Cover

TIKTIKI

আচমকা বেজে ওঠে ল্যান্ডফোনটা। রাত সাড়ে এগারোটা। ওর ঘুমোনোর সময় এখন। এসময় তো ফোন আসার কথা নয়! আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন সবাই জানে, মোবাইলফোন বন্ধ করে ও রাত দশটায় শুয়ে পড়ে। আসলে দশটা থেকে সাড়ে এগারোটা এই সময়টুকু একান্ত ওর নিজের। এটা ওর লেখালেখির সময়। নতুন কিছু সৃষ্টি করার সময়। এ সময়টুকু থেকে শুক্তিও কয়েক মিনিট ভাগ বসালে ও বিরক্ত হয়। ইচ্ছা না থাকলেও রিসিভার ওঠাতে হয়— হ্যাঁ বলছি, বলুন।

Share:

আচমকা বেজে ওঠে ল্যান্ডফোনটা। রাত সাড়ে এগারোটা। ওর ঘুমোনোর সময় এখন। এসময় তো ফোন আসার কথা নয়!  আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজন সবাই জানে, মোবাইলফোন বন্ধ করে ও রাত দশটায় শুয়ে পড়ে। আসলে দশটা থেকে সাড়ে এগারোটা এই সময়টুকু একান্ত ওর নিজের। এটা ওর লেখালেখির সময়। নতুন কিছু সৃষ্টি করার সময়। এ সময়টুকু থেকে শুক্তিও কয়েক মিনিট ভাগ বসালে ও বিরক্ত হয়। ইচ্ছা না থাকলেও রিসিভার ওঠাতে হয়— হ্যাঁ বলছি, বলুন।

  অন্য প্রান্তে কথাগুলো কপালে এঁকে দেয় চিন্তার কারুকাজ। চোয়াল শক্ত হয়। হাতের কলমটা কাগজের বুকে যেন গেঁথে যেতে চায়! কানের মধ্যে ঢুকছে কথা নয়, যেন গলানো সিসে! একসময় কান থেকে সরে আসে রিসিভার।

  শুক্তি দরজার ফ্রেমে। ওর চোখে-মুখে জিজ্ঞাসা। রিসিভার নামায় অমল। ক্রেডলে নয়, টেবিলে। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে— রাসকেল। ইডিয়ট!

  কার ফোন? কাকে বকছ আপনমনে?

  অমল চমকে ওঠে— তুমি? ঘুমোওনি?

  ফোনের শব্দে উঠে এলাম। এত রাতে তো...!

  শুক্তি দরজা ছেড়ে ঘরের ভেতরে। অমলের মুখমণ্ডলের রেখা পালটায়। শুক্তি সরব— উড়ো ফোন নিশ্চয়। আজকাল এই এক উৎপাত। কী বলল? ভয়টয় দেখিয়ে টাকাপয়সার দাবি নয় তো?

  না ওসব নয়। আনকালচারড ইনটলারেবল।

  কী পাগলের মতো বকছ! কী হয়েছে বলবে তো! তেমন বুঝলে পুলিশে খবর দিতে হবে।  

  অমল রিসিভার তুলে ক্রেডলে রাখে। কলমে ঢাকনি লাগায়— না তেমন কিছু নয়। ননসেন্স স্টুডেন্টদের কারও ফোন। আমার প্রেস্টিজ হ্যাম্পারিংয়ের চেষ্টা। ন্যাস্টি ব্লেইম...!

  শুক্তি চেয়ারে বসে— স্টুডেন্ট! ঠিকই বলেছ বুঝলে। সন্ধেবেলায় তুমি যখন ও ঘরে জেনিকে পড়াচ্ছিলে, তখন একটা ফোন এসেছিল, পুরুষের গলা।

  কী ক্কী বলেছে তোমাকে?  

  তেমন কিছু বলেনি। জিজ্ঞেস করল, 'স্যার কোথায়?' ‘পড়াচ্ছে’ বলতে লাইন কেটে দিল।

  এরাই করেছিল। স্টুপিড।

  ব্লেম ফ্লেম কী বলছ...?

  তোমার না শুনলেও চলবে। শোও গে যাও।

  শুক্তি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। অমলের ঘাড়ে হাত রাখে— ওসব কিছু নয় গো। কোনও ছাত্র হয়তো বদমায়েশি করছে তোমার সঙ্গে। কারুকে হয়তো কোচিংয়ে নিতে গররাজি হয়েছ। এখন বাদ দাও তো ওসব। হাতে মুখে জল দিয়ে এসো একটু। চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে।

  অমল শুক্তির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর মনের ভাষা বোঝার চেষ্টা করে। আস্তে আস্তে ওর চোখ-মুখে নরম ভাব ফুটে ওঠে।

  কী দেখছ অমন করে? চলো শোবে চলো। সাড়ে এগারোটা পেরিয়ে গেছে।

বেডরুমের দেওয়াল-ঘড়িতে সুরেলা বাজনা। তারপর ঠিন ঠিন করে বারোটা ঘণ্টি। ঘরে নীলচে আলো। অমল খালি গায়ে। চিত হয়ে শুয়ে। ডান হাতটা কপালে আড়াআড়ি। চোখ ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে স্থির। রামকিঙ্করের ভাস্কর্য যেন! রোজকার মতো আজও শুক্তির ডানহাতের আঙুলগুলো অমলের বুকের ঘাসে চরছে। মুখটা অমলের ক'নের কাছে— টেলিফোনে কী বলল, আমাকে বলবে না?

  ভাস্কর্য প্রাণ পায়— তেমন কিছু নয়।

  তা হলেও বলো না। তুমি খুব চিন্তায় পড়েছ মনে হচ্ছে।

  শুনলে তোমার খারাপ লাগবে। ঘুমোও।

  না খারাপ লাগবে না। বলো।

  বললাম তো তুমি ঘুমোও।

  বুকের ওপর আঙুলগুলো থেমে যায়। বুক থেকে হাত সরে আসে। নিস্তব্ধ। শুধু দেওয়াল ঘড়িটা কুট কুট শব্দ করে সময়কে খাচ্ছে।

  অমল পাশ ফেরে— কী রাগ করলে?

  শুক্তি উলটোদিকে পাশ ফেরে— না, রাগ করার কী আছে। ওসব তোমার পার্সোনাল ম্যাটার। আমাকে বলবে কেন? তোমার প্রেস্টিজ-হ্যাম্পার হলে আমার তো কিছু যায় আসে না।

  দেখো শুক্তি, তুমি ব্যাপারটা অন্যভাবে নিচ্ছ। আসলে আমাকে... মানে আমার বাড়িতে একা পড়তে আসাটা... মানে...!

  থাক থাক। তোমাকে আর রাতদুপুরে কথা বানাতে হবে না। আমার ঘুম পাচ্ছে। একটু সরে শোও।

  অমল কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়।

 

দুই

শুক্তি দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে ঘুমোচ্ছে। হালকা শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। এক লয়ে, এক ছন্দে। অমলের চোখ দুটো স্থির দেওয়ালে স্থির হয়ে থাকা এক টিকটিকির দিকে। টিউশনি, কলেজ, আবার টিউশনি। মাথাটা বিশ্রামের সময় পায় না সারাদিন। রোজ রাতে বিছানা নিতে না-নিতে দু'চোখে নেমে আসে ঘুম। কিন্তু আজ। মনের মধ্যে বাজছে টেলিফোনের কথাগুলো— জেনিকে নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করছেন স্যর। প্রেস্টিজ পাংচার করে দেব। আমরা ওয়ালিং করব কলেজে, কোয়ার্টার্সের দেওয়ালে। ফোন করে আপনার সুন্দরী বউকেও জানাব। কলেজে-বাড়িতে জেনিকে নিয়ে এরকম অংশু-লীলা চলতে থাকলে...।  

  অমলের মনে জেনি। বাংলা অনার্সের উৎকট পোশাক পরা মেয়েটা। ওর কাছে বাংলা পড়তে আসে একা। সন্ধেবেলায়। ওর পোশাক আশাক, হাবভাব দেখে প্রথম প্রথম তো ওর বেশ অস্বস্তি হয়েছিল। কলেজে শাড়ি পরে যায়, কিন্তু পড়তে আসে বিভিন্ন পোশাকে। কোনওদিন মিডি-স্কার্ট, কোনওদিন জিন্স-টি শার্ট, আবার কোনওদিন সালোয়ার কামিজ। কথাবার্তাগুলোও কেমন আদুরে আদুরে। বেশ সুন্দরী মেয়েটা। তা ছাড়া বাড়বাড়ন্ত শরীর! টেবিলে কনুইয়ে ভর দিয়ে বসে ও যখন মগ্ন হয়ে 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য' কিংবা 'গীতগোবিন্দম'-এর ব্যাখ্যা শোনে, তখন হুঁশ থাকে না যে, ওর গোপন সৌন্দর্য বিকশিত হয়ে  পড়ছে কিংবা যৌবনের সৌরভ বাতাসকে ভারী করে তুলছে। ইচ্ছা না থাকলেও পড়াতে পড়াতে ওর চোখ আটকে যায় সেই বিকশিত সৌন্দর্যে। রক্তে মিশে যায় সেই সৌরভ। অথচ জেনি কেমন উদাসীন থাকে। বিবেকের দংশনে ও চোখ সরিয়ে নেয় ঠিকই। কিন্তু ওকে সচেতন বা সংযত হওয়ার কথা বলতে পারে না। হয়তো বলতে চায়ও না। পুরুষের স্বাভাবিক ধর্ম অনুযায়ী নারী-শরীর দেখে হয়তো কিছুটা তৃপ্তি পায়। ব্যস! এইটুকু হয়তো ওর অপরাধ। ওর সঙ্গে অশালীন কথা বা অশালীন ব্যবহার তো কখনও করেনি। এর মধ্যে বাড়াবাড়িটা কোথায়! চোখ চলে যাওয়াটা এমন কিছু দোষের, ও মনে করে না।   অধ্যাপক হলেও ও তো পুরুষ! ওর এখনও চল্লিশ পেরোয়নি। এটা অপরাধ বা বাড়াবাড়ি হিসেবে গণ্য হলে জেনির ভূমিকাও তো এতে কম নয়। কলেজে পড়া মেয়ে নিশ্চয় কচি খুকি নয়! সে সচেতন ভাবেই হয়তো নিজেকে দেখায়। ছাত্রী হলেও সে তো নারী।    

  শুক্তি পাশ ফেরে। হালকা নীল আলোয় ওর মুখটা মায়াময়। ও মুখে এখন রাগ-অভিমানের কোনও ছাপ নেই। সত্যি, জেগে-থাকা মুখের সঙ্গে ঘুমন্ত মুখের কত তফাত! আবার ঘুমন্ত মুখের সঙ্গে মরা মুখের ফারাকও বিস্তর। শুক্তির সুন্দর মুখখানা অমলের এখন বেশ ভাল লাগে। ও যথেষ্ট সুন্দরী। অথচ জেনির সঙ্গেও ওর কত তফাত। জেনির মুখে চোখ পড়লে, চোখ সরে না। এক অদ্ভুত মাদকতা ওর চোখে-মুখে।

  দেওয়ালের ঘড়িটা মিষ্টি বাজনা ছড়ায়। তারপর একটাই মাত্র ঘন্টি ঠিন করে। ঘড়ির মিষ্টি বাজনাটা অন্যান্য দিন বেশ ভাল লাগে অমলের। যেন একঘন্টা ধরে মনে জমে থাকা ক্লান্তিটুকু শুষে নেয় ওই সুরেলা আওয়াজ। পরের ঘণ্টার জন্য মনকে নতুন করে শক্তি দিয়ে দেয়। কিন্তু আজ ঘড়ির বাজনাটা ওর মনের তারে এলোমেলো সুর তোলে। ঝড়ের পূর্বাভাস যেন! যেন বলতে থাকে, 'সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। চিন্তা-ভাবনা করে যা সিদ্ধান্ত নিতে চাও, নিয়ে ফেলো শিগগির।' 

  এই মুহূর্তে জেনির ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে অমলের। সবার সঙ্গে কোচিংয়ে পড়ার কথা ওকে বলা হয়েছিল। ও রাজি হয়নি। একা পড়তে চেয়েছিল তিনগুণ টাকা বেশি দিয়ে। টাকাটা কম নয়, তাই পড়াতে রাজি হয়ে গিয়েছিল। পড়তে আসে ওই আগুনজ্বালা শরীরে উৎকট পোশাক পরে। ওর দেহে চোখ পড়ার সময় লক্ষ্য করেছে, জেনির চোখে প্রশ্রয়ের ছাপ, শরীর পেতে সয়ে নিচ্ছে যেন! এতে কি জেনি আনন্দ পায়? নাকি মজা পায়, 'দেখো আমি কেমন পুরুষের চোখ টানতে পারি। আমাকে তোমরা দেখে কেমন লোভী হয়ে পড়ো। তোমাদের ব্যক্তিত্ব ও গাম্ভীর্যের মোড়ক ছিঁড়ে বের করে নিয়ে আসি লোলুপ ও কামুক দৃষ্টি!'  

  এসব ভাবতে ভাবতে দেওয়ালে চোখ যায় অমলের। দেখে টিকটিকিটা জায়গা পালটেছে।

 

তিন 

টিকটিক-টিক-টিক-টিক। হঠাৎ পরিচিত শব্দটা সময়কে ভেঙে দেয়। ভাঙে অমলের চিন্তাকেও। টিকটিকিটা কোথায়? একটু আগেই ছিল পুব-দেওয়ালে। ঘাড় ঘোরায় অমল। দরজার পেলমেটের ওপর অনড় হয়ে আছে ওটা। চোখ স্থির। নিশ্চয় ওর সামনে কোনও শিকার আছে। টিকটিকিটা এবার এগোচ্ছে এক পা-এক পা করে।

  অমলের ভাঙা চিন্তাটা আবার জোড়া লাগে। ফোনটার কথাগুলো তাকে যেন একটু একটু করে দুর্বল করে দিচ্ছে, ‘জেনিকে নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি করছেন স্যর।’ মোটেই বাড়াবাড়ি কিছু করা হয়নি। অশালীন ব্যবহার কখনও করা হয়নি ওর সঙ্গে। ওর উত্তেজক দেহের হাতছানি কখনও সখনও লদলদে মাংসপিণ্ডের মতো মনটাকে, শিক্ষা-সভ্যতার শক্ত খোল থেকে টেনে বের করে ফেলে ঠিকই। কিন্তু তক্ষুনি তাকে বিবেক ও সম্মানবোধের খোঁচা মেরে আবার খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলা হয়। তবুও কেন ছেলেগুলো...! আচ্ছা! ওরা এরকম সন্দেহ করলই বা কেন? জেনি কি তবে রং চড়িয়ে কিছু বলেছে ওদেরকে? নিজের রূপের জাহির করার জন্য কোনও গল্প ফেঁদে ওদেরকে ক্ষিপ্ত করেছে? ওরা নিশ্চয় জেনির সঙ্গ চায়। তাই ঈর্ষায়...। ইদানীং জেনির শরীরের উপত্যকায় চোখ কি বেশিক্ষণ থামছে ওর প্রশ্রয় পেয়ে! খোল থেকে কামনার মাংসপিণ্ড বেরিয়ে, ওর প্রশ্রয়ের রসে ভিজে পেছল হয়ে শুঁড় বের করে একটু বেশি এগোচ্ছে কি ওর দিকে? তাই ওকে স্পেশাল নোটস্ কিংবা ইম্পর্ট্যান্ট কোয়েশ্চন-আনসার দেওয়া। কিংবা একটু বেশি সময় ধরে পড়ানো। আচ্ছা! এ ব্যাপারটা শুক্তিও কি লক্ষ করেনি? জেনি তো বাড়িতেই পড়তে আসে। কোচিং-সেন্টারে যায় না! শুক্তির মনেও কি কিছু...? শুক্তিকে ফোনে শোনা কথাগুলো বলা উচিত ছিল। কেন যে বলতে ইচ্ছে হল না। ওর মনে সন্দেহ জমে থাকলে, এতে নিশ্চয় আরও বাড়ল।

  শুক্তি কেমন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ওর মনে কোনও সন্দেহ জমে আছে কিনা, তা এখন ওর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না। ও  যদি সত্যি সত্যি সন্দেহ করত, তা হলে তো সম্পর্কে চিড় ধরতে পারে। দু'জনের মধ্যে মানসিক দূরত্ব...। না-না, এই সামান্য ব্যাপারে...। শুক্তি তেমন মনের কখনও নয়। অমলের মনে পড়ে যায়, বিয়ের আগে শুক্তির সঙ্গে প্রেমপর্ব চলাকালীন এক ঘটনা— তখন সদ্য কলেজে পড়ানোর কাজটা পেয়েছে। কলেজের একজন থার্ড-ইয়ারের ছাত্রী বিভিন্ন অজুহাতে ওর কোয়ার্টার্সে মাঝেমাঝে হানা দিত। একদিন শুক্তি দেখা করতে এসে দেখে, টেবিলের দু'দিকে দু'জনে বসে হালকা আলোচনায় ও হাসাহাসিতে ব্যস্ত। অমল প্রমাদ গনেছিল। মেয়েটা চলে যেতে শুক্তি এক মুখ হেসে বলেছিল, 'না না লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, মাঝেমাঝে স্বাদ বদল ভাল। একঘেয়েমি কাটে। তবে রুচিটা বদলে ফেলো না।' ও অবাক হয়েছিল। ওর আশঙ্কা ছিল শুক্তির রাগ, অভিমান কিংবা সন্দেহ হবে। ওকে দু’-চার কথা শোনাবে। অথচ...! তারপর তো শুক্তিকে বিয়ে করেছে, এক ছাদের নীচে এতদিন। আরও বোঝাপড়া, আরও ভালবাসা। একে অন্যের সুখ-দুঃখ, ভাল-মন্দ ভাগ করে নেওয়া। এর কি কোনও মূল্য নেই? কিন্তু ওই অসভ্য ছেলেগুলো যদি দেওয়ালে ওইসব সাজানো আজেবাজে কথা লেখে, তখনও কি শুক্তি...! ওর মনের চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে। শুধু শুক্তি কেন, সবাই, সবাই তখন ওকে সন্দেহের চোখে দেখবে। মানসম্মান একদম…!

 

চার

সিলিং-ফ্যানটা পুরো দমে ঘুরছে। তবুও অমলের পিঠটা ঘামে জ্যাবজ্যাবে হয়ে উঠেছে। লেপটে আছে বিছানার চাদরে। ওর গলা শুকিয়ে গেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে ও। হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে জলের বোতল নেয়। গলায় ঢালে যতটা সম্ভব কম শব্দ করে। খাট থেকে নেমে জানলার ধারে যায়। জানলা খোলা। বাইরে শিউলি গাছটাতে ঝুপঝুপে অন্ধকার। ল্যাম্পপোস্টটা বেশ দূরে। ল্যাম্পপোস্টের নীচে কে বসে আছে যেন! নড়ছে চড়ছে। কোনও মানুষ? নটী পাগলি বোধহয়। সারাদিন ধরে ও শুধু যাত্রাপালার পাঠ বলে। হাসে, কাঁদে, কখনও বা নাচে ঘুরে ঘুরে। ময়লা ছেঁড়া শাড়িটা একটু তুলে ধরে নাচের সময়। কই এখন তো ও পাঠ বলছে না। চুপচাপ বসে আছে ল্যাম্পপোস্ট আঁকড়ে। ও কি ভয় পেয়েছে? নাকি ঘুমোচ্ছে? না ঘুমোয়নি তো! ওই তো আকাশের দিকে মুখ তুলে কী যেন দেখছে! ওরও কি ঘুম আসছে না? আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ জমে আছে। মেঘের আড়ালে পশ্চিম আকাশে চাঁদটা। কেমন যেন পাঁশুটে। কড়া করে ভাজা পাঁপড়ের মতো। একটু হাওয়া নেই। গুমোট ভাব। বৃষ্টি নামবে মনে হয়। 

  অমলের মনে ভিড় করে টেলিফোনের কাটাকাটা কথাগুলো। ছেলেগুলো ফোন করে শুক্তিকে যদি বাড়িয়ে বাড়িয়ে এসব বলে! শুক্তি কি ওদের কথা বিশ্বাস করবে? ওকে কি ঘৃণা করতে শুরু করবে মনে মনে? নাকি রাগে-অভিমানে কথা বন্ধ করে দেবে? ও কি সত্যি-মিথ্যে যাচাইটাও করবে না? আচ্ছা! শুক্তিকে যদি ব্যাপারটা খুলে বলা হয় আগেই; তা হলে নিশ্চয় পাজি ছেলেগুলো ওর মনে...!   

  অমল আবার বিছানায় উঠে যায়। শুক্তি ঘুমোচ্ছে অঘোরে। ওকে কি এখন জাগানো ঠিক হবে? না থাক। সকাল হতে আর বেশি দেরি নেই। একটু পরেই আলো ফুটবে। সকালেই না হয় শুক্তিকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা যাবে। কিন্তু ওরা যদি রাতেই কোয়ার্টার্সের দেওয়ালগুলো নোংরা কথায় ভরিয়ে ফেলে। ঘুম থেকে উঠেই যদি ওগুলো চোখে পড়ে সকলের। আর ভাবতে পারে না ও। ওর দৃষ্টিটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। তাকিয়ে আছে, অথচ নির্দিষ্ট কিছুতে চোখ নেই। এমন সময় দেওয়ালঘড়িটা আবার বেজে ওঠে। টিকটিকিটা এখন ঘড়ির পাশে অনড় হয়ে। ঘড়ির বাজনা ছড়ায় পুরো ঘরটাতে। বাজনা থেমে যাওয়ার পর ঘড়িটা ঠিন ঠিন করে সময়কে ভাঙে। সে-শব্দ একশো গুণ বেড়ে অমলের বুকে বাজে। অসহ্য! বিছানা থেকে নিঃশব্দে নেমে পড়ে ও। তারপর গুটিগুটি পায়ে সিঁড়ির দরজা খুলে ছাদে উঠে যায়।

 

পাঁচ

খোলা ছাদ। নিস্তব্ধ। হালকা হাওয়া বইছে। মেঘটা কাটছে বোধহয়। অমলের শরীরে আরামের ছোঁয়া। পুব-আকাশে গেরুয়া আভা। তার মাঝে শুকতারাটা জ্বলজ্বল করছে। দূরে কলেজ চত্বরে গাছপালাগুলো আঁধারের চাদর জড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। গাছের নীচে কারা যেন রয়েছে মনে হচ্ছে। ওই ছেলেদের দল নয় তো? দেওয়ালে-দেওয়ালে অপমান ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে? নাকি ‘মর্নিং-ওয়াক'-এ আসা বয়স্করা। ভোরের প্রথম জাগা পাখিটা কি ডেকে উঠল? নাকি প্রহর-গোনা রাতচরাটা!  নীচে বাথরুমে জলের শব্দ যেন! তবে শুক্তি কি উঠেছে? ওকে বিছানায় না পেয়ে চিন্তিত হবে নিশ্চয়। ঘরে না পেয়ে ও ঠিক ছাদে খুঁজতে আসবে ওকে। 

  হঠাৎ এক হা হা হাসির শব্দে অমল চমকে ওঠে। নটী পাগলির হাসি। ও ল্যাম্পপোস্টের নীচে থেকে কখন উঠে চলে এসেছে। কোয়ার্টার্সের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে বিকট শব্দে হাসছে। হাসি থামিয়ে ও এবার যাত্রাপালার পাঠ বলা শুরু করেছে। তীক্ষ্ণ কিন্তু অসংলগ্ন কথাগুলো। কখনও গলা চড়ছে কখনও খাদে নামছে। অমলের কানে ছেঁড়া ছেঁড়া কথা আসছে— পালাবে কোথায় সিরাজ। হাঃ-হাঃ-হাঃ। আমি সাজাহান-কন্যা...!

অমলের কানের পরদা ফাটিয়ে মাথার মধ্যে ঢুকে গিয়ে আলোড়ন তোলে ওই নটা পাগলির হাসি। অসহ্য! ওকে কেউ থামাচ্ছে না কেন? ওই যে আবার শুরু করেছে— জানি, জানি, সব জানি আমি। কাউকে বলব না, কিচ্ছু বলব না, কাউকে বলব না, দূর হটো, হাঃ-হাঃ-হাঃ ভয় পেয়েছ...।

  অমলের ইচ্ছে করে নীচে নেমে গিয়ে নটীর গলাটা চেপে ধরে। ওর পাগলি জীবনের ইতি করে দেয় এখুনি। কী বিতিকিচ্ছিরি, বীভৎস। মুখের একপাশ পোড়া। চোখটা বেঁচে থাকলেও আশপাশটা মরুভূমি হয়ে গেছে। গলায় ঝোলানো নানারকম পুঁতি ও পাথরের মালা। সারাটা দিন বকে চলে ও। ঠোঁটের চারপাশে ফেনা। সূর্য ডুবলেই ওর পাগলামি নাচন-কোঁদন শেষ। আবার ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে শুরু করবে। অমল আর সহ্য করতে পারে না পাগলির পাগলামি। ওকে স্তব্ধ করে দিতেই হয়তো ও সিঁড়িমুখো হয়। ধাপে ধাপে নেমেও আসে কিছুটা। হঠাৎ থেমে পড়ে ও। সিঁড়িতে অন্যের পায়ের শব্দ যেন! তবে কি নটী পাগলি...। না না ও কী করে আসবে। নীচের গেট তো বন্ধ। নিশ্চয় শুক্তি! ওকে খুঁজতে আসছে। ওকে বুঝতে আসছে। 

  অমল আবার ছাদে উঠে যায়। তড়িৎগতি। ও কি শুক্তির কাছ থেকে নিজেকে আড়ালে রাখতে চাইছে? তবে কেন ও ছাদের এ কোণটায় চলে এল? এখানে তো সচরাচর আসে না। চিলেকোঠার ফোকরের বাসিন্দা পায়রাগুলো এদিকটা বিশ্রীরকম নোংরা করে রেখেছে। ওর পায়ের শব্দে পায়রাগুলোর অসময়ে ঘুম ভেঙে গেল বোধহয়! ওরা হঠাৎ বকবকম শুরু করল। শুক্তি নিশ্চয় ছাদে উঠে এসেছে এতক্ষণে। ছাদময় ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ও কি অশুভ কিছু ভাবতে শুরু করেছে, ওকে খুঁজে পাচ্ছে না বলে! খুঁজুক। আর একটু খুঁজুক ও। পেয়ে তো যাবেই একসময়। অনেকক্ষণ খোঁজার পর হঠাৎ পেয়ে যাওয়ার মধ্যে কেমন এক আনন্দ ও তৃপ্তি-জারিত অনুভূতি থাকে। শুক্তিকে সেটাই দিতে চায় ও। রাত্তিরে ওর মনে কষ্ট দিয়েছে। সে কষ্টকে এই আনন্দটুকু দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে ছাদের কোণে।

  পায়রাগুলো গুমরে চলেছে। অবসরে কখনও সখনও পায়রার বকম বকম শুনেছে সে। দেখেছে কেমন ঘাড়ের রোঁয়া ফুলিয়ে মাথা নিচু করে কুব কুব করতে থাকে পুরুষ পায়রাটা। আর মাঝেমাঝে একটা ডানা ছড়িয়ে পায়ের নখে ঘষে নেয় অদ্ভুত কায়দায়। কই এখন তো বকবকমটা সেরকম লাগছে না। একটু যেন অন্যরকম! কেমন বেসুরো। বেয়াড়া রকমের শব্দ। অসময়ে ঘুম ভাঙার জন্যই কি?

ছয়

শুক্তির আকুল দৃষ্টি অমলকে আবিষ্কার করে। পুব আকাশের গেরুয়া পশ্চাদপটে যেন সিল্যুয়েট। শুধু অবয়বটা বোঝা যায়। চোখ-মুখ-নাক একাকার। আলাদা করা যায় না। ও এক পলক দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর ধীর পায়ে অমলের দিকে এগোয়। কাঁধে আলতো হাত রাখে। অমল ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর হাত ধরে দু'মুঠোর মধ্যে। শুক্তির আবেগভেজা গলা— তুমি একা ছাদে এসেছ, আমাকে ডাকোনি কেন? সারারাত ঘুমোওনি মনে হচ্ছে। কেন এত ভাবছ বলো তো!

  শুক্তি, আমি আর ভাবতে পারছি না। আমার মান-সম্মান-যশ...!   

  কিচ্ছু যাবে না। কোনও ক্ষতি হবে না তোমার। তুমি কোনও অন্যায় করোনি। আমি জানি তুমি অন্যায় করতে পারো না। 

  তোমার এত বিশ্বাস আমার ওপর। অথচ রাতে আমি তোমাকে...।

  না বললেও আমি জানি।

  তুমি জানো? মানে ওরা তোমাকে ফোনে সব...?

  না, ওরা কিছু বলেনি। আমি বুঝতে পারি। এতদিন ধরে আমি তোমার সঙ্গী। তোমাকে বুঝব না।

  তুমি জানো না, ওরা কী কুৎসিত ইঙ্গিত করছে। বাড়িতে পড়তে আসে জেনি। আমাকে মিথ্যা করে ওর সঙ্গে জড়িয়ে...!

  জানি। জেনির প্রশ্রয়, শরীরী আবেদন, তোমার কামনা-মাখা দৃষ্টি, কিছুই আমার চোখ এড়ায় না।

  অমল শুক্তির হাতটা মুঠো থেকে ছেড়ে দেয়— অর্থাৎ তুমিও আমাকে...?

  না, সন্দেহ, ঘৃণা কোনওটাই করি না। বরং আমার গর্ব হয়, তুমি এখনও ফুরিয়ে যাওনি।

  তুমি আমাকে করুণা করছ মনে হচ্ছে।  

  শুক্তি অমলের হাত চেপে ধরে— বিশ্বাস করো, তোমাকে মোটেই খারাপ ভাবি না। তা ছাড়া তুমি তো খারাপ নও। চল্লিশবছর বয়সি একজন পুরুষের চোখে কামনার আগুন থাকবে না তো কি একটা দশবছরের বাচ্চার চোখে থাকবে!  একজন আঠারো বছরের আগুনে-মেয়ের শরীরের আনাচে-কানাচে চোখ যাবে না তো কি আটান্ন বছরের বুড়ির দিকে চোখ যাবে! আমি এও দেখেছি, তুমি তাকাতে লজ্জা পাও, ইতস্তত করো। এটাই তো তোমার ভাল হওয়ার প্রমাণ। তুমি জেনির সঙ্গে খারাপ কিছু করোনি। তা আমি বিশ্বাস করি।

  অমল শুক্তিকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে— জানো শুক্তি! আমার সবচেয়ে বেশি চিন্তা ছিল তোমাকে নিয়ে। পাছে তুমি ভুল বোঝো।

অমলের বুকে মাথা রাখে শুক্তি— আমাকে তা হলে এতদিনে এই চিনলে তুমি! অমল শুক্তির মাথায় থুতনি রাখে— আজ আবার নতুন করে চিনলাম। সত্যিই তুমি আমার মনটা কিছুটা হালকা করে দিলে গো! কিন্তু অন্য ভয়টা মন থেকে তাড়ানো যাচ্ছে না।

  অন্য ভয়?

  হ্যাঁ, দেওয়ালে-দেওয়ালে আমার নামে কুৎসা রটানোর ভয়। ওরা ফোনে এটাই বলেছিল কাল রাতে। ওরা যদি ওইসব আজেবাজে...?

  লিখবে না। আমি বলছি ওরা লিখবে না। এ ব্যাপারটা তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও।

  তোমার ওপর। তুমি আবার কী করবে?

  যা করার আমিই করব। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। তুমি শুধু একটা কাজ করবে। জেনি আজ সন্ধেয় পড়তে এলে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবে। বলবে, বউদি ডেকেছে। ওকে যা বলার বলব।

  অমল শুক্তির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর মুখে লালচে আভা। নাকছাবির পোখরাজ পাথরটা ঝিকমিক করছে। হালকা হাওয়ায় কিছু ঝুরো চুল বারবার ওর বাতাবি-কোয়া রঙের ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে। দু'ঠোঁটের ফাঁকে দু'-একটা বেলকুঁড়ি, কেমন অচেনা লাগছে তার এতদিনের চেনা শুক্তিকে।

  পুব আকাশে শুকতারাটা কখন মুখ লুকিয়েছে। গেরুয়া আবির ছড়ানো আকাশে দু'-একটা পাখির আনাগোনা। পায়রাগুলো বকবকম থামিয়ে আবার হয়তো ঘুমের জগতে!

এমন সময় বিকট চিৎকার করে নটী পাগলি গান ধরে— আমার হৃদয় বনে কুসুমকলি আজকে ফুটেছে.../তাই তো যত রসিক নাগর আজকে জুটেছে...

  শুক্তি ছাদ থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখে ছেঁড়াখোড়া কাপড়টা দু'হাতের আঙুলে ধরে, একটু তুলে নটী নাচছে ঘুরে ঘুরে। শিউলি গাছ ঘিরে ওর যত নাচ। মাঝেমাঝে গাছটাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরছে। ওই গাছটাই যেন ওর নাগর!

  অমলও মুখ বাড়ায়। দেখে, শিউলি গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে এখনও কিছু অন্ধকার বাসা বেঁধে আছে। সবুজ পাতার ঝোপ থেকে কোনও এক পাখি উড়ে যায় সাদা মেঘভাসা গেরুয়া আকাশে। নটী পাগলির ওপর রাগটা এখন আর নেই।

  শুক্তি বলে, চলো, নীচে চলো। ঘুমোবে। সারারাত ঘুমোওনি।

  ধীর পায়ে ওরা দু'জনে নীচে নেমে আসে। ঘরের ভেতর এখনও রাত ছড়ানো। বিছানায় ঘুমঘুম গন্ধ। অমলের দু'চোখে ঘুমের বোঝা। শুক্তি ওর মাথায় হাত রাখে— তুমি ঘুমোও।

  অমল বলে— ঘরের ভেতরে সকাল হতে এখনও দেরি আছে। তুমিও শোবে এসো।   

  শুক্তির ঠোঁটের কোণে হাসির লুকোচুরি। অমলের দিকে ও হালকা পায়ে এগোয়। অমল অবাক হয়ে দেখে শুক্তির মুখে বয়সের রেখাগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেন বিয়ের আগের সেই দুষ্টুমিষ্টি মেয়েটা! এমন সময় দেওয়াল ঘড়ির বাজনাটা ঝংকার দিয়ে ওঠে। তারপর পাঁচটা ঠিন ঠিন আওয়াজ দু'জনের মনের মাঝে পাঁচ হাজার ঠিন ঠিন শব্দ ছড়িয়ে দেয়। অমলের চোখ যায় দরজার পেলমেটে। সেখানে টিকটিকিটা আর নেই। অমল শুক্তিকে দু'হাতে ধরে বুকে টেনে নেয়। এমন সময় কানে আসে নটী পাগলির কান্না। সে শিউলি গাছের সামনে পা ছড়িয়ে বসে ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদছে। সে কান্না ছড়িয়ে পড়ছে শিউলি গাছের পাতায় পাতায়।

Share: