আজও এল ছেলেটা। রোজকার মতো আজও পিঠ থেকে স্কুলব্যাগটা খুলে, গাছে, ডাল কেটে নেওয়া খোঁচটায় ঝুলিয়ে রাখল। তারপর যথারীতি গাছগুলোর কাছে পরপর গেল। থামল। বিড়বিড় করে কিছু বলল বোধহয়! ঠিক যেন ভালমন্দ, সুখ-দুঃখের খোঁজখবর নিচ্ছে! এ পর্ব শেষ হতে এদিক ওদিক থেকে বুনো ফুল-পাতা আর শুকনো মাটি নিয়ে সব গাছের সামনে কিছু কিছু দিল। নৈবেদ্য দিচ্ছে যেন! তারপর সেই মোটা গাছটার আড়ালে গিয়ে চুপটি করে বসে রইল। যেন ওৎ পেতে থাকা কোনও বাঘ কিংবা উপদ্রুত সীমানায় অতন্দ্র প্রহরী।
আজও এল ছেলেটা। রোজকার মতো আজও পিঠ থেকে স্কুলব্যাগটা খুলে, গাছে, ডাল কেটে নেওয়া খোঁচটায় ঝুলিয়ে রাখল। তারপর যথারীতি গাছগুলোর কাছে পরপর গেল। থামল। বিড়বিড় করে কিছু বলল বোধহয়! ঠিক যেন ভালমন্দ, সুখ-দুঃখের খোঁজখবর নিচ্ছে! এ পর্ব শেষ হতে এদিক ওদিক থেকে বুনো ফুল-পাতা আর শুকনো মাটি নিয়ে সব গাছের সামনে কিছু কিছু দিল। নৈবেদ্য দিচ্ছে যেন! তারপর সেই মোটা গাছটার আড়ালে গিয়ে চুপটি করে বসে রইল। যেন ওৎ পেতে থাকা কোনও বাঘ কিংবা উপদ্রুত সীমানায় অতন্দ্র প্রহরী।
শুভর মনে কৌতূহলের ডিমে তা পড়ছে রোজ। কোয়ার্টার লাগোয়া এই চারকোনা জমিতে ছেলেটা একা। অবশ্য একা বললে ভুল হবে; গোট পাঁচেক মোটা গুড়িওয়ালা গাছ ও কিছু বুনোফুলের ঝোপ ওর সঙ্গী। এদের সঙ্গে ছেলেটা রোজ অনেকটা সময় কাটায়, যতক্ষণ না সর্ষেখেতের ও পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসা মহিলাকে দেখতে পাওয়া যায়। দেখে মনে হয় গাছগুলোর সঙ্গে ছেলেটা খেলছে। গল্প করছে। অন্য কেউ ওর খেলার সঙ্গী হয়েছে, এমন দেখা যায় না।
আর একটু পরেই সেই মহিলা আসবে। বেশ লম্বা, একটু রোগা, ফরসা। লালপাড় সাদা শাড়ি, লাল ব্লাউজ। তার ওপর সাদা উলের হাতে-বোনা চাদর। কপালে লাল টিপ, সিঁথিতে সিঁদুর। তার চোখ সবসময় নীচের দিকে। ক্লান্ত, অবসন্ন। তাকে দেখামাত্র ছেলেটা দৌড়োবে তার দিকে। বেড়াল-মাকে হঠাৎ দেখতে পেয়ে বেড়াল-ছানার ছুটে যাওয়া যেন। মহিলার সঙ্গে চারকোনা জমিটার কাছাকাছি এসে, ছেলেটা আবার ছুটে চলে আসবে গাছগুলোর কাছে। ব্যাগটা খুলে নিয়ে পিঠে ঝোলাবে। গাছগুলোর সামনে গিয়ে আবার কিছু বলবে। তারপর মহিলার হাত ধরে মেঠো পথ বরাবর কিছুদূর গিয়ে পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যাবে।
ওরা যতক্ষণ না চোখের আড়ালে যায়, ততক্ষণ শুভ রোজ ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওরা অদৃশ্য হতেই ওর মনটা কেমন বিষণ্ন হয়ে যায়। এই কোয়ার্টারে ও তখন বড় একা! ওর সঙ্গে আলাপ না হলেও, কাছে না এলেও, ওই ছেলেটা যেন রোজ বিকেলে ওর সঙ্গী হয়! ওর অদ্ভুত খেলা দেখতে দেখতে সঙ্গহীন বিকেলের অনেকখানি কেটে যায়। একটু পরেই ওর বিষণ্ণতা বাড়িয়ে আঁধার নামে। সেই আঁধার গায়ে জড়িয়ে হরি রোজ আসে। দাদাবাবু, আলো জ্বালাই— বলতেই ঘরের আঁধার সরে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মনের আঁধারটাও পিছু হটতে থাকে একটু একটু করে।
এখানে শুভর পরিচিত মানুষ বলতে একমাত্র হরি। এক সপ্তাহ হল শুভ এই গ্রামে, সেচ বিভাগের এই কোয়ার্টারে এসেছে। কারও সঙ্গে এখনও তেমন আলাপ হয়নি। এক হরিই যা স্টেশনে নামামাত্র আশ্চর্যজনকভাবে অচেনা শুভদীপ রায়কে খুঁজে বের করে এখানে নিয়ে এসেছে। এ ক’দিনের মধ্যে কয়েকজন চাষি এসেছিল খেতের ফুলকপি কিংবা বাঁধাকপি হাতে নিয়ে, তাদের নতুন জলবাবুর সঙ্গে দেখা করতে। তারা সম্ভ্রমের চোখে ওকে দেখে, হাতের শাক-সবজিগুলো মেঝেয় নামিয়ে রেখে, নমস্কার করেছিল। ওদের চোখে সম্ভ্রমবোধের সঙ্গে ছিল লাজুকতা ও সংকোচ। একটা অদৃশ্য দূরত্ব ছিল যেন তাদের সঙ্গে ওর! ওর সুন্দর সুগঠিত দেহে দামি পোশাক ও শহুরে ছাপ হয়তো দূরত্ব তৈরী করেছিল! ওদের পরনে লুঙ্গি কিংবা ফুটিয়ে ফুটিয়ে লালচে হওয়া দুধ রঙের ধুতি। গায়ে ছেঁড়া-ফুটো গেঞ্জি অথবা শুধুই গামছা একখানা। ওদের শরীরে অদ্ভুত এক মেঠো ছাপ। গায়ে মাটির গন্ধ। যে গন্ধের অনুভূতি প্রথম সে পেয়েছে এখানে এসে। ওদের বাড়িঘর হয়তো এই গ্রামেই কিংবা পাশের গ্রামে। শুভ এখনও পুরো গ্রামটা ঘুরে দেখেনি। ওর পরিচিত গণ্ডি বলতে কোয়ার্টার নামে দু’খানা ঘর। তার পাশেই ডিপটিউবওয়েলের পাম্পঘর। আর সামনে এই বিশাল শস্যখেতের কিছুটা অংশ। উল্টোদিকে কোয়ার্টার-লাগোয়া চারকোনা মাঠটাতে সে যায়নি কখনও। এখনও অনেক কিছুই দেখার বাকি আছে।
দুই
ছেলেটা এখন গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। হাতে একটা শুকনো ডাল। ডাল তো নয় যেন বন্দুক! দূরে কোন অজানায় তাক করা। ওভাবেই ধীর অথচ বলিষ্ঠ পা ফেলে ছোট্ট মাঠটা একটা চক্কর দিয়ে আসে ছেলেটা। ও একটু রোগা গোছের। ফরসা গালে লালচে ছোপ। সাদা হাফশার্ট আর নীল হাফপ্যান্ট। বেশ ময়লা। পায়ে কালো জুতো সাদা মোজা।
মাঠটার চারপাশে কয়েকটা সজনেগাছ, এখন সাদা ফুলে ভরতি। ওগুলোর পাশে পাশে কচা, আশশেওড়া কাঁটামাদার এসব। কখনও হয়তো গাছ পুঁতে জমিটার সীমানা বরাবর বেড়া দেওয়া হয়েছিল। শুভ এ গাছগুলোর নাম জানত না আগে। মাঠের মধ্যে ভাঁটফুল ও শিয়ালকাঁটার ঝাড়। সাদা আর হলুদ ফুল ধরেছে ওগুলোতে। ছেলেটা ফুলগুলোর মধ্যে কী যেন দেখে হেঁট হয়। তারপর দু’আঙুলে ধরে শিয়ালকাঁটা ফুলের দু’-একটা হলুদ পাপড়ি ছিঁড়ে নিয়ে বাতাসে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়। সেগুলো যেন ছোট্ট হলুদ প্রজাপতি। ছেলেটার চোখের পাতায় স্বপ্ন, ঠোঁটের কোণে সজনেকুঁড়ি। ও কোয়ার্টারের দিকটায় আসতে মুচমুচ শব্দ শোনা যায়। অজস্র শুকনো পাতায় ওর পা-মাড়ানোর শব্দ।
শুভর মনে কৌতূহলের তা দেওয়া ডিমে প্রাণের স্পন্দন যেন! ভেতর থেকে কৌতূহলের ছানা মুচমুচ শব্দ করে খোলা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে অন্ধকার থেকে আলোর জগতে! জানলা থেকে উঠে পড়ে ও। ছেলেটা দারুণভাবে টানছে ওকে।
এতক্ষণ শুভর কানে আসছিল চালু থাকা ডিপটিউবওয়েল পাম্পের হালকা যান্ত্রিক আওয়াজ। তার সঙ্গে একটা পাইপ থেকে জল পড়ার শব্দ। এই শব্দদুটো এমনভাবে কান ও মনের সঙ্গে এক সুরে বাঁধা হয়েছিল যে, আলাদা করে শব্দগুলোর অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছিল না। এখন ঘর থেকে বেরোতেই শব্দ আরও জোরালো হয়ে তার অস্তিত্ব ঘোষণা করতে থাকে।
চারকোনা মাঠের মাঝামাঝি গেছে শুভ। হঠাৎ ওর কানে আসে— হুঁশিয়ার! থামো শিগগির, নয়তো...!
শুভকে দাঁড়িয়ে পড়তেই হয়। বাচ্চার গলা হলেও সেটার মধ্যে একটা সত্যিকারের আদেশের সুর আছে, যা উপেক্ষা করা যায় না। হাতে ধরা ডাল তাক করে ওর দিকে ছুটে আসে ছেলেটা। ডাল তো নয়, যেন বেয়নেট লাগানো রাইফেল!
তুমি আমাদের সীমানায় ঢুকেছ কেন?
শুভ ব্যাপারটা ঠিকমতো বোঝার আগেই আবার কচি অথচ বলিষ্ঠ গলা— ধরা পড়ে গেছ তুমি।
এটা তোমাদের সীমানা? আমার জানা ছিল না। ঠিক আছে আমি...।
না না, পালানোর চেষ্টা করবে না। তুমি ধরা পড়েই গেছ। এখন তোমার বিচার হবে।
দু’হাত ছড়িয়ে সামনে দাঁড়ায় ছেলেটা। একহাতে রাইফেল, অন্যহাতে আত্মবিশ্বাস। চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি— আমি তোমাকে ছাড়তে চাইলেও এরা ছাড়বে না।
শুভর চোখ ফেরে চারদিকে। কেউ কোত্থাও নেই। চারপাশে মোটা গুঁড়িওয়ালা পাঁচখানা গাছ। একটা আমগাছ, অশ্বত্থ একটা, অন্যগুলো চেনে না সে। গাছগুলোর আশপাশে ভাঁটফুল, কালকাসুন্দের ঝোপ। সেখানে একটি টুনটুনি তিড়িক তিড়িক করে লাফাচ্ছে এ-ডালে ও-ডালে। তার সঙ্গে চিকচিক মিষ্টি ডাক।
অবাক শুভ বাঙময়— কারা ছাড়বে না আমাকে?
গাছগুলোকে দেখায় ছেলেটা। শুভর চারপাশে যেন পাঁচটা তাগড়া সেপাই! শুভ চোখে-মুখে ভয়ের মুদ্রা আঁকে; তার সঙ্গে অনুনয় মেশানো।
না না, অত ভয় পেতে হবে না। দেখে মনে হচ্ছে তুমি দুষ্টু লোক নও। বিচারে তোমার ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করতে পারি আমি। কী, ছাড়া পেতে চাও?
এখন শুভর মুখে খুশির কারিকুরি। সঙ্গে কৃতজ্ঞতার পোঁচ— হুঁ ছেড়ে দাও আমাকে।
আমার ইচ্ছেমতন এমনিতে ছাড়া যায় না। দোষ করেছ তো! ঠিক আছে তুমি বসো। আমি ওদের সঙ্গে কথা বলে দেখছি কী করা যায়!
সবচেয়ে মোটা গাছের দিকে এগোয় ছেলেটা— এই যে এখানে বসো তুমি।
মাটিতে শুয়ে থাকা একটা মোটা বাতিল জলের পাইপের দিকে ডাল-বন্দুকের নলের ইশারা। শুভ সীমানা-লঙ্ঘনকারীর আসামি। তাই চোখেমুখে অপরাধীর আঁকিবুকি। পাইপের ওপর ও মাথা নিচু করে বসে। পাইপটার প্রায় অর্ধেকটা মাটির মধ্যে ঢুকে রয়েছে। ডিপ টিউবওয়েলের নিকাশি পাইপ এটা। কবে বাতিল করে ফেলে দেওয়া হয়েছে এখানে কে জানে!
ছেলেটা গাছের সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসে। ওর অদ্ভুত আচরণ ক্রমশ শুভকে আকর্ষণ করছে। এখন তার চোখে-মুখে হাসির ছোঁয়া— তোমার ছাড়া পাবার আর্জি মঞ্জুর হয়েছে। ওরা তোমাকে চেনে। তুমি জলবাবু, এই বিশাল জমির গাছপালাকে জল খাওয়াও। ওরা মাটির তলায় তলায় তোমার জল খায়। তাই তোমার শাস্তি কিছুটা কমেছে।
শুভ অবাক হয় ছেলেটার কথা শুনে। গ্রামের ছেলে। ওই তো বয়স! এখনও বোধহয় বারো হয়নি! অথচ কী সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে! কথা নয়, যেন নাটকের সংলাপ বলছে!
কী হল? তুমি চুপ করে আছ! তোমার কী শাস্তি হয়েছে শুধোচ্ছ না তো!
ও আমার শাস্তি হয়েছে নাকি? আমি ভাবলাম...!
এ রাজত্বে অপরাধ করলেই শাস্তি দেওয়া হয়। তুমি ওদের চেনা, তাই তোমার শুধুমাত্র জরিমানা হয়েছে। জরিমানা বাবদ ওদেরকে কিছু খাবার দিতে হবে। ওরা খুব কষ্টে আছে। খাবার পায় না ঠিকমতন।
গাছগুলোর দিকে তাকায় শুভ। পাতাগুলো কেমন নুইয়ে পড়েছে। হলুদ হয়ে গেছে অনেক পাতা। অশ্বত্থ গাছটায় গায়ে তো মাংসই নেই! হাড় কঙ্কাল সার হয়েছে। প্রায় সব পাতাই গিয়েছে ঝরে। গাছগুলোতে যেন আকুতির চিহ্ন!
কী, খুব চিন্তায় পড়লে মনে হচ্ছে?
না তা নয়। তবে, আমার কাছে তো খাবার নেই। ঘরে পাউরুটি আছে কিছুটা, নিয়ে আসি।
অদ্ভুত ভঙ্গিতে শব্দ করে হেসে ওঠে ছেলেটা। সংলাপের মতো হাসিটাও যেন রপ্ত করেছে কোনও উঁচু দরের নাট্য-নির্দেশকের কাছ থেকে। হাসি থামিয়ে বলে— ওরা পাউরুটি খায় না। কেবল মাটি, জল আর ফুলপাতা খায়।
শুভর অস্বস্তি আশ্বস্ততায় বদলায়। তাহলে খাবার জোগাড় করা তেমন কঠিন হবে না। সামনেই বুনোফুলের ঝোপ। অদূরে মাটির ছোট্ট একটা ঢিবি। সে দিকে পা বাড়ায় শুভ।
না না, ওগুলো নয়। ওগুলো আমাদের এলাকার। ওই যে সীমানার বাইবে সর্ষেখেত দেখছ, ওখান থেকে আনতে পারো।
তবে একটা কথা, পালানোর চেষ্টা করলে বিপদ আছে। আমি তোমার পেছন পেছন যাচ্ছি।
শুভ সর্ষেখেতের দিকে এগোয়। এই চাকরি পাওয়ার আগে সবুজ খেতের এত কাছাকাছি এখনও সে এসেছে কিনা মনে পড়ে না। সবুজ রং যে কত ধরনের হয়; এ চাকরি না পেলে ওর জানা হত না। শুধু কি সবুজ! এক এক জমিতে এক এক রঙের বাহার। ওপাশে আলু খেতে গাঢ় সবুজের সমারোহ। তার পাশেই মটর-ভুঁই যেন বেগুনি ফুলছাপা সবুজ গালচে। সামনের সর্ষেখেতটা যেন হলুদরঙা জলভরা দিঘি! সে জলে দামাল হাওয়া কাঁপন তুলছে। সর্ষেফুলগুলোর হাত দুয়েক ওপরে কয়েকটা ফিঙে পাখি একই জায়গায় গতিহীন, অথচ ডানা ঝাপটিয়ে শরীরটাকে ভাসিয়ে রেখেছে। হঠাৎ হঠাৎ পাখিগুলো ফাইটার বিমানের মতো সাঁ করে গোঁত্তা খেয়ে, সর্ষেফুলের মাথা ছুঁয়ে উড়ে গিয়ে আবার এক জায়গায় চঞ্চল অথচ গতিহীন! শুভ পাখিদের এই অদ্ভুত আচরণে বিস্মিত। খেতের কাছে গিয়ে দেখে সর্ষেফুলের ওপর মৌমাছির আনাগোনা। উড়ে বসছে এ ফুল থেকে ও ফুলে।
খেতের মাটিগুলো শুকনো। কিন্তু নেবে কী করে! হাতে আর কতটুকু মাটি নেওয়া যাবে! মুশকিল আসান করে গায়ের পাঞ্জাবি। সামনের দিকটা কোঁচড়ের মতো করে, বেশ কিছু মাটির ঢেলা তুলে নেয় শুভ। এখানে আসার পর আজ প্রথম মাটি মাখল সে। প্রথম ছিঁড়ল সাদা ভাঁটফুল, হলুদ কালকাসুন্দে, খুব সাবধানে কাঁটা বাঁচিয়ে শিয়ালকাঁটার হলুদ পাপড়ি। ও ভাবে, মুক্তি পাওয়ার জন্য শাস্তিটাতে বেশ নতুনত্ব আছে। খুব ভাল লাগছে।
আড়চোখে ছেলেটাকে দেখে শুভ। ওর ঠিক পেছনে। চুপচাপ। বেশ গম্ভীর এখনও। হাতের ডালটা আর তাক করা নেই ওর দিকে। হয়তো বুঝেছে আসামী পালাবে না। একটা হাত কোমরে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। বেশ রোগা লাগছে ওকে। মাথার চুলগুলো বেশ লম্বা। এলোমেলো হাওয়ায় গাছের পাতার মতো তিরতির করে উড়ছে চুলগুলো। ও যেন জমিটার সীমানার কাঁটামাদার!
শুভ মাটি আর ফুলপাতা নিয়ে গাছগুলোর কাছে আসে। ও জানে, ছেলেটা কীভাবে গাছগুলোর সামনে মাটি- ফুল-পাতা দেয়। সেভাবে ও কিছু কিছু সব গাছকেই দেয়। ছেলেটা গাছের পাতাগুলোর দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে। যেন পাতাদের সঙ্গে চোখে চোখে হচ্ছে মনের ভাব বিনিময়!
এবার তা হলে ওরা আমাকে ছেড়ে দেবে নিশ্চয়ই!
উদাসীন গলায় ছেলেটা বলে— হ্যাঁ এবার তুমি মুক্ত।
তারপর ছেলেটা মোটা গুঁড়িওয়ালা গাছটার দিকে দ্রুতপায়ে এগিয়ে যায়।
উত্তুরে হাওয়ায় গাছটার পাতাগুলো নড়ছে। হয়তো বা খাবার পাওয়ার খুশিতে দুলে উঠছে ওরা! শুভর খুশি হওয়ার কথা। মুক্তি পেয়েছে সে। কিন্তু ওর মনটা বিষণ্ন হয়ে ওঠে। এ তো মুক্তি নয়, যেন খেলাভঙ্গ! গুটি গুটি পায়ে ও ভাঙা পাইপটাতে গিয়ে বসে। বেশ আনমনা হয়ে পড়ে। সাতদিন হল ও বাড়িছাড়া হয়েছে। চাকরি পেয়ে প্রথম বাড়ির বাইরে। ওর মনে একে একে জায়গা নেয় কলকাতার বাড়ি, মা, বাবা, ছোট বোন। বিশুদার চা-দোকানের আড্ডা, মেয়েলি নিতাই, বদরাগী শঙ্কর, অন্য বন্ধুরা। ওদের সবাইকে ছেড়ে ও যেন নির্বাসনে! এই নির্বাসন থেকে মুক্ত, এমন কথা তো কেউ বলছে না! শুধু কিছুক্ষণের জন্য ছেলেটা ওকে দিয়েছিল মুক্তির আনন্দ। এমন এক অসমবয়সি অপরিচিত ছেলের সঙ্গে খেলেও যে এত আনন্দ, তা সে আগে জানত না। যদিও তার কাছে এটা খেলা, কিন্তু ছেলেটা যেন সত্যিই কোনও গুরুদায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করছে! এর মধ্যে থেকেই ছেলেটা নিশ্চয় পেয়ে যায় আনন্দের রসদ! তাই তো ওর অন্য কারও সঙ্গে খেলার প্রয়োজন হয় না। খেলতে ওর তেমন কোনও উপকরণও লাগে না, অথচ কী বিপুল আনন্দ!
তিন
ছেলেটাকে কাছেপিঠে দেখা যাচ্ছে না। নিশ্চয় গাছের আড়ালে সেরকম ওত্ পেতে আছে! ওর স্কুল ব্যাগটাতে চোখ পড়ে। বেশ পুরোনো ব্যাগটার পেট ফুলে রয়েছে। কয়েক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। ভেতরে বই-খাতা ঠাসা। বইপত্তর ছাড়াও আরও কিছু যেন ব্যাগে আছে! ব্যাগের চেনটা কাটা। একটা সেফটিপিন চেনের দু’পাশকে জুড়ে রেখেছে। চেনের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে একটা কাঠের ভাঙা স্কেল।
গাছের আড়াল থেকে কখন বেরিয়ে এসেছে ছেলেটা। ওর মুখ ওপর দিকে। ওপর থেকে পড়ন্ত কিছু একটা ধরছে সে ছুটে ছুটে। ওকে দেখে শুভর মনে জায়গা নেয় সুচরিতা। ওর কিশোরী ছোট বোন। তার খেলার সামগ্রী কিনতে কত টাকা খরচ করতে হয় বাবাকে। আজ ভিডিও গেম তো কাল ম্যাগনেটিক ডল। দু’দিনেই এসব পুরোনো হয়ে যায়। আবার আসে রিমোট কন্ট্রোল নর্তকী কিংবা বৈদ্যুতিক জলতরঙ্গ। তবুও কি বোনটা ওই ছেলেটার মতো আনন্দে বিভোর হয়ে থাকতে পারে? দু’জনেই কিন্তু শৈশব-পেরোনো স্বপ্ন দেখা জগতের পথিক! অথচ কত তফাত দু’জনের মধ্যে! হঠাৎ যেন শুভকে দেখতে পায় ছেলেটা। শুভর কাছে চলে আসে— কী ব্যাপার! তুমি ছাড়া পেয়েও যাওনি?
না। তুমি দৌড়ে দৌড়ে কী ধরছিলে? প্রজাপতি?
উঁহু! আমার বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিলাম। ওরা পাতা ঝরাচ্ছিল। আমি পড়ন্ত পাতাগুলো ধরছিলাম। সব ধরতে পারছিলাম না দেখে ওরা খুব মজা পাচ্ছিল।
ওদের সঙ্গে খেলছিলে! তোমার স্কুলের বন্ধু নেই? তারা তোমার সঙ্গে খেলে না?
ইস্কুলের বন্ধুরা শুধু ইস্কুলের। এরা আমার সবসময়ের বন্ধু। বিজ্ঞানের স্যার বলেছেন, গাছেরা মানুষের বন্ধু। তাই আমি গাছ খুব ভালবাসি।
আর পশুপাখি ভালবাসো না? জন্তু-জানোয়ার?
কিছুক্ষণ চুপ থাকে সে। দৃষ্টি কোন সুদূরে! বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে জামার একটা বোতাম অকারণে খুঁটে চলেছে। একটু পর আপন মনেই যেন বলে ওঠে— কিছু কিছু গাছ আছে পশুর মতো পাজি ও হিংসুটি হয়।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, আলকুশি, বিছুটি, এরা ভীষণ পাজি আর হিংসুটি। আলকুশিটা এমন পাজি, ওর গায়ের বিষাক্ত রোঁয়াগুলো হাওয়ার মধ্যে ছেড়ে দেয়। সেগুলো উড়ে উড়ে...। আর বিছুটি খুবই একালষেঁড়ে! গায়ে হাত দিলেই...।
তা হলে এদেরকে তুমি ভালবাসবে না বলো।
কেন বাসব না! সবাই কি সমান হয়! যেমন হোক, এরাও তো গাছ!
আর জন্তু জানোয়ার?
তুমি জানো ভাল মানুষরা একসময় গাছ হয়ে যায়, আর খারাপ মানুষরা জন্তু!
ছেলেটা হঠাৎ কেমন আনমনা হয়ে যায়। আপন মনে বিড়বিড় করতে থাকে। ওর মনে ছায়া। ধীর পায়ে সে মোটা গাছটার কাছে যায়। তারপর গাছে ঠেস দিয়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
গাছগুলো ছায়া বিস্তার করেছে পুরো মাঠ জুড়ে। কিছুক্ষণ আগেও আমগাছের আড়ালে সূর্য কিছুটা তাপ ছড়ানোর চেষ্টা করছিল। এখন তাকে আর দেখা যায় না। এমন সময় সর্ষেখেতের ওপাশের রাস্তায়, দূরে সেই মহিলাকে দেখতে পাওয়া যায়। রোজকার মতো আজও ছেলেটা ছুট দেয়। গিয়ে মহিলাকে জড়িয়ে ধরে। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে মহিলার শাড়ির খুঁটটা ধরে আঙুলে জড়ায় ছেলেটা। কত কিছু বকবক করতে থাকে। শুভর কান অবধি তা পৌঁছোয় না। ওর বকবকানিতে মহিলার কোনও ভাবান্তর দেখা যায় না। ছেলেটার কাঁধে একটা হাত রেখে এগিয়ে আসতে থাকে চারকোনা জমিটার দিকে।
মাঠের কাছাকাছি এসে ছেলেটা দৌড়ে গাছগুলোর দিকে যায়। ছোট হাতদুটো বাড়িয়ে যেটুকু সম্ভব গাছগুলোকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। যেন আলিঙ্গন করছে! আলিঙ্গনপর্ব শেষে স্কুলব্যাগটা নামিয়ে পিঠে ঝুলিয়ে নেয়। তারপর শুভর কাছে আসে। ওর চোখে খুশির ঝিলিক। গাছগুলোকে জড়িয়ে ধরার মতো হঠাৎই সে শুভর কোমর জড়িয়ে ধরে বলে— তুমি তো জলবাবু। তোমাকে আমার ভাল লেগেছে। আজ থেকে তুমিও আমার বন্ধু।
কথা ক’টা বলে ছেলেটা ছুট দেয় মহিলার দিকে। শুভ ওকে জিজ্ঞেস করার সময়ও পায় না, মহিলা ওর মা কিনা! এতক্ষণে ওর নামটা তো জানা হয়নি। কেমন এক ঘোরের মধ্যে কেটে গেল সময়টা। ওর মন জুড়ে এখন ছেলেটার স্পর্শ আর তার বন্ধুত্বের স্বীকৃতি।
মহিলার কাছে যেতেই পিঠের ব্যাগ খুলে বইখাতার ভেতর থেকে একটা নীল রঙের সোয়েটার বের করে মহিলা। সেটা পরিয়ে দেয় ছেলেটার গায়ে। তারপর শুভর দিকে এক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি ছুড়ে দেয়। শুভ সে দৃষ্টির মাঝে খুঁজে পায় আন্তরিকতা ও ভাল লাগার ছোঁয়া। নাকি এ তার কল্পনা ঠিক ধরতে পারে না সে।
কখন ওরা মেঠো পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। ছেলেটার সঙ্গে অনেকটা সময় কাটাল শুভ। অথচ কিছু জানা হল না। বন্ধুহীন মনে হয়েছিল ছেলেটাকে। কিন্তু...! আসলে শুধু দুটো চোখ দিয়ে কত কিছুই সঠিকভাবে দেখা হয়ে ওঠে না। নিজের চোখ দিয়ে নিজেকেও কি দেখা যায় সেভাবে! এসব সাত-পাঁচ ভাবনা শুভর মনটাকে ছেয়ে ফেলে। আর শরীরটাকে ক্রমশ ছেয়ে ফেলে অন্ধকার। শুভ অন্ধকার পেছনে রেখে কোয়ার্টার আলোর দিকে পা পাড়ায়। হরি অনেকক্ষণ আগে এসে কোয়ার্টারের অন্ধকারকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
চার
হরি মানুষটা বেশ মজার। প্রথম দিন থেকেই শুভর বেশ ভাল লেগেছে ওকে। আগের জলবাবুর নির্দেশমতো হরি স্টেশনে গিয়েছিল ওকে আনতে। কেউ কাউকে চেনে না। অথচ হরি কীভাবে তাকে ঠিক খুঁজে বের করেছিল অত লোকের মধ্যে! ওর সামনে গিয়ে বলেছিল— বাবু! আপনি কি শুভদীপ রায়?
শুভ চমকে উঠেছিল। কলকাতা থেকে এত দূরে চাকরিতে। চেনা-জানা কেউ নেই। তার ওপর গ্রাম। বেশ ভয় ছিল মনে। অথচ স্টেশনে নামতেই ওর নাম অন্যের মুখে...। বেশ খুশি হয়েছিল। স্বস্তিও পেয়েছিল কিছুটা। পরে হরিকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেও বলেছিল— বাবু, এ আর এমন কী! জলবাবুর কাচে শোনলাম কলকাতা থেকে আসচেন। শউরে বাবু দেকলেই চেনা যায়। আর হল গে আমনার নামটা!
নামটা মানে?
মানে আমনার নাম। আমনি বিশ্বেস যাবেন না, আরি কারও নাম শুনে তার মুকটা কেমন হবে ভেবে লিতে পারি।
শুভ একথা শুনে হো হো করে হেসে উঠেছিল। তারপর বলেছিল— আচ্ছা! বলো তো ‘সুচরিতা’ এই নামের মেয়েটার মুখ কেমন হবে?
হরি আমতা আমতা করে বলেছিল— মেয়েছেলের নাম তো! আসলে ওই মেয়েছেলের মুকের দিকে খুব এট্টা তাকাই না তো তাই...।
আচ্ছা আচ্ছা বোঝা গেছে। শোনো, মেয়েছেলে বলতে নেই, শুধু মেয়ে বলবে, কেমন!
যে আজ্ঞে।
শুভর মনে সেদিন ভেসে উঠেছিল বেরোনোর সময় ছোট বোনের জল-ছলছল চোখদুটো। আজ শুভর মনটা বেশ খুশিখুশি। গ্রাম হলেও সুচরিতার পাঠানো চিঠিটা দেরি না করে আজই ওর হাতে পৌঁছেছে। ওই ছেলেটার কথা লিখেছিল ছোটবোনকে। কিন্তু ওর নাম জানাতে পারেনি। লিখেছিল— রূপাই, অপু কিংবা বলাই যা খুশি ধরে নিতে পারিস। বোন লিখেছে— দাদা! বলাই কিংবা অপুর মতো একটা ভাই পেয়ে যেন এই পাজি বোনটাকে ভুলে যাস না।
সত্যি পাজি ও! তা না হলে..., ভাবতে ভাবতে আপন মনে হেসে ওঠে শুভ। এবারের চিঠিতে ওর নামটা জানাবে বোনকে আর লিখবে ওর বন্ধু হয়ে ওঠার কথা। চিঠি লেখার পরদিনই ছেলেটাকে নাম জিজ্ঞেস করেছিল। সে বলেছিল— আমার নাম বিশ্ববন্ধু মুখোপাধ্যায়। তুমি আমাকে ‘বিশ্ব’ বলে ডেকো। আমি তোমাকে ডাকব ‘বন্ধু’ বলে। এরপর থেকে শুভকে আর সীমানা-লঙ্ঘনকারী হিসেবে সাজা পেতে হয়নি। কিন্তু গাছ-বন্ধুদের খাবারের ব্যবস্থা করতেই হয়েছে বন্ধুত্বের খাতিরে।
পাঁচ
আজও সে গাছেদের খাবার জোগাড় করে জানলার ধারে বসে আছে বিশ্বর অপেক্ষায়। অদ্ভুত এক খেলায় পেয়ে বসেছে তাকে। অত বড় বড় গাছের সামনে কিছু ফুল-পাতা-মাটি দিলে কীভাবে তারা খায় তা ওর জানা নেই। কিন্তু একদিন না দিলেও বেশ খারাপ লাগে। ওর পরিচিত জগৎ থেকে বিশ্ব যেন ওকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। যে-জগতে সবাই বন্ধু। শত্রুতা করা মতো একজনকেও পাওয়া যায় না। কিন্তু বিশ্বকে বাদ দিয়ে একা ওই মাঠটায় গিয়ে দেখেছে ওই জগতের সন্ধান সে পায় না। তখন গাছগুলোকে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মূক-বধির গাছ ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। অথচ বিশ্বর স্পর্শে ওই গাছগুলোই তাদের ব্যথা-বেদনা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিয়ে জেগে ওঠে।
বিশ্বকে আসতে দেখে শুভ বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে। আজ বিশ্বর হাতে একটা গাছের চারা। ও আজ পিঠ থেকে ব্যাগ খোলে না। শুভকে বলে— বন্ধু! তুমি ওদেরকে খাবারগুলো দিয়ে আমার কাছে এসো। নতুন বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করবে।
এ-রাজ্যের রাজা এখন বিশ্ব। তাই ওর কথামতো চলতে হয়। খাবার পরিবেশন পর্ব শেষ করে বিশ্বের সামনে শুভ এসে দাঁড়ায়।
দেখো, এ আমার নতুন বন্ধু। এর সঙ্গে আলাপ করো।
শুভ বুঝতে পারে না কী করবে। গাছেদের খাবার দেওয়াটা রপ্ত করেছে। কিন্তু গাছের সঙ্গে আলাপ কীভাবে করতে হয় জানে না।
কী হল? হাবার মতো দাঁড়িয়ে রইলে কেন?
শুভ থতমত খেয়ে নিজের বুদ্ধিমতো চারাগাছটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে— হাই, তোমার সঙ্গে আলাপ করে খুশি হলাম।
না না, ওসব শহুরে আদব কায়দা এরা বোঝে না। ওদের পাতায় এমনি করে হাত বুলিয়ে শুধোতে হয়, 'কী তোমার নাম? কেমন আছ? খিদে পেয়েছে কিনা?' এসব।
আলাপ পর্ব শেষ হয়। শুভ জিজ্ঞেস করে— তোমার নতুন বন্ধুকে কোথায় পেলে?
ওই তো নয়নজুলির ধারে। এখন তো নয়ানজুলিতে জল নেই। ওখানে খিদে তেষ্টায় ঝিমোচ্ছিল। দেখছ না কী রোগা হয়ে গেছে। তুমিও কেমন যেন! ওই বিশাল বিশাল জমিতে এত গাছকে জল খাওয়াও; এদের জল খাওয়ানোর একটু ব্যবস্থা করতে পারো না? নয়ানজুলি দিয়ে কিছু জল পাঠালেই পারো। তোমার কত জল তো নষ্ট হয়! এমনি এমনি বয়ে যায়।
শুভ অপরাধীর ভঙ্গিতে মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে থাকে। আড়চোখে চারাগাছটার দিকে তাকায়। গাছের পাতাগুলো কেমন নুইয়ে পড়েছে। হলেদেটে ভাব। ছেলেটার বুকের কাছে চুপটি করে আছে। চারাগাছটা যেন আস্তে আস্তে ছেলেটার বুকে মিশে যেতে থাকে। আলাদা করে তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না।
বিশ্ব বলে— শোনো বন্ধু! আজ তোমার সঙ্গে, এই বন্ধুদের সঙ্গে বেশিক্ষণ থাকব না। এই নতুন বন্ধুর একটা ব্যবস্থা করতে হবে তো!
শুভ কথা খুঁজে পায়— ওকে কোথায় রাখবে?
আমাদের বাগানে। বাড়ির পাশেই। তোমাকে একদিন নিয়ে যাব। আমি এখন যাই, বুঝলে! আমার মা খুঁজলে বলে দিও, আমি নতুন বন্ধুকে নিয়ে বাড়ি গেছি।
বিশ্ব ওর বন্ধুদের আলিঙ্গন করে বিদায় নেয়। বিশ্ব যখন গাছগুলোকে জড়িয়ে ধরছিল, তখন মনে হচ্ছিল কোনও মন্ত্রবলে বিশ্ব ওদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রাণটাকে জাগিয়ে তুলছে। গাছগুলোও যেন কোন অদৃশ্য হাত দিয়ে বিশ্বকে জড়িয়ে ধরছে।
ছয়
বিশ্ব চলে যেতে শুভর মনটা কেমন মেঘলা হয়ে যায়। ও থাকলে গাছগুলোর সঙ্গে তারও যেন একটা সেতুবন্ধ গড়ে ওঠে। সেও যেন ওদের সঙ্গে ভাব-বিনিময় করতে পারে। এখন কিছুতেই সে গাছগুলোর সঙ্গে একাত্ম হতে পারছে না। কোনও এক নাম না-জানা পাখি গাছের পাতার আড়াল থেকে টানাটানা সুরে ডেকে চলেছে। পাখির ডাকটাও কেমন যেন বিষণ্নতায় ভরা! শুভর চোখ চেষ্টা করেও পাখিটাকে খুঁজে পায় না।
গাছের পাতার সবুজ চেখে, সর্ষেখেতের হলুদ মেখে, শুভর চোখ দূরে আরও দূরে দিগন্ত-ছোঁয়া নকশি-কাঁথা মাঠের মধ্যে হারিয়ে যায়। পাম্পঘরের পাশে বড় চৌবাচ্চা থেকে দুপাশে দুটো নালা বেরিয়ে এঁকেবেঁকে মাঠের মধ্যে বহুদূর অবধি গিয়ে অন্য একটা চৌবাচ্চায় মিশেছে। সেখান থেকে জমির বুকে। নালা বেয়ে স্বচ্ছ জল কলকল শব্দে বয়ে যাচ্ছে। বিকেলের ফিকে রোদ ঝলমল করছে চলমান জলে। যুবক আলুগাছ কিংবা গর্ভবতী ধানগাছগুলো তাদের তেষ্টা মিটিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু উঁচু আলের উপর গজিয়ে ওঠা আগাছাগুলো ওই জলের নাগাল পাচ্ছে না কিছুতেই। ওরা কেমন ম্যাড়মেড়ে, নিস্তেজ।
বিশ্বর মুখ সরে গিয়ে শুভর মনে কখন জায়গা নিয়েছে সুচরিতা। দুষ্টু মিষ্টি মন ভুলানি, দুই কাঁধে দুই চুল-বিনুনির দোল-দুলুনি বোনটা! হয়তো সে এতক্ষণ স্কুল থেকে ফিরেছে। হাত-মুখ না ধুয়ে, না খেয়ে বসে গেছে ভিডিও গেম নিয়ে। মা রোজকার মতো বকে চলেছে, তার সে দিকে কান নেই। সে ভিডিও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হয়তো চিৎকার করে উঠেছে— থ্রি হানড্রেড! মাম্মাম্! অ্যাট-এ টাইম থ্রি হানড্রেড স্কোর করেছি। ট্রিপল সেঞ্চুরি! শচীন-সৌরভকে টপকে দিয়েছি। এখন আমি সহবাগ।
শুভ ভাবতে থাকে, ও বাড়িতে থাকলে হয়তো সূচি এসে বলত, 'দাদা! কই হারা দেখি আমাকে!' মা তখন রেগে কিছু বলতে গিয়ে হঠাৎ হেসে ফেলত। শুভর মনে খেলা করে এইসব এতোল বেতোল কত ভাবনা।
একসময় জমির আলপথে ফুটে ওঠে নারীমূর্তি। আলপথ ছেড়ে সর্ষেখেতের পাশের মেঠো রাস্তায় এসে পড়ে মহিলা। বিশ্বর মা। তার চোখে মুখে প্রশ্নের জ্যামিতি। চারকোনা মাঠে তো বিশ্ব নেই! তার দিকে এখন ও ছুটে গেল না তিরবেগে! গাছগুলোর আড়ালে, ঝোপেঝাড়ে চোখ ছুটে বেড়ায়। শুভর চোখ স্থির হয় এক পলকের জন্য। সে পলকটুকু জিজ্ঞাসায় ভরা। এর উত্তর শুভর জানা। পুরো নম্বর পেতে চায় সে। তাই মনে মনে গুছিয়ে নেয় কথাগুলো— বিশ্ব বাড়ি চলে গেছে তার এক নতুন বন্ধুকে নিয়ে। এখন হয়তো বাগানে বন্ধুর থাকার ব্যবস্থা করেছে।
উত্তর পেয়ে বিশ্বর মায়ের চোখে-মুখে স্বস্তির ছাপ। ঠোঁটে হালকা হাসির কারিকুরি। কিছু বলতে চায়। কিন্তু বাধা দিচ্ছে গ্রাম্য লাজুকতা। একটু আড়ষ্ট ভাব।
আপনি বিশ্বর মা তো! বিশ্ব আপনাকে খবরটা দেওয়ার জন্য আমাকে এখানে বসিয়ে রেখে গেছে।
অনালাপের বাধাটা সরে যায়— আপনাকে খুব জ্বালাতন করে বুঝি পাগল করে ছেলেটা?
মোটেও না। আমি তোর ওর বন্ধু!
ওর মুখে শুনেছি আপনার কথা। ওর রাজ্যে অনুপ্রবেশ করে ধরা পড়েছিলেন নিশ্চয়! মুক্তিপণ দিতে হয়েছে!
কথার সঙ্গে সঙ্গে হালকা হাসি, নাকি সেতারের মূর্ছনা! সঙ্গে তবলার সঙ্গতের মতো শুভর উদাত্ত হাসি। সে হাসি ছড়িয়ে পড়ে তাগড়া সেনাদের সবুজ পাগড়িতে, হলুদ রোদ-মাখা কিশোরী রাইখেতে। লুকিয়ে থাকা পাখিটা কখন তার ডাক থামিয়েছিল। হাসির শব্দে সেও হঠাৎ আবার ডাকতে শুরু করে। এখন সুর বদলিয়ে তুমুল শব্দে ডেকে চলে পাখিটা।
আপনি বুঝি স্কুলে পড়ান?
হ্যাঁ, প্রাইমারি। পাশের গ্রামে। ওর স্কুলের ছুটি হয়ে যায় আগেই। আমার ফিরে আসতে সময় লাগে তো! সেই সময়টুকু ও এখানে...।
ওকে সঙ্গী পেয়ে আমারও কিছুটা সময় কেটে যায়। আমি তো একা। আজ ও চলে যেতে...।
আপনি একা হয়ে গেছেন! কেন? ওর এই বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়নি?
হ্যাঁ, তা দিয়েছে। তবে...।
ওদের ভাষা বুঝতে পারছেন না, এই তো?
একটা হলুদ প্রজাপতি নাচানাচি করছে শুভর সামনে। ওর মুখে অপ্রস্তুতের হাসি। মহিলা পা বাড়ায়— যাই দেখি, পাগলটা আবার কী কাণ্ড করছে!
শুভ বিশ্বর মায়ের চলে যাওয়া লক্ষ করে। গ্রামের মহিলা, অথচ কথাবার্তায় কী সাবলীল! গ্রাম্য টানটাও নেই কথার মধ্যে। বিশ্বের মধ্যেও লক্ষ করেছে এ ব্যাপারটা। ও বেশ আশ্চর্য বোধ করে।
সাত
এখন চারকোনা মাঠের ধারে কাঁটামাদার গাছগুলোতে থোকা থোকা লাল লাল ফুল ধরেছে। গাছগুলোতে একটাও পাতা নেই। কঙ্কালসার দেহের মাথায় ফুলগুলো বড় বেমানান। সেই ফুলের থোকায় এক হতচ্ছাড়া বুলবুলি কী যে খাচ্ছে খুঁটে খুঁটে! সজনেগাছগুলোতে একটাও পাতা নেই, ফুলও নেই। শুধু গা-ভরতি ডাঁটা ঝুলছে। অশ্বত্থগাছের পাতাহীন ডালগুলোর মাথায় প্রদীপের শিখার মতো হলুদ হলুদ পাতার কুঁড়ি। আমগাছটায় বউল এসেছে। জমির সর্ষেগাছগুলো তিলে তিলে রূপ হারিয়ে এখন বুড়ি। ওরা শেষ দিনের অপেক্ষায় দিন গুনছে হয়তো! সবুজ হারানো আলুখেত তোলপাড় করে চাষিরা তাল তাল সোনা বস্তাবন্দি করে নিয়ে যাচ্ছে। পাম্পটার কিন্তু বিরাম নেই। সে কোন অতল থেকে জল নিয়ে এসে এখন ওপাশের জমির কিশোরী ধানগাছগুলোর মন ভেজাচ্ছে।
শুভকে এর মধ্যে মাঠের বন্ধুদের জন্য কত খাবার সরবরাহ করতে হয়েছে তার হিসেব নেই। বিশ্ব ও হরির শিক্ষাধীনে থেকে শুভ গ্রাম-পড়ুয়া হিসেবেও বেশ নাম করেছে। চারকোনা মাঠের অন্য তিনটে গাছের নাম এখন সে জানে। সে জানে জমির ‘পগার’ কাকে বলে, জমিতে ‘ভুলুক’ হয়ে কীভাবে জমির সমস্ত জল বেরিয়ে গিয়ে জমি মরুভূমি হয়ে যায়। সুজন, বলাই, নুরআলি এই চাষিদেরকে এখন শুভ চেনে। ডেকে কথা বলে। ওদের সঙ্গে দূরত্ব ঘুচে গেছে এখন।
হরির সৌজন্যে সে জেনে গেছে বিশ্ববন্ধুদের পরিবারের এককালের রমরমার কথা। ওদের বাড়ির নাটমন্দিরে দুর্গাপুজোর সময়ে সমস্ত গ্রামবাসীর নেমন্তন্ন পাওয়ার কথা এখন তার অজানা নয়। বিশ্বর উড়নচণ্ডী, বিপথগামী বাপটাকে না দেখেও মনে মনে তার ওপর বেশ রাগতে পারে। বিশ্বর মা এখন তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একটুও আড়ষ্ট হয় না। তাই আজ বিকেলে স্বচ্ছন্দে শুভকে বলতে পারে— আজ আসুন না আপনার এই পুচকে বন্ধুর বাড়ি। কবে থেকেই তো ‘যাব যাব’ করে কাটিয়ে দিচ্ছেন। ঘরে বসে বসে সারাদিন ধুধু মাঠ দেখতে কী এত ভাল লাগে আপনার!
শুভ চুপচাপ! ওর ঠোঁটের কোণে হাসি। কানে আসছে মিহি গুনগুনানি। আমের বউলে মৌমাছির আনাগোনার শব্দ বোধহয়! ও আজ পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর শাল জড়িয়ে প্রস্তুত হয়েই আছে বিশ্বদের বাড়ি যাওয়ার জন্য। কাল বিশ্ব বলেছিল— বন্ধু! আমার বাগান দেখতে যাবে না! দেখবে না সেই ছোট্ট বন্ধুটা কত্ত বড় হয়ে গেছে!
এখন মায়ের আঁচল ছেড়ে বিশ্ব এসে শুভর হাত ধরে— হ্যাঁ আজই চলো।
মা চলেছে আগে আগে। ছেলে শুভর হাত ধরে এমন টানছে যেন মাকে টপকে যেতেই হবে। শুভকে পিছনে টানছে সৌজন্য ও সম্ভ্রমবোধ। বিশ্বর মা ধীরপায়ে চুপচাপ চলেছে। ওর চলাটা কি আস্তেই? নাকি ছেলের আবদারে ভদ্রতা করতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ল? গ্রামের মহিলাদের অনেক বুঝেসুঝে পা ফেলতে হয়। অনাত্মীয় পুরুষ মানুষকে বাড়িতে নিয়ে আসবে। একটু ভাবতেই হবে বই কী! গ্রামের মানুষদের ‘ঢাকঢাক গুড়গুড়’ যত বেশি অন্যের ব্যাপারে কৌতূহল ও আলোচনা ততটাই বেশি।
আট
দূর থেকে পোড়োবাড়ি বলেই মনে হচ্ছে। ভাঙাচোরা। পলেস্তারা খসা। কার্ণিশে অশ্বত্থ-বটের জবরদখল। একদিকের ছাদ ভেঙে পড়েছে। ভাঙা ছাদের অবশিষ্টতে কয়েকটা বিড়ালছানার দামালপনা। ওদের মা দাবনা মুড়ে পুটুস পুটুস করে দেখছে ছেলেমেয়েদের দুষ্টুমি। তারই পাশে কয়েকটা শালিক নির্ভয়ে ক্যাচোর-ম্যাচোর করে চলেছে। বিশ্ব আঙুল উঁচিয়ে দেখায়— বন্ধু! ওই আমাদের বাড়ি।
শুভর মনে আশঙ্কা, ওরকম একটা বাড়িতে এরা... যে-কোনও সময়েই ...! মনের চিন্তা চাপা দেয় কথা দিয়ে— অতবড় বাড়িতে তোমরা দু’জন থাকো, ভয় করে না?
দু'জন নয়, অনেকজন থাকি। চলো দেখাব।
আশেপাশে সবই তো মাটির বাড়ি, শুধু তোমাদেরটাই দেখছি পাকাবাড়ি।
জানো বন্ধু, মা বলে, বাড়িটা একসময় পাকা ছিল; এখন নাকি খুব বেশি পেকে, পচে গেছে। তাই ছাদ দিয়ে রস গড়ায়।
নিজের কথায় নিজেই হেসে ওঠে বিশ্ব। শুভ সে হাসির মধ্যে আরও কিছু খোঁজার চেষ্টা করে। বাড়িটার সামনে গিয়ে ওরা থামে। বিশ্বর মায়ের কুণ্ঠা-মেশানো গলা— ভাঙাচোরা বাড়িঘর। তবুও আপনাকে এনে বিব্রত করলাম। কিছু মনে করবেন না।
না না আপনাকেই বরং...।
আপনি ওর সঙ্গে গেটের চাতালে দাঁড়ান। আমি খিড়কি দরজা দিয়ে ঢুকে সদর দরজা খুলে দিচ্ছি। ওদিকটা বড় গলিঘুঁজি, অন্ধকার। আপনি ও পথে যেতে পারবেন না।
অন্ধকারকে শুভর সত্যিই খুব ভয়। মোটেই অন্ধকার মাখতে চায় না সে। তাই আবছায়া ঘেরা চাতালের দাঁড়িয়ে থাকে। কোনও গেট চোখে পড়ে না। দু’পাশে ভাঙা পাঁচিলের মাঝে বড় ফাঁকটাতে একসময় হয়তো লোহার গেট ছিল! লাল পাগড়ি বল্লমধারীও থাকত হয়তো গেটের সামনে! ওই ফাঁকটার নাম বদলানো সম্ভব হয়নি। হয়তো বা যথার্থ নাম খুঁজে পাওয়াও মুশকিল।
বিশ্ব কেমন মুখর হয়ে উঠেছে। হাত নাড়িয়ে বলছে— বন্ধু! ওই যে দেখছে উঁচু জায়গাটা, ডুমুরগাছে ভরা, ওখানে ছিল মোষমদ্দিনী মন্দির। মা বলে, ওটা যেদিন ভেঙে পড়ল সেদিন আমি হয়েছি। আর এই যে ডানদিকের বিশাল জায়গাটা, এটা নাটমন্দির। এখানে হত কেষ্টযাত্রা, কবিগান এসব।
শুভ ওদিকে তাকায়। নানারকম জংলাগাছ আর বুনোফুলের ঝোপ। সে ওদিকে দু’পা এগোতেই বিশ্ব বলে ওঠে— ওদিকে যেয়ো না। ওখানে জানোয়ার আছে। একটা শিয়াল বাস করে ওখানে। আমি ওদিকে মোটেও যাই না। মা বলে, ওখানে নাকি আমার বাবা রোজ সন্ধেবেলায় বসত বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে।
তোমার বাবা এখন কোথায় থাকেন?
কলকাতায়।
কী করেন তোমার বাবা?
আমি ঠিক জানি না। মা বলে, বাবা নাকি মস্ত চাকরি করত। এখন করে না।
সদর দরজাটা বিকট শব্দ করে খুলে যায়। বিশ্বর মায়ের বিষণ্ন অথচ শান্ত মুখ। ঠোঁট দুটো নড়ে শুধু— আসুন। সাবধানে আসবেন। বহুদিন পর এ দরজা খোলা হল।
বাড়ির বাইরের চেহারার সঙ্গে ভেতরের তেমন মিল নেই। যে-ঘরটায় গিয়ে ওরা থামল, সেটা বেশ সাজানো-গোছানো। পুরনো দিনের পালঙ্ক, কয়েকটা ভারী চেয়ার, কাঠের আলমারি।
আপনি বসুন। ছেলের সঙ্গে গল্প করুন। আমি আপনার জন্যে চা করে আনি।
শুভ ছোট্ট হাসি দিয়ে সম্মতি জানায়। ওর কৌতূহল হয়, এতবড় বাড়িতে বাসের উপযোগী ঘর এই একখানাই, নাকি আরও আছে।
বিশ্ব, তোমরা এ ঘরেই থাকো?
এ ঘরে মা আর আমি ঘুমোই। আমার নিজস্ব একটা ঘর আছে বাগানের পাশে। চলো, তোমাকে আগে বাগান দেখিয়ে আনি।
বেশ কয়েকটা ভাঙাচোরা ঘর ও একটা গলিপথ পেরোনোর পর বাগান। বাগানে পা রাখতেই বিশ্ব ঠোঁটে তর্জনী ঠেকায়— শ্-শ্! আস্তে আস্তে পা ফেলো, ওদের অসুবিধা হবে।
সাবধানী হয় শুভ। কারও অসুবিধার কারণ হতে চায় না সে। সন্ধানী চোখে চারিদিকে তাকায়। কাউকে চোখে পড়ে না।
ওদিকে আর এগিয়ো না। ওদের এখন সন্ধে-আহ্নিকের সময়।
কারা আহ্নিক করছেন? এখনও তো সন্ধে হয়নি!
আমার ঠাকুরদা। ঠাকুরদার বাবা।
ঠাকুরদার বাবা? কোথায় তিনি, বেঁচে আছেন এখনও?
ওই তো সবচেয়ে বড় মেহগনিগাছটা, ওই গাছের মধ্যেই বেঁচে আছেন তিনি।
আর ঠাকুরদা?
ছাতিমগাছের দিকে আঙুল বাড়ায় বিশ্ব— ওই তো। ওই গাছটা ঠাকুরদা লাগিয়েছিলেন। মা বলে, ঠাকুরদার খুব পছন্দ ছিল ছাতিমফুলের গন্ধ। তাই তো মরার পর ঠাকুরদা আস্তে আস্তে ওর মধ্যে মিশে গেছেন।
তোমার বাবাও কি এখানে কোনও গাছ বসিয়েছেন? যাতে...!
সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় নাড়ায় বিশ্ব— না না না, বাবা গাছ হতে পারবে না। এখানে বাবার জন্য কোনও জায়গা নেই। ঢোকার সময় দেখলে না জঙ্গলে ভরা নাটমন্দির। জঙ্গল সরিয়ে ওখানে ঢুকলে দেখতে পাবে, একটা পাথরের মেয়েমানুষ। তার হাতে একটা পাথরের কলসি। কাত করে ধরা। কলসি থেকে জল বেরোত আগে। এখন বেরোয় না। ওটার জন্য বাবা অনেক টাকা খরচ করেছে। ওখানেই হয়তো বাবা...!
শুভর চোখে ধরা পড়ে বিশ্বর চোখ-মুখের পরিবর্তন। ও বলে— আচ্ছা বিশ্ব, তোমার সেই ছোট্ট বন্ধু কই? তাকে দেখালে না?
বিশ্ব হঠাৎ কেমন শান্ত নিরুদ্বেগ হয়ে যায়। চোখ-মুখ ভাবলেশহীন— চলো দেখাই। এই বাঁদিক ধরে এসো।
গাছটাকে আর চেনা যায় না। সবুজ পাতায় ভরে উঠেছে। লম্বায় বিশ্বর মাথার সমান। কিন্তু বেশি ডালপালা ছড়ায়নি। সেদিন শুভ গাছের চারটাকে চিনতে পারেনি। আজ ঠিক চিনেছে, দেবদারুগাছ ওটা। বিশ্বর মতোই রোগা। কেমন শান্ত বিষণ্ন গাছটা!
নয়
বাগানে আসার গলিপথে বিশ্বর মা— বাগান দেখা হল? চা যে জুড়িয়ে যাচ্ছে! ভেতরে আসুন। বিশ্ব, তুই স্কুলের প্যান্ট-জামা ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে আয়।
শুভ দেবদারুগাছ থেকে চোখ সরিয়ে গলিপথে ছুড়ে দেয়। সামান্য পোশাকের বদল পুরো মানুষটাকেই যেন বদলে দিয়েছে। সাদার পরিবর্তে এখন পরনে একটা হালকা সবুজ শাড়ি। উলের চাদরটা এখন আর গায়ে নেই। হাতে-বোনা কালো রঙের উলের ব্লাউজে দারুণ মানিয়েছে শাড়িটার সঙ্গে।
বিশ্ব বলে— বন্ধু তুমি ভেতরে যাও। আমি এদেরকে খেতে দিয়ে, স্কুলের জামা-প্যান্ট বদলে নিয়ে যাচ্ছি।
কাঁসার থালায় ফুলফুলে মুড়ি। তেলমাখানো। একটা কাচের প্লেটে কিছু নারকেল-ফালি, একটা কাঁচালঙ্কা। কাঁসার বাটিতে কয়েকটা নারকেল নাড়ু। পাশে কাঁসার গ্লাসে জল।
মেঝেয় আসন পাতে বিশ্বর মা— বসুন। আপনি কাঁচা পেঁয়াজ খান কিনা জানি না। আনব?
না থাক। এ তো রীতিমতো আয়োজন! এতসব...।
না না এ আর এমন কী! আমরা গাঁয়ের মানুষ, তাই মুড়ি...! নিন খান।
আমার একা কেন? বন্ধুর কই? তা ছাড়া আপনিও তো সেই কোন সকালে...!
আমার কথা বাদ দিন। আপনি খেতে শুরু করুন। ওর আছে। বাগান থেকে কখন আসে দেখুন আপনার বন্ধু!
শুভ আসনে বসে— আপনার ছেলে তো গাছপালার দারুণ ভক্ত!
বিশ্বর মা-ও বসে মেঝেতে— আর বলবেন না, সারাটা দিন বাগানে ঘুরে বেড়ায়। স্কুলের সময়টুকুই যা...। তাও তো ফেরার পথে আপনার কোয়ার্টারের কাছে...।
অভ্যাসটা খারাপ নয়। গাছ কখনও শত্রুতা করে না।
তা ঠিকই বলেছেন। আসলে, আমার ইচ্ছে লেখাপড়াটা ওকে ভাল করে করাব, ও যাতে না ওর বাবার মতো...!
শুভ মুড়ির থালায় হাত বাড়ায়— ও পড়াশুনায় কেমন?
ওই আর কী। নিজে যা করে। আমিও তেমন সময় দিতে পারি না। টিউশন দেওয়ারও...! আসলে আমার স্কুলটা এখনও স্যাংশন হয়নি। আপনি খান। বিশ্বকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমি চা নিয়ে আসি।
বিশ্বর মা একটা পেতলের পিরিচে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে ঘরে ঢোকে। পেছনে বিশ্ব। ওর হাতে কয়েকটা পাতা। ও পাতাগুলো শুভর দিকে বাড়িয়ে দেয়— এই নাও বন্ধু। আমার দেওয়া উপহার।
শুভ হাত বাড়িয়ে পাতা নেয়। বেশ বড় বড় পাতাগুলো।
বিশ্বর মা হেসে ওঠে— ছেলের কাণ্ড দেখেছেন! উপহার দেওয়ার আর কিছু পেল না। বিশ্বর চোখে-মুখে খুশির আভাস— এ তো দারুণ উপহার! জানেন, আফ্রিকার জঙ্গলে এক শ্রেণীর মানুষ আছে, কারও সঙ্গে সন্ধি করার সময় ওরা গাছের পাতা বিনিময় করে।
ওটা তো জংলিই। লেখাপড়া হবে না বোধহয়।
হবে হবে। মানুষ তো প্রকৃতি থেকেই প্রথম শিক্ষা নেয়। পরে বইপত্তর...। শোনো বিশ্ব কাল থেকে এক কাজ করবে। বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় তুমি তো তোমার রাজ্যে অনেকক্ষণ কাটাও। ওখানে তোমার বন্ধু-বান্ধবদের তদারকি করার পর আমার কোয়ার্টারে চলে আসবে। আমি রোজ পড়াব তোমাকে। কী, আপনার আপত্তি নেই তো!
বিশ্বের মা উচ্ছল— আমার আপত্তি কেন থাকবে! এতে ওর ভালই হবে।
বিশ্ব খুশিতে কলকলিয়ে ওঠে— কী মজা! আমি রোজ দেখতে পাব, কী করে মাটির নীচে থেকে এত জল ওঠে! একদিন মাত্র গিয়েছি তোমার সঙ্গে।
শুনলেন ছেলের কথা। পড়াশুনায় একদম মতিগতি নেই।
আপনি কিচ্ছু ভাববেন না, ঠিক হবে।
বিশ্ব মায়ের কাছ ঘেঁষে বসে। মায়ের হাঁটুতে হাত রেখে আঙুল দিয়ে অদৃশ্য আঁকিবুকি কাটতে থাকে। মা ছেলের পিঠের ওপর হাত রেখে বলে— আপনি তো কিচ্ছুই খাচ্ছেন না!
শুভ একফালি নারকেল তুলে নেয়— বিশ্বর বাবা কোথায় থাকেন?
পেতলের ঘটি থেকে কাপে চা ঢালে বিশ্বের মা— কলকাতায়। চিনি বেশি না কম?
কম। চাকরি করেন?
করতেন। শুনেছি এখন ছোট ব্যবসা। ওসব কথা থাক। আপনার কথা বলুন।
বিশ্ব কলকাতায় গেছে কখনও?
বিশ্বর মায়ের দৃষ্টি দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে— আমরা আগে কলকাতায় থাকতাম। বিশ্ব যখন আটবছরের তখন গাঁয়ে চলে আসি। আপনি কলকাতা ছেড়ে এত দূরে, গাঁয়ে কেন এলেন? তাও আবার জল দেওয়ার চাকরি!
বিশ্ব মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে ছবিতে চোখ রাখে শুভ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের পশ্চাদপটে বিশ্বর মা, খুদে বিশ্ব, আর কোট-প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোক। নিশ্চয় বিশ্বর বাবা। ছবি থেকে চোখ সরে আসে বিশ্ব মায়ের চোখে— কেন, কাজটা কি খারাপ?
না, তা বলছি না। তবে...।
শুভর দৃষ্টি জানলা গলে বাগানে ছাতিম গাছের মাথায়। গাছের পাতাগুলো কেমন চুপচাপ! আলো কমে যাচ্ছে বলে চিন্তিত যেন! ওর গলায় আবেগ— জানেন, মাঠের শুকনো মাটিগুলো যখন জলে ভিজে নরম হয় তখন কী ভাল যে লাগে! আর এ জল থাকেও অনেক গভীরে। কেমন স্বচ্ছ, উষ্ণ। একটু মাটি খুঁড়লেই যে জল পাওয়া যায় তা শীতল। কিন্তু কাদা-বালি মিশে থাকে। শুধু তাই নয়, জীবাণু থাকে।
সত্যিই আপনার ওই জলে ভিজতে হলে কপাল করে আসতে হয়। তাই না?
জমির শস্যগুলো ওই জলে চান করে। কিন্তু জমির আলে গজিয়ে ওঠা ঘাসপাতার ও জলের নাগাল পায় না।
বিশ্ব আচমকা বলে ওঠে— জানো মা! নায়নজুলিটা এখনো শুকনো। আমি বন্ধুকে দিয়ে নয়ানজুলি দিয়ে জল পাঠাব। নয়ানজুলির ধারে ধারে জংলা গাছগুলো সব তাজা হয়ে উঠবে।
বিশ্বর মা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে দেওয়ালের ছবিটার দিকে। শুভ হো হো করে হেসে ওঠে। সে হাসিতে ঘরের সমস্ত আসবাবপত্রের ঘুম ভেঙে যায় যেন!
শুভর হঠাৎ মনে হয়, সে এমন জোরে হেসে উঠল, অথচ ওর সঙ্গে হাসিতে কেউ যোগ দেয়নি। ও লজ্জিত হয়; এরকমভাবে হেসে ওঠা উচিত হয়নি। বিশ্বর মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে ওরও চোখ যায় ছবিটায়। ছবি কথার সৃষ্টি করে— তোমার বাবা বাড়ি আসবেন কবে?
জানি না। হয়তো আসবে না।
বিশ্বর মা এতক্ষণ যেন অন্য কোথাও ছিল। হঠাৎ এখানে পৌঁছেছে এমনভাবে বলে ওঠে— আরে! আপনার চা যে ঠান্ডা হয়ে গেল!
হ্যাঁ খাচ্ছি। বলছিলাম, উনি, মানে বিশ্বর বাবা বাড়িতে আসার তেমন সময় পান না বোধহয়!
হ্যাঁ, কম আসে। শেষ এসেছিল মাস তিনেক আগে। বাগানে যে বড় মেহগনি গাছটা দেখলেন, ওটাকে কেটে বিক্রি করে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। ব্যবসাতে নাকি অনেক টাকার দরকার। ছেলে মোটেই রাজি নয় ও গাছ কাটাতে। ছেলের কান্নাকাটিতে আমি আর ঠিক থাকতে পারিনি। তারপর যা হয়...। সেই থেকে আর আসেনি।
সূর্যের আলো কমে এসেছে। বাগানের গাছগুলোর নীচের দিকে ছোপছোপ অন্ধকার। ঘরের ভেতরটাতেও অন্ধকার দখল নিচ্ছে একটু একটু করে। অন্ধকার ঘরের ভেতরের মানুষগুলোর মনেও। বাগান থেকে একটা জোনাকিপোকা জানলা দিয়ে ঘরে উড়ে এসেছে। হালকা সবুজ আলোর বিন্দুটা ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। উড়তে উড়তে পোকাটা শুভর গায়ে বসে।
শুভ বলে— সব ঠিক হয়ে যাবে। কিচ্ছু ভাববেন না। আচ্ছা, বিশ্ববাবু! আমার সঙ্গে কলকাতা যাবে? আমি এবার যখন বাড়ি যাব, তোমাকে নিয়ে যাব। শিবপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখিয়ে নিয়ে আসব। আর আলিপুরের চিড়িয়াখানাটাও দেখাব। যাবো তো? কত জন্তু-জানোয়ার আছে!
বিশ্ব হাত বাড়িয়ে শুভর জামা থেকে জোনাকিপোকাটা ধরে ফেলে— যাব।
শুভ হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে যায়। তারপর তরল গলায় বলে— আপনার আপত্তি নেই তো?
কথাটা ঘরময় ভেসে বেড়ায়। হয়তো বা দেওয়ালে, ছাদে, ঘরের খাট-বিছানা, আলমারিতে ধাক্কাও খায়। কিন্তু বিশ্বর মায়ের কানে কোনও স্পন্দন জাগায় না। নিস্পৃহ, নিশ্চল, বিশ্বর মা স্থির চোখে তাকিয়ে ছেলের হাতে ধরা পোকাটার দিকে।
শুভ যখন ভাঙাচোরা বাড়িটা থেকে বেরিয়ে আসে; তখন শুধুমাত্র পশ্চিম আকাশে গেরুয়া আভা। বাড়ির পাশে অশ্বত্থ গাছটাতে অসংখ্য কাকের অবিশ্রান্ত চিৎকার। গেটের চাতালে কতকগুলো ছাতার পাখি লাফিয়ে লাফিয়ে ধুলো মাখছে। আর অনর্গল ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে এলোমেলো বাতাসের সঙ্গে হয়তো বা ঝগড়া করছে! সদর দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্ব ও ওর মায়ের শুধুমাত্র অবয়ব। চোখ-মুখ চেনা যায় না।
দশ
মোটা পাইপ থেকে সশব্দে জল পড়ছে দুই মুখওয়ালা চৌবাচ্চায়। চৌবাচ্চার অস্থির জলে পা ডুবিয়ে বসে আছে বিশ্ব। দুরন্ত জল ওর পা-কে স্থির রাখতে দিচ্ছে না। ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে নিকাশমুখের দিকে। ওর মনটা যেন ভেসে যেতে চাইছে ওই জলের সঙ্গে। চৌবাচ্চাটা কখনও ভরে উঠছে না। দুটো নিকাশ-মুখ দিয়ে জল বেরিয়ে, আঁকাবাঁকা পাকা নালা বেয়ে মাঠের মাঝে অন্য এক চৌবাচ্চায়। সেখান থেকে মাঠের বুক চিরে বিভিন্ন দিকে।
মাটির নীচে থেকে উঠে আসা মোটা পাইপের বাঁকটায় বসেছিল শুভ। ওর দৃষ্টি পাম্পঘরের গা বেয়ে উঠে যাওয়া পুঁইলতার দিকে। কিশোরী পুঁইলতাটা যেন দু’দিনে যুবতী হয়ে উঠেছে। কেউ বসায়নি গাছটা, এমনই গজিয়ে উঠেছে। অবহেলায়। পাম্পঘরের চাল থেকে কোয়ার্টারের ছাদের দিকে মাথা বাড়িয়ে লতাটা ঝুলছিল সেদিন। তা দেখে হরিকে বলে একটা কঞ্চি দিয়ে নিয়েছিল চাল ও ছাদের মধ্যে। ঠিক যেন একটু সেতু! কঞ্চি বেয়ে এখন যেন ছাদ ছুঁইছুঁই পুঁইলতাটা! সেদিকে তাকিয়ে থেকেই শুভ বলে ওঠে— বিশ্ব, নেমে এসো ওখান থেকে। জলে পড়ে যাবে।
বিশ্বর মুখে বিশ্বজয়ী হাসি— বন্ধু! দেখবে এসো জলের তোড়ে আমার পা দুটো কেমন ভেসে যেতে চাইছে! এসো না! দেখবে এসো না!
শুভ ধীর পায়ে চৌবাচ্চার কাছে। অবাক বিস্ময়ে জলোচ্ছ্বাস দেখতে থাকে। যেন জীবনে প্রথমবার সে সেই আশ্চর্যজনক দৃশ্য দেখছে! এখন ওর এবং বিশ্বর দৃষ্টির মধ্যে কোনও তফাত নেই।
বেশি জল ঘেঁটো না। ঠান্ডা লেগে যাবে। চলো, পড়তে বসবে।
আচ্ছা বন্ধু! জলটা গরম কেন? কলের জল তো ঠান্ডা থাকে!
মাটির অনেক নীচে থেকে আসছে তো, তাই।
অনেক নীচে থেকে এলে বুঝি গরম হয়ে যায়?
শুভ কেমন যেন আনমনা— না, তা নয়, মাটির নীচে, মানে অনেক নীচে আগুন থাকে তো, তারই তাপে...। বড় হয়ে পড়বে এসব। এখন চলো পড়া করবে।
বিশ্ব ফাঁকা মাঠের দিকে কিছুক্ষণ উদাস চোখে তাকিয়ে তাকে। তারপর বিড়বিড় করে বলে— ও! এবারে বুঝেছি। চোখের জলও তো গরম হয়। অনেক ভেতর থেকে আসে বলে হয়তো! কাল বাবার চিঠি এসেছে। মা সেটা পড়ে, আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল, আর বলছিল ‘কিছুতেই ছাড়ব না।’ তখন আমার গায়ে পড়ছিল মায়ের চোখের জল। গরম! মানুষের ভেতরেও বুঝি আগুন থাকে গো বন্ধু?
হ্যাঁ মানুষের ভেতরে অনেক অনেক আগুন থাকে। সেই আগুনকে ঠিকমতো জ্বালাতে হলে ঠিকমতো পড়াশুনো করতে হয়। চলো, ঘরে চলো।
বিশ্ব চৌবাচ্চা থেকে পা উঠিয়ে নিয়েছে। সম্মোহিতের মতো সে শুভকে অনুসরণ করে।
বিশ্বের শান্ত চোখ দুটো এখন বইয়ের পাতায়। কোনও শব্দ উচ্চারণ নয়। নেই কোন মুখরতা। শুধু ওর ডাগর চোখ দুটো বিচরণ করছে অক্ষরের বাগানে। অক্ষরগুলোর নির্যাস শুষে নিচ্ছে দুটো চোখ। সেই নির্যাস বিন্দু বিন্দু হয়ে মনের পাত্রে জমা হচ্ছে হয়তো।
শুভর স্থির চোখ বিশ্বতে। বিশ্ব এখন ধ্যানমগ্ন তাপস যেন! তার চোখ-মুখে এখন নেই চারকোনা জমির অধীশ্বরের কোনও চিহ্ন, কিংবা কিছুক্ষণ আগের কৌতূহলী চঞ্চলতার ছাপ। এখন সে এক অন্য জগতে। বিশ্বর সীমানায় প্রথম প্রবেশ করে ধরা পড়েছিল সে। মুক্তিপণও দিতে হয়েছিল। কিন্তু সে ছিল নেহাতই কৌতুক। এখনও যেন ক্রমশ মৌন তাপসের সীমানায় ঢুকে পড়ছে। সত্যি সত্যি ও ধরা পড়ছে। এ থেকে মুক্তি পেতে গেলে কী মুক্তিপণ দিতে হয় তার জানা নেই।
এগারো
শুভ রাতের ট্রেনে কলকাতা থেকে ফিরেছে। যাওয়ার আগে ও বিশ্বর মায়ের কাছে প্রস্তাব রেখেছিল বিশ্বকে কলকাতায় বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বিশ্বর মা বিষণ্ণ চোখে শুভর দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়েছিল শুধু। কেন যে প্রস্তাব মঞ্জুর হয়নি, তার সঠিক কারণ জানে না শুভ। বিশ্বর মায়ের চোখের কোণে জল দেখে কারণটা ওর কাছে আরও দুর্বোধ্য হয় উঠেছিল। একাই গিয়েছিল সে।
রাতে যখন ফিরল তখন হরিটাও চলে গেছে। ক্লান্ত শরীরটা আর বইছিল না। তাই কিছু না খেয়েই বিছানায় ঢেলে দিয়েছিল নিজেকে। ভোর রাতে হঠাৎ শুভর ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নে ছিল বিশ্ব, নাকি বিশ্বর মা! গুমোট গরম। ঘামে ভিজে গেছে পিঠ, বিছানার চাদর। অথচ রাতে ছিল হিমহিম দখিনা বাতাস। কখন যে তাপ বেড়ে গেছে! তাপ ওর মনের মাঝেও। ও ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। আকাশে একটাও তারা নেই। কোত্থেকে এক বিশাল কালো দত্যি এসে সব গ্রহ-তারা গিলে ফেলেছে। চারপাশে নিরেট অন্ধকারের দেওয়াল তাকে যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে আলাদা করে দিয়েছে! মাঠে উড়ে বেড়ানো ঝাঁক ঝাঁক জোনাকিগুলোও যেন ওই দত্যির পেটে। ঝিঁঝিঁ পোকারাও হয়তো ভয়ে চুপ মেরেছে! শুভর গায়ে দু’-এক ফোঁটা বৃষ্টি। মনের মধ্যে বৃষ্টির ফোঁটা হিম ছড়ায়। একসময় দু’-এক ফোঁটা বৃষ্টি লক্ষ ফোঁটায় পরিণত হয়। শুভ ঘরে ঢুকে পড়ে।
ভোর থেকেই বৃষ্টি। অকালবর্ষণ। তার সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া। নিম্নচাপ হয়তো! সারাটা দিন টিপটিপ ঝুপঝুপ। দিনের বেলায় হরির দেখা মেলেনি তাই অগত্যা খিচুড়ি আর মায়ের দেওয়া আচার। কোয়ার্টারে একা একা সারাদিন। কখনও সঙ্গী জিম করবেট; কুমায়ুনের অরণ্যে তার সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া, আবার কখনও বা মন জুড়ে বাবা-মা, সুচরিতা, বিশ্ব অথবা তার মা।
সন্ধেবেলায় হরি আসে। মাথায় অদ্ভূত এক টুপি। চেরা বাঁশের শিল্পসামগ্রী যেন! হরি বলে— এর নামা মাথালি। মাথা বাঁচে। বিষ্টি থেকে গা-ও বাঁচে কিছুটা। ওঃ সারাদিন ঝরচে। যেন শেরাবনের পাউষ লেগেচে! জানেন বাবু! এ বৃষ্টিতে চাষিদের মাথায় হাত। রবি ফসলগুলোর ক্ষেতি হবে খুব। আমগাছের বোলগুলো সব কালো হয়ে যাবে। কতায় বলে, ‘ফাগুনের জল আগুন।’
হরি বকবক করে চলে আরও কিছুক্ষণ। সকালে না আসার দোষ ঢাকতেই হয়তো এই বকবকানি। শুভর কানে সব কথা যায় না। ওর মন আটকে আছে আমগাছের বোলগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথায়। প্রকৃতি কী অদ্ভুত খেয়ালি! নিজেই সৃষ্টি করে। নিজেই করে ধ্বংস। যেন সেই পথের মোড়ের পাগলা শিল্পী। অনেক ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে গড়ছে মাটির পুতুল। হঠাৎ অপছন্দ হতে তাকে দলে-মুচড়ে করে ফেলছে একতাল কাদা।
দু’দিন অন্তরীণ থেকে সূর্য আজ দেখা দিয়েছে। ঝলমলে রোদ্দুর। চান করে পরিচ্ছন্ন হওয়া গাছপালাতে রঙের জেল্লা। শুভ চারকোনা মাঠের দিকে তাকিয়ে বসে বসে প্রাণভরে সে রং দেখছে আর মাঝে মাঝে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। স্কুল থেকে বিশ্বর ফেরার সময় তো পেরিয়ে যাচ্ছে। তবে কি বাদলার দিন দুটোর মতো আজও বেরোয়নি ঘর থেকে? নাকি শরীর খারাপ? কিন্তু ওর যে মন মানে না।
ও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। চারকোনা জমিটার মধ্যে ঢুকে পড়ে। সৈন্যবৃক্ষদের মাথার পাগড়ি জলে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে এখন ঝকঝকে সবুজ। শুভর ইচ্ছে করছে, ওদেরকে জিজ্ঞেস করে— তোমরা কেমন আছ? কিন্তু ওদের সঙ্গে মনের সংযোগ হচ্ছে না। বিশ্বটা নেই যে! ওই তো ওদের সঙ্গে তার সেতু গড়ে দেয়। আমগাছের নীচে অনেক ঝরা মুকুল। অদ্ভুত এক গন্ধ ছড়াচ্ছে। তার মাঝে এক কাঠবেড়ালি লেজ উঁচু করে ঘুরছে ফিরছে। আর খুঁটে খুঁটে কী যেন খাচ্ছে।
একসময় গাছের ছায়াগুলো লম্বা হতে হতে বিশাল ছায়ার সমুদ্রে হারিয়ে যায়। শুভর মনেও ছায়া নামে। বিশ্ব তবে আজও এল না। কিন্তু বিশ্বর মা? আজও স্কুলে যায়নি বোধহয়! গাছের ডালে ডালে পাখিগুলো বিরামহীন চিৎকার করে যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে জায়গা দখলের কোঁদল। নাকি আঁধার নামার প্রতিবাদে অস্থির ওরা? অস্থিরতা শুভর মনেও। আঁধার নামতে বেশি দেরি নেই আর। উঠিউঠি করেও ওটা হয়ে ওঠে না বাতিল জলের পাইপটা থেকে। এমন সময় দুরে আলপথে মহিলার অবয়ব। নিশ্চয় বিশ্বর মা!
দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসছে চারকোনা জমিটার দিকে। জমিটাকে পাশে ফেলে রেখে হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছে মেঠো পথ ধরে। জমিটার দিকে তাকানোর সময় নেই তার। তাকালেই নিশ্চয় চোখে পড়ত ওকে। শুভ দৌড়ে গিয়ে থামে মহিলার সামনে। বিশ্বর মা। চোখে কোনও ভাষা নেই। যেন সামনে শুভ নয়, অচেনা কেউ।
বিশ্ব কোথায়?
কে? ও বিশ্ব। বিশ্ব নেই।
বিশ্ব নেই? মানে, কোথায়?
চলে গেছে। ওর বাবা চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল ওকে নিয়ে যাবে ব্যবসার কাজে। তার ছোট ব্যবসাতে নাকি একটা ছোট ছেলের খুব দরকার। কাল নিয়ে গেছে।
বিশ্বকে নিয়ে গেছে! কলকাতায়?
কোনও কথা বলে না বিশ্বর মা। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। চোখ মাটির দিকে। একটু পরে কাপড়ের খুঁটে চোখ মুছে নিয়ে ছন্দহীন পায়ে এগিয়ে যায় রাস্তার বাঁকের দিকে।
শুভ বিশ্বর মায়ের কাছে আরও কিছু জানতে চায়, ওর কাছাকাছি যেতে চায়। কিন্তু ওর পা দুটো যেন কেউ আটকে দিয়েছে অদৃশ্য পেরেক দিয়ে! অনেকক্ষণ ও আবছায়াতে দাঁড়িয়ে থাকে। ওর মনের মধ্যে বাষ্প। চোখের কোণে সে বাষ্প জমা জল। একসময় ধীর পায়ে সে চলে আসে গাছগুলোর কাছে। গাছগুলোর মাথায় থোকা থোকা আঁধার। শুভ সবচেয়ে মোটা গাছটার কাছে যায়। আস্তে আস্তে সে গাছটাকে দু’হাত জড়িয়ে ধরে। গাছের গায়ে কান পেতে, কিছু যেন শুনতে পাচ্ছে সে। ধুকপুক ধুকপুক একটা শব্দ। সেটা গাছের ভেতর থেকে, নাকি নিজের বুকের শব্দ বুঝে উঠতে পারে না। গাছ থেকে ওর গায়ে ঝরে পড়ে দু’-একটা পাতা, নাকি গাছের কান্না!
একসময় সে কোয়ার্টারে দিকে পা বাড়ায়। ঘরগুলো আঁধার ভরা। আজ হরিটাও আসেনি। ওর ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে হয় না। বাইরে মরা আলো। পাম্পটা দু’দিন ধরে বন্ধ। চৌবাচ্চাটা শুকনো। শুকনো চৌবাচ্চার কিনারায় বসার জন্য শুভ সেদিকে এগোয়। এগোতেই ওর মাথায় ঠেকে কিছু একটা। ঝুলন্ত পুঁইলতাটা। চাল থেকে অসহায়ভাবে ঝুলছে। ছাদের নাগাল পায়নি। কঞ্চিটা নীচে এক পাশে পড়ে আছে। হয়তো দু’দিনের ঝড়-জলে ভেঙে গেছে সেতুটা।