Cover

MARRIAGE MAIL DOT COM

গাড়িটা তীব্র গতিতে ছুটছে। স্পিডোমিটারের ছোট্ট ডিজিটাল স্ক্রিনে এক, পাঁচ ও শূন্য সংখ্যা তিনটি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ গাড়ির গতি এখন ঘন্টায় দেড়শো কিলোমিটার। মিস্টার বি. কে. টেন ঠান্ডা হেল্থ-ড্রিঙ্কের ক্যানে চুমুক দিচ্ছেন আর গাড়ি চালাচ্ছেন। গাড়ির ইলেকট্রনিক ড্যাশবোর্ডের লাল-সবুজ বোতামগুলোর একটিতে তিনি আঙুল ছোঁয়ালেন। ভিট্রিয়ল-ব্লু রঙের গাড়িটার গতি কমে এল। সামনেই ট্রাফিক সিগন্যালের খবরদারি চোখ।

Share:

গাড়িটা তীব্র গতিতে ছুটছে। স্পিডোমিটারের ছোট্ট ডিজিটাল স্ক্রিনে এক, পাঁচ ও শূন্য সংখ্যা তিনটি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ গাড়ির গতি এখন ঘন্টায় দেড়শো কিলোমিটার। মিস্টার বি. কে. টেন ঠান্ডা হেল্থ-ড্রিঙ্কের ক্যানে চুমুক দিচ্ছেন আর গাড়ি চালাচ্ছেন। গাড়ির ইলেকট্রনিক ড্যাশবোর্ডের লাল-সবুজ বোতামগুলোর একটিতে তিনি আঙুল ছোঁয়ালেন। ভিট্রিয়ল-ব্লু রঙের গাড়িটার গতি কমে এল। সামনেই ট্রাফিক সিগন্যালের খবরদারি চোখ।

  মিস্টার বি. কে. টেনের মনের উত্তেজনার মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। মাত্র দশ সেকেন্ড সময় এগিয়ে থাকতে পারলে সিগন্যালে আটকে থাকা তিন মিনিট সময় নষ্ট হত না। ওঁর মনের স্ক্রিনে এখন সকালের নিউজ ইউনিভার্স’ ই-পেপারে দেখা বিজ্ঞাপনের কথাগুলো ব্রাইডগ্রুম্ সিলেকশন, কাম সুন...। প্রথম আসার ভিত্তিতে মাত্র দুশোজন ক্যান্ডিডেটকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে। 

  মি. টেন ভাবেন, দুশোজনের নাম এন্ট্রি হয়ে গেলে এই দৌড়ঝাঁপ করে আসাটাই বৃথা। দেখা যাক কপালে কী আছে! তাঁর চোখ সিগন্যালের টাইম-ডিজিটে। সেখানে কাউন্ট-ডাউন হচ্ছে ফোর-থ্রি-টু-ওয়ান-জিরো। সঙ্গে সঙ্গে গ্রিন সিগন্যাল।

  এর মধ্যে বি. কে. টেন ড্যাশবোর্ডের সামনে থেকে বাঁদিকে সরে বসেছেন। কারণ ডানদিকের স্বচ্ছ কাচ ভেদ করে রোদ পড়ছে গায়ে-মুখে। শহরের পুলিশের কড়া নির্দেশ, গাড়িতে ডার্ক-গ্লাস লাগানো চলবে না। সে কারণে সান-প্রোটেকটিভ গ্লাস লাগানো যায়নি। উগ্রপন্থী হানায় পুলিশ একদম নাজেহাল। তাই এ সাবধানতা। এদিকে তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়ে হাতে-মুখে ইউ-ভি রে-প্রোটেকটিভ ক্রিমও লাগানো হয়নি। অথচ গতকালই সমস্ত মিডিয়াতেই সতর্কবার্তা ছিল, ওজোন-স্তরের ভাঙন বিপদসীমা ছাড়িয়ে গেছে। ক্ষতিকারক রে-নিরোধক পোশাক ও ক্রিম অবশ্যই ব্যবহার করুন। 

  সবুজ আলোর সঙ্গে সঙ্গে রিমোটের বোতাম টিপে গাড়ি স্টার্ট দেন মিস্টার বি. কে. টেন। ই. এম বাইপাসের সুপারফার্স্ট-বে ধরে ছুটছে হুশুকাই গাড়ি। গাড়িটা একদম নতুন। গত পরশুদিন জাপানি কোম্পানি গাড়ি ডেলিভারি দিয়ে গেছে বাড়িতে। কোম্পানির মেকানিক বাড়িতে এসে ডিমনস্ট্রেশন দিয়ে গেছে; যাতে এই সৌরশক্তি-চালিত গাড়িটা চালাতে অসুবিধা না হয়। পুরোনো গাড়িটা ছিল ব্যাটারি-চালিত। এত গতি ছিল না গাড়িটার। মেকানিক ছেলেটা যাওয়ার সময় অবশ্য পুরোনো গাড়িটা নিয়ে গেছে। এক্সচেঞ্জ অফার। সৌভাগ্যবশত মিস্টার বি. কে. টেন অফারটি পেয়ে গেছেন। সবার কপালে এক্সচেঞ্জ অফার জোটে না। আসলে অটোমোবাইল কোম্পানি ছাড়া পুরোনো গাড়ি কেউ নিতে চায় না। লঝঝড়ে গাড়ি নিয়ে তখন হয় সমস্যা। রাস্তার সুপার-ফার্স্ট বে-তে ওই গাড়ি নিয়ে ঢোকা যায় না। ঢুকলে পুলিশ সার্জেন্ট ফাইন করে। তখন লঝঝড়ে মার্কা গাড়িটা কার-গারবেজে ফেলার জন্য মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে আবেদন করে অপেক্ষা করতে হয়। কবে ডাক আসবে; তখন গারবেজ-ট্যাক্স বাবদ একগাদা টাকা দিয়ে গাড়ির জঞ্জালখানায় গাড়িটা ফেলে এসো! সে কি কম ঝামেলা! গায়েও লাগে! অতগুলো টাকা ট্যাক্স, তার সঙ্গে গাড়ি! বছর সাতেক আগে গ্যাস চালিত গাড়িটা বাতিল করার সময় তাঁকে এই ঝামেলা পোয়াতে হয়েছিল।

  এবার ভাগ্যটা ভাল তাই এক্সচেঞ্জ অফারটা...! এখন যে কাজে যাচ্ছেন সেখানে যদি ভাগ্য সহযোগিতা করে তা হলেই...! এসব ভাবতে ভাবতে বি. কে. রিমোটে রাইট-টার্ন ইন্ডিকেটরের বোতাম টিপে দেন। সঙ্গে সঙ্গে ডানদিকের হলুদ আলোদুটো দপ দপ করে জ্বলতে থাকে। বেজে ওঠে ডাইনে বাঁক নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট করা টিপিক্যাল মিউজিক। বাঁয়ে বাঁক নেওয়ার মিউজিকের সঙ্গে এর অনেক তফাত। এতক্ষণ গাড়ির কোনও শব্দ ছিল না। টার্ন নেওয়ার সময়েই যা...। টার্নিং বাটনে আলতো চাপ দিতেই গাড়ি ডানদিকের রাস্তায় ঘুরে যায়। গাড়িটা আবার ছুটতে থাকে দেড়শো-পেরোনো গতিতে।

  ডানদিকে জে বোস স্টেডিয়াম’ ঘুমিয়ে। ওটা পেরোতেই বাঁদিকে বি. ভট্ট লিটেরারি মিউজিয়াম অ্যান্ড মডার্ন লাইব্রেরি’।  লাইব্রেরির সামনে বিশাল লন। লনে গার্ডেন-আমব্রেলার নীচে ইজিচেয়ারে শুয়ে কয়েকজন বৃদ্ধ কাগজের বইয়ে চোখ ডুবিয়েছেন। গরম হাওয়া আটকানোর জন্য ইজিচেয়ারের চারপাশে ফাইবার-গ্লাসের ঘেরাটোপ। তার মধ্যে দিয়ে বৃদ্ধদের দেখে মিউজিয়ামের মডেল মনে হচ্ছে। ওঁদের বোধহয় মনিটরে ই-বুক পড়তে ভাল লাগে না, তাই সেকেলে কাগজের বই ঘাঁটছেন!

  মিউজিয়াম পেরিয়ে আরও তিনমিনিট চল্লিশ সেকেন্ড দৌড়োয় গাড়িটা। মিস্টার টেন কাপল-প্লাজা’-তে পৌঁছে যান। পার্কিং জোন-এ গাড়ি রাখেন। গাড়ির বাইরে বেরোতেই গায়ে যেন আগুনের হলকা! গাড়ি থেকে বেরোলেই এই অস্বস্তির মধ্যে  পড়তে হয়। সারাবছরই আবহাওয়া গরম থাকে। সবসময়েই চল্লিশের ডাইনে-বাঁয়ে। অথচ শোনা যায় বছর চল্লিশেক আগেও নাকি এ শহরের তাপমাত্রা বারো-তেরো ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসত! তখন উইন্টার নামে একটা ঋতু ছিল। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে এখন এ অবস্থা!

  বি. কে. টেন পার্কিং জোনের পাশেই ইনস্ট্যান্ট ফ্রেশ-পার্লারে ঢুকে যান। কয়েক মিনিট পড়েই বেরিয়ে আসেন পার্লার থেকে। কিছুক্ষণ আইস বাথ নেওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু দেরি হয়ে যাবে! তাই নরম্যাল-ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়েন। তবুও ঝকঝকে লাগছে ওঁকে। গাড়ি চালানোর ধকলটাও উধাও। পোশাকের স্প্রে-মিস্ট অদৃশ্য রেণু হয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। এখন মনটাও বেশ ফুরফুরে। গরম হাওয়াকে ডোন্ট-কেয়ার’ করতে ইচ্ছে করছে। আশপাশে আরও কিছু ভদ্রলোকের ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে বি. কে. কাপল-প্লাজার গেটের দিকে এগিয়ে যান। বিধিসম্মত সতর্কতার জন্য সিকিউরিটি স্টাফের অনুরোধে চেকিং স্ট্যান্ডের ওপর উঠে দাঁড়াতে হয়। চোখ যায় গেটের মাথায় ইলেকট্রনিক সাইট স্ক্রিনে। সেখানে ইংরেজি, হিন্দি ও বাংলা হরফে লেখাগুলো চলমানপাত্র মনোনয়ন। পাত্রী মিস জি-এল ফিফটি। জন্মদু’হাজার কুড়ি খ্রিষ্টাব্দ। প্রথম বিবাহে ইচ্ছুক। বিশদ বিবরণের জন্য এনকোয়ারিতে যোগাযোগ করুন।

বি. কে. টেনের মন আনচান করে ওঠে। বেশ দেরি হয়ে গেল আসতে। তবে হয়তো এখনও দুশোজনের কোটা পূরণ হয়নি! তা হলে নিশ্চয় স্ক্রিনে নো-এন্ট্রি লেখা থাকত।

  চেকিং স্ট্যান্ডের মেটাল-ডিটেক্টর ও এক্সপ্লোসিভ-ডিটেক্টর যন্ত্র সবুজ সংকেত দিয়েছে। সিকিউরিটি-স্টাফ স্যালুট জানিয়ে এস্কালেটারের দিকে হাত দেখায়। স্টেপ-ডাউন এসকালেটর ধীর গতিতে বি. কে টেনকে একদম গেটের চাতালে পৌঁছে দেয়। অটোম্যাটিক ফটো-সেন্সেটিভ স্লাইডিং গেট দু’পাশে সরে যায়। চোখে-মুখে হালকা ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা। তার সঙ্গে মিষ্টি গন্ধের ডিওডোরেন্ট স্প্রে। অদৃশ্য ডলবি-ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম থেকে সুরেলা নারীকণ্ঠ মোস্ট ওয়েলকাম টু কাপল প্লাজা। দ্য এনকোয়ারি এন্ড দ্য বুকিং কাউন্টার ইজ অন দা রাইট হ্যান্ড সাইড। থ্যাঙ্ক য়ু।  

  বি. কে. টেন এগিয়ে যান। একটু এগোতেই ডানদিকে দাঁড়িয়ে থাকা রোবোটের ধাতব হাতটা সামনে চলে আসে। হাতে একটা সিন্থেটিক গোলাপফুল। ফুলটা থেকে সুন্দর গন্ধ ছড়াচ্ছে। রোবোটের যান্ত্রিক পুরুষ কণ্ঠগুড মর্নিং স্যার!

গুড মর্নিং... ব'লে রোবোটের হাত থেকে ফুল নিয়ে এগিয়ে যান বি. কে. টেন। গ্রাউন্ড ফ্লোরের লাউঞ্জে গোটা তিনেক কাউন্টার। প্রত্যেক কাউন্টারের সামনে ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সি পুরুষের লম্বা লাইন। বি. কে. টেন এনকোয়ারিতে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। অপেক্ষাকৃত ছোট লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন। চোখে-মুখে বিরক্তির গ্রাফিক্‌স্এত কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এই লাইন-সিস্টেমের কোনও উন্নততর পরিবর্তন হল না এখনও অবধি! সেই লর্ড ক্লাইভের আমল থেকে লাইন-সিস্টেম চলছে তো চলছেই। ইচ্ছে করলেই লাইনে বসার ব্যবস্থা করা যেত! তাও হয়নি। যেন লাইন দিতে হলে দাঁড়ানোটাই নিয়ম!

  বি. কে. টেন ডাইনে-বাঁয়ে চোখ ছড়ান। অনেক জোড়া চোখ ওঁর দিকে। কেউ প্রোফাইলে, কেউ অ্যাঙ্গেলে, কেউ স্ট্রেট-সাইটে, কেউ শ্যালো-সাইটে দেখছে। কিন্তু সব চোখের ভাষা যেন এক! সব চোখই যেন বলছেএ আবার কোন পিকাডুলু এলেন হোক্কাইডো বা হনলুলু থেকে! আমি থাকতে উনি বিয়ে করবেন! শখ কম নয়!

  বি. কে’র চোখে অবশ্য ওই চোখগুলোর ভাষা অন্যভাবে ধরা দেয়। তিনি ভাবেনআমাকে দেখে নিশ্চয় ওদের টেনশন হচ্ছে! আর একজন কম্পিটিটর বাড়ল! পোশাক আশাকে নিশ্চয় ওরা অনুমান করেছে আমার বায়োডাটা খুবই ওয়েটফুল হবে। অনেকেই পাত্তা পাবে না। তাই ওদের চোখে আফশোস। হয়তো কিছু ঈর্ষাও মেশানো আছে দৃষ্টিতে!

  বি. কে. টেন কাঁধ ঝাঁকিয়ে একবার ডান কাঁধে আর একবার বাঁ কাঁধে ফুঁ দিয়ে অদৃশ্য ধুলো উড়িয়ে সামনে তাকান। সেই ফুঁয়ে হয়তো লাইনে দাঁড়ানোর বিরক্তিটাও উড়ে যায়!

  কাউন্টারের মাথায় লেজার-স্ক্রিনে চলমান লাল অক্ষরগুলো চোখ টানে। সেখানে ইংরেজিতে যা বিজ্ঞাপিত হচ্ছে তার বাংলা অনুবাদ এরকমস্বাগতম! পাত্র-নির্বাচন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। আপনার নাম ও বিবরণ নথিভুক্ত করার জন্য মাত্র পঁচিশহাজার টাকা জমা দিন। কম্পিউটার নম্বর ও আপনার ফাইল নম্বর নিয়ে নিন। দশতলায় হলঘরে গিয়ে নম্বর অনুযায়ী আপনার কম্পিউটার সেটটি খুঁজে নিন। জি-এল ফিফটি ফাইল খুলুন। পাত্রী ও বিবাহের শর্ত সম্পর্কে জ্ঞাতব্য বিষয় পেয়ে যাবেন। আপনি উপযুক্ত হলে, আপনাকে দেওয়া ফাইল-নম্বরের ফাইল খুলে আপনার সমস্ত তথ্য দিয়ে দিন। প্রাথমিকভাবে আপনি মনোনীত হয়েছেন কি না, তা আগামীকাল থেকে তিনদিনের মধ্যে ইন্টারনেটে জি-এল ফিফটি ম্যারেজ মেল ডট কম-এ জেনে নিতে পারবেন। আপনার বিবাহিত জীবন কামনা করি। ধন্যবাদ।

  মিস্টার টেন ভাবেনএতজনের মধ্যে একজন সিলেক্ট হবে। নেহাতই ভাগ্যের ব্যাপার! আর ভাগ্য বলে যদি কিছু থাকে,  তা হলে সেটা এতই পরিবর্তনশীন যে, তাকে ঠিকমতো বোঝা মুশকিল। গত পরশু অবধি ভাগ্য প্রসন্ন ছিল। তার প্রমাণ তো  এই গাড়িটা কেনার সময় এক্সচেঞ্জ অফারের সুযোগটা পেয়ে যাওয়া। কিন্তু কাল থেকে ভাগ্যটা যেন অসহযোগিতা করছে! কম্পিউটারটা কাল হঠাৎ বিগড়ে গেল। দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। মনে হচ্ছে যেন সদ্য পাশ হওয়া আইন মোতাবেক  বিকৃত-সমকামিতার জন্য শাস্তি হয়েছে গৃহবন্দি’। ইন্টারনেটে যখন লস ভেগাসের বিউটি কুইন এল-ভি হানড্রেডের সঙ্গে  চ্যাটিং করে শরীর গরম হচ্ছিল; তখনই সেটটা বিগড়োল। কম্পিউটার ঠিক থাকলেও এখানে এসে লাইন দিতে হত! ওঁরা আবার অনলাইন এন্ট্রি নেবে না। যাক গে! কী আর করা যাবে। ভাগ্যে যা আছে সেটা তো...। এখন যদি বিয়েটা এ-যাত্রায় করে ফেলা যায়, তা হলে সব কষ্ট পুষিয়ে যাবে।

  এর মধ্যে লাইন বেড়েছে। বি. কে. টেন না দেখার ভান করে আড়চোখে দেখে নেন পেছনের মানুষগুলোকে। বেশিরভাগই চল্লিশ পেরোনো বয়সের। যুবক সংখ্যায় কম। তাঁর নিজেরও চল্লিশ হয়েছে। পাত্রীর সঙ্গে বয়সের ফারাক অনেক! এ নিয়ে মনে টেনশন! পেছনের পুরুষগুলো দেখে ওঁর মনের ব্যথায় যেন ইথার-স্প্রে করার শীতল আরাম! তাঁর মতো অনেকেই এখনও অবধি বিবাহিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেনি। এখন একটা বিয়ে করতে পারা, আর চাঁদে বেড়াতে যাওয়ার টিকিট-পাওয়া এক ব্যাপার। দেখা যাক এই খেলায় ওর হাতেই বাউন্স বলে যদি ক্যাচ ওঠে! মনে ধোঁয়া ধোঁয়া আশা। এই ধোঁয়াশাকে জমাট বাঁধানোর জন্য এখন ওঁর খুব ইচ্ছে করছে একটা সিগারেট ধরাতে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে তো ধরানো যাবে না! কোথায় পল্যুশন কন্ট্রোলের অফিসার ঘাপটি মেরে বসে আছে কে জানে! এসে ক্যাঁক করে ধরবে। দশহাজার টাকা গচ্চা যাবে। একটু দূরে তাকাতে নজরে আসে একটা গ্লো-সাইন বক্স। তার ওপর তির চিহ্ন দিয়ে লেখাটয়লেট এন্ড স্মোকিং জোন। 

  বি. কে. টেন ঝটপট সামনের লোকগুলো গুনে ফেলেন। এগারো জন। অর্থাৎ এগারো ইন্টু ত্রিশ সেকেন্ডসাড়ে পাঁচ মিনিট পরে টার্ন আসবে। পেছনের লোকটির কানের কাছে ফিসফিসে গলায় টয়লেট’ শব্দটা উচ্চারণ করে ভদ্রতার হাসি হেসে বি. কে. তির চিহ্নের দিকে এগিয়ে যান।

দুই

আজ ছুটির দিন। কিন্তু বি. কে টেনের ছোটাছুটির দিন। সকাল থেকে খুব ধকল গেছে। কম্পিউটার খারাপ থাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তাই সপ্তাহ শেষে বাবা ও মায়ের সঙ্গে ইন্টারনেটে যোগাযোগ করা গেল না। রুটিন মাফিক কর্তব্য পালনের জন্য সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে যেতে হল দুটো আলাদা আলাদা ওল্ড এজ হোমে। গত রবিবার নিজের কম্পিউটার ঠিক থাকলেও স্বর্গদ্বার বৃদ্ধাবাস’-এর যন্ত্র ঠিক না থাকায় বাবার সঙ্গে কথা বলা যায়নি। টেলিফোনে হয়তো কথা বলা যেত। কিন্তু টেলিফোনে কথা বলে তৃপ্ত হওয়া যায় না। শুধুমাত্র কথা শোনা যায়, একে অপরকে দেখা যায় না। নিজে না দেখলেও চলে, কিন্তু যতই হোক সন্তান তো, বাবা-মায়ের মন ভরে না পরদায় ছেলেকে না দেখতে পেলে। একবার তো ভিডিওফোনের প্রিপেড-কার্ড শেষ হয়ে যাওয়ায় টেলিফোনে কথা বলতে গিয়ে কী বিপত্তি! বাবার গলা চিনতে না পেরে বি. কে. টেন জিজ্ঞেস করেছিলেনআপনি কে বলছেন?

  ব্যস! উগ্রপন্থী মেজাজের বাবা হুংকার ছেড়েছিলেন, "রাসকেল! এত অধঃপতন তোমার! ওল্ড হ্যাগার্ডদের বৃদ্ধাবাসে রাখাটা না হয় আইনসিদ্ধ; কিন্তু এখন ক্লোনিংয়ের যুগ বলে বাবাকে অস্বীকার করা! বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য ডেকে তাকেই জিজ্ঞেস করা, 'আপনি কে'?"  

  এসব কথা ভেবে সকালেই সরাসরি স্বর্গদ্বার বৃদ্ধাবাসে চলে গিয়েছেন বি. কে. টেন। গিয়ে শুনলেন, মেডিক্যাল চেক-আপে ধরা পড়েছে বাবার একটা ফুসফুস ঠিকমতো কাজ করছে না। ফুসফুসটা ইমিডিয়েট পালটানো দরকার। ভাগ্যিস ক্রেডিট-কার্ড সঙ্গে ছিল! আগামীকালই খারাপ ফুসফুস বাদ দিয়ে একটা সিন্থেটিক লাং লাগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হল। এসব ঝামেলায় অনেকটা সময় গেছে। এরপর দ্য ইভ ওল্ড-এজ হোম প্রাঃ লিঃ’-এ যেতে হল। ওখানে মায়ের সঙ্গে দেখা করে, এক সপ্তাহের বোরিং রোজনামচা শুনে যখন বেরোলেন, তখন সাড়ে ন’টা।

  আসার পথেই পড়ে অ্যাডাম ক্লোনিং সেন্টার’। হঠাও বি. কে. টেনের মাথায় এল, ক্লোনিংয়ের লেটেস্ট চার্জটা জেনে গেলে কেমন হয়! গতবছর বলেছিল পঞ্চাশলাখ খরচ হবে। দেখা যাক কিছু কমল কিনা! যদি এই চেষ্টায় বিয়ে না করা যায়, তা হলে আর চেষ্টা নয়। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী যখন অবশ্যই একটা বংশধর নিতে হবে; তখন ক্লোন করে একটা বংশধর নিয়ে নিলেই হবে। আগে বংশধর নিয়ে এত কড়াকড়ি ছিল না। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে বহু লোক মারা যাওয়ার পর সরকার এই নিয়ম জারি করেছে। সন্তান নেওয়া, না-নেওয়াতেও মানুষের স্বাধীনতা নেই! কিন্তু ক্লোনিংয়ের খরচের বহর শুনে তো   চোখদুটো হয়ে গেল আইসক্রিম বল! এক কোটি টাকা লাগবে ক্লোনিং করাতে গেলে। ক্লোনিং-বেবির বয়স তিনমাস হলেই ক্লিনিক থেকে রিলিজ করে দেবে। তখন বেবিকে ক্রেশ’-এ রাখো নয়তো বাড়িতে গভর্নেসের হেফাজতে। এছাড়াও অনেক  হ্যাপা। আগে হিউম্যান রাইটস্ কমিশন থেকে ক্লোনিং-অর্ডার স্যাংশন করাতে হবে। ম্যারেজ কন্ট্রোল অফিসে গিয়ে মুচলেকা দিতে হবে, 'নিজের ক্লোনিং করাচ্ছি, ভবিষ্যতে বিয়ে করার সুযোগ এলেও বিয়ে করব না।' এসবের পর ক্লোনিং। 

  ক্লোনিং সেন্টারে কথা বলার সময় বি. কে. টেনের চোখদুটো ভেসে বেড়াচ্ছিল দেওয়ালে ঝোলানো সুন্দর সুন্দর ক্লোন-বেবির ছবিগুলোর দিকে। কী ফুটফুটে বাচ্চাগুলো! বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আদর করতে ইচ্ছে করছিল! রিসেপশনিস্টের সুন্দর মন-কেমন করা কথাতেও মনটা ক্রমশ ক্লোনিংয়ের দিকে ঝুঁকছিল। কিন্তু এত টাকা খরচ হবে একটা বংশধর আনার জন্যে!

নিজের ভবিষ্যতের কথাও তো ভাবতে হবে! পাঁচকোটি টাকা ডিপোজিট না করলে ভাল ওল্ড-এজ হোম পাওয়া যায় না। তা-ও আবার অ্যাডভান্স-বুকিং করতে হয়। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে, টাকাপয়সা পেয়ে বুক’ করব ভাবলে হবে না। সরকারি বৃদ্ধাবাসের চার্জ অবশ্য কম! কিন্তু তা পেতে অনেক টোব্যাকো পোড়াতে হয়! মন্ত্রী ধরো, আমলা ধরো, তলায় তলায় চ্যানেল করো। তারপর যদিও বা সরকারি বৃদ্ধাবাস মেলে, কিন্তু ওখানে থাকা আর সরকারি সংশোধনাগারে থাকা এক ব্যাপার! বুড়ো বয়সে একটু আরাম আর কে না চায়!

  আর একটা কারণেও ক্লোনিংয়ের ব্যাপারে বি. কে. টেনের আগ্রহ একটু কম। তাঁর দেহের উচ্চতা পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি। বাঙালির গড় উচ্চতা অনুপাতে বেঁটেই বলা যায়। তা ছাড়া নাকটাও একটু থ্যাবড়া। মঙ্গোলিয়ান ধাঁচের। এ নিয়ে বেশ মনোকষ্ট আছে। ক্লোনিং বেবি হলে, সেও একই মনোকষ্টে ভুগবে।

  রিসেপশনিস্ট কীভাবে মনের কথা বুঝতে পেরে বলেছিলেনবেঁটে লম্বা নিয়ে ভাববেন না স্যার! এসব মাইনর ব্যাপার! জিন-প্রযুক্তির বাজার এখন রমরমা। জিনের ডি.এন.এ. চেইন-এ সামান্য রদবদল ঘটালেই বেঁটে হয়ে যাবে লম্বা, বসা নাক হবে খাড়া। শুধু একটু বাড়তি খরচ হবে এই আর কী!

ক্লোনিং সেন্টার থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে বি. কে. টেন ভাবছিলেন, দেখা যাক সকালের বিজ্ঞাপন অনুযায়ী চেষ্টা করে। এটাই লাস্ট চান্স। হয় এবার নয় নেভার। বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়তে বিয়ে করার শখটা আবার মাথায় চেপে বসল। তা না হলে বেশ তো চলছে। শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য এখন শহরে অনেক পলিডল সেন্টার’ হয়েছে। আগে লুকিয়ে-চুরিয়ে দু’-একটা সেন্টার অবৈধভাবে চলত। এখন তো সরকার নিজেই উদ্যোগ নিয়ে পলিডল সেন্টার’ খোলার ঢালাও লাইসেন্স দিয়েছে। আসলে দিতে বাধ্য হয়েছে। সমকামিতা এখন শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ আইনটা পাশ হতেই ব্যাপকভাবে দু’নম্বরি সেন্টারের রমরমা। তা সামাল দিতেই...! এতে মধ্যবিত্তদের অনেক সুবিধা হয়েছে। বুক ফুলিয়ে রাবার-মেয়ের ঘরে ঢোকো। চার্জ দাও। এনজয় করো। ঠান্ডা হয়ে বেরিয়ে এসো।

  বি. কে. টেন অবশ্য ওসব আম-জনতার সেন্টারে যান না। একদিন টিভি-প্রোগ্রামে দেখেছিলেন, ওসব থেকে ডারমাটেক্সিয়া’ নামের এক স্কিন ডিজিজ হচ্ছে। তাই বি. কে. টেন থাইল্যান্ড থেকে একটা ইমপোর্টেড রাবার-ডল আনিয়ে নিয়েছেন। দারুণ জিনিসটা! একদম যেন রক্ত-মাংসের নারী! হালকা আলো জ্বালিয়ে ওটাকে কভার থেকে বের করে ওর দিকে তাকালেই শরীরে রক্তের ছোটাছুটি বেড়ে যায়।

বি. কে. টেন ভেবেছিলেন, এভাবেই আর কয়েক বছর কাটিয়ে দিলেই হয়। বিয়ে করার খরচ তো কম নয়! তবুও দেখা যাক, এ যাত্রায় বিয়েটা করে ফেলতে পারলে ক্লোনিংয়ের খরচ থেকে অব্যাহতি পাওয়া যেতে পারে। সমাজে সম্মানও বাড়ে। যাওয়া যাক কাপল প্লাজা। গাড়ি চলতে শুরু করেছিল স্যান্ড লেক সিটির দিকে।

 

তিন

টয়লেট কাম স্মোকিং জোন’ থেকে এসে বি. কে. টেন আবার লাইনে দাঁড়ান। সামনে মাত্র একজন। পেছনে একশোজন হবে বোধহয়!

কম্পিউটার থেকে বেরোনো মানি-রিসিট ও কয়েকটা সংখ্যা-সম্বলিত কাগজ নিয়ে বি. কে. নির্দেশ অনুযায়ী দশতলায় উঠে যান স্বয়ংক্রিয় লিফটে চড়ে। বাঁয়ে মোড় নিতেই ব্যাঙ্কোয়েট হল। সেখানে সারি দিয়ে গোটা পঞ্চাশেক কম্পিউটার বসে আছে টেবিলে। সেগুলোর বেশ কয়েকটা জ্যান্ত হয়ে নীলচে চোখে তাকিয়ে। সেগুলোর সামনে আগে-আসা প্রতিযোগীরা বসে গেছে। তিনিও কাগজে উল্লেখিত সংখ্যার কম্পিউটার সেট খুঁজে নিয়ে, চেয়ার টেনে তার সামনে বসে যান। সুইচ অন করতেই মনিটরে বুটিং শুরু হয়। বুটিং চলাকালীন মনিটরে ভেসে ওঠে একটা বাচ্চা মেয়ের ছবি। ছবির ক্যাপশন, 'মেয়েরাই জাতির ভবিষ্যৎ। বেশি করে ফিমেল ক্লোনিং বেবি করান। কন্যা-সন্তানের যত্ন নিয়ে সমাজ ও জাতিকে বাঁচান।'

  ক্যাপশন দেখে বি. কে.-র ঠোঁটে বিষাদের হাসি। এতদিনে টনক নড়ল! এই মিলেনিয়ামের শুরু থেকে যেভাবে কন্যা-ভ্রুণ হত্যা শুরু হয়েছিল, তখন কোনও কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়নি স্বার্থপর মানুষগুলো! তা হলে আজ এই অবস্থা হত না।

  মিস্টার টেন মাউস-ক্লিক করে জি-এল ফিফটি ফাইল খোলেন। ভেবেছিলেন, ফাইল খোলামাত্র জি-এল ফিফটির ছবি ফুটে উঠবে মনিটরে। কিন্তু না, মনিটরে ভেসে ওঠে ইংরেজি হেলভেটিকা ফন্ট-এ লেখা কয়েকটি কথা আপনার কাজটি কুড়ি মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন করুন। কারণ, কুড়ি মিনিট পরে কম্পিউটারটি আর আপনার তথ্য সংগ্রহ করবে না।

  এর পরেই রয়েছে পাত্রীর বিবরণ। তার মোটামুটি বাংলা তর্জমা এরকমআর. এল থার্টি সেভেনের একমাত্র কন্যা জি. এল. ফিফটি প্রথম বিবাহ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাঁর জন্ম তারিখ দোসরা মার্চ দু’হাজার কুড়ি খ্রিস্টাব্দ। কম্পিউটারে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট। ইন্দো-চিন কোলাবোরেশন স্পেস কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে চাকরি। দশ বছরের এগ্রিমেন্টের চাকরির তৃতীয় বছর চলছে। উচ্চতা পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। স্লিম ফিগার। রক্তের গ্রুপ এ’, আর-এইচ পজিটিভ। এইচ-আই-ভি ও এইডস্-মুক্ত সার্টিফিকেট আছে। কখনও গর্ভ ভাড়া দিয়ে ভাড়াটে-মা হননি। টেস্টটিউব বেবির জন্য ডিম্বকোষ বিক্রয় বা দান করেননি। বিজ্ঞানসম্মত সঙ্গমের অভিজ্ঞতা আছে। প্রিয় পুরুষের মুখে দাড়ি এবং ইন্ডিয়ান হুইস্কিতে এলার্জি।

বি.দ্র.  নেকুনেকু প্রেমের বাতিক মোটেই পছন্দ করেন না।

সত্যিই মিস জি. এল ফিফটি ওই সেকেলে প্রেম’ ব্যাপারটা একদম পছন্দ করে না। তা না হলে কবেই বিয়ে হয়ে যেত! বিয়ের জন্য এত কাণ্ড করতে হত নাকি! একবার তো প্রায় রাজি হয়ে শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে হল। ছেলেটা বেশ হ্যান্ডসাম, স্মার্ট। একই কনসার্নে চাকরি করে। কম্পিউটার এঞ্জিনিয়র। যদিও বয়স ও চাকরিতে জুনিয়র! ছেলেটার ফ্যামিলি-স্ট্যাটাস, ক্যারিয়ার সব কিছু বেশ ভাল লেগেছিল জি. এলের। নিজের ফ্ল্যাটেও ওকে নিয়ে এসেছে দু’একবার। বেডরুমেও নিয়ে গেছে। বেশ ভাল শারীরিক আনন্দও দিয়েছে ছেলেটা! তাই ওর সঙ্গেই বছর পাঁচেকের জন্য লিভ টুগেদার করবে ভেবেছিল জি.এল। একদিন অফিসে বসে কী-বোর্ডের বোতাম টিপতে টিপতে ছেলেটিকে বলেছিল এ.টি! আমি তোমার সঙ্গে লিভ টুগেদার করব ভাবছি। চটপট ডিসিশন নাও। তোমার ফ্ল্যাটে দু’জন থাকব? নাকি আমার ফ্ল্যাটে তুমি থাকবে?

  এ.টি. ওর দিকে অবাক চোখে তাকিয়েছিল কিছুক্ষণ। কী ন্যাকান্যাকা দৃষ্টি! জি.এলের একদম ভাল লাগেনি। আগেকার দিনের প্যানপ্যানানি সিনেমার নায়িকাকে দেখে নায়ককে ওইরকম তাকাতে দেখেছে। এ.টি কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে, জি. এলের দু’কাঁধে হাত রেখে কাঁপাকাঁপা গলায় বলেছিল, 'আই লাভ ইউ জি.এল, আই লাভ ইউ। তুমি যা বলবে তাই হবে।'

  ছিটকে সরে এসেছিল জি.এল। চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টি। পরক্ষণেই অবশ্য নিজেকে সামলে নিয়েছিল। ম্লান হেসে বলেছিল আমি যা বলব তাই করবে?

  হ্যাঁ মাই ডার্লিং!

  তা হলে শোনো! তুমি ইমিডিয়েট কোনও ভাল সাইকায়াট্রিস্টের কাছে একটু দেখিয়ে নাও। সো ফার মাই নলেজ ইজ  কনসার্নতোমার লাভেরিয়া হয়েছে। ইটস আ মেন্টাল ডিজিজ। আগে এ রোগের খুব প্রকোপ ছিল। বাট এখন...!

  এ ঘটনার পর থেকে এ.টি ফোর-কে এড়িয়ে চলত জি. এল। এ.টি তো মনের দুঃখে হাইকোর্ট থেকে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি নিয়ে আত্মহত্যা করে বসল। মৃত্যুর আগের দিন জি.এলের হাতে একটা সিডি দিয়ে বলেছিল অফিসে নয়, ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখো।

  ছেলেটি আত্মহত্যা করায় জি. এলের খারাপ লেগেছিল। চিকিৎসা করালে হয়তো মনের রোগটা...! কোর্টও তলিয়ে না দেখে পার্মিশন দিয়ে দিল! আসলে স্বেচ্ছামৃত্যু এখন আইনসম্মত। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বহু মানুষ পঙ্গু হয়ে যাওয়ায়, তার কষ্ট সইতে না পেরে স্বেচ্ছামৃত্যু আইনসম্মত করার জন্য আন্দোলন করল। সরকারও অনুমোদন করতে বাধ্য হল, তবে কোর্টের অনুমতি সাপেক্ষে।

  এর পর জি. এল. ফিফটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিয়ে কিংবা লিভ টুগেদার করতে হলে ভাল করে যাচাই করে নিয়ে তবে করবে। তাই এ ব্যবস্থা।

  পাত্রীর বিবরণ বি. কে. টেনকে দারুণ আগ্রহী করে তোলে। উনি আবার বিবরণে চোখ রাখেন প্রথম-বিবাহে ইচ্ছুক, অর্থাৎ কপাল ভাল হলে প্রথম-স্বামী হওয়া যাবে। এখন দু’হাজার পঁয়তাল্লিশ চলছে। তার মানে বয়স পঁচিশ। একদম ফাটাফাটি যৌবন! শিক্ষাগত যোগ্যতাটাও একদম যুগোপযোগী। তার ওপর চাকরি; মানে আর্থিক সহায়তা! হাইটটা একটু বেশি, নো প্রবলেম! বরং নেক্সট জেনারেশনের ডোয়ার্ফ’ হওয়ার চান্স কমবে। ফিগার স্লিম হোক আর বাল্ক হোক, বেটার দ্যান রাবার-ডল! আফটার অল রক্ত-মাংসের শরীর তো! ব্লাডগ্রুপ ম্যাচ করছে। এইডস্ ফেইডস্ নেই, বাঁচোয়া। স্যারোগেটেড মাদার হয়নি। দ্যাট মিনস্ ব্র্যান্ড নিউ। ইন্টারকোর্সের এক্সপিরিয়েন্স আছে। ওঃ! জমবে ভাল! আর দাড়ি রাখা, প্রেম করা, নিজেরও অপছন্দ! রুচির মিল হবে মনে হচ্ছে। ইস! ছবিটা দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব! কোন পেজে আছে কে জানে! হয়তো ফটোশপ খুললে পাওয়া যাবে। ঠিক আছে, পরেই দেখা যাবে। নেক্সট পেজে কী আছে দেখা যাকভেবে মাউস ক্লিক করেন বি. কে. টেন।

  এ-পাতায় টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন। বিবাহ সংক্রান্ত চুক্তি। এ বি. সি পয়েন্ট করে দেওয়া আছে। নথিভুক্ত আবেদনকারীদের বায়োডাটা বিচার করে মাত্র কুড়িজনকে ইন্টারভিউয়ে ডাকা হবে। ইন্টারভিউ নিয়ে দশজনকে মনোনীত করা হবে মেডিক্যাল চেক আপের জন্য। যাদের রিপোর্ট সন্তোষজনক, তাদের সঙ্গে পাত্রী মুখোমুখি বসবেন সেভেন স্টার হোটেলের কনফারেন্স রুমে।

  আলাপ-আলোচনা করে একজনকে পাত্র হিসেবে বেছে নেবেন। যিনি মনোনীত হবেন, তিনি সাতদিনের মধ্যে পাত্রীর বাবা আর এল. থার্টি সেভেনকে পঞ্চাশ লাখ টাকা দেবেন কশান ডিপোজিট হিসেবে। পরের মাসের এক তারিখ থেকে পাঁচবছরের জন্য জি. এল. কে স্ত্রী রূপে পাবেন। 

  মি. টেন টার্মস্ অ্যান্ড কন্ডিশন পড়ে আচমকা হেঁচকি তোলার মতো শব্দ করেন। আশেপাশের কয়েকজন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ওঁর দিকে। বি. কে-র চোখে চোখ পড়ে যায়। অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে আবার মনিটরে। চোখ এক জায়গায় থেমে থাকলেও মনের মাঝে চুক্তির কথাগুলো স্লো-মোশনের ছবির মতো ঘুরছে-ফিরছে। এতগুলো হার্ডল পেরোলে, তবে নিজস্ব একটা বউ পাওয়া যাবে! তা-ও আবার পাঁচ বছরের জন্য! অথচ সেদিন ইন্টারনেটে এনশিয়েন্ট সোসাইটির ফাইলে চোখ বুলোতে গিয়ে নজরে পড়ল মাত্র দেড়শো বছর আগে একজন পুরুষ নাকি দু’-তিনটে বিয়ে করতে পারত। অবৈধ স্ত্রীও নাকি থাকত দু’-একটা। সত্যি কী কপাল করে জন্মেছিল ওরা! 

  মন শক্ত করে বি. কে. আবার মনিটরে লেখাগুলো পড়তে শুরু করেনপাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনে কন্যা-সন্তানের জন্ম দিলে পঁচিশলাখ টাকা এবং পুত্র-সন্তানের জন্ম দিলে পনেরোলাখ টাকা স্ত্রী অর্থাৎ জি. এন. ফিফটির অ্যাকাউন্টে অবশ্যই জমা দেবে সন্তানের বাবা।    

  টেন মনে মনে হিসেব কষেন ওদিকে ডিপোজিট পঞ্চাশলাখ, সন্তানের জন্য ম্যাক্সিমাম পঁচিশলাখ! এদিকে বিয়ের জন্য টি-পার্টি লাখদশেক ধরা যাক। মোটামুটি পঁচাশিলাখ টাকা খরচ করলে, পাঁচবছরের জন্য একটা নিজস্ব বউ এবং একটা বংশধর পাওয়া যাবে। ক্লোনিংয়ের চেয়ে লাভজনক।

আগ্রহে মি. টেনের চোখ দৌড়োতে থাকেপাঁচবছর পেরিয়ে গেলে ওই স্ত্রীকে আরও পাঁচবছরের জন্য পেতে হলে স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে চুক্তিপত্র নবীকরণ করাতে হবে। সেক্ষেত্রে কশান-ডিপোজিট মানির পঞ্চাশ শতাংশ অফেরত যোগ্য হয়ে যাবে।

  টেন ভাবেনপঞ্চাশলাখ টাকা যাক ক্ষতি নেই, পাঁচবছর নিশ্চিন্ত। তবে এদের এই শর্তটা খুব ট্র্যাশি! পারমানেন্ট বউ না থাকলে...!

  এসব ভাবতে ভাবতেই পরের পয়েন্টে চোখ যায় কোনও বাধাবিপত্তি ছাড়া দশবছর এই দম্পতি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করলে এবং উভয়ের মত থাকলে, সারাজীবন দু’জনে একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রী হয়ে কাটাতে পারবে। তখন কশান-মানির পুরোটাই ফরফিট’ হয়ে যাবে।

  হাত ঘেমে উঠেছে। মাউস ভিজে যাচ্ছে। এই এক রোগ! টেনশন হলেই হাত ঘামতে থাকে। রুমাল বের করে হাত মুছতে মুছতে বি. কে আড়চোখে ডাইনে-বাঁয়ে তাকান। অন্যান্যদের ভাবগতিক বোঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুই বোঝা যায় না। যেন সবাই এক-একটা রোবোট! স্ট্যাটিক মোড’-এ আছে। ওদের ভেতরে হার্ডওয়্যারগুলো সবই হয়তো একরকম! কিন্তু ওদের ব্রেনের সফটওয়্যারগুলো বোধহয় আলাদা হবে! নাকি এই মুহূর্তে একরকম! খুব জানতে ইচ্ছে করছে। সকলেই নিশ্চয় চাইছে জি.এল. ফিফটি তার স্ত্রী হোক। কিন্তু তা সম্ভব নয়। একজন মহিলা একাধিক পুরুষকে বিয়ে করতে পারবে না, সেটা বেআইনি। তা ছাড়া এমন হলে, ওই মহিলার সন্তান কোন পুরুষের তা আবার ডি.এন.এ টেস্ট করে ঠিক করতে হবে!

  এসব ভাবতে ভাবতে মি. টেনের হঠাৎ মনে পড়ে যায় বহু বছর আগের একটা কথা। তখন বয়স খুব কম! ঠাকুরদা'  রিটায়ার্ড হয়েছেন। উনি সে-সময় মাঝে মাঝে একটা মোটা বই পড়তেন অদ্ভুত সুরে। কাগজের বই। তখন ই-বুকের অত রমরমা হয়নি। সে বইটা ছিল ছন্দে লেখা। তাতে ছিল, একজন মহিলা নাকি পাঁচজন পুরুষকে বিয়ে করেছিল। ইস! এখন যদি ওই ব্যবস্থা চালু থাকত তা হলে অনেক পুরুষ...!

  পরক্ষণেই মি. টেন নিজেই ওই ব্যবস্থাটা মনে মনে খারিজ করে দেন। ধুস্! বউ পাঁচজনের সঙ্গে ভাগাভাগিডিসগাস্টিং! বউ হবে একদম একার জন্য। ওসব চার-পাঁচজনে...? দেখা যাক এ মেয়েটাকে কোনওভাবে বিয়ে করতে পারলে, একটু তেল মেরে দশটা বছর পার করতেই হবে। তা হলেই কেল্লাফতে। স্ত্রী রত্ন একদম নিজের! সঙ্গে তার ব্যাঙ্ক-ব্যালান্স। সবাই তখন সমীহ করবে। ঈর্ষার চোখে তাকাবে। দেশে নারী-আকালের যুগে একটা পারমানেন্ট ওয়াইফ’ থাকা গর্বের ব্যাপার!

  নিজের বায়োডাটা নথিবদ্ধ করার জন্য বি. কে. টেনের মন আনচান করে ওঠে। কেরিয়ার নেহাত খারাপ নয়সরকারি চাকুরে। নিজের ফ্ল্যাট। নিউ-মডেলের গাড়ি। বাবা-মা সিনিয়র সিটিজেনের বয়সে পৌঁছতেই ওল্ড-এজ হোমে চলে গেছে। কোনও বার্ডেন’ নেই। অলরেডি মোটা অ্যামাউন্টের ব্যাঙ্ক-ব্যালান্স হয়েছে। একস্ট্রা কম্পিটেন্সিও আছেদু’-দুবার রোবো-রেস্টলিং-এ চ্যাম্পিয়ন। এখানে চ্যাম্পিয়ন একজনও নেই বোধহয়!

  কাউন্টার থেকে দেওয়া নম্বর অনুযায়ী ফাইল খোলেন মি. টেন। ওই ফাইলে নিজের সমস্ত তথ্য কম্পোজ করে দিতে হবে। মনিটরে চোখ ও মন একসঙ্গে নিবিষ্ট করতেই লেখাগুলো জানান দেয়নিম্নলিখিত যোগ্যতা থাকলে এই ফাইলের ফরম্যাট’ অনুযায়ী আপনার ডেটা’ দিয়ে দিন। সবশেষে লেজার-ক্যামেরার সুইচ অন করে, ফটোশপ খুলে আপনার ইনস্ট্যান্ট ফটো তুলে ফাইলে দিয়ে দিন।

  যোগ্যতার মাপকাঠিতে চোখ দৌড়োয়আবেদনকারীর বয়স ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে থাকতে হবে। টেন ভাবেন, তাঁর চল্লিশ চলছে। যাক, মার্জিন ছুঁয়ে বেরিয়ে আসা গেছে।

  পূর্ব-বিবাহিত কিংবা সন্তানের পিতা বিবেচিত হবে না।

  এখনও অবধি একটা বিয়েই করা গেল না, তো আবার সন্তানের পিতা!

  পরের পয়েন্ট বি. কে.-র মনে খুশির মাত্রা বাড়ায়আবেদনকারীর বার্ষিক উপার্জন কমপক্ষে পঁচাত্তরলাখ টাকা হতে হবে।

কবেই বাহাত্তর ছাড়িয়ে গেছে। সবই তো ম্যাচ’ করছে। টেনের উচ্ছ্বাস চোখে-মুখে ফুটে ওঠে। অধীর আগ্রহে পড়ে ফেলেন পরের লেখাগুলোপাত্র সুদর্শন হওয়া দরকার।

  বি. কে.-র মুখে চিন্তার রেখা। তাঁকে কি সুদর্শন বলা যায়? স্বাস্থ্যটা ভালই। রংটাও ফরসা। কিন্তু হাইটটা একটু কম! আর নাক বসা! হাইটটা কিছু করার নেই। কিন্তু নাকটার ব্যবস্থা করাই যেত! গতমাসে অফিস-কলিগ ডি.জি. ফোর বলেছিলবি. কে.! তোমার নাকটা সার্জারি করে খাড়া করে নাও না! বেশ হ্যান্ডস্যাম লাগবে! কী এমন খরচা হবে!

  তখন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এখন কাজে লেগে যেত। এর মধ্যে হয়তো করা সম্ভব হবে না! কিছুদিন সময় তো লাগবে সার্জারিতে। যাক গে! কী আর করা যাবে! সুন্দর ব্যাপারটা তো আপেক্ষিক! কার চোখে কাকে যে সুন্দর লাগে কে বলতে পারে! আগেকার দিনে প্রেম’ নামে কী একটা ব্যাপার স্যাপার ছিল! তখন নাকি অনেক সুন্দরী মেয়ে কুদর্শন ছেলের প্রেমে পড়ত! তার চোখে সে-ই যেন মিস্টার ইউনিভার্স! সেরকম কিছু একটা মিরাক্‌ল যদি এ ক্ষেত্রে হয়ে যায়! দেখা যাক না, প্রাইমারি সিলেকশনে থাকলে, তখন নাক নিয়ে ভাবা যাবে।

  একটু দমে গিয়ে পরের পয়েন্টে চলে আসেনএইচ-আই-ভি, এইডস ও ভেনার‍্যাল ডিজিজ থেকে মুক্তএই মর্মে সার্টিফিকেট থাকতে হবে।

  ঠিক আছে আগামীকালই এসব সার্টিফিকেট নিয়ে নেওয়া যাবে। কিছুদিন আগেই তো রেক্টাম-ক্যান্সারের ট্রিটমেন্ট করার সময় গোটা দেহটার সমস্ত রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়েছিল। কিন্তু ক্যান্সার সেরে যেতে সেসব রিপোর্ট কম্পিউটারের কোন ফাইলে আছে কে জানে! থাক, ওই ল্যাবে গিয়ে আবার কালেক্ট’ করে নিলেই হবে।

  পর্দায় পরের শর্তবেসরকারি চাকুরিজীবী অগ্রাধিকার পাবে।

  মি. টেন ভাবেন, হয়তো ভুল দেখছেন! আবার পড়েন ওই লাইনটানন-গভর্নমেন্ট এমপ্লয়ি ইজ প্রেফারেবল।

  বি.টেনের মনে এক অব্যক্ত যন্ত্রণা! এ ব্যাপারটা নিয়ে মনে একটা ডিবিলিটি ছিলই! সরকারি-সংস্থা বেসরকারিকরণ হতে হতে এখন তো তলানিতে ঠেকেছে! সবই পাঁচ কিংবা দশ বছরের চুক্তির চাকরি! তবুও যারা সরকারি চাকরি করে, তাদের বেতন কম নয়! চাকরির নিরাপত্তাও আছে; দশবছর পর যে আবার চাকরি খুঁজতে হবে এমন নয় তবুও...! বি. কে টেনের মনে ঘুরে বেড়ায় কিছুদিন আগে দ্য কান্ট্রি’ ই-ম্যাগাজিনের একটা আর্টিকেলের কথাগুলো। সরকারি কর্মচারীদের প্রতি সাধারণ মানুষের অবজ্ঞা ও অনীহার কারণ হিসাবে আলোচনায় ছিলপঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইউনিয়নভুক্ত কর্মীদের স্বেচ্ছাচারিতা ও কর্মবিমুখতার জন্য তখনকার মানুষ সরকারি চাকুরেদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নাকি ওয়ার্ক কালচার ফিরিয়ে আনার জন্য কড়া ফরমান জারি করেছিলেন। কিন্তু কোনও সুফল পাওয়া যায়নি। সরকারি কর্মীর সেই বদনাম আজও ঘুচল না! সরকারি কর্মী মানেই যেন সবাই ফাঁকিবাজ ও ঝান্ডাবাজ!

  এ ছাড়া আরও একটা কারণে সরকারি কর্মী পুরো পৃথিবীর মানুষের চোখে ছোট হয়ে গেছে। দু’হাজার বারো সালে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একদল সরকারি কর্মীর বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই নাকি কিউ.এস.এর অত্যাধুনিক অস্ত্রভাণ্ডারে বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব হয়েছিল এবং সে কারণে কিউ.এস.এ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল! তারপর থেকেই সরকারি কর্মী অনেকের ঘৃণার পাত্র।

  বি. কে. টেনের চোখে-মুখে হতাশা ফুটে ওঠে। সুযোগ পেয়েও বেসরকারি চাকরি নেওয়া হয়নি। সরকারি চাকরির নিরাপত্তা যে আজ বিয়ে করার পথের কাঁটা’ হবে কে জানত! এখন হুট করে বেসরকারি চাকরি পাওয়াও সম্ভব নয়।

  বি. কে. টেন উদাস চোখে বসে থাকেন কিছুক্ষণ। মনের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে এতক্ষণ ধরে মগজে ঢোকা বিষয়গুলো। হঠাৎ আশপাশে একটু চোখ ছড়ানোর কথা ভাবেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে উদয় হয়, হয়তো হতাশার ছাপ চোখে মুখে ফুটে উঠবে! অন্যের চোখে ধরা পড়বে। তাঁর অযোগ্যতা অন্যের আনন্দের খোরাক হবে! তবুও চোখকে লাগাম দিতে পারেন না। আড়চোখে কয়েকজনের দিকে দৃষ্টি ছুড়ে দেন। বিস্মিত হয়ে লক্ষ করেন ওদের মুখেও হতাশার ছাপ। বি. কে.-র মনে আশার সঞ্চার হয়, তা হলে এর মধ্যে অনেকেই আনফিট হতে পারে। এমনও হতে পারে বেসরকারি কর্মী যারা, তারা অন্য কিছুর জন্য রিজেক্ট হয়ে গেল! তখন তো...।

  বি. কে. মনিটরে তড়িঘড়ি চোখ রাখেন আশান্বিত হয়ে। সব শেষ পয়েন্টপ্রেম ভালবাসা জাতীয় কোনও মানসিক রোগ মোটেও বরদাস্ত করা হবে না। বিবাহ হয়ে যাওয়ার পর যদি এ জাতীয় রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়, তা হলে তৎক্ষণাৎ বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটানো হবে।

  মি. টেন বারকয়েক এই লাইনগুলো পড়েন। মনের মধ্যে কথাগুলো ঘুরপাক খায়পাঁচবছর স্বামী-স্ত্রী হয়ে ঘর-সংসার করতে হবে অথচ তার মধ্যে প্রেম-ভালবাসার কোনও প্রকাশ থাকবে না! কোনও দুর্বল মুহূর্তে প্রেম হয়ে গেলেও তা মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচিত হবে! কী অদ্ভুত! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কত পরিবর্তন যে হয়! মি. টেনের চোখ মনিটরে থাকলেও মন চলে গেছে অনেক দূরে। বছর পঁচিশেক আগে ঠাকুরদা'র মুখে শোনা একটা ঘটনা এখন মনের পর্দায়। 

  এক বিষণ্ন বিকেলে ঠাকুরদা' তাঁর বিয়ে করার মজাদার গল্প শোনাচ্ছিলেন সদ্য গোঁফ-গজানো নাতিকে। তাঁর বিয়ে হয়েছিল প্রেম করে। কলেজে পড়তে পড়তে প্রথম দেখাতেই প্রেম! তারপর কত চিঠি দেওয়া-নেওয়া। পার্কে বসে বাদাম খাওয়া। ঘাসের ডাঁটি চিবোতে চিবোতে, গায়ে গা ঠেকিয়ে লেকের জলে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকা। কখনও কথা বন্ধ, মান-অভিমান। তারপর মানভঞ্জন, মুচকি হাসি চোখের জল! 

  ঠাকুরদা'র সমস্ত কথা তখন কচি মাথায় ঢোকেনি। তবে, শুনতে বেশ ভাল লেগেছিল। ঠাকুরদা হাতে একটা লম্বা তালি মেরে হেসে বলেছিলেনএকদিন তো মেয়েটার বাবার কাছে ধরা পড়ে গেলাম; তারপর কী কাণ্ড! বাড়িতে অভিযোগ! বাবা ডেকে বললেন, শোনো! সামনের মাসে তোমার বিয়ে।  

  ঠাকুরদা' আমতা আমতা করে বলেছিলেন, 'বাবা! আমি...বিয়ে... মানে এখনও কোনও উপার্জন...!' 

  ঠাকুরদা'র বাবা গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, 'তোমার কথা আমার বোধগম্য হল না। তোমার উপার্জনের সঙ্গে বিবাহের কী সম্পর্ক! বরং প্রেমের সঙ্গে বিবাহের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। ছেলেবেলায় ন্যাংটা থাকতে, পোশাক পরার যখন প্রয়োজন হয়েছে, পরেছ! গোঁফ-দাড়ি গজালে কামানোর প্রয়োজনে তা-ও করেছ। ঠিক তেমনি বিবাহের বয়স হয়েছে, বিবাহ করবে। সবাই বিয়ের পরে প্রেম করে। তুমি প্রেম করেছ, তাই বিয়ে করবে।'

  না, মানে...।

  না কী! বিয়ে তোমার সামনের মাসেই। আমি চাই না প্রেমের মতো পবিত্র জিনিসের কোনও অমর্যাদা ঘটুক।  

  তারপর ঠাকুরদা'র বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। সানাই-নহবত, বাই-বাজনা। পালকি-বেহারা, গায়েহলুদ-আশীর্বাদ, বউভাত-ফুলশয্যা এসব মনকেমন করা স্বপ্নময় কথা! সব কিছু বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছিল না। ঠাকুরদা' বলতেন প্রেম হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বন্ধন, ইটের গাঁথুনির মধ্যে সিমেন্ট-বালির মশলার মতো। এ মশলা সারাজীবন একে ওপরকে জুড়ে রাখে। আবেগমাখা গলায় ঠাকুরদা' সে দিন আরও কত কিছু বলেছিলেন।  

  বি. কে. টেন ঠাকুরদা'র সেই কথাগুলোর জগতে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছেন। তাঁর মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি! বিষাদ নাকি যন্ত্রণা, নাকি সব কিছু মিলেমিশে এক অথই সাগর! যার তল খুঁজে পান না তিনি।

  হঠাৎ কম্পিউটার থেকে বিপ বিপ শব্দে বি. কে চমকে ওঠেন। কম্পিউটারের অটো-টাইমারের শব্দ। মনিটরের কোণে টাইম-ডিজিটে জানাচ্ছে কুড়ি মিনিট সময়সীমা পেরোতে আর এক মিনিট এগারো সেকেন্ড বাকি।    

  বি. কে. কিন্তু ডেটা লজ’ করার কোনও উৎসাহই পান না। শুধু ফ্যালফ্যালে চোখে তাকিয়ে থাকেন মনিটরের দিকে।

  এতক্ষণ কম্পিউটার অপারেট না করায় মনিটরের স্ক্রিন-সেভার কাজ করতে শুরু করেছে। মনিটরে দেখা যাচ্ছে সেই বাচ্চা মেয়েটার ছবি। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ডিগবাজি খেতে খেতে ছবিটা ক্রমশ কোন সুদূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আবার আসছে, মিলিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে সঙ্গে ছবির ক্যাপশনটা বিভিন্ন রঙে বদলে গেলেও লেখাটা ক্রমশ বড় হচ্ছেগ্রো মোর ফিমেল ক্লোনিং বেবি। চোখে মনিটরের দৃশ্য এবং কানে টাইমারের বিপ বিপ শব্দ বি. কে. টেনকে যেন ক্রমশ আচ্ছন্ন করে ফেলছে!

Share: