বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে শোকাতুর কিশোর বিপু শেষকৃত্য সেরে রাতে একাকী ঘুমানোর চেষ্টা করলে তার ঘরে নানা অশরীরী কাণ্ড ও শব্দ অনুভব করতে থাকে। বাবার স্নেহময় স্পর্শ ও গলার স্বর পাওয়ার পর ভয়ে সে মায়ের ঘরে আশ্রয় নেয়, কিন্তু সেখানেও সে ল্যাভেন্ডার পাউডারের পরিচিত গন্ধ ও বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। মৃত বাবা তাকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নপূরণ ও বড় দায়িত্ব পালনের কথা বললে বিপু ভয় ও বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। শেষপর্যন্ত শোক ও অতিপ্রাকৃতিক অনুভূতির রহস্যময় পরিবেশে বিপু অচেতনের মতো ঘুমিয়ে পড়ে।
উফ্! সারাটা দিন যা ধকল গেল! এত যে নিয়মকানুন আছে, জানা ছিল না। সেসব পালন করতে গিয়ে, আমার মনের নিদারুণ কষ্টটাও প্রকাশ করার সময় পাইনি। হয়তো মনের কষ্টটাকে কমানোর জন্যই প্রাচীনকালে জ্ঞানীগুণীজন এসব বিধিনিষেধ চালু করেছেন। সমস্ত কাজ মিটিয়ে, নিয়মবিধি পালন করে, আমি যখন মেঝেয় মাদুর পেতে টানটান হলাম, তখন রাত বারোটা।
ভেবেছিলাম, যা ক্লান্ত হয়েছি, আর মনের যা অবস্থা, বিছানায় শোওয়ামাত্র দু-চোখ জুড়ে ঘুম নামবে। শোওয়ার আগেই তো চোখ বুজে আসছিল। কিন্তু কোথায় ঘুম! শোওয়ার পর মনের মধ্যে হাজারো চিন্তা ভিড় করেছে। সেইসঙ্গে মনের মধ্যে চেপে রাখা দুঃখটা সময়-সুযোগ পেয়ে মাথাচাড়া দিয়েছে। গলার মধ্যে দলা পাকানো কান্নাটা এবার বেরিয়ে আসতে চাইছে।
এমনিতেই পড়াশোনার চাপে আমার ঘুম কম। রাতে সহজে আমার ঘুম আসে না! শোওয়ার পর, অল্পক্ষণের জন্য হলেও, বাবা আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, তবে আমার ঘুম আসে। এ অভ্যাসটা সেই ছেলেবেলা থেকেই। এতটা বড় হওয়া সত্ত্বেও বদ্-অভ্যাসটা...! ভাবি, এখন কী হবে? আর কখনও...। এ ভাবনায় আমার গলায় আটকে থাকা কান্নাটাও যেন লাগামছাড়া হয়ে যায়। আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠি।
এমন সময় আমার পিঠে এক হালকা ছোঁয়া পাই। কে আবার এল আমাকে সান্ত্বনা দিতে! ঘাড় ঘোরাই। কেউ তো নেই। আসবেই বা কী করে! দরজা তো বন্ধ করে শুয়েছি। তাহলে মনের ভুল। কোমরে গুঁজে রাখা পশমের আসনটা মাদুরের পাশে রেখে শুয়েছি। ওটাই হয় তো ফ্যানের হাওয়ার উড়ে...! নাঃ! পশমের সুড়সুড়ি তো নয়! এই যে আবার স্পর্শটা পাচ্ছি। নরম হাতের ছোঁয়া যেন! ঠান্ডা হিমহিম ছোঁয়া। তবে কি খাটের তলায় ডিকি শুয়েছিল! আমি শুতেই বেরিয়ে এসে গা শুঁকছে, জিভ দিয়ে পিঠ চাটছে! অসম্ভব। ডিকি তো গত রবিবার...।
মনেই থাকে না যে ডিকি আর নেই। কোন দুর্বুদ্ধিতে মেন রোডে গেল, আর লরির চাকার তলায়...। এত ভালোবাসতাম কুকুরটাকে। বাড়িতে যতক্ষণ থাকতাম, আমার কাছছাড়া হতো না। সুযোগ পেলেই গা চাটত! কখনও-সখনও সামনের পা তুলে মাথায় চুলের মধ্যে...! আরে! মাথায় চুলের মধ্যে বিলি কাটার মতো অনুভূতি হচ্ছে! ডিকির পা ঘষার মতো নয়, বাবা যেভাবে চুলে বিলি কেটে দিতেন, ঠিক সেরকম!
এবার আমি ভয় পেয়ে যাই। ধড়মড় করে উঠে বসি। নাকে আসে একটা বোটকা গন্ধ। ঠিক সে সময় মাথার কাছে জানলার ভেজানো পাল্লাটা ক্যাঁ-অ্যা-চ্ শব্দ তুলে খুলে যায়। জানলা দিয়ে ভেতরে আসে ঠান্ডা বাতাস। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে নাকি! বাতাস তো ঠান্ডা হওয়ার কথা নয়! আমি উঠে বসতেই অনুভব করি, আমার কাছে-পিঠে কেউ রয়েছে। আমি যেন শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। চারপাশে তাকাই। নাইট-ল্যাম্পের আলোয় হয়তো নজরে আসছে না। এবার আমি তড়াক করে উঠে দাঁড়াই। হাত বাড়িয়ে আলোর সুইচ্ টিপে দিই। ঘরময় আলো। কেউ কোথাও নেই। কিন্তু জানলার গোবরাটে ওটা কী? দুটো লালচে মার্বেল যেন!
ও! একটা কালো বেড়াল। তার চোখদুটো আগুনের ভাঁটার মতো ধক্ধক্ করছে। নিশ্চয় পাশের বাড়ির বামিপিসির পোষা বেড়ালটা। আমার চোখে চোখ পড়তেই নিঃশব্দে লাফ মেরে বারান্দায়। ওখান থেকে সিমসিম করে এগিয়ে পাঁচিলে ওঠে। পাঁচিল থেকে হঠাৎ অদৃশ্য।
আমি ভাবি, বেড়ালটার নিশ্বাস ছাড়ার শব্দ পাচ্ছিলাম বোধহয়! আর ওর গায়ের গন্ধটাও...। কিন্তু গন্ধটা যেন এখনও রয়েছে। আর একটা খসখস শব্দও পাচ্ছি যেন! তা ছাড়া মাথার চুলে বিলি কাটার ব্যাপারটাও ঠিক...। বেড়ালটা তো জানলার ওপাশে ছিল। ঘন গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢোকা সম্ভব নয়। তবে কি গ্রিলের ফাঁক দিয়ে চুলের মধ্যে...। ধ্যাত্! আমি তো মেঝেয় শুয়ে। নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। খসখস্ শব্দটা হয় তো পাঁচিলের ওপাশের বাগান থেকে আসছে। হাওয়ায় কলাপাতা দোলার শব্দ।
সচরাচর আমি ভয় পাই না। বিশেষত আমার ভূতের ভয় নেই। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। ভূত-টুত বিশ্বাস করি না। সবকিছু যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। তাই চুলে বিলি কাটার ব্যাপারটার যুক্তি ও কার্য-কারণ খুঁজতে থাকি। জানলার সামনে গিয়ে বারান্দায় চোখ ছুঁড়ি।
এমন সময় আমার পিঠের ওপর ঝপ্ করে কিছু একটা পড়ে। আমি আচমকা ভয় পেয়ে ‘আঁক্' করে চাপা শব্দ করে ফেলি। ঝট্ করে পেছন ফিরতেই দেখি, জানলার পরদাটা পিঠের ওপরে। পাল্লা বন্ধ করার সময় জানলার পেলমেটে পরদার প্রান্তটা চাপিয়ে রেখেছিলাম, আর নামানো হয়নি। ওটাই পেলমেট থেকে হড়কে গিয়ে পিঠে পড়েছে। আমি নিজেই নিজেকে ‘বুদ্ধুরাম’ বলি।
ঠিক তখুনি বাথরুমে জল ফেলার মতো একটা শব্দ হয়। কেউ যেন ট্যাপকল খুলেছে, কিংবা ইউরিনালে। বাথরুমের আলোর সুইচ্টা অন করি। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের আলো নিভে যায়। এমন কি নাইট-ল্যাম্পটাও। যাঃ বাবা! লোডশেডিং হল! নাকি শর্ট-সার্কিটে ফিউজ গেল?
সুইচবোর্ডের কাছ থেকে সরে আসতেই পায়ে নরম নরম কী একটা জড়িয়ে যায়। আতঁকে উঠি। হেঁট হয়ে হাত দিতেই হাতে ওঠে পশমের আসনখানা। ভয়ে আর রাগে আসনটা তালগোল পাকিয়ে সামনে ছুঁড়ে দিই। সঙ্গে-সঙ্গে কানে আসে বাথরুমের দরজাটা খোলার টিপিক্যাল কোঁ-ও শব্দটা।
এবার বাস্তবিকই আমি ভয় পেয়ে যাই। ওই পশমের আসন বাথরুমের দরজায় পড়লেও দরজাটা খুলে যাওয়া সম্ভব নয়। আমার স্পষ্ট মনে আছে, বাথরুমের দরজার ছিটকিনি দিয়ে শুয়েছিলাম। আচমকা বাথরুমের ভেতর জলের শব্দটাও বেড়ে যায়। এবার আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠি— মা...।
চিৎকার শুনে পাশের ঘর থেকে মা ছুটে আসেন— কী হয়েছে? কী হয়েছে বিপু?
ততক্ষণে অন্ধকারের মধ্যে দরজা খুলে কোনওক্রমে বাইরে এসেছি। মা-কে সামনে পেয়ে জড়িয়ে ধরেছি। মা আমাকে ধরে ঝাঁকাচ্ছেন, আর বলছেন— কী হয়েছে? চিৎকার করে উঠলি কেন? খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস্ বোধহয়!
আমি ততক্ষণে একটু ধাতস্থ হয়েছি। আমি বলি— না, স্বপ্ন নয়, সত্যি।
কী সত্যি?
আমার ঘরে কেউ ছিল।
মা বলেন— হ্যাঁ, ছিল তো! তুই শুতে যাওয়ার আগে ও ঘরে তোর কাকা আর মেসোমশাই বসে কথা বলছিল।
আমি মরীয়া হয়ে বলে উঠি— শুতে যাওয়ার আগে নয়, শোওয়ার পরে। তা ছাড়া আলোটা হঠাৎ নিভে গেল!
মা বলেন— আলো তো জ্বলছে তোর ঘরে!
তাকিয়ে দেখি, সত্যিই আলো জ্বলছে।
আমি বিড়বিড় করি— আলো কিন্তু নিভে গিয়েছিল, আমি ভুল বলছি না।
মা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন— বুঝেছি, তুই ভয় পেয়েছিস! চল আমার ঘরে শুবি চল। এসময় এমন হয়। এখনও পাঁচ প্রহর পেরোয়নি তো!
আমি মায়ের ঘরে যাই। মা-কে সমস্ত ঘটনা খুলে বলি। মা আমাকে বলেন— ও সবকিছু না। তোর কোনও ভয় নেই। তুই গলায় ঝোলানো লোহার চাবিটা যেন ভুলেও খুলিস্ না। আসলে, প্রিয় মানুষদেরকে কেউ চট্ করে ছেড়ে যেতে পারে না। শো, শুয়ে পড় আমার কাছে।
আমি মায়ের পাশে শুয়েছি। মা আমাকে জাপটে ধরে, আমার মাথায় চিবুক ছুঁয়ে ফুলে ফুলে কাঁদছেন। কাঁদছেন বলা ভুল, কান্নাটাকে আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। এবার আমি মা-কে সান্ত্বনা দিই। মায়ের চোখের জল মুছে দিই। কিন্তু কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাই না। এক সময় মা শান্ত হয়ে যান। তখন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন— ঘুমো বাবা! দুঃখ করিস না। বিধির বিধান কে খণ্ডন করবে বল! কিচ্ছু ভাবিস না। দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমার ঘুম না এলেও চুপটি করে শুয়ে থাকি, মা যাতে ঘুমিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যে আমারও চোখ এঁটে আসে। আধো ঘুম আধো জাগা অবস্থায় আমার মনের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় সারাদিনের কথা, আমার ঘরের আজগুবি ঘটনার কথা। বোধহয় এসব ভাবতে-ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
মাঝরাতে এক খসখস্ শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে দেখি, নাইটল্যাম্প জ্বলছে না। ঘরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। হাত বাড়িয়ে অনুভব করি, পাশেই মা গভীর ঘুমে। মায়ের শ্বাস-প্রশ্বাসের হালকা শব্দ পাচ্ছি। কিন্তু একটা খসখস্ শব্দ হচ্ছেই। আমি কান পাতি, কোথা থেকে শব্দটা আসছে বোঝার চেষ্টা করি।
নাহ্! আর তো শব্দটা পাচ্ছি না। শুধু উচ্চিংড়ের একটানা কিরিকিরি ডাক, আর বাইরের কোথাও বেড়ালের কান্নার শব্দ। আচমকা ঘরের পাশেই কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক শুনে চমকে উঠি। ডিকি তো নেই। বোধহয় রাস্তার কুকুর। ঘেউ ঘেউ শব্দে মা-ও নড়চেড়ে পাশ ফেরেন। কিন্তু মায়ের ঘুম ভাঙে না। আমিও জাগাই না মা-কে। খবরটা পেয়ে মা কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। এখন ঘুমোচ্ছেন, ঘুমোন।
আমিও ঘুমোনোর চেষ্টা করি। এমন সময় আমার নাকে আসে একটা মিষ্টি গন্ধ। ঝট্ করে আমার মাথায় আসে— ক্লোরোফর্মের হালকা গন্ধ নয় তো! ডিটেকটিভ গল্পে পড়েছি, ক্লোরোফর্মের হালকা গন্ধ মিষ্টি লাগে। বাইরে চোর-ডাকাত আসেনি তো! জানলার ফাঁক দিয়ে ক্লোরোফর্ম-ভেজানো তুলো ছুঁড়ে দিয়ে, আমাদের অজ্ঞান করে দিয়ে...। না, গন্ধটা আমার খুব চেনা।
ল্যাভেন্ডার ডিও পাউডারের গন্ধ এটা। বাবার খুব পছন্দের ট্যলকাম পাউডার। রোজ অফিস যাওয়ার আগে, আর শোওয়ার আগে বাবা এ পাউডার মাখেন। কিন্তু বাবা তো....।
এবার আমার মনে কেমন এক ভয়ের সঞ্চার হয়। আমি ঘুমন্ত মা-কে জড়িয়ে ধরি। মা-ও ঘুমের ঘোরে আমার পিঠের ওপর দিয়ে একটা হাত ছড়িয়ে দেন। আমি জোর করে চোখ বুজে থাকি। হঠাৎ আবার আমার মাথায় কারুর হাতের স্পর্শ অনুভব করি। আমার চুলে বিলি কেটে দেওয়ার মতো লাগছে। ভাবি, মা বোধহয় জেগে গেছেন। আমাকে নড়াচড়া করতে দেখে, চুলে আঙুল চালিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছেন। আমি আস্তে করে আমার মাথায় হাত ছোঁয়াই। নাঃ! কোনও হাতে তো হাত ঠেকল না! অথচ...। হাত বাড়িয়ে বুঝতে পারি, মায়ের একটা হাত বালিশের মতো করে মায়ের মাথার তলায়। এ অবস্থায় বালিশ নিয়ে শুতে নেই, তাই...। আর অন্য হাতখানা আগের মতো আমার গায়ের ওপর। তাহলে...!
এমন সময় পাউডারের গন্ধটা আরও তীব্র হয়। কারুর ফিসফিসানি শুনতে পাই। বাইরে কেউ? নাকি ঘরের ভেতর? ঘরেই হবে। ফিসফিসানি খুব স্পষ্ট— বিপু! ঘুমো বাবা! ঘুমিয়ে পড়। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
তাহলে মা বলছে নিশ্চয়! আমি চট্ করে মায়ের মুখের হাত রাখি। মা মুখ ঘুরিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়েন। অর্থাৎ মা ঘুমের জগতে। তাহলে ফিসফিস কথাটা কার? বাবার গলা মনে হচ্ছে। বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে রোজ এ-কথাটাই তো বলেন। কিন্তু বাবা বলবেন কী করে! আজ সন্ধেবেলাতেই তো বাবার দেহটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল!
আমি ভয়ে শক্ত হয়ে গেছি। গায়ের রোম, মাথার চুল খাড়া হয়ে গেছে। তাহলে কি বাবার আত্মা...!
ফিসফিসানিটা বেশ স্পষ্ট এবার— বিপু! ভয় পাচ্ছিস্ কেন রে তুই! আমি তোর বাবা। ভয় কীসের! আমি সর্বক্ষণ তোর পাশে পাশেই রয়েছি। আমি ছাড়া কি তোর চলে! এখন তোর যে দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল বাবা!
স্পষ্ট বুঝতে পারছি এটা বাবার কণ্ঠস্বর। অথচ বাবা আজ অফিস যাওয়ার পথে মোটরবাইক অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন। স্কুল থেকে কাকা আমাকে নিয়ে হাসপাতালে গেলেন। তারপর থানা-পুলিশ, মর্গ, পোস্টমর্টেম। বডি নিয়ে বাড়িতে ফেরা, তারপর শ্মশানঘাট, দাহ-কাজ। বাবা ধোঁয়া হয়ে আকাশে মিলিয়ে গেলেন। পড়ে রইল নাভিকুণ্ড, আর একমুঠো ছাই।
অথচ বাবা কানের কাছে বলে চলেছেন— বিপু! আমার স্বপ্ন তোকে পূরণ করতেই হবে। এইচ. এস আর জয়েন্ট-টা ভালো করে দে। কম্পিউটার-ইঞ্জিনীয়ার তোকে যে হতেই হবে বাবা!
ওই চাপা কন্ঠস্বরে আমি ক্রমশ সম্মোহিত হয়ে পড়ছি যেন! ভয়ে চিৎকার করতেও ভুলে গেছি। ধাক্কা দিয়ে মা-কে জাগাব, সে শক্তিটাও নেই। আমার মাথার চুলে বিলি কাটা চলছেই। সেইসঙ্গে ওই অলৌকিক কন্ঠস্বর। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই, নাকি ঘুমিয়ে পড়ি, জানি না।