শহর থেকে রনি ও টনি তাদের গ্রামের বাড়ি বেড়াতে এসে তপু ও গপুর সঙ্গে ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে বাজি ধরে। একদিন ঝড়ের বিকেলে আম কুড়োতে গিয়ে তারা বাগানের কুঁড়েঘরে অসুস্থ পাহারাদার বিপিনকাকাকে দেখতে পায়, যিনি অতিপ্রাকৃতভাবে তাদের থলে আমে ভরে দিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। বাড়ি ফিরে তারা জানতে পারে যে বিপিনকাকা সকালেই হাসপাতালে মারা গেছেন, যা টনিসহ সকলকে স্তব্ধ করে দেয় এবং পরোক্ষভাবে ভূতের অস্তিত্বের বাজিটি অমীমাংসিত এক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
'প্রিয় তপু ও গপু, কলকাতা থেকে রনি লিখছি। আশা করি তোরা ভাল আছিস! তোদের অ্যানুয়াল পরীক্ষা নিশ্চয়ই শেষ হয়ে গেছে এতদিনে। আমার পরীক্ষা কমপ্লিট। নিশ্চয়ই জানিস, টনিদা' এবার মাধ্যমিক দিল। কাল ওয়ার্ক এডুকেশন পরীক্ষা হয়ে গেলেই ও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে।
আমরা আগামী রবিবার সকালের গাড়িতে তোদের কাছে, মানে, আমাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাব। এক সপ্তাহ থাকব। তারপর আমাদের সঙ্গে তোরা এখানে, মানে, কলকাতায় বেড়াতে আসবি। এমনই কথা ছিল, মনে আছে তো! টনিদা' বলেছে, গত বছর নাকি ভূত দেখাবি বলে দেখাতে পারিসনি! এবার ভূত-পেতনিগুলোকে সেজেগুজে তৈরি থাকতে বলিস্। এবার তেনারা দেখা না দিলে জানব ওঁরা নেই। তোরা বাজি হেরে যাবি। বাজির কথা মনে আছে তো! নাকি ভুলে মেরে দিয়েছিস?
ভাল কথা, দিনুদাকে নিয়ে তোরা যেন অবশ্যই স্টেশনে থাকিস। আমাদের সঙ্গে অনেক জিনিসপত্তর থাকবে।
কাকা-কাকিমাকে প্রণাম জানাস। আর আমার নাম করে, পয়সা দিয়ে, নিতাইকাকার দোকান থেকে দু'জনে দুটো চকোলেট খেয়ে নিস্।
—ইতি
রনি
গোপন চিঠিটা হাতে পেয়ে এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলে। ওর মনে খুশির হাওয়া। সকলের আগে দাদাকে চিঠির কথা জানাতে হবে। কালই দাদা বলছিল ওদের কথা। গতবছর দারুণ মজা হয়েছিল নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে। কাঁকড়ার তাড়া খেয়ে রনির কাদায় আছাড় খাওয়া। মৌমাছির চাকে ঢিল মেরে টনির নাক শাঁক-আলু হয়ে যাওয়া। এসব কথা উঠতে সকলে হেসে লুটোপুটি। দাদা বলছিল, ‘এবার ওদের বোকা বানিয়ে, নাস্তানাবুদ করেই ছাড়ব।’
কিন্তু দাদা কোথায়? নিশ্চয়ই আমবাগানে গিয়ে বসে আছে!
গোপন এক ছুটে আমবাগানে। যা ভেবেছে ঠিক তাই! কুঁড়েঘরের পাশে বাঁশের চটানে বিপিনকাকা আর দাদা বসে আছে। বিপিনকাকা গলা ছেড়ে সেই ‘খাচাঁর ভিতর অচিন পাখি' গানটা গাইছে। এ গানটাই রোজ গায় বিপিনকাকা। তবু কী ভাল যে লাগে এ গান শুনতে! কাকা বলে, এ লালন ফকিরের গান। আলমপুরের এক ফকিরের কাছে শিখেছে। দাদা আধখানা ব্লেড দিয়ে এক মনে কচি আমের খোসা ছাড়াচ্ছে।
গোপন চট্ করে পকেটে হাত দিয়ে দেখে নেয় ওর আধখানা ব্লেডটা ঠিকঠাক আছে কি না। কাল অনেক কাণ্ড করে দাদার কাছ থেকে ব্লেডটা বাগিয়েছে। দাদা তক্কে-তক্কে ছিল। ছোটকাকু দাড়ি কামানোর পর বাতিল ব্লেড কখন ফেলেন! তারপর বহু কষ্টে দু'ভাইয়ে ভাগাভাগি। অন্য পকেটে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে নস্যির ডিবের ঢাকনা খুলে গিয়ে, কালকের মতো নুন-লঙ্কা গুঁড়ো পকেটে পড়ে গেছে কি না! ঠাকুরদা'র নস্যির ডিবে। অনেক পুরোনো। ঢাকনির প্যাঁচ কাটা। দাদু মারা যাওয়ার পর কাঠের আলমারির কোণে পড়েছিল ডিবেটা। মায়ের কাছে ঘ্যানর-ঘ্যানর ক'রে কাল ওটা হাতিয়েছে নুন-লঙ্কা গুঁড়ো রাখার জন্য। আধখানা ব্লেড আর এই ডিবে থাকার জন্য বন্ধুদের কাছে যে ওর কদর বাড়বে, সে ব্যাপারে ও নিশ্চিত।
গোপন কী ভেবে চুপিচুপি দাদার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। শুকনো বটপাতার উপর খোসা ছাড়ানো কচি আম। গোপু টুক্ করে এক টুকরো আম নিয়ে মুখে পুরে দেয়। তপু খপ্ করে ওর কান ধরে— অ্যাই, নিলি কেন? কত কষ্ট করে ছাড়াচ্ছি।
আঃ! লাগছে, কান ছাড়। একটা ভাল খবর দোব। তাই পুরস্কারটা আগেই নিলাম।
কী খবর রে?
গোপন চিঠিখানা দাদার চোখের সামনে মেলে ধরে। তপন চিঠি পড়ে বাঁশের চটান থেকে লাফিয়ে নামে— দারুণ খবর এনেছিস! আমার সোনাভাই! নে, আম খা। জানিস, টনিদা খুব সাহস দেখায়। এবার আসুক না! জমিদারদিঘির জঙ্গলে গিয়ে ওদের ছেড়ে পালিয়ে যাব। বাছাধন টের পাবে। ভূতে অবিশ্বাস!’’
পকেট থেকে নুন-ঝালের ডিবে বের করে গোপু— এই নে দাদা নুন-লঙ্কা গুঁড়ো। কাল পদ্মপিসিকে পটিয়ে-পাটিয়ে গুঁড়িয়ে নিয়েছি।
মনের আনন্দে দু'জনে কচ্মচ্ করে খেতে থাকে নুন-ঝাল দিয়ে কাঁচা আম। তপু চাকুম্ চুকুম্ শব্দ করে মুখে— উঃ! খুব ঝাল! লঙ্কা বেশি হয়ে গেছে। মা’কে দেখিয়েছিস চিঠিটা?
না। পিয়নকাকু চিঠিখানা আমার হাতে দিতেই পড়ে নিয়ে সোজা তোর কাছে। কী টক রে আমগুলো! ল্যাংড়া বোধহয়! দাঁত আমলিয়ে যাবে!
হ্যাঁ, ল্যাংড়া। কাঁচায় খুব টক!
বিপিনকাকার গান থেমে গেছে। দু’ভাইয়ের কথায় কান ওর— কিসের খপর গো কানাই-বলাই?
জ্যাঠার ছেলেরা এখানে আসছে। সাতদিন পর আমরাও ওদের সঙ্গে কলকাতা যাব। সেই যে রনি-টনিদা, মনে আছে?
হ্যাঁ-হ্যাঁ। সেই যে ভূত-পেরেত, জিন-পরি-আজরাইন বিশ্বেস করে না, লম্বা-রোগা সাহেবরঙা ছেলেটা তো! ওঃ, ওদের নিয়ে কত কাণ্ড!
ঠিক ধরেছ!
ভাল, ভাল। ক'দিন হৈ-হুল্লোড় হবে আর কি! ইশকুল খুলতে দেরি আচে তো!
হ্যাঁ, রেজাল্ট বেরোবে, তারপর...! যাই কাকা! মা'কে চিঠির ব্যাপারটা জানাই।
তপু-গপু গুটিগুটি এগোয় বাড়ির দিকে। গাছের ডালে বসে একটা কোকিল কু-কু করে ডাকছে। দু'জনে কোকিলের স্বর নকল করতে-করতে হাত ধরে হাঁটতে থাকে। কোকিলটা ডেকে চলে প্রাণপণে।
দুই
রবিবার। তপু, গোপু ও দিনুদা' স্টেশনে এসে বসে আছে। কলকাতা থেকে আসার প্রথম গাড়ি ঢুকবে দশটায়। তবুও ওরা ন'টায় এসেছে। ট্রেনের সময় হতে একজন রেলকর্মী ঢং-ঢং করে ঘন্টা বাজায়। টিকিট কাটার ঘন্টা। ঢং-ঢং-ঢং, তিনটে শব্দ করে টিকিট-ঘন্টি থামলেও তপু-গোপুর মনে ঘন্টা বেজেই চলে নিঃশব্দে। আর-একটু পরেই ওরা এসে যাবে। কতদিন পর দেখা হবে, কথা হবে! গাড়িটা লেট করছে খুব!
ওই যে দেখা যাচ্ছে গাড়িটা। এখনও অনেকটা দূরে। এখনও গাড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবুও তপু-গোপু যেন শুনতে পাচ্ছে গাড়ির ঝিক্-ঝিক্। নাকি নিজের বুকের ধুকপুক্! কে জানে!
দিনুদা' বলে ওঠে— দ্যাক, এ গাড়িতে আবার আসচে কি না! এটায় না এলে আবার ডেড়ঘন্টা।
দিনুদা'র কথায় তপু-গোপু অসন্তুষ্ট হয়। মুখে কিছু বলে না! তবে ওদের মনের মাঝে বাজতে-থাকা একতারাটার সুর কেটে যায়।
গাড়ির সামনের দিকেই ওরা ছিল। জ্যাঠামশাই আসেননি। জেঠিমাকে প্রণাম করার পর তপন-গোপন, টনি-রনিকে জড়িয়ে ধরে। টনি বলে— অ্যাই, আমাকে প্রণাম করলি না! আমি তোদের চেয়ে বড় না! গুরুজনদের প্রণাম করতে হয়!
তপন বলে ওঠে— তুই গুরু নয়, লঘুজন হবি আমার চেয়ে। আমি পঞ্চাশ কেজি। তোর ওজন চল্লিশও হবে না মনে হয়। তা হলে কে গুরুজন?
সবাই হো-হো করে হেসে ওঠে তপুর কথায়। দিনুদা' ইতিমধ্যে ব্যাগট্যাগ কাঁধে তুলে নিয়েছে। সে বলে— চলো বউমা।
জেঠিমা বলেন— হ্যাঁ, চলো দিনুদা! তুমি তো একই রকম আছ গো দিনুদা! মোটেই বুড়ো হওনি!
বুড়ো কী করে হব বলো তো! কেউ তো আমাকে কাকা-জ্যাঠা বা দাদু বলে না! কত্তাবাবু, মা, ছেলে, সকলেরই ‘দিনুদা' আমি। তাই... হেঁ-হেঁ-হেঁ। চলো বউমা, হেঁটেই চলো। এক দণ্ডের পত, তাই গাড়ি আনিনি।
বাড়ির পথে যেতে-যেতে কত রকমের গল্প। বাগানের আমগাছগুলোতে আম ধরেছে কি না, বাগানের পাহারাদার সেই বিপিনকাকা কেমন আছে, সে অন্য গান শিখেছে, নাকি এখনও শুধু ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি‘ গায়। এমন হাজারো প্রশ্ন।
তপু-গোপু উত্তর দেওয়ার ফাঁকে-ফাঁকে জেনে নেয়, গত বছর বিড়লা মিউজিয়ামে একটা ডাইনোসর তৈরি হচ্ছিল, সেটা হয়ে গেছে কি না, কথা বলা রোবোট সেই ‘খগেনবাবু' একাই আছে নাকি আর-একটা এসেছে?
এভাবে একে অপরের কৌতূহল মেটাতে-মেটাতে ওরা বাড়ির কাছাকাছি। টনি বলে— কী রে তপু! চিঠিতে আগাম খবর দিয়েছিলাম তোদের ভূতটুতগুলোকে রেডি থাকার জন্য। এবার ভূত দেখাবি তো? সেই যে বলিস, মাছ খেয়ে নেয়, লালপাড় শাড়ি পরে বসে থাকে! ওদের সঙ্গে এবার মোলকাত করিয়ে দিস। তা না হলে মনে আছে তো বাজি ধরার কথা!
তপুর মিনমিনে গলা— কপালে থাকলে নিশ্চয়ই দেখতে পাবি। ওসব শখ করে কাউকে দেখানো যায় না। তোকে আগেও বলেছি, ওদের নিয়ে মজা করিস না। কী হতে কী হয়! ওদের গতিবিধি সর্বত্র।
রনি-টনি হেসে ওঠে— তাই নাকি! তোদের বাড়িতেও আসে তা হলে! তবে তো নিশ্চয়ই দেখা হয়ে যাবে। বাড়ি তো এসেই গেলাম।
তিন
নদীর ধারে গাঙশালিখের ছানা খুঁজতে যাওয়া। পুকুরে সাঁতার শিখতে গিয়ে রনির একপেট জল খেয়ে নেওয়া। ঢিল ছুড়ে আম পাড়তে গিয়ে ছোটকাকুর কাছে কানমলা খাওয়া। এসব নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে তিনটে দিন কেটে যায়। এর মধ্যে আমবাগানেই কেটেছে বেশি সময়। বিপিনকাকার কাছে ওর ছেলেবেলার ভূতের গল্প শোনা, তার সঙ্গে ওর সেই খাঁচা-পাখির গান তো আছেই। আজ ঠিক হয়েছে, বিকেলে যাবে জমিদারদিঘির জঙ্গলে। কিন্তু দুপুরেই আকাশ কালো করে মেঘ জমেছে। মা বললেন— আজ কালবোশেখি হবে মনে হচ্ছে। এ বছরের প্রথম ঝড়। আজ তোরা কোথাও বেরোস্ না!
রনি আকাশের দিকে তাকায়— বাব্বা! একেবারে অন্ধকার হয়ে এল যে! কী রে গোপু! ভুতুড়ে ব্যাপার নাকি?
টনি কাঁধ ঝাঁকায়— ছাড় তো! ভূত না হাতি! তিনদিন হয়ে গেল ভূতের দেখা নেই। তপু-গপু, এরকম আঁধার-ঘেরা পরিবেশে একজন কাউকে ভূত সাজিয়ে দেখা অন্তত! নিজেদের সম্মানটা বাঁচা!
গোপুর ফিসফিসে গলা— দ্যাখ, ওসব নিয়ে মজা করিস না টনিদা'! কখন যে ওরা দেওয়ালে কান পেতে রাখে...!
একটু পরেই শনশন্ করে হাওয়া বইতে থাকে। গাছপালাগুলোতে লাগে দোলা। তপু-গোপুর মন চঞ্চল হয়ে ওঠে আমবাগানে যাওয়ার জন্য। ঝড়ে আম পড়বে। সঙ্গে-সঙ্গে না কুড়োলে অন্য ছেলেরা কুড়িয়ে নেবে। বিপিনকাকা একা কি সব কুড়োতে পারবে? বেশিরভাগ সময়ই তো ওকে বাগানের পশ্চিম দিকটায় পাহারা দিতে হয়।
মায়ের কাছে বাগানে যাওয়ার আরজি পেশ করা হয়। কিন্তু আরজি না-মঞ্জুর। ঝড়ের সময় বাগানে যাওয়া নিষেধ। কিন্তু তেমন ঝড় ওঠেনি। জোরে হাওয়া বইছে মাত্র। এই হাওয়াতেই তো কচি আমগুলো টুপটাপ্ পড়ে! ঝড় ওঠার আগেই ওরা বাগান থেকে ফিরে আসবে, এই অঙ্গীকার করে ওরা মা-জেঠিমাকে নিমরাজি করায়।
চারজনে চারটে থলে হাতে নিয়ে ছুট্ লাগায় বাগানের দিকে। মা হাঁক পাড়েন— তাড়াতাড়ি চলে আসবি। আর যদি বৃষ্টি নামে, বিপিনের কুঁড়েঘরে থাকবি। ভিজিসনে যেন! ঠান্ডা লাগবে।
মায়ের কথাগুলো ওদের কানে যাওয়ার আগেই ওরা বাগানে পৌঁছে গেছে। বেশ অন্ধকার বাগানটা। যেন সন্ধে নেমে গেছে। শোঁ-শোঁ, কটকট্ শব্দ। থোকা-থোকা আম-ওয়ালা ডালগুলো খুব জোরে-জোরে দুলছে। নারকোল গাছগুলো এমন দুলছে যেন ভেঙে পড়বে! এত ধুলো উড়ছে যে, ভাল করে চোখ মেলা যাচ্ছে না। তার মধ্যেই ওরা আম কুড়োচ্ছে। চিৎকার করে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। তা না হলে শুনতে পাচ্ছে না। বেশ কিছু আম কুড়িয়েছে। এমন সময় চড়বড়িয়ে বৃষ্টি নামে। মোটা-মোটা ফোঁটা। গোপু বলে— দাদা, বিষ্টি নামছে, বাড়ি চল।
দাড়াঁ না! থলে ভর্তি হয়নি এখনও। তা ছাড়া বিপিনকাকার সঙ্গেও তো দেখা হল না। সকালে গেলাম নদীর ধারে! চল, কুঁড়েতে ঢুকি গিয়ে! বৃষ্টি থামলে বাড়ি যাব।
বাঁশের চটানের পাশেই তালপাতা-ছাওয়া কুঁড়েঘর। চেরা বাঁশের তৈরি আগড়টা খোলাই ছিল। কিন্তু ভেতরে বিপিনকাকা নেই। নিশ্চয়ই ওই পশ্চিম দিকটায় গেছে কাকা! বাগদিপাড়ার ছেলেগুলো যা উৎপাত করে!
কুঁড়ের ভিতরটা আরও বেশি অন্ধকার। মাঝে-সাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তার আলোয় ওরা চোখ বুজে ফেলছে। কারণ, তার পরেই কান-ফাটানো মেঘের ডাক শোনা যাবে। গোপুর মনে ভয়। ও বলে— চল না দাদা, বাড়ি চলে যাই। মা চিন্তা করবেন।
টনির গলা— কী রে গোপুচন্দ্র! ভয় পাচ্ছিস নাকি! ভূতের ভয়! আমি আছি না! তোদের ভূত এখন আসবে না। শহরের ছেলেদের ভূত ভীষণ ভয় পায়।
এমন সময় বিপিনকাকা আসে। পরনে একটা লুঙ্গি আর ছেঁড়া গেঞ্জি। ভিজে-টিজে এক্শা। চোখ-মুখ ঢুকে গেছে কোটরে। কেমন যেন দেখতে লাগছে কাকাকে। কিন্তু যখন চটানে বসে গান গায়, তখন কত সুন্দর লাগে!
কাকা ওদের দেখে বলে— তোমরা এই ঝড়ের মধ্যে বাগানে এসেছ কেন? আমি তো আছি। যাও, শিগগির বাড়ি চলে যাও। তোমার বাবা জানতে পারলে আমাকে বকবেন, তোমাদেরও...! এ ঝড় মোটেই ভাল নয়!
দাঁড়াও না কাকা। আর ক'টা আম কুড়িয়ে নিই। এখনও ঝোলা ভরেনি।
নাও, ঝোলা পাতো দিকিনি!— ব'লে বিপিনকাকা কুঁড়ের ভিতরে এক কোণ থেকে এক ঝুড়ি আমি নিয়ে আসে। ওরা এতক্ষণ কুঁড়ের ভিতর থাকলেও আমের ঝুড়ি চোখে পড়েনি। বিপিনকাকা ঝুড়ির আম ঢেলে সকলের ঝোলা ভর্তি করে দেয়।
তারপর গম্ভীর গলায় বলে— এবার যাও। আর-এক মিনিটও দাঁড়াবে না। বিপদে পড়বে। শিগগির বাড়ি চলে যাও সব্বাই!
তপু-গোপু অদ্ভুত চোখে তাকায় বিপিনকাকার দিকে। ওর এরকম গলার স্বর কখনও শোনেনি! এত মিষ্টি ব্যবহারের কাকা যেন একটু অন্য রকম! গলায় আদেশের সুর! চোখ দুটো যেন ধক-ধক করে জ্বলছে!
গোপু বলে— চলো টনিদা', আমাদের থলে তো ভরে গেছে!
চল্। কাকিমা চিন্তা করবেন বলছিস্। বৃষ্টিতে কিন্তু পুরো ভিজে যাব।
চার
ওরা বাড়ি পৌঁছেছে। দ্যাখে, উঠোনে তালপাতার ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিপিনকাকার বড় ছেলে অমল। ও উঠোনে দাঁড়িয়ে মা'কে বলছে— কর্তামা, বাবার কাল রাত থেকে আন্তিরিক হয়েচে। বাবাকে সকালেই হাসপাতালে নিয়ে গেয়েছে কাকারা। আমুও গেইছিলাম। বাবা বলল, বাগানে যেন দিনুদা'কে পাটায়। তা নইলে সব আম শেষ করে দেবে ছেলের দল। আর বাবা বলেচে কিচু টাকা দিতে। ওষুড-বিষুদ কিনতে হয় যদি!
টনি ব্যাপারটা শুনে-বুঝে বলে ওঠে— অ্যাই চোপ্। ঢপ্ মারার আর জায়গা পাও না! কিছু টাকা গ্যাঁড়ানোর ধান্দা! এখনই বাগানে বিপিনকাকাকে দেখে এলাম! আর বলে কিনা সকাল থেকে হাসপাতালে...! যা, ভাগ!
অমল হতভম্ব। ওর মুখ কাচুমাচু। চোখে জলও চলে আসে বুঝি!
টনি! তুমি থামো। ও মিছে কথা বলে না। আমি দেখছি। তোমরা ভিজে জামা-প্যান্ট পালটাতে যাও! —মা গম্ভীর গলায় বললেন।
টনি নিজের মনে গজগজ করতে থাকে— আমি কি তবে মিছে কথা বলছি। আমি নিজের চোখে...তা ছাড়া তপু-গোপুও তো...!
তপু বলে — কী বুঝলি টনিদা'?
কী আবার বুঝব! আমি মিথ্যেবাদী হয়ে গেলাম, আর...!
অমল মিছে কথা বলে টাকা নিতে আসেনি। ওরা খুব বিশ্বস্ত! বাগানে যাকে দেখলাম ওটা আসলে...!
ভূত, তাই তো! যত্তসব! চল, বাগানে আমার সঙ্গে। তোদের ভূতকে ধরে নিয়ে আসি তা হলে! কাকিমা...!
কাকিমা ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন— এই নে অমল! আমার কাছে মাত্র দু'শো টাকা ছিল। তোর কর্তাবাবু তো বাড়িতে নেই! বাবা কেমন থাকে সন্ধেবেলায় খবর দিয়ে যাস্। সাবধানে যাবি!
পাঁচ
কিছুক্ষণ পড় ঝড়বৃষ্টি থামে। আকাশের ঘন মেঘ কোথায় উধাও! ঝকঝকে নীল আকাশ। ঝিকমিকিয়ে রোদ উঠেছে। টনি যেন এরই অপেক্ষায় ছিল। ও বলে ওঠে— তপু! বৃষ্টি থেমে গেছে। চল, এবার বাগানে। বিপিনকাকাকে ডেকে নিয়ে আসি।
তপুর মন সায় দেয় না বাগানে যেতে। ও ইতস্তত করে। ওর মনে ভেসে ওঠে বাগানে দেখা বিপিনকাকার কথাগুলো। কী গম্ভীর ও কর্কশ! আর চোখদুটো...!
টনি রেগে ওঠে— তোরা গাঁয়ের ছেলেরা না খুব ডরপুক্। সাহস বলতে কিসসু নেই। ভূত-ভূত করেই হেদিয়ে গেলি।
তপু সামনের বছর মাধ্যমিক দেবে। ওর নাকের নীচে কালো রেখা। গলার স্বর ভেঙেছে। এখন ও যুবক হওয়ার পথে। তাকে কিনা এমন কথা বলে মাত্র দেড় বছরের বড় টনিদা'! ওর মনের মধ্যে কেমন-কেমন হচ্ছে। ও বলে— চল। তোর তো সাহস আছে! তোরা শহরের ছেলে কিনা! আমরা গাঁয়ের ছেলে, একটু ভিতুই হই।
টনি-রনি ও তপু-গোপু আবার বাগানের দিকে। বাগানের সুঁড়িপথটায় কাদা হয়ে গেছে। তার উপর উড়ে পড়েছে শুকনো পাতা। চারদিকে কেমন এক সোঁদা-সোঁদা গন্ধ! গাছপালা, ঝোপঝাড়গুলো এখন কেমন শান্ত! পাতা থেকে জল ঝরছে টুপটাপ্। ভিজে পাতায় পড়েছে বিকেলের রোদ। কী সুন্দর যে লাগছে! এইমাত্র ওরা যেন চান করে উঠে রোদ পোয়াচ্ছে! গাছগাছালিতে পাখপাখালি ভিজে ডানা ঝাড়ছে আর নানান সুরে ডেকে যাচ্ছে। ওরা এগোচ্ছে বাগানের ভিতর দিয়ে। ওদের গায়ে ভেজা-হাওয়ার ঠান্ডা পরশ। টনি সকলের আগে। পিছনে অন্যরা।
কুঁড়েঘরটার কাছাকাছি গিয়ে ওরা চমকে ওঠে। আমগাছের বিশাল এক ডাল ভেঙে পড়েছে কুঁড়েঘরটার উপর। বাঁশের চটান, কুঁড়েঘর একেবারে পিষে গেছে! ওদের চোখ তো ছানাবড়া, মুখ থেকে কথা সরে না কারও। টনিও কেমন হতভম্ব হয়ে যায়! রনি বলে— দাদা! আমরা যদি কুঁড়েঘরটায় থাকতাম, তা হলে কী হত বল্ তো!
তপু বলে— কী রে টনিদা! থামলি কেন? এগো!
গোপুর ভেজা গলা— দাদা, বাড়ি ফিরে চল্!
টনি সাহস দেখিয়ে বলে— বিপিনকাকা ওই ঘরের ভিতর চাপা পড়ে যায়নি তো! চল তো দেখি!
ডাল-পাতার খোঁচা বাঁচিয়ে ওরা সাবধানে এগোয় গাছের ডাল চাপা-পড়ে ঘরটার কাছে। তালপাতার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় ঘরের সেই আমের খালি ঝুড়িটা থেঁতলে গেছে। আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
তবে কি বিপিনকাকা ডাল ভেঙে পড়ার আগেই ঘর থেকে সটকান দিয়েছে! তাই যদি হয়, তা হলে এখন তো এখানেই থাকার কথা!
একটা পাখি হঠাৎ বিকট শব্দে ওঠে। সে ডাক ওদের বুক কাঁপায়। একে অন্যের মুখের দিকে তাকায়। এমন সময় ওরা শুনতে পায়, বহু দূরে কে যেন গাইছে, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়...।'
টনি বলে— বিপিনকাকার গলা না?
তপু বলে— বিপিনকাকার গলা এমন হতেই পারে না!
তবে?
বাড়ি চল সবাই। এখানে আর একমিনিটও নয়!
বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে দ্যাখে, বিপিনকাকার ছেলে অমল হাপুস্ চোখে কাঁদতে-কাঁদতে বেরিয়ে যাচ্ছে। তপু বলে— কী রে অমল! কী হয়েছে?
অমল কোনও কথা বলে না। একবার টনির মুখের দিকে তাকিয়ে চলে যায়। বাড়িতে ঢুকে দ্যাখে, মা, জেঠিমা, এমনকী দিনুদা'ও বারান্দায় বসে কাঁদছে।
কী গো, কী হয়েছে মা?
কী হয়েছে কাকিমা? কাঁদছ কেন তোমরা?
ওরা বারান্দায় উঠে দ্যাখে, মেঝেতে দুটো একশো টাকার নোট ভাঁজ হয়ে পড়ে। তার পাশেই বিপিনকাকার সব সময়ের সঙ্গী সেই লাঠিটা।
মা বললেন— জানিস, তোদের বিপিনকাকা আর নেই! ওর ভাইরা হাসপাতাল থেকে দেহ নিয়ে এসেছে। হাসপাতালে পৌঁছনোর ঘন্টাখানেক পরেই মারা গেছে!
তপু-গোপুর গলায় আক্ষেপের স্বর। চোখে জল। রনি-টনির মনটাও বিষণ্ন। এ ক'দিন বিপিনকাকার কাছে কত গল্প শুনেছে! ছেলেবেলার দস্যিপনার গল্প, ভূতের গল্প! সত্যি-সত্যি সেই বিপিনকাকা আর নেই! তা হলে যে থলেয় আম ভরে দিল, সে কে? তবে কি...!
টনি হিসেব মেলাতে পারে না। ভাবে, তা হলে তপু-গোপুই কি বাজি জিতে গেল! নাকি এ বাজিতে শুধু তপু-গোপু নয়, চারজনই জিতে গেল বাজিটা। বিপিনকাকা জিতিয়ে দিল সব্বাইকে।