কেমন নিঝঝুম হয়ে আছে গ্রামখানা। ব্রাহ্মণী নদীর ওপারে জোড়া তালগাছের ফাঁকে অস্তগামী চাঁদটার চোখেও যেন ঘুম ধরেছে। অথবা সারারাত ধরে জ্যোৎস্না বিলিয়ে যেন সে নিঃস্ব এখন; তাই ম্রিয়মাণ। গ্রামটির অজস্র গাছগাছালিকে আর তেমন রুপোলি আলো মাখাতে পারছে না সে। ফিনফিনে বাতাস বইছে। সে বাতাসে হিমজড়ানো। গাছপালাগুলো যেন শীতের ভয়ে হালকা কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়েছে। ছাইরঙা খড়ো চালের মেটে ঘরগুলোও কেমন জবুথবু। ঘষা কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখলে যেমন লাগে, তেমন অস্পষ্ট অবয়ব ধরা পড়ে শুধু।
‘করিতেছি অনুভব সে অনন্তপ্রাণ
অঙ্গে অঙ্গে আমারে করেছে মহীয়ান।
সেই যুগযুগান্তের বিরাট স্পন্দন,
আমার নাড়ীতে আজি করিছে নর্তন।’
— রবীন্দ্রনাথ
কেমন নিঝঝুম হয়ে আছে গ্রামখানা। ব্রাহ্মণী নদীর ওপারে জোড়া তালগাছের ফাঁকে অস্তগামী চাঁদটার চোখেও যেন ঘুম ধরেছে। অথবা সারারাত ধরে জ্যোৎস্না বিলিয়ে যেন সে নিঃস্ব এখন; তাই ম্রিয়মাণ। গ্রামটির অজস্র গাছগাছালিকে আর তেমন রুপোলি আলো মাখাতে পারছে না সে। ফিনফিনে বাতাস বইছে। সে বাতাসে হিমজড়ানো। গাছপালাগুলো যেন শীতের ভয়ে হালকা কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়েছে। ছাইরঙা খড়ো চালের মেটে ঘরগুলোও কেমন জবুথবু। ঘষা কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখলে যেমন লাগে, তেমন অস্পষ্ট অবয়ব ধরা পড়ে শুধু।
মরা জ্যোৎস্না মেখে একটা পেঁচা মাঠের দিক থেকে উড়তে উড়তে গিয়ে বসল মাঠের ধারের বাড়িটার খড়ের চালে। কিছুক্ষণ বসে থেকে কেমন তীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে উঠল রাতচরা পাখিটা। নিঝঝুম নিটোল রাতটাকে ফালাফালা করে দিল। তারপর উড়ান দিল কোন অজানায়। তার দুই ডানায় কিছুটা নিস্তব্ধতা চুরি করে নিয়ে গেল। সেই সঙ্গে খড়ো চালের ঘুমন্ত বাড়িটাকেও যেন জাগিয়ে দিয়ে গেল।
বাড়িটা ঘুমিয়ে থাকলেও বাড়ির ভেতর একজনের চোখে ঘুম নেই। সে লতা। লতা হালদার। বয়স সতেরো। শ্যামলা বরন, ডাগরচোখি, রোগা রোগা গড়নের বউটা। ওর পাশের মানুষটা ঘুমিয়ে থাকলেও লতা বেশ কিছুক্ষণ ধরেই উসখুস করছে বিছানায়। গা থেকে কাঁথাটাকেও সরিয়ে দিয়েছে। খুব আনচান করছে ওর শরীর। এপাশ ওপাশ করছে; কিন্তু উঠে বসছে না। পাশের মানুষটার দিকে অসহায় দৃষ্টি ছুঁড়েছে একবার। তার কোনও নড়নচড়ন নেই। অঘোরে ঘুমোচ্ছে কাঁথামুড়ি দিয়ে।
কয়েক দিন হল কার্তিকমাস পেরিয়েছে। হালকা ঠাণ্ডা পড়েছে। অথচ লতার গা ঘামছে। গায়ের ব্লাউজ স্যাঁতসেতে হয়ে গেছে। সায়াটাও কেমন যেন ভিজে ভিজে! তবে সেটা ঘামে নয়; তাহলে নিশ্চয়...! ও পাশ ফিরে বেশ কষ্টেই উঠে বসে বিছানায়। তলপেট টনটন করে ওঠে। মশারি তুলে হাত বাড়িয়ে কুলুঙ্গিতে রাখা টেমির আলোটা উস্কে দেয়। যা ভেবেছে তাই, সায়ার অনেকখানি ভেজা। আস্তে আস্তে তলপেটের ব্যথাটাও চারিয়ে যায় সারা শরীরে। তাহলে কি আজকেই...! মানুষটাকে জাগানো দরকার। জাগাবে বলে ওর গায়ে হাত ঠেকিয়েও সরিয়ে নেয় হাত। দিন-সাতেক আগের ঘটনা মনে পড়ে যায়। আবার যদি তেমন হয়! সেদিন খুব রেগে গিয়েছিল মানুষটা।
দূরে কোথাও শেয়াল ডেকে ওঠে। নিশ্চয় শেয়াল-ডহরের জঙ্গলে। লতা ভাবে, শেয়াল যখন ডেকে উঠল, তখন নিশ্চয় রাতের শেষ প্রহর। আর কিছুক্ষণ পরেই আকাশ ফরসা হয়ে যাবে। ব্যথাটাও হঠাৎ কেমন জিরিয়ে গেল। থাক, ওকে এখন আর ডেকে কাজ নেই; সারাদিন যা খাটুনি ওর! আর একটু ঘুমোক। খানিক পরেই তো উঠে পড়বে।
পাশের মানুষটা নড়েচড়ে ওঠে, পাশ ফেরে। লতা কী মনে করে হাত বাড়িয়ে টেমির আলোটা কমিয়ে দেয়। ভারী পেটটা নিয়ে বড় কষ্টে আস্তে আস্তে আবার শুয়ে পড়ে। একটু পরেই অনুভব করে, ব্যথাটা যেন আবার ফিরে আসছে। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে ব্যথাটাকে ও সইয়ে নিতে থাকে।
কাক ডাকল যেন! কান পাতে লতা। হ্যাঁ, কাকেরই ডাক। তাহলে ভোর হয়ে এসেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে ও বন্ধ জানলার দিকে তাকায়। জানলা বন্ধ থাকলেও গরমকালে ফাঁকফোকর দিয়ে আলো আসে ভোরবেলায়। কিন্তু শীতকালে যতক্ষণ না সকাল হয়...।
ওই তো নড়াচড়া করছে ও। এবার উঠবে বোধহয়! উঠলেই কি ওকে বলবে ব্যথা ওঠার কথা! না থাক, ও ভোর ভোর উঠে ‘মাঠে বসতে’ যায়। ফিরে এলেই না হয়...। এমন ভেবে লতা দাঁতে দাঁত চেপে পাশ ফিরে শুয়ে থাকে।
কিছুক্ষণ নড়াচড়া করে, গা থেকে কাঁথা সরিয়ে উঠে বসে জগন। আড়মোড়া ভাঙে। পাশে শুয়ে থাকা বউয়ের দিকে ঘুম লেপ্টে থাকা চোখে তাকায়। ঢাকা-চাপা ছাড়াই লতা কাত হয়ে পড়ে রয়েছে। পেটটা যেন একটা ভাদুরে কুমড়ো। নিশ্চয় জেগেই রয়েছে। এতক্ষণ লতা উসখুস করছিল, সেটা ও টের পেয়েছে আধঘুম আধজাগা অবস্থায়। লতার গায়ে কাঁথাটা চাপিয়ে দিয়ে মশারি তুলে বিছানা থেকে নেমে আসে জগন।
টেমির পলতে উস্কে একটা বিড়ি ধরায়। তারপর গায়ে একখানা খদ্দরের চাদর চড়িয়ে বাইরে আসে। যাওয়ার আগে ইচ্ছাকৃত কাশির শব্দ করে। দরজাটা ভেজিয়ে দেয়। দাওয়া থেকে উঠোনে নামার আগে একবার চোখ ছোঁড়ে দাওয়ার কোণে। সেখানে উনুনের পাশে মাদুরে-কম্বলে জড়সড় হয়ে ঘুমোচ্ছে ওর মা, ক্ষান্তমণি। উনুনের ওপাশে কালো খেঁকিটা শুয়ে। সে একবার মাথা তুলে আবার কুণ্ডলী পাকায়। তার পেটের কাছে গোটা তিনেক ছেলেপুলে কুঁই কুঁই করে ওঠে।
জগন যথারীতি শেয়াল-ডহরের দিকে এগোয় শিশির-ভেজা ঘাস মাড়িয়ে। রোজ প্রাতঃকৃত্য সারতে যায় ওখানে। যেতে যেতে ভাবে, লতার শরীরের ভাবগতিক আজ ভাল ঠেকছে না। বিছানায় ‘তনছিট্’ করছিল। কেমন যেন ‘অসোয়াস্তি’! তবুও ভালমন্দ কিছু জিজ্ঞেস করেনি, দিন-সাতেক আগের ঘটনা মনে উদয় হতে। সেদিন যা নাকাল হতে হয়েছে। তবে, একবার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, ভাবে জগন। ফিরে এসে না হয়...। তেমন হলে লতা নিজেই তো বলত।
প্রাতঃকৃত্য সারা হতে না হতে সমস্ত পাখি জেগে উঠেছে। তাদের কলকলানি শুনতে শুনতে জগন গলা-পুকুর পাড়ের ছোট নিমগাছ থেকে হাত বাড়িয়ে ভেঙে নিয়েছে সরু নিমডাল। ডাল চিবোতে চিবোতে যখন পুকুরপাড় থেকে রাস্তায় নেমেছে, পুব আকাশে আঁতুড়ে সূর্য তখনও যেন পুরোপুরি ক্লেদমুক্ত হয়নি! কিন্তু গ্রামখানা আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে। মাঠে চাষীদের আর পুকুরঘাটে বউ-ঝিদের দেখা যাচ্ছে। আর দূরে পাকা রাস্তার ওপাশে আকাশের গায়ে দেখা যাচ্ছে টিমটিমে একটা লাল আলো। একটু চোখ ঠাহর করলে দেখা যায় লাল আলোর নিচে ফিন্ফিনে কুয়াশার চাদরে ঢাকা বিশাল বিশাল কপিকল। গাঁয়ের লোকে অবিশ্যি ওগুলোকে বলে যন্ত্রদানব।
এখন জগনের চোখ যেত না ওদিকে। কিন্তু ও যখন বাহ্যে ফিরতে বসেছিল, তখন অনুভব করেছিল মাটির হালকা কাঁপন। একটু পরে পরেই কেঁপে উঠছে মাটি, ভরভরন্ত পোয়াতির তলপেট কেঁপে ওঠার মতো। জগন জানে কেন এই মাটির কাঁপন!
কাল মোড়লগাঁ থেকে ফেরার সময় দেখেছে বিশাল উঁচু লোহার একটা খাঁচা। তার মাথায় একটা লাল আলো জ্বলছে। সেই খাঁচার চুড়ো থেকে মোটা লোহার তার ঝুলছে একগাছা। সে তারের ডগায় বাঁধা খুব ভারী একটা লোহার হন্দর। একটা ঘুরতে থাকা যন্ত্র তারটা গোটাচ্ছে, আর হন্দরটা খাঁচার শিবডগালে উঠে যাচ্ছে। তারপর ঘটাং করে একটা শব্দ হতেই তিরবেগে সেই ভারী হন্দর এসে পড়ছে মোটা শালবল্লার মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে মাটি কেঁপে উঠছে। শালবল্লাটা মাটির বুকে গেঁথে যাচ্ছে একটু একটু করে। বেশ দেখার মতো জিনিস! ও সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে দেখেছিল কিছুক্ষণ। আশপাশে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকা লোকজনের মুখে শুনেছিল, ওখানে নাকি কারখানা তৈরি হবে। বিশাল কারখানা। কেউ বলছে গাড়ির কারখানা। কেউ বলছে, না না জাহাজ কারখানা হবে। কেউ আবার বলছে, না না তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। তবে সকলের মুখেই এক কথা, কারখানাটা বিশাল বড় হবে। অনেক লোকের চাকরি হবে ওই কারখানায়। আশেপাশে অনেক দোকান পসরা হবে। ‘গাঁ-গেরাম’ আর থাকবে না। শহর হয়ে যাবে। একজন বেশ রসিয়ে বলল, মাটির পেটের মধ্যে শিল্প ঢুকে আচে তো! ওটাকে বের করার লেগে মাটির পেট ফুটো কচ্চে শালখুঁটি দিয়ে।
লোকটার কথা শুনে ধক করে উঠেছিল জগনের মনটা। তার বউয়ের পেটেও একখানা ‘ছেলে’ ঢুকে আছে! সেটাকে বের করতে হলে লতার পেট ওই রকম ফুটো করতে হবে নাকি! পরক্ষণেই আপনমনে হেসে উঠেছিল, ধুর! আংসাং ভাবনা আসছে কেন মাথার মধ্যে! কোথায় মাটির পেটে কারখানা আর কোথায় বউয়ের পেটে তার ছানা; দুটো কি এক জিনিস হল! এ-সব ভাবতে ভাবতে জগন ঝপাং করে সাইকেলে উঠে পড়েছিল বারদুয়েক এক পায়ে লাফিয়ে।
কালকের সেই কাঁপন আর এই কাঁপন একই। তার মানে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই শুরু হয়েছে সেই কারখানা তৈরি করার কাজ। নাকি সারাটা রাতই মাটির বুক এমন কেঁপে কেঁপে উঠেছে, কে জানে! এ-সব কথা ভাবতে ভাবতে জগন বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছে।
পায়ে পায়ে এগোতে এগোতে জগন মনে মনে সাজিয়ে নিতে থাকে সারাদিনের কাজ-কারবার। আজ হল গিয়ে সোমবার। মামুদপুর হয়ে আলমগাঁয়ে যাওয়ার দিন। ও গ্রাম দুটোতে বেলোয়াড়ি চুড়ি, পুঁতির মালা আর কানের ঝোলা-দুল বেশি বিকোয়। সামনে ঈদুজ্জোহা। খুশির পরব, মিলনের পরব। বাজারটা ভালই যাবে মনে হয়। তাই মহাজনের কাছে তিনশো টাকা দিয়ে সাতশো টাকার মাল তুলেছে। রাতেই সব গোছগাছ করে রেখেছে টিনের বা’টার মধ্যে। কাচ-লাগানো আংটির বা’তে লাল-নীল-সবুজ ঝুটো পাথর বসানো আংটিগুলো তুলোর ফাঁকে পর পর সাজিয়ে রেখেছে। আংটিতে লাভ বেশি। লালগুলো পলার আংটি, আর সবুজগুলো দেশি পান্না বলে বিক্রি হয়। ভাগ্য ফেরানোর জন্য অনেকেই রঙিন পাথরের আংটি পরে আজকাল। যার কাছে যতটা পারা যায় বেশি দাম নেওয়া হয়।
প্রথম প্রথম ও বেশি দাম চাইতে পারত না। বিবেকে বাধত, এ তো লোককে ঠকানো! অন্যান্য ফেরিওলাদের দেখে এবং তাদের চাপে এখন ও চোখ বুজে বেশি দাম হাঁকে। মনকে বোঝায়, চুরি তো আর করছে না! ব্যবসা তো লাভ করার জন্যই। জিনিসপত্রের যা দাম বাড়ছে, কম আয়ে সংসার চালানো মুশকিল। তাছাড়া খাটুনিও কম নয়! রোদ, বৃষ্টি মাথায় করে সাইকেলে গাঁয়ের পর গাঁ ঘোরা।
সাইকেলটার পেছনে খরচও কি কম! আজ টায়ার, কাল টিউব, পরশু চেন, একটা না একটা লেগেই আছে। রাস্তার যা ছিরি! শুধু ইটের টুকরোতে ভর্তি; মোরাম বা পিচের বালাই নেই। পেছনের টায়ারটা তো এক জায়গায় কেটেছে। বেশি হাওয়া দেওয়া যায় না, কখন ফটাস হয়ে যায়! কখন কী হয় না হয় ভেবে, একটা হ্যান্ড-পাম্পারও কিনেছে এই সেদিন। রাতেই সাইকেলের চাকায় সেটা দিয়ে হাওয়া ভরে ঠিকঠাক করে রেখেছে, যাতে সকালে বেরোতে দেরি না হয়।
জগনের পায়ে রোজকার ব্যস্ততা! ও এসে বাড়ির সামনে কলতলার ধারে দাঁড়িয়ে দাঁতন করছে। বারোয়ারি কল, তাই সাতসকালেই মেয়ে-মদ্দর ভিড়। তখন সূর্যের সবে চোখ ফুটেছে। সে চোখের দৃষ্টি অস্বচ্ছ।
জগন ভোরবেলায় শব্দ করে দরজা খুলতেই দাওয়ায় উনুন ধারে শুয়ে থাকা ক্ষান্তমণির ঘুম ভেঙেছে। এমনিতেই ওর ঘুম কম। একে তো বয়স হয়েছে; তার ওপর অসুস্থ; সারারাত খঙর খঙর কাশি। ঘুম ভাঙতে শীতটা যেন আরও বেশি লাগছে। উনুনের তাপটা মোটামুটি মাঝরাত্তির অবধি থাকে। তারপর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ঘুম ভেঙে যেতে ছেঁড়াখোড়া কম্বল আরও এঁটেসেঁটে জড়িয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে ক্ষান্তমণি। মনে হাজারো চিন্তার ওড়াউড়ি। এমন সময় ওর কানে আসে মৃদু গোঙানির শব্দ। খুব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে যেন কেউ! শব্দটা মনে হচ্ছে ঘরের ভেতর থেকেই আসছে। তবে কি বউমার ব্যথা উঠেছে! বড়কষ্টে ক্ষান্তমণি ওঠে। দরজার কাছে গিয়ে কান পাতে। হ্যাঁ, বউমারই কাতর গলা। দরজায় ঠেলা দিতেই খুলে যায়। টেমির আলোয় ক্ষান্তমণির অভিজ্ঞ চোখ বুঝতে পারে লতার প্রসব-যন্ত্রণা উঠেছে। ও পায়ে পায়ে এগিয়ে লতার কাছে গিয়ে বসে। গায়ে মাথায় হাত বুলোয়, আর ছেলের ফেরার অপেক্ষায় দরজায় চোখ রাখে।
এর মধ্যে সূর্যর দৃষ্টি অনেকখানি স্বচ্ছ হয়েছে। তবুও এখনও কল খালি পায় না জগন। অগত্যা পাশে মাটির ঢিবিতে উবু হয়ে বসে দাঁতে নিমডাল ঘষতেই থাকে। ভাবে, সরকারি কল হলেও কলটা কিন্তু তার জায়গাতেই। পুরো পাড়াটার জন্য একখানা টিউবওয়েল স্যাংশন হল অঞ্চল অফিস থেকে। কিন্তু কোথায় বসানো হবে! সকলেই চায় কলটা যেন তার বাড়ির কাছাকাছি বসানো হয়। কিন্তু নিজের জায়গা কেউ দিতে রাজি নয়। শেষে জগন বলেছিল, আমার জায়গাতেই তাইলে বসানো হোক, কেউ যখন জায়গা দিতে রাজি নয়কো।
জগন তখন ওর বাড়ির সামনে কল বসানোর জন্য জায়গা দিয়ে বেশ গর্ব অনুভব করেছিল। এখন সে গর্ব ফিকে হয়ে গেছে কেমন! এখন ও ভাবছে, গাঁয়ের মানুষগুলো সে কথা বেমালুম ভুলে, সরকারি কলের দখলদারি দেখাচ্ছে। আগে কলতলায় এসেছে, তাই আগে নেওয়ার নিয়ম শোনাচ্ছে অন্যজনকে। ও যে মুখ ধোবে বলে অপেক্ষা করছে, সে হুঁশ নেই কারও।
কালো খেঁকিটা কলতলায় ঘুরঘুর করছে এঁটোকাঁটা পাওয়ার আশায়। ছানা তিনটে তার পেছন পেছন ছুটে বোঁটার নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করছে। খেঁকি আর ছানাগুলোকে দেখেই লতার কথা মনে আসে জগনের। বেচারি বউটা কাল রাতে ঘুমোয়নি। মনে হচ্ছে আজকেই ওর...! তেমন হলে ইদের বাজারটা মাটি হবে। মাঝে শুধু একটা শুক্কুরবার পড়বে ওই গাঁ-দুটোতে ফেরি করতে যাওয়ার জন্যে। মাঝের তিনটে দিন তো অন্য গাঁয়ের জন্যে বরাদ্দ। ঠিক করে রাখা বারে সেই সেই গাঁয়ে না গেলে খদ্দের নষ্ট হয়। এ ক’দিনের মধ্যে সমস্ত মাল বিক্রিবাটা করে মহাজনকে টাকা মেটাতে হবে শনিবারে। কিন্তু লতার যদি আজ সত্যি সত্যি প্রসব বেদনা ওঠে, তাহলে তো দু’দিন গাঁ-ঘোরা বন্ধ।
জগনের মেজাজটা খিঁচড়ে যায় এ-সব ভাবনায়। ও পুচুত করে থুথু ফেলে। নিমডালের দাঁতনটা আরও জোরে জোরে দাঁতে ঘষতে থাকে।
কাল থেকে লতাকে দেখে অন্যরকম লাগছে যেন! রাতে ঘুমের মধ্যেও জগনের কানে বেজেছে লতার ব্যথা-নিংড়ানো গোঙানি।
আগের সোমবারের রাতেও লতা বিছানায় এমন কাতরাচ্ছিল। জগনকে জাগিয়ে ব্যথা জড়ানো গলায় বলেছিল, ওগো, আমার ব্যতা উটেছে। খুব যন্তনা হচে। মনে হচে রেতেই...!
জগন ধড়মড় করে উঠে বসেছিল, লতার দিকে ঘুম-জড়ানো চোখে তাকিয়েছিল। টেমির হলদেটে আলোয় দেখেছিল লতার দু’চোখের কোনা ভিজে। কপালে গুঁড়ো গুঁড়ো ঘাম। ঠোঁটদুটো শুকিয়ে আমসি। ঘাম-চিকচিকে গলার নিচে উদলা বুক। ভাদুরে কুমড়োর মতো পেটটা যেন পাতলা কাপড়ের আস্তরণ ফাটিয়ে আরও ফুলে উঠতে চাইছে।
সেই মাঝরাতে লতার ওই অবস্থা দেখে জগন হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। কী করবে ঠিক করতে পারছিল না। দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিল দাওয়ায়। বুড়ি মা-টাকে জাগিয়েছিল। মা একটু কেশে নিয়ে বলেছিল, বুড়ি দাই তো মরেচে। এখন ওই ডোমপাড়ার হাঁড়ি-বউ খালাস টালাস করচে। ওকেই ডেকে নিয়ে আয়। আর যাওয়ার আগে কাটকুটো জ্বেলে এক হাঁড়ি জল চড়িয়ে দিয়ে যা। গরম জল লাগবে। আমার পোড়া কপাল! এমন আখুন-তখুন সুমায়ে একটু যে করে-কম্মে দোব, সে জো নাই! ছ-মেস্কে ধরেচে আমার! এটু নড়ে মোতার খ্যাম্তা নাইকো। কী কপাল করিচি!
কথা শেষ না হতেই আবার বেদম কাশি শুরু হয়েছিল জগনের মায়ের। জগনের এখন এত কথা শোনার সময় নেই। হাঁড়ি-বউকে ডাকার কথা শুনেই ও দাওয়া ছেড়ে উঠোনে নেমে পড়েছিল। বার-দরজা অবধি গিয়ে আবার কী মনে করে ফিরে এসেছিল। ঘরের দরজাটা ফাঁক করে বলেছিল, তুমি এট্টূ একা থাকো। আমি ভ্যানরিকশা ডেকে আনচি। হাসপাতালে নিয়ে যাব। মা তো দাওয়ায় আচে। ভয় পেয়ো নাকো। এক ছুটে যাব আর আসব।
অন্ধকার কোলে শুয়ে থাকা নিঝঝুম গলিপথ ধরে জগন ছুট লাগিয়েছিল বাগদিপাড়ার দিকে। ওর মনের মাঝে ছুটছিল চিন্তাগুলোও— ভগা-বাগদিকে বলে-কয়ে রাজি করাতে হবে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য। হাঁড়ি-বউকে বাড়িতে ডেকে এনে কোনও লাভ হবে না। ওকে ভরসা করা ঠিক নয়। প্রথম পোয়াতি; কী হতে কী হয়! বুড়ি দাইমা বেঁচে থাকলে না হয়...। তার অভিজ্ঞতার তো একটা দাম ছিল।
ভগা-বাগদির বাড়ি পৌঁছে তো আর এক সমস্যা। ভগা নৈমিত্তিক ‘দেশি’ টেনে ঘুম দিচ্ছিল। বড় কষ্টে ঘুম থেকে জাগানো হল। কিন্তু জাগলে কী হবে, তখন সে মহারাজার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। অবশেষে প্রায় হাতে-পায়ে ধরে ওকে রাজি করানো গেল। দেশি মদের খোয়ারি কাটিয়ে, হাঁটু-ছেড়া ফুলপ্যান্ট, শাহরুখের ছবিওলা গেঞ্জি, মাথায় গামছা বাঁধা, এসবে সাজতে-গুজতে গেল আরও পনের মিনিট।
সেই নিশুতি রাতে লতাকে ভগার ভ্যানরিকশায় চড়িয়ে তিন কিলোমিটার দূরে হাসপাতাল পৌঁছনো হল। ডাক্তার ঘুমোচ্ছিল। তাকে জাগিয়ে নাম ঠিকানা লেখালেখি করতে প্রায় ভোর।
গর্ভবতী থাকাকালীন লতাকে নিয়মিত হাসপাতালে দেখানো হয়নি। হাসপাতালের কার্ড করা নেই। তাই অনেক ঝকমারি কবে তাকে যখন ভর্তি করে নিল, তখন শুকতারা নিভে গিয়ে সূর্য চোখ মেলেছে।
বেড খালি নেই। তাই দরজার পাশে একটা বিছানায় পড়ে থেকেও সে যাত্রায় দু’টি প্রাণী আলাদা হয়নি। মেয়েদের ডাক্তার দেখেটেখে বলেছিল, আরও কয়েকদিন দেরী আছে। পেট ব্যথা কমানোর বড়ি লিখে দিলাম। এখন বাড়ি নিয়ে যাও।
বাড়ি ফেরার পথে আর এক কাণ্ড। ভগার ভ্যানরিক্শার টায়ার পাংচার হয়ে গিয়েছিল। জগন তো ভ্যানরিকশায় চড়ে বসার পর থেকেই শুরু করেছিল ‘ঘিঁতুনি’। মুখ বেঁকিয়ে লতাকে বলেছিল, মা হবার আর সবুর সয় নাকো! শুদুমুদু এতগুলো টাকা খসে গেল। ছেলে আর বেরুলো না। এট্টা দিন আমার নষ্ট হল। গাঁ-ঘুরতে যাওয়া হল না। কাল আর হাঁড়ি চড়বে নাকো, পেটে গামচা বেঁদে থাকতে হবে।
লতা কোনও কথা বলেনি। মুখ বুজে পড়েছিল। ওর পেটের ব্যথাটা কমে গেলেও মনের মাঝে একটা যন্ত্রণা ঘুরপাক খাচ্ছিল। জগন নিজের মনে অনেকক্ষণ বকবক করেছিল— ক’দিন আগে কালীপুজোর বাজারটাও মার গেল। ওই সব পাটি-পাটির় ঝামেলিতে। এতে কী যে লাব হয় ওদের কে জানে! নিত্যিদিন পাটির ঝামেলা লেগেই আচে।
জগনের বক্বকানি থেমেছিল সেদিনের ঝকমারি মনে পড়ায়! কালীপুজো আর মাত্র দু’দিন বাকি। তার দু’দিন পরেই ভাইফোঁটা। বাজার ভাল যাবে ভেবে অনেক মাল তুলেছিল। ভোর ভোর উঠে বা’-প্যাঁটরা বেঁধেছেদে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল মোড়লগাঁয়ের পথে। নদী পেরোনোর পর বাজে-পোড়া তালতলায় গিয়ে দেখেছিল অবাক কাণ্ড! রাস্তার ওপর হঠাৎ যেন কেউ ‘ডাঁরা’ কেটেছে, এ-পাশ থেকে ও-পাশের জমিতে জল যাওয়ার জন্য! এত চওড়া সেটা, ডাঁরা না বলে ক্যানেল বলাই ভাল। গাড়ি-টাড়ি তো দূরের কথা সাইকেল নিয়ে পার হওয়াও শক্ত। তবুও ও পার হওয়ার চেষ্টা করেছিল। হঠাৎ ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা একদল লোক রে-রে করে তেড়ে এসেছিল, অ্যাইঅ্যাই! দেকচ না যাওয়া-আসা বন্দ করার লেগে রাস্তা কাটা হয়েচে! তুমি যাচ্চ যে ভারি! সাইকেল-মাইকেল কেড়ে নিয়ে বাড়ি পাটিয়ে দোব, বুজবা মজা!
ও তো ভয়েময়ে সাইকেল উল্টিয়েই ফেলেছিল। সেই লোকগুলোর একজন এসে আবার ধরে তুলে দিয়ে বলেছিল, ফিরে চলে যাও। আখুন দু’তিন দিন এ-দিকে আসবা নাকো।
ও ভয়ে ভয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কীসের জন্য রাস্তা কাটা হয়েচে গো বড়ভাই?
লোকটা তেরিয়ান হয়ে উঠেছিল, কীসের জন্য আবার! জানো না? মোড়লগাঁয়ে কারখানা করার লেগে জমি নিয়েচে। সবাইকে টাকা পয়সা কিলিয়ার না করেই কারখানা তোয়ের করা শুরু করেচে। দেকচো না, ওই যে অনেক বড় বড় কেরেন, কপিকল! আমাদের পাটির় নিদ্দেশে জমির মালিকরা কেস করে দিয়েচে। কোট থেকে ইনজিশন জারি করেচে। তাও পাঁচিল তৈরির কাজ চলছিল। তাই আমরা রাস্তা কেটে আন্দোলন করচি। আখুন কারখানা হবে না। আগে ইনজিশন উটুক তার পর...!
ও আর কোনও কথা জিজ্ঞেস করেনি তাকে। সাইকেল টেনে পাঁই পাঁই করে বাড়ির দিকে ছুটেছিল। যেতে যেতে ভেবেছিল, কারখানাটা হওয়া পিছিয়ে গেল।
সেদিনের কথা ভাবতে ভাবতে ভ্যানরিকশায় শুয়ে থাকা লতার উঁচু পেটটার দিকে তাকিয়ে জগন ভেবেছিল, ডাক্তার তো লতাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। যেন ‘ইনজিশন’ জারি হল লতার পেটে। ‘ইনজিশন’ উঠলে বাচ্চা হবে। তার ব্যবসাতেও যেন ‘ইনজিশন’ জারি হয়ে গেল। মহাজনকে টাকা না দিলে মাল দেবে নাকো...। এইরকম কত কথার বুজকুড়ি জগনের মনে।
একসময় ওর রাগ পড়ে গিয়েছিল। কথাও হয়েছিল বন্ধ। লতার দিকে তাকিয়ে দেখেছিল, উদাস চোখে আকাশ দেখছে লতা। তার চোখের কোনায় জল। তা দেখে ওর মনটাও কেঁদে উঠেছিল। আহা! বেচারির কত কষ্ট হল! প্রথম ছেলে হবে ওর। ও কি আর অতশত বোঝে! বেফালতু লতাকে কত ঘিঁতুনি সহ্য করতে হল। ওর এ-সব কথা বলা ঠিক হয়নি। মনে মনে পস্তেছিল জগন। কিন্তু লতার কাছে মাথা নোয়ায়নি পৌরুষ বজায় রাখতে। শুধু আঙুলের ডগা দিয়ে তার চোখের কোনা দুটো মুছে দিয়েছিল। তাতে লতার চোখের জল আরও বেড়ে গিয়েছিল। সেদিন যখন ওরা বাড়ি ফিরেছিল, তখন সূর্যটা অনেকখানি হেলে গেছে পশ্চিমে।
এখন সূর্যটা পুব আকাশে বেশ জ্বলজ্বলে। গোটা তিনেক কাক এসে বসেছে কলতলার পাড়ে। খাদ্যবস্তু তেমন কিছু পাচ্ছে না। শুধু অবিশ্রান্ত চিৎকার করছে। জগনের মুখের তেতো ভাবটা একটু একটু করে গলার দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু কলটা খালি হচ্ছে না। না, আর দেরী করা যায় না।
জগন নিমডালটা ছুঁড়ে দেয় সামনের ভ্যাটভ্যাটে কাঁচা ড্রেনে। ওটা জল-কাদার মধ্যে গেঁথে গিয়ে কেমন উঁচিয়ে থাকে। একরকম জোর করেই এক জনকে সরিয়ে কলের হ্যান্ডেল ধরে জগন। শব্দ করে মুখ ধোয়। কলতলার পাশে খেজুর চারা থেকে হাত বাড়িয়ে একটা খেজুরপাতা ছিঁড়ে নিয়ে জিভ ছোলে ওয়াক ওয়াক শব্দ করে। হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকেও ওয়াক ওয়াক শব্দ ওর কানে আসে। বমি করার শব্দ। লতা কি বমি করছে? কিন্তু ওর তো এখন বমি হওয়ার কথা নয়। সে সব ‘ইস্টেজ’ তো অনেকদিন আগেই পেরিয়ে গেছে।
ও তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতর এগোয়। দেখে, লতা দাওয়ায় শুয়ে আছে। বড় কাহিল লাগছে ওকে। দাওয়ার নিচে উঠোনে বমি ভরতি। কাল রাতে যা খেয়েছিল কিছুই হজম হয়নি লতার।
জগনের পায়ের শব্দে লতা করুণ চোখে তাকায় জগনের দিকে। ওর চোখের কোণে কষ্টের সোঁতা, তবুও ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি। সে হাসির আড়ালে একটু লজ্জার আভাসও খুঁজে পায় জগন। লতার শিয়রে বসে ক্ষান্তমণি। কাশির দমক চেপে ক্ষান্তমণি বলে ওঠে, বউমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্তা কর। তু-তো হাঁড়ি-বউকে ডাকবি নাকো! জল ভাঙচে, আজকেই মা হবে তোর বউ। শিগ্গির যা।
জগনের মনের উষ্মা বাষ্প হয়ে উবে গেছে কখন। লতা শুধু মা হবে না, সে-ও যে বাবা হবে আজ, এ কথাটা তার কানে কানে কেউ যেন বলে দেয়। তড়িঘড়ি সাইকেল বের করে সে ছোটে বাগদিপাড়ার পথে। উঠোনের সজনেগাছটাতে তখন শালিখ পাখির ক্যাঁচোর ম্যাঁচোর, তার পাশেই বুড়ি পেঁপেগাছটার অবশিষ্ট ডাঁট-ওয়ালা পাতাগুলো হালকা হাওয়ায় কেমন কাঁপছে তিরতির করে।
দুই
‘যে ফুল এখনো কুঁড়ি
তারি জন্মশাখে
রবি নিজ আশীর্বাদ
চিরদিন রাখে।’
— রবীন্দ্রনাথ
বউমাকে সেই সকালে হাসপাতাল নিয়ে গেছে। এদিকে এতখানি বেলা হল। এখনও অবধি কোনও ভালমন্দ খবর পাওয়া গেল না! কী যে হল কে জানে! খবর পাওয়া যাবেই বা কী করে! খোঁজখবর নিয়ে আসার কেউ কি আছে! এমন পোড়া কপাল! মানুষজন থেকেও নেই। এ সময় মদনটা থাকলে কত উপকার হত! সে হারামজাদা ‘পেম করে বিয়ে করে’ মা-ভাইকে ছেড়ে শ্বশুবাড়ির পোষা বেড়াল হয়েছে— এ-সব সাতপাঁচ কথা জগনের মায়ের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। উনুনের পাশে ছেঁড়া মাদুরে বসে রয়েছে সে।
ঘরদোর চড়বড় করছে। মাটির দাওয়ায় ধুলো আর হলুদ হলুদ সজনে পাতা উড়ে এসে পড়েছে। ছাঁচতলায় লতার উগরে দেওয়া খাবারের কণাগুলো কাক-চড়াইয়ে খুঁটে খুঁটে শেষ করলেও দুর্গন্ধ যায়নি। বার-দরজাটা হাট করে খোলা। খেঁকি কুকুরটা তার ছানাপোনা নিয়ে উঠোনটা চক্কর দিয়ে গেল একবার। খাওয়ার মতো কিছু পেল না। শুধু হাঁসকে ভাত-কুঁড়ো দেওয়ার খুলিটা চেটে তলানি জলটুকু পরিষ্কার করে দিয়ে গেল।
পশ্চিমের ভাঙা পাঁচিলে কয়েকটা কাক বসে কা-কা করেই চলেছে। অকারণে নয়; প্রায়শই এ সময়ে লতা ‘আঁশবঁটি’ আর এক মুঠো ছাই নিয়ে উঠোনে মাছ কুটতে বসে। ওই মাছের নাড়িভুঁড়ি খাওয়ার লোভেই কাকগুলোর অভ্যাসগত জমায়েত। আজ এখনও সেসবের আয়োজন না দেখে ওরা চিৎকার জুড়েছে। যেন বলতে চাইছে— কোথা গেলে গো বউ! আমরা তো এসেই গেছি।
সত্যিই ওই কাকগুলোর সঙ্গে লতার একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কাকগুলো যেন ওর খেলার সাথী! মাছ কুটতে কুটতে নাড়িভুঁড়িগুলো ছুঁড়ে দেয় লতা। উড়ন্ত অবস্থায় সেগুলো লুফে নেয় কোনও কাক। কখনও বা ঠোঁট ফস্কে পড়ে যায়। অন্য কাক সেটা ছোঁ মেরে নিয়ে গিয়ে বসে সজনেগাছের ডালে। লতা বেশ মজা পায় এতে। কাকগুলো আসে শুধু কি খাবারের লোভেই, নাকি মজা পেতেও! আজ ওদের কা-কা রবের মধ্যে কি কই-কই প্রশ্ন শুধু!
ক্ষান্তমণির মনেও হাজারো প্রশ্নের ওড়াউড়ি। ছেলে-বউয়ের চিন্তা তো রয়েছেই। নিজের জন্যেও চিন্তা কি কম! সকাল থেকে তো দাওয়ায় উনুনের ধারে ছেঁড়া মাদুরে পড়ে রয়েছে। এতটা বেলা হল, এখনও অবধি এক কাপ চাও জোটেনি। একটা দানাও পেটে পড়েনি। ঘরে খুঁজে পেতে হয়তো একবাটি মুড়ি আর দু’একটা বাতাসা পাওয়া যেত। কিন্তু এখনও অবধি ছেলেটা ফিরল না; তার খাওয়া জুটল কি না! তাছাড়া দুর্বল শরীর নিয়ে নড়াচড়া করাও বড় কষ্ট। তাই মাঠে বসা, ঘাটে যাওয়া, সাফসুতরো হওয়া, কোনও কিছুই হয়নি। কিন্তু আর কতক্ষণই বা অপেক্ষা করা যায়! শরীর যে মানে না আর! তাই ক্ষান্তমণি বিছানা ছেড়ে কোনওরকমে দাওয়ার শেষ প্রান্তে এসে ডাক পাড়ে— অ-কম্লি! এট্টূ আসবি মা! কমলি রে!
পশ্চিমের ভাঙা পাঁচিলের ওপাশ থেকে আওয়াজ ভেসে আসে— আসচি ঠাকমা !
আয় না এট্টূ, নক্কি দিদিভাই আমার...!
কমলি অর্থাৎ কমলা ক্ষান্তমণির ছোটজায়ের নাতনি। ছোট জা যখন বউ হয়ে এ বাড়িতে আসে, তখন পশ্চিমের ওই পাঁচিল উঠে দুটো বাড়ি আলাদা হয়নি। সে কবেকার কথা! তখন কর্তাদের দু’ভাইয়ে কী অন্তরঙ্গতা ছিল! দু’জনে যেন হরিহর-আত্মা! ছোটবউ আসার পর শুরু হল দু’ভাইয়ে মন-কষাকষি। ছোট বউ যদিও দোষী নয়; তবুও কেন যে দু’ভাইয়ে ঠোকাঠুকি লাগল! অবশেষে পঞ্চায়েতে সালিশি বসিয়ে আলাদা হল দু’ভাইয়ের সংসার। উঠোনের মাঝে মাটির পাঁচিল উঠল। দুটো বাড়ির আনন্দ-বিষাদ, সুখ-দুঃখ, অভাব-স্বচ্ছলতা আলাদা আলাদা খাতে বইতে শুরু করল। সংসার ভাগ হয়ে গেলেও ক্ষান্তমণির সঙ্গে ছোট বউয়ের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার এক ফল্গুধারা কিন্তু বজায় ছিল সকলের অলক্ষে। এক সময় ছোট বউ রোগভোগে গত হল অকালে। সে দুঃখের ঢেউ এসে লাগল ক্ষান্তমণির মনেও। দুঃখের বরফটা একসময় গলতে গলতে জলও হয়ে গেল।
বছরের পর বছর বর্ষার জলে গলতে গলতে পাঁচিলটা এখন কয়েকটা মাটির ঢিবিতে পরিণত হয়েছে। তবু এখনও সে ঢিবি পাঁচিলেরই সম্মান পায়। পাঁচিল ক্ষয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দু’বাড়ির মধ্যে মন-কষাকষির পাথরটাও ক্ষয়েছে একটু একটু করে। দু’বাড়িরই কর্তা গত হয়েছে। ওবাড়ির কর্তা এখন কমলির বাপ সনাতন। এ বাড়ির কর্তা ছোটছেলে জগন। জগন আর সনাতনের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। দায়-দৈবে, ঠেকা-বেঠেকায় আপদে বিপদে একে অপরকে সাহায্য করে। কমলা নিজের ঠাক্মার কাছে তেমন আদর পায়নি। এই বড় ঠাক্মার হাতে তেল-জল মেখে তার হাড় শক্ত হয়েছে। নিরক্ষর ঠাক্মার সামনে বসে ‘অ-এ অজগর আসছে তেড়ে’ থেকে শুরু করে ‘ফোর কেলাস’ পাশ করেছে। ফাইভে ভরতিও হয়েছিল পাশের গাঁয়ের হাই ইস্কুলে। কিন্তু ওর বয়সের তুলনায় ডাগর হয়ে যাওয়া শরীরখানা পড়াশুনার অন্তরায় হয়েছে।
কমলির বাপ সনাতনের বড় সাধ ছিল, মেয়েকে লেখাপড়া শেখাবে। ছেলে থাকলে তাকেও তো লেখাপড়া শেখাতে হত। কমলির মা অবশ্য হালকা আপত্তি জানিয়েছিল, ওকে ইস্কুল, পাটিয়ে আর কী হবে! ও কি আর চাকরি কত্তে যাবে? ওজগার করে এনে তোমাকে খাওয়াবে। এককাঁড়ি টাকা খরচ করে সেই তো মেয়ের বিয়ে দিতে হবে।
মায়ের আপত্তি ধোপে টেঁকেনি। গ্রামের প্রাইমারির গণ্ডিটা পেরিয়ে গেছে কমলা। দারুণ উৎসাহে সনাতন মেয়েকে পাশের গ্রামের হাই স্কুলে ভর্তি করেছে। স্কুলে যাওয়া-আসাও করছে মেয়ে। হঠাৎ একদিন কাঁদতে কাঁদতে কমলা ফিরল। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলে না। অবশেষে জানা গেল, স্কুল থেকে ফেরার সময় আমবাগানে দুটো রাখাল-ছেলে ওকে একা পেয়ে গাছের আড়ালে নিয়ে গিয়ে ঠোঁটে, বুকে কামড়ে-খিম্চে দিয়েছে।
সনাতন কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পথেই শুনে ফেলেছে মেয়ের ঘটনা। পাঁচজনের মুখে মুখে ওই ঘটনা শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে, ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ হয়ে সনাতনের কানে যা পৌঁছেছে; তাতে আজকেই যেন তার বারো বছরের মেয়েটাকে গর্ভপাত করাতে নিয়ে যেতে হবে! বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভেবেছে— হতভাগীর শরীরটা খেয়ে-না-খেয়ে এমন বেড়ে উঠছে যে...। আর মানুষের মুখকেও বলিহারি যাই, যা নয় তাই...!
কমলার মা, মেয়ের মুখে ঘটনা শোনার পর সেই যে গালমন্দ শুরু করেছে; সনাতন না ফেরা অবধি থামেনি। সনাতন যুক্তি দিয়ে বোঝাতে গেলে কমলার মা আর এক পর্দা গলা চড়িয়ে বলেছে, শুদু রাখাল-বাখাল বলচ কেনে। কোনদিন বড়মানুষেই হয় তো...। ব্যাটাছেলেরা আজকাল কালো-কুচ্ছিত, রোগা-পট্কা, ভাগনি-ভাইঝি মানে নাকো! মেয়েমানুষকে একা পেলেই ওদের ‘নাল’ ঝরে।
তারপর থেকে কমলার স্কুল যাওয়া বন্ধ। তিন বছর ধরে ও ওর মায়ের ‘হাত-নুড়কোত্’। রান্না-বাটনা, ঘরকন্নার সব কাজে হাত লাগায়। মায়ের কাছে রান্নায় কতটা হাত পাকল, মাঝেসাঝে তার পরীক্ষা দেয় লতাকাকিমা কিংবা বড়ঠাকমার কাছে।
কমলি আসে। ভাঙা পাঁচিল টপকে নয়, বাইরের দরজা দিয়ে। পাঁচিল এখন ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও একসময় অক্ষুণ্ন ছিল। তখনকার ঘুরপথে আসার অভ্যাসটা সকলের মধ্যে থাকায় ভাঙা-পাঁচিল তার কাজটুকু এখনও করে চলেছে।
বারদরজা থেকে ঢুকতে ঢুকতে কমলি বলে, ওমা, ঘর-দোর যে চড়বড় করচে গো! এতক্ষণ ডাকনি কেন ঠাক্মা? কাকির খপর কিচু পেলে? কাকা ফেরেনি আখুনো?
ক্ষান্তমণি এতগুলো প্রশ্নের উত্তরে শুধু ‘না’ কথাটা বলতে পারে। তার কথা বলার ক্ষমতাটাও যেন ক্রমশ কমে আসছে। কমলা প্রথমে ক্ষান্তমণির কাছে যায়। ঠাকমাকে ধরে আস্তে আস্তে উঠোনে নিয়ে আসে। তারপর পাশের পুকুর থেকে বাড়ির ‘পাঁদাড়ে’ এক বালতি জল এনে দেয়। বলে, যাও ঠাকমা, জল দিইচি। তুমি একটু পোস্কার ঝরঝরে হয়ে নাও। ততক্ষণে আমি এ-দিকটা সেরেসুরে নিয়ে তোমাকে চা করে দিচ্চি।
কমলা এবার যেন সাক্ষাৎ দশভূজা হয়ে যায়। ঠাক্মার ছেঁড়া মাদুর আর কম্বলের বিছানা গুটিয়ে তুলে রাখে। ঘর-দাওয়া, উঠোন ঝাঁট দেয়। দাদুর আমলের বালতিটাতে গোবর গুলে ঘর-পিঁড়ে নিকোয়। এর মাঝে এক ফাঁকে ঘুঁটে আর গুল দিয়ে রান্নার চালাঘরের উনুনটা ধরিয়ে দিয়েছে। গলগল করে ধোঁয়া উঠছে উনুনটা থেকে। এ-পাড়াটাতে এই ধোঁয়াই যেন এদের স্বচ্ছলতার প্রতীক। ধোঁয়া ওঠা মানেই হাঁড়ি চড়ানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। আজকের দিনের মতো বেঁচে থাকার রসদটুকু জোগাড় হয়েছে তাহলে। কারুর বাড়িতে যদি ধোঁয়া দেখা না যায়, ধরে নেওয়া হয় ওই বাড়িটাতে স্বাভাবিকতা বজায় নেই।
ক্ষান্তমণি এর মধ্যে অনেক কষ্টে বাড়ির পাঁদাড়ে গিয়ে শরীর হালকা করেছে। মুখ হাত ধুয়ে কাপড় ছেড়ে এসেছে। আঁচ ধরতেই কমলা আদা দিয়ে লাল চা তৈরি করে দিয়েছে ঠাক্মাকে।
লতাকাকিমা ঠিক যেমনটা করে, কমলা সেটাই অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। কখনও সখনও ও এ-বাড়িতে এসে বসে থাকে। দেখে কাকিমার কাজ-কর্ম, ঘর সংসার। ইদানিং তো একটু বেশিই আসতে হচ্ছে। কাকিমার পেট ভারি হয়েছে। তেমন দৌড়-ঝাঁপ করে কাজ করতে পারে না, দম লেগে যায়। ও মা-ঠাকমাকে বলতে শুনেছে, ‘এমন অবস্থায় ভারী বালতি তুলতে নাইকো, শিল-নোড়ায় মশলা বাটতে নাইকো। তাতে পেটের ছানার খেতি হয়।’ তাই কমলা নিজে থেকেই কাকিমার এ কাজগুলো করে দেয়। ওকে ডাকতে হয় না। নিজে থেকেই আসে। ওর বয়স কম হলেও ও যে ভেতরে ভেতরে একজন সংসারী ও গৃহকর্ম নিপুণা হয়ে উঠছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাখির ছোট্ট ডিমের মধ্যে যেমন আগামী দিনের আকাশে ওড়া পাখিটা লুকোনো থাকে; তেমনি প্রতিটি শিশুকন্যার মধ্যেই লুকোনো থাকে আগামীদিনের এক সংসারী প্রাণবন্ত ও কর্তব্যপরায়ণা নারী।
ক্ষান্তমণি দাওয়ার খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসে আদা দেওয়া লাল চা খাচ্ছে। চা খেতে খেতে ওর মনে পড়ে যায় সেই মানুষটার কথা। কাজ থেকে ফিরে এই খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসেই চা খেত মদনের বাবা! বিয়ের পর প্রথম প্রথম ওগো-হ্যাঁগো করেই কাজ চালাত। মদন হওয়ার পর সে হল ‘মদনের বাবা’ আর ও ‘মদনের মা’। কী তাড়াতাড়ি তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল মানুষটা। আজ সে যদি থাকত...। থাকলেই বা কী লাভ হত! বরং জগনের কষ্ট আরও বাড়ত। তাকে নিয়েও জেরবার হতে হত ছেলেটাকে। সেও তো সুস্থ ছিল না। একটুতেই হাঁফ ধরত। পরিশ্রমের কাজ করার পর কামারশালার হাপরের মতো ওঠানামা করত বুকটা। ফোঁস ফোঁস শব্দে নিশ্বাস ছাড়ত।
একবার তো ‘ফুট ফাট ওয়াকে’ (ফুড ফর ওয়ার্কে) মাটি কাটতে গিয়ে কী বিপদ! মাথায় মাটি ভর্তি ঝুড়ি নিয়ে টলতে টলতে পড়ে গিয়েছিল। সে একদম মরে যাওয়ার দাখিল! নিশ্বাস-মিশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। লুঙ্গিতে হেগে-মুতে একশা। মোল্লাপাড়ার সাবিরালি আর কটা মোড়ল দু’জনে চ্যাংদোলা করে বাড়িতে দিয়ে গিয়েছিল। আধবেলা কাজ করেছিল, তবুও আড়াই কেজি গমের এক কেজিও দেয়নি।
তারপর থেকে হেঁপো রোগি হয়ে গেল। ঠিকমতো চিকিৎসা করালে হয়তো আরও কিছুদিন বাঁচত মানুষটা। কিন্তু কে করাবে? একা মানুষ। আলাদা হয়ে যাওয়ার পর দেওর এ-বাড়ির ছায়া মাড়াত না! মদনটাও তখন ছেলেমানুষ, আর জগন তো নেহাতই কাঁচাছেলে!
মদনের বাবা অসময়ে গত হওয়ার পর মদন আর জগনকে নিয়ে কী আতান্তরে যে পড়েছিল; সে-সব দিনগুলোর মধ্যে ক্রমশ ডুবে যেতে থাকে ক্ষান্তমণি। নাবালক ছেলেদুটোকে দুই বগলে চেপে ধরে সদ্য স্বামী হারানোর দুঃখকে চাপা দিয়েছিল সে। ছেলে দুটোকে মানুষ করার আকাঙক্ষা তীব্র হয়ে উঠেছিল।
তারপর কত কষ্টের দিন পেরিয়ে মদন আর জগনকে মানুষ না হোক, অন্তত ‘মুনিশ’ করে তুলতে পেরেছে। ছেলে দুটোর গায়ে-গতরে ‘মাস’ লাগানোর তাগিদে নিজের শরীরের দিকে নজর দিতে পারেনি। কতদিন দিনের বেলা খাওয়াই হত না। রাতে ভাতে-ভাত রাঁধত। মা আর দুই ছেলে মিলে টেমির আলো জ্বেলে খেতে বসত। তখন পশ্চিমের পাঁচিল টপকে পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসত রেডিয়োর গান।
ঠাকমাকে চা দিয়ে নিজেও একটু চা খেয়েছে কমলা। তারপর মাটির হাঁড়িতে ভাতে-ভাত চড়িয়েছে কাকা আর ঠাক্মার জন্য। ঘরে তেমন কিছু ছিল না। চাল আর আলু পেয়েছে খুঁজে পেতে। রান্নার চালাঘরের খড়োচালে বেড়ে ওঠা শিমগাছ থেকে কয়েকটা শিম জোগাড় করতে পেরেছে।
কাকিমা থাকলে হয়তো বলত, কমলি, যা তো মা! ওই ঘাটের পাড় থেকে চারটি শুশ্নি শাক তুলে নিয়ে আয়। কাকিমা নেই, তাই শাক তুলতে যাওয়ার ইচ্ছা হল না। কাকিমা থাকলে ঠিক দু-চারটে মাছও জোগাড় করত জেলেনিদের কাচের চুড়ি কিংবা টিপের পাতা দিয়ে। আজ আর তা হল না।
রান্নার চালায় গুলের আঁচে মাটির হাাঁড়িতে ভাত ফুটছে টগবগিয়ে। খড়ের চাল থেকে ঝুলে-পড়া শিম-লতায় একটা শ্যামাপাখি বসে দোল খাচ্ছে। অদূরে বসে রয়েছে কমলা। তার দৃষ্টি ভাতের হাঁড়ির দিকে, নাকি পাখিটার দিকে বোঝা যাচ্ছে না। পাখিটা মোটেও ভয় পাচ্ছে না ওকে। ভাতের হাঁড়ি থেকে উঠতে থাকা বাষ্পের মধ্যে দিয়ে শ্যামাপাখিটাকে কেমন আবছা লাগছে। ওর মনের মধ্যে বাষ্পের মতো উড়ছে কাকিমার ভাবনা— সেই সকালে হাসপাতাল নিয়ে গিয়েছে কাকা। এখনও কোনও খবর নেই। কী হল কে জানে! ওর ভাবনায় দোল খাচ্ছে একটা কচি বাচ্চার মুখ। সেটা কেমন আবছা লাগছে। খোকা না খুকি বোঝা যাচ্ছে না। এখনও প্রসব হল কি না কে জানে!
ভালোয় ভালোয় কাকিমার সন্তান প্রসব করে দাও ঠাকুর। কাকিমা খুবই ভালমানুষ; তাকে যেন কষ্ট দিও না। এমনিতেই তার বড় কষ্ট। ওই শরীর নিয়ে ঘর-সংসারের সব কাজ। তার ওপর ঠাকমাটা তিন মাস ধরে অসুস্থ। তার দেখাশুনা করা, নাওয়ানো, খাওয়ানো। অবসর পেলে বুকে-পিঠে তেল মালিশ করে দেওয়া। আরও কত কী! খুবই আন্তরিক ভাবে এমন কামনা করে কমলা তার ঠাকুরের কাছে।
তেল মালিশের কথা মনে আসতেই কমলা উঠে পড়ে। চালের বাতায় তুলে রাখা অ্যালুমিনিয়মের ছোট্ট বাটিটা হাত বাড়িয়ে পেড়ে নেয়। পুড়ে পুড়ে কালো হয়ে গেছে বাটিটা। ওটাতে রোজ রসুন- তেল গরম করে কাকিমা। কমলা বাটিতে তেল দিয়ে কয়েক কোয়া রসুন ফেলে দেয়। ভাতের হাঁড়ির তলার ফাঁক দিয়ে উনুনে গরম করে রসুন-তেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ও ঠাকমা! উটোনের রোদে এস। তেল মালিশ করে দিই।
ক্ষান্তমণির চোখে মুখে ফুটে ওঠে খুশির আভাস। সে খুশি আশীর্বাদ হয়ে ঠোঁটে ফোটে, লাতনিটা আমার খুব গুণের! ওকে ভালো ঘর-বর দিও ঠাকুর। ও যেন সুখী হয়।
পায়ে পায়ে ক্ষান্তমণি উঠোনে আসে। আকাশে তখন কিশোরী সবিতা। তার কুসুম কুসুম রোদ্দুর বুড়ি ক্ষান্তমণির গায়ে-মাথায় আদরের হাত বুলোয় যেন! কিশোরী কমলা ঠাকমার গায়ের কাপড় সরিয়ে হািড্ডসার বুকে-পিঠে-মাজায় মালিশ করে দিতে থাকে। আরামে ক্ষান্তমণির চোখ বুজে আসে।
লতা তার ভারি শরীর নিয়ে কাল অবধি এ-সব কাজ করেছে। তার কষ্ট হয় ঠিকই; কিন্ত তৃপ্তিও পায়। পড়শিরা বলতে তো পারবে না, লতা অসুস্থ শাশুড়ির যত্ন করে না! বরং সবাই ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ— বউটা খুব গুণের! নিজের এ অবস্তাতেও শাশুড়ির সেবাযত্নের কোনও ত্রুটি করে না।
কলতলায় বা ঘাটে গিয়ে কমলা যখন কাকিমা সম্পর্কে কথাগুলো শোনে, তখন গর্বে যেন ওর বুক ভরে ওঠে! ওরও তখন খুব ইচ্ছে করে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ও কাকিমার মতো হবে। ওরও খুব সুনাম হবে। পাঁচজন ওকে নিয়ে আলোচনা করবে। তাই তো ও রোজ এ-বাড়িতে আসে, কাকিমার কাজকর্ম দেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ওর শাশুড়িও যদি এমন অসুস্থ হয়, তাহলে...! এমন ভাবনা মাথায় আসতেই আপন মনে হেসে ফেলে কমলা। এমন সময় পুকুর পাড়ে বউ কথা কও পাখিটাও ডেকে ওঠে তুমুল শব্দে।
তিন
‘দুঃখ এড়াবার আশা
নাই এ জীবনে
দুঃখ সহিবার শক্তি
যেন পাই মনে।’
— রবীন্দ্রনাথ
তিনমাস ধরে বিছানায় পড়ে ক্ষান্তমণি। কিন্তু তার রোগটা যে কী, এখনও তা ধরা পড়েনি। আসলে, রোগ ধরার চেষ্টাও হয়নি সে-ভাবে। মাঝেমাঝে জ্বর আর খুকখুকে কাশি হচ্ছে। তাই পাড়ার নিঞ্জূমাস্টারের কাছে দেখিয়ে এনেছিল জগন। তার দেওয়া ‘হোমোপাথি’ দানা খেয়েছিল কিছুদিন। তেমন কাজ হয়নি। নিঞ্জূ মাস্টারকে সে কথা বলতে, সে বলেছিল, সারল না যখন, তখন বড় ডাক্তার দেখাও।
বড় ডাক্তার আর দেখানো হয়নি। ডাক্তার দেখানোর মতো টাকাই-বা কোথায় জগনের! তাই পাঁচজনের পরামর্শ মতো টোটকা, গরমজলে গার্গেল, এ-সব চলছিল। মাস তিনেক আগে এক দিন ক্ষান্তমণি কলতলায় জল আনতে গিয়ে কাশির দমকে পড়ে গেল। কাশতে কাশতে গলা থেকে রক্তও উঠল কিছুটা। তখন পাড়ার পাঁচ জন পাঁচ কথা বলতে, জগন কাজ কামাই করে মাকে নিয়ে গেল সদর হাসপাতালে। হাসপাতালের ডাক্তার বুকে স্টেথোস্কোপ বসিয়ে, আরও নানারকম কায়দা-কানুন করে নিদান দিল— বুকের ফটো, রক্ত-পরীক্ষা, থুথু পরীক্ষা এ-সব করাতে হবে। আপাতত দু’রকম বড়ি সকাল-দুপুর-রাতে চলবে। এক সপ্তাহ পর সব রিপোর্ট নিয়ে আবার আসতে হবে।
ডাক্তার লাল কার্ডে সব লিখে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দিল। সেখানে একজন গুঁফো লোক কার্ডখানাতে একটা স্ট্যাম্প মেরে বলল, পাশের ঘরে যাও।
পাশের ঘরে কার্ড জমা দিয়ে দেড় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর ডাক পড়ল। ঘরে ঢুকতেই চেয়ারে বসে থাকা লোকটা বলল— ফটো করানো, ‘পুটাম’ আর ‘বেলাড’ টেস্টের জন্য নব্বই টাকা জমা দাও। কাল সকালে খালি পেটে ‘বেলাড’ দিয়ে যাবা। আর এই নাও তিনটে কোটো। কাল থেকে পরপর তিন দিন ‘পুটাম’, মানে থুতু-গয়ের দিয়ে যাবা এই কোটোয় ভরে। আর বুকের ছবি করানোর জন্যে ‘ডেট’ পড়ল একমাস পরে।
জগন কথাগুলো শোনার পর লোকটার মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়েছিল। লোকটা খেঁকিয়ে উঠেছিল, কী হল? টাকা নাই নাকি? যত্তসব! সরো, নে’্ট গদাই মণ্ডল!
জগন ভয়ে সরে গিয়েছিল লাইন থেকে। টাকা ওর কাছে নেই এমন নয়। মহাজনকে মেটানোর জন্য তিনশো টাকা সঙ্গেই রয়েছে। কিন্তু ও ভাবছিল অন্য কথা। কাল সকালে রক্ত পরীক্ষার জন্য আসা। তাছাড়া তিন দিন থুথু পরীক্ষার জন্য আসা মানেই তো দিন তিনেক কাজ কামাই। এছাড়া অন্য কোনও ব্যবস্থা হয় কিনা, তা জিজ্ঞেস করার সময়ই দিল না লোকটা।
আর একটা কথাও ভাবছিল জগন। ও জানে, সরকারি, হাসপাতাল গরীব মানুষদের জন্য। সেখানে টাকাপয়সা লাগে না। কিন্তু রক্তপরীক্ষা, বুকের ফটো করা, এসবের জন্য টাকা চাইছে কেন? এখন হাসপাতালও কি ‘পেরাইভেট’ ডাক্তারখানা হয়ে গেল নাকি! তাহলে গাঁয়ের মিত্তন মাস্টার যে বলে, হাসপাতাল আর গরিব মানুষদের জন্য নয়। ঠিকই বলে তাহলে।
জগন আর দাঁড়ায়নি হাসপাতালে। বাড়ি ফেরার পথে মজুমদারের ওষুধের দোকান থেকে এক সপ্তাহের ওষুধ কিনেছে দু’শো পঁয়ষট্টি টাকা দিয়ে।
পরের দিন হাসপাতালে রক্ত পরীক্ষা করতে যাওয়া হয়নি। ভ্যানরিকশার ভাড়া ছিল না হাতে। তাছাড়া পরপর দু’দিন কাজ কামাই হবে। পেটে টান পড়বে। ক্ষান্তমণি পরিস্থিতি বুঝে বলেছিল, ও রে! ও-সব টেস্-মেস্ করাতে হবে নাকো। দাক্তারে অনেক কিচুই বলে! এই বড়ি কটা খেলে ঠিক সেরে উটব। তু অত ভাবিস নাকো। এত তাড়াতাড়ি মরবে না তোর মা। যা কাজে বেরিয়ে যা। অ্যানেক বেলা হয়ে গেল।
জগনের মনে ধক্ করে লেগেছিল কথাটা। মা মরে যেতে পারে এ ভাবনাই আসেনি তার মনে। কথাটা শুনে মনে হয়েছিল, তাইতো, মা যদি মরে তাহলে তার আর রইল কে! সেই কোন ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে। আবছা মনে পড়ে বাবাকে। তখন থেকে দেখে আসছে মা লোকের বাড়ি মুড়ি ভাজে, ধান সেদ্ধ করে, পালা-পার্বণে আল্পনা দেয়। ছোটবেলায় সেও থাকত মায়ের সঙ্গে সঙ্গে। মা যখন মুড়ি ভাজত কারুর বাড়িতে; ও চুপটি করে বসে থাকত মায়ের পিঠ ঘেঁষে। মুড়ি ভাজতে ভাজতে মা কেমন ঘেমে উঠত। তুষের ধোঁয়া আর আগুনে মায়ের চোখ-মুখ কেমন লাল হয়ে যেত, আর ঘামে চকচক করত। মায়ের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ থাকত না, মুড়ি ভেজেই যেত। মায়ের হাতে দুটো সোনালি রঙ চটে যাওয়া টিনের চুড়ি ঠিনঠিন ঠিনঠিন করে বাজত। ওর যে কী ভাল লাগত সেই বাজনাটা। ও অবাক হয়ে সেই বাজনা শুনত, আর দেখত খোলার মধ্যে গরম বালিতে চাল দিলেই কাঠির নাড়ায় সেগুলো কেমন ফুলফুলে মুড়ি হয়ে উঠছে। ও ভেবেই পেত না চালগুলো অমন মুড়ি হয়ে যায় কোন জাদুতে। মা কি জাদু জানে! তখন মাকে ওর বড় ভাল লাগত। মায়ের আরও কাছ ঘেঁষে বসে মায়ের পিঠে তার কচি হাত রাখত। মা মুড়ি ভাজতে ভাজতে মুখ না ফিরিয়েই বলত, খিদে লেগেছে? মুড়ি খাবি চাট্টি! দিচ্চি দাঁড়া।
মা সে-বাড়ির গিন্নির কাছ থেকে একটা বাটি চেয়ে নিয়ে তাতে চারটি গরম মুড়ি দিত। ও মুড়িতে গুড় নেওয়ার বায়না করলে মা বলত, ছিঃ! লোকেদের কাচে চাইতে নাইকো! আখুন শুদু মুড়ি খেয়ে নাও সোনা। বাড়ি গেয়ে দুদ দিয়ে গুড় দিয়ে মুড়ি দোব।
তার পরেও শুকনো মুড়ি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকলে মা মুড়ি ভাজা থামিয়ে তাকে কেমন কাছে টেনে নিত। মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে থুতনিতে মাথা রাখত কিছুক্ষণ। তখন মনে হত মা কত ভাল, এত ভাল মা কারুর হয় না। মায়ের চোখ-মুখ ছল ছল কর উঠলেও বড় ভাল লাগত তখন মাকে দেখতে। সেই মা আজ...!
জগন মায়ের মুখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছে। মায়ের সেই রূপখানা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু হাড় জিরজিরে ওই বুড়ি মানুষটার খোলস থেকে তার সেই মাকে কিছুতেই বের করে আনতে পারেনি। জগনের চোখ ছলছল করে উঠেছে মায়ের কথা শুনে। মায়ের রোগ হয়েছে, কিন্তু সে এমনই ‘কুপুত্তুর’ মায়ের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পারছে না। এর চেয়ে...!
আর মায়ের সামনে দাঁড়ায়নি সে। চোখের জল লুকোতেই যেন তড়িঘড়ি লঝঝড়ে সাইকেলটা দাওয়া থেকে উঠোনে নিয়ে এসেছে। তারপর কেরিয়ারে টিনের বা’টাকে লাগিয়ে সাইকেলের বাতিল টিউব দিয়ে বেঁধে নিয়েছে রোজকার মতো। আংটির বা’টা রশি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে দিয়েছে সামনের রডে। তিন কোনা ফাঁকটার মধ্যে বা’টা দুললেও কাচ ভাঙার সম্ভাবনা নেই। খদ্দের জড়ো করার ডুগডুগিটা হ্যান্ডেলে বেঁধে নিয়েছে রোজকার মতো। অসুস্থ মায়ের দিকে আর তাকাতে পারেনি চোখে জল এসে যাওয়ার ভয়ে। সাইকেল ঠেলে তড়িঘড়ি চলে এসেছে মাঠের দিকে।
সেই ছোটবেলা থেকেই ও দেখেছে সবুজ, হলুদ রঙ-রঙের ফসলভরা মাঠের দিকে তাকালে কেমন মন ভাল হয়ে যায়। কিন্তু আজ মাঠের দিকে তাকিয়ে ওর মন ভাল হচ্ছে না। মাঠটারও যেন ওর মায়ের মতন দশা। কেমন জরাজীর্ণ রুখুশুখু হয়ে আছে। ওই জমিগুলো নাকি কারখানার জন্য কিনে নিয়েছে কোন এক বড় কোম্পানি। তাই চাষ হয়নি ওই জমিগুলোতে। চাষ হলে এই ভরা ভাদরে মাঠ সবুজ হয়ে থাকত! কচি ধানগাছগুলো আইবুড়ি মেয়ের মতন অকারণে খিলখিলিয়ে হাসত হালকা বাতাসে। কিন্তু ধু ধু করছে ফাঁকা জমি। এগুলো কোনও দিনই আর সবুজে ভরে উঠবে না। লক্ষ-কোটি বিয়েনকাঠি বুকে থোড় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না। পাকা ধানের শীষগুলো নুইয়ে পড়ে লাজবতী নারীর মতন মুখ লুকোবে না। এই জমিগুলোর ওপর ইটখোলার ঘ্যাঁস ফেলা হয়েছে উঁচু করার জন্যে। সেদিকে তাকিয়ে মনেই হচ্ছে না এগুলো কখনও সবুজে ভরা ধানজমি ছিল। ওই জমিতে তাকালে মন ভাল হওয়া দূরের কথা, মন আরও খারাপ হয়ে যায় জগনের। ও ভাবে, ইট-কাঠ-পাথরে, লোহা-লক্কড়ে ভরে উঠবে ওই জমিগুলো। ও চোখ সরিয়ে নেয় জমি থেকে।
জগন ছলছল চোখে আলপথ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে সাইকেল চালিয়ে গাঁয়ে ঢুকেছে। গাঁয়ে ঢুকে প্রথমদিকে ও ভুলে গিয়েছে ওর সেই বিশেষ ‘হাঁক’ দিতে। মায়ের আর মাঠের কথাগুলোই মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল এতক্ষণ। ডুগডুগি বাজিয়েও গাঁয়ের বউ-ঝি-রা ভিড় জমাচ্ছে না দেখে সম্বিত ফিরেছে ওর। তখন ‘হাঁক’ দেওয়া শুরু করেছে— চুরি লেবে গো...কানের দুল...আংটি, বালা, মাথার ফুল, চুলের কিলিপ, টিপের পাতা, ট্যাসেল চুল...।
মামুদপুরের সব পাড়া ঘোরা হয়ে গেলে ডালিমচাচার চা-দোকানে এসেছে জগন। সামনে পাকুড় গাছে সাইকেলখানা ঠেস দিয়ে রেখে চেরা-বাঁশের বেঞ্চিতে বসেছে।
তখন ছিল ভাদ্রমাস। ভ্যাপসা গরমে ঘাম মুছতে মুছতে জগন নেড়ো বিস্কুট আর চায়ের অর্ডার দিয়েছে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় আর জলখাবার খাওয়া হল না মায়ের ওই মন-খারাপ-করা কথার জন্য। এখন ভেতরটা কেমন ‘তাঁ-তাঁ’ করছে। নেড়ো বিস্কুটের কিছুটা চিবিয়ে একপেট জল খেয়ে নিল। অবশিষ্ট বিস্কুটটা আর খাওয়া হল না। মনে পড়ে গেল মায়ের কথা। ওর মা চায়ে ডুবিয়ে নেড়ো বিস্কুট খেতে খুব ভালবাসে। সামনে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছিল একটা নেড়ি; তার দিকেই ছুড়ে দিল টুকরোটা। চা শেষ করে একটা বিড়ি ধরাল ও।
ভাদ্রমাস হলেও রোদের তেজ কম নয়। রাস্তায় তেমন লোকজন নেই। দুপুরবেলা, তাই ডালিমচাচার দোকানও ফাঁকা। নিস্তব্ধ। শুধু ফুটন্ত গরম জলের কেটলির ঢাকনাটা নড়ছে কিট্কিট্ শব্দে। কেটলির নল দিয়ে বাষ্প বেরোচ্ছে হুশহুশ করে। জগন সেই কেটলির দিকে তাকিয়ে রয়েছে, নাকি উনুনের ও-পাশে লোভী চোখে তাকাতে থাকা নেড়িটাকে দেখছে, বোঝা যাচ্ছে না।
বিড়িতে টান দিতে ভুলে যাওয়ায় বিড়ির আগুন কেটে গেছে। ডালিমচাচা নৈঃশব্দ ভাঙতেই যেন বলে ওঠে, কী গো জগনভাই! অমন উদাস উদাস লাগচে কেনে? বিক্কিরি বাটা ভাল নয় নাকি গো?
জগন আগুন কেটে-যাওয়া বিড়িটা ছাইগাদায় ছুঁড়ে দেয়— না চাচা তা নয়, আসলে বাড়িতে রোগ-বালাই। তাই মন-মেজাজ তেমন জুত নাইকো...!
কার কী হল গো?
মায়ের।
মায়ের কী হয়েচে?
জগন ডালিমচাচাকে মায়ের রোগের বৃত্তান্ত শুনিয়েছে, হয়তো কিছুটা মন হালকা করতেই। সব শুনে ডালিমচাচা মুশকিল আসান হতে চেয়েছে— ও-সব ওষুধ ইঞ্জেশনে কাজ হয় না আজকাল। সব ভেজাল, সব ভেজাল! তুমি বরং কোবরেজি করাও। আজকাল দাক্তাররাও হয়েচে সেইরকম; দেকে-শুনে রোগ ধরার খ্যাম্তা নাইকো! খালি ‘অমুক ‘টেস’ করাও তমুক ‘টেস’ করাও।’ পয়সা নেওয়ার ফিকিরি। ‘টেস’ করতে পাটালেই কমিশন! আগেকার দিনে হেকিম-কোবরেজরা নাড়ি টিপেই রোগ বাতলে দিত; আখুন সব...! যা শোনলাম, তাতে মনে হচে বুকে গাঢ় ‘শেলেস্যা’ জমেচে। এক কাজ করো দিকিনি! ‘বাসকপাতা’কে আদা, গোলমরিচ আর লবঙ্গ দিয়ে ফুটিয়ে একটু মিছরি দিয়ে চায়ের মতো খাওয়াও দু’বেলা। দেকো তিন দিনে হড় হড় করে শেলেস্যা উঠে যাবে। এ-সব গাচগাচড়া হল সাক্ষাৎ ধন্নন্তি। আমার বুবুর এমন হয়েছিল। ওই গাচগাচড়াতেই...।
বাড়ি ফিরে লতাকে ডালিমচাচার কথা বলেছিল জগন। লতা বাড়ির পাঁদাড় থেকে বাসক পাতা ছিঁড়ে নিয়ে এসে আদা-গোলমরিচ দিয়ে ফুটিয়ে খাইয়েছিল শাশুড়িকে। লবঙ্গ ঘরে ছিল না, তাই দেওয়া হয়নি। মিছরির অভাবে রেশনের চিনি দিয়েছিল ওতে। তিন দিনের জায়গায় ছ’দিন খাইয়েছিল। কিন্তু ওই ধন্বন্তরি-ওষুধ খেয়ে হড়হড় করে শ্লেষ্মা বেরোয়নি ক্ষান্তমণির।
ক্ষান্তমণি একদিন গায়ে-পিঠে তেল মেখে উঠোনে বসে আছে রোদে পিঠ দিয়ে। এমন সময় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী মমতা এসেছে লতাকে ‘আয়রন-বড়ি’ দিতে। ক্ষান্তমণি কিছু বলতে গিয়ে শুরু করেছে বেদম কাশি। মমতা ক্ষান্তমণিকে দেখে, আর লতার মুখে সব কিছু শুনে বলেছে, বউদি! এ ব্যাপার ভাল ঠেকছে না। তুমি দাদাকে বল বর্ধমানে মেডিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে গেয়ে দেখাতে। ওখানে বিনি পয়সায় চিকিৎসা পাওয়া যায়।
বিনা পয়সার চিকিৎসাও নেওয়া হয়নি ক্ষান্তমণির। গ্রাম থেকে বর্ধমানে দু’জন মানুষের যেতে আসতে খরচ হবে দেড়শো টাকা। তাছাড়া সারাটা দিনের ব্যাপার। পথে খাবার-দাবারও দরকার হবে। একদিনে তো হবে না; মাঝে মাঝেই যেতে হবে। এ-সব ভাবনা-চিন্তা করে বর্ধমান আর যাওয়া হয়নি।
জগন একদিন খেতে বসে কথায় কথায় বলেছে, দাদাকে একটু বললে হয়। তুমি তো তারও মা। তারও তো একটা ‘কত্তব্য’ আচে নাকি!
ক্ষান্তমণি হা-হা করে উঠেছে, না না, ওকে খপর দেয়ার কোনও দরকার নাইকো। যে ছেলে, মা মরল কি বাঁচল খপর নেয় না; সে করাবে মায়ের চিকিচ্ছে! তুই যদ্দুর পারিস কর। আর ক’টা দিনই বা বাঁচব! এমনি করেই ঠিক চলে যাবে। তোকে অত চিন্তা করতে হবে না।
লতা বলে উঠেছে, আমনি বুজচেন না মা, ভালমন্দ একটা কিচু হয়ে গেলে তখন আমনার ছেলের দোষ হবে। বলবে, ‘আমাকে কি খপর দিইচিস্, নিজে নিজে মুচ্ছুদি করিচিস্। আমার মা-টাকে মেরে ফেলিচিস’!
তার বয়েই গেছে ও-সব কতা বলতে! তুমি মিছেই ও-সব কতা ভাবচ বউমা। সে কি আর আমাকে মা বলে গণ্যি করে! ওকে পেটেই ধরিচি ওই পর্যন্ত, সে আমার পেটের শত্তুর।
কথা বলতে বলতে ক্ষান্তমণির চোখ জলে ভরে উঠেছে। কাপড়ের খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বলেছে, ওর কতা আর আমাকে বোলো না বউমা। দাও ঝোলটা জুড়িয়ে যেচে। গরম থাকতে থাকতে জগার পাতে দাও দিকিনি।
চার
‘ইহাদের করো আশীর্বাদ
ধরায় উঠিছে ফুটি শুভ্র প্রাণগুলি
নন্দনের এনেছে সংবাদ
ইহাদের করো আশীর্বাদ।’
— রবীন্দ্রনাথ
জানলার ফাঁক-ফোকর দিয়ে সোনালি আলোর রেখা বিছানায় বালিশে, গায়ের কাপড় সরে যাওয়া পুষ্পর শরীরে। চোখে আলো পড়তেই তিরতির করে কেঁপে ওঠে পুষ্পর চোখের পাতা। ও ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। আধ-আলো আধ-অন্ধকার ঘরে ও লজ্জায় মরে— এত বেলা হয়ে গেছে! অন্যান্যদিন ছেলেটাও এতক্ষণ জেগে গিয়ে ঘ্যান্ঘ্যান্ শুরু করে। আজ জাগেনি, গায়ের ঢাকা-চাপা সরিয়ে ফেলে ‘দ’ হয়ে ঘুমোচ্ছে কেমন! সে মানুষটা তো রোজকার মতো সকালবেলায় তেলকলে দৌড়েছে বাবার সঙ্গে।
পুষ্প ছেলের গায়ে বিলিতি কম্বলখানা চাপিয়ে দেয়। নাকে কম্বলের রোঁয়া ঠেকতেই নড়েচড়ে ওঠে রোগা-প্যাঁটকা ছেলেটা। পুষ্প তার পাঁচ বছরের বোধনের নাকের ওপর থেকে কম্বল সরায় আলতো হাতে। ঘুমন্ত ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে। তারপর সন্তর্পণে দরজা খুলে বাইরে আসে। ছেলেটা এখন জেগে গেলে মুশকিল। তার অনেক কাজ এখন। বাপের বাড়ি হলে কী হবে, সংসারটা যে তাকেই সামলাতে হয়। মা-টা যে কিছুই পারে না তার মোটা শরীর নিয়ে। তার জন্যেই তো বাপ তাকে শ্বশুর-ঘর যেতে দিল না।
ভাল হোক, মন্দ হোক, শ্বশুর বাড়িটাই হল গিয়ে মেয়েদের নিজের বাড়ি। এমনই বলে ওর সই শেফালি। একই দিনে বিয়ে হয়েছে দু’জনের। সে চুটিয়ে শ্বশুর ঘর করছে। উৎসব অনুষ্ঠানে পালা-পার্ব্বনে বাপের বাড়ি আসে। শ্বশুর বাড়ির গল্প করে কত! শাশুড়ি কেমন কাজের খুঁত ধরে, আইবুড়ো ভাসুরটা মুচকি হেসে তার রান্নার প্রশংসা করে, বিয়ে হয়ে যাওয়া ননদটা কখনও এলে অসভ্য ভাষায় রসের কথা বলে। এমন সব গল্প সইয়ের মুখে শুনতে শুনতে ওরও খুব ইচ্ছে করে শ্বশুর-ঘর করতে।
শুনেছি শ্বশুর বাড়িটা ওদের বাড়ির মতো দালান-কোঠা নয়। মাটির ঘর, খড়ের চাল। তা হোক্ না, তবুও তো শ্বশুর বাড়ি। ওদের মতো বড়লোকও নয় বোধনের বাপেরা। শাশুড়িটাও বেশ বুড়ি হয়েছে, তার ওপর এখন আবার অসুস্থ। ও শ্বশুর বাড়ি গেলে, সে বাড়ির বড় বউ হত। সংসারের দায়দায়িত্ব তার ওপরেই পড়ত। শুনেছে ছোটবউটা নাকি খুব লক্ষীমন্ত। গিদের-অহঙ্কার নেই। তার স্বামীটা মনোহারী জিনিস ফেরি করে গাঁয়ে গাঁয়ে সাইকেলে ঘুরে। তার আর অহঙ্কার হবে কীসে! বরঞ্চ ওরই কদর হত ও-বাড়িতে। তার স্বামী যে তেলকলের মিস্ত্রি। কেউ কেউ আবার ‘মেকানিক’ না কী যেন একটা ইংরাজি নামে ডাকে। এ তল্লাটে কিছুটা নাম ডাকও আছে।
কিন্তু ওর এখন যেন আর ভাল লাগে না মানুষটাকে। কোনও ওজন নেই। বাবা বলল বলেই ঘরজামাই থাকতে রাজি হতে হবে! আসলে, বাবুগিরি খুব মানুষটার! সকালবেলা গিয়ে তেলকলটা খোলার পর তো আর কোনও কাজ নেই। অবরে-সবরে যদি কল খারাপ হয়, তখন না হয় একটু কালি ঘাঁটা। এখন আর অন্য তেলকল খারাপ হ’লে সারাতে যায় না। বাবা বলে, ‘বাবাজীবন মদন। এখন তুমি হলে গিয়ে ধনপতি মণ্ডলের জামাই! এখন কি আর মিস্তিরিগিরি করতে যাওয়া শোভা পায়! আমার ছেলে নাইকো, তুমিই ভবিষ্যতে এই তেলকলের মালিক হবা। মন দিয়ে তেলকলটা চালাও বাবা। কল ঘুরলেই টাকা।’
ওই শ্বশুরের টাকাতেই এখন ওর যত বারফাট্টাই! বাবুগিরি করে ষোল-আনার ওপর আঠারো-আনা। কে বলবে আধপেটা খেয়ে বড় হয়েছে! কে বলবে এখনও নাকি রোজ দু’বেলা উনুনে আগুন পড়ে না ওদের বাড়িতে! সেদিকে ওর কোনও হুঁশ আছে! বলতে গেলে আবার বাবুর রাগ হয়! রাগাতেও ভয় করে, গায়ে যা অসুরের মতো ক্ষমতা!
ওই ক্ষমতা আর শ্যাওলারঙা পাথর-কোঁদা শরীরখানা দেখেই তো এক লহমায় মনে ধরেছিল মানুষটাকে। তেলকলের বিশাল ‘হাঁড়ি’টা একাই যখন ঘাড়ে করে নামাচ্ছিল প্রথমদিন তেলকল সারাতে এসে; তখন ওকে মনে হচ্ছিল যেন বীর হনুমান গন্ধমাদন পর্বত নিয়ে যাচ্ছে ঘাড়ে করে! তা দেখে ওর চোখে মুখে খুশি আর বিস্ময় ফুটে উঠেছিল। হয়তো আরও কিছু ফুটে উঠেছিল! তার সামনে ওই মানুষটার মধ্যেও ফুটে উঠেছিল কেমন একটা নায়ক-নায়ক ভাব! অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা নিশ্চয় লক্ষ করেছিল দু’জনের চোখমুখের ভাষা! তাই তো কল খারাপ হওয়ার অছিলায় ঘনঘন ডাক পাঠানো শুরু করেছিল ওই বীর হনুমানকে। আর মেয়েকে কাজ বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে চলে যাচ্ছিল তিল-তিসি-সর্ষের খোঁজে।
একদিন রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আমতা--আমতা করে মা বলেছিল, ‘পুষ্প! তোর লেগে দু’বচর ধরে তো পাত্তর খুঁজচি! তোর ওই রক্ষেকালির মতন গায়ের রংয়ের লেগে কারুরই পচন্দ হচে নাকো! মনে হচে ওই মিস্তিরি ছেলেটার মনে ধরেচে তোকে! তোরও বোধায় অপচন্দ নয়কো! টাকা-পয়সা না থাক, খাটিয়ে ছেলে তো বটে! তেলকলের কাজটা ভালই জানে! তু রাজি থাকিস তো কতা পাড়ি’!
মায়ের কথায় লজ্জা পেলেও ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল ও। পরক্ষণেই মনে হয়েছিল সে সম্মতি দেবে তো? তার মতো এমন কালো মেয়েকে বিয়ে করবে তো সে! নাকি বিয়ের কথা বললেই তার চোখের নেশা কেটে যাবে, মনের রঙ ছুটে যাবে! এই ক’দিনে যা বুঝেছে, তাতে তো গররাজি হওয়ার কথা নয় সে বীর হনুমানের।
ছিঃ ছিঃ! তাকে হনুমান কেন ভাবছে! যদি সত্যি সত্যিই সে বিয়েতে রাজি হয় তখন! স্বামীকে কি হনুমান ভাবতে আছে! তখন থেকেই তাকে স্বামী ভেবে নিয়ে স্বপ্নের জালবোনা শুরু হয়েছিল। তারপর তো ঘরজামাই থাকতেও রাজি হয়ে গেল মানুষটা।
তেলকলের কাজ ছাড়া আর একটা কাজই ভাল পারে ওই খাটিয়ে ছেলে। তা হল এই রক্ষেকালি মার্কা বউটার গতর ধাম্সাতে। সত্যিই সুখ দিতে পারে বটে মানুষটা! আজ ভোরবেলাতেই তো...! এ-সব কথা ভাবতে ভাবতে খিড়কির ঘাটের দিকে এগোয় পুষ্প। কলের জল নাকি অশুদ্ধ! গরুর চামড়ার তৈরি ‘বাটি’ আছে নাকি কলের ভেতর! তাই পুকুরের শুদ্ধ জল এনে ঘরে-দুয়োরে দিতে হয় রোজ। ওর হাতে পেতলের ঘটিখানা।
এতটা বেলা হলেও এখনও ঘাসের শিশির শুকোয়নি। পুষ্পর পায়ের তলায় শিরশিরানি। পুকুরের পাড়ে নিমগাছে কাকের বাসার কাছে একটা চিল এসে বসেছে। তাই একটা কাক অবিরাম কা-কা করেই চলেছে। কিন্তু চিলটার কোনও হেলদোল নেই। একসময় হয়তো কাকের চিৎকারে বিরক্ত হয়েই উড়ান দেয় চিলটা। উড়তে উড়তে তালগাছ ছাড়িয়ে আরও অনেক উঁচুতে উঠে যায়।
এখন আর চিলটা ডানা নাড়ছে না, শুধু ছড়িয়ে রেখেছে। লেজটার নড়াচড়ায় পাক খাচ্ছে শুধু আকাশ জুড়ে। নিমগাছে কাকটার মনে যেন সন্ন্যাসীর প্রশান্তি। গলায়-রোঁয়া ফুলিয়ে অদ্ভূত একরকম শব্দ করে কাকটা। নিশ্চয় ওটা মা-কাক।
হাঁটুজলে নেমে পুকুরের জলে জল বাড়িয়ে হালকা হয় পুষ্প। হেঁট হয়ে দু’হাতের ধাক্কায় কাছের জলে ঢেউ তুলে, জল সরিয়ে দিয়ে মুখ ধোয়। পুকুরের ওপারে টানা জালের বোঝা নিয়ে হাজির হয়েছে জেলেরা। তাদের একজন জুলজুল করে দেখছে পুষ্পকে। পুষ্প তার দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টি ছোঁড়ে। মুখ ভর্তি জল নিয়ে কুলকুচো করে, তার দিকে তাকিয়ে পিচকারির মতো ফোয়ারা ছোটায়। লোকটা লজ্জা পেয়ে মুখ ঘোরায়।
পেতলের ঘটিতে জল ভরে নিয়ে পুষ্প উঠে আসে ঘাট থেকে। খিড়কির দরজার চৌকাঠে, মাঝ উঠোনে, উঠোনের এক পাশে তুলসীতলায় জলছড়া দেয়। অবশিষ্ট জলটুকু তুলসী গাছের গোঁড়ায় ঢেলে দিয়ে সূর্যের দিকে মুখ করে জোড়হাতে প্রণাম করে। এমন সময় বার দরজায় শোনা যায় খঞ্জনির টুং-টুং আওয়াজ। গোবিন্দবাবাজি এসেছে। খঞ্জনির তালে তালে গান ধরেছে— কৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ। হরেকৃষ্ণ হরে রাম রাধে গোবিন্দ...! গান শেষ হতে পরিচিত সুরে হাঁক পেড়েছে— জয় রাধাগোবিন্দের জয়...!
পুষ্প জানে, গোবিন্দবাবাজি ভিক্ষা চাইবে না। শুধু খঞ্জনিতে টুং-টং শব্দ করে উপস্থিতির জানান দেবে। যতক্ষণ না একবাটি চাল আর দুটো আলু তার ঝুলিতে পড়ছে, ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে দরজায়। সপ্তাহে দু’দিন আসে বাবাজি; মঙ্গল আর শনি।
অন্যান্য দিন এতক্ষণে ধোয়া-মোছার কাজ সারা হয়ে যায় পুষ্পর। আজ ভোরবেলায় ওই মনোহর পরিশ্রমের পর ঘুমিয়ে পড়েছিল আবার। তাই...! এ অবস্থায় ভিক্ষাও দেওয়া যাবে না বাবাজিকে। কাছে গিয়ে বলে, একটু দাঁড়াও গোবিন্দবাবাজি, বাসি কাপড়টা বদলে নিই। আর আমার ছেলেটাকে একটু ঝেড়ে দিও তো! দু’দিন ধরে গা-টা ছ্যাঁক-ছ্যাঁক করছে। কিছুই খেতে চাইছে নাকো! মন্দ বাতাস-টাতাস লাগল কিনা!
বাবাজি একমুখ পাকা গোঁফ-দাড়ির ফাঁকে অমায়িক হাসি হেসে বলে, নিশ্চয় নিশ্চয়! রাধাগোবিন্দের কৃপায় সব ঠিক হয়ে যাবে।
আকাশের চাঁদ যেমন সকলের চাঁদমামা, তেমনি এই বাবাজিও ছেলে-বুড়ো সকলের গোবিন্দবাবাজি। সেই কোন ছোটবেলা থেকে একই রকম দেখছে লোকটাকে। মাথায় গৌরঝুঁটি, নাকে, কানে, গলায় রসকলি কাটা। সাদা কাপড় লুঙ্গির মতো পরা। গায়ে একটা সাদা উড়ূনি আর হাতে খঞ্জনি। কাঁধে ঝোলানো কাঁথার মতো সেলাই করা কাপড়ের একখানা ঝুলি। লোকটার বয়সের কোনও গাছ-পাথর নেই। ওর আসল নামও কেউ জানে না। গোবিন্দকে সব সময় ডাকার জন্য ওকেও সকলে ‘গোবিন্দ’ বলে ডাকে। আশেপাশের গ্রামের প্রায় সকলেরই প্রিয় এই মানুষটা কোনও মন্ত্র-তন্ত্র জানে না। নিজে স্বীকারও করে সে কথা। তবুও মানুষের বিশ্বাস, অসুস্থ, আতুরের দেহ স্পর্শ করে ও একবার ‘জয় রাধা-গোবিন্দ’ বললেই নাকি সুস্থ হয়ে ওঠে বাচ্চাকাচ্চা।
তাই পুষ্প বোধনকে বিছানা থেকে তুলে, মুখে-চোখে জলের ছিটে দেয়। তারপর নিজের শাড়ি বদলে বাবাজির কাছে নিয়ে আসে। তখনও ছেলের চোখে ঘুম জড়ানো। একরকম টানতে টানতেই ছেলেকে বার-দরজার কাছে আনতে হয়। কারণ বাবাজি কখনও কারুর বাড়ির ভেতর ঢুকতে চায় না। বলে, ‘গৃহস্থের বাড়ির ভেতর অনেক মায়াজাল পাতা থাকে! গৃহে ঢুকলে যদি মায়াজালে বন্দি হয়ে যাই কাতলা মাছের মতো! তখন কী হবে! বায়ু-সমুদ্রের বায়ুর টানে প্রাণবায়ুটা বেরিয়ে আসবে যে’! কথাক’টা বলেই দরাজগলায় প্রাণখোলা হাসবে ওই আপনভোলা মানুষটা। সে হাসি যেন তখন বিকশিত শতদল।
এখন ওই শতদলের আধফোটা কুঁড়ির মতো এক হাসি পাকা গোঁফ-দাড়ির ফাঁকে ফুটে উঠেছে। নাড়ূগোপালের নাড়ূ খাওয়ার ঢঙে হাঁটু মুড়ে বসে বুকে জড়িয়ে ধরেছে বোধনকে। তারপর ওর মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলে উঠেছে, জয় রাধা-গোবিন্দ।
বোধনের চোখে লেগে থাকা ঘুমটুকু উড়ে যায় ওই গুরুগম্ভীর শব্দে। সেই সঙ্গে হয়তো মন্দ বাতাসটাও ওকে ছেড়ে ডানা মেলে, দূর আকাশে ওড়া চিলটার মতো। পুষ্প গলায় কাপড়ের আঁচল জড়িয়ে, কপালে হাত ঠেকিয়ে অদ্ভূত এক তৃপ্তির শব্দ করে। ঠিক সেই গলার রোঁয়া ফোলানো কাকটার মতো।
একবাটি চাল, দুটো আলু আর একটা বেগুন ঝুলিতে পড়তেই আর একবার রাধা-গোবিন্দের শরণ নিয়ে রাস্তায় পা-বাড়ায় গোবিন্দবাবাজি।
বাবাজির চলে যাওয়া পথে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পুষ্প ছেলেকে নিয়ে এগোয় ঘরের দিকে। যেতে যেতে ভাবে— আবার এ কাপড়খানা ছেড়ে আকাচা কাপড়টা পরতে হবে। ভিক্ষে দেওয়ার কাজটা যদি মা করতে পারত; তাহলে আর কাপড় বদলানোর ব্যাপার থাকত না। কিন্তু এখনও মা ভসভসিয়ে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। সংসারে যেন থেকেও নেই মানুষটা! কোনও কাজে পাওয়া যাবে না। বিয়ে দেওয়ার পরেও মেয়েকে বাড়িতে রেখেছে বলে যেন যত দায়-দায়িত্ব মেয়ের! সংসারটা যেন মেয়েরই, এমন ভাবখানা। মোটা মানুষ কি কোনও কাজকর্ম করে না! আসলে গতর না নড়িয়ে নড়িয়ে আরও মোটা হয়ে গেছে। জামাইকে অবধি খাটাতে চায় সুযোগ পেলে। ঘরজামাই বলে সে ফ্যালনা নাকি! তা-ও যদি মুখের কথার ছিরিছাঁদ থাকে। বলে কি না, ‘খালি মেয়েকে দেকলে চলবে, মা-টাকেও একটু দ্যাকো’! এ কেমনতর ‘আগামবাইশে’ কথা রে বাবা! তুমি হলে গিয়ে শাশুড়ি। জামাইকে এমনধারা কথা বলা মানায়! আসলে জ্বলে মরে। মেয়ের এমন স্বামী-সুখ সহ্য হয় না। মা হলে কী হবে!
এ-সব কথা ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢুকে শাড়িখানা ফরফর করে খুলে ফেলে পুষ্প। পুরো দিগম্বরী হয়ে ঘরের কোণে রাখা আকাচা সায়া আর কাপড় হাতে তুলে নেয়। ছেলেটা তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছে পুকুর ধারে ডুমুর গাছে একটা সাদা ধবধবে বক বসে রয়েছে। মা বলে, ‘ওগুলো নাকি ধম্মবক, ওদের নাকি টিকি থাকে বোষ্টমদের মতো’।
পাঁচ
‘ওগো তুমি পঞ্চদশী, পৌঁছিলে পূর্ণিমাতে’
— রবীন্দ্রনাথ
সূর্য তখন মাঝ-আকাশে। উঠোনের এ-দিকটাতে রোদ্দুর রয়েছে; সেখানে পা ছড়িয়ে বসে ক্ষান্তমণি। ঠাক্মার সারা শরীরে রসুন-তেল মালিশ করা হয়ে গেলে কমলা বলে, তুমি এই রোদে বসে থাক খানিকক্ষণ, গায়ে তেলটা বসুক। আমি ততক্ষণে ভাতের ফ্যান গেলে আসি।
দেখিস মা, সাবধানে ফ্যান গালিস, যেন হাত-পা পোড়াস না— ঠাকমার এই সাবধানবাণীতে কমলা ঘাড় নাড়ে শুধু। কমলা ভাত রান্না করেছে অনেক দিন, অনেক বার। কিন্তু ভাতের ফ্যান ঝরানো এই প্রথম। মা-কাকিমাকে দেখেছে ভাতের হাঁড়িতে ঢাকনা দিয়ে অদ্ভূত কায়দায় হাঁড়িটা উলটে দেয় একটা ডেকচিতে। আজ সেই কাজটা ও করবে ভেবে যেমন একটা আনন্দের অনুভূতি; তেমনি এক দুরু দুরু ভয়ও জায়গা নেয় মনে— ঠিকঠাক পারবে তো? হাঁড়ি উপুড় করতে গিয়ে হাতে-পায়ে গরম ফ্যান পড়বে না তো? নাকি মাকে ডাকবে এ কাজটা করে দেওয়ার জন্য? না থাক, নিজেই পারবে ঠিক! দেখেছে তো অনেক দিন কেমন কায়দায় হাঁড়িটা কাত করতে হয়।
কমলার মনে হঠাৎই উদয় হয়— আচ্ছা! যখন বিয়ে হয়ে যাবে ওর, তখন স্বামীর ঘরে গিয়ে রান্না তো করতে হবে ওকেই। তখন তো একাই সবকিছু...। না না তা কেন, শাশুড়ি তো থাকবে!
ভাবনা থামিয়ে হঠাৎই কমলা লজ্জা পেয়ে যায়— ছিঃ! বিয়ের কথা ভাবছে কেন সে! এখন তো তার সবে পনের! বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি! তবুও মা কেন যে মাঝে মাঝেই বিয়ের কথা তোলে, শ্বশুরবাড়ির কথা তোলে! মা বিয়ের কথা তোলে বলেই তো তার মনে এ-সব ভাবনা...! এই তো সেদিন ঘাট থেকে বাসন ধুয়ে আনার পর মা একটা বাসনে শুকিয়ে যাওয়া এঁটো খুঁজে পেয়েছিল। তারপর মায়ের বকবকানি শুরু, ‘শ্বশুর-ঘর গেয়ে এমন কাজ করলে ঝাঁটা নিয়ে তাড়া করবে শাশুড়ি। ননদ মুখঝাম্টা দেবে। বিয়ে দিলে এক ছেলের মা হয়ে যেতিস, এখনও বাসনটা ভাল করে মাজতে শিকলি না।’
সে-দিন মায়ের ওই কথায় লজ্জা নয়, খুব রাগ হয়েছিল ওর। বিয়ে দিলে সাত তাড়াতাড়ি এক ছেলের মা কেন হতে যাবে ও। ওই তো অঙ্গনওয়াড়ি মমতাদিদি সে-দিন পাশের বাড়ির বউদিকে বোঝাচ্ছিল, ইচ্ছা করলে মা হওয়া আটকানো যায়। নানারকম উপায় আছে মা না হতে চাওয়ার, বাচ্চা না নেওয়ার। ও লজ্জা পেয়ে সরে আসছিল। তা দেখে মমতাদিদি বলেছিল, না না এসবে লজ্জার কিছু নেই, শেখার জিনিস। তুমিও শোন। তোমারও একদিন বিয়ে হবে। এ-সব জেনে রাখা ভাল।
তারপর মমতাদিদি ওকে আর ওই বউদিকে পাশে বসিয়ে শুনিয়েছিল ছোট পরিবার সুখী পরিবারের কথা, গর্ভনিরোধের কথা। সেই সঙ্গে ও জেনে গিয়েছিল মা হওয়ার গোপন রহস্য। সেই ‘মা’ হওয়ার কথা বাবার সামনে বলতেই, ওর খুব রাগ হয়েছিল সেদিন। পরশু রাতেও বাবার কানের কাছে মাকে ফিস্ফিস্ করে বলতে শুনেছে— শোন! গায়ে হিমজল ঢেলে বসে থাকল হবে না। দিনকাল ভাল নয় আখুন। বয়েস কম হলে কী হবে! মেয়েটার শরীলের দিকে তো তাকানো যায় না! মাঠে ঘাটে যায়, ককন কী করে ফেলে! একবার কালি লাগলে সে কালি জীবনেও উটবে নাকো! তুমি পাত্রর খোঁজ কর। দেখাশুনা করতে করতেও তো বচর ঘুরে যাবে।
ও তখনও ঘুমোয়নি। মায়ের কথাগুলো শুনে মরমে মরে যাচ্ছিল। আবার রাগও হচ্ছিল। কালি লাগার কথা বলছিল মা, ব্যাপারটা ভাল বোঝেনি ও। তবে, ওর নিজের ওপরে খুব রাগ হচ্ছিল কিংবা ‘ভগমানের’ ওপরে। কেন যে শরীরটা এত ডাগর হয়ে যাচ্ছে! ওই তো ওরই বয়সী কাজুলি; সে তো সিড়িঙ্গে পারা হয়ে আছে কেমন! এখনও ‘ছোটজামা’ পরা ধরেনি। কোনও ব্যাটাছেলে তার দিকে তাকায় না। কিন্তু ও ঘাটে গেলেই মদ্দরা কেমন আশেপাশে ছুকছুক করে! কেমন হেসে হেসে কথা বলতে চায়। সে-দিন পুকুরঘাটে তালকাঁড়ির ওপর বসে পায়ের গোড়ালি ঘষছিল ঝামা দিয়ে। দত্তবাড়ির নবকাকা চান করতে নামার সময় গুজগুজ করে বলছিল, ও কম্লি! তোর হাঁড়িখানা সরা। পুরো ঘাট জুড়ে বসিচিস যে!
ও বলেছিল, হাঁড়ি কোতা দেকলে? আমি তো...!
নবকাকা গা ঘেঁষে নামার সময় ওর পাছায় হাত ঠেকিয়ে বলেছিল, ধুর পাগলি! এই হাঁড়ির কতা বলচি! কাত করিস্ না রস গড়াবে।
কথাটা বলেই নবকাকা ঝপাং করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুব সাঁতার দিয়ে উঠেছিল পশ্চিমপাড়ের ঘাটে। আর ও তখন ঘাট থেকে তড়িঘড়ি উঠে পা বাড়িয়েছিল বাড়ির পথে। যেতে যেতে দেখেছিল, পুকুরপাড়ে কলাবাগানে ধর্মরাজের নামে ‘উচ্ছুর্গ্য’ করা পাঁটাটা সামনের দু’পা তুলে কচি কলাগাছের পাতা নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করছে।
হাঁড়িটা ঠিকঠাক কাত করতে পেরেছে কমলা। হাত-পা পোড়ায়নি। ডেকচির ওপর প্রায় উপুড় হওয়া হাঁড়িটা থেকে কুলকুল করে ফ্যান গড়াচ্ছে। বোধহয় ডেকচিটা ভর্ত্তি হয়ে উপ্চে যাবে। জলের আন্দাজ করতে পারেনি ঠিক। কাকিমা এমন মেপে জল দেয়; ফ্যান কখনও ডেকচি ছাপায় না। আবার কমও হয় না। ফ্যান ঝরানো হয়ে গেলে ডেকচিটা ধরে নিয়ে গিয়ে পুরো ফ্যানটা কাকিমা ঢেলে দেয় হাঁসের খাবারের খুলিতে। না হাঁসের জন্য নয়, ছেলেপুলের মা খেঁকিটার জন্য। ঠিক ওই সময়ই বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে খেঁকিটা ঢুকবে। রোজ কী করে যে সময়টা বুঝতে পারে কুকুর হয়েও, তা কমলার মাথায় আসে না। আজ হয়তো এসে ঘুরে গিয়েছে কুকুরটা।
গুলের আঁচে উনুনটা গন্গন্ করছে। এখনও অনেক আঁচ রয়েছে। আর কিছু রান্না করারও নেই। এমনি এমনি বয়ে যাবে! গুল একটু কম দিলেই হত। ও ভাবে, জল ঢেলে আঁচটা নিভিয়ে দেবে কি না! তাহলে হয়তো ওই গুল দিয়ে আবার পরে আঁচ ধরানো যেত। দোনামনায় পড়ে ক্ষান্তমণির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, ও ঠাক্মা! উনুনে আখুনো অনেক আঁচ রয়েচে, জল ঢেলে নিবিয়ে দোব আগুন?
না না, জ্বলন্ত উনুনে জল ঢালিস্ না, ফেটে যাবে উনুনের ভেতরটা। চটা ছেড়ে ছেড়ে পড়বে।
কমলা উনুনে জল ঢালা থেকে বিরত হয়। কিন্তু বেফালতু আঁচটা বয়ে যাবে বলে পস্তানিও হয়। উনুনে গন্গনে আঁচ দেখলেই, তাতে কিছু বসাতে ইচ্ছা হয় মেয়েদের। আর মেয়েদের শরীরে গন্গনে আঁচ দেখলেই ব্যাটাছেলেরা...এমন ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ওর মাথায় আসে— একটু জল গরম করে নিলে তো হয়। বেলা পড়ে গেছে, এখন ঠাকমাকে ঠাণ্ডা জলে চান না করিয়ে দু’ঘটি গরম জলে...! কাকিমাও তো তাই করে।
রান্নার চালায় পড়ে থাকা মাটির পোড়া হাঁড়িটা এনে জল চড়ায় কমলা। ও জানে, এ হাঁড়িটা এ-সব কাজের জন্যেই। কতরকম কাজ যে হয় এই একটা হাঁড়িতে। কাপড়-চোপড় ময়লা হলে এই হাঁড়িতে জল চড়িয়ে, কাপড় কাচা সোডা দিয়ে কাপড়গুলো ভট্ ভট্ করে ফোটায় কাকিমা। কখনসখনও ধানসেদ্ধ হয় হাঁড়িতে। আবার কখনও কাঁকড়া ধরার ফাঁদ পাতা হয় এ হাঁড়িতেই। হাঁড়ির গলায় কলাগাছের বাস্না বেঁধে হাঁড়ির ভেতর ভাত-কুঁড়ো দিয়ে সাঁঝবেলায় পুকুরঘাটে হাঁড়িটা ডুবিয়ে রাখলেই ব্যাস! ভাত-কুঁড়োর লোভে কলার বাস্না বেয়ে কাঁকড়া ঢুকে পড়ে হাঁড়িতে। আর বেরোতে পারে না। সত্যিই হাঁড়িতে ঢোকা কত সহজ, অথচ একবার ঢুকে পড়লে আর বেরোনো যায় না। হাঁড়ির মধ্যেই ঘুরপাক খেতে হয়। হাঁড়ির কথা ভাবতে ভাবতে ওর হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেদিন পুকুরঘাটে নবকাকার কথাটা। বলেছিল— তোর হাঁড়িটা...। ইস্ কী অসভ্য নবকাকা! ও আবার নাকি শিক্ষিত! দুটো পাশ দিয়েছে।
উনুনে হাঁড়িতে জল গরম হচ্ছে। কমলা রান্নার চালায় বসে ভাবছে এ-সব কথা। ওর ভাবনার কোনও মাথামুন্ডু নেই। ‘হাঁড়ির’ ভাবনা থেকে লতাকাকিমার হাঁড়ির মতন পেট নিয়ে বাচ্চা হতে হাসপাতাল যাওয়া, সে বাচ্চা ছেলে না মেয়ে এ-সব পেরিয়ে, কাকা এখনও না ফেরার চিন্তায় যখন ভাবিত কমলা; তখনই ডাক পড়ে ও-বাড়ি থেকে। কমলার মা হাঁক পাড়ে— ও কম্লি! তোর হল? এবার খেতে আয়। ভাত যে জুড়িয়ে গেল!
আসচি মা! একটু পর যাচ্চি। তুমি খেয়ে নাও।
কমলা কাজের গতি বাড়ায়। গরমজল নামিয়ে ঠাক্মাকে ধুয়ে-মুছিয়ে দেয়। তেলচিটানি কাপড়টাও বদলে দেয়।
বুড়ি ক্ষান্তমণি স্নানের পর বেশ শীত অনুভব করছে। উঠোনের এক চিলতে রোদে জবুথবু হয়ে বসে ভাবছে— কমলিটা খুবই গুণবতী। এইটুকুনি মেয়ে! কত সংসারি হয়ে উঠেছে। এই তো সেদিন ওকে দু’পায়ের ফাঁকে শুইয়ে কচি কচি হাত-পা গুলোতে তেলমালিশ করে দিত। সেই মেয়েই আজ...!
ও ঠাক্মা! ভাত বেড়িচি, এসো!
কমলার ডাকে ক্ষান্তমণি নড়েচড়ে। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে আস্তে আস্তে ভাতের থালার সামনে পৌঁছয়। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে। সকাল থেকে তেমন কিছু পেটে পড়েনি। তবুও ভাতের থালায় হাত দিতে মন সরে না ক্ষান্তমণির। ছেলেটা বউকে নিয়ে বেরিয়েছে কোন সকালে! কী হল, না হল; ছেলেটার পেটে কিছু পড়ল কি না কে জানে! বউটা কষ্ট থেকে মুক্তি পেল কি না! সে-ও তো কাল রাতের খাবার সব উগড়ে দিয়েছে ভোরবেলায়।
গরমভাত থেকে ভাপ বেরোচ্ছে। কমলা পাশে বসে শিম আলুসেদ্ধ মাখছে নুন-লঙ্কা-পেঁয়াজকুচি দিয়ে। রান্নার চালায় সেই শ্যামাপাখিটা ভীরু ভীরু চোখে এসে বসেছে। তুড়ূক তুড়ূক করে লাফাচ্ছে পাখিটা, আর ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কী দেখছে কে জানে!
ঠাকমা ঘি নাইকো? শুদু ভাতে ভাত করিচি, এট্টূ ঘি নইলে খেতে পারবা নাকো।
না রে নাইকো! হারুগয়লা সেই কবে এক পোয়া ঘি দিইছিল, তা কি আর থাকে! বউমাকে এ সময় এট্টূ দুধটা ঘি-টা...। আখুন তো ওকে দু’জনের লেগে খোদ্দানি দিতে হয়। সেদিন হারুকে দেকতে পেয়ে বললাম ঘিয়ের কতা। কিন্তু ও গায়ে মাকল না। ব্যাটা পাজির পা-ঝাড়া। নগদ পয়সা পায় না তো, হাঁসের ডিম দিয়ে শোদ হয় বলে দিতে চায় নাকো।
দুটো চড়াই পাখি ফর্ফর্ করে উড়ে এসে দাওয়ায় বসে। চিক চিক শব্দ করে লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে অদৃশ্য খাবার খায় খুঁটে খুঁটে। কয়েক পলক পরেই পাখিদুটো ফুরুৎ করে উড়ে গিয়ে বসে সজনে গাছে।
ঠাকমা, কিছুই তো খাচ্চ নাকো, খালি নাড়াচাড়া করচ। পেট ভরে না খেয়েই তোমার অমন দশা হয়েচে। দশায় মশা বসচে। আর এট্টূ খাও দিকিনি— কমলার গলায় যেন কর্তৃত্বের সুর!
আর খেতে পারচি নাকো। খালি শুয়ে থাকলে কি খিদে হয়? ক্ষান্তমণির স্বরে ছেলেমানুষের বাহানা! শ্যামাপাখিটাকে আর রান্নার চালায় দেখা যাচ্ছে না। কোন অজানায় উড়ে গেছে কে জানে! উনুনের আঁচটা নিভন্ত। কিন্তু আশপাশের জিনিসপত্রগুলোকে তাতিয়ে দিয়েছে।
কমলা নিজের মনেই বকতে থাকে— আমার আর কী! না খেয়ে খেয়ে শরীলখানা পাটকাটি করেচ। আমি যেমন পাললাম রেঁদে-বেড়ে দেলাম।
অনেক বছরের পুরনো খড়ের চালের ছ্যাঁদা দিয়ে দুপুর-পেরোনো এক চিলতে রোদ্দুর এসে পড়েছে সকাল-বয়সী কমলার মাথায় মুখে। ওর মুখটা কেমন যেন মা মা হয়ে উঠেছে। কিশোরীর চপলতা কোনও মন্ত্রবলে যেন উধাও হয়ে গেছে। সে জায়গায় দখল নিয়েছে পাকা গিন্নির দায়িত্ব ও অভিজ্ঞতা! এখন যেন পূর্ণিমার চাঁদের মতো জ্যোতি বেরোচ্ছে কমলার মুখ থেকে।
এমন সময় ভাঙা পাঁচিলের ওপাশ থেকে ডাক আসে— কই রে! ও-কম্লি! তোর হল? আয় মা! ভাত যে জুড়োল!
কালো খেঁকিটা তার ছানাগুলো নিয়ে উঠোনে ঢোকে এসময়। তার পেটে যেন জম্মের খিদে। হাঁসের খাবারের খুলিতে রাখা ভাতের ফ্যান খেতে থাকে চকাস চকাস শব্দে। আর মাঝে মাঝে মুখ তুলে কমলার দিকে তাকায়।
কমলা দাওয়া থেকে নেমে একটা কুকুরছানাকে খপ করে ধরে কোলে তুলে নেয়। আধ-আধ কথায় আদর করে— কুর কুর ময়না, কাল দোব গয়না, পশ্যু দোব বিয়ে টোপর মাতায় দিয়ে...।
তারপর কুকুরছানাটাকে ছেড়ে দিয়ে ছুট লাগায়— ও ঠাকমা, গেলাম। সাঁঝবেলায় আসব।
ছয়
‘বিলম্বে উঠেছ তুমি কৃষ্ণপক্ষে শশী
রজনীগন্ধা তবু চেয়ে আছে বসি’
ভগা-বাগদির ভ্যানরিকশা যখন হাসপাতাল চত্বরে পৌঁছল, তখন রোদ্দুরটা তেমন আরামদায়ক লাগছে না জগনের। আর ভগার নাকের ডগা থেকে ঘাম ঝরছে টস টস করে। লতা ভ্যানরিকশায় চড়ার পর প্রথম দিকে একটু যন্ত্রণাকাতর হয়ে পড়লেও, মাঝে কেমন থিতিয়ে গিয়েছিল ব্যথাটা। তবে ভ্যানের ঝাঁকুনিতে লতা কঁকিয়ে উঠছিল মাঝে মাঝে। হাসপাতালের কাছাকাছি গিয়ে ব্যথাটা আবার চাগাড় দিয়ে উঠল।
‘জরুরী বিভাগ’ লেখা ঘরটার সামনে শিরীষ গাছের তলায় গিয়ে ভ্যান থামতেই জগন ভেতরে ছুটল স্টে্রচার আনতে। কিছুক্ষণ পর ফিরে এল খালি হাতে। স্টে্রচার পায়নি। দুটো স্টে্রচারে দু’জন রোগী শুয়ে আছে। অন্য স্টে্রচার দুটোর হাতল ভাঙা। তাই জগন আর ভগা ধরাধরি করে লতাকে নিেয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল এমার্জেন্সির টেবিলে। প্রায় মিনিট পনের পর ফুরসত পেয়ে একজন ডাক্তার এলেন লতার কাছে— কী হয়েছে?
জগন ইশারায় লতার পেটটা দেখাল।
ডাক্তার খুব বিরক্ত— ও! তা এখানে কেন? এটা এমার্জেন্সি; প্রসূতি বিভাগে নিয়ে যাও। যত্তসব!
জগন আর ভগা ধরাধরি করে লতাকে নিয়ে গেল প্রসূতি বিভাগে। বেশ কিছুক্ষণ পর একজন নার্স কাছে এল— দেখি কার্ড দেখি। কবে ডেট?
জগন আকাশ থেকে পড়ল— কাড! কাড তো করাইনি। ওই ঘর থেকে এখেনে পাঠিয়ে দিল।
কার্ড করাওনি! হাসপাতালে দেখাওনি এই ন’মাসের মধ্যে?
এক সপ্তা আগে এনেছিলাম। সেদিন বাচ্ছা হয়নিকো। বাড়ি ফেরত পাঠিয়েছিল আমনাদের মেয়েছেলে দাক্তার।
কোথায় সেদিনের কার্ড?
জগন মাথা চুলকোয়। তাড়াহুড়ো করে বেরিয়েছে। সেদিনের কার্ডখানা নেওয়া হয়নি। ও ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে নার্সের দিকে।
কী হল? আনোনি?
ভুলে গেইচি দিদিমণি। তাত্তারি বেরোতে গিয়ে...!
তা তো ভুলবেই, তুমি ওর কে হও? স্বামী?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আসল কাজটার সময় তো ভুল হয় না। ক’মাস যেতে না-যেতেই বউয়ের পেট ডাগর করে দাও। যাও এমার্জেন্সি থেকে একটা লাল কার্ড করিয়ে আন। যতসব অশিক্ষিতের হাতবা’...!
কোথায় যেতে হবে না বুঝলেও জগন পা বাড়ায়। সেদিন লতা এর চেয়ে সুস্থ ছিল। নিজেই কার্ডটা করেছিল। জগনকে মেয়েদের লাইনে দাঁড়াতে দেয়নি অন্যান্য মহিলারা। কিন্তু আজ...। ভগা বাগদি বেশ কয়েকবার হাসপাতালে পেসেন্ট নিয়ে এসেছে। ও জগনের পেছনে গিয়ে বলে, চল, আমি জানি কোতা কার্ড হয়।
লতার ব্যথাটা জিরিয়ে গেছে আবার। ও লম্বা বারান্দার এক পাশে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে রয়েছে। জগন আর ভগা বাগদি দু’জনেই চলে যেতে ও অসহায় বোধ করে। এর মধ্যে সেই নার্সকে আবার পাশ দিয়ে যেতে দেখে লতা কঁকিয়ে ওঠে, দিদিমণি! আর সইতে পাচ্চি না। কাল রাত থেকে ব্যতা উটেচে।
‘ব্যতা উটেচে’ তা আমি কী করব? আমি কি আহ্লাদে নাচব! তখন আরাম লেগেছিল এখন একটু ব্যথা তো সইতেই হবে। তোমার কার্ড-টার্ড তো কিছুই নেই। কার্ড আসুক তারপর লেবার-রুমে ঢোকাব।
গজ গজ করতে করতে চলে যায় নার্স। লতা কষ্ট-জড়ানো চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। লতার কানে আসছে অন্যান্য মহিলার আর্তকণ্ঠ। তখন মনটাতে একটা ভয় ছড়িয়ে পড়ছে। আবার কচি বাচ্চার কান্নার শব্দও কানে আসছে। তখন ওর মনে একটা অজানা আনন্দের ঝিলিক। প্রচণ্ড ব্যথার চোটে কেউ আবার চিল-চিৎকার শুরু করেছে। লতা ভাবে, ওই বারান্দার ওপাশেই তো বাচ্চা হতে আসা মহিলাদের সারি সারি বেড। সে-দিন দেখেছে। বেডে জায়গা না পাওয়ায় সেদিন ওই দরজাটার পাশে পড়েছিল। দেখা যাক আজ আবার কী দশা হয়।
বেশ কিছুক্ষণ পর জগন ও ভগা আসে। জগনের হাতে একখানা কার্ড। ও এসে লতাকে দেখতে পেয়ে আশ্বস্ত হয়। ওর কাছে যায়— কী গো আখুন যন্তনা হচে খুব?
এট্টূ কম। কাড হল?
হ্যাঁ।
দিদিমণিটা ওইদিকে গেয়েচে। ওই ঘরটায় আচে মনে হয়। যাও শিগগির!
জগন পায়ে পায়ে এগোয় ঘরটার দিকে। এগোনোর আগে একবার ভগার দিকে তাকায়। ভাবখানা এমন, তুইও আয় ভাই আমার সঙ্গে, দিদিমণির যা মেজাজ! একজন আয়া ওদেরকে ভেতরে ঢুকতে দেখে বলে, এই মিন্সেরা! মেয়েদের ওয়াডে ঢুকেচ কেন? মজা দেকতে নাকি! যাও, বাইরে যাও।
জগন ভয়ে পিছিয়ে আসে। ঘরটাতে যাওয়ার দরকার হয় না। তার আগেই সেই নার্স ঘর থেকে বেরিয়ে হনহন্ করে আসছে এ দিকেই। জগন প্রস্তুত হয়েই থাকে কাছে এলেই...!
দিদিমণি কাড এনিচি।
এনেছ, দাও দেখি। ওমা! এ তো আউটডোরের কার্ড। শুধু পেসেন্টের নাম লেখা, ফাঁকা। উফ্! তোমাদের নিয়ে আর পারা যায় না। কই এস দেখি আমার সঙ্গে। কী নাম তোমার বউয়ের?
আজ্ঞে লতা, লতা হালদার।
বয়স কত?
বয়স! তা সতর-আঠার হবে বোধায়!
সতের-আঠার! তাহলে তো তোমাকে থানার লক-আপে পাঠানো দরকার। জান, মেয়েদের আঠারোর আগে বিয়ে করা আর কুড়ির আগে মা হওয়া বে-আইনী।
তাইলে দিদিমণি ওই কুড়িই করে দিন না। আমাকে লকাপে দিলে লতাকে বাড়ি নিয়ে যাবে কে!
কথা বলতে বলতে ওরা পৌঁছে গেছে এমার্জেন্সি বিভাগে। নার্সটির তৎপরতায় মিনিট দশেকের মধ্যেই এমার্জেন্সি টিকিট করিয়ে ওরা ফিরে আসে লতার কাছে। লতা তখন প্রবল ব্যথায় মেঝেতে শুয়ে ছটফ্ট করছে।
এই মেয়ে! ওঠ। দেখি লেবার-রুমে নিয়ে গিয়ে...।
লতার উঠে দাঁড়ানোর মতো পরিস্থিতি নেই। করুণ চোখে সে তাকায় নার্সটার দিকে।
কী হল ওঠ! মা হওয়া অত সহজ নয়। এটাই প্রথম তো! চল ওঠ!
কথা বলতে বলতে লতাকে ধরে ওঠায় নার্স। তারপর একরকম বগলদাবা করেই ওকে নিয়ে এগোয় লেবার-রুমের দিকে। যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে জগনকে বলে, অ্যাই! তুমি সট্কান দেবে না! এখানেই থাকো। ওষুধ-ইঞ্জেকশন কিনে আনতে হবে।
লতাকে লেবার-রুমে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় নার্স। জগন একটু দূরে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ভগা একটু উস্খুস্ করে বলে, জগাদা, আমি বাইরে আচি। পেরোজন হলে ডাকবা। ভ্যানটা বাইরে আচে তো, আমি যাই।
সকাল থেকে খুব ধকল গেল জগনের। সেই মুখ ধুয়ে আসার পর থেকে আর বিরাম নেই। এক কাপ চা খাওয়ারও ফুরসত পায়নি। একটু চাঙ্গা হয়ে নেওয়ার জন্য পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে একটা বিড়ি নিয়ে ঠোঁটের ফাঁকে গোঁজে। পকেটে দেশলাই হাতড়িয়ে পায় না। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আর একজনের কাছে দেশলাই চাইতে সে বলে ওঠে, বিড়ি ফেল শিগ্গির। হাসপাতালে বিড়ি খাওয়া নিষেধ। ধরতে পারলে পাঁচশো টাকা ফাইন নয় তো হাজত।
বিড়ি খাওয়া নিষেধ! কিন্তু আমার কাচে যে সিগারেট নাইকো। সিগারেটের যা দাম হয়েচে!
এই! কোথাকার ভূত তুমি? বিড়ি-সিগারেট সবকিছু খাওয়া নিষেধ। ওই দেকো তোমার মাথার ওপরে দেয়ালে লেকা আছে— ধূমপান নিষেধ।
কিন্তু ওই ঘরে টিকিট করাতে গিয়ে দ্যাকলাম একজন সিগারেট খেছিল। দাক্তার হবে মনে হয়। ওদের ফাইন হয়নাকো?
লোকটা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল জগনকে। এমন সময় সেই নার্স দরজা ফাঁক করে চিৎকার করে— লতা হালদারের বাড়ির লোক...!
জগন বিড়িটা বুক পকেটে ফেলে দৌড়য়— যাই দিদিমণি!
এই নাও, এই ওষুধ আর ইঞ্জেকশনগুলো কিনে নিয়ে এস তাড়াতাড়ি। তোমার বউয়ের ডেলিভারি হবে কিছুক্ষণের মধ্যে, যাও শিগ্গির।
কাগজখানা হাতে ধরিয়ে দিয়ে দিদিমণি আবার দরজা বন্ধ করে দেয়। জগন বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে এক মুহূর্ত। তারপর পায়ে পায়ে গেটের বাইরে যায়।
শিরীষ গাছের গুঁড়ির চারপাশে সিমেন্টের তৈরি গোল বেঞ্চিতে বসে রয়েছে ভগা বাগদি। ওর ভ্যানরিকশাটা গাছের ওপাশের ফাঁকা জায়গায় রেখেছে। জগনকে বেরোতে দেখেই ও উঠে দাঁড়ায়। জগন এ-দিক ও-দিক তাকিয়ে ভগাকে দেখতে পেয়ে কাছে যায়— ভগা, ক’টা ওষুধ-ইঞ্জেশন কিনতে হবে, এই যে এতে লেকা আচে।
কিনে আনোগা। ওষুদের দোকান চেন তো? ওই যে ওই জলট্যাঙ্কের ওপাশে ‘এমিডি’ ওষুদের দোকান।
হ্যাঁ, দোকান আমি চিনি, কিন্তু...! বলছেলাম তু-ও চ না আমার সঙ্গে। বসেই তো থাকবি।
বলচ যখন চল।
বেশ ভিড় রেমিডি ফার্মেসীতে। তবুও একটু ফাঁক পেতেই জগন কাগজের টুকরোটা ধরিয়ে দেয় দোকানের একজনকে। সে কাগজ দেখে মনে মনে হিসেব কষে বলে, দু’শো আশি টাকা মতো লাগবে। দোবো তো?
কালকের বিক্রিবাটার দু’শো টাকা ছিল। বেরোনোর সময় সেই টাকাটা নিয়ে বেরিয়েছে জগন। আশি টাকা কম পড়ছে। এই আশঙ্কা-ই করছিল সে। তাই ভগাকে সঙ্গে ডেকে নিয়েছে। এখন অথই জলে পড়ে যেন ও। ডুবন্ত অবস্থায় খড়কুটো ধরার মতো ভগা-বাগদিকে বলে, তোর কাচে আশি টাকা হবে?
ভগা অপ্রস্তুতের হাসি হাসে, আমি অত টাকা কোতা পাবো! চা-জল খাবার লেগে দশটা টাকা নিয়ে বেরিইচি আমি।
দোকানদার কাগজখানা পেপারওয়েট চাপা রেখে অন্য খরিদ্দার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জগন একবার ভাবে, ধার রাখার কথা বলবে কি না দোকানদারকে। পরক্ষণেই ভাবে, বলে লাভ হবে না। তাকে চেনে না, জানে না, ধার কেন দেবে! পরিস্থিতি দেখে ভগা মুশকিল আসান করে, দাঁড়াও জগাদা, এক জন চেনা ‘প্যাডলার’-কে দেখেছেলাম হাসপাতালের সামনে। ও বোম লাগা পেসেন নিয়ে এয়েচে। আমাদের গাঁয়ের পুব পাড়ায় থাকে। ওর কাচে হতে পারে।
ভগা জগনের সায়-উত্তরের অপেক্ষা না করেই ছুট দেয় হাসপাতালের দিকে। ফিরেও আসে কিছুক্ষণ পর। তার মুখে বিজয়ীর হাসি— পেইচি জগাদা। ওকে বললাম তোমার কতা। বিকালে বাড়ি গেয়ে দিয়ে দেবা সে কতাও বলিচি। এই নাও পুরো একশো টাকাই নেলাম। ও একখান টায়ার কিনবে বলে টাকা এনেছিল। সে না হয় পরে কিনবে। আখুন বিপদের সোময়...!
জগন টাকাটা ভগার হাত থেকে নিতে নিতে বলে, ভগা রে! আর জন্মে তু আমার ভাই ছিলিস!
ভগা বলে ওঠে, এ জম্মেও তো তোমার ভাই-ই আচি গো। দাদা হতে আর পাল্লাম কোতা!
ওষুধ নিয়ে যখন হাজির হল জগন তখন সেই নার্সটির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে। জগনকে দেখামাত্র দাঁতমুখ বিকৃত করে বলে ওঠে, ওষুধ কি ল্যাবরেটারি থেকে তৈরি করে আনলে নাকি।
জগন কোনও কথা না বলে ওষুধের ক্যারিব্যাগটা ধরিয়ে দেয় দিদিমণির হাতে। দিদিমণি আর বাক্যব্যয় না করে লেবার রুমের ভেতরে ঢুকে যায়।
ভগা বাগদি বলে, জগাদা, ওষুধ দিয়ে দিয়েচ, তোমার কাজ শেষ। আখুন ওদের কাজ। চিন্তা করো নাকো, ঠিক ছায়ে-মায়ে আলেদা করে দেবে ওরা। তবে সোমায় লাগবে। এই সুযোগে আমরা পেটে জল-কয়লা দিয়ে নিই চল।
জগন কিছু না বলে ভগার পেছন পেছন বাইরে আসে। বেরিয়েই দেখে শিরীষতলায় হৈ-হৈ রৈ-রৈ কাণ্ড চলছে। একটা ম্যাটাডোর গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। তার ডালায় অনেক লোকজন। ছেলে-ছোকরাই বেশি। তারা ভীষণ চিৎকার করে শ্লোগান দিচ্ছে। কী যে বলছে ওরা তার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না জগন। শুধু এটুকু বুঝেছে ওদের দলের কাউকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। সে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে কিংবা জখম হয়েছে। ‘জমি বাঁচাও কমিটির’ লোক হবে মনে হয়! হঠাৎ একটা পুলিশের ভ্যান এসে থামে ম্যাটাডোরের পাশে। লোকগুলোর শ্লোগান আরও বাড়ে। ভগা বলে, জগাদা, চল এখান থেকে কেটে পড়ি। আখুন ধরপাকড় শুরু হবে। আসল লোকগুলো তো সট্কান দেবে। তোমার আমার মতোন বোকা-হাবা নিদ্দুষিগুলোকে ভ্যানে তুলবে।
শিরীষ গাছের পেছন দিয়ে ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে ওরা দু’জনে একটু দূরে রাস্তার ওপারে দরমা ঘেরা খাবারের দোকানে যায়। ঘুগনি আর পাউরুটির অর্ডার দেয় ভগা। দোকানে তুমুল আলোচনা চলছে ওই ম্যাটাডোর আর ওদের স্লোগান নিয়ে। কেউ বলছে, প্রশাসন বলে কিছু কি আর আছে! হাসপাতাল চত্বরে স্লোগান, চিৎকার চেঁচামেচি চলছে! এখানে কত রকমের রুগী আছে! হাট পেসেন্ট...!
তাকে কথা শেষ না করতে দিয়ে আর এক জন বলে ওঠে, শ্লোগান দেবে না কেনে? আপনার ছেলের গায়ে পুলিশের গুলি লাগলে আপনি কি চুপ থাকতেন!
অন্যজনের গলা আর এক প্রস্ত চড়ে— ও-সব আন্দোলন, পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতি করতেই বা যাওয়া কেন বাবা!
যাবে না, জোর-জবরদস্তি আপনার জমি নিয়ে নিলে আপনিও আন্দোলন করতেন। কারখানার জন্যে জমি নেবে ঠিক আচে। তাই বলে ন’মাস ধরে জমিগুলো অ্যাকোয়ার করেচে, না টাকা, না চুক্তিপত্র, না শ্বেতপত্র! কারখানা করবো বললেই হয় না, জমি নোব বললেই হয় না। তার তা একটা পদ্ধতি আচে নাকি!
দোকানদার খিঁচিয়ে ওঠে, আমনারা দোকানের বাইরে গেয়ে তক্কাতক্কি করুন তো! আমার খদ্দের নষ্ট হচ্চে।
লোকদুটো গজগজ করতে করতে দোকান থেকে বেরোয়। তারপর দু’জন দু’দিকে হাঁটা দেয়। জগন পাউরুটির পোড়াদিকটা মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে ভাবে— এ তো তার লতার ছেলে হওয়ার মতোই কেস! ন’মাসের পেট হলেও লতার কার্ড করানো হয়নি হাসপাতালে। নার্সটা দাঁত খিঁচাচ্ছিল। ওই কারখানা জন্মানোর আগেও ন’মাসের মধ্যে কীসব পত্র-মত্র হয়নি বলছিল ওই লোকটা। যাকগে মরুকগে, কারখানা হয় হোক, না হয় না হোক। ভালোই ভালোই লতার খালাসটা হয়ে যাক তাড়াতাড়ি।
এরপর দু’ঘণ্টা সময় অতিক্রান্ত। শিরীষ গাছের তলা এখন শুনশান। ম্যাটাডোরও নেই, পুলিশের ভ্যানও নেই। গুটিকয় লোক বিষণ্ন মুখে বসে আছে সিমেন্টের বেঞ্চিতে। তাদের রুগীর খবরাখবরের চিন্তায় আচ্ছন্ন ওরা। জগন আর ভগা বাগদিও ভ্যানে বসে আছে পা ঝুলিয়ে। ভগা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সারা বেলা এখানে বয়ে যাওয়ার জন্য। জগন ওকে কিছু টাকা বেশি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
জগনের একবার মনে পড়েছে অসুস্থ মায়ের কথা। একা কী যে করছে মা, কে জানে! নিশ্চয়
ও-বাড়ির বউদি ভাত-জল দেবে মাকে। আসার সময় বলে এলে ভাল হত। মা নিশ্চয় বউদিকে ডাকবে। না ডাকলেও কম্লি দু’একবার পাক মেরে যায় এ-বাড়ি দিয়ে। ও তার ঠাক্মাকে খুব ভালবাসে। ব্যবস্থা একটা হবে। লতাকে তো আজ ছাড়বে না। খালাস হয়ে গেলে বেডে দেবে। কাল কিংবা পরশু এসে ছুটি করে নিয়ে যেতে হবে। এখন ভালোয় ভালোয় মায়ে-ছায়ে আলাদা হলে হয়। এ-সব ভাবনা বয়ে চলে জগনের মনে।
এর মধ্যে সূর্য মাঝ আকাশ অতিক্রম করেছে। শিরীষ গাছের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে একটু একটু করে। কিছুক্ষণ আগে একটা মৃতদেহ বেরোল হাসপাতাল থেকে। বেশ বড়লোকের মৃতদেহ বোধহয়। ম্যাটাডোর গাড়ি এসেছিল ‘বডি’ নিতে। খাটখানা সাজানো ফুল দিয়ে। চারকোণে চার গোছা সুগন্ধী ধূপ জ্বলছে। নিয়মমাফিক কান্নার মধ্যে দিয়ে দেহ তোলা হল গাড়িতে। অনেক অগুরু ও বিলিতি সেন্ট ছেটানো হল দেহটাতে। কান্না থেমে গেছে একটু পরেই। তেমন দুঃখ কেউ পেয়েছে বলে মনে হল না। হয়তো মানুষটার বয়স হয়েছিল বলেই! নাকি আজকাল মানুষ মারা গেলে আত্মীয়-স্বজন তেমন দুঃখ পায় না! ওর মা মারা গেলে ও কিন্তু খুব দুঃখ পাবে। মায়ের মৃত্যুর কথা হঠাৎ মনে এল জগনের। তাতেই সে দুঃখ পেল কিছুটা। মনে মনে বলল, ঠাকুর মাকে আখুনো অনেকদিন বাঁচিয়ে রেকো।
ম্যাটাডোরখানা মৃতদেহ নিয়ে চলে গেছে একটু আগে। এখনও দামি ধূপের গন্ধটা রয়ে গেছে। গন্ধটা কেমন একটু একটু করে মিশে যাচ্ছে জগনের মনের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া ভাবনাতে। ওর মনের মাঝে গন্ধটা দুঃখ না খুশি ছড়াচ্ছে বুঝতে পারে না জগন।
একসময় ওর ডাক পড়ে। সেই দিদিমণি নয়, অন্য এক জন আয়া গেটের সামনে এসে হাঁক পাড়ে— লতা হালদারের বাড়ির লোক কেউ আচেন...।
জগন হন্তদন্ত হয়ে এগোয়। ওকে দেখে আয়া বলে ওঠে, আপনি লতা হালদারের...।
হ্যাঁ, আমি জগন হালদার।
শুনুন, পেসেন্টের মেয়ে হয়েছে। বেডে দেওয়া হয়েচে। দেখে আসতে পারেন। মা আর বাচ্চা ভাল আচে।
জগন আয়ার পেছন পেছন ভেতরে পা বাড়ায়। ওর মনের মাঝে একটা কাঁপন। পা দুটোও ঠিক বশে নেই যেন! চলতে গিয়ে কেমন কাঁপছে। প্রথম বাবা হওয়ার উত্তেজনায় নাকি আনন্দে অথবা ভয়ে কে জানে! লতার কাছাকাছি যেতেই ওর কানে আসে চিঁ চিঁ কান্নার শব্দ। কারুর কান্নার শব্দ যে এতখানি আনন্দের আর সুখের হতে পারে তা আগে জানত না জগন।
সাত
‘দুখের রাতে নিখিল ধরা
যে-দিন করে বঞ্চনা
তোমারে যেন না করি সংশয়’
— রবীন্দ্রনাথ
ক্ষান্তমণির বেশ শীত লাগছে। অন্যান্য দিন দুপুরে খাওয়ার পর দাওয়ার উনুন ঘেঁষে বসে। বেশ আরাম লাগে। আজ আর উনুনের ওম পাওয়া যাবে না। দাওয়ার উনুন আজ ধরানো হয়নি। লতা কাঠকুটো জ্বেলে দাওয়ার উনুনে রোজ রান্না করে। কমলা এখনও এ বিদ্যাটা রপ্ত করতে পারেনি। একবার লতার নির্দেশে উনুনে কাঠ গুঁজে দিতে গিয়ে ভাতের হাঁড়ি উল্টে দিয়েছিল। সেই থেকে কাঠের উনুনে ওর ভয় কিংবা অনীহা। তাই রান্নাচালার তোলা-উনুনে গুলের আঁচ দিয়েছিল। সে উনুন এখন একদম ঠান্ডা হয়ে গেছে।
আজ দাওয়ার উনুনের আশপাশ গরম না থাকলেও অভ্যাস মতো উনুনের পাশেই চট পেতে বসে ক্ষান্তমণি। গায়ে পুরনো তুষ চাদরটা জড়িয়ে নেয় ভাল করে। চাদরটা অনেক পুরনো। প্রায় শতচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবুও এ চাদরটা বাতিল করেনি। সেই মানুষটার চাদর এটা। তা বয়স কম হল না চাদরের।
মনে পড়ে, আটাত্তরের বন্যার পরে শীত পড়েছিল জব্বর। সেবার বৈরেগীতলার মেলায় গিয়ে কিনে এনেছিল মদনের বাবা। বলেছিল, এটা নাকি আসল কািশ্মরি তুষ! কারণ, মেলাতে চাদরের দোকানদার বাংলা কথা বলতেই পারছিল না। কী এক অজানা ভাষায় কথা বলছিল। সে ভাষা কািশ্মরি না হয়ে যায় না। তাহলে লোকটা নির্ঘাত কািশ্মর থেকেই এসেছে ওই বৈরেগীতলার মেলায় দোকান করতে! সেই আসল কািশ্মরি তুষ চাদর অবিশ্যি বেশি দিন গায়ে দেওয়ার সৌভাগ্য হয়নি সোজা-সাপটা মানুষটার। হাঁপানিতে কষ্ট পেয়ে চলে গেল সাত-তাড়াতাড়ি!
মদনের বাবা গত হওয়ার পর টিনের বা’র মধ্যে বহু দিন ভরা ছিল চাদরখানা। মদন যখন ‘শাঁসে-জলে’ হয়ে উঠল। নাকের নিচে কালো রেখা দেখা দিল। তখন ও এক দিন টিনের বা’র জংধরা তালা ভেঙে বের করল ওই চাদর, খানকতক ধুতি, একটা ফতুয়া আরও কত কী! সবই বাবার ব্যবহার করা জিনিস। কোনওটাই অক্ষত নেই। টিনের বা’র জং লেগে নষ্ট হয়েছে কিছু। কোনওটা আবার পোকায় কেটেছে। চাদরটারও বেশ কয়েক জায়গায় ফুটো করেছে পোকায়। ধুতি-ফতুয়া এ-সব কোনও কাজের জিনিস নয় পেন্টুল-পরা মদনের কাছে। কিন্তু চাদরটা গায়ে দেওয়া যেতে পারে। এইভেবে ওটাকে রোদে দিয়েছিল মদন। পোশাকগুলোতে কেমন এক গুমসানি গন্ধ; এত দিন বা’বন্দি হয়েছিল বলেই। গন্ধটা মদনের ভাল লাগছিল না। তাই বারবার গন্ধের কথা বলছিল। তাতে মদনের মায়ের বেশ রাগ হচ্ছিল। শেষবার গন্ধের কথা বলতে ক্ষান্তমণি বলে উঠেছিল, তকন থেকে তো গন্দ-গন্দ করচিস! তাইলে আবার গায়ে দেবার ইন্তাম করচিস কেনে! এমন ছেলে জম্মে দেকিনি, বাপের জিনিসকে গন্দ বলে, মন্দ বলে। তোর বাবার গায়ে কি গন্দ ছিল লেকিনি!
মদন ফ্যাক্ ফ্যাক্ করে হেসে উঠেছিল, বাবার গায়ে গন্দর কতা কে বলেচে! অনেক দিন ধরে বাস্কোতে ভরা ছিল বলে গন্দ হয়েছে তাই বলচি। তুমি রেগে উটচ কেনে?
তারপর ওই চাদর রিঠেফল ভেজানো জল দিয়ে কেচে ধুয়ে, রোদে শুকিয়ে, থালা গরম করে ইস্তিরি করে উত্তরাধিকার সুত্রে মালিকানা পেল মদন। গায়েও দিল অনেকগুলো শীতকাল। তবুও ছিঁড়ে ফর্দাফাই হল না চাদর। শুধু ফুটোগুলো আকারে বাড়ল। ওটা যে মদনের বাবার চাদর ছিল তা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল ক্ষান্তমণি। কিন্তু মদন বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় সেটা বেশিরকম করেই মনে করিয়ে দিয়েছিল।
সেটা ছিল ছ’বছর আগের পৌষমাস। পৌষমাসে বাড়ি থেকে কুকুর-বেড়ালকেও নাকি তাড়াতে নেই। বাড়ি ছেড়ে যেতেও নেই কাউকে। তবু মদন তুমুল ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়েছিল। তখনই গা থেকে চাদরখানা খুলে টান মেরে ছুড়ে দিয়ে বলেছিল, বাপের জিনিস কিচ্ছু নোব নাকো। এই রইল তোমার আসল কািশ্মরি তুষ চাদর। আমার শ্বশুর শাল দিয়েচে।
চাদরটা উঠোনে আছড়ে পড়তে ক্ষান্তমণির মনে হয়েছিল সেই মানুষটাকেই বুঝি তুলে আছাড় মারল মদন। ছুটে গিয়ে চাদরখানা তুলে বুকে চেপে ধরেছিল সে।
সে-কথা মনে পড়তে ক্ষান্তমণি এখন চাদরটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নেয়। যেন সেই মানুষটারই স্পর্শ পাচ্ছে ওতে। মদন চাদরটা এত দিন গায়ে দিলেও চাদরে তার বিন্দুমাত্র চিহ্ন যেন নেই।
মদনকে মনের মাঝেও আনতে চায় না ক্ষান্তমণি। তবুও সময়ে-অসময়ে মনে পড়ে যায়। ওকে পেটে ধরেছে, এতটা বড় করেছে; মনে কি আসবে না! ওর ওপর রাগটা ওই সেদিন থেকেই, যেদিন বলেছিল, কী দায়িত্ব কত্তব্য করেচে সে-লোকটা! জম্ম দিয়েচে তো ফুত্তি কত্তে গেয়ে। তারপর পটল তুলেছে তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে। তুমি না করলা মানুষ, না করলা মুনিশ। নিজের চেষ্টায় তেলকলের মিস্তিরি হইচি। দু’পয়সা রোজগার কচ্চি, তা তোমাদের সজ্য হচে নাকো।
এখনও গা রি-রি করে ওঠে সে-সব কথা মনে পড়লে। ছেলেটা প্রথমে এমনধারা ছিল না। ওই কালনাগিনীটার সঙ্গে আশনাই হওয়ার পর থেকেই কেমন বিগড়ে গেল। কী কুক্ষণে যে মোড়লগাঁয়ে ধনা মোড়লের তেলকলে কাজ করতে গেল! মোড়লও লেলিয়ে দিল তার মেয়েকে। ঘি-আগুন পাশাপাশি থাকলে না গলে কি পারে! মাস ঘুরতে না ঘুরতেই মেয়েকে সাতপাক ঘুরিয়ে দিল ছেলেটাকে ভেড়া বানিয়ে। ঘরজামাই রাখল। আসলে, বরাবরের জন্য একটা তেলকলের মিস্ত্রি পেল, আর মা কালি-বরণ মেয়েটারও ‘গতি’ হল। সে হারামজাদা তো সেটা বুঝল না। সে ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ করার সুযোগ পেয়ে ‘ধরাকে সরা’ জ্ঞান করল। মা-ভাইকে ছেড়ে গিয়ে উঠল ধনা মোড়লের ভদ্রাসনে। যাওয়ার সময় ভাঙাচোরা সাইকেলটাও ছেড়ে গেল। শ্বশুর নাকি নতুন সাইকেল দিয়েছে একখানা।
মদন মিস্ত্রি হয়ে ওঠার পর এখানে সেখানে ডাক পড়ত তেলকল সারানোর জন্য। বেচারা ছেলেটা হেঁটে হেঁটে যায়! মায়ের মনে কষ্ট হয়। তাই এক গেরস্থকে বলে কয়ে পুরনো সাইকেলখানা নিয়েছিল। মুড়ি ভেজে ভেজে সাইকেলের দাম শোধ করেছিল। মদন সাইকেল রেখে গিয়ে মায়ের ঋণ সবটাই শোধ করে গেল।
মিস্ত্রি হওয়ার পর মদন যা রোজগার করত, সবটাই এনে তুলে দিত মায়ের হাতে। সংসারটাতে একটু চেকনাই আসছিল। অন্ধকার জায়গাগুলোতে একটু-আধটু আলো পড়ছিল। কিন্তু বেমক্কা সমস্ত আলো চুরি করে নিল সেই কালনাগিনী। নিজের মাথার মণি করল মদনকে। সে মণিকে সবসময় আগলে রাখে। এ-দিক পানে আসতেই দেয় না!
তখন এ-বাড়ির অন্ধকার ঘোচানোর দায়িত্ব নিল সদ্য গোঁফ-গজানো জগন। মদনের বাতিল করা সাইকেলখানা সারিয়ে নিয়ে, গাঁ-গঞ্জ ঘুরে ‘যা নেবে তাই ছ’টাকা’র জিনিস বিক্রি করা শুরু করল। তারপর তো কত শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা গেল। জগন জোয়ান হল। ঘরের চালে খড় চড়াল। উঠোনে রান্নার চালা বানাল। লতাকে দেখে শুনে ঘরে আনল। সেই লতার আবার...।
লতা এ-বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর জগনের ব্যবসাটাও জমে উঠল। মনোহারী-ইমিটেশনের ব্যবসা শুরু করল জগন। লতা যেন এ বাড়ির লক্ষ্মী! ক্ষান্তমণি লক্ষ্মীই ভাবে বউকে। লতার চলন-বলন, আচার-ব্যবহার খুবই ভাল লাগে ক্ষান্তমণির। সত্যিই সংসারী মেয়ে ও। ওর ভালবাসা আর মমতা দিয়ে স্বামী আর শাশুড়িকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছে।
ক্ষান্তমণির মনে লতার কথা। বেচারির শরীরখানা হাড়-ডিগডিগে হয়েছে। শুধু পেটখানা সার! কাল রাত থেকেই ব্যথা উঠেছে বউটার। জগনকে মুখ ফুটে বলেনি। সেদিনের মতো যদি আবার...! এতক্ষণে নিশ্চয় খালাস হয়ে গেছে। ওর শরীরের যা দশা হয়েছে, ব্যাটাছেলেই হবে! দেহ রোগা হলে নাকি খোকা হয়!
নাতনি নয়, নাতি হবে— এ ভাবনা ক্ষান্তমণির মনের মাঝে মাঝেসাঝেই ঘোরাফেরা করে। তখন ওর ঘোলা-ঘোলা চোখের মণিদুুটো একটু বড় হয়। ‘সোন্দর পারা’ একটা নাতি! উঠোনের রোদে পা ছড়িয়ে বসে দু’পায়ের খাদানে নাতিকে শুইয়ে তেল মাখাবে। কাঁঠাল কাঠের পিঁড়িতে বসিয়ে চান করাবে। সিজে-পাতার কাজল পরাবে। চাঁদের মতন গোল টিপ দেবে কপালে। আরও কত শখ-আহ্লাদে মেটাবে।
ওর অবিশ্যি নাতি আছে একটা। মদনের ব্যাটা। কিন্তু তাকে তেল মাখানো দূরের কথা, কোনওদিন ছুঁয়েও দেখেনি। সেই কালনাগিনীর রক্ত যে তার শরীরে।
শীতটা বুঝি জাঁকিয়ে পড়বে এবার! নাকি তার শরীরটার জুত নেই বলেই এত শীত করছে কে জানে! দুপুরে খেয়ে শুয়ে পড়লে শরীর বেশি খারাপ করে। জ্বর জ্বর লাগে। তাই ক্ষান্তমণি দাওয়ায় উনুনের ধারে বসে আছে। ওর চোখে ঢুলুনি আসছে, তবুও শুয়ে পড়ছে না। ছেলেটা বাড়ি ফিরে দেখলে কী ভাববে! বউ-ছেলে হাসপাতালে, আর মা দিব্যি খেয়েদেয়ে ঘুমোচ্ছে! এ-সব ভেবে ক্ষান্তমণি একরকম জোর করেই চোখ খুলে রেখেছে।
খেঁকি কুকুরটা দরজা খোলা পেয়ে উঠোনে ঢুকল ছানাগুলোকে নিয়ে। মাটি শুঁকতে শুঁকতে খুলিটার কাছে গেল। ক্ষান্তমণির পাতে পড়ে থাকা ভাত চারটি খুলিতে ঢেলেছিল কমলা। সেগুলো চেটেপুটে খেল কুকুরটা। তারপর আবার বেরিয়ে গেল। ছানাগুলোও সবসময় মায়ের পিছু পিছু। কুকুরটা বেরোনোর সময় বার দরজায় ক্যাঁচ করে শব্দ হল।
তারপর কেমন নিস্তব্ধ! শুধু সজনে গাছের ডালে একটা ঘুঘুপাখি করুণ সুরে ডেকে চলেছে ঘুঙুর-ঘু ঘুঙুর-ঘু। পেঁপে গাছের লম্বা ডাঁটওয়ালা পাতায় একটা গিরগিটি। ওটা লাফিয়ে একটা হলদেটে পাতায় পড়তেই আস্তে আস্তে ঝুলে পড়ল ডাঁটিসহ হলুদ পাতা। কেমন শুকিয়ে গেছে। কখন যে খসে পড়বে কে জানে! গিরগিটিটা এখন শুকনো ডাঁটির ওপর নিশ্চল। গিরগিটির রঙটাও কেমন বিষণ্ন হলুদ হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
ক্ষান্তমণির ঘুম জড়ানো চোখ জোর করে খুলে রাখতে গিয়ে কপালের বলিরেখা আরও বেড়ে যাচ্ছে। সে বলিরেখার খাঁজে খাঁজে ব্যথা জড়ানো। নাতি হোক আর নাতনি হোক, তার সাধ কি মিটবে! হয়তো মিটবে না। শরীরের যা অবস্থা কখন যে ডাক এসে যাবে! যদিও বা বুকের নিচে ধুকপুকুনিটা থাকে, হয়তো নাতির গায়ে তেল মাখানোর শক্তিটুকু থাকবে না শরীরে। দিনকে দিন যেন আরও কাহিল হয়ে পড়ছে। কাশি বাড়ছে। কখন কী হয়ে যায়! এ-সব ভাবনার অতলে একটু একটু করে তলিয়ে যেতে থাকে ক্ষান্তমণি। একসময় আর বসে থাকতে পারে না। চটের ওপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে।
আট
‘গৃহিণী সচিবঃ সখীমিথঃ
প্রিয়শিষ্যা ললিতে কলাবিধৌ’
— কালিদাস
সংসারের সকালবেলাকার কাজ সারতে পুষ্পর অনেকখানি সময় গেল। এর মাঝে ছেলেকে খাওয়ানো-ধোয়ানো, বায়নাক্কা সামলানো। মা শয্যা ছাড়লে চা-জল দেওয়া; এ-সব তো আছেই। দশটা বাজতে না বাজতে সে মানুষটা জলখাবার খেতে আসবে বাড়িতে। বাবার জন্যে মুড়ি আর আলুচচ্চড়ি নিয়ে যাবে কৌটোয় ভরে। আলুচচ্চড়িটা এবার না বসালেই নয়; তার আসার সময় হয়ে গেল! মাকে যে আলুটা কুটে দিতে বলবে সে উপায় নেই। তারই সংসার, অথচ কোনও কাজ করতে নারাজ। মেয়ে-জামাইকে থাকতে জায়গা দিয়ে যেন দাস আর দাসী কিনে রেখেছে! শরীর মোটা যেন আর কারুর হয় না! নিজের মা হলে কি হবে; ভাবগতিক দেখে এমন ভাবতেই হয়। সংসারের এত কাজ, তার ওপর ছেলের ধকল, ঠিক ঠিক সময় ধরে জলখাবার, অন্ন-ব্যঞ্জনের ব্যবস্থা সবই করতে হয় একা হাতে। তিনি কুটো ভেঙে দুটো করবেন না। বেলা করে ঘুম থেকে উঠবেন। তরিবৎ করে চা খাবেন। তারপর আধ ঘণ্টা ধরে চানঘরে। চানঘর থেকে বেরিয়ে এসে ফুল তুলে, পুজো সেরে, জলখাবার খেয়ে পাড়া বেড়াবেন। দুপুরে ফিরে খেয়েদেয়ে ঘুমোবেন। ঘুম থেকে উঠে চা। তারপর আবার পাড়ায় ঘুরতে যাবেন। ফিরে এসে সবারই সংসারের হাঁড়ির খবর নিজের মনেই আওড়াবেন।
এ-সমস্ত ভাবনা পুষ্পর মনে চড়ে বেড়াতে, উষ্ণ হয়ে ওঠে ওর মনটা। সেই উষ্ণতার বাষ্প বিড় বিড় করে বেরোয় পুষ্পর ঠোঁট থেকে, তিনি এখন পুজো করতে ঢুকেছেন! সহজে কি আর বেরোবেন! বেরোনোর পর আলু কুটে দিতে বললেও গোঁসা হবে হয়তো!
স্নান আর পুজোতে অনেকখানি সময় যায় শুভঙ্করীর। চা খাওয়া হলে চানঘরে আধঘণ্টা। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা যে কালই হোক স্নান সেরে ভিজে কাপড় পরে বেরোবে চানঘর থেকে। সেই অবস্থায় উঠোনের পাশে বসানো পাঁচমিশেলি ফুলগাছ থেকে পুট্পুট করে তুলবে নয়নতারা, গাঁদা, অপরাজিতা, টগর; যখন যা পাওয়া যায়। এ নিয়মের কোনও হেরফের হয় না সচরাচর। কোনওদিন যদি জামাই বাড়িতে থাকে, তাহলেও একই পদ্ধতি। তখন পুষ্পর খুব রাগ হয় মায়ের এই কাণ্ডকারখানা দেখে। একটু কি হায়া-লজ্জা থাকতে নেই! জামাইয়ের সামনে ওই অবস্থায় ঘুরঘুর করা! একে তো সাদা কাপড়, তার ওপরে আবার ভিজে; মোটা শরীরখানার চড়াই-উৎরাই সবই ফুটে ওঠে। হোক না চল্লিশ পেরোনো, তবুও তো মেয়েমানুষের শরীর! ব্যাটাছেলের চোখ যাবেই। আর ও মানুষটাও তেমন! না দেখার ভান করে তাকিয়ে থাকবে ড্যাব ড্যাব করে। পিঠে খোঁচা মেরে ঘরে যেতে বললে তখন যাবে। একদিন ঘরে যাওয়ার পর ফিস ফিস করে শাসন করতে গেলে, খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলেছিল, ‘তোমার ভুল ধারণা। বুড়ো লাউ কেনে দেকতে যাব? ওই লাউয়ের বীজই তো আমাকে দিয়েচে তোমার বাবা, তা আখুনো কচি আচে।’ এমন খচ্চর লোক ও!
আর একদিন মাকে অনুযোগ জানিয়েছিল, মা! তোমার কি জ্ঞানগম্যি কমচে দিন-দিন? ভিজে কাপড় পরে অমন...!
মা মুখঝাম্টা দিয়ে উঠেছিল, দ্যাক পুষ্প, আমি তোর পেটে হইনি, তুই আমার পেটে হইচিস! আমাকে সহবত (সবক্) শেকাতে আসিস নাকো! আমার মেয়ে হয়ে এত নোংরা মন কেনে রে তোর! জামাই হল ছেলের মতন। ছেলের সামনে আবার লাজ-লজ্জা কীসের!
একটু থেমে থেকে মা আবার বলেছিল, তোর আর কী দোষ দোব! যেমন বাপ তেমন বিটি তো হবে! চিরটাকাল মানুষটা সন্দ করে করেই আমার এমন হাঁড়ির হাল করেচে।
সে-দিন পুষ্প আর দাঁড়ায়নি মায়ের কাছে। ও জানে মা বকতে শুরু করলে সহজে থামে না। কাছে থাকলে সেটা আরও বাড়ে। ও চানঘরে ঢুকে গিয়ে ভেবেছে মায়ের ‘হাঁড়ির হাল’-টা কী হয়েছে! বেশ তো রানির হালেই আছে! ছেলে থাকলে, তার বিয়ে দিয়ে বউ আনলে, সেও এত ধকল নিত না। মুখনাড়া দিত। পুজো করতে ঢুকে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া বরদাস্ত করত না কিছুতেই।
পাঁচমিশেলি ফুল আর বাতাসা ভোগ দিয়ে চোখ বুজে অনেকক্ষণ বিড়বিড় করার পর গড় হয়ে প্রণাম করে শুভঙ্করী। ওই প্রণামটা দেখেই বোঝা যায় পুজোর পাট চুকল এবার।
পুষ্প এর অপেক্ষাতেই মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকাচ্ছিল আর বিড়বিড় করছিল। মা ঠাকুরঘর থেকে বেরোতেই পুষ্প বলে ওঠে, মা! একটু চচ্চড়ির আলুটা কেটে দাও না! আমার এখনও চান হয়নি! তোমার জামাই এখ্খুনি এসে পড়বে।
শুভঙ্করী কোনও কথা না বলে গোটা চারেক আলু আর বঁটি টেনে নিয়ে বসে। তবে তার আলু কাটার গতিতে আর জলভরা থালায় টুকরো আলু ফেলার ঢঙে ধরা পড়ে তার মনের অপ্রসন্নতা।
পুষ্প জানে, ঠাকুরঘর থেকে বেরোনোর পর মায়ের আরও একটা কাজ বাকি থাকে। গত রাতের বাঁচিয়ে রাখা দুটো শুকনো রুটি নিয়ে উঠোনে যাবে। সেগুলোকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে রান্নাঘরের টালির চালে ছুঁড়ে দেবে। গোটা পাঁচেক কাক এসে সেগুলো যত না খাবে; তার চেয়ে বেশি চিৎকার করবে। এতে নাকি মায়ের পুণ্য সঞ্চয় হয়! তো এই পুণ্য সঞ্চয়ের কাজটা একটু পরে করলেই বা কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে— এমন ভেবে চান ঘরে ঢুকে যায় পুষ্প।
ঠিক তখুনিই বাড়িতে ঢোকে মদন। পুষ্প চানঘর থেকে শুনতে পায় তার স্বামীর গলা, কই গো! কোতা গেলে! খেতেমেতে দাওসে!
শুভঙ্করী বলে, বোসো বাবা! পুষ্প আখুনো চানঘরে। কাজকম্ম সারতে বড্ডা দেরি করে ফেলাল আজ। এই চচ্চড়ি বসাচি। তুমি না হয় আজকে দুদ ঢেলে চািড্ড মুড়ি খাও।
পুষ্পর মন আনচান করছে। কোনও ক্রমে দু’মগ জল ঢেলে বেরিয়ে আসে ও। ততক্ষণে শুভঙ্করী আলুচচ্চড়ি বসিয়েছে কেরোসিনের স্টোভ জ্বেলে।
ভিজে কাপড় বদলে উঠোনের তারে ভিজে শাড়ি-সায়া মেলছে পুষ্প। ওর মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানান কথা। ছেলেটা বারান্দায় বই-খাতা ফেলে কোথায় গেল কে জানে! লাল ফড়িংয়ের পেছনে ধাওয়া করে আবার পুকুরে না পড়ে! রাস্তায় চলে গেলে আর এক বিপদ! মোটর সাইকেল এত বেড়েছে গ্রামখানায়! সবারই তো আর তেলকল নেই! এত টাকা কোথায় পায় সব, কে জানে! ও কাপড় মেলতে মেলতে হাঁক পাড়ে, বোধন! ও বোধন! কোতা গেলি রে!
এর মধ্যে কখন ঘরে ঢুকে খাটের ওপর ফেলে রাখা মায়ের ট্যাসেল চুল মাথায় চড়িয়েছে বোধন। কিম্ভুতকিমাকার হয়ে ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে গঙ্গাজল ভর্তি দিদিমার কমণ্ডলুটা হাতে নিয়ে— মা মা, দেকো আমি রিচিমচাই ছেজেচি! ঋ-তে রিচিমচাই বচেন পূজায়। আমুও পুজো করতে বচবো।
ছেলের ওই চেহারা দেখে হেসে মরে পুষ্প। মদনও বারান্দায় একটা টুলে বসে মিটিমিটি হাসে। শুভঙ্করী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ওকে দেখে রে-রে করে ওঠে— দস্যি ছেলে! দিল আমার সব তচনচ করে। ওরে! ওতে গঙ্গাজল আচে, পড়ে যাবে যে!
বোধনের মনের ঘরে এখন ঋষিমশাইয়ের ছবি বিরাজ করছে। তাই দিদিমার সাবধান বাণী ওর কান দিয়ে ঢুকলেও, মনের ঘরে জায়গা পায় না। ও পুজো করবে বলে কমণ্ডলুটা বারান্দায় নামাতে গিয়ে সত্যি-সত্যিই উলটে ফেলে। গঙ্গাজল গড়ায় মেঝে থেকে উঠোনে। তা দেখে শুভঙ্করী যেন ক্ষেপে ওঠে। বিশাল শরীর নিয়ে থপাস থপাস করে এসে বোধনের পিঠে চাপড় কষায়— বজ্জাত ছেলে! কত কষ্ট করে গঙ্গাজল আনা, দিল সব ফেলে!
নিমেষে পরিবেশটা কেমন বদলে যায়। বোধনের চিল-চিৎকার, ওর দিদিমার বকবকানি, বোধনের মায়ের মুখে রাগ আর কষ্টের কারিকুরি, মদনের উদাসীনতা, সবকিছু মিলেমিশে এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্যপট। পুষ্প কয়েক মুহূর্ত থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। কাঁদতে থাকা ছেলের দিকে তেড়ে গিয়ে আরও দু’চার ঘা বসিয়ে দেয়— বজ্জাত ছেলে! মর মর তুই! এই শরীলে এত মার খাওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল।
বোধনের কান্না আর একপ্রস্ত বাড়ে। কিন্তু ওর দিদিমার বক্বকানি থেমে যায়। রান্নাঘরে ঢুকে শুভঙ্করী খুব মনোযোগ সহকারে আলুচচ্চড়ির আলু সিদ্ধ হল কি না পরখ করতে থাকে। মদন আর উদাসীন ভাব বজায় রাখতে পারে না। ও বলে ওঠে, তুমি আবার ওকে মারতে গেলে কেনে? ওই তো শরীলের অবস্তা!
বেশ করিচি, আমার ছেলেকে আমি মেরিচি। লোকে মেরে মেরে ছেলেটাকে আদখানা করে দিচ্চে দেকতে পেচো নাকো! আমি মারলেই দোষ!
শুভঙ্করী গলা না চড়িয়ে রান্নাঘরে গজ্গজ্ করে— হ্যাঁ, পেটে ধরা মা আখুন ‘লোক’ হবে না তো কী হবে! এ হল বংশর দোষ। পিরিত করে বিয়ে করে মা আখুন পর। তাও যদি তেমন শ্বশুর-ঘর থাকত! যেমন বাপ তেমন বিটি হয়েচে!
ছেলেটাকে মারার পর পুষ্প যেন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। তাই সে কাঁসার থালায় মুড়ি আর গোটাচারেক নারকোল নাড়ু এনে স্বামীর হাতে ধরিয়েছে। রান্নাঘরে ঢুকে কাঁসার বাটিতে আলুচচ্চড়ি তুলেছে। শুভঙ্করী তখন অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে কাল রাতের বাসি রুটি হাতড়িয়েছে কিছুটা সময় নিয়ে।
বারান্দায় বসে মদন মুড়ি খাচ্ছে। শুভঙ্করী বাসি রুটির টুকরো খাওয়াতে ব্যস্ত কাকগুলোকে। পুষ্প পায়ে পায়ে ছেলের কাছে গেছে। ছেলের চোখের জল, নাকের সিক্নি মুছিয়ে দিয়েছে। তারপর বারান্দার পিলারে ঠেস দিয়ে থাপন গেড়ে বসেছে। ছেলেকে কোলে বসিয়েছে। ছেলে এখন কান্না ভুলে খুশিতে ডগমগ। পুষ্প ছেলের পিঠের জামা তুলে দেখছে আঙ্গুলের দাগ বসেছে কি না। ওর চোখদুটো ছলছল করছে।
মদন মুড়ি খেতে খেতে পুষ্পকে বলে, শোনলাম জগা বউকে হাসপাতাল নিয়ে গেয়েচে।
কেনে গো? কী হল? পুষ্পর গলায় তরাস।
না কোনো বিপদ-আপদ নয়কো! ওর বোয়ের সন্তান হবে শুনেছেলাম। তাই হয়তো...!
তাইলে তোমার মা তো বাড়িতে একা!
হ্যাঁ।
শুনেছেলাম তোমার মায়ের খুব শরীল খারাপ। তার ওপর আবার বাড়িতে কেউ নাইকো, একবারটি দেকে আসো গা!
মদন কোনও কথা বলে না। এক মনে মুড়ি খেতে থাকে। পুষ্প কিছুক্ষণ মদনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, বাবাকে জলখাবারটা দিয়ে সাইকেলে চলে যাও। তুমি ছেলে তো বট! তোমার কি কোনো কত্তব্য নাইকো।
মদন কোনও সায়-উত্তর দেয় না। পুষ্প আবার বলে ওঠে, তুমি যদি বল, তাইলে আমিই না হয় যাই একটা ভ্যান ভাড়া করে ছেলেটাকে নিয়ে। দু’দিন করে-কম্মে দিয়ে আসি।
মদন মুড়ি খাওয়া শেষ করে বলে, না থাক, তোমাকে যেতে হবে নাকো; দেকচি কী করা যায়।
উঠে পড়ে মদন। ঝোলাতে টিফিন কৌটো ভর্তি মুড়ি আর আলুচচ্চড়ি নিয়ে তেলকলের উদ্দেশে পা বাড়ায়।
নয়
‘দুঃখ শিখার প্রদীপ জ্বেলে
খোঁজ আপন মন
হয়তো সেথা হঠাৎ পাবে
চিরকালের ধন’
— রবীন্দ্রনাথ
তখন পশ্চিম আকাশখানা গিরিমাটির রঙ ধারণ করেছে। আর পুব আকাশটা পান্তাভাতের আমানি রঙ। জগন ভ্যানরিকশায় বসে যেতে যেতে ভাবে, একটাই আকাশ, তাতে কত রকম রঙ! কোথাও গিরি-গিরি, কোথাও পাটকিলে, কোথাও বা নীলের মধ্যে সাদা সাদা ছোপ, কোথাও আবার কাতলামাছের আঁশ ছড়ানো! কোথায় বসে বসে কে যে এত রঙ লাগায় আকাশের গায়ে! বেলা পড়তে না পড়তেই ব্রাহ্মণী নদীটার চোখে যেন ঘুম ধরেছে! কেমন চুপচাপ, শান্ত! তার বুকের ওপর এপার-ওপার কাঠের ব্রীজটা থেকে জলের স্রোত বোঝা যাচ্ছে না। পাখ-পাখালিগুলোও নদীর বুকে চরে বেড়াচ্ছে না। সন্ধে নামার আগেই বাসামুখো হয়েছে হয়তো!
ভগা-বাগদি একমনে এক গতিতে প্যাডেল করে যাচ্ছে। তার গায়ের জামাটা ঘামে সপ সপ করছে। বাঁ-প্যাডেলে চাপ দেওয়ার সময় পিঁকপিঁক শব্দ হচ্ছে প্রতিবার। ওই শব্দটাই যেন গতির মাপকাঠি! আর কোনও শব্দ নেই। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে কিছুটা পথ অবধি বকর-বকর করেছিল ভগা। তার সংসারের কথা, তিন-তিনটে মেয়ের জন্ম দিয়েছে ওর বউ, একটাও ছেলে বিয়োতে পারেনি; সে-সব কথা বলেছিল। জগনের কাছ থেকে কথার পিঠে কথা না পেয়ে একসময় থেমে গিয়েছিল।
জগন ভাবছিল লতার কথা, সদ্য জন্মানো মেয়েটার কথা। একঝলক দেখেছে মেয়েটাকে। দশ টাকা দামের একটা প্লাস্টিকের পুতুল যেন! খুবই ছোট। আয়া বলল, ওজন মাত্র এক কেজি আটশো গ্রাম। ও ভেবে পায়নি ছানাটা এত ছোট্ট হল কী করে! লতার পেটখানা তো বড়সড় কুমড়োর মতো হয়েছিল! তার ভেতরে ওইটুকুনি ছানা! ঠিক মতো পুষ্ট হয়নি বলছিল সেই আয়া। ডাক্তার নাকি বলেছে গর্ভ অবস্থায় ঠিকমতো খাওয়ানো-দাওয়ানো হয়নি প্রসূতিকে। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া বলতে কী বুঝিয়েছে ডাক্তার কে জানে! অভাব থাকলেও পেট পুরেই তো খাইয়েছে লতাকে। ভাত, মুড়ি, রুটির অভাব রাখেনি। দুধ-ঘিও খাইয়েছে একটু আধটু। টনিক-ফনিক কিনে খাওয়ানো হয়নি। ওই অঙ্গনওয়াড়ি মেয়েটা, মমতা যা আয়রন বড়ি দিয়েছিল গোটাকতক।
গাঁয়ের মানুষ অন্যান্যরা যেমন খায়, তেমনই খাইয়েছে লতাকে। ওই তো বাগদিপাড়ার নবার বউয়েরও ছেলে হল। ব্যাটা ছেলে। ডাগর-ডোগর। ওরা তো আর সোনা-রূপো খায় না! সবদিন ভরপেট খাওয়াও জোটে না। তবুও...! আসলে হল গিয়ে কপাল। যার যেমন কপাল।
জগন ভাবে, একটু-আধটু গাফিলতি যে হয়়নি তা নয়! সব কি পেরে ওঠা যায় গরিব মানুষদের। লতার পেটে বাচ্চা আসার পর হাসপাতালে প্রথম দেখাতে যাওয়ার সময় হাসপাতালের ওই গুঁফো লোকটা বলেছিল, প্রত্যেক মাসে মাসে রুগিকে চেক-আপ করাতে নিয়ে আসবে। আর ওষুধ নিয়ে যাবে। বিনেপয়সার ওষুধ।
প্রথমবারের পর আর যাওয়া হয়নি। একদিন হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া মানে ত্রিশ-ত্রিশ ষাট টাকা ভ্যানরিকশা ভাড়া আর একদিন কাজ কামাই। জগনের মা লতার মুখে সব শুনে জগনকে শুনিয়ে বলেছিল, ওদের কতা বাদ দাও বউমা। দাক্তারে অনেক কিচু বলে! অত কি মানা যায়! পেটের ভেতর সেঁদিয়েছে যখন ঠিক বড় হয়ে বেরুবে পেট থেকে। যা খেচ খাও। তার সঙ্গে নিত্যি এক গেলাস করে ভাতের মাড় খেয়ো। আর মাজেমদ্যে পোড়ামাটি খেয়ো একটু আধটু, ওই কটিং-মটিং, মাটির ভাঁড়ভাঙা। আমরাও তো ছেলেপিলে বিইয়েচি। ও-সব টনিক ফনিক খাইনি বাবার জম্মে। বলতে নাইকো, ষেটের বাচারা বেশ ডাঁটোই হইছিল। ও-সব টনিক কেনা মেলা খচ্চা। জগন পয়সা পাবে কোতা! ওই তো ওজগার! তাছাড়া টনিক খেয়ে পেটের ভেতর ছ্যানা বেশি বড় হয়ে গেলে আবার বিপদ। তখন কাটা-ছেঁড়া করে বার কত্তে হয় পেট থেকে।
না কাটা-ছেঁড়া করতে হয়নি লতার পেট। আয়া তো বলল, ‘নরমাল ডিলিভারি’! তবে তেমন ডাঁটো হল না মেয়েটা। ছেলে হলে বোধহয় ডাঁটো হয়, মোটাসোটা হয়। মেয়েরা তো চিরদিনই ‘ক্ষীণজিমি’, দুর্বল।
ব্রাহ্মণী নদীর ওপর কাঠের ব্রিজটা খুবই দুর্বল। অ্যামবাসাডার, জিপগাড়ি পেরোয় আস্তে আস্তে, ভয়ে ভয়ে। ভ্যানরিকশা যাচ্ছে, তাতেই ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ হচ্ছে। ব্রিজটার বয়সও কম হল না! সেই ছোটবেলায় যখন কাকিমা মারা গিয়েছিল, তখন নদীর ধারে শ্মশানে এসেছিল সকলের সঙ্গে। তখন দেখেছিল এই কাঠের ব্রিজটা তৈরি হয়েছে। আলকাতরা লাগানো হচ্ছে কাঠের রেলিঙে। সে-সব রেলিং কারুর বাড়ির জ্বালানি হয়ে ছাই হয়ে গেছে কবেই। তা প্রায় তের-চোদ্দবছর হল ব্রিজটার বয়স। গাঁয়ের পঞ্চায়েত মেম্বার অভিরাম সামন্ত বছর তিনেক আগে চেষ্টা-চরিত্তির করেছিল কংক্রিট ব্রিজ করার জন্যে।
তখন বিধানসভার ভোট আসছে। বিধায়ক হেমেন চ্যাটার্জি গাঁয়ে মিটিং করতে এসেছিল। মাইকের সামনে গলা ফাটিয়ে বলেছিল— এই গাঁয়ের মানুষজনদের দুর্দশার দিন এবার ঘুচবে। শহরে যেতে হলে ভ্যান-রিকশা, গরুর গাড়ি, নয়তো পায়ে হেঁটে তিন কিলোমিটার পথ যেতে হয় ওই ব্রাহ্মণী নদীটার জন্যে। নদীর ওপর কাঠের ব্রিজ থাকার জন্যে। কাঠের ব্রিজের পাশে কংক্রিট ব্রিজ করে দেওয়ার জন্য আমরা সরকারের কাছে দরবার করেছি। জনদরদী সরকারও আমাদের আবেদন মঞ্জূর করেছে। খুব শিগগির ব্রিজ তৈরির কাজ শুরু হবে। সামনের মাসেই কংক্রিট ব্রিজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হবে। ব্রিজ হয়ে গেলে এই গ্রাম থেকে বাস চলবে শহর অবধি। আপনারা...!
মিটিং শুনতে আসা মানুষের করতালির শব্দে বিধায়কের ভাষণের পরের কথাগুলো চাপা পড়ে গিয়েছিল।
বিধায়কের কথা মতো ব্রিজের ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল পরের মাসেই। সে কী বিশাল আয়োজন! ব্রিজের ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করতে আসবেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। এতদূরে আসার গাড়ির ধকল সহ্য করা সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। তাই তিনি আসবেন হেলিকপ্টারে। গ্রামের মানুষগুলোর কাছে সে কী রোমহর্ষক ব্যাপার! এ-রকম এক এঁদো গাঁয়ে কিনা মুখ্যমন্ত্রী আসছেন! তার চেয়েও বড় কথা হেলিকপ্টার এসে নামবে এ গাঁয়ে। ব্রাহ্মণী নদীর ধারে তৈরি হল অস্থায়ী হেলিপ্যাড।
অনুষ্ঠানের এক দিন আগে একটা হেলিকপ্টার এসে চক্কর মেরে গেল। অস্থায়ী হেলিপ্যাডে নেমেও দেখল সব ঠিকঠাক আছে কি না। সেদিন গাঁয়ের মানুষগুলোর কাছে কিংবা নেতাদের কাছেও আগাম খবর ছিল না। তাই হেলিকপ্টার দেখতে যাওয়া হয়নি। কিছু মানুষ ভাগ্যবান, যারা নদীর কাছাকাছি মাঠে ছিল। তারা দেখেছে সেই আশ্চর্য আকাশযানকে। বেশিক্ষণ ছিল না, নেমে, পরক্ষণেই আবার উড়ান দিয়েছে। অনুষ্ঠানের দিন হেলিকপ্টার দেখার সুবর্ণ সুযোগ কেউ হেলায় হারাতে চায়নি। তাই সকাল থেকেই নদীর ধারে মানুষের ঢল।
বেলা দুটো নাগাদ দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দেখা গেল বহু আকাঙিক্ষত আকাশ-যান। সূর্যের আলোয় রুপোলি রঙ চিকচিক করছে। সমস্ত মানুষের দৃষ্টি ওই পুষ্পক-রথে। দেবতা আসছেন মাটির মানুষের কাছে। কয়েকমিনিটের মধ্যেই আকাশ-যান নিকটবর্তী হয়েছে। এবার ঠিক মাথার ওপরে। দুলে দুলে নামছে। সে কী আশ্চর্য দৃশ্য! নিচে থেকে দেখে মনে হচ্ছে একটা বিশাল হাঙর যেন সবকিছু গিলতে আসছে! তার তলপেটটা লাল। গায়ে রুপোলি আভা। হেলিকপ্টারের বিশাল পাখার হাওয়ায় ধুলোর মেঘ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষগুলোর গায়ে মাথায় ধুলো ভর্তি। সে ধুলো মেখেও যেন আনন্দ! ধুলো নয় যেন দেবতার বিভূতি!
হেলিপ্যাডে নামার পর মানুষগুলো ওই পুষ্পকরথকে একটু ছুঁয়ে দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। পুলিশবাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়েছে সে ইচ্ছা নিবৃত্তি করার জন্য। মিনিট পনেরোর মধ্যে ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করা হয়ে গেছে। দুলে দুলে আকাশযান উঠে যাচ্ছে আকাশে। ঠিক যেন অনেক উঁচুতে ওঠা শকুন! একসময় দক্ষিণ পূর্ব কোণে অদৃশ্য হয়ে গেছে দেবতার পুষ্পক-রথ। মাটির মানুষগুলোর গায়ে মাথায় বিভূতি! ওদের যেন জীবন সার্থক হয়ে গেছে এই বিভূতি মেখে, দেব-দর্শন করে! কেউ বর্ণনা দিচ্ছে হেলিকপ্টারের, কেউ বা মন্ত্রীর ধবধবে পোষাকের। সকলের চোখে-মুখে এক তৃপ্তির উজ্জ্বলতা! যেন কী বিলাসিতাই না করল সকলে! জগন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে ওদের মুখের দিকে। ওর গায়ে-মাথায় নেই বিভূতি, মুখে নেই উজ্জ্বলতা। তার দিন আনা দিন খাওয়া জীবনে আজ কাজ কামাই করার বিলাসিতা করতে পারল না সে। দেবদর্শন হল না তার। জগন ভাবে, সবাই যেন দুয়ো দিচ্ছে তাকে। ও মনমরা। দলছুট যেন! সবাই ধুলো-মাখার দলে। ও একাই শুধু...! তাই জগন একটু এ-দিক ও-দিক দেখে নিয়ে রাস্তা থেকে ধুলো তুলে গায়ে-মাথায় ছড়িয়ে নেয় সবার অলক্ষ্যে। এখন সেও ধুলো-মাখার দলে। সে-ও এখন বিভূতিবিলাসী।
তিন বছর আগের সেই মুখ্যমন্ত্রী আসার কথা জগনের মনে এখনও জ্বল জ্বল করছে। জগন ফেরি করতে গিয়ে কানাঘুষো শুনেছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নাকি আবার আসছে এই এঁদো গায়ে। তবে এবার হেলিকপ্টারে নয়, গাড়িতেই আসবে। গাঁয়ের মানুষগুলোকে বোঝাতে আসবে, কলকারখানার কত দরকার! শুধু চাষবাস করে কিছু হয় না। কারখানা হলে অনেক ছেলের চাকরি হবে। কারখানার আশেপাশে অনেক দোকান-পসরা হবে। ব্যবসা বাড়বে। দেশের নাকি আয়-উন্নতি হবে।
এবারে মুখ্যমন্ত্রী হেলিকপ্টারে আসছে না বলে মানুষের মনে তেমন উন্মাদনা নেই। জগন ডালিমচাচার দোকানে বসে চা খেতে খেতে শুনেছে— কেউ কেউ বলছে, মন্ত্রী এলে নাকি তাকে কালো পতাকা দেখানো হবে। জোর-জবরদস্তি নাকি চাষের জমি কেড়ে নিয়েছে শিল্প করার জন্যে।
তা শুনে জগন ভেবেছে, মন্ত্রীর বাড়িতে কি কালো পতাকা নেই! জীবনে কি কালো পতাকা দেখেনি মন্ত্রী! ওটা দেখালেই বা কী হবে? চাষের জমি ফেরত পেয়ে যাবে চাষীরা? যদি জমি ফেরত দিয়েই দেয়, তাহলে কারখানা কি আকাশে হবে? এ-সব ভাবতে ভাবতে জগন নিজের মনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে— ও-সব কারখানা-ফারখানা হবে না। খালি হুজুগ! কী করে হবে, এতে তো অনেক লোকের বাধা, কোনও কোনও পার্টির আপত্তি! ওই ব্রাহ্মণী নদীর ওপর কংক্রিট ব্রিজ তৈরিতে কারুর আপত্তি ছিল না। তবুও সেটাই হল না তিন বছরে! তাহলে বাধাবিপত্তি পেরিয়ে কারখানা হবে কী করে!
ও-সব পার্টির লোকেরা ভোটের আগে অনেক কিছুই হবে-হবে বলে। শেষে কিছুই হয় না। হলেও ছোটখাটো একটা কিছু করে মান বাঁচায় ভোট পাবার জন্য। বড় কিছুর স্বপ্ন দেখায়, দেখতে ভাল লাগে। পরে স্বপ্ন ভেঙে যায়। এই তো লতা, মা ওরা স্বপ্ন দেখিয়েছিল লতার একখান ডাগর-ডোগর ছেলে হবে। সেই ছেলে লেখাপড়া শিখবে। বাবুদের মতন চাকরি করবে ওই নতুন হওয়া কারখানায়। কোথায় হল! হল তো একখান রোগা-প্যাঁটকা মেয়ে।
আসলে পার্টির লোকেরা স্বপ্ন বোনে চাষাভুষোদের মনে, আবার ইচ্ছে মতন স্বপ্ন তুলে ফেলে দেয়। ওই তো কংক্রিট ব্রিজের স্বপ্ন পুঁতেছিল মুখ্যমন্ত্রী নিজে হাতে। সেটা মাসখানেক আগেও ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে না। কে বা কারা ওটা তুলে ফেলে দিয়েছে ব্রাহ্মণীর জলে। সেটা নিয়েই কত জলঘোলা হল। ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন হলেও কংক্রিট ব্রিজ তৈরির কাজ এখনও শুরু হয়নি। বুড়ি কাঠের ব্রিজখানা ভ্যানরিকশার চাপে কান্নাকাটি করছে ক্যাঁচকোঁচ শব্দে। তাকে সাহায্য করার জন্য যুবতী ‘কংকিরিট বিরিজ’ পাশে এসে দাঁড়ায়নি এখনও।
বুড়ি মা-টা নিশ্চয় চিন্তা করছে বাড়িতে বসে। নাতি হওয়ার খবর পাওয়ার আশায় মুখিয়ে আছে হয়তো। নাতি হল না। নাতনি হওয়ার খবর শুনে মুখভার হবে কিনা কে জানে।
এ-সব ভাবনা জগনের মনের আকাশে কতরকম রঙ ছড়াচ্ছে। যখন ও বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছল তখন পুরো আকাশটার রঙ ধূসর। সূর্যটা যাওয়ার সময় সব রঙ চুরি করে নিয়ে গেছে। জগনের মনের আকাশেও ধূসরতা। সারাটা দিন তার যা ধকল গেল! বাড়িতে অসুস্থ মা-টার যে কী দশা কে জানে!
বার-দরজাটা খোলাই ছিল। জগন বাড়ি ঢোকে। উঠোনে হাঁস চারটে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পুকুর থেকে কখন উঠে চলে এসেছে। ওকে দেখে হাঁসগুলো জোরে প্যাঁক-প্যাঁকিয়ে ওঠে। জগনের পায়ের কাছে চলে আসে। লতা রোজ ওদের জন্য ভাত-কুঁড়ো দিয়ে রাখে মাটির খুলিতে। আজ সেটা খালি।
জগনের চোখ যায় দাওয়ায়। চটে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে মা। দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন অনেক পুরনো একটা তেলচিটে পাশবালিশ। মানুষটাকে চেনা যাচ্ছে না। অথচ ওটাই ওর মা। জগনের মনে ভাসে মায়ের সেই মুখটা— কয়েক বছর আগে যখন ও সারাদিন গাঁয়ে গাঁয়ে ফেরি করে শেষ বিকেলে বাড়ি ফিরত; তখন ওকে দেখে মায়ের চোখে-মুখে ঝিকমিকিয়ে উঠত কুসুম কুসুম রোদ্দুর। এখন মায়ের মুখের দিকে তাকালে কিছুতেই সেই মুখখানা খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ চোখ বুজলেই দিব্যি মনের আরশিতে সে মুখ ফুটে ওঠে।
জগন ইচ্ছাকৃত কাশির শব্দ করে। কিন্তু মা পাশ ফেরে না। ধক্ করে ওঠে জগনের মনটা। মা-তো এসময় ঘুমোয় না। ও কিছুটা আতঙ্কেই জোরে বলে ওঠে— মা!
নড়ে ওঠে পাশবালিশ। সেই নড়নচড়ন জগনের আটকে থাকা নিশ্বাসকে সচল করে।
ক্ষান্তমণি পাশ ফেরে— জগন! এলি বাবা? বউমা ক্যামন আচে? পেসব হয়েচে?
একটু থম মেরে থাকে জগন। তারপর শব্দ করে নিশ্বাস ছেড়ে বলে, হ্যাঁ, হয়েচে। তবে এর চে না হওয়া ভাল ছিল।
সে কী রে! অমন অলুক্ষুণে কতা বলচিস্ কেনে? কী হয়েচে? মেয়ে?
হ্যাঁ, মেয়ে।
পেথম সনতান ছেলে হোক আর মেয়ে হোক অবঘেন্না করতে নাইকো।
তার লেগে নয়কো। খুব ললাটে হয়েছে মেয়েটা। রোজোন মাত্তর এক কেজি আটশো। এইটুকুনি। হাড়ের ওপর চামড়া জড়ানো শুদু। বাঁচবে কিনা সন্দ।
ঠিক বাঁচবে। মেয়েদের কই মাচের পরান। তু মন খারাপ করিস নাকো। যা, হাতে মুকে জল দে। সারাদিন কিচু খ-অ হয়নি বোধায়! হ্যাঁরে! বউমা টন্কো আচে তো?
হ্যাঁ আচে। দাক্তার বলেচে কাল বাদ পশ্যু ছাড়বে। হাসপাতালে বেড খালি নাইকো। মেজেয় জায়গা দিয়েচে। কাল বেড খালি হলে দেবে।
দাওয়ার পাড়ের বাঁশে ঝুলতে থাকা গামছাখানা হাত বাড়িয়ে নেয় জগন। মাকে বলে, তুমি উটে আমাকে এক দশান তেল দাও। গায়ে-মাতায় বুলিয়ে একটা ডুব দিয়েই আসি। হাসপাতাল থেকে এলাম, ছোঁয়াছুয়ি করবো নাকো।
বাঁ-হাতের চেটোতে সর্যের তেল নিয়ে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে নাভিকুণ্ডে, দু’কানের ছিদ্রে আর নাকের ছিদ্রে তেল দেয় জগন। তারপর অবশিষ্ট তেলটুকু দু’হাতের তালুতে মাখিয়ে মাথায়, বুকে পেটে বুলোয়। হাত ঘুরিয়ে থপাস থপাস শব্দে পিঠেও তেল বুলোনোর চেষ্টা করে জগন। তেল মাখতে মাখতেই পুকুরঘাটের দিকে এগোয়। ঘাটের পাড়ে কলাগাছের ঝাড়ের পাশে কয়েক লহমা দাঁড়ায় জলের দিকে তাকিয়ে। হয়তো বা শীতের ভয়ে!
পৌষ আসতে এখনও বেশ দেরি আছে, সবে অঘ্রাণ মাস। এখনই বেশ ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। এবারে বেশ শীত পড়বে বোধহয়! দাওয়াটাকে পাটকাঠির বেড়া কিংবা চট দিয়ে ঘেরা দরকার। মা দাওয়ায় শোয়। একে অসুস্থ, তার ওপর বয়স হয়েছে। ঘরের মেঝেয় শুতে বললে, শোয় না মা। বলে, ‘ছেলে-বউয়ের সঙ্গে মাকে শুতে নাইকো। আমি বাইরেই ভাল থাকি।’
কবে থেকেই ভাবছে আর একখানা ঘর বানাবে, সে আর হয়েই উঠছে না। একটা না একটা সমস্যা লেগেই রয়েছে। এই যে বাচ্চা হল, এতে তো খরচ বাড়ল! তিনটের জায়গায় চারটে মানুষ হল। বাচ্চাটা যদি আর কিছুদিন পরে হত, কিছুটা সামলে-সুমলে নেওয়ার পর; তাহলে ভাল হত। কিন্তু লতার আর তর সইল না। কেন যে এত মা হওয়ার লোভ মেয়েমানুষের কে জানে! ও নিজে একটু হিসেব-নিকেশ করেই চলছিল, কিন্তু লতা সব হিসেবের গন্ডগোল করে দিল। এক দিন শোওয়ার পর কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে বলল, জানো তো, এমাসে আমার হয়নি। বোধায়...!
কথাটা বলেই লাজুক হেসেছিল লতা। ও সে হাসিতে হাসি মেলাতে পারেনি। বলেছিল, এত তাড়াতাড়ি! কী দরকার ছিল...! লতা ওর মুখে হাত চাপা দিয়েছিল, ছিঃ! অমন কতা বলতে নাইকো। যে আসচে তার অকল্যেণ হবে।
জগন এ-সব সাত-পাঁচ ভাবতে থাকে চারা কলাগাছের গুটিয়ে থাকা একটা কচি কলাপাতা খুলতে খুলতে। ওর মনটা হঠাৎ ধক্ করে ওঠে— ও মনে প্রাণে চায়নি বলে সত্যিই কি অকল্যাণ হল! তাই কি মেয়েটা অমন ‘দেড়-রোগা’, ‘তেঁয়াটে’ হল! না না, তা নয়; ও-সব কথার কথা। ওটা তো তার মনের কথা ছিল না। ও নিজেও তো মনে মনে বাবা হতে চেয়েছিল। মোড়লগাঁয়ে ফেরি করতে গিয়ে একদিন ধনা মোড়লের তেলকলের সামনে মোড়লের কোলে দেখেছিল দাদার ব্যাটাকে। তখন মনে হয়েছিল ওরও যদি এমন একটা ছেলে থাকত।
কচি কলাপাতাটা ছেড়ে দিতে আবার কেমন গুটিয়ে যায়। জগন চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ঝপাং করে লাফিয়ে পড়ে জলে। জলে ভেসে বেড়ানো কয়েকটা হাঁস সে শব্দে প্যাঁক প্যাঁক করে ডাঙায় উঠে পড়ে। জগন খলবল করে চান করতে থাকে।
ক্ষান্তমণি দাওয়ার পশ্চিম প্রান্তে গিয়ে ডাক ছাড়ে, কমলি, ও লো ও কমলি...!
ভাঙা পাঁচিলের ও-পাশ থেকে কমলার গলা, ঠাকমা, কাকা এয়েচে?
হ্যাঁ লো হ্যাঁ, তার লেগেই তো ডাকচি।
কী হয়েচে? ছেলে না মেয়ে?
ক্ষান্তমণির দুর্বল গলায় ‘মেয়ে’ উত্তরটা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কমলার চিৎকার— মেয়ে? তাইলে মেয়েই হল!
কমলার কিশোরী গলায় ‘মেয়ে’ উচ্চারণটা এত তীক্ষ্ণ যে, তা হাওয়ার বুকে বিঁধে যায়। হাওয়া বুক খালি করে কমলির মায়ের কানে। কমলির মা বলে দেওয়ালকে। দেওয়াল বলে পাশের বাড়ির বুঁচির মা-কে। বুঁচির মা শোনায় উঠোনের জামরুলগাছকে। জামরুলগাছ বলে টুনটুনিকে। এ-ভাবে পুরো পাড়া জেনে যায় জগনের মেয়ে হয়েছে।
ক্ষান্তমণি কী মনে করে কমলাকে হাঁক পাড়ার পরেও আর আসতে বলে না। নিজেই গুটিগুটি ঘরে ঢোকে। এনামেলের থালায় ভাত বাড়ে জগনের জন্য। শিম-আলু সেদ্ধ আর ভাত। ভাত বাড়তে বাড়তে ভাবে, ঠাণ্ডা ভাত আর এই সেদ্ধ, খাবে কী করে ছেলেটা! ঘরে ডিমও নাই যে একটা ডিম ভেঙে বড়া করে দেবে!
জগন পুকুরঘাট থেকে উঠে এসেছে। ভিজে জামা-গেঞ্জিগুলো উঠোনের তারে মেলে দিচ্ছে। ক্ষান্তমণি বলে, ওই দ্যাক দাওয়ার সাঙাতে নুঙি ঝুলচে। ওটা পরে খেতে বোস। ভাত বেড়িচি। ওই কলসি থেকে জল গড়িয়ে নে এক ঘটি। আর চ্যাটাইটা টেনে নিয়ে বোস।
জগন খেতে বসে। জগনের মা পাশে বসে বকতে থাকে, ওই কমলি এসে ভাতে-ভাত রেঁদে দিয়ে গেয়েচে। আর কিচু হয়নিকো! যেমন পারিস চাট্টি খা। সারা দিন খাসনিকো। পিত্তি পড়ে শরীল খারাপ হবে।
কিছুটা ভাত খায় জগন। অবশিষ্ট ভাত ঢেলে দেয় হাঁসের খাবারের খুলিতে। হাঁসগুলো যেন এরই অপেক্ষায় উঠোনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। খুলিতে ভাত ঢালামাত্র ওরা খলখল শব্দে খেতে শুরু করে। এত দ্রুত ভাতগুলো ওরা খেয়ে নেয়, যেন অনেকদিন কিছু খাওয়া হয়নি ওদের। কিংবা কে কত তাড়াতাড়ি বেশি বেশি খেয়ে নিতে পারে তারই প্রতিযোগিতা।
জগন হাত ধুয়ে দাওয়ায় বসে একটা বিড়ি ধরিয়েছে। জগনের মা ক্ষান্তমণি এখন ঘরে। ছেলেটা বিড়ি খায় ঠিকই, কিন্তু মাকে সামনে দেখলে বিড়িটা আড়াল করে। তাই ক্ষান্তমণিও সম্মান বজায় রাখতে ছেলের সামনে যায় না, যখন ও বিড়ি খায়।
জগন এখন দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে উঠোনের দিকে তাকিয়ে। হাঁসগুলোকেই দেখছে বোধহয়! খাওয়া শেষ হলে ওরা দরমার মধ্যে ঢুকে গেল একে একে। মদ্দা হাঁসটা ফ্যাঁসফেঁসে গলায় ডাকতে ডাকতে সকলের আগে ঢুকল। পেছনে মাদি তিনটে। জগন উঠে গিয়ে হাঁসের দরমায় পাটা লাগিয়ে আবার এসে বসে দাওয়ায়।
কিছুক্ষণ আগের প্যাঁক প্যাঁক ডাক এখন পিঁক পিঁক আওয়াজে বদলে গেছে! এখনও ওরা দরমার মধ্যে থিতু হতে পারেনি। পিঁক পিঁক শব্দে ওরা খুনসুটি করছে নাকি সোহাগ, কে জানে। জগনের মনে আসে লতার কথা, মেয়ের কথা। হাসপাতালে তো বেড পায়নি। মেঝেই রয়েছে। কম্বল-টম্বল দেবে তো আবার! বেশ ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। বাড়ি থেকেও তো কম্বল নিয়ে যাওয়া হয়নি। শুধু একটা চাদর আছে লতার গায়ে। বেশি বড় নয়। মেয়ের গায়ে জড়ালে লতার গায়ে টান পড়বে। কম্বল কি আর দেবে না! নিশ্চয় দেবে।
এমন ভাবতে ভাবতে জগন বিড়িতে টান দিতে ভুলেছে। বিড়ির আগুন কেটে গেছে। আলমগাঁয়ের পান দোকানি শিবু বেশ বলে— বিড়ি হল গে লতুন বউ, ঘন ঘন চুমু না খেলে গিদের (অভিমান) হয়, তাই আগুন কেটে যায়। আর ‘সিগাট’ হল গে তিন ছেলের মা। মুকে একবার আগুন ধরিয়েচ কি না আর লিববে নাকো সহজে, আগুনমুকো হয়েই থাকবে যতক্ষণ না মুক ঠুসে ধরচ।
জগন আর বিড়িটা ধরায় না। নিভে যাওয়া বিড়ি ধরিয়ে টানলে নাকি কাশি হয়! খুব ক্ষতি করে শরীরের। মিত্তন মাস্টার বলে— বিড়ি-সিগারেট খাওয়া খুবই ক্ষতিকর। এতে নাকি ক্যানসার হয়। মশারির ভেতর বা ঘরের ভেতর বিড়ি-সিগারেট খাওয়াই উচিত নয়। ধোঁয়া যার নাকে যাবে, তারও ক্ষতি।
ও কবে থেকেই ভাবছে বিড়ি খাওয়াটা ছেড়ে দেবে; তা কিছুতেই আর পারছে না। চা খাবার পরেই মনটা ছুকছুক করে বিড়ি খাওয়ার জন্যে। নাঃ, এবার ছাড়তেই হবে বিড়ি খাওয়াটা, তা না হলে ধোঁয়ায় মেয়ের ক্ষতি হবে যে!
দশ
‘প্রতিকূল ভাগ্য আসে
হিংস্র বিভীষিকার আকারে
তখনি সে অকল্যাণ
যখনি তাহারে করি ভয়’
— রবীন্দ্রনাথ
ঘরের ভেতর একটু একটু করে দখল নিচ্ছে অন্ধকার। কিন্তু দাওয়ার আলো মরেনি এখনও। জগন দাওয়ায় বসে রয়েছে আদুল গায়ে। জগনের মা ঘরের ভেতর একটা ছেঁড়া কাঁথা জড়িয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে। বেশ শীত করছে ওর। তবে কি ওর জ্বর আসছে নাকি? আসতেও পারে! মাঝে মাঝেই জ্বর হয়। নিঞ্জূমাস্টারের হোমিওপ্যাথি দানা আর গোটা দুই উপোস দিলেই জ্বর ছেড়ে যায়। আবার দিনকয়েক পর...! আজ বোধহয় ভালরকমই আসবে জ্বরটা, তারই প্রস্তুতি যেন! ক্ষান্তমণির শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এই অবেলায় শুয়ে থাকলে সংসারের নাকি অকল্যাণ হবে, তাই বসে রয়েছে কষ্ট করে।
জগন বসে আছে দাওয়ায়। ওর দৃষ্টি উঠোনের সজনে গাছটার দিকে। হয়তো ও সজনে গাছটাকে দেখছেই না। হয়তো চোখেই পড়ছে না সজনেফুলের ছোট্ট ছোট্ট কুঁড়িগুলোকে! নিশ্চয় ওর চোখ চলে গেছে কঙ্কালসার সজনে গাছের ডাল ছুঁয়ে দূর আকাশে উড়ে বেড়ানো কয়েকটা প্রাণীর দিকে। খালি পাক খাচ্ছে আকাশে। ওগুলো চাতকপাখি না চামচিকে কে জানে!
জগন ভাবছে ওর ব্যবসার কথা, আজ কাজে না যেতে পারার কথা। কাল কাজে যাবে; নাকি হাসপাতাল যাবে ঠিক করতে পারছে না। কাল বোধহয় ছুটি দেবে না লতাকে! নার্স বলছিল কাল একজনের ছুটি হবে, বেড খালি হবে। লতাকে নাকি বেডে দেবে। তাহলে কালকের দিনটা গাঁ ঘুরতে গেলেই হয়, তা না হলে মহাজনের টাকা মেটানো যাবে না। কিন্তু মায়ের শরীরটাও ভাল নেই। লতা হাসপাতালে, ও যদি সকালবেলা কাজে চলে যায়, তাহলে সারাটা দিন মা একা-একা কী করবে কে জানে! মা দিনকে দিন আরও কাহিল হয়ে পড়ছে! লতাকে বাড়ি আনার পর ইদ পেরোলে মা-কে একবার হাসপাতালে দেখানো দরকার।
একা-মানুষ হওয়া খুবই জ্বালা! দাদাটা থেকেও নেই। প্রেম করে তো বিয়ে করলি। যা করলি, করলি, বাড়িতে একসঙ্গে থাকলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত! একসঙ্গে থাকার কত সুবিধা। বিপদে-আপদে, ডাকতে হাঁকতে পাওয়া যায়। ভাইয়ে-ভাইয়ে মিলেমিশে থাকলে অন্যরাও একটু সমীহ করে। দু’ভাইয়ে একসাথে মানে, কোনও কিছু হলে দু’খান লাঠি বেরোবে এ বাড়ি থেকে। এটা যে কেন বুঝল না দাদাটা! দাদাকেই বা কী দোষ দেবে! আজকাল এই এক ‘চল’ হয়েছে— ভাই-ভাই ঠাঁই-ঠাঁই। সব বাড়িতেই এক অবস্থা! কেউ কারুর সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চায় না। শুধু বাড়িতেই বা বলি কেন, পাড়ায়-পাড়ায়, দেশে-দেশেও ওইরকম ‘ভেনো’ হওয়ার বিষাক্ত বাতাস বইছে।
সেদিন মিত্তন মাস্টার মোড়পতলায় দাঁড়িয়ে বলছিল, আমাদের এই পশ্চিমবাংলাটাও নাকি ভেঙে দু’টুকরো করার চক্রান্ত চলছে। কীসব অমুক ল্যান্ড তমুক ল্যান্ড বানাবে। যারা দেশ শাসন করছে, তাঁরা কেন যে ওই দু’টুকরো করতে চাওয়া লোকগুলোকে নিকেশ করে না, কে জানে!
মিত্তন মাস্টার বলছিল, ‘ওদের দ্বারা কিস্যু হবে না। ওরা ইচ্ছা করেই এই ভাঙাভাঙিটা জিইয়ে রাখবে। ওরা পারবেই বা কী করে! যে সর্ষে দিয়ে ভূত ছাড়াবে, তার মধ্যেই তো ভূত ঢুকে আছে। ওদের পার্টির মধ্যেই তো ‘নানা মুনির নানা মত’। একটা দল ভেঙে দুটো-তিনটে দল হচ্ছে। পাঁচ-ছ’টা দল নিয়ে গড়া সরকারি দলেও মিলমিশ নাই, এক-এক দল এক-এক রকম কথা বলে। ওদের দলের কেউ শিল্প চায়, কেউ শিল্প চায় না। কেউ বলে, জমি নিয়েছে বেশ করেছে। কেউ বলে, এ-ভাবে জমি নেওয়া অন্যায়। আসলে, কারখানা নয়, আবাসন হবে ওই জমিতে।’ এমন সব নানান্ কথা বলছিল মিত্তন মাস্টার।
জগন বসে বসে ভাবে মিত্তন মাস্টার ঠিকই বলেছে। আসলে, মানুষ এখন খুব স্বার্থপর আর লোভী হয়ে গেছে। নিজের ‘গন্ডা’টি ভাল বোঝে। দাদাটাও স্বার্থপর, লোভী। তোর বউকে তো বাড়িতে থাকতে দেওয়া হবে না বলেনি কেউ! শ্বশুরের মোটা টাকা দেখে লোভে পড়ে গেলি। যেদিন পাছায় লাথি মেরে তাড়াবে, সেদিন কোথায় যাবি! এ বাড়িতে ঢুকতে লজ্জা লাগবে না! এ-সব ভাবনা জগনের মনে ছুটে বেড়ায়।
দাদার ওপর বেশ রাগ হয় ওর। রাগটা একটু একটু করে চড়তে থাকে। হঠাৎ ওর মনে পড়ে যায়, দাদা সঙ্গে না থাক সেই ভ্যানরিকশাওলা নগেন আজ দাদার কাজ করেছে। হাসপাতালে ওর টাকাটা না পেলে! ওকে এখুনি একবার পুব পাড়ায় যেতে হবে। সেই নগেনের বাড়ি। ভগা-বাগদি একশো টাকা ধার চেয়ে আনল যার কাছ থেকে। টাকাটা ওকে বিকেলে দেওয়ার কথা। বিকেল পেরোতে চলল। এখ্খুনি যাওয়া দরকার। খুব উপকার করেছে ছেলেটা! টাকাটা না জোগাড় হলে কী করে যে ওষুধ কেনা হত!
জগন উঠে পড়ে। ওর রাগটা উবে গেছে মন থেকে। মনকে প্রবোধ দেয়— যার কেউ নেই তার ভগবান আছে। দাদাটা পর হয়ে গেলেও পর তো আপন হয়েছে। ভগা-বাগদি, ওই পুব পাড়ার নগেন ওরা তো ভাইয়ের কাজই করেছে।
ঘরে ঢুকে একটা টিনের তোরঙ্গ বের করে জগন। তোরঙ্গ খুলতেই নাকে আসে ন্যাপথালিনের গন্ধ। এ গন্ধটা ওর খুব ভাল লাগে। লতার গায়ে মাঝে মাঝে এমন গন্ধ পাওয়া যায়। তখন খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করে লতাকে। তোরঙ্গর ভেতর ভাঁজ করে রাখা লতার কাপড়-চোপড়ের তলা থেকে বের করে একটা ছোট্ট পুঁটলি। সে পুঁটলিতে কয়েকখানা একশোটাকা আর পঞ্চাশ টাকার নোট। লতার সম্পদ এগুলো। বিপদে আপদে, দুর্দিনে কাজে লাগবে ভেবে যখের ধনের মতো লতা আগলে রেখেছে টাকা ক’টা। ওর বিয়ের সময় আত্মীয়-পরিজনেরা হাতে টাকা দিয়ে আশীর্বাদ করেছিল।
সে-টাকা ও সযত্নে রেখে দিয়েছে ওর বাপের বাড়ি থেকে দেওয়া টিনের তোরঙ্গে নতুন শাড়ি-ব্লাউজের ভাঁজে।
সেই টাকা থেকে জগন মাত্র একশো টাকা নিয়ে আবার ঠিকঠাক রেখে দেয় সবকিছু। তারপর বেরিয়ে পড়ে পুবপাড়ার পথে। যেতে যেতে ভাবে, লতার বুকের পাঁজর যেন এ টাকাগুলো। কিছুতেই খরচ করতে চায় না। বলে, ‘অসময়ে কাজে লাগবে।’ সেই থেকে খরচ করতেই হল নিরুপায় হয়ে। হাতে মোটেও টাকা নেই। লতা হয়তো রাগ করবে না। এখন তো অসময়ই বলা চলে।
পরক্ষণেই জগন ভাবে— না না অসময় কেন হবে! মেয়ে হয়েছে। কথায় বলে— মেয়ে ঘরের লক্ষ্মী। লক্ষ্মী এসেছে ঘরে। এখন থেকেই হয়তো সুসময়ের শুরু। মেয়ের পয়েই হয়তো ওর কপাল খুলবে। ব্যবসার আয়-উন্নতি হবে। হয়তো আর গাঁয়ে-গাঁয়ে ফেরি করতে যেতে হবে না। দখিনপাড়ার হাটতলায় একটা দোকান দেবে। মনোহারি দোকান। হরেক রকম চুড়ি, কানের দুল, ইমিটেশন গয়না, নেলপালিশ, চোখের কাজল, লিপস্টিক, সব, সবকিছু রাখবে। দলে দলে আসবে বউ-ঝি-রা। তাদের নরম নরম হাতে তুলে দেবে ডজন-ডজন কাচের চুড়ি। কাচের চুড়ি পরে ঝনক ঝনক শব্দ তুলে তা’রা খিলখিলিয়ে হেসে উঠবে।
ওই হাসি দেখতে ওর যে কী ভাল লাগে! সারা শরীর দুলিয়ে হাসে কেউ কেউ আবার! তখন ও আর তাকাতে পারে না তার দিকে। লজ্জা লাগে, চোখ নামিয়ে নেয়। লোকে দেখলেই বা কী বলবে! ভাববে চুড়িওলা খুব হ্যাংলা, নির্লজ্জ। খদ্দেরও নষ্ট হবে তাতে। তবে সবচেয়ে ভাল লাগে বাচ্চা মেয়েকে চুড়ি পরিয়ে দেওয়ার পর, তার ফোকলা দাঁতের হাসি। হাতে যেন স্বর্গ পেয়েছে মেয়ে! ওর মেয়েটা যখন বড় হবে তখন তার হাতেও চুড়ি পরিয়ে দেবে। রামধনু রংয়ের চুড়ি।
রামধনু রংয়ের চুড়ির কথায়, মনে পড়ে যায় অনেকদিন আগেকার কথা। লতাকে ঘরে আনার পর সে এক কাণ্ড! মাসি-পিসিরা বলল, ওরে জগা! ফুলশয্যের রেতে লতুন বউকে উপহার দিতে হয় যে! কী তোয়ের করিয়ে রেকিচিস? হাতের বাজু না পায়ের মল?
সাত কাজের মধ্যে জগনের মাথায় আসেনি বউয়ের জন্য উপহার তৈরির কথা। কিন্তু নতুন বউয়ের সামনে হারলে চলবে কেন? তাই বলেছিল— আমি নিজেই তো গয়নার ব্যবসা করি গো! তোয়ের করাতে হবে কেনে! রেতের বেলায় বউয়ের লরম-লরম হাতে পরিয়ে দোব রামধনু রঙা চুড়ি।
সকলে খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছিল। লতাও মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট টিপে হেসেছিল। কী মিষ্টি সে হাসি! এখন আর লতা তেমন হাসে না।
ওর কথা শুনে পাশের বাড়ির পরি-বউদি বলেছিল, ঠাকুরপো, কী বুদ্ধি তোমার! রাতে সেই সময়ে চুড়ির শব্দ শোনা যাবে যে! বউ লজ্জা পাবে না!
ফাজিল পিসতুতো বোনটা তা শুনে বলেছিল, না গো বউদি! দাদার ধাম্সানিতে সব কাচের চুড়ি গুঁড়ো-গুড়ো হয়ে বিছানায় পড়বে। শেষে রক্তারক্তি কাণ্ড না হয়!
জগন পথে যেতে যেতে আপন মনেই হেসে ওঠে এ-সব কথা মনে পড়ায়। সেদিন ফুলশয্যার রাতে ও বউকে দিয়েছিল ইমিটেশনের জড়োয়া সেট। বকুলগাঁয়ের সেনবাড়ির ছোটবউ অর্ডার দিয়েছিল জিনিসটার। তার জন্যেই মহাজনের ঘর থেকে তুলেছিল এমন দামি মাল। সেটাই লতাকে দিয়েছিল। পরে আবার এনে সেনবাড়িতে দিয়েছিল অর্ডারি জড়োয়া সেট। সেনবাড়ির ছোটবউ সেটা কিনে নিয়ে একটা পুরনো গয়নার বা’ে ভরে ওর হাতে দিয়ে বলেছিল, জগন! এটা তোমার বউয়ের জন্যেই আনালাম। বউকে দিয়ে বলো, ‘সেনবউদি দিয়েছে।’
সত্যিই সকলেই তাকে খুব ভালবাসে। এই যে পুবপাড়ার ছেলেটা, নগেন না কী যেন নাম! ও চেনেই না। সে কিন্তু ওকে চেনে। ওর কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে একশো টাকা ধার দিয়েছে। ভগা-বাগদি বলেছিল, তেঁতুলতলার পাশেই টালির একচালাটা নগেনের। ওই যে ওই বাড়িটাই হবে বোধহয়! নগেন কি বাইরে দাঁড়িয়ে আছে! না, ওটা নগেন নয়। তবে, নগেনের বাড়ি ওটাই। এমন ভাবতে ভাবতে জগন এগোয় টালির একচালাটার দিকে।
জগন কখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে খেয়াল করেনি ক্ষান্তমণি। একটু আগে ঘরের ভেতরে তোরঙ্গ বের করে কী খুটখাট করছিল, তারপর দাওয়ায় গেল। একটু পরে সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখে জগন নেই। ছেলেটা দূরে কোথাও গেলে তো বলে যায়! সাইকেলটাও তো পেঁপেগাছে ঠেসানো রয়েছে। তাহলে হয়তো কোনও দরকারে কাছেপিঠেই গেছে। চলে আসবে নিশ্চয় এখুনি। এমন ভেবে ক্ষান্তমণি দাওয়ায় উনুনের পাশে বসে কাঁথা মুড়ি দিয়ে।
একটু পরেই কমলা আসে। ক্ষান্তমণি ও-বেলাতেই ওকে বলে রেখেছে, যে ক’দিন লতা আঁতুড়ে থাকবে, সে ক’দিন সন্ধেবেলায় এসে পিদিম জ্বালিয়ে সাঁঝ দেখিয়ে যাওয়ার জন্য। কমলা শুধোয়, ও ঠাক্মা কাকা কোতা গো!
কোতা গেল কে জানে! আচে কোতাও। কিচু দরকার নাকি?
না, দরকার কিচু নয়কো। শোনলাম মেয়ে হয়েচে। তা দেকতে ক্যামন হয়েচে শুদাতাম। ক্যামন হয়েছে বলল, কাকির মতন ফস্সা?
শুদোই-নিকো। ওর মন-মেজাজ ভাল নাই মেয়েটা রোগা হয়েচে বলে।
কমলা একদণ্ড তাকিয়ে থাকে ঠাক্মার দিকে। ঠাক্মারও কি মনটা খারাপ, মেয়ে হয়েছে বলে! ঠাক্মার ধারণা ছিল ‘ব্যাটাছেলে’ হবে! ওর নিজের মনটাও ভাল নেই খবরটা শোনার পর থেকে। ওর ছোট্ট স্বপ্নটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। কাকির সঙ্গে নিরালায় বসে কখনও সখনও স্বপ্ন দিয়ে কথা বুনেছে— কাকি! ভাই হলে আমাকে কোলে নিতে দেবা তো! আমি ওর কপালে চাঁদের মতোন গোল টিপ পরিয়ে দোব। চোকে কাজল পরিয়ে দোব। তারপর লাল রংয়ের জাঙি পরিয়ে ওই ঠাকুরপাড়া দিয়ে বেড়াতে নিয়ে যাব। তুমি ততক্ষণে ঘরের কাজকম্ম সেরে নেবা। তারপর ফিরে এলে তুমি বোতলে দুদ ভরে দেবা, আমি উটোনে ঘুরে ঘুরে দুদ খাওয়াবো।
কাকি বাঁশবনের মাথায় ভাঙা চাঁদটার দিকে তাকিয়ে থেকে শুধু বলেছে, হুঁ। কমলাও আর কোনও কথা না বলে কাকির মুখের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থেকেছে। কাকির আনমনা চোখদুটো কোন সুদূরে স্থির থাকতে থাকতে হঠাৎ দোল খেয়ে এসে ওর চোখে পড়তেই, ওর মাথাটা টেনে নিয়ে নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরেছে কাকি। ওর রুখু মাথার ওপর থুতনি রেখেছে কিছুক্ষণ। ওর নিশ্বাস গাঢ় হয়েছে। কানে বেজেছে কাকির বুকের ধুকপুকুনি। তখন ওর মনে হয়েছে কাকি তাকে খুব ভালবাসে। হয়তো মায়ের চেয়েও বেশি! তখন ওরও খুব ইচ্ছে করেছে কাকিকে ভালবাসতে, একটু সেবা যত্ন করতে। কী করবে ভেবে না পেয়ে বলেছে, কাকি! তোমার পা-দুটো একটু টিপে দোব? মাঝে মাঝে যন্তনা হয় বল যে!
কাকি হেসে বলেছে— না রে! এখন দিতে হবে না। যন্তনা হলে বলব। তুই খুব ভাল মেয়ে রে কমলি! দেখিস! তোর খুব ভাল ঘরে বিয়ে হবে। তোর খুব ভাল বর হবে। তোকে খুব ভালবাসবে তোর বর!
ও তখন লজ্জায় মুখ লুকিয়েছে কাকির পিঠে। ঠিক তখনই একটা মিষ্টি গন্ধ এসে ওর নাকে লেগেছে। গন্ধটা কাকির চুলের না উঠোনের কোণে ফুটে থাকা বেলফুলের; তা বুঝে উঠতে পারেনি ও।
ওর নিজের মনটা যেমন ভাল নেই; তেমন কাকিরও নিশ্চয় খুব মন খারাপ! কাকির স্বপ্ন ছিল কোল আলো-করা ছেলে হবে তার। অথচ...! কাকি মাঝে-সাঝে বলে, কমলি। মেয়েদের জীবনটা খুব কষ্টের রে! পরের জম্মে ব্যাটাছেলে হয়ে জন্মাবো বেশ!
কমলা নিজের কথা ভাবতে ভাবতে আনমনে বলেছে, আমুও।
কমলা কোন স্বপ্নের দেশে ছিল যেন এতক্ষণ। হঠাৎ ঠাক্মার কথায় বাস্তবে ফিরে আসে। ঠাকমা বলে, কমলি! সাঁজ দেকাবার সোমায় হল বোধায়! ঘরে দুয়োরে জলছড়া দিয়ে পিদিম ধরা এবার। আমাদের তো আনন্দ-অশোচ, ছুঁতে পাব নাকো। তু ছুলে দোষ নাইকো। একই বংশের হলেও অন্যবাড়ির তো বটে। তিন-সন্দে সাজ না দেকালে বাস্তুদেবী উষ্ট (রুষ্ট) হয় জানিস তো মা!
কমলা ঘরে ঢুকে গায়ের ফ্রক খুলে রেখে শুধুমাত্র সন্ধ্যাপ্রদীপ দেখানোর জন্য রাখা ছালটি কাপড়খানা (পট্টবস্ত্র) শরীরে জড়িয়ে নেয়। পুরনো ঘি’য়ের মতো রঙের কাপড়ে কমলার অন্য এক রূপ। তামার গেলাসে গঙ্গাজল ঢেলে নেয় ছোট ঠিলি থেকে। ঘরের দরজার চৌকাঠে, দাওয়ায় ওঠার ধাপিতে, মাঝ-উঠোনে, তুলসীতলায় আর বার-দরজায় গঙ্গাজল ছিটোয় কমলা। তারপর মাটির প্রদীপ ধরায়। ধূপকাঠি খোঁজে। পায় না।
আদুল গায়ে ছালটি কাপড়, হাতে জ্বলন্ত প্রদীপ, আধবোজা চোখ, নড়তে থাকা ঠোঁটে অস্পষ্ট স্তোত্র উচ্চারণ। এ রূপে সেই কিশোরী মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কমলা যেন ভৈরবী রূপ ধারণ করেছে এখন।
ও প্রদীপখানা দু’হাতের তালুতে রেখে দেওয়ালের ছবিগুলোর সামনে, রং চটে যাওয়া মূর্তিগুলোর সামনে ধীরে ধীরে ঘোরায়। মাথা নিচু করে কপালে জোড়া কি ঠেকায়। ক্ষান্তমণি দীর্ঘনিশ্বাসের সঙ্গে ‘হরিবোল’ বলে ওঠে। অস্পষ্ট স্বরে আরও কিছু বলে। সবশেষে ‘রক্ষে কর মা’ বলে কপালে হাত ঠেকায়।
কমলা ততক্ষণে দাওয়া পেরিয়ে মাঝ উঠোনে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে হয়তো বা কাকি ও না-দেখা বোনটার কল্যাণ কামনা করে। তারপর তুলসীতলায় প্রদীপ নামিয়ে গড় হয়ে প্রণাম করে। এমন সময় জগনের দাদা মদন এ বাড়িতে ঢোকে। পায়ের শব্দে কমলির বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। মুখ তুলে বলে, কাকা এলে। ও বড়কাকা!
হ্যাঁ রে আমি। ভাল আচিস তো!
আচি। ঠাকমার শরীল ভাল নাইকো। তুমি তো এ-বাড়ি আসোই না কাকা!
মদন ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’-য়ের মাঝামাঝি একটা শব্দ করে দাওয়ার দিকে এগোয়। আঁধার-মেশা মলিন আলোয় দেখতে পায় দাওয়ায় উনুনের পাশে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে বসে রয়েছে মা। মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রেখেছে। ও বুঝতে পারে কমলির কথা মায়ের কানে গেছে। ও যে এসেছে মা দেখেছে। তবুও মা ইচ্ছা করেই মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে অন্যদিকে। ওর মনে পড়ে যায় রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া দিনটার কথা। মা রাগের মাথায় বলেছিল, ‘তোর মতোন কুলাঙ্গার ছেলের মুক দেকতে চাই না আমি।’
সে কথা রাখতেই মা বোধহয় মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। ও দাঁড়িয়ে পড়ে মাঝ উঠোনে। আর এগোবে কি না ভাবে। মায়ের এই স্থির মূর্তি দেখে হঠাৎ ওর ‘পৌষবুড়ি’র কথা মনে পড়ে যায়। ঠিক যেন পৌষবুড়ির মতো লাগছে মাকে এখন। পৌষ সংক্রান্তিতে ও নিজে হাতে বানাত পৌষবুড়ি। সে কবেকার কথা। ভগদত্ত, জয়লাল ওরা সব শুকিয়ে যাওয়া পুকুর থেকে পাঁক তুলে আনত। জগা জোগাড় করে নিয়ে আসত বাতিল মুড়ি ভাজার খুলি। পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া খুলি দিয়ে পৌষবুড়ির মুন্ডু করত। খড়ি মাটির অভাবে বটার পানের দোকান থেকে চুন চেয়ে নিয়ে আসত সিগারেটের প্যাকেট-ছেঁড়া কাগজে। সেই চুন দিয়ে পোড়া খুলির ওপর ফুটিয়ে তুলত পৌষবুড়ির চোখ-মুখ। খুলির ওপর শনের ফেঁসো চড়িয়ে বুড়ির চুল বানাত। পাঁক দিয়ে তৈরি হত বুড়ির আধশোয়া শরীর। কোনও ফিচেল ছেলে কখনও আবার দুটো শোলে-বেগুন নিয়ে এসে পাঁকে গুঁজে দিয়ে বুড়ির বুক বানাত। ওর অবশ্য পছন্দ নয় পৌষবুড়ির উদোম শরীর; তাই মায়ের একখানা মুড়ো কাপড় এনে পৌষবুড়ির শরীরে জড়িয়ে দিত। এখন আবছা আলোয় মাকে ঠিক সেই কাপড়ঢাকা পৌষবুড়ির মতো লাগছে।
মা তো কিছু দিন আগেও এত বুড়ি ছিল না! তিন-চার মাস আগে একবার দেখেছিল মাকে। হাসপাতাল থেকে ভ্যানরিকশায় চড়ে ফিরছিল মা। তখন তো এত বুড়ি হয়নি!
কমলা তুলসীতলা থেকে প্রদীপ তুলে নিয়ে ঘরের দিকে এগোতে গিয়ে বলে, কী হল বড় কাকা, মাঝ উটোনে দাঁড়িয়ে পড়লা কেনে? ঘরে চল।
হ্যাঁ যাই।
মদন পায়ে পায়ে দাওয়ায় ওঠে। একটু ইতস্তত করে বলে, মা তুমি কেমন আচ?
ক্ষান্তমণি একটু কেশে নিয়ে বলে, আখুনো মরিনিকো। মল্লে খপর পাবি।
মরার কতা কি শুদিয়িচি? অমন কতা বলচ কেনে?
ক্ষান্তমণি চুপ থাকে।
মদন আবার বলে, জগাকে দেকচি নাকো। আখুনো ফেরেনি নাকি?
কমলা ঘরের ভেতর পিদিম বসাতে বসাতে থেকে উত্তর দেয়, এই তো একটু আগে কাকা হাসপাতাল থেকে ফিরল। কাকির মেয়ে হয়েচে।
ও! তা বেশ! হ্যাঁরে কমলি! তা বউমা, বাচ্চাটা ভাল আচে তো?
তা আচে বোধায়। কাকার সনে আমার দেকা হয়নিকো। আমি এই সাঁজ দিতে এলাম এখুনি।
ও! তা কোতা গেল তোর কাকা?
কে জানে! কাচেই কোতাও গেয়েচে। বস না। আসবে এখুনি।
মদন ঠিক করতে পারে না অপেক্ষা করবে না চলে যাবে।
কমলা এর মধ্যে ছালটি কাপড় বদলে ফ্রক পরেছে। দাওয়ার কোণে রাখা একটা লম্ফ নিয়ে গিয়ে প্রদীপের আগুনে জ্বালিয়ে দাওয়ায় এনে রেখেছে। তারপর ঘরের ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা চট এনে দাওয়ায় পেতে দিয়েছে— বস বড়কাকা! কাকিমা, তারপর তোমার ছেলে কী যেন নামটা?
বোধন। চটে বসতে বসতে মদন বলে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বোদন, কেমন আচে ওরা?
ওই আচে একরকম। তোর মা বাবা ভাল আচে?
হ্যাঁ, ভাল আচে। বস কাকা, তোমার লেগে একটু চা করি। ঠাকমা! তুমিও চা খাবা তো!
অদূরে বসে আছে ক্ষান্তমণি। সে কোনও কথা বলে না। শুধু আড়চোখে দেখে মদনকে। সোজাসুজি তাকায় না। ওর মনে হয় ছেলেটা একটু যেন রোগা হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালচে ছোপ। গালে খোঁচা-খোঁচা দাঁড়ি। লম্ফর আলোয় চোখে ধরা পড়ে ছেলেটার থুতনির দাড়িতে পাক ধরেছে। ক্ষান্তমণি ভাবে, ছেলেটার কতই বা বয়স হল! এর মধ্যেই...। যেন সেদিনকার কথা মনে হচ্ছে, দু’ভাইয়ে খেতে বসে খুনসুটি করত। জগার পাতের মাছখানা খপ করে তুলে নিয়ে নিজের পাতে ভাতের তলায় লুকিয়ে রাখত। পরে জগা সেটা ওর পাত থেকে আবিষ্কার করার পর দু’জনে হাতাহাতি লাগল। তখন খুন্তি উস্কে মারের ভয় দেখিয়ে ওদেরকে নিরস্ত করতে হত। বড়টা একটু বেশি বেশি খেত। খাওয়া শেষে ছোটটার পাতে পড়ে থাকা অবশিষ্ট ভাতটুকুর দিকে লোভী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। ভাই উঠে গেলে শুধু চোখের ইশারায় সম্মতির অপেক্ষা। ভাই হাত ধুয়ে ফিরতে না ফিরতে গপ গপ করে খেয়ে নিত ভাতটুকু। চেহারাখানাও ছিল মস্ত মল্লবীরের মতো। সেই চেহারা এমন ভেঙে গেল কী করে! শ্বশুরবাড়িতে কি পেট পুরে খেতে পায় না! কেন যে মতিচ্ছন্ন হল ছেলেটার; ঘরজামাই থাকতে গেল! ধনা মোড়লের সেই মা কালির ছা কালনাগিনী মেয়েটা কী যে যাদুটোনা করল ছেলেটাকে! আসলে, বড়টার পাহাড়-পারা শরীরখানাই ছিল শুধু, বুদ্ধি কম ছিল। সে তুলনায় জগাটা...!
এমন সময় জগন বাড়ি ঢোকে। দাওয়ায় পুরুষ মানুষ বসে থাকতে দেখে এক মুহূর্তের জন্য চমকে ওঠে ও। কাছাকাছি গিয়ে দেখে দাদা। অনেকদিন পর দাদা এ বাড়িতে এল। হঠাৎ দাদা এল কেন? কোনও বিপদ-আপদ নয়তো? বউদি কিংবা বাচ্চাটার কিছু হয়নি তো? এমন ভাবনা নিমেষে খেলে যায় জগনের মনে। ওর মনের প্রশ্ন ঠোঁটে ফোটে, দাদা, সবাই ভাল আচে তো?
হ্যাঁ রে, ভাল আচে।
তা হঠাৎ কী মনে করে?
কেন নিজের বাড়িতে কি আসতে নাই?
তা কেন? নিশ্চয় আসবি। কিন্তু তুই নিজেই তো এটাকে পরের বাড়ি করে দিয়ে ধনা মোড়লের বাড়িকে নিজের করেছিলিস। এখন আবার...!
ক্ষান্তমণি থামিয়ে দেয় দু’জনকে— ও-সব কতা বাদ দে আখুন। ঝগড়া লাগাস না।
না মা! ঝগড়া কত্তে আমি আসিনি। ওবেলায় হাটতলায় শোনলাম, জগার বউকে নাকি হাসপাতাল নিয়ে গেল ভ্যানরিস্কায় করে। কী হল না হল তারই খোঁজ-খপর নিতে এলাম। তাছাড়া শুনেছেলাম তোমারও শরীলটা খারাপ, তাই দেখতে এলাম।
কথা বলতে বলতে মদন বুকপকেট থেকে দু’খানা একশো টাকার নোট বের করে। জগার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে, নে এটা রাক! মায়ের ওষুধ কিনে দিস আর তোর মেয়ে হয়েচে শোনলাম। তার লেগে একসেট প্যান-জামা কিনে দিস।
টাকা দিতে হবে না তোকে। পারিস যদি একদিন সময় করে মাকে বর্ধমান হাসপাতালে দেকিয়ে নিয়ে আয় গা। আমার সময় হচে নাকো। তার ওপর লতার আবার...!
মদন টাকা দুটো পকেটে ঢুকিয়ে নিতে নিতে বলে, আমারও সেই একই অবস্তা। সকাল থেকেই তেলকলে থাকতে হয়। সময় পাওয়া খুব সমিস্যে। তবুও একদিন নিয়ে যেতে হবে। যা চেহারা হয়েচে মায়ের।
ক্ষান্তমণি বলে ওঠে, না না, ও-সব ঝামেলিতে কাজ নাইকো, বদ্ধমান আমি যাবো না। তোদেরকে ব্যতিব্যস্ত হতে হবে নাকো। আর ক’টা দিনই বা বাঁচব! মরি-বাঁচি এই ভিটেতেই থাকব। হাসাপাতাল মানেই তো নরক।
জগন আর মদন দু’জনেই মনে মনে কথা সাজাতে থাকে কী বলবে সে বিষয়ে। এমন সময় কমলা একটা এনামেলের থালায় বসিয়ে তিন কাপ চা নিয়ে আসে। তিনজনের হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে কমলা বলে, ঠাকমা! আমি বাড়ি যাচ্চি। কাল সকালে আসব। কাকা! গেলাম গো!
মদন বলে ওঠে, কমলি, দাঁড়া না! একসঙ্গে যাব। এলাম যখন তোদের বাড়িতেও একবারটি দেকা করে যাই।
এগারো
নানান বরন মায়ের কোলে নানান বরন পুত
নানান বরন মায়ের বুকে একই বরন দুধ’
— রবীন্দ্রনাথ
বাচ্চাটাকে দেখে কমলার আনন্দ আর ধরে না। কাকিমা হাসপাতাল থেকে ফিরেছে, খবরটা পেয়েই ও একছুটে এ-বাড়ির ভেতরে। ছানাটাকে দেখার জন্য ওর আর তর সয় না। কাকিমার কোলে কাপড়-জড়ানো তুলতুলে ছানাটা। সর্বাঙ্গ ঢাকা, শুধু মুখটুকু বেরিয়ে রয়েছে। লালচে রঙের ছোট্টমতো মুখ। চোখদুটে বোজা। বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই কপালে একটা বড়সড় কাজলের টিপ পরিয়ে দিয়েছে ক্ষান্তমণি। এতে নাকি নজর লাগবে না কারুর। চোখে সিজে-মনসা পাতার কাজল পরাবে বলে ক্ষান্তমণি গুটিগুটি পায়ে মনসাবাড়ির দিকে গেছে সিজে-মনসার পাতা আনতে।
চোখবোজা বাচ্চাটাকে দেখে কমলার কৌতূহলী গলা, ও কাকিমা! বুনু আখুন ঘুমুচে নাকি?
লতা ঘাড় নাড়ে, না না, জেগে আচে।
তবে যে চোক খুলচে নাকো!
আখুনো চোক ফোটেনি। নতুন চোক, এত আলো সইতে পারবে কেনে! তাই বন্দ!
অ! তা কই নড়াচড়াও করচে না, কাঁদচে না তো?
আঃ! তু সরে চ একটু, ছুঁয়ে ফেলাবি যে! আঁতুর ছুলে জামা-প্যান ছাড়তে হবে।
তা ছাড়ব না হয়! আমার কোলে একটু দেবা বুনুকে? আমি কোলে নিয়ে বসি কেনে! তুমি মুক-হাত ধুয়েটুয়ে কাপড় ছেড়ে এসো, হাসপাতাল থেকে এলা।
আকাচা হবি, তোর মা বকবে না তো?
বকবে না, তুমি দাও না! আমার কাঁচাছেলে কোলে নিতে খুব ভাল্লাগে।
লতা খুব সাবধানে কমলার কোলে দেয় মেয়েকে।
কমলা কোলে নিতে নিতে বলে, এ মা, কইটুকুনি হয়েচে গো। রোজোন নাইকো মোটেও।
এর মধ্যে বেশ কয়েক জন প্রতিবেশী মহিলা লতা আর তার মেয়েকে দেখতে এসেছে। তারা উঠোনে দাঁড়িয়ে। তাদের মধ্যে কাছে দাঁড়ানো বুঁচির মা বলে, হ্যাঁ, বড্ডা দেড়রোগা! ভাল মতন পুষ্টি হয়নিকো পেটের ভেতর।
ভগদত্তর পিসি বলে ওঠে, পুঁইয়ে-পাওয়া মতন লাগচে। হ্যাঁরে ও লতা! পেটে থাকা রবস্তায় কুঁয়েসাপ-টাপ ছুঁয়েছিলিস নাকি?
কমলা বলে, কুঁয়েসাপ! সে আবার কী গো?
আ মরণ! গাঁয়ের মেয়ে, কুঁয়েসাপ চিনিস নাকো! কালোরঙের কেঁচোর মতন দেকতে। গভ্য রবস্তায় ছুঁলেই ব্যাস! পেটেরটার রবস্তা কাহিল। ডাঁটো হবে না, হাত-পা বেঁকে-বেঁকে থাকবে। ঘাড় সোজা হবে নাকো।
কমলার রাগ হয় ওই ধুম্সি মহিলার কথাগুলো শুনে। ও বলে ওঠে, তুমি থাম তো জেঠি! যত সব অলুক্ষুণে কতা! কিচুই হয়নিকো বুনুর! ছোট হয়েচে তো কী হয়েচে, পেটভরে গাদা-গাদা দুদ খেলেই ডাঁটো হয়ে যাবে।
বাঁকা হাসি হাসে মহিলা, গাদা গাদা দুদ পাবে কোতা! ওই তো লতার শরীর, হাড়ে মাস্ নাইকো। তু না হয় তোর দুদই খাওয়াস। তোর তো ডাগর ডাগর আচে।
মহিলাটির কথায় সকলে ফ্যাক-ফ্যাক্ করে হেসে ওঠে। আর কমলা যেন লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে চায়। ভাবে— হে ভগবান! কেন আমার শরীরটা এমন ভরভরন্ত করে দিলে! কাজুলির মতন সিড়িঙ্গে পারা থাকলেই ভাল হত।
লতা এর মধ্যে দাওয়ার একপাশে দু-আঁটি খড় বিছিয়ে, তার ওপর চট আর মুড়ো কাপড় ভাঁজ করে পেতে বিছানা বানিয়েছে মেয়ের জন্য। কমলার কোল থেকে মেয়েকে নিতে নিতে বলে, দিদি! তোমাদের মুকে কি কিচুই আটকায় না! ও কি আখুন অতশত বোজে! ওর শরীলটা না হয় হাঁফালো হয়ে উটেচে! তোমাদেরও তো ছেলেমেয়ে আচে নাকি!
কয়েকজন লতার কথায় সায় দেয়, ঠিকই তো! ওকে এমন করে বলা উচিত হয়নি। কমলি খারাপ কতা তো কিচু বলেনি! মধ্যস্থতা করে অন্য এক জন— ছাড়ান দাও ও-সব কথা! হ্যাঁরে লতা! হাসপাতালে মেয়েকে ইঞ্জিশন দিয়েছে তো?
হ্যাঁ দিয়েচে। একটা। আর বলেচে, শরীলটা একটু ডাঁটো হলে ওই অঙ্গনারী মমতাকে দিয়ে আর একটা দিয়ে নিতে। তারপর পোলিও মোলিও সব খাওয়াতে বলল।
হ্যাঁ, ওই ইঞ্জিশন-টিকেগুলো ঠিকঠাক দিবি বাচ্চাকে। তাতে বাচ্চা ভাল থাকবে। মেয়ে বলে কতা! অঙ্গহানি হলে যন্তনার আর শেষ নাইকো।
অন্য একজন ফোড়ন কাটে, হ্যাঁ, বিয়ে দেয়া যাবো নাকো! আমার বাপের বাড়ির পাশে একজন আচে, তার একখানা পা কেমন সরু মতন...।
কমলা এবার আরও বেশি রেগে ওঠে, যাও তো তোমরা! ঘরের কাজ থাকে তো করগা। আর কি কোনও কতা নাইকো তোমাদের!
ভগদত্তর পিসি তেতে ওঠে, এই! তু আমাদের তাড়ানোর কে রে! এটা কি তোদের বাড়ি! পাড়া-ঘরে আচি বলে কত্তব্য-খাতিরে দেকতে এইচি। নাইলে মুততেও আসতাম নাকো এ বাড়িতে। ঢলানি মাগির যত বড় মুক নয়কো তত বড় কতা! আমরা কিচুই জানি না যেন! ইস্কুল থেকে ফেরার সময় ফস্টিনস্টির কতা সবাই যেন ভুলে গেয়েচে তিনবচরে।
কমলার চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে। চোখদুটো টলটলে হয়ে যায়। আর বসে থাকতে পারে না ও। দাওয়া থেকে উঠে দ্রুতপায়ে উঠোন পেরিয়ে বাইরের দরজার দিকে এগোয়। যাওয়ার আগে ওই পিসির দিকে একবার দৃষ্টি ছোঁড়ে; সে দৃষ্টির ভাষা মহিলাটি পড়তে পারে কি না বোঝা যায় না।
একজন বলে, চল চল, আর একদণ্ড নয় এ বাড়িতে।
সকলে একসঙ্গে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। লতার চোখদুটো জলে ভরে উঠেছে। কমলার অপমানের কষ্টে, নাকি নিজের অপমানে তা বোঝা মুশকিল।
সন্ধে নামতে না নামতেই লতা ঘরের ভেতর একপাশে খড় বিছিয়ে তার ওপর বিছানা করেছে নিজের আর মেয়ের জন্য। ও এখন সেই বিছানার ওপর বসে আছে থাপন গেড়ে। ওর কোলে তিন দিন বয়সি মেয়ে। সামনে জ্বলন্ত হ্যারিকেনের মাথায় বসানো দুধের বাটিতে আঙুল ডুবিয়ে, দুধের উষ্ণতা বোঝার চেষ্টা করে লতা। ঈষৎ গরম হয়েছে বুঝতে পেরে কাপড়ের খুঁট দিয়ে ধরে বাটিটা নামায়। হাতের কাছে রাখা পরিষ্কার ন্যাকড়া থেকে একটু ছিঁড়ে নিয়ে একটা পলতে পাকায়। তার একপ্রান্ত দুধের বাটিতে ডুবিয়ে অন্য প্রান্তটা মেয়ের মুখে গুঁজে দেয়। ঘাড় নিচু করে বোঝার চেষ্টা করে দুধ টানছে কিনা মেয়ে! বুকের দুধ টানতেই পারছে না পোড়ামুখি! কলজেয় দম নেই মোটেও। এক হাতে ঝিনুক ধরে অন্যহাতে মাইয়ের বোঁটা টিপে দুধ বের করে ছানাটাকে খাইয়েছে সারাটা দিন। এখন বোঁটা এত ব্যথা হয়েছে যে হাত ঠেকানো যাচ্ছে না।
দাওয়ার এক পাশে বসে ক্ষান্তমণি কুটুর কুটুর করে শুকনো মুড়ি আর বাতাসা চিবোচ্ছে। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে রাতে ভাত খাওয়া ছেড়েছে ও। রাতে ভাত রান্না হয় না কোনদিনই। দিনের বেলার জলছাঁকা ভাত খেলে কাশি যেন আরও বাড়ে! তাছাড়া রাতের বেলায় তলপেটের চাপ কমাতে দু’একবার উঠোনে নামতে হয় জলবিয়োগ করতে। মুড়ি খেলে সে-সব আর...।
লতার মেয়ে কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে পলতের দুধ চুষতে চুষতে। পলতে নাড়িয়ে দিলেও আর দুধ টানছে না। ও সাবধানে শুইয়ে দেয় মেয়েকে। মাথায় দেয় সর্ষেদানা ভরা একটা ছোট্ট বালিশ। বিছানায় মচমচ শব্দ ওঠে। খড়ের শব্দ। সোঁতা মাটির মেঝেয় ঠান্ডা লাগতে পারে, তাই বিছানার তলায় খড় বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তুলতুলে পুতুলটাকে শ্বশুরের সেই পুরনো তুষ চাদর দিয়ে ঢেকে দেয় লতা। মুখটা শুধু বেরিয়ে থাকে পেটের থলিতে ক্যাঙারুর ছানার মতো। হ্যারিকেনের ম্যাড়মেড়ে আলো সে মুখে। লতা মেয়ের বালিশের তলায় গুঁজে দেয় লোহার কাজললতা। মা-ঠাকুমার কাল থেকে ও শুনে আসছে লোহার কাজললতা সমস্তরকম অশুভ শক্তি, মন্দ-বাতাস থেকে বাচ্চাকে রক্ষা করে। প্রথম মা-হওয়া লতার মধ্যে বাস করা সেই মা-ঠাকুমা যেন ওকে নিরুচ্চারে বলে দিচ্ছে সন্তান লালন-পালন করার সনাতন পদ্ধতি।
জগন দরজার চৌকাঠের গায়ে দরজায় ঠেস দিয়ে বসে এতক্ষণ দেখছিল মেয়েকে দুধ খাওয়ানোর কায়দাকানুন। ভাবছিল এমন হতভাগী মেয়েটা! মায়ের বুকের দুধ টেনে খাওয়ার ক্ষমতাটুকুও হয়নি এখনও। কী করে যে সতেজ হবে! আর লতার শরীরটাও গেছে একেবারে। ওকে ডাঁটো করতে গেলে ভালো খাবার খাওয়ানোর প্রয়োজন। কিন্তু ওর সে সামর্থ্য কোথায়!
মেয়েকে শুয়ে দেওয়া হয়েছে দেখে জগন ওঠে। মুড়ির টিন নিয়ে লতার কাছে এসে বলে, কই নাও থালা পাতো।
এনামেলের থালা বাড়িয়ে দেয় লতা। ছোঁয়া বাঁচিয়ে আলগোছে মুড়ি ঢালে জগন। এক চামচ ঘি দেয় মুড়িতে। পাশে একটা আদার টুকরো আর একটু আলুচচ্চড়ি। কাঁচা পোয়াতি, রাতে ভাত খেলে শরীরে রস জমবে, পা ফুলবে।
লতাকে মুড়ি দেওয়া হলে জগন নিজে হাতেই বেড়ে নেয় জল-ছাঁকা ভাত আর আলুচচ্চড়ি।
ও-বেলায় কমলা রেঁধে দিয়ে গিয়েছিল। খেতে খেতে জগন ভাবে তার ব্যবসার কথা— কাল হল গিয়ে শনিবার। মহাজনকে টাকা মেটানোর দিন। এদিকে মাল এখনও ঘরে রয়ে গেছে। দু’-দুটো দিন গাঁ ঘুরতে বেরোনোই তো হল না। কালই যা বিক্রির শেষ বাজার! পরশু ইদ। ইদ পেরোলেই তো বাজার মন্দা। এবছর ইদের আগে দুর্গাপুজো, কালিপুজো সবই হয়ে গেছে। আজ মামুদপুর হয়ে আলমগাঁ গিয়েছিল। বিক্রিবাটা মন্দ হয়নি। ইচ্ছা আছে কালও ওই গ্রামদুটোতে ঘুরবে। যদিও কাল দেপাড়া, মোড়লগাঁয়ে ফেরি করতে যাওয়ার দিন। ও গ্রামদুটোতে হিন্দুর বাস। সব উৎসব পেরিয়ে এখন ওদের হাত খালি। এখন আর পাল-পরব নেই। ব্যবসার মন্দা শুরু হবে এবার। ইচ্ছা আছে এর মধ্যে মাকে বর্ধমান হাসপাতালে দেখাতে নিয়ে যাবে। দাদাকে বলল সেদিন। কিন্তু সেও কোনও গুরুত্ব দিল বলে মনে হল না। সে যাক না যাক, তাকে তো নিয়ে যেতেই হবে। মহাজনের কাছে কিছু টাকা বাকি রাখবে তেমন হলে।
খাওয়া শেষ করে জগন উঠে পড়ে। লতা তখনও শুকনো মুড়ি চিবোচ্ছে। ওর ইচ্ছে করছে জল ঢেলে ভিজিয়ে খেয়ে নেয় মুড়িগুলো। কিন্তু শাশুড়ি বলেছে, কাঁচা পোয়াতিকে মুড়ি ভিজিয়ে খেতে নেই। তার কারণ যে কী, তা যেমন লতা জানে না, শাশুড়িও জানে না। ওর মা-ঠাকুমাও জানত না। কিন্তু নিয়মগুলো ঠিকঠাক চলে আসছে সেই কোন যুগ থেকে।
জগন গিয়ে বসে লতার কাছাকাছি; কিন্তু ছোঁয়া বাঁচিয়ে। ওর চোখ তুলতুলে ছানাটার মুখে। ঠিক যেন প্লাস্টিক পুতুলের মুখ! যেগুলো ও বিক্রি করে দশটাকায়। হ্যারিকেনের পলতেটা আর একটু উস্কে দেয় জগন। চকচক করছে বাচ্চার মুখখানা। বোজা চোখের পাতায় লেগে থাকা তেল থেকে আলো ঠিকরোচ্ছে। জগনের খুব ইচ্ছা করে মুখখানা একটু ছুঁয়ে দেখতে। একটু আদর করতে। ও হাত বাড়াতেই লতা বাধা দেয়, উঁহু উঁহু ছুঁয়ো নাকো, কাপড় ছাড়তে হবে।
জগনের মুখে বোকাবোকা হাসি। লতার শুকনো ঠোঁটেও হালকা হাসির আভাস। দু’জনে চোখাচোখি; দু’পলক স্থির। দু’জনের শরীর বেয়ে আচমকা একটা তরঙ্গ নেমে যায় যেন! আনন্দের ঢেউ, নাকি তৃপ্তির! অথবা একে অপরকে আশ্বাস দেওয়ার শিরশিরানি, কে জানে! সে হাসির মধ্যে লজ্জাও জড়ানো কিছুটা। জগন বলে, অমন পলতে করে দুদ কতদিন খাওয়াতে হবে?
লতার চোখে বিষাদ, যত দিন না বুকের দুদ টেনে খেতে পারে।
পুতুল পুতুল মুখখানা জগনকে বড্ড টানছে। ও নিজেকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। পুতুলটার নাকে আঙুল ছোঁয়ায়। নড়ে ওঠে পুতুল। ওঁয়াও করে কেঁদে ওঠে।
লতার ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি, দিলে তো ঘুমটা ভাঙিয়ে! তোমার ঠাণ্ডা হাত!
জগন কিছুটা অপ্রস্তুত, বিটির আবার বাপের আদর সজ্য হচে নাকো!
লতার হাসি অল্প বিস্তৃত হয়, না গো তা নয়কো, বিটি বাবা বলচে তোমাকে।
ক্ষান্তমণি মুড়ি খাওয়ার পর দাওয়ায় উনুন পাড়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিল। সে হঠাৎ কাঁথার ভেতর থেকে মুখ বের করে বলে, জগা! নুঙি আর গেঞ্জিটা ছেড়ে ফেলিস বাবা! চৌকির বিচেনায় আঁতুড় ছোঁয়াছুয়ি করিস না।
জগন ও লতা চমকে ওঠে। মা তাহলে ঘুমোয়নি এখনও! তাদের কথা শুনতে পেয়েছে। দু’জনে দু’জনের চোখে চোখ রেখে মনের ভাষা পড়ার চেষ্টা করে।
জগন লতার কাছ থেকে ধীর পায়ে উঠে আসে। ওর মনে চিন্তা গড়ায়, লতা আর মেয়েকে ঘরে আনার পর থেকে মায়ের চোখে মোটেও ঘুম নেই। সারাটা দিনই মা জেগে। অন্য দিন বিকেলে ঘুমোয় একটু। আজ...! মা কি আরও বেশি চিন্তা করছে! নাকি মায়ের শরীরটা আরও খারাপ হয়েছে এ ক’দিনে! মায়ের ভালমন্দ কিছু হয়ে যাবে না তো!
হঠাৎ এমন চিন্তা জগনের মনে আসায় একটা হালকা কষ্ট ছড়ায় ওর মনে। ছিঃ ছিঃ! এমন কথা কেন এল মনে! মা যে তার কাছে কতখানি তা সে ছাড়া আর কে বুঝবে!
মায়ের কাছে আসে জগন। বিছানা থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলে, মা ঘুম আসছে না?
ক্ষান্তমণি কিছু একটা বলতে গিয়ে বেদম কাশতে শুরু করে। কাশতে কাশতে বড় কষ্টে উঠে বসে। মুখ বাড়িয়ে থুথু-কফ ফেলে ক্ষান্তমণি। জগন সবিস্ময়ে লক্ষ করে কফের সঙ্গে রক্ত! চমকে ওঠে ও। মা কি তবে...!
মায়ের কাশি একটু কমতে জগন ধীর গলায় বলে, মা!
তোমার কি খুব কষ্ট হচে?
ক্ষান্তমণি কোনও ক্রমে বলে, আমাকে বদ্ধমান হাসপাতালে একবারটি নিয়ে যাস জগা। আমাকে আখুনো থাকতে হবে ওই লাতনিটার লেগে। এত তাড়াতাড়ি তোদেরকে আতান্তরে ফেলে যাব কী করে!
জগনের চোখ ছলছল করে ওঠে। উনুনের ওপাশে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে শুয়ে থাকা খেঁকিটা আচমকা করুণ সুরে কুঁই কুঁই করে ওঠে। ওরাও কি তবে মানুষের সব ভাষা বুঝতে পারে!
জগন বলে, হ্যাঁ মা, এই ইদ পেরোলেই তোমাকে বর্ধমান হাসপাতালে দেকাতে নিয়ে যাব। তুমি সেরে উটবা ঠিক। লাতনিকে তেল মাকিয়ে মাকিয়ে ডাঁটো কত্তে হবে না!
ক্ষান্তমণি ভাঙা গলায় বলে, তা কি আর পারবো রে! দম যেন ফুরিয়ে আসচে মনে হচে!
কেন তুমি অমন বলচ মা! তুমি ছাড়া যে আমার আর কেউ নাইকো! সেই কোন ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েচি। তুমিও যদি...!
আর কথা বলতে পারে না জগন। ওর গলা ধরে আসে। ক্ষান্তমণি বলে, যা, নুঙি ছেড়ে অন্যটা প’রে শুয়ে পড়গা যা। রাত করিস না। কাল আবার সকালে কাজে বেরুতে হবে।
জগন পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় ঘরের ভেতর। পোশাক বদলে হ্যারিকেনের আলো কমিয়ে শুয়ে পড়ে চৌকির বিছানায়।
বারো
‘জন্ম মোদের রাতের আঁধার
রহস্য হতে
দিনের আলোর সুমহত্তর
রহস্য স্রোতে’
— রবীন্দ্রনাথ
তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি। রাস্তাঘাটে জনমনিষ্যি নেই। ভগা-বাগদির ভ্যানরিকশায় একখানা মাদুর পেতে মাকে শুইয়ে দিয়েছে জগন। পাশে ও বসে রয়েছে। ভগা সাধ্যমতো জোরে প্যাডেল করছে। তবুও জগনের মনে হচ্ছে, গাড়ি যেন এগোচ্ছেই না। ও বলছে, ভগা, আর একটু জোরে টান ভাই! কাটোয়া থেকে বর্ধমান যাওয়ার ফাস বাসটা ধরতেই হবে। মাকে বাঁচাতেই হবে।
ভগা কোনও কথা বলছে না। আপ্রাণ চেষ্টা করছে জোরে চালাতে। ক্ষান্তমণি মাঝে মাঝে কেশে উঠছে। কেমন যেন ক্ষীণ গলা। কাশতেও বোধহয় কষ্ট হচ্ছে। কাশির সঙ্গে তাজা রক্ত বেরোচ্ছে। সে রক্ত দেখে জগন আর স্থির থাকতে পারছে না। ফার্স্ট বাসটা তাকে ধরতেই হবে। হাসপাতালে পৌঁছে গেলেই তার মা সুস্থ হয়ে যাবে।
হঠাৎ মায়ের কাশিটা বন্ধ হয়ে গেল যে! চুপচাপ! কোনও শব্দ বেরোচ্ছে না! এমন কি নিঃশ্বাসের শব্দও নয়! ভাল করে কান পাতে জগন। ওর কানে আসে চিঁ চিঁ কান্না! এ যে তার মেয়ের কান্না! আশ্চর্য! মেয়েটা কোত্থেকে এল এই ভ্যানরিকশায়! ওহ! ভ্যানে লতাও বসে রয়েছে যে! বিরক্তির সঙ্গে জগন বলে, আরে, তুমি আবার আসতে গেলে কেনে? আমিই তো মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারতাম।
লতা খালি মিটি মিটি হাসছে আর বলছে, বিটি বাবা বলচে তোমাকে।
বলুক। ও-সব শোনার সময় নাইকো আখুন। তুমি এই ঠাণ্ডায় ওকে নিয়ে বেরোলা কেনে? ওর ঠাণ্ডা লাগবে না? তাছাড়া মমতা বলেচে মায়ের রোগটা ভালো নয়কো, ছোঁয়াছুঁয়ি করলে...। আরে, কমলিও রইচিস দেকচি। এই, যা তো রে! তোর বুনুকে ঘরে নিয়ে যা।
কমলা বলে ওঠে, বুনু আমার কাচে থাকতে পারবে কী করে? মায়ের দুদ ছাড়া আর কিচু যে খায় না বুনু।
জগন বলতে যায় তোরও তো দুদু আচে তুই...! বলতে গিয়ে থেমে যায়। ভাবে দুদু থাকলেও দুধ পাওয়া যায় না সব দুদুতে। সব মাটিতে কি আর ফসল হয়! কমলা এখন আফলা জমি; লাঙল পড়েনি।
জগন দেখে, কমলি তবুও বুনুকে নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসছে। হঠাৎ কারা যেন কম্লিকে জাপটে ধরে টেনে নিয়ে গেল মাঠের দিকে। কমলি চিৎকার করছে— বাঁচাও— বাঁচাও। জগন ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছে; কিন্তু কিছুতেই ভ্যানরিকশা থেকে নামতে পারছে না। ওকে যেন ভ্যানের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে! ও নিরুপায় হয়ে দেখে কমলির শরীরটা ছিঁড়েখুড়ে নষ্ট করে আগুন ধরিয়ে দিল জন্তুগুলো।
এদিকে ভগার ভ্যানরিকশাটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। জগন চেঁচিয়ে ওঠে, কী হল আবার থামলি কেনে? কমলির মতন আমাদেরকেও ওরা...!
না থেমে কি রুপায় আচে! সামনে তাকিয়ে দেকো রাস্তা কাটা। জগন চোখ তুলে দেখে রাস্তাটার মাঝখানে ক্যানেলের মতো কাটা রয়েছে। ওপারে একটা ম্যাটাডোর ভ্যান। ভ্যানে অনেক লোকজন। তারা শ্লোগান দিচ্ছে— আমাদের জমি দিচ্ছি না দোব না। কারখানা হতে দিচ্ছি না দোব না। পুঁজিপতির দালাল তুমি দূর হটো। এমন সব অনেক কথা। সব কথা বোঝা যাচ্ছে না। ওই লোকগুলোর মধ্যে মদনকেও দেখা যাচ্ছে। মদন ওর দাদা। সে ওদের দলে ভিড়ল কী করে ভেবে পায় না জগন। মদনও শ্লোগান দিচ্ছে। ও বলছে, ‘মাকে বর্ধমান নিয়ে যেতে দিচ্ছি না, দোব না। জগন তুমি দূর হটো’!
আশ্চর্য! ওর দাদা বলেছিল খুব শিগগির মাকে বর্ধমান হাসপাতালে নিয়ে যাবে, সুস্থ করে তুলবে! সে এখন দূর হটতে বলছে কেন, মাকে বর্ধমান নিয়ে যেতে দেবে না কেন?
আরে! লোকগুলোর চিৎকার হঠাৎ জোরদার হল কেন? তাহলে কি পুলিশ আসছে! হ্যাঁ, ওই তো পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে! গাড়ি থেকে হুড়মুড় করে নামছে বন্দুকধারী পুলিশ। ওরা বন্দুক তাক করেছে শ্লোগান দিতে থাকা লোকগুলোর দিকে। পুলিশ কি গুলি ছুঁড়বে! তাহলে তো ওর দাদার বুকেও গুলি লাগবে! একদম সামনের দিকেই রয়েছে দাদা। ও এ-পার থেকে চিৎকার শুরু করে, দাদা, পুলিশ গুলি ছুঁড়বে পালিয়ে যা। পালা দাদা পালা!
ও এত জোরে চিৎকার করছে, তবুও ওর দাদা শুনতে পাচ্ছে না কেন? পালাচ্ছেও না। পুলিশ গুলি ছুঁড়ছে। ও-পারে এ-পারে সব দিকেই। জগন ভেবে পাচ্ছে না এখন কী করবে! ভগা বাগদি, লতা, কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না পাশে। ওরা পালিয়েছে। ও ছুটে পালাতে গেলেও তো পিঠে গুলি লাগবে! মাকে ফেলে রেখে পালাবেই বা কী করে! মা যে জন্ম দিয়েছে, বড় করেছে। তাকে ফেলে রেখে কি পালানো যায়! কিন্তু মায়ের যে কোনও সাড়াশব্দ পাচ্ছে না! মা কি তবে...! না, ওই তো কাশছে মা! কাশির শব্দটা এখন জগনের খুব ভাল লাগছে। মা তবে বেঁচে আচে! বাচ্চাটার চিঁচিঁ কান্নাও কানে আসছে। লতা ওকে ঘুম পাড়াতে চাইছে ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়ে। ওরা কোথায় ছিল এতক্ষণ! লতা হঠাৎ ঘুমপাড়ানি গান থামিয়ে বলে ওঠে, ওগো! কী হল! অমন গোঁ গোঁ আওয়াজ কচ্চ কেনে? ও মানুষটা! ও সোনার বাবা! তুমি অমন কচ্চ কেনে!
জগন ধড়মড় করে উঠে বসে বিছানায়। দেখে হ্যারিকেনের পলতেটা উস্কানো। হারিকেনের মাথায় বাটি চাপিয়ে দুধ গরম করছে লতা। বাইরে মায়ের কাশির শব্দ।
লতা বলে, স্বপন দেখছিলা নাকি! ও বাবা! ঘেমে নেয়ে উটেচ যে! ভয়ের স্বপন বোধায়! তাই অমন গোঁ-গোঁ কচ্ছিলা। যাও, বাইরে গেয়ে একটু হাতে মুকে জল দিয়ে আসো গা।
জগন বিছানা থেকে নামে দরজা খুলে বাইরে বেরোয়। উনুনের ধারে শুয়ে থাকা খেকিঁটাও কী মনে করে উঠে ওর পেছন পেছন উঠোনে নামে। তার ছানাগুলো কুঁইকুই করে ওঠে মায়ের গায়ের ওম থেকে বঞ্চিত হয়ে। পুব আকাশে শুকতারাটা জ্বলজ্বল করছে। তার মানে ভোর হয়ে এসেছে। অন্য তারাগুলোকে দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশা শুকতারাটাকে ঢেকে দিতে পারে না। একমাত্র সূর্য দেখা দিলেই শুকতারাটা হারিয়ে যায়!
জগন পেঁপেগাছতলায় পেচ্ছাব করে ছরছর শব্দে। কোনও শুকনো পেঁপে পাতার ওপর পড়ছে বোধহয় তাই এমন শব্দ হচ্ছে। কুকুরটা মাটি শুঁকে শুঁকে কীসের গন্ধ পাওয়ার চেষ্টা করছে কে জানে!
জগন হাতে মুখে জল দিয়ে দাওয়ায় ওঠে। ক্ষান্তমণি একটু নড়াচড়া করে বলে, নেহার পড়চে। বাইরে বেশিক্ষণ থাকিস না বাবা। ঠাণ্ডা লাগবে। দরজাটা খুলে রেকে গেলি! ঠেসিয়ে দিয়ে উটোনে নামবি তো! ঘরে ঠাণ্ডা ঢুকচে যে! কচিটা আচে, কাঁচা পোয়াতি রয়েচে! যা ঘরে যা।
এমন সময় মোল্লাপাড়ার মোরগ ডেকে ওঠে। দু’একটা কাকও কা-কা করে কাছেপিঠে কোথাও। জগন ঘরে ঢুকে যায়। এখন ওর খুব শীত করছে। বিছানায় ঢুকে কাঁথামুড়ি দিয়েও শীত কমছে না ওর।
লতা বলে, সকাল হতে দেরি আছে আখুনো। আর একটু ঘুমিয়ে নাও।
জগনের ঘুম আসে না আর। ও চুপচাপ কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে বিÀ স্বপ্নটার কথা।
তেরো
‘ওরে অপুষ্ট ওরে দুর্বল দীন
মায়ের যত্নে হইবি সবল
রহিবি না আর ক্ষীণ’
— রবীন্দ্রনাথ
দাওয়ার একপাশে ঘুমোচ্ছে লতার মেয়ে। তার গায়ে-মাথায় কুসুম-কুসুম রোদ্দুর। চোখে রোদ আড়াল করার জন্য একটা পাতলা কাপড়ের টুকরো ভাঁজ করে চোখের ওপর চাপিয়ে রেখেছে। কাপড়টার নিচেই ছোট্ট নাক। নাকের ডগায় গুঁড়ো গুঁড়ো ঘাম। নাকের নিচেই লাল টুকটুকে ঠোঁট দুটো ঈষৎ ফাঁক হয়ে রয়েছে। একমাস বয়স হয়ে গেলেও তার এখনও নাম ঠিক হয়নি। যখন যা খুশি একটা নাম বললেই হল। লতা বলে সোনা-মা। কমলা বলে ফুলটুসি। জগন মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে খেঁদি, বুড়ি আরও কতকিছু বলে। প্রথমদিকে তো জগন ওকে কোলে নিতে ভয় পেত— চামড়া-মোড়া হাড়ে যদি ব্যথা লাগে ওর কাঠ-কাঠ হাতে।
এখন তবুও একটু চিকন-চাকন হয়েছে। কোলে নিয়ে আদর করা যায়। জগন কখনও সখনও ফেরি করার ডুগডুগিটা নিয়ে এসে মেয়ের সামনে বাজায়। কাঁদতে থাকা মেয়ে চুপ হয়ে যায় ডুগডুগির শব্দে। লাল টুকটুকে ঠোঁটে হাসির আভাস ফুটে ওঠে, হাত-পা ছোড়ে। বাজনা থামলেই আবার কেঁদে ওঠে। বাজালেই আবার হাসি। জগন ভেবে পায় না নিমেষের মধ্যে কান্না আর হাসি বদলায় কী করে! কই সে তো কাঁদতে কাঁদতে হাসতে পারে না চেষ্টা করেও। কাঁদতেও কি পারে ঠিকমতো!
ডুগডুগি আর মেয়েকে নিয়ে এই কান্নাহাসির খেলায় খুব মজা পায় জগন। লতা তা দেখে বলে, কী গো, মেয়েকে নিয়ে ভাদু নাচাচ্চ নাকি!
না না, আমার মেয়ে ভাদু হতে যাবে কোন দুখে! ভাদু তো জনম-দুখিনী ছিল। আমার মেয়ে হল রূপভান কন্যা। অচিনপুরের রাজকুমার ঘোড়া চড়ে আসবে মেয়ের কাচে। ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে তেপান্তরের মাট পেরিয়ে নিয়ে যাবে মেয়েকে।
কেনে? নিয়ে যেতে দোব কেনে আমার মেয়েকে! ও আমার সোনা-মা। আমার কাচেই থাকবে চেরটা কাল।
লতার সেই সোনা-মা এখন ঘুমোচ্ছে। অদূরে ক্ষান্তমণি গুটিসুটি মেরে নিঃসাড়ে পড়ে। লতা সংসারের কাজে ব্যস্ত। ঘরদোর পরিষ্কার করা, গোবরজল দিয়ে নিকোনো, বাসন ধোয়া। কচিটার কাঁথা-কানি কাচা। এর মাঝে সোনা-মা জেগে গেলেই মুশকিল। তখন কমলাকে হাঁক পাড়তে হয়।
কমলা তখন এসে ওকে কোলে তুলে নেয় কাঁথায় মুড়ে। দুলিয়ে দুলিয়ে ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করে আবোল তাবোল কতকিছু বকতে বকতে। মাঝে মাঝে আবেগে চুমু খায় তুলতুলে নরম গালে।
ওর আবোল-তাবোল কথাগুলো মোটেও আবোল তাবোল নয়। ওর অপূর্ণ সাধ ও স্বপ্ন মেশানো থাকে সে কথায়। লতা কাজ করতে করতে সে-সব কথা শোনে আর আপন মনে হাসে। কখনও বা কষ্ট পায় মনে। মেয়েটার অনেক দূর অবধি লেখাপড়া করার ইচ্ছা ছিল! দু’-তিনটে পাশ দেবে। তারপর ইস্কুলের দিদিমণি হবে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে পাশের গাঁয়ের ইস্কুলে পড়াতে যাবে। গাঁয়ের অন্য মেয়েরা ড্যাব ড্যাব করে দেখবে ওকে। এ-সব অপূর্ণ সাধ সে তার ফুলটুসির ওপর আরোপ করে।
এ-সব শুনে লতার মনে চিনচিনে ব্যথা। সে নিজেও পাঁচ ক্লাস অবধি পড়েছিল। তারপর বাবা বলেছিল, আর ইস্কুল যেতে হবে নাকো। অত পড়ে হবে কী? সেই তো রান্নাঘরে হাত-খুন্তি নাড়া আর কাঁচাছেলের ক্যাঁতাকানি কাচা! এর জন্যে অত পড়তে লাগে না!
তখন গাঁয়ের নবীন মাস্টার বাবাকে অনেক বুঝিয়েছিল, নারীশিক্ষা, নারী স্বাধীনতা এরকম সব গালভরা কথা বলে। বাবার কিন্তু মন ভরেনি ও-সব কথায়। তার ইস্কুল যাওয়া বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কমলার বাবার ইচ্ছা থাকলেও মেয়ের আর ইস্কুল যাওয়া হল না।
কুঁই কুঁই শব্দ করে জেগে ওঠে বাচ্চাটা। লতা হাতের কাজ ফেলে ছুটে আসে। মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে বুকের দুধ দেয়। চুকচুক করে প্রাণরস সংগ্রহ করছে ছানাটা। লতা গা উদলা করে মেয়েকে খাওয়াচ্ছে দাওয়ায় বসে। ওর চোখ দুটো দূর আকাশের বুকে উড়তে থাকা চাতকপাখিটার থিরথিরে ডানায়।
ক্ষান্তমণি উনুনের পাশে শুয়ে থাকলেও জেগেছে অনেকক্ষণ। কচিটার কান্নার শব্দে ও কাঁথার ভেতর থেকে মুখ বের করেছে। জুল জুল চোখে দেখছে, চুক চুক করে দুধ টানছে সজনে ফুলের মতো নরম ছানাটা। পা ছুঁড়ছে খাওয়ার খুশিতে। কচি কচি আঙুল দিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে মায়ের দুধ ভরা বুকে। ক্ষান্তমণির মনে নানা কথার স্রোত— হাসপাতাল থেকে যখন এল তখন ছানাটার দিকে তাকানো যায় না, এত রোগা! মাসখানেকের মধ্যেই বেশ ডাঁটো হয়েছে ওই বুকের দুধ খেয়ে। কী আশ্চর্য ওই জিনিস! যেন দেব্তাদের সেই সুধা। যা খেলে নাকি অমর হওয়া যায়!
মেয়েটা ঠিক শক্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু এই একমাসে ওর শরীর আধখানা হয়ে গেছে। জগা বর্ধমানের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েও আনল। ওষুধপত্র কিনে দিল। বউমা যে যত্নআত্তি করে না তা নয়! দুধটা, ঘি-টা, হাঁসের ডিম এ-সব খাওয়ায়। তবুও দিনকে দিন...! আর হয়তো বাঁচবে না! সেই মানুষটার কাছে যাবার সময় হয়ে গেছে এবার। কিন্তু বড্ড তাড়াতাড়ি সময় হয়ে গেল যেন! কী এমন বয়স হল! রোগবালাই না থাকলে ওই নাতনিকে নিয়ে পাড়া-বেড়ানোর বয়স এখন! কিন্তু রোগটা...! ওষুধ যে মোটেও পড়েনি তেমন নয়! নিঞ্জূমাস্টারের হোমিওপ্যাথি দানা, কোবরেজি গাছগাছড়া, এমনকি বর্ধমানের ডাক্তারের লেখা দামী ওষুধ খেল ক’দিন ধরে! কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। কিন্তু ওই ছানাটাকে কোনও ওষুধই খাওয়াতে হল না। ও দিব্যি বেড়ে উঠছে। আসল ওষুধ খাচ্ছে চুকচুক শব্দে।
এ-সব এলাটিং বেলাটিং ভাবনা ক্ষান্তমণির মনে বয়ে চলে। কেমন লোভ-জড়ানো চোখে ও তাকিয়ে থাকে লতার উদোম করা পুরুষ্টু বুকের দিকে।
একুশ দিন লতা আঁতুড়ে ছিল। সে ক’টা দিন কমলা ক্ষান্তমণিকে দেখাশোনা করেছে। ধরে ধরে উঠোনের পাশে পেঁপেগাছ তলায় নিয়ে গিয়ে বাহ্যে ফিরিয়েছে, চান করিয়েছে। একুশ দিন পেরোতেই হাল ধরেছে লতা। শুধু সংসারের রোজকার কাজ নয়, সেইসঙ্গে কচি মেয়ের যত্ন আর অসুস্থ শাশুড়ির শুশ্রুষা একাই করতে হয়। কারণ কমলার এ-বাড়িতে আসা বন্ধ হয়েছে।
সেদিন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী মমতা এসেছিল প্রসূতি ও বাচ্চাকে দেখতে। তখন ক্ষান্তমণির বেদমকাশি আর কাশির সঙ্গে তাজা রক্ত বেরোতে দেখে বলেছিল, বউদি, তোমরা এখনও কিচু না করে বসে আচ! তোমার শাশুড়ির টিবি হয়েচে বলে মনে হচে আমার। এমন পেসেন্টকে চিকিৎসা না করিয়ে বাড়িতে ফেলে রাখা মোটেও ভাল কাজ নয়কো। বাড়িতে কচি বাচ্চা রয়েচে, তোমরা আচ, ও-বাড়ির মেয়েটাও আসে। কী হতে কী হয়! এ সংক্রামক রোগ; শিগগির হাসপাতাল নিয়ে যাও।
লতা, অভাবের কথা, হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার অসুবিধার কথা বলতে মমতা বলেছিল— একবার অন্তত হাসপাতালে দেখিয়ে কার্ডখানা করাও। রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হলে আমি না হয় চেষ্টাচরিত্তির করে সপ্তা-সপ্তার ওষুধ এনে দোব। আর সাবধানে থেকো তোমরা!
একথা শোনার পরেই লতা বলেকয়ে মাকে হাসপাতালে পাঠিয়েছে জগনের সঙ্গে। এ-সব কথা শুনে সাবধান হয়েছে কমলার মা। কমলাকে আর আসতে দেয় না এ বাড়িতে। ফলে লতার ধকল আরও বেড়েছে। কচি বাচ্চার যত্ন তো নিতেই হয়; তার চেয়ে বেশি যত্ন নিতে হয় এখন শাশুড়ির। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর লতা লক্ষ করেছে, শাশুড়ি কেমন যেন হঠাৎ বদলে গেছে! যে মানুষটা বলত, থাক, আর হাসপাতালে দেখাতে নিয়ে যেতে হবে না। সে-ই এখন ভাল করে চিকিৎসা করানোর জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। যে বলত, আর ক’টা দিনই বা বাঁচব! এ-ভাবেই ঠিক কেটে যাবে। সে-ই এখন আরও অনেকদিন বেঁচে থাকার জন্য আকুলি বিকুলি করে।
রোজ সকাল পেরিয়ে একটু বেলা বাড়লে, রসুন-তেল গরম করে মেয়েকে আর শাশুড়িকে মালিশ করে দেয় লতা। কোনও দিন মেয়েকে তেল মাখিয়ে রোদে শুয়ে রেখে ভাতের হাঁড়ি চড়াতে যায় উনুনে। জল গরম হতে হতে শাশুড়িকে তেলটা মাখিয়ে দেবে। তার মধ্যেই চিৎকার শুরু করে ক্ষান্তমণি, অ বউ, আমাকে তেল মাকিয়ে দিলি নাকো!
যাই মা। এই ভাত বসিয়ে যাচ্চি। সময় পেরিয়ে যাচ্চে যে!
মেয়ের বেলায় সময় পেরোয় না, আমার বেলায় সময় পেরিয়ে যাচ্চে! আমাকে আর যত্ন-আত্তি করচিস না বউ।
লতা সব ফেলে ছুটে আসে। গরম তেল মালিশ করে দেয় শাশুড়িকে। উঠোনের রোদে ছেঁড়া মাদুরে শুয়ে আরাম উপভোগ করতে করতে ক্ষান্তমণি ভাবে, কাঁচাটা তেল মাখতে মাখতে কেমন ঘুমিয়ে পড়ে আরামে। তার পোড়াচোখে ঘুম আসে না কেন? তাকে কি তবে তেমন ভাল করে মালিশ করছে না বউ? জগাটাকে ক’দিন ধরেই বলছে বর্ধমানের হাসপাতালে আর একবার দেখাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তিন সপ্তাহ পরে আবার যেতে বলেছিল ডাক্তার। সে-ও তেমন গা করছে না। বলছে, ‘দাদাকে বলিচি, নিয়ে যাবে আসচে সোমবার’। সোমবার তো আজ। নিয়ে যাবার তো কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। মদন সেই একদিন যা দেখতে এসেছিল! তারপর আর এ-বাড়ি মাড়ায়নি, খোঁজ-খবর নেয়নি, সে কিনা হাসপাতাল নিয়ে যাবে! ও-সব তাকে স্তোকবাক্য দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। ও মদনা, জগা দুটোই সমান।
সংসারের কাজ সেরে আজও লতা বেশ যত্ন করেই তেল মালিশ করছে শাশুড়িকে। মালিশ করতে করতে ভাবছে— মানুষটা দিন দিন আরও ক্ষীণজীবী হয়ে পড়ছে। কেমন অধৈর্য আর খিটখিটেও হয়ে গেছে এখন। সবসময় ঘ্যান ঘ্যান করে। ওই কচিটার চেয়েও যেন ছেলেমানুষ! না। ছেলেমানুষই বা কেন বলবে! কথার বেলায় তো বেশ কটর কটর করে বলতে পারে! ওই কচিটা আর ও কি এক! ও কচিটাকে সহ্য করতে পারে না যেন! ওকে দুধ খাওয়ানোর সময় কেমন লোভী চোখে তাকিয়ে থাকে। ওকে দুধ খাওয়ানো শেষ হতে না হতে বলে, অ বউ, আমাকে আখুনো খেতে দিলি না? কেমন যেন খাই-খাই বাই হয়েছে, কিন্তু দিলেও খায় না। ফেলে রাখে। আসলে, শরীর অসুস্থ বলেই তো খেতে পারে না। ওর আর দোষ কী! একে অসুস্থ, তার ওপর বুড়ি মানুষ; ওর ওপর রাগ-অভিমান করা ঠিক নয়। আগে তো এমন ছিল না, এখন হয়েছে। অনেকদিন বাঁচার সাধ কার না থাকে! সবাই তো চায় এই সুন্দর পৃথিবীটাতে অনেক দিন থাকবে। খাবে-দাবে, আনন্দ করবে।
কখনও সখনও খুব দুঃখ-কষ্ট পেলে না হয় মরার ইচ্ছা জাগে। পৃথিবীটাকে ভাল লাগে না তখন! রাগ পড়ে গেলেই আবার সংসারের টান এসে হাজির হয় মনে। দুঃখ-কষ্ট যতই থাক না কেন, সংসারের এক আশ্চর্য টান আছে। ভাল-লাগা আছে। এই যে পেটেরটা অমন রোগা হয়েছিল, দেখে মনে হয়েছিল বাঁচবে না। কিন্তু ওর ওপর টান কি কম ছিল! এই যে অভাবের সংসার, সবদিন ভালোমন্দ জোটে না, তবুও তার তো মনে কষ্ট হয় না। প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হত। মনে হত, এ কোথায় এসে পড়েছে রে বাবা! শুধু অভাব আর অভাব! বাপের বাড়িতে এর চেয়ে সুখ ছিল। এত অভাব ছিল না। তবুও সে কষ্ট মন থেকে উবে যেত কর্পূেরর মতো; যখন ওই মানুষটা সারাদিনের শেষে খেটেখুটে এসে দাওয়ায় বসে বলত, ‘কই গো বউ! একঘটি জল দাও, খুব তেষ্টা পেয়েচে।’ তখন কী ভাল যে লাগত! একটা বাতাসা আর চকচকে করে মাজা পেতলের ঘটিতে একঘটি জল এনে দিলে, পরম তৃপ্তিতে মানুষটা কুড়মুড় শব্দে বাতাসা চিবোত। মুখ দেখে মনে হত যেন রসগোল্লা-রাজভোগ খাচ্ছে। তার দিকে তাকিয়ে কেমন মিটিমিটি হাসত; আর পিট পিট করে দেখত। যেন তার নতুন বউকে কতদিন পর দেখছে! তখন নিজেরই কেমন কেমন লাগত! লজ্জা, ভাললাগা সবকিছু মিলেমিশে কেমন যেন এক বলতে না পারা অনুভূতি।
ওপর দিকে মুখ তুলে ঘটি ধরে আলগোছে এক ঘটি জল এক নিশ্বাসে খেয়ে নিত মানুষটা। তারপর একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়ত। যেন সারা দিন ধরে সাইকেল চালানোর কষ্ট, ফেরি করে বেড়ানোর কষ্টটা হাওয়া হয়ে বেরিয়ে গেল। সেই সঙ্গে নিজের মনের মাঝে জমে থাকা অভাব-অভিযোগের কষ্টটাও হাওয়া হয়ে যেত। তখন ওই মানুষটাকে, শাশুড়িকে, এই খড়ের চালের বাড়িটাকে, উঠোনের সজনে গাছ, পেঁপেগাছকে এমনকী ওই খেঁকি কুকুর আর হাঁসগুলোকেও বড় ভাল লাগত। মনে হত এই সংসারে অনেক অনেকদিন থাকবে, লোকটাকে ভালবাসবে। এ তো তার নিজেরই সংসার আর কারুর নয়।
লতা তেলের বাটির গায়ে লেগে থাকা তেলটুকুও আঙুলে করে মুছে নিতে নিতে ভাবে— সেই খাটিয়ে মানুষটা, এই অসুস্থ শাশুড়ি আর মেয়েকে নিয়েই তো তার সংসার! এ সংসার থেকে একজন মানুষ কমে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারে না সে। শাশুড়ি তো তাকে ছাতার মতো আগলে রেখেছে এই বাড়িতে আসার পর থেকে। এখন না হয় একটু দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবুও মানুষটা থাকায় মনে একটা বল থাকে। মনে হয় মাথার ওপর এক জন তো কেউ রয়েছে। না থাকলে, সারাটা দিন বাড়িতে মেয়েকে নিয়ে একা থাকতে হবে।
আজ সে মানুষটাকে বুঝিয়ে বলবে এক দিন কাজ কামাই হয় হোক, মাকে হাসপাতালে দেখিয়ে নিয়ে আসুক কালই। ওষুধও ফুরিয়ে গেছে।
আলো কমে আসা বিকেলে জগন ফেরি করে ফিরে আসে। সাইকেলখানা সজনে গাছে ঠেস দিয়ে দাঁড় করায়। সাইকেলের মৃদু ধাক্কায় গাছটা একটা কেঁপে ওঠে। টুপটাপ দু’একটা ফুল ঝরে পড়ে গাছ থেকে। গাছের কুঁড়িগুলো এর মধ্যে ফুল হয়ে গেছে কবে খেয়াল করেনি জগন। ও গাছের দিকে চোখ তোলে। এখানে ওখানে কিছু সাদা ফুল-কুঁড়ি গাছের সবুজ কমিয়েছে। গাছটার রূপ বদলে গেছে যেন! সজনে গাছের পাশে পেঁপেগাছটার ডাঁটওয়ালা পাতাগুলো কেমন শুকিয়ে গিয়ে ঝুলছে। প্রায় সব পাতাই শুকিয়ে গেছে। একদম ওপর দিকে খানকতক পাতা শুধু সবুজকে ধরে রেখেছে বড় কষ্টে। কী যে রোগ হয়েছে পেঁপেগাছটার কে জানে!
দাওয়ার দিকে তাকায় জগন। উনুনের কাছাকাছি মা বসে রয়েছে জবুথবু হয়ে। চোখ দুটো বোজা। ওপাশটায় ছোট্ট একটা বিছানায় মেয়েটা শুয়ে আছে। ঘুমোয়নি, কেমন হাত-পা ছুঁড়ছে। বুকের কাছের আকাশটাকে ধরতে চাইছে যেন! কিন্তু ধরতে পারছে না। তার পাশে বসে লতা ছেঁড়া শাড়ি দিয়ে ছোট কাঁথা তৈরি করছিল। জগনকে দেখে সে-সব ভাঁজ করে সরিয়ে রাখে।
জগন দাওয়ায় বসে খুঁটিতে ঠেস দিয়ে। রোজকার অভ্যাসমতো হাঁক পাড়ে, কই গো বউ! জল দাও একঘটি!
জগনের গলার শব্দে তন্দ্রা কেটে যায় ক্ষান্তমণির। প্রতি দিনের অভ্যাস মতো বলে ওঠে, জগা এলি বাবা! বউমা! জল দাও।
এখন কথা বলতে গেলেই কাশি আসে ক্ষান্তমণির। কিন্তু রক্ত বেরোনো বন্ধ হয়েছে! বেশির ভাগ সময়েই কথা না বলে ঝিমোয় ক্ষান্তমণি।
লতা বাতাসা আর জল এগিয়ে দিতে দিতে বলে, বেশ ঠাণ্ডা পড়েচে। এই শীতে আর চান করতে হবে নাকো। হাতমুক ধুয়ে এসে ভাত খেয়ে নাও।
জল খাওয়ার পর জগন সাইকেলের হ্যান্ডেল থেকে ডুগডুগি, কেরিয়ার থেকে টিনের বা’ খোলে। দড়ি খুলে আংটির বা’ নামায়। গোছগাছ করে রাখে। তারপর জামা-গেঞ্জি ছেড়ে খালি গা হয়।
ফেরি করে এসে রোজ জগনের চান করা অভ্যাস। তাই ও হাতের চেটোয় খানিকটা সর্যের তেল নিয়ে গায়ে মাথায় বুলোতে বুলোতে পুকুরঘাটের দিকে এগোয়। লতা উঠে বারুণ দিয়ে আলতো হাতে দাওয়া ঝাঁট দেয়। আসন পাতে। ঘটিতে টাটকা জল ধরে আনে বাড়ির সামনের কল থেকে। জগন স্নান সেরে এলে এনামেলের থালায় ভাত বাড়ে লতা। ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া ভাত, সজনে ফুল ভাজা। বিউলির ডালটুকু গরম করে নেয় কাঠকুটো জ্বেলে। একটা চিনেমাটির প্লেটে কাঁকড়ার ঝাল দেয় জগনের থালার পাশে। তা দেখে জগনের চোখ চকচক করে ওঠে। কাঁকড়ার ঝাল খেতে খুব ভালবাসে জগন।
সচরাচর ভাতের থালাতেই তরকারি-পাতি ডাল ঢেলে দেওয়ার রেওয়াজ এবাড়িতে। কিন্তু বিশেষ কোনও পদ যেমন মাংস, বড় মাছের ঝোল কিংবা জিভে জল আনা কাঁকড়ার ঝাল এ-সব রান্না হলে পাতের পাশে আলাদা বাটি কিংবা চিনেমাটির প্লেট বসে।
কাঁকড়ার ঝাল চাখতে চাখতে জগন শুধোয়, কোতা পেলে?
লতা শাড়ির আঁচলটা কোমরে গোঁজে, কাল সন্ধেবেলায় ঘাটে হাঁড়ি পেতেছেলাম।
বলনি তো!
তুমি তকন মোড়লগাঁ গেইছিলে। তোমার দাদার সঙ্গে দেকা করতে। আজ তো সকালে বট্ঠাকুরের আসার কতা ছিল; কই এল না তো!
হ্যাঁ, সে কতাই তো ভাবচি।
শোন, ভেবে কোনও লাব হবে না। বট্ঠাকুর মাকে দেকাতে নিয়ে যাবে নাকো। মাও বট্ঠাকুরের সঙ্গে যেতে রাজি নয়কো। তুমি কালকে কাজ কামাই করে মাকে হাসপাতালে দেকিয়ে নিয়ে এসো গা। মায়ের শরীলের অবস্তা খুব খারাপ। কোমোশো নিজ্জীব হয়ে যেচে। হাসপাতালে যদি ভত্তি নেয় তো...!
জগন কাঁকড়ার দাঁড়া চিবোয়— মা হাসপাতালে ভত্তি থাকতে চাইল না। আমি বলেছেলাম সে কতা। বলল, আমাকে দেকিয়ে বাড়ি নিয়ে চ। হাসপাতালে রেকে যাস নাকো। তাইলে এখানে মরে যাবো আমি। মরি-বাঁচি তোর বাবার ভিটেতেই থাকব।
লতা ভাতের হাঁড়ি এনে আর চারটি ভাত দেয় পাতে— শোন, ভত্তি না হয় না করালে, দেকিয়ে ওষুদপত্তর নিয়ে আসোগা।
দেকি, কাল যাবো ভাবচি। তার আগে বড়কত্তার সঙ্গে আজ একটা বোজাপাড়া করে আসি গা। আজ নিয়ে গেল নাকো; কাল যদি নিয়ে যেতে চায়। ও না নিয়ে গেলে আমি তো আচিই। কাল কাজে যাবো নাকো।
জগন বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। মোড়লগাঁয়ের পথে পা বাড়ায়। মেঠো পথটুকু পেরিয়ে কাঁচা সড়কে পৌঁছতেই দেখে বিশাল বড় মিছিল চলেছে সড়ক দিয়ে। তাদের হাতে পতাকা। সূর্য নিভে যাওয়া লাল আকাশের পটে ম্যাড়মেড়ে আলোয় পতাকাগুলোকে কেমন কালো কালো লাগছে। মিছিলের মানুষগুলোর সর্বাঙ্গে ধুলো ভর্তি। সবাই যেন একরকম। কাউকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না। ওদের গলা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তবুও সম্মিলিত কণ্ঠস্বরে বোজা যাচ্ছে ওদের শ্লোগান— চাই চাই শিল্প চাই! চাই চাই চাকরি যাই! কারখানাকে অন্য রাজ্যে নিয়ে যেতে দিচ্ছি না, দোব না! কৃষি শিল্পে বিরোধ নাই, কৃষি চাই, শিল্প চাই।
জগন মিছিলকে ছাড়িয়ে দ্রুতপায়ে মোড়লগাঁয়ে পৌঁছনোর চেষ্টা করে। তাকে যে আবার ফিরতে হবে! কিন্তু কিছুতেই সে মিছিলটাকে অতিক্রম করতে পারে না। অগত্যা মিছিলে পা মেলায়। হয়তো বা গলাও মেলায়। যদিও ও জানে, কারখানাটা অন্য রাজ্যে চলেই গেছে। আজ গাঁ ঘুরতে যাওয়ার সময় দেখেছে বিশাল-বিশাল যন্ত্রদানবগুলো সারি দিয়ে চলে যাচ্ছে শহরের দিকে। জমিতে রেখে যাচ্ছে শুধু ইটভাটার ঘ্যাঁস আর ছাই। ওই ছাই দেখিয়েই হয়তো গ্রামের মানুষগুলো এক সময় গ্রামটা শিল্পমুখী হয়ে ওঠার বিলাসিতা দেখাবে অন্যের কাছে। ওরা আটকাতে পারেনি সেই চলে যাওয়া। ওরা অনেক কিছু চেয়ে শ্লোগান দিয়েছে, এখনও ক্ষীণ গলায় চেয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু! কিন্তু সর্বাঙ্গে ধুলো ছাড়া আর কিছুই পায়নি। তবে এ ধুলো মাখাটাও ওদের কাছে আনন্দের। মিছিলে না হাঁটলে যে আরও অনেক কিছু পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হবে। তাই ওরা গায়ে মাথায় ধুলোকে দেবতার বিভূতি ভাবছে।
জগন ভাবে, চলে যাওয়ার হলে কোনও কিছুকেই জোর করে আটকে রাখা যায় না। মা, মাটি, মানুষ, কারখানা কোনও কিছুকেই না। ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে থাকা আকাশের লাল রংটাকেও না। তবুও আটকানোর চেষ্টা করতে হয়।
চোদ্দ
লক্ষ কোটি আলোবছর পারে
সৃষ্টি করার যে বেদনা
মাতায় বিধাতারে
হয়তো তারি কেন্দ্র-মাঝে
যাত্রা আমার হবে—
অস্তবেলার আলোতে কি
আভাস কিছু রবে
— রবীন্দ্রনাথ
বিকেলের আলো মরে এসেছে। সজনে গাছের ডগায় হলুদ হলুদ আলো। গোঁড়ার দিকে আবছায়া। পাখ-পাখালি বাসায় ফেরার আগে শেষবারের মতো খাবারের খোঁজে নেমেছে। তাদের নানারকম ডাক হয়তো লতার কানে যাচ্ছে; কিন্তু মনের ঘরে কড়া নাড়ছে না। ওর মনে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছুক্ষণ আগে ক্ষান্তমণির মুখে শোনা কথাগুলো— আমার যে আখুনো অ্যানেক দিন বাঁচার সাদ গো বউমা! অ্যাত তাত্তারি মত্তে চাইনাকো আমি। আখুনো যে আমার কাজ বাকি আচে। লাতনিটাকে তো কোলে নিতেই পাল্লাম না। ওকে নিয়ে আমার কত সক-আল্লাদ; সে-সব কিচুই মিটল নাকো। তুমি দেকো, আমি ঠিক ভাল হয়ে উটব। ওই লাতনিটা ক্যামুন নিজ্জীব পারা ছিল, ডাঁটো হয়ে উটল; আর আমি হব নাকো! শুদু ঠিক ওষুদটা পেটে পড়লেই...।
লতা বলেছিল— আমনি তো অনেকটা ভাল হয়ে উটেচেন। আমনাকে কালকেই আবার হাসপাতালে নিয়ে যাবে আমনার ছেলে। সে ব্যাপারেই তো বট্ঠাকুরের সঙ্গে কতা বলতে গেল। বদ্ধমান হাসপাতালের দাক্তারের দেয়া ওষুদ আর কিচুদিন খেলেই আমনি ঠিক হয়ে যাবেন।
ও-সব ওষুদে কিচু হবে নাকো আমার! আমি যে...আমি যে...।
আর কথা বলতে পারেনি ক্ষান্তমণি, বেদম কাশতে শুরু করেছিল। লতা তড়িঘড়ি পেঁপেগাছের কাছে রাখা নারকোলের মালাটা এনে দিয়েছিল শাশুড়ির হাতে। থুথু-গয়ের ফেলবে। সে-সব পরিষ্কার করতে লতার কেমন গা-ঘিনঘিন করে। তাই বুদ্ধি করে ওই নারকোল-মালার ব্যবস্থা করেছে।
কাশির দমক দেখে লতার হঠাৎ মনে পড়েছে মমতার কথা, ‘এ সংক্রামক রোগ, বাড়িতে বাচ্চাকাচ্চা রয়েচে, কী হতে কী হয়! সাবধানে থেকো তোমরা।’ তাই সাবধান হওয়ার জন্যেই দাওয়া থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ঘরের ভেতর শুইয়ে দিয়েছে মেয়েকে। মেয়েটা দিনে ঘুমোয় বেশি। ওই খিদে পেলেই যা কেঁদে ওঠে। কিন্তু রাতের বেলায় ঘুমোতে চায় না। এমন পাজি! অবিশ্যি দিনে ঘুমোয় বলেই রক্ষে, তা না হলে সংসারের এত কাজ নিয়ে কী নাকাল যে হতে হত! এই তো সাঁজ নামবে এখন। ঘরদোর ঝাঁটপাট দিতে হবে। ঘরে-দুয়োরে জল দিতে হবে। সাঁজবাতি জ্বালতে হবে। মেয়েটা না ঘুমোলে...!
ক্ষান্তমণির কাশি থেমেছে। তবে হাঁফাচ্ছে খুব। লতা নারকোলের মালাটা পেঁপেগাছ তলায় রেখে আসে। দেখে বেশ কিছুটা তাজা রক্ত বেরিয়েছে। ওর মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। ওষুধে রক্ত বন্ধ হয়েছিল। ওষুধ ফুরিয়ে যেতে আবার বেরুচ্ছে। মায়ের যা অবস্থা, তাতে মনে হয় আর টিকবে না। আরও আগে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু কী-ই বা বলবে সে লোকটাকে! মাসখানেক আগে ‘বাচ্চা হতে’ গিয়ে এতগুলো টাকা খরচ হল! তারপর বর্ধমান হাসপাতাল যেতে ধার করেছে। লতা হাত ধুয়ে আসে।
ক্ষান্তমণির কাছে গিয়ে বলে, মা, আমনি বরং ঘরে চৌকিতে গিয়ে শুয়ে থাকুন। পোষ মাস, উত্তুরে হাওয়া শুরু হয়েচে। বাইরে থাকলে কাশিটা বাড়বে।
ক্ষান্তমণির এখন হ্যাঁ, না বলার মতোও পরিস্থিতি নেই। বাচ্চাছেলের কোলে চড়তে চাওয়ার মতো হাতদুটো বাড়িয়ে দেয় লতার দিকে। লতা প্রায় বুকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে ক্ষান্তমণিকে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়। চৌকিটাতে একটা মাদুর পেতে, তার ওপর শুইয়ে দেয়। দাওয়া থেকে কাঁথাখানা এনে চাপিয়ে দেয় গায়ে। মাথায় শনের মতো চুলে একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, মা, সাঁজ নামচে নামুক; আমনাকে আর উটে বসতে হবে নাকো কষ্ট করে। চুপচাপ শুয়ে থাকুন। আমি ঘরপিঁড়ে ঝাঁট দিয়ে, সাঁজ দেকিয়ে আসচি।
ক্ষান্তমণি খপ করে লতার হাতটা চেপে ধরে। কাশি চেপে হাঁফাতে হাঁফাতে লতাকে যা বলে, তা শুনে লতা প্রায় আকাশ থেকে পড়ে— এ কী বলচেন মা! আমনার মাতা খারাপ হয়ে গেল নাকি? ছি ছি ছি! কী লজ্জার কতা! লোকে শুনলে...!
বিছানা-সর্বস্ব ক্ষান্তমণি তার শিরা ফুলে ওঠা হাতদুটো দিয়ে আরও জোরে চেপে ধরে লতার হাত— লোকে শুনবে কেনে বউমা তুমি না বললে! তুমি আমার বউমা নয়, তুমি...তুই যে আমার মা! এ বুড়ি মেয়েটার জন্যে এটুকু কত্তে পারবি নাকো!
লতা ভেবে পায় না কী বলবে! এমন কথা কি সুস্থ ভাল মানুষ কেউ বলতে পারে! নিশ্চয় শাশুড়ির মাথার গণ্ডগোল হয়েছে। বাচ্চা মেয়ে হলেও না হয় কথা ছিল, উনি যে বুড়ি মানুষ!
লতাকে চুপ করে থাকতে দেখে ক্ষান্তমণি ভাঙা গলায় বলে, মা রে, আমি কোনও দিন কারুর কাচে কিচু চাইনি। তোর কাচে ভিক্ষে চাইচি আমি! অমত করিস না! সবটা তো খেতে পারে নাকো ওই কচিটা। বুক টন টন কললে গেলে গেলে ফেলে দিস, দেকিচি। সেটুকুই যদি...! ও জিনিস যে অমিত্তসুধা রে! ও জিনিস খেলে মানুষ এমনি বেঁচে ওটে; কোনও ওষুধ লাগে নাকো। আমার যে আখুনো অ্যানেকদিন বাঁচার সাদ রে মা! সারাটা জেবন কষ্ট কল্লাম। সুকের মুক দেকার সময়ে চলে যেতে কি মন চায়!
ক্ষান্তমণি আর কিছু বলতে পারে না। দমকে দমকে কাশতে থাকে। লতার হাতটা হাত থেকে ফসকে যায়। লতা নিজেই এখন শাশুড়ির একখানা হাত নিজের হাতে তুলে নেয়।
ক্ষান্তমণির কাশির দমক থামে একসময়। তবে, নিশ্বাস পড়তে থাকে খুব জোরে জোরে। চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে কানের পাশ দিয়ে বালিশে পড়ে। লতার চোখদুটোও ভিজে ওঠে। ওর মুখে কোনও ভাষা নেই। ঘরের ভেতরটা নিস্তব্ধ। একটা টিকটিকি ডেকে ওঠে টিকটিক শব্দে।
বাইরে থেকে নানারকম পাখির কলকলানি কানে আসছে। পাখিগুলো বাসায় ফিরে এত চিৎকার করে কেন কে জানে! ছানা-পাখিগুলো কি মা-পাখিদের কাছে পেয়ে মা-মা করে ডাকে! নাকি মা পাখিগুলো সারা দিনের শেষে ছানাদের পেয়ে কলকলিয়ে সোহাগ করে! এ-সব ভাবনার মাঝে লতার মেয়েটা হঠাৎ কেঁদে ওঠে। কাশির শব্দে ঘুম ভেঙে গেছে বোধহয়। লতা শাশুড়ির হাতখানা আলতো করে নামিয়ে দেয় বিছানায়। বাচ্চার কাছে যায়। কোলে তুলে নেয় মেয়েকে। বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে। মায়ের কোল পেয়েই চুপ করে গেছে মেয়ে। লতার বুকের ধুকপুকুনির পাশে ধুকপুক করছে আর একটা প্রাণ। তার বুকের পাঁজর, আদরের ধন!
লতার বুকের ভেতর পাক খাচ্ছে একটা কথা— তুই যে আমার মা! তুই যে আমার মা!
নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে লতার। সেই কবে নিজের মাকে হারিয়েছে। বিয়ের পর আবার মা পেয়েছে সে! মা বলে ডাকতে তো পাচ্ছে! সেই মা এখন...! শাশুড়ির দিকে চোখ যায় লতার। জল টলটল চোখদুটো স্থির হয়ে আছে। তাকে দেখছে, নাকি মেয়েকে! বোঝা যাচ্ছে না। হয়তো কোনও কিছুই দেখছে না, এমনিই তাকিয়ে আছে দেওয়ালের দিকে।
লতা বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারে না সে চোখে। ওর চোখ নত হয়। মেয়ের দিকে চোখ যায়। মেয়ে এখন তার বুকের উষ্ণতা শুষে নিচ্ছে চুকচুক শব্দে! ‘অমিত্তসুধা’। যা খেলে মানুষ এমনি এমনি বেঁচে ওঠে। কোনও ওষুধ লাগে না। তার সোনা-মা ওই অমৃত খেয়েই সবল হয়েছে।
এখন লতার সোনা-মা বোঁটা মুখে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন সে আর অমৃত পান করছে না। অথচ লতার ডাগর বুক যেন দু’খানি অমৃতভাণ্ড! অমৃতে টইটম্বুর। মা কি ওই অমৃতভাণ্ডর দিকেই চেয়ে আছে! তাই হবে হয়তো! এমন ভেবে লজ্জা-চোরা চোখে শাশুড়ির দিকে তাকায় লতা। চোখ দুটো তেমনিই খোলা, দৃষ্টি উদাস। চোখের দু’কোণে দুটো স্ফটিক পাথর! সে পাথর দুটো কোনও অলৌকিক শক্তিতে লতার বুকে এসে বেঁধে। তার কোলের মেয়েটা মাকে কাছে পেতে কাঁদতে পারে শব্দ করে। কিন্তু ওই বুড়ি মেয়েটা নিঃশব্দে তরল স্ফটিক ঝরায়। বয়স হলে মানুষ কি আবার বাচ্চা হয়ে যায়!
এমন ভাবতে ভাবতে লতা মেয়েকে সন্তর্পণে শুইয়ে দেয়। তারপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। ওর চোখে-মুখে এক অদ্ভূত অভিব্যক্তি। মনে ঘুরছে শাশুড়ির কথা, ‘মা রে, তোর কাচে ভিক্ষে চাইচি আমি।
ধীরপায়ে লতা ক্ষান্তমণির কাছে যায়। নিজের বুকের কাপড় সরায়। দু’হাতে উন্মুক্ত অমৃতভাণ্ড ধরে ক্ষান্তমণির মুখের কাছে নিয়ে আসে। মৃদুগলায় ডাকে— মা!
মায়ের কানে সে ডাক আর পৌঁছয় না। শুধু পাথর হয়ে যাওয়া চোখদুটো লতার দিকে তাকিয়ে থাকে। সারাদিন সূর্যালোকের আড়ালে থেকে, পশ্চিম আকাশে একবার দেখা দিয়ে, তখন শুক্লা-তৃতীয়ার অস্তগামী চাঁদ কিছুক্ষণ আগেই অদৃশ্য হয়েছে।