কোনও গলিঘুঁজির মধ্যে নয়; একদম মেন-রোডের ধারেই ওই যে টকটকে লাল রংয়ের বাড়িটা দেখছেন; ওটাই। সামনেই গ্লো-সাইন বক্সে লেখা রয়েছে— ভেনাস হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স প্রাঃ লিঃ। কেমন জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু চোখ ওখানে আটকে থাকতে পারছে না, তাই তো? আসলে, সামনে বিশাল কাচের সুইং-ডোরের মাথায় সেঁটে থাকা, ওই লেজার ডিসপ্লের চলমান লাল অক্ষরগুলো চোখ টেনে নিচ্ছে। ডিসপ্লে’তে কিছুক্ষণ চোখ রাখুন; চলমান ইংরেজি লেখাগুলো জানাচ্ছে— এখানে হার্ট, কিডনি, ফুসফুস, বুকের পাঁজর, মালাইচাকি প্রভৃতি পাওয়া যায়। জরুরী ভিত্তিতেও সরবরাহ করা হয়।
কোনও গলিঘুঁজির মধ্যে নয়; একদম মেন-রোডের ধারেই ওই যে টকটকে লাল রংয়ের বাড়িটা দেখছেন; ওটাই। সামনেই গ্লো-সাইন বক্সে লেখা রয়েছে— ভেনাস হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স প্রাঃ লিঃ। কেমন জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু চোখ ওখানে আটকে থাকতে পারছে না, তাই তো? আসলে, সামনে বিশাল কাচের সুইং-ডোরের মাথায় সেঁটে থাকা, ওই লেজার ডিসপ্লের চলমান লাল অক্ষরগুলো চোখ টেনে নিচ্ছে। ডিসপ্লে’তে কিছুক্ষণ চোখ রাখুন; চলমান ইংরেজি লেখাগুলো জানাচ্ছে— এখানে হার্ট, কিডনি, ফুসফুস, বুকের পাঁজর, মালাইচাকি প্রভৃতি পাওয়া যায়। জরুরী ভিত্তিতেও সরবরাহ করা হয়।
আরও অনেক কিছু তথ্য জানাবে ওই চলতে থাকা লাল অক্ষরগুলো। পরে দেখবেন সে সব। এবার এগিয়ে চলুন। কী হ’ল! আবার থেমে গেলেন যে! ও! ওই কাচের দরজার ভেতরে কালো ব’-য়ের মধ্যে কিছু রং-বেরংয়ের আলোকেই চোখ বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলছে তো! ফেলবেই। শুধুই রঙিন আলো তো নয়, ওই আলোগুলো হার্ট, লাং, কিডনি এ সবের ডিজাইনে তৈরি এবং তা জ্বলছে-নিভছে। চব্বিশ ঘন্টা-ই ওগুলো জ্বলে-নেভে। দেখুন, সবগুলো জ্বলে উঠলে একটা মানবদেহের অবয়ব পাওয়া যাচ্ছে। যার শরীরের ভেতর লাল হৃদ্পিণ্ড, সবুজ ফুসফুস, নীল কিডনি এসব দেখা যাচ্ছে। বেশিক্ষণ অবশ্য চোখ রাখা সম্ভব হচ্ছে না ওই রং-বেরংয়ের আলোর খেলায়। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে, তাই না! বাধ্য হয়ে চোখ বিশ্রাম নিতে সরে গেল দেখছি বিউটিফুল লেডি-রিসেপশনিস্ট-য়ের দিকে। শুধু আপনার কেন, সকলেরই চোখ ওখানে আটকায়। কিন্তু যা ভাবছেন তা নয়; ওর ব্যাপারে পরে বলব, এখন এগিয়ে চলুন।
ওই যে, ভেতরে একপাশে, গ্লাস-সেপারেটরের মধ্যে চেয়ারে বসে থাকা লোকটাকে দেখতে পাচ্ছেন তো? পুরো শরীরটা অবশ্য দেখা যাচ্ছে না। ওর সামনে রাখা কম্পিউটারের মনিটর বুক অবধি আড়াল করে দিয়েছে। শুধু বিশাল মাথাওয়ালা মুখমণ্ডল দেখা যাচ্ছে। বেশ কালো মুখখানা। মোটা ভ্রূ আর কালচে পুরু ঠোঁটের মাঝে থ্যাবড়া নাক। থলথলে গাল। সব মিলিয়ে মুখখানা যেন গরিলার মুখ মনে হচ্ছে, তাই না! দেখতে অমন অসুন্দর হলে কী হবে; উনিই হচ্ছেন এই সুন্দর সাজানো-গোছানো কনসার্নের প্রোপাইটার। ওঁরই নাম মিঃ কে.বি-টু; যাঁকে আপনি অ্যাং’াস্লি খুঁজছেন এবং কথা বলতে চাইছেন। যদিও আপনি আমাকে বলেননি কেন ওঁর সাথে কথা বলতে চাইছেন। না, না, আমি শুনতে চাইছিও না। আমরা গাইডরা কখনও কাস্টমারদের পারসোন্যাল ম্যাটারে নাক গলাই না।
কে. বি.-টু’র চোখ এখন মনিটরে। একমনে কী যেন করছেন! গেম খেলছেন নাকি? ভেতরে ঢুকে দেখা যাক, উনি কী করছেন। এ কী! একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে যেন! ও! বোঝা গেছে; মিঃ কে.বি-টুর সামনে টেবিলে রাখা ওই মোবাইল ফোন থেকে শব্দটা বেরোচ্ছে। ফোনের রিং-টোন ওটা। কিন্তু বি-টু ফোন রিসিভ করছেন না কেন? কী ব্যাপার?
ওহ্! রিসিভ করবেন কী করে! কানে আটকে থাকা ব্লু-টুথ-এ কথা বলছেন কারুর সঙ্গে। ডান হাতটা মাউসে। চোখদুটো মনিটরের স্ক্রিনে। মন দিয়ে কি কিছু একটা করছেন? আর একটু এগিয়ে গিয়ে দেখা যাক তো! দেখতে পাচ্ছেন, স্ক্রিনে একটা টেবিল দেখা যাচ্ছে। হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, ছক-কাটা ঘর। ছকের মাথায় লেখা কাস্টমার্’স্ অর্ডার টেবিল। মিঃ বি-টু মাউস ক্লিক করছেন আর স্ক্রিনের ছক-কাটা টেবিলে ফুটে উঠছে লেখাগুলো— ওয়ান পিস কিডনি, ব্লাড-গ্রুপ ও., আর. এইচ-পজেটিভ। দু’পিসেস কিড্নি, গ্রুপ-বি, নেগেটিভ। ওয়ান লিভার, টু লাংস, বিলো টোয়েন্টি এজ-এর। ফাইভ পেয়ারস্ আইজ। টোয়েন্টি ব্লাড-পাউচ, গ্রুপ-ও-পজেটিভ ...।
দেখছেন, স্ক্রিনে ছক-কাটা ঘরের মধ্যে একের পর এক বসে যাচ্ছে লেখাগুলো। এ রকম আরও কিছু নাম লিস্টেড হবে অর্ডার-টেবিলে। মিঃ বি-টু, মাউস আর আঙুলের কারসাজিতে, স্টক টেবিল থেকে নামগুলো সিলেক্ট করে এনে অর্ডার-টেবিলে পেস্ট করছেন। নিশ্চয় কসমিক নার্সিংহোমের অর্ডার এটা! সেম-ডে ডেলিভারি; আজকেই সাপ্লাই দিতে হবে। অর্ডার-লিস্টটা বেশ বড় মনে হচ্ছে, তাই না! বড় হবেই তো! কসমিক নার্সিংহোম শহরের মধ্যে সবচেয়ে বড় নার্সিংহোম যে! মিঃ বি-টুর বড় কাস্টমারদের মধ্যে একজন হচ্ছে এই কসমিক। মাসে কয়েক কোটি টাকার অর্ডার দেয়। তাই ওর প্রায়রিটি বেশি। তবুও দেখুন, এর ফাঁকে কান্নার শব্দ ছড়ানো মোবাইল সেটটা ঝট্ করে হাতে তুলে নিলেন বি-টু। সেটের স্ক্রিনে চোখ ছুড়লেন মুহূর্তের জন্য। কলার-এর নাম দেখে নিয়ে বোতাম টিপে থামিয়ে দিলেন মোবাইল ফোনের কান্না। বিড়বিড় করলেন— অনেকদিন পর ডাঃ এস. ফিফ্টি কল করেছেন দেখছি। পরে ধরে যাবে, এখন থাক।
না-না, ডাঃ এস. ফিফটি খুব অর্ডিনারি কেউ নয়; উনি একজন বড় সার্জন। হার্ট স্পেশালিস্ট। ওঁর একটা হার্ট রিসার্চ সেন্টার আছে। গ্যালা’ি হার্ট রিসার্চ সেন্টার। নাম গালভরা হলেও রিসার্চ-টিসার্চ কিস্যু হয় না ওখানে। টুকটাক হার্টের ট্রিটমেন্ট, বাইপাস সার্জারি, অ্যানজিওপ্ল্যাস্টি এসব হয়। কখনও সখনও দু’একটা হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন হয়। তবে, এস. ফিফটির হাতটা খুব শার্প। স্ক্যালপেল, ফরসেপ চালান রোবটের মতো। কিন্তু ওঁর লাক ফেভার করে না। তাই পেসেন্ট কম। মাঝে-সাঝে দু-একটা হার্টের অর্ডার দেন ডাঃ এস-ফিফটি। তার জন্য উনি আবার টোয়েন্টি পারসেন্ট কমিশন নেন। অন্যরা নেয় টেন পারসেন্ট। উনি আবার ‘কমিশন’ শব্দটা শুনলে রেগে যান। বলেন— কমিশন নয়, ‘অনরেরিয়াম’। ডাক্তারের একটা সম্মান নেই!
তা শুনে মিঃ বি-টু মজা করে বলেন জানেন! বলেন, ‘আপনার ‘হনরেরিয়াম’ পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ আর, টাকাগুলো ফোন-পে করতে করতে ভাবেন— যাক্ গে, টাকাগুলো নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে তো আর যাচ্ছে না। কমিশন বলো, আর অনরেরিয়াম বল, যাবে তো পেসেন্ট-পার্টির পকেট থেকে।
এখন ডাঃ এস-ফিফটি ফোনে বি-টুকে ধরতে চাইছেন কেন কে জানে! হার্ট-ফাটের দরকার পড়েছে বোধহয়। জরুরী ব্যাপারও হতে পারে। মিঃ বি-টুর উচিত ছিল কলটা রিসিভ করা, তাই না! আসলে, কাস্টমার-হিসেবে ডাঃ এস্ ফিফটি ছোট তো!
ওই যে, মাউস টিপে ব্যাক-পেজ ডিসপ্লে করলেন। কসমিক নার্সিংহোমের অর্ডার নেওয়া শেষ হ’ল মনে হচ্ছে। পুরো লিস্টটাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন এখন। স্ক্রিনে স্টক টেবিল ডিসপ্লে করে মিলিয়ে দেখে নিচ্ছেন, অর্ডার নেওয়া লিস্টের মধ্যে কোন্ জিনিসটা এই মুহূর্তে স্টকে নেই। সেগুলোর ব্যবস্থা করতে হবে তো! স্টকে না থাকলে ফার্ম হাউস থেকে লাইভ-মাল নিয়ে এসে কেটে-কুটে রেডি করা। ফার্ম হাউসের কিডির সঙ্গে এজ-এ না মিললে আবার ফ্র়েশ-কিডি কালেক্ট করার ট্রাব্ল্। ব্যবস্থা অবশ্য সবই আছে। জনা-পাঁচেক কিডি-কালেকটর নিয়োগ করা আছে। ভেতরে ভেতরে দু’একটা অরফ্যানেজ ও অ্যাসাইলাম এর সঙ্গেও যোগাযোগ আছে।
না-না, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, ব্যবসা চালাতে গেলে এসব ব্যবস্থা রাখতেই হয়। এমার্জেন্সি হিউম্যান লিম্ব সাপ্লাই ব’লে কথা। দেরিতে সাপ্লাই দিলে তো চলবে না। অনেক সময় তো অপারেশন-টেবিলে রোগি তোলার পর আর্জেন্ট অর্ডার পাঠায় ডাক্তার। তার ব্যবস্থা তো রাখতে হয়।
এই তো গত সপ্তাহে জুপিটার নার্সিংহোমের ডাঃ এস. নাইনটিন আধঘন্টার মধ্যে দুটো ফ্রেস অ্যাডাল্ট ফুসফুস চাইলেন, ফোনে। আর্টিফিসিয়াল লাং অনেকেই ব্যবহার করতে চায় না। তাই ...। কিন্তু সেদিন দু’খানা ফার্ম হাউসের কোনওটাতেই অ্যাডাল্ট-স্টক ছিল না। দু’একটা যা আছে বুড়ো-ধুরো। তাদের ফুসফুস দিলে ডাক্তার ঠিক বুঝে যাবে। রেপুটেশন ন ষ্ট হবে। বাচ্চার ফুসফুসও দেওয়া যায় না। তাই একটা অ্যাসাইলামের শরণ নিতে হল। দিন দুয়েক হ’ল, পুলিশ একটা ভ্যাগাবন্ডকে অ্যাসাইলামে দিয়ে গিয়েছিল ফুটপাত থেকে তুলে এনে। বেশ তাগড়া চেহারা। নাম-ঠিকানা অজানা। সেই আনকোরা মালটাকে ফুড সাপ্লাই দেওয়ার গাড়িতে লুকিয়ে ভরে, বের করে আনা হ’ল অ্যাসাইলামের বাইরে। তারপর তাকে গাড়িতে তুলে সার্জিক্যাল চেম্বারে নিয়ে গিয়ে কেটেকুটে লাংস্ বের করতে আর কতক্ষণ। মাত্র তিন মিনিট লেট হয়েছিল মাল ডেলিভারি দিতে। অ্যাসাইলামের ম্যানেজার সুযোগ বুঝে দাঁওটা ভালই মেরেছিল। কিন্তু মিঃ কে-বি-টুর প্রফিট একটু কম হয়েছিল। এই আর কী! তবে হার্ট, কিডনি এসব প্রিজার্ভ করা হয়েছিল। বিক্রি হলে পুষিয়ে যাবে। ভাবছেন, আমি এত কথা জানলাম কী করে! আমি আগে এখানকার স্টাফ ছিলাম। ছেড়ে দিয়ে এখন ‘গাইড’ হয়েছি। সে জন্যেই ...।
ওই যে বি-টু আড়মোড়া ভাঙছেন। তার মানে অর্ডার-টেবিলের সঙ্গে স্টক-টেবিল ট্যালি করা হয়ে গেল। একটা ‘ও’ পজেটিভ গ্রুপের কিডনি কম পড়েছে মনে হচ্ছে! তাই লাইনটা রিভার্স মেরে হাইলাইট করা আছে! সেজন্য ফার্ম হাউসের স্টক-টেবিল স্ক্রিনে নিয়ে এলেন দেখছি। জ্যান্ত মাল এনে কিডনি বের করা হবে। কার পেটে ছুরি পড়ে আজ কে জানে!
আরে! বাচ্চাটা আবার কান্না শুরু করল যে! টিপিক্যাল সাউন্ড।
... হ্যাঁ— হ্যাঁ, এই বেবি-ক্রাই রিংটোনটা নাকি ওঁর খুব ভাল লাগে! উনি বলেন, কেমন এক পিকিউলিয়ার সেনসেশন্ হয়! বুকের ভেতর কেমন টিংক্লিং হয়। কিসের জন্য যে এমন হয়, তা অবশ্য বলেন না। তবে ভাল যে লাগে এটা ঠিক। তাই ইন্টারনেট থেকে এটাকে ডাউন লোড ক’রে, সিলেক্ট ক’রে রেখেছেন। ওই যে, ইচ্ছে করে এতক্ষণ বাজতে দিচ্ছেন শুনতে ভাল লাগার জন্য। নিশ্চয় ডাঃ এস-ফিফটির ফোন। একটু আগেই তো কল করেছিলেন উনি। তখন রিসিভ করেননি। আর একটু কাছে যাওয়া যাক। কার ফোন, কী বলছেন শোনা যাক।
হ্যাঁ, বলুন ডাক্তার এস-ফিফটি, আপনার জন্য কী করতে পারি?
একটু আগে ফোন করলাম, কেটে দিলেন কেন?
স্যরি-স্যরি! আসলে, তখন অন্য একটা আর্জেন্ট ফোনে এন্গেজ্ড্ ছিলাম। বলুন কী খবর!
বলছিলাম, একটা হার্ট চাই। আর্জেন্ট। পনের বছরের মেলচাইল্ড।
পনের বছরের মেল! গ্রুপ কী?
গ্রুপ-ও, আর এইচ পজেটিভ। এইচ.এল.এ. অব্ টিস্যু ম্যাচ না করলেও চলবে। আজকাল একটা লিথিয়াল ইনজেকশান মেরে দিলেই টিস্যু-গ্রুপ বদলে যায়। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই দিতে হবে পজেটিভ্লি।
দু’ঘন্টার মধ্যে! ইম্পসিব্ল্ ! আমার স্টকে এই মুহূর্তে কোনও হার্ট নেই।
আরে মিস্টার! স্টকে না থাকে তো ফার্ম হাউস থেকে লাইভ চাইল্ড আনিয়ে, কেটেকুটে দিন না। দাম ভাল পাবেন। পার্টি সলিড আছে।
সে তো বুঝলাম, পার্টি সলিড আছে। কিন্তু ...। আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি ফার্ম হাউসের স্টক দেখে বলছি, যদি কোনওটার সঙ্গে ম্যাচ করে।
হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি দেখুন। দেখে আমাকে রিং ব্যাক করুন। দামের জন্য ভাববেন না। ওয়ান ক্রোড় অবধি ডান হবে পার্টি।
ডক্টর! ছাড়বেন না, শুনুন, শুনুন। স্টকে থাকলে এক ক্রোড় লাগবে না, রিজ্নেবল্ প্রাইসেই পাবেন। কিন্তু ফার্ম-হাউসের চাইল্ডগুলোর কোনওটার সঙ্গে যদি গ্রুপ ম্যাচ না করে; তাহলে ফ্রেশ কিডি কালেক্ট করতে হবে রিফিউজি কলোনি থেকে। তাতে একটু সময় লাগবে। দামও বাড়বে।
একটু মানে কতক্ষণ?
তা ধরুন ঘন্টা চারেক তো লাগবেই।
ঠিক আছে, পেসেন্ট ভেন্টিলেশনে আছে। আপনি যদি কনফার্ম করেন, তাহলে আর অন্য লিম্ব সাপ্লায়ার্স-এ ট্রাই করব না।
আপনি তো জানেন স্যার, ভেনাস হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স-এর সঙ্গে কথা বললে, আর কোথাও ট্রাই করার প্রয়োজন হয় না।
দ্যাট্স্ গুড। আপনি রিং করুন অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিব্ল্। ছাড়ছি।
দেখলেন, মিঃ বি-টু মোবাইল ফোনের সুইচটা অফ্ করলেন হাতটা কেমন অদ্ভূত এক কায়দায় ঝাঁকুনি দিয়ে। এটা ওঁর উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। দেখুন ওঁর ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার কেমন ছড়াচ্ছে। গোলাপী ছোপ ধরা কালো পুরু ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে দু’একটা ঝকঝকে সাদা দাঁত উঁকি মেরে আবার লুকিয়ে পড়ছে। ওঁর মনের মাঝে এখন নিশ্চয় ছড়াচ্ছে ডাঃ এস. ফিফটির ওই কথাটা— ‘দামের জন্য ভাববেন না। ওয়ান ক্রোড় অবধি ডান হবে পার্টি।’
মিঃ বি-টুর মনে পুলক-জাগার কারণটা জানতে চাইছেন তো! আসলে, সকালে এসে কম্পিউটার অন করে নিজে স্টক মিলিয়েছেন উনি। দু’টো রিটেল কাউন্টার ও দুটো ফার্ম-হাউসের স্টক দেখে নেওয়া ওঁর রুটিনমাফিক কাজের মধ্যেই পড়ে। নিশ্চয় ওঁর ফার্মহাউসের স্টকে ওই বয়সী মেল-চাইল্ড আছে। তার সঙ্গে গ্রুপও মিলে গেছে হয়তো! হার্টের গ্রুপটা কী যেন! হ্যাঁ, ‘ও’ পজেটিভ। এদিকে কসমিক নার্সিংহোমের অর্ডার লিস্টের একটা কিডনি শর্ট আছে। তার গ্রুপও ও-পজেটিভ। অর্থাৎ ওই বাচ্চাটা কাটলেই ওদিকের কিডনি আর এদিকের হার্ট দুটো মালই রেডি। যখন জানা গেছে হার্টের পার্টি মালদার, তখন দাঁওটাও জানদার মারতে হবে তো! তাই একটু খেলিয়ে তুলতে হবে। ওঁর মনের মধ্যে এখন এই খেলা চলছে। তাই এত উচ্ছ্বাস।
কী! উসখুস্ করছেন কেন? ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চান তো! ব্যক্তিগত ব্যাপার বললেন তো! দাঁড়ান, এত ব্যস্ততার কী আছে! দেখছেন উনি এখন খুব বিজি। আপনার সঙ্গে কথা বলবেন না। আপনি কাস্টমার হলে বলতেন। তার চেয়ে বরং আগে শুনে নেওয়া যাক, মিঃ বি-টু হার্টের ব্যাপারে কী বলেন! ব্যাপারখানা ভাবুন একবার, একটা পনের বছরের ছেলের প্রাণ সংশয়ের ব্যাপার; হার্ট সময়মতো পৌঁছলে ছেলেটা হয়তো বাঁচবে! ওঁর লাইভ স্টকে ও-পজেটিভ গ্রুপের বাচ্চাও আছে। অথচ বেশি প্রফিট করার জন্য কেমন হ্যারাস করছেন! এ ব্যাপারে কিছু বলতে গেলে আপনাকে পাগল বলবে। কিংবা বলবে, ‘আপনার বিনিগ্ন্যান্সিয়া রোগ হয়েছে। আপনার ডি.এন.এ. চেন-এ বিরল বিনিগ্নিটি অ্যাটিটিউড রয়ে গেছে এখনও। শিগ্গির ট্রিটমেন্ট করান।’
কী বলছেন? এরকম কোনও রোগের নাম শোনেননি? আরে মশাই! কারুর মনে সহৃদয়তা, দয়া-দাক্ষিণ্য, এসব ক্ষতিকারক অপগুণ থাকলে তাকে বিনিগ্ন্যান্সিয়ার পেসেন্ট বলা হয়। এসব রোগের প্রকোপ নাকি গত শতাব্দী অবধি ছিল। এখন পৃথিবী এ রোগমুক্ত বলে দাবী করে ইউনিভার্স হেলথ্ অর্গানাইজেশন।
কী! গায়ে গরম হাওয়ার হল্কা লাগতে কেঁপে উঠলেন যে! আপনি কোন্ দেশে ছিলেন বলুন তো! একটু গরম সহ্য হচ্ছে না! কেউ হয়তো সুইংডোর ঠেলে বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকল। সেই সঙ্গে কিছু গরম হাওয়াও ঢুকে গেছে। বাইরের টেম্পারেচারটা তো জানেন, ফরটি ফাইভের নীচে নামে না কখনও। কে আসছে দেখা যাক্!
ও! ডাঃ এস-টু। এই ফার্মের সার্জনদের মধ্যে একজন। গোটা চারেক সার্জেন পুষেছেন মিঃ বি-টু। এঁরা দারুণ এ’পার্ট-হ্যান্ড। দেখেই বুঝতে পারছেন, কোনও হসপিটাল থেকে রিটায়ার্ড হওয়ার পর এখানে কনট্রাক্ট-বেসিসে রিত্রুটেড হয়েছেন। প্রচুর এক্স্পিরিয়েন্স ওঁর। কিন্তু ব্যাপার কী! আজ এস.টু-য়ের এত লেট হল! ওই যে, কম্পিউটারে ওঁর অ্যাটেনড্যান্স-কার্ড পাঞ্চ হচ্ছে না দেরিতে আসার জন্য। অন-লাইনে আর প্রেজেন্ট হবে না। অ্যাবসেন্ট হয়ে থাকবে। তার মানে ওয়েজেস্ কাট্ল্! উনি নিশ্চয় এখন মিঃ বি-টুর দ্বারস্থ হবেন। দেখা যাক কী হয়! মজাটা দেখুন।
ওই যে ডাঃ এস. টু মাথা নিচু করে বি-টুর কাছে দাঁড়ালেন। হাত কচলাচ্ছেন। বলতে ইতস্তত করছেন। যতই হোক একজন বিগ পারসোন্যালিটি তো নিশ্চয়! এত বড় সার্জন উনি! বি-টু কিন্তু বুঝে গেছেন উনি কী বলবেন; ওঁর সব দিকে নজর। এস-টু মুখ খুলতেই বি-টুয়ের ধমক। ওয়েটখানা দেখলেন ধমকের! একেই বলে মাস্টার্স ভয়েস। মালিক-সুলভ গলায় মিঃ বি-টু ওঁর লেট হওয়ার এক্সপ্ল্যানেশন চাইছেন। আর মাথা নিচু করে উনি কানের লতি চুলকোচ্ছেন। কী নিদারুণ দৃশ্য! তাই না! অথচ ইনি যখন হসপিটালের আর.এম.ও. ছিলেন; তখন উনিই যেন প্রেসিডেন্টের পরের পার্সোনালিটি।
যাক, ধমকানির পর্ব শেষ। ওই যে, এবার কম্পিউটারে ডেইলি অ্যাটেন্ড্যান্স এর ব্যাচ লাইন খুলে ডাঃ এস-টু’র কোড-নাম্বার সিলেক্ট করে ‘পি’ বাটন টিপলেন। কম্পিউটারে পিঁক শব্দটা হতেই এস-টু’র মুখে বিগলিত হাসি।
ওই যে মিঃ বি-টু ধমকের সুরে কী বলছেন শুনুন!
‘যান ও.টি.তে। ইক্যুইপমেন্ট রেডি করুন। এখুনি একটা ফ্রেশ হার্ট ডেলিভারি আছে। তাছাড়া কসমিকে বড় অর্ডার লিস্ট আছে। যান কুইক্।’
সার্জন কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে যান। বি-টুয়ের ঠোঁটে কেমন ফিচেল হাসি— বেশ মালিকগিরি করা গেল।
মালিক হওয়ার এই তো মজা! বিশাল ডিগ্রিধারী ওই ডাক্তারের কাছে বি-টুয়ের যোগ্যতা কিছুই নয়। ডাক্তারকে যদি একটা টোটাল কম্পিউটার ধরা হয়, বি-টু সেখানে সামান্য একটা মাইক্রো চীপ মাত্র। ডাক্তার কী ক্যাজুয়ালি একটা মানুষের শরীর থেকে হার্ট, কিডনি, ফুসফুস অক্ষত অবস্থায় বের করে নিয়ে, সেফটি ব’্-এ প্রিজার্ভ করেন। অথচ বি-টু সামান্য নিজের নখ কাটতে গেলেও রক্তপাত করেন। কোয়ালিফিকেশন অর্ডিনারি কমার্স গ্র্যাজুয়েশন আর বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ডিপ্লোমা। তাও তিনবারের চেষ্টায় পাশ। এর জন্য ওঁর মনে একটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লে’্ আছে। সেইজন্য উচ্চশিক্ষিত কিংবা ওঁর চেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন কোনও মানুষকে ধমক-টমক দেওয়ার সুযোগ হলে মনে বেশ আনন্দ হয়। বি-টু’র চোখ-মুখ বলছে ওঁর মনে এখন সেই আনন্দ। ওঁর মনের মাঝে এখন সত্যি-সত্যি কী ঘুরছে, তা একটু জানা যাক মনের অন্দরমহলে গিয়ে। সাইকো-অ্যানালাইজারের বাটনটা টিপে দিন ওঁর দিকে ফোকাস করে।
... ওহ্! ব্যাটা বুড়ো ডাক্তারের এম্ব্যারাস্ড্ ফেস্টা দেখে গুলগুলিয়ে হাসি পাচ্ছিল। বিশাল ডিগ্রিধারী ডাক্তার হও আর যা-ই হও, তুমি আমার হুকুমের চাকর ছাড়া আর কিছু নও, সেটা বুঝিয়ে দিলাম ভাল করে। এখন অন্তত ওয়ান উইক কাজ করবে আজকের এই ডোজ। ঠিক সময়ে কর্ডলেস মাইক্রোফোনটা অ্যাক্টিভেট করার কথাটাও মাথায় এসেছিল। সব ডিপার্টমেন্টের স্পিকারগুলোতে নিশ্চয় এই ধমকানি পৌঁছেছে! সবাইকে অ্যালার্ট করা গেল। দিস ইজ কল্ড্ অ্যাডমিনিস্টে্রশন। সার্জারি না জানলেও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিতে ...! এমনি-এমনি কি আর এতবড় কনসার্নের মালিক হয়েছি।
বুঝলেন তো! বাটনটা অফ করে দিন। চলুন, ওর মনের বাইরে আসা যাক্। দেখলেন, যা বললাম তাই, উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে ডমিনেট করতে পেরে ওর মনে কেমন খুশি ও আত্মতুষ্টি! তবে এটা অস্বীকার করা যায় না, ব্যবসায়ী বুদ্ধিটা ওঁর খুব ধারালো। প্রথমে উনি ছিলেন এনার্জি ট্যাবলেটের সোল-সেলিং এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটার। তা থেকে আজ ...! দেখতেই তো পাচ্ছেন। এছাড়াও আর একটা এইরকম ও-টি-কাম রিটেল কাউন্টার আছে সাউথে। আর দু’খানা ফার্ম হাউস। যেখানে সব সময় শিশু, কিশোর, বুড়ো-বুড়ি মিলিয়ে শ’-খানেক লাইভ স্টক রেডি থাকে। দেখতে চাইলে সেসব পরে দেখাব। এখন মিঃ বি-টু ওই হার্টের ব্যাপারে কী করছেন দেখা যাক। আপনার যে শুধু কে-বিটুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা নয়; সবকিছু দেখারও ইচ্ছে আছে, তা বুঝতে পারছি।
দুই
ওই দেখুন, মনিটরে স্টাফ-অ্যাটেনড্যান্স স্ক্রিন সরিয়ে এখন ফার্ম-হাউসের স্টক-টেবিল! সেদিকে চোখ রেখে মিঃ বি-টু মাউস ক্লিক করে যাচ্ছেন।
কী? ফার্ম-হাউসের ব্যাপারটা ঠিক ক্লিয়ার হচ্ছে না? আচ্ছা! বুঝিয়ে বলছি। স্টক বিজনেসের যেমন শো-রুম ছাড়াও স্টোর-রুম থাকে; অনেকটা সে রকম। সস্তা দামে ছোট ছেলেমেয়ে, যুবক-যুবতী কিনে আনা হয় রিফিউজি কলোনি থেকে বা স্লাম এরিয়া থেকে। সেগুলোকে ফার্ম-হাউসে রাখা হয়। জানেন তো, থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়রের পর কত মানুষ ঘর ছাড়া, দেশ ছাড়া হয়েছে! বিশেষতঃ মিড্ল ইস্টের দেশগুলো তো প্রায় শেষ। ওখান থেকে কার্গো ভর্তি ক’রে কত মানুষকে আনা হ’ল সেল্টার দেওয়ার জন্য। ওই সমস্ত রিফিউজির অনেক ছেলেমেয়ে, অনেক অভাব। পেটের জ্বালায় ওরা নিজেদের সন্তানকে বিক্রি করে দিচ্ছে, আর হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স কোম্পানিগুলো তা সস্তা দামে কিনে নিয়ে, তাদের ফার্ম-হাউসে রাখছে। তাদেরকে মিনিমাম ফুড-কেক আর মেডিসিন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে। আর দরকার মতো সেগুলো নিয়ে এসে সার্জারি করে তার লিম্ব বের করে সাপ্লাই দিচ্ছে।
এছাড়া ফার্ম হাউসে বুড়ো-বুড়ি কিনেও রাখা হয়। খুব সস্তা দামে পাওয়া যায় বুড়ো-বুড়িগুলো। মা-বাবা বুড়ো-বুড়ি হয়ে গেলে কিংবা ডিস্যাব্ল্ হয়ে গেলে ছেলেরা তাদেরকে বেচে দেয়। কিছু টাকাও পেল; বুড়োবুড়ির ঝামেলাও গেল। সরকারও এই কেনা-বেচাতে অনুমতি দিয়েছে। এতে সরকারের লাভ। বার্ধক্য ভাতা বাবদ ব্যয়টা বন্ধ করে দেওয়া গেছে। ব্যয় বন্ধ করার জন্য সরকার সবসময় মুখিয়ে আছে। যেখানে খরচ সেখানে সরকার নেই। দেখুন না, জু-তে ছোটখাটো প্রাণীগুলো তো কবেই শেষ হয়ে গেছে বিদ্ঘুটে প্রকৃতির সাথে ফাইট্ করতে না পেরে। নামকা-ওয়াস্তে কয়েকটা বড় জন্তু-জানোয়ার আছে; তার খরচও সরকার চালাতে রাজি নয়। ওগুলো দত্তক দিয়েছে পয়সাওয়ালা লোকদেরকে। জন্তুটা জু-তে, কিন্তু তার পালন-পোষণের ভার ওই দত্তক নেওয়া লোকটার।
জানেন, আমার গ্র্যাণ্ড-ফাদারের মুখে শুনেছি, আগে নাকি সরকার শিক্ষা খাতে, স্বাস্থ্য খাতে অর্থ ব্যয় করতো। দেশের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য সরকারী স্কুল-কলেজ ছিল। সেখানে বিনামূল্যে পড়ানো হত। সরকারী ভরতুকি দেওয়া হতো ওই স্কুল-কলেজগুলোকে। আর এখন টাকা থাকলে শিক্ষা কিনে নাও, না থাকলে মুর্খ হয়ে থাক। আগে জনগণের স্বাস্থ্যরক্ষা ছিল সরকারের পরিষেবা। আর এখন তো ...! দেখতেই পাচ্ছেন নিজের চোখে, এখন টাকা দেওয়া তো দূরের কথা, বিভিন্ন ইন্স্টিটিউশন্ এবং নার্সিংহোম থেকে সরকার টাকা নেয়; যেহেতু তারা স্বাস্থ্য নিয়ে বিজনেস্ করছে। এই যে বুড়ো-বুড়ি কেনা-বেচা, ওর জন্য কিছু ট্যা’ও কালেকশন হচ্ছে। জানেন, এ-তে গভর্নমেন্টের প্রচুর রেভিনিউ আর্ন হয়। ক্যাপিট্যালিস্ট গভর্নমেন্ট তো! ব্যাবসা ছাড়া কিছু বোঝে না। ‘লাইভ’ কেনার সময় ট্যা’ দিতে হয়। প্রত্যেকটা লিম্ব্ বিক্রির ওপর ভাল রকম সেলস্-ট্যা’ আছে। ওল্ড-এজ হোমের মালিকগুলোর ইউনিয়ন এ নিয়ে কিছুদিন চিৎকার-চেঁচামেচি করেছিল। ওদের ব্যবসায় ডামাডোল শুরু হয়েছিল এই বুড়োবুড়ি কেনাবেচার জন্য। সরকার তো ওদের কথায় কর্ণপাত করল না। করবে কেন? ওই হোমগুলো সরকারকে ট্যা’ও দিত না সমাজকল্যাণ সংস্থার অজুহাতে। সরকার ওদেরকে চুপ করাতে সমাজকল্যাণ আইনটা-ই অ্যামেন্ডমেন্ড করল। এতে আবার এক বুলেটে দুটো শেয়াল মরল। দেহদান, চক্ষুদান করতে বলার এন.জি.ও.গুলোকেও ডিমলিশ করে দেওয়া গেল। ওরা যা আন্দোলন শুরু করেছিল এই লিম্ব সাপ্লায়ার্সদের বিরুদ্ধে। লিম্ব সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ওদেরকে প্রচুর টাকার অফার দিয়েও চুপ করাতে পারেনি। সরকার এক আইন পাশ করিয়ে চুপ করিয়ে দিল। বুঝছেন, কী ব্রেইন আমাদের ক্যাপিটালিস্ট সরকারের! এই সরকার বা গভর্নমেন্টের কথা উঠতে একটা কথা মনে পড়ে গেল।
আপনি জানেন কিনা জানি না, বিদেশে ছিলেন বলছেন তো! অনেক আগে নাকি আমাদের দেশে ‘ডেমোক্র্যাসি’ মানে গণতন্ত্র নামের একটা কথা খুব চালু ছিল। সরকারের আগেও ওই ‘গণতান্ত্রিক’ কথাটা জোড়া থাকত, তখন বলা হত ডেমোক্র্যাটিক গভর্নমেন্ট। অনেক পলিটিক্যাল পার্টি থাকত। তাদের মধ্যে থেকে বিভিন্নজন এলাকাভিত্তিক জন-প্রতিনিধি হয়ে ভোটে দাঁড়াত এবং জনগণ ভোট দিয়ে তাদেরকে নির্বাচিত করত।
কী হ’ল? হাসছেন যে! ও! আপনি এসব জানেন! তখন জনগণের আর খেয়েদেয়ে কাজ ছিল না বোধহয়। তাই ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিত নিজের পছন্দের প্রতিনিধিকে। আর ওই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দলের প্রতিনিধি বেশি নির্বাচিত হত, সে দল সরকার গড়ত। তাই বলা হ’ত গণতান্ত্রিক সরকার। ওই রাজনৈতিক দলগুলোকে তখন ইনডাইরেক্টলি চালাত মালটি-মিলিনীয়ার বিজনেসম্যান, অর্থাৎ ক্যাপিটালিস্টরা। এখনকার মতো ডাইরেক্ট ক্যাপিটালিস্টদের দল ছিল না। তখনকার ক্যাপিটালিস্টরা তাদের পছন্দ মতো দলকে চালানোর জন্য তলায় তলায় দলকে আর্থিক সাহায্য দিত এই শর্তে যে, সেই দল ক্ষমতায় এসে সরকার গঠন করলে, সেই সরকার তাদের বিজনেস ও পুঁজি বাড়ানোর কাজে নানারকম সুযোগ সুবিধা দেবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হ’ল, কোনও কোনও দল ক্যাপিটালিস্টদের আর্থিক সাহায্য নিয়ে ক্ষমতায় এসে বেমালুম পাল্টি খেত। ক্যাপিটালিস্টদের সব শর্ত মেনে নিয়ে সবরকম সুযোগ সুবিধা দিত না।
আপনি এসব নিশ্চয় জানেন! তবুও বলতে শুরু করেছি যখন ...। এরকম চলতে চলতে তো ওরা ঠেকে শিখল। ইনডাইরেক্টলি রাজনৈতিক দলকে টাকা না দিয়ে নিজেরাই ক্যাপিট্যালিস্ট কাউন্সিল গঠন করল। একাধিক পুঁজিপতি গোষ্ঠী নিয়ে বেশ কয়েকটা কাউন্সিল তৈরি হ’ল। তিন বছরের এগ্রিমেন্টে সরকারে ক্ষমতায় আসবে সেই ক্যাপিট্যালিস্ট দল; যে কাউন্সিল সরকারের ফান্ডে সর্বাধিক টাকা ঢালবে। তারপর থেকেই তো এই ক্যাপিটালিস্ট গভর্নমেন্ট চালু হল। জনগণও স্বচ্ছন্দে মেনে নিল। জনগণ ভেবে দেখল, ডেমোক্র্যাটিক গভর্নমেন্টেও মেন ফ্যাক্টর হ’ল ক্যাপিট্যালিস্ট। ওতে তারা পিছনে থাকে; এই সিস্টেমে তারা সামনে থাকবে। আমাদের়ও ভোট-ফোট দেওয়ার ঝামেলা নেই, নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা, মারামারি, খেয়োখেয়ি থাকবে না। তোমরা পুঁজিপতিরা নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি কর। সরকারে বেশি টাকা মানেই জনগণের বেশি সুবিধা। সরকার তো তোমরাই চালাতে, এখনও তোমরাই চালাবে। সুতরাং ক্যাপিট্যালিস্ট গভর্নমেন্ট জিন্দাবাদ!
বেশি টাকা লগ্নিকারী কাউন্সিল সরকার গঠন করে, আর অন্যান্য কাউন্সিল তখন বিরোধী আসনে বসে। কোনও আইন পাশ করতে হলে সরকার প্রস্তাব তোলে। বিরোধী দল যদি বোঝে যে, এতে তাদের কোনও ক্ষতি হবে না, ক্যাপিট্যালিস্টদের অনুকূলেই আইনটা; তখন তারাও সমর্থন করে। আইনও পাশ হয়ে যায়। আর আইন যা হবে তা জনগণকে মেনে চলতেই হয়। কারণ প্রশাসন তো ক্যাপিটালিস্ট গর্ভনমেন্টের। আইন ভঙ্গ করলে ...! তাই এই আইনটা পাস হতে ওই এন.জি.ও.দের আন্দোলনও থেমে গেল। তারপর থেকেই তো এই লিম্ব-সাপ্লাই বিজনেসের রমরমা। এখানে ওখানে গজিয়ে উঠল রিটেল কাউন্টার আর ওই স্টকরুম, মানে ফার্ম হাউস।
মিঃ বি-টুর দু’খানা ফার্ম হাউস আছে। ইস্ট জোনে একটা আর ওয়েস্ট জোনে একটা। ইস্ট জোনে চাইল্ড আর টিন-এজার। স্ক্রিনে দেখুন ইস্ট জোনের ফার্ম হাউসের স্টক ডিসপ্লে হয়েছে। ওই যে, বি-টু, নেসেসারি আইটেম খুঁজে পেয়েছেন। সিলেক্ট করে তার বায়োডাটা ম্যা’িমাইজ করলেন। টিন-এজারটার কোড নাম্বার ঃ বি-টোয়েন্টি এম.ই.আর.সি.। সে’ ঃ মেল। ডেট-অব-বার্থ ঃ ফিফটিন্থ্ অগাস্ট, টু থাউজেন্ড থারটি সেভেন। ব্লাড গ্রুপ ঃ ও। আর এইচ ঃ পজেটিভ। কালেকশন প্লেস ঃ মিড্ল্ ইস্ট রিফিউজি কলোনি। কালেকশন প্রাইজ ঃ ইলেভেন লাখ। কালেকশন ডেট ঃ দশ জানুয়ারি দু’ হাজার বাহান্ন।
কী ব্যাপার! মিঃ বি-টু স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে উদাস চোখে চেয়ে রয়েছেন, কেন বাইরের দিকে! গভীরভাবে কিছু ভাবছেন বোধহয়! হ্যাঁ, নিশ্চয় কিছু ভাবছেন! ওই যে কপালে ভাঁজ পড়েছে। কাজ করতে করতে হঠাৎ এমন ...! আচ্ছা! ওর মনের গতিবিধি লক্ষ করতে সাইকো-অ্যানালাইজারের শরণ নেওয়া যাক্।
... এই কিডির কালেকশন প্রাইজ এগার লাখ লেখা রয়েছে কেন? সাধারণতঃ সাত-আট লাখে কেনা হয়। খুব বেশি হলে দশলাখ। কিন্তু এটার সি.পি. এগার লাখ লেখা রয়েছে! এরকম হতে থাকলে আমার ব্যবসা ডকে উঠবে যে। ওহ! মনে পড়েছে। মাস ছয়েক আগের ঘটনা। মিডল ইস্ট রিফিউজি কলোনির সেই কেসটা।
ইস্ট জোনের কালেকটার, বাচ্চাটার বাবার সঙ্গে দর-কষাকাষি করে, হায়েস্ট প্রাইজ দশ লাখে রফা করেছিল। অ্যাডভান্স্ দিয়ে এসেছিল এক লাখ টাকা। কালেক্ট করার দিন ক্যাওস হ’ল। সেদিন হঠাৎ মিডল্ ইস্ট কলোনি থেকে কালেক্টরের ফোন— স্যার! প্রবলেমে পড়েছি আপনাকে একটু আসতে হবে।
প্রবলেমটা কী আগে শুনি। পুলিস, না পাড়ার দাদা, না মানবকল্যাণ সমিতি?
না স্যার, ওসব নয়, বাচ্চার মা।
বাচ্চার মা, মানে?
মানে স্যার, মা বাচ্চা দিতে বাধা দিচ্ছে। তাই নিয়ে বেশ প্রবলেম হয়ে গেছে। আশপাশের কিছু উটকো লোকজন জড়ো হয়ে বাধা দিচ্ছে। টাকা খাওয়ার ধান্দা আরকি! আপনি আসুন স্যার। ফোনে সব বলা যাবে না।
মনে পড়ছে, সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে ছুটেছিলাম স্পটে।
দূর থেকেই নজরে পড়েছে অনেক মানুষের ভিড়। কানে আসছে ওদের চিৎকার-চেঁচামেচি। পরিস্থিতির জটিলতা আঁচ করে, দূরে গাড়ি থামিয়ে লোকাল থানায় ইনফর্ম করেছি। থানার জিপ আসতে, তার পিছু-পিছু পৌঁছেছি স্পটে। গিয়ে দেখি— কালেক্টর ছোকরাটার প্রায় প্যান্ট ভিজে যাওয়ার অবস্থা। পুলিশ গিয়ে একটু হম্বিতম্বি করতে ভীড় হালকা হ’ল। কালেক্টর ছেলেটাকে পাশে ডেকে নিয়ে জিগ্যেস করি— কী ব্যাপার?
সে তো হাওমাও করে ওঠে— স্যার! কথামতো বাচ্চাটার বাবাকে আরও ন’লাখ টাকা পেমেন্ট করা হয়ে গেছে। কাগজ-পত্তর সই-সাবুদও হয়ে গেছে। কিন্তু বাচ্চাটাকে কালেক্শন ভ্যানে তোলার সময় ওর মায়ের সে কী কান্না! কান্নার চোটে যেন শব্দ-দূষণ প্রতিরোধ সমিতির লোকজনও ছুটে আসবে, এমন অবস্থা। সে কিছুতেই তার ছেলেকে ছাড়বে না। এতদিন ধরে ফিল্ডে কাজ করছি; কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। এ কী অনাসৃষ্টি মা রে বাবা! বাচ্চার জন্য কোনও মাকে এমনভাবে কাঁদতে দেখা যায় নাকি আজকাল! এ তো সেই আগের শতাব্দীতে হত। সিনেমায় গল্প-উপন্যাসে পাওয়া যায়।
আবেগে ছেলেটা আরও কত কিছু বকে চলেছে। মনে পড়ছে, খুব অধৈর্য হয়ে বলেছিলাম— আরে বাবা! সংক্ষেপে বল তারপর কী হল?
তারপর তো স্যার ওই মা’টার চিৎকারে কলোনির সমস্ত লোক জড়ো হয়ে গেল। ওরা ভাবছে জোর করে ঐ বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছি। আমি কন্ট্রাক্ট পেপার দেখাতে চাইলেও দেখছে না। ঝুটমুট ওরা আমাকে ...।
বুঝেছি, বুঝেছি চল— ব’লে জটলার দিকে এগিয়েছিলাম। অনেক কষ্টে সেদিন পরিস্থিতি আয়ত্তে্ব এনেছিলাম। অবশ্য পুলিশের সাহায্য নিতে হয়েছিল। মাঝখান থেকে আরও লাখখানেক টাকা খসেছিল পুলিশের পেছনে। তাই দশলাখের পরিবর্তে এগার লাখ লেখা রয়েছে।
সত্যিই সেদিন আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম সেই মা’টার অস্বাভাবিক ব্যবহার দেখে। যেন আর্কাইভে রাখা পুরোনো দিনের কোন ফিল্ম দেখছি। ছেলের জন্য মায়ের কী আকুলি-বিকুলি! ওই সময় কিছু সাংবাদিকও জুটে গিয়েছিল কোত্থেকে। পরের দিন বেশ কয়েকটা কাগজে ওই মায়ের ছবিসহ খবর হয়েছিল এইরকম শিরোনামে— নির্মূল হয়নি কিন্শিপিয়া।
কোনও কাগজ হেডিং দিয়েছিল— এখনও অপত্য-স্নেহ!
মানুষ তো চেটেপুটে খেল ভেতরের খবরটা— মনোবিজ্ঞানীরা যতই দাবী করুক পৃথিবী থেকে কিনশিপিয়া রোগ নির্মূল হয়েছে; বাস্তবে তা হয়নি। এখনও কিছু মানুষের মনে অপত্য-স্নেহ, মায়া-মমতা, সম্পর্কের টান, ভালবাসা, এসব আবর্জনা রয়ে গেছে। তারই প্রমাণ মিড্ল ইস্ট রিফিউজি কলোনির এক মহিলা ...! ইত্যাদি ইত্যাদি।
সেদিন অবাক হয়েছিলাম ওই মহিলার আবেগ দেখে। ওর স্বামীকে পাশে ডেকে নিয়ে বলেছিলাম— শুনুন! আপনার স্ত্রীকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাবেন। ওর শরীরে সেই আগের শতাব্দীর স্নেহ-মায়া-মমতার ভাইরাস রয়ে গেছে। রোগটা সংক্রামক। অন্যদের ইনফেক্শন হতে পারে।
সব ঝামেলা চুকিয়ে ভ্যানে বাচ্চাটাকে তুলে দিয়ে ড্রাইভারকে বলেছিলাম সোজা ইস্ট জোন ফার্ম হাউসে চলে যেতে। ভ্যানের সঙ্গে দু’জন কনেস্টব্ল্কে দিয়ে দিয়েছিল পুলিশ অফিসার। যাতে রাস্তায় আর কোনও ঝুট্ঝামেলা না হয়।
কালেক্টরকে নিজের গাড়িতে নিয়ে ফিরেছিলাম। গাড়িতে গুম্ হয়ে বসে থাকায় কালেক্টর ছোকরাটা বলেছিল আপনার অনেক ধকল গেল স্যার! পার্টিটা এমন প্রবলেম ক্রিয়েট করবে জানলে ...।
তখন বলেছিলাম— আমি এখনকার প্রবলেমের কথা ভাবছি না। ভাবছি ভবিষ্যতের কথা।
কালেক্টর-ছেলেটা কোনও কথা না বলে চোখে মুখে প্রশ্ন এঁকে তাকিয়েছিল। বলেছিলাম— বুঝলে হে ছোকরা! এসব আমাদের বিজনেসের ক্ষতি করবে। বেবি কালেক্ট করা সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। মানুষের মনে এখনও এসব আবর্জনা ..! অথচ জিন-টেকনোলজিস্টরা গলা ফাটায়— ‘মানুষের ডি.এন.এ.-তে আর এইসব বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায় না।’
সব যায়; এই তো পাওয়া গেল। আসলে, এখনও কিনশিপিয়া, লাভেরিয়া, বিনিগ্ন্যান্সিয়া এসব রোগ লুকিয়ে-চুরিয়ে রয়ে গেছে।
কালেক্টর বিজ্ঞের মতো ঘাড় নেড়ে বলেছিল— কোনও রোগই পুরোপুরি নির্মূল করা যায় না স্যার। সেই সে-যুগের ক্যানসার, এইড্স্, হেপাটাইটিসের রোগি খুঁজলে এখনও দু’একটা মিলতে পারে। অথচ কাগজে-কলমে পৃথিবী ওসব রোগমুক্ত। যদি স্যার রোগ নির্মূল করা যেত, তাহলে আপনার বিজনেস আর আমার পেট চলতো কী করে!
এটা তুমি ঠিক বলেছ— ব’লে হা-হা করে হেসে উঠেছিলাম সেদিন।
যাক্, সেদিনের ঘটনা ভেবে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। যখন যা হবে দেখা যাবে। পনের বছরের মেল-হার্ট আছে, কনফার্ম হওয়া গেল। এবার ডাঃ এস. ফিফটিকে একবার রিং করা দরকার। ব্যাটা নিশ্চয় টেনশনে আছে।
মিঃ বি-টু তো এখন ডাঃ ফিফটিকে ফোনে ধরার চেষ্টা করবেন! সুতরাং ওঁর মন থেকে বেরোনো যাক। এবার নিশ্চয় ফার্ম-হাউস আর তার কিডি কালেকশনের ব্যাপারে কিছুটা আইডিয়া হয়েছে।
মা-বাবা তার সন্তানকে বিক্রি করে দিচ্ছে, ব্যাপারটা আপনার কেমন খটকা লাগছে। তাই তো? আমার সন্দেহ হচ্ছে, আপনি অন্য দেশ থেকে এসেছেন বললেন। এটা ঠিক বলেননি। আমার মনে হয় আপনি বছরের পর বছর স্রেফ ঘুমিয়ে ছিলেন। ঠিক আছে আপনাকে একদিন নিয়ে যাব, নিজের চোখে দেখে আসবেন। আসলে কি জানেন, মানুষ একমাত্র নিজেকে ভালবাসে। নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য অনায়াসে মানুষ এমন করতে পারে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই পঁচিশটা বছরে পৃথিবীর অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে দেখেছেন। মানুষের গড় উপার্জন কোথায় নেমেছে! মানুষের উপার্জনের প্রধান উৎস তো ছিল প্রাকৃতিক সম্পদ আর চাষবাস। এটাই মুখ্য। এগুলোর উপর নির্ভর করে শিল্প এবং বাণিজ্য এসব গৌণ উৎস থেকে মানুষ উপার্জন করত। তো সেই চাষবাসই তো বন্ধ হয়ে গেছে। পুরো পৃথিবীর জলই বলতে গেলে বিষাক্ত হয়ে গেছে। ওই জলে কৃষিকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। নদীগুলো তো কবেই বিলুপ্ত হয়েছে। ‘গারল্যান্ড অব্ রিভার্স প্রোজেক্ট’ ইম্প্লিমেন্ট হওয়ার পর সাঁইত্রিশটা নদী মজে গেল। কিছু নদীর খাতে সামান্য জল আছে, তাও সমুদ্রের নোনা জল ঢুকেছে বলে। সে জল খাওয়া তো দূরের কথা, চাষবাসও করা যাবে না। তাছাড়া, পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে কী কাণ্ডটা হল সে তো জানেন। সুমেরুর বরফ গলল। আফ্রিকার মাউন্ট অব্ কিলিমাঞ্জারোর বরফের মুকুট শেষ। কতগুলো দেশ সমুদ্রের তলায় চলে গেল। স্থলভাগ কমে গেল। সমুদ্রজাত প্রাণী ধরে আয়-উপার্জন; সেও শেষ হতে বসেছে। সমুদ্রের জল বিষাক্ত হয়ে গেছে পরমাণু বিস্ফোরণের ফলে। সমুদ্রের মাছেদের প্রধান খাদ্য প্ল্যাঙ্কটন না কী যেন নামের ক্ষুদ্র জীব; তাদের বংশ শেষ। খাদ্যের অভাবে মাছ জাতীয় প্রাণীগুলো শেষ। সমুদ্র নির্ভর করে উপার্জন কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ আয়-উপার্জন করবে কোত্থেকে বলুন তো! অভাব থেকেই যাচ্ছে। সে অভাব মেটাতে কত কিছু করে ফেলছে মানুষ। নিজের সন্তান বিক্রিটাতো ওদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে।
থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়রের আগে থার্ড ওয়ার্ল্ড কািKCগুলোতে কী হত জানেন, অভাবের তাড়নায়় শিশুদের কাজ করতে পাঠাত রোজগারের জন্য। ওদের শিক্ষা-টিক্ষা পেটের দায়ে শেষ। কিন্তু ওরা শ্রমিকের মর্যাদাও পেত না, তেমন পয়সাও পেত না। বাচ্চাগুলো আধমরা হয়ে যেত, অথচ পেট ভরত না। সেটা তো হয় না। তাই ওরা বাচ্চা বিক্রি শুরু করল!
কিন্তু তাতেও কি ওদের অভাব মিটছে! ওই তো মনিটরে দেখলেন, বি-টোয়েন্টির ক্রয়মূল্য মাত্র এগার লাখ। তার মধ্যে তো দশলাখ পেয়েছে ওর বাবা। এক লাখ পুলিশের অ্যাপিয়ারেন্স ফি। এই বাজারে দশলাখে কতদিন চলবে। আসলে লাভটা করে এই লিম্ব সাপ্লায়ার্সরা। দেখুন না মিঃ বি-টু একটা হার্টের কত দাম চান। ডাঃ এস ফিফটিকে মোবাইলে ধরেছেন মনে হচ্ছে।
... হ্যালো! ভেনাস হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স থেকে মিঃ বি-টু বলছি।
হ্যাঁ বলুন। আপনার নাম-ধাম আর বলতে হবে না। সে তো মোবাইল স্ক্রিনে দেখতেই পেলাম। কাজের কথাটা বলুন। হার্টের ব্যবস্থা হল?
একটু প্রবলেম হয়ে গেল স্যার। ফার্ম হাউসে পনের-ষোল বছরের বাচ্চা নেই। তবে ওরিড্ হবেন না। মাল ঠিক পেয়ে যাবেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার এফিসিয়েন্ট কালেক্টরকে পাঠিয়েছি জোন-থ্রী রিফিউজি কলোনিতে। ওখানে কয়েকটা বাচ্চার অ্যাডভান্স দেওয়া আছে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই কালেক্ট হয়ে যাবে আশা করি। তবে, দাম বোধহয় এক কোটিই পড়ে যাবে। বুঝলেন, এমার্জেন্সি বেসিসে কালেকশন করতে হচ্ছে তো! কেনার খরচ বেশি লেগে যাবে! সুযোগ বুঝে কালেক্টর ছেলেটাও কমিশন বেশি চাইবে। তার ওপর আপনার অনরেরিয়াম টোয়েন্টি পারসেন্ট। বুঝতেই তো পারছেন।
আপনি দামের জন্য ভাববেন না পার্টি মাল্টি-মিলিয়নীয়ার। তার একমাত্র বংশধর। যে কোনও মূল্যে ওকে বাঁচাতেই হবে। আপনি অ্যাস্যুওর করুন যে হার্টটা দিচ্ছেন। তা না হলে ...।
ডোন্ট ওরি ডক্টর! য়্যু মাস্ট গেট ইট উইদ্্ ইন টু আওয়ার্স।
ও-কে! নাও আয়্যাম ইন হারি। পেসেন্ট ভেন্টিলেশনে আছে। প্লীজ রিং ল্যাটার।
ফার্ম হাউসে পনের বছরের চাইল্ড রেডি থাকা সত্বেও কলোনি থেকে কালেক্ট করতে হবে বলল কেন—তাই ভাবছেন তো! আরে বাবা! এ হ’ল বিজনেস ট্যাকটি’! ‘ভাও বাড়ানো’— কথাটা শুনেছেন? এ হল তাই। স্টকে আছে বললে তো ন্যায্য দাম নিতে হবে। শুনলেন না বি-টু বললেন— এমার্জেন্সি বেসিসে কালেক্ট করা হচ্ছে, দাম বেশি পড়বে। এক কোটিই লেগে যাবে।
চলুন, মিঃ বি-টুর মনে কেমন আনন্দের ঢেউ গড়াচ্ছে দেখা যাক। চোখে-মুখে তো খুশি উপচে পড়ছে দেখছি।
... ওঃ! মাল্টি-মিলিয়নীয়ারের একমাত্র বংশধর। চেষ্টা করলে দাঁওটা আরও বেশি মারা যেত! বংশধরকে বাঁচাতেই হবে। সরকারি আইন অনুযায়ী বংশধর ছাড়া আর কারুকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করা যায় না। মেয়ে থাকলে সেও ওই সম্পত্তির মালিক হতে পারবে না। সমস্ত সম্পত্তি সরকারের দখলে যাবে। সুতরাং...!
যাক গে! এক কোটিই বা কম কী! শুধু হার্টের জন্যই এক কোটি পাওয়া যাবে। এছাড়া পুরো বডিটাই তো রইল। লাং, কিডনি এসবের আলাদা দাম পাওয়া যাবে। যদিও পারচেজ প্রাইস্ দশের জায়গায় এগার লেগেছে। তাছাড়া কালেক্টরের কমিশন, গভর্নমেন্টের ট্যা’্, কনভেয়্যান্স, পুলিশ এট্সেট্রা। বাচ্চাটাকে সাত-আট মাস ফার্ম-হাউসে রাখার খরচ; সেটাও কম নয়। বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভাল কোম্পানির ফুড-কেক। সুস্থ রাখার জন্য রুটিন ওয়াইজ মেডিসিন। প্রতি মাসে আলট্রা ভায়োলেট-রে প্রোটেকটিভ ভ্যাকসিন। ওর মায়ের কিন্শিপিয়া সিম্প্টম্ পাওয়া গিয়েছিল ব’লে এর কিন্শিপিয়া অ্যালাইজা টেস্ট করতে হল। ডি.এন.এ. টেস্টে অবশ্য কিন্শিপিয়া, লাভেরিয়া, বিনিগ্ন্যান্সিয়া এসবের হদিশ মেলেনি। কিন্তু খরচটা তো করতে হ’ল। যাক্ গে! তবুও যা প্রফিট থাকবে, তাতে স্পেস্-সিটিতে গেস্ট হাউস বানানোর পারপাসে নেওয়া লোনের এ মাসের প্রিমিয়ামটা হয়ে যাবে।
মেনি-মেনি থ্যাংকস্ টু ডঃ এস-ফিফটি। অর্ডার কম দিলেও যেটা দেয়, একদম সলিড। সেই সঙ্গে বর্তমান সরকারকেও ধন্যবাদ দেওয়া দরকার। স্টেম সেল টেকনোলজি তো লিম্ব সাপ্লাইয়ের ব্যবসা ডাউন করে দিয়েছিল। ভাগ্যিস এদের সিগ্মা ক্যাপিটালিস্ট কাউন্সিল ক্ষমতায় এসে স্টেম সেল টেকনোলজিটা ব্যান করে দিল। তা না হলে স্পাইন ভার্টিব্রা, মালাইচাকি, ফ্রেস হার্ট বিক্রি বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে ওগুলো আবার রিপেয়ার হয়ে যাচ্ছিল যে! ব্যবসা একদম ঝুলে গিয়েছিল। অনেক ভেবেচিন্তেই সিগ্মার মেম্বার হয়েছি। ব্যবসা আর একটু বাড়াতে পারলে মিনিস্ট্রিতেও ...।
কী! স্টেম-সেল টেকনোলজি ব্যান করার ব্যাপারটা জানেন না নাকি? ও! আপনি জানবেনই বা কী করে! স্বীকার করুন আর না করুন, আপনি যে পৃথিবীর বাইরে কোথাও ছিলেন বোঝাই যাচ্ছে। ঠিক আছে, শুনুন! বর্তমান সরকারে থাকা কাউন্সিল যখন বিরোধী দল ছিল; তখন এদের কর্মসূচিতে ছিল ক্ষমতায় এলে স্টেম-সেল-টেকনোলজি বন্ধ করা হবে।
কী! বন্ধ করলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষতি হবে, তাই বলতে চাইছেন তো!
আরে বাবা চিকিৎসা-বিজ্ঞানের লাভ-ক্ষতির কথা কে চিন্তা করে! ওরা নিজেদের মুনাফার কথা চিন্তা করে। ক্ষমতায় থাকার কথা চিন্তা করে। যখন দেখল, মানবকল্যাণ সমিতি, হিউম্যানস ওয়েলফেয়ার ফোরাম এসব সেকেলে আর ট্র্যাস সংস্থাগুলো স্টেম-সেল-টেকনোলজির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে এবং সাধারণ মানুষও ওদের সমর্থন করছে, শামিল হচ্ছে; তখন ওরা ওটাকেই ক্যাপিটাল করল। কারণ বিজনেসের কাস্টমার-কনজিউমার তো সাধারণ মানুষগুলোই।
অ্যাঁ? ওই ফোরামগুলো আন্দোলন করছিল কেন? বলছি বাবা বলছি। আপনি দেখছি কিছুই খোঁজ খবর রাখেন না। স্টেম সেল টেকনোলজির জন্য নাকি ‘আমবিলিকাল কর্ড ব্লাড’; মানে মাতৃজঠর আর শিশুর নাভির সঙ্গে যুক্ত নাড়ির রক্তের প্রয়োজন হয়। তা নিয়ে প্রচুর দু’নম্বরি ব্যবসা চলছিল, আর মায়ের পেটের শিশুও মারা পড়ছিল। তাই ওরা আন্দোলন করছিল। ওই আন্দোলনকারী দলগুলোকে কাজে লাগিয়ে এরা ক্ষমতায় এল। এসেই স্টেম-সেল-টেকনোলজি ব্যান করে দিল। ফলে লিম্ব সাপ্লাইয়ের ব্যবসা আবার রমরমা। তাই বি-টু সরকারকে ধন্যবাদ জানাল।
সে যাই হোক্, মিঃ বি-টু’র ক্যালকুলেশন ফলো করলেন! দিস ইজ কল্ড্ পারফেক্ট বিজনেসম্যান। ওর এই বিজনেস ব্রেনের জন্যই ওঁকে হ্যাট্স্ অফ করতে হয়।
আরে! পিঁক-পিঁক একটা শব্দ হচ্ছে কোত্থেকে? ওহ্! মিঃ বি-টুয়ের রিস্টে বেঁধে রাখা ই-এন-পি মিটার থেকে শব্দটা বেরোচ্ছে। নিশ্চয় এনার্জি লেভেল ফল করেছে কিংবা ব্লাড প্রেসার লেভেল কম-বেশি হয়েছে। তাই ওই এলার্মিং! ‘এনার্জি অ্যান্ড প্রেসার মিটার’ দারুণ হেল্পফুল জানেন। ওই যে বি-টু পকেট থেকে এনার্জি-ট্যাবলেটের পাউচ বের করলেন। তার মানে এনার্জি লেভেল ডাউন হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে হাউস সার্জেনের সঙ্গে একটু উত্তেজিত কথাবার্তা বললেন তো! তাছাড়া হার্টের অর্ডারটা পেয়ে, লাভের কথা ভেবে মনে এক আলাদা উত্তেজনা। এসব কারণে এনার্জি লেভেল ফল করেছে। উত্তেজিত হ’লে বেশি এনার্জি ব্যয় হয়ে যায় তো!
ওই দেখুন, মিঃ বি-টু পাউচ থেকে এনার্জি ট্যাবলেট বের করে মুখে পুরলেন। চিউয়েবল ট্যাবলেট, চুষে চুষে ট্যাবলেট শেষ হবে। লস্ট এনার্জিটাও রিকভারি হবে। জানেন— মিঃ বি-টু প্রথম ব্যবসা শুরু করেছিলেন ওই এনার্জি ট্যাবলেটের ডিস্ট্রিবিউটরসিপ নিয়ে। তখন আর এমন কোম্পানি নেই; যারা এনার্জি-ট্যাবলেট তৈরি করে। একচেটিয়া ব্যবসা। হঠাৎ বিদেশের এক কোম্পানি তাদের এনার্জি ট্যাবলেট লঞ্চ করল মার্কেটে। প্রচুর প্রচার আর বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করল সেই কোম্পানি। কোনও মিডিয়া বাদ রাখেনি। শুধু বিজ্ঞাপন দিয়েই ক্ষান্ত হল না; তারা অন্য স্ট্র্যাটেজি নিল। প্রচার শুরু করল, দেশি কোম্পানির ট্যাবলেটে ক্ষতিকারক ন্যান্ডে্রালন নামের উত্তেজক পদার্থ আছে।
কোয়ালিটি কন্টে্রাল ডিপার্টমেন্টকে তলায় তলায় টাকা খাইয়ে সে রকম একটা রিপোর্টও বের করে দিল বিভিন্ন মিডিয়াতে। ব্যাস্! দেশি এনার্জি-ট্যাবলেট কোম্পানিটার দফারফা। মিঃ বি-টুর প্রথম ব্যবসা ঝুল হয়ে গেল। ওর বাবার ছিল নার্সিংহোম। এটাই। শুনেছি, বাবা বলেছিলেন, ‘কী আর করবে, নার্সিংহোমটাই চালাও।’
লঝ্ঝড়ে নার্সিংহোমটাকে কী করে মডার্ন করা যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ নজরে পড়ল একটা জবর খবর— ক্লোনিং-ইস্যু পাশ। ক্লোনিং এখন আইনসিদ্ধ। সাধারণ মানুষ ইচ্ছে করলে নিজের ক্লোন করে সন্তান নিতে পারবে। তবে, তার জন্য কোর্ট থেকে পারমিশন নিতে হবে। গেজেটেড অফিসারের দেওয়া গুড ক্যারাক্টার সার্টিফিকেট প্রোডিউস করতে হবে এবং ভবিষ্যতে বিয়ে করব না—এই মর্মে এফিডেভিট দিতে হবে।
খবরটা জানামাত্র মিঃ বি-টু’র মাথায় খেলে গেল বিজনেসের কথা। একটা ক্লোনিং সেন্টার খুললে রমরম করে চলবে। পাবলিক এখন ক্লোনিং-এ ঝুঁকবে। কারণ গত শতাব্দী থেকে কন্যা-ভ্রূণ হত্যার একটা ট্রেন্ড চলছিল ব্যাপকভাবে। তাতে দেশে নারী সংখ্যা দারুণ রকম কমে গেছে। ফলে সব পুরুষ লিভ টুগেদার করার জন্য মেয়ে পাচ্ছে না। অথচ সরকারি আইন অনুযায়ী, একটা পুরুষ-সন্তান থাকতেই হবে, তা না হলে ধন-সম্পত্তির উত্তরাধিকারী থাকবে না। বংশধর না থাকলে তার সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করবে। অন্য কোনও আত্মীয় সে সম্পত্তি ভোগদখল করতে পারবে না। সুতরাং ক্লোনিং-বেবি জিন্দাবাদ।
মিঃ বি-টু নার্সিংহোমটাকে বানিয়ে ফেললেন ‘অ্যাডাম ক্লোনিং সেন্টার’। বছর কুড়ি রমরমিয়ে চলল মেল ক্লোন-বেবি তৈরি করার ব্যবসা। কিন্তু কপাল এমন খারাপ; সরকারের গদি ওল্টাল। তখন ওমেগা ক্যাপিটালিস্ট কাউন্সিল সরকারে এসেই ক্লোন বেবি নিষিদ্ধ করল। আইন পাশ হয়ে গেল— ক্লোন-বেবি নেওয়া বা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ক্লোনিং বিজনেস বন্ধ হতেই বি-টু খুললেন এই লিম্ব্ সাপ্লাইয়ের বিজনেস। এছাড়া আরও বিজনেস আছে ওর। ক্লট-ব্লাড সাপ্লাই এবং মেডিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট সাপ্লাইয়ের।
ক্লোন-বেবি নিষিদ্ধ করল কেন? একথা ভাবছেন তো! সে অনেক কারণ। পরে বলছি। তার আগে দেখা যাক মিঃ বি-টু এখন কী করছেন? বলবেন, বলবেন, ওর সঙ্গে কথা বলবেন, এত ব্যস্ত কেন? বি-টু কী করছেন দেখুন আগে। এতক্ষণে নিশ্চয় ইস্ট জোন ফার্মহাউসে খবর পাঠিয়ে দিয়েছেন সেই পনের বছরের বাচ্চাটাকে এই ও.টি.-কাম-রিটেল কাউন্টারে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য।
তিন
আরিব্বাস! মিঃ বি-টু কম্পিউটারে গেম খেলছেন দেখছি। তার মানে মনে দারুণ স্ফূর্তি। হওয়াটাই স্বাভাবিক। একটা ভাল প্রফিট করতে চলেছেন। মনিটরে দেখা যাচ্ছে একটা নগ্ন মানুষ। মাউস আর আঙুলের যোগসাজসে মানুষটার হাত, পা, মাথা একে একে খসে পড়ছে। বুকের মধ্যে খয়েরি রংয়ের হৃদপিণ্ডটা তুড়ূক তুড়ূক করে নড়ছে। একে একে বুকের পাঁজর সরিয়ে সন্তর্পণে হৃদপিণ্ডটা অক্ষত অবস্থায় বের করে আনতে পারলেই ভিকট্রি। মিঃ বি-টু নেভিগেশন- কি টিপে কয়েকখানা বুকের পাঁজর সরিয়ে ফেলেছেন। পেছনে কশেরুকা দেখা যাচ্ছে। তার ওপরে হৃদপিণ্ডটা বাড়ছে-কমছে। আর কয়েকটা পাঁজর সরালেই কাম তামাম, খেল খতম।
কী, এই সুযোগে ওঁর সঙ্গে কথাটা সেরে নিতে চাইছেন! চলুন, আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।
একি! হঠাৎ কম্পিউটারে বিপ-বিপ শব্দ শুরু হল কেন? ভিডিও গেমের ডিউরেশন-অ্যালার্মিং নাকি? নাহ্! ওটা ই-মেল আসার সিগন্যাল। ওই দেখুন, খেলাটাকে ফ্রিজ মোডে রেখে ই-মেল মেসেজ ডিসপ্লে করেছেন মিঃ বি-টু। কী মেসেজ এল দেখা যাক।
এ-কী! ইস্ট জোন ফার্মহাউসের ম্যানেজার জানিয়েছে— ফার্ম হাউসে ও-পজেটিভ ব্লাড গ্রুপের কোনও পনের বছরের চাইল্ড নেই। বি-টোয়েন্টির ব্লাড গ্রুপ এ, আর এইচ পজেটিভ।
অথচ তখন ফার্মহাউসের স্টক ডিসপ্লেতে বি-টোয়েন্টির বায়োডাটাতে দেখা গিয়েছিল ব্লাড গ্রুপ ও। ব্যাপারটা কী হল!
ওই যে, একই প্রশ্ন ফুটে উঠেছে বি-টু’র ভ্রূতে। ওঁর মুখ চোখে অস্থিরতা। অস্থিরতা নাকি রাগ! কী বিভৎস হয়ে উঠেছে মুখটা। একটা রাগী গরিলা মনে হচ্ছে এখন। মেসেজটা ডিলিট করে দিলেন মাউস টিপে। স্ক্রিনে এখন নগ্নমানুষের হৃদপিণ্ডটা থ্রবিং হচ্ছে। মাউসে আঙুলের চাপ দিতেই হৃদপিণ্ডটা তছনছ হয়ে গেল। পর্দায় ফুটে উঠল— ট্রাই এগেইন।
ওই দেখুন, বি-টু মোবাইলে কারুকে ধরতে চাইছেন। ম্যানেজারকে নাকি ডাক্তারকে! বি-টোয়েন্টির বায়োডাটাতে মিস্টেকন্টার ব্যাপারে কোয়্যারি করতে চান নিশ্চয়! হ্যাঁ, ফোনে পেয়েছেন কাউকে।
... শুনুন ম্যানেজার! বি-টোয়েন্টির বায়োডাটাতে দেখাচ্ছে ব্লাড-গ্রুপ-ও। অথচ আপনি জানাচ্ছেন ব্লাড গ্রুপ-এ। বি-টোয়েন্টির ব্লাড গ্রুপ টেস্ট করে আমাকে ইমিডিয়েট জানান। আমার কাস্টমারকে এমার্জেন্সি-মাল সাপ্লাই দিতে হবে। কী পেয়েছেন আপনারা! আমার কাছে বায়োডাটাতে একরকম, ওখানে একরকম! আপনারা কি ব্যবসাটা ডকে তুলতে চান! যত্তসব ওয়ার্থলেস্!
দেখলেন, বি-টু ফোনের লাইনটা কাটলেন বুড়ো আঙুলের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে। ভেতরের রাগের বহিঃপ্রকাশ আর কি! চলুন, এই মুহূর্তে ওঁর মনের প্যাভেলিয়নে একটু পাক খাওয়া যাক।
... ব্যাটা সবগুলো রাসকেল। স্যাক্ করে দেব। খতিয়ে দেখব কার ফল্ট; ডিটেক্ট করতে পারলেই স্যাক করব। স্যালারির সময় মোটা অ্যামাউন্ট পাওয়ার জন্য কম্পিউটার খুলে ওয়ার্কিং-আওয়ার্স, ও.টি. কাউন্ট করতে বসে যায় সব। তখন কত অ্যাটেন্শন্! আর বায়োডাটা লজ করার সময় ...!
এদিকে ডাঃ এস ফিফটিকে অ্যাস্যুওর করলাম দু’ঘন্টার মধ্যে হার্ট ডেলিভারি দেব। হোয়াট আ প্রবলেম! চিন্তায় এখন আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। দেখি কী করে প্রবলেম সল্ভ হয়।
ও! এনার্জি-ট্যাবলেটটা খাওয়ার পর জল খাওয়া হয়নি। গলা তো শুকবেই। গস্! জলের ফ্লাস্ক্টা গাড়িতেই রয়ে গেছে। ওটা আনাতে হবে তারপর জল খাওয়া যাবে।
মিঃ বি-টু কলিং-বেল এর সুইচ টিপলেন। নিশ্চয় জলের বোতলটা গাড়ি থেকে নিয়ে আসার জন্য আর্দালিকে কল করলেন।
বুঝতে পারছি, মনে প্রশ্ন জাগছে সামান্য জল খাওয়ার জন্য গাড়ি থেকে ফ্লাস্ক্ আনানোর কী দরকার! এত বড় একটা কনসার্ন। ভেতরে কি জলের ব্যবস্থা নেই?
না নেই। এখানে পানীয় জলের কোনও ব্যবস্থা নেই। আগে ছিল। কিন্তু কিছুদিন হল মিঃ বি-টু জলের ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছেন। জল রাখলে দারুণ অপব্যয় হয়। স্টাফেরা লুকিয়ে খালি বোতলে জল ভরে বাড়িতে নিয়ে যায়। জলের যা দাম হয়েছে। মাটির নীচে তেল শেষ হল; তার কিছুদিন পর জলও শেষ হল। ওপরের লেয়ারে কিছু জল আছে। কিন্তু সে তো বিশ্বযুদ্ধের পর বিষাক্ত হয়ে গেছে। রাসায়নিক বোমা, পরমাণু বোমা, এছাড়া সাধারণ বারুদের বোমা, গোলাগুলি। পৃথিবীর ওপর দিয়ে ধকল কি কম গেল! এখন তো খাদ্য বলতে ফুডকেক আর খাওয়ার জল মানেই পিউরিফায়েড ওয়াটার। প্রচুর দাম। হবে না কেন? জল দূষণমুক্ত করার খরচ কি কম! দেশের গরীবগুর্বোরা তো অরিজিনাল পিউরিফায়েড ওয়াটার কিনতেই পারে না। ওরা চালু জল মানে বাংলা কোম্পানির সস্তার জল খায়। ফলে রোগবালাইও বাড়ছে। আর তাতে নার্সিংহোম আর এই বি-টুদের প্ল্যাটিনামের রিংয়ে হিরে বসছে।
ওই যে দুলে দুলে ঢুকছে পি-নাইন। মিঃ বি-টুর স্পেশাল আর্দালি। ওটা আগে ছিল ওয়েস্ট জোন ফার্ম হাউসে। ওর সার্ভিস খুব ভাল। তাই গত মাসে একটা নতুন যন্ত্রমানুষ কেনা হলে, নতুনটা ফার্ম হাউসে রেখে এটাকে এখানে আনা হয়েছে। শুনুন, পি-নাইনের যান্ত্রিক গলাতেও কত বিনয়— বলুন স্যার! আপনার জন্য কী করতে পারি!
ঠিক যেন মানুষের কণ্ঠস্বর! আবেগ-মেশানো আছে। কী অদ্ভূত না! মানুষের মধ্যে থেকে আবেগ, ভালবাসা, মমতা কবেই বিদায় নিয়েছে; কিন্তু মানুষের তৈরি যন্ত্রমানুষের মধ্যে মানুষ আবেগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। হয়তো আর কিছুদিন পর এই রোবট-প্রোবটগুলো প্রেমও করবে; আর মানুষ তা দেখে বালখিল্য মজা উপভোগ করবে— এসব ভাবছেন তাইতো?
দেখুন-দেখুন, গাড়ি থেকে জলের ফ্লাস্ক আনার নির্দেশ পেয়ে কেমন গটগটিয়ে যাচ্ছে মিস্টার পি-নাইন। ও খুবই ডিউটিফুল। শুধু ও কেন? যতগুলো যন্ত্রমানব আছে মিঃ বি-টুর কনসার্নে, সবগুলোই খুব কাজের। তাই মিঃ বি-টুর ফার্ম-হাউসের সুপারভিশন সুন্দরভাবে চলছে। শুধু অফিস স্টাফ; মানে ম্যানেজার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট্, ক্লার্ক এগুলোতে লোক রাখা হয়েছে। আর সেখানেই যত গণ্ডগোল। দেখলেন না, বি-টোয়েন্টি কোড নম্বরের কিডিটার বায়োডাটাতে গন্ডগোল।
কী বলছেন? অনেক বেকার মানুষ আছে, তাছাড়া প্রোবট কেনার অনেক খরচ, তবুও কেন ফার্ম-হাউসে প্রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে?
আরে মশাই! ব্যাপারটা বোঝার আছে। এটা ঠিকই যে, যন্ত্রমানুষ কিনতে এককালীন অনেক টাকা লাগে। কিন্তু একবার কিনে ফেলতে পারলে, তাকে তো আর মাস মাইনে, অন্যান্য অ্যালাউয়েন্স কিংবা ওভারটাইম দিতে হয় না। প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি এসবেরও বালাই নেই। শুধু যা একটু মেন্টেন্যান্স খরচ। সবচেয়ে বড় কথা, ওদের ইউনিয়নবাজির ঝামেলা নেই। এছাড়া ফার্ম হাউসে প্রোবট কর্মী রাখার অন্য ভাইটাল কারণ আছে। ফার্ম-হাউসে পাঁচ থেকে কুড়ি বছরের ছেলেমেয়ে আছে অনেক। কোনও মানুষকর্মী ওদের দেখাশোনা করলে, ওরা মানুষের কিছু বাজে আচার-ব্যবহার শিখে যেতে পারে। ওদেরকে কু-পরামর্শ দিয়ে বাজে চিন্তাভাবনাও ওদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারে। ওই কিডিগুলো যদি জেনে যায় ওদের পরিণাম কী; তাহলে কেউ সুইসাইডও করে ফেলতে পারে। সুইসাইড করা মানেই আট-দশ লাখ টাকা লস্। সেই সঙ্গে পুলিশি ঝামেলা। কোর্ট-পার্মিশন্ ছাড়া সুইসাইড করা নিষেধ।
এ-তো গেল বাচ্চাদের ব্যাপার। বুড়োবুড়িদের ক্ষেত্রে মানুষ তো আরও ডেঞ্জারাস! তাই একদম আলাদা ফ্লোরে ঘেরাটোপের মধ্যে বুড়ো-বুড়িগুলোকে রাখা হয়েছে। ওদের কারুর মধ্যে প্রেম-ভালবাসা, মায়া-মমতা এসবের ভাইরাস থাকলেও থেকে যেতে পারে। কোনও মানুষ-কর্মী ওদের পরিচর্যা করতে গিয়ে সংক্রামিত হতে পারে। তখন সেই লাভেরিয়া বা বিনিগ্ন্যান্সিয়া রোগগ্রস্ত কর্মী টিনএজারদের ফ্লোর-এ ঢুকে কী কাণ্ডটা ঘটাবে বুঝতে পারছেন! এ সব কারণে অনেক দামী হলেও প্রোবটই ব্যবহার করছে বেশির ভাগ ফার্ম।
নন্-গভর্নমেন্ট কনসার্নগুলোতে রোবট-প্রোবট ছেয়ে গেছে। প্রোবট বা রোবট দিয়ে কাজ করানোর সুবিধা হ’ল ওরা কাজে ভুল করে না মোটেই। এই যে, বি-টোয়েন্টি’র ব্লাড-গ্রুপের মিসটেক্ন্; দু’জায়গায় দু’রকম এিKC হয়ে আছে। রোবটে কাজটা করলে, মোটেই এ ভুল হত না। আর মিঃ বি-টু কেও এখন এমন প্রবলেমে পড়তে হত না।
দেখা যাক মিঃ বি-টু’র প্রবলেম সলভ্ড হ’ল কি না! ফার্ম-হাউস থেকে বি-টোয়েন্টির সঠিক ব্লাড-গ্রুপ জানা গেল কি না!
উরিব্বাস! মিস্টারের মুখখানা তো ভোডুরামের পেটফোলা বোতলের মতো হয়ে রয়েছে। রেগে ফায়ার হয়ে আছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। এক-কোটি টাকা ফসকে যাওয়ার সম্ভাবনা, এদিকে এনার্জি-ট্যাবলেট খেয়ে গলা শুকিয়ে মাটন-চিপস্ হয়ে আছে। দেখেছেন, তবুও সাহেবের কাজ কিন্তু থেমে নেই। মোবাইলে বোতাম টিপে কাকে ধরার চেষ্টা করছেন কে জানে! ডাঃ এস ফিফটিকে নিশ্চয় নয়। প্রবলেমের কথা তাকে জানালে তো মুশকিল। সে অন্য সাপ্লায়ার্সের কাছে মাল চাইবে। পেয়েও যাবে। এখন কম্পিটিটিভ মার্কেট। মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো কাউন্টার খুলেছে। ওদের হ্যাভক স্টক। ইউনিভার্স ট্রেড অর্গানাইজেশন-য়ের জেনেরোসিটিতে সস্তা দামে প্রচুর জমি কিনে বিশাল ফার্ম-হাউস বানিয়েছে ওরা। আর অলিগলিতে কাউন্টার বানিয়েছে।
আচ্ছা! আন্দাজ করুন দেখি, মিঃ বি-টু এখন ফোনে কাকে ধরার চেষ্টা করছেন? ফার্ম-হাউসের ম্যানেজারকে? নো-নো, নট দ্যাট্। সো ফার মাই নলেজ ইজ কনসার্ন— উনি কোনও অনাথ-আশ্রম কিংবা অ্যাসাইলামের ম্যানেজারকে ফোনে ধরার চেষ্টা করছেন। যদি বি-টোয়েন্টি রিজেক্ট হয়; তাহলে সাবস্টিটিউট ব্যবস্থা রাখতে হবে তো! ওয়ান ক্রোড়, নট এ ম্যাটার অফ ইগনোর! আরে! আবার বাচ্চা কেঁদে উঠল যে! নিশ্চয় কিডিটার ব্লাড-গ্রুপ কনফার্ম করার মেসেজ।
... ইয়েস! বলুন।
... ... ...
গস! এ—পজেটিভ? কনফার্ম?
... ... ...
দেন হোয়াট হ্যাভ টু ডু নাও?
... ... ...
হ্যাঁ, আমিও সেটা ভেবেছি। ফোনে চেষ্টা করছি। বাট আই থিঙ্ক হু ইজ্ রেসপন্সিব্ল্ অফ্ দিস ইনট্রিকেট সিচ্যুয়েশন? কে এভাবে ডেটার গণ্ডগোল করল?
... ... ...
মে-বী— মে-বী। এখানকার ক্লার্কও হতে পারে। ও-কে। আই উইল টীচ হিম।
ইস্ট জোন ফার্ম হাউসের ম্যানেজারের ফোন। জানাল, পনের বছরের সেই বাচ্চাটার ব্লাড গ্রুপ এ-পজেটিভ। এদিকে হার্টের অর্ডার তো ও-পজেটিভ গ্রুপের। দু’ঘন্টার মধ্যে ডেলিভারি দেবেন বলেছেন ডাঃ এস-ফিফটিকে। প্রবলেমটা বুঝুন। দেখুন চিন্তায় ওর কপালে কেমন ভাঁজ পড়েছে। অথচ কিছুক্ষণ আগেই মিঃ বি-টু আনন্দে গেম খেলতে শুরু করেছিলেন। দিস্ ইজ কল্ড্ বি-বি; মানে বিজনেস-ব্লুমার। এই ব্লুমার সামাল দিয়ে মাল ঠিকমতো ডেলিভারি দিতে পারলেই মালামাল— লালে লাল। আর না পারলেই বেসামাল।
দেখুন ওঁর মুখটা এখন ভোডুরামের পেটফোলা বোতল থেকে বদ্লে প্রীটিজিনের সিড়িঙ্গে কনটেনার হয়ে গেছে। মনের মাঝে নিশ্চয় রাগ-দুঃখ-আফশোশের ককটেল। চলুন, ওর মনের কিনারায় একটু ঘুরে আসা যাক।
... যত্তসব ইনভেটেরেট বাংলার, ওয়ার্থলেস ক্রীচার। একটা ডেটা পারফেক্টলি কম্পিউটারে ফাইল করার কম্পিটেন্সি নেই! কিক্ আউট করব। কার ফলট্ জানতে পারলে স্টে্রট কিক্ আউট করব। এখন যে কী করি! মার্স অরফ্যানেজ-এর লাইনটাও পাচ্ছি না ছাই! ওদের কাছে না পেলে ভ্যাগাবন্ড অ্যাসাইলামে ট্রাই করতে হবে। দেখি একবার শেষ চেষ্টা করে। এর চেয়ে ক্লোনিংয়ের বিজনেসটাই বোধহয় বেটার ছিল!
দেখলেন, মাই অ্যাজামসন ইজ অ্যাবসল্যুটলি কারেক্ট্! এতক্ষণ উনি অনাথ আশ্রমেই ফোন করছিলেন। লাইন পাননি। আবার চেষ্টা করছেন। সত্যিই এমার্জেন্সি লিম্ব সাপ্লাইয়ের ব্যবসাতে হ্যাপা অনেক। ক্লোনিংয়ের ব্যবসায় এত ঝঞ্ঝাট ছিল না । কিন্তু নতুন সরকার এসে আইন করে ...! ও! তখন তো বলা-ই হল না ক্লোনিং-বেবি বন্ধ করা হল কেন? আসলে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ত্রিশটা বছরে দেশে প্রচুর ক্লোন-ম্যান হওয়ায় প্রশাসন ও সমাজব্যবস্থার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছিল। কোনও একজন ক্লোনম্যান কিছু অপরাধ করল। তার বিরুদ্ধে থানায় এফ.আই.আর. করা হ’ল। পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করতে এল। এসে হয়তো উইট্নেসের কথামতো একজনকে লক্-আপে পুরল। কিন্তু সে আসল কালপ্রিট নয়। ফ্ল-লেস অ্যালিবাই দেখিয়ে সে মুক্তি পেয়ে গেল। আর আসল অপরাধী ওরই মতন দেখতে, ওর ক্লোনিং ব্রাদার ততক্ষণে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ব্যাপারটা বুঝলেন। আমাদের এনক্লেভ-এর একটা ঘটনা বলি আপনাকে; তাহলে ক্লোনিং ব্রাদারের প্রবলেমটা বুঝতে পারবেন।
ওরা দুজনেই ক্লোনিংব্রাদার। বছর খানেকের তফাৎ বয়সের। বড়টা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। ভাল রোজগার। ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দেখে অনেক তদ্বির ও চেষ্টা চরিত্তির করে, লাখ পঞ্চাশেক টাকা খরচ করে, দশ বছরের এগ্রিমেন্ট-এ লিভ-টুগেদার করার জন্য একটা সুইট গার্ল নিয়ে এল ঘরে।
কী বলছেন? লিভ-টুগেদার এর এগ্রিমেন্টের ব্যাপারটা ঠিক বুঝলেন না? এবার সত্যিই আপনাকে মঙ্গলগ্রহের মানুষ বলতে ইচ্ছে করছে। বিদেশে ছিলেন বললেন, কোন্ দেশে ছিলেন কে জানে! এ দেশের কোনও খোঁজ-খবরই রাখেন না। ঠিক আছে, পরে বোঝাচ্ছি ও ব্যাপারটা। এখন ক্লোনিং ব্রাদার থাকার প্রবলেমটা বুঝুন। তো হয়েছে কী— যে লিভ টুগেদার করার জন্য অত টাকা খরচ করে একটা মেয়ে জোগাড় করল; তার ক্লোনিং-ব্রাদার তেমন আয়-উপার্জন করে না। বেড- পার্টনার জোগাড় করার টাকা নেই। কিন্তু শরীরের খিদে তো আছে। সে তার দাদার অ্যাবসেন্সে ... হুঁ-হুঁ, বুঝতেই তো পারছেন। দু’জনে একই রকম দেখতে, একই আচার-আচরণ। মেয়েটা তো ধরতে পারে না। একদিন হ’ল কি ওর প্রক্সি দেওয়া ধরা পড়ে গেল দাদার কাছে। দাদা তো ভাইয়ের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে বসল পঁচিশ লাখ টাকা। সে পাবে কোথায়। তাই এখন সে জেলে।
এরকম ঘটনা তো এখন ফ্রিকোয়েন্ট্লি ঘটছে। ক্লোনিংয়ের জন্য ব্যাভিচার দারুণভাবে বেড়ে গেছে সমাজে। তবুও এসব হল ছোটখাট সমস্যা। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সরকার ও প্রশাসনের। সন্ত্রাসবাদী ও উগ্রপন্থীরা বিদেশী মদতে প্রচুর ক্লোন-বেবী তৈরি করা শুরু করল। তাদেরকে ট্রেনিং দিয়ে সন্ত্রাসবাদী তৈরি করল। একই রকম দেখতে অসংখ্য সন্ত্রাসবাদী দেশজুড়ে। তাদেরকে সামাল দিতে স্বরাষ্ট্র দপ্তর তো হিমশিম! যদিও ক্লোন করার আগে, নিয়ম হ’ল, গেজেটেড অফিসারের থেকে নেওয়া গুড-ক্যারাকটার সার্টিফিকেট প্রোডিউস করা। সন্ত্রাসবাদীরা সব ফল্স্ সার্টিফিকেট জমা দিয়ে ক্লোন করাচ্ছে। গোয়েন্দা বিভাগ সন্ত্রাস-দমন বিভাগ, একদম ফেড্ আপ্ হয়ে গেল। তাই বাধ্য হয়ে ক্লোনিং বেবী করা বা করানো আইনত দণ্ডনীয় ঘোষণা করল। মিঃ বি-টুর মতো যারা ক্লোনিংয়ের বিজনেস করছিল, তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল। এই বিজনেসের সঙ্গে যুক্ত অনেকে বেকার হয়ে গেল।
মিঃ বি-টু নতুন ব্যবসা শুরু করলেও সকলে তো আর তা পারেনি। ওঁর বিজনেস-ব্রেনটাই এ’ট্রা-অর্ডিনারি। দেখুন না, নিজের ফার্মে পারফেক্ট-কিডি না মিললেও হার্ট সাপ্লাই উনি ঠিক সময়েই দেবেন। ওই দেখুন, লাইন পেয়ে গেছেন কোনও অনাথ আশ্রম কিংবা মানসিক সংশোধনাগারের। ম্যানেজারের সঙ্গে মোটা-অ্যামাউন্টের ডিল হয়ে যাবে। ও-পজেটিভ ব্লাড গ্রুপের পনের বছরের মেল-বেবীও এসে যাবে। ওয়েট অ্যান্ড সী।
চার
পি-নাইন কাচের সুইং-ডোর ঠেলে দুলে দুলে ঢুকছে। ওর ধাতব হাতে একটা মোটা চোঙাকৃতি জিনিস। সেটা কালো ক্যাম্বিস কাপড় দিয়ে মোড়া।
ভাবছেন— কী ব্যাপার? ও তো জলের ফ্লাস্ক্ আনতে গেল গাড়ি থেকে! ওটা কী?
হুঁ-হুঁ! এটাই তো ব্যবসায়িক বুদ্ধি। মিঃ বি-টু বলেন— জল যাতে গরম না হয়ে যায় তার জন্য কালো ক্যাম্বিস কাপড়ের অতিরিক্ত সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে জলভর্তি ফ্লাস্কটাকে। কিন্তু থার্মোস্ ফ্লাস্ক এমনিতেই হিট-প্রোটেকটিভ। ওটা বাহানা মাত্র। আসল ব্যাপারটা হল, ভেতরে যে জলের ফ্লাস্ক্ আছে তা কারুকে বুঝতে না দেওয়া। উনি বাড়ি থেকে দু’লিটার জল নিয়ে বেরোন। পুরো দিনটা ওই দু’লিটার জলে চালাবেন। অন্য কাউকে খাইয়ে পরিমাণ কমিয়ে ফেলতে রাজি নন উনি। দেখুন না কতটা জল উনি খান।
ওই দেখুন, মাত্র দু’আউন্স জল খেলেন ফ্লাস্কের গায়ে আঁকা স্কেলের মাপ দেখে। ফ্লাস্কটা আড়ালে রেখে, পি-নাইনকে ইশারায় বলেন বাইরে চলে যেতে।
শুনুন! এই পি-নাইনের একটা মজার ঘটনা বলি। মজার ঘটনা ঠিক নয়; আশ্চর্যজনক ঘটনা বলা যেতে পারে। পি-নাইন আগে ছিল ওয়েস্ট জোন ফার্ম-হাউসে। ওখানে ও ছাড়া আরও আটখানা প্রোবট আছে। তার মধ্যে ছ’খানা মেল-প্রোবট আর দু’খানা ফিমেল প্রোবট।
প্রোবট তো মেশিন! তার আবার মেল-ফিমেল কী! এটাই ভাবছেন তো! আছে, ওদের মধ্যেও মেল-ফিমেল আছে। ভেতরের যন্ত্রপাতি, সফট্ওয়্যার সব একই। কিন্তু বাইরের খোলসটার রকমফের। যে যন্ত্রমানবগুলো রিসেপ্শনিস্ট, ডিমন্স্টে্রশনিস্ট কিংবা অ্যাড্ভার্টাইজিং অ্যানাউন্স্মেন্টের কাজ করে; সেগুলোর বডি মেয়েদের করা হয়। ভলাপচুয়াস্ এণ্ড সে’ি ফিগার। যাতে পুরুষ কাস্টমারদের চোখ টানে। হাসছেন যে! আরে বাবা! রক্তমাংসর না হোক্ তবুও রক্ত চনমনে হয় সেটা কি অস্বীকার করতে পারেন। তা না হলে পলি-ডল সেন্টারগুলোর এত রমরমা কী করে হল! ওরা তো আর রক্ত-মাংসের নারী নয়; তবুও দেখুন আগেকার যুগের ব্রথেলের রমরমার মতো ওই সেন্টারগুলোতে কেমন ভিড়। শরীর উত্তপ্ত করছে। আবার উত্তাপ নেভাচ্ছেও।
তো মিঃ বি-টুর ওয়েস্ট জোন ফার্ম হাউসে দুটো ফিমেল প্রোবট ছিল। ছিলই বা বলছি কেন? এখনও আছে। ও দুটো টিনএজার মেল ফ্লোরের লুক-আফটার করে! টিন-এজার ছেলেগুলোর মনকে একটু চনমনে রাখার জন্য মিঃ বি-টু এই ব্যবস্থা করেছেন আর কি! ওই ফার্ম-হাউস থেকে পি-নাইনকে এখানে নিয়ে আসা হল। একদম ও-কে অ্যান্ড এফিসিয়েন্ট রোবট। কিন্তু এখানে আনার পর ওটা বিগড়লো। ঠিক মতো কাজ করছে না। কম্যান্ড ভায়োলেট করছে। রেস্পন্স কম। বুকের সবুজ আলোটা জ্বলছে না। শুধু মাথার লাল আলো জ্বলছে। ঘাড় সামনে ঝুঁকিয়ে অনড় পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকছে। মেকানিক্যাল ফল্ট হয়েছে নিশ্চয়— এই ভেবে মেকানিক ডাকা হল। মেকানিক সমস্ত খুলে-খেলে কোনও ত্রুটি ধরতে পারল না। বলল— দেয়ারস্ নো ফলট্। ইটস্ কোয়াইট ওকে। বাট ...!
মেকানিক ‘বাট’ বলে থেমে যেতে, বি-টু জিগ্যেস করলেন— বাট কী? থামলেন কেন? বলুন! এনি আদার প্রবলেম?
না-না, মেকানিক্যাল প্রবলেম কিছু নয়। দেয়ার আর সাম হিউম্যানেটেরিয়ান সিম্পটম্। ইটস্ অ্যাবসলিউটলি অ্যাবসার্ড বাট ...! এনিওয়ে ... দেখুন, আমার যা করার করেছি; এবার ওটা অ্যাক্টিভ হয় কিনা।
মেকানিক চলে যাওয়ার পরেও দু’একঘন্টা ইন্যাক্টিভ ছিল পি-নাইন। তারপর হঠাৎ একসময় ওর বুকের সবুজ আলোটা জ্বলে উঠল। ঘাড় সোজা হল। তখন শো-রুমে কয়েকজন সুন্দরী কাস্টমার এসেছিল ব্লু-আই-লেন্স, শার্প নোজ্, হিপ-প্যাচ এসব কিনতে। তারপর থেকে আর অবশ্য বিগড়োয়নি পি-নাইন। ওকে মিঃ বি-টু নিজের স্পেশাল আর্দালি করে দেওয়ায়; যতক্ষণ মিঃ বি-টু ভেতরে থাকেন; ততক্ষণ পি-নাইন বাইরে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। আর একটা অদ্ভূত ব্যাপার, ল্যাবরেটরিতে একটা প্রোবট আছে। সে সুযোগ পেলেই, এই পি-নাইনের পাশে এসে দাঁড়ায়। তবে বি-টু কখনও বাইরে বেরোলেই সেটা গুটিগুটি এগোতে থাকে ল্যাবের দিকে। কেমন মানুষ-মানুষ আচরণ, তাই না! ক্যাশরুমেও দু’টো মেয়ে-রোবট ডিউটি করে। কিন্তু ওরা সহজে বেরোতে পারে না। ক্যাশরুম বাইরে থেকে লক করা থাকে তো!
আরিব্বাস! মিঃ বি-টু দেখছি ফোনে হেসে হেসে কথা বলছেন কারও সঙ্গে। শোনা যাক্ কী এত কথা, কিসের এত স্ফুূর্তি!
... না-না আপনাকে কোনও রিস্ক নিতে হবে না। যা রিস্ক সব আমার। আপনি এই মুহূর্তে ওটাকে একটা ট্রাঙ্কুলাইজার ইঞ্জেকশন পুশ করুন। তার একটু পরেই আশ্রমে প্রচার করে দিন—বাচ্চাটা খুব অসুস্থ। ইমিডিয়েট হসপিটালাইজড্ করা দরকার। অ্যামবুল্যান্স ডাকতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন করুন। আমার অ্যামবুল্যান্স পৌঁছে যাবে অনাথ আশ্রমের গেটের সামনে। আমার লোকের হাত থেকে পনের লাখের প্যাকেটটা আপনি অন্যের চোখ বাঁচিয়ে সাবধানে কালেক্ট করে নেবেন। অ্যাকাউন্টে তো নিতে পারবেন না। তারপর যা করার আমি করব। ও-কে! ছাড়ি তাহলে!
বুঝলেন কেসটা! ও-পজেটিভ গ্রুপের পনের বছরের বাচ্চার ট্রেস পাওয়া গেছে। এবার শুধু কালেক্ট করার অপেক্ষা। ওঁর নাম মিঃ কে বি-টু। আমি কী বলি জানেন— মিঃ কে-বি-টি। কিং অফ বিজনেস-টাইকুন। দেখুন ফোনের সুইচ অফ্ করার পর ওঁর ঠোঁটের কোণের হাসিটা। এ হাসি কিং-য়ের মুখেই মানায়।
দেখুন, এবার বোধহয় মিঃ বি-টু ডাঃ এস-ফিফটিকে ফোন করবেন। কারণ পার্টি যেকোনও মুহূর্তে অর্ডার ক্যানসেল করতে পারে। হয়তো পেসেন্টটা টেঁসে গেল; কিংবা তলায়-তলায় অন্য কোনও লিম্ব সাপ্লায়ার্সের সাথে যোগাযোগ করে সস্তায় পেয়ে গেল হার্ট। তখন ক্যানসেল করে দিতে পারে অর্ডার। পনের লাখ টাকা দিয়ে অনাথ-আশ্রম থেকে কালেক্ট করা মালটা তখন নিয়ে এসে বিড়ম্বনা হবে। এরকম টানা-মাল ফার্ম হাউসে রাখাও নিরাপদ নয়। মাঝে মাঝে সরকারি অফিসার ফার্ম হাউসে রেইড করে। সন্দেহ হলে হাজারো কৈফিয়ত। প্রথমত কেনার কোনও ডকুমেন্ট নেই। সরকার এটা থেকে ট্যা’ও পাবে না। যদি ধরা পড়ে যে, এটা অনাথ-আশ্রম থেকে লুকিয়ে নিয়ে আসা; তাহলে নিয়ম অনুযায়ী, ট্রেড লাইসেন্স ক্যানসেল। আর লাইসেন্স বাঁচাতে তখন এক কাঁড়ি টাকা। এ সব ট্রাব্ল্সাম বার্ডন্ আর কে নিতে চায় বলুন।
একবারের এক ঘটনা শুনুন। ও-পজেটিভ ব্লাড-গ্রুপের একটা কিডনির আর্জেন্ট অর্ডার পাওয়া গিয়েছিল। স্টকে কিডনি ছিল না। ফার্ম হাউসের লাইভ-স্টকেও গ্রুপ মিলল না। অথচ ভাল টাকার অফার। মিঃ বি-টু লোভে পড়ে গেলেন। এখানে ওখানে ফোন করতে করতে এক মেন্টাল হসপিটালের ওয়ার্ড-মাস্টারের সঙ্গে রফা হল। ও-পজেটিভ গ্রুপের একজন বদ্ধ-পাগল আছে হসপিটালে। তার বাড়ির লোকজন একদম বীতশ্রদ্ধ। কথায় কথায় বলে— পাগলা মরলে বাঁচি। বাড়ির লোক আসেও খুব কম। ওয়ার্ড-মাস্টার, মিঃ বি-টুর ট্র্যাপে পড়লেন। অনেক টাকার বিনিময়ে রাজি হলেন এই শর্তে যে, হার্ট, লাংস, কিডনি এসব দামী জিনিস বের করে নেওয়ার পর বডিটা ফেরত দিতে হবে। পাগলটা বাথরুমে পড়ে মারা গেছে এবং পোস্টমর্টেম হয়েছে এই বলে তার বাড়ির লোককে বডি ফেরত দেওয়া হবে।
ভাবছেন তো আমি এত খবর পাই কী করে! আপনাকে আগেই বলেছি, আমি এখানকার স্টাফ ছিলাম। ভেতরের খবর অনেক জেনে ফেলেছিলাম বলেই তো আমাকে ছাঁটাই করল। তারপর এই গাইডের কাজ।
যাইহোক, শুনুন, পাগলটাকে মরফিন ইঞ্জেকশন মেরে, ক্লোদিং-ভ্যানে, মানে যে গাড়িতে ময়লা বেডসিট, পোশাক এসব ক্লিনিং-এ পাঠানো হয়; সেই গাড়িতে নোংরা চাদরের তলায় চাপা দিয়ে হাসপাতালের বাইরে আনা হল। ক্লোদিং-ভ্যান থেকে অ্যামবুল্যান্স-এ সিফ্ট্ করার সময় এক ব্যাটা আধপাগলা দেখে ফেলে দোতলার ওয়ার্ডের জানলা দিয়ে। কী অদ্ভূত! অতটা দূর থেকেও সে চিনেও ফেলে সেন্সলেস পাগলটাকে। কপালে দুর্ভোগ থাকলে যা হয় আর কি! ব্যাস! পুরো পাগলা গারদে সে একেবারে হই-হই-রই-রই কাণ্ড। পাগলদের কাণ্ডকারখানা তো! একটা ছুতো পেলেই হয়েছে। হাসপাতালের আশপাশের বাড়ির লোকগুলোর কানেও গেল ওদের চিৎকার-চেঁচামেচি, কথাবার্তা। এক ব্যাটা ফিচেল থানায় ফোন করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ হাজির। সব শুনেটুনে, পয়দার গন্ধ পেয়ে ওরাও খোচরগিরি শুরু করল। ব্যাস! বামালসহ ধরা পড়ল। যাকে বলে কট-ইন্-রেড-হ্যান্ডেড। সবে পাগলটাকে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকিয়ে ডিসেকশান টেবিলে তোলা হয়েছে; এমন সময় পুলিশ গটমট করে ঢুকে পড়ল। শেষমেষ পাগলটাকে পাগলাগারদে ফেরত দিতে হল। আর কয়েক কোটি টাকা পুলিশের গভ্যে ঢেলে লাইসেন্স বাঁচল। কিন্তু সেই ওয়ার্ড-মাস্টারের চাকরিটা আর বাঁচল না।
মিঃ বি-টু কিছুদিন এ সব কালাধান্দা থেকে দূরে থাকলেও আবার মওকা বুঝে বড় দাঁও মারার জন্য এসব শুরু করলেন। উনি কী বলেন জানেন, বলেন, ‘বিজনেস ইজ আ গেম, কভি স্লান্ডার কভি ফেম।’ এই তো পনের বছরের ছেলেটা জোগাড় হল এক ... আরে! বি-টুর মোবাইলে রিং হচ্ছে যেন! শোনা যাক্ কার ফোন।
... ইয়েস বলুন স্যার!
... ... ...
হ্যাঁ-হ্যাঁ, লাইভ বেবী পাওয়া গেছে। তবে অনেক কষ্টে। প্রায় তিনগুন দাম দিয়ে কিনতে হল। উইদ্-ইন অ্যান আওয়ার হার্ট পেয়ে যাবেন আশা করি।
... ... ...
না-না, লিকুইড মানির দরকার নেই। অ্যাকাউন্ট টু অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার করে দিতে বলুন। ওয়ান ক্রোড় পুরোই ট্রান্সফার হোক। আপনার টোয়েন্টি পারসেন্ট ‘হনরেনিয়াম’ আমি ক্যাশ ইন হ্যান্ড পাঠিয়ে দেব। ঠিক আছে ছাড়ি তা হলে!
নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন কার ফোন। হার্টটার ডিম্যাKড রয়েছে এখনও। আর কোথাও চেষ্টা করেনি বোধহয়। চেষ্টা করলেও রেয়ার ব্লাড গ্রুপ তো। পাওয়াটা একটু টাফ!
কী ব্যাপার! হার্টটার ডিমান্ড আছে এখনও; ফ্রেশ লাইভ-কিডিরও সন্ধান পাওয়া গেছে। অথচ মিঃ বি-টুর মুখখানা অমন হিপোপটেমাসের পাছার মতো হয়ে আছে কেন? দেখি তো ওঁর মাইন্ড-হাউসে একটু প্রবেশ করা যাক।
... একঘন্টার মধ্যে হার্টখানা সাপ্লাই দেব বললাম। কিন্তু কিডি তো এখনও অরফ্যানেজ-এর লবিতে খেলে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে সব কিছু ঠিকঠাক মতো হবে তো? এতক্ষণে বোধহয় ওটাকে ট্র্যাঙ্কুলাইজার পুশ করে দিয়েছে। আর একটু পরেই ফোন আসবে অ্যামবুল্যান্সের জন্য। না, মোটেই দেরী নয়। অ্যামবুল্যান্সটা একদম রেডি রাখা যাক। ফোন পেলেই সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যাবে। মার্স অরফ্যানেজ দূর তো কম নয়; অ্যামবুল্যান্সের অপারেটরকে ফোনটা করেই রাখি।
... হ্যালো!
... ... ...
হ্যাঁ, গুডমর্নিং। শুনুন। একটা অ্যামবুল্যান্স একদম রেডি রাখুন। এখুনি বেরোতে হবে।
... ... ...
না-না, জেনুইন কেস নয়, মক-আপ। জেনুইন কেস আর পাই কোথায়। শুনুন, গাড়ি রেডি করে আমার চেম্বারে আসুন।
... ... ...
ইয়েস, কাম শার্প।
... ... ...
ও-কে, থ্যাঙ্ক য়্যু।
কী ব্যাপার! ভ্রূতে প্রশ্নচিহ্ন কেন? ওই জেনুইন আর মক-আপ ব্যাপারটা বুঝলেন না তাই তো?
জেনুইন হ’ল, সত্যি-সত্যিই যখন কোনও দুর্ঘটনায় আহত বা মরণাপন্ন পেসেন্টকে অ্যামবুল্যান্সে করে আনা হয়; তখন অ্যামবুল্যান্সের সেট-আপ হয় একরকম। তখন অ’িজেন সিলিন্ডার, স্যালাইন, রেসপিরেটরি ইক্যুইপমেন্ট এসব গাড়িতে থাকে। এই হল জেনুইন কেস। আর ... হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনের ভেতরের প্রশ্নটা বুঝতে পেরেছি। জেনুইন কেস হসপিটাল বা নার্সিংহোমে না নিয়ে গিয়ে এই লিম্ব সাপ্লায়ার্সে আনা হবে কেন, তাই তো? এর উত্তরে পরে আসছি। আগে মক-আপ ব্যাপারটা ক্লিয়ার করে দিই।
ও! মক-আপ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে গেছেন!
হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এক্ষেত্রে অরফ্যানেজ-এর বাচ্চাটা সত্যি-সত্যি তো আর অসুস্থ নয়। তাকে ঘুমপাড়ানি ইঞ্জেকশন দিয়ে অসুস্থ শো ক’রে অ্যামবুল্যান্সে তোলা হবে। এখানে পৌঁছে গেলেই তো সঙ্গে সঙ্গে ডিসেকশন টেবিলে। তারপর ছুরি-কাঁচির খেলা। মক-আপ কেসে খরচ বেশি, রিস্কও বেশি। প্রফিট কম। কিন্তু জেনুইন কেসে খরচ কম, প্রফিট বেশি।
হ্যাঁ, জেনুইন কেস এখানে আনা হয় কেন বলছি। জেনুইন পেসেন্টকে এখানে বাঁচানোর জন্য আনা হয় না। পেসেন্ট-পার্টিও আনে না। আনে এই সাপ্লায়ার্স-এর র্যাফ ডিপার্টমেন্ট। মানে র্যাপিড অ্যামবুল্যান্স ফোর্স ডিপার্টমেন্ট। ব্যাপারটা হল, এই হাইটেক যুগে, রাস্তাঘাটে, ইন্ডাস্ট্রিতে, অফিসে দুর্ঘটনা লেগেই আছে। অনেক সময় দেখা যায়, রাস্তায় কোনও পথচারি রান-ওভার হয়ে গেল। সে ব্যাটা খাবি খাচ্ছে। তার সঙ্গী-সাথী কেউ নেই। ট্রাফিক পুলিশ তাকে রেসকিউ করল। সেই মুহূর্তে যদি লিম্ব সাপ্লায়ার্স-এর লাইভ কালেক্টর কাছে পিঠে থাকে; সে ট্রাই করে বডিটা পাওয়ার। ট্রাফিক পুলিশকে টোপ দেয় ভাল টাকার। যদি পুলিশ টোপ গিলল তো কেল্লা ফতে। খুবই কম টাকায় হাফ-ডেড বডিটা পাওয়া গেল। সঙ্গে-সঙ্গে র্যাফ ডিপার্টমেন্টে ফোন। ওরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই জেনুইন সেট-আপ-এর অ্যামবুল্যান্স নিয়ে এসে হাফ্-ডেড বডি তুলে সোজা ও-টিতে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হার্ট, লাং, কিডনি, চোখ, লিভার এসব সেফটি প্যাকে ঢুকে গেল। বডিটা তখন শুধু চামড়ার খোল।
পুলিশ ব্যাটার পকেটে কিছু মালও এল। আর হাসপাতাল থানা এ সবের ট্রাবল থেকেও বাঁচল।
এই স্ট্রিট-অ্যাকসিডেন্ট ছাড়াও ডোমেস্টিক বডি পাওয়া যায় অনেক সময়। যেমন ধরুন, কারুর ছেলে ভীষণ অসুস্থ। ট্রিটমেন্ট করানোর টাকা নেই। ছেলেটা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই মরে যাবে। মরে যাওয়া মানেই তো এতটা বড় করে তোলার খরচ-খরচা ভেপার। আবার কোনও পেসেন্ট রোজগেরে ব্যক্তি হলে তার ইনকামের উইন্ডো ক্লোজড্। তখন তার বাড়ির লোক বা অভিভাবক হাফ-ডেড বডিটাকে সাপ্লায়ার্সে বিক্রি করে দেয়। যা হোক, কিছু টাকা তো এল। হাফ এ লোফ ইজ বেটার দ্যান নো ব্রেড। বুঝলেন তো! তখন র্যাফ-এর জেনুইন সেট-আপে-এর অ্যামবুল্যান্স পাঠানো হয়। পেসেন্টকে ঠিকঠাক নিয়ে আসার জন্য। কী, জেনুইন আর মক-আপ জেনুইনভাবে ক্লিয়ার হল তো?
ওই যে অ্যাম্বু-অপারেটর ঢুকছে। দেখি, কী নির্দেশ দেওয়া হয় ওকে।
বলুন স্যার!
ইয়েস, বসুন। বলছি কত নাম্বার অ্যাম্বু পাঠাচ্ছেন?
এ-ভি-টু স্যার। এ-ভি-ওয়ান গেছে নর্থ জোনে ডোমেস্টিক পেসেন্ট কালেক্ট করতে।
ও! হ্যাঁ। সেই অ্যালঝাইমার্স পেসেন্টটা! কালকের সিডিউল ছিল। ঠিক আছে। এ-ভি-টু এর ড্রাইভার কে আছে?
সি. ডি. ফোর স্যার।
সি. ডি.! কোনও পি. ডি. নেই!
না স্যার! পারমানেন্ট স্টাফ আজ ছুটি নিয়েছে। তবে স্যার! এই ক্যাজুয়াল ড্রাইভারটা রিলায়েব্ল্ অ্যান্ড ওবিডিয়েন্ট। ওকে ভরসা করা যায়।
ঠিক আছে। শুনুন। মার্স অরফ্যানেজ থেকে একটা মক -পেসেন্ট আসবে। এই নিন ভাউচার। ক্যাশ থেকে ফিফটিন লাখ তুলে নিয়ে প্যাক করে ফেলুন। প্যাকেটটা মার্স-এর ম্যানেজারের হাতে যাবে। মক-আপ কেস। ওকে একটু কাজটা বুঝিয়ে দেবেন ভাল করে। যেন কেস গুবলেট না হয়। বুঝেছেন।
হ্যাঁ স্যার।
যান, চটপট রেডি করে ফেলুন। এখ্খুনি ফোন আসবে।
ঠিক আছে স্যার।
কী ব্যাপার! অমন ফ্যাল্ফ্যাল্ করে চেয়ে আছেন যে! মাথা ঘুলিয়ে গেল নাকি এই লিম্ব সাপ্লায়ার্সের মালিক মিঃ বি-টু’়র ব্যাপার-স্যাপার দেখে! আরে মশাই! এত অল্পতে ব্রেন হ্যাং-আপ হলে চলবে! এখনও তো খোসাতে রয়েছেন শাঁসে ঢোকেননি। চলুন না হয় এখান থেকে বেরিয়ে একটু সামনের ওই ফ্রেস-পার্লারে যাই। পনের মিনিট পরে ফ্রেস- ট্রেস হয়ে আবার ঢোকা যাবে। তখন জমিয়ে কথা বলবেন ওঁর সঙ্গে। বুঝতে পারছি, ওঁর সঙ্গে বিজনেসের ব্যাপারেই কথা বলতে চান। ঠাণ্ডা মাথায় ওসব কথা বলতে হয়।
পাঁচ
উরিব্বাবা! হঠাৎ ফারনেসে ঢুকে পড়লাম মনে হচ্ছে! এতক্ষণ ভেতরে সি.সি. তে ঢুকেছিলাম বলে বুঝতে পারিনি। আজ বোধহয় ফরটি নাইন-টাইন হবে। অবশ্য এখন, মানে এই অগাস্ট মাসে নরমাল হ’ল ফরটি থ্রি-ফোর। জানেন কিছুদিন আগে একটা পুরনো দিনের ফিল্ম দেখলাম। হোয়াট আ রিডিকিউলাস! ফিল্মে দেখাচ্ছে উইন্টার সিজ্ন্। স্নো পড়ছে। চারদিকে যেন সাদা তুলো ছড়ানো। তার মাঝে হিরো-হিরোইন জাপটা-জাপটি করছে। কী অদ্ভূত দৃশ্য! তাই না! দেখে হিংসে হচ্ছিল! বিনা-খরচায় প্রকৃতি থেকেই তখন আইস বাথ পাওয়া যেত। আর এখন আমরা যাচ্ছি ফ্রেস পার্লারে টাকা খরচ করে আইস-বাথ নিতে। জানেন—বইয়ে পড়েছি, মানে আপনিও নিশ্চয় পড়েছেন, তখন গ্রীষ্ম-বর্ষা ছাড়া আরও চারটে ঋতু ছিল! নামগুলোও দারুণ; শরৎ, হেমন্ত, বসন্ত আর ওই উইন্টার মানে শীতকাল। কী ভাগ্যবান ছিল তখনকার মানুষ। ছ-ছটা ঋতু এনজয় করত। আর এখন মাত্র দুটো— সামার এন্ড রেইনি সিজন্। উঃ! আর পারা যাচ্ছে না। বর্ষাটা যে কবে আসবে! বর্ষাকালে তবু টেম্পারেচারটা দু’চার ডিগ্রি কমে।
চলুন, ওই দিকে নাইটিঙ্গেল ফ্রেস পার্লার। ওখানেই যাই। ওটা এটার চেয়ে বেটার। ওখানে নাকি কী সব পাখির ডাক-টাক শোনা যায় ব্যাক-গ্রাউন্ড মিউজিকে। সামনে স্ক্রিনে সে-সব পাখির ছবিও দেখায়। আপনি কখনও ঢুকেছেন নাইটিঙ্গেলে? ঢোকেননি! ঢুকবেনই বা কী করে! আপনি তো বলছেন গতকাল এ শহরে এসেছেন। আজকেই চলুন। ওখানকার স্পেশ্যালিটিজ হল নাইটিঙ্গেল মানে বুলবুলি পাখির ডাক। কী মিষ্টি! তখন নাকি এসব পাখি গাছগাছালিতে ঘুরে বেড়াত আর গান গাইত! আমার ঠাকুরদা নাকি দেখেছেন, গল্প করতেন। উনি বলতেন— তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধর আগে প্রকৃতি-পরিবেশটাই আলাদা ছিল। এখনকার সঙ্গে হেভেন অ্যান্ড হেল ডিফারেন্স! জানেন, একবার একটা ফিল্ম দেখেছিলাম, ফিল্মটার নাম ‘দ্য স্যুইসাইডাল স্কোয়াড ইন জাটিঙ্গা’। জাটিঙ্গা নামে একটা পাহাড়ি গ্রামে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে সুইসাইড করে। পরে গবেষণা-টবেষণা করে এক বিজ্ঞানী জানাল, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য পাখিগুলো মরে যাচ্ছে।
বিশ্বযুদ্ধের পর সমস্ত পাখি তো একসঙ্গে সুইসাইড করল। তখন গাছে-গাছে ফুল, ফুলে-ফুলে ভ্রমর, ডালে-ডালে পাখি। পাখ-পাখালির কূজন, ভ্রমরের গুঞ্জন এসব এনচ্যান্টিং অ্যান্ড এনথ্রলিং সব জিনিস ছিল। থার্ড ওয়ার্ল্ড-ওয়রের পর সব ভ্যানিশ হয়ে গেল। আসলে, ওই অ্যাটম বোমা, রাসায়নিক বোমা আরও কী-কী সব ব্যবহার করল তো কিউ এস এ আর মিডল ইস্ট কািKCগুলো। কী ব্যাপার! আপনার চোখে বালি পড়ল নাকি? টীয়ার্স ফ্লো হচ্ছে!
ও! এমনিই! আমি এত বকবক করছি; বিরক্ত হচ্ছেন না তো! আসলে আমার কাজটাই তো এই। আপনি আমাকে পে করবেন তার জন্য সবকিছু আপনাকে ঠিকঠাক বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। তাই ...। হ্যাঁ, কী বলছিলাম যেন! ও! অ্যাটম বোমা ...। ওরাও তেমনি উচিত শাস্তি পেয়েছে। কিউ.এস.এ.-এর অর্ধেকটা তো সমুদ্রের তলায় চলে গেল নিজেদের অস্ত্র-ভাণ্ডারের হ্যাভক বিস্ফোরণের ফলে। যাওবা কিছুটা বেঁচেছিল সেটাও ধ্বংস হয়ে গেল টু থাউজেন্ড থার্টি সি’ে। প্রশান্ত মহাসাগরে বিশাল উল্কাপাত হ’ল। সমুদ্র তোলপাড়। সুনামি হয়ে গেল। তাতে অবশিষ্ট কিউ.এস.এ. তো গেলই; তার সঙ্গে সিলি, বেরু, ডলিভিয়া, ভিলিপাইনস্, ঝাপান, মার্জেন্টিনা, এসব দেশ তলিয়ে গেল সমুদ্রের তলায়। আর মিডল ইস্ট-কািKCগুলোর দশা তো আগেই বলেছি। ছিল মরুভূমি হয়ে গেল পোড়াভূমি। লক্ষ লক্ষ রিফিউজি তো জাহাজে আর প্লেনে চড়িয়ে আনা হ’ল। আমাদের দেশটাও যেত। নেহাৎ শেষ মুহূর্তে প্রতিবেশি দেশ ইসলামিস্তান আমাদের সঙ্গে সমঝোতা করল কিউ এস এর ট্র্যাপে না পড়ে। তাই রক্ষা।
কী বলছেন? রক্ষা কী আর হল? আরে বাবা! মরুভূমি হয়ে যাওয়া থেকে তো রক্ষা পেল। পরিবেশ দূষণ, বায়ুদূষণ, জলদূষণের ফলে বহু প্রজাতির গাছপালা, বহু প্রজাতির পশু-পাখি লুপ্ত হয়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু মানুষ বাস তো করতে পারছে।
ও! আপনার চোখমুখ বলছে, আপনি বোর ফিল করছেন। এসব আইড্ল টেল ভাল্লাগছে না। সবই আপনার জানা জিনিস। আসলে কি জানেন, আবেগে বলছি আবেগে। সমাজতত্ত্ববিদরা যতই বলুক না, প্রেম-ভালবাসা, মায়া-মমতা, এ-সব হারিয়ে গেছে। প্রেম আমি বিশ্বাস করি, মনের মধ্যে আবেগ বলে একটা জিনিস এখনও রয়ে গেছে। অন্তত আমার তো রয়েছেই।
এই রে! আমাকে আবার ইমোসন্যান্সিয়া রোগি না ভেবে বসেন। চলুন
নাইটিঙ্গেল-এর এKCাসটা ওই পাশে। পনের মিনিটের স্লট নিই, নাকি বলেন! বেশিক্ষণ এখানে থাকলে আসল কাজটাই যে ফসকে যাবে। আপনার তো এখনও মি. বি-টু’র সঙ্গে কথা বলা হয়নি। উনি এতক্ষণ নিশ্চয় মার্স অরফ্যানেজ এর ম্যানেজারের ফোন পেয়ে মক-আপ সেট আপ অ্যামবুল্যান্স পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আঃ! দেখেছেন কী ঠাণ্ডা! সেন্ট্রালি কোল্ড কণ্ডিশানিং। এটা অনেক পুরোনো কনসার্ন জানেন তো! রিনোভেশন হয়েছে। আসলে এটা আগে ছিল বিউটি পার্লার। থার্ড-ওয়ার্ল্ড ওয়রের পর এটা ফ্রেস পার্লারে কনভার্ট করেছে। এটা বিউটি পার্লার থাকার সময় আমার গ্র্যান্ড-মা নাকি এখানে নিয়মিত আসতেন হেয়ার কাট, ফেসিয়াল এসব করাতে। তখন এটা ছিল সেই রদ্দি আমলের এ সি বিউটি পার্লার। মানে এয়ার কন্ডিশানিং। যখন সরকার আইন করে এ সি বন্ধ ক’রে নিউ টেকনোলজির সি সি চালু করতে বাধ্য করল; তখনই এই নাইটিঙ্গেল সি সি সেট আপ করে ফ্রেস পার্লার করল।
আপনি জানেন নিশ্চয় এয়ার কন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর এসবের ব্যবহার আইন পাশ করিয়ে প্রশাসন দিয়ে কড়া হাতে দমন করা হয়েছিল কেন!
জানেন না! আচ্ছা! সত্যি করে বলুন তো, আপনি কোন্ দেশে ছিলেন?
ঘুমিয়ে ছিলেন! হাসালেন মশাই। আমাদের সবই জানতে হয়। হিস্ট্রি না জানলে ভাল গাইড হওয়া যায় না। আমি ই-জার্নালে পড়েছি ওইসব এ সি, ফ্রিজ ইত্যাদি যন্ত্র চালালে নাকি গ্রীন হাউস গ্যাস উৎপন্ন হয়। ওই গ্যাস নাকি বায়ুমণ্ডলের ওজোন-স্তরের মহাশত্রু। ওজনস্তরকে ভেঙে তছনছ করে দেয়। তাতে আলট্রা ভায়োলেট রে, তারপর ইনফ্রা রেড রে এসব নাকি সূর্য থেকে বিকিরিত হয়ে অনায়াসে পৌঁছে যায় পৃথিবীতে। পৃথিবীর টেম্পারেচারও বাড়িয়ে দেয়। তাই তখনকার পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা আন্দোলন শুরু করে, এইসব যন্ত্র ব্যবহার বন্ধ করার আর্জি জানিয়ে। বহুদিন ধরে আন্দোলন চলে। ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়েই গেছে। সুমেরু সাগর নাকি বার-তের ফুট বরফে ঢাকা থাকত। সে বরফের চিহ্ন নেই। বহু দেশ নিঃশেষ। ওজোন স্তরও ভেঙে তছনছ। এখন আমরা তার ফল ভোগ করছি। ইউ-ভি-রে প্রোটেকটিভ পোশাক আর ক্রীম কিনতে গাদা-গাদা টাকা খরচ হচ্ছে।
আরে! আপনি দেখছি সাধারণ একটা জোব্বা পরেছেন! নিশ্চয় ইউ ভি রে প্রোটেকটিভ ভ্যাকসিন নেওয়া আছে। তাই আমার কথা শুনে মুচকি-মুচকি হাসছেন। খুব সেয়ানা আপনি! সবই জানেন; না জানার ভান করে মিছিমিছি বকাচ্ছেন আমাকে। ভারি মজা পেয়েছেন, না! যাক্গে! আমার বকবক করাই তো কাজ!
কী বলছিলাম যেন! ও! এ.সি. ব্যান করার কথা। অনেকদিন আন্দোলন করার পর সরকারের টনক নড়ল। এ. সি. সিস্টেম বন্ধ করার আইন পাশ হ’ল। ততদিনে অবশ্য বিজ্ঞানীরা ঘর ঠাণ্ডা রাখার জন্য নতুন প্রযুক্তির এই কোল্ড কন্ডিশনিং আবিষ্কার করে ফেলেছে। তারপর থেকেই তো ...! এই নাইটিঙ্গেল কোম্পানি-ই এই শহরে প্রথম সি.সি. চালু করে।
ও! একটা মজার ব্যাপার কি জানেন ... থাক্ আমি পার্লারের স্লটের চার্জটা দিচ্ছি। আপনাকে আর পার্স বের করতে হবে না। আমাকে পে করার সময় সব হিসেব করে মিটিয়ে দেবেন।
হ্যাঁ, বলছিলাম, একটা মজার ব্যাপার কি জানেন; এই নাইটিঙ্গেলের মালিক হ’ল বাঙালি। একটা মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি এটা কিনে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা দেয়নি। তা নিয়ে তখনকার গভর্নমেন্টের সঙ্গে কী ঝামেলা! গভর্নমেন্ট তখন রাজ্যে বিদেশি পুঁজি বিনেয়োগ করানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এদের বিভিন্ন শহরে অনেকগুলো ব্র্যাঞ্চ এবং এই মেন ব্যাঞ্চ মিলিয়ে বিজনেসটাও খুব একটা ছোট নয়!
বিদেশী কোম্পানি এটা কিনে নিলে আরও বিজনেস বাড়বে। অনেক ব্র্যাঞ্চ খুলবে। অনেক বেকারের কাজ হবে। এসব যুক্তি দিয়ে সরকার চাপ সৃষ্টি করল এর তৎকালীন মালিকের ওপর। সে বাঙালির বাচ্চাও ছাড়বার পাত্র নয়। শেষে কোর্ট-কাছারি এমনকি সুপ্রীম কোর্ট অবধি গিয়ে জিতে ফিরল লড়াকু বাঙালি মালিক। ওই দেখুন তার পাথরের মূর্তি! সিন্থেটিক ফুল দিয়ে কেমন সাজানো। কী হ’ল! অমন নাক টানছেন যে! হাঃ-হাঃ, স্মেলটা বেশ ভাল লাগছে বলুন। এই স্মেলটা আসছে ওই সিন্থেটিক ফ্লাওয়ারগুলো থেকে। ওই ফুলে অ্যারোমা দেওয়া আছে। তারই গন্ধ। আমাদের ঠাকুরদার আমলেও সত্যিকারের ফুল ছিল। কী দারুণ তাদের নাম, গোলাপ, চাঁপা, রজনীগন্ধা, যুঁই, কামিনী, হাস্নুহানা, আরও কত কী! আর কী সুন্দর গন্ধ সে সব ফুলের, ঠাকুরদার মুখে শুনেছি ছোটবেলায়। এখন আমার আপনার ছেলেরা ‘অ্যানসিয়েন্ট ওয়ার্ল্ড’ ওয়েবসাইট খুলে ইন্টারনেটে পড়ে এসব।
এই নিন এন্ট্রি কুপন। আপনার আর আমার পাশাপাশি চেম্বার। চেম্বার থেকে আগে বেরিয়ে পড়বেন না। আমি কিন্তু পাক্কা পনের মিনিট এনজয় করব। টাকাটা উসুল করতে হবে তো! আপনার তো ‘নাইটিঙ্গেল ফ্রেস পার্লার’এ ফার্স্ট টাইম; দেখুন কেমন লাগে। আইস বাথ নিতে নিতে আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে চারপিং শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়বেন না যেন! তাহলে সামনের স্ক্রিনে সে যুগের গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালি, ফুল-ফলের ছবিগুলো মিস্ করবেন। কোন্ পাখির চারপিং কেমন সেটাও তো জানা দরকার! অবশ্য আপনার ওই পাখির ডাক আর নেচারের মুভি পছন্দ কি না জানি না। আমি আমার পছন্দটা আপনার ওপর চাপিয়ে দেবই বা কেন? ইচ্ছে হলে আপনি আর পাঁচজনের মতো ইন্টারকোর্স-হিসিং সাউন্ডসহ সে’-আর্জিং মুভি দেখতে পারেন। আমার আবার ওটা পছন্দ নয়। বডি-টেম্পারেচার আরও বেড়ে যায়। বাইচান্স যদি সিমেন-লস হয়; তাহলে ফ্রেস হওয়া তো দূরের কথা, শরীর ম্যাজ-ম্যাজ করে।
কী হাসছেন যে! বেশির ভাগ কাস্টমার ফ্রেস পার্লারে এসে ওটাই চুজ করে। আমার কয়েকজন কলিগের ওইসব পছন্দ। বললে বলে— প্রচণ্ড টেম্পটেড হয়ে সিমেন-লস্ হলেই নাকি সত্যিকারের ফ্রেস হওয়া যায়। শরীর জুড়িয়ে যায়, কাজে মন লাগে। জানি না, আপনার কী টেম্পেরামেন্ট। ওই যে আপনার চেম্বারে গ্রিন সিগন্যাল হয়েছে। যান। আমারটাও তো ...! বেরিয়ে রিসেপশনের সামনে দাঁড়াবেন।
বাঃ! একদম সেম টাইমে বের হ’লাম দু’জনে। কেমন লাগল বলুন এই
নাইটিঙ্গেল ফ্রেস পার্লার? ফ্রেস লাগছে না! লাগতেই হবে। টাকা যেমন নেয়, সার্ভিসটাও ভাল দেয়। রোবো-ওম্যান দিয়ে টপ-টু-বটম ম্যাসাজিং, কোল্ড ব্লোয়িং এসব ছাড়া আইস-বাথ তো আছেই। সঙ্গে অডিও-ভিসুয়াল সিস্টেম। আপনি কী এ-ভি নিয়েছিলেন? বার্ড-চারপিং উইদ নেচার, না ওইসব ন্যাকেড ...?
কী বললেন? এ দুটোর কোনওটাই চুজ করেননি! ও! তাই বলুন, ‘ডেজার্ট এন্ড ওয়েসিস উইদ ড্রোম’ সিলেক্ট করেছিলেন। ওটাও নাইস! চারদিকে শুধু বালি আর বালি। কেউ কোথাও নেই। দু’একটা কাঁটাগাছ আর কয়েকটা অদ্ভূত ধরণের কীট। মনটা কেমন উদাস হয়ে যায় ঝিঁঝির ডাকের শব্দে; তাই না! মনে হয় যেন অন্য কোনও গ্রহে পৌঁছে গেছি। আমার আবার এসব দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায় জানেন! এখন পুরো পৃথিবীটাই তো বলতে গেলে এরকম হয়ে গেছে। এসব দেখে মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়।
চলুন ফাঁকা মাথায় মিঃ বি-টু’র কান্ড-কারখানা ঢুকবে ভাল। এতক্ষণে বোধহয় মার্সর্ অরফ্যানেজের উদ্দেশে অ্যামবুল্যান্স বেরিয়ে গেছে। ওখানে ঢোকার আগে দু’জনে দু’টো ফুড কেক নেওয়া যাক্ নাকি বলেন! আগে এই খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা কী ভ্যারিয়েগেটেড ছিল বলুন তো! শুনেছি কত ধরনের খাবার, কত প্রসেসিং, প্রিপারেশন। হাউ এ্যামিউজিং! আমাদের জিভের নাকি তখন আর একটা কাজ ছিল স্বাদ বোঝার। এখন তো জিভের সে ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। আর তার দরকার নেই বলেই বোধহয়! এখন তো হোল ইউনিভার্স জুড়ে একটাই খাবার—কম্প্লিট ফুড কেক, সঙ্গে পিউরিফায়েড ওয়াটার। শরীরে পুষ্টি জোগানোই আসল কথা।
আরে! মিঃ বি-টু অমন মাথায় হাত দিয়ে বসে কেন? কী ব্যাপার? অঘটন কিছ ঘটল নাকি? ডাঃ এস ফিফটি কী হঠাৎ হার্টের অর্ডারটা ক্যানসেল করে দিল! ওই যে আবার ফোন করছেন কাকে।
.... আরে মশাই! একটা বাচ্চাকে ট্যাক্ল্ করতে পারেন না, পনের লাখ কামানোর স্বপ্ন দেখেন কী করে? আমার পারপাস সার্ভ না হলে আমি কি ওকে নিয়ে এসে এগ্জিবিশনে সাজাব নাকি!
... ... ...
কমন সেন্স অ্যাপ্লাই করুন কমনসেন্স। অন্য ছেলেদের সঙ্গে রয়েছে তো কী হয়েছে। নিউট্রি কেক খাওয়ান সব্বাইকে। ওরটাতে ড্রাগ মিশিয়ে দিন ব্যাস! পাঁচমিনিটের মধ্যেই ...।
... ... ...
অ্যাঃ কী বলছেন? সেপারেট করা গেছে। ঠিক আছে এবার যা করার করুন ঝটপট। আমি অ্যামবুল্যান্স পাঠাচ্ছি। আপনি অ্যাটেন্ডেন্ট্দের সামনে লোকদেখানো একটা ফোন করুন বাচ্চাটা ঝিমিয়ে পড়লে। বুুঝেছেন! ছাড়ছি।
কী বুঝলেন মশাই! সমস্যা ঘোরালো মনে হচ্ছে। হার্ট-সাপ্লাই দেওয়ার টাইম এগিয়ে আসছে। এদিকে হার্টের মালিক এখনও খেলে বেড়াচ্ছে অরফ্যানেজ—এর করিডোরে। ওই দেখুন, মিঃ বি-টু কেমন রেগে ফায়ার হয়ে উঠেছেন। মুখখানা এখন একদম গরিলার মতো লাগছে। বুকে থাপ্পড় মারাটাই যা বাকি!
না-না, আপনি ঘাবড়াবেন না। তেমন কিছু করবেন না উনি। ওঁর মাথা খু-উ-ব ঠাণ্ডা। কুল-ব্রেন না হলে কী এত বড় বিজনেস সামাল দেওয়া যায়। ওই যে ইন্টারকাম ওয়ারলেসে আবার কাকে ধরছেন! বোধহয় ও.টি.তে জানাচ্ছেন সার্জারির অ্যারেঞ্জমেন্ট রেডি করার জন্য।
... হ্যালো! সি-থার্টি! একবার আমার চেম্বারে এসো তো এখ্খুনি।
বাব্বা! ওয়্যারলেস সেটটা কী জোরে রাখা হ’ল দেখলেন, রাগটা কমেনি এখনও। সি-থার্টি হ’ল ক্লার্ক। অফিসের ফাইল মেনটেন, ডেটা প্রসেসিং এসব ওর কাজ। কিছু প্রসেস করতে দেবেন বোধহয়। এই সি-থার্টির খুব বেশিদিন চাকরি হয়নি। লাস্ট ইয়ারে ঢুকেছে ফাইভ ইয়ার্স কনট্রাক্ট-এ। ছেলেটা ভাল। এফিসিয়েন্ট অ্যান্ড এনার্জেটিক। আর একটা মজার ব্যাপার হ’ল, টু মাচ গুড লুকিং ছেলেটা। এলেই দেখতে পাবেন, সুন্দর দেখতে। সুন্দর ইন দ্য সেন্স পঞ্চাশ বছর আগের বাঙালিদের মতন অতটা সুন্দর নয়। সুন্দর বলতে ওর স্কিন কমপ্লে’নটা ব্রাইট। এখনকার নাইনটি পারসেন্ট বাঙালির মতো, মানে আমার মতো ডার্ক-ট্যান নয়। ওর জিনের ডিএনএ চেন-এ ফর্সার ক্যারাকটারিস্টিক সাপ্রেস্ড্ হয়েছিল বোধহয়। পূর্বপুরুষরা নিশ্চয় ফর্সা ছিল। বাই দি বাই, আপনি তো বেশ ফর্সা এবং নিশ্চয় সি’টি ক্রশ করেছেন তবুও এত হ্যান্সাম, এর রহস্যটা কী? হাসছেন যে! বলতে চান না। ঠিক আছে।
ওই যে সি থার্টি ঢুকছে। দেখুন, সুন্দর দেখতে না! ওর এই হ্যান্সামনেস নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে। পরে বলছি। মিঃ বি-টু ওকে কী বলছেন আগে শুনে নিই।
লুুক হীয়ার! এই ডেটাটা কম্প্যুতে কে লোড করেছে? তুমি নিশ্চয়!
হ্যাঁ স্যার! লগ-ইন দেখাচ্ছে সি আর এফ থার্টি। তার মানে আমার পাসওয়ার্ডে ওপেন করেই করা। অর্থাৎ আমিই করেছি।
আচ্ছা! তুুমি কি সহজভাবে কথা বলতে পার না? এক কথায় বললেই তো হয় আমি করেছি। কাজটা তো তোমারই। তুমি ছাড়া কি রোবট এসে করবে। যত্তসব...। কাজের সময় কোন্ দিকে মন থাকে?
কেন স্যার! এনিথিং রং?
এনিথিং র..অং! রাস্কেল কোথাকার।
হোয়াট ইজ দিস?
ব্লাড গ্রুপ স্যার!
ব্লাড গ্রুপ কী?
‘ও’ আর এইচ পজেটিভ।
আর ইউ সিওর?
হ্যাঁ স্যার! ডিসপ্লে তো তাই জানাচ্ছে।
কিন্তু ফার্ম হাউস থেকে জানাচ্ছে বি-টোয়েন্টি এম ই আর সি-এর ব্লাড গ্রুপ এ। সেই ডেটাই এসেছিল। অথচ তুমি ‘ও’ ঢুকিয়ে রেখেছ। জান, কী প্রবলেমে তুমি আমাকে ফেলেছ?
কিন্তু স্যার আমি তো ...।
থাম! আবার আরগুমেন্ট করা হচ্ছে। তোমাকে আমি স্যাক করব। পেয়েছটা কী! যা খুশি তাই করবে।
স্যাক করবেন না স্যার। এই চাকরিটা পাওয়ার পর ফিফটি ওয়ান লাখ খরচ করে একটা ওয়াইফ এনেছি। পাঁচ বছরের কনট্রাক্ট-এ। চাকরি চলে গেলে সেও চলে যাবে স্যার। পুরো টাকাটা লস হয়ে যাবে।
কী হ’ল হাসছেন কেন? ওর বলার ধরন দেখে হাসি পেলেও কথাটা সত্যি। ওর ঘটনাটা পরে বলছি আপনাকে। ছেলেটার জন্য খারাপ লাগছে আমার। দেখা যাক কী হয়। শুনুুন ছেলেটা কী বলছে।
স্যার! বলছিলাম আমাকে একটা চান্স দিন। আমি সেদিনের পেপার্স বের করে দেখি ভুলটা আমার ছিল কি না। পেপারে ম্যানুয়াল ডেটাতে তো ... !
বের কর তোমার ম্যানুয়াল পেপার্স। ওখানে যদি গ্রুপ লেখা থাকে ‘ও’ তাহলে বেঁচে গেলে। আর যদি ...! দাঁড়াও, ওঁয়াও-ওঁয়াও থামাই আগে। ... নিশ্চয় অরফ্যানেজ-এর ম্যানেজারের ফোন। হ্যাঁ, ঠিক তাই। ফোন এল তাই বেঁচে গেলে। যাও, তোমাকে আর পেপার্স বের করতে হবে না। মন দিয়ে কাজ করগে যাও।
যাক, বেঁচে গেল ছেলেটা। পেপারে যদি ‘এ’ থাকে আর ছেলেটা ‘ও’ কম্পোজ করে থাকে; তাহলে সত্যিই ওকে ডিসচার্জ করে দিতেন মিঃ বি-টু। আমি তো জানি একদম পাতি প্রফেশনাল বিজনেসম্যান বলতে যা বোঝায়, তাই হলেন মিঃ কে. বি-টু। যাক্ কার ফোন শুনি।
... হ্যালো! বলুন ...
... ... ...
হ্যাঁ, ঠিক আছে। আমার অ্যামবুল্যান্স বেরিয়ে গেছে অলরেডি। আপনি ফোনে আরও কিছু কথা বলে যান। আশপাশে অন্য কেউ আছে তো? শুনছে তো?
... ... ...
ঠিক আছে ... ঠিক আছে। ও কে।
ব্যাটা অরফ্যানেজের ম্যানেজার বছর পনেরর বাচ্চাটাকে কrা করেছে বলে মনে হচ্ছে। এ যেন সেই আগেকার দিনের চিকেন-পলট্রি, বুঝলেন। আমার ঠাকুরদার মুখে শুনেছি, তখন পলট্রিতে মুরগি পালন করা হত। বড় হলেই বিক্রি করা হত তার মাংস খাওয়ার জন্য। এখন তো মুরগি প্রজাতিটাই এ’টিংক্ট্ হয়ে গেছে; তাই মানুষের ছানাকেই ...! লক্ষ করেছেন, মিঃ বি-টু’র মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে। যা টেনস্ড ছিলেন এতক্ষণ। তবে, এখনও সমস্যা মেটেনি। যতক্ষণ না অপারেশন টেবিলে কিডি তোলা হচ্ছে; ততক্ষণ টেনশন। এবার ইন্টারকম ওয়্যারলেসে বোধহয় সার্জারি স্টাফ কে ধরছেন। ও টি রেডি রাখতে হবে তো।
... হ্যালো ও.টি. স্টাফ! উইদ-ইন হাফ এন আওয়ার ফ্রেস কিডি এসে যাবে। অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিব্ল্ হার্ট ডেলিভারি দিতে হবে। ও টি রেডি রাখুন। তাছাড়া কসমিক নার্সিংহোমের বিগ অর্ডার আছে। আশা করি, মনিটরে অর্ডার স্ক্রিন খুলে দেখে নিয়েছেন।
... ... ...
হ্যাঁ, সব প্যাক করে ফেলুন। ওল্ড স্টক থাকলে একটু চেক-ইন-এ দেবেন। যেন ডিসপিউট অ্যারাইজ না করে।
... ... ...
হ্যাঁ জানি, একটা ‘ও’ পজিটিভ কিডনি সর্ট পড়বে। যে কিডি আসছে ওটা ‘ও’ পজিটিভ। ও-কে। ওভার।
দেখলেন, মাই অ্যাজামসন ইজ অ্যাবসলিউটলি কারেক্ট। দিস ইজ কল্ড্ এ’পিরিয়েন্স। এখন স্টকরুম আর ল্যাবটা খুব দেখতে ইচ্ছে করছে; তাই না! বললাম, তো এসেছেন যখন ভাল করে দেখে নিন। বিজনেস-টক করতে চান যখন। যাব, একটু পর ওদিকে যাব। ওরা এখনও প্যাকিং শুরু করেনি। সেকেন্ড হাফ-এ মাল ডেলিভারি হবে। সাধারণত টিফিন-আওয়ার্স এর পর অর্ডারের মাল প্যাক করা শুরু হয়। তার আগে চলুন, একটু ক্যাশ রুম ঘুরে আসি। ওখানে রোবটের কাণ্ডকারখানা দেখবেন। মিঃ বি-টু এখন টেনশনে আছেন যতক্ষণ না পনের বছরের বাচ্চা নিয়ে অ্যাম্বু এখানে পৌঁছয়। ওই দেখুন, উনি জলের ফ্লাস্ক বের করে জল খাচ্ছেন। এরপর কী করবেন, তা আমার জানা। কম্প্যুটারে গেম খুলে বসবেন। ওঁর এই এক বাতিক। টেনস্ড্ হলেই গেম খেলতে থাকেন।
একটা মজার ব্যাপার কি জানেন, বিশেষ বিশেষ ডিভিশনে মিঃ বি-টু, রোবো দিয়ে কাজ করান। কোনও মানুষ-কর্মীর প্রবেশ নিষেধ সেখানে। যেমন ধরুন ফার্ম হাউসে বুড়োবুড়ির ফ্লোর; যার কথা আগেই বলেছি। তারপর এই ক্যাস ডিভিশন, ল্যাবরেটরি। অর্থাৎ যেখানে মানুষ রাখলে রিস্ক আছে; রিস্ক মানে আনফেয়ার কাজ করার সুযোগ আছে এবং কোম্পানির ক্ষতি হতে পারে; সেখানে মানুষ রাখবেন না। বোঝেন তো আজকাল মানুষের মর্যালিটি বলে কিছু নেই। এমন কি আমারও নেই। এই আপনাকে এত সব ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি। নেহাত আপনি আমার কাস্টমার ও ট্যুরিস্ট বলে। আমি জানি, আপনি আমাকে পাই-টু-পাই পে করবেন। সেই লোভেই আমি ফাঁকি দিচ্ছি না। চলুন। এই ডানদিকে ক্যাশরুম।
যেতে ইচ্ছে করছে না? আরে বাবা! ওখানে আপনাকে টাকা পে করতেও হবে না। আর টাকার বান্ডিলও দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি না। গেলেই বুঝতে পারবেন কেন নিয়ে যাচ্ছি।
আরে নাঃ! আবার বেবি’জ ক্রাই! থামুন! বি-টু’র কাছে কার ফোন এল! আমার আবার এসব ব্যাপারে খুব কিউরিওসিটি! এই কিউরিওসিটি থাকার জন্যই তো এত কিছু জানতে পেরেছি। শুনেই যাই ফোনের কথাবার্তা। শুনুন।
... হ্যাঁ। কে-সি-এইট বল কী ব্যাপার!
স্যার! ইমিডিয়েট জেনুইন সেট-আপ র্যাফ পাঠান ইস্ট রেঞ্জ, ক্লাস্টার থ্রি-ডি-এর সামনে। কার অ্যা’িডেন্ট কেস, টিন-এজার কিডি, পুলিশ সার্জেন্ট ফাইভ লাখে ডান।
ভেরি ভেরি গুড নিউজ। ও-কে থ্যাঙ্ক য়্যু! বী স্টেডি, গুড লাক।
কী বুঝলেন কিছু! বুঝলেন না! কেসটা হ’ল— ইস্ট রেঞ্জের ক্লাস্টার থ্রি-ডি এর সামনে কোনও কার অ্যা’িডেন্ট হয়েছে। অ্যা’িডেন্ট-এ কোনও টিন-এজার, মানে উনিশের মধ্যে বয়স এমন কেউ সিরিয়াসলি ইনজিওর্ড্ হয়েছে। হয়তো একা ছিল। সেইসময় ওখানে কিডি-কালেকটর-এইট ছিল কাছেপিঠেই। অন্ ডিউটি ট্রাফিক পুলিশ কেসটা টেক-আপ করেছে। হয়তো গাড়িটাড়ি সরিয়ে রোড ক্লিয়ার করে দিয়েছে। ইনজিওর্ড্ পার্সনকে হসপিটালাইজ্ড্ করতে হবে। পুলিশের অনেক কাজ পড়ে গেল। ইন দি মিন টাইম ওই কালেক্টর-এইট পুলিশটার সাথে পাঁচ লাখ টাকায় রফা করে ইনজিওর্ড্ পার্সনকে নিয়ে নিয়েছে। পুলিশ টাকার লোভে এবং ঝামেলা এড়াতে রাজি হয়ে গেছে। একটু আগে বলছিলাম না, র্যাফ ডিপার্টমেন্টের কথা। সে এখন র্যাফ মানে র্যাপিড অ্যাম্বুলেন্স ফোর্স চাইছে কিডিটা এখানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এরকম র্যাফ-কেসে কালেক্টর ডাব্ল্ কমিশন পায়। কারণটা বুঝতেই পারছেন, দশ এগারোর পরিবর্তে পাঁচ লাখে একটা কিশোর বা যুবকের গোটা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো পাওয়া গেল। একটু পরেই দেখবেন জেনুইন সেট-আপ অ্যাম্বুলেন্স কিডিটাকে নিয়ে এসে ও.টি.তে ফেলবে। তখন ও.টি.তে নিয়ে যাব আপনাকে। এখন চলুন রোবোসুন্দরী দেখিয়ে আনি।
ছয়
এই যে, এটা ক্যাশ কাউন্টার। খুচরো খরিদ্দার যারা আসে; তারা অর্ডার দেওয়ার পর এই কাউন্টারে টাকা, চেক কিংবা ক্রেডিট-কার্ড দিয়ে রিসিট নেয়। সেই রিসিট দেখিয়ে মাল হাতে পায়। বেশিরভাগ কাস্টমার হ’ল মালাইচাকি আর পাঁজরার। আজকাল এই হাই-স্পীড এর যুগে অ্যাকসিডেন্ট দারুণভাবে বেড়েছে। আর বেশিরভাগই কার-অ্যাকসিডেন্ট। কারুর মালাইচাকি চুরমার, কারুর বুকের রিব দু’টুকরো। সে সব পাল্টানো তো এখন নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাস্টমার প্যাটেলা কিনতে ... কী দেখছেন অমন করে? ক্যাশ-কাউন্টারের ওই সুুন্দরী মেয়েটাকে; তাই না? বাব্বা! আপনার যে চোখের পাতা পড়ছে না। বাট ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, আপনাকে বলতে বাধ্য হচ্ছি—ওই সুন্দরীটি রক্ত-মাংসে গড়া নয়।
নো-না অমন অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইট্স্ ফ্যাক্ট। দ্যাট ইজ নাথিং বাট আ ফিমেল রোবট। ফিফ্টি ইয়ার্স আগের মিস্ ইউনিভার্সের আদলে তৈরি।
ইয়েস স্যার। বিশ্বাস না হয় কাছে গিয়ে দেখুন। কি লুক্রেটিভ ফিগার দেখেছেন! ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস্ দেওয়া হয়েছে চোখ টানার মতো। তার ওপর স্কিন কমপ্লেকসন ড্রেস মেক-আপ এত অ্যাট্রাকটিভ; যে না তাকিয়ে পারবেন না। শুধু তাকানো নয়, শরীরে ব্লাড সার্কুলেশনও বেড়ে যাবে। মনে আছে, ঢোকার সময় রিসেপ্শনে ওইরকম একটা বিউটি-কুইন দেখেছিলেন। বলেছিলাম, ওর ব্যাপারে পরে বলব। দ্যাট ওয়াজ অলসো আ ফিমেল-রোবট। এগুলো অ্যাডভান্সড্ ইন্টিগ্রেটেড মোশন কেKCালে চলে। একদম সত্যিকারের একজন সুন্দরী তরুণীর মতো মুভমেন্ট, হাসি, এমনকি গলার ভয়েসও। এর কাজ পেমেন্ট নেওয়া। একটা অদ্ভূত ব্যাপার কী জানেন, কোনও কাস্টমার, বিল-অ্যামাউন্টের চেয়ে বেশি টাকা দিলে, ব্যালান্স মানি ফেরত দেয় না, এমন ভাবে ডেটা প্রোগ্রামিং করা আছে। কাস্টমার ওর খোলা বুক দেখতে ব্যস্ত থাকায় ভুলেই যায় ব্যালান্স ফেরত নেওয়ার কথা। কেউ ব্যালান্সের জন্য রিপিটেডলি নক করলে সাউন্ড অ্যাসেসর সিস্টেম তখন বাদবাকি টাকা ফেরত দিতে ওকে অ্যাক্টিভেট করে। বুঝেছেন কেসটা! সারাদিনে যদি বিক্রিবাটা হল পঞ্চাশ লাখ, তো ক্যাশ-এ পেলেন বাহান্ন কি তিপান্ন লাখ। এক বছরে একটা নতুন ফিমেল রোবট কিনে নেওয়া যাবে ওই বাড়তি টাকায়।
অমন ড্যাবড্যাবে চোখ করে তাকানোর কিছু নেই। দিস ইজ অলসো আ বিজনেস স্ট্র্যাটেজি। বুঝতে হবে পাবলিকের কোথায় সফট্ কর্নার। সেই সফ্ট্নেসকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটতে হবে। মিঃ বি-টু ভাল করেই জানেন— ওই ওম্যান-ক্রাইসিসের যুগে পুরুষরা নারীর জন্য লালায়িত হবেই। সকলের ক্ষমতা নেই লাখ-লাখ টাকা খরচ করে একটা বেড-পার্টনার জোগাড় করা। বিয়ে ব্যাপারটা তো ব্যাকডেটেড হয়ে গেছে কবেই। লিভ-টুগেদার চলছে কনট্রাক্ট বেসিসে। ও! ভাল কথা! একটা পারসোন্যাল কোয়েশ্চন করব? বলছিলাম— আপনার যা এজ্, তা দেখে মনে হচ্ছে আপনার ইয়াং এজের সময় ম্যারেজ সিস্টেমটা ব্যাপকভাবে চালু ছিল। আপনার কি ওয়াইফ্ আছে? নাকি কারোর সঙ্গে লিভ-টুগেদার করেন?
বুঝতে পেরেছি, আপনি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না। ডাজনট্ ম্যাটার। ইটস্ নাথিং বাট কিউরিওসিটি। আসলে এ প্রশ্ন করছি বিশেষ এক কারণে। কিছুক্ষণ আগে একজন হ্যান্সাম ক্লার্ক এসেছিল মনে আছে? সি-থার্টি, সেই ফর্সা ছেলেটা! বলেছিলাম না, ওর ব্যাপারে পরে বলব একটা ঘটনা।
ঘটনাটা হল— ছেলেটা আর সকলের চেয়ে ফর্সা এবং হ্যান্সাম হওয়ায় অফিস-কলিগরা ওকে খুব লাইক করত। করত নয়, এখনও করে। তবে, তখন পছন্দ করত অন্য কারণে। ওকে অনেকেই নিজের ফ্ল্যাটে ইনভাইট করত। আগেকার দিনের নিমন্ত্রণের মতো এখন তো আর পঞ্চব্যঞ্জন রান্না করে খাওয়ানোর ব্যাপার-স্যাপার নেই। এখন তো নিউট্রি-কেক বা এনার্জি-ট্যাব খেলেই পুষ্টি, এনার্জি, সে’ুয়াল-এ’াইটমেন্ট, সবকিছু। আসলে, ওকে ইনভাইট করত ওর সঙ্গে হোমোসেকস্ করার জন্য। ছেলেটা সকলের বাড়ি যেতে যেতে ওতে অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়ল। আপনি জানেন কি না জানি না, বছর চল্লিশেক আগে সারা দেশের ‘ইফেমিনেট সোসাইটি’ আন্দোলন করে হোমো-সে’ আইনসিদ্ধ করেছিল। তাই হোমোসে’ অফেন্স ছিল না। কিন্তু একটা সমস্যা হ’ল, হোমোসে’ এ নানারকম রোগের প্রাদুর্ভাব হ’ল। এই ইস্যুটাকে কাজে লাগিয়ে ‘পলিডল সেন্টার ওনার্স এসোসিয়েশন’ হোমোসে’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করল। কারণ ওদের ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছিল হোমোসে’-এর লিগ্যাল পারমিশন থাকায়। বন্ধ্, ধর্না এসব করে ওরা হোমোসে’ ব্যান করিয়ে ছাড়ল। ব্যাস! ওতে এই ক্লার্ক-ছেলেটা পড়ল ফাঁপড়ে। লুকিয়ে-চুরিয়ে হোমোসে’ করতে গিয়ে হাতে-নাতে ধরা পড়ল পুলিশের ওয়াচিং ডিপার্টমেন্টের লোকের হাতে। রুলস্-ভায়োলেশন কেস-এ দশ লাখ টাকা গর্চা গেল। কিন্তু, মুশকিলটা হল, ও অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়েছে। একটা দিন সে’ ছাড়া থাকতে পারে না। তখন করল কি, পলিডল সেন্টারে যাওয়া শুরু করল। কিন্তু বড্ড ব্যাড লাক ছেলেটার। বহুজনের ব্যবহার করা রাবার-মেয়ের সঙ্গে সে’ুয়াল অ্যাটাচমেন্টের ফলে ওর ডারমাটে’িয়া রোগ হল। সে রোগ সারাতেও বেশ কিছু টাকা খসল। তখন ডাক্তারের সাজেশন অনুযায়ী ও নিজের জন্য একটা ইমপোর্টেড রাবার ডল কিনে আনল। হেভি দেখতে ছিল পুতুলটা। একদম সত্যিকারের মেয়ের মতো। সুইচ অন্ করলে মুচকি হাসে, চোখ নাচায়। আমি ওর বাড়ি গিয়ে দেখে এসেছি। উত্তেজনায় চরম মুহূর্তে ওটা থেকে নাকি ফ্লুয়িড বেরোত আর হিসিং মেলোডি বাজত! কিন্তু রাবার পুতুলের লংজিবিটি আর কত হবে! ওটা তলতলে হয়ে যেতে ওর প্রতি অ্যাট্রাক্শন্ কমে গেল সি-থার্টির। ঠিক সেই সময় ই-নিউজ মেল-এ একটা বিজ্ঞাপন ওর চোখে পড়ল। ব্রাইড গ্রুম সিলেকশন, কাম সুন ...!
তা দেখে সি-থার্টির মন নেচে উঠল— নাম এিKC করলে কেমন হয়! বিয়ে করাটাতো আজকাল রেয়ার ব্যাপার হয়ে গেছে। যদি লাকে থাকে; তাহলে এই সুযোগে বিয়ে করা যাবে আর একটা সন্তানও তৈরি করে নেওয়া যাবে। তা না হলে মুশকিল! ক্লোনিং বেবি করাও বন্ধ হয়ে গেছে। একজন উত্তরাধিকারী তো থাকা দরকার।
ও করল কি, সঙ্গে-সঙ্গে একটা ট্যাক্সি নিয়ে, বিজ্ঞাপনে দেওয়া কাপ্ল্-প্লাজার ঠিকানায় ছুটল। গিয়ে দেখে কাউন্টারে লম্বা লাইন। চল্লিশ থেকে শুরু করে ষাট বছর বয়সী পুরুষের ভিড়। হবে না কেন? এখন তো এদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজনের বয়স সি’টি। তা শো-খানেক পুরুষ হবে। অথচ কাউন্টারের মাথায় লেজার সাইট-স্ক্রিনে চলমান অক্ষরগুলো জানাচ্ছে পাত্রী মাত্র একজন। তার নাম কে-এল টোয়েন্টি। জন্ম— দু’হাজার সাতাশ। প্রথম বিবাহে ইচ্ছুক। মাত্র একশো জনকে এিKC দেওয়া হবে। এিKC-ফি মাত্র কুড়ি হাজার টাকা।
সি-থার্টি লাইনটা মোটামুটি কাউন্ট করে দেখল নিজে একশো জনের মধ্যেই আছে। সুতরাং একটা চান্স নেওয়া যাক। এই ভেবে দাঁড়িয়ে গেল। অনেকক্ষণ দাঁড়ানোর পর ওর টার্ন এল ছিয়ানব্বই নম্বরে। টাকা দিয়ে নাম এিKC করতে, একটা কম্পিউটার নম্বর আর ফাইল নম্বর দেওয়া হল কাউন্টার থেকে। নির্দেশ অনুযায়ী লম্বা একটা হলঘরে গিয়ে দেখে, সারি সারি কম্পিউটার। অন্ করা আছে। স্ক্রিনে নির্দেশ ফুটে উঠেছে— আপনাকে দেওয়া ফাইল খুলে ফরম্যাট অনুযায়ী আপনার ডেটা দিয়ে দিন। কে-এল টোয়েন্টি ফাইল খুললে পাত্রী সম্পর্কে সমস্ত তথ্য পেয়ে যাবেন।
কাউন্টার থেকে দেওয়া নম্বর অনুযায়ী কম্পিউটার খুঁজে নিয়ে ফাইল খুলে তার সামনে বসে নিজের সব তথ্য কম্পোজ করল সি-থার্টি। সবশেষে কমান্ড বাটন টিপতেই স্ক্রিনে ফুটে উঠল—আপনার দেওয়া তথ্য কমিট করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আপনি নির্বাচিত হয়েছেন কিনা, তা আগামী কাল থেকে তিনদিনের মধ্যে ইন্টারনেটে কে-এল টোয়েন্টি ম্যারেজ মেল ডট কম ওয়েবসাইট-এ দেখে নিতে পারবেন। একশো জন আবেদনকারীর বায়োডাটা বিচার করে মাত্র কুড়ি জনকে ইন্টারভিউয়ে ডাকা হবে। ইন্টারভিউ নিয়ে পাঁচজনকে মনোনীত করে মেডিক্যাল চেকআপে পাঠানো হবে। যাদের রিপোর্ট সন্তোষজনক; তাদের সঙ্গে পাত্রী মুখোমুখি বসবেন। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একজনকে পাত্র হিসেবে বেছে নেবেন পাত্রী নিজে। যিনি চূড়ান্ত-মনোনীত হবেন, তিনি সাতদিনের মধ্যে পাত্রীর লিগ্যাল গার্জিয়ানকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা কশান ডিপোজিট দিয়ে পরের মাসের এক তারিখ থেকে পাঁচ বছরের জন্য কে-এল টোয়েন্টিকে ওয়াইফ হিসেবে পাবেন।
টার্মস্ এন্ড কন্ডিশনের এবং মেয়েটির বায়োডাটার পেপার প্রিন্ট-আউট নিয়ে এসেছিল সি-থার্টি। টার্মস্ এন্ড কন্ডিশনের সেকেন্ড পেজ-এ ছিল আরও কিছু শর্ত।
কী ব্যাপার! চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ কেন? এ সব মেয়ের গল্প ভাল লাগছে না? আপনি একটু সেকেলে দেখছি। আরে এখন তো ষাট বছর হ’ল ইয়াং এজ। এই বয়সে মেয়ের গল্প করবেন না তো ...। ঠিক আছে, পরের শর্তগুলো শুনুন। পাঁচবছরের কনজুগাল লাইফে কন্যা-সন্তানের জন্ম দিলে কুড়ি লাখ টাকা, আর পুত্র সন্তানের জন্ম দিলে দশলাখ টাকা কে-এল টোয়েন্টির অ্যাকাউন্টে ডিপোজিট করতে হবে। শান্তিপূর্ণভাবে পাঁচবছর কেটে গেলে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য রি-কন্ট্রাক্ট করা যাবে; যদি কে. এল-টোয়েন্টির কনসেন্ট থাকে। সে ক্ষেত্রে কশান-ডিপোজিটের ফিফ্টি পারসেন্ট ফরফিট হয়ে যাবে। তবে রি-কনট্রাক্ট করে টোটাল দশবছর একসঙ্গে নির্ঝঞ্ঝাটে কাটাতে পারলে পার্মানেন্টলি বউ থেকে যাবে। এই হ’ল মোটামুটি শর্ত।
তবে, সি-থার্টি এ সব শর্ত-টর্ত পড়ে ঘাবড়ে যায়নি। প্রাইমারি, মেডিক্যাল টেস্ট এবং ফাইনাল সিটিং-এও স্বচ্ছন্দে উতরে গেল হয়তো ফর্সা ও হ্যান্সাম হওয়ার জন্য। খুব লাকি ও, তাই না! তবে টোটাল ফিফটি ওয়ান লাখ মতন খরচ হয়ে গেল ওর, একটা বউ আনতে। পাঁচ বছরের মধ্যে মাত্র একবছর হয়েছে। আরও চার বছর বাকি থাকতে অভাবের তাড়নায় বউ চলে গেলে হেভি লস হয়ে যাবে ওর। তাই তখন অমন করে রিকোয়েস্ট করছিল বসকে। আপনি হাসছিলেন তখন। যার জ্বালা সেই বোঝে। যেমন এখন মিঃ বি-টুর জ্বালা যে কী, তা সহজে কি আমরা বুঝব। চলুন যাই, একটু বোঝার চেষ্টা করি। সম্ভব হলে আপনার দরকারি কথাটাও এখন সেরে নেবেন।
সাত
উরিব্বাস! একটা ‘ঝাক্কাস’ গাড়ি এসে থামল দেখছি। দাঁড়ান— দাঁড়ান, দেখা যাক কে এল। এই শো-রুমের সামনের পার্কিং-জোনে যখন গাড়ি পার্ক করছে; তখন নিশ্চয় এখানেই আসবে। ওই যে, নামল দেখছি দু’জনে। মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বলেই মনে হচ্ছে। এদিকেই আসছে। দেখা যাক, কী ব্যাপার!
উঃ! দেখেছেন, বেলা যত বাড়ছে, টেম্পারেচার তত বাড়ছে। ওরা কাচের দরজা ঠেলে ঢুকতে কেমন গরম হাওয়া ঢুকল ভেতরে। হাওয়া তো নয় যেন আগুনের হলকা! ওরা কাস্টমার মনে হচ্ছে। দেখছেন না, রিসেপসনিস্টের নির্দেশ মতো ওরা এদিকেই আসছে।
ইস! কী কদাকার দেখতে লোকটা! মুখের চামড়া যেন পুড়ে ভাজা-ভাজা হয়ে গেছে। তার ওপর আবার ঘাম জ্যাব্জেবে মুখখানা। ব্যাটা রে-প্রোটেকটিভ ক্রিম-ফ্রিম মাখে না বোধহয়! সে তুলনায় ম্যাডামের কিছুটা বিউটি আছে দেখছি। কালো হলেও স্কিনে একটা গ্লেজ আছে। তবে, দু’জনেই বেশ গাট্টাগোট্টা। কাপ্ল্টা বেশ ম্যাচ করছে বলুন হাঃ-হাঃ-হাঃ।
এবার চলুন ওদের পিছু পিছু যাওয়া যাক। বি-টু’র মুখের দিতে তাকান। কেমন গদগদ হাসি ভরা মুখখানা। এটা ওর একদম পেটেন্ট নেওয়া হাসি। শুধুমাত্র কাস্টমারকে রিসিভ করার জন্য। মনের মধ্যে যত চিন্তা-ই থাক্ না কেন, হাসিটা মুখে ঠিক সময়মতো এসে সেঁটে যাবে। লক্ষ রাখুন, বি-টু চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর একটা ভঙ্গি করবেন ওদের দেখে। যে কোনও খদ্দের এলেই এটা করেন। কিন্তু উঠবেন না, শুধু কাঁধদুটো আর ভুড়িখানা একটু নড়বে। তারপর টিপিক্যাল ভয়েসে বলবেন ...!
শুনুন-শুনুন, ওই যে বলছেন।
হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ? আপনার জন্য কী করতে পারি?
আমার একজোড়া মালাইচাকির দরকার। এখ্খুনি। পাওয়া যাবে?
অবশ্যই যাবে। বয়স কত বলুন।
অ্যাঁ?
বলছি পেসেন্টের বয়স কত? এজ?
বয়স চৌদ্দ বছর। আমার একমাত্র উত্তরাধিকারী । সকালে একটা অ্যাকসিডেন্টে ওর হাঁটুদুটো ...!
প্যাটেলা-রিপ্লেসমেন্ট সামান্য ব্যাপার। এমন কিছু এ’পেনসিভ নয়। বলুন, প্রিজার্ভ করা পুরোনো মাল নেবেন, না ফ্রেশ?
না-না পুরোনো টুরোনো নেব না। ছেলের জন্য ...!
অ্যাই তুমি থাম তো! আমি কথা বলছি।
আরে বাব্বা! এই না হলে মহিলা! দেখলেন মিস্টারকে ঝাঁঝি মেরে কেমন চুপ করিয়ে দিল। একেই বলে, ফিমেল-ডমিনেশন, বুঝেছেন! বহুযুগ ধরে ওরা ঝাড় খেয়ে এসেছে। থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়র কেমন চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে দেখুন। গলার সাউন্ড শুনছেন!
পুরোনো নিলে কত লাগবে? আর ফ্রেশের দামই বা কত?
ম্যাডাম! পুরোনো মানে খারাপ জিনিস ভাববেন না। একটু ওল্ড স্টক আর কি! তার দাম পড়বে এইট্টি থাউজেন্ড পার পেয়ার। আর ফ্রেশ যদি চান তাহলে দাম লাগবে ওয়ান টোয়েন্টি, একলাখ বিশ হাজার। লাইভ থেকে বের করে দেওয়া হবে। প্যাটেলা সবসময় ফ্রেশ দেওয়া সম্ভব হয় না। স্টক থেকেই নিতে হয়। আপনাদের লাক্ ভাল এখুনি একটা লাইভ ডিসেক্শন হবে।
আরে যা! করপুলেন্টটা ওর বউকে কী বলছে মিনমিন করে? কিছুই যে শোনা যাচ্ছে না! ওর মনের মধ্যে ঢুকতে হবে নাকি!
আরেবাবা! অমন মিউমিউ করছ কেন? যা বলবে জোরে বল না! আচ্ছা মানুষ বটে!
ওঃ! বউটার গলা শুনলেন! লোকটা মিউমিউ করে কী বলছে শুনুন!
বলছি— ডাক্তারের সঙ্গে একটু কথা বলে নিলে হ’ত না?
ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে আর কী হবে। ডাক্তার তো ফ্রেশ প্যাটেলাই নিতে বলবে। ফ্রেশ জিনিস সেট করা সুবিধা হবে ওদের পক্ষে। আমাকে খরচের ব্যাপারটা তো ভাবতে হবে।
আমি একটা কথা বলব ম্যাডাম! বলছিলাম ফ্রেশ প্যাটেলাই নিয়ে যান। পুরোনোতে একটু রিস্ক থেকে যায়। মাত্র চল্লিশ হাজারের জন্য ...! পুরোনো নিলে আমার লাভ বেশি হবে। তবুও আপনার ভালোর জন্য বলছি।
ঠিক আছে তাই দিয়ে দিন। কী আর করা যাবে। সকাল-সকাল এতগুলো টাকা গ্যাটিস। অপারেশন চার্জ, নার্সিংহোমের চার্জ, সব মিলিয়ে লাখ-দশেকের ধাক্কা। জানেন, এই মানুষটার জন্যই হল!
আমার জন্য হ’ল! আমি কি ওকে গাড়িতে ধাক্কা দিয়েছি?
তা নয়তো কী! জল কিনে আনতে বললাম, তো নিজে নড়তে পারলে না, ছেলেটাকে পাঠালে।
বাড়ির সামনে সামান্য রাস্তার ওপার থেকে জল আনতে গিয়ে যদি গাড়ি চাপা পড়ে তো আমার দোষ। একেবারে মরে গেলে খরচের হাত থেকে বাঁচতাম। পা ভাঙা অবস্থায় তো আর ফেলে রাখা যায় না।
প্লীজ! আপনারা উত্তেজিত হবেন না। এটা তো আপনাদের পারসোন্যাল ম্যাটার। নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে না হয় ...! আজকাল রাস্তায় বেরোনোই রিস্ক। কখন যে কী হয়!
আর বলবেন না স্যার, বড়লোকের মাতাল ছেলেগুলো এমন বেপরোয়া গাড়ি চালায়। ব্যাটচ্ছেলে যেন আকাশরেল চালাচ্ছে। বুঝলেন, যে চালাচ্ছিল তার বয়স বেশি নয়, পুচকে ছোকরা, সতের-আঠারোর বেশি হবে না। ব্যাটা নিজেও ঘায়েল হয়েছে। গাড়ি কন্টে্রাল করতে পারেনি। রেলিং-এ ধাক্কা মেরেছে।
ম্যাডাম! পেসেন্টের নেম-অ্যাড্রেস বলুন। আর অর্ডার কপিটা কী নামে হবে?
পেসেন্ট-মাস্টার কে-জে ফোর-হানড্রেড। থ্রি-ডি, ক্লাস্টার-ফোর, ইস্ট রেঞ্জ। অর্ডার কপি ওর বাবার নামেই করুন। মিঃ কে-জে থ্রি।
ঠিক আছে। কোন্ নার্সিংহোমে ডেলিভারি দিতে হবে?
নার্সিংহোমে!
হ্যাঁ, আপনার ছেলের প্যাটেলা নিশ্চয় বাড়িতে লাগাচ্ছেন না!
না, বাড়িতে কী আর কম্পিউটার-এডেড নেভিগেশন সিস্টেম আছে! সেজন্যই ভলক্যানো অর্থোপেডি’ে ...। বলছিলাম, এখুনি আমাদের দিয়ে দিলে ...!
ম্যাডাম! ফ্রেশ মাল নিচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গে কী করে পাবেন বলুন। ফার্ম হাউস থেকে লাইভ কিডি আসবে, মালাইচাকি কেটে বের করা হবে, তবে তো আপনাকে দেওয়া যাবে। পেমেন্ট ক’রে, অ্যাড্রেস দিয়ে যান। উইদাউট ফেল পৌঁছে যাবে প্যাটেলা। আর যদি নিয়ে যেতে চান, তাহলে ওয়েট করুন ঘন্টাখানেক। পেয়ে যাবেন।
না-না অপেক্ষা করার টাইম নেই। আমাদের ওদিকটায় আবার রাস্তা সারানোর কাজ চলছে। খুব জ্যামজট হয়েছে। ঠিক আছে। তাহলে ভলক্যানো অর্থোপেডি’্-এ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডেলিভারি দেবেন। ওটা সাউথ জোন সেক্টর টু-তে। ডাঃ এস ফর্টিনের আন্ডারে আছে আমাদের ছেলে।
ও-কে! ভ-ল-ক্যানো অর্থোপেডি’। থ্যাঙ্ক য়্যু। এই নিন অর্ডার কপি। ক্যাশ-কাউন্টারে টাকাটা জমা দিয়ে রিসিট নিয়ে নিন।
কী বুঝলেন? ফ্রেশ কিডি বলতে তো মার্স অরফ্যানেজ এর বাচ্চাটা। সে হয়তো এখন অরফ্যানেজে কিংবা অ্যাম্বুতে। অথচ তার মালাইচাকি বিক্রি হয়ে গেল। দিস ইজ কলড্ মর্ডান বিজনেস। মিঃ বি-টু কেমন ওভার-কনফার্মড্ দেখলেন অনাথ-আশ্রমের ওই বাচ্চাটা পাওয়ার ব্যাপারে। এরকম সোর্স আরও কিছু আছে। গোটাকয়েক মেন্টাল হসপিটাল, ভ্যাগাবন্ড রিহ্যাভিলাইটেশন সেন্টার। এছাড়া আর এক ধরনের সোর্সও ছিল। এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে। দু’একটা আন্ডারওয়ার্ল্ড কনসার্ন ছিল, যারা বেবী, টিন-এজার এসব কিডন্যাপ করত স্কুল কিংবা স্ট্রিট সাইড থেকে। তারপর সেগুলোকে কিছুদিন রেপ-টেপ করে, পুরোনো হয়ে গেলে বেচে দিত এইসব লিম্ব সাপ্লায়ার্স কোম্পানিতে। এরাও সস্তা দামে ওই হাফ-ডেড বডি কিনে নিত। মক-আপ অ্যাম্বুলেন্সে করে ভেতরে নিয়ে এসে স্যাটাস্যাট ছুরি, কাঁচি, ফরসেপ, সেফ্টি প্যাক। তার ওপর ব্যাকডেটের স্টিকার।
কিন্তু একবার একটা চক্র ধরা পড়ে গেল, এক ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের নাতনিকে কিডন্যাপ করার জন্য। সাধারণ মানুষের বেবি ভেবেই কিডন্যাপ করেছিল। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টের নাতনি হওয়ায় পুলিশের ওপর প্রেসার এল। বাধ্য হয়ে ওদেরকে তদন্ত করতে হল এবং গ্যাংটাকে ধরতে হল। কিন্তু একটা মজার কথা কি জানেন, আসামীরা কোর্টের কাঠগড়ায় ওঠার আগেই মার্ডার হয়ে গেল।
ভাগ্যিস, ওরা মার্ডার হ’ল। তা না হলে মিঃ বি-টুকে ভাল ফাঁসা ফাঁসতে হত। গ্যাংটা ধরা পড়ার খবর পেয়ে মিঃ বি-টুর তো পালস্ বিট থেমে যাওয়ার অবস্থা। তবে, ওঁর লাকটা খুব ভাল প্রবলেম এলেও ঠিক সলভ্ হয়ে যায়। এই আজকের কথাই ধরুন না— হার্ট স্টকে নেই, এমনকি ফার্মহাউসে লাইভ কিডিটাও ম্যাচ করল না। অথচ অর্ডার নিয়ে বসেছে। চেষ্টা চরিত্তির করে জোগাড় তো করে ফেলেছে। অবশ্য এখনও ও-টিতে পৌঁছয়নি, তাই একটু চিন্তা। দেখছেন না, টেনসনে চোখমুখ কেমন টানটান হয়ে আছে। টাইম যে পেরিয়ে যাচ্ছে। ঘন্টা-খানেকের মধ্যে ডাঃ এস-ফিফ্টি’র নার্সিংহোমে ও-পজেটিভ গ্রুপের হার্ট সাপ্লাই দেওয়ার কথা। এর মধ্যে পঁয়ত্রিশ মিনিট তো কেটেই গেল।
মিঃ বি-টু এখন কী ভাবছে দেখা যাক ওর মনের মধ্যে পাড়ি দিয়ে।
... ফ্রেশ প্যাটেলার পেমেন্ট তো ক্যাশে চলে এল; কিন্তু লাইভ কিডিটা তো এখনও এসে পৌঁছল না! অ্যাম্বুল্যান্স বেরিয়েছে; বেশিক্ষণ হয়নি। ওদিকে ডাঃ এস ফিফটি হার্টের জন্য ওয়েট করছে। বড্ড বেশি রিস্ক নেওয়া হয়ে গেল। কিডিটা ভালয়-ভালয় পৌঁছে গেলে হয়। অরফ্যানেজ এর ম্যানেজারকে একটা এম এম এস পাঠানো যাক। কদ্দুর কী করল কে জানে!
মিঃ বি-টু এখন এমএমএস পাঠান, চলুন, আমরা ততক্ষণ অপারেশন থিয়েটারে একটু ঘুরে আসি। ওরা কী কদ্দুর অ্যারেঞ্জমেন্ট করে রেখেছে দেখা যাক।
আরে! কী ব্যাপার! মালাইচাকি কিনতে আসা ভদ্রলোকের ঝাক্কাস্ গাড়িটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে দেখছি। ওরা কি একেবারে মালাইচাকি নিয়ে ফিরবে; নাকি অন্য কোনও ব্যাপার! চলুন তো দেখি কেসটা কী!
ট্রাফিক সার্জেন্টের সঙ্গে তর্কাতর্কি হচ্ছে দেখছি। তাহলে গাড়ি-সংক্রান্ত কিছু হবে। চলুন, কাছাকাছি যাওয়া যাক। ওদের কথাবার্তা শোনা যাবে।
... আরে মশাই! আমি তো গাড়ি ব্যাক করে নিয়েছি। ছেলেটা নার্সিংহোমে তাই ...!
ব্যাক্ করে নিলে কী হবে! আপনি তো সুপারফাস্ট চ্যানেলে ঢুকেছিলেন। আমি না আটকালে আপনি কি ব্যাক্ করতেন গাড়ি। ওসব এ’কিউজ ছাড়ূন। হয় স্পট ফাইন দিন কুড়ি হাজার টাকা; নয়তো গাড়ির ব্লু-বুক কোর্ট থেকে নেবেন। সেই জুরাসিক যুগের গাড়ি নিয়ে সুপারফাস্ট চ্যানেলে ঢুকে মিনিস্টারদের গাড়ি অবস্ট্রাক্ট্ করবেন, আর ফাইন দেবেন না। তা কি হয়।
শুনুন না, আসলে ভুল করে ...।
ভুল যখন করেছেন, তার কমপেন্সেট তো করতেই হবে! এমনিতেই এই সব ঝাক্কাস-মাক্কাস গাড়ি চালানো বন্ধই করে দিয়েছে মোটর ভেহিক্যালস্। এখন ফিউসনার, গ্র্যাভিটার, হুশুকাই এসবের যুগ। আমরা দেখেও দেখি না। তাই এই বায়োফুয়েলে চলা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পার পেয়ে যান। আপনি প্রজনন-মন্ত্রীর গাড়ি আটকে ফেলেছিলেন আপনাকে ছেড়ে দিলে আমার চাকরি থাকবে? পুলিশমন্ত্রীকে ধরেটরে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে চাকরিটা বাগিয়েছি। এত সহজে হারাতে রাজি নই। আরে! আপনার ব্লু-বুকে তো দেখছি গারবেজ স্ট্যাম্প পড়ে গেছে; তবুও গাড়ি কার-গারবেজে ফেলেননি কেন? আপনার স্পট-ফাইন তো নেওয়া যাবে না!
আচ্ছা স্যার! এই নিন কুড়ি হাজার টাকা। ফাইনের রসিদ দিয়ে দিন। প্লীজ!
না-না, কুড়ি কেন পঞ্চাশ হাজার দিলেও আমি নিতে পারব না। আগে খেয়াল করিনি গারবেজ-স্ট্যাম্প পড়ে গেছে। গাড়ি এখান থেকেই স্টে্রট গারবেজে যাবে। গারবেজ-ট্যা’ বাবদ বিল পৌঁছে যাবে আপনার ফ্ল্যাটে। গাড়ি চালানোর এতই যদি সখ তো একটা সোলার-হুশুকাই, কিংবা অ্যাটমিক ফিউসনার গাড়ি কিনে নিন না। যান— কাটুন তো!
... ... ...
কী হল? মোটা আর মুটি তো গাড়ি ফেলে চলে গেল। আপনি অমন ইলোডহপারের মতো তাকিয়ে আছেন কেন এখনও? কেসটা মাথায় ঢোকেনি নাকি? আরে বাবা! এই ‘ঝাক্কাস’ গাড়ি হ’ল কুড়ির দশকের গাড়ি। বায়োডিজেলে চলে। সৌরশক্তি আর পরমাণুশক্তি চালিত গাড়ি মার্কেটে আসার পর এগুলো টাইম-ব্যারেড হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে যেটার কন্ডিশন খুব খারাপ, সেটা কার-গারবেজে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ গাড়িটা সি এফ নিতে গিয়ে বাতিল বলে গণ্য হয়েছে। কর্পোরেশনের কার গারবেজ আছে। ওখানে গাড়িটা ফেলে দেব বললেই ফেলা যায় না। গারবেজ-ট্যা’ দিতে হয় কর্পোরেশনকে। গাড়িও যায়, টাকাও যায়। তার ওপর ঝামেলাও কি কম! কর্পোরেশন অফিসে বারকতক দৌড়াতে হয়। বেচারা আজ নিশ্চয় ড্রাগনের স্বপ্ন দেখেছিল। সকাল থেকে কপালে দুর্ভোগ আর টাকার ফান্ড-ট্রান্সফার।
কী বলছেন? ড্রাগন কী জানেন না? আপনার তো জানার কথা! হয়তো ভুলে গেছেন। জায়নার নাম শুনেছেন? যাকে গোদা বাংলায় বলা হয় জীন দেশ। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে দেশটার অর্ধেক ধ্বংস হয়ে গেল অ্যাটম বোমায়। অনেক আগে ওই দেশের জাতীয় প্রতীক ছিল ওই ড্রাগন। অবশ্য বছর চল্লিশেক আগে ওই প্রতীক বাতিল হয়ে ‘ইউফন’ হয়েছিল। ওই ড্রাগন ভয়ঙ্কর দেখতে ছিল। ক্রোকোডাইলের ছবি দেখেছেন? অনেকটা ওই ক্রোকোডাইলের মতো দেখতে। ওর মুখ থেকে আগুন বেরোত নাকি! সত্যি-মিথ্যা জানি না। বাস্তবে ড্রাগন বলে কিছু ছিল কিনা, তা-ও জানি না। যাই হোক, এই সেঞ্চুরির প্রথম দিকে, মানে দু’হাজার সাত-আট সালে ওরা ড্রাগনের গায়ে ইভিলের লেবেল সেঁটে দিল। তখন থেকে ড্রাগন নাকি অশুভর প্রতীক। কেউ স্বপ্নে ড্রাগন দেখলে তার নাকি খারাপ সময় আসে— এসব চালু করল ওদের দেশের বুদ্ধিজীবিরা। অবশ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। ওয়েবসাইটে জায়না-পল.হিস্ট.ডট.কম সাইট খুলে একটু পড়ে নেবেন। বুঝতে পারবেন।
থার্ড-ওয়ার্ল্ড ওয়রের পর তো ওরা ‘ইউফন’ বাতিল করে ‘কিংসাং’ রেখেছে। যাক গে, ওসব ফালতু কথায় গিয়ে কাজ নেই। চলুন, যেখানে যাচ্ছিলাম সেখানেই যাই। মিঃ বি-টুর অপারেশন থিয়েটারে কী প্রস্তুতি চলছে দেখা যাক্।
আট
লুক দেয়ার! একটা অ্যামবুল্যান্স এসে দাঁড়াল দেখছি। জেনুইন সেট-আপ নাকি মক্-আপ অ্যাম্বুটা এল, কে জানে! চলুন দেখা যাক্। ওই যে স্টে্রচার নামাচ্ছে।
স্টে্রচারে ছেলেটা ঘুমিয়ে আছে মনে হচ্ছে, তাই না! ওকে কোনও ট্র্যাঙ্কুলাইজার খাইয়েছে। এটা মক-আপ অ্যাম্বু। ইস্ট রেঞ্জের সেই অ্যা’িডেন্ট কেস্টা নয় তাহলে। চলুন, আমরা এখন অপারেশন থিয়েটারে যাই। এখুনি বাচ্চাটাকে কাটা হবে। আপনার লাক ভাল, সব ভিজিটরের কপালে জোটে না অপারেশন দেখা। ওই দেখুন মিঃ বি-টু’র কম্পিউটারের স্ক্রিনে বাচ্চাটাকে দেখা যাচ্ছে। ক্লোজ সার্কিটে ধরেছেন। কাটার আগে লাইভ-কিডিটা একবার দেখে নিলেন উনি। এখন ওঁর চোখ-মুখের এ’প্রেশন দেখছেন! কেমন ব্রাইট, টেনশন-ফ্রি হলেন তো তাই।
ওই যে ফোনে ধরছেন ডাঃ এস ফিফটিকে। ডাক্তারও তো ওরিড্, তাকে এনসিওর করছেন— ডক্টর! উইদ্-ইন হাফ্ অ্যান আওয়ার হার্ট পৌঁছে যাচ্ছে গ্যালা’ি হার্ট রিসার্চে। ও-কে। তাহলে চেক এর ব্যাপারটা ...!
ডোন্ট ওরি মিঃ বি-টু। ঘন্টাখানেক পর আপনার অ্যাকাউন্ট-বুক ডিসপ্লে করলেই দেখতে পাবেন ক্রেডিটে যোগ হয়ে গেছে ওয়ান ক্রোড়।
থ্যাঙ্ক য়্যু স্যার, থ্যাঙ্ক য়্যু। ছাড়লাম।
দেখুন মিঃ বি-টুর মোটা ঠোঁটের কোনে কেমন পাতলা হাসি। তাহলে হিউম্যান লিম্ব সাপ্লাইয়ের বিজনেস সম্পর্কে কিছুটা অভিজ্ঞতা হ’ল আপনার। আচ্ছা! আমার খুব কিউরিয়সিটি হচ্ছে, এত কিছু দ্রষ্টব্য স্থান থাকতে আপনি হঠাৎ এই ভেনাস লিম্ব সাপ্লায়ার্স দেখতে চাইলেন কেন? আর এই মালিকের সঙ্গেই বা কথা বলতে চাইছেন কেন?
অবশ্য আপনার আপত্তি থাকলে না বলতে পারেন।
কী বলছেন? নিশ্চয় কোনও কারণ আছে। এখন জানাতে চান না। ও-কে, ও-কে, স্যরি ফর ওভার-কিউরিওসিটি। চলুন এবার ও.টি.’র কাণ্ডকারখানা দেখা যাক। না-না, না-না! দাঁড়ান একটু। মিঃ বি-টু ইন্টারকামে হাউস সার্জনকে ধরেছেন। কী নির্দেশ দিচ্ছে শুনুন। তারপর এগোবো আমরা।
... ডক্টর! কিডিটা এসে গেছে। উইদ-ইন্ হাফ অ্যান আওয়ার হার্টটা ডেলিভারি হবে। প্যাটেলা দুটো প্রিজার্ভ করার দরকার নেই, ভলক্যানো অর্থোপেডি’ে্ আর্জেন্ট পার্সেল হবে। আর কসমিকের অর্ডার লিস্টে একটা কিডনি, গ্রুপ-ও, আর এইচ পজেটিভের। যা স্টকে নেই; খেয়াল আছে তো?
ইয়েস স্যার! এই কিডির একটা কিডনি কসমিকে যাবে। অন্যটার কি আর্জেন্ট পার্সেল আছে? নাকি প্রিজার্ভ হবে স্যার?
না আপাতত অর্ডার নেই। প্রিজার্ভ করুন। আর শুনুন, ব্লাড যেন ওয়েস্টেজ না হয়। ক্লট ব্লাডগুলো প্রিজার্ভ করবেন। ক্লট ব্লাডের এখন বাজার চড়া। আর দাঁতগুলো অ্যাজ-ইউজুয়াল খুলে টুথ-ব’ে রাখবেন।
জমাটবাঁধা রক্ত, দাঁত কী কাজে লাগবে জানতে চাইছেন তো! ক্লট-ব্লাড প্যাক্ কর়ে ব্লাড ডাস্ট কোম্পানিতে বিক্রি করা হবে। ওগুলো থেকে ব্লাড-পাউডার তৈরি হবে। আজকাল ব্লাড-পাউডারই ইউজ করা হচ্ছে বেশি। আর দাঁতগুলো যাবে জুয়েলারীতে। ওগুলো দিয়ে গয়না তৈরি হয় এ ব্যাপারে পরে কথা হবে। এখন ও.টি.তে চলুন। কিডিটাকে বোধহয় অপারেশন টেবিলে তুলে ফেলেছে এতক্ষণে। চলুন-চলুন। একটা এমেজিং এ’পিরিয়েন্স্ হবে।
ওই দেখুন অ্যানাস্থেসিস্ট ওর নাক থেকে গ্যাস-মাস্ক খুলে নিল। কয়েক মিনিট পরেই ওটাকে কাটা শুরু হবে। ওই যে ফাইবার গ্লাসের তৈরি ওভাল-টাইপের ব’গুলো দেখছেন; ওগুলো হ’ল সেফ্টি প্যাক। ওর মধ্যে হার্ট, লাং, কিডনি এসব প্যাক করা হয় ডেলিভারি দেওয়ার জন্য কিংবা প্রিজার্ভ করার জন্য। ওই যে সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে আছে, ওকে সত্যিকারের নার্স ভাববেন না। না, মানে নার্স ঠিকই, কিন্তু মানুষ নার্স নয়; রোবট-নার্স। ওটার ফটো-অ্যাসেসর সিস্টেম অ্যাক্টিভেট করা আছে। ওর চোখ-দুটো সাধারণ মানুষ কিংবা সার্জনের চেয়েও বেশি তীক্ষ্ণ হয়ে পেসেন্টের দিকে তাকিয়ে। সার্জারির ডিটেলিং টো-টো প্রোগ্রামিং করা আছে ওর বুকের ভিতর। তাই যখন যে ইক্যুইপমেন্টটা দরকার ও ঠিক এগিয়ে দেবে ডাক্তারের হাতের কাছে। মানুষ নার্সের ভুল হলেও, ওই রোবট-নার্সের ভুল হবে না।
আরিব্বাস! আজ তিনজন সার্জনই অ্যাপ্রন পরে প্রস্তুত দেখছি। এমার্জেন্সি লিম্ব সাপ্লাই দেওয়ার ব্যাপার আছে বলেই বোধহয়। এবার শুরু হচ্ছে দেখুন স্ক্যালপেল ব্লেড, সীজার, ফরসেপের খেলা। দেখছেন স্ক্যালপেলের একটানেই বুকটা কেমন হাঁ হয়ে গেল। উনি হলেন ডাঃ এস ওয়ান। ওর হাত দারুণ শার্প। ছুরির যা টান দেবেন এক মাইক্রোমিটার এদিক-ওদিক হবে না।
ওই দেখুন নিমেষের মধ্যে চামড়া-মাংস সরিয়ে বুকের খাঁচা বের করে ফেলেছেন। ওই মেসিনটা হচ্ছে অটোম্যাটিক্ বোন-কাটার। শুনুন! কু-র-র-র করে একটা হালকা শব্দ পাচ্ছেন; ওটা হল হাড় কাটার শব্দ। বুকের পাঁজরগুলো কাটা হচ্ছে হার্টটাকে নিখুঁতভাবে বের করার জন্য। ওই যে কয়েকখানা পাঁজরা কাটা হয়ে গেল। দেখুন, হালকা গোলাপি রংয়ের হৃদপণ্ডটা কেমন তুড়ূক-তুড়ূক করে লাফাচ্ছে। ফুসফুস দুটো কেমন ফুলছে আর চুপসাচ্ছে। বুকের কাছটা বাদ দিয়ে দেহের অন্য অংশে চোখ ফেলে দেখুন, মনে হচ্ছে যেন বছর পনেরর বাচ্চাটা টেবিলে শুয়ে ঘুমোচ্ছে।
কী হল? আপনি অমন করছেন কেন? এনি প্রবলেম? আন-ইজি ফিল করছেন নাকি? চলুন তাহলে আর সার্জারি দেখে কাজ নেই। তাছাড়া দেখার আর আছেটাই বা কি! এবার সিজার দিয়ে কুচুৎ-কুচুৎ করে সব ভেইন-আর্টারিগুলো কাটবে। কেটে হার্ট, লাং এসব আলাদা করে নিয়ে সেপারেট সেফটি ব’ে পুরবে। হার্টের পর ওরা মালাইচাকি দুটোতে হাত দেবে। ওদুটোর আর্জেন্ট অর্ডার আছে যে! মালাইচাকি খুলে নেওয়া দু’মিনিটের কাজ।
তা হোক্! আর দেখতে হবে না। আপনার নার্ভ খুব দুর্বল। চলুন ওখানে গিয়ে একটু বসবেন। প্রিজার্ভ-রুম, ক্রিমেটোরিয়াম এরকম টুকিটাকি দু-একটা জিনিস দেখানোর বাকি আছে। আপনি একটু সুস্থ হলে ওগুলো স্যাটাস্যাট দেখিয়ে দেব। ইচ্ছে করলে আমি ওগুলো আপনাকে না দেখাতেও পারতাম। কিন্তু আমি পার্টিকে চিট্ করি না। আজ আপনি স্যাটিসফায়েড হলে, তবেই না কাল অন্য কিছু দেখতে যাওয়ার সময় আমাকে গাইড রাখবেন। বসুন এখানে। এনার্জি ট্যাবলেট খাবেন একটা। না-না হেজিটেট করবেন না। আমাদের সব কিছুই রাখতে হয়। পার্টির কখন কি দরকার পড়ে। আপনি ইচ্ছে হলে নিতে পারেন। বিল করার সময় আমি ঠিক ওর দাম ধরে নেব। নিন ধরুন।
এবার কিছুটা সুস্থ লাগছে? ঠিক হয়ে যাবেন এখুনি। ও কিছু হয়নি। এসব দেখার হ্যাবিট নেই তো তাই ...! আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না! শহরে এত ভিজিটিং প্লেস থাকতে আপনি এই ভেনাস হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স কেন চুজ করলেন! এটাতো কোনও ভিজিটিং-প্লেস নয়, মিড্লম্যান হিসাবে আমি এদের কাস্টমার ধরে দিই, তাই আমার অবারিত দ্বার। আপনাকে ওরা কাস্টমার ভাবছে। ও হ্যাঁ, মি. কে-বি-টু’র সঙ্গে কী কথা বলবেন বলছিলেন; কই বললেন না তো?
ওহ্ গড্ কী হ’ল? যাঃ! কোনও সাড়াশব্দ নেই দেখছি! সেন্সলেস হয়ে গেল বোধহয়? এ আর এক হ্যাজার্ড!
কে-বি-টু
ক্লোজ সার্কিট স্ক্রিনে একটু দেখা যাক, অপারেশন থিয়েটারের প্রেজেন্ট সিচুয়েশনটা। হার্ট ডেলিভারি দেওয়ার টাইম ওভার হয়ে যাচ্ছে। ডাঃ এস. ফিফটি এক্ষুণি ফোন করবে হয়তো!
যাক্, এবার কিছুটা রিল্যা’ড্ হওয়া গেল; সেফ্টি প্যাকে হার্টটা প্যাক্ হচ্ছে দেখছি। ডেলিভারি-ম্যান রেডিই আছে। মিনিট পনেরোর মধ্যেই পৌঁছে যাবে গ্যালাক্সি হার্ট রিসার্চ সেন্টারে। এবার প্যাটেলা দুটো বের করে ব’ে ভরতে পারলে হয়। চোদ্দবার ফোন করে করে ভে’ট্ করে দিল ওই ডিসগাস্টিং লেডি। অ্যাডভান্সড্ পে করে গেছে বলে যেন আমার হেড-পারচেজ করে নিয়েছে।
ওহ্! একটা ব্যাপার মাথা থেকে একদম আউট হয়ে গেছে! র্যাফ এখনও ইস্ট রেঞ্জ থেকে ইনজিওর্ড্ কিডিটা কালেক্ট করে ঢুকল না তো! কে-সি-এইটের কোনও ফোন বা মেসেজও নেই। কোনও প্রবলেম অ্যারাইজ্ করল নাকি! এতক্ষণ ঢুকে যাওয়া উচিত ছিল। দেখি কে-সি-এইটকে একটু ফোনে ধরা যাক।
... এনি প্রবলেম?
অল ইজ্ ও-কে স্যার! নো প্রবলেম। পৌঁছতে দেরী হচ্ছে অন্য কারণে। অ্যা’িডেন্ট হওয়ার কারণে একটু রোড জ্যাম হয়েছিল। তাছাড়া রোড রিপেয়ারিং হচ্ছে ইস্ট রেঞ্জে। তাই রুট-ডাইভার্ট করে দিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। ইস্টার্ন বাইপাস হয়ে আসতে হচ্ছে। বাইপাসে হঠাৎ বেশি লোড পড়েছে তাই স্লাইট ট্রাফিক কন্জেশন্। উইদ-ইন টোয়েন্টি মিনিট্স্ পৌঁছে যাব আশা করছি।
হ্যাঁ, আমার এক কাস্টমার বলছিল বটে, ইস্ট রেঞ্জে রোড রিপেয়ারিং চলছে। ও-কে গুড-বাই।
যাক্, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এটার ব্যাপারে অবশ্য ভাবিনি। মনেই ছিল না র্যাফ পাঠানো হয়েছে। আসলে, দারুণ ওরিড্ ছিলাম ফার্ম-হাউসের কিডিটার ব্লাড গ্রুপ ম্যাচ না করায়। অনেক ব্রেন অ্যাপ্লাই করে অরফ্যানেজ থেকে জোগাড় অবশ্য হ’ল। এটার খবর যদি আগে পেতাম, তাহলে হয়তো ...। কালেক্টর তো জানাল অরফ্যানেজ-এ মক-আপ অ্যাম্বুল্যান্স পাঠিয়ে দেওয়ার পর। তবে গ্রুপ ম্যাচ করত কি না সেটা একটা ব্যাপার। অরফ্যানেজের কিডিটার দাম একটু বেশি পড়ল এই যা! তবে প্রফিট কম হবে না। হার্টটাতেই তো ওয়ান ক্রোড় এসে গেল। দেখি তো, অ্যাকাউন্টের ক্রেডিটে ওটা অ্যাড হল কি না। ডাঃ এস.ফিফটি তো তখন ফোনে বলল, আধঘন্টার মধ্যেই অ্যাকাউন্ট টু অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার হয়ে যাবে।
উফ্! আবার ফোন বাজছে। এবার যদি ওই মহিলাটি হয় না ...! অবশ্য ডক্টর এস.ফিফটিও হতে পারে। নাহ! ওরা তো নয়; নিউ নাম্বার দেখছি, অন্য দেশের।
... গুড্ ডে। ভেনাস হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স।
গুড ডে! মে-আই স্পিক টু মিঃ কে-বি-টু!
ইয়েস স্পিকিং।
স্পিকিং ফ্রম ক্রায়োনি’্ সেন্টার অফ্ ফ্রস্টেলিয়া।
ইয়েস প্লীজ!
ডু ইউ রিমেম্বার উই আস্ক্ড্ য়্যু টু বী প্রেজেন্ট অ্যাট আওয়ার সেন্টার অন্ দ্য ডে ইওর গ্র্যান্ডপা ওয়াজ কম্প্লিটিং হিজ ক্রায়োনি’্ পিরিয়ড?
নো!! ওহ্! আই মিন ইয়েস ... আই গট দ্য মেসেজ বাট ...!
উই অলসো আস্কড্ য়্যু টু টেক ইওর গ্র্যান্ডপা ব্যাক হোম উইদ্ ইউ।
ও আই সি! ... আই ... আই ওয়াজ এ’ট্রিম্লি বিজি ...।
বাট য়্যু ডিড্ন্ট্ টার্ন আপ টু উইট্নেস সাচ আ স্পেক্টাকুলার ফেনোমেনা— নর ডিড য়্যু কেয়ার টু সেন্ড সাম-ওয়ান ডাউন হীয়ার টু টেক হিম ব্যাক হোম।
নো। অ্যাকচুয়ালি আই ট্রায়েড ... আই মিন ...।
ক্যান য়্যু ইমাজিন হাউ সাকসেস্ফুলি ইওর গ্র্যান্ডপা হ্যাজ পাস্ড্ থ্রু দ্য ফোর ডিকেড্স লং পিরিয়ড? ইট্স ইনডিড এমেজিং!
ওহ্ রিয়েলি?
হি ওয়াজ ডি-ক্রায়োনাইজ্ড্ অন্ সেভেন্থ্ জুলাই অ্যান্ড ব্রট ব্যাক টু হিজ সেন্সেস্ উইদাউট এনি ট্রাবল! আনবিলিভেব্ল্!
ব্রাভো!
হি ওয়াজ অ্যাংসাস্লি ওয়েটিং ফর ইউ। অ্যান্ড য়্যু নো, নো পেসেন্ট ইজ অ্যালাউড টু স্টে ব্যাক হীয়ার মোর দ্যান্ ফিফটিন ডেজ আফটার হিজ ডিক্রায়োনাইজেশন্। বাট হি ওয়েটেড ফর ইউ থার্টি ডেজ! দেন হি ডিসাইডেড টু লিভ দ্য সেন্টার। অ্যান্ড হি ডিড ইট্ অন হিজ ওন্। হি ওয়াজ গিভ্ন্ সাম ডলার্স্ ফর হিজ ট্রাভেলিং অ্যান্ড পকেট এ’পেন্সেস্ অ্যাট দ্য টাইম অফ্ ডিপারচার অ্যাজ পার এগ্রিমেন্ট অ্যান্ড অল্সো ইওর অ্যাড্রেস উইথ হিম!
ইজ ইট?
ইয়া, নাও উই লাইক টু নো হ্যাজ হি রিচড্ টু ইউ? দিস্ ইজ নাথিং বাট আওয়ার ফরম্যাল ডিউটি।
নো হি হ্যাজ্নট্ টার্ন আপ ইয়েট !
দেন উই আর হেল্পলেস। নাউ ইটস্ ইওর রেস্পন্সিবিলিটি টু ফাইন্ড হিম। ও-কে! গুড বাই।
এই আর এক প্রবলেম! বিফোর আ মানথ্ ইনফর্ম করেছিল ঠিকই কিন্তু এত কী আর মাথায় থাকে। তাছাড়া তেমন ইম্পট্যান্স দিইনি। গ্র্যান্ডফাদার নামের লোকটাকে কি আর মনে আছে! সেই কোন্ ছোটবেলায় বছর পাঁচেক বয়সে দেখেছিলাম। আবছা মনে পড়ে—ফাদার বলেছিল—‘জানিস! তোর গ্র্যান্ড-পা বরফ ঘুমে যাচ্ছে চল্লিশ বছরের জন্য। যখন ফিরে আসবে, তখন আমি যদি বেঁচে না থাকি; তুই তোর গ্র্যান্ডপা কে নিয়ে আসিস।’
তারপর গ্র্যান্ড-পা উধাও। ওঁর স্মৃতিও মন থেকে মুছে গেছে। নীয়ার অ্যাবাউট ফিফটিন ইয়ারস্ ল্যাটার, গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর ব্যবসায় নেমে, পুরোনো কাগজপত্র, ট্রেড-লাইসেন্স, এসব খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ে একটা এগ্রিমেন্ট পেপার। ফ্রস্টেলিয়ার কোন্ এক ক্রায়োনি’্ সেন্টারের একটা অ্যাড-এর কাটিংও আছে সঙ্গে। কোন্ এক সায়েন্টিস্ট ফিলিপ, ফ্রস্টেলিয়াতে পৃথিবীর প্রথম ক্রায়োনি’ সেন্টার তৈরি করেছেন। তিনি ওয়ার্ল্ড-ওয়াইড অ্যাড দিয়েছেন। তখন নিউজপেপার ইউজ হ’ত। পেপারে রঙচঙে ছবিসহ বিজ্ঞাপন—চল্লিশ পঞ্চাশ কিংবা একশো দেড়শো বছর পরের পৃথিবীকে যাঁরা নিজের চোখে দেখতে চান; তাঁরা বরফ ঘুমের জন্য আবেদন করুন। কোনও এিKC ফি কিংবা মেনটেনেন্স চার্জ লাগবে না। উপরন্তু আপনার পরিবারকে এক হাজার ডলার কমপেন্সেশান্ দেওয়া হবে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে সহযোগিতা করুন।
গ্র্যান্ড পা এক হাজার ডলারের লোভেই হোক, কিংবা চল্লিশ বছর পরের পৃথিবীকে দেখার লোভেই হোক, ক্রায়োনাইজড্ হওয়ার জন্য অ্যাপ্লাই করেছিলেন। ওটা তার এগ্রিমেন্ট পেপার। পেপারে নমিনি হিসেবে আমারই নাম রয়েছে। অবশ্য আমার আগেকার নাম। ষাট বছর বয়সে ঠাকুরদা ক্রায়োনাইজড্ হয়েছেন। চল্লিশ বছর পর সেই ষাট বছরের শরীর ও মেধা নিয়েই ফিরে আসবেন। ফেরার সময় তাঁকে সে সময়ের কারেন্সিতে এক হাজার ইউ×নিট মানি দেওয়া হবে। আরও কী কী সব ছিল এগ্রিমেন্ট পেপারে।
তারপর আরও পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেছে। সে এগ্রিমেন্ট-পেপার কোথায় রয়েছে তার ঠিক নেই। মাসখানেক আগে ফ্রস্টেলিয়ার এক ক্রায়োনি’্ সেন্টার থেকে একটা ই-মেল এসেছিল শহরের কর্পোরেশন অফিসে। কর্পোরেশন অফিস খুঁজে পেতে আমার ই-মেল অ্যাড্রেসে রি-ডাইরেক্ট করে দেয় মেসেজটা। আমার ই-মেল অ্যাড্রেস ওদেরকেও জানিয়েছিল নিশ্চয়। ওরা আমাকে আবার ই-মেল করেছিল— আপনার গ্র্যান্ডফাদার মিঃ বি. বোস আগামী সাত জুলাই ২০৫২ তে বরফ ঘুম থেকে জেগে উঠবেন। চল্লিশ বছরের ক্রায়োনিকস্-পিরিয়ড এ’িড্ করেছে। আপনাকে অনুরোধ করা হচ্ছে ওই দিন সেন্টারে অ্যাটেন্ড করার জন্য। নরম্যালাইজড্ হতে দু’সপ্তাহ সময় লাগবে। আমাদের স্যানেটোরিয়ামে ম্যা’িমাম ওয়ান মানথ্ রাখা হবে। এর মধ্যে অবশ্যই নিয়ে যাবেন। নতুূবা আমরা ধরে নেব যে, আপনি টেক-আপ করতে আগ্রহী নন। তখন তাঁর ইচ্ছে মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভেবেছিলাম, ধ্যুর! কে এক বুড়ো হিমঘুম থেকে জেগে উঠবে। নাও, তাকে এখন আনার জন্য ছোট। এদিকে বিজনেস্ দেখার কেউ নেই। টাকা খরচও হবে বেশ কিছু। ব্যাটা বুড়োর সখ কম নয়; ষাট বছর বয়স অবধি পৃথিবীতে থেকে, ভোগ-দখল করে হ’ল না, আরও চল্লিশ বছর পরের পৃথিবী দেখার ইচ্ছা। এখনকার পৃথিবীতে দেখার আর কি আছে! থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়রের পর তো আর সে পৃথিবীকে চেনাই যায় না। গাছপালা, পশুপাখি সবই শেষ। আছে শুধু মানুষ আর কিছু বড়সড় জন্তু-জানোয়ার। আনতে যেতে পারব না। সুস্থ-টুস্থ হয়ে যদি নিজে নিজে এসে পৌঁছয় এখানে, তখন দেখা যাবে। যদি বুঝি ট্রাবল দিচ্ছে না, তাহলে থাকবে। আর যদি বার্ডেন হয়ে ঘাড়ে পড়ে; তখন তো ফার্ম হাউস আছেই। বুড়ো-ধুরো হলেও একটা লাইভ-মাল তো পাওয়া গেল। কেটে-কুটে লিভার, ফুসফুস, কিডনি বিক্রি করে খরচ তুলে নেব।
কিন্তু এখন দেখছি সেটাও হ’ল না। ঠিকানা তো সঙ্গে দিয়েছে জানাল। কিন্তু এখানে এসে পৌঁছল না। কোথায় গেল কে জানে! ফ্লাইট ধরে এ শহরে এলেও ঠিকানা খুঁজে কি পৌঁছতে পারবে! সেই চল্লিশ বছর আগের শহর কি আছে! নাকি সেই এনভায়রন্মেন্ট, সেই ওয়েদার আছে! এই ওয়েদার স্যুট না করায় টেঁসে গেল কিনা তাই বা কে জানে।
যাঃ! কবে ফ্রস্টেলিয়া থেকে রওনা দিয়েছে সেটাও জানা হ’ল না। ফ্লাইটে তো ঘন্টা চল্লিশেক-এর বেশি লাগে না। এমন হতে পারে, শহরে পৌঁছেছে ঠিকই; কিন্তু সিটির এমন র্যাডিক্যাল-চেঞ্জ দেখে কন্ফাউন্ডেড হয়ে গেছে হয়তো! দু’একদিনের মধ্যেই হয়তো বাড়িতে কিংবা এখানে হাজির হবে।
আচ্ছা! যদি এখানে আসেও; আমি তো চিনতে পারব না। ইটস্ কোয়ায়েট ইম্পসিবল্। কোন্ পাঁচবছর বয়সে দেখেছি। আমার কি আর মুখ মনে আছে! কোনও আইডেন্টিফিকেশন মার্কের কথা যদি মেনশন্ করা থাকত; তা হলে না হয়...! বাড়িতে গেলে অবশ্য প্রবলেম হবে না, খুঁজে-পেতে ঠাকুরদার দু’এক কপি ফটো কি পাওয়া যাবে না! ফটো পেলে, তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে নিলেই তো হয়।
আচ্ছা! হিসেবমতো আমি তো নাতি, তাহলে আমার ফেসের সঙ্গে কিছু সিমিলারিটিজ থাকবে নিশ্চয়! নাও আ-য়্যাম ফরটি ফাইভ। হি ইজ হান্ডে্রড ওভার; বাট লাইক দ্য এজ অফ সি’টি। অ্যাপারেন্টলি পনের বছরের ডিফ্রেন্স। ফেস-এর মিল পাওয়া যাবে নিশ্চয়!
আমি না চিনলেও গ্র্যান্ডপা আমাকে নিশ্চয় চিনবে। তার তো তখন ষাট-বছরের ম্যাচিওরড্ ব্রেন ছিল; মেমারিতে থাকবে। ওহ্ গস্। তাঁর মেমারিতে তো আমার পাঁচ বছর বয়সের মুখ! তখনকার সঙ্গে কি আর এখনকার ফেসের ...!
আচ্ছা! ফেসের মিল না থাকলেও বিহেভিয়ার-অবজারভ্যান্স-এর মিল তো কিছু থাকবে। জেনাইটাল-ক্যারাকটারেস্টিককে তো ইগ্নোর করা যায় না। ইটস্ সায়েন্টিফিক। বাট্ চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য কিংবা আচার-আচরণের মিলটা চট্ করে তো আর ধরা সম্ভব হবে না। কয়েকদিন ধরে অবজার্ভ করলে না হয় ...! আর তাছাড়া সারকাম্স্ট্যান্সেস্ অ্যান্ড সিচুয়েশন আচার আচরণকে ডিক্টেকট্ করে। আমার এখনকার আচরণের সঙ্গে তার আচরণের মিল কি পাওয়া যাবে? তার তো সেই চল্লিশ বছর আগের হ্যাক্নিড্ লোয়ার মিড্ল্-ক্লাস মেন্টালিটি। এই চল্লিশ বছরে সোসাইটির মডিফিকেশন তো কম হয়নি। সেই সঙ্গে আমিও অ্যাডপ্টেড হয়েছি। সো, আমার অ্যাটিচিউডের সঙ্গে তার অ্যাটিচিউডের মিল খুঁজতে যাওয়া বৃথা। তবে গলার ভয়েস কিংবা কোনও ম্যানারিজম...। কিন্তু আমার নিজের কোনও ম্যানারিজম্-ই কি আমি জানি? অন্য কেউ জানলেও জানতে পারে, যাদের সঙ্গে ওঠাবসা করি কিংবা অনেক সময় কাটাই। কিন্তু কেউ তো কোনদিনও বলেনি। বাড়ির লোক মানে ওয়াইফ কিংবা ছেলেটা হয়তো আমার কোনও মুদ্রাদোষ লক্ষ করে থাকবে। ফোনে ওদের কাছ থেকে জেনে নিলেও তো হয়। ধ্যুর! ব্যাপারটা রিডিকুলাস হবে। কী সব আবোল-তাবোল ভাবছি। তার চেয়ে বেটার হয় ....!
ওঁয়াও ... ওঁয়াও ... ওঁয়াও।
ওঃ! আবার ফোন! এবার নিশ্চয় ডাঃ এস.ফিফটি। নাহ্! স্ক্রিনে নিউ নাম্বার দেখছি।
... গুড-ডে! ভেনাস লিম্ব!
... ... ...
ইয়েস্ কে-বি. টু স্পিকিং।
... ... ...
নো নট নার্সিংহোম। ইটস্ হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স।
... ... ...
ওহ্ সিওর! ডু ইউ নিড?
... ... ...
ইয়েস-ইয়েস। কাম প্লিজ।
কথাবার্তা শুনে কাস্টমার বলে তো মনে হ’ল না। আমি কে-বি-টু কিনা জিগ্যেস করল। এটা নার্সিংহোম কিনা জানতে চাইল। পরে আবার এখানে হিউম্যান-লিম্ব সেল হয় কিনা সেটাও জানতে চাইল। কাস্টমার হলে তো জেনেশুনেই ফোন করবে। নাকি সেইরকম ইডিয়ট-ব্র্যান্ড কাস্টমার, সবই জানে, আবার কিছুই জানে না। যাক্গে, এলেই বোঝা যাবে। আসতে তো বললাম। লোকটা ঢোকার পর থেকেই অবজার্ভ করতে হবে ভাল করে।
যদি লোকটা গ্রান্ডপা হয়! যদি এসে দাবী করে যে, আমি তার নাতি সে আমার ঠাকুরদা, তা হলে তখন আমার কী করা উচিত হবে! আমি কী কোনও ডকুমেন্ট দেখতে চাইব। আরে! ডকুমেন্টের কথাটা এতক্ষণ মাথায় আসেনি কেন? নিশ্চয় কিছু না কিছু ডকুমেন্ট তার কাছে থাকবেই। ক্রায়োনি’ের লোকটা তো ফোনে জানাল, সঙ্গে কিছু কারেন্সি আর অ্যাড্রেস দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয় তখনকার এগ্রিমেন্ট পেপার্স এর কোনও কপি থাকবে সঙ্গে। তা না থাকলেও, কিছু না কিছু তো থাকবেই। লোকটা যে চল্লিশ বছর ক্রায়োনাইজ্ড্ ছিল, কম্সে কম্ তার রিলিজ-পেপারটা তো থাকবে। তা না হলে তার আইডেন্টিটি কী হবে, সে তো আইডেন্টিটি-ক্রাইসিসে পড়বে।
আচ্ছা! এমন কোনও ডিড্ তার কাছে থাকবে না তো; যাতে সে এই সমস্ত প্রপার্টির কিংবা এর একটা শেয়ারের মালিক হবে। তাহলেই তো হয়েছে! সব কিছু ছেড়ে আমাকে ইনসল্ভেন্ট অ্যাসেম্ব্লেজ-এ জায়গা নিতে হবে। আর না হয়তো স্যুইসাইড করার জন্য কোর্টে আবেদন করতে হবে। এই সেল্স্ কাউন্টারটা না হলেও রিয়্যাল এস্টেট বা অন্যান্য ইম্মুভেবল্ প্রপার্টির মালিক তো সে বটেই। এটা ছিল তার ওষুধের দোকান-কাম-গোডাউন। সেটা বদলে নার্সিংহোম হ’ল বাবার আমলে। তারপর পাল্টে গিয়ে এই লিম্ব সাপ্লাইয়ের সেল্স্ কাউন্টারটা হ’ল। তার সব কিছু আমাকে দিয়ে গেছে এমন কোনও ডকুমেন্ট তো আমার কাছে নেই। তার উত্তরাধিকারী হিসেবে সব ভোগদখল করছি ঠিকই; কিন্তু সে মারা তো যায়নি। বেঁচে আছে। সো সব কিছু ফিরে পাওয়ার রাইট আছে তার। আইন তো তাকেই হেল্প করবে। যাক্গে, ও নিয়ে এখন হেডেক বাড়িয়ে লাভ নেই। যখন প্রবলেম আসবে, ফেস করা যাবে।
আচ্ছা! লোকটা এখানে না এসে যদি আমার অ্যাবসেন্সে বাড়িতে চলে যায়! বাড়িটার গেট-আপ বদলালেও জায়গাটা তো বদলায়নি। ঠিকানাও একই আছে। ওই ঠিকানায় পৌঁছে যায় যদি! যদি কে.টি.কে গিয়ে বলে— আমি তোমার হাজব্যান্ডের গ্র্যান্ডফাদার, মানে তোমার দাদাশ্বশুর।
কে.টি.’র তো প্যানিক স্টার্ট হবে। ‘দাদাশ্বশুর’ ওয়ার্ডটাই ও জানে না হয়তো! আমার নাম বললেও তো ও বুঝবে না। চল্লিশ বছর আগের সে নাম তো আর নেই আমার। আমি এখন গভর্নমেন্টের ক্রিস্টেনিং অ্যাক্ট-২০৩০ এর বাই-ল ৪বি অনুযায়ী, মিঃ কে-বি-টু। কে ফর সিটি নেম, বি ফর সারনেম, এসব তো তার জানার কথা নয়। সে তো বলবে তারই দেওয়া সেই পুরোনো নাম। কে.টি সে নাম শুনে হয় ওকে পাগল ভাববে; নয়তো কোনও সুইন্ডলার ভেবে পুলিশে খবর দেবে। অবশ্য তার আগে আমাকে নিশ্চয় ফোনে নক্ করবে! ছেলেটা যদি সে সময় বাড়িতে থাকে; তাহলে ঘটবে আর এক আন্এ’পেক্টেড অকারেন্স। যা বদরাগি ছেলেটা! লোকটার ইন্ক্রেডিবল্ কথাবার্তা শুনে যদি মেরে বসে! একবার তো সে তার গ্র্যান্ডফাদারকে খুব মেরেছিল কী একটা কথার জন্য। শেষে ফাদারকে নার্সিংহোমে ভর্তি করে, ওকে বাঁচালাম মার্ডারার হওয়ার হাত থেকে।
তারপরই তো আমার ওল্ড হ্যাগার্ড ফাদারকে ওল্ড-এজ হোমে পাঠিয়ে দিলাম। তখন যা হোক্ ওল্ড-এজ হোম থাকায় একটা উপায় হয়েছিল। কিন্তু এখন ওল্ড-এজ হোমগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে আমাদের এই ফার্ম হাউস আর লিম্ব সাপ্লাইয়ের বিজনেস চালু হওয়ার পর থেকে। বুড়োটা যদি ফিরেও আসে; হয় তাকে বাড়িতে রাখতে হবে, আর না হয় কায়দা করে ফার্ম-হাউসের স্টকে ঢুকিয়ে দিতে হবে। তবে, যা করতে হবে, খুব সাবধানে। লোকটাকে চটালে চলবে না। যদি সব কিছু দাবী করে বসে, তাহলেই তো গেছি। তবে, মনে হয় এমনটা করবে না। শুনেছি তখনকার মানুষদের নাকি ওইসব মায়া-মমতা, মানবিকতা অ্যাফেকশন্ এসব সেন্টিমেন্ট ছিল। ওরও নিশ্চয় থাকবে। আমি সম্পর্কে নাতি আমাকে কি আর ...!
ইস! এদিকটা একদম ভাবিনি। ওর মধ্যে তো ওইসব ডিটেস্টেবল্ কিনশিপিয়া, বিনিগ্ন্যান্সিয়া রোগের ভাইরাস ভর্তি থাকবে। আমাকে নাতি-নাতি করে, কিংবা কে.টি.কে নাতবউ-নাতবউ করে পাগল করে দেবে। টু মাচ ডিসগাস্টিং হবে ব্যাপারটা। ছেলেটাকে আদর-টাদর করতে গেলে আর এক কাণ্ড হবে। সে হয়তো লোকটাকে হোমোসে’ড্ বা পার্ভাটেড ভেবে বসবে। তার চেয়েও মারাত্মক হবে, যদি তার ওই সব ভালবাসা-টাসার ভাইরাস আর সকলের মধ্যে ছড়িয়ে যায়।
নাঃ যা, ভেবেছিলাম তা-ও হবে না। ফার্ম হাউসে একটা দিনও রাখা নিরাপদ হবে না। এক কাজ করা যেতে পারে—টোটালি সেপারেট একটা সেল-এ যদি রাখা যায়। আদারওয়াইজ একদিনও না রেখে ডাইরেক্ট ও.টি. তে পাঠিয়ে কেটেকুটে সেফটি-প্যাক-বন্দী করে ফেলা।
ওহ গড্! এদিকে প্যাটেলা দুটো সেফটি-প্যাকে প্যাক্ হ’ল কি না কে জানে। ক্রায়োনি’ সেন্টারের ফোনটা এসে সব ডিজ-অর্ডার করে দিল। অ্যাকাউন্টে ওয়ান ক্রোড় ক্রেডিটে এল কিনা সেটাও দেখা হ’ল না। আগে মাল ডেলিভারি দেওয়ার ব্যাপারটাই খোঁজ নেওয়া যাক।
ইট্স্ সারপ্রাইজিং! হার্টের আর্জেন্সি থাকা সত্ত্বেও ডাঃ এস. ফিফ্টি অনেকক্ষণ ফোন করেনি তো! হ’লটা কি!
এই যে ভাবতে ভাবতেই ফোন। নাহ্ বাড়ির ফোন দেখছি।
হ্যাঁ, বল কে.টি.! কী ব্যাপার?
বলছি— ছেলেটা কলেজ টাইমে বেরিয়ে গেছে কলেজ যাচ্ছি বলে। বেরোনোর সময় তাড়াহুড়ো করে বেরিয়েছে ফিউসনার গাড়িটা নিয়ে। তাড়াহুড়োতে মোবাইল, ক্রেডিট-কার্ড সব বাড়িতে ফেলে গেছে। কিছুক্ষণ আগে ওর এক ক্লাসমেট ওর মোবাইলে ফোন করেছিল। ফোন রিসিভ করতে সে জানাল, আজ নাকি কলেজ নেই! আবার মনে হয় ওই সব পলিডল সেন্টার ফেন্টারে ...। তাই তোমাকে একটু জানিয়ে রাখলাম।
ঠিক আছে। ক্রেডিট-কার্ড ফেলে গেছে যখন, তখন বেশি টাকা খরচ করে ফেলার চান্স নেই। পকেটে যা রয়েছে সেটাই ওই রাবার-ডলের পেছনে যাবে আর কি! ফিরলে জানিও। ছাড়ছি।
উফ্স্! রাস্কেল ছেলেটার ডিবচারি বেড়েই চলেছে ডে-বাই-ডে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ভেবেছিলাম, ছেলেটাকে মানুষের মতো মানুষ করব। আমার মতো যেন মানুষ-কাটার ব্যবসা না করতে হয়। এ ব্যবসায় রিস্ক্ প্রচুর। যাতে ও একটা ‘হ্যাপিনেস কন্সালটেন্ট ফার্ম’ খুলে বসতে পারে; সেই মতো এগোচ্ছিলাম। তাই ‘সায়েন্স অব ওয়েল-বিয়িং’ এ অনার্স রেখে অ্যাডমিশান করালাম কয়েক কোটি টাকা ‘ক্যাপিটেশন ফি’ দিয়ে। কোনও রকমে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনটা করলে আরও কয়েক কোটি টাকা ঢেলে ‘অথেন্টিক্ হ্যাপিনেস’ এর ওপর রিসার্চটা করানোর ইচ্ছা ছিল। টাকা খরচ করে হ্যাপিনেসের ওপর পি.এইচ.ডি.-টা পাইয়ে দিলেই একটা কনসালট্যান্সি ফার্ম খুলতে পারত। রেগুলার টেন-টু-টুয়েল্ভ্ ক্রোড়স্ হেসেখেলে চলে আসত। কিন্তু দেখছি তা হবার নয়। হাতে কাঁচা টাকা পাচ্ছে আর ওড়াচ্ছে। কিছু করারও নেই।
নতুন চালু করা জুভেনাইল অ্যাক্ট অনুযায়ী আঠার বছর হলেই তার নামে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া, ক্রেডিট কার্ড ফেসিলিটি দেওয়া কম্পালসারি। বুঝি, এ সব আইন বিজনেসম্যানদের অ্যাডভান্টেজ্ দেওয়ার জন্যই। ক্যাপিটালিস্ট গভর্নমেন্ট, বিজনেসম্যানদের সুবিধার জন্যই তো আইন বানাবে। কিন্তু বিজনেসম্যানদের ছেলেরাই যে টাকা ওড়াবে বেশি বেশি এটা জানা কথা। সার্ভিস হোষ্প্ররদের ছেলেরা আর খরচ করতে পারে কোথায়! নাম কা ওয়াস্তে টাকা দিয়ে ওদের ব্যাঙ্ক-অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হয় আইন বাঁচাতে। আমরা তো টাকা থাকতে না দিয়ে পারি না। এই অপারচুনিটিকে ওরা মিস্ইউজ্ করছে। তা না হলে আঠার হতে না হতে সে’্ এনজয় করতে পলিডল সেন্টারে ছোটে! মাস দুয়েক আগে তো বাড়িতে পুলিশ অবধি এল। কোন্ এক পলিডল সেন্টারে আট লাখ টাকার চার্জ হয়েছে ক্রেডিট কার্ড-এর অ্যাস্যুরেন্সে। অ্যাকাউন্টে টাকা নেই। ব্যাঙ্ক অ্যালার্মিং লেটার পাঠিয়েছিল। কোনও রেসপন্স করেনি। শেষে পুলিশ হাজির বাড়িতে। সবটাকা পে করতে হ’ল। একটা লাম্প-সাম অ্যামাউন্ট পেনাল্টিও গেল।
তারপর কিছুদিন ওর ডিবচারি বন্ধ ছিল। আবার শুরু করেছে। একটা ছেলে বলে হেল্পলেস আমি। আর একটা থাকলে কবেই এটাকে কেটেকুটে হার্ট-কিডনি-লাংস বিক্রি করে দিতাম। আইন-অনুযায়ী একটা সন্তান থাকতেই হবে যে! তা নাহলে এত-এত টাকার প্রপার্টি সরকার নিয়ে নেবে। কে.টি.কেও আর একটা বেবি নেওয়ার ব্যাপারে এগ্রি করাতে পারলাম না; যেহেতু ম্যারেজ-এগ্রিমেন্টের টার্মস্ এ্যান্ড কন্ডিশন ছিল— একবারের বেশি ও কনসিভ করবে না। আগের মতো ক্লোন-বেবি নেওয়ার পারমিশান থাকলে না হয় একটা নিজের ক্লোন করে নেওয়া যেত। নিজেরই তো ক্লোনিং সেন্টার ছিল। এই সিগ্মা গভর্নমেন্ট সেটাও বন্ধ করে দিল।
যাক্গে! যা হয় হবে। এখন আর এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে ভাল লাগছে না। এমনিতেই টেনশান সেই গ্রান্ডফাদারের আবির্ভাব হতে পারে জেনে। তাছাড়া ব্যবসার টেনশান তো আছেই।
দুই
যাক্, এবার কিছুটা মেন্টাল প্রেসার কমল। গ্যালাক্স হার্ট রিসার্চ সেন্টারে এতক্ষণে হার্ট বোধহয় পৌঁছে গেল। প্যাটেলা দুটোর রিসিট-নিউজও ফোনে জানিয়েছে সেই মহিলা। কসমিক নার্সিংহোমের উদ্দেশে বেরিয়ে গেল ডেলিভারি ভ্যান। হার্ট-বাবদ এক কোটি টাকা অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার হয়ে গেছে দেখছি। এবার স্লাইট ফুড-কেক খেয়ে নেওয়া যাক, জলের ফ্লাস্কটা তো কাছেই আছে দেখছি। কিন্তু ফুড কেকের স্টক তো শেষ মনে হচ্ছে। কাছাকাছি ফুড-কেক কর্ণারে কোডে’ স্ট্যান্ডার্ড কেক পাওয়াও মুশকিল। গর্ভনমেন্ট সাপ্লাইয়েড ফুড-কেকগুলোতে তবু কিছুটা স্ট্যান্ডার্ড মেনটেইন করা হয়। কিন্তু অন্য কোম্পানির কেকগুলোতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, মিনার্যালস্, ভিটামিনস্ এর পারসেন্টেজ ঠিক থাকে না। এই হয়েছে এক প্রবলেম। সবচেয়ে সমস্যা হ’ল, লোকাল ফুডগুলোতে এজ-বার মেনটেইনিং পারসেন্টেজ কাউন্টই করে না। বিশ বছরের ইয়াং-এর যে ফুড কেক পঞ্চাশ বছরের মিডল্-এজেডের সেই একই ফুড কেক। এর চেয়ে আগেকার দিনে খাবার খাওয়ার সিস্টেমই ভাল ছিল দেখছি। যেমন খুশি রান্না কর যেমন খুশি খাও। থার্ড ওয়ার্ল্ড-ওয়রের পর যত সব ট্র্যাশি সিস্টেম চালু হল— সমস্ত শ্রেণির মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ইউনিফর্মড্ ফুড সিস্টেম। পৃথিবীর সমস্ত ভেজিটেবল্স্ নাকি পয়েজনাস্ হয়ে গেছে। পিউরিফায়েড অ্যান্ড প্রসেস্ড্ না হলে খাওয়া যাবে না, রোল, চাউমিন, পিৎজা, বার্গার এসব মশলাদার জাঙ্কফুডও খাওয়া চলবে না। এগুলো নাকি ক্যানসার নির্মূল করতে বাধা সৃষ্টি করছে।
আরও সব কত বাহানা! তারপরেই তো প্রসেসিং ফুড চালু হল। আসলে, ফুড-প্রসেসিং বিজনেসকে প্রায়রিটি দেওয়া। তাছাড়া আর কি! যত্তসব ..! ছোটবেলায় দেখেছিলাম মা রান্না করত। রান্নাটাও নাকি একটা আর্ট হিসেবে ধরা হত। আর এখন ...।
যাক্গে! এত সব ভেবে টাইম ওয়েস্ট করে লাভ কী! নিউট্রিশানের জন্য কিছুটা ফুড কেক দরকার। আনিয়ে নিলেই হল। পি-নাইন তো আছেই। ওকেই কল করা যাক!
ট্রা-ট্রা-ট্রা ...
রিসেপ্শন থেকে আবার কী মেসেজ এল রে বাবা! কিসের আস্কিং! কোনও প্রবলেম অ্যারাইজ করল নাকি? কী বলছে— নট আ কাস্টমার। লাইক টু মীট মী। পারসোনাল ম্যাটার।
সি.সি. টিভিতে দেখা যাক্ তো কে এল। একজন এজেড পারসন দেখছি। ওভার সি’টি হবে। তবে কি গ্রান্ডপা? মে বী! আচ্ছা! আসতে অ্যালাও করা যাক! পি-নাইন যতক্ষণ ফুড-কেক নিয়ে না আসছে; ততক্ষণ এর সঙ্গে কথাটা সেরে নেওয়া যাবে। তবে অ্যালার্ট থাকতে হবে প্রথম থেকেই। অবজার্ভ করতে হবে ভাল করে।
মে আই কাম ইন?
ইয়েস প্লিজ! হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ?
বলছি এটাই ভেনাস হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স তো?
হ্যাঁ, বাইরে সাইনবোর্ড দেখেননি?
হ্যাঁ, তা দেখেছি। বলছি আপনিই মিঃ কে-বি-টু তো?
কেন? আপনার কী সন্দেহ হচ্ছে?
না-মানে কনফার্ম্ড্ হলাম।
ওঃ! তা আপনি কী চান?
আমি আমার নাতিকে চাই।
নাতিকে চান? আপনি কে?
আমি ঠাকুরদা মানে গ্র্যান্ডফাদার।
গ্র্যান্ড ফাদার?
হ্যাঁ, গ্র্যান্ডফাদার মানে বোঝেন না— বাবার বাবা।
হুঁ, তাহলে বুড়োটা অবশেষে ঠিক জায়গাতেই পৌঁছে গেছে দেখছি। এ ক’দিন কোথায় ছিল কে জানে। কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে বেশ শ্রুড আছে। সাবধানে এগোতে হবে। চটালেও চলবে না। ক্যোয়ারি করব; কিন্তু সাবধানে। বেঁকে বসলেই তো সমস্ত প্রপার্টি ক্লেম করে বসবে। একটু নেড়েচেড়ে দেখা যাক— বলছিলাম আপনার নাতিকে চাইছেন তো?
হ্যাঁ, তবে কী নাতনিকে চাইছি? যত্তসব ...!
ঠিক আছে— ঠিক আছে। বলছি, আপনার নাতিকে দেখলে আপনি চিনতে পারবেন তো?
আমার নাতিকে আমি চিনতে পারব না তো কি আপনি চিনবেন?
বড় বেশি হামবাগ দেখছি বুড়োটা। বড়-বড় ডায়ালগ, ‘আমার নাতিকে আমি চিনতে পারব না তো কি আপনি চিনবেন’। চিনতে আর পারলে কই বাবা! নাতির সঙ্গেই তো কথা বলছ! আচ্ছা! আমার মুখের সঙ্গে তো ওর কোনও মিল পাচ্ছি না। নাক, চোখ, মুখ কোথাও তো মিল নেই। অবশ্য দাদুর সঙ্গে নাতির ফিজিক্যাল সিমিলারিটি যে থাকবেই এমনটা নয় তবুও ...! গলার ভয়েসটা কিছুটা যেন ...!
কী ব্যাপার? অমন হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন যে! বলুন আমার নাতি কোথায়?
আপনার নাতির নাম কী বলুন তো?
ওর আসল নাম কী আর আছে? আমি তো রেখেছিলাম ডিকি। ইম্ম্যাচিওরড্ বেবি হয়েছিল। ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছিল। নার্সিংহোম থেকে যখন বাড়ি ফিরল; তখন ইনকিউবেটরে। আর সেটা ছিল গাড়ির ডিকিতে। তাই নাম দিলাম ডিকি। পরে কর্পোরেশন বার্থ সার্টিফিকেটে রাখল মাস্টার কে-ডি ফাইভ হানড্রেড। বাড়িতে সবাই কে-ডি বলত।
নাহ্! ব্যাপারটা কনফিউজিং। আমার নাম ডিকি তো শুনিনি কখনও। কী একটা ইন্ট্রিকেট নাম রেখেছিল দাদু! নাঃ আর একটু ডিপে যাওয়া যাক্— আচ্ছা! আপনার নাতির এজ কত?
এজ? মানে বয়স? তা হিসেব করুন না কেন থার্টি সেভেন মানে সাঁইত্রিশের আগস্টে জন্ম, এখন দু’হাজার বাহান্নর আগষ্ট। মানে নিট পনের বছর।
ফিফটিন ইয়ার্স?
হ্যাঁ, তাই তো হচ্ছে, কেন হিসেবে ভুল হল নাকি?
ওহ্ মাই গুডনেস! হিসেবে ভুল তোমার হবে কেন, আমারই হয়েছিল। যা পেনিট্রেশন শুরু হয়েছিল ভেতরে ভেতরে! আমি ভেবেছিলাম ...!
কী মশাই! কী বিড়বিড় করছেন? থার্টি সেভেন থেকে ফিফটি টু পনের বছরই হয়। এতক্ষণ হিসেব করতে লাগে!
হ্যাঁ, তা-তো হয়। যাক্ ফুড কেক নিয়ে পি-নাইন এল। কই এনেছ?
ইয়েস স্যার!
কই? কই আমার নাতি? আনতে পাঠিয়েছিলেন? এই যন্ত্রমানুষটা নাতিকে চিনতে পারবে?
আরে থামুন মশাই! আপনার নাতি নয়, ফুড-কেক। পি-নাইন! ওই টেবিলে রেখে তুমি যাও।
ও! ফুড-কেক! আমার নাতি কোথায়? হোয়ার ইজ মাই গ্র্যান্ড সান্? সে-ই আমার লিগ্যাল হেয়ার।
আপনার নাতি কোথায়, আমি কী করে জানব? এটা কি হসপিটাল না পুলিশ স্টেশন?
পুলিশ স্টেশন কি আমি চিনি না! থার্টি ইয়ার্স চাকরি করলাম পুলিশে। লাস্ট ইয়ারে রিটায়ার্ড হয়েছি। আমাকে পুলিশ স্টেশন চেনাবেন না। পুলিশম্যান ছিলাম বলেই নাতির পাত্তা লাগিয়ে এই অবধি পৌঁছেছি। ও ইমম্যাচিওরড্ বেবি না হলে কি এত দুর্ভোগ হত! ব্রেনটা ম্যাচিওরড্ হয়নি বলেই বাড়ি ফিরতে পারেনি। বাড়ির অ্যাড্রেস বলতে পারেনি। বছরখানেক ধরে চেষ্টা চালিয়েছি। ফ্যা’ করে প্রত্যেকটা থানার কম্পিউটারে ওর ফটো পাঠিয়েছি। গতকাল খবর পেলাম, মার্স অরফ্যানেজ-এ এরকম একটা বাচ্চাকে পুলিশ বছরখানেক আগে জমা দিয়েছে।
মার্স অরফ্যানেজ! মানে ... ওহ্ গড্! এবারে বোঝা গেছে তার হার্ট তো এখন...! আবার বুঝি সে বারের মতো ফাঁসলাম।
আজ লোকাল থানার স্টাফ নিয়ে মার্স অরফ্যানেজ-এ গিয়েছিলাম। অরফ্যানেজের ম্যানেজার জানাল সে নাকি অসুস্থ হয়েছিল। তাই সরকারি হসপিটালে ইনফর্ম করা হয়েছিল। হসপিটালের অ্যামবুল্যান্স নাকি এসে নিয়ে গেছে।
কোনও হসপিটালে তাকে পাওয়া গেল না। শেষে অরফ্যানেজ-এর সামনের দোকানগুলোতে ইন্টারোগেট করে অ্যামবুল্যান্সের নাম্বারটা পাওয়া গেল। মোটর ভেহিক্যালস্ থেকে জানাল, ওই অ্যাম্বুল্যান্স হ’ল ভেনাস হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স-এর। এসে দেখলাম সামনেই অ্যাম্বুল্যান্সটা দাঁড়িয়ে আছে। ওই অ্যাম্বুল্যান্সেই আমার নাতিকে মার্স অরফ্যানেজ থেকে এখানে আনা হয়েছে ঘন্টাখানেক আগে। কোথায় আমার নাতি বলুন।
আরে মশাই থামুন থামুন! সিন ক্রিয়েট করবেন না এখানে! কোন্ দোকানদার কী বলল, তা শুনে এখানে ছুট্ দিলেন। এটা কি নার্সিংহোম না হসপিটাল, যে পেসেন্ট আনা হবে এখানে! এখানে মানুষের লিম্ব পাওয়া যায়। নাতি-ফাতি পাওয়া যায় না। গেট-আপ অ্যান্ড গেট লস্ট!
আপনি কিন্তু ভুল করছেন! জানেন আমি পুলিশম্যান ছিলাম।
না-না আপনি পুলিশম্যান ছিলেন না, তা তো বলছি না। বলছি আপনি ভুল করছেন, আপনার নাতিকে এখানে আনা হয়নি। আমার অ্যাম্বুল্যান্স সকাল থেকে কোথাও বেরোয়নি। আপনার নাতিকে অন্য কোথাও খোঁজ করুন। যান!
তাহলে আমার নাতিকে আপনি রিটার্ন দেবেন না? তাই তো! ঠিক আছে, আমিও এ’্-পুলিশম্যান! দেখে নেব ...!
দেখুন স্যার! ইউ আর গোয়িং রং। আপনার গ্র্যান্ড সন্্কে আমরা আনিনি। মার্স অরফ্যানেজ কি আমাদের কথা বলেছে? বলেনি, তাহলে ...! অকারণ আপনি উত্তেজিত হচ্ছেন। গভর্নমেন্ট হসপিটালে সিভিয়ারলি সার্চ করুন। পেয়ে যাবেন। তাছাড়া আপনি বলবেন, আপনার নাতির ব্রেন ইম্ম্যাচিওরড্; ওই ইম্ম্যাচিওরড্ ব্রেনের নাতিকে খুঁজে টাইম ওয়েস্টেজ করছেনই বা কেন?
ইমম্যাচিওরড্ ব্রেন হলেও সেই এখন আমার প্রপার্টির লিগ্যাল হেয়ার। আমার একমাত্র ছেলে কার-অ্যাকসিডেন্ট-এ মারা গেছে। একমাত্র নাতিটাকে না পেলে আমার কয়েক বিলিয়ন টাকার প্রপার্টি গভর্নমেন্ট ভেস্টেড করবে। সরকারের আইন তো আপনি জানেন। ক্যাপিটালিস্ট কাউন্সিলের গভর্নমেন্ট আম-জনতার সম্পত্তি দখল করার জন্য সবসময় মুখিয়ে থাকে। আর একটা ছেলে কিংবা নাতি থাকলে কি আর তার খোঁজ করতাম। অনেক কষ্টে প্রপার্টি করেছি।
হ্যাঁ, সে তো জানি স্যার! সামান্য মাইনের চাকুরে পুলিশদের প্রপার্টি করতে অনেক কষ্ট করতে হয়। দেখুন খুঁজে হয়তো কোথাও নাতিকে পেয়ে যাবেন। সরি স্যার! এখন আমি আর কথা বলতে পারছি না। নাউ আ য়্যাম হাংরি। ওই টেবিল থেকে ফুড কেক প্যাকেটটা একটু বাড়িয়ে দেবেন কাইন্ডলি।
আ-য়্যাম নট ইওর সার্ভেন্ট অ্যাট-অল! নিজের প্যাকেট নিজে নিন। আমি এখন চলে যাচ্ছি। কিন্তু পরেও আসতে হতে পারে। মাইন্ড ইট!
ঠিক আছে, দরকার হ’লে নিশ্চয় আসবেন।
ওঃ! ‘পারস্পায়ার অন দ্য ভিউ ...’! বহু কষ্টে আউট অফ ডেঞ্জার হওয়া গেল। যা ট্রাবল্-এ পড়েছিলাম। ব্যাটা পুলিশম্যান পরে আবার ঝামেলা না পাকায়! তবে, প্রুভ করতে পারবে না। লাকিলি ওটাকে কেটেকুটে সেফ্টি ব’ে ভরে দেওয়া গেছে, তা না হলে ...! শীট্! একটার পর একটা প্রবলেম!
ব্যাটা অন্য গ্র্যান্ডফাদার এসেই প্যানিক ধরিয়ে দিল। আসল গ্র্যান্ডফাদার এলে কী করে যে ট্যাকল্ করব! আচ্ছা! এমন যদি হয়, সে তার ডকুমেন্ট প্রোডিউস করে প্রুভ্ করে দিল যে, সে আমার গ্র্যান্ডফাদার; তখন আমি কী করব? আমি কী তাকে রেকগ্নাইজ্ করে বাড়িতে নিয়ে যাব? নাকি অন্য কোথাও থাকার অ্যারেঞ্জমেন্ট করব! তাকে অ্যাডমিট করা মানেই তো একটা বার্ডেন নেওয়া। তার কাছ থেকে পাওয়ার মতো তো কিছু নেই, যদ্দিন বেঁচে থাকবে তদ্দিন ফুড-কেক, ওয়াটার, মেডিসিন, ড্রেস সাপ্লাই দিয়ে যাও। ব্যাড ইনভেস্টমেন্ট, নো আউটপুট।
দি আইডিয়া! একটা জিনিস মাথায় এসেছে। ও তো সেই টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরিতে বর্ন অ্যান্ড ব্রট-আপ। অর্থাৎ ওর মধ্যে সে সময়ের ফ্যাকাল্টিগুলো থাকবে। সেগুলোকে ইউটিলাইজ করে কোনও বিজনেস ফর্ম করা যায় না! ওই যে নাইটিঙ্গেল ফ্রেস পার্লারে প্রিমিটিভ কিছু অডিও ভিস্যুয়াল এফেক্ট ইউজ করে প্রচুর কাস্টমার টানছে তার পার্লারে। তাছাড়া কিছু রোবটকে ওরা একদম মানুষের মতো ইউজ করছে। গা-হাত-পা-মাথা ম্যাসাজ করে দেওয়ার জন্য। কিছুটা প্রিমিটিভ্ ধাঁচের হ’লেও ব্যাপারটা বেশ অ্যামিউজিং অ্যান্ড ইন্থ্রলিং। পাব্লিক বেশ এন্জয় করছে। আসলে, প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই সাবকন্শিয়াস্লি রয়ে গেছে বোধহয় আগেকার দিনের মতো একটু স্নেহের ছোঁয়া, একটু ভালবাসার স্পর্শ পাওয়ার আকাঙক্ষা। নাইটিঙ্গেল সেটাকেই টিটিলেট করে বিজনেস করে যাচ্ছে। আচ্ছা! রোবটিক্ হাতের স্নেহের ছোঁয়াতেই যদি প্লীজ্ড্ হয়; তাহলে সত্যি সত্যিই স্নেহ-ভালবাসা, মায়া-মমতা ভরা মানুষের পরিচর্যা পেলে তো এখনকার মানুষ লুফে নেবে। সেরকম যদি কিছু করা যায়! তখনকার দিনে হিউম্যানিটি, সেনস্ অব্ ভ্যালুজ, কাইন্ডনেস, অ্যাফেকশন, ফিলিং অব কিন্শিপ্ এসব কিছু জিনিস ওর মধ্যে থাকবে। একটু আলাদা ফর্মেশনে এগুলো ইউজ করে যদি পাবলিককে খাওয়ানো যায়; তাহলেই তো গুজ অব্ গোল্ডেন এগ্। ফাদার একটা কথা বলত— ওল্ড ইজ গোল্ড! যদিও এখন ওসব ফ্রেজ ব্যাক্ডেটেড্।
ব্যাক্ডেটেড্ থিম কে আপ-টু-ডেট করে সেল করতে পারাই তো পোস্ট মর্ডান কন্সেপ্ট। একটু ব্রেন ইউজ করলে কি আর হবে না! বুড়োটাকে কেটেকুটে বেচে দিলে তো একবারই যা পাওয়া গেল। কিন্তু যদি ওইরকম কিছু একটা কনসেপ্ট সেল করা যায়, তাহলে রেকারিংলি মানি আসতে থাকবে। কুল ব্রেনে একটু ভেবে দেখা যাক্। কিন্তু তার আগে মালটাকে তো পেতে হবে। ব্যাটা বুড়ো কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে! আদৌ এসেছে কি না, তারই বা ঠিক কি! র্যাদার ইট ইউল বী গুড টু কনট্যাক্ট ফারদার উইথ দ্য ক্রায়োনিকস্ সেন্টার। দেখি ইন্টারনেট খুলে ওদের ই-মেল অ্যাড্রেস বের করি। তারপর ...।
ধ্যাত্তেরিকা! কম্প্যুটাও এমন সময় আবার টিউমাল্ট করছে। এই এক নতুন উৎপাত! ইন্টারনেটে কোত্থেকে যে এসব গাঁক-গাঁক, ভ্যাঁ- ভোঁ বেলোয়িং আসে কে জানে! একে তো ওই ক্যুইয়ার এন্ড আগলি সাউন্ড, তার ওপর আবার মিস-কানেকশন। খুলতে চাইছি ডব্লিউ-ডব্লিউ-ডব্লিউ ডট ক্রায়োনি’ ডট কম ওয়েবসাইট, কোত্থেকে ঢুকে গেল ডব্লিড-ডব্লিড-ডব্লিড বল্ড হেড রেমিডি মেল ডট কম। হেয়ার উইভিং-য়ের নিউ ফরমুলা জানাতে বসল। আমি যেন টাকে চুল গজানোর টেকনোলজি জানতে চেয়েছি! মাঝে-মাঝেই এমন হচ্ছে। দেখছি হয়তো ফার্ম হাউসের স্ট্যাটিসটি’; হঠাৎ স্ক্রিনে চলে এল এয়ার-ফ্লাইটের টাইম টেবিল!
মেকানিক দেখিয়েও লাভ হ’ল না কিছু। ব্যাটা খানিকক্ষণ খুটুর-খাটুর করে বলল— সেট ইজ কোয়ায়েট ও-কে স্যার! এ প্রবলেমটা সেটের নয়, এটা এখন ওয়ার্ল্ড-ওয়াইড প্রবলেম! গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের জন্য এমন হচ্ছে। স্যাটেলাইটের সিগন্যাল স্কিপ্ করে যাচ্ছে নীয়ারার ফ্রিকোয়েন্সিতে। ট্রপোস্ফিয়ারের টেম্পারেচার খুব বেড়ে গেছে তো! সেই হারে আউটারস্পেসের টেম্পারেচার কমে গেছে। স্যাটেলাইটগুলো আউটার স্পেসে তো; তাই এমন ট্রাবল দিচ্ছে। সেদিন কমেট নার্সিংহোমের একটা সেট টেস্ট করছিলাম। পেনিনসুলার সাইকোথেরাপি থেকে হঠাৎ গ্রে-হাউন্ডের স্পিসিজ টেবিলে স্কিপ করল। এসব হচ্ছে ওই গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের জন্য। এক সময় ওয়ার্মিং ঠেকানোর জন্য কিয়োটো প্রোটোকল চালু হয়েছিল। তাতে তেমন লাভ হয়নি। নিউ টেকনোলজি কী আসে দেখুন। যদ্দিন না আসছে, এরকম ট্রাবল্ দেবে। দিন আমার ফিজ— টু থাউজেন্ড।
সেটটা একবার খুলে আর কিছু ভাষণ দিয়ে মেকানিক দু’হাজার নিয়ে নিল। কাজের কাজ কিছুই হ’ল না। ধ্যুত! ক্যুইট করাও যাচ্ছে না ওটা থেকে। হ্যাং হয়ে গেল। দেখি টেলিফোনেই ধরার চেষ্টা করা যাক। ভেবেছিলাম ই-মেল অ্যাড্রেসটা খুঁজে নিয়ে ই-মেল পাঠাব, তা আর হ’ল না।
ফ্রস্টেলিয়ার ক্রায়োনিকস্ সেন্টারের ম্যানেজার তো জানাল আট আগস্টের মর্নিংফ্লাইট ধরে রওনা হয়েছে। তাহলে নয় আগস্ট নাইটের মধ্যে এখানে পৌঁছে যাওয়ার কথা। আজ এগার আগস্ট। একটা দিন কোনও হোটেলে রেস্ট নিলেও, আজ এসে যাওয়া উচিত ছিল।
আশ্চর্য! সে লোকটার আসা নিয়ে আমি এত অ্যাংশাস হচ্ছি কেন? গ্র্যান্ডফাদার বলেই কি? তার সঙ্গে ব্লাড রিলেশন আছে বলেই কি! আমি কি কিনশিপ অ্যাফেকটেড্ হয়ে যাচ্ছি? ধ্যুর! কিনশিপ-ফিনশিপ কিছু নয়, আমি বোধহয় তাকে ভয় পাচ্ছি। তার আসাটাকে ভয় পাচ্ছি। প্রপার্টি হারানোর ভয়, সব কিছু চলে যাওয়ার ভয়। সে যদি এসে সব কিছু দাবী করে! দাবী তো সে করতেই পারে! এই যে ও.টি.-কাম-শো রুম করেছি। এটা তো তার ফার্মেসি ছিল। ওষুধের দোকান আর পেছনে একটা গোডাউন। গ্র্যান্ডপা ক্রায়োনিক্স-এ যাওয়ার এগ্রিমেন্ট পেপারে সই করায় হঠাৎ পাওয়া এক হাজার ডলার কাজে লাগিয়ে ড্যাড সেটাকে নার্সিংহোম বানাল। আমি গ্র্যাজুয়েশন করার পর বিজনেস ম্যানেজমেন্ট করলাম। তারপর কোনও কাজ না পাওয়ায় বাবার নার্সিংহোমের ম্যানেজার। বাবা এ’পায়ার্ড হয়ে যেতে ম্যানেজার থেকে মালিক। মাঝে কিছুদিন এনার্জি-ট্যাবলেটের ডিলারশিপ্ নিলাম। বিদেশি কোম্পানি ঢুকে পড়ায় সে বিজনেসও ফ্লপ। তারপর তো নার্সিংহোমটাকে ক্লোনিং সেন্টার করলাম। অ্যাডাম ক্লোনিং সেন্টার। কয়েক বছর পর সরকার ক্লোনিং বন্ধ করে দিতে মাথা খাটিয়ে এই ভেনাস হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স প্রাঃ লিঃ।
আসলে এই জায়গা আর বাড়িটার মালিক সে-ই। শুধু বিজনেসের টাইপটা বদলেছে। সে করত মানুষের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা। ফাদারের নার্সিংহোমেও ছিল প্রাণ দেওয়ার কারবার। কিন্তু আমার বিজনেস হল প্রাণ নেওয়ার এবং দেওয়ার বোথ। সো দ্য বিজনেস ইজ গ্র্যাজুয়ালি ইনক্রিজড্ বাই মী। তবুও লিগ্যালি সে ক্লেম করতেই পারে।
আচ্ছা! আমি কি ডে-বাই-ডে ডাল-হেডেড হয়ে যাচ্ছি! কোন্ এক বুড়ো বরফ-ঘুম থেকে চল্লিশ বছর পর উঠে এসে আমার প্রপার্টি ক্লেম করবে এই ভয়ে অ্যাফ্রেড হচ্ছি। সে অ্যাসেট নিয়ে কী করবে, তার আর কে আছে! আমি তার গ্র্যান্ডসন্। লিগ্যাল হেয়ার। তার অ্যাবসেন্সে আমিই তো ওনার। আসলে আমি বোধহয় কমপ্লেক্সে ভুগছি তাই এসব অ্যাব্রাকাডেব্রা থট মনের মাঝে।
র্যাদার এ সব ভাবনা না ভেবে বিজনেসের কথা ভাবলে লাভ হবে। ফাদার করত একজনের প্রাণ দেওয়ার ব্যবসা। আমি একজনের প্রাণ নিলেও তা দিয়ে অনেকের প্রাণ বাঁচাচ্ছি। লেস-ইনভেস্টমেন্ট মোর প্রফিট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজনেসের টাইপ-এন-স্টাইলও তো বদ্লায়। একবার কমার্শিয়াল ই-বুকে পড়েছিলাম এই সেঞ্চুরির প্রথম দিকে নাকি সমস্ত মিডিয়া, সে’ আর ভায়োলেন্স নিয়ে ব্যবসা করত। মানুষও সারাদিন বিভিন্ন মিডিয়াতে সেক্স-ভায়োলেন্স দেখতে দেখতে ওভার-এ’াইটেড হয়ে থাকত। শরীরী সে’ ফুলফিল করার জন্য প্রস কোয়াটার্স, ব্রথেলে ছুটত। পথে-ঘাটে লেডিকে একা পেলে রেপ করত, সে সময় কোনও রাইভাল সামনে এসে গেলে মার্ডার করতেও হেজিটেট করত না। আন-অথরাইজড্ আর্মসের সাপ্লাইও খুব ভাল ছিল। প্রায় প্রত্যেক ইয়াংম্যানের কাছেই আর্মস-অ্যাম্যুনিশন থাকত। তখন ব্রথেল আর আর্মস-এর বিজনেস বেশ জমে উঠেছিল। তখন ড্রামা, ফিল্ম সব ছিল এসবেই ভরা।
কিন্তু থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়রের পর একটা চেঞ্জ এল। এক সময় মানুষ সে’-এও ডিসকারেজড্ হয়ে পড়ল। মানি স্পেন্ট ক’রে, ভলাপচুয়াস শরীর হায়ার ক’রে সেক্স প্লে করেও ঠিকঠাক প্লেজার পেত না। তখন তারা কিনশিপ পারচেজ শুরু করল। শুধু ফিমেল-বডি ভোগ নয়, তার সঙ্গে ফ্যামিলিয়্যাল রিলেশনশিপকেও ভোগ করে আনন্দ পেতে চাইল। তাই আলাদা-আলাদা করে মা কিংবা মেয়েকে নয়; এক বিছানায় মা-মেয়েকে কিংবা পিসি-ভাইঝিকে সে’-পার্টনার হিসেবে পেলে এনজয়মেন্টটা সাকসেস্ফুল হত। শরীর ধর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক ধর্ষণের আনন্দ। এক সময় এটা নিয়েও ব্যবসা চলল। সুন্দরী মা-মেয়ে, পিসি-ভাইঝি, মাসি-বোনপোর সন্ধান দিয়ে টাকা রোজগার শুরু করল এক শ্রেণির বিজনেসম্যান। তখনকার ফিল্মের থিম-ও হতে থাকল এই কিনশিপ-রেপ নিয়ে।
একসময় কিনশিপ-পারচেজ এন্ড এনজয়মেন্ট ও ব্যাকডেটেড হয়ে গেল। সোসাইটিতে ‘সম্পর্ক’ ব্যাপারটা যখন প্রায় টাইম-ব্যারড হয়ে গেল, তখন আর এতে মজা কোথায়! তারপর এল অন্য ট্রেন্ড। ডিগনিটি-এনজয়মেন্ট অর্থাৎ সম্ভ্রম সম্ভোগ। ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে ট্রেন্ড এল ডিগনিফায়েড পারসনের বেড পার্টনারকে এনজয় করা। কলেজ স্টুডেন্টরা শুরু করল নিজের প্রফেসরের ওয়াইফকে এনজয় করতে। অফিস স্টাফরা বসের বেড-পার্টনারকে একটা দিনের জন্য হলেও নিজের বেড পার্টনার করতে থাকল। বসের পছন্দের জিনিসকে সে সম্ভোগ করেছে এটাই গর্বের। এটাই এনজয়। মিড্ল্-ক্লাসের পুরুষ কোনও অ্যারিস্টে্রাক্র্যাট ফ্যামিলির মহিলাকে এনজয় করে মিলিওনীয়ার হওয়ার তৃপ্তি পেতে লাগল। তখনকার বিজনেসম্যানরা এটা নিয়েও অনেক বিজনেস করল। সে’ুয়ালি ডিস্স্যাটিস্ফায়েড লেডি খুঁজে বের করার জন্য স্মার্ট এন্ড এফিসিয়েন্ট এজেন্ট রিত্রুট করল। তারপর সেই লেডিদের হোয়ার-অ্যাবাউট সাব-অর্ডিনেটদের কাছে সেল করে টাকা কামাতে থাকল। এ বিজনেসটা অবশ্য এখনও চলছে। তবে মজা নেই।
এই ধরনের কোনও একটা বিজনেস যদি বের করা যায় মাথা খাটিয়ে, আর গ্র্যান্ডফাদারের সেন্স অফ্ ভ্যালুজ, কাইন্ডনেস এগুলোকে যদি রোবটে ইম্প্লিমেন্ট করা যায় তাহলে দারুণ খাবে পাবলিক। তবে সোসাইটির ট্রেন্ড-টা আবার ডাইভার্টেড হবে, তখন ...।
ধ্যুস! আজ আমার হ’লটা কি! বিজনেসের কথা ভাবতে গিয়ে কী সব সোসাইটির এভোল্যুসনের কথা ভাবছি। বিজনেসম্যান্ থেকে আমি কি হঠাৎ ফিলজফার হয়ে গেলাম নাকি!
কোথায় যেন পড়েছিলাম—‘উই আর মিয়ারলি অ্যান ইকোনমি, নট আ সোসাইটি।’ তাই আরও অনেক মানি আর্ন করতে হবে, বিজনেস বাড়াতে হবে, তবে ই×চ্ছাটা ফুলফিল হবে। দু-তিনটে বিজনেস আর থাউজেন্ড বিলিয়ন ক্যাপিটাল থাকলে ক্যাপিটালিস্ট কাউন্সিলের অর্ডিনারি মেম্বারশিপ পাওয়া যায়। সে তো কবেই হয়েছি। কিন্তু মিনিমাম ছ’খানা বিজনেস-এর ‘বিজনেস-গ্রুপ’, আর ইয়ারলি টেন-থাউজেন্ড বিলিয়নের টার্ন-ওভার না থাকলে তো কাউন্সিলের কোর-কমিটির মেম্বার হওয়া যাবে না। কোর-কমিটির মেম্বার না হলে মিনিস্ট্রিতে চান্স পাওয়া যাবে না। একবার অন্তত মিনিস্টার না হতে পারলে বেঁচে সুখ নেই।
মানুষ যা কিছু করে, সুখের আশাতেই তো করে। যে ভোগ করে, সে সুখের আশায় করে; আবার যে ত্যাগ করে, সেও কোনও সুখের আশাতেই ত্যাগ করে। এই যে গ্র্যান্ড-ফাদার তার ফার্মেসি, তার ফ্যামিলি ছেড়েছুড়ে দিয়ে ক্রায়োনি’ে গিয়েছিল; নিশ্চয় কোন সুখের আশাতেই গিয়েছিল। চল্লিশ বছর পর আবার ফিরে আসছে সেই সুখ ভোগ করার জন্যেই। সুখ পাবে না পাবে, দ্যাট্স্ অ্যানাদার ইস্যু; কিন্তু সুখের আশাতেই তো আসবে। হয়তো ভাবছে— গ্র্যান্ডসনের কাছে ফিরলে তাকে ওয়ার্ম রিসেপশন দেওয়া হবে, আরও কত কিছু করা হবে। কিন্তু সোসাইটি তো আর সেই চল্লিশ বছর আগের প্লেসে স্ট্যাগ্নেন্ট হয়ে নেই। তখন ছিল কিনশিপ-সোসাইটি। অদ্ভূত এক আত্মীয়সমাজ। গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ। এখন কিনশিপ নেই, গোষ্ঠীও তেমনভাবে নেই। কিনড্রেড-আইডেন্টিটি এখন সেকেণ্ডারি হয়ে গেছে। ইনকাম-লেভেলই এখন মানুষের সোসাইটি মেনটেন করে। একটা মানুষ, কোন সোসাইটিতে বিলং করবে, তা জাস্টিফাই করা হয় তার ইনকাম-গ্রুপ দেখে। একটা ফ্যামিলির টোটাল ইনকামও এক্ষেত্রে অ্যা’েপ্টেব্ল্ নয়। বিকজ্ ফ্যামিলি কনসেপ্টটাই তো নেগ্লিজেব্ল্ হয়ে গেছে। পারসোনাল ইনকাম লেভেলই ঠিক করে দেবে, সে মানুষটা কোন সোসাইটিতে থাকবে।
আচ্ছা! গ্র্যান্ডপা যদি ফিরে আসে, তাহলে সে কোন্ সোসাইটিতে বিলং করবে? তার তো কোনও ইনকাম নেই। তাহলে কি সে গভর্নমেন্টের চ্যারিটেব্ল্ ইন্স্টিটিউশনে প্লেস পাবে; নাকি আইনের সাহায্য নিয়ে আমার ফ্যামিলিতেই থাকতে চাইবে, আমার সোসাইটি বিলং করবে! ওঃ গড্! আবার সেই সোসাইটি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি!
তিন
যাক্, ভালোয় ভালোয় র্যাপিড অ্যামবুল্যান্সটা এল। অনেকদিন পর একটা র্যাফ-পেসেন্ট পাওয়া গেল। আজ সত্যিই হেভি-হেভি অপারচুনিটিজ্ আসছে। বেশ কয়েকদিন ধরে ডাল-মার্কেট চলছিল। আজ যেন একটু ...। তখন সি-এইট তো জানাল পেসেন্ট টিন্-এজার। স্টকে টিন-এজার লিম্বস্ কম আছে। দারুণ কাজে লাগবে। এখন তো টিন-এজারের লিম্বেরই ডিম্যান্ড। টিন এজারের প্যাটেলা, রিব, কলার, বোন, এসব পেটি আইটেম ছাড়াও কিডনি, লাংস, হার্টেরও বেশ ডিম্যান্ড আছে। হবে না কেন! অ্যাটমিক এনার্জির হাইস্পিড কারগুলো তো বেশির ভাগ চালায় ইয়ং-জেনারেশন। তাদের চাই মোর এন্ড মোর স্পিড। আউট অফ্ কনট্রোল হয়ে গেলেই অ্যা’িডেন্ট। আর অ্যা’িডেন্ট মানেই ইনজুরি। ইনজুরি মানেই লিম্বের চাহিদা।
নাঃ, এই কালেক্টরটার এফিসিয়েন্সি আছে! নিউলি রিত্রুটেড হলে কি হবে। বেশ ক্লেভার এন্ড এনার্জেটিক। লাস্ট র্যাফ-পেসেন্টটাও ও-ই এনেছিল। ওকে কিছু ইন্সেনটিভ অ্যালাওয়েন্স্ দেওয়া দরকার। তা শুনে অন্য কিডি-কালেক্টররাও এন্কারেজড্ হবে। ওকে একটু ডেকে নেওয়া যাক।
... হ্যালো।
বলুন স্যার।
বলছি, এখানে এখন তো তোমার কোনও কাজ নেই। পেসেন্টকে ও.টি. পৌঁছনোর জন্য ও.টি.- অ্যাটেন্ডেন্ট আছে। তুমি আমার চেম্বারে চলে এস। কুইক!
আসছি স্যার!
ওফ্! আজ সারাদিন বেশ মেন্টাল প্রেসার গেল। যদিও মেন্টাল অ্যাগোনি এখনও কাটেনি। সেই গ্র্যান্ডফাদারটা এসে পড়তে পারে। এলে আবার কী ট্রাব্ল্ দেবে কে জানে! এদিকে পুলিশম্যান-গ্র্যান্ডফাদার তো তার নাতির খোঁজে এসে একরকম থ্রেট করেই গেল। আপাতত তাকে মোল্ড করে পাঠিয়ে দিলেও, পরে ট্রাব্ল্ ক্রিয়েট করতে পারে। যাক্গে, যা হবার হবে। এখন ব্রেনটাকে একটু রিলিফ দেওয়া দরকার। কালেক্টর ছেলেটার কাছে শোনা যাক্ কিডি-কালেকসানের ডিটেলিং; তাতে মাইন্ডে ট্রাংকুইলিটি আসবে।
মে আই কাম ইন স্যার?
ইয়েস— ইয়েস কাম ইন। বী সিটেড।
হ্যাঁ, বলুন স্যার কী করতে হবে! আপনি কুইক চলে আসতে বললেন আপনার চেম্বারে।
কিছু করতে হবে না। তোমাকে কংগ্র্যাচুলেট করার জন্য এখানে ডাকলাম। ওয়েল ডান! তোমার কাজে আমি প্লীজ্ড্। এর আগেও বোধহয় তুমি এরকম একটা অ্যাকসিডেন্ট কেস থেকে কিডি কালেক্ট্ করেছিলে র্যাফ চেয়ে নিয়ে!
হ্যাঁ স্যার। লাস্ট মান্থে, ইস্টার্ন বাইপাস থেকে।
এটা তো বললে— ইস্ট রেঞ্জ থেকে, তাই না!
হ্যাঁ স্যার। ই×স্ট রেঞ্জের বাসস্টপে দাঁড়িয়ে আছি। একটু দূরেই থ্রী-ডি ক্লাস্টার। বাসস্টপ থেকে দেখা যায়। বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শুনতে পাই চিৎকার-চেঁচামেচি। আমার মনে হঠাৎ প্লে করে— নিশ্চয় কোনও অ্যা’িডেন্ট হয়েছে ওখানে। আমি এগোই ওদিকে। গিয়ে দেখি ঠিক তাই। রান-ওভার কেস! একটা তের-চৌদ্দ বছরের ছেলেকে চাপা দিয়েছে একটা ফিউসনার। তবে, খুব ট্রাই করেছিল বাঁচানোর জন্য। তাই গাড়ি গিয়ে ধাক্কা মেরেছে রাস্তার রেলিঙে। বাচ্চাটার দু-পায়ের ওপর দিয়ে গেছে। বেঁচে যাবে, কিন্তু পায়ের হাড় গুঁড়িয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
তারপর - তারপর!
তারপর যা হয় আর কি! ভিড় জমে গেল, বাচ্চাটা ওই ক্লাস্টারের কোনও ফ্ল্যাটের হবে। রাস্তার ওপারে নাকি জল কিনতে গিয়েছিল শুনলাম। ওর পেরেন্ট্স্ও সঙ্গে সঙ্গে এসে গেল। বাচ্চাটাকে তো গাড়িতে তুলে নার্সিংহোমে ছুটল। আমি পায়ে-পায়ে ফিউসনার গাড়িটার কাছে গিয়ে দেখি গাড়িতে মাত্র একজন। সতের-আঠারে বছরের ইয়াংম্যান। রেলিঙে ধাক্কা লেগে গাড়ির শো একদম সেঁটে গেছে তার বুকের ওপর। সকলে ভাবল, বোধহয় ছেলেটা ডেড্ হয়ে গেছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম ও মরেনি। সেন্সলেস হয়ে গেছে, পুলিশ সার্জেন্ট এসে পরিস্থিতি বুঝে রেকার কল করল রোড ক্লিয়ার করার জন্য। বডিটাকে একটা ট্যাক্সিতে তোলার তোড়জোড় চলছে। আমি সাহস করে এগিয়ে গিয়ে সার্জেন্টকে ডেকে নিলাম। আই-কার্ড দেখালাম। তারপর চার লাখের টোপ দিলাম। একটু গাঁইগুঁই করতে, আরও একলাখ বাড়িয়ে দিলাম! ডান হয়ে গেল। সঙ্গে লিকুইড-মানি ছিল। পে করে দিলাম। বলল— আপনি নিজেকে শো করবেন ওর বাড়ির লোক বলে। আমরা বডিটা আপনাকে দিয়ে দেব। নিয়েই সঙ্গে সঙ্গে সরে পড়বেন ওখান থেকে।
সার্জেন্ট রাজি হয়ে যেতেই আমি আপনাকে র্যাফের জন্য ফোন করেছিলাম।
গুড! এই নাও সাড়ে পাঁচ লাখের ভাওচার। পাঁচ লাখ পার্চেজ প্রাইস্, আর ফিফ্টি থাউজেন্ড হ’ল তোমার ইন্সেনটিভ। এছাড়া ডাবল কমিশন এিKC করে নিও মনে করে। যাও, এন্ক্যাশ্মেন্ট করে নাও ভাওচারটা।
মেনি-মেনি থ্যাং’্ স্যার। আয়্যাম গ্রেটফুল টু ইউ।
ও-কে— ও-কে। এফিসিয়েন্টলি কাজ কর। বেনিফিটেড হবে। ইন্সেন্টিভের ব্যাপারটা বলো অন্য কালেক্টরকে।
... ... ...
নিশ্চয় বলব। থ্যাঙ্ক য়্যু স্যার। আসছি।
অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নামিয়ে বডিটা এতক্ষণে ও.টি.- তে ঢুকে গেছে নিশ্চয়! কালেক্টর ছেলেটা বলছিল, ও নাকি মুখ দেখে বুঝতে পেরেছিল ইনজিওর্ড্ ছেলেটা সেন্স্লেস্ হয়ে গেছে, ডেড হয়নি। দেখে বোঝা যায় নাকি, অজ্ঞান হওয়া আর মারা যাওয়ার পার্থক্য! ক্লোজ সার্কিটে একবার দেখি তো পেসেন্টের মুখখানা। কিছু বুঝতে পারি কি না।
আরিব্বাস! অপারেশন টেবিলে তোলা হয়ে গেছে দেখছি। আজকাল আমার স্টাফেরা মোর এফিসিয়েন্ট হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। ওঃ! ফার্স্ট ক্লাস বডিখানা! টিন-এজার বলল যে! এ তো দেখছি কোয়ায়েট ইয়ংম্যান; সেভেনটিন-এইট্টিন এজ হবে, বলল। মুখটা দেখা যাচ্ছে না ভাল করে। বাঁদিকে হেলে রয়েছে। মুখটা একবার দেখতে ইচ্ছে করছে। দেখি, মাইক্রোফোনে বলি ডাক্তারদেরকে, পেসেন্টের মুখখানা ক্যামেরার দিকে ঘোরানোর জন্য।
... ডক্টরস্ পেসেন্টের ফেসটা একটু ক্যামেরার দিকে ঘোরান তো, দেখব।
... ... ...
ব্যাস - ব্যাস! ঠিক আছে! আরে! ফেসটা খুব চেনা লাগছে যেন! ওহ্ গড্! এ তো বি-টেন! আশ্চর্য! র্যাফ পেসেন্ট বি-টেন— অ্যা’িডেন্ট! ডক্টঅরস্ ...! স্টপ, স্টপ, হোল্ড দি নাইভ্স্! আমি আসছি।
কী ব্যাপার স্যার! এনি প্রবলেম? আপনি ও.টি.-তে ছুটে এলেন! কল করলে তো আমরাই ...।
ওহ্! ডক্টর! ওর বুকের ওপর থেকে ছুরি-কাঁচি সরান। ও বি-টেন, আমার ছেলে। ওনলি সন্!
আশ্চর্য! আপনার ছেলে— মানে— ও এখানে কী করে ...!
ওঃ! ডাক্তার এত কথা বলার সময় নেই। আপনি আগে ওকে বাঁচান। দেখুন কী হয়েছে ওর! ও এ’্পায়ার্ড হয়ে গেলে আমার লিগ্যাল হেয়ার কেউ থাকবে না। প্রচুর ক্ষতি হয়ে যাবে। ট্রাই টু সারভাইভ হিম! প্লীজ্— প্লীজ্!
হ্যাঁ - হ্যাঁ দেখছি স্যার। আপনি - আপনি শান্ত হন। কুল-ডাউন প্লীজ! উই আর ট্রায়িং আওয়ার লেভেল বেস্ট! র্যাদার আপনি আপনার চেম্বারে যান। তেমন হলে আমরা ...!
না - না, আপনি আগে চেক আপ করুন। কোথায় হ্যামারেজ হয়েছে ?
স্যার! প্রাইমারি অবজার্ভেশনে বোঝা যাচ্ছে বুকে চোট পেয়েছে। কলার বোন আর দু-একটা রিব ফ্র্যাকচার হয়েছে। তবে ইন্টারনাল হ্যামারেজ হয়েছে কিনা তা এখানে বোঝা সম্ভব নয় স্যার! কারণ আমাদের ও.টি. তে তো লাইফ দেওয়া হয় না, লাইফ নেওয়া হয়। সে কারণে পেসেন্টকে থরোলি চেক-আপ করার বা বাঁচিয়ে তোলার এসেন্শিয়াল ইক্যুইপমেন্ট নেই এখানে। ইট উইল বী বেটার টু রিমুভ হিম অ্যাট আ নার্সিংহোম; প্রেফারেব্লি এনি হার্ট রিসার্চ সেন্টার। তার আগে স্যার একটা ইঞ্জেকশন পুশ করা দরকার কিছুক্ষণ টিঁকিয়ে রাখার জন্য।
দেন হোয়াই ডিলেইড্! ডু ইট অ্যাট ওয়ান্স!
ইয়েস স্যার—ইয়েস স্যার! বাট আমাদের স্টকে এই ইঞ্জেকশন নেই। অ্যাক্চুয়ালি আমাদের ওটা প্রয়োজন হয় না তো! একটা ইঞ্জেকশন আনাতে হবে ফার্মেসি থেকে।
ওহ্ গড! আনাবেন তো তাড়াতাড়ি। একে না বাঁচালে ...! মোর দ্যান টোয়েন্টি-থাউজেন্ড বিলিয়নের প্রপার্টি, অনেক ব্রেন অ্যাপ্লাই করতে হয়েছে আর্ন করতে। এই বিশাল অ্যামাউন্ট আমি কিছুতেই ওই ক্যাপিটালিস্ট কাউন্সিল গভর্নমেন্টকে দিয়ে দিতে রাজি নই। প্রয়োজন হলে কয়েক বিলিয়ন টাকা খরচ করে ফেলুন। কিন্তু ওকে বাঁচান অ্যাট এনি কস্ট!
স্যার! আপনি টেনস্ড্ হবেন না। আমাদের স্টকে সমস্ত লিম্ব আছে যেটা লাগবে...।
ওঃ শীট! লিম্ব থেকে কী হবে; যদি ওর প্রাণটাই না থাকে। আমাদের স্টকে কি প্রাণ আছে! দ্য সোল— সোল— লাইফ-ব্রেথ! আছে?
স্যার! আপনি যে কী বলেন না, আমরা সমস্ত লিম্বস্, বোন্স্ এমনকি ক্লট-ব্লাড আর টিথ্ও রেখে দিই। কিন্তু লাইফ-ব্রেথ! ওটা রাখার মতো সেফ্টি প্যাক এখনও তৈরি হয়নি স্যার! ওটা ধরে রাখতে পারে এই সেফটি-প্যাক, মানে বডি। আই মিন শরীর! ওটা থেকে বেরিয়ে গেলে আর রিফিল করা যায় না স্যার!
তা আমি জানি ডাক্তার! আমাকে টীচ্ করবেন না। এখন যাতে আমার ছেলের লাইফ-ব্রেথটা ওই সেফ্টি প্যাকের মধ্যে থাকে সে চেষ্টা করুন। কুইক!
হ্যাঁ স্যার! অ্যাটেন্ডেন্ট - ওয়ান! যাও এই ইঞ্জেকশনটা নিয়ে এসো। কুইক! অ্যাটেন্ডেন্ট - টু! তুমি অ্যাম্বুল্যান্স রেডি করতে বল। কুইক।
এ কী! বি-কে, সিটু, পি.নাইন, তোমরা সবাই এখানে গ্যাদার্ড হয়েছ কেন?
স্যার! আপনার চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে আমরা ভয় পেয়ে গেছি। কিছুদিন আগে স্যার মেন্টাল অ্যাসাইলাম থেকে একটা পাগলকে মক্-আপ পেসেন্ট বানিয়ে নিয়ে এসে কী ঝামেলা হয়েছিল বলুন! পুলিশ ভ্যান, পুলিশ ফোর্স, সে এক এমব্যারাসিং সিচ্যুয়েশন্! আমরা ভাবলাম, আবার সেরকম কোনও কিছু হ’ল কি না। আপনাকেও অনেক অ্যাসাল্টেড্ হতে হয়েছিল সে বার। যাক্, এবারে সে সব ঝামেলা হবে না, শুনছি আপনারই ছেলের বডি ওটা! কার অ্যা’িডেন্টে ...।
যাও তোমরা! নিজের-নিজের কাজে যাও। যত্তসব গ্যারুলাস! ওয়ার্থলেস্!
হ্যাঁ যাচ্ছি স্যার। এই সবাই চল।
কী হল? পি-নাইন! তুমি আবার ওরকম ঘাড় নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলে কেন? যাও।
যা বাব্বা! পি-নাইনটা আবার বিগড়োল মনে হচ্ছে। বুকের সবুজ আলো অফ্ দেখছি।
স্যার! ও.টি.তে রোবো-নার্সটাও দেখছি আউট-অফ্-অর্ডার হয়ে গেছে। কোনও রেসপন্স্ করছে না। রোবট-প্রোবটগুলোর হলো কী? মন খারাপ হওয়া মানুষের মতো মাথা নীচু করে আছে সব!
আঃ! ডক্ট্র! ওদের কথা পরে ভাববেন। ওদের তো লাইফ-ব্রেথ নেই যে বেরিয়ে গেলে আর ঢোকানো যাবে না। ওগুলো খারাপ হলে আবার সারানো যাবে।
ঠিক বলেছেন স্যার! কোন্ নার্সিংহোমে পেসেন্টকে পাঠাব? আই মিন আপনার ছেলেকে পাঠাব?
ডাঃ এস ফিফ্টির গ্যালা’িতেই পাঠান। আমি ফোনে বলে দিচ্ছি ডক্টরকে।
গ্র্যান্ডফাদার
স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুম ভেঙে গেলে যেমন মনে এক অতৃপ্তি মেশানো কষ্ট জমা হয়, আমার মনে ঠিক সেরকম একটা কষ্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে। দীর্ঘ চল্লিশটা বছর, নাকি কয়েক ঘন্টা ঘুমিয়েছিলাম জানি না, কিন্তু ঘুম ভাঙার পর, দিন-পনের ছিলাম আধঘুম-আধজাগা অবস্থায়। তখন সবই শুনতে পাচ্ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম কেউ কথা বলছে। কিন্তু তাকাতে পারছিলাম না। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল যেন! হাত-পাগুলো সব অসাড় হয়ে ছিল। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। অথচ মগজটা কাজ করছিল ঠিক। ভাবতে পারছিলাম, আমি চল্লিশ বছর ক্রায়োনি’ সেন্টারে ছিলাম। এবার জেগেছি। আবার পৃথিবীটাকে দেখব। গাছপালা-পশুপাখি, আকাশ-মাটি দেখব। মানুষ দেখব। আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-স্বজন কৌতূহলী হয়ে আমাকে ঘিরে ধরবে। নানান্ প্রশ্ন করবে— কেমন ছিলাম, কোনও কষ্ট অনুভব করেছিলাম কি না, এইসব। আমিও অজস্র প্রশ্নে তাদেরকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলব।
আধজাগা অবস্থায় শুনেছিলাম আমার নাতিকে খবর দেওয়া হয়েছে। নাতি নিতে আসবে আমাকে। কল্পনা করেছিলাম নাতির বর্তমান রূপ-চেহারা। কিন্তু নাতি আসেনি। তখনই ওই কষ্টটা বাসা বেঁধেছিল, তারপর তো সেটা বাড়তে থাকল। স্যানেটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে যখন বর্তমান পৃথিবীর রং-রূপ-রস দেখলাম তখনই স্বপ্নটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল! কোথায় রং, কোথায় রূপ! রসহীন পৃথিবী যেন আমাকে দেখে দুয়ো-দিচ্ছে। যেন বলছে— তুমি বড্ড বোকা! কেন ঘুমোতে গেলে চল্লিশটা বছর! আরও কিছুদিন ভোগ করে যেতে পারতে আমার সৌন্দর্য! আর ঘুমোলেই যদি, তাহলে আবার জাগলে কেন?
তবুও এখানে আসার আগে অবধি কিছুটা স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছিলাম। হয়তো নাতি খবর পায়নি। হয়তো সে ব্যস্ত থাকায় যেতে পারেনি। আমি বিমানবন্দরে পৌঁছলেই হয়তো সে ‘দাদু’ বলে বুকে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু কোথায় নাতি, কোথায় বা অন্যান্য আত্মীয়-পরিজন! তবুও আশায় বুক বেঁধেছিলাম। নিশ্চয় ওরা সংবাদ পায়নি। কর্পোরেশন অফিস নথিপত্র ঘেঁটে ভুল-ভাল লোকের ঠিকানা দিয়েছে হয়তো! নিজে আসল ঠিকানায় পৌঁছে চমকে দেবো সকলকে! যদিও ওদের কেউই চিনবে না। একমাত্র নাতিই যা দেখেছে আমাকে। তখন তার বয়স মাত্র পাঁচ। মনে থাকবে না কিচ্ছু। কিন্তু পরিচয় দিলে তো আনন্দে লাফিয়ে উঠবে। তারও বয়স হল পঁয়তাল্লিশ। সে এতদিনে দাদু না হলেও বাবা হয়েছে নিশ্চয়। তার ছেলেপুলে আমাকে কী বলে ডাকবে— বড়বাবা না প্র-দাদু। প্র-দাদুটাই শুনতে ভাল লাগবে। ওটাই বলতে বলব। এরকম আরও কত কিছু আশা করেছিলাম।
কিন্তু সে আশাতেও ছাই পড়ল যখন জানলাম সেই ঠিকানা-ই আর নেই। সে বাড়ি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। খুঁজে পেতে গেলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। কর্পোরেশন অফিসে ধর্না দিয়ে সেই পুরোনো রাস্তার নতুন নাম খুঁজে বের করতে হবে। সে অনেক ঝক্মারি। অগত্যা ক্রায়োনি’ সেন্টার থেকে দেওয়া ঠিকানাটা সম্বল করেই বেরোবো ভাবছিলাম। হোটেলের ম্যানেজারের কথায় গাইড নিতে হ’ল। এখানে পৌঁছে যা দেখলাম তাতে অবশিষ্ট স্বপ্নের তলানিটুকুও নিঃশেষ হয়ে গেল। মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল।
যাক্, এখন কিছুটা সুস্থ বোধ করছি। কোথায় একটা কোলাহল শুনতে পাচ্ছি যেন! কারা চিৎকার করছে কে জানে! হতচ্ছাড়া গাইডটা কোথায় গেল!
ওই যে বসে রয়েছে। যাবে আর কোথায়! ওকে তো টাকা-দেওয়া হয়নি এখনও। টাকা না নিয়ে ও নড়বে নাকি! ওখানে বসে আছে, থাক। ডাকলেই আবার বক্বক্ শুরু করবে। আর একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক্।
উফ্! অপারেশন-থিয়েটারের ওই বিভৎস দৃশ্য দেখে মাথাটা একেবারে ...! কিন্তু আমি তো এসব দেখার জন্য এখানে আসিনি। আমি তো এই দোকানের মালিকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। কিন্তু ওই গাই×ড-কাম-মিড্লম্যানটার পাল্লায় প’ড়ে ...! ও তো চাইবেই আমি বেশ কয়েকঘন্টা ধরে সমস্তটা ঘুরে দেখি। যত সময় পেরোবে, তত ওর চার্জ বাড়তে থাকবে। ইচ্ছে করলে অনেক আগেই ওকে পেমেন্ট দিয়ে ছেড়ে দিতে পারতাম। আসলে, আমিও ব্যাপার-স্যাপার দেখে অবাক হয়ে গেলাম। ওর কথার জালে কেমন মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। তাছাড়া, ওই যে যন্ত্রটা মাথায় হেয়ার-ব্যান্ডর মতো লাগানোর জন্য দিল; ওটার সুইচ্ অন্ করলেই অন্যের মনের কথাগুলো সব জানতে পেরে যাচ্ছিলাম। বেশ মজা লাগছিল। এসব চক্করে পড়ে আসল কাজটাই তো হল না। এবার আর ওর বক্বকানি শুনলে হবে না। যার সঙ্গে কথা বলার জন্য এসেছি, তার সঙ্গে এখনও কথাই বলা হল না।
নাঃ! এবার ওঠা যাক্! কথাটা সেরে ফেলতে হবে। আসলে, আমি একটু পরিস্থিতি-পরিবেশ আর ওর মানসিকতাকে বুঝে নিতে চাইলাম! যা বুঝলাম তাতে তো ...! তবু কথা বলতেই হবে। তাছাড়া আর উপায়ই বা কী! পরিস্থিতি- পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে মানিয়ে তো নিতেই হবে। দেখা যাক্ অবশেষে কী দাঁড়ায়।
ওই যে, আমার নড়নচড়ন দেখে গাইড এগিয়ে আসছে। এবার আর ওকে মুখ খুলতে দেব না। আমার ভাড়া করা লোক ও। আমি যা বলব তা-ই ওকে শুনতে হবে।
এই যে গাইড-মশাই! শুনুন! আমি এখন মোটামুটি সুস্থ। সারাক্ষ ণ আপনার বকবকানি শুনে আর ওইসব ভয়ংকর দৃশ্য দেখে মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠেছিল। এখন ঠিক আছি। আপনি একদম আর কথা বলবেন না, তাহলে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ব। শুধু আমি যা চাইব বা বলব, সেটা করবেন, তাহলেই হবে। আপনার পেমেন্ট তবেই আপনি ঠিকমতো পাবেন। বুঝেছেন কী বললাম?
হ্যাঁ, বুঝলাম।
ঠিক আছে। বুঝলেই ভাল। আচ্ছা! এত চিৎকার-চেঁচামেচি হচ্ছে কেন ভেতরে? ওই অপারেশন থিয়েটারের দিকেই গণ্ডগোলটা হচ্ছে যেন! গাইডমশাই! চলুন তো দেখি কী ব্যাপার? আপনার বি-টু না বিট্টূ ওকেও তো চেম্বারে দেখছি না। ওর সঙ্গে কথা বলা আমার খুব দরকার। কোথাও চলে গেল না তো? ওই যে গোলমাল হচ্ছে, ওখানে থাকতে পারে চলুন তো দেখি।
কী ব্যাপার! ও.টি.তে কোনও সমস্যা দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে যেন! কিন্তু ওদিকে এগোতেই ইচ্ছে করছে না। ওখানে গেলে তো সেই বিভৎস দৃশ্য আবার চোখে পড়বে। এখানে দাঁড়িয়েই না হয় ব্যাপারটা ...! ওই তো বিট্টূ চিৎকার করছে কী ব্যাপারে! বলছে— আমাদের স্টকে কি প্রাণ আছে? দ্য সোল—সোল, লাইফ-ব্রেথ আছে?
গাধা কোথাকার! তোমাদের স্টকে প্রাণ থাকবে কী করে বাবা! তোমরা কি প্রাণ দেওয়ার কারবারি! তোমরা তো প্রাণ নাও।
ডাক্তার কী বলল কে জানে! ডাক্তারকে কড়া গলায় বলছে—এখন যাতে আমার ছেলের লাইফ-ব্রেথটা ওই সেফ্টি-প্যাকে থাকে সে চেষ্টা করুন, কুইক!
আশ্চর্য! ওর ছেলের লাইফ-ব্রেথ! সেফ্টি প্যাক! কিছুই তো বুঝতে পারছি না। ওর ছেলে এখানে এল কী করে! লাইফ-ব্রেথ মানে তো প্রাণবায়ু। অর্থাৎ আত্মা। সেটাও সেফ্টি-প্যাকে রাখা যায় নাকি! তখন তো দেখলাম হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, লিভার এসব প্যাকে ভরছে। আত্মাকে প্যাক করে ফেলার কেরামতি এরা শিখে ফেলেছে নাকি! তাহলে তো ঈশ্বরের পর্যায়ে চলে গেছে মানুষ। কই! গাইড তো আত্মা প্যাক করার কথা বলেনি একবারও!
নাঃ! আমার বুদ্ধিতে আর কুলোচ্ছে না। দেখছি গাইডের সাহায্য নিতেই হবে— এই যে! ওই অপারেশন-থিয়েটারের সামনে গেলে আমার আবার মাথা চক্কর দেবে। দেখে এসে বলুন তো কী ব্যাপার! ওর ছেলের লাইফ-ব্রেথ সেফ্টি প্যাকে রাখতে বলছে। ওর ছেলেকেও কি কেটেকুটে বিক্রি করে দিচ্ছে নাকি!
কী বললেন? আপনি জানেন পুরো ব্যাপারটা? তাহলে বলছেন না কেন? ও! কথা বলতে নিষেধ করেছি তাই ...! ঠিক আছে, একটা-আধটা বলবেন, বেশি নয়! ওই তো কাকে যেন ও.টি. থেকে বের করে আনছে স্টে্রচারে করে।
কী বললেন? ওর ছেলে? গাড়ি অ্যা’িডেন্ট হয়েছে? বেঁচে আছে তো?
ওঃ! নীয়ারলি ডেড! মানে মৃতপ্রায়! নার্সিংহোমে নিয়ে যাচ্ছে! আহা রে! একদম যুবক ছেলে দেখছি। বেঁচে যেতে পারে, নাকি বলুন! সবই পাপের ফল। বুঝলেন; সবই পাপের ফল।
পরের ছেলেকে নিয়ে এসে ওইরকম বুক-পেট চিরে হৃৎপিণ্ড, কিডনি কেটে বিক্রি করে দিলে পাপ হবে না! পাপ কখনও বাপকে ছাড়ে না। নাও এখন ঠেলা সামলাও। দেখ, এখন কেমন লাগে!
কিন্তু ওর চোখেমুখে তো কোনও দুঃখ কষ্টের ছাপ দেখছি না! ছেলেটার ওই অবস্থা অথচ ...! ইস্ আমার কষ্ট হচ্ছে ভেতরে ভেতরে! কী সুন্দর মুখখানা ছেলেটার! মাথাভরা কুচকুচে কালো কোঁকড়া চুল। রঙটা কালো হলেও বেশ মিষ্টি মুখখানা। এর মুখ দেখে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে আমার সেই নাতি বৃংহণকে। কাচ কাচ গায়ের রং। নাকটা একটু বসা হলেও চোখ দুটো দারুণ টানাটানা। গলায় সুড়সুড়ি দিলে খিলখিলিয়ে হাসত। সেই বৃংহণের বয়স এখন পঁয়তাল্লিশ বছর হবে! এ বাচ্চাটার মুখের সঙ্গে বৃংহণের সেই কচি মুখখানার কিছুটা যেন মিল পাওয়া যাচ্ছে! না-না এ আমার মনের ভুল! তখনকার কোন কিছুর সঙ্গে এখনকার কোনও কিছুরই মিল নেই, সবই অদ্ভূত!
মনে পড়ে—আমার ছেলে বিপুল তখন তের কি চৌদ্দ। স্কুলের গণ্ডীও পেরোয়নি। ওর ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হবে। আমাকে বলত— বাবা তোমার ফার্মেসির লাগোয়া একটা চেম্বার করব।
তাই দিনরাত পড়াশুনা নিয়েই থাকত। সকালে যখন ফার্মেসি বেরোতাম তখন ও বইমুখে, রাতে যখন ফিরতাম তখনও পড়ার ঘরে। সারাদিনে মনে জমে থাকাপ্রশ্নগুলো একের পর এক করতে থাকত, রাতে চায়ের কাপ হাতে ওর পাশে গিয়ে বসলে।
একদিন ফিরে দেখি ও দাঁতের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। গরম-ঠাণ্ডা কোনওটাই সহ্য হচ্ছে না। হা-মুখ করিয়ে দেখি একখানা মোলারের মধ্যেটা কালো হয়ে রয়েছে। ক্যারিজ হয়েছে কবেই, তেমন গুরুত্ব দেয়নি। এখন আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে। সে রাতটুকু কোনও ক্রমে কাটল দু-একটা পেন-কিলার খাইয়ে। পরের দিন সকাল থেকে আবার এক অবস্থা। অগত্যা ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম আমার ফার্মেসির পাশের চিং সাং ডেন্টাল ক্লিনিকে। ডাক্তার সাং দেখেটেখে বলল— এ’্ট্রাক্ট্ করতে হবে।
দাঁতের গোড়ায় ইঞ্জেকশন দেওয়ার সময় একপ্রস্ত চিৎকার ছেলেটার। তারপর যখন পিনসার দিয়ে ধরে দাঁতটাকে নাড়ানো হচ্ছে, তখন যেন চিৎকারে ছাদ ফাটিয়ে ফেলবে এমন অবস্থা! দেখেশুনে আমারই চোখে জল এসে গেল। ভাবলাম লোকাল অ্যানাস্থেশিয়াটা কি ঠিকমতো হয়নি? ইঞ্জেকশনটা আমার দোকানেরই! দু-নম্বরি মাল দেওয়া হয়নি তো আবার সাংকে। আর থাকতে না পেরে বললাম— ডাক্তার! ছেড়ে দাও ওকে। ওর প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। দাঁত আর তুলতে হবে না। আমি অন্য ব্যবস্থা করব।
সাং কি আর ওই অবস্থায় ছাড়ে! অনেক কসরত করে দাঁতটা উপ্ড়ে যখন মুখের বাইরে আনল; তখন আমার হৃৎপিণ্ডটাতেও যেন উপ্ড়ে ফেলার যন্ত্রণা। দাঁতের যন্ত্রণায় ছেলেটা যত না কষ্ট পেল, তার চেয়ে মনের কষ্ট বেশি পেলাম আমি। অথচ এই যে বিট্টূ, ছেলের এ অবস্থায় ওর কোনও কষ্ট আছে! কর্মীদের ধমকে কাজে পাঠাচ্ছে। কাজটাই যেন সব! আরে বাবা! আগে ছেলেকে বাঁচা, তারপর তোর বাণিজ্য দেখিস!
না-না মনে হয় আমারই ভুল হচ্ছে! কষ্ট কি আর হচ্ছে না ওর! ছেলে বলে কথা! হয়তো লোকগুলোকে ধমক - ধামক দিয়ে ভেতরের কষ্টটাকে চেপে রাখতে চাইছে। এ অবস্থায় ওর সঙ্গে আমার কথা বলতে যাওয়া তো উচিত হবে না! বড্ড অমানবিক হবে ব্যাপারটা! কিন্তু না বললেও যে নয়!
আজ আর কথা বলা গেল না ওর সঙ্গে। কাল এসে বলতেই হবে। কাল আর গাইডের দরকার হবে না। আমার এমনিতেও গাইড লাগত না। কিন্তু হোটেলের ম্যানেজারের চাপে পড়ে ...! গাইডগুলোর সঙ্গে ম্যানেজারের নিশ্চয় একটা ...! তবে, একপক্ষে ভালই হয়েছে। ওকে না নিলে বর্তমান অবস্থা, পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে এত কিছু জানাও সম্ভব হত না।
আজ তো দেখেই গেলাম। সন্ধান যখন পেয়ে গেছি, কাল একাই চলে আসব। আজ বরং গাইডটাকে বিদেয় করে দিই। বাস কিংবা ট্যাক্সি ধরে একাই হোটেলে ফিরে যেতে পারব। তবে কাল হোটেল ছাড়তেই হবে। রসদ তো শেষ হতে চলল। গাইডের পেছনেই তো অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে যাবে। ওকে ছেড়ে দিলেই তো হয়!
এই যে গাইড মশাই! চলুন। আজ আর কথা বলা গেল না। পরে দেখা করব। বাসস্টপে চলুন। ওখানে হিসেব-নিকেশ করে আপনার পেমেন্টটা করে দিই।
কী বলছেন? এখানে নেবেন না? হোটেলে ফিরে নেবেন! কিন্তু আমি আপনাকে আর রাখতে চাইছি না। হোটেলে একাই ফিরে যেতে পারব, অনর্থক এতটা সময়ের চার্জ আপনাকে দিতে যাব কেন?
ও! এখনই টাইম দেখে আপনাকে অফ্ করে দেওয়ার কথা বলছেন! ঠিক আছে টাইম আপনিও নোট করে রাখুন। হোটেলে ফিরলে পেমেন্ট নেবেন তাই তো? হ্যাঁ, হিসেব করে রাখবেন বলছেন। ঠিক আছে। আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দিন।
ট্যাক্সি এখন পাওয়া যাবে না বলছেন! রাস্তা বন্ধ? কেন? কী ব্যাপার? ওহ্! তাই তো! সামনে দেখছি ...!
অবাক লাগছে! পথ অবরোধকারীরা প্রত্যেকেই উলঙ্গ। দু-একজনের ঊর্ধ্বাঙ্গে পোশাক থাকলেও নিম্নাঙ্গ পোশাক-বিহীন। উলঙ্গ শরীরে কোমরের ঘুন্সি থেকে একটা প্লাকার্ড ঝোলানো যৌনাঙ্গের ওপর। তাতে লেখা—সে নো টু সে’্-অ্যামিউজ্্মেন্ট ট্যাক্স্। কয়েকজন নারীকেও দেখা যাচ্ছে অবরোধকারী দলটার মধ্যে। তারাও উলঙ্গ এবং নিম্নাঙ্গে প্লাকার্ড ঝোলানো। দু’একজন মহিলার নগ্ন বুকের ওপরেও এক ফালি পোস্টার সাঁটানো। তা বেশি চোখ টানতে, না লজ্জা ঢাকতে কে জানে! প্রত্যেকের গলায় শ্লোগান—
—সে’্ অ্যামিউজ্মেন্ট ট্যা’্ বাতিল করতে হবে ...
— করতে হবে— করতে হবে
— জনগণের গাঁটকাটা এই নতুন ট্যা্ক্স দিচ্ছি না দেব না
— দিচ্ছি না দেব না
— সিগমা সরকার নিপাত যাক্
— নিপাত যাক্ নিপাত যাক্
শ্লোগানটা বেশ জোরদার হ’ল। অবরোধটা প্রায় শেষ পর্যায়ে; তাই হয়তো শেষ হবার আগে একটু চেগে উঠেছে মানুষগুলো। একদম চৌরাস্তার মাঝখানে শুরু করেছে ওদের অবরোধ ও পথসভা। ওদের মধ্যে যে নেতা, সে একটা চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু করেছিল— বন্ধুগণ! আমাদের এই পূর্বনির্ধারিত পনের মিনিটের পথ অবরোধ করার কারণ আপনারা সকলেই জানেন ...।
তারপর একে একে আরও দু-তিনজন বক্তা গলা ফাটিয়ে বক্তব্য রেখেছে সাম্প্রতিক সে’্-অ্যামিউজ্মেন্ট ট্যাক্স্ বাতিল করার দাবী জানিয়ে। ক্ষমতাসীন সরকারের বড্ড বেশি ব্যবসায়িক মনোভাবের সমালোচনা করে। সরকার নাকি দেশের জনগণ বৃদ্ধি করার জন্য, বিশেষত নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য যে কন্যা সন্তান অধিগ্রহণ প্রকল্প চালু করেছে; তার ব্যয়ভার চালানোর জন্য জনগণের ওপর নতুন এক করের বোঝা চাপাতে চাইছে। কোনও পুরুষ কোনও নারীর সঙ্গে লিভ-টুগেদার করতে চাইলে তার এগ্রিমেন্ট তো করতেই হবে কোর্টপেপারে; সেই সঙ্গে একটা বার্ষিক করও চাপিয়ে দেওয়া হবে তাদের ওপর। এমনকি পলিডল সেন্টারে যে সমস্ত মানুষ সাময়িক যৌনক্ষুধা মেটাতে যাবে, তাদেরকেও এই ট্যাক্স্ দিতে হবে। আগামী আর্থিক বছর থেকে এই নতুন কর কার্যকর হবে। এই নতুন কর সম্পূর্ণ নিয়মবিরুদ্ধ এবং জনগণের ওপর বোঝাস্বরূপ; তাই এর বিরুদ্ধে এই পনের মিনিটের প্রতিবাদ সভা ও পথ অবরোধ।
প্রতিবাদ সভার চারপাশে সাধারণ জনগণ নেই বললেই চলে। প্রচুর পুলিশ আর কিছু সাংবাদিক রয়েছে। পুলিশের বড়কর্তা বারে-বারে ঘড়ি দেখছে কতক্ষণে পনের মিনিট অতিক্রান্ত হয়। অজস্র গাড়ির লাইন পড়ে গেছে যতদূর অবধি চোখে দেখা যায়। প্রতিবাদ সভা শেষ হলে রাস্তা স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। রাস্তার মোড়ে এই বাসস্টপে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কে জানে! এয়ারপোর্টের কাছে সেই হোটেল এখান থেকে কম দূর নয়; প্রায় চল্লিশ মিনিট লেগেছিল। এখন এই জ্যামজট ঠেলে তো আরও বেশি সময় লাগবে।
আচ্ছা! এত কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ছে কিন্তু শহরের ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেমে তেমন কোনও উন্নতি হয়নি দেখছি। তাছাড়া আর একটা ব্যাপারে তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম না। চল্লিশ বছর আগেও ছিল এই পথ-অবরোধ পথসভা; এখনও রয়েছে। হয়তো পুলিশের সঙ্গে বিবাদ-বিসম্বাদ এড়াতে এবং সরকার বা প্রশাসনের কাঁদানে-গ্যাস, রাবার-বুলেট কিংবা জল কামানের খরচ বাঁচাতে একটা নির্দ্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে পথ-অবরোধ করার। এটুকুই যা পরিবর্তন। প্রতিবাদ করাও হল, অথচ কোনও অশান্তি হল না, অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে হল না, এটুকুই যা। কিন্তু এতে প্রতিবাদ কতখানি করা হল এ প্রশ্ন থেকেই যায়। এত কিছু নতুন জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে এই চল্লিশ বছরে। কিন্তু আন্দোলন বা প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসাবে নতুন কোনও পন্থা বেরোয়নি, ভাবতেই অবাক লাগছে।
মনে পড়ছে একবারের একটা ঘটনা। সরকার হঠাৎ ঘোষণা করল— সমস্ত ওষুধের দোকানে জীবনদায়ী ওষুধ রাখতে হবে। বিশেষতঃ বিদেশী কোম্পানির দামী ওষুধগুলো। দেশী ওষুধের চেয়ে ওগুলোর গুণগত মান নাকি ভাল এবং বেশি কার্যকর। যদি কোনও ফার্মেসি ওই বিদেশী কোম্পানির জীবনদায়ী ওষুধের স্টক না রাখে তাহলে তার ড্রাগ-লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
সরকারের এই ফরমান জারিতে মেডিসিন ডিলার অ্যান্ড রিটেলার অ্যাসোসিয়েশন খেপে উঠল। মিটিং-মিছিল করে আন্দোলন শুরু করল। কারণ বিদেশী কোম্পানিগুলোর কমিশন খুবই কম। দেশি কোম্পানিগুলোর মতো সেলিং-ইনসেনটিভও নেই ওদের। তার ওপর মেডিসিনের ডেট এ’পায়ার্ড হয়ে গেলে রিটার্ন বা রিফান্ড হয় না। তাই কোনও কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট কাউন্টার ওই বিদেশি ওষুধ বিক্রি করতে চায় না। সে কারণে অ্যাসোসিয়েশন এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছিল। অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার হওয়ার জন্য আমাকেও প্রতিবাদ সভায় শামিল হতে হয়েছিল।
মনে পড়ছে এই চৌরাস্তার মোড়েই হয়েছিল সেই প্রতিবাদ সভা। সমস্ত যানবাহন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশবাহিনী হাজির হয়েছিল। তারা প্রথমে অবরোধ তুলে নেওয়ার আর্জি জানিয়েছিল। কিন্তু সে কথায় কান না দিয়ে আমাদের শ্লোগান আরও জোরদার হয়েছিল। পুলিশগুলো কিছুক্ষণ শলাপরামর্শ করে হঠাৎ শুরু করে দিয়েছিল লাঠিচার্জ। আমরাও লাঠির প্রতিবাদে, রাস্তার ফুটপাত তৈরি করার জন্য ডাঁই করে রাখা কংক্রিট-ব্লকগুলো তুলে ওদের দিকে ছুড়েছিলাম। সে এক ধুন্ধুমার কাণ্ড! পুলিশ তখন কাঁদানে গ্যাসের সেল ছুড়তে লাগল আমাদের দিকে। অবশেষে আমাদের রণে ভঙ্গ দিতে হয়েছিল; যখন পুলিশ দু-এক রাউন্ড গুলি চালালো শূন্যে।
পরের দিন সমস্ত খবর-কাগজগুলোতে বিভিন্নরকম হেড-লাইন। সরকার-বিরোধী কাগজগুলো লিখেছে—‘গণতন্ত্রের অপমৃত্যু’, ‘গণতন্ত্র সরকার এখন ধনতন্তে্র পর্যবসিত’ এই সব ...। সরকার পক্ষের কাগজ লিখেছে— ‘বিরোধী দলের মদতে আইনের কণ্ঠরোধ’, ‘সমাজ-বিরোধী সংগঠন দ্বারা প্রশাসন আক্রান্ত’ এই সব।
এখন তো আর গণতান্ত্রিক সরকার নেই শুনলাম। কী যেন এক পুঁজিপতি কাউন্সিল সরকারে আছে। সিগমা সরকার। বিরোধী দলও নাকি ক্যাপিটালিস্ট কাউন্সিল। শুধু গোষ্ঠী আলাদা। সুতরাং, গণতন্তে্রর অপমৃত্যু হওয়ার ব্যাপার-ট্যাপার নেই নিশ্চয়! আর ওই সাংবাদিকগুলোই বা কোথায় কী লিখবে কে জানে! খবর-কাগজ বলে নাকি এখন কিছু নেই।
কাল হোটেলের স্টুয়ার্ডকে খবর-কাগজের কথা বলতে বোকার মতো কিছুক্ষণ চেয়ে রইল মুখের দিকে। চোখে দেখা তো দূরের কথা, ‘নিউজপেপার’ শব্দটাই নাকি শোনেনি কখনও। বুঝিয়ে বলতে দেওয়ালের দিকে আঙুল বাড়িয়ে একটা ওয়াল-স্ক্রিন দেখিয়ে দিল। বিছানার পাশে একটা সুইচ্ টিপে সেটা অন্ করে দিয়ে চলে গেল ছেলেটা। দেখি স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে— নিউজ হেড্লাইনস ...! খবরের কথার ফাঁকে ফাঁকে নানারকম জিনিসপত্রের বিজ্ঞাপন। কোন্টা খবর আর কোন্টা বিজ্ঞাপন সেটাই বুঝতে পারছি না।
আজ রাস্তায় বেরিয়ে দেখলাম রাস্তার মোড়ে-মোড়ে নিউজ-ডিস্প্লে। কোথাও লেজার-স্ক্রিন, কোথাও ডিজিটাল ফ্ল্যাট-ডিস্প্লে। সেখানে নিউজ বয়ে যাচ্ছে নদীর স্রোতের মতো! পথচারীদের চোখ পড়ছে কখনও-সখনও। সেখানেই হয়তো নিউজ হবে ওই সব সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা বাইটগুলো।
সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এমন পরিবর্তন এলেও সেই মান্ধাতা-আমলের মিছিল-মিটিং, পথসভা, অবরোধ করা, এসব দেখে অবাক লাগছে। আরও অবাক লাগছে পুলিশের হাতে কোনও অস্ত্রশস্ত্র নেই দেখে। রাইফেল, রিভলবার তো দূরের কথা হাতে লাঠিও চোখে পড়ছে না! অদ্ভূত ব্যাপার! সে সময় পুলিশের হাতে যত না অস্ত্রশস্ত্র থাকত, তার চেয়ে বেশি থাকত রাজনৈতিক দলের হার্মাদ বাহিনীর হাতে!
আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার কি আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে! নাকি আগ্নেয়াস্ত্রর চেয়েও মারাত্মক ও আধুনিক কোনও অস্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, যা পুলিশের কাছে রয়েছে অথচ দেখা যাচ্ছে না! সেই ভয়েই কি না কে জানে পনের মিনিট পেরোতেই অবরোধকারী উলঙ্গ মানুষগুলো অবরোধ তুলে নিয়ে রাস্তা খুলে দিল।
অজস্র গাড়ি ছুটছে বিভিন্ন চ্যানেল ধরে। সুপারফার্স্ট চ্যানেলের গাড়িই বেশি। ট্যাক্সি পেতে হলে ‘ট্যাক্সি-বে’র মুখটায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে দেখছি। তা নাহলে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না সারা রাত্রি অপেক্ষা করলেও।
দুই
বেলা পড়ে এল। আলো দ্রুত কমে আসছে। কিছুক্ষণ আগেও তো সূর্য গন্গন্ করছিল। মনে হচ্ছিল যেন দুপুর পেরিয়েছে সবে। অথচ সূর্যটা চোখের আড়াল হতে না হতে আলো নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে দেখছি। প্রকৃতি এতখানি বদলে গেছে! আগে সূর্যডোবার পরেও বেশ কিছুক্ষণ আলো থাকত বিশ্বজুড়ে। অদ্ভূত মায়াময় সেই আলো। তাকে বলা হত কনেদেখা আলো। গোধুলিবেলা। এখন সেই গোধুলিবেলাটা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে দেখছি। খুব তাড়াতাড়ি সন্ধে নেমে যাবে। নামবে রাত্রিও। আমার এখন হোটেলে ফেরার চেষ্টা করা উচিত। তা না হলে হয়তো একা একা ফিরতে পারব না!
এখন আমি কী করব সেটাই ভাবছি। এর চেয়ে বরফ ঘুমে থাকাই ভাল ছিল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নেমে যাবে। সূর্য ডুবলেও গরম কমেনি একটুও। ক্রায়োনি’ সেন্টার থেকে এই অদ্ভূত জোব্বাটা দিয়েছিল তাই রক্ষা। এটা গায়ে চড়ানো থাকলে গরমটা কম লাগে। ওখান থেকে ছেড়ে দেওয়ার আগে একটা ইন্জেক্শান্ দিয়ে দিল। বলল— রে-প্রোটেক্টিভ্ ভ্যা’িন্ নাকি ওটা। জানি না, ওই ভ্যা’িন্ আদৌ কাজ করছে কি না। গরমে তো প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা। ভাবছি, এয়ারপোর্টের পাশের হোটেলটাতেই আজ ফিরে যাবো আবার। আজ আরও একটু ঘোরার ইচ্ছে ছিল। যদি বাড়িটাও দেখে আসতে পারতাম! অবশ্য খুঁজে পাব কি না সন্দেহ আছে। এত বদলে গেছে তা বলার নয়। খুঁজে পেলেও বা কী হ’ত! আমাকে কি আর ...! এই জায়গাটাতেও কি পৌঁছতে পারতাম যদি না গাইডটা থাকত। এই যে এখানে বসে আছি, যতদূর মনে পড়ে, এখানে ছিল একটা ছাতিমগাছ। তার চারপাশে সিমেন্ট বাঁধানো ছিল। একটা গোলাকার বেঞ্চ যেন! চলতে চলতে শ্রান্ত পথিক কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিতে সেই ছাতিমগাছের ছায়ায় বসত। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে কেউ আবার মাথা বাঁচাতে সেখানেই আশ্রয় নিত। আর প্রাণ ভরে উপভোগ করত ছাতিমফুলের গন্ধ। আজ এটা একটা বাসস্টপ্। কোনও এক মাল্টি-ন্যাশানাল কোম্পানি শেড্ তৈরি করে নিজেদের বিজ্ঞাপন দিয়েছে। কোথায় ছাতিমগাছ, কোথায় বেঞ্চি! রাস্তার ওপাশেই আমার ফার্মেসির পেছনে ছিল বিশাল এক কৃষ্ণচূড়া। মাঘ-ফাগুনে গাছটা ফুলে-ফুলে লাল হয়ে থাকত। গাছের তলায় ঝরে পড়ত পাপড়ি। পেছনের জানালা খুললেই ...!
আজ ওখানে ওই কোম্পানিটার ক্রিমেটোরিয়ামের চোঙ দাঁড়িয়ে আছে। এসব দেখে মনটা সত্যিই খুব খারাপ হয়ে গেল। কিছুই ভাল লাগছে না।
আচ্ছা! হোটেলে আর না ফিরলেই বা কী হয়! আমি তো হোটেলে থাকার জন্য আসিনি। বিমানবন্দরে নেমে সোজা বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম। আমার নিজের বাড়ি। ছোট্ট দোতলা সাদা বাড়িখানা। বাড়ির সামনে বাগান, পাশে দেবদারু গাছ ছাদ ছুঁয়েছে। ছাদে জলের ট্যাঙ্কটা একটা ক্যাপসুলের আদলে করা। তার অর্ধেকটা সমুদ্র নীল রং আর অর্ধেকটা সাদা। ঠিক যেন একটা অ্যাম্পিসিলিন ফাইভ হানড্রেড ক্যাপসুল। মনে পড়ছে তার গায়ে ‘ফাইভ হানড্রেড’ সংখ্যাটাও লেখা। পাঁচশো লিটার জলের ট্যাঙ্ক ছিল সেটা। ওষুধের দোকান চালাতে চালাতে মনটাই বোধহয় ওষুধময় হয়ে গিয়েছিল। ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সিরাপ ছাড়া আর কিছু মাথায় আসত না। তাই বাড়িটার নামও রেখেছিলাম ‘কোবাডে’্ ফোর্ট’। একটা মালটি-ভিটামিন ক্যাপসুলের নামে নাম। আমার পাশের বাড়িটার নাম ‘ডাটসন ফোর্ট’ এর সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখলেও নামের অন্তর্নিহিত অর্থটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেই বাড়িটাতে পৌঁছনোর ঠিকানা-ই আমি বলেছিলাম এয়ারপোর্টের ট্যাক্সি ড্রাইভারকে । ড্রাইভার অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। এরকম কোনও রাস্তার নাম সে জীবনে শোনেনি। এমনকি আমি শহরের যে নাম বলছি, সে নাম নাকি বিশ-পঁচিশ বছর আগে ছিল। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কী বুঝল কে জানে ছেলেটা; আমাকে বলল— মনে হচ্ছে আপনি বহু বছর পর এ শহরে এলেন, চলুন, আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দিই। কাল দিনেরবেলায় ঠিকানা খুঁজে নেবেন।
অবশেষে এয়ারপোর্টের কাছে এক হোটেলে উঠলাম। হোটেলের লোকজনও ওই ঠিকানার হদিশ দিতে পারল না। বলল, এতো ঐতিহাসিক যুগের নাম বলছেন; এখনকার রাস্তার ওই ধরনের নাম নেই।
ক্রায়োনি’ সেন্টার থেকে একটা ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল। বাড়ির ঠিকানা না পাওয়ায় সেই ঠিকানায় যাওয়া ঠিক হ’ল। হোটেলের ম্যানেজার বলল— আপনি এ শহরে একদম ‘নিউ-কামার’ দেখছি। একটা গাইড নিয়ে নিন।
অগত্যা গাইড নিতে হল। সে আমাকে নিয়ে পৌঁছল এই ভেনাস হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স প্রাঃ লিঃ-এ। এর মালিক-ই নাকি সেই লোক, যার সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই। আমি দেখা করতে চাই আমার নাতির সঙ্গে। তার নাম তো বৃংহণ বোস। কে-বি-টু কোনও মানুষের নাম হতে পারে আমার ধারণা ছিল না। যদ্দুর মনে পড়ছে, একটা মেডিসিনের এরকম নাম ছিল। যৌনশক্তিবর্ধক একটা ওষুধ।
হোটেল ম্যানেজার বলল—আপনি পুরোনো নাম বলছেন। টু-থাউজেন্ড থার্টিতে ক্যাপিটালিস্ট গভর্নমেন্ট ক্ষমতায় আসার পর নামের ব্যাপারে ব্যাপক রদবদল ঘটায়। ক্রিস্টেনিং অ্যাক্ট চালু করে।
সেই অ্যাক্ট-এর বাই-ল অনুযায়ী আপনার নাতির নাম বদলে হয়তো ওই নাম হয়েছে। কর্পোরেশন অফিসে গেলে কনফার্ম হওয়া যাবে। ওখানে রি-নেম-এর টোটাল লিস্ট আছে। আপনি এই ঠিকানায় একবার গিয়েদেখুন। আপনার নাতিকে তো দেখলে চিনতে পারবেন। সঠিক না হলে, তখন কর্পোরেশন অফিসে খোঁজ নেবেন।
নাতিকে চিনতে আর পারলাম কই! ভেবেছিলাম, পাঁচবছর বয়স অবধি তো দেখেছি, মুখের আদলে কিছুটা মিল ঠিকই পাওয়া যাবে। কিন্তু ...! শারীরিক পরিবর্তন হতেই পারে। যুদ্ধ-টুদ্ধ হওয়ার পর আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তাতে রং-চেহারার ওপর প্রভাব পড়তেই পারে। শরীরের পুষ্টির জন্য খাদ্য ব্যবস্থাও পাল্টে গেছে। সারা পৃথিবী জুড়ে এখন একটাই খাদ্য— ফুড কেক। তাতেও শরীরের ...।
কিন্তু মন! মানসিক গঠন কি এত পাল্টে যাবে! ওর বাবা বিপুলের মনে কী মায়া মমতা ছিল! একবারের ঘটনা মনে পড়ে— বিপুল তখন আমার ওষুধের দোকান আর গোডাউনটাকে রিনোভেট করে সদ্য-সদ্য নার্সিংহোম খুলেছে। নার্সিংহোমে রাত্রিবেলায় একটা পেসেন্ট এল। চৌদ্দ-পনের বছরের ছেলে। মোটর সাইকেল আ্য’িডেন্ট হয়ে পায়ে মারাত্মক রকম কেটে গেছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে প্রায় মর মর অবস্থা। ইমিডিয়েট ব্লাড দেওয়ার দরকার। ওর ড্রাইভিং-লাইসেন্স দেখে ব্লাড-গ্রুপটা সঙ্গে সঙ্গে জানা গেলেও, ব্লাড কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া গেল না। গ্রুপটা বিপুলের ব্লাড-গ্রুপের সঙ্গে মিলছে। ও করল কী— ডাক্তারকে বলল— আমার শরীর থেকে ব্লাড নিন। সেম গ্রুপ। বাচ্চাটাকে বাঁচান।
সেই বিপুলের ছেলেই তো বৃংহণ, আমার নাতি। সে যদি কে-বি-টু হয় তাহলে তার মানসিকতা কি এত পাল্টে যাবে! যে মানুষ একটা তের-চৌদ্দ বছরের কিশোরকে বাঁচানোর জন্য নিজের শরীর থেকে রক্ত দেয়, তার ছেলে কি না জলজ্যান্ত একটা বাচ্চাকে আনিয়ে হার্ট-ফুসফুস কেটেকুটে বের করে বিক্রি করে দিতে পারে! মিলছে না কিছুই মিলছে না। প্রকৃতি-পরিবেশ-পরিস্থিতি মানুষকে যতই পাল্টাক না কেন, জিনগত বৈশিষ্ট্য কি এত পাল্টায়! পাল্টায় না বোধহয়! তাই তো বিশ্বাস হচ্ছে না যে ওই গরিলার মতো দেখতে নৃশংস মানুষটা সেই কোঁকড়া চুলের ফুটফুটে বৃংহণ! বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
কিন্তু গাইড যা বলল, তাতে ও বৃংহণ না হয়েও যায় না। ওর বাবার নার্সিংহোম ছিল, ঠাকুরদার নাকি ছিল ফার্মেসি। ফার্মেসি তো ছিল আমারই। এখানেই। জায়গাটা চিনতে পেরেছি। ওই যে একটা চোঙ দেখা যাচ্ছে। ওই জায়গাটাতে ছিল একটা সুপুরি গাছ। গাছের গোড়ায় ছিল ছোট্ট একটা বাগান। অযত্নেও সেই বাগানে ফুটত নানারকম মরশুমি ফুল। এখন ওখানটায় হয়েছে ক্রিমোটোরিয়াম। ওই মানুষ কাটা ঘর থেকে দেহের অদরকারি অংশ, নাড়িভুরি, ছাল-চামড়া এসব পুড়িয়ে ফেলা হয় ওখানে। ফুলের গন্ধে ম-ম করত ওখানটা। এখন দুর্গন্ধে যাওয়া গেল না ওদিকে। ওই চোঙটা থেকে বেরোচ্ছে ধোঁয়া আর বিদ্ঘুটে চামড়া পোড়ার গন্ধ।
ওই চোঙটার সোজাসুজি দূরে তাকালে যে মিনারটা দেখা যাচ্ছে, ওটা ছিল। অক্টাভিয়ান মিনার ওটা। এত কিছু ভেঙে-চুরে পাল্টালেও ওটাকে ভাঙা হয়নি কেন কে জানে! মনে পড়ে— ওই অক্টাভিয়ান মিনার সংলগ্ন পার্কে একবার বেড়াতে এসেছিলাম ছোট্ট বৃংহণকে নিয়ে। ওই মিনারের নীচের বেদিতে বৃংহণকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ছবি তুলেছিলাম ওর। কী মিষ্টি হাসি সেই ছবির বৃংহণের। মনে আছে বেদির পাশে একটা মরা কাক দেখে বৃংহণের হাসি থেমে গিয়েছিল হঠাৎ। কেমন থম্ মেরে গিয়েছিল ও। মরা কাকটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ও নানান প্রশ্ন শুরু করেছিল— কাকটা কী করে মরল, কারা মারল, ওর অসুখ করেছিল কিনা, এইসব। এখনও মনে আছে সেই সময়কার কষ্ট-মাখা মুখখানা।
আজ কিন্তু নিজের ছেলের মরণাপন্ন অবস্থাতে সেই কষ্টের লেশমাত্র খুঁজে পেলাম না ওর মুখে। ভাবছি নিজের ছেলের ওপরেই যদি ওর কোনও টান না থাকে, তাহলে আমার মতো এক সেকেলে বুড়োর ওপর কি কোনও টান থাকবে!
একটা বিষয় কিছুতেই মাথায় আসছে না, অপত্য স্নেহ, মূল্যবোধ এসব তামাদি হয়ে গেছে এদের সমাজে; তবুও এই সমাজটা দাঁড়িয়ে আছে কিসের ভিত্তিতে; কী সেই আশ্চর্য বন্ধন যা সমাজকে আটকে রাখার সাধারণ শর্তগুলি ছাড়াও বেঁধে রাখতে পারছে এদের সমাজটাকে! নাকি এদের সমাজ বলে কিছুই নেই! তাহলে মানুষ এখন আর এখন সমাজবদ্ধ জীব নয়! একটা স্বপ্ন তো নিশ্চয় আছে এদের জীবনে; স্বপ্নহীন হলে তো জীবন থাকে না বলেই জানতাম। কোনও মানুষের নিজের স্বপ্ন যথাযথভাবে পূরণ না হলে, সে সেই স্বপ্নকে পূরণ করতে চায় অপত্যের মধ্যে দিয়ে; তাই সন্তান, তাই সৃষ্টি, তাই পালন-পোষণ।
আমি যখন ওষুধের দোকান চালাতাম, তখন আমার দোকানে একজন ডাক্তার বসত রোগী দেখার জন্য। তখন ভেবেছিলাম, ছেলেটাকে ডাক্তার তৈরি করব, সে এই চেম্বারে বসবে। এই স্বপ্নটাই রসদ জুগিয়েছিল বিপুলকে ডাক্তারি পড়াতে। সে ডাক্তার হয়ে শুধু ওষুধের দোকানের চেম্বারে বসেনি। নার্সিংহোমে বদলে ফেলেছিল দোকানটা। জানি না, বিপুল কি স্বপ্ন দেখেছিল তার সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে। নিশ্চয় এই মানুষ কাটার ব্যবসাদার করতে চায়নি! এই যে বিট্টূ না বি-টু নামের লোকটা, যে আমার নাতি হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে; ওর কি স্বপ্ন নেই ওর ছেলেকে নিয়ে? যদি না-ই থাকে, তবে কেন সন্তান, কেন বিবাহ! ও! বিবাহ প্রথা নাকি বন্ধ হয়ে গেছে। গাইডটা বলছিল, এখন বিয়ে-টিয়ে নেই, আছে লিভ-টুগেদার কিংবা বেড-পার্টনার। শুধুমাত্র শয্যাসঙ্গী কিংবা শয্যাসঙ্গিনী! অর্থাৎ বিবাহটা পাল্টে গিয়ে এখন শুধু শারীরিক খিদে মেটানোর জন্য একটা বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সাময়িক উপস্থিতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই সমাজেই এক সময় মনুসংহিতা নামের গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, যাতে বিয়ে সংক্রান্ত ব্যাপারে ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’ লেখা থাকলেও সেই সঙ্গে ছিল— স্ত্রিয়ঃ শ্রিয়শ্চগেহেষু ন বিশেষোহস্তি কশ্চনঃ ... এ ধরনের কিছু শ্লোক; যার পুরোটা আর মনে নেই। কিন্তু অর্থটা মনে আছে— শুধুমাত্র সম্ভোগের জন্যই স্ত্রী নয়। বাস্তবে স্ত্রী ও লক্ষ্মীর মধ্যে কোনও ভেদ নাই। সন্তানের জন্মদান হেতু নারী বহুকল্যাণময়ী, পূজনীয়া, গৃহশোভাদায়িনী, অতিথি বৎসলা ... আরও কী কী সব যেন ছিল।
অতিথিবৎসলা, গৃহশোভাদায়িনী এ সব এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলেও সন্তান উৎপাদনের প্রয়োজন কিন্তু থেকেই গেছে। মানুষ-প্রজাতির ধারাটাকে অক্ষুণ্ন রাখতে নিশ্চয়! তাই সন্তানধারণের জন্য সরকারকে নাকি ফরমান জারি করতে হয়েছে! গাইড বলছিল, কমপক্ষে একটা সন্তান নিতেই হবে নাকি নিজের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী রাখার জন্য! সেটা ক্লোনিং করেই হোক কিংবা পাঁচবছরের জন্য কোনও নারীর সঙ্গে লিভ টুগেদার করেই হোক!
তাহলে এই বিট্টূর স্ত্রী, মানে আমার নাতবউ বলে কি কেউ নেই? অবশ্য বিট্টূ যদি আমার নাতি হয় তবেই। যদি এখন না-ও থাকে, কেউ তো ছিল নিশ্চয়; ওর ছেলে যখন আছে। ইস্! ছেলেটার জন্য মনটা খারাপ লাগছে! নার্সিংহোম তো নিয়ে গেল, বাঁচল না মরল কে জানে! আচ্ছা! ওর বাঁচা-মরার সঙ্গে আমার সম্পর্কও তো জড়িয়ে আছে! ও যদি বাঁচে, তাহলে আমার বংশের প্রবাহটা বজায় থাকল! অবশ্য বংশের ধারা বজায় থেকেই বা কোন্ মহাবোধিলাভ হবে! যা অবস্থা দেখছি, তাতে মানুষ-প্রজাতিটার ধারা বজায় থাকে কিনা সন্দেহ, সেখানে কোন্ এক বিপ্রতীপ বসুর বংশের ধারা থাকল আর না থাকল!
বাঃ! নিজের নামটা হঠাৎ মনে পড়তে, মনে একটা অদ্ভূত শিহরণ খেলে গেল তো! বি-প্র-তীপ বসু। বেশ ভাল লাগছে নিজের নাম উচ্চারণ করতে। নিজেকে ভালবাসার মতোই মানুষ নিজের নামকেও খুব ভালবাসে, বোঝা যাচ্ছে! হোটেলে ওঠার সময় নিজের নাম বলেছিলাম। চল্লিশ বছর পর নিজের নাম নিজের মুখে উচ্চারণ করেছিলাম। মনের ভেতর অদ্ভূত এক সুখের অনুভূতি হচ্ছিল তখন। কিন্তু হোটেলের রিসেপশনের ছেলেটা ভ্রূ কুঁচকে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করেছিল আমার নাম। তারপর কম্প্যুটারে তুলেছিল। ওখানে আমাকে মিঃ বি-বি বলেই ডাকা হচ্ছিল।
আমারও তো একটা নতুন নাম হবে কর্পোরেশনের খাতায়। যদি আমি এখানে থাকি! অবশ্য এখানে না থাকলে যাব আর কোথায়, একমাত্র মরে যাওয়া যেতে পারে! কিন্তু মরতে কি আর কেউ সহজে চায়! এই যে আমি বলতে গেলে চল্লিশ বছর মৃতই ছিলাম। তারপর বেঁচে উঠতে মনে এক অদ্ভূত আনন্দ হয়েছিল! আবার দেখতে পাব সেই চেনা পথ-ঘাট, চেনা প্রকৃতি, গাছপালা, ফুল-পাখি-নদী, প্রিয়জন, বংশধারা! কিন্তু কোথায় সে সব! প্রকৃতি তো অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ছাত্রবেলায় কোথায় যেন পড়েছিলাম— প্রকৃতির কোনও বদল হয় না। সত্যিকারের প্রকৃতি অপরিবর্তিত থাকে। তার মধ্যে নানান বৈচিত্র্য থাকে বলেই মানুষ নিত্য-নতুন দেখে প্রকৃতিকে।
এখন মনে হচ্ছে এসব ভুল কথা। প্রকৃতি-সমাজ-বাস্তব যে দিকে যেতে চায়, তাকে বল্গাহীনভাবে ছুটতে দিলে তা একসময় বদ্লাবেই, ভেঙে টুকরো-টুকরো হবেই। নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে ক্রমশ যদি কেউ চড়াইয়ে উঠতে থাকে, বাঁকের মাথায় তার গিরিখাতে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
ওই যে প্রবল গতিতে একখানা গাড়ি ছুটে আসছে ...! কী আশ্চর্য! আমি তো এখনও রাস্তার ধারে বাসস্টপেই দাঁড়িয়ে আছি। আমার তো সেই এয়ারপোর্টের কাছে হোটেলে ফেরার কথা। কী যে এতক্ষণ ধরে ছাইপাঁশ ভাবছি। কখন অন্ধকার নেমে গেছে খেয়াল করিনি। রাস্তায় আলোগুলো জ্বলে উঠছে। কাল এয়ারপোর্টের ট্যাক্সি ড্রাইভারটা বলছিল। এসব নাকি সৌরশক্তির আলো! এখন নাকি তাপবিদ্যুৎ বা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নেই। বিদ্যুৎ তৈরি হয় সূর্যের আলো থেকে আর অ্যাটম থেকে। যাক্, একটা সুবুদ্ধি অন্তত হয়েছে মানুষের। পরমাণু-শক্তিকে এখন মানুষের উপকারে ব্যবহার করতে শিখেছে। গাইড বলছিল, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেছে। পরমাণু বোমাতে বহু দেশ ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই ধ্বংসলীলা দেখেই হয়তো ...!
মানুষকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। মানুষের স্বভাবই এই! কোনও কিছু হাতে পেলে তার সঠিক ব্যবহার জানতে একটু সময় লাগে বইকি! মনে পড়ে— ছেলেবেলায় কোনও গাছের ডাল হাতে পেলে, সেটা দিয়ে দুমাদ্দুম পেটাতাম নিরীহ গাছগুলোকে। গাছের ডালের প্রহারেই ধ্বংস হত অন্যান্য গাছ। পরে যখন বুঝতাম সেই বিধ্বস্ত গাছগুলোর যন্ত্রণা; তখন হাতের ডালটাকে দা-কাটারি দিয়ে কেটেকুটে বানাতাম খেলার তরবারি, জগন্নাথের রথ কিংবা ওই দা-কাটারির বাঁট। সে সব নব্বই বছর আগেকার কথা। নব্বই বছর পরে হলেও মানুষের স্বভাব বোধহয় বদলায়নি।
আরে! আমি যে এখনও রাস্তার ধারে বসে বসেই আকাশ-পাতাল ভাবনা ভেবে যাচ্ছি। কিন্তু রাস্তায় তো থাকতে দেয় না কাউকে, গাইড বলছিল। একটা ঠিকানাতে পৌঁছতে হবে। হয় হোটেলে নয় নিজের বাড়িতে। হোটেলে থাকার রেস্তও তো তলানিতে। ক্রায়োনি’্ সেন্টার থেকে যে টাকা দিল তা বেশিরভাগটাই তো হোটেলে ডিপোজিট দেওয়া আছে। তাতে বড়জোর আর একদিন থাকতে দেবে। আচ্ছা! এমন তো করা যেতে পারে— ওই হার্ট-ফুসফুসের দোকানটার পাশে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। যখন ওই বিট্টূ বেরোবে, তখন ওর পিছু নিলে বাড়ি অবধি পৌঁছে যাব। বাড়িটা দেখলে নিশ্চয় চিনতে পারব, তখন নিশ্চিত হওয়া যাবে ও আমার সেই আদরের বৃংহণ কি না! সেটাই বোধহয়, বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই গরমে আর দাঁড়িয়ে থাকাও যাচ্ছে না। ওখানেই বরঞ্চ...!
তিন
আমি এখন সুখ অনুভব করছি না, আবার দুঃখও পাচ্ছি না। এখন বুঝতে পারছি সুখ-দুঃখ ব্যাপারটাই আপেক্ষিক। মনের আবেগের ওপর নির্ভর করে সুখবোধ; আর মনের সহনশক্তির ওপর নির্ভর করে দুঃখবোধ। আবেগ বেশি হলে অল্পতেই সুখের অনুভূতি মনের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। আর মনের ভেতরে দুঃখ-প্রতিহত করার বাঁধ যদি শক্তপোক্ত হয়, তাহলে দুঃখের বেনোজল সহজে ঢুকতে পারে না।
গভীরভাবে চিন্তা করলে হয়তো আমি সুখী এখন। চল্লিশটা বছর পেরিয়ে গেলেও আমার শরীর, আমার মনন-মেধা কিন্তু সেই ষাট বছরের মতোই রয়ে গেছে। চল্লিশ বছর পরের পৃথিবীকে দেখতে চেয়েছিলাম। দেখতে পেয়েছি। সুতরাং আমার সুখী হওয়া উচিত। আবার যখন দেখছি প্রকৃতি-পরিবেশ, মানুষ, সমাজের এই হতাশাসঞ্চারি নেতিবাচক পরিবর্তন; তখন মন আর আনন্দের সাজে সজ্জিত হতে পারছে না। দুঃখ পাওয়ার উপকরণগুলোর তো অভাব নেই। দুর্ঘটনাকবলিত ওই যে যুবক ছেলেটি যে আমার নাতির ছেলে; সে যদি আর মৃত্যুর কিনারা থেকে ফিরে না আসে, তাহলে আমার দুঃখিত হওয়া উচিত। কারণ আমার বংশধারাতে ছেদ পড়ে গেল। কিন্তু যখন বুঝেছি যে, মৃত্যু আর জীবনের মধ্যে প্রভেদ খুব সামান্যই; তখন মৃত্যু আর মনে রেখাপাত করে না। তাই সুখ কিংবা দুঃখ কোনওটাই তেমনভাবে আমাকে আঁকড়ে ধরছে না। আমি তো মৃত্যুর শীতলতাকে সঙ্গী করে এতগুলো বছর কাটিয়ে আবার জীবনের উষ্ণতায় ফিরে এসেছি। বুঝেছি, মৃত্যু আর জীবনের মধ্যে বিস্তর প্রভেদ নেই, মৃত্যু জীবনেরই রূপভেদ মাত্র। তবুও সাধারণ মানুষ কিন্তু মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে ভয় পায়। অন্যের মৃত্যুতে মানুষ দুঃখ পায় না। দুঃখ পায় অন্যের মৃত্যুতে নিজের স্বার্থহানি হলে। তাই হয়তো ওই বিট্টূর মনে কোনও দুঃখ ছড়াচ্ছে না, অঢেল অর্থ রয়েছে তার। স্বার্থহানির আশঙ্কা নেই।
যে সমাজে অর্থই হচ্ছে সুখ-সমৃদ্ধির মাপকাঠি, সেখানে সে তো সুখীই। তার ছেলে মারা গেলেও, তার নিজের লোভ-লালসা তৃপ্ত হওয়াতে কিংবা বাহ্যিক সুখভোগে তো কোনও বাধা সৃষ্টি হবে না। নিজেকে ছাড়া মানুষ আর কাউকে ভালবাসে না। হয়ত নিজেকেও তেমনভাবে ভালবাসে না।
লোভ-লালসা-আকাঙক্ষাকে অবলম্বন করেই তো জীবন। এই যে আমি রাস্তার ওপর থেকে এপারে এলাম লোভে পড়েই তো! বেঁচে থাকার লোভ, জীবনের রসদ জোগাড়ের লোভ আমাকে এখানে টেনে আনল। ওই বি-টু না বিট্টূ নামের লোকটা যদি আমার নাতি হয়, আমাকে যদি তার পরিবারে স্থান দেয়, সে ব্যাপারে কথা বলার জন্যেই তো এলাম এখানে। একসময় না একসময় সে এই হিউম্যান লিম্ব সাপ্লায়ার্স থেকে বেরিয়ে ঘরমুখী হবে। আমিও তার অনুসরণ করে নিশ্চিত হয়ে নেব আমার নিজের বাড়িতে পৌঁছলাম কি না।
আচ্ছা! এমনও তো হতে পারে, সেই পুরোনো বাড়ি আর নেই। নাতি অন্য বাড়ি তৈরি করেছে অন্য কোথাও। সেটা তো চিনতে পারার কথা নয়; তখন কী হবে!
ধ্যুস! তখন যা হবে দেখা যাবে, এত ভাবতে ভাল লাগে না। না হয় মৃত্যু হবে আমার, তার বেশি তো কিছু নয়।
ওই যে! বিট্টূ বেরিয়ে আসছে মনে হচ্ছে। গাড়ির দিকে যাচ্ছে। এক্ষুনি রওনা দেবে নিশ্চয়। ওকে অনুসরণ করতে হলে আমারও তো একটা গাড়ি দরকার। নাকি এক্ষুনি গিয়ে কথা বলব। নিজের পরিচয় দিয়ে বলব— বৃংহণ! আমাকে বাড়ি নিয়ে চল্! আমি তোর দাদু!
কিন্তু আমার কথা যদি না শোনে! আমাকে যদি গুরুত্ব না দেয়! তার চেয়ে বরং বাড়িতে যাওয়াই ভাল।
ওখানে গিয়ে যা হয় বলা যাবে, এখানে যা ব্যস্ত থাকে। হয়ত মাথায় অনেক চিন্তা রয়েছে! তার ওপর ওর ছেলেটার ওই অবস্থা। যতই অমানুষ হয়ে যাক, ছেলের জন্য একটুও কি কষ্ট হচ্ছে না!
একটা ট্যাক্সি নিয়ে ওর পেছন পেছন যাই বরং। দুম্ করে তো আর সব কিছু বলা যায় না।
এই ভাই রোক্কে রোক্কে!
... ... ...
ব্যাস! সামনে ওই যে নীল রংয়ের গাড়িটা ব্যাক্ করছে দেখতে পাচ্ছ? হ্যাঁ, ওই নীল গাড়িটার পেছন-পেছন যাবে, বুঝতে পেরেছ?
তুমি করে বলছেন কেন? সম্মান দিয়ে কথা বলতে পারেন না?
কী বলছ? তোমাকে তুমি সম্বোধন করছি কেন? আপনি বলতে হবে! আরে বাবা! তুমি বললাম তো কী হয়েছ! আমার বয়স কত জান? তুমি আমার নাতির বয়সী ... না, না, নাতির ছেলের বয়সী হবে।
যত বয়সই হোক আপনার, আমাদের তো একটা আত্মসম্মান আছে! ট্যাক্সি-ড্রাইভার বলে কি মানুষ নই!
ঠিক আছে বাবা ঠিক আছে। এই যে ট্যাক্সি-ড্রাইভার সাহেব, দয়া করে সামনের ওই নীল গাড়িটাকে অনুসরণ করুন।
হুঁঃ! আত্মসম্মান! যে সমাজে মানবিকতা, মায়া-মমতা, এসব উধাও হয়ে গেছে, সেখানে আত্মসম্মান নিয়ে ধুয়ে-ধুয়ে জল খাবে! যত্তসব ...!
... ... ...
ওঃ! বিট্টূর গাড়িটা কী স্পীডে ছুটছে রে বাবা! আর কিছু হোক না হোক গাড়িগুলোর স্পীড্ বেড়েছে! অবশ্য সবই তো উড়াল পুল! পুরো শহরটাই দেখছি উড়াল পুলে ভরা। ওপাশে আকাশের বুক চিরে ওটা কী দেখা যাচ্ছে আবার! উড়ালপুল তো মনে হচ্ছে না! এই যে ড্রাইভার সাহেব! ওই দূরে রাস্তার মতো কী ওটা? কী সব তার-টার দেখছি।
ওটা স্কাই-রেল!
কী বললে? না-না কী বললেন? স্কাই রেল! বাব্বা! আকাশরেল হয়েছে আবার! কেন, পাতাল রেল চলে না আর?
আপনি কী স্যার স্পেস-সিটিতে বসবাস করতেন নাকি! কোনও খোঁজখবর রাখেন না! টু থাউজেন্ড থার্টি সিক্সে বিশাল উল্কাপাত হল, মারাত্মক রকম ভূমিকম্প হল, সুনামি হল। তখন পাতালরেলের টানেলে বিভিন্ন জায়গা ফাটল ধরল। তার পর থেকেই তো বন্ধ আছে পাতাল রেল। টু থাউজেন্ড ফিফটিতে কমপ্লিট হ’ল স্কাই-রেল।
হ্যাঁ, মনে পড়ছে-ক্রায়োনি’্ থেকে উঠে মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর ওরা একটা নিউজ-মনিটর দিয়েছিল ঘরে। তাতে ছবিসহ নিউজটা দেখেছিলাম মনে হচ্ছে। গত চল্লিশ বছরের ইম্পর্ট্যান্ট নিউজগুলো ছিল। কে এত দেখে! স্যানেটোরিয়াম থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় ওরা একটা পকেট ভাইপড্ও দিয়েছিল তো! শুধু এদেশের নিউজ লোড করা ছিল তাতে। যাঃ! ওটা হোটেলে পড়ে আছে! আচ্ছা! ওখান থেকে আমাকে একটি রিলিজ সার্টিফিকেট দিয়েছিল— সেটা আবার হোটেলে পড়ে নেই তো! না— যাক্! পকেটেই আছে! ওটা হারালেই তো বিপদ! ওটাই আমার আইডেন্টিটি কার্ড। ওটা হারিয়ে গেলে আমার পরিচয়ই রইল না কিছু! এই যে বিট্টূকে ফলো করে বাড়ি অবধি যাচ্ছি। ওকে আমার পরিচয় দিতে। ও যদি কোনও প্রমাণ চেয়ে বসে, তখন তো ওটাই দেখাতে হবে। ওতেই তো আমার নাম-ধাম, জন্মতারিখ, বরফঘুমে যাওয়ার এবং জাগার তারিখ, এইসব আছে। ওতে যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে পুরোনো কথাগুলো বলতে হবে। চল্লিশ বছর ঘুমিয়ে থাকলেও স্মৃতিশক্তিটা তো খোওয়া যায়নি।
কত কথাই তো মনে পড়ছে! সেই যে বৃংহণ যে দিন জন্মাল সেদিন এক ক্রিকেট-কোচের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল, তখন ক্রিকেট-বিশ্বকাপ চলছিল। নার্সিংহোমের ওয়েটিংরুমে যখন উদগ্রীব হয়ে বসেছিলাম, তখন কয়েকজন আলোচনা করছিল, ওই কোচের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে। কেউ বলছিল স্যুইসাইড। কেউ বলছিল মার্ডার। নার্স এসে বৃংহণের জন্মের সংবাদটা দিতেই একজন বলে উঠল— বাঃ! আপনার নাতি হয়েছে। ওর নাম রাখবেন ক্রিকেটারের নামে। বড় ক্রিকেটার হয়ে ও বিশ্বকাপ খেলবে।
নাতির নাম ক্রিকেটারের নামে রাখার ইচ্ছে হয়নি। না রেখে ভালই হয়েছে। ক্রিকেটার কী হল ও! ও তো হল কসাই! ছাগলের বদলে মানুষ কেটে কেটে ...! এখন আর ক্রিকেট খেলা হয় কিনা তাও জানি না!
দু-হাজার এগারতে যেদিন ওকে প্রথম স্কুলে ভর্তি করা হল সে দিনটাও একটা স্মরণীয় দিন। সেদিন লিখিতভাবে দুই বাংলা আবার এক হয়ে গেল রাষ্ট্রপুঞ্জের মধ্যস্থতায়। সেদিন কত উৎসব চলছিল পুরো শহর জুড়ে! পরের দিন ছুটি ঘোষণা করল রাজ্য সরকার।
জানি না, এসব বৃংহণের মনে আছে কি না! ও তখন খুব ছোট! কিন্তু বাড়ি ঘরের কথাগুলো ঠিকঠাক বললে তো ও বিশ্বাস করবে! দোতলা বাড়িটাতে ওপর-নীচে, মিলিয়ে ছ’খানা ঘর ছিল। দখিন দিকের ঘরের পাশেই ছিল একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। জানলা দিয়ে হাত বাড়ালে গাছের ডাল ছোঁওয়া যেত। ফুল ছেঁড়া যেত। ওই ঘরটায় থাকত বিপুল আর বউমা। বিপুলের মা মারা যাওয়ার পর থেকে আমি একাই থাকতাম নিচের ঘরে। ওর এটা নিশ্চয় মনে থাকবে— বাবা-মার কাছে না শুয়ে রোজ ও আমার কাছে শোওয়ার বায়না ধরত। শুয়ে শুয়ে গল্প শুনতে চাইত। ভূত-পেতনির গল্প একদম পছন্দ করত না। রকেটে চড়ে চাঁদে, মঙ্গল গ্রহে বেড়াতে যাওয়ার কল্প-গল্প খুব প্রিয় ছিল ওর। ও বলত— দাদু! বড় হয়ে আমি মহাকাশ-বিজ্ঞানী হবো। চাঁদে যাব, স্পেস-সিটিতে যাব।
মনে আছে, দু’হাজার দশে প্রথম স্পেস শাট্ল্ সার্ভিস চালু হল আম-জনতার জন্য। যাদের টাকা আছে এবং ফিজিক্যাল ফিট্নেসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ তারা স্পেস-সিটিতে যেতে পারবে।
যেভাবেই হোক, ওর অনেক টাকা হয়েছে এখন। জানি না স্পেস-সিটি ঘুরে এসেছে কি না। এখন বোধহয় স্পেস-সিটিতে বসবাস করা শুরু হয়েছে। ট্যাক্সি ড্রাইভারটা বলছিল, আমি স্পেসসিটিতে বসবাস করতাম কি না! আমি যে কোথায় বসবাস করতাম আমিই জানি। এখন ওই নাতি যদি ...!
এই যাঃ! নীল গাড়িটা দেখা যাচ্ছে না কেন? এই ভাই! গাড়িটা অনেক এগিয়ে গেছে নাকি? ওটাকে হারিয়ে ফেললে সর্বনাশ হবে।
ওই যে বড় গাড়িটা দেখছেন। ওর সামনে রয়েছে। এই ফ্লাই ওভার থেকে অন্য দিকে যাওয়ার রাস্তা নেই। সোজা সাদার্ন বাইপাসে গিয়ে মিশেছে এ রাস্তা। বাইপাসে পৌঁছলে ওই গ্র্যাভিটার গাড়ির পেছন ধরে নেব স্যার!
যাক্, সার্দান বাইপাসে বিট্টূর নীলগাড়িটা চোখে পড়েছে। প্রচণ্ড গতিতে ছুটছে গাড়িটা। ট্যাক্সি ড্রাইভারের খুব পাকা হাত। গাড়ির রিমোটের স্পিড বাটনে আলতোভাবে আঙুলের চাপ বাড়ছে। গাড়ির স্পিডোমিটারের ডিজিট্যাল স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে টু ফাইভ জিরো। ঘন্টায় আড়াইশো কিলোমিটার গতিতে ট্যাক্সি ছুটছে নীল গ্র্যাভিটারের পেছন-পেছন। এবার দেখছি নীল গাড়ির পাশাপাশি চলছে ট্যাক্সিটা।
সামনের নীল গাড়িটাকে ওভারটেক করে দাঁড়িয়ে যাব স্যার?
না-না, ওভারটেকিং নয়, ওর পিছনে চলুন, ওটা যেখানে থামবে। সেখানে আপনিও থামবেন।
ঠিক আছে স্যার।
নীল গাড়ি তীব্র বেগে ছুটছে সার্দান বাইপাস ধরে। তার পেছনে ট্যাক্সি। ডানদিকে বিশাল বিল্ডিং। তার গায়ে নিয়ন আলোয় লেখা রয়েছে— ইউনিভার্স এসেম্ব্লেজ। এত উঁচু আর এত বড় বাড়িটা সম্পর্কে জানার ইচ্ছে হল খুব। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে জিগ্যেস করতে ও বলল— এটা স্যার শহরের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু এবং বড় বিল্ডিং। আটশোখানা ফ্ল্যাট আছে এই একটা বিল্ডিংয়ে। আটশো ফ্যামিলি বাস করে এখানে। সবই অন্যদেশের রিফিউজির ফ্যামিলি। বিশ্বযুদ্ধে বোমা পড়েছিল ওদের দেশে। ওদেরকে রেসকিউ করে এদেশে নিয়ে এসেছে কার্গো-বিমান ভর্তি করে। শ্রমের বিনিময়ে ওরা খাবার এবং থাকার জায়গা পেয়েছে স্যার! তবে স্যার, দূর থেকে দেখে বা শুনে ভাল লাগছে, কিন্তু ওরা মোটেও সুখে নেই। সেদিন আমার ট্যাক্সির সওয়ারি হয়েছিল ওদের একজন। খুব দুঃখ করছিল। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ষোল-সতের ঘন্টা খাটিয়ে নেয় ওদেরকে। ব্যক্তিগত জীবন বলতে আর রইল কী!
কারা খাটায়?
কেন স্যার, সরকার। আমাদের সরকার মানে তো এখন ক্যাপিটালিস্ট কাউন্সিল। সরকারের তকমা লাগিয়ে নিজেদের কল-কারখানায় খাটায় এদেরকে। ‘ফুড অ্যান্ড সেলটার ফর ওয়ার্ক’ স্কিম এর আওতায় এরা।
সামনের গাড়িটা হঠাৎ জোর ব্রেক কষল। ট্যাক্সি ড্রাইভারের হাতের রিমোটের মাঝখানের বড় লাল বাটনেও চাপ বাড়ল।
ট্যাক্সি ড্রাইভার বলে ওঠে—সামনের সিগন্যাল অফ আছে স্যার। এই সিগন্যালে গাড়ি আটকালে টাইম লাগে। ডানদিকে তো জে. বি. স্টেডিয়াম। ওখানে খেলা-টেলা থাকে প্রায়ই। খেলা শেষ হয়েছে বোধহয়!
কী খেলা? ফুটবল না ক্রিকেট?
ট্যাক্সি ড্রাইভার হেসে ওঠে— আপনি দেখছি রসিকতাও করতে পারেন! সদ্য পুরোনোদিনের খেলাগুলো দেখেছেন বোধহয় ফিল্ম-এ!
না-না, সত্যিই এখানকার খেলা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। বলুন না ওখানে কী খেলা হয়?
ওখানে খেলা হয় রোবো রেস্টলিং, রোবো-বক্সিং এইসব।
সে আবার কী রকম খেলা?
রোবট মানে যন্ত্রমানুষেরা বক্সিং খেলে, কুস্তি লড়ে। ওরা রিংয়ের মধ্যে থাকে। আর ওদের ওনার থাকে রিংয়ের বাইরে হট সিটে। ওখান থেকে ওরা রিমোট অপারেট করে আর রোবোগুলো ঘুষি ছোঁড়ে। সে দারুণ মজার খেলা, আমি একবার দেখেছিলাম। যাক্ সিগন্যাল অন্ হয়েছে দেখছি।
নীল গাড়িটা আবার চোখের আড়ালে চলে গেছে। সিগন্যালে অনেক গাড়ি জমে যাওয়ায়, তার ভিড়ে দেখা যাচ্ছে না ওটাকে। আমি উদ্বেগ প্রকাশ করতে, ড্রাইভার ছেলেটা বলে ওঠে—কিচ্ছু ভাববেন না স্যার! ও গাড়ির নাম্বার দেখে নিয়েছি আমি। ঠিক পেয়ে যাব। সামনেই বি. ভাট কালচার কম্প্লেস্। ওখানেই বেশির ভাগ গাড়ি ঢুকে যাবে। তখন ঠিক দেখতে পাব আপনার ব্লু গ্র্যাভিটারটাকে।
ওই যে কী কম্প্লে্ক্স বললেন, ওখানে কী হয়?
আমি স্যার বুঝতে পেরে গেছি। আপনি পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের লোক। আমাকে একটু বাজিয়ে নিতে চাইছেন। ওখানেই তো কালচারের নামে যত ম্যাল-কালচার চলে স্যার! ওখানে ফিল্ম হাউস আছে, ড্রামা হাউস আছে আরও কী-কী সব ইনফোটেক মোটেক আছে। যা সব ফিল্ম, ড্রামা চলে না; সে কী বলব আর! ও সব দেখতেই তো পয়সাওয়ালাদের এত ভিড়। দেখেছেন কেমন গাড়ির লাইন। সব ঢুকবে ওখানে। ওর ভেতরে একটা ই-লাইব্রেরিও আছে। আমি একবার একজন মহিলা সওয়ারিকে ওখানে দিয়ে এসেছিলাম। লাইব্রেরি একদম ফাঁকা। দু-একজন বয়স্ক মানুষ ই-বুক খুলে বসে আছে। লাইব্রেরিতে কেউ ঢোকে না। সব ওই সিনেমা না হয় ড্রামা। আর কেউ কেউ নিজেকে শিল্পমনস্ক দেখাতে ওর লাগোয়া আর্ট গ্যালারিতে ঢোকে। আমি একবার আর্ট গ্যালারিতে ঢুকেছিলাম এক সওয়ারির
সঙ্গে। কিন্তু কিছুই বুঝিনি। শুধু দু-একটা ছবি বুঝেছি, সেগুলো মেয়েদের সে’-অর্গানের ছবি। আর কিছু হোমোসে’ করার ছবি। শুনেছি লুকিয়ে-চুরিয়ে ওখানে একটা পলিডল সেন্টারও চলে।
ওই যে আপনি যে গাড়ি ফলো করছেন, সে গাড়ি কমপ্লে’-এ না ঢুকে বেরিয়ে যাচ্ছে সোজা।
বোধহয় বুঝতে পেরেছে আমরা ফলো করছি। পেছনেই যাব স্যার? নাকি ওভারটেক করে সামনে ভিড়িয়ে দেব?
না-না, আপনি ওর পেছনেই চলুন। গাড়িটা হারিয়ে ফেললে প্রবলেম হবে।
ঠিক আছে স্যার, নো প্রবলেম!
চার
ওই যে স্যার, নীল গ্র্যাভিটারখানা গ্যালাক্সির সামনে থেমেছে। একটু ডিসট্যান্স রেখে দাঁড়াব, নাকি একদম কাছে নিয়ে যাব? একটু দূরেই রাখুন। গ্যালািক্স কি বাড়ির নাম? এতো দেখছি বেশ বড় বাড়ি।
না স্যার! গ্যালাক্সি হল হার্ট রিসার্চ সেন্টার।
হার্ট রিসার্চ সেন্টার! ও! মনে পড়েছে। বিট্টূ তার ছেলেটাকে গ্যালাক্সিতে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করানোর কথা-ই তো বলল। তাহলে বাড়ি ফিরছে না, ছেলেকে দেখতে এল এখন! ছেলেটার বাড়াবড়ি কিছু হল কি না কে জানে! যদি ছেলেটার ভালমন্দ কিছু হয়ে যায়, তাহলে তো আজকে আর ওর সঙ্গে কথা বলা যাবে না। বলা উচিতও হবে না, ছেলের মৃত্যু বলে কথা। কোনওরকমে আমি যদি নিশ্চিত হতে পারতাম যে, ও আমার নাতি কিংবা নাতি নয়, তাহলে আপাততঃ ল্যাঠা চুকে যেত।
কিন্তু আমার মন বলছে, ও-ই আমার নাতি। কর্পোরেশন অফিস কী এতখানি ভুল করবে! আরও বহু মানুষ থাকতে, এর ঠিকানা ক্রায়োনি’ সেন্টারকে জানাবে কেন? পুরোনো নথি ঘেঁটেই তো বের করেছে এই পরিবর্তিত নাম-ঠিকানা! শুধু নামগুলোই যা বদলেছে! মানুষটা কিংবা জায়গাটা তো বদলায়নি।
আমার ওষুধের দোকানের জায়গাটা তো আমি ঠিক চিনতে পেরেছি।
তাছাড়া ওর ছেলের অ্যা’িডেন্ট হওয়ায়, কিংবা এমন আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে আমার ভেতরে কষ্ট হচ্ছে কেন! এটাই বোধহয় রক্তের টান! আমার শরীরের রক্ত বইছে হয়তো ওই বিট্টূ কিংবা ওর ছেলের শরীরেও। তাই হয়তো মন আনচান করছে!
ওকে অনুসরণ করে এতদূর এসেছি যখন, শেষ দেখেই ছাড়ব। দরকার হলে আবার ওকে অনুসরণ করব। একসময় না একসময় ও বাড়ি তো পৌঁছবে! বাড়ি অবধি পৌঁছে গেলে দেখেশুনে নিশ্চিত হয়ে যাবই। তখনই না হয় পরিচয়টা দেওয়া যাবে। এখন বরং ট্যাক্সি ছেড়ে দেওয়া যাক্। দেখি সেই হতভাগা ছেলেটা মরল না বাঁচল।
... ... ...
ওই যে বিট্টূকে দেখা যাচ্ছে। কী কথাবার্তা বলছে নার্সিংহোমের রিসেপশনে। ওর কাছাকাছি যাওয়া যাক্! ওর ছেলের খবরটা জানতে পারব তাহলে।
রিসেপ্শনিস্টের কাছ থেকে একটা নম্বর জেনে নিয়ে বিট্টূ সে-অপারেটিভ কম্পিউটারটাতে লগ-ইন করল দেখছি। ওই যে স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে ছেলেটার মুখের ছবি। চোখদুটো বোজা। ছবির নীচে লেখা—
নাম ঃ মিঃ কে-বি-টেন, পিতা ঃ মিঃ কে-বি-টু।
ঠিকানা ঃ ... সংযাগ নম্বর ... বয়স ঃ ১৮ বছর
ভর্তির তারিখ ও সময় ঃ ১১ আগস্ট ২০৫২ ,সন্ধে ৬টা ৩২ মিঃ
কার্ডিওলজি বিভাগ, দশতলা, বেড নম্বর - সাত
তত্ত্বাবধানে - ডাঃ এস ফিফটি
বর্তমান পরিস্থিতি ঃ সংকটজনক (আই.সি.সি.ইউ)
কম্পিউটারে সব দেখেটেখে বিট্টূ রিসেপ্শনিস্টকে বলে— শুনুন ডাক্তার এস. ফিফ্টি আমাকে ফোনে বলেছিলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য। উনি যদি থাকেন, তাহলে বলুন মিঃ কে-বি-টু এসেছেন।
রিসেপ্শনিস্ট ডাঃ এস ফিফ্টিকে জানান বিট্টূর কথা। তারপর বলেন— আপনি ওয়েট করুন ওই ওয়েটিংরুম নাম্বার-থ্রি-তে। ডক্টর এখুনি আসছেন।
বিট্টূ ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসে। ওর মুখে চিন্তার রেখা। ছেলেটার এই অবস্থায় খুব মুষড়ে পড়েছে দেখছি। যতই মায়া-দয়াহীন হোক না কেন, অন্যের বাচ্চাকে কিনে এনে কেটেকুটে হার্ট-লাং বিক্রি করুক না কেন, নিজের ছেলে বলে কথা। সন্তান, বংশধর বলে কথা। তার এ অবস্থায় মন খারাপ তো হবেই! আমারই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে! সেভাবে ভাবলে ছেলেটা তো আমারও বংশধর! ভাল হোক্, মন্দ হোক্ নিজের বংশধরকে সবাই চায় বাঁচিয়ে রাখতে। এটা তো প্রকৃতির নিয়ম। পশু-পাখি, গাছপালা, কীট-পতঙ্গ সকলেই বংশবিস্তার করে। কালের নিয়ম, যুদ্ধ-বিধ্বংস কিংবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যারা হারিয়ে গেছে; তারা গেছেই। কিন্তু যারা বেঁচে আছে তারা তো প্রতিনিয়ত চেষ্টা করবে তার বংশের ধারাকে অক্ষুণ্ন রাখতে।
গাইডটা বলছিল— ওইসব সম্পর্কের টান-ফান এখন আর নেই। থাকলেও তাকে রোগ বলে ধরা হয়।
সব বাজে কথা! সম্পর্ক কখনও শেষ হতে পারে! যতদিন মানুষ থাকবে, যতদিন সৃষ্টি থাকবে, ততদিন সম্পর্কও থাকবে। সব সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও সন্তান ও জন্মদাতার সম্পর্ক কি কখনও শেষ হয়! মনের অন্তস্থলে লুকিয়ে থাকে সেটা, ঠিক সময়ে বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ওই যে বিট্টূর চোখ-মুখে এখন ফুটে উঠেছে সেই লুকিয়ে থাকা সম্পর্কের টান। তাই× উদগ্রীব হয়ে চেয়ে রয়েছে ডাক্তারের পথ চেয়ে।
ওই যে, গলায় একটা পাইপের মতো অদ্ভূত যন্ত্র ঝুলিয়ে একজন এদিকেই আসছেন। উনিই বোধহয় ডাঃ এস ফিফটি। ওর মুখেও দেখছি চিন্তার রেখা।
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছি। ওঁকে দেখে বিট্টূ এগিয়ে গেল। শুনি, ডাক্তার কী বলে ছেলেটার ব্যাপারে।
... গুড ইভনিং ডক্টর।
ইয়েস, গুড ইভনিং মিঃ বি-টু। চলুন ওই কনসাল্টিং রুমে বসে কয়েকটা জরুরী কথা সেরে নেওয়া যাক।
চলুন।
শুনুন মিঃ বি-টু! বলছি যে, আপনার ছেলের অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। যে কারণে আপনাকে ফোনে ডেকে নিলাম। ওভার-টেলিফোন সব কিছু ডিস্কাস্ করা সম্ভব নয় তো তাই ...!
আপনার ছেলে এখন ভেন্টিলেশনে আছে। ওর হার্টে চোট লেগেছে। সিভিয়ার ইনজুরিতে ওর অ্যাওর্টাতে ব্লাড ক্লট বেঁধে গিয়েছিল। আমরা একটা বাইপাস সার্জারি করলাম। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হল না। কারণ, দেখছি ওর ট্রাইকাসপিড ভাল্ভ্ ড্যামেজ হয়েছে। ওকে বাঁচাতে গেলে ইমিডিয়েট ওর হার্ট রিপ্লেস করা দরকার। এখন আপনি ডিসিশন নিন কী করবেন। ছেলেটাকে বাঁচাবেন? নাকি এক্সটারপেট করবেন।
যদি এ’টারপেট করতে চান, তাহলে কনফার্ম করুন। আমিই বডি কিনে নেব। হার্টটা ড্যামেজ হয়ে গেছে, কোনও কাজে লাগবে না। কিন্তু অন্যান্য লিম্বগুলো ...। দাম আপনি ভালই পাবেন। আপনার কাছ থেকে আমি মাল কিনি। আপনাকে ঠকাবো না। আর যদি ওকে বাঁচাতে চান, তাহলে ইমিডিয়েট একটা হার্ট জোগাড় করুন। ব্লাড গ্রুপ ও আর এইচ পজেটিভ। এইচ.এল.এ. টিস্যু ম্যাচিং না হলেও চলে আজকাল। একটা লিথিয়াল ইঞ্জেকশন্ দিয়ে দিলে ...।
বাঁচাতে গেলে হার্ট লাগবে বলছেন! কিন্তু আমার স্টকে কোনও হার্ট নেই। অন্য সাপ্লায়ার্স থেকে এখন হার্ট কালেক্ট করতে গেলে, মওকা বুঝে প্রচুর দাম চেয়ে বসবে। মরে গেলেও বিশাল লস। আঠার বছর অবধি বড় করার খরচ তো কম হয়নি! তাছাড়া একজন উত্তরাধিকারী তো রাখতেই হবে। আর একটা ছেলে থাকলে বলতাম এটাকে এ’টারপেট করে দিন। বডিটা বিক্রি করে দিলে কিছু টাকা অন্তত রিটার্ন পেতাম। কিন্তু ..! আচ্ছা! ডাক্তার! এখুনিই কি হার্টটা চাই? ভেন্টিলেশনে দু’একটা দিন বাঁচিয়ে রাখা যাবে না?
যাবে না তা নয়, তবে রিস্ক হয়ে যাবে। দু’একটা দিন ভেন্টিলেশনে রেখে দিলে হার্ট জোগাড় করে ফেলবেন বলছেন!
হ্যাঁ, ফ্রেস কিডি জোগাড় করে ফেলব ঠিক। আচ্ছা! ডাক্তার একটা কথা জিজ্ঞেস করি— ফাদারের গ্র্যান্ডফাদারের সঙ্গে কি ব্লাড গ্রুপ কিংবা এইচ এল এ টিস্যু গ্রুপ মেলে?
হ্যাঁ, কখনও-সখনও মেলে। তবে, সবসময় যে মিলবেই এমন নয়। তা হঠাৎ এরকম উদ্ভট প্রশ্ন?
না— মানে যদি মিলত ...?
যদি মিলত তাহলে?
তাহলে একটা চান্স আছে বুঝলেন, আজ কিংবা কালকেই একটা হার্ট পেয়ে যাওয়ার চান্স আছে। আচ্ছা, যদি একশো বছর বয়সী মানুষের হার্ট হয় অসুবিধা নেই তো?
মিঃ বি-টু! আপনার ছেলের এই অবস্থা হওয়ায় আপনি বোধহয় আপসেট হয়ে পড়েছেন। আপনার মাথা ঠিকঠাক কাজ করছে না। ভুলভাল বকছেন।
কিচ্ছু ভুলভাল বকিনি ডাক্তার, কিচ্ছু ভুলভাল বকিনি। চান্স একটা আছে। মানুষটার একশো বছর বয়স হলেও শরীরটা এখন ষাট বছরের মতোই আছে।
বয়স একশো বছর, শরীর ষাট বছরের! শুনুন আপনি বরঞ্চ ...!
না-না আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি ডক্টর! লাক ফেভার করলে আজই হার্ট পেয়ে যাব। আপনি শুধু বলুন একশো বছরের হার্ট চলবে কি না! আসলে, ষাট বছর বয়স; চল্লিশ বছর ক্রায়োনিক্স-য়ে ছিল, তাই একশো বছর বলছি।
চলবে কি না তা হার্টের অবস্থা দেখে গ্রুপ টেস্ট করে তবে বলতে পারব। কিন্তু এরকম লোক পাবেন কোথায়? কে সে?
আমার গ্র্যান্ড-ফাদার। চল্লিশ বছর পর ক্রায়োনি’্ সেন্টার থেকে ফিরে এসেছে। আমার শো-রুমেও আজ এসেছিল একটা গাইডকে নিয়ে। কিন্তু পরিচয় দেয়নি। আমি শো-রুম বন্ধ করার আগে ক্লোজ-সার্কিট টিভি রেকর্ডিং দেখি ডেইলি। দেখলাম একজন বছর ষাটেকের লোক গাইড নিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। কিন্তু সে কাস্টমার নয়। আমার কাছে আসেনি। সো ফার মাই নলেজ ইজ কনসার্ন হি ইজ মাই গ্র্যান্ডপা। গতকালই তার আসার কথা ছিল। ওই গাইডটাকে আমি চিনি। ও আমার কনসার্নে কাজ করত আগে এখন মিডলম্যানের কাজ করে। দু’একটা কাস্টমারও দেয়। ওকে চেজ করলেই সে বুড়োর সন্ধান ঠিক পেয়ে যাব।
... ... ...
হে ঈশ্বর! এ কোন্ পৃথিবী দেখার জন্য আমি চল্লিশ বছর ঘুমিয়ে থেকে আবার জেগে ফিরে এলাম! আমি ভাবতে পারছি না মানুষের এই পরিবর্তন। এতখানি বদলে যেতে পারে মানুষ! মানুষের হৃদয়বত্তা বলে কি কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না; একদম নির্মূল হয়ে যাবে! এমন পৃথিবীতে আমি আর একদন্ডও বেঁচে থাকতে চাই না। আমি .... আমি ...!
না! আমি হেরে যাব না। এসেছি যখন কিছু অন্তত করেই যাব। হৃদয়বত্তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেই বা! আবার আমি পুঁতে দিয়ে যাব হৃদয়বত্তার বীজ এই মানুষের বুকে। সেই এক বীজ থেকে দশ, দশ থেকে হাজার, হাজার থেকে লক্ষ-কোটি হৃদয়বান মানুষ আবার জন্মাবে এই পৃথিবীতে। আমার হৃদপিণ্ডটা পুঁতে যাব ওই আমার প্র-নাতির বুকে। আর দেরি করা উচিত হবে না, তাহলে হয়তো বংশের ধারাটা বিচ্ছিন্ন হয়েই যাবে। আমি প্রস্তুত, আমি প্রস্তুত এখন আরও পঞ্চাশ বছর আমার হৃদয়টাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
এই যে মিঃ কে-বি-টু, ডাঃ এস-ফিফ্টি! আমিই হলাম সেই হৃদয়বান। আমার বিশ্বাস, আমার ব্লাড-গ্রুপ মিলে যাবে আমার নাতির ছেলের সঙ্গে। হলেই বা একশো বছরে পুরোনো হার্ট, সত্যিকারের হৃদয় কখনও পুরোনো হয় না। চলুন— আমাকে নিয়়ে চলুন আপনার অপারেশন থিয়েটারে। যাওয়ার আগে আমার শুধু একটাই ইচ্ছা— আমার নাতি বৃংহণকে একবার এই বুকে জড়িয়ে ধরতে চাই। কে-বি-টু’র খোলস থেকে একবার বেরিয়ে আয় তো সত্যিকারের বৃংহণ!