Cover

AAGUN

তুই যাই বল সোনা! আমার দেওয়া পেনডেন্টটা তোকে যা মানিয়েছে না!
রকি, আস্তে! ড্রাইভারের কান খাড়া। ও আবার অফিসের সবার কাছে চুকলি খায়। ওর সামনে এমন সোনা-মনা করে ডাকিস না! অফিসের সবাই জেনে যাবে তোর আর আমার রিলেশনটার কথা।

শেয়ার করুন:

তুই যাই বল সোনা! আমার দেওয়া পেনডেন্টটা তোকে যা মানিয়েছে না!

  রকি, আস্তে! ড্রাইভারের কান খাড়া আবার অফিসের সবার কাছে চুকলি খায় ওর সামনে এমন সোনা-মনা করে ডাকিস না! অফিসের সবাই জেনে যাবে তোর আর আমার রিলেশনটার কথা।

  ঠিক আছে, আস্তেই বলছি তবে আজ না হয় কাল তো জানবেই! আফটার অল উই আর গোয়িং টু বি ম্যারেড ইন দ্য নেক্সট স্প্রিং  

  হ্যাঁ, সে ঠিক আছে।  

  পর্ণী, তুই কিন্তু কথা দিয়েছিস, আমাদের পছন্দের পলাশফুলের মালা দিয়ে আমরা মালাবদল করবো মনে আছে তো?

  হ্যাঁ, আর তোর মনে আছে তো, আমরা ফুলশয্যার রাতটা 'হেভেন গার্ডেন'-এ সেলিব্রেট করবো উইথ দ্য 'ব্যালভিনে ৫০ ইয়ার' স্কচ দিয়ে।  

  রকি ড্রাইভারের দিকে আড়চোখে তাকায় সোনা,  বলছিলাম, আজ তো দু'জনেই অফিস থেকে আর্লি কাট মারলাম চল না, আজ ঘন্টা দুয়েকের জন্য 'রোমান্টিক এসকেপ'-এ যাই। ওখানে তোকে 'ম্যাকালান ফাইন' খাওয়াবো ওটা খুব স্মুদ, অনেকটা জিনের মতো

  পর্ণিকা খুব আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে ঘাড় ঘোরায় বলছিস, খাওয়াবি?   

  হুম! বললাম তো!

  ঠিক আছে দাঁড়া, মা-কে একটা ফোন মেরে দিই তা না হলে টেনশন করবে আমার মা-টা না...!

  শুধু তোর মা নয়, মা জাতটাই ছেলেমেয়েদের জন্য খুব টেনশন করে ওরা ভাবে, আমার 'বাবান' বা 'মাম্পি' সেই ছোট্টটাই আছে  

  পর্ণিকা হ্যান্ডব্যাগ থেকে ফোন বের করে রকি বলে ওঠে তাহলে ড্রাইভারকে বলি, আমাদেরকে স্বভূমির সিগন্যালে ড্রপ করে দিতে?  

 

 

 

পর্ণিকা কিছু বলার আগেই ওর মোবাইলফোনটা বেজে ওঠে স্ক্রিনে ফুটে উঠে সুতনুকা কলিং...

  পর্ণিকা ফোন রিসিভ করার আগেই বলে ওঠে ওহ মাই গড! একদম ভুলে মেরে দিয়েছি।

  তারপর ফোন ধরে বলে হ্যাঁ বল তনু!  

  ফোনের ওপ্রান্তে সুতনুকা বুঁচি, তোর মনে আছে তো, আমি কিন্তু শার্প সিক্স পি এমে তোর ফ্ল্যাটের ডোরবেল বাজাবো    

  পর্ণিকা রকির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ওলটায় ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে, আমি অফিস থেকে বেরিয়ে নিকো পার্ক ক্রস করেছি ইন টাইম ফ্ল্যাটে রিচ করে যাব      

  কথা বলতে বলতে পর্ণিকা জিভ কামড়ে রকির দিকে তাকায় রকি ওর দিকে ঘুষি পাকায় ফোনের প্রান্তে সুতনুকা বলে ও কে, আ'ইল বি গ্ল্যাড টু মিট ইউ আফটার লং টাইম 

  হঠাৎ মনে পড়েছে এমনভাবে পর্ণিকা বলে ওঠে ওহ তনু, মনে আছে তো, মাই গিফট?

  হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন! তুই বলেছিলিস ভারমুথ বা ওই স্ট্যান্ডার্ডের কিছু। আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড-এর জন্য নিয়েছি তার চেয়েও দামি 'ডালমোর কনস্টেলেশন' ইউএসএ তে এটা খুব চলে হাফ অ্যান আওয়ার পরে নেশা ধরে ড্রাইভ করে বাসায় ফেরার সময় দেয় আর কী! হি হি হি...!

  রকি চোখে মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে হিসহিসে গলায় বলে আরে! কাট না ফোনটা! কোথাকার কে তনু না মনু...!   

  রকির কথা ফোনে চলে যেতে পারে ভেবে, পর্ণিকা সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা কেটে দেয় তারপর রকির হাতটা নিজের কোলের উপর তুলে নিয়ে বলে আয়্যাম ভেরি স্যরি! আমার একদম মাথায় ছিল না যে, তনু আজ সন্ধেবেলায় আমাদের ফ্ল্যাটে আসবে বলেছে আজ 'রোমান্টিক এসকেপ' হবে না ডোন্ট মাইন্ড ডার্লিং পজিটিভলি নেক্সট স্যাটারডে, প্রমিস  

  রকি চাপা অথচ গাঢ় গলায় বলে এই তনুটা কে?  তন্ময় না তনয়?

  আরে ধ্যাত! তোর মাথাটা গেছে! 'তনু' মানে সুতনুকা, আমার স্কুল-লাইফের ক্লাসমেট, বোজম ফ্রেন্ড ইউ এস এ-তে পি এইচ ডি করছিল কাল ফিরেছে

  তুই তাহলে তনুকে আজ বাইপাস করতে পারবি না?    

  গাড়িটা ততক্ষণে ইস্টার্ন বাইপাসে উঠেছে পর্ণিকা সামনে উইন্ডস স্ক্রিনে চোখ ছুঁড়ে বলে না রে! স্যরি, আজ পারবো না তাছাড়া তুই বাইরে তাকিয়ে দেখ, আমরা স্বভূমি সিগন্যাল ক্রস করে এসেছি  

  রকি কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বলে ওঠে শুধু স্বভূমি সিগন্যাল নয়, আমরা আমাদের এই রিলেশনের অনেকগুলো সিগন্যাল ক্রস করে এসেছি। সামনের  মার্চে আমরা বিয়ে করব। অথচ তুই...! আগের উইকেও একটা অ্যালিবাই দেখালি। আজকেও তাই। আমি তোকে ঠিকঠাক গেস করতে পারছি না। তুই কি আমাকে রিলাই করতে পারছিস না?

  এভাবে বলছিস কেন! এটা অ্যালিবাই নয়। 

   

দুই

মাসিমা, তোমাকে প্লেজ্যান্ট সারপ্রাইজ দেবো ব'লে তোমাকে জানাতে বারণ করেছিলাম কেমন আছো তুমি? কথাটা  বলেই সুতনুকা নিচু হয়ে প্রতিমা-মাসির পা ছুঁয়ে প্রণাম করে পর্ণিকা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে বাব্বা! তোর ছ'টা মানে ডট ছ'টাকী পাংচুয়াল!    

  না রে! আমাদের ওখানে ছ'টা মানে পাঁচটা আটান্ন। স্যানিটাইজড হতে দু'মিনিট সময় রাখতে হয় সেই হিসাবে আমি দু'মিনিট লেট কিন্তু এখানে স্যানিটাইজেশনের ব্যাপার ট্যাপার নেই মাসিমার সুরক্ষা বলয় ভেদ করে কোন রোগব্যাধির অনুপ্রবেশ ঘটবে না

  পর্ণিকা বলে ওঠে তনু, তোর কথাবার্তা শুনে আমি তো অবাক হচ্ছি!  

  কেন?  

  পাঁচ-পাঁচটা বছর ইউএসএ-তে কাটিয়ে এত ভালো বাংলা বলছিস! আমি তো বাংলিশ বলি তুই মাতৃভাষাটা একটুও ভুলিসনি দেখছি      

  শোন! মাতৃভাষা কি কখনো ভোলা যায়? যারা ভোলে, তারা ইচ্ছে করেই ভোলে এত বছর পরেও আমি 'বর্ণপরিচয়'-এর 'ঐক্য বাক্য মানিক্য মুখ্য অখ্যাতি, উপাখ্যান' থেকে 'সহজ পাঠ'-এর শেষ পাতায় 'শরতের আকাশেতে সোনা রোদ্দুরে' অবধি মুখস্ত বলে দিতে পারি সেই যে রে! শেষ পাতায় ন্যাংটাপুটো ছেলেটার ছবি দেখে আমরা খুব হাসাহাসি করতাম, আর রং-পেন্সিল দিয়ে হাফ প্যান্ট এঁকে দিতাম

  প্রতিমা বলেন বুঁচি, রান্নাঘরে দাঁড়িয়েই বকর বকর শুরু করলি যে! তনুকে ঘরে নিয়ে যা!

  হ্যাঁ চল চল! ঘরে চল!

  যাচ্ছি দাঁড়া তার আগে এই নে, এই শাড়িটা মাসিমার জন্য মাসিমা, শাড়িটা পরবে কিন্তু! আর এইটা তোর সেই 'ডালমোর'

  প্রতিমা পেছন থেকে হালকা হেসে বলে ওঠেন তনু, তোর এখনো মনে আছে, বুঁচি ডালমুট খেতে ভালোবাসে!   

  ওরা দু'জন পলকের জন্য চোখে চোখ রেখে হা হা করে হেসে ওঠে তারপর ঘরের দিকে এগোয়।  

  তারপর বল বুঁচি, তোর কেমন কাটছে?

  পর্ণিকা ঘরের পর্দাটা টেনে দেয় বিন্দাস! সকাল আটটায় বাড়ির সামনে গাড়ি আসে অ্যারাউন্ড নাইন, সেক্টর ফাইভ-এর অফিসে সন্ধে সাতটায় অফিস ছুটি আবার গাড়ি পৌঁছে দেয় বাড়িতে। আর মাঝখানে ওই অনলাইন 'ওভার হিয়ারিং' মানে আড়ি পাতা এই চলছে 'বাড়ি-গাড়ি-আড়ি আর আড়ি-গাড়ি-বাড়ি।' দাঁড়া, দুটো গ্লাস আর ওয়াটার বটল নিয়ে আসি সিপ নিতে নিতে গল্প হবে    

  সুতনুকা পর্ণিকার হাত ধরে বসায় বস না! প্রাণ খুলে চারটি কথা বলি পরে হবে ওসব বলছি যে, আমি না হয় বাঁধা গতে পড়াশুনা ক'রে, ধেড়িয়ে ধেড়িয়ে এমএসসি-টা ক'রে বিদেশে পাড়ি দিলাম কিন্তু তুই তো বিসিএ, এমসিএ করে ভালো চাকরি করছিস।

  পর্ণিকা 'ডালমোর কনস্টেলেশন'-এর বোতলের ছিপি  খোলে চাকরিটা ভালো কি মন্দ বলতে পারবো না। তবে করছি, এই আর কী। কিন্তু তুই হঠাৎ এতো বিনয়ী হয়ে উঠলি কেন! কলেজে তো 'রাফ-বিহেভড' নামে তোর একটা খ্যাতি ছিল। লেখাপড়ায় ব্রিলিয়ান্ট, পি এইচ ডি করে এলি, অথচ এমন ভাব করছিস, যেন তুই একটা মোস্ট অর্ডিনারি পারসন!

  খ্যাতি নয়, কুখ্যাতি বল! শুধু ওটাই নয়, তোর নিশ্চয় মনে আছে, আমার শরীর ও গায়ের রঙ নিয়ে সবাই প্যাঁক দিত। আর তুই দেখতে ছিলিস মোনালিসার মতো। পাকা গমের মতো গায়ের রঙ!   

  এখন আর আমার সে রূপ নেই রে! বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সব গেছে।  

  বাব্বা! এটাও তোর বিনয় ছাড়া আর কিছু নয়। এখনও তুই খুব সুন্দর দেখতে। তখন তোকে নিয়ে স্কুল-কলেজের ছেলেগুলো তো পাগল হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া তুইও তো দু-একজনকে পছন্দ করতিস! এতদিনে তাদের কাউকে বিয়ে করলি না কেন? কারও কাছে ল্যাং-ট্যাং খেয়েছিস নাকি?    

  আরে! ছাড় তো! আজকালকার ছেলেদের ল্যাং মারার মত পায়ের জোর আছে নাকি? এখন মেয়েরাই ল্যাং মারে আগে ছেলেরা মেয়েদেরকে ফুসলে নিয়ে গিয়ে এনজয় করত, এখন মেয়েরা ছেলেদেরকে টুপি পরিয়ে এনজয় করে

  সুতনুকা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে তাই বুঝি! তা তুই কতজনকে এনজয় করলি?

  দাঁড়া, আমি দুটো গ্লাস, জল আর কিছু স্ন্যাক্স আগে নিয়ে আসি। তা না হলে ওই এনজয় করার গল্প ঠিকঠাক জমবে না

  পর্ণিকা রান্নাঘরে যায়। সুতনুকা ঘরের ভেতরে চারপাশে চোখ চাড়ায়। দেয়ালে বিশাল একটা ছবিওয়ালা ক্যালেন্ডার, বোধহয় বুঁচি যে কোম্পানিতে চাকরি করে, সে কোম্পানির ক্যালেন্ডার হবে। তার পাশে একটা স্প্যানিশ গিটার, তারছেঁড়া র‍্যাকে কিছু বিলিতি মদের বোতল ঘরের একপাশে ডিভান, অন্যদিকে কম্পিউটার, ওয়ার্ডরোব আর 'সোলিমা নিগেলা' কোম্পানির দামী সোফাসেট মাঝে এই প্যারিন গ্লাসটপ সেন্টার টেবিল সুতনুকা ওর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা সেন্টার টেবিলের উপরে রেখেছিল। কী মনে করে ব্যাগটা থেকে একটা বাঁধানো মোটা বই বের করে টেবিলের উপর রাখে

  পর্ণিকা আসে। সেন্টার টেবিলে দুটো বোরো-সিলিকেট কিউলেট গ্লাস, জলভর্তি জাগ ও ওভাল-শেপ বোন-চায়না প্লেটে আনা ফ্রায়েড কাজু রাখতে রাখতে বলে এটা কী বই রে?  

  সুতনুকা দু'আঙুলে একটা কাজু তুলে নিয়ে সামনের দাঁত দিয়ে দু'টুকরো করে বলে ওই আমার ছাতার মাথা রিসার্চ ওয়ার্ক। তুই দেখলে খুশি হবি, তাই সঙ্গে নিয়ে এলাম পাঁচবছর ধরে খেটেখুটে এই থিসিসটাই  জমা দিয়েছিলাম পরে লেদার জ্যাকেট, ওয়াক্স-কোটিং,  বোর্ড বাইন্ডেড বুকস করেছে ইউ এস এ-র একটা সায়েন্টিফিক বুক পাবলিশিং কোম্পানি।   

  হুম! তো পাঁচবছর ধরে এই বই লিখলি?   

  সুতনুকা ম্লান হাসে আরে! বই লিখতে তো লেগেছে তিনমাস বাকি সাড়ে চারবছর ধরে ল্যাবে যে লাইফ ইভাপোরেট হওয়ার জোগাড়।  

  পর্ণিকা ততক্ষণে গ্লাসে স্কচ ঢেলে জল মিশিয়েছে। সুতনুকার দিকে গ্লাস বাড়িয়ে বলে এই নে, ধর চিয়ার্স...!

  হ্যাঁ, চিয়ার্স ...! সুতনুকা গ্লাস নিয়ে চুমুক দেয়।

  তো এতদিন ধরে পিএইচডি করলি চাকরি-বাকরি করবি না?   

  হ্যাঁ, করব। ওখানকার দু'তিনটে ইউনিভার্সিটি চাকরির অফার দিয়েছিল বেশ ভালো ডলারের প্যাকেজ আমি নিইনি রে!

  কেন! তোর চাকরির দরকার নেই?

  নিশ্চয়ই আছে কিন্তু টাকাই তো সব নয় আমি পাঁচবছর ধরে কষ্ট করে যা শিখলাম, তা ওদের ছেলেমেয়েদেরকে শেখাতে যাব কেন! আমার দেশের ছেলেমেয়েদেরকে শেখাবো

  আরে বাবা! দেশের ছেলেমেয়েদেরকে শেখাবো বললেই কি তুই শেখাতে পারবি? এখানে চাকরি পাবি কোথায়!   

  এখানকার ইউনিভার্সিটিগুলো বিদেশের পিএইচডি হোল্ডার সচরাচর পায় না আমি রাজি থাকলে দু'একটা জুটেই যাবেওসব কথা ছাড়। কেমন লাগছে বল এই 'ডালমুট'?

  পর্ণিকা হেসে বলে ভালোখুব স্মুদ। তা হ্যাঁ রে! ওখানে কি এই পাঁচবছর ল্যাবরেটরি আর থিসিস লিখেই কাটিয়ে দিলি? নাকি আরও কিছু...?  

  আরও কিছু মানে?

  আরও কিছু মানে, এই ধর বয়ফ্রেন্ড, আউটিং, ঘোরাঘুরি, এইসবের কথা বলছি  

  আরে! ল্যাব তো দিনে আটঘন্টা রাতে স্টাডি চার ঘন্টা বাকি বারোঘন্টা নিজের মতো করে ইউজ কর, ঘুমাও, ঘোরো-ফেরো, ডেটিং করো, পাব-এ যাও, অ্যাজ ইউ লাইক সেটাই করেছি

  ডেটিং! তুই আবার ডেটিংও করেছিস নাকি?

  কেন করব না! ওখানে কি পুরুষ নেই? নাকি ওখানকার পুরুষেরা নারী পছন্দ করে না?

  না না, সে কথা বলছি না

  তুই যে কথা বলতে চাইছিস, আমি বুঝতে পেরেছি তুই বলতে চাইছিস যে, আমার মতো একটা  কেলটে-মার্কা, সিড়িঙ্গে মেয়ের সঙ্গে কে আর ডেটিং করবে! তোরা যাকে স্কুলে নাম দিয়েছিলিস 'নিমাই', তার দিকে কে আর তাকাবে!

  না, মানে তা ঠিক নয় তবুও...    

  সুতনুকা গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দেয় শোন! ওখানে ডার্ক ট্যান কমপ্লেক্সনের ডিমান্ড আছে রে! আর ওরা ডানলোপিলো গদি পছন্দ করে না। হালকা-পুলকা পছন্দ করে। দরকারে ওরা কোলে তুলে নেয়। তা ধর, নয় নয় করে পাঁচজন সাদা চামড়াকে আমার বয়ফ্রেন্ড করেছিলাম তার মধ্যে একজনকে বিয়েও করেছিলাম কেননা, আমার থাকার জায়গার অসুবিধা হচ্ছিল আসার সময় সেই বরকে টা-টা জানিয়ে চলে এলাম। যাকগে, আমার কথা ছাড় তুই তখন ছেলেদেরকে ভোগ করার কথা বলছিলিস সেটা বল তুই কতজনকে ভোগ করলি?  

  পর্ণিকা খালি গ্লাসে তৃতীয়বার সোনালি তরল ঢালে তিনজনকে  

  কথাটা বলেই পর্ণিকা এক চুমুকে প্রায় গ্লাস অর্ধেক করে। তারপর দুটো ফ্রাইড কাজু মুখের মধ্যে ছুঁড়ে দেয়। সেটা চিবোতে চিবোতে ভাবে, অফিসের সিনিয়র এঞ্জিনীয়ার বিয়ে করেনি ব'লে বার তিনেক ওকে ড্রিমল্যান্ড-এ নিয়ে গেল তারপর জানা গেল, ব্যাটার একটা দশ বছরের ছেলে রয়েছে তারপর সে ব্যাটা ওকে ছেড়ে স্নিগ্ধার পেছনে পড়েছে এরপর ও ডেসপ্যাচের অরিত্রর খপ্পরে পড়ল সে প্রেম প্রেম খেললো বছর খানেক তার মধ্যে বকখালি, দীঘা, দার্জিলিং পরে বলল, ওর মুখ থেকে নাকি গন্ধ বেরোয়, তাই বিয়ে ক্যানসেল সবশেষে এই রকিওকে বোঝা যাচ্ছে না এখনও কিন্তু শোবার জন্য ছটফট করে মরছে   

  সুতনুকা গ্লাস নামিয়ে বলে কী রে বুঁচি, এমন চুপচাপ হয়ে গেলি কেন! আন-ইজি ফিল করছিস নাকি? তাহলে আর খাস  না     

  এই পেগটা একটু কড়া হওয়ায় পর্ণিকার গলাটা একটু জ্বালা জ্বালা করছে আর বুকের মধ্যেও কেমন একটা জ্বলন তনু ইউএসএ তে ইচ্ছেমতো জীবনটাকে ভোগ করেছে, সেইসঙ্গে পি এইচ ডি টাও করেছে বয়ফ্রেন্ড করেছে, বিয়েও করেছে আবার তাকে কাঁচকলা দেখিয়ে চলেও এসেছে ওখানকার ভালো ইউনিভার্সিটির লেকচারারশিপ পেয়েছে কিন্তু নেয়নি আর এই কোম্পানিটা ছাড়তে চাইলেও ভালো স্যালারি দেবে, এমন কোনও কোম্পানি পাচ্ছে না সবেতেই সুতনুকা নামের ওই শুঁটকি মেয়েটার কাছে ও হেরে যাচ্ছে আর যাই হোক, এই মদ খাওয়াতে কিছুতেই ওর কাছে হেরে যেতে রাজি নয় তাই বলে ধুস! তিন পেগ-এ আমার কিস্যু হয় না আমি তো সিক্স পেগ-এর প্লেয়ার

  এই বলে ও গ্লাসের সবটুকু সোনালি তরল এক নিঃশ্বাসে পেটে চালান করে সুতনুকা ওর ভাবগতিক দেখে বলে শোন বুঁচি, তোর নেশা হয়ে গেছে আর খাস না আমি তো আর একফোঁটাও খাব না তাছাড়া আমাকে এবার উঠতে হবে রে! ঠিক সাড়ে সাতটায় কলকাতা ইউনিভার্সিটির রিডার কে পি রায় আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন বলেছেন আর তোকে ভালো কথা বলছি, আর একটুও খাস না বুক জ্বালা করবে  

  পর্ণিকা একটা ডোন্ট কেয়ারি ভাব করে। তারপর  জড়ানো গলায় বলতে থাকে জানিস! আমাদের কলেজের সেই অভিষেক এখন নামকরা ডাক্তার। কিন্তু খুব সেলফিস। ও আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিল, আমি রিফিউজ করেছি। কলেজের সিঁড়িতে একবার চুমু খেতে দিয়েছিলাম বলে কি বিয়ে করতে হবে!

  সুতনুকা হালকা ঘাড় নাড়ে। চোখ পিট পিট করে পর্ণিকাকে দেখে। পর্ণিকার সেদিকে খেয়াল নেই। ও বলে চলে আর তোর সেই পলাশকে মনে আছে? পলাশ রায়চৌধুরী। ও তো এখন বিজনেস টাইকুন। ও কিছুদিন আমার পিছনে ঘুরঘুর করেছিল। কিন্তু পাত্তা দিইনি, বুঝলি! জেনেছি, ও পার উইক বেড-পার্টনার চেঞ্জ করে। ওকে বিয়ে করলে তো লাইফ হেল হয়ে যাবে।      

   এর মধ্যে প্রতিমা দুটো প্লেটে খাবার নিয়ে ঘরে ঢোকেন সুতনুকা একটা প্লেট থেকে ডিমের ওমলেটখানা তুলে নেয়। দু'তিন কামড়ে সেটা খেয়ে নিয়ে বলে মাসিমা, আজ উঠব। আমার একটা জরুরী কাজ আছে অন্যদিন আসবো

  কিছুই তো খেলি না! কী আর বলবো তোকে একটা কথা বলার ছিল রে মা! থাক, আজ আর হবে না। আর একদিন আসিস, বলবো।

  বল বল মাসিমা, আবার কবে আসতে পারব ঠিক নেই। এখুনি বল।

  বলবো আর কী! বলছিলাম, বুঁচির তো বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। তেমন ভালো যোগাযোগ হচ্ছে না। তুই তো বিদেশে ছিলিস! তোর অনেক যোগাযোগ। দেখ না, ওর জন্য যদি একটা ভালো পাত্রের সন্ধান দিতে পারিস। আমি তো মা, ওর জন্য ভারী চিন্তা হয় রে!

  পর্ণিকা খেঁকিয়ে ওঠে মা! তোমাকে এসব কথা কে বলতে বলেছে! যাও, তুমি রান্নাঘরে যাও! আমি কাকে বিয়ে করব না করব আমার ব্যাপার। ও আমার পছন্দের ব্যাপারে কী জানবে!

  প্রতিমা থতমত খেয়ে তড়িঘড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে যান।

  সুতনুকা আর দেরি করে না। উঠে পড়ে আজ যাই রে বুঁচি।

  ও ঘর থেকে বের হয়। রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলে মাসিমা, আজ যাই। 

  ঠিক আছে। আবার আসিস রে মা! সাবধানে যাস!  

 

তিন  

সুতনুকা ও ওর মা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, পর্ণিকা আরও এক পেগ হুইস্কি ঢালে গলা জ্বলতে জ্বলতে নামতে থাকে সোনলি তরল ওর চোখ যায় সুতনুকার আনা বইটাতে ও বোধহয় ভুল করে বইটা ছেড়ে গেছে। বইয়ের চামড়ার মলাটে সোনার জলে লেখা পাঁচটা শব্দের একটা নাম তার সঠিক মানে জানে না সেটার নিচে লেখা ড. সুতনুকা চৌধুরী সোনালি লেখাটাতে আলো পড়ে ঝকঝকে আলো ছড়াচ্ছে তা দেখে পর্ণিকার মনে আগুন ধরে যায় বইটা খুলে ফস করে একটা পাতা ছিঁড়ে নেয় টেবিলে অ্যাস-ট্রের পাশে পড়ে থাকা লাইটারটা তুলে নিয়ে পাতাটাতে আগুন ধরিয়ে দেয় ওয়াক্স ল্যামিনেটেড পাতাটা আগুনের ছোঁয়ায় নিমেষে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে হাত পুড়ে যাওয়ার ভয়ে কাগজটা হাত থেকে ছেড়ে দেয় ওটা কামিজের ওপর প'ড়ে ওর কামিজে আগুন ধরিয়ে দেয় এমন সময় বাইরে গলা শোনা যায় মাসিমা, দরজাটা খুলুন! আমি বইটা ফেলে গেছি তাই নিতে এলাম   

  ঠিক সে সময় পর্ণিকার ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার মা... আগুন... মা...!

শেয়ার করুন: