Cover

SURYA-DOBA AALO

ওর হাঁটুর নীচে অবধি কাদাজলে। বাঁ হাতে ধরা এক গোছা লকলকে সবুজ ধানগাছের চারা। হেঁট হয়ে আছে ও। ডান হাতটা একবার করে বাঁ হাতে ধরে থাকা ধানচারাকে ছোঁ মেরে নিমেষের মধ্যে পা ডোবানো কাদাজলে ডুব মারছে। আবার উঠছে। ছোঁ মারছে, ডুবছে। কালচে কাদাজলে ভরা, মরা কালিবাকুড়িটা ক্রমশ জ্যান্ত হয়ে উঠছে। তার মেঘরঙা কালচে গতরখানা সবুজ হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।

শেয়ার করুন:

ওর হাঁটুর নীচে অবধি কাদাজলে বাঁ হাতে ধরা এক গোছা লকলকে সবুজ ধানগাছের চারা হেঁট হয়ে আছে ডান হাতটা একবার করে বাঁ হাতে ধরে থাকা ধানচারাকে ছোঁ মেরে নিমেষের মধ্যে পা ডোবানো কাদাজলে ডুব মারছে আবার উঠছে ছোঁ মারছে, ডুবছে কালচে কাদাজলে ভরা, মরা কালিবাকুড়িটা ক্রমশ জ্যান্ত হয়ে উঠছে তার মেঘরঙা কালচে গতরখানা সবুজ হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে

  কালিবাকুড়ির চওড়া আলের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে অবনী লম্বা, রোগা, কোলকুঁজো সাদা চুল, বসা গাল গেঞ্জি, ধুতি, খালি পা কালিবাকুড়ির মালিক হাতে ধরা বেতের বাঁটওয়ালা ছাতা নেড়ে মাঝে মাঝে হাঁক পাড়ছে বিধেন! গোছ একটু মোটা দিস বাপ আমার! উই যে ঈশেন কোণে, ওখানটায় সব একগাছি করে দিইচিস রে! আর একগাছি করে ধরিয়ে দে মানিক! ধুলোট বীজ তো লয়, কাদান বীজ! জোর কম!

  শুকনো তালপাতার খড়খড়ানির মতো অবনীর কথাগুলো বিধানের কান অবধি পৌঁছোয় না পুবের হালকা বাতাস হয়তো কথাগুলোকে খেয়ে ফেলছে! ওর ঘাড় নিচু হাতের বিরাম নেই

  কালিবাকুড়ির পুরো বুকটা আজ সবুজ করে ফেলার ঠিকে নিয়েছে হাতে ঝড় বইছে যেন! ঝড় আজ ওর মনেও কালবোশেখি এলোমেলো উথাল-পাথাল মনটাকে ঠেলে নিয়ে যেতে চাইছে ওই দূরের গাঁয়ের বাড়িগুলোর একটাতে কিন্তু পেট বড় বালাই! মন বোঝে তো পেট বোঝে না

  বাঁ-হাত খালি হতেই সোজা হয়ে দাঁড়ায় বিধান কোমর টানটান করে মাথায় জড়ানো গামছাটা আলগা হয়ে চোখে নেমে এসেছিল সেটা আবার মাথায় জড়িয়ে নেয় দূরে ক্লান্ত দৃষ্টি ছোড়ে মাঠের দক্ষিণে হতচ্ছাড়া একালষেঁড়ে পাকুড়গাছটা ওর ঝিলিমিলি পাতার ফাঁকে বুড়ো সূর্য পেকে হলুদ হয়ে যাওয়া কুমড়োর মতো ঝুলছে যেন মাচা থেকে! মেটে ঘর, খড়ো চালের বাড়িগুলো যেন জলরঙের ছবি! ওই ছবির একপোঁচ রং হয়ে এখন নিজেকে মিশিয়ে নিতে খুব ইচ্ছে করছে ওর ওর ঘরে এখন শান্তা...?

  ওরে বিধেন! আবার থামলি কেনে? বেলা যে গড়াল! হাত চালা, হাত চালা বেলাবেলি না রুইতে পারলে অনেক ঝরতি যাবে যে! নামলা বোনা হচে এবার ধরাট খরচা বেশি যাবে জমিটা আজ সেরে ফেল বাপ!

  বিধানের কাদা-মাখা পা বেয়ে একটা মেঠো পোকা উঠছে সিমসিম করে হাঁটু ছাড়িয়ে, ছেঁড়া লুঙি বেয়ে পোকাটা এখন ওর ঢেউখেলানো পিঠের খাঁজে নোংরা কাদাজল থেকে উঠে এলেও পোকাটার গায়ে একটুও কাদা নেই উজ্জ্বল সবুজ পোকা পিঠের খাঁজ পেরিয়ে ঘাড়ের উপত্যকায়

  ঘাড় ঘুরিয়ে জমিটা একবার দেখে নেয় বিধান এখনও অনেকটা খিদে জমিটার আরও পনখানেক বীজ খাবে বিশাল কালিবাকুড়ি গভভো যেন ভরেই না! ওদিকে সবুজ চারাগুলো পায়ের তলায় মাটি পেয়ে কোমর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে তিরতির করে কাঁপছে নাকি খিলখিল করে হাসছে! বাচ্চা মেয়ে যেন! সে হাসি বিধানের মনের ঝড়টাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে!

  পান্না-সবুজ পোকাটা এখন ওর মাথায় মাথায় উঠে থিরথির করে নড়ছে পাখার কাঁপন জলকাদা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে হয়তো! শুকনো পাখায় উড়ান দেবে এবার, তারই প্রস্তুতি!

  বিধানের মনের মাঝে তার মেটে ঘরের ভাঙা জানলার একটা ছিদ্র ছিদ্রটা ওকে টানছে মনটা ছেঁড়া ছেঁড়া হয়ে যাচ্ছে সে টানে কালিবাকুড়ির গর্ভটা সে এখনও ভরাতে পারেনি আজ না হয় কাল ঠিক ভরাবে কিন্তু ওদিকে শান্তা কথামতো...! মাথা থেকে গামছা খুলে ফেলে জমির আলের দিকে আসতে থাকে গামছায় হাত মুছতে মুছতে

  কী হল? উটে আসচিস কেনে? আজকের মধ্যে জমিটা...

  বাবু! পেটটা ক্যামুন মোড়া মারচে আমি এক ছুটে যাব আর আসব দের হবে নাকো

  বিধান ছুট লাগায় দূরে ওই ঘরবাড়িগুলোর দিকে ওর মাথার সবুজ পোকাটা উড়ান দিয়েছে তার আগেই অবনী হিসহিসে গলায় অনেক কিছু বলতে থাকে সেসব কথা বিধানের পিছনে ছুটে ওর নাগাল পায় না

  আকাশটা সকাল থেকেই পান্তা ভাতের আমানি রং ছিল এখন আবার কাজলাদিঘির রং ধরেছে দূরে পিচরাস্তার রং গাছপালার রং মিলেমিশে একসা জমির বুকে পড়ে থাকা ধানচারার সবুজ আঁটিগুলোতেও মেঘ জমেছে এখনও বৃষ্টি নামেনি তবুও অবনী ছাতা খুলেছে জমির মাদায় বসে নিজের মনে সে বিড়বিড় করছে মিগের বাত চলচে জমিটার বতর হয়েচে ভাল সবটা আজ রুইয়ে ফেলতে পাল্লে ভাল হত শালা কিষান ভাল হলে কী হবে, হাড়-হারামজাদা অবনীর মনের মধ্যে আরও কত কথা ছুটে বেড়াতে থাকে তার ধাক্কায় ঠোঁট দুটো নড়ে শুধু

 

দুই

 

  গাঁয়ে ঢুকে বিধান দৌড় থামায় কিন্তু হাঁটতে থাকে প্রায় দৌড়োনোর মতোই ওর শ্যাওলা-রঙা গা-গতরে ভোরের শিশিরের মতো ঘাম ঘাসহীন চওড়া বুকটার ওঠানামা বেশ জোরে বুকের ভেতর হাপর চালছে যেন! আর একটুখানি বাড়ি এসেই গেছে প্রায় ওই তো উঠোনে মেঘ-জড়ানো আমগাছের মাথা

  হালকা পায়ে উঠোন পেরোয় মাটির দাওয়াতে ওঠে গাছগাছালি ঘেরা বাড়িটাতে বিকেলবেলাতেই আঁধার নেমেছে গায়ে মেঘলা আঁধার জড়িয়ে ভাঙা জানলার কাছে এগোয় পা টিপেটিপে বুকের কামারশালে এখন হাতুড়ি পেটা চলছে নিশ্বাস প্রায় বন্ধ রেখে জানলার পাল্লার ফুটোয় চোখ রাখে না, কিছুই দেখা যাচ্ছে না তা হলে শান্তা কি ঘরে একাই রয়েছে? দিলীপ কি তবে...? জানলা থেকে সরে আসে দরজার ফাঁক খোঁজার চেষ্টা করে

  কোনও ফাঁক নেই পাল্লায় কুমরিপোকার বাসা আলতো চাপ দেয় দরজায় বাসাটা আঙুলের চাপে ভেঙে যায় ভেতর থেকে দরজা বন্ধ বিধানের চোখে ঝিলিক তা হলে নিশ্চয় দিলপেটা ঘরে ঢুকেছে!

  বিধানের মনে এখন এতোল-বেতোল ঝড় সে ঝড় থামাতে দাওয়ার খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় একটুখানি একটা সবুজ গঙ্গাফড়িং উড়ে এসে বসে ওর গায়ে নাকি মনের আকিংখে ফলার লক্ষণ! সেও হালকা পায়ে যায় জানলার কাছে এবার জানলার ফুটোয় কান পাতে হাসির শব্দ শোনা গেল যেন! নাকি টিকটিকির ডাক? ঠাহর করতে পারে না ঠিক এমন সময় চড়বড়িয়ে বৃষ্টি নামে ঘরের ভেতরের কোনও শব্দ আর কানে আসে না কান জুড়ে এখন বৃষ্টির শব্দ আমগাছের পাতায় পটপট শব্দে মোটা বৃষ্টির ফোঁটা উঠোনের কোণে, মুড়ি ভাজারআখাতে ঢাকা দেওয়া টিনটায় বৃষ্টি যেন তবলার বোল তুলছে বৃষ্টি বিধানের মনেও! সারা শরীরে মনে সে বৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ছে নিঃশব্দে এমন সময় গঙ্গাফড়িংটা জানলা থেকে উড়ে চলে যায় উঠোনের আমগাছের দিকে

  দিন দশেক হল বর্ষা শুরু হয়েছে মাঝেমাঝে বিরাম আবার রিম-ঝিম-ঝিম, টাপুর-টুপুর বিধানের ভাষায় মিগের বাত এই সময়টা ধান রোয়ানোর পক্ষে লাগসই বিধানের মতো ভাল কিষানদের এখন কদর কত! জনা পাঁচেক কিষেন সঙ্গে পেলে এক বেলাতেই তিন বিঘে বাকুড়ির কালচে মরা কাদায় সবুজ প্রাণের ঢেউ খেলিয়ে দিতে পারে

  বিধানের হঠাৎ মনে পড়ে যায় কালিবাকুড়ির কথা অবনীবাবু ছাতা মাথায় ঠিক বসে থাকবে জমির মাদায় মই দেওয়ার পর চারদিন ধরেপচানহয়েছে জমিটা সময় বীজ পুঁতলেই গাছ ফনফনিয়ে উঠবে! পুরো জমিটা রোয়া না হলে বুড়ো নড়বে না জমি থেকে কিন্তু ওর আজ জমিতে ফিরে যেতে মন নাই ওর মন জুড়ে আজ শান্তা শ্যামলারঙা ডাগরচোখি বউটা! যেদিন কালিবাকুড়িতে প্রথম হাল নামাল, সেদিনই শান্তার -মাসেরশরীল খারাপহয়েছিল আঙুলের কর গুনে হিসেব করে বিধানদশ দিন হল সে চান করেশুদ্ধুহয়েছে শহরের সেই ডাক্তারের ভাষায় শান্তা এখনপোডাকটিব পিরোডে বিধান অতশত বোঝে না সে বোঝে, কালিবাকুড়ির মতন শান্তার শরীলটাও সময় বতর হয়েছে বীজ বুনলেই...

 

তিন

 

  বিধানের মনটা স্যাঁতসেঁতে শান্তাকে ঘরে এনেছে বারোটা বছর বারো বছর ধরে শান্তার শরীরে বীজ বুনে চলেছে সে তার শরীরটা বতরও হয়েছে মাসের পর মাস কিন্তু ফসল ফলেনি ওদের দুজনের মনের মাঝের ইচ্ছেটা আদরের নন্দদুলাল হয়ে, হামাগুড়ি দিতে আসেনি মাটির দাওয়ায় বিয়ের পর বছর ঘুরতে না-ঘুরতেই শাশুড়ির তত্ত্বতালাশ শুরু হয়েছিল, কী গো বউ! বলি ব্যাপার কী? একনও গা-ভারী হল না!

  শান্তা লজ্জায় মাথার কাপড় একটু টেনে নামিয়ে ঠোঁট টিপে হেসেছে তখন রাতের বেলায় ওর কানের কাছে মুখ এসে ফিসফিস করে বলেছে মায়ের কথা তারপর দুজনেই উদ্দাম হয়ে উঠেছে ল্যাজে মোচড় খাওয়া হেলে-বলদের নতন! এমনি করে আরও বছর দুয়েক তখন মায়ের কথার সুর পালটেছিল, বিয়েতে নগদ টাকাও দশ হাজার কম নেলাম অমন নক্কিপারা মুক আর শাঁসালো গতর দেকে মন ভিজে গেল ঘরে তোললাম তখন তো বুজিনি মাগি আঁটকুড়ি! আমার কপালে - ছিল! সে মিনসে আমাকে একা ফেলে ফাঁকি দিয়ে চলে গলে ভাবলাম শেষ জেবনটা নাতির নিকেমানি করে একটু হেসে খেলে কাটাব! তা আমার পোড়া কপাল!

  শান্তা এসব কথা শুনে গোয়ালঘরে গিয়ে হাপুস চোখে কেঁদেছে আর মা ষষ্ঠীর কাছে মানত করেছে আমার কোল ভরিয়ে দাও মা! সোনারনতদোব ছেলেররোজোনেরসিন্নি দোব রাতে কানের কাছে ফোঁসফোঁস শব্দ মিশিয়ে মায়ের কথাগুলো উগরেছে, আর বালিশ ভিজিয়েছে! তখন মায়ের কথায় সায় দিয়েছিল, মা তো খারাপ কিচু বলেনি বাঁজা মেয়েছেলে! তার আবার ফোঁসফোঁসানি!

  বিধানের চোখে বৃষ্টি নামে কী অন্যায়টা করেছিল সেদিন! পাপ করেছিল অমন সতীনক্ষি বউটাকে যা নয় তা বলে আজ সে পাপের ফল ভোগ করচে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের বউকে...!

  বৃষ্টির মোটা ফোঁটা ছোট হয়েছে কিন্তু বেশ ঘন আমপাতার ওপর এখন পটপট করে জোর শব্দ হচ্ছে না পিটপিট পিটপিট শব্দে ঝরে পড়ছে ওপর দিকের সমস্ত পাকায় সে পাতাগুলো থেকে গড়িয়ে নীচের পাতায় এমনি করে সব পাতাগুলোই ভিজে যাচ্ছে

  বিধানের মনে পড়ে, গাঁয়ের সমস্ত মানুষগুলো একসময় কীভাবে জেনে গিয়েছিল ওর বউ বাঁজা ওর মা একা নয়, গাঁয়ের সব মেয়েমানুষ গুজগুজ ফুসফুস করত শান্তাকে দেখতে পেলেই শান্তা মাঠে বসতে যাওয়া, পুকুরঘাটে যাওয়া বন্ধ করেছিল অবশেষে সে বাবা-দাদার কাছে কেঁদেকেটে টাকা আদায় করেছিল পুরো দশ হাজার সব টাকাটাই তুলে দিয়েছিল ওর হাতে, মায়ের সামনে সেই টাকা দিয়ে উঠোনের একপাশে বানিয়ে নিয়েছিল বেমানান পায়খানা চানঘর টিউকল বসিয়ে নিয়েছিল তা থেকে হুসহুস করে জল ওঠা দেখে ওর মনে দখনে বাতাস বাবুদের বাড়িতেও টিউকল বাবুদের কলে এত জল হয়তো ওঠে না! কলের জল কী ঠান্ডা! সে-জল শান্তার শাশুড়ির মনটাকে কিছুটা জুড়িয়েছিল তারপর কলের জল একসময় কমে এসেছিল তেমন ঠান্ডাও আর ছিল না

  এর মধ্যে নানা জনের নানা কথামতো অনেক মানত, বহু সিন্নি চড়ানো, কবচ-তাবিজ, শেকড়-বাকড় ওসব নিষ্ফল হয়েছিল অবশেষে গাঁয়ের রতন মাস্টারের কথামতো কিছু টাকাপয়সা জোগাড় করে শহরের বড় ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল দুজনে এক দিন, দুদিন অনেক দিন বিধানের মনে পড়ে ডাক্তারের কথাগুলো — ‘বিধান! তোমাদের দুজনের শরীর পরীক্ষার রিপোর্ট দেখলাম শান্তা মণ্ডল মানে তোমার বউয়ের কোনও দোষ পাওয়া যায়নি বাঁজা নয় কিন্তু তোমার রিপোর্ট ভাল নয় তোমার বীজে পোকা নেই মানে তুমি কোনওদিন বাবা হতে পারবে না

  ওর মনে পড়ে যায়, ডাক্তারের কথা শুনে জ্ঞান হারিয়ে শান্তার মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ঘটনা

 

চার

 

  ঝুপঝুপিয়ে বৃষ্টি পড়ছে আমগাছের ডালে দুই হতচ্ছাড়া কাক ঝুপসি হয়ে বসে বসে ভিজছে বিধান বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর মনে হুড়মুড়িয়ে আসছে কত কথা মা-টা পট করে মরে গেল মরার সময় মায়ের জড়ানো কথাগুলো এখনও ওর কানে বাজে — ‘লাতি সগ্যে দেয় বাতি আমার সগ্যে বাতি দেওয়ার কেউ নাইতারপর মায়ের জীবনের বাতিটা ফুস করে নিভে গিয়েছিল মায়ের বন্ধ চোখদুটোর কোনায় দুফোঁটা জল শান্তা মরা-মায়ের বুকের ওপর পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল

  তারপর থেকে শান্তা আর কোনওদিন কাঁদেনি কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে হাসিও নেই ওর মুখে ঠিক যেন টিউকলের মতো কলের হ্যান্ডেলে চাপ দিলে ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ আর ছিড়িক ছিড়িক জল আর না টিপলে চুপচাপ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র ওর খুশি দেখা যায় পাশের বাড়ি থেকে ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা যখনজেঠিমা জেঠিমাবলে -বাড়িতে আসে শান্তা তখন একমুখ হাসি নিয়ে ওদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমোতে ভরিয়ে দেয় ওদের জন্যেই তৈরি করে রাখে তিল-পাটালি, নারকোল নাড়ু আজকাল সে দেখছে, পাড়ার আরও কিছু বাচ্চাদের জেঠিমা-কাকিমা হয়ে গেছে সে হয়ে গেছে ওদের খেলার সাথী বিকেলে বুড়ো আমগাছ ঘিরে রুমাল চুরি, নয়তো আইশ-বাইশ খেলা যাওয়ার সময় ওদের হাতে নাড়ূ, নয়তো পাটালি যখন বাড়িতে থাকে না, দুপুর কিংবা বিকেলে বাচ্চাগুলো আসে তখন শান্তাও যেন বদলে যায়! মাঠ থেকে কোনওদিন তাড়াতাড়ি ফিরে এলেই হয় মুশকিল ওকে কেন যে বাচ্চাগুলো ভয় পায়! অথচ ওর খুব ইচ্ছে করে ওদেরকে কোলে তুলে নিয়ে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে

  বৃষ্টিটা একটু ধরেছে যেন এখন পড়ছে গুঁড়িগুঁড়ি বিধান দাওয়ায় জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ওর মনটা হারিয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য জীবনের খানাখন্দে অন্ধকারে ওর সংবিৎ ফেরে হঠাৎ এক শব্দে চোখে পড়ে দাওয়ার ওপর একটা পাঁঠা পটাপট শব্দ তুলে গা ঝাড়ছে পুরো ভিজে চান হয়ে গেছে ছাগলটা ওর নিজেরও গা-মাথা ভিজে একসা বাদলার ছাটে ভিজে গেছে খেয়াল করেনি, ছাগলটা কখন দাওয়ায় এসে ঠাঁই নিয়েছে ধর্মরাজের পাঁঠা যেখানে খুশি যায় যা পায় তাই খায় আর গাঁয়ের যত ছাগলের ছা আছে, তার বেশির ভাগেরই বাবা ওই পাঁঠা ছাগলটার ওপর বিধানের কেমন যেন রাগ হয় তার গায়ের বিটকেল গন্ধটা নাকে লাগে সে গন্ধ নাক দিয়ে ঢুকে যেন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে! ছাগলটাকে ওর একদম সহ্য হচ্ছে না, তাড়িয়ে দেয় দাওয়া থেকে

 

পাঁচ

 

  গোটা কয়েক ডাঁশমাছি অস্থির হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে বারান্দায় কখনও দু’-একটা এসে বসছে বিধানের খালি গায়ে আবার তক্ষুনি উড়ে যাচ্ছে বিধানের মনও অস্থির কালিবাকুড়ির মাদায় অবনীবাবু তার জন্যে ঠায় বসে থাকবে এখনও বীজ বোনা বাকি এদিকে ঘরের দরজা এখনও বন্ধ ঘরের মধ্যে আঁধার শান্তাও আঁধারে ডুবে ওর গায়ে কি ঘরের ভাঙাচোরা ফাঁকফোকর দিয়ে কোনও আলোই পড়ছে না! জানলার ফুটোতে চোখ রেখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে কান পাতে হ্যাঁ, কথার গুনগুনানি! তবে নিশ্চয় শান্তা একা নেই! বলুক, যত খুশি কথা বলুক শান্তা সেটাই আজ চায় ! এখন মোটেই নড়বে না এই দাওয়া থেকে অবনীবাবু হয়তো দু’-চার কথা শোনাবে তা শোনাক আজ কথা শোনালেও কাল আবার ডাকবে কিষান হিসাবে ওর কদর খুব! সবাই বলে বিধানটা জাতচাষি যদি জমিতে বীজ না পুঁতে শুধু ছুড়ে দেয়, তা হলেই গাছ লকলকিয়ে ওঠে ফলন ভাল হয় ওর হাতের গুণই আলাদা সকলের কাছে সে ভাল কিষেন কিন্তু শান্তার কাছে...?

  বৃষ্টি থামলেও এলোমেলো জলো হাওয়া বইছে গায়ে শেতল ছোঁয়া বিধানের নাকে এক উৎকট গন্ধ এসে লাগে পচা গোবরের গন্ধ কলতলার পাশে একটা গর্ত করে, সেখানে গোবরগুলো ফেলা হয় গোবরও তো কম নয়! দুটো হেলে আর একটা গাই! রতন মাস্টার তার জমিতে দেওয়ার জন্যে কিছুটা গোবর উঠিয়ে নিয়ে গেছে নীচেকার ভ্যাটভ্যাটে গোবরে বর্ষার জল পড়ে ছড়াচ্ছে বিশ্রী গন্ধ হাওয়ায় হাওয়ায় গন্ধ পুরো পাড়াতেই ছড়িয়েছে নিশ্চয়

  বারো বছর বিয়ে করেও বিধান বাবা হতে পারেনি তার আসল কারণটা গাঁ-সুদ্ধ সবাই জেনে গেছে খুব বিরক্ত এতে কী করে যে জানল! অন্য মুনিশরা যখন-তখন ওকে নিয়ে মজা মারে বিধান! তোর জৈবনের খ্যামতাটা ভগবান ভুল করে হাতে দিয়ে ফেলেছে তাই তোর হাতে সোনা ফলে

 ওদের হো হো হাসি বিধানের বুকে হু হু কান্না হয়ে ছড়ায় সে কান্নার শব্দ সে ছাড়া আর কেউ শুনতে পায় না

  বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু মেঘ কাটেনি উঠোনের আমগাছের পাতার ফাঁকে ঝাপসা আঁধার পাতা থেকে জল ঝরছে টুপটুপ করে বিধানের মনে চুঁইয়ে পড়ছে আশার আলো আর বোধহয় ওই খচ্চর মুনিশগুলোর কাছে ...! শান্তা তাইলে তার কথার অমান্যি করেনি ওর মনটা থেকে এখন সদ্য বৃষ্টি হওয়া সোঁদা গন্ধ বেরোচ্ছেহয়তো এবার ওই উঠোনে নাড়ুগোপাল হামাগুড়ি দেবে!

 

ছয়

 

  উঠোনে চোখ যায় বিধানের আমগাছের নীচে পাঁঠাটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জাবর কাটছে পাঁঠার চোখদুটো যেন ওর দিকে জুলজুল করে দেখছে হঠাৎ ওটা খ্যাকখ্যাক করে গলা ঝাড়ে! নাকি ওর দিকে তাকিয়ে খ্যাকখ্যাক করে হেসে ওঠে! ছাগলটার গা গড়িয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝড়ছে মাটিতে কেমন লালচে রং সে জলের! বিধান চোখ ফিরিয়ে নেয় ওর মনে কেমন যেন একটা চিনচিনে ব্যথা জমা হচ্ছে একটু একটু করে ব্যথাটা ক্রমশ যেন রাগে বদলে যেতে থাকে প্রচণ্ড রাগ! তারপর হঠাৎ রাগটাও কেমন ছানাকাটা হয়ে যায় ওর মনে পড়ে গাঁয়ের রতন মাস্টারের কথা

গ্রামেরপঞ্চাত মেম্বররতন মাস্টার সেদিন মোড়পতলার মজলিশে ওকে বলেছিল, 'বিধান! তুমি তো জেতে চাষি! তাইলে ভাল করেই জানো, এখন কত রকম হাইব্রিড ধানের বীজ কিনতে পাওয়া যায় তুমি নিজের হাতেই তো চাষ করো হাজার ছত্রিশ, মিনিকিট, লাল সন্ন এসব তা তুমি তোমার জমির লেগে শহর থেকে হাইব্রিড বীজ কিনে লিয়ে এসো নিশ্চয় ফসল পাবা আর তা লইলে তোমার জমিটা তুমি ভাগে দিয়ে দাও অন্যজনকে দিয়ে চাষ করাও, যদি বাপ হতে চাও' তারপর ফস করে দেশলাই জ্বেলে বিড়ি ধরিয়েছিল মাস্টার

  দপ করে আগুন ধরে গিয়েছিল বিধানের মাথায় ইচ্ছে করছিল মাস্টারের জিভটা টেনে ছিঁড়ে নেয় কিন্তু রতন মাস্টার হল গিয়েকিষক সমিতির সেকেটারি তাই ওকে খাতির করতে হয় ওকে চটালে কাজ পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে তাই সে মনের আগুন চেপে রেখে শুধিয়েছিল –— মাস্টার! ধানের বীজ না হয় কিনতে পাওয়া যায়, কিন্তু বীজ...?

  একমুখ ধোঁয়া ছেড়েছিল মাস্টার পাওয়া যায় বীজও কিনতে পাওয়া যায় শহরে মানে কলকাতায় কতায় বলে না, পয়সা দিলে কলকাতায় বাগের দুদ মেলে

  তারপরপামব্যাঙ্ক ফামব্যাঙ্কআরও কত কিছু বলেছিল সব শেষে বলেছিল, তবে বুজলে বিধান! ওসব মেলা খরচের ব্যাপার! তুমি পারবা নাকো তুমি ওইটা করো, যা বললাম

  মাস্টারের পাশ থেকে খ্যাঁদা গয়লা ফোড়ন কেটেছিল হ্যাঁ হ্যাঁ ষাঁড় দেকিয়ে লাও আমাদের গরু গরম হলে ষাঁড় দেকাতে লিয়ে যাই তো!

  তারপর গুলগুলিয়ে হেসে উঠেছিল দুজনে বিধান লজ্জায়, ঘেন্নায় রাগে বোবা হয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে উঠে এলেবেলে পায়ে হাঁটা দিয়েছিল বাড়ির দিকে

 

সাত

 

  একটা কুমরিপোকা উঠোন থেকে কাদা নিয়ে আসছে মুখে করে এসে বসছে জানলায় ঘর বানাচ্ছে পোকাটা উঠোনে যাচ্ছে  আর ফিরে আসছে কাদা নিয়ে বিধান জানলার কাছে ওর কানে এবার খসখস শব্দটা ধরা দেয় ফিসফিস কথার শব্দও কানে আসে ওর মন চলকায় দিলীপটা তাহলে ঘরে আচে একটা ডাঁশমাছি এসে বসেছে ওর গালে রক্ত চুষছে থাপ্পড় মেরে মাছিটাকে মেরে ফেলার ইচ্ছে করে ওর কিন্তু হাত থেমে যায়, গালে ব্যথা লাগবে মাছিটা উড়ে যায় মনের মাঝে শান্তার ডাগর শরীরখানা সেই শরীরটা নিয়ে দিলীপ...! ওর রগের শিরা ফুলে ওঠে হাতের মুঠি শক্ত হয় ইচ্ছে করে লাথি মেরে দরজা খুলে ফেলে ঘাড় ধরে উঠোনে টেনে নিয়ে আসে লম্পটটাকে তারপর...! কিন্তু পরক্ষণেই মনের আগুনে যেন জল পড়ে মুখের রেখাগুলো পালটাতে থাকে কেমন এক অসহায়তা ফুটে ওঠে মুখে মনে ভাসে রতন মাস্টারের কথাগুলো মনের মধ্যে পাক খায় মাঠের অন্যান্য কিষান মুনিশদের কথা তুই আবার পুরুষ নাকি! বারোবছর চেষ্টা করেও বাবা হতে পাল্লি না ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা

  পশ্চিম আকাশটা পরিষ্কার হচ্ছে আর বোধহয় বৃষ্টি হবে না এখন আমগাছে ভিজে কাক দুটো ডানা ঝাপটিয়ে কা-কা শুরু করেছে মেঘের নীচে ডিমের কুসুমরঙা সূর্যটা উঁকি মারছে মাটির দাওয়ায় তার হলদেটে আভা এসে পড়েছে একটা হলুদ রঙের ছোট্ট প্রজাপতি কোত্থেকে দাওয়ায় উড়ে এসে সেই আলো মাখছে বিধানের বুকের কাছে উড়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতি

মনের আগুনটা নিভে গেছে আগুনে জল ঢালার পর বাষ্প ওঠার মতো ফিনফিনে একটা স্বপ্ন ওর মনে খসখস শব্দটা এখন ওর মনকে তেমনভাবে পোড়াচ্ছে না তা যেন মনের মাঝে স্বপ্নটাকে বুনছে একটু একটু করে

  কালিবাকুড়িতে বীজ বোনা সারা হয়নি অবনীবাবু নিশ্চয় দাঁড়িয়ে জমির ধারে তিনি বলছিল ধুলোট বীজ লয়, কাদান বীজ গোছ একটু বেশি দিতে হবে ধানের বীজটাওহাইবিরিড’, শহর থেকে কিনে আনা এবার নামলা বোনা হচে আর দেরি করা ঠিক লয়, আজই বুনে ফেলতে হবে ছুট দিতে হবে কালিবাকুড়ির দিকে কিন্তু এদিকে শান্তা? সে একা দরজা বন্ধ করে রোজকার মতো আজও ঘুমাচে না তো? ঘরের মধ্যে হয়তো ইঁদুরের দৌরাত্ম্যির শব্দ! ঘরের মধ্যে দিলীপ ঢুকেছে? নাকি ইঁদুর! দিলীপটা তাদের বংশের মধ্যে একমাত্র বি পাশ কলকাতায় সরকারি চাকরি পেয়েছে কিন্তু ওর মনে বেজায় কাদা শান্তা কি কাদা মাখছে? বারোটা বছর বড়ই নামলা বড়ই নামলা শান্তার শরীরটাওবতরহয়েছে সময়

 

আট

 

  এখন আর বৃষ্টি হবে না বোধহয়! মেঘ সরে যাচ্ছে বিধানের বাড়ির চারপাশ থেকে, উঠোনের আমগাছ, ভাঙা জানলার ছিদ্র থেকে অন্ধকার একটু একটু করে কমছে সামনের আকাশটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ কিন্তু দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আকাশে মাঝে মাঝে আলোর ঝলকানি, অথচ কোনও শব্দ কানে আসছে না

  বিধানের মনের অন্ধকার চিরে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো একটা কথা বারবার চমকাচ্ছে রতন মাস্টারের কথাটা বিধান! অন্যজনকে দিয়ে চাষ করাও যদি বাপ হতে চাও সেদিন রতন মাস্টার আর খ্যাঁদা গয়লার খোঁচা খেয়ে সে হাঁটা দিয়েছিল বাড়ির দিকে বাড়ির পাঁদাড়ে পৌঁছোতেই কানে এসেছিল শান্তার হাসির শব্দ আশ্চর্য! শান্তার হাসি শোনেনি বহু দিন! এই সাঁঝবেলায় আবার হাসাহাসি করছে কার সঙ্গে? বাচ্চাকাচ্চাগুলো তো যে যার বাড়ি চলে গিয়েছে সে পা টিপে টিপে উঠোনে দাওয়ায় বসে পাটকাঠি জ্বেলে চা করছে শান্তা ওর গা ঘেঁষে কে একজন মরদ মানুষ বাবুদের মতন কাপড় চোপড় পরা ওর মনটা ধক করে উঠেছিল তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে দেখেছিল দিলীপ নিজের জ্যাঠার ছেলে আজই কলকাতা থেকে গাঁয়ে এসেছে ছুটিতে বউদির সঙ্গে এখন এসেছে দেখা করতে দিলীপের মুখটা টেমির আলোয় চকচক করছে শান্তার মুখে সে আলোর কিছুটা নিজের অন্ধকার মনে হঠাৎ এক আলোর ফুলকি টেমির আলোর চেয়েও সে আলো আরও তেজালো সেই আলোয় সে দেখেছিল উঠোনে টলমল পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের স্বপ্ন, তাদের ভবিষ্যৎ তার মল-পরা পায়ে রিনিক-ঝিনিক শব্দ! কপালে চাঁদের মতো কাজলের টিপ! ফোকলা মুখ থেকে ঝরে পড়ছে হাসি! নাকি মণিমুক্তো! বিধান ভাইয়ের সঙ্গে দু’-একটা মামুলি কথা বলেছিল তারপর বলেছিল, ভাই দিলীপ! তু বউদির সঙ্গে গল্প কর আমি একটা কাজ মিটিয়ে আসচি

 

নয়

 

  সেদিন ছিল পূর্ণিমা বেশ দিন ধরে মেঘলা ছিল সেদিন আকাশ বিলকুল পরিষ্কার জোছনা-ধোয়া রাত পুরো গাঁ-টা জোছনাসাগরে ডুবে আছে বিধানের বাড়িটাতেও যেন রূপো গলে গলে পড়ছে বুড়ো আমগাছের পাতায়, একঠেঙে টিউকলটার মাথায় বাঁধভাঙা আলো খড়ো চালের ওপর লাউয়ের লকলকে পাতায় বসে জোছনাপরিরা আড্ডা জমিয়েছে যেন! বিধানরা দুই মানুষে ঘরের ভেতরে মাদুর আর ছেঁড়া কাঁথার বিছানায় শোওয়ার আগে টেমিটা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিয়েছে তবুও যেন ঘরের ভেতরটাতে অন্ধকার তেমনভাবে দখল নিতে পারেনি খড়ের চালের ফাঁকফোকর দিয়ে দু’-একটা রুপোলি রেখা ঘরের ভেতর তেলচিটে বালিশে মাথা রেখে শান্তা আদুল গায়ে শুয়ে ওর শরীরের ওপর চালের ছিদ্র গলে একমুঠো জোছনা ছড়িয়ে পড়েছে ওর চোখ বন্ধ উঠোনের আমগাছ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক সেটাই বুঝি শুনছে সে মন দিয়ে

  কী বউ, ঘুমোলি নাকি?

  শান্তা পাশ ফেরে বিধানের দিকে একটা হাত রাখে ওর চওড়া বুকে

  দিলপেটাকে তোর কেমন লাগে রে?

  বুকের ওপর আঙুলের নাড়াচাড়া, খারাপ কী! ভালই তো! বেশ মজার মজার কতা বলে আগের চেয়ে এয়ারকিবাজ হয়েচে বেশি

  হুঁ, কলকাতায় চাকরি লিয়ে চেয়ারাটাও বেশ চেকনাই হয়েচে

  শান্তা বিধানের গায়ে লেপটে যায়, এই রেতেরবেলায় ওর কথা?

  না এমনিই কিন্তু তোকে বেশ পছন্দ করে

  তাতে কী? তুমি বুঝি পচন্দ করো না!

  তা লয় তবে আমি তো তোকে...!

  এখন ওসব কতা ছাড়ান দাও

  বিধান আঁকড়ে ধরে শান্তাকে, একটা কতা বলব তোকে? রাগ করবি না?

  শান্তা কোনও উত্তর দেয় না মুখ গুঁজে দেয় বিধানের বুকের মধ্যে                                                     

  বলছিলাম, তু যদি রাজি হোস, তাইলে আমাদের ঘরেও একটা ছেলে আসতে পারে

  শান্তার হালকা হাসি হাট থেকে কিনে লিয়ে আসবা নাকি!

  এয়ারকি করিস না দিলীপ এক সপ্তার ছুটিতে এয়েচে বলচি যে, এর মদ্যে তু যদি ওই দিলীপের সঙ্গে... দু’-এট্টা দিন সময় তোর শরীলটাও বতর হয়ে আচে

  শান্তা রাস্তার মাঝে সাপ দেখার মতো আঁতকে উঠেছিল বিধানের কাছ থেকে ছিটকে সরে গিয়েছিল সে! হিসহিসে গলায় বলেছিল, তুমি ব্যাটাছেলে না হিজড়ে!

  বিধান মরিয়া হয়ে বলেছিল তু যা খুশি বল শুধু এট্টা দিন... আমি আর পারচি না রে বউ, আর পারচি না মাঠের মুনিশ, গাঁয়ের ড্যাকরাগুলো...!

  বিধান আরও অনেক কথা বলেছিল সেই রাতে সতী অসতী, পুন্নাম নরক, বুড়ো বয়সের কষ্ট আরও কত কী! শান্তা চুপচাপ পড়েছিল বিছানায়, গায়ে আঁধার জড়িয়ে একসময় ভোরের কাক ডেকে উঠেছিল তখন মরার মতো পড়ে থাকা শান্তাকে বুকে টেনে নিয়েছিল বিধান

 

দশ

 

  মেঘের ফাঁকে সূর্যটা কেমন মিইয়ে গেছে দাওয়ায় মরা রোদ সে রোদ মেখে বিধান খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বেরোনোর সময় সে শান্তাকে বলে গিয়েছিল, ‘আজ বিকেলে দিলীপকে আসতে বলিস বউতারপর কালিবাকুড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছিল এখন ওর মনটা চলে গেছে কালিবাকুড়িতে সেখানে হলুদ রোদে ভিজে ছাতা শুকোচ্ছে জমির মালিক অবনী মনেমনে গালিগালাজ করছে হয়তো তাকে তবুও কাজ বুঝে নেবে বলে জমি থেকে নড়েনি তার বিশ্বাস খুব ভাল কিষান আজ এই মিগের বাতে বিধানের হাত দিয়ে জমিতে বীজ পুঁতলে একটা বীজও মরবে না কিছুদিন পরেই ঘন সবুজ গাছে পরিণত হবে

  বিধান যেন দেখতে পাচ্ছে সেই ঘন সবুজ ধানখেতে শরতের রোদ্দুর পড়ে ঝলমল করছে ধানখেত নয় যেন সবুজ সমুদ্দুর হাওয়া সবুজ সমুদ্দুরে ঢেউ তুলেছে! তাকে দেখে সবুজ পাতাগুলোর কী খিলখিল হাসি! থোড় এসেছে গাছগুলোতে তাদের দেহ ভারী হয়েছে ফুলোনো ধানগাছের মন-মাতাল করা গন্ধ আসছে তার নাকে গাছ থেকে দু’-একটা দানা ছিঁড়ে নিয়ে দুআঙুলে টিপে দুধ বের করতে ইচ্ছে হচ্ছে ওর হয়তো আর বেশিদিন লয় তার শান্তাও ওই ধানগাছের মতন হবে

  এমন সময় খুটখাট আওয়াজ দরজার খিল খোলার শব্দ বিধান এক লাফে দাওয়া ছেড়ে উঠোনে ছুটে গিয়ে আমগাছের আড়ালে আমগাছের গুঁড়িতে ঘুরে বেড়ানো কাঠবেড়ালিটা লেজ উঁচিয়ে ভয়ে দৌড় দেয় চোঁ চাঁ উঠে যায় মগডালে সেখান থেকে তুড়ুক তুড়ুক করে ঘাড় নাড় আর পুটুস পুটুস তাকায়

  বিধানের বুকের হাপরটা বেশ জোরে চলছে ঘর থেকে কে বেরোবে আগে? চরিত্তির নষ্ট হওয়া নোংরা মনের দিলীপ! নাকি উপকারী ভাই! অসতী হয়ে যাওয়া শান্তা! নাকি স্বামী-অন্ত পরাণ তার মিষ্টিমুখি বউটা! ওর চোখ দরজার দিকে স্থির! ঘর থেকে বেরিয়ে আসে শান্তা ওর দুই কাঁধে দুটো বাচ্চা ভাইয়ের ছেলে আর মেয়েটা পেছনে শাড়ির খুঁট ধরে দাঁড়িয়ে আরও গোটা তিনেক পাড়াপড়শির ছেলেমেয়ে বিধানের চোখে দপ করে আগুন জ্বলে ওঠে শান্তা তার কথার অমান্য করেছে গাছের আড়াল থেকে সে বেরিয়ে আসে দাওয়ার কাছে যেতেই শান্তার সঙ্গে চোখাচোখি, শান্তার চোখেমুখে কুসুমকুসুম রোদ

  তুমি এসে পড়েচ! কী বিষ্টি কী বিষ্টি! ঝেঁপে বৃষ্টি আসায় এরা আর বাড়িই যেতে পারল না এদেরকে নিয়ে শুয়ে শুয়ে গল্প বলছেলাম তুমি তো ভিজে চুবচুবে মাতা মুচে নাও দুটো কোল থেকে নামতেই চায় না এই ছোটটা আমাকে মা বলে, জানো

  বিধানের চোখের ভাষা পালটাতে থাকে তার চোখ শান্তার দিকে স্থির শান্তাকে এত খুশি বহুদিন দেখেনি শান্তা খুশিতে বকবক করে চলেছে তোমাকে দেকে ভয় পাচ্চে বড্ড ভয়তরাসে! দেকো তোমার দিকে কেমন তাকিয়ে আচে

  বিধান দাওয়ায় ওঠে শান্তার মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে থাকে তারপর শান্তার কোল থেকে ছোট্ট মেয়েটাকে টেনে নিয়ে বুকের মধ্যে মিশিয়ে নিতে থাকে ওর মাথা থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ে বাচ্চাটার চোখেমুখে চোখ থেকেও দু’-এক ফোঁটা ঝরে হয়তো বা! ওকে অবাক করে দিয়ে মেয়েটা ওর কোলে গিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে একটু আগে এই মুখটাই তো ওর মনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল মণিমুক্তো ছড়িয়ে বাচ্চার ওই অনাবিল হাসি বিধানের বুকের ভেতর দিয়ে ঢুকে ছড়িয়ে পড়ে ওর মজ্জায় মজ্জায় পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন পেকে লাল হয়ে উঠেছে সে লাল রং শান্তার লক্ষ্মীপারা মুখ রাঙিয়ে, ছড়িয়ে পড়ে বিধানের মেটে ঘর খড়ো চালের পুরো বাড়িটাতে

শেয়ার করুন: