চাকা লাগানো বড় সুটকেসটা দরজার সামনে নামায় সে। রংচটা নড়বড়ে দরজার শিকলটা নাড়ায় বেশ জোরে। কান পাতে। নিস্তব্ধ। দরজাটা ঠেলে। ভেতর থেকে বন্ধ। এবার আরও একটু জোরে শিকল নাড়ায়। ভেতর থেকে কোনও শব্দ পাওয়ার অপেক্ষা। শব্দ হয় না। সে দরজার ফাঁকে চোখ রাখে।
চাকা লাগানো বড় সুটকেসটা দরজার সামনে নামায় সে। রংচটা নড়বড়ে দরজার শিকলটা নাড়ায় বেশ জোরে। কান পাতে। নিস্তব্ধ। দরজাটা ঠেলে। ভেতর থেকে বন্ধ। এবার আরও একটু জোরে শিকল নাড়ায়। ভেতর থেকে কোনও শব্দ পাওয়ার অপেক্ষা। শব্দ হয় না। সে দরজার ফাঁকে চোখ রাখে। উঠোনে কলতলার সামনে এঁটো বাসন। পেছনের বাড়ির জানলা খোলার শব্দ। জানলায় ঘুম জড়ানো উৎসুক চোখ। চোখে কিছুটা বিরক্তিও। ভোরের স্বপ্ন-ঘুম ছিনতাই হয়েছে। সে দরজার সামনে থেকে অপদস্থ ভাব নিয়ে সরে যায়। এখন সে বাড়িটার উঁচু জানলার নীচে। জানলাটাও বন্ধ হয়ে যায়। তার চোখেমুখে বিরক্তি ও হতাশার ছাপ। সে জানলার নীচ থেকে সাবধানে সরে আসে। ওখানে আগাছার জঙ্গল। কিছু আবর্জনাও। এদিক ওদিক চোখ ফেরায়। আড়াই বছর আগের দেখা ছবির খুব একটা হেরফের হয়নি। বাড়ির ছাদের জল নামার পাইপটা এখনও ভাঙাই আছে। দেওয়ালের রং বোঝা যায় না। উঠোনের নারকেল গাছটা লম্বায় বেড়েছে মনে হচ্ছে। বাঁদিকে বাড়ির চালটা এখনও টালির। শুধু টালির রং পাল্টে কালো হয়ে গেছে। ওই বাড়ির পাশে জামগাছটা আরও লম্বা ও জমকালো হয়েছে।
সে আবার দরজার সামনে আসে। কোঁচকানো কপালে বিনবিনে ঘাম। এবার দরজায় বেশ জোরে ধাক্কা দেয়। ভেতরের শিকলটা ঝনঝনিয়ে ওঠে। হাট হয়ে খুলে যায় দরজাটা। সেই সঙ্গে কাঁধের কিটস ব্যাগটা হাত গলে নীচে পড়ে। হেঁট হয়ে ব্যাগ তুলতে গিয়ে বুকপকেট থেকে খুচরো পয়সা পড়ে। গড়িয়ে যায় উঠোনে।
বারান্দাটা অচেনা লাগে তার। আড়াই বছর আগে বারান্দায় গ্রিল ছিল না। বাড়ির বাইরের চেহারাটা মোটামুটি একই থাকলেও ভেতরে তা হলে কিছুটা বদলেছে। বাইরেটা বেশি ভাঙাচোরা। ভেতরে সুরক্ষা বেড়েছে, কিংবা সাবধানতা। আড়াইবছর আগে বাইরেটা বেশ সাফসুতরো ছিল। এখন আগাছার জঙ্গল। ঝোপঝাড়। এখন বাড়ির ভেতরটা কি একটু বেশি ছিমছাম লাগছে! ইন্দুও কি বাড়ির ভেতরের মতোই ভেতরে ভেতরে বেশি শক্তপোক্ত হয়ে গেছে আগের চেয়ে! নাকি বাড়ির বাইরেটার মতো...!
আড়াইবছর আগে মায়ের শ্রাদ্ধশান্তি ও ভোজ-কাজ চুকেবুকে যাওয়ার পরদিনই রওনা হয়েছিল সে। যদ্দুর মনে পড়ছে, বেরোনোর সময় ইন্দু দরজার সামনেও দাঁড়ায়নি। মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মুম্বই থেকে এখানে পৌঁছোনোর দিন, রাত্তির বেলায় ইন্দুর সঙ্গে যা কথা হয়েছিল, তাকে অবশ্য কথা না বলে ঝগড়া বলাই ঠিক। বাকি ক’টা দিন ‘হ্যাঁ’ ‘না’ ছাড়া আর কোনও কথাই হয়নি। সে আশা করেছিল যাওয়ার দিন অন্তত কিছু বলবে। কিংবা দরজায় দাঁড়িয়ে...!
দরজা খোলার শব্দ হয়। দরজার সামনে কবিতা। নিমেষের মধ্যে কবিতার মুখের কারিকুরি পালটাতে থাকে। প্রথমে বিরক্তি, তারপর জিজ্ঞাসা, বিস্ময় পেরিয়ে আনন্দের আল্পনায় স্থির হয় — বাবা তুমি! ঘুমের ঘোরে শিকল নাড়ার শব্দ শুনেছি কিন্তু ...! বাইরে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ?
আড়াইবছর।
কবিতার ঠোঁটের ফাঁকে ভোরের শিউলি — বাবার কথাগুলো এখনও আগের মতোই। বেশ মজা করে কথা বলে বাবা।
কী রে গেট খুলবি না! বাইরের লোকের প্রবেশ নিষেধ নাকি?
কবিতা চাবি নিয়ে এসে গ্রিলের দরজা খোলে। উদয়ের চোখে বিস্ময়। তার আদুরে মেয়েকে খুঁজতে চেষ্টা কবিতার মধ্যে — তুমি শাড়ি পড়েছ কেন? ফ্রক নেই, কিংবা সালোয়ার-কামিজ?
হেঁট হয়ে বাবার পা ছোঁয় কবিতা — মায়ের শাড়ি। শখ করে।
আগের মতো মেয়েকে জড়িয়ে বুকে মিশিয়ে নিতে পারে না উদয়। শাড়িটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মেয়ের মাথায় হাত ছোঁয়ায়।
আজ আসবে খবর দাওনি তো? কোন ট্রেনে এলে? এত সকালে? সোজা মুম্বই থেকেই তো নাকি...?
কেন তোর মা বলেনি? আমি তো পাশের বাড়ির ফোনে তোর মাকে ডেকে...! তোর মা কি ঘুমুচ্ছে?
কবিতা উঠোন থেকে সুটকেসটা বারান্দায় নিয়ে আসে — মা জেগেছে। তুমি অনেকদিন পর এলে এবার। আমি তো ভেবেছিলাম...!
বারান্দায় কাঠের চেয়ারে বসে উদয় — হ্যাঁ, ন’শো দশ দিন পর। ভেবেছিলি বাবা নামের লোকটা আর আসবে না বোধহয়!
বাবা, তুমি না...!
কবিতার গলায় জলতরঙ্গ বেজে ওঠে। কাছে এগিয়ে এসে বাবার জানার হাতা ধরে টানে কবিতা। চোখে-মুখে আদুরে কারুকাজ। উদয় মেয়েকে টেনে নিয়ে পিঠে হাত রাখে। এই মাত্র শাড়ির পাক থেকে ছাড়া পেয়ে তার আদরের কবু-মা বেরিয়ে আসে। চেনা দুষ্টু মেয়েটা।
বাবা, তুমি পোশাক বদলে নিয়ে হাত-মুখ ধোও। আমি তোমার জন্য..., এখনও সেই লিকার চা-ই তো! নাকি অভ্যেস বদলেছ?
উদয় জুতোর ফিতে খোলে —ওরে বাবা! তুই তো দেখছি আর মেয়ে নয়, আমার মা হয়ে গেছিস!
বাবার পায়ের মোজা খোলে কবিতা — আমি তোমার মা-ই তো! দেখো না এবার থেকে কেমন শাসন করি!
জামার বোতাম খোলে উদয় — তোর মা-কে ডাক। বল আমি এসেছি।
মা জানে। মা-ই আমাকে জাগিয়ে দিয়ে বলল, তোর বাবা এসেছে মনে হয়, দরজা খুলে দে গিয়ে।
উদয় অন্যমনস্ক হয়ে জামার বোতামগুলো আবার লাগাতে শুরু করেছে। কয়েকদিন ধরে পাশের বাড়ির টেলিফোনে ইন্দুকে পেতে চেয়ে অবশেষে ইন্দুর গলা শুনেছিল। নিস্পৃহ ক’টা কথা — বলো কী বলতে চাও।
তার আসার খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল — ছাড়ছি।
না, ছেড়ো না, শোনো।
আমি তোমার কোনও কথা শুনতে চাই না। তোমার বাড়ি তুমি আসতেই পারো। কিন্তু কোনও জিনিস যেন নিয়ে আসবে না। ছাড়ছি।
বারান্দা-লাগোয়া রান্নাঘরে কেরোসিন স্টোভ ও চায়ের সরঞ্জাম নামিয়েছে কবিতা। বাবার দিকে চোখ যায় তার। কেমন ঘাড় নিচু করে বসে আছে বাবা। শোবার ঘরে চোখ ফেরায় সে। মা এখনও শুয়ে।
বাবা, আমাকে একটু হেলপ করবে?
উদয় চমকে উঠে সোজা হয় — হ্যাঁ। যখন ইংরেজি সাহায্য চাইলি তখন তো করতেই হবে। বল তো মা, কী করব?
কবিতা বেশ শব্দ করে হাসে — স্টোভটা একটু ধরিয়ে দাও না। এটা এখনও ঠিকমতো...।
ব্যস! এইটুকু হেলপ মাত্র! তুই সত্যিই চা বানাতে শিখে গেছিস?
দেখো না, পারি কি না!
উঠোনের কল থেকে সসপ্যানে জল ধরে নিয়ে আসে কবিতা — বাবা! চায়ে চিনি তো কম খেতে। বেড়েছে নাকি?
স্টোভের সোঁ-সোঁ শব্দ। নীলচে শিখা। সসপ্যানটা স্টোভে বসাতে শব্দ কমে।
হ্যাঁরে কবু! তোর তো সব মনে আছে দেখছি। একটু কম করেই দিস। জল কম নিলি কেন? তোর মায়ের জন্যেও নে। তুই খাবি না?
জলে চা-পাতা দিতে তা কেমন ছড়িয়ে যাচ্ছে পুরো পাত্রটাতে। শুকনো। ভেসে আছে। ভিজছে না সহজে।
চা খেলে রং কালো হয়ে যায় — তুমি বলতে না!
সে তো তুই ছোট ছিলি বলে। বড় হয়ে গেলে রং পাকা হয়ে যায়। আর বদলায় না।
সসপ্যানে জল ফুটছে। চা-পাতাগুলো দৌড়োচ্ছে। উপরে-নীচে। ক্রমাগত। উদয়ের মনের অতলের ছবিগুলোও ওপর-নীচ হয়। রান্নাঘরটার বিশেষ হেরফের হয়নি। যেখানে যা ছিল তেমনই আছে। সাঁড়াশিটা ওই পেরেকটাতে আগের মতোই ঝুলছে। মায়ের নির্দেশে ওখানে পেরেকটা সে-ই পুঁতেছিল নোড়ার ঘা মেরে। সে কবেকার কথা। কবিতা যে পিঁড়িতে বসে চা করছে, ওই পিঁড়িতেই মা বসে রান্না করত। পিঁড়িটা বদলায়নি। শুধু মানুষটার বয়স কমে বারো হয়ে গেছে।
বারান্দায় হালকা রোদে গ্রিলের নকশা-ছায়া। দুটো করে ঢ্যাঁড়া, মাঝে একটা গোল। ছোটবেলাকার কাটাকুটি খেলার মতো। কলতলার পাশে লেবুগাছটায় ফুল এসেছে। বোধহয় এই প্রথম ফুল! কবিতা শাড়ির আঁচল দিয়ে সসপ্যানের হাতল ধরে চা ছাঁকছে। গ্রিলে একটা কাক উড়ে এসে বসে ঢ্যাঁরার ওপরে। গোলের মধ্যে দিয়ে মাথা গলায়। পছন্দমতো কিছু পায় না বোধহয়। উড়ে গিয়ে বসে কলের হ্যান্ডেলে।
বারান্দায় গ্রিল কবে লাগানো হয়েছে কে জানে! তাকে জানানো হয়নি। হয়তো দরকার মনে করেনি। খোলা ছিল বারান্দাটা। এখন ঘেরাটোপ। কাকও গলতে পারে না এখন।
বাবা, তুমি এখনও পোশাক পালটালে না! হাতমুখও ধুলে না। চা ঠান্ডা হয়ে যাবে যে!
ও হ্যাঁ, চা দে। পরে হাতমুখ ধোব। তোর মাকে ডাক। চা খাবে।
মা বাসিমুখে চা খায় না। ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে ঢোকে। একবারে চান সেরে বেরোয়। স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নেয়। তারপর চা বানায়। রাতের বাসি রুটি কিংবা দু’মুঠো মুড়ি আর এক কাপ চা খায়। আমিও তাই খাই। তারপর স্কুলের পোশাক পরে একসঙ্গে দু’জনে বেরোই। আজ আমি স্কুলে যাব না।
কবিতার মিষ্টি হাসি উদয়ের মনে বাজনা বাজাতে পারে না।
তোর মা কি তোকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসে?
না না। বছর দেড়েক হল মা একটা বাচ্চাদের স্কুলে পড়াচ্ছে। বেসরকারি। মাইনে খুবই কম। বেশ দূরেও স্কুলটা।
উদয় চা-ভরতি কাপ মেঝেতে নামিয়ে কাপের হ্যান্ডেলে আলতো আঙুলের ঠেলা দেয়। কাপটা আস্তে আস্তে ঘোরে।
নিজের চায়ের কাপ নিয়ে বাবার পাশে এসে বসে কবিতা — বাবা!
বাবার হাতে চায়ের কাপটা তুলে ধরিয়ে দেয় মেয়ে — ওই যে মা উঠেছে। দেখো, সাতসকালে আবার ঝগড়া বাধিয়ে বোসো না।
তুই কি ভাবছিস আমি আড়াইবছর পর চল্লিশ ঘন্টা ট্রেনে-জার্নি করে এলাম ঝগড়া করার জন্য!
কবিতার চাপা গলা — তা নয়, আসলে মা তোমার সঙ্গে...।
জানিস ইচ্ছে করলেও ঝগড়া একা একা করা যায় না।
ইন্দু ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে সোজা বাথরুমের দিকে যাচ্ছে। কবিতা মাথা নিচু করে চায়ের কাপ থেকে অদৃশ্য কোনও ময়লা চামচ দিয়ে তুলতে ব্যস্ত। উদয় ইন্দুর দিকে তাকিয়েছিল ওর কোনও সম্ভাষণ শোনার জন্য। ইন্দু তার সামনে দিয়ে চলে যায়। ওকে আগের চেয়ে অনেকটা রোগা দেখায় যেন! মাথার চুলও যেন বেশ হালকা হয়ে গেছে! এক ঝলক ওর মুখটা চোখে পড়েছে। কেমন ভাবলেশহীন মুখ। ও-মুখে অভিমান রাগ দুঃখ কোনও কিছুরই আভাস পায় না উদয়। উদয়ের চোখে-মুখে সহানুভূতির ছাপ। বাথরুমের দরজাটা বেশ শব্দ করে বন্ধ করে ইন্দু। বাথরুমের ওপাশেই নারকেলগাছটা। কেমন সোজা হয়ে উপরে উঠে গেছে। বারান্দা থেকে গাছের মাথা চোখে পড়ে না। শুধু ঋজু গুঁড়িটা দেখা যায়। আগের চেয়ে গাছটা সরু লাগছে। গাছের গুঁড়িতে কোত্থেকে এক কাঠঠোকরা পাখি এসে বসেছে। লেজের ভরে লাফিয়ে লাফিয়ে পাখিটা গুঁড়িটার চারপাশে ঘুরছে। উদয়ের মুখটা আস্তে আস্তে কঠোর হতে থাকে।
সূর্যের তেজটা এবার বাড়ছে। কিন্তু বারান্দাটাকে তেমনভাবে তাতাতে পারছে না। মাঝে সদ্য ফুল-আসা লেবুগাছটা রোদ্দুরটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে দিচ্ছে।
বাবা, সুটকেসটা নতুন না! কী সুন্দর! আবার দেখছি চাকা লাগানো আছে। কেন বাবা?
এখন চাকাই তো সব রে মা! চাকার ওপর ভর করে পৃথিবী চলছে। চাকা না থাকলেই যে এক জায়গায় বসে যেতে হবে। এখন আর কেউ বসে থাকতে চায় না।
অনেক বড় সুটকেসটা। এত কী আছে ওতে?
উদয় ওঠে — চল দেখবি চল, অনেক কিছু এনেছি তোর জন্য।
সুটকেস খুলতেই একদম ওপরে হলুদ সেলোফেন কাগজে মোড়া টিনের বা’। মেয়ের হাতে দেয় বা’টা –এই নে ‘ঘাসিটারাম হলওয়াই’-এর মিক্সড সুইটস। তোর আর তোর বন্ধুদের জন্য। আর এটা তোর মা আর তোর জন্য কাজু-কতলির স্পেশাল বাক্স।
বারান্দার মেঝেতে একে একে জায়গা নেয় মিডি-স্কার্ট, শাড়ি, পাখি-ডিজাইনের ঘড়ি। হট-পট, ক্যাসারোল, গ্রাইন্ডার-মিক্সার আরও কত কী! উদয় একমনে সুটকেস থেকে জিনিসগুলো বের করছিল। হঠাৎ সে মেয়ের মুখের দিকে তাকায়। মেয়ের চোখে কোনও ভাষা দেখতে পায় না। সে যেন সমস্ত জিনিসগুলোকে একসঙ্গে একদৃষ্টিতে দেখছে কিংবা কিছুই দেখছে না! উদয় মিক্সড সুইটস-এক বাক্সর মোড়ক ছিঁড়ে একটা কাজু বরফি বের করে মেয়ের সামনে ধরে — হাঁ কর। কতদিন তোকে আমি খাওয়াইনি।
বাবার গলাটা কি একটু ধরাধরা লাগল কবিতার কানে! সে বাবার দিকে তাকায়। বাবার চোখে আকুতি না অন্য কিছু!
হাঁ করছি। মুখে দিতে গিয়ে তুমি আবার নিজের মুখে পুরে দেবে না তো? ছোটবেলায় চিনেবাদাম ছাড়িয়ে যেমন...!
উদয় শব্দ করে নিশ্বাস ছাড়ে — হ্যাঁ, আবার যদি সেরকমটা করতে পারতাম!
কেন? আমি বড় হয়ে গেছি বলে, নাকি তুমি বুড়ো হয়ে গেছ বলে?
উদয় মেয়ের মুখে বরফিটা পুরে দেয় — হয়তো এ দুটোর কোনওটাই নয়।
কবিতা চোখ বন্ধ করে বরফি খাচ্ছে। লেবুগাছটার ডালে একটা দোয়েলপাখি উড়ে এসে বসে। বারান্দায় আর রোদ্দুর নেই। সূর্যটা বেশ উঁচুতে উঠে গেছে।
বাবা, আমি তোমাকে চিঠিতে যা আনতে লিখেছিলাম, আনোনি কিন্তু!
আনিনি আবার! তোকে চমকে দেব বলে তোর স্কার্টের ভাঁজে রেখেছি। স্কার্টটা খুলে দেখতে গেলেই...! কিন্তু তুই তো...! তোর বোধহয় স্কার্টটা পছন্দ হয়নি?
খুব পছন্দ হয়েছে।
স্কার্টের প্যাকেটটা টেনে নেয় কবিতা। প্যাকেট খুলে বের করে রঙিন পাথরের একটা মালা।
হ্যাঁরে! এত কম দামি জিনিস আনতে লিখলি তুই! ঝুটো পাথরের মালা। যাই হোক তোর পছন্দ হয়েছে তো?
কবিতার চোখে ঝিলিক — খুব পছন্দ। মায়ের জন্য। মা অবিশ্যি জানে না।
বাইরে লেবুগাছের দোয়েলপাখিটা কখন উড়ে গেছে।
উদয় মেয়েকে কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য মুখ খুলতেই মেয়ে বাবার মুখে হাত চাপা দেয় — বাবা, মা বোধহয় বাথরুম থেকে বেরুচ্ছে। আমি এই জিনিসপত্তরগুলো সরিয়ে রাখি আগে। মা দেখতে পেলেই আবার...। তুমি জানো না, মাকে বলতে শুনেছি, তুমি কোনও জিনিস নিয়ে এলে মা সেগুলো ছুড়ে ফেলে দেবে।
আমি জানি, তোর মা শুধু আমার নিয়ে আসা জিনিস নয়, আমাকেও পছন্দ করে না। কিন্তু আমি এসব তো তোর জন্য এনেছি। তুইও কি মায়ের মতোই...?
বাবা চুপ করো! মা বেরিয়েছে।
ওরে পাগলি! এখন তুই লুকিয়ে রাখলেও পরে তো দেখতে পাবে!
সূর্য বেশ কিছুটা উপরে। লেবুগাছের মাথা ছাড়িয়েছে। বারান্দাটা তেতে উঠেছিল। এখন তা ঠান্ডা হচ্ছে। লেবুগাছের পাতাগুলোর ঝোপে মাকড়সার জাল। সেই শিকার-ধরা জালে একটা ছোট পোকা কীভাবে আটকে পড়েছে। পোকাটার গায়ে এক অস্বচ্ছ আস্তরণ। ক্রমশ পোকাটা নিস্তেজ হয়ে পড়ছে।
কবিতা ত্রস্ত হাতে জিনিসগুলো সরিয়ে রাখছে ঘরের ভিতর খাটের নীচে। ছোটবেলায় সে তার খেলনাপাতিগুলো এভাবেই সরিয়ে রাখত; যখন ওর মা রেগেমেগে ওর দিকে তেড়ে আসত। বাবার নিয়ে আসা জিনিসগুলো ওর নেড়েচেড়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল খুব। কিন্তু মাঝেসাঝে শোনা মায়ের সতর্কবাণীর নামে ঘৃণা-মেশানো কথাগুলো মনের মধ্যে পাক খাচ্ছে। তাই ওকে মায়ের শাসন মেশানো স্নেহকে মর্যাদা দিতে বাবার আকস্মিক উজ্জ্বল স্নেহ অনিচ্ছাসত্ত্বেও দূরে ঠেলতে হচ্ছে। তার বারোবছরের জীবনের অভিজ্ঞতায় সে বুঝেছে বাবার এ উন্মাদ ও হঠকারী ভালোবাসার কোনও মর্যাদা তার মা দেবে না।
দাঁড়াও। জিনিসগুলো ঘরে ঢোকাবে না।
উদয় কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে কিছু বলতে যায়। কিন্তু বলা হয়ে ওঠে না।
তোমাকে টেলিফোনে সেদিন বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও...?
উদয়ের গলায় অসহায়তা ফুটে ওঠে — দেখো ইন্দু! এগুলো আমি কবুর জন্য...!
কবুর জন্য? কবু এসব কী করবে?
ভিজে কাপড়ে ইন্দ্রাণী বারান্দার সামনে উঠোনে দাঁড়িয়ে। ওর গায়ে-মাথায় রোদ পড়েছে। মাথার চুল গড়িয়ে উঠোনে জল পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা। উঠোনে পড়ামাত্র তা সঙ্গে সঙ্গে শুষে নিচ্ছে অনেকদিনের রুখু মাটি।
মা! বাবা এতদিন পর এলো আর তুমি...?
আসতে কে বলেছে? আমি চাই না তোর বাবা আর এখানে আসুক। তার তো এখানে আসার আর কোনও প্রয়োজন নেই।
ছিঃ ইন্দু! মেয়েটা বড় হয়েছে।
সেটা তোমার বোঝা উচিত ছিল।
আচ্ছা! এত দিন পর আমি এলাম। ভাল-মন্দ শুধানো নেই, কিছু নেই। মেয়েটাকে খুশি করার জন্য ক’টা জিনিস এনেছি, তাও তোমার সহ্য হচ্ছে না?
কেন মিথ্যে কথা বলছ? মেয়েকে খুশি করার জন্য ওইসব জিনিস? নাকি...? লজ্জা করে না?
উদয় কোনও কথা বলে না। তার দৃষ্টি নারকেলগাছটার দিকে। কাঠঠোকরা পাখিটা গাছের গায়ে বসে তার শক্ত ঠোঁট দিয়ে ঠোকর মারছে –ঠক-ঠক-ঠক-ঠক-ঠক। গাছটার মধ্যে গর্ত করতে চায় সে। গাছটা বেশ শক্ত। তা ঠোকরের শব্দে বোঝা যায়।
ইন্দুর মুখটা কঠিন হয়ে আছে। কিন্তু গলার স্বর ততোটা কঠিন নয় যেন। গলাটা কি একটু ভেজাভেজা মনে হল, তার সদ্য চান করা ভেজা শরীরটার মতো। হয়তো সে মুখের কাঠিন্যকে ধরে রাখতে সক্ষম হয় না। অথচ উদয়ের চোখে সে পরিবর্তনটা ধরা পড়ুক এটাও চায় না ইন্দু। তাই সে বারান্দা পেরিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ায় — আমার স্কুলের দেরি হয়ে যাবে।
কবিতা কিছুটা ইতস্তত করে অবশিষ্ট জিনিসগুলো খাটের নীচে নিয়ে গিয়ে রাখে। দু’-একবার মায়ের দিকে আড়চোখে দেখে নেয় সে। না, মা দেখছে না। কিংবা দেখেও কিছু বলছে না। স্কুলে যাওয়ার জন্য মা এখন তৈরি হচ্ছে। কবিতার ইচ্ছে করে, মাকে বলে — মা আজ স্কুলে না-ই বা গেলে!
কিন্তু ও তা বলতে পারে না। বলে — মা আমি আজ স্কুলে যাব না।
ইন্দ্রাণীও মনে মনে এটাই ভাবছিল। কবিতা না বললে তাকেই বলতে হত যে, আজ তোকে স্কুলে যেতে হবে না। কিন্তু মুখে বলে — তোমার ইচ্ছা। যদি বোঝো যাওয়ার দরকার নেই, যাবে না। এখন তুমি বড় হয়েছ।
লেবুগাছে দোয়েলপাখিটা আবার এসে বসেছে। দোয়েলটা এখন শিস দিচ্ছে। নারকেলগাছে কাঠঠোকরাটা আর দেখা যাচ্ছে না। অথচ শব্দটা হচ্ছে ঠক-ঠক-ঠক-ঠক। হয়তো পাখিটা গাছের ওপাশে চোখের আড়ালে ঠোকর মেরে চলেছে। তার একটা আস্তানা চাই।
কবিতা বলে — বাবা, তুমি কাপড়জামা ছেড়ে চান করে নাও। আমি তোমার জন্য গোটা কতক রুটি বানিয়ে ফেলি। আমি রুটি গড়তে শিখে গেছি।
উদয় কবিতার কথার কোনও উত্তর দেয় না। হয়তো কবিতার কথা তার কানেও যায়নি। এখন একমনে সে লেবুগাছটায় বসে থাকা দোয়েলটার শিস শুনছে।
দুই
বাবা – বাবা...
নরম মিষ্টি ডাকে ঘুম ভাঙে উদয়ের। সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলতে পারে না। চোখে পশ্চিমের জানলা গলে আলোর বন্যা। উদয় ঘুমের মধ্যে একটা বিশ্রী স্বপ্নের জলে ডুবেছিল। আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। যেন হঠাৎ সন্ধে নেমেছে। প্রচণ্ড একটা ঝড় উঠেছে। সেই ঝড়ে নারকেলগাছটা খুব দুলছে। লেবুগাছটা সেই ঝড়ের ধাক্কা সামলিয়ে উথাল-পাথাল। দোয়েলপাখিটার শিস বন্ধ হয়ে গেছে। সে গাছটার ডাল আঁকড়ে বসে আছে প্রাণপণে। দূরে কোথাও থেকে কবিতার গলা ভেসে আসছে — বাবা, বাবা। উদয় আপ্রাণ চেষ্টা করছে মেয়ের কাছে পৌঁছোতে। কিন্তু পৌঁছোতে পারছে না। তাকে কেউ যেন হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখে দিয়েছে।
ঘুম ভাঙলে দেখে, পশ্চিমের জানলা দিয়ে হলদেটে ম্যাড়ম্যাড়ে রোদ্দুর বিছানায়, বালিশে। পাশে কবিতা দাঁড়িয়ে। উদয়ের মনটা স্থির হতে একটু সময় নেয়। হঠাৎ তার কানে আসে ইন্দুর হিসহিসে গলা — আমার বিছানায় কেন শুয়ে আছে ও? ওকে পাশের ঘরে শুতে বলতে পারিসনি?
বিছানা ছেড়ে ঝটিতে উঠে পড়ে উদয়। কবিতা বাবাকে ওরকমভাবে লাফিয়ে উঠে পড়তে দেখে ভয় পেয়ে যায়। ঝগড়াঝাটি ও একদম সহ্য করতে পারে না। পাশের ঘরে চলে যায়। উদয় গলায় কিছুটা শক্তি জমা করে ইন্দুকে কিছু বলতে উদ্যত হয়। হঠাৎ সে থমকে যায়। ইন্দুর পোশাকে দৃষ্টি আটকে পড়ে। সকালে ইন্দু যখন বেরিয়েছিল তখন ও ছিল বাথরুমে। ইন্দুর এ-পোষাক তাই তখন নজরে পড়েনি। একদম সাদা! শাড়ি ব্লাউজ এমনকী গলায় পুঁতির মালাটাও সাদা। সিঁথিতে চোখ যায়। সামান্য একটু লালের ছোঁয়া আছে, কিংবা নেই ঠিক নজরে আসে না তার। খুব শান্ত গলায় উদয় বলে — ইন্দু! আসলে তুমি কী চাও বলো তো?
কিচ্ছু না। কিচ্ছু চাই না। আমি আমার মতো থাকতে চাই শুধু। তোমার যেমন নিজের ইচ্ছেমতো বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তেমনই আমারও আছে। নোংরা মরাঠি মহিলাকে নিয়ে মুম্বইতে তোমার যেমন আলাদা একটা জগৎ আছে, যেখানে আমরা হানা দিই না। তেমনই আমার মেয়েকে নিয়ে আমারও একটা আলাদা জগৎ আছে। এ-জগতে তোমার প্রবেশ পছন্দ করি না।
মেয়ে কি শুধু তোমারই?
তা কেন হবে! মেয়ে তোমারও, কিন্তু তুমি সে অধিকার হারিয়েছ।
উদয় বিছানা ছেড়ে দু’পা এগিয়ে আসে — ইন্দু, পাগলামি কোরো না। এখানে এসে বোসো। কথা আছে। কবু মা! কবু! কোথায় তুই?
কবিতা পাশের ঘর থেকে দরজায় এসে দাঁড়ায়। ঘরের পরিবেশটা বোঝার চেষ্টা করে সে। উদয় গলায় অনাবশ্যক জোর এনে বলে — আমাদের জন্য একটু চা করে আনবি? ভালই শিখেছিস চা বানাতে।
কবিতা উচ্ছ্বসিত — শুধু তোমাদের জন্য? তোমাদের মেয়ের জন্য নয়!
উদয় বড় বেমানানভাবে জোরে হেসে ওঠে — ও রে বিচ্ছু মেয়ে!
কবিতারও খিলখিল হাসি। উদয়ের কানে বাজে লেবুগাছ থেকে আসা দোয়েলের শিস। সে ভাবে, মেয়ের এমন হাসি কিংবা দোয়েলের শিস কোনওটাই বহুদিন শোনা হয়নি তার।
সূর্যটা এখন বাড়ির পশ্চিমে জামগাছের আড়ালে। জামগাছটার ঝাঁকড়া মাথার ফাঁক গলে এলোমেলো রোদ্দুর এখন বিছানার কিনারায়। ইন্দ্রাণী দরজায় কয়েকপলক দাঁড়িয়ে থাকে। তার মুখে রুক্ষ রেখা। সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেন তার শরীরটাকে টেনে নিয়ে যায় ঘরের ভেতরে। বিছানা থেকে দূরে একটা টুলের উপর বসে। তার দৃষ্টিতে এখুনি একটা হেস্তনেস্ত করে ফেলার ভাষা।
শুনলাম, তুমি দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে আসো। আজ এত দেরি হল যে?
তোমার কাছে কি জবাবদিহি করতে হবে?
না, তা নয়...!
তবে তোমার এটা জানা কি খুব প্রয়োজন যে এতক্ষণ আমি কোথায় ছিলাম?
ছিঃ ইন্দু! তুমি একটু সহজ হতে পারছ না।
সহজ হওয়ার মতো সহজ হিসেব আমার জানা নেই।
উদয় সরাসরি ইন্দুর চোখে চোখ রাখে। ইন্দু চোখ নামায় না। বাইরে রান্নাঘরে স্টোভের সোঁ-সোঁ শব্দ। চামচ-কাপের টুংটাং। ঘরের দেওয়ালে একটা টিকটিকি।
দেখো ইন্দু! বহুদিন পর মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য আসি। এই ক’টা দিন অন্তত তোমার কাছে ভালো ব্যবহার আশা করতে পারি!
ইন্দুর দৃষ্টি এখন জানলার বাইরে জামগাছের পাতায়। সে নিরুত্তর। উদয়ের কথাগুলো শুনেছে কিনা বোঝা যায় না।
আমি জানি, তোমাদের প্রতি আমার কর্তব্য আমি ঠিকমতো পালন করতে পারি না। শুধু টাকা পাঠিয়েই সবকিছু...।
তোমার পাঠানো সমস্ত টাকা তোমার বইয়ে জমা আছে। তুলে নিয়ে যেতে পারো।
উদয় ইন্দুকে মাথা থেকে পা অবধি দেখতে থাকে। ইন্দু উঠে দাঁড়ায় — তোমার আর কিছু বলার আছে?
উদয় পশ্চিমের জানলার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে। ওর পিছনে আলো। মুখটাতে অন্ধকার –দেখো ইন্দু, তুমি আমাকে ভুল বুঝছ। বিশ্বাস করো...।
ইন্দুর বাঁকা ঠোঁটে ঘৃণা ও চোখে রাগের ছাপ — বিশ্বাস? তোমাকে? হ্যাঁ, ভুল তো সত্যিই বুঝেছি তোমাকে। ঠিকটা তখন বুঝতে পারলে আজ আমার জীবনের এই দশা হত না। তোমার হাত ধরে রাস্তায় বেরোবার আগে যদি ঠিকটা বুঝতাম, তা হলে...।
তা হলে কী করতে? অন্য কারও সঙ্গে ... সে তো তুমি এখনও পারো। যা শুনেছি...!
কী শুনেছ তুমি?
তা শুনতে কি তোমার ভাল লাগবে?
নিজের মতো সবাইকে ভেবো না, সবাই সবকিছু পারে না, তুমি পারো এই বয়সে মরাঠি মেয়ের সঙ্গে...ছিঃ!
‘ছিঃ’ কথাটার সঙ্গে ইন্দুর মনের সমস্ত ঘৃণা ঝরে পড়ে যেন!
তোমাকে তো এই গাঁয়ের সমাজ মেনে চলতে হয় না, আমাকে হয়। তোমার কোনও পিছুটান না থাকতে পারে, আমার আছে। কবিতা বড় হয়েছে। বুঝতে শিখেছে। আসলে অনেক দেরি হয়ে গেছে আমার তোমাকে বুঝতে।
ইন্দুর গলা ধরে যায়। চোখে হেমন্তের কুয়াশা।
কবিতা একটা থালাতে তিন কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢোকে। ঘরের ভেতরে কোনও শব্দ নেই। বাবা জানলার বাইরে তাকিয়ে। মা নীরবে কাঁদছে যেন! কবিতা মেঝেতে চায়ের থালা নামায়। কোনও কথা বলে না। আবার বাইরে বেরিয়ে যায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে ভেবে ঠিক করতে চেষ্টা করে মায়ের কান্নার অনেক কারণের মধ্যে সঠিক কারণ কোনটা। ও জানে ওর কোনও কথা এখানে খাটবে না। ওরা এখন যে-অন্ধকারে ডুবে আছে, সেখানে আলো ফেলতে হলে যতটা আলোর দরকার তা এখনও সে সঞ্চয় করতে পারেনি। তবে হতাশার ছাপও নেই কবিতার মধ্যে। তার বারো বছর বয়সের মধ্যেই সে বুঝে গেছে, সংসারের এই আলো-আঁধারের খেলাটাকে ইচ্ছে করলেও সমস্তটাই আলোয় ভরানো যায় না। আঁধার কিছুটা থেকেই যায়। এই মুহূর্তে সে বাবার উপর বীতশ্রদ্ধ হয়। তাদের সাদামাটা জীবনটা বাবা এসে কেমন সব ওলটপালট করে দিল। কবিতা মায়ের জন্য কষ্ট অনুভব করে। ঘরে ঢুকে সে মায়ের কাছে গিয়ে বসে। মায়ের হাঁটুর ওপর হাত রাখে। মেয়ের হাতের উপর মা তার হাত দুটো রাখে। হয়তো অবলম্বন পেতেই। উপরের হাতদুটো আস্তে আস্তে নীচের হাতটাকে মুঠো করে ধরে। হাতের উপর চাপটা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
মা, চা ঠান্ডা হচ্ছে যে!
উদয় যেন একক্ষণ ঘরের বাইরে ছিল। জোর করে নিজেকে ঘরের মধ্যে নিয়ে আসে — কবু মা! আমাকে চা দিবি না?
বাবার গলাটা কি খুব করুণ শোনাল! তার বুকটাতে তবে হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল কেন? কবিতা উঠে বাবার হাতে চায়ের কাপ ধরায়। মায়ের হাতে কাপটা না দিয়ে সামনে ধরে থাকে। মা তার এত কাছে, অথচ তার মনে হচ্ছে মা কত দূরে! দূরত্ব কমাতে সে বলে — মা, আজ দুপুরে তোমার খাওয়া হয়নি বোধহয়; চারটি মুড়ি আনব বাটিতে?
ইন্দু ঘাড় নাড়ে দু’দিকে।
বাবা, তুমি মুড়ি খাবে?
না রে মা, দুপুরে যা খাইয়েছিস...!
তবে শিগগির চা খেয়ে নাও। তারপর তোমাকে আমাদের বাগান দেখাব।
ইন্দু কবিতার হাত থেকে চায়ের কাপ নেয়। একটু চুমুক দিয়ে হঠাৎ উদয়ের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় — তুমি কি কালই চলে যাবে, না পরশু?
উদয় ইন্দুর মুখের দিকে তাকায়। প্রশ্নটার ভিতরের কথাটা বোঝার চেষ্টা করে। তারপর বেশ বলিষ্ঠভাবে বলে — আমি আর যাব না।
তিন
বাবার হাত ধরে মেয়ে বাগানের দিকে যাচ্ছে। ওদের গায়ে তামাটে রোদ। ইন্দ্রাণী ঘরের মধ্যে থেকে ওদেরকে দেখতে থাকে। ঘরের মধ্যে হালকা অন্ধকার। সেই অন্ধকারে ইন্দ্রাণীর সাদা ধবধবে পোশাক কিছুটা আলো ছড়াচ্ছে। তার মনের মধ্যে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা। অনেকদিন আগে যেমন দৃশ্যগুলো সে দেখতে অভ্যস্ত ছিল আজ আবার সেই দৃশ্য চোখে ভাসছে তার। বাবার সঙ্গে মেয়ে বাগানে। এমন সময় সে বাগানের পাশে পুকুরঘাট থেকে গা ধুয়ে ভিজে কাপড়ে ফিরত। বাগান থেকে উদয় বলত, 'একবারটি দাঁড়াও না ইন্দু! তোমাকে একটু ভাল করে দেখি, অনেকদিন পর পর তো তোমাকে এ-রূপে দেখার সৌভাগ্য হয়!'
ইন্দু চোখ পাকিয়ে চলে আসত। উঠোনে দাঁড়িয়ে আবার ঘুরে দেখত মানুষটাকে। আজ উদয় মেয়ের হাত ধরে এগোচ্ছে। পিছনে ঘাড় ঘোড়াচ্ছে না। অথচ সে...! দৃশ্যটা কেন যে আর আগের মতো হয় না!
হ্যাঁরে কবু! তোদের বাগানে কী কী ফুল আছে?
কোনও ফুল নেই।
সে কী! বাগান, অথচ ফুল নেই কেন?
আমাদের বাগানে আছে লঙ্কাগাছ, বরবটিগাছ, পেঁপেগাছ এইসব।
বাঃ বাঃ বেশ! সবজির বাগান। তা গাছগুলোর যত্ন নেয় কে? কোনও ঠিকে মুনিশটুনিশ আছে নাকি?
কবিতা হেসে ওঠে — এইটুকু বাগানের জন্য আবার মুনিশ! মা আর আমি দু’জনে এগুলো বসিয়েছি। রোজ বিকেলে জল দিই আমি। দাঁড়াও, আমি জল দেওয়ার ঝাড়িটা নিয়ে আসি।
কবিতা ঝারি নিয়ে এলে উদয় ওর হাত থেকে ঝারি নিয়ে গাছগুলোতে জল দিতে থাকে। গাছগুলো জল পেয়ে কেমন সতেজ হয়ে ওঠে। উদয়কে যেন গাছে জল দেওয়ার নেশায় পেয়ে বসে। প্রত্যেকটা গাছকে সে চান করিয়ে দিচ্ছে যেন! কবিতা বাবার ছেলেমানুষি লক্ষ করছে ঘুরে ঘুরে। সে হঠাৎ বলে — বাবা, তুমি মা-কে বললে আর যাবে না। সত্যিই যাবে না তো?
কেন, আমি গেলে বুঝি তোর সুবিধে হয়?
ধ্যাত! তুমি না...! তুমি আর না গেলেই ভাল হয়।
কিন্তু আমাকে তোর মা থাকতে দেবে না যে!
সে মাকে আমি বুঝিয়ে বলব’খন।
না রে পাগলি, আমি কাল সকালেই চলে যাব।
তবে তুমি মা-কে মিথ্যে বললে কেন?
উদয় ঝারি রেখে গাছগুলোর দিকে চেয়ে থাকে — তোর মা-ও যে মিথ্যে কথা বলে।
কবিতা গাছের গোড়ায় মাটি দিতে থাকে — না, মা মিথ্যে বলে না।
তা যদি না-ই বলে তবে কান্না ..., সে তুই বুঝবি না রে পাগলি মেয়ে!
বাগান থেকে নারকেলগাছে তাকিয়ে উদয় খুঁজতে চেষ্টা করে কাঠঠোকরা কোনও গর্ত করতে পেরেছে কি না! কিন্তু কোনও গর্ত চোখে পড়ে না।
ইন্দ্রাণী বাথরুম থেকে গা ধুয়ে আসে। পোশাক পালটাতে গিয়ে দেখে খাটের নীচে উদয়ের আনা জিনিসগুলো। প্যাকেট খোলা। এলোমেলো। দুপুরে বাবা ঘুমোলে কবিতা নাড়াচাড়া করে দেখেছে ওগুলো। অন্য কোথাও জিনিসগুলো উঠিয়ে রাখতে সাহস পায়নি। ইন্দ্রাণী জিনিসগুলো দেখে দপ করে জ্বলে ওঠে। কিন্তু ওগুলো হঠিয়ে দিয়ে কিংবা সুটকেসে ঢুকিয়ে দিতেও ইচ্ছে করে না। খাটের নীচেই জিনিসগুলো বড় অসহায়ভাবে পড়ে থেকে যেন ওকে আরও রাগিয়ে তোলে।
‘আমি আর যাব না’ — এ-কথাটা ইন্দ্রাণীর মনে ফড়িংয়ের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। সত্যিই কি ও আর মুম্বইয়ে ফিরে যাবে না! নাকি তার মন বুঝতে মিথ্যে বলেছে সে! যাবে না তা কী করে হয়! সেই নচ্ছার মহিলার সুখের ঘর-সংসার তা হলে ভেসে যাবে যে! এতদিনে একটা ছেলেমেয়েও কি হয়নি? তারও তো একটা টান আছে নাকি! উদয়ের ওপর এই মুহূর্তে ওর মন বড় বেশি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ঘরের মেঝেয় উদয়ের সুটকেসটা। ইন্দ্রাণী ওটাকেও যেন চোখের সামনে সহ্য করতে পারছে না। চাপা রাগে সে সুটকেসটাকেই একটা ঠেলা দেয়। সুটকেসের নীচে চাকা লাগানো থাকায় অনেকটা গড়িয়ে যায় ওটা। খাটের বাজুতে গিয়ে ধাক্কা লেগে খুলে যায় সুটকেসটা। জিনিসপত্র সব মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে। ইন্দ্রাণী অপ্রস্তুত। এমনটা হবে ভাবেনি। জিনিসগুলোয় হাত দিতে ইতস্তত করে। যেন পরের জিনিসে অনধিকার ছোঁয়া। কিন্তু এগুলো এভাবে পড়ে থাকাটাও অস্বস্তিকর। কবুটাও ঘরে নেই। বাবা-আদেখলা মেয়ে এখন বাবা পেয়েছে। তবুও বাবা যদি ‘বাবা’র মতো হত! কিছুক্ষণ বসে থেকে, মেঝেয় পড়া প্যান্ট-শার্ট, শেভিং-বক্স এসব সুটকেসে ভরতে থাকে সে। হঠাৎ নজরে পড়ে একটা লাল রংয়ের ছোট বাক্স। ওটা ধরতে গিয়েও হাত সরিয়ে নেয়, নাঃ, যা আছে থাক। দেখার কী দরকার! কিন্তু তার দারুণ কৌতূহলও চাপতে পারে না। বাক্সটা খোলে। ঝিকমিকিয়ে ওঠে একটা জড়োয়া নেকলেস। মেয়ের জন্যে? তা হলে সারা দিনের মধ্যে মেয়েকে দিতে পারত। তবে কি...? না-না অসম্ভব! স্বামীর অধিকার নিয়ে ওকে মিথ্যে কথায় ভোলাতে চায়। জড়োয়া নেকলেস উপহার দিয়ে তার মন পেতে চায়। এত খেলো ভাবে তাকে! সামান্য গয়নার লোভ দেখিয়ে তার শরীরটাতে দখল নিতে চায়! এত নীচ, এত পাষণ্ড লোকটা! সুটকেসে জিনিসগুলো কোনওরকমে ভরে ঝপ করে বন্ধ করে। যেন সুটকেসে কেউটে সাপ আছে! বন্ধ করেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
আকাশে লালচে আভাটাও কখন বিদায় নিয়েছে। দূরে গাছগুলোতে হালকা ধোঁয়া। বাগানে গাছের পাতাগুলো ধীরে ধীরে কালো হচ্ছে। বাবার মুখের ভাঁজগুলো আর তেমন স্পষ্ট হচ্ছে না কবিতার চোখে। গা-শিরশির করা হালকা বাতাস বইছে। কবিতা বলে — বাবা, ঘরে চলো এবার। মা একা আছে ঘরে।
হ্যাঁ রে, তোর মা সত্যিই বড় একা। চল ঘরেই যাই। তার আগে সত্যি করে বল তো মা, রঙিন পাথরের মালাটা তোর জন্য আনতে লিখেছিলি, না মায়ের জন্য?
কবিতা মুচকি হেসে এমনভাবে ঘাড় নাড়ে যার অর্থ উদয়ের কাছে বোধগম্য হয় না।
ইন্দ্রাণী অন্ধকার ঘরের মেঝেতে বসে আছে। তার মনের রাগ-দুঃখ-অভিমান সব গলে জল হয়ে ঝরে গছে। এখন সে কেমন উদাস হয়ে বাইরে আঁধার-জড়ানো লেবুগাছটার দিকে চেয়ে আছে। উদয় ও কবিতা বারান্দায় পা রাখতেই ইন্দ্রাণী নিজের মধ্যে নিজেকে ফিরে পায়।
মা, আলো জ্বালোনি কেন? অন্ধকার নেমেছে।
এই জ্বালছি।
উদয় বাথরুমে ঢোকে। অন্ধকারের মধ্যে আন্দাজে হাত বাড়িয়ে সুইচটা ঠিক জায়গাতেই পেয়ে যায়। প্রায় কুড়ি বছর সুইচ জায়গা বদল করেনি। হয়তো বা বদলায়নি সুইচটাও। আলো জ্বলে উঠতেই চোখে পড়ে কাঠের তাকে তেল, সাবান, টুথ পাউডারের কৌটো। আশেপাশে কয়েকটা আরশোলা। দড়িতে ঝোলানো সায়া, অন্তর্বাস, গামছা। ওর খুব ইচ্ছে করে অন্তর্বাসটা ছুঁয়ে দেখতে। কিন্তু হাত বাড়াতে গিয়েও হাত সরিয়ে নেয়। কেমন যেন অবৈধ-ছোঁয়া মনে হয় এটা তার কাছে। বাথরুমের দেওয়ালে পেরেকে ঝোলানো একটা কমদামি আয়না। আগে ছিল না। জলের দাগে আয়নার কাচ ঝাপসা। উদয় ভেজা হাত ঘষে আয়নাটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। আয়নার সামনে দাঁড়ায়। মুখে তিন দিনের দাড়ি। বেশির ভাগই সাদা। চোখ দুটো অচেনা লাগে। মুখে ভাঁজগুলো এত স্পষ্ট ছিল কিনা ভাবতে চেষ্টা করে। মনের মধ্যে ভেসে ওঠে ইন্দুর মুখ। হঠাৎ সে দড়ি থেকে ইন্দুর অন্তর্বাসটা টেনে নেয় এমনভাবে, যেন উড়ন্ত পাখি ধরল। তারপর সেটাকে দলে-মুচড়ে তার মধ্যে মুখ গুঁজে দেয়।
চার
আকাশে কানা-ভাঙা রুপোলি চাঁদ। দূরে ছিঁটেফোঁটা কয়েকটা তারা। বেশ হিম পড়েছে সন্ধে থেকে। ছাদের আলসেতে ঠেস দেবে বলে একটু সরে বসতে গিয়ে উদয় দেখে মাদুরটা স্যাঁতস্যেঁতে হয়ে গেছে। বোতলের তলানিটুকু গ্লাসে ঢেলে নিয়ে বোতলটা পাশে পড়ে থাকা কিটস ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে সে। গ্লাসের পানীয়তে কিছুটা জল মিশিয়ে একটা লম্বা চুমুক দেয়। দূরে দৃষ্টি ছুড়তেই নারকেলগাছটাতে তা আটকে পড়ে। গাছটা লম্বায় বেড়েছে। আগে ছাদ থেকে গাছটার মাথায় সদ্য-গজানো পাতাগুলো নজরে পড়ত। এখন আর দেখা যায় না। গাছের লম্বা মসৃণ পাতায় চাঁদের আলো পড়ে চকচক করছে। হালকা হাওয়ায় থিরথির করে কাঁপছে পাতাগুলো। গ্লাসের অবশিষ্টটুকু গলায় ঢেলে নিয়ে সিগারেট ধরায় উদয়। এটা তার নৈমিত্তিক ব্যাপার। মুম্বইতে এম.ভি শিপিং প্রাইভেট লিমিটেডের চাকরিতে ঢোকার পর এ জিনিসটাতে সে ক্রমশ আসক্ত হয়ে পড়েছে। ইন্দ্রাণীর চোখে এটা খারাপ লাগলেও উদয়ের কখনও মনে হয়নি এটা বদভ্যাস। ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টাও করেনি। প্রতিদিন দাঁতে ব্রাশ করে, বাথরুমে যাওয়া, চা খাওয়া, খাবার খাওয়ার মতো এই পানপর্বটাও নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে চা, জল কিংবা অন্যান্য পানীয় পান করে যেমন কোনও শারীরিক বা মানসিক বৈকল্য চোখে পড়ে না, এ-পানীয় পান করেও সে স্বাভাবিকই থাকে।
কবিতা এর মধ্যে মায়ের চোখ এড়িয়ে ছাদে কয়েকবার উঁকি দিয়ে গেছে। বাবাকেও জানান দেয়নি অবশ্য। প্রায় ঘন্টা চারেক হল বাবা ছাদে। কার্তিকের শেষে হালকা শীতের ছোঁয়া। বাবা খালি একটা গেঞ্জি গায়ে রয়েছে। কবিতার মনটা উসখুস করছে — মা! রান্না তো হয়ে গেছে। রাতও অনেকটা হল। বাবাকে এবার নীচে ডাকব? একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া হবে।
ইন্দ্রাণীর মনের মধ্যে একটা আগুন এতক্ষণ ধোঁয়াচ্ছিল। মেয়ের কথার ফুঁয়ে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন — সারারাত পড়ে থাক ছাদে। তোমাকে আদিখ্যেতা করতে হবে না! তুমি চারটি গিলে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করো।
কবিতা হকচকিয়ে যায়। সে ভেবেছিল বিকেলে মায়ের কান্নাকাটির মধ্যে দিয়ে বাবার সঙ্গে নিশ্চয় একটা বোঝাপড়া হয়ে গেছে। মায়ের চার-পাঁচ রকম রান্না করা দেখে এ-ধারণাটা আরও মজবুত হচ্ছিল। অথচ মা...! ও মাকে বেশি ঘাঁটাতে সাহস পায় না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও একা একা রাতের খাবার খেয়ে বিছানা নেয়। ঘুম আসে না।
ইন্দ্রাণী বারান্দায় হাঁটু মুড়ে বসে। তার চোখ নির্দিষ্টভাবে কিছুই দেখছে না। স্থির চোখে দূরে তাকিয়ে সে। মন চলে গেছে ষোলো-সতেরো বছর আগের এক সন্ধেবেলায়। সেদিনও এমনই জোছনা-ঢালা আকাশ। নদীর ধার। জলের চাঁদটা গলে গলেও ফুরোচ্ছে না। পাশেই কাশফুলগুলো চাঁদের আলো শুষে নিয়ে তাকে শতধারায় ছড়াচ্ছে। ওদের দু’জনকে আকাশের চাঁদ ছাড়া আর কেউ দেখছে না। উদয়ের হাতের মুঠোয় ইন্দুর একটা হাত ঘেমে আরও নরম হচ্ছে। অন্য হাতে ঘাসের ডাঁটি চিবোতে চিবোতে গলায় বীণা বাজে, 'তুমি কথা দাও কোনওদিন আমাকে ভুলে যাবে না।' বীণার সঙ্গে তবলার সঙ্গত, 'সামনে এই বয়ে যাওয়া নদী, পাশের কাশফুলের ঝাড়কে সাক্ষী মেনে তোমার হাতের অনামিকা ছুঁয়ে বলছি, তোমাকে কোনওদিন ভুলব না। তুমিও কথা দাও, যত ঝড়ঝাপটা আসুক আমরা দু’জনে বুক পেতে সামাল দেব।' বীণার রিনরিন, 'কথা দিলাম।'
বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ইন্দ্রাণী ভাঙা চাঁদের দিকে তাকায়। চাঁদটা যেন তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসছে! ইন্দ্রাণী লজ্জায় চাঁদ থেকে চোখ নামিয়ে নেয়। চোখ পড়ে কলতলায় জমে থাকা জলে। সেখানেও চাঁদ কেঁপে কেঁপে হাসছে, যেন অট্টহাসি। চোখ লাফিয়ে সরে আসে লেবুগাছে। থোকা থোকা আঁধার জমে আছে গাছটায়। ইন্দ্রাণী ওঠে। ঘরে বিছানায় উঁকি দেয়। মেয়েটা কেমন গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। মুখটা অন্ধকার। ঘুমিয়েছে কিনা বোঝা যায় না। কিন্তু জানলা দিয়ে গলানো রূপো মেয়ের পিঠে লুটোপুটি। ইন্দ্রাণী ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে। মেয়ের গায়ে-মাথায় আলতো হাত বোলায়। মনে লেবুগাছের কাঁটা ফোটে, অকারণ মেয়েটাকে বকল সে! ওর কী দোষ! এতদিন পর বাবা এসেছে! বারো বছর বয়স, কতটুকুই বা বোঝে! মেয়ে পাশ ফেরে। এখন তার মুখে আলোর বন্যা। মেয়েকে ঠিকঠাক শুইয়ে দিয়ে পাতলা চাদর ঢাকা দেয় মেয়ের গায়ে।
হিমঝরা রাতে মানুষটা ছাদে একা। ইন্দ্রাণীর মনে করুণা, নাকি মমতা! সেই সন্ধেবেলায় ছাইপাঁশ নিয়ে ছাদে উঠেছে। নামেও তো না! ওখানেই ঘুমিয়ে গেল নাকি? কিংবা বেশি খেয়ে...? না, তেমন তো কোনওদিন হতে দেখিনি। পাশের ঘরে ইন্দ্রাণী বিছানা পাতে। তারপর আস্তে আস্তে ছাদে যায়।
মানুষটা মড়ার মতো শুয়ে আছে। নারকেলগাছের ওপাশে চাঁদ। নারকেলপাতার ছায়া উদয়ের শরীরে নড়ছে চড়ছে। ওই শরীরটা একসময় কত চেনা ছিল! মানুষটাও। ইন্দ্রাণী হালকা পায়ে উদয়ের কাছাকাছি।
এসো ইন্দু, এসো!
চমকে ওঠে ইন্দু — তুমি...?
ঘুমোইনি। তোমার অপেক্ষায়।
উদয় উঠে বসে — না, তোমার দুশ্চিন্তার কারণ নেই। অন্য কোনও মতলব নেই আমার। শুধু কয়েকটা জরুরি কথা তোমায় বলবার জন্য। মেয়ের সামনে তো সবকিছু বলা যায় না। বসো।
ইন্দ্রাণী বসে না — অনেক রাত হয়েছে নীচে চলো।
উদয়ের মুখে ক্ষীণ হাসির রেখা — আমি তো অনেক নীচেই আছি। আর না-ই বা নামলাম! তোমায় বেশিক্ষণ বসতে হবে না। শুধু তোমাকে জানানোর দরকার মনে করেছি কয়েকটা কথা। যদি শুনতে চাও!
ইন্দ্রাণী মাদুরে বসে। মাদুরটা স্যাঁতসেঁতে। ইন্দ্রাণীর মনটাও হয়তো বা! উদয় ঝাঁকড়া জামগাছের দিকে তাকিয়ে বলে — আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। মুম্বইয়ে আর থাকা যাচ্ছে না। যাওয়ারও ইচ্ছে নেই।
ইন্দ্রাণী কোনও কথা বলে না। কিন্তু তার চোখে-মুখে প্রশ্ন ফুটে ওঠে — কেন?
কারণ আমি ও আমার মতো অনেক হতভাগা এখন ওখানে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ছাড়া আর কিছু নয়! আমার নামটাও নাকি আসল নয়! শেখ, খান বা মহম্মদ থেকে নাম ভাঁড়িয়ে মুম্বইয়ে আছি। দেশে থেকেও আমাকে প্রমাণ করতে হবে আমি ভারতীয়। সে চেষ্টা বা ইচ্ছে কোনওটাই আমার নেই। যাক গে, ওসব কথা তোমার না শুনলেও চলবে। তোমাকে যে-কথাটা শোনাতে চাই তা হল, চাকরি ছেড়ে দিয়ে কোম্পানি থেকে এককালীন কিছু টাকা আমি পেয়েছি। জানি, ও টাকা তুমি নিতে চাইবে না। তোমাকে নিতেও বলছি না। কিন্তু মেয়েকে নিতে বাধা দিয়ো না। ওর সারা জীবনটাই পড়ে আছে। লাখ চারেক টাকার ব্যাঙ্ক ড্রাফট করা আছে ওর নামে। ব্যাঙ্কে ওর একটা বই করে ড্রাফটা জমা দিয়ো। ওর লেখাপড়া, বিয়ে এসবের জন্য দরকার লাগবে।
ইন্দ্রাণী মুখ খোলে — তোমার হঠাৎ এ-ধারণা হল কী করে যে, কবুর লেখাপড়া কিংবা বিয়ের টাকা আমি জোটাতে পারব না, তোমার ভিক্ষে নিতে হবে?
উদয় ইন্দ্রাণীর দিকে স্থির চোখে তাকায় — ভিক্ষে না ভেবে উপহার ভেবেও টাকাটা রাখতে পারো। তা ছাড়া ও আমার মেয়ে। ওর তো এ-টাকাতে অধিকার আছে।
তোমার ওখানকার সংসারে নিশ্চয় ছেলেপুলে হয়েছে! তাকে দিয়ো।
ইন্দু!
উদয় এখানে আসার পর থেকে এই প্রথম জোরে কথা বলল — তুমি কী ভাবো বলো তো? কবু শুধু তোমার মেয়ে নয়, আমারও মেয়ে। ওর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তার অধিকার আমারও আছে। আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ আমি অনিশ্চিতের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না। একটা স্কুলে পড়িয়ে কত টাকা তুমি রোজগার করো যে, এত দেমাক দেখাচ্ছ! আমি যা টাকা পাঠিয়েছি, তা তুমি জেদ করে খরচ না করে আমার মেয়েকে কষ্টে রেখেছো। মেয়ের পোশাক কিনে দেওয়ার ক্ষমতা নেই, তোমার শাড়ি পরিয়ে রাখো। ভাল জুতো নেই, মোজা নেই। কেন? তোমার জেদের জন্য কেন আমার মেয়ে কষ্টে থাকবে?
মেয়ের জন্য দরদ উথলে উঠছে দেখছি! তোমার যদি মনে হয় মেয়ে কষ্টে আছে, তা হলে মেয়েকে নিয়ে যেতে পারো, আমার রাস্তা আমি খুঁজে নেব।
তোমার রাস্তা খুঁজে নেওয়া বলতে তো হয় রেল লাইন, নয় নদীর জল। আর মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছ, মেয়েকে আমি নিয়েই যেতাম। শুধু তোমার একা হয়ে যাওয়ার কথা ভেবে নিয়ে যাইনি। কারণ তোমাকে মুম্বইয়ে নিয়ে যেতে চাইলেও তুমি এই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে যেতে রাজি হওনি, তাই বাধ্য হয়ে আমাকে একা কাটাতে হচ্ছে।
একা কাটাচ্ছ? কেন? তোমার মরাঠি বউ?
মরাঠি বউ নয়, বড়জোর মরাঠি মহিলা বলতে পারো। কারণ তাকে আমি বিয়েও করিনি, আর সে আমার সঙ্গে থাকেও না।
তা হলে যা শুনেছি তা কি মিথ্যে?
মিথ্যে-সত্যি যা-খুশি ভাবতে পারো। প্রয়োজনে তোমার সেই মাসতুতো ভাই, যে এসব খবর দিয়ে তোমার উপকার করেছিল, তার কাছে জেনে নিতে পারো। যা ঘটনা সেটাই বলছি আমি। এক মহিলার সঙ্গে একটু মাখামাখি হয়েছিল তাও অস্বীকার করিনি। আড়াইবছর আগে মায়ের কাজকর্ম সেরে মুম্বইয়ে ফিরে গিয়ে দেখি সে নেই। আমার ঘরের জিনিসপত্রও উধাও। তারপর তার আর কোনও খোঁজ করিনি।
উদয় মাদুরে চিৎপাত হয়ে শোয়। তার চোখ দুটো বোজা। একটা হাত কপালে। ওদের খুব কাছ দিয়ে একটা রাতচরা পাখি উড়ে যায়। চাঁদটা নারকেলগাছ ছাড়িয়ে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। পাথর-রঙা আকাশে বড় নিঃসঙ্গ চাঁদটা। হাওয়ার বেগ বেড়েছে। নারকেল পাতাগুলো থরথর করে কাঁপছে। পিছনে জামগাছে ঝুপঝুপে অন্ধকার থেকে একটানা ঝিঁঝির ডাক।
ইন্দ্রাণী হঠাৎ বলে ওঠে — তা হলে সেই শয়তানি ভেগেছে বলেই এখানে ঠেক নিতে এসেছ। বউ মেয়ের ওপর সোহাগ দেখাতে নয়, দখল নিতে!
উদয় নিরুত্তর। সে যেন কথাটা শুনতেই পায়নি।
ইন্দ্রাণী উদয়ের বন্ধ চোখের দিকে তাকায় — ঠিক আছে, দখল নিতেই যদি এলে তবে আড়াইবছর পর কেন? এতদিন কি আর কারও সন্ধানে ছিলে?
উদয় হঠাৎ তড়াক করে উঠে বসে — চুপ করো! লম্বা-চওড়া কথা বোলো না। আমি কিছু জানি না মনে করো? কিছুই শুনিনি আমি? তোমার সেই মাসতুতো ভাই এখান থেকে গিয়ে আমাকে সব বলেছে। কী করে তোমার স্কুলে চাকরি হল, এ চাকরি পাওয়ার পেছনে তোমার পিরিতের যতীনদা'র হাত কতখানি আমি জানি না! মনে করে দেখো, আমি এখান থেকে যাওয়ার মাস তিনেক পরেই চিঠিতে লিখেছিলাম, মেয়েকে নিয়ে মুম্বইয়ে চলে যাওয়ার জন্য তোমার ভাইয়ের সঙ্গে। তুমি যেতে রাজি হওনি। কেন যেতে চাওনি সেটা আমার চেয়ে তুমি ভাল জানো। আমি ওপরে তির ছুড়তে চাইনি, তিরটা ফিরে এসে নিজের গায়েই বিঁধবে বলে। মনকে এই বলে বোঝ দিয়েছি, আমিও তো ধোয়া জবাফুল নই!
ইন্দ্রাণী যেন ব্রোঞ্জমূর্তি! ওর দেহে প্রাণ আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। উদয় কিছুক্ষণ চুপচাপ! তারপর হঠাৎ বলে ওঠে — কী! মুখে কথা নেই কেন এখন? আমি খুঁচিয়ে ঘা করতে চাইনি। তুমি বাধ্য করলে আমায় মুখ খুলতে। আমি চেয়েছিলাম আবার...!
ইন্দ্রাণী বিড়বিড় করে। নিজের মনেই যেন বলতে থাকে — তুমি আমার চেয়ে আমার ভাইকে বেশি বিশ্বাস করো? তার কথাটাই...। ইন্দ্রাণীর গলা দিয়ে আর কোনও কথা বেরোয় না। হু-হু শব্দ করে কেঁদে ওঠে সে।
ঝাঁকড়া জামগাছে ঝিঁঝির ডাক হঠাৎ থেমে গেছে। থেমে গেছে হাওয়া। নারকেল গাছের পাতাগুলো এখন স্থির। যেন গাছটা স্থিরচিত্র ধোঁয়া রঙের ক্যানভাসে। উদয় চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছে স্যাঁতসেঁতে মাদুরে। চোখ বন্ধ। ওর মন এখন এই বাড়ি, নারকেলগাছ, লেবুগাছের চৌহদ্দি ছেড়ে দূরে পাড়ি দিয়েছে।
ইন্দ্রাণী এখন হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। তার মন ছুটে বেড়াচ্ছে তার মাসতুতো ভাই, পরোপকারী যতীনদা' এবং বহুদিন আগে পাওয়া উদয়ের পাঠানো চিঠির গোলকধাঁধায়। ইন্দ্রাণী হিসেব কষতে কষতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বুকের ভেতর পাথরচাপা আগুনের গোলা। সে গোলার তাপ সে সহ্য করতে পারে না। তাই নিজেকে জুড়িয়ে নিতে স্খলিত পায়ে কোনওক্রমে সে নীচে নেমে যায়। উদয় পড়ে থাকে খোলা আকাশের নীচে। বাকি রাতটা উদয়কে পাহারা দিতে থাকে। আর চাঁদটা আরও দূরে সরে গিয়ে মিটিমিটি হাসতে থাকে।
পাঁচ
সূর্য সবে আড়মোড়া ভাঙছে। এখনও ভাল করে চোখ মেলেনি। উদয় জেগেছে অনেক আগেই। হয়তো সে জেগেই ছিল। এখন বাইরে বেরোনোর পোশাকে সে তৈরি। সুটকেসটা বারান্দায়। কাঁধে কিটস ব্যাগ। ওর দৃষ্টি বন্ধ দরজার দিকে। দরজার কড়া নাড়বে, নাকি অপেক্ষা করবে ভাবছে। এমন সময় দরজাটা খুলে যায়। দরজায় কবিতা। আধফোটা গোলাপ যেন! কিন্তু গোলাপের মুখে একরাশ কুয়াশা। চোখের কোণে শিশির। ঠোঁটের ফাঁকে ঝরা শেফালি — বাবা, তুমি কোথায় যাবে?
আয় মা। আমার কাছে আয়। তোরই অপেক্ষায় আছি।
বাবা, তুমি সত্যিই চলে যাবে আজ?
হ্যাঁ রে মা, আমাকে যে যেতেই হবে রে!
আর দু’-একটা দিন থেকে গেলে হত না?
দু’দিন পরেও তো যেতেই হত। আয় আমার কাছে আয়।
কবিতা উদয়ের কাছে আসে। উদয় মেয়ের মাথাটা বুকে টেনে নেয়। এখন দরজার ফ্রেমে ইন্দ্রাণী। তার মুখটা যেন বিকেলের আকাশের চাঁদ! চোখদুটো সন্ধ্যামালতী! মুখে কোনও কথা নেই।
উদয় কাঁধের ব্যাগ থেকে জড়োয়া নেকলেসের বাক্স আর একটা খাম বের করে — নে, ধর এটা। অঘ্রাণে তোর জন্মদিনে তোকে চমকে দেব ভেবেছিলাম, কিন্তু...! আর এই খামটা আমি চলে গেলে খুলিস, খুব দামি এটা, হারাস না যেন!
বাবা, তুমি আমাদের ফেলে চলে যাচ্ছ?
না রে কবু, ফেলে যাচ্ছি না, তোদের রেখে যাচ্ছি। একটা হাত কিংবা বুকের কলজেটা কি ফেলা যায়! সময় হলে আবার আসব।
কবিতার চোখ থেকে মুক্তো ঝরে জড়োয়া নেকলেসে। সে দামি মুক্তো লুকিয়ে ফেলতে কবিতা ঘরে ঢোকে মা-কে সরিয়ে দিয়ে।
উদয় লেবুগাছটার দিকে তাকায়। লেবুপাতায় শিশিরকণা। কোনও পাতা থেকে শিশির ঝরছে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে মাটিতে। উদয় যেন সে-শিশির ঝরার শব্দ শুনতে পাচ্ছে তার বুকে। শব্দটা ক্রমশ লক্ষ গুণ হয়ে বাড়ছে। বুকের জমা মাটিকে একটু একটু করে ভেজাচ্ছে শিশিরের ফোঁটা। কালকের সেই দোয়েলটাকে লেবুগাছে আর একবার দেখে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে খুব। তার শিস শোনার জন্য মন-প্রাণ আকুল। উদয় নারকেলগাছে চোখ ফেলে! হাওয়া থেমে গেছে। নারকেলগাছের পাতাগুলো নিথর-নিষ্কম্প। কালকের কাঠঠোকরা পাখিটাকে আর আস্তানা তৈরি করতে দেখা যাচ্ছে না। সে গাছটার শরীরে চোখ বোলায়। কোথাও কি গর্ত খুঁড়তে পেরেছে পাখিটা! ওই তো অনেকটা উপরে যেন একটা গর্ত দেখা যাচ্ছে! তবে কি পাখিটা এ-গাছেই বাস করবে! উদয় ইন্দ্রাণীর চোখে চোখ রাখে।
কবিতা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। হাতে রঙিন পাথরের মালাটা। সে হঠাৎ মালাটা মায়ের গলায় পরিয়ে দেয়। ইন্দ্রাণী বাধা দেয় না। ইন্দুর গলায় রঙিন পাথরে ঘুম-ভাঙা সূর্যের আলো ঠিকরোচ্ছে। সে আলোর ছ’টা কবিতার চোখে-মুখে।
উদয় তার সুটকেস হাতে নেয়। ইন্দু এমন সময় অস্ফুটে বলে — মেয়ের বেড়ে ওঠা ও মানুষ হওয়ার জন্য শুধু মায়ের স্নেহ নয়, বাবার শাসনেরও প্রয়োজন হয়। উদয় ইন্দুর চোখে চোখ রাখে। সে-চোখেও মুক্তোদানা, যার ঝিলিক গলায় রঙিন পাথরের ঝিলিককে হার মানায়। সুটকেসটা হাত থেকে বারান্দায় আবার নামায় উদয়। ওর নাকে আসে লেবুফুলের গন্ধ। এমন সময় দোয়েলপাখিটা লেবুগাছের পাতার আড়াল থেকে শিস দিয়ে ওঠে। শিস দিতেই থাকে।