Cover

AAMAR DEKHA KALBOSHEKHI

সুমন ও তিতুর পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তারা পরিবারের সাথে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে বাংলার প্রকৃতির রূপ এবং কৃষকদের কাজ উপভোগ করে। যাত্রাপথে হঠাৎ আকাশ কালো করে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়, যার ফলে তারা গরুর গাড়িতে আটকে পড়ে এবং প্রকৃতির ধ্বংসলীলার পাশাপাশি বজ্রপাতে তাদের পরিচিত রাখাল রতনের মৃত্যুর সংবাদ পায়। গল্পের শেষে কিশোর সুমন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কালবৈশাখী ও বজ্রপাতের কারণ ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে কুসংস্কার দূর করার চেষ্টা করে।

শেয়ার করুন:

স্কুলের মিনু-দিদিমনি মাঝে মাঝে একটা কথা বলেন, ‘মেঘ না চাইতেই জল

আজ সক্কালবেলাতেই তেমন এমন ঘটনা ঘটলোএকেবারে মেঘ না চাইতেই জল! সকালে বাপি, মা, ভাই আর আমি একসঙ্গে বসে ব্রেকফাস্ট করছি বাপি হঠাৎ বললতিতু! সুমন! তোমাদের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে তো, তাই না!

আমি আর ভাই একসঙ্গে বলে উঠিহ্যাঁ বাপি  

  বাপি বললঠিক আছে, গুড ফ্রাইডে, রবিবার এসব মিলিয়ে আমারও দিন-তিনেক ছুটি কাল ভোরবেলায় আমরা যাব গ্রামে তোমাদের দাদুর বাড়ি বেড়াতে তোমরা আজ রাতের মধ্যে সব গোছগাছ করে রেখো হাওড়া থেকে ট্রেন পাঁচটা পঁচিশে

  আমার তো আনন্দে মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না ভাই কথাটা শুনে অভ্যেস মতো বাতাসে ঘুসি ছুঁড়ে বলে ওঠেদিদি, ইয়া একাইনো ডারমাটেক্সিয়া আপিস থুপিস

  মা বললভালোই হবে অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয়নি তবে, এই গরমের দিনে গ্রামে যাবে? যদি দীঘা যেতে তাহলে ভালো হতো বড়দিনের ছুটিতে তো সুনামির জন্য পুরী যাওয়া ক্যানসেল হল অনেকদিন সমুদ্রে যাইনি

  আমি আচমকা বলে উঠিনা দীঘা নয়, দাদুর বাড়ি

  মা আমার দিকে বড়বড় চোখ করে তাকায় আমি লজ্জা পেয়ে যাই এভাবে মা-বাবার মুখের ওপর কথা বলা আমার অভ্যাস নয় ইচ্ছে করেও কথাটা বলিনি আসলে বহুদিন আগে দাদুর বাড়ি গেছি সেখানে দোলনা চড়েছি, প্রজাপতি ধরেছি, আরো কত মজা করেছি! সে যে কী আনন্দ পেয়েছিলাম, ভোলার নয়! হয়তো সেই অনুভূতিটাই ...

  বাপি অবশ্য আমার আনন্দটাকে বাড়িয়ে দিয়ে বললনা দীঘা নয় গ্রামের বাড়ি অনেকদিন যাওয়া হয়নি সুমন আমার কাছে এসে সেই অদ্ভুত কায়দায় আঙুলে আঙুল ঠেকিয়ে হ্যান্ডসেক করে নিল তারপর কানের কাছে মুখ এনে বললদিদি, এবারে দোলনা চড়াবি কিন্তু

  আমি তখন ভাবছি মিনু-দিদিমনির ওই কথাটা

 

দুই

 

আমরা প্ল্যাটফর্মে ট্রেন আসার আগেই পৌঁছেছি ভোরে এমন কিছু ভিড়ভাট্টাও নেই আমি আর ভাই দুজনেই জানলার ধার পেয়েছি দুজনে সামনাসামনি ঠিক সময় ট্রেন ছাড়ল কয়েকটা স্টেশন যাওয়ার পরেই শুরু হল গ্রামের পরিবেশ সবুজ মাঠের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে ট্রেন ঝিকির ঝাঁই ঝিকির ঝাঁই শব্দ তুলে গাড়ি কখন যে থামছে, কখন চলছে হুঁস নেই আমাদের আমি আর ভাই দুচোখ দিয়ে যেন চারপাশ গিলতে গিলতে যাচ্ছি গাছগাছালি, নানারকম পাখি, খালবিল, সবুজ কার্পেটের মতো ধানজমি মাঝে মাঝে ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করছে কোনও কথা, কখনও বা আমি ভাইকে ট্রেনে যেতে যেতে কতরকম যে দৃশ্য দেখছি কোথাও সবুজ জমিতে চাষিরা উবু হয়ে বসে কী যেন করছে! বাপি বললওটা পাটখেত পাটচারার সঙ্গে গজানো আগাছা ঘাস চাষিরা তুলে ফেলছে ওকে বলে ভুঁই নিড়োনো

  কোথাও খালের ধারে বসে মাছ ধরছে কেউ মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে কোনও দুষ্টু রাখাল ছেলে হাতের লাঠি তুলে মারার ভঙ্গি করছে আমাদের দেখে আমরা হাসছি কোথাও দেখছি দুটো শিংওয়ালা ভেড়া তুমুল লড়াই করছে দুজনে মুখোমুখি পেছনের দুপায়ে দাঁড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে আবার মাটিতে সামনের পা ফেলছে সঙ্গে সঙ্গে ওদের মাথায় মাথায় শিংয়ে-শিংয়ে ধাক্কা লাগছেঢিসুম তারপর মাথায় মাথা লাগিয়ে ওকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে কিছু দূর, আবার একে পিছু হটাচ্ছে বাপি বললওদের ভীষণ রাগ! যতক্ষণ না একজন রক্তাক্ত হয়ে শিং ভেঙে পরাজয় স্বীকার করে পালিয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ লড়াই চলবে

  দেখি, ভাই আনমনে নিজের মাথায় শিংয়ের মতো দুহাত ঠেকিয়ে রেখে কী বিড়বিড় করে বলছে

রেললাইনের ধারে এক জায়গায় একটু গরু লম্বা দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল ঘাস খাচ্ছিল গোরুটা ট্রেন হঠাৎ বিকট শব্দে হর্ন দিতেই গরুটা দড়ি-টড়ি ছিঁড়ে লেজ উঁচিয়ে দে ছুট ভীষণ ভয় পেয়েছে গোরুটা তাই না দেখে ভাই তো হেসে গড়িয়ে পড়ে আর কি!

  একটা ছোট্ট স্টেশন থেকে উঠলো একজন বাউল গেরুয়া আলখাল্লা পরনে বগলে একটা বাজানোর জিনিস ধরা রয়েছে একমুখ খোলা ছোটো ঢোলের মধ্যে থেকে দুটো তার বের করা তারের প্রান্তটা একটা ছোট কাপের মতো জিনিসের সঙ্গে বাঁধা সেই কাপটা বাঁ-হাতে টানটান করে ধরা রয়েছে ডানহাতে ধরা একটা প্লাস্টিকের জিনিস দিয়ে তারে বোল তুলছেবুলুলুম বুলুম বুলুম ...

  বাপি বললওটার নাম গোপীযন্ত্র, কেউ বা বলে গোবা। আবার কেউ বলে গাব গুবাগুব।  

  ওই গোপীযন্ত্রটা বাজিয়ে মিষ্টি গলায় একের পর এক গান গেয়ে চলেছে বাউল— ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি ...,’ ‘প্রাণের বান্ধব রে ...’ আরও কত গান ট্রেনের ঝিকঝিক আওয়াজ, বাউলের টানা মিষ্টি সুর, দুপাশে খোলা মাঠ, চলন্ত গাড়ির দুলুনি মিলেমিশে কী ভালো যে লাগছিল! আমরা এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আছি এর মধ্যে দুপুর হয়ে গেছে ট্রেনে কত কী যে খাওয়া হল! মায়ের তৈরি লুচি, আলুর দম, সন্দেশ তো ছিলই সেইসঙ্গে ট্রেনে কেনা ঝালমুড়ি, বুলবুলভাজা আরও কত কি! দাদুর বাড়ি এতদূর, রাস্তা যেন আর ফুরোয় না!

  এর মধ্যে কখন আকাশ জুড়ে মেঘ জমেছে ছায়া-ছায়া চারিদিক কেমন যেন গুমোট! গাছের পাতাগুলো নড়ছে না, ট্রেনটা একটা নদীর ওপরে সেতু পেরোল শব্দ হল ডিগ ডিগা ডিগ, ডিগ ডিগা ডিগ! শব্দটা যেন পেটের ভেতর থেকে বেরোচ্ছে মনে হচ্ছে বাপি জানলা দিয়ে আকাশ দেখে বললমনে হচ্ছে ঝড় উঠবে কালবোশেখির লক্ষণ এদিকে আমাদের নামারও সময় হল ঝড়রে মুখে পড়লেই তো বিপদ  

  পরের স্টেশনে আমরা নামলাম তখন রোদ্দুর গেছে হারিয়ে অথচ এসময় মাথার ওপর সূর্য দাউ-দাউ করে জ্বলার কথা ছোট্ট স্টেশনটাতে মাত্র কয়েকজন নামল গাড়ি থেকে প্ল্যাটফর্মে অবনীদাদাঁড়িয়েছিল আমাদের জন্যে আমি অবশ্য চিনতে পারিনি বাপি বললঅবনীদা', অনেকক্ষণ এসেছো?  

  অবনীদা বয়স পঞ্চাশ, ষাট কিংবা সত্তরও হতে পারে বাপি, কাকু, পিসি এমনকি আমাদেরও অবনীদা ফোকলা মুখে অবনীদাবললদাদাবাবু, ঝড়-তুফান হবে বলে মনে হচে শিগ্গির শিগ্গির চল লাটফরমের নীচে গাড়ি আচে

  আমরা গাড়ির ভেতর খড়রে গদির ওপর বিছানো শতরঞ্চিতে বসতেই নন্দী-ভৃঙ্গি হাম্বা রব তুলে চলতে শুরু করল ওদের গলায় বাঁধা ঘন্টিতে শব্দ হচ্ছিল ঠুনঠুন-ঠুনঠুন

  বেশ কিছুটা পথ আমরা গেছি, এমন সময় ঝড় উঠলো সে কী ভীষণ আওয়াজ! সোঁ-সোঁ, শনশন-শনশন চারদিকে ধুলোয় ভরে গেল চোখ খোলা যাচ্ছে না নন্দী-ভৃঙ্গি আর এগোতে পারছে না অবনীদাবললদাদাবাবু! এই তুফান মাথায় যাওয়া যাবে নাকো সামনের ওই বাগানের ধারে গাড়ি নামাই বাগানের ভেতর যাওয়া ঠিক হবে না গাচ-টাচ ভেঙে পড়তে পারে গাড়িতেই ছইয়ের ভেতর সবাই বসো ঝড় থামলে যাবো

  অগত্যা অবনীদা কথা মতো গাড়ির ভেতর আমরা সবাই নন্দী-ভৃঙ্গিকে গাড়ির জোয়ালের সঙ্গে বেঁধে রাখা হল এদিকে মেঘের গর্জন আর বিদ্যুৎ চমকানি চলছে আমরা সবাই ভয়ে জড়ো-সড়ো তারপর নামল বৃষ্টি ঝড়ের তোড়টা একটু কমেছে হঠাৎ শুনি, মটমট মটমট ঝপাং আমরা সবাই চমকে উঠি বাগানে আমগাছের বিশাল এক ডাল ভেঙে পড়ল ভাগ্যিস! আমরা বাগানে আশ্রয় নিইনি! নন্দী-ভৃঙ্গি ডাল পড়ার শব্দে ভয় পেয়ে দড়ি ছিঁড়ে মাঠের মাঝখানে আমরা গাড়িতে ছইয়ের ভিতর থাকলেও ভিজে একশা শীত ধরে গেছে আমাদের ভয়ও করছে খুব    

  আমাদেরকে সাহস দেওয়ার জন্যে বাপি মাঝেমাঝে দুটো-একটা কথা বলছে কিন্তু মা ট্রেন থেকে নামার পর আর একটা কথাও বলেনি মুখ গোমড়া করে বসে আছে বাপির কথা, ‘কোনও কিছুর শুরু হলে তার শেষও হয়

  ঝড়ও থামল একসময় বৃষ্টি থেমে গেল অবনীদানন্দী-ভৃঙ্গিকে খুঁজে পেতে নিয়ে এসে আবার গাড়িতে জুড়ে দিল গাড়ি চলল দাদুর বাড়ির দিকে যেদিকে তাকাচ্ছি, চোখে পড়ছে ঝড়ের তান্ডবের চিহ্ন কোথাও ডাল ভেঙেছে কোথাও গাছ  উপড়ে  গেছে কোনও বাড়ির চালটাই উড়ে চলে গেছে সে বাড়ির মানুষগুলোর কী কষ্টটাই না হবে!

  সুমন এতক্ষণ চুপচাপ ছিল হঠাৎ বলে ওঠেদিদি, কালবোশেখি কেন হয় জানিস?

  বুঝলাম সুমন ভয় শীত কাটিয়ে নিজের ফর্ম ফিরে পাচ্ছে আমি বললামতুই বল না শুনি

  সুমন চিরাচরিত ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলআমি ছোটকাকুর কাছে শুনেছি, প্রচন্ড গরমে, রৌদ্রে মাটির কাছাকাছি হাওয়া গরম হয়ে উপরে উঠে যায় তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা হাওয়া আশপাশ থেকে ছুটে আসে প্রচন্ড বেগে এটাই কালবোশেখি

আমি বললামআমিও শুনেছি তবে এটুকু বললে তুই পাঁচের মধ্যে তিন পাবি এইসঙ্গে বলতে হবেসাধারণত বৈশাখ মাসে এই ঝড় হয়, তাই এর নাম কালবোশেখি ঝড়

  এরকম নানান কথা বলতে বলতে আমরা দাদুর বাড়ির কাছাকাছি এমন সময় কয়েকজন রাখাল ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে বললঅবনীদাতোমাদের বাগাল বাজে মরেচে ওই পচ্চিমের মাঠে  

  আমি কথাটার মানেই বুঝতে পারলাম না অবনীদা' তো শোনামাত্র গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটল পশ্চিম মাঠের দিকে বাপি বললবাগাল মানে হল গোরু দেখাশোনার জন্য স্থায়ী কাজের লোক রতনকে মনে আছে তোর? সেই রতন বোধহয় বজ্রপাতে মারা গেছে

  দাদুর বাড়ির ঢোকার আগেই এমন একটা খবরে খুব মন খারাপ হয়ে গেল এর মধ্যে বাড়িতেও খবর পৌঁছে গেছে দাদু ছুটেছে পশ্চিম মাঠের দিকে বিন্তিপিসি আমাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল আমাদেরকে লেবুর সরবত তৈরি করে দিতে দিতে বিন্তীপিসি বললআর বছরে আমাদের বাগানে বাজ পড়েছিল একটা কলাগাছকে দুভাগ করে লাঙলের ফলার মতো একটা জিনিস মাটির ভেতর ঢুকে গিয়েছিল  

  সুমন জিজ্ঞেস করলতুমি সেই জিনিসটা দেখেছ পিসি?  

  পিসি বললনা, সেটা তো মাটির তলায় ঢুকে গেছে

  সুমন মন খারাপের মধ্যেও হাসেপিসি, তোমাদের কত ভুল ধারণা থাকে ছোটকাকু থাকলে তার মুখ থেকে শুনতে, বজ্রপাতে কোনও জিনিস আকাশ থেকে পড়ে না হলইলেক্ট্রিসিটিঅর্থাৎ বিদ্যুতের ব্যাপার বাতাস জোরে ছুটে এলে এবং গরম হাওয়া জোরে ওপরে উঠে গেলে, জলকণা ভর্তি কালো মেঘগুলোর ওপরের অংশে পজিটিভ অর্থাৎ ধনাত্মক তড়িৎ এবং নীচের দিকে নেগেটিভ মানে ঋণাত্মক তড়িৎ সৃষ্টি হয় এই ধরনের দুখানা মেঘ কাছকাছি হলে বিপরীতধর্মী তড়িৎ আকর্ষণ করে একে অপরকে তখন আলোর ঝলক দেখা যায় আর মেঘের বাতাসের ঘর্ষণে বিশাল শব্দ হয় ওটাই মেঘ গর্জন আর কোনও ধনাত্মক তড়িৎওয়ালা মেঘ কাছাকাছি ঋণাত্মক তড়িৎ না পেলে পৃথিবীর ঋণাত্মক তরিতের আকর্ষণে ওই বিদ্যুৎ মাটিতে নেমে আসে ওটাকেই বলে বজ্রপাত কোনও মানুষের শরীরের মধ্যে দিয়ে সে বিদ্যুৎ বয়ে গেলে ...

সুমনের কথাগুলো পিসির কানে ঢোকে কি না বোঝা যায় না শুধু পিসির চোখ থেকে জল ঝড়তে থাকে হঠাৎ খেয়াল করি, আমার চোখদুটোও কখন জলে ঝাপসা হয়ে গেছে

শেয়ার করুন: