Cover

BUKAIYER SIKKHA

বুকাইয়ের দামি কলম হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার ভুল, মিথ্যা বলা ও বন্ধুকে সন্দেহ করার শিক্ষা ফুটে উঠেছে। মা তাকে বোঝান— মিথ্যা ঢাকতে গিয়ে আরও মিথ্যা বলতে হয়, আর সত্য শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পায়। শেষে জানা যায়, বুকাইয়ের বন্ধু শুভাশিসই কলমটি খুঁজে পেয়ে ফেরত দিয়েছে। গল্পটি সততা, সত্যবাদিতা ও বন্ধুত্বের মূল্য শেখায়।

শেয়ার করুন:

বুকাইয়ের খুব মনখারাপ। কলমটা দিয়েছিল ছোটমামা। আজ সেটা স্কুলে নিয়ে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে দেখে, স্কুলব্যাগে কলমটা নেই!      

  কলমটা পাওয়ার পর থেকেই ওর খুব ইচ্ছে করছিল, ওটা স্কুলে নিয়ে গিয়ে বন্ধুদেরকে দেখাবে। মা বলেছিল বুকু, এ কলমটা স্কুলে নিয়ে যাস না! দামি কলম তো! হারিয়ে গেলে মনখারাপ হবে।                

  মায়ের কথা শুনে সেদিন নিয়ে যায়নি। কিন্তু আজ আর মন মানেনি। মায়ের কথা অগ্রাহ্য করেই স্কুলে কলমটা নিয়ে গিয়েছে। ক্লাসের বন্ধুদেরকে দেখিয়েছে। প্রত্যেকে সোনালি রঙের কলমটার প্রশংসা করেছে। তা শুনে ওর খুব আনন্দ হয়েছে।     

  কিন্তু বাড়ি ফিরে ব্যাগে কলমটা না পেয়ে ওর সমস্ত আনন্দ, দুঃখ হয়ে চোখের কোণে জমা হল। ও ভাবতে বসলো, কলমটা হারালো কী করে! ব্যাগ থেকে পড়ে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। তাহলে কি কেউ ব্যাগ থেকে বের করে নিয়েছে! নিলে ক্লাসের বন্ধুদের মধ্যেই কেউ নেবে। কে নিতে পারে? পাশেই তো বসেছিল শুভাশিস। কলমটা বের করে নেওয়ার সুযোগ ওরই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ও তো খুবই ভালো ছেলে! ওর সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্ব। টিফিনবেলায় রোজ দু'জনে ভাগাভাগি করে টিফিন খায়। তাছাড়া শুভাশিসের বাবা একজন ডাক্তার। বেশ বড়লোক ওরা। শুভাশিস বললে, ওর বাবা ওকে একটা এমন কলম কিনে দিতেই পারে। তাহলে ও কলম নেবে কেন! তবে অন্য কেউ কি চুরি করেছে? সেটা কে হতে পারে?           

  একে একে ও ক্লাসের বন্ধুদের কথা ভাবে। এর আগে ক্লাসে কলম, পেন্সিল, ইরেজার চুরি করেছে, এমন কারও নাম মনে পড়ে না। এবার ও ভাবতে বসে মায়ের কথা। মা কলমটা স্কুলে নিয়ে যেতে নিষেধ করেছিল, ও শোনেনি। ওটা হারিয়ে গেল। মা তো খুব বকবে।         

  ঠিক করে, মা-কে ও বলবেই না যে, কলমটা হারিয়ে গেছে। তাহলে আর বকুনি খেতে হবে না। মা তো নানা কাজে ব্যস্ত থাকে! নিশ্চয় কলমের খোঁজ নেবে না! এমন ভেবে ও নিজেকে একটু সান্ত্বনা দেয়। কিন্তু মনখারাপটা কিছুতেই যায় না।           

  এখন ও মুখহাত ধুয়ে খেতে বসেছে। আজ খেলতে যেতেও ইচ্ছে করছে না। মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে, তাই আনমনা হয়ে যাচ্ছে। মা ওর রকম-সকম দেখে জিজ্ঞেস করেন কী রে! আজ স্কুলে কিছু হয়েছে নাকি? অমন চুপচাপ!    

  ও মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে না, কিছু হয়নি তো!    

  তবুও মা নিশ্চিন্ত হন না। বলেনপড়া পারিসনি নাকি?  স্যার বকুনি দিয়েছে বুঝি!    

  বুকাই বলে না মা, সব পড়া পেরেছি।   

  তবে কি বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করেছিস?  

  না তো! আমার বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়াই হয় না।  

  তাহলে কী হয়েছে?

  বললাম তো কিছু হয়নি।       

  উহুঁ, তোর চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে, কিছু একটা হয়েছে। বল আমাকে! বই-খাতা-কলম কিছু হারিয়ে ফেলেছিস?

  না তো!   

  কিছু হারিয়ে ফেললে আমাকে বল। আমি বকবো না।

  বললাম তো কিছু হারাইনি। আমার এমনিই মনখারাপ।     

  এমনি এমনি আবার কারও মনখারাপ হয় নাকি! যাক গে, না বলবি, বলিস না।  

  মা থেমে যান। বুকাই খেতে থাকে। কিন্তু খাবার পেটে যাচ্ছে না। তা দেখে মা বলেনখাবার নিয়ে অমন নাড়াচাড়া করছিস কেন! খেয়ে নে! আমি ততক্ষণে বাজারের ফর্দটা লিখে ফেলি। কাল সকাল হলেই তো তোর বাবা ফর্দ চাইবে।           

  ততক্ষণে বুকাইয়ের খাওয়া হয়ে গেছে। ওর মা একটা কাগজ আর কলম নিয়ে বসেছেন ফর্দ লিখতে। একটু পরেই বিরক্ত হয়ে বলেন ধুর ছাতা! কলমে লেখা হয় না। বোধহয় এ কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। একটা কলম দে তো! ও ভালো কথা, তোর সেই নতুন কলমটা নিয়ে আয়! দেখি, ওটাতে কেমন লেখা হচ্ছে।            

  বুকাই থতমত খেয়ে যায়। মা হঠাৎ ওই কলমটাই চেয়ে বসবে, বুঝতে পারেনি। তাই অন্য একটা কলম মাকে দিয়ে বলে ওটা বাক্সে ভরে রেখেছি। বের করতে সময় লাগবে। এটা দিয়ে লেখ।       

  মা বলেন সময় লাগুক, এখন কী আর কাজ আছে! তুই ওই কলমটাই নিয়ে আয়। একটু লিখে দেখি, কেমন লেখা হচ্ছে। তোর ছোটমামা তোকে বেশ দামি কলম দিয়েছে, বুঝলি!          

  বুকাই এবার বেশ বিপদে পড়ে যায়। কী বলবে ভেবে পায় না। মা বলেন কী হলো! দাঁড়িয়ে রইলি কেন? কলমটা নিয়ে আয়!    

 বুকাই এবার কান্নাভেজা গলায় বলে ওই কলমটা আজ হারিয়ে গেছে।  

  সে কী রে! কোথায় হারালি?   

  বুকাই চুপ থাকে। মা বকে ওঠেন আরে! কোথায় হারালি?     

  ও তোতলায় আজ ক-কলমটা স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলাম। বাড়ি ফিরে ব্যাগে কলমটা আর খুঁজে পাচ্ছি না।   

  তোকে যে পই পই করে বলেছিলাম, কলমটা স্কুলে নিয়ে যাবি না।  

  বুকাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে নখ খোটে। মা বলেনকী হল! কথা বলছিস না যে!     

  ও মিন মিন করে বলে বন্ধুদের দেখাবো ব'লে আজ কলমটা স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি যখন টয়লেটে গেছি, তখন বোধহয় কেউ ব্যাগ থেকে বের করে নিয়েছে।

  কে নিয়েছে বলে তোর মনে হয়?         

  আমার পাশে বসেছিল শুভাশিস, ওই নিয়েছে হয়তো!  

  মা বকে ওঠেন কী করে বুঝলি ও নিয়েছে! না জেনে ওকে চোর ভাবছিস। ও তোর বন্ধু তো!    

  বুকাই এবার কেঁদে ফেলে। মা বলেন নিষেধ করা সত্ত্বেও তুই কলমটা স্কুলে নিয়ে গেছিস। মায়ের কথা শুনিসনি। এটা তোর প্রথম অপরাধ। কলমটা স্কুলে হারিয়ে এসেছিস, আমাকে বলিসনি। উপরন্তু মিথ্যা কথা বলেছিস যে, স্কুলে কিছু হয়নি। কলমটা আনতে বললাম, বললি, ওটা বাক্সে আছে। অর্থাৎ তুই আবার মিথ্যা কথা বললি। এটা তোর দ্বিতীয় অপরাধ। না জেনেশুনে তোর ক্লাসের বন্ধুকে তুই চোর বলেছিস, এটা তোর তৃতীয় অপরাধ। এবার বল, তোর কী শাস্তি হওয়া উচিত!      

  বুকাই মা-কে জড়িয়ে ধরে বলে আর মিথ্যে কথা বলবো না। এবারের মতো ক্ষমা করে দাও।        

  মা বলেন দেখ তোকে কতবার বলেছি, মিথ্যা কথা বলবি না। একটা মিথ্যা ঢাকতে গিয়ে কতগুলো মিথ্যা বলতে হয়। একসময় আর বলার মত মিথ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন সত্যিটা বেরিয়েই পড়ে। এই এখন যেমন হল।             

  বুকাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে। মা বলেন কেঁদে আর কী হবে? অন্যায় যখন করেছিস, সাজা তো তোকে পেতেই হবে। কান ধরে দশবার ওঠবোস কর। আর মনে মনে বল, কোনদিন মায়ের কথার অবাধ্য হবি না। আর কখনও মিথ্যা কথা বলবি না। কখনও না জেনেশুনে বন্ধুদেরকে সন্দেহ করবি না।       

  অগত্যা বুকাই কান ধরে ওঠবোস করা শুরু করে। অপমানে ওর চোখমুখ লাল। চোখ থেকে অঝোরে জল ঝরছে।         

  বার পাঁচেক ওঠবোস করতেই মা বলেন ঠিক আছে, থাম! আর করতে হবে না। এখন বাবার ঘরে যা! দ্যাখ, বাবার টেবিলের উপরে ওই কলমটা আছে, নিয়ে আয়। আমাকে ফর্দ লিখতে হবে তো!

 বুকাই কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। তারপর ও বাবার ঘরে গিয়ে টেবিলের উপরে সত্যি সত্যিই ওই কলমটা পেয়ে যায়। ও ভেবে পায় না, কলমটা এখানে কী করে এলো!     

  কলম নিয়ে ও মায়ের কাছে আসে। মা মিটিমিটি হেসে বলেন দ্যাখ, সেই কলমটাই তো?   

  বুকাই আবেগ জড়ানো গলায় বলে হ্যাঁ, সেটাই তো! এখানে কী করে এলো?       

  মা ওর পিঠে হাত রেখে বলেন যাকে তুই চোর ভাবছিলিস, তোর সেই বন্ধু শুভাশিসই একটু আগে কলমটা দিয়ে গেছে। ওর বাবার গাড়িটা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে ছুটে এসে দিয়ে গেল। বলল, 'কাকিমা, তুহিন, মানে বুকাই তো স্কুলবাসে আসছে। বাসটা কোনদিকে গেছে জানি না। আমি বাবার গাড়িতে আগে চলে এসেছি। তাই ওর কলমটা বাড়িতে দিয়ে গেলাম।   

   বুকাই ভেবে পায় না, শুভাশিসের কাছে কলমটা কী করে গেল! ও জিজ্ঞেস করে মা, ও কলমটা কী করে পেল, বলেনি?           

  বলেছে, তুই যখন ছুটির পরে হুড়োহুড়ি করে ক্লাস থেকে বেরোচ্ছিলিস, তখন তোর জামার পকেট থেকে কলমটা পড়ে গিয়েছিল। তুই তো ছুটে গিয়ে বাসে উঠে গেছিস। বাসও সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছে। ও তোকে খুঁজে পায়নি। তাই কলমটা বাড়িতে দিয়ে গেল।          

  বুকাইয়ের মনে পড়ে যায়, লাস্ট পিরিয়ডের সময় ও ব্যাগ থেকে কলমটা বের করে জামার পকেটে রেখেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ইতিহাসের স্যার ওর পকেটে সোনালি রঙের কলমটা দেখে, যদি একবার হাতে নিয়ে দেখতে চান তাহলে ভালো হয়। স্যারেরাও জেনে যাবেন যে, ওর একটা ভালো দামি কলম আছে। কিন্তু স্যার পুরো ক্লাসটা ইতিহাস পড়িয়েই গেলেন। ওর পকেটের দিকে একবারও তাকালেন না। শেষের দিকে আবার ওকে একটা প্রশ্নও করলেন। তার উত্তর দিতে গিয়ে ও কলমটার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। আর ছুটির ঘন্টা পড়তেই তো...।   

  মা বলেন শুভাশিস খুব সৎ এবং তোর খুব ভালো বন্ধু। কাল ওকে তোর টিফিন খাইয়ে দিস। আমি বেশি করে বানিয়ে দেব, হ্যাঁ।

শেয়ার করুন: