Cover

BISUDDHA VASA PURASKAAR

সুকুমার রুজের গল্পে সৃজনের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতা ফুটে উঠেছে। স্কুলে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে “বিশুদ্ধ ভাষা পুরস্কার” ঘোষণা করা হয়—যেখানে বাংলা ক্লাসে ইংরেজি ও ইংরেজি ক্লাসে বাংলা শব্দ ব্যবহার নিষিদ্ধ। সৃজন পুরস্কার জেতার জন্য সাধুভাষায় কথা বলার অনুশীলন শুরু করে। মামা ও মায়ের সঙ্গে তার কথোপকথনে মাতৃভাষার মর্যাদা ও বিশুদ্ধতার গুরুত্ব প্রকাশ পায়। গল্পটি ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও সাংস্কৃতিক সচেতনতার সুন্দর বার্তা দেয়।

শেয়ার করুন:

সৃজনের মামারবাড়িতে সরস্বতী পুজোয় খুব ধুমধাম ছোটোমামা সৃজনকে নিয়ে যেতে নিজে এসেছে বাবা অনুমতি দিলেও মা ওর মামারবাড়ি যাওয়া না-মঞ্জুর করে দিলেন স্কুলে সরস্বতীপুজো আর শনি-রবি মিলিয়ে দিন-চারেকের ছুটি কিন্তু ট্যুইশনির পড়া কামাই করা চলবে না   

 সৃজনের খুব মনখারাপ কিন্তু হঠাৎ একটা ফোনেই ওর মন ভালো হয়ে গেল ট্যুইশন-স্যার ফোন করে জানাচ্ছেনতিনি দিন-চারেকের জন্য শহরের বাইরে যাচ্ছেন তাই সামনের দুদিন পড়তে আসতে হবে না

 সৃজন মনের আনন্দ চেপে রেখে বলেস্যার, স্যার, একটু ধরুন না, মাকে ফোনটা দিচ্ছি, একটু বলে দিন না যে, আপনি দুদিন পড়াচ্ছেন না তাহলে আমার একটু সুবিধা হয়

 স্যারের সঙ্গে কথা শেষ করে মা ফোনটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে ওঠেনতবে আর কী! আনন্দে নাচো এবার আর মামারবাড়ি যাওয়া আটকায় কে! যাও তৈরি হয়ে নাও

 সৃজন আনন্দে নাচতে নাচতে গিয়ে ছোটমামার গলা জড়িয়ে ধরে বলেছোটোমামাশ্রী, আমার মাতুলালয় ভ্রমণ মঞ্জুর হইয়াছে আহা কী আনন্দ!

 ছোটোমামা বলে ওঠেতোর খুব আনন্দ হলে, সাধুভাষায় কথা বলিস নাকি?

 না, তা নয় তবে সাধুভাষায় বাংলা বললে, তার সঙ্গে ইংরেজি শব্দ মিশে যাওয়ার চান্স কম থাকে এই দ্যাখোচান্সবলে ফেললাম সাধুভাষায় বললে ঠিকসম্ভাবনাবলতাম

 বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশে গেলে ক্ষতিটা কী বল তো! কথাটা বোঝানো নিয়ে তো দরকার

 না না, ক্ষতি আছে, পুরস্কার হাত ছাড়া হয়ে যাবে

 কিসের পুরস্কার, কে দেবে?

 বিশুদ্ধ ভাষা পুরস্কার’, স্কুলের স্যার দেবেন হেডস্যার ..., না না, প্রধান শিক্ষক বলেছেন, আগামী ২১ ফেব্রুয়ারিআর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এ মাতৃভাষার সম্মানার্থে এক বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে ওইদিন স্কুলের ইংরেজি ক্লাসে কথার মধ্যে একটাও বাংলা শব্দ ব্যবহার করা চলবে না, এবং বাংলা ক্লাসে একটাও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা চলবে না যারা এটা ঠিকঠাক পালন করতে পারবে, তাদেরকে পুরস্কার দেওয়া হবে

 ছোটোমামা উৎফুল্লবাঃ, দারুণ ব্যাপার তো!

 হ্যাঁ, তাই আমি অনুশীলন করছি পুরস্কার আমাকে নিতেই হবে

 তোদের তো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এসব স্কুলে তো বাংলাকে গুরুত্বই দেওয়া হয় না তোদেরটা দেখছি অন্যরকম তো কার মাথা থেকে এসব বেরিয়েছে?

 প্রধান শিক্ষকের মাথা থেকে উনি ইংরেজিতে এম. আবার বাংলাতেও এম.এ স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত জানো মামা, উনি আবার কবিতাও লেখেন

 বাঃ, তোদের হেডস্যার তাহলে কবি

 হ্যাঁ, উনি বলেন, ইংরেজি মাধ্যমে পড়লে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সুবিধা হয় ঠিকই কিন্তু সেইসঙ্গে মাতৃভাষাটাও ভালোমতো শেখা দরকার

 ঠিকই বলেছেন তোদের হেডস্যার আজকাল অনেকেই ইচ্ছে করে বাংলা বলে না তাতে যেন সম্মান নষ্ট হয়

 হ্যাঁ, আমাদের স্কুলে শৌভিক আছে ও বাংলা বলতেই চায় না বললেও ইংরেজি মিশিয়ে জগাখিচুড়ি এক ভাষা বলে একদিন তো স্যারের কাছে পানিশমেন্ট..., দুঃখিত, শাস্তিও পেল অনেকেই এমন করে তাই বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য এই পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন

 হ্যাঁ, উদ্যোগটা ভালো তবে পুরস্কার পাওয়াটা খুব কঠিন, বুঝলি সৃজন কিছু কিছু ইংরেজি শব্দ আছে, যেগুলো নিজের অজান্তেই বাংলার সঙ্গে বেরিয়ে আসে যেমন, স্যরি, থ্যাঙ্ক ইউ, গুড, নাইস্ ... এইসব

 হ্যাঁ মামা, তবে পরীক্ষা করে দেখেছি, সাধুভাষায় বললে কিন্তু ইংরেজি শব্দ ঢোকে না সেই কারণেই বলিতেছি, এক্ষণে আর বিলম্ব করিলে চলিবে না যত শীঘ্র সম্ভব বাহির হইয়া পড়িতে হইবে তাহা না হইলে, রেলগাড়ি... রেলগাড়ি, ‘ফেল হয়ে যাওয়াবাংলায় কী হবে ছোটোমামা?

 ছোটোমামা হেসে বলেনরেলগাড়ি প্রস্থান করিবে চলো, আমরা এখন গাত্রোত্থান করি প্রস্তুত হইয়া লই

 মামা-ভাগ্নের কথোপকথন শুনে মা হেসে বলেনতোরা কি এখন থেকেই দেবী সরস্বতীকে তুষ্ট করার জন্য সাধুভাষায় কথা বলা শুরু করলি? তাহলে সংস্কৃতে বল!

 না মা, মাতৃভাষাকে, মানে তোমার ভাষাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মহড়া চলছে কদিন তুমি যেন ভুলেও ইংরেজি বলো না দিন দশেক মহড়া, একুশে ফেব্রুয়ারি ফাইনাল যা, ‘ফাইনালটা তো বাংলায় বলা দরকার কী হবে মামা?

 চূড়ান্ত এখন এসবের অন্ত চলো ভাগ্নে, আমাদের হাতে এখন সময় বাড়ন্ত

 মা খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলেনপারিসও তোরা বাবু, সোয়েটার নিতে যেন ভুলো না

 মা, সোয়েটারটা বাংলায় বলো না!

 এত বাংলা আমি জানি না, যা!

শেয়ার করুন: