Cover

PRATIPAKSHA

সেই বিকেল তিনটে থেকে অনুষ্ঠান চলছে। দু’ঘন্টা হয়ে গেল। দর্শক আসনে এবার একটু চা‌ঞ্চল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উদ্বোধনী সঙ্গীতের পর সেই যে বক্তৃতা শুরু হয়েছে, আর বিরাম নেই। মঞ্চে যাঁরা বসে রয়েছেন, তাঁরাও যে খুব স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করছেন, এমন নয়। কিন্তু এখনও দু’একজন আলোচকের আলোচনা বাকি রয়েছে। মুখ্য আলোচক নিরুপমা দাশগুপ্তর আলোচনা শোনা অবধি সভাঘর বেশ মনোযোগী ও শান্ত ছিল।

শেয়ার করুন:

সেই বিকেল তিনটে থেকে অনুষ্ঠান চলছেদুঘন্টা হয়ে গেলদর্শক আসনে এবার একটু চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছেউদ্বোধনী সঙ্গীতের পর সেই যে বক্তৃতা শুরু হয়েছে, আর বিরাম নেইমঞ্চে যাঁরা বসে রয়েছেন, তাঁরাও যে খুব স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করছেন, এমন নয়কিন্তু এখনও দুএকজন আলোচকের আলোচনা বাকি রয়েছে মুখ্য আলোচক নিরুপমা দাশগুপ্তর আলোচনা শোনা অবধি সভাঘর বেশ মনোযোগী ও শান্ত ছিল

  নিরুপমা মঞ্চ থেকে নেমে আসার পর দর্শকের কেউ কেউ উসখুস করছে নিরুপমা নিজেও এখন কিছুটা অধৈর্য্য যেন! আলোচনার বিষয়টা যদিও গতানুগতিক নয়, তবুও একই বিষয়ের উপর এত কথা সত্যিই বিরক্তির কারণ হয় ওর অবশ্য বিরক্ত লাগছিল অন্য কারণে ও আলোচনা শুনতে আগ্রহী হতে পারছে না, একারণেই যে, আলোচনাতে আসল জায়গাটাকে কেউ ধরতে পারছেন না, কিংবা ধরতে চাইছেন না নিরুপমা আলোচনা করার সময় বিষয়বস্তুর গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল এমন একটা জায়গায়  বিষয়টাকে নিয়ে গিয়ে কথা থামিয়েছিল, যেখান থেকে অন্য আলোচকদের গভীরে ঢোকার পথ সুগম ছিল কিন্তু ওরা সেইপুরুষশাসিত সমাজ’, ‘নারীরা পুরুষদের চেয়ে সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে' 'প্রতিবন্ধযুক্ত নারীরা তো আরও পিছিয়ে, এদের সমান সুযোগ ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য আইনের সাহায্য দরকারএসব কথায় ঘুরপাক খাচ্ছেন নিরুপমার ভালো লাগছে না

  অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথির বক্তৃতা শুনতে শুনতে নিরুপমা ফোল্ডিং স্টিকখানা আস্তে আস্তে আনফোল্ড করেঅপেক্ষা করতে থাকে, কখন ওই বক্তার কথা শেষ হয়পরের বক্তৃতা শুরু হওয়ার আগেই উঠে পড়তে হবে! বিশেষ অতিথি বক্তব্য শেষ করতেই নিরুপমা চেয়ার ছেড়ে উঠে  দাঁড়ায় একদম সামনের সারির ধারের চেয়ারে বসেছিল সুতরাং উঠে বাঁয়ে ঘুরে বাইরের দিকে এগোনোর পথে কোথাও বাধা পাওয়ার কথা নয় তবুও যাতায়াতের সরু পথে ওর হাতে ধরা ধাতব স্টিক কিছুতে বাধাপ্রাপ্ত হল কেউ একজন বলে উঠল, ‘আরে আরে! সামনের ক্যামেরা-স্ট্যান্ডখানা সরান দেখছেন তো...!'

  নিরুপমা দাঁড়িয়ে পড়েছে হঠাৎ ওর হাতে অন্য একজনের হাতের স্পর্শ অনুভব করে কেউ যেন ধরেছে হাতখানা ওর অতি-সচেতন অনুভূতি বুঝতে পারে, সে হাতখানা পুরুষের সেই সঙ্গে মৃদু পুরুষকণ্ঠ চলুন ম্যাডাম, আমি আপনাকে সাহায্য করছি

  নিরুপমা আলতো টান দিয়ে নিজের হাতখানা মুক্ত করে এই সাহায্যকথাটার উপর নিরুপমার বরাবরের রাগ শুনলেই ভেতরে ভেতরে কেমন জ্বালা হয় তবুও  স্বাভাবিক ভদ্রতায় বলে ওঠে ধন্যবাদ, সাহায্যের দরকার  নেই আমি একাই যেতে পারব   

  পুরুষকণ্ঠটি কথায় হাসি মেশায় আপনি পারবেন, আমি  জানি সত্যি কথা বলতে কী, আপনার সঙ্গে আমার একটু দরকার আছে বহুক্ষণ থেকে অপেক্ষায় আছি, কখন আপনি উঠবেন তাই এই সুযোগে আমি আপনার সঙ্গ নিয়েছি

  নিরুপমা সামনে স্টিক বাড়িয়ে সাবলীলভাবে এগোতে থাকে দুপাশে চেয়ার-ভর্তি মানুষ ও বেশ বুঝতে পারে, মানুষগুলোর মুগ্ধ দৃষ্টি ওর দিকে ওর চলে যাওয়া দেখছে কেউ কেউ তো কথা বলতে বা শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রণাম জানাতে আগ্রহী

  দুএকজনের কথাও কানে আসছে দিদি নমস্কার, চলে যাচ্ছেন?’ ‘দিদি, আপনার বক্তৃতা খুব ভালো লেগেছে 

  কথার উত্সস্থল বুঝে নিরুপমা সেদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে মৃদু   হাসে কাউকে বলে, 'ধন্যবাদ' কোনও দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, 'তাত্ক্ষণিক ভালোলাগা নয়, এই ভালোলাগাটুকু জীবনে সঞ্চারিত করতে হবে'   

  নিরুপমা দরজার কাছাকাছি সামনে স্টিক বাড়িয়ে এ অবধি এলেও বেশ বুঝতে পারে, সামনে পায়ে পায়ে সেই পুরুষটিও চলেছে সে সুইংডোর টেনে যাওয়ার পথ সুগম করে বলে আসুন ম্যাডাম! আমি কিন্তু আপনার সঙ্গ   ছাড়িনি

  নিরুপমা মৃদু হাসে জানি তো! বাইরে চলুন, কথা  হবে

  ভেতরে ভেতরে নিরুপমা কৌতূহলী পুরুষটি কি ওর তাত্ক্ষণিক গুণমুগ্ধ? নাকি সাহায্যপ্রার্থী? নাকি মতলববাজ? এই ত্রিশবছরের জীবনে কম মতলববাজের সঙ্গে তো মোকাবিলা করতে হয়নি! তাই কণ্ঠস্বর শুনেই বুঝে যায়, কার উদ্দেশ্য সাধু, কার সাধু নয় এ কণ্ঠস্বরে তেমন অসাধু আভাস পায়নি তাই কৌতূহল যেন বেশি

  বাইরে সূর্যডোবা নরম আলো নিরুপমার চোখের গাঢ় অন্ধকার সামান্য হালকা হয় দরজার বাইরে বেরোনোর পর পুরুষ-কণ্ঠ আবার সরব ম্যাডাম, আমি একটা নামী  দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা  বলতে চাই

  নিরুপমার সাবলীল প্রশ্ন এটা কি বক্তৃতা শুনে  তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, নাকি আপনাদের এডিটরের নির্দেশ অনুযায়ী পূর্ব পরিকল্পিত?

  আপনি ঠিকই ধরেছেন, এটা পূর্ব পরিকল্পিত আপনার লড়াকু মানসিকতার কথা কাগজে বেরোনোর পর থেকে  আপনি তো সেলিব্রিটি এডিটরের নির্দেশ আপনার একটা সাক্ষাত্কার নিয়ে আসতেই হবে সেই গুরু-দায়িত্বটা এ অধমের উপর পড়েছে তাই...!

  নিরুপমা সামনে স্টিক বাড়িয়ে সাবধানে সিঁড়িতে পা রাখে আমার মতো একজন নগন্য মানুষের সাক্ষাত্কার! মঞ্চে তো রয়েছেন ডিসেবিলিটি রাইটস সেন্টার’-এর চেয়ারপার্সন, রয়েছেনপ্রতিবন্ধী মহিলা কমিশন’-এর সভানেত্রী ওদের বাদ দিয়ে আমার সাক্ষাত্কার কেন?

  দেখুন ম্যাডাম, আমাদের কাগজ শুধু পায়াভারী মানুষের ভারী ভারী কথা ছাপতে আগ্রহী নয় আমরা এমন একজন মানুষের সাক্ষাত্কার নিতে চাই, যিনি ষোলো বছর বয়সে প্রতিবন্ধী হোম’-এ জায়গা পেতে গিয়ে, টোটাল হিস্টেরেক্টমি করানোর ফরমান শুনে প্রতিবাদ করেছিলেন এবং জরায়ু বাদ না দিয়ে হোম-এ জায়গা করে নিয়েছিলেন

  নিরুপমা বিস্মিত এসব আপনি কী করে জানলেন? আমার বক্তৃতায় তো এসব বলিনি!

  জানতে হয় ম্যাডাম, আমরা হলাম সাংবাদিক, আমাদের সাধারণের চেয়ে একটু বেশিই জানতে হয় আমি এমন একজন লড়াকু মহিলার সাক্ষাত্কার নিতে চাই, যাঁকে স্কুল সার্ভিস কমিশনে রিটন পাশ করার পর ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে শুনতে হয়েছিল, ‘ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন, দিন কিন্তু চাকরি আপনি পাবেন নাতার পরেও শিক্ষকতার চাকরিটা আপনি আদায় করে নিয়েছেন

  সিঁড়ি ভাঙা শেষ করে নিরুপমা সমতলে পা রাখে   আপনি তো দেখছি আমার সম্পর্কে অনেক তথ্যই জোগাড় করে ফেলেছেন তাহলে আর সাক্ষাত্কার নেওয়ার দরকার কী! এগুলোই ছেপে দিন!

  চলুন না, সামনের কফিসপ-এ যাই এভাবে চলতে চলতে কথা হয় না

  নিরুপমার মৃদু আপত্তি আবার কফিসপ-এ কেন? 

  না, মানে যদি আপনার আপত্তি না থাকে, তাহলে কফি  খেতে খেতে একটু কথা বলে নেওয়া যাবে

  নিরুপমার গলায় শ্লেষ আপনার আরও কি তথ্য জানা বাকী রয়েছে?

  দেখুন ম্যাডাম, আপনার সম্পর্কে তথ্য আমাদের স্টক-এ বেশ কিছু আছে কিন্তু আমরা আর পাঁচটা কাগজের মতো শুধু তথ্য বা ঘটনা ছাপি না আমরা ঘটনার অন্তরালের কারণটাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করি সেটা জন-সমক্ষে আনার চেষ্টা করি তাই আপনার সাক্ষাত্কারটা খুবই  দরকার

  নিরুপমা এবার শব্দ করে হেসে ওঠে শুনেছি,  সাংবাদিকরা নাকি নাছোড়বান্দা হন আজ না হলে কাল কিংবা পরশু, নয়তো একমাস পরে হলেও সাক্ষাত্কার নিয়েই   ছাড়বেন সুতরাং চলুন তবে কফিসপ-এ নয়, রাস্তার ওপাশের পার্কে চলুন যদিও খুব শিগগির সন্ধে নামবে তবুও চলুন ওহ্! ওখানে আমার সঙ্গে বসতে আপত্তি নেই তো আপনার?

  না না, আপত্তি কেন থাকবে? বরং সুবিধাই হবে পার্কটা নিরিবিলি, ডিস্টার্ব্যান্স কম হবে

  আমিও নিরিবিলি পছন্দ করি ওই কফিসপ-এ বসে কফি খেতে যাবো, আর আমার সুন্দর মুখখানা-তে কালো চশমা আর হাতে ব্লাইন্ড-স্টিক দেখে মানুষ মনে মনে সমবেদনা জানাবে, কিংবা অনুকম্পা দেখাবে এ আমার পছন্দ নয়

  কথাটা বলেই নিরুপমা ফিক ফিক করে হাসে সাংবাদিক  সে হাসিতে যোগ দেয় আপনি যে সুন্দরী, তাতে সন্দেহ নেই বরং কালো চশমাতে আরও ভালো লাগে! না না আমি ফ্ল্যার্ট করছি ভাববেন না সত্যিই আপনি সুন্দরী!   

  নিরুপমার গাঢ় কণ্ঠস্বর নিজের রূপ না দেখতে পেলেও আপনাদের মতো পুরুষদের চোখ দিয়ে জেনেছি, আমি সুন্দরী ভাগ্যিস দৃষ্টি দেননি বিধাতা, তাহলে কী হত বলা যায না যাক্ গে! বাদ দিন এসব কথা, চলুন! আর তার আগে বলুন, আপনাকে কী নামে সম্বোধন করব?  

  আমি অরুময়, অরুময় বসু আমাকে অরুবলে ডাকতে পারেন

  না অর্ধেক নয়, পুরোটাই চলুন অরুময়বাবু! ওহ! দাঁড়ান, তার আগে আমার সঙ্গে আসা মেয়েটিকে একটা ফোন করে নিই তা না হলে ও চিন্তা করবে সভাঘরে একটানা বকর বকর শুনতে ভালো না লাগায় ও বেরিয়ে বাইরে কোথাও বসে ফেসবুক ঘাঁটছে হয়তো! আবার এমনও হতে পারে, আমরা বেরোনোর পর ও আমাদের অনুসরণ করছে আপনি তো ওকে চেনেন না হা হা হা...!

  অরুময় লক্ষ্য করে, চোখে না দেখেও কী অবলীলায় মোবাইলফোনের বোতাম টিপে চলেছে জন্মান্ধ মহিলাটি!

  হালকা হাওয়া বইছে তাতে মিষ্টি গন্ধ পার্কটা বেশ ফাঁকা বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে গেছে বলেই হয় তো! ফুলগাছের ঝোপের আড়াল-আবডালে দুএকজনকে দেখা যাচ্ছে কেউ একা নয়, নারী ও পুরুষ জোড়ায় জোড়ায় ঘনিষ্ট হযে বসে রয়েছে তারা আশপাশে কে রয়েছে বা কারা চলাচল করছে, সেদিকে ওদের হুঁশ নেই

  অরুময় পার্কের পরিস্থিতি দেখে নিরুপমাকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঢুকতে একটু ইতস্তত করে আগে মনে পড়েনি যে, এসময় পার্কের অবস্থা এমন হয় তাই ও বলে ওঠে পার্কে তেমন লোকজন নেই, ফাঁকাই বলা চলে আপনি আনঈজি ফিল করবেন না তো?

  না না, আমার কোনও অস্বস্তি নেই, আপত্তিও নেই, চলুন আমাদেরকে দেখে বড় জোর কেউ ভাববে, অন্ধ মেয়েটা একজন যুবকের সঙ্গে প্রেম করছে তাতে আমার কিছু যায়  আসে না

  অরুময় সশব্দে হেসে ওঠে হ্যাঁ, আমারও যায় আসে না কেননা, জীবনে প্রেম তো হয়নি আমি বিন্দাস!   

  কেন? আপনার স্ত্রী নেই?

  হ্যাঁ আছে তবে তার সঙ্গে প্রেম হয়নি

  সে আবার কেমন কথা!

  আমি ঠিকই বলছি ম্যাডাম স্ট্যাটিস্টিক্স্ নিলে দেখা যাবে, এখন এইট্টি পারসেন্ট কাপল প্রেমহীন দাম্পত্য জীবন কাটায় তবে, প্রেম ব্যাপারটা আমার খুব পছন্দের আমি প্রেমের কাঙাল কেউ আমার সম্পর্কে ভাবছে যে আমি প্রেম করছি, এটা ভাবতেই ভালো লাগছে আচ্ছা ম্যাডাম! একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?

  আপনি তো কথা জিজ্ঞেস করবেন বলেই পার্ক-এ নিয়ে এলেন

  না, মানে বলছিলাম, আপনি দেখতে না পেয়েও কী করে বুঝলেন যে আমি যুবক?

  কেন! অনুভূতিশক্তি আপনার স্পর্শ, আপনার কণ্ঠস্বর... এখন তো আরও নিশ্চিত হলাম প্রেমকথাটা শুনে আপনার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করাতে

  এবার লাজুক হাসি হাসে অরুময় না না, সত্যিই  আমার প্রেম-ট্রেম করা হয়ে ওঠেনি আর হবেও না

  হবে হবে স্ত্রী-র সঙ্গে প্রেম করার চেষ্টা করুন!

  চেষ্টা করেছিলাম, বুঝলেন কিন্তু প্রেম জমে ওঠার আগেই বিয়ে করে ফেলতে হল

  আরে বাবা! বিয়ের পরেও তো প্রেম করা যায়, নাকি!

  হ্যাঁ, সে চেষ্টাও করেছিলাম এখনও চেষ্টা করে চলেছি জানেন, ওর প্রেম মানুষের সঙ্গে নয়, গাছের সঙ্গে

  সেটা কী রকম?

  পরে কোনওদিন দেখা হলে বলব

  ওর বাচ্চা-কাচ্চা নেই?

  অরুময় চুপ হয়ে যায় এর উত্তরে কী-ই বা বলার আছে এতদিন বিয়ে হওয়ার পর বাচ্চা হয়নি শুনে সেই চিকিত্সা করানোর পরামর্শ, কিংবা জরি-বুটি অথবা পীর-দরগার থানে মানত করার ফরমান জারি ছাড়া নতুন কথা কী-ই বা বলবেন উনি!

  অরুময় কিছু না বললেও নিরুপমা কী এক অদ্ভুত ক্ষমতাবলে অনুমান করে, ওর এখনো সন্তান হয়নি তাই  বলে আজকালকার দম্পতির তো একটার বেশি মানব-সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর ইচ্ছে বা সাহস থাকে না! একটা বাচ্চা নিয়ে নিন, দেরি করবেন না! আমি আমার মা-বাবার বেশি বয়সের সন্তান আমার আগে তিনজন আছে বেশি বয়সের সন্তান আমার মতো প্রতিবন্ধী হতে পারে

  অরুময় কথাটা শুনে আঁতকে ওঠে অপালার বয়স তো কম হল না! এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে এরপর যদি সন্তান হয়, সে কি পঙ্গু হবে?

  নিরুপমা অরুময়ের চোখমুখের অভিব্যক্তি দেখতে পাচ্ছে না তাই বলে চলেছে, প্রতিবন্ধী হওয়ার যে কী যন্ত্রণা, তা  আপনি নিশ্চয় কিছুটা অনুমান করতে পারছেন

  অরুময় কী ভেবে জিজ্ঞেস করে আচ্ছা! কেউ মানসিক রোগী হলে তাকে কি প্রতিবন্ধী বলা হবে?

  হ্যাঁ, সে হল মানসিক প্রতিবন্ধী তা হঠাৎ এমন প্রশ্ন?

  সে অনেক কথা আজ থাক, পরে কখনো বলব

  ঠিক আছে, থাক তবে বলছিলাম, অন্ধ মানুষটাকে আর কতখানি হাঁটাবেন? বসুন কোথাও!

  হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই তো সামনের বেঞ্চটাতে বসা যাক

  বাঁশের বেঞ্চের আদলে তৈরি কংক্রিট বেঞ্চ-এ বসতে  বসতে অরুময় বলে কফিসপ-এ তো গেলেন না! দূরে একজন চা-ওলাকে দেখা যাচ্ছে ওকে ডাকি!

  না থাক, অনেক দেরী হয়ে গেছে পার্কের গেট বন্ধ হয়ে  যাওয়ার সময় হয়ে এল একটু পরেই বাঁশি বাজবে আপনি কী জানতে চাইছেন, চটপট বলুন

  অরুময় পকেট থেকে একটা ছোট ভয়েস-রেকর্ডার বের করে সুইচ্ অন করে হ্যাঁ, প্রথমেই আমি জানতে চাইব  যে, আপনার কোনও তাড়া নেই, তবুও আলোচনা সভা শেষ না হতেই আপনি উঠে পড়লেন কেন?

  নিরুপমা একটু সময় নেয় আসলে, ওই অগভীর  আলোচনা আর ভালো লাগছিল না

  কিন্তু প্রতিবন্ধযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য সমান সুযোগ ও আইনএ বিষয়ে তো আলোচনা চলছিল সেক্ষেত্রে...!

  একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন আশা করিনি সাংবাদিকরা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি অনুমান-শক্তির অধিকারী বলে সবাই মনে করে

  না, মানে আমি অনুমান করতে পারিনি তা নয়, আলোচনা আর ভালো লাগছিল না, তাই উঠে এলেন আমি জানতে চাইব ভালো না লাগার কারণটা

  কারণ হল, সেই পুরুষশাসিত সমাজ’, ‘নারীরা পুরুষদের চেয়ে পিছিয়ে', ‘প্রতিবন্ধযুক্ত নারীরা তো আরও পিছিয়ে, এদের সমান সুযোগ ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য আইনের  সাহায্য দরকার এসব কথা বিভিন্ন সভায় এত শুনেছি যে, আর ভালো লাগে না একই কথার পুনরাবৃত্তি!  

  ম্যাডাম, বলছিলাম, বিষয় এক হলে তো একই কথার পুনরাবৃত্তি হবেই!

  না, হবে না! গৌরচন্দ্রিকাতে সংক্ষেপে পুনরাবৃত্তি হতে পারে কিন্তু আসল বক্তব্যটা তো মেধা-সমৃদ্ধ হবে! তা না হয়ে সেই সাম্য-সুরক্ষা ও সার্বিক বিকাশের জন্য কী কী বিষয় ভাবা দরকার, তার লিস্টিশুনিয়ে দেওয়া হয় আরে বাবা! ফর্দ শুনিয়ে কী হবে? সেগুলোকে কার্যকরী করার জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বা নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে আলোচনা হোক! সে বিষয়ে প্রতিবন্ধযুক্ত মানুষগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা হোক একটা আন্দোলনের প্রচেষ্টা নেওয়া হোক তা নয় ...!

  আপনি কি মনে করেন, ‘সমকামী বিবাহের স্বীকৃতির আন্দোলনকিংবা তৃতীয় লিঙ্গর বৈধতা আন্দোলন’-এর মতো এটাও একটা বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নিক? সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে একটা আইনি স্বীকৃতি আদায়  করে নেওয়া হোক?

  না, মোটেও তা মনে করি না তাতে কিছু লাভ হবে না আইন শুধু কাগজে কলমেই থাকবে আমি চাইছি, প্রতিবন্ধযুক্ত মানুষটির পারিবারিক ও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন তার জন্য একটা গণপ্রচার ও সুস্থ আন্দোলন দরকার প্রতিবন্ধযুক্ত নারীরা নারী হয়ে ওঠার পর থেকেই যে এদের সার্বিক বিকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছে এমন নয় যৌবনবতী হওয়ার পর যে এদের সুরক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে, এমনটা নয় সেই কিশোরীবেলা থেকে, আরও নিখুঁতভাবে বললে বলা যায়, প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মানোর পর থেকেই উপেক্ষা, অবহেলা, অবমূল্যায়ন চলতে থাকে এটা সরকারের বা সমাজের দোষ নয়, তার পরিবারের দোষ সে মানসিকতার পরিবর্তন দরকার

  অরুময় ভয়েস-রেকর্ডার চালিয়ে রেখে শুনে যেতে থাকে নিরুপমা বলে অরুময়বাবু, বুঝতে পারছি, কথাগুলো আপনার কাছে বেশ ভারী ভারী লাগছে সাক্ষাত্কার নয়, যেন বক্তৃতা শুনছেন মনে হচ্ছে শুনুন, এভাবে হবে না তাছাড়া আপনি এভাবে দুঁদে সাংবাদিক হয়ে চোখা চোখা প্রশ্ন করলে আমার সব গুলিয়ে যাবে আপনি বরং একদিন সময় করে আমার বাসায়, মানে আমাদের হোমে আসুন আপনি জানেন তো, আমি কোথায় থাকি?

  হ্যাঁ, ম্যাডাম ৬৭/১ বি সুখতলা রোড, হ্যান্ডিক্যাপড  রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার-

  একদম ঠিক, সব খবরই সংগ্রহ করেছেন দেখছি

  আমাদের খবর সংগ্রহ করাই তো কাজ তবে একটা খবর এখনও অবধি সংগ্রহ করতে পারিনি

  সেটা কী?

  আপনি যোগ্যতাবলে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ভালো বেতন পান ইচ্ছে করলে নিজে বাড়ি ভাড়া নিয়ে চাকর-বাকর রেখে স্বাধীনভাবে থাকতে পারেন তা না থেকে ওই রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে কেন?

  বলব বলব, সব বলব না বললেও বুঝে যাবেন কেন হোমে থাকি আগামীকাল একটা দরকারে আমি ছুটি নিয়েছি আপনি হোমে চলে আসুন আমি আরও কয়েকজনকে বলে রাখব আপনি শুধু আমার ও তাদের জীবনের কিছু ঘটনা শুনবেন আপনি কোনও প্রশ্ন করবেন না, অবাধে বলতে দেবেন আপনি একটু আগে বললেন না যে, আপনারা শুধু তথ্য বা ঘটনা ছাপতে চান না ঘটনার অন্তরালের কারণটা উদ্ধার করার চেষ্টা করেন সেই কারণগুলো পেয়ে যাবেন

  হ্যাঁ ম্যাডাম, সেটাই ভালো কাল কখন যাবো?

  আসুন না, আপনার সময় মতন! সকালের দিকে আমার একটা কাজ আছে সকালটা বাদ দিয়ে

  বিকেলবেলা, চারটে নাগাদ আসি

  ঠিক আছে, তাই আসুন চলুন, আজ ওঠা যাক

  হ্যাঁ, তার আগে আমরা মোবাইলফোনের নম্বর দেওয়া নেওয়া করে নিই

  হ্যাঁ, আপনারটা বলুন আমি মিসড কল দিচ্ছি  

  অরুময়বাবু, ওই শুনুন, সিকিওরিটির হুইসল বাজছে এবার পার্ক না ছাড়লে লাঠি-পেটা করবে

  ম্যাডাম আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, এসব আপনি  জানলেন কী করে! আপনি তো কখনও পার্কে এভাবে... মানে আপনি প্রেম-ট্রেম...

  হো হো করে হেসে ওঠে নিরুপমা বলব বলব, সব  বলব আপনি কাল আসুন তো!

  এর মধ্যে আকাশের আলো নিভে গিয়েছে পার্কের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে অরুময় পা বাড়াতেই দেখে, অদূরে একটি মেয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, একা

দুই

 

সকাল সাতটা দক্ষিণমুখী ব্যালকনির বাঁদিকের গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো তেরছাভাবে ব্যালকনিতে পড়েছে ফোল্ডিং চেয়ারে বসে দু’পেয়ে ঢাউস ঘুড়িকে ‘ধোলাই’  দেওয়ার ঢঙে অরুময় খবরের কাগজখানা দু’হাতে ধরে রেখেছে চোখের সামনে খবরগুলো কিলবিল করলেও অরুময়ের চোখ খবরে চরে বেড়াচ্ছে না কাগজের কিনারা ঘেষে ওর দৃষ্টি চরে বেড়াচ্ছে অপালার দিকে অপালার হাতে ধরা গাছে জল দেওয়ার ঝারি ব্যালকনির টবে বসানো ফুলগাছগুলোতে জল দিচ্ছে

  ও রোজই এসময় ফুলগাছে জল দেয় অরুময় রোজই কাগজ পড়ে কিন্তু রোজ এভাবে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে ওকে দেখে না কাল রাতের ঘটনার পর থেকে ওর সন্দেহটা বেড়েছে, তাই নজরদারি

  অপালা শুধু গাছে জলই দিচ্ছে না, সেইসঙ্গে আরও অনেক কিছু করছে গাছের হলদে হয়ে যাওয়া পাতা কিংবা শুকিয়ে যাওয়া ফুলগুলোকে আলতো হাতে খসিয়ে দিচ্ছে সতেজ পাতাগুলোর উপর জল ঢেলে পাতায় জমা ধুলো কিংবা পাখির বর্জ্যকে খুঁটে খুঁটে তুলে দিচ্ছে যেন মা পরম মমতায় সাতসকালে তার সন্তানকে ঘুম থেকে তুলে, চোখের পিঁচুটি ছাড়িয়ে মুখ ধুয়ে দিচ্ছে তারপর টবের মাটিতে জল ঢেলে সন্তর্পণে নাকটা নিয়ে যাচ্ছে প্রায় মাটির কাছাকাছি সেই সঙ্গে ঠোঁটদুটোও নড়ছে হাসি হাসি মুখে বলছে যেন কিছু ঠিক যেন গাছগুলোর কাছে খোঁজ খবর নিচ্ছে, রাতে ভালো ঘুম হয়েছে কি না! কিংবা ওদের এখন জলতেষ্টা ছাড়া অন্য খিদে পেয়েছে কি না!

  এই প্রথম নয়, এর আগেও অপালাকে এমন করতে দেখেছে তা দেখে হাসি-ঠাট্টাও করেছে অপালা বলেছে, হ্যাঁ, ওরা তো আমার সন্তানই ওদের বুঝি আদর-যত্ন করতে হবে না!

  অরুময় মজা করে বলেছে, আদর করছ কর, তবে আমাকে আদর করার চেয়ে ওদেরকে বেশি আদর ক’রো না! তাহলে কিন্তু আমার রাগ হবে

  আজ কিন্তু অরুময়ের মজা লাগছে না চিন্তা বাড়ছে হঠাৎ দেখে, অপালা কোনও এক টবের পাশ থেকে একটা ছড়ি বের করে নিয়ে আসে ও ভাবে, ওটা দিয়ে নিশ্চয় কোনও হেলে-পড়া গাছের মেরুদণ্ড তৈরি হবে কিন্তু না, অপালা গোলাপগাছের কাছে গিয়ে গাছটার ওপর ছড়ি দিয়ে সাঁই সাঁই করে মারছে আর গজরাচ্ছে, 'বল, বল! আর দুষ্টুমি করবি? দেখাচ্ছি মজা!' এই ব’লে ছড়ি ফেলে কোমরে আঁচলটা গুঁজে নেয় তারপর টবের কিনারা ধরে হিড় হিড় করে টেনে ব্যালকনির কোণে নিয়ে যায়

  অরুময় বলে ওঠে কী হল অপু, খারাপ কিছু?

  অপালা ফুঁসে ওঠে, খারাপ তো নিশ্চয়! খুবই ডেঁপো হয়েছে ওটা সময় সুযোগ পেলেই পাশের ক্যালেন্ডুলাটার পেছন লাগবে দেখবে এসো, বেচারির রসালো ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে কেমন ছিঁড়ে দিয়েছে ঠোঁটটা!

  অনিচ্ছা সত্ত্বেও অরুময় ওঠে ক্যালেন্ডুলার টবের কাছে যায়

  এই দেখো, এই দেখো পাজিটার কাণ্ড!

  অরুময় দেখে, ক্যালেন্ডুলার রসালো পাতায় সরু সরু কালো দাগ গোলাপের কাঁটার আঁচড়ে হলেও হতে পারে ও অপালার মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে ওর মনের মধ্যে বয়ে চলে কালো ভাবনা জড়ানো অনেক কথা সে ভাবনায় আলো মেশানোর জন্যে হাসি ফুটিয়ে বলে, দাঁড়াও, আজই আমি আমাদের নিউজ ডেস্কে ব্রিফ করে দেব ক্যাপশন থাকবে ‘ক্যালেন্ডুলার শ্লীলতাহানি!’

  অপালা রেগে ওঠে, থাক ঢের হয়েছে! তোমাকে আর সাংবাদিকতা করতে হবে না এমনিতেই তোমরা রোজ  অমানুষগুলোর শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের খবর ছেপে ছেপে ধর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছ কালকের কাগজে দেখলাম, না-মানুষকেও তোমরা রেহাই দিচ্ছ না কাগজে ছেপেছ, ‘ফুটপাতের নেড়িকুত্তাটা কাউন্সিলারের সুন্দরী ডগিটাকে একা পেয়ে রেপ করেছে’ এবার দয়া করে গাছেদের নিয়ে পড়ো না তাহলে সমাজটা উচ্ছন্নে যাবে গাছেরা এখনও অবধি মহান ওদেরকে আর...

  অরুময় জানে, অপালাকে সহজে থামানো যাবে না তাই আবার ফিরে গিয়ে চেয়ারে ব'সে প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করে আরে যা! অপু, সকালে কতিলা-ভেজানো সরবত খেতে ভুলে গেছি শিগগির চল, বানিয়ে দেবে

  থাক, চা খেয়ে ফেলেছ, আজ আর কতিলা কাজে দেবে না ‘হাঙ্গেরিয়ান হট মুভি’ দেখার পরে কি আর ‘পথের পাঁচালি’ মন ছুঁতে পারে? পারে না, ন্যাতানো মনে হয়

  অরুময়ের মনে পড়ে যায় রাতের কথা হাঙ্গেরিয়ান নয়, তবে মুভিটা খুবই হট ছিল ইচ্ছে করেই দেখা কয়েক মাসের প্রেম আর পাঁচবছরের বিবাহিত জীবনের মধ্যেই দাম্পত্যটা কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে একটু চাঙ্গা করার চেষ্টা আর কী! কিন্তু তার রি-অ্যাকশন যে এমন হবে কে জানত!

  অফিসের মুখার্জিদা’র পরামর্শ মতোই অরুময় এগোতে  চাইছিল মুখার্জিদা’ বলেছিলেন, ‘ভায়া, বছরতিনেক খেলাধুলো কর, তারপর ওসব ওঁয়া...ওঁয়া, ন্যাপি-কাঁথা বাচ্চার মা হয়ে গেলেই তো বউ কম তুলো-ভরা বালিশ! তখন আর জমবে না 

  মুখার্জিদা’র কথা মাথায় আসতেই অরুময়ের মনে পড়ে  যায় ‘খেলা’-র ডেস্কের নবারুণের কথা ও কালকেই বলেছে, ‘দাদা, সময় থাকতে বউদিকে একটু ‘সাইকি’ দেখিয়ে  নিন তা না হলে পরে বিপদে পড়বেন! এখনও তো মা হতে পারেনি, ওটাও একটা কারণ হতে পারে  

  তিনবছর পেরোনোর পর এই দু'বছর ধরে এত চেষ্টা করছে, তবুও...! এসব কথা মনে আসায় অপালার দিকে নরম চোখে তাকিয়ে অরুময় বলে ঠিক আছে, আজ না হয় কতিলা খাব না বলছিলাম কি অপু, শনিবার সন্ধেয় তোমার কোনও প্রোগ্রাম নেই তো?

  কেন?

  সেই যে বলেছিলাম না, আমার এক বন্ধু আছে নির্বেদ দাশগুপ্ত অনেকদিন থেকে যাওয়ার জন্য বলছে শনিবার সন্ধেয় তাহলে ওর ফ্ল্যাট থেকে একটু ঘুরে আসতাম

ও! সেই সাইকায়াট্রিস্ট, মানে মনোরোগের ডাক্তার! হঠাৎ  তার কাছে কেন? তোমার কোনও সমস্যা হচ্ছে? কই! আগে বলনি তো!   

  আরে বাবা, না! সমস্যা-টমস্যা কিছু নয় ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে নিমন্ত্রণ করেছিল যাওয়া হয়নি তাই...

  অপালা এখন আনমনে গোলাপগাছটাকে আদর করতে থাকে ওর চোখদুটো ছলছল করছে অরুময়ের সে দিকে কোনও খেয়াল নেই ও বলে চলে, অন্য বন্ধুরা গিয়েছিল একবার দেখা না করে এলে...! 

  অপালা গোলাপের টবটাকে কোলে নেওয়ার ঢঙে উঠিয়ে   নিয়ে গিয়ে যথাস্থানে রাখে অরু, কাল রাতে তো তোমার কাণ্ড-কারখানা দেখে মনে হচ্ছিল, তোমার সত্যিই একবার সাইকায়াট্রিস্টের কাছে যাওয়া দরকার! বিভত্স রকম উত্তেজিত হয়ে পায়ের তলায় জিভ বুলোনো, কশেরুকার শেষ প্রান্তে সুড়সুড়ি, আরও সব...! আগে তো কখনও এমন করোনি! এসব হয় তোমার ওই কলিগ মুখার্জিদা’র নতুন পরামর্শ, না হয় তোমার মানসিক বিকৃতি  

  এবার অরুময়ের মনে বয়ে যাওয়া চিন্তার ধারায় রাগের রং মেশে আর তুমি কী কাণ্ডটা করলে! সবকিছুর পরে  রাতদুপুরে জোর করে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে স্নান করালে শেষে আবার ভেজা গায়ে গান ধরতে বললে, কী যেন গানটা? ও! মনে পড়েছে, ‘তুমি মায়ের মতোই ভালো, আমি একলাটি পথ হাঁটি...’ এগুলো পাগলামি নয়!

  অপালার চোখেমুখে সাতসকালের আলো পড়েছে ফর্সা মুখখানা গোলাপী হয়ে উঠেছে ওর গোলাপী ঠোঁট নড়ে ওঠে অরু, এ হল নারীর মাতৃসত্তার বহিঃপ্রকাশ আমি  এখনো মা হতে না পারলেও আমার ভেতরে তো মাতৃসত্তা রয়েছে। চেতনার স্তর বৃদ্ধি পেলে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে কখনো-সখনো স্ত্রী তার স্বামীকে সন্তান ভেবে আদর করে তুমি তো তখন দেখোনি, জাফরির ফাঁক দিয়ে একফালি চাঁদটা আমাদের দেখে কেমন মিচিক মিচিক হাসছিল তুমি তো জান না, রাতের বেলায় আকাশের সঙ্গে বসুন্ধরা সঙ্গম করে, আকাশেরও রেতঃপাত হয় চাঁদ তো বসুন্ধরার সন্তান মায়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিল ছাড়, এসব তুমি বুঝবে না

  না বুঝব না কলেজে পড়াও ব’লে সব যেন তুমিই বোঝ! রাগের সঙ্গে কথাটা বলেও অরুময় নিজেকে সামলে নেয় চেয়ার ছেড়ে উঠে অপালার কাছে যায় ওর দু’কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বলে অপু, আর কিছু না বুঝি, তোমার গাছেদের মতিগতি এখন বেশ ভালোই বুঝতে পারি ওই যে গোলাপগাছটা দুষ্টুমি করেছে বলে ওকে সাজা দিলে! পরে আবার ওকে আদর ক'রে ওর মন ভালো করে দিলে তারপর কোলে করে নিয়ে গিয়ে ঠিক জায়গায় রাখলে!

  অপালার চোখে হাসির ঝিলিক বাঃ বাঃ! এটা তো  খুব ভালো লক্ষণ! তার মানে এবার তুমি বার্ধক্যের জড়তা কাটিয়ে ক্রমশ শিশু থেকে কিশোর হচ্ছ

অরুময় খবরের কাগজ গোছায়, বার্ধক্যের জড়তা মানে! আমি কি বুড়ো হয়ে গেছি নাকি? কাল রাতে কি...!  

  অপালা জলের ঝারি রেখে ঝাড়ু হাতে নেয়, আরে বাবা, শরীরে বুড়ো বলছি না আত্মিকভাবে বুড়ো ছিলে এবার মনের আবিলতা কাটিয়ে ক্রমশ ছেলেমানুষ হচ্ছ এটাই তো স্বাভাবিক প্রত্যেক মানুষই তাই হয়

  অপু! তুমি আবার আবোল তাবোল বকা শুরু করলে! তুমি একটু অন্যরকম ঠিকই কিন্তু ইদানীং দেখছি বেশ বাড়াবাড়ি করছ

  খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে অপালা কথাগুলো তোমার ভোঁতা মাথায় ঢুকছে না বলেই তোমার এমন মনে হচ্ছে

  এবার ফুঁসে ওঠে অরুময় হ্যাঁ, আমার মাথা তো ভোঁতাই, আমি আকাট মূর্খ কি না! যত বুদ্ধি তোমার!

  আমি মোটেও তা বলিনি এখানেও তুমি গুলিয়ে  ফেলছ আমার চেয়ে তোমার বুদ্ধি অনেক বেশি বোধ বা চেতনা এবং বুদ্ধির মধ্যে পার্থক্য আছে আবার বুদ্ধি ও বিদ্যার মধ্যেও তফাত আছে তোমার...!

  থাক, আমার বোধ-বুদ্ধির বিচার তোমাকে করতে হবে না আমি বলে দিলাম, শনিবার সন্ধেবেলায় আমার সঙ্গে তুমি নির্বেদ দাশগুপ্তর কাছে যাচ্ছ এটাই শেষ কথা 

  অপালার শীতল গলা ঠিক আছে, আমি যাব না,  একবারও তো বলিনি তবুও তুমি হুইপ করছ সেইসঙ্গে  মিথ্যাও বলছ সরাসরি বলতে পারছ না যে, 'অপু, তোমাকে সাইকায়াট্রিস্টের কাছে দেখাতে নিয়ে যাব' তার মানে, তোমার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে, সেটা গলার জোর দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করছ যদি তুমি পুরুষ হওয়ার জন্য কিংবা আমার স্বামী হওয়ার অধিকারে আমাকে সাইকায়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যেতে চাও, তাহলে কিছুতেই আমাকে নিয়ে যেতে পারবে না এসব কারণেই আলাপ হওয়ার কিছুদিন পরেই বলেছিলাম, আমরা তথাকথিত বিয়ে  করব না, যদি একে অপরকে ভালো লাগে, তাহলে একসঙ্গে থাকব সারা জীবন তাতে আবিলতা থাকবে না, অধীনতাও থাকবে না

  ওটা তোমার পাগলামি ছিল আমাদেরকে তো সামাজিক অনুশাসন মেনে চলতে হবে নাকি!

  'সামাজিক অনুশাসন' মানে তো বেশ কিছু শর্ত আর নানারকম চক্রান্ত তাই আমাদের মধ্যে প্রেম-ট্রেম জন্মানোর আগেই দুম্ করে বিয়ে করে ফেললে! এটাও এক চক্রান্ত

  চক্রান্ত?

  হ্যাঁ, মিথ্যে বলার চক্রান্ত, হৃদয়ের সত্যকে গোপন করার চক্রান্ত, অন্যকে ভালোবাসার ক্ষমতা থাকলেও এবং ভালোবাসলেও তাকে অবৈধ বলার চক্রান্ত, আর এই যে এখন যেটা করছ, সেটা হল, অধিকার ফলানোর চক্রান্ত

  অপু, সবেতেই তুমি চক্রান্ত খুঁজে পাও কিন্তু সামাজিক নিয়ম মেনে বিয়ে না করে একসঙ্গে বাস করলে বিরূপ সমালোচনা শুনতে হয় তাছাড়া তাতে সুবিধাটাই বা কী?

  সুবিধাটা যে কী, তা চোখ ও মন খোলা থাকলেই বোঝা যায় কিছু মানুষ ছাড়া এ বিশ্বব্রহ্মান্ডের আর কেউ কি এমন শর্ত আরোপ করে বিয়ে করে! আদিম উপজাতি মানুষদের কথা ভাবো, তারা কি বিয়ে করে! অথচ তারাও তো একসঙ্গে বাস করে পশু-পাখিরাও প্রেম করে, লিভ-টুগেদার করে কনজুগাল লাইফ লিড করে তাদের তো ম্যারেজ রেজিস্ট্রি করার প্রয়োজন হয় না গাছপালারাও প্রেম ক’রে একসঙ্গে থাকে, তারা তো শর্ত আরোপ করে না তাদের মধ্যে কোনও বৈকল্য দেখেছ কি? তারা নিয়ম-নিগড়ের বন্ধনে বাঁধাও পড়ে না, তাই তাদের নিয়মের শিকল ভাঙারও প্রয়োজন হয় না অধিকার ফলানোরও প্রয়োজন হয় না

  ঠিক আছে বাবা! বুঝেছি আমি অধিকার ফলাচ্ছি না তুমি আমার স্ত্রী হলেও বন্ধু তো! বন্ধুর ভালো করার বা ভালো ভাবার দাবী তো থাকে সে হিসাবে দাবী করছি যে, একবার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করার দরকার আছে এবং তুমি শনিবার সন্ধেয় আমার সঙ্গে নির্বেদ দাশগুপ্তর কাছে যাবে

  হ্যাঁ যাবো কেন না, আমারও বন্ধুকৃত্য করা দরকার তোমার মনে প্রচুর আর্বজনা জমা হয়েছে তাই বৃদ্ধ মনটা শিশু থেকে কৈশোরের দিকে যেতে বাধা পাচ্ছে সেগুলো পরিস্কার করা দরকার তোমার প্রাণসত্তা মহাপ্রাচীন প্রাণ-প্রবাহ থেকে বিচ্যুত হয়ে এক আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, তাকে আবার শাখা-প্রবাহে ফিরিয়ে আনা দরকার তবে তো সে সময়মতো মহাপ্রবাহে মিলিত হতে পারবে!

  অপালা বিড়বিড় করে আরও কিছু বলতে থাকে অরুময় ওর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে আর ভাবে, শনিবার কোনও অজুহাত শুনবে না নির্বেদের কাছে ওকে দেখাতে নিয়ে যাবেই এরকম মানসিক রোগীর সঙ্গে কতদিন অ্যাডজাস্ট করে চলা যায়! একদিন না একদিন তো ধৈর্যচ্যুতি ঘটবেই! তাছাড়া মনোরোগকে প্রশ্রয় দিলে তা ক্রমশ বাড়তে থাকে

  অপালা এবার ক্যালেন্ডুলার টবটার পাশে গিয়ে থাপন গেড়ে বসে এখন সূর্যটা আরও উপরে উঠে গিয়েছে তাই ব্যালকনিতে রোদ্দুর নেই শুধুমাত্র ঝকঝকে আলোয় ভরা অপালার মুখখানাও কেমন আলোময় ও টবটাকে কোলে তুলে নেয় রসালো পাতাগুলো খুঁটিয়ে দেখতে থাকে, আর মৃদুগলায় আদর-সূচক কথা বলতে থাকে একসময় মাথা ঝুঁকিয়ে পাতায় চুমু খায়

  অরুময় চেয়ারে বসে আড়চোখে অপালাকে লক্ষ্য করতে থাকে এই মুহূর্তে অপালাকে ঠিক যেন মা-মা লাগছে যেন বাচ্চাকে কোলে বসিয়ে সোহাগ করে তার কপালে চুমু খাচ্ছে! ওর মনটা হঠাৎ ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে অপালার প্রতি কেমন এক মমত্ব অনুভব করে বেচারি সত্যিই দুঃখী পাঁচ-পাঁচটা বছর দাম্পত্য জীবন পালন করেও মা হতে পারল না অথচ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিত্সা তো কম করানো হয়নি! ওর নিজের পরীক্ষাও করিয়েছে কোনও দোষ ধরা পড়েনি কিন্তু...!  

  অরুময়ের হঠাৎ মনে পড়ে যায় নিরুপমার কালকের কথাগুলো, 'আর দেরী করবেন না বেশি বয়সে সন্তান  ধারণ করলে বাচ্চা প্রতিবন্ধী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে'

  বাইরে এতো আলো, তবুও অরুময়ের মনের মধ্যে অন্ধকার ছড়ায় কাল নিরুপমা বলল, মনোরোগীকে  মানসিক প্রতিবন্ধী বলা হয় তার মানে, অপালা এক অর্থে প্রতিবন্ধী তাহলে যদি ওর সন্তান হয়, সেও কী...!

 

তিন

 

ঘরখানা ছোট হলেও সুন্দর করে সাজানো একপাশে একটা সিঙ্গল ডিভান সাদা ধপধপে বিছানা পাশে গোটা চারেক মোল্ডেড চেয়ার ডিভানের পাশে আলনা কাম ওয়ার্ডরোব পরিপাটি করে গোছানো কিছু পোশাক-আশাক সবই মেয়েদের আলনার শেষ প্রান্তে শাড়ি-সায়া-ব্লাউজের পাশে বিসদৃশভাবে ঝোলানো একটা শ্যাওলা রঙের কোট সেটা এতটাই বড় যে, বোঝা যায়, ওটা নিরুপমা বা কোনও মহিলার হতেই পারে না তার ডিজাইন জানান দেয় যে, ওটা কোনও দশাসই চেহারার পুরুষের ঘরে ঢুকে প্রথমেই অরুময়ের চোখ আটকায় ওই কোটটাতে খুব স্বাভাবিকভাবেই ওর মনে জাগা প্রশ্ন ঠোঁটের আগায়   ম্যাডাম, এ কোটখানা কার?  

  নিরুপমা হালকা হাসে ঘরে ফুলভরা ফুলদানি, ফুলের  মতো সুন্দর এতগুলো মেয়ে, সেসবে চোখ না পড়ে প্রথমেই চোখ গেল ওটাতে? সাংবাদিক তো! সবকিছুতেই গন্ধ শোঁকার চেষ্টা আর কী 

  অরুময় অপ্রস্তুত না ম্যাডাম, সেসব কিছু নয় এমনিই, স্বাভাবিক কৌতূহল বশত...!

  ওটা আমার বাবার কোট গত শীতে ওটা গায়ে দিয়ে  আমাকে দেখতে এসেছিলেন কথা বলতে বলতে খুলে রেখেছিলেন নিয়ে যেতে ভুলে গেছেন আমি আর ফেরত দিইনি বাবার স্মৃতি...

  বাবার স্মৃতি!  মানে আপনার বাবা কি...? 

  না, বাবা গত হননি কিন্তু আমাদের এখানে অনেকদিন পর পর আসেন তাই মাঝের দিনগুলো স্মৃতি আঁকড়েই থাকতে হয় ওই যে, ওই মেয়েগুলোর মধ্যে স্বপ্না রয়েছে ওর বাবা শেষ ওর সঙ্গে দেখা করে গেছেন ছ’মাস আগে অথচ তিনি থাকেন এখান থেকে মাত্র দু’ঘন্টার দূরত্বে

  সে কী!

  হ্যাঁ, অবাক হওয়ার কিছু নেই মা-বাবাদের কাছে আমরা বাতিলের খাতায় এখন নয়, যখনই ওঁরা জানতে পেরেছেন যে, ওদের সন্তান প্রতিবন্ধী, তখন থেকেই হয়তো আপনার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে না কিন্তু আমার বা এদের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা যখন শুনবেন, তখন নিজেই অনুভব করবেন আসুন, এখন কয়েকজনের সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দিই তার আগে রাবেয়া, দরজাটা বন্ধ করে দে তো!

  অরুময় একটু ভ্যাবাচেকা খায় ঘরে গোটা পাঁচেক মহিলা, ও একা পুরুষ!

  ও কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই দরজা বন্ধ করার  কৈফিয়ত হিসাবে নিরুপমা বলে আপনি এখানে এসেছেন আমার খুড়তুতো দাদা হয়ে আমাকে দেখতে আপনি একটা এন জি ও-র সঙ্গে যুক্ত এখানকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসের জন্য অনুদানের ব্যবস্থা করবেন এই শর্তে আপনার প্রবেশের অনুমতি বুঝেছেন? আপনি একজন সাংবাদিক জানতে পারলে এখানে ঢোকার দরজা আপনার জন্য বন্ধই থাকত তাই সাবধানতার জন্য এখন দরজা বন্ধ করতে হল নিন, এখন একটা চেয়ারে বসুন তো! ঘরে ঢুকে হাবার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন?  

  অরুময় ভাবে, ও যে না বসে দাঁড়িয়ে রয়েছে, অদ্ভুত ক্ষমতায় সেটা ও বুঝতে পারছে। ঈশ্বর সত্যিই অন্ধদের বিশেষ ক্ষমতা দেন। ও একটা স্বস্তিবাচক শব্দ করে চেয়ারে বসে ঘরের চারপাশে চোখ চাড়ায় অন্য চারজন মহিলার দিকে আড়চোখে দেখতে থাকে

  নিরুপমা গলার স্বর পাল্টিয়ে বলে অরুময়বাবু, হুইল  চেয়ারে বসে আছে যে মেয়েটি, ওর নাম স্বপ্না ও এখানে এসেছে মাত্র এগারো মাস হল এর মধ্যে ও এখানে সাতবার ধর্ষিতা হয়েছে

  অরুময় চমকে ওঠে কী বলছেন আপনি!

  স্বপ্না লজ্জিত হয় থাক না দিদি এসব কথা উনি  আজ প্রথম এলেন আমার খুব লজ্জা লাগছে

  নিরুপমার গাঢ় গলা না স্বপ্না, উনি একজন  সাংবাদিক এসব জানাবো বলেই ওকে নিয়ে এসেছি শুনুন অরুময়বাবু! একটুও বাড়িয়ে বলছি না অসহ্য যন্ত্রণা ও কষ্ট ও ছ’বার সহ্য করেছে সাতবারের বেলায় কোনক্রমে শরীরটা টেনে হিঁচড়ে আমার কাছে পালিয়ে আসতে পেরেছে

  এ তো মারাত্মক অপরাধ! এর কোনও প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ...! কিংবা আপনাদের কাছে কোনও মিডিয়ার দপ্তরের নম্বর নেই? 

  তাতে কোনও লাভ হবে না প্রমাণ করা যাবে না যে, অত্যাচারিতা হয়েছে তাতে মেয়েটার ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে তবে আমি হাল ছাড়িনি সে শয়তান ঝাড়ুদারটাকে কোনও সাজা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়তো করতে পারিনি, কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখান থেকে তাকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে

  ঝাড়ুদার!

  হ্যাঁ, সুইপারভাইজার থেকে ঝাড়ুদার কেউই বাদ দেয় না এসব আপনারা জানেন না, জানার চেষ্টাও করেন না

  আচ্ছা, স্বপ্নার বাড়ির লোককে এসব জানানো হয়নি?

  জানালেও কোনও লাভ হত না বাড়ির লোক ওকে বাড়িতে রাখতে চাইছে না বলেই তো হোমে পাঠিয়েছে হোমের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝামেলা করলে তো ওরা ওকে এখানে আর রাখবে না জমা দেওয়া টাকাও ফেরত দেবে না অন্য হোমে রাখতে গেলে আবার এককাঁড়ি টাকা লাগবে তাই বাড়ির লোক হোমের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থাই নিত না

  অরুময়ের গলায় আক্ষেপতাই বলে দিনের পর দিন...!

  হ্যাঁ, এটাই সত্যি আর এসব নোংরামির জন্যই তো হোমে কোনও মেয়েকে জায়গা পেতে হলে জরায়ু কেটে বাদ দিলে তবেই নেওয়া হয়, যাতে ওরা কখনও না ফাঁসে এটাই এখন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে

  হ্যাঁ, এরকম কথা শুনেছি, এবং সেদিন বলেওছি আপনাকে আপনিই একমাত্র নারী, যিনি এর প্রতিবাদ করে, টোট্যাল হিসটেরেকটমি না করে, হোমে জায়গা করে নিয়েছেন আমি ব্যাপারে ডিটেলস- আপনার কাছে শুনতে চাইতাম প্রসঙ্গক্রমে এখনই তা উঠে গেল

  নিরুপমা ঘাড় নাড়েঅরুময়বাবু, প্রসঙ্গ এলেও ব্যাপারে আমি এখন কোনও কথা বলব না আপনার সঙ্গে পরে দেখা করে বলব এখন যে কাজের জন্য আপনাকে এখানে আসতে বলেছি, সেটা চটপট সেরে ফেলুন যে কোনও মুহূর্তে আপনাকে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হতে পারে

  অরুময় কেমন ভড়কে যায়যে কাজের জন্য মানে...? আমি তো আপনার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছি

  আমার সাক্ষাৎকার আপনি বাইরে কোথাও নিতে পারবেন কিন্তু মেয়েগুলো তো আমার মতো চাকরি করে না, বাইরেও বেরোয় না আমি চাইছি ওদের মুখ থেকে আপনি ওদের জীবন-যন্ত্রণার কথা শুনুন শুধু শোনা নয়, আপনার ভয়েস রেকর্ডারে রেকর্ডও করে নিন কেন না, এই চাঞ্চল্যকর খবর ছাপার পর আপনাদের কাগজ বা আপনার উপর প্রেসার আসবে তখন প্রমাণ করতে আপনার সুবিধা হবে

  অরুময়ের গলা কাঁপেমানে আমি... মানে আপনি আমাকে দিয়ে...!

  আপনি ভয় পাচ্ছেন অরুময়বাবু! হয়তো কয়েকদিনের মধ্যেই খবর হবে, ‘প্রতিবন্ধী হোমের আবাসিক যুবতির অস্বাভাবিক মৃত্যু কিন্তু সে ঘটনার পিছনে কারণ কী সেটা জানার জন্যই... আপনি কাল বিকেলেই তো বললেন যে, আর পাঁচটা কাগজের মতো আপনারা শুধু ঘটনা ছাপেন না ঘটনার অন্তরালের কারণটাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন তাই আপনাকে নিয়ে আসা কিন্তু আপনি...!

  অরুময় গলার জোর আনার চেষ্টা করেনা না, আমি ভয় পাচ্ছি না আমি ভাবছি যে, আমার একার পক্ষে কতখানি করা সম্ভব? বিশেষত একজন প্রিন্ট মিডিয়ার লোকের পক্ষে এক্ষেত্রে একজন টিভি মিডিয়ার সাংবাদিকের দরকার ছিল শুধুমাত্র একটা ভয়েস রেকর্ডারের ওপর ডিপেন্ড করে..

  অরুময়বাবু! যা করার আমিই করব আপনি শুধু একটু সহযোগিতা করবেন তা হলেই টিভি মিডিয়ার সাংবাদিক আসতে বাধ্য হবে আসলে আমি অন্ধ তো! একজন চক্ষুষ্মান লোকের সহযোগিতা আমার দরকার আপনি এক কাজ করুন, আপনি বরং এদের সঙ্গে ইনডিভিজুয়ালি কিছু কথা বলে নিন অনেক কিছু জানতে পারবেন আর একটা কথা, এর মাঝে যদি অন্য কেউ ঘরে আসে, আপনি কথা থামাবেন না শুধু প্রসঙ্গটা বুদ্ধি করে পাল্টে দেবেন এমনভাবে যে, আপনি আবাসিকদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়ার লিস্ট বানাচ্ছেন

  ঠিক আছে ম্যাডাম, কথা বলে নিচ্ছি আপনার সাক্ষাৎকারটা কিন্তু ...

  সে পড়ে হবে স্বপ্নার কথা তো আপনাকে বললাম এখানে আরও রয়েছে রাবেয়া, মিনতি জবা ওদেরকে দেখে বুঝতে পারবেন না যে, ওরা প্রতিবন্ধী রাবেয়া বোবা, কিন্তু কালা নয় যথেষ্ট বুদ্ধিমতি এবং সাহসী ওকে কোনও প্রশ্ন করলে ইশারায় উত্তরটা ঠিক বুঝিয়ে দেবে মুর্শিদাবাদের মেয়ে ওর চাচাতো ভাই ওকেনিকেকরবে বলে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে এসেছিল কলকাতার হোটেলে তুলে মাসখানেক ফুর্তি করেছে তারপর হোটেলের ঘরে ছেড়ে পালিয়েছে অনেক ধকল সহ্য করার পর, অনেক ঘাটের জল খেয়ে শেষে হোমে ঠাঁই পেয়েছে হোটেলের ঘরে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল শরীরে চোটও ছিল কয়েক জায়গায় যাবার আগে ওর চাচাতো ভাই বোধহয় ওকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু মরেনি হোটেলের ম্যানেজার পুলিশে খবর দিয়েছিল পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল হাসপাতালে ওর কপাল ভালো যে, একটা দয়ালু ডাক্তারের হাতে পড়েছিল সবকিছু শোনার পর, পুলিশের কাছে মুচলেকা দিয়ে ডাক্তার ওকে নিয়ে এসে এই হোমে রেখেছেন উনি দুএকবার ওকে দেখতেও এসেছিলেন আর আসেন না কিন্তু হোমের ডোনেশনটা ঠিক পাঠিয়ে দেন তাই এখানে রাবেয়াকে রেখেছে আর রয়েছে মিনতি ছোটবেলায় পোলিও হয়ে ওর ডানহাতখানা গেছে একদম অসাড়, শুকনো ওর বাবা নেই, বিধবা মা আছে ওর বিয়ে দেওয়ার কোনও সঙ্গতি নেই মায়ের, এমনকি খাওয়ানোরও বসত বাড়িটা বিক্রি করে হোমে এককালীন টাকা জমা দিয়ে মেয়েকে রেখে মা উধাও হয়েছে হয়তো কোথাও ভিক্ষা করছে কিংবা... আমি এই চৌদ্দটা বছর ধরে কত কিছু যে দেখলাম! সহ্যসীমা অতিক্রম করে গেছে

  কথা বলতে বলতে নিরুপমার গলা ধরে আসে অরুময় বলে ওঠেথাক ম্যাডাম, আমি ওদের সঙ্গে কথা বলে নেব আপনি একটু শান্ত হন আপনার কষ্টটা আমি বুঝতে পারছি

  নিরুপমা শাড়ির আঁচলে চোখ মোছেঠিক আছে, আপনি কথা বলুন আমি ওদিকে যাই সিকিওরিটি ছেলেটাকে একটু ম্যানেজ করি তা না হলে, ‘আধঘন্টা হয়ে গেছে, এবার যেতে হবে', বলে তেড়ে আসবে

  নিরুপমা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর অরুময় ঘরের অন্যদের দিকে ভালভাবে তাকানোর ফুরসত পায় আলতো চোখ বুলোয় মেয়েগুলোর দিকে ভাবে, ওদেরকে মেয়ে না বলে যুবতী বলাই সমীচীন পঁচিশের নীচে কারও বয়স হবে না প্রথমেই যে উঠে দরজা বন্ধ করেছিল, সে রাবেয়া হুইল-চেয়ারে বসে থাকা মহিলাটির নাম বলল স্বপ্না বাকি দুজন মিনতি আর জবা মিনতির নাকি ডানহাত প্যারালাইজড কিন্তু ওদের গায়ে শাড়ির আঁচল জড়ানো থাকায় বোঝা যাচ্ছে না কার ডানহাত শুকিয়ে গেছে

  অরুময় অনুমান করে একজনের দিকে তাকিয়ে বলেআপনি বোধহয় মিনতি?

  না, আমি জবা, মিনতি

  ! আপনি জবা কতদিন হল আপনি হোমে এসেছেন?

  তেরো বছর

  তেরো বছর! আপনার পরিবারে আর কেউ নেই? মানে বাবা মা কিংবা...?

  জবা হাত কচলায়আছে, তারা আমার সঙ্গে এখন আর তেমন যোগাযোগ রাখে না দুর্গাপুজোর আগে একবার এসে শাড়ি দিয়ে যায় শুধু আর দিয়ে যায় হোমের একবছরের ডোনেশন

  বলছিলাম, আপনার পরিবারের সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করে না?

  প্রথম প্রথম করত, এখন আর করে না

  আচ্ছা, আপনাকে এই রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে রাখা হয়েছে কেন? মানে আপনার কী অসুবিধা?

  ছোটবেলায় রিকেট হয়ে আমার দুটো পা বেঁকে গিয়েছে আমি স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে পারি না বসে আছি লে দেখে বুঝতে পারছেন না

  কোনও চিকিৎসা হয়নি?

  হয়েছিল, তেমন লাভ হয়নি ওয়াকিং অ্যাপারেটাস লাগানো ছিল অনেকদিন এখানে আসার পর সেসব খুলে ফেলে দেওয়া হয়েছে

  জবা, আপনার ফ্যামিলি কি খুব গরিব? মানে বাড়িতেই তো আপনাকে রাখা যেতে পারত অথচ...!

  না, আমার বাবা গরিব নয় তাহলে তো এখানেও থাকতে পারতাম না এখানে থাকতে তো টাকা লাগে আমার বাবা-মা দুজনেই চাকরি করে প্রতিবন্ধী মেয়েকে একা বাড়িতে রাখা অসুবিধা, তাই হোমে ব্যবস্থা করা হয়েছে তাছাড়া আমার একটা বোন আছে সে আমাকে মোটেও সহ্য করতে পারে না একা পেলেই মারে তাই আমার ভালোর জন্যই...

  আপনার কি মনে হয়, বাড়ির চেয়ে আপনি এখানে ভালো আছেন?

  জবা কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে অরুময়ের দিকে তারপর ধরা গলায় বলেভালো মন্দ বুঝি না, বেঁচে আছি, এটুকু বলতে পারি বাড়িতে থাকলে হয়তো এতদিনে...

  আপনি তো বললেন, এখানে তেরো বছর ধরে আছেন তার মানে আপনি তো খুব অল্প বয়সেই এখানে...

  হ্যাঁ, আমার যখন তেরো বছর বয়স তখন বাবা-মা এখানে রেখে যায় সেই থেকেই...

  তাহলে আপনার পড়াশোনা বা শিক্ষা-দীক্ষা?   

  বাড়িতে থাকতেই অক্ষর পরিচয় হয়েছিল পাড়ার মিউনিসিপ্যাল ইস্কুলে ক্লাস ফোর অবধি পড়েছিলাম হাই ইস্কুলেও ভর্তি করে দিয়েছিল কিন্তু সহপাঠীদের জ্বালাতনে ইস্কুল যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম এখানে আসার  পর এদের ইস্কুলে কয়েক বছর পড়িয়েছিল এইট পাশের সার্টিফিকেটও দিয়েছিল কিন্তু এখন অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল কিচ্ছু মনে নেই শুধু বাংলা পড়তে পারি লিখতেও পারি সামান্য আসলে এরা লেখাপড়া শেখানোর চেয়ে কাজ শেখানোতে বেশি জোর দেয়  

  কাজ শেখায়? আপনাকে কী কাজ শিখিয়েছে?

  আমাকে প্রথমে দিয়েছিল গ্লাভস ডিপার্টমেন্টে মানে হাতের দস্তানা তৈরির জন্যে ডাইস পেতে পেতে কাপড় কাটতে হত কিন্তু আমার পায়ের অসুবিধার জন্যে কাজ ঠিকঠাক করতে পারতাম না তারপর দিল খেলনা তৈরির কাজ ফোম, ফার, ভেলভেট কাপড় এসব দিয়ে টেডি বিয়ার, স্কুবিডু ডগ এসব তৈরি করতে হয়  

  এর জন্য আপনাদের কোনও পারিশ্রমিক দেয়?

  পারিশ্রমিকমানে?

  মানে মজুরি, টাকা?

  জবা কেমন চুপচাপ হয়ে যায় অরুময় বলে ওঠেকী হল? কিছু বলছেন না যে! মজুরি দেয় না, তাই তো? আপনারা পরিশ্রম করছেন, মজুরির কথা বলেন না?  

  মিনতি বলে আমি একবার মজুরির কথা বলেছিলাম কেন না আমার তো কেউ নেই মাসে মাসে কেউ দেখতে আসে না কোনও টাকা পয়সাও পাই না কিন্তু খাওয়া-পরা, থাকার জায়গা থাকলেও নিজের প্রয়োজনে কখনো সখনো টাকা লাগে তাই কাজের বিনিময়ে মজুরি চেয়েছিলাম

  মজুরি পেয়েছিলেন?

  পেয়েছিলাম, মজুরি চাওয়ার শাস্তি তিনদিন জল ছাড়া আর কিছু খেতে দেয়নি শুনিয়েছিল, এবার শুধু উপোস করিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল বেশি বাড়াবাড়ি করলে মন্ত্রীর বাড়িতে এক সপ্তাহ কাজ করতে পাঠানো হবে

  মন্ত্রীর বাড়িতে? কী কাজ?

  জবা বলে, ওই রাবেয়া জানে কী কাজ সেই ঝাড়ুদারের বিরুদ্ধে মুখ খোলায়, ওকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এক মন্ত্রীর বাড়িতে সাতদিনের কাজে পাঠানো হয়েছিল যখন ফিরে এল, তখন ওর আর দাঁড়ানোর শক্তি নেই টয়লেট যেতেও কষ্ট হচ্ছে বুঝে নিন কী কাজ

  মাই গড! এসবের জন্য আর কেউ প্রতিবাদ করেনি? বড়রা বা আপনাদের ওই নিরুপমাদিদি?

  এমন সময় নিরুপমা দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকেঅরুময়বাবু, সিকিওরিটি ছেলেটাকে আমি ম্যানেজ করে এসেছি তবে, খুব বেশি সময় পাবেন না আপনি ওদের সঙ্গে একটু তাড়াতাড়ি কথা বলে নিন আমার সঙ্গে কথা পরে হবে

  ম্যাডাম, আমি এদের সঙ্গে মোটামুটি কথা বলে নিয়েছি এদের ক্রাইসিস এক্সটরশনটা ধরতে পেরেছি কিন্তু এত অল্প সময়ে তো ডিটেলস জানা সম্ভব নয় বেশ কয়েকটা ইনডিভিজুয়াল সিটিংয়ের দরকার আর সেটা এখানে না হয়ে বাইরে কোথাও হলে স্বচ্ছন্দ্যে কথা বলা যায় তবে আমি ভাবছি অন্য কথা

  কী কথা?

  ভাবছি, শুধুমাত্র এই হোমের মালিকগোষ্ঠী নয়, এর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীও জড়িত এরকম এক বিশাল শক্তির সঙ্গে আপনি, আমি বা আমার সংবাদপত্র কি লড়াইয়ে দাঁড়াতে পারবো?

  নিশ্চয় পারবো অরুময়বাবু সংবাদপত্র সঙ্গে থাকলেই তা সম্ভব হবে সংবাদপত্রের মাধ্যমে শুভবোধসম্পন্ন মানুষকে দলে আনতে হবে তাদের দিয়েই প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে আপনি বা আপনাদের কাগজ যদি তাতে সম্মত হয়, তবেই আমি আপনাদের কাগজে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দেব আদারওয়াইজ...

  না, আদারওয়াইজ বলে কিছু নেই আমি এতক্ষণের সব কথা রেকর্ড করে নিয়েছি এডিটরকে শোনাই উনি কী বলেন দেখি তবে, আমার মনে হয় উনি রাজি হবেন আপনার হয়তো মনে আছে, শান্তিচরের সেইকুমার ব্রহ্মচারী’- কেসটা আমাদের কাগজই তো সত্যিটাকে বের করে জনসমক্ষে আনল আশা করি, এডিটর পিছপা হবেন না  

  ঠিক আছে, রাজি থাকলেই ভালো আমি আমার মতো করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছি আপনি আপনার কাগজকে পাশে পেলে ভালো লাগবে আর আপনি সেদিন জানতে চাইছিলেন না, আমার প্রতিবাদ লড়াকু মানসিকতার কথা, সেসব বলব আগামী বুধবার ওই পার্কে আসুন, আমি স্কুল থেকে একটু আগে বেরিয়ে পার্কে পৌঁছে যাব এর মধ্যে আপনি আপনার এডিটরকে কনভিন্স করুন সমাজসেবার নামে এরকম একটানা ক্রাইম করে যাওয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা একজনের সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে

  সে বোধটা আছে বলেই তো আমার অ্যাসাইনমেন্টের বাইরে এখানে এসে আপনাদের কথা শুনছি এরা স্বপ্না, রাবেয়া, মিনতি, জবা না হয়ে আমার বোনও হতে পারত তখন কি রুখে না দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম! আপনি কিচ্ছু চিন্তা করবেন না এদের মুখোস খুলেই ছাড়বো শুধুমাত্র এ-হোম নয়, এরকম অজস্র নন-গভর্নমেন্ট অরগ্যানাইজেশন সমাজসেবার নামে প্রতিনিয়ত ক্রাইম করে যাচ্ছে তাদের কাছে একটা বার্তা পৌঁছনো দরকার

  আমিও তাই চাই আপনাকে পাশে পেয়ে ভালো লাগছে চলুন, আজ ওঠা যাক অন্যদিন আসার অনুমতি পাওয়ার রাস্তাটা খোলা রাখাই ভাল

  হ্যাঁ, চলুন স্বপ্না, রাবেয়া, জবা, মিনতি তোমরা, না না, আপনারা হতাশ হবেন না নিশ্চয় একদিন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে

  স্বপ্নারা সমস্বরে বলে ওঠেদাদা, আমাদেরকে তুমি বলবেন বোনকে কি কেউ আপনি বলে!

  অরুময় ম্লান হেসে নিরুপমাকে অনুসরণ করতে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলেআচ্ছা, তোমরা আমার কাগজের অফিসের নাম্বারটা লিখে রাখো হঠাৎ কোনও দরকার হলে, আমাকে না পেলে এই নাম্বারে ফোন করবে কাগজ-পেন নেই? দাঁড়াও আমি কার্ড দিচ্ছি

  অরুময় যখন রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থেকে বেরিয়ে আসে, তখন রাস্তায় দ্বিতীয় অফিস টাইমের ব্যস্ততা অফিস-ফেরতা মানুষ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘরে ফেরার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে

 

                            চার

 

বুধবার বিকেল পাঁচটা নাগাদ নিরুপমা নাগরিক পার্কে এসে পৌঁছেছে স্কুল থেকে বেরোনোর সময় অরুময়কে ফোন করে মনে করিয়ে দিয়েছে অরুময় জানিয়েছে, আজ শহরে রাষ্ট্রপতি এসেছেনপ্রেসিডেন্টস স্পিচকভার করার জন্য ওকে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছে তবুও পার্কে অবশ্যই আসছে হয়তো একটু দেরি হবে সেদিন দুজনে যে বেঞ্চিটাতে বসেছিল, ঠিক সেই বেঞ্চিটাতেই বসে রয়েছে নিরুপমা পার্কে অনেকেই রয়েছে, ঘোরাফেরা করছে কিংবা বসে গল্পগুজব করছে, বোঝা যায় তাদের কথাবার্তার শব্দে পৌঁনে-টা নাগাদ হন্তদন্ত হয়ে অরুময় পার্কে ঢোকে অরুময় কিছুটা দূরে থাকতেই নিরুপমা একটু নড়চেড়ে বসে এবং বলে ওঠেআসুন অরুময়বাবু

  অরুময় অবাক তো কোনও কথা বলেনি এখনও অথচ নিরুপমা কী করে বুঝে ফেলল যে, আসছে এবং ওঁর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে! তবে কি নিরুপমা পুরোপুরি অন্ধ নয়? কম হলেও দেখতে পায়? অরুময় নিরুপমার পাশে বসে কথাটা জিজ্ঞেস করেই ফেলে

  নিরুপমা কষ্টের হাসি হাসেআপনার কি মনে হয় যে, আমি অন্ধের অভিনয় করছি! দেখুন, আপনি সাংবাদিক সাধারণ মানুষ যা-কিছু যেমনভাবে দেখে, আপনি তো তাদের চেয়ে অন্যরকম ভাবে দেখেন কার্য-কারণ সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেন এটা আপনাদের আলাদা একটা শক্তি বা বৈশিষ্ট্য তেমনি যারা অন্ধ, তাদের মধ্যে ঈশ্বর এমন এক শক্তি দিয়ে রেখেছেন যে, সেটা দিয়ে তারা অন্ধত্বের অসুবিধাটাকে কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পারে জন্মান্ধদের শ্রবণ-অনুভূতি, স্পর্শ-অনুভূতি, এমনকি ঘ্রাণ-অনুভূতিশক্তিও সাধারণের চেয়ে বেশি আপনার পায়ের শব্দ, অর্থাৎ চলার যে ছন্দ, সেটা আমার পরিচিত হয়ে গেছে তার সঙ্গে অনুমান শক্তি পূর্বনির্ধারিত নির্ঘন্ট বিবেচনা করলেই তো বুঝতে পারা যায় যে আপনি আসছেন

  আশ্চর্য! স্যরি ম্যাডাম, আমি এতটা গভীর ভাবে ভাবিনি

  না না, এতেস্যরিহওয়ার কিছু নেই আর আমিও দুঃখ পাইনি এসব কথা এখন বাদ দিন কাজের কথায় আসা যাক

  হ্যাঁ, বলুন

  বলবেন তো আপনি! আপনার এডিটরমশাইকে সেদিনের ভয়েস-রেকর্ডিং শুনিয়েছেন?

  হ্যাঁ, শুনিয়েছি

  কী বললেন উনি?

  উনি তো খুবই উত্তেজিত বললেন, এরকম কাজ উনি খুব সিরিয়াসলি করতে চান ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এগিয়ে যেতে হবে তবে, তার জন্য প্ল্যান-মাফিক এগোতে হবে না হলে হাটে হাঁড়ি ভাঙা যাবে না

  কীরকম?

  বললেন যে, এরকম সংস্থাগুলো বেশিরভাগই রাজনৈতিক দল বা নেতার মদতপুষ্ট সুতরাং সাবধানে পা না বাড়ালে যে কোনও মুহূর্তে নেতার ছোবল খেতে হতে পারে প্রথমদিকে বুঝতে দিলে হবে না, আমরা কী করতে চলেছি গোপনে আমাদেরকে বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে নিতে হবে, যেগুলোর গুরুত্ব আছে এবং প্রমাণ আছে তারপর একটা বোমব্লাস্টিং নিউজ করে ময়দানে নামতে হবে যাতে জনগণের মনে তুমুলভাবে নাড়া দেওয়া যায় সাধারণ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সহায়তা ছাড়া তো এধরনের সমাজবিরোধী কাজকর্ম বন্ধ করা যাবে না তাই জনসাধারণকে কাছে পেতে গেলে আগে তাদের মনে সহানুভূতির সঞ্চার করতে হবে তাদের সেন্টিমেন্টে নাড়া দিতে হবে তবে তারা আমাদের ডাকে সাড়া দেবে কেননা, সাধারণ মানুষ তো হুজুগে চলে আর রাজনৈতিক নেতারা ভালোমতই জানে, কোন হুজুগে সাধারণ মানুষকে কব্জা করতে হয় তাই আমাদের লড়াইটা খুব একটা সহজ হবে না

  সহজ যে হবে না, তা আমিও জানি যে কারণে আমি এতদিন মুখ বুজে আছি একটা শক্ত অবলম্বন খোঁজার চেষ্টা করছি তবে তার জন্য আমাকে ঠকতেও কম হয়নি!

  কীরকম! এর আগে কি কোনও মিডিয়া আপনাকে অ্যাসুওর করেছিল, ওই রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের মুখোশ খুলে দেবে বলে?

  না, ঠিক মিডিয়া বলব না, মিডিয়ার লোক বলা যেতে পারে এক টিভি মিডিয়ার সাংবাদিক

  কোন টিভি?

  সেসব কথা পরে হবে আমাদের হাতে সময় খুব কম কাজের কথাগুলো সেরে ফেলা যাক

  না, তবু জানা দরকার ওরা যদি আমাদের অ্যান্টি-মিডিয়া হয়, তাহলে, ওরা ওই হোমের কেচ্ছা-কাহিনীকে চূড়ান্ত সেবামূলক কাজ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে এটাই মিডিয়া লাইনের দস্তুরি তখন মিডিয়ার তরজা লড়াই চলবে মাঝখান থেকে হোমের কীর্তিকলাপ চাপা পড়ে যাবে ওরা সুযোগ বুঝে ধোয়া তুলসীপাতা হওয়ার ফন্দি আঁটবে

  হ্যাঁ, এটা আপনি ঠিকই বলেছেন তবে এক্ষেত্রে সেরকম ভয়ের কিছু নেই কেননা, আদৌ সে মিডিয়ার অস্তিত্ব আছে কি না আমার জানা নেই আপনার মতোই এক যুবক, সুন্দর সুপুরুষ বলে নিজেকে জাহির করে... নাঃ, এখন থাক ওসব কথা

  না না, বলুন না!

  আমি ওসব কথা এখন বলতে চাইছি না শুধু একটা কথা বলে রাখি, সেদিন এই পার্কে এই বেঞ্চিতে বসেই জিজ্ঞেস করেছিলেন না যে, এই পার্কের ব্যাপার-স্যাপার, সিকিওরিটির হুইসল বাজানো এসব জানলাম কী করে? এসব অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেই মিডিয়ার সাংবাদিক বা সাংবাদিক নয়, এমন বদমাইশ মানুষটার অনুরোধে তবে সে অভিজ্ঞতা বড় তিক্ত আসলে আমি ট্র্যাপে পড়েছিলাম এখন ওসব কথা থাক, আপনি বলুন আপনার প্ল্যান পরিকল্পনার কথা

  হ্যাঁ, সেকথাই বলব আমাদের চীফ এডিটরের প্ল্যান হল, আপনার থেকে শুরু করে কয়েকজন প্রতিবন্ধী নারী পুরুষের জবানবন্দী নিয়ে নেওয়া তার মধ্যে প্রথমদিকে থাকবে আপনাদের জীবন-যন্ত্রণার কথা অর্থাৎ হোমে যাওয়ার পিছনের পরিস্থিতির কথা আপনাদের পরিবার থাকা সত্ত্বেও হোমে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন কী কারণে? এতে পাঠকদের মনে একটা সমবেদনা জাগবে সেইসঙ্গে এটাও বোঝানো যাবে যে, আপনাদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা আপনারা কীভাবে উপেক্ষিত হয়েছিলেন বা হচ্ছেন এতে পাঠক তথা জনগণের মনে একটা শুভবোধ জাগানো যাবে যেটাকে আপনি সেদিন বলেছিলেন গণপ্রচার সুস্থ আন্দোলন, সেটা হয়ে যাবে

  হ্যাঁ, আমিও তাই চাইছি কিন্তু এর মধ্যে আবার পুরুষ প্রতিবন্ধীর জবানবন্দী কেন?

  বিষয়টাকে সর্বজনীন করার জন্য এর প্রয়োজন আছে তবে আন্দোলনটা জোরদার হবে

  ঠিক আছে, আমি চাইছি একটা হেস্তনেস্ত হোক

  আমরাও তাই চাইছি তাই প্রথমে সাক্ষাৎকার, মানে সাক্ষাৎকার ঠিক নয়, আপনার জবানবন্দী দিয়ে শুরু করতে চাই আপনি বলবেন যে, আপনার পরিবারের সদস্যদের দ্বারা আপনি কীভাবে উপেক্ষিত হয়েছিলেন?

  দেখুন, আপনি আমাকে এভাবে প্রশ্ন করলে আমি হয়তো ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারব না আপনার যদি সময় থাকে, তাহলে আমি বরং নিজের মতো করে সেই কিশোরীবেলা থেকে এখন অবধি কয়েকটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলে যাই তা থেকেই আশা করি আপনি আপনার লেখাটা তৈরি করতে পারবেন

  হ্যাঁ, সেই ভালো বলছিলাম, আপনি চা খাবেন? একজন চা-ওলা আসছে এদিকে

  ডাকুন, খাওয়া যাক সেদিনও বলেছিলেন, না খেলে আবার রাগ করবেন

  এই চা... এদিকেচা খেতে খেতে আপনি বলবেন, আর আমি পুরোটা রেকর্ড করে নেব পরে সাজিয়ে লেখাটা তৈরি করব আমরা যেটা পরিকল্পনা করেছি, আমাদের কাগজে কয়েকটা পর্বেপ্রতিবন্ধীদের জীবন-যন্ত্রণাএই শিরোনামে বেশ কিছু নারী পুরুষ প্রতিবন্ধীর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তার জবানবন্দী হিসাবে প্রকাশ করব আপনার জবানবন্দী দিয়েই শুরু হবে আমাদের মনে হয় এতে পাঠকমহলে একটা প্রবল আলোড়ন তৈরি হবে বিশেষত বিদগ্ধ পাঠক বা সুশীল সমাজকে যদি নাড়া দেওয়া যায়, তাহলেই কেল্লা ফতে আমরা যদি এদেরকে সঙ্গে পেয়ে যাই, তাহলে টিভি মিডিয়াও ঝাঁপিয়ে পড়বে

  নিরুপমার হাতে চা ধরিয়ে দেয় চা-ওলা চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দেয় মুখমণ্ডলে খুশির আভাসটিভি মিডিয়াকে তো সঙ্গে পেতেই হবে মেয়েগুলোকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দেবো সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের যন্ত্রণার কথা পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগবে না

  ঠিক আছে ম্যাডাম! তাহলে আমি ভয়েস রেকর্ডার অন করছি, আপনি নিজের মতো করে বলা শুরু করুন

  হ্যাঁ, আমি একটু আগে থেকে, মানে আমার কিশোরীবেলা থেকে শুরু করছি কেন না, আমার লক্ষ্যটা শুধুমাত্র রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, আশ্রম কিংবা এন জি নয় ওদের অন্যায়-অত্যাচার শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবশ্যই হতে হবে সেই সঙ্গে আমি চাইছি, সাধারণ মানুষেরও একটু চেতনা আসুক তারা যে অমানবিক হয়ে যাচ্ছে, তারও একটা প্রতিকার দরকার গত কালকের কাগজে পড়েছেন নিশ্চয় জি আর পি- হেফাজতে থাকা বাচ্চাটার কথা আমাকে জবা পড়ে শোনালএকটা সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চাকে কেউ ট্রেনের বাথরুমে ফেলে রেখে চলে গেছে তার পাশে দুধভর্তি বোতল রেখে বাচ্চাটার পোশাক-আশাক দেখে সম্ভ্রান্ত ঘরের বলেই মনে হয় কুড়িয়ে পাওয়া বাচ্চাটার মেডিক্যাল চেক-আপ করে জানা গেছে, সে নাকি বাঁ চোখটায় কম দেখে এবং কানে শোনে না শিশুটা প্রতিবন্ধী লে ভবিষ্যতের ঝামেলা এড়ানোর জন্য তাকে পরিত্যাগ করে গেল তার মা-বাবা অথচ তারাই শিশুটিকে পৃথিবীতে এনেছে কতখানি নিষ্ঠুর অমানবিক হলে এমনটা করা যায় বলুন তো!

  হ্যাঁ, সত্যি ভাবতেই কেমন লাগে আজকের কাগজে দেখলাম, কেউ কেউ বাচ্চাটাকে দত্তক নিতে চাইছে বাচ্চাটার চিকিৎসারও ব্যবস্থা চলছে, যাতে তার চোখ এবং কান স্বাভাবিক হতে পারে

  হ্যাঁ, তা হচ্ছে কিন্তু তার আগে ওর বাবা-মা তো ওর সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করেছে! মানুষের এই নিষ্ঠুর আচরণকে সংশোধন করে স্বাভাবিক করে তোলার দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে

  তার জন্যেই আমরা আমাদের মতো করে এগোচ্ছি ম্যাডাম নিশ্চয় সফল হব আপনি বলতে থাকুন

  হ্যাঁ, এবার আপনি রেকর্ডার অন করুন  

  হ্যাঁ, করছি তার আগে বলে নিই, কোনও জায়গায় বুঝতে অসুবিধা হলে দুএকটা প্রশ্ন করতে পারি তো?

  নিশ্চয় করবেন! তবে অবশ্যই তা যেন প্রাসঙ্গিক হয় তা না হলে আমি খেই হারিয়ে ফেলবো

  ঠিক আছে, ঠিক আছে ভয়েস রেকর্ডার যে অন রয়েছে, এটা আপনি মাথায় রাখবেন না, তাহলে গুলিয়ে যাবে আপনি আপনার মতো করে বলে যান দাঁড়ান, আমি একটা বুদ্ধি দিই আপনি বরং আমাকে বলুন আপনার কিশোরীবেলা থেকে কোন কোন পয়েন্টগুলো বলতে চাইছেন আমি নোট ডাউন করে রাখছি একটা করে পয়েন্ট বলা হয়ে গেলে আমি পরেরটা মনে করিয়ে দেবো

  হেসে ওঠে নিরুপমানা না, আমার স্মৃতিশক্তি এত দুর্বল ভাবার কোনও কারণ নেই প্রতিটি ঘটনা আমার মনে গনগনে আঁচের মতো জ্বলে তাছাড়া আপনি তো শুনেছেন আমার বক্তৃতা, খুব কি খারাপ বলি?

  না না, আপনি তো অসাধারণ বক্তৃতা করেন আমি বলতে চাইছি যে, এখন আপনার কথায় বক্তৃতার ঢঙ আনবেন না অ্যাজ ইফ আপনি আপনার জীবনের কথা কোনও আপনজনকে বলছেন, এমনভাবে বলে যান

  বলতে বলতে কোথাও যদি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি, প্লিজ আপনি যেন কিছু মাইন্ড করবেন না!

  হালকা হাসে অরুময়ম্যাডাম, আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন যে, আমি একজন সাংবাদিক আমাকে অনেক আবেগপ্রবণতার সম্মুখীন হতে হয় এবং নিজেকে কন্ট্রোল করে আসল কাজটা করতে হয়

  আসলে, আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারছি না, মানে...!

  আমি বুঝেছি, আসলে আপনি আমার কাছে সহজ হতে পারছেন না ম্যাডাম আপনজন ভাবতে পারছেন না

  ধুত! আপনি আমাকে ম্যাডাম-ম্যাডাম করাটা বন্ধ করুন তো! ওটাতেই আমার আরও বেশি অস্বস্তি হচ্ছে

  ঠিক আছে, তাহলে কী বলব?

  আপনি নাম ধরে ডাকতে পারেন আমি তো বয়সে আপনার চেয়ে ছোটই হবো

  তবে তাই হোক আমরা দুজনেই দুজনকে নাম ধরে ডাকবো আরআপনিনয় তুমি বলব তাহলে আপনজন মনে হবে আর আন-ঈজি ফিল করবেন না না না, করবে না এবার তুমি শুরু কর নিরুপমা

  কপালের মাঝখানে ডানহাতের মধ্যমা স্পর্শ করে নিরুপমা কয়েক মুহূর্ত স্থির থাকে তারপর শুরু করেআমি তখন তের প্রথম ঋতুমতী হয়েছি স্বভাবতই খুব ভয় পেয়ে মা-কে বলতেই মা বেশ বিরক্তি প্রকাশ করলেন,  মরণদশা! এদিকে নাই ওদিকে আছে ভগবানকেও বলিহারি যাই! জন্ম থেকেই যখন চোখের আলো কেড়ে নিয়েছে, শরীরে আগুন দেওয়ার কী দরকার ছিল!’

  মা বকবক করতে করতে আমাদের বাড়ির কাজের লোক রুবাদি কাছে ভিড়িয়ে দিল আমাকে রুবাদিপরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে তার মতো করে শিখিয়ে দিল

  পুরোনো কাপড়ের টুকরো কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, ওই টা দিন কীভাবে বসতে হয়, চলাফেরা করতে হয়, সব বুঝিয়ে দিল তার কয়েকমাস পরেই আমার এগারো বছরের বোন ঋতুমতী হল এগারোতেই বোন নারী হয়ে ওঠায় মা যার পর নাই খুশি ওকে আদর করে কাছে ডেকে নিয়ে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়া, নিজের জন্য রাখা স্যানিটারি ন্যাপকিন এনে তার ব্যবহার শিখিয়ে দেওয়া, সবকিছু মা নিজে করল আমি অন্ধ হলেও কালা এবং হাবাগোবা নই; এটা একবারও মায়ের মনে হল না আমার উপস্থিতিতেই সবকিছু... বোঝো তাহলে, কেমন মা!

  ইস! তোমার এখনও মায়ের ওপর রাগটা মনে জমে রয়েছে

  নাহ! রাগ নয়; দুঃখ আর অভিমান জন্মান্ধ হলেও আমিও তাঁরই মেয়ে! এরকম ঘটনা কত যে আছে আর একটা ঘটনা বলি আমার বয়স তখন ষোল আমার দিদির বিয়ে বাড়িতে প্রচুর আত্মীয় পরিজন, মাসতুতো-পিসতুতো দাদা-দিদি ভাই-বোনেরা এসেছে দুতিনদিন ধরে আড্ডা, গুলতানি, হাসি-ঠাট্টা, মশকরা চলছে স্বাভাবিক প্রবৃত্তিতেই আমি ওদের কাছে কাছেই থাকছি বাড়ির ভেতর চলাফেরা করতে আমার স্টিকের প্রয়োজন হয় না তাই ওরা যেখানে যাচ্ছে, আমিও যাচ্ছি ওরা যে খুশি হচ্ছে এমনটা নয়, কিন্তু বিরক্তি প্রকাশও করছে না তবে, আমার অন্ধত্ব নিয়ে চটুল মন্তব্য মজা করছে এতে যে আমার বুকের ভেতরটা ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে, বোধ ওদের নেই আমার বোনও ওদের সঙ্গে মশকরাতে যোগ দিচ্ছে বোনের বয়স তখন চৌদ্দ হলেও দেহসৌষ্ঠব  খুব ভাল সবাই বলে খুবই আকর্ষনীয়া, সুন্দরী তাই মাসতুতো-পিসতুতো দাদারা সবসময় ওর পেছনে ঘুরঘুর করছে আমি বুঝতে পারছি সুযোগ পেলেই ঝুঁটি ধরে, গাল টিপে, কিংবা অন্যভাবে ওর শরীর ছোঁয়ার চেষ্টা করছে বোন ইশারায়, ইঙ্গিতে আমার উপস্থিতি জানিয়ে প্রশ্রয়পূর্ণ বাধা দিলে, ওরা চাপাগলায় বলছে, ‘ আছে তো কী হয়েছে! তো দেখতে পাচ্ছে না তাছাড়া এসব বুঝবে নাভাবো ব্যাপারখানা! আমিও তো একজন মেয়ে, আমারও দেহে যৌবন আছে, আমারও মন বলে কিছু আছে!

  তোমার কি তখন মনোকষ্ট হত? তোমার কি মনে হতো যে, বোনের সঙ্গে যেমন করছে, তোমার সঙ্গেও তেমন করুক?

  হ্যাঁ, আমাকেও কিছুটা গুরুত্ব দিক, তা মনে হতো বইকি! তবে মনোকষ্ট হতো অন্য কারণে আমি যৌবনবতী হওয়া সত্ত্বেও ওরা আমাকে কিছু না-বোঝা কিশোরীর দলে ঠেলে দিত আমার দৃষ্টিহীনতাকে ওরা বোধহীনতা ভেবে নিত এটাই হল ট্র্যাজেডি এটাই হল একজন প্রতিবন্ধী মানুষের পরিবারের ত্রুটি ঘাটতি

  তাহলে এটা কি ধরে নেওয়া যায় যে, যৌবনবতী হলেও প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে যৌন নিপীড়ন বা ওই ধরনের ব্যাপার-স্যাপার থেকে তোমরা অনেক নিরাপদ?

  একথাটা তুমি একজন সাংবাদিক হয়ে বলছ কী করে!

  তোমরাই তো নিত্য-নৈমিত্তিক খবর করছ অমুক জায়গায় প্রতিবন্ধী মহিলা লাঞ্ছিতা, অমুক জায়গায় ধর্ষিতা এছাড়া বাড়ির মধ্যেই কত অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে তার খবর তো তোমরা রাখ না তার পরের ঘটনা শুনলে তো তুমি চমকে উঠবে

  কী ঘটনা? বল না শুনি!

  দিদির বিয়ের পাট তো চুকেবুকে গেল পরের দিন সকালবেলা জামাইবাবুর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে দিদি চলে গেল শ্বশুরবাড়ি স্বভাবতই বাড়িতে তখন একটা মনখারাপের পরিবেশ অনেক আত্মীয়-পরিজন ফিরে যাওয়ায় হৈ-হট্টগোলও কমেছে এর মধ্যে বোনের সঙ্গে আমার একটু মনোমালিন্য হওয়ায় দুপুরবেলা ঘরে চুপচাপ একা শুয়ে রয়েছি হঠাৎ ঘরের ভেতর পায়ের শব্দ আমার অতীন্দ্রিয় শক্তি বুঝে ফেলে সে পায়ের শব্দ কোনও পুরুষের শব্দটা আমার পাশে এসে থামে পরিচিত গন্ধ না হওয়ায় আমি জিজ্ঞেস করতে যাই কে? কিন্তু তার অবকাশ পাই না আচমকা একটা গোঁফওয়ালা মুখ আমার ঠোঁটের ওপর চেপে বসেছে বলিষ্ঠ দুটো হাত আমার অনুদ্ভিন্ন বুক তছনছ করে দিতে চাইছে তারপরে তার শরীরটা ...!  

  আমি চিৎকার করারও সুযোগ পাই না কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র তারপরেই বুক থেকে হাত সরে যায়, মুখ থেকে মুখ পুরুষটার পদশব্দ দ্রুত মিলিয়ে যায় আমি এক ঝটকায় বিছানায় উঠে বসি কিন্তু সেই মুহূর্তে কী করব বুঝে উঠতে পারি না পাশবিক কবলমুক্ত হয়ে বোধহয় নিজের অজান্তেই আমি কোনও শব্দ করেছিলাম হঠাৎ বুঝতে পারি, আমার বোন ঘরে ঢুকেছে আমার হতবিহ্বল অবস্থা দেখে বলে দিদি! কী হয়েছে তোর?

  আমি কোনও কথা বলতে পারি না আমার ঠোঁট কেঁপে ওঠে বোন কাছে আসতেই ওকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠি মনের মধ্যে একটা কষ্ট পাক খায় আমার কিছু যেন একটা ছিনতাই হয়ে গেল! চোখের দৃষ্টির মতো মূল্যবান সম্পদ কেউ যেন কেড়ে নিল!  

  আমার কান্নার শব্দে মা ঘরে ঢোকে মায়ের একের পর এক প্রশ্নের চাপে মা-কে তাৎক্ষণিক ঘটনা বলে ফেলি তা শুনে মা ঠাস ঠাস করে আমার দুগালে দুটো চড় কষিয়ে চাপা গলায় বলে বল! কে তোকে এখন -ঘরে একা শুতে বলেছে! এখন কি শোওয়ার সময়? হাড়মাস জ্বালিয়ে খেলি আমার! নিজের চোখে তো কালি ঢেলেছিস! এবার বংশের মুখেও কালি ঢালবি কাল থেকে তোর বাইরে বেরোনো বন্ধ স্কুলে যাওয়াও বন্ধ কোথায় কী করে বসবি! খেয়ে না খেয়ে শরীরেও যেন বান ডেকেছে হতচ্ছাড়ির!

  আমি কোনও কথা বলতে পারিনি শুধু ভেবেছি, আমি তো তোমার গর্ভেই জন্মেছি মা! তাহলে অন্ধ হওয়ার দোষ কি শুধু আমারই! তোমার কোনও দোষ নেই!

  মা এমনও হন!

  হ্যাঁ হন শুধু আমার মা নয়; বেশির ভাগ প্রতিবন্ধযুক্ত বাচ্চার মা এমন হন তবে, এটা ওঁদের দোষ নয় বহু গঞ্জনা, বিতৃষ্ণা তিতিক্ষায় ওঁরা আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না এটা ওঁদের মনোকষ্ট অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ মাত্র কেননা, দেখেছি, তারপরে মা কেঁদ়েছিল

  তারপর কী হল? তোমার বাইরে বেরোনো, স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল?

  তারপর অনেক ঘটনা! এত সব বলার অবকাশ নেই তোমারও শোনার ধৈর্য থাকবে না মোটকথা, আমার স্কুলে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে বাবার সঙ্গে মায়ের তুমুল ঝগড়াঝাঁটি হল কত চেষ্টা করে, আইনের সাহায্য নিয়ে, বাবা আমাকে গ্রামের সাধারণ স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন সেই স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে! স্কুলে গেলে শিক্ষকরা পড়া জিজ্ঞেস করেন না, ভালোমন্দ কিছুই বলেন না তবুও তাঁদের পড়ানো শুনে তো শেখা যায় বাবার কিনে দেওয়া রাইটারে সেগুলো লেখা যায় পরীক্ষাতেও বসতে দেয় কিন্তু স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলে... বাবা রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নেন, আমাকে প্রতিবন্ধীদের হোমেই পাঠাবেন বাড়িতে আমার আর কোনও নিরাপত্তা নেই

  ঘটনার বছর খানেক আগে ছোটমামার সহায়তায় মা আমাকে হোমে পাঠিয়ে হালকা হতে চেয়েছিল তখন বাবা রাজি হননি আমারও সে সময় ইচ্ছে ছিল না বাবা-মা, দিদি-বোন, রুবাদি এদের ছেড়ে হোমে গিয়ে থাকি কিন্তু ওই ঘটনার পর আমার মনে হল, বাড়ির চেয়ে আমি হোমেই ভাল থাকব 

  বাবা তখন নিজেই ছোটমামার সঙ্গে যোগাযোগ করে, ‘হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারনামে শহরের এক বেসরকারি হোমে রাখার জন্য নিয়ে গেলেন, তার পরের ঘটনা তুমি তো জান বলেছ হোমের শর্ত যেহেতু ষোলবছর বয়স হয়ে গেছে, সেইহেতু আমার টোটাল হিসটেরেকটমি করাতে হবে জরায়ু-ডিম্বাশয় সবকিছু সার্জারি করে বাদ দিয়ে হোমে রাখা যাবে এটা নাকি সামাজিক সুরক্ষার জন্য এবং কোনও অঘটন ঘটলে হোমের যাতে বদনাম না হয় তার সাবধানতার জন্য কী অন্যায় বল তো! এখন আমি তিরিশ; আরও চোদ্দ বছর আগে আমার এত মনের জোর ছিল না তবুও আমি প্রতিবাদ করেছিলাম রিস্ক-ফ্যাক্টর কেটে বাদ দাও, তারপর যত খুশি বলাৎকার কর, তা আমি কিছুতেই হতে দেবো না এরকম কোনও নিয়ম কিংবা আইনও ছিল না ওরা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল শেষে বাবা মানবাধিকার কমিশনের সহায়তা নিয়ে আমাকে ওই হোমেই রাখতে সক্ষম হন

  তারপরহোম’-এর লোকজন তোমার সঙ্গে কোনওরকম দুর্ব্যবহার বা অত্যাচার করেনি তো?

  না, তা করেনি হোম-কর্ত্তৃপক্ষ বুঝে গিয়েছিল বড় শক্ত মাটি! একে গুঁড়োতে গেলে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে তাই প্রথমদিন থেকেই আমি আলাদা গুরুত্ব সহযোগিতা পেয়েছি ওই হোমে থেকেই ব্লাইন্ড স্কুলে পরে কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট হয়েছি তারপর তো অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে স্কুল-শিক্ষিকার চাকরি পেলাম এখনও ওই হোমেই রয়েছি

  আচ্ছা নিরুপমা! বলছিলাম, তুমি তোহোম’- থেকে পড়াশুনা করলে স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে স্কুল শিক্ষিকার চাকরিও পেলে এখন বাড়িতে মা-বাবার কাছে যাও নিশ্চয়!

  হ্যাঁ যাই তবে খুবই কম

  বাড়িতে, বিশেষত তোমার মা কিংবা বোনের কাছ থেকে কেমন ব্যবহার পাও?

বোনের তো বিয়ে হয়ে গেছে দেখা-সাক্ষাৎ কমই হয় মা পরিবারের অন্যান্যরা ভালবাসে না তা নয়; বরং আমার অনমনীয় জেদের জন্য আমাকে একটু সমীহই করে কিন্তু দুঃখের কথাটা কী জান! একটা ব্যাপারে সেই ষোলবছর বয়সে আর এই তিরিশ বছর বয়সে ওদের ধারণা একই রয়ে গেছে

  সেটা আবার কী?

  আমি যে যুবতী, সেটা ওরা কখনও ভাবতে চায় না এবং আমাকেও ভুলিয়ে দিতে চায় তখন মা কিংবা বোন অথবা অন্যান্যরা ভাবত আমার শরীরের বৃদ্ধি হলেও মানসিকভাবে আমি কিশোরী, যৌনজীবন সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা থাকতে পারে না আর এখন ভাবে, আমি প্রৌঢ়া ওসবের পাঠ চুকেবুকে গেছে তাহলে বল, পরিবারের মানুষই যদি এমন ভাবে, সমাজের অন্য মানুষ তো ভাবতেই পারে সমস্যা কি আইনের মাধ্যমে সমাধান হওয়া সম্ভব? এর জন্য যে চেতনা মানসিকতা পরিবর্তনের দরকার সেটা কি ওই ধরনের বক্তৃতা দিয়ে হবে?

  ঠিকই বলেছ, কেউ কোনও একদিক থেকে প্রতিবন্ধযুক্ত হলে, তাকে সার্বিকভাবে প্রতিবন্ধী ভেবে নেওয়া ঠিক নয় সাধারণ জীবনযাপন করার সুযোগ থেকে সে বঞ্চিত হবে কেন! তারও তো জীবন-যৌবন আছে! 

  একটু দম নেয় নিরুপমা তারপর বলতে শুরু করে  দেখ, আমার কথা শুনে তোমার মনে হতে পারে যে, আমি আমার যৌবন যৌনজীবন নিয়ে বড় বেশি ভাবিত যৌবনজ্বালায় যেন দগ্ধ হচ্ছি, তাই এসব কথা বলছি!  ব্যাপারটা কিন্তু তা নয় একজন অন্ধ, মূক কিংবা বধিরের সমস্যা ছাড়াও আরও অনেক সমস্যা আছে তারমধ্যে সমস্যাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ওই বেসিক ইনস্টিংকট বংশগতির ধারা বজায় রাখার শাশ্বত ইচ্ছা যার জন্য প্রত্যেকের মধ্যেই প্রকৃতি বা বিধাতা পূর্ণ করে দিয়েছেন কামনাকে সে কামনার নিবৃত্তির জন্যই বল, আর নিজের বংশধারা অব্যাহত রাখার জন্যই বল, প্রত্যেকেই যোগ্যতর হতে চায় কিন্তু যোগ্যতর হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধযুক্ত মানুষদেরকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয় ঘর বা পরিবারের বৈষম্যের বাধাই যদি টপকাতে না পারে; তাহলে বাইরের বাধা টপকাবে কীভাবে! সকলে আমার মতো লড়াকু নাও হতে পারে!  সকলের মনের জোর তো সমান নয় সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র আইন তাদেরকে কতখানি সামাজিক সাম্য, সুরক্ষা দেবে বলতে পার! এরজন্য এই প্রতিবন্ধী মানুষদের লড়াকু মানসিকতাকে উজ্জীবিত করা খুব দরকার

  সত্যিই তোমার এই লড়াকু মানসিকতাকে আমি সম্মান জানাচ্ছি তোমার মতো একজন হার না-মানা মহিলা, নারীর গর্ব শুধু নারী কেন যে কোনও পুরুষেরও অহংকার হতে পার তুমি

  তাই নাকি! দারুণ দারুণ কথা বলছ তো! নারী বলেই স্বীকার করে না, সবাই প্রতিবন্ধী বলে, সে কিনা নারীর গর্ব!

  না না, মোটেও বাড়িয়ে বলছি না তুমি একদিন স্বীকৃতি পাবেই

  কিন্তু কোথায় আমার যৌবনের স্বীকৃতি! কোন মেয়েবেলায় কোনও এক লম্পট আমাকে একা পেয়ে বুকে খাবল মেরেছিল, সেটাই তো যৌবনের স্বীকৃতি নয়! আমিও তো একজন শিক্ষিতা, চাকুরিরতা যুবতী আমাকে বিয়ে করার জন্য তো কেউ এগিয়ে আসে না! আমার দিদি কিংবা বোনের বিয়ের জন্য বাবা-মা চেষ্টা করে, তাদের বিয়ে হয় আমার জন্য তো চেষ্টা করে না! তাহলে কোথায় সামাজিক সাম্য!

  অরুময় মাথা নিচু করে বসে থাকে। নিরুপমা বলে ওঠে স্যরি! প্লিজ, তুমি কিছু মনে করো না। আমি একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম

  না না, আমি কিছু মনে করছি না। আমি ভাবছি, আমাদের লড়াইটার কথা। ভাবছি, আমরা পারব তো! আমাদের প্রতিপক্ষ শুধু কয়েকটা ডিসেবল রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার নয়! আমাদের লড়তে হবে সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গেও।

  নিশ্চয় পারব, তোমার মতো একজন যোদ্ধাকে সাথী হিসাবে পেয়েছি। দেখবে, এ লড়াই আমরা ঠিক জিতব।

দেখা যাক! চলো নিরুপমা! এবার আমাদের উঠতে হবে। হুইসল বাজছে।

  হ্যাঁ, শুনেছি। তবে এ বাঁশি আমাদের দৌড় শুরু করার বাঁশি। আমরা আমাদের লক্ষে  ঠিক পৌঁছব, নাকি বল অরুময়বাবু!

  'অরুময়বাবু' নয়, শুধু অরু।   

  আর আমি শুধু 'নিরু'। 

  কথা শেষ হতেই দু'জনে হেসে ওঠে। সে হাসির শব্দে কাছেই বসে থাকা দু'টি নাম না জানা পাখি ফুড়ুত করে উড়ে যায়।

                           পাঁচ

 

অনিকেত প্রতিদিনের অভ্যাসমতো এই সময়ে ব্যালকনিতে চা-সহযোগে খবরের কাগজ হাতে দোলনায় বসে রয়েছেন দোলনাটা সেভাবে দুলছে না ঠিকই; তবে অনিকেতের ভারী দেহটা স্থিরও নেই এই মুহূর্তে চায়ের কাপ পাশের টিপয়ে বসে তার পাশে জাপানি প্লেটে গোটা কতক স্ন্যাক্স বাসি সকালের রোদে গা সেঁকছে খবরের কাগজটা অনিকেতের দুহাতে যেন ডানা ছড়ানো চিল অন্যান্য দিন এই চিলের শরীরে অনিকেতের নিষাদ-চোখ চরে বেড়ায় আজ ওঁর চোখ সামনের চারকোনা আকাশে নির্নিমেষ কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু দেখছেন বলে তো মনে হয় না তিরতিরে ডানা কাঁপানো চাতক, ক্ষুধার্ত কাকেদের আনাগোনা, কিছুই দেখছেন না

  অদূরে ডাইনিং-য়ে সোফায় চায়ের কাপ হাতে বিদিশা ওর চোখ সোজাসুজি রিডিংরুমে দূর থেকে অদ্রিজার গায়ে-মাথায় স্নেহভরা দৃষ্টি বুলোচ্ছে ব্রেকফাস্ট সেরে বই নিয়ে বসেছে মেয়েটা পড়ার জন্য বলতেই হয় না ওকে বাপের ধাত পেয়েছে সারাদিন পড়তে পেলেই যেন আনন্দ! খেলার কথা মনে করিয়ে দিতে হয় ওরই বা দোষ কী! ওইটুকু মেয়ে হলেও পড়ার চাপ কম নয়! চাপ না নিয়েই বা উপায় কী! ভাল রেজাল্ট না করলে স্কুল থেকে বাধ্যতামূলক টি. সি দেওয়া হবে অনিকেত চায় ওর মেয়েও ওর মতো সমাজবিজ্ঞান পড়বে গবেষণা করবে, অধ্যাপনা করবে

  বিদিশা অবশ্য অন্যরকম ভাবে চায়, ওর মেয়ে গ্ল্যামার জগতের নক্ষত্র হবে মডেলিং দিয়ে শুরু করে ছোট পর্দাকে টুসকি মেরে বড় পর্দায় দাপিয়ে বেড়াবে কিন্তু সেসবের এখনও অনেক দেরি আগে প্রথাগত শিক্ষাদীক্ষা শেষ হোক তারপর তো ...! ওর মেয়ে রূপসী; এখন সবে দশ, তাতেই সকলের চোখ টানে শরীরে জোয়ার এলে তো ...!

  হঠাৎ ঠক করে আওয়াজ হতে বিদিশার চোখ যায় অনিকেতের দিকে অনিকেত চায়ের কাপটা টিপয়ের ওপর সশব্দে নামিয়ে বলে ওঠেন না না, ওসব চলবে না কাল রাতে আমি পরশুরামের সঙ্গে আলোচনা করেছি উনি কথা দিয়েছেন, পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করার হাতিয়ার, কুড়ুলখানা থানায় সারেন্ডার করবেন নিধন করার মতো ক্ষত্রিয় আর উনি পাচ্ছেন না

  বিদিশা ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারে না কাগজের কিছু জোরে জোরে পড়ছে; নাকি কারুর সঙ্গে কথা বলছে! কাছেপিঠে তো ছাড়া আর কেউ নেই! মোবাইলফোনও তো হাতে নেই! তাহলে ...!

  বিদিশা এবার সরব হয় কী গো! কার সাথে কথা বলছ?

  অনিকেতের কানে হয়তো প্রবেশ করেনি বিদিশার কণ্ঠস্বর উনি বলে চলেছেন ঠিকই করেছেন পরশুরাম কোথায় সেই ক্ষত্রিয়ের তেজ, বল, শৌর্য-বীর্য! আজকাল সব অমেরুদণ্ডী, ডরপুক, ইনভার্টিব্রেট! এখন সব হাইব্রিড, নয় তো কনভার্টেড হয় ব্রাহ্মণ থেকে ডিমোশন হয়ে ক্ষত্রিয়, নয় তো বৈশ্য থেকে প্রমোশন পেয়ে ক্ষত্রিয়

  বিদিশা সোফা ছেড়ে উঠে পড়ে এবার কী ব্যাপার! শব্দ করে, কথা বলে তো কাগজ পড়ে না কখনও! তাহলে কি সেদিনকার মতো কোনওভালগারবিজ্ঞাপন পড়ছে

  আজকাল কত কায়দার বিজ্ঞাপন ছাপে কাগজে সেদিনের বিজ্ঞাপনটা কী বিচ্ছিরি! ‘আপনি যদি পতি নম্বর ওয়ান হতে চান, স্ত্রী-কে যদি দ্রৌপদী না করতে চান; তাহলে নীচের বিজ্ঞাপনটি পড়ুনবেশ মোটা মোটা অক্ষরে লেখা তার তলায় সরু অক্ষরে কী সব বাঁকা, সরু, মোটা, লম্বা, আয়ুর্বেদিক তেল এইসব একগাদা বাজে বাজে কথা

  বিজ্ঞাপনটা উচ্চারণ করে পড়েছিল অনি, তারপর ভীষণ রেগে উঠেছিল সংবাদপত্রের সামাজিক দায়বদ্ধতা বিষয়ে মিনিট তিনেক বক্তৃতা দিয়েছিল আজ আবার তেমন কোনও বিজ্ঞাপন নাকি! আজ ভাল বিজ্ঞাপন না খারাপ, কে জানে! মজাদার হলে, বিজ্ঞাপনটা পড়ে অনি হো হো করে হেসে উঠবে তারপর ওর কাছে বিজ্ঞাপনের রহস্য ফাঁস করবে আর যদি খারাপ হয় তাহলে তো ....!

  একদম অনিকেতের পাশে গা ঘেঁষে দাঁড়ায় বিদিশা প্রত্যাশা অনি এবার ওর দিকে মুখ উঁচিয়ে হেসে উঠবে কিন্তু না, অনি তো কাগজ থেকে চোখই তুলল না! এবার মানুষটার দিকে নিবিড়ভাবে তাকায় দেখে, অনির হাতে কাগজ, আর ঘাড় নিচু থাকলেও, ওর দৃষ্টি কিন্তু কাগজের গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই কাগজের কিনারা ঘেঁষে ওর দৃষ্টি দূরে ফ্ল্যাটবাড়ির দিকে সরু চোখে উদাস দৃষ্টি মুখখানা কেমন গম্ভীর! কাছে এসে দাঁড়ানোয় হয়তো কথার শব্দ কমিয়ে দিয়েছে কিন্তু ঠোঁট নড়ছে বিড়বিড় করে বলছে কিছু একটা! কী ব্যাপার! অনি তো এমন করে না কখনও! বিদিশা এবার অনিকেতের কাঁধে হাত রাখে অনিকেত যেন চমকে ওঠেন! জুলজুল করে দেখেন বিদিশাকে যেন কোনও অচেনা মানুষ দেখছেন

  প্রতিদিন সকালে এইচা-সংবাদসেবনের জন্য অনিকেতের কুড়িমিনিট সময় বরাদ্দ এর মধ্যে টুকরো-টাকরা সাংসারিক বা বৈষয়িক কথা বলার জন্য মিনিট পাঁচ-ছয় সময়ের ভাগ বসায় বিদিশা অনিকেত সারাদিনের মধ্যে সকালে এই মিনিট পাঁচেক আর রাতে ডিনারের পর রিডিংরুমে যাওয়ার আগে আধঘন্টাটাক সময় দেন স্ত্রীকে মাসে দুতিনদিন ওই আধঘন্টাটা একঘন্টায় পৌঁছয় জৈবিক প্রয়োজনে অবশ্য যদি পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকূল হয় অবশিষ্ট তেইশঘন্টা অনিকেত ব্যস্ত থাকেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্র-গবেষণা, লেখাপড়া অথবা শারীরিক মানসিক বিশ্রামে যদিও বিশ্রামের জন্য অনিকেতের নির্দিষ্ট কোনও সময় নেই কোনওদিন দেখা যায়, সন্ধেবেলায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে এসে বিছানায় টানটান পোশাক না বদলিয়েই ঘন্টাখানেক ঘুম বিদিশা বা মেয়ে কেউই তখন বিরক্ত করে না ভাবে, নিশ্চয় ইউনিভার্সিটিতে কাজের চাপ ছিল শরীরের পরিশ্রমের চেয়ে মগজের পরিশ্রমে বেশি ক্লান্ত হয় মানুষ ক্লান্তি কাটলে, উঠে স্নান, টিফিন খাওয়া, পড়াশুনা রাত দশটা কুড়ির খবর শোনা চাই তারপর ডিনার সেরে আধঘন্টা আগডুম বাগডুম বকে আবার রিডিংরুমে হয়তো রাতই কাবার হয়ে গেল বই পড়তে পড়তে ভোরবেলা বিছানায় গেলেন তবে, যখনই শুতে যান, আটটায় ওঠা চাই মোবাইল ফোনের 'চারপিং মেলোডি অ্যালার্ম' জাগাতে ভুল করে না মানুষটাকে  

  আটটায় বিছানা না ছাড়লে ইউনিভার্সিটি পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবে! ব্যাপারেই উনি একমাত্র পাংচুয়াল অ্যালার্ম বাজতেই উঠে বসবেন বিছানায় মিনিট তিনেক ঘাড়ের  ব্যায়াম করবেন স্পন্ডিওলিসিসের ব্যথা কমানোর জন্য তারপর বিছানা ছেড়ে, বাথরুম সেরে ব্যালকনিতে তখনই চাই খবরের কাগজ আর চা প্রায়শই চা খেতে খেতে অনিকেত কথা শুরু করেন পরিবারের প্রতি কর্তব্য পালন করার চেষ্টায় তেমন জরুরি বা দায়িত্বপূর্ণ কথা বলেন তা নয়; মামুলি কোনও খবর কিংবা কোনও অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতার কথা কাগজ পড়তে পড়তে কখনও বলে ওঠেন বুঝলে দিশা! মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছে, একবছরের মধ্যে ইরাক থেকে সমস্ত মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবে সুমতি হয়েছে; তাই না!

  বিদিশার কাছে খবর মামুলি নয় তো কী! যদি খবরটা এমন হত একমাসের মধ্যে সমস্ত বিনোদন সামগ্রী থেকে কর প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে তাহলে বুঝত সরকারের সুমতি হয়েছে ফ্রিজটা পাল্টানো দরকার, টিভিটাও সেই বুদ্ধবাবুর আমলের একটা এল.সি.ডি. টিভি হলে বেশ হয় তার দাম কমছে জানলে, বিদিশার কাছে সে খবরের গুরুত্ব থাকত

  কখনও অনিকেত বিদিশার দিকে ভ্রু কুঁচকিয়ে বলেন হ্যাঁ গো! উত্তর কোরিয়ার মতো দেশও দুদুটো পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাল রাষ্ট্রসংঘের পারমিশনের তোয়াক্কা না করে!

  এমনভাবে অনিকেত কথাটা বিদিশাকে বলেন, যেন বলছে, ‘হ্যাঁ গো! অজির মতো শান্তশিষ্ট মেয়ে চায়ের টেবিলে দুদুটো কাপ ভেঙে ফেলল রেগেমেগে! মায়ের বকুনির তোয়াক্কা না করে!’

   বিদিশার অন্তত তেমনই মনে হয় উত্তর কোরিয়া পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাল কি না ঘটাল, তার খবর বিদিশা রাখতে চায় না বলে তাতে আমার কী যায় আসে!

  অনিকেত ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলেন তাতে তোমার আমার অনেক কিছুই যায় আসে ওই দেশটা পৃথিবীর বাইরে নয় তোমার রান্নাঘরে আগুন লাগলে আঁচটা শোবার ঘর অবধি আসবেই! এরপর অনিকেত শুরু করেন গ্লোবাল ভিলেজের কথা বিশ্ব অর্থনীতি, যুদ্ধ, সন্ত্রাস, মূল্যবৃদ্ধির কথা, গ্রামে-গঞ্জে নাবালিকা ধর্ষণের কথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা

  বিদিশা কিছু শোনে, কিছু শোনে না যখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বলে অনি; তখন বিদিশার মনে পড়ে মেয়ের কথা বলে ওঠে পরশু অজির জন্মদিন; তোমার কাছে কোনও গিফট আশা করে তো মেয়েটা! তোমার খেয়াল আছে?

  অনিকেত কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলেন হ্যাঁ, তা আবার মনে থাকবে না! আমার একমাত্র বংশধর অজি-মায়ের জন্মদিন বলে কথা! কথা বলতে বলতে মোবাইলফোনেরটু-ডু লিস্টেসিডিউল এন্ট্রি করে রাখেন মনে পড়ার জন্য মাইন্ডার অ্যালার্ম দিয়ে রাখেন ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে মেয়ের জন্য চার সেট পোশাক কিনে ফ্ল্যাটে ঢোকেন তার মধ্যে তিন সেট হয় তো মাপসই হল না দেখে ভাল লেগেছে, কিনে এনেছেন মেয়ের প্রতি ভালবাসা কর্তব্যের প্রবল পরাকাষ্ঠা দেখানো হল সেই সঙ্গে পোশাকগুলো বদলে আনার ভার পড়ল বিদিশার ওপর বিদিশা অবশ্য রাগ করে না এতে ঠোঁট টিপে মিটিমিটি হাসে জানে, মানুষটা এরকমই

  কিন্তু আজ যেন অন্যরকম লাগছে মানুষটাকে কাগজ পড়তে পড়তে এত গম্ভীর তো হয় না! এমন বিড়বিড়ও করে না! যে কথাগুলো বলল, তারও তো কোনও মাথামুণ্ডু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! কাগজে চোখও নেই! কাঁধে হাত দিতে, যেভাবে তাকাচ্ছে যেন বিদিশা নয়, অন্য কেউ

  বিদিশা জোর করে ঠোঁটে হাসি টেনে বলে কী গো! সাতসকালে কী নাটক শুরু করলে! ওদিকে চা যে ঠান্ডা হয়ে গেল

  অনিকেতের চোখ মুখ একসঙ্গে ভাষা পায় হ্যাঁ ঠান্ডা; শুধু চা কেন, ফ্রয়েড, স্কিনার, পাভলভ, চমস্কি, সব্বাইকে ঠান্ডা করে দেওয়া হবে ওঁদের তত্ত্বকে গ্লেসিয়ারের তলায় চাপা দেওয়া হবে মানুষের আকার-প্রকার, এমনকি সায়েন্টিফিক-নেম অবধি বদলে ফেলা হবে হোমো-স্যাপিয়েন্স বলা যাবে না; হোমো-ইনিব্রিয়েট বলা হবে ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড?

  বিদিশা এবার বাস্তবিকভাবেই দিশাহীন এসব তুমি কী বলছ?

  অনিকেতের গলা আর একপ্রস্ত চড়ে সেই লাতিন প্রবাদ, ‘হোমো হোমিনিস লুপাসকথাটা ঠিকই! দ্যাট মিনস ম্যান ইজ উলফ আনটু ম্যানএকজন মানুষ, অন্য একজনের পক্ষে নেকড়েঅ্যাবসল্যুটলি কারেক্ট মাইন্ড ইট

  ঘাবড়ে যায় বিদিশা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না তবে ওর মুখ-চোখ দেখে অনুমান করে, অনি কোনও কারণে প্রচণ্ড রেগে গেছে ওর জানা, অনি রেগে গেলে চোখদুটো লাল হয়ে ওঠে, আর ব্যাকব্রাশ করা চুলের কয়েকগাছি আশ্চর্যজনক ভাবে ঝুলে পড়ে কপালের ওপর ওর রাগ কমানোর উপায়টাও আবিষ্কার করেছে বিদিশা কপালে ঝুলে পড়া চুলগুলোকে স্বস্থানে ফিরিয়ে দেওয়ার উপলক্ষে কয়েকবার মাথায় হাত বুলোলেই অনেকখানি রাগ কমে যায়

  হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠে বিদিশা অনিকেতের মাথায় হাত বুলোয় কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কী হল তোমার! এত রেগে উঠলে কেন?

  এর মধ্যে বাপির রাগমেশানো কণ্ঠস্বর শুনে অদ্রিজা বেরিয়ে এসেছে পড়ার ঘর থেকে ওর বাপিকে যেমন ভালবাসে, তেমন ভয়ও করে বিশেষত কোনও কারণে বাপি রেগে গেলে ওর হৃৎকম্প শুরু হয় বুকের ভেতর দুরুদুরু মেঘ ডাকে আর চোখের কোনায় বৃষ্টি জমে ভীরু ভীরু পায়ে ব্যালকনিতে গিয়ে মায়ের আঁচলের খুঁট ধরে দাঁড়ায় ইশারায় মা-কে জিজ্ঞেস করে, বাপি রাগল কেন!

  বিদিশাও ইশারায় জানায়, ‘কিছু হয়নি, তুমি রিডিং রুমে চলে যাওযাওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও ছোট্ট মেয়েটা পা ঘষতে ঘষতে পড়ার ঘরে ঢুকে পড়ে

  অনিকেত ততক্ষণে ওর কাঁধে রাখা বিদিশার হাতের ওপর মাথাটা হেলিয়ে দিয়েছেন ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে চোখদুটো বোজা বিদিশা মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলে তোমাকে এমন করতে দেখে অজি খুব ভয় পেয়েছে তোমার অসুবিধা কী হচ্ছে বল তো!

  এবার আলতো করে চোখ খোলেন অনিকেত কিন্তু কোনও কথা বলেন না চোখে মুখে রাগের চিহ্ন নেই সদ্য যেন ঘুম থেকে উঠলেন নিজের কাঁধ থেকে বিদিশার হাতখানা নামিয়ে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেন কী গো! অজি ভয় পেয়েছে, না কী যেন বললে! মেয়ে আমার ভয় পেল কিসে? তুমিই বা এভাবে আমার কাছে কেন এখন?

  অনিকেত যে মোটেও মজা কিংবা ভান করছেন না, তা বোঝে বিদিশা চেষ্টা করলেও এত নিখুঁত অভিনয় করতে পারবে না; হেসে ফেলবে, তা বিদিশা জানে

  তাহলে কি কোনও ঘোরের মধ্যে ছিল! নিজের অজান্তেই কি ওইসব আবোল তাবোল বকছিল! তাহলে আর তা ওর মাথায় ঢুকিয়ে দরকার নেই এখন তো স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছে তাই বলে কিচেনে একটা বিড়াল ঢুকেছিল, তাই দেখে ভয় পেয়েছে তোমার মেয়ে বিড়ালটা তাড়ানোর জন্য তোমাকে বলতে এসেছিলাম এখন পালিয়েছে নাও চা খাও

  টিপয় থেকে হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিতে নিতে অনিকেত বলে ওঠেন হাফ কাপ চা দিয়েছ কেন? চায়ের জল নিতে ভুল করেছ নাকি!

  হ্যাঁ, ভুল নিয়েছি ওটুকু খাও, আবার তৈরি করে দিচ্ছি

  দাও কাগজটা কই?

  ওই তো তোমারই হাতে! অ্যাই! কাগজটা আগে আমাকে একটু দাও তো! আমি একটা জিনিস দেখে নিয়ে দিচ্ছি

  ! বুঝেছি তুমি তো রাশিফল দেখবে নাও, তাড়াতাড়ি দেখে নিয়ে দাও আমাকে

  বিদিশা খপ করে কাগজটা নেয় অনিকেতের হাত থেকে পাঁচের পাতা খোলা ছিল ওই পাতার কোনও খবর পড়েই হয় তো ...

  দেখতে হবে পাঁচের পাতাটা কিচেনে যাওয়ার উপক্রম করতেই কলিংবেল বেজে ওঠে নিশ্চয় কাজের মেয়ে চম্পা দরজা খোলার জন্য বিদিশা এগোয় চাবি হাতে দরজা খুলতেই চম্পা ঢোকে ওর সব সময়ই ব্যস্ততা তিনটে ফ্ল্যাটে কাজ করে বিদিশাই বলেছে অন্য দুটো ফ্ল্যাটের কাজ সেরে ওর ফ্ল্যাটে আসার জন্য এত তাড়াহুড়ো পোষায় না ওর কাজে যেমন তড়বড়ানি, কথাও বলে তড়বড় করে হাত আর মুখ একসঙ্গে চলে

  বিদিশার হাতে খবরের কাগজ দেখে বলে ওঠে কী গো বউদি! দাদার আপিস নেই আজ? সক্কালবেলা পেপার পড়ছ! সময়ে তুমি তো পেপার পড় না! দাদাবাবুই তো চা আর পেপার একসঙ্গে ...! মা! তোমার আজ চা খাওয়া হয়নি এখনও! খেয়ে নাও শিগগির!

  বিদিশা চম্পার এই বকবকানিতে অভ্যস্ত তাই কোনও উত্তর দেয় না ওর কথার ওর কথা থামলে বলে রান্নাঘর থেকে বাসনগুলো বের করে নে আগে চা ঠান্ডা হয়ে গেছে আমি আবার চা বসাতে ঢুকব

  চম্পা একটু অবাক হয় বউদি এত গম্ভীর হয়ে তো কথা বলে না! ওদিকে দাদাবাবুও বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে রয়েছে চা খাচ্ছে না পেপার পড়ছে না! তাহলে নিশ্চয় হাওয়া গরম! ফ্ল্যাটবাড়ির মানুষগুলো এরকমই কখন যে ওরা গরম হয়, কখন ঠান্ডা হয় বোঝা মুশকিল এই হাসিখুশি; তো এই গোমড়ামুখ এই বকম বকম; তো পরক্ষণেই কথা বন্ধ তারপরই একে অপরের দিকে আগুনের গোলা; নয় তো নর্দমার কাদা ছোড়ে ফ্ল্যাটবাড়িতে কাজ করা তো কমদিন হল না! তবুও লোকগুলোকে ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেনি এসব ভাবতে ভাবতে রান্নাঘরে ঢোকে চম্পা

  বিদিশা একবার অনিকেতের দিকে তাকিয়ে রিডিংরুমে ঢোকে মেয়েটা পড়া করছে, না এদিকে কান পেতে বসে রয়েছে, কে জানে! ওর বাপির অসংলগ্ন কথাগুলো কি ওর কানেও গেছে? গেছে তো নিশ্চয়! তা না হলে উঠে এল কেন? হঠাৎ কী যে হল মানুষটার! হবে না- বা কেন! মানুষেরই তো শরীর! কোনও নিয়মনীতি মানে! রাত জেগে পড়তে পড়তে, নয় তো লিখতে লিখতে ভোরই হয়ে গেল! থিসিস তৈরি, রিসার্চ, এসব যেন আর কেউ করে না! এমন পাগল পাগল কথা বলতে শুনিনি কাউকে দাদাও তো লোক-সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করেছে, ডক্টরেট হয়েছে কোনওদিন এমন ..... বিষয়টাও এমন বিদঘুটে বেছেছে! ‘সারা বিশ্বে মানবিক মূল্যবোধের অবনমন তার উৎস-সন্ধাননা কী যেন একটা ....

  এসব ভাবতে ভাবতে মেয়ের কাছে আসে বিদিশা মা- কে কাছে পেয়ে প্রশ্নভরা চোখ অদ্রিজার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বস্ত করে ও কিছু হয়নি তোমার বাপির কাল রাতে বোধহয় ঘুমোয়নি সারারাত জেগে কাজ করেছে হয়তো সেসবই মাথায় ঘুরছে তোমার ম্যাথস হল?

  এই তো করছি মম!

  ঝটপট করে নাও আদার্স হোমওয়ার্কগুলো হয়ে গেছে?

  হ্যাঁ, শুধু জিওগ্রাফির একটা কোয়েস্ট বুঝতে পারছি না

  রান্না বসিয়ে এসে একটু বুঝিয়ে দিও না!

  ঠিক আছে, ম্যাথস হোমওয়ার্ক সেরে নাও পরে আসছি আমি

  অদ্রিজা অংকে মন দেয় বিদিশা ওর পাশে দাঁড়িয়ে হাতে ধরা খবর কাগজে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় প্রথম পাতার হেডলাইন বা রাশিফল নয়; পাঁচের পাতার টুকরো খবরগুলো দ্রুত পড়তে থাকে ওর ধারণা, কাগজের কোনও খবর পড়েই হয় তো অনি এমন করেছে সামান্য ব্যাপারে এমন রি-অ্যাক্ট করে মানুষটা! কিন্তু তেমন খবর তো... ফার্স্ট কলামে রয়েছে শীঘ্র রদবদল দলীয় সংগঠনে’, তার নীচে রাজনৈতিক সংঘর্ষ নিয়ে রাজ্যপালের প্রস্তাব মানছে কেন্দ্র, ‘সন্ত্রাস বন্ধ করলে তবেই আলোচনা মাওবাদীদের সাথে: মুখ্যমন্ত্রী  

  বিদিশা জানে, এসব খবর অনি পড়ে না ও বিশেষ ধরনের খবর পড়ে আন্ডারলাইন করে ওর থিসিস লেখাতে সেসব নাকি কাজে লাগে তেমন ধরনের খবর তো ...

  রিডিংরুমের সামনে চম্পা যাও গো বউদি, বাসন সরিয়ে নিয়েছি চা বসাবে তো বসাও গে! আমার জন্যেও এককাপ জল নিও আজ সরকার বউদির চা-টা মোটেও জমেনি

  বিদিশা মেয়ের কাছ থেকে সরে আসে এই নে চম্পা, পেপারটা তোর দাদাবাবুকে দিয়ে আয় তো!

  কেন তুমি ....

  যা বললাম কর না! এত ফালতু বকিস কেন?

  দ্বিতীয়বার চা বানিয়ে দিতে গেলে অনিকেত আর খান না বিদিশাও জোরাজোরি করে না অন্য দিনের চেয়ে আজ আগেই বাথরুমে ঢুকে যান অনিকেত চম্পা যেন এই সুযোগটার অপেক্ষাতেই ছিল নিজের কাপের চা শেষ করে মেঝেয় বসে তারপর বিদিশার কাছে এসে বলে চা টা খেয়ে নাও গো বউদি; মন খারাপ কোরো না সমসার কত্তে গেলে ওরকুম খিটিমিটি, ঝগড়াঝাঁটি হয়, আবার মিলমিশ হয়ে যায় এখনকার রাগ গলে জল হয়ে যাবে রাতের বেলায়

  কথাটা বলেই চম্পা খিকখিক করে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হাসে তা দেখে বিদিশা রেগে ওঠে কে বলেছে তোর দাদাবাবুর সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়েছে?

  কেউ না বললেও বুঝতে কি আর পারি না! আমরাও সমসার করি গো বউদি আমার বরও মাঝেসাঝে রাগ করে, চচ্চাপড়ও চালিয়ে দেয় আমি রাগ করি না পুরুষ মানুষ, সারাদিন গাধার খাটুনি তারপরেও অভাব, টানাটানি সবসময় কি মাথার ঠিক থাকে ওদের! রাগ করে মারধোর করলেই বা, পরে আদরও তো করে পাগলের মতোন তোমাদের না হয় অভাব নেই ...

  থাক চম্পা, তোকে আর সাতকাহন শুরু করতে হবে না আমাদের ঝগড়াঝাঁটি হয় না কখনও

  ওই জন্যে তোমাদের প্রেমও ঠিকঠাক হয় না গো বউদি, সেদ্ধ না হওয়া আলুর আলুপোস্তর মতো, আলু একদিকে আর পোস্ত একদিকে!

  দ্যাখ চম্পা! মন-মেজাজ ভাল নেই, কিছু বলে ফেললে ফোঁস করে উঠবি কাল থেকে কাজে না আসার হুমকি দিবি আজকাল তুই দেখছি খুব লম্বা-চওড়া কথা বলতে শিখেছিস! আমার ব্যাপার আমাকে বুঝতে দে, যা তুই কাজ সেরে নে!

  চম্পা ঠোঁট উল্টে কলঘরে ঢুকে যায় অন্যদিনের চেয়ে বেশি শব্দ করে বাসন ধুতে থাকে বিদিশা রান্নাঘরে ঢোকে আধঘন্টা সময় আছে হাতে এর মধ্যে অনির জন্য ঝোল-ভাত, মেয়ের খাবার, স্কুলের টিফিন ভাগ্যিস  মাইক্রোওয়েভ ওভেনটা ঠিকঠাক রয়েছে কিন্তু মন ঠিক না থাকলে হাতও চলতে চায় না কী যে হল মানুষটার বোঝা যাচ্ছে না কথাগুলো অস্বাভাবিক হোক না হোক, যা বলেছে তা মনেও নেই ওর এটাই তো সবচেয়ে বেশি ভাবনার ওর কিছু হয়ে গেলে তো ...!

  বিদিশা কিচেনে থাকলেও ওর চোখ আর কান বাথরুমের দিকে অনি বাথরুমে ঢুকেছে অনেকক্ষণ হল এতটা সময় তো লাগে না! আজ যেন বেশি সময় নিচ্ছে! কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে চম্পার চোখ বাঁচিয়ে বাথরুমের দরজায় কান রাখে একটানা জল পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে

  শাওয়ারের শব্দ এতক্ষণ ধরে স্নান করছে নাকি! ওর ঠান্ডা লাগার ধাত, বেশিক্ষণ জল ঢালে না শাওয়ার খুলে দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে নেই তো আবার! কিংবা কল খুলে দিয়ে আবোল তাবোল বকে যাচ্ছে নাকি? বিদিশা দরজায় নক করবে কি না ভাবে

  পরক্ষণেই সে ভাবনা বাতিল করে চম্পা কী ভাববে!

  এমনিতেই সন্দেহ করেছে ওদের দুজনের মধ্যে নাকি ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে অশিক্ষিত মানুষগুলোর এই এক দোষ, এর বেশি কিছু ওরা ভাবতে পারে না ঝগড়াঝাঁটি ছাড়াও যে আরও বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে, তার ধারণাই নেই ওদের বাড়ির সুস্থ সবল মানুষটা হঠাৎ অর্থহীনভাবে বকতে শুরু করলে ... আচ্ছা! অর্থহীন ভাবছেই বা কেন? অনিকেত যা বলছিল, নিশ্চয় তার কোনও অর্থ আছে, যা ধরতে পারেনি এমন জটিল বিষয় নিয়ে দিনরাত চর্চা করে অনি তাতে কিছু কথাবার্তা ওর কাছে দুর্বোধ্য লাগতেই পারে সে জন্য মানুষটার মাথার গন্ডগোল হচ্ছে ভাবার কোনও কারণ নেই আচ্ছা!

কথাগুলো দুর্বোধ্য মনে হতেই পারে ওর কাছে! কিন্তু অনি পরে আর মনে করতে পারল না কেন কিছু! এমনকি হাফ কাপ চা আগে খেয়ে ফেলেছে, সেটাও মনে নেই! অন্যমনস্ক হতেই পারে মানুষ; তাই বলে এতখানি ভুলোমন হয়ে যাবে! বোঝা দায় এসব!

  বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছে বিদিশা চম্পা হঠাৎ বলে ওঠে কী গো বউদি, ওখানে দাঁড়িয়ে!

  দাদাবাবুর সাড়াশব্দ পাচ্ছ না নাকি! তোমাদের ব্যাপার-স্যাপার বুঝি না বাবা!

  বিদিশা অপ্রস্তুত কী বলবে চম্পাকে হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি আসে আরে! কখন ঢুকেছে, বেরোচ্ছেই না আমার এদিকে জোর বাথরুম পেয়েছে

  চম্পা ফিক করে হাসে ! এই ব্যাপার! এক কাজ কর আমার কলঘরের কাজ হয়ে গেছে ওখানে যাও, আমি জল ঢেলে দেব

  না, ওখানে থালা-বাসন ধোয়া হয় এক কাজ কর তো! দরজায় টোকা মেরে তোর দাদাবাবুকে ডাক ওদিকে বোধহয় বেগুনভাজাটা পুড়েই গেল

  বিদিশা আবার রান্নাঘরে ঢুকে যোয় চম্পা একটু ইতস্তত করে বউদি দরজায় টোকা মারতে বলেছে ঠিকই, কিন্তু...! একজন মেয়েমানুষ ভেতরে থাকলেও না হয় ঠিক ছিল

  কিন্তু বাথরুমে একজন ব্যাটাছেলে স্নান করছে সে দরজায় টোকা দেওয়া! ইস! দাদাবাবু কী ভাববে! এমনিতেই যা রাশভারি দাদাবাবু!

  বিদিশার বিরক্তি মেশানো চড়া গলা কী রে! হাবার মতো দাঁড়িয়ে রইলি যে! তোর দাদাবাবুকে ডাকতে বললাম না! বল ফোন এসেছে শিগগির বেরোতে

  চম্পা আর এক মুহূর্ত দেরি করে না দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলে দাদাবাবু! তাড়াতাড়ি করুন, ফোন এসেছে দাদাবাবু ....

  বিদিশা নিজেই নিজের তারিফ করে না রে! বিদিশা! খুব একটা ভোঁতা নয় তোর মাথাটা; ঠিক সময়ে ঠিক বুদ্ধি জুগিয়ে যাচ্ছে

  বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায় চম্পা সক্ষম হয় বাথরুমের দরজা খোলাতে অনিকেত ভিজে গায়ে-মাথায়, অন্তর্বাস পরনে হুড়মুড় করে বেরিয়ে পড়েন কার কী হল? আমার অজি-মায়ের কিছু হল নাকি?

  অনিকেতকে ওই অবস্থায় দেখে চম্পা লজ্জা পেয়ে ছুটে কলঘরে ঢুকে যায়

  বিদিশা রান্নাঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে পরিস্থিতি সামাল দিতে এমন সময় সত্যি-সত্যিই টেলিফোনটা বেজে ওঠে — ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে ...!’  

  চম্পার চেঁচামেচিতে অদ্রিজা পড়ার ঘর থেকে ইতিমধ্যে বেরিয়ে এসেছে বাপিকে ওই অবস্থায় বাথরুম থেকে বেরিয়ে পড়তে দেখে খুব ভয় পেয়ে যায়বাপি’ ... লে চিৎকার করে ওঠে অনিকেত এবার মেয়ের চিৎকার শুনে ভেবে নেন নিশ্চয় কোনও বিপদ! বলে ওঠেন কোথায়, কোথায় নিরুপমা! মার্ডার হয়ে গেছে? শ্বাসরোধ? না ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে?  

  অদ্রিজা তখন পড়ার ঘরে থাকলেও ওর বাপির অদ্ভুত ধরনের কথাগুলো ওর কানে গিয়েছিল মম যতই বলুক, কিছু হয়নি, ওর মনে একটা সন্দেহ দানা বেঁধেছিল এখন বাপির ওই অবস্থা দেখে ওর ভয় পেয়ে ওঠা স্বাভাবিক আর বাথরুমে এতক্ষণ থেকেও অনিকেতের স্নান সম্পূর্ণ হল না, বরং কোন নিরুপমার মার্ডার হওয়ার ভীতি মাথাচাড়া দিল কেন, সেটা ছাড়া আর কেউ ঠিকঠাক বলতে পারবে না

  কলঘরে চম্পার খিলখিল হাসি, অদ্রিজা অনিকেতের ভয়জনিত চিৎকার, বিদিশার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা, ওদিকে টেলিফোনের ঝনঝনানি মিলেমিশে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড!

  বিদিশার কিছুক্ষণের প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে অনিকেতকে আবার বাথরুমে ফেরত পাঠানো হয় গা-মাথা মুছে নেওয়ার জন্য ধমক খেয়ে চম্পার হাসি থামে ফোনটা ধরা হয়ে ওঠে না বাজতে বাজতে একসময় থেমে যায়

  অদ্রিজাকে আর পড়ার ঘরে ফেরত পাঠানো যায়নি মায়ের আঁচলের খুঁট আনমনে নিজের আঙুলে জড়াতে জড়াতে প্রশ্ন করে বল না মম! বাপির কী হয়েছে?

  মেয়ের মুখের দিকে তাকায় বিদিশা দেখে মেয়েটার চোখদুটো ক্রমশ জল টলটলে হয়ে উঠছে তা দেখে বিদিশার চোখদুটো জ্বালা জ্বালা করতে থাকে আপ্রাণ চেষ্টায় চোখের জলে বাঁধ দিয়ে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলে ধুর বোকা মেয়ে! কিছু হয়নি তোর বাপির যাও তুমি আমি তোমার বাপির খাবার রেডি করে দিয়ে আসছি তোমার জিওগ্রাফির টাস্ক করিয়ে দেব

  কিছুক্ষণের মধ্যেই অনিকেত বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসেন ইউনিভার্সিটি যাওয়ার পোশাক পরে নেন ঠিকঠাক তৈরি হয়ে এসে ডাইনিংয়ের নির্দিষ্ট চেয়ারে বসেন অতিমাত্রায় স্বাভাবিক এখন কে বলবে মাত্র মিনিট দশেক আগে কোথায় নিরুপমা! মার্ডার হয়ে গেছে? শ্বাসরোধ? না ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে?’ লে চিৎকার করে উঠেছিলেন খাওয়া শেষ হলে, প্রতিদিনের মতো ঘড়ি দেখে, মোজা-জুতো পরে ঠিক সময়ে রওনা হন শুধু একটা ভুল হয়েছে অনির বেরোনোর আগে প্রতিদিনের মতো আজ মেয়েকে আদর করেননি

  সময়টাতে বিদিশার নিশ্বাস নেওয়ারও বুঝি সময় থাকে না তার মধ্যে আজ আবার অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ও একবার ভেবেছিল, অনিকেতকে বলবে, আজ না বেরোনোর জন্য পরক্ষণেই ভাবে, সেটা ঠিক হবে না এতে অনি যে কিছুটা অস্বাভাবিক ব্যবহার করছে, এটাই এস্টাবলিশড হবে এখন তো একদম স্বাভাবিক ওকে বুঝতে দিলে হবে না ব্যাপারটা তবে ইগনোর করাও ঠিক হবে না

  ওকে খেতে দিয়ে মেয়ের কাছে গেছে জিওগ্রাফির হোমটাস্ক-য়ের আনসার বলে দিয়েছে ঠিক সময়ে মেয়েকে ড্রেস-আপ করিয়ে, খাইয়ে, স্কুলবাসে তুলে দিয়ে এসেছে নীচে গিয়ে মেয়েটা বাসে ওঠার আগে বলে বলেছে, ‌‘মা, বাপি ঠিকঠাক পৌঁছল কি না একটু খোঁজ নিওএখনও বোধহয় পৌঁছয়নি একটু পরে ফোনে খোঁজ নেবে

  চম্পার সকালের কাজে এটাই শেষ বাড়ি, তাই এখানে একটু রয়েবসেই কাজ করে তাছাড়া বউদি প্রায় ওর সমবয়সী, কাজের সময় অন্যদের মতো খিচির খিচির করে না, খুঁত ধরে না কাজের পর বউদি টিফিনও দেয় রোজ তাই অনেকটা সময় দেয় এখানে বিদিশা যেদিন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিতে নাকানিচোবানি খায়; সেদিন ওর ধরাবাঁধা কাজের বাইরেও একটু হাত লাগায় ভেবেছিল, আজ বউদি ওকে বলবে, মেয়েটাকে স্কুলবাসে ছেড়ে আসার জন্য কিন্তু বলেনি চুপচাপ সামলে যাচ্ছে সকালের এই ব্যস্ততাটুকু  

  চম্পা কোনও বাড়িতেই নির্ধারিত কাজের বাইরে একটাও বেশি কাজ করে না বলে বেশি কাজ করাচ্ছ, বেশি টাকা দেবে তো?’ আবার এটাও ঠিক যে, নির্ধারিত কাজের কোনটাতে ফাঁকিও মারে না বলে– ‘এই কাজই আমার ছেলেমেয়ের মুখে অন্ন জোটাচ্ছে, তাতে ফাঁকি দিলে পাপ লাগবে

  শুধুমাত্র ছেলেমেয়েদেরকে স্কুলবাসে চড়িয়ে দিয়ে আসতে বললে আপত্তি করে না বরং খুশিই হয় কাজটা করতে ওর খুব ভাল লাগে হয়তো কচি কচি ছেলেমেয়েগুলোকে দেখে ওর ছেলে আর মেয়ের কথা মনে পড়ে যায় কিংবা নিজের ছোটবেলার অপূর্ণ সাধটাকে পূর্ণ করে নেয় ওই স্কুলবাসে অদৃশ্য সওয়ারি হয়ে

  চম্পার আজ আর অদৃশ্য সওয়ারি হওয়া গেল না

  একটানা অনেকক্ষণ কাজ করার পর ডাইনিং-য়ে মেঝেতে ফ্যানের তলায় পা ছড়িয়ে বসেছে সময় বিদিশা রোজ ওকে চা আর দুপিস সেঁকা পাউরুটি দেয় তারপর নিজেও সামান্য টিফিন সেরে নেয় কিন্তু আজ মেয়েকে স্কুলবাসে ছেড়ে এসে সেই যে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বসেছে, আর নড়ন চড়ন নেই মাঝেমাঝে অর্কিডের ফাঁকফোকর দিয়ে ওর দৃষ্টি দূরে আবছা হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় হুগলি-সেতুর চুড়োটার দিকে, আবার খবরের কাগজের পাতায়

  চম্পা এখনও চা-পাউরুটি পায়নি ওর মনে চাপা উষ্মা ভাবে, এইসমস্ত লোকগুলোর মতিগতি বোঝা দায়! এসে দেখল, মিঞা-বিবি কিস্যা চলছে তারপর তো বাথরুমে  ঢুকে এক কেলেঙ্কারি! উনি মেয়েকে স্কুলবাসে ছেড়ে এসে সেই যে কাগজ নিয়ে ঘাড় গুঁজে বসলেন, আর ওঠার নাম নেই! কী এত খবর পড়ে কে জানে! টিভিতেই তো চৌপরদিন খবর চলতেই থাকে একবার দেখে নিলেই হয় এত কাগজ পড়ার কী দরকার!

  চম্পা বলে ওঠে কী গো বউদি! আজ টিফিন-ফিপিন খাবে না! কাগজ পড়েই পেট ভরাবে নাকি!

  বিদিশা থতমত খেয়ে চম্পার দিকে তাকায় সব ভুলে যেন এতক্ষণ অন্য জগতে ছিল চম্পার কথায় বাস্তবে ফিরে আসে  

  চম্পা অবাক চোখে বিদিশার মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে কী বোঝে কে জানে! আর কোনও কথা না বলে ডাইনিং টেবিল থেকে এঁটো থালা-বাটি তুলে নিয়ে কলঘরে ঢুকে যায়

  বিদিশা হাত বাড়িয়ে কাগজখানা নিয়ে আবার তার মধ্যে ডুবে যায় পাঁচের পাতাটা উপরে ছিল বলে -পাতাটা প্রায় খুঁটিয়ে পড়ে ফেলে আঁতিপাতি করে খুঁজতে থাকে এমন একটা খবর, যে খবরটা পড়ে অনিকেতের মনে প্রবল প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছিল আনমনে পাতা উল্টিয়ে ছয়ের পাতায় চোখ ফেলতেই চমকে ওঠে লেখা রয়েছে, ‌‘প্রতিবন্ধীদের জীবন-যন্ত্রণাআজ নিরুপমা দাশগুপ্ত

ছয়

 

অরুময় দোতলার ব্যালকনি থেকে রাস্তার দিকে চোখ মেলে বসে রয়েছে ফুটপাতের পাশে আবর্জনার ভ্যাটে কিছু কাকের জটলা সেখানে একটা বেড়ালছানা কোত্থেকে এসে জুটেছে কাকগুলো তাকে দেখে ভয়ে কিংবা হিংসায় চিৎকার জুড়েছে একটা ঘেয়ো কুকুর হঠাৎ সেখানে এসে জুটল তাকে দেখে বেড়ালছানা সটকান দিয়েছে কিন্তু কাকগুলোর চিৎকার বেড়ে গেল এসব দেখেশুনে অরুময়ের বিরক্ত লাগছে তবুও ব্যালকনি থেকে নড়ছে না অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে খবরের কাগজের জন্য আজ যেনপেপারওলাছেলেটা বেশি দেরি করছে! অরুময় কাকের চিৎকারে বিরক্ত হয়ে ক্যাকটাসের টব  থেকে একটা নুড়ি পাথর তুলে নিয়ে ছুঁড়ল সেদিকে কাকগুলো উড়ে গিয়ে আবার বসল কুকুরটার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই সে চিল্লাতে থাকা কাকগুলোর দিকে নিষ্ফল  ধাওয়া করছে

  ভ্যাট থেকে চোখ সরাতেই দেখে, সাইকেল চড়ে পেপারওলা ছেলেটার  বাড়ির কাছাকাছি মনের বিরক্তি চলে গিয়ে জায়গা নেয় আগ্রহ কাগজটাই এখন মূল লক্ষ্য ছেলেটা চলন্ত অবস্থাতেই অদ্ভুত নিশানায় গোটানো কাগজটা ব্যালকনির দিকে ছুঁড়ে দিল অরুময় সেটা লুফে নিতে চেয়েও পারল না, পড়ল ব্যালকনির মেঝেতে

  ব্যস্ত হাতে তুলে নিয়ে কাগজ খুলে একদম ছয়ের পাতায় আঠাশ পয়েন্টের হেড লাইন, তার নীচে কুড়ি পয়েন্টের সাব টাইটেল দিয়ে বেরিয়েছে লেখাটা বেশ কয়েকবার ঘসামাজা করে লেখা তবুও ছাপা অক্ষরে পেয়ে পড়তে শুরু করে নিজের লেখা কিন্তু একটু যেন অন্যরকম লাগে ভাবেবেশ অ্যাপিল আছে লেখাটাতে কিছু মানুষ নিশ্চয় মুভড হবে পরক্ষণেই ভাবেধুস! আজকালকার মানুষ সচেতনতার সীমানা পেরিয়ে অতি-সচেতন হয়ে গেছে তাই কাগজ পড়তে পড়তে চায়ের কাপে তুফান তুললেও প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করতে ভুলে গেছে আদৌ কি বুদ্ধিজীবী সমাজ একটু নড়চেড়ে বসবে? মনে তো হয় না এখন লেখা-টেখা দিয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করা যায় না যাবেই বা কী করে!

  খবরের কাগজ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতাই হারিয়ে ফেলেছে একই বিষয়ে বিভিন্ন কাগজ বিভিন্ন রকম খবর ছাপে কোনও কোনও কাগজ তো অন্য কাগজের সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলে মানুষ কোনটাকে বিশ্বাস করবে! আসলে, কোনও কাগজই নিরপেক্ষ নয়নিরপেক্ষকথাটাই আসলে বাস্তবোচিত নয় ওই শব্দটা অভিধানে স্থান পাওয়া ছাড়া বোধহয় আর কোনও অস্তিত্ব নেই!... এসব কথা ভাবতে ভাবতে অরুময়ের হঠাৎ মনে হয়আরে! নিজে একজন সাংবাদিক হয়ে কী আবোল তাবোল ভাবতে শুরু করল সকালবেলায়! সংবাদপত্রের কাজ সংবাদপত্র করেছে, মানুষ সরব হবে কি নিরব থাকবেএসব ভাবার দরকার কী!

  এমন সময় অপালা দ্বিতীয় দফা চা নিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায় অরুময় ভাবে, লেখাটা অপালাকে পড়তে বললে হয় পরক্ষণেই সংযত হয়, না থাক, এমনিতেই লুনাটিক অল্পতেই ভীষণ রি-অ্যাক্ট করে এমন একটা ঘটনা ড়ে কী রিঅ্যাকশন হবে কে জানে আগামীকাল ডা. নির্বেদ দাশগুপ্তর কাছে যাওয়ার জন্য কোনক্রমে রাজি করানো গেছে এসব পড়ে বিগড়ে গেলে মুশকিল তাই ছয়ের পাতাটা চটপট উল্টে ফেলে, যাতে ওর নামটা অপুর চোখে না পড়ে হাত বাড়িয়ে চা নেয় চোখ কাগজের পাতায়

  অপালার এখন ব্যস্ততার সময় সাড়ে টার মধ্যে ওকে বেরোতে হয় রাঁধুনী থাকলেও রান্নাঘরে অনেকখানি সময় যায় তাছাড়া কলেজে যাওয়ার জন্য একটা প্রস্তুতি তো থাকেই তবুও অরুময়ের হাতে চায়ের কাপ ধরানোর পরও অপালা দাঁড়িয়ে থাকে অরুময় কাগজ থেকে চোখ না সরিয়ে বলেকিছু বলবে?

  অপালা বলেনা, আমি শুনব, তুমি বলবে

  অরুময় মুখ ঘোরায় ভ্রুতে প্রশ্নআমি কী বলব?

  ! কিছু বলবে না? আমি ভেবেছিলাম, আজকের কাগজের তোমার সেই অনুপমা না নিরুপমা কার যেন জীবন-যন্ত্রণা বেরোবে, সেটা আমাকে পড়তে বলবে

  ! ওই ব্যাপারটা তোমাকে বলেছিলাম বুঝি!

  তোমার মনে নেই! পরশুদিন আমাকে তীব্র আশ্লেষে আদর করতে করতে হঠাৎ বলে উঠেছিলে, ‘জানো! আজ বিকেলে একজন প্রতিবন্ধী নারীর সাক্ষাৎকার নিলাম ভদ্রমহিলা অসাধারণ সুন্দরী কিন্তু অন্ধ

  কই! আমার তো মনে পড়ছে না! ওরকম সময় তার কথা তোমায় বলতে যাবো কেন?

  সেসময় আমার মুখটা অসুন্দর লেগেছিল, আর বিকেলে দেখা সুন্দর মুখখানা মনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল তাই... তবে, এতে আমি কিছু মনে করিনি ঘরের ফুলদানিতে সাজানো রজনীগন্ধার গন্ধ হঠাৎ নাকে এলে রাস্তার ধারে পাওয়া হাসনুহানার গন্ধ মনে পড়তেই পারে! এটা দোষনীয় কিছু নয়!

  অরুময় রেগে গিয়েও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে অথবা আজ কাগজে ওর এই বিশেষ ধরনের লেখা বেরোনোর তৃপ্তি রাগকে প্রশমিত করে তাই বলে বাদ দাও ওসব কথা সকালের দিকে তোমার ব্যস্ততা থাকে, তাই পড়তে বলিনি কাগজ তো রইল পরে সময় সুযোগ মতো পড়ে নিও  

  আমার পড়া হয়ে গেছে সেই সুন্দরী প্রতিবন্ধী ভদ্রমহিলার সাক্ষাৎকারের রেকর্ডিং চালিয়ে লেখাটা তৈরি করলে ঘরে বসেই আমাকে ওই কাগজে ছাপা লেখা পড়তে বললে হয়তো পড়তামও না, পড়ার ভান করতাম কিন্তু তোমার বলা উচিত ছিল

  ঠিক আছে বাবা, ভুল হয়ে গেছে এখন খুনসুটি বাদ দাও আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে

  কেন? তুমি তো আগে বেরোতে চাও না!

  আজ একটু ওই প্রতিবন্ধী হোমে যেতে হবে সেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে দেখা করে অফিস যাবো আজ একজনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা

  যদি কাল থেকে বলে রাখতে আজ আগে বেরোবে, তাহলে সুবিধা হতো রান্নার আইটেমটা কম রাখতাম

  রান্না তো তুমি করছো না, করছে তো মালতিদিদি

  তা তো আমি জানি আমি কেন বলছি তুমি কী বুঝবে? আসলে ...

  এমন সময় অরুময়ের মোবাইলফোন বেজে ওঠে অপালা কথা থামিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোয়

  অরুময়ের ফোনের স্ক্রিনে ফুটে উঠেছেনিরুপমা কলিং...

  ফোন রিসিভ করতেই নিরুপমার উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বরঅরু, এই মুহূর্তে তুমি কোথায়?  

  আমি বাড়িতে!

  তুমি শিগগির আমাদের হোমে চলে এসো

  আমি হোম হয়েই অফিস যাবো ঠিক করেছি

  না, দেরি করলে হবে না, তুমি এখখুনি এসো

  আমি এখনো রেডি হইনি তো! ঠিক আছে দেখছি কী করা যায় তোমার কোনও সমস্যা?

  সমস্যা তো নিশ্চয়! তা না হলে ডাকব কেন?

  লেখাটা পড়েছ?

  হ্যাঁ, পড়েছি হোম কর্তৃপক্ষও পড়েছে হোমের নামের উল্লেখ না থাকলেও ওরা আমার সঙ্গে ঝামেলা করছে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে

  তাহলে লেখাটাতে কাজ হয়েছে বলো

  হ্যাঁ, কাজ হয়েছে, তবে সেটা ক্ষতিকারক ভালো কাজ হতে একটু সময় লাগবে

  তা ঠিক, তুমি থানায় কোনও কমপ্লেন্ট জানিয়েছ?

  না, আমি একা থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে নেবে না, ভাগিয়ে দেবে তাছাড়া থানায় এমন ছোটোখাটো অভিযোগ জানিয়ে লাভ কী! একেবারে আটঘাট বেঁধে নামতে হবে তুমি এসো তো, সাক্ষাতে কথা হবে

  ঠিক আছে আমি যত তাড়াতাড়ি পারি যাচ্ছি

  খুব চেষ্টা করেও টার আগে অরুময় ফ্ল্যাট থেকে বেরোতে পারল না নিরুপমার ফোন ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গেই বাথরুমে ঢুকেছিল প্রাত্যহিক কাজগুলোর কিছু ছাঁটকাট করে বেরোনোর সময়টাকে এগিয়ে এনেছিল কিন্তু খাবার টেবিলে গিয়ে দেরি হয়ে গেল

  ডাল-ভাত, মাছভাজা হয়ে গেলেও তখনো মালতিদি রান্না শেষ হয়নি যা হয়েছে তাই খেয়েই অরুময় বেরিয়ে পড়তে পারে কিন্তু অপালা নাছোড়বান্দাতুমি মোচার ঘন্ট খেতে ভালোবাসো হয়ে এসেছে, ওটা খেয়ে যেতেই হবে খেতে খেতে জলপাইয়ের চাটনিটাও হয়ে যাবে  

  অরুময় ভেতরে ভেতরে রেগে ওঠে কিন্তু নিজেকে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এখন মাথা গরম করলে মোটেও চলবে না হোমে গিয়ে কী পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কে জানে! ওখানে যাওয়ার আগে অফিসে নিউজ এডিটরকে একবার ফোন করে নিলে হয় যদি কোনও  ফোটোগ্রাফার পাঠাতে পারে!

  অপালার আবদার মিটিয়ে কোনওক্রমে তৈরি হয়ে যখন অরুময় মেন রোডে পৌঁছয়, তখন টা সাত অফিস টাইম শুরু হয়ে গেছে ট্যাক্সি পাওয়াও ঝকমারি অনেক দৌড়ঝাঁপ করে ট্যাক্সি নিয়ে যখন ৬৭/ বি সুখতলা রোডে পৌঁছল, তখন টা আটান্ন ট্যাক্সিতে যেতে যেতেই অরুময় ফোনে নিরুপমাকে ধরার চেষ্টা করে কিন্তু কিছুতেই ফোন ঢুকছে না কখনও জানাচ্ছে ব্যস্ত  রয়েছে, কখনও জানাচ্ছেপরিষেবা-সীমার বাইরে রয়েছে তো মহা মুশকিল হলো! ভাবতে ভাবতে অরুময় রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের সামনে পৌঁছে যায় ট্যাক্সি ছেড়ে দেয় নিরুপমা ফোনে বলল, ‘সমস্যায় পড়েছে, শিগগির চলে আসতেঅথচ...! সেন্টারের ভেতরে যে ঢুকে যাবে, সে উপায় নেই হাজারও কৈফিয়ৎ চাইবে সাংবাদিক জানলে তো আরও ঝামেলা করবে নিরুপমা এখন হোম- রয়েছে, না বেরিয়ে থানায় গেছে, সেটাও তো বোঝা যাচ্ছে না!  

  অরুময় কেমন দিশেহারা হয়ে পড়েকী করবে ঠিক করতে পারে না ওদিকে অফিসেও রিপোর্ট করা দরকার কোনও প্রায়র-অ্যাসাইনমেন্ট নেওয়া নেই শেষমেশ সিদ্ধান্ত নেয়, হোমের সামনের চা-দোকানে মিনিট দশেক অপেক্ষা করে অফিসে যাওয়ার বাস ধরবে তার মধ্যে যদি নিরুপমাকে ফোনে পাওয়া যায়

  এমন সময় ফোন বেজে ওঠে তড়িঘড়ি ফোন রিসিভ করে অরুময়হ্যাঁ, তুমি কোথায়?

  আমি আসছি এসে সব বলছি তুমি কি এসেছো?

  হ্যাঁ, আমি তোমাদের হোমের সামনে চা-দোকানটাতে ওয়েট করছি এসো শিগগির!

  কয়েক মিনিটের মধ্যে চা-দোকানটার সামনে একটা ট্যাক্সি এসে থামে ট্যাক্সি থেকে ফোন করে নিরুপমাঅরু, দোকানের সামনে দাঁড়ানো ট্যাক্সিটাতে আমি রয়েছি ঝটপট চলে এসো ট্যাক্সিতে উঠে পড়ো  

  অরুময় কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ট্যাক্সিতে ওঠে ট্যাক্সি চলতে শুরু করে নিরুপমা বোঝে, অরুময়ের চোখেমুখে এখন জিজ্ঞাসার চিহ্ন তা মোছার জন্য বলে ওঠেথানায় গিয়েছিলাম এফ আই আর করতে

  এফ আই আর নিল?

  হ্যাঁ, অনেক কষ্টে এখন যাবো মহিলা কমিশনের অফিসে চেয়ার-পার্সনের সঙ্গে দেখা করতে তোমাকে সঙ্গে থাকতে হবে তা না হলে আমাকে পাত্তা দেবে না   

  অরুময় ভালো করে দেখে নিরুপমাকে তারপর বলে ওঠেতোমার ওপর কোনো অ্যাটাক হয়নি তো? না, তা হয়নি তবে ওরা রাগে ফুঁসছে শাসানি দিচ্ছে

  সেসব কথা কি রেকর্ড করেছ? তোমাকে বলেছিলাম মোবাইলফোনের ভয়েস-রেকর্ডারটা অন করে রাখবে

  না, তখন মনে পড়েনি তাছাড়া ওরা তো ডাইরেক্ট আমাকে কিছু বলছে না শুনিয়ে শুনিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে — ‘বড্ড বাড় বেড়েছে খোট্টা সুইপার দিয়ে রেপ করাবো, তখন বুঝতে পারবেকখনও ছড়া কেটে কেটে বলছে — ‘অন্ধ নুলো খোঁড়া এক ডিগ্রি বাড়া /এমন গাদন দেবো, হবে হোমছাড়া ...  

  শোনো নিরু! এসব কথায় পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই মাথা গরম করলেও চলবে না ওদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে নামতে হবে তার আগে আটঘাট বেঁধে ফেলা দরকার

  আমি তো মাথা গরম করিনি কিছুই বলিনি তাই আমাকে তাতানোর জন্য শুনিয়ে শুনিয়ে বলছেকাল রাবেয়াকে আবার এক মন্ত্রীর বাড়ি কাজে পাঠানো হবে বোবার মুখ কী করে খোলায় দেখবো

  রাবেয়াকে এর আগে একবার...!

  হ্যাঁ, বেচারী মেয়েটা তো ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে সকাল থেকে কিচ্ছু খায়নি, জানো! হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে দেখেই মায়া লাগছে আবার যদি ওকে নিয়ে যায়, তাহলে আর বাঁচবে না আমি চাইছি, আজকের মধ্যেই একটা হেস্তনেস্ত করতে অন্তত থানা-পুলিশ কিংবা মহিলা কমিশনকে দিয়ে এই অত্যাচারটা আটকাতে

  থানায় তো গিয়েছিলে, অফিসার কী বলল?

  কিছুই বলল না এফ আই আর নিল, তবে দায়সারা গোছের কোনো অ্যাকশন নেবে বলে মনে হয় না রিপোর্টে কী লিখেছে, সেটাও পড়ে শোনালো না বলল, আপনি যা বলেছেন তাই লিখেছি সাইন করুন

  তুমি সাইন করলে?

  না করে উপায় কী! আমি তো অন্ধ, পড়তে পারবো না আমার সঙ্গেও কেউ যায়নি যে পড়ে দেখবে তবে একটা কাজ করেছি আমি থানায় ঢোকার আগে মোবাইল ফোনটাতে কল ব্লক করে, ভয়েস রেকর্ডার অন করে রেখেছিলাম আমি যা বলেছি, তা রেকর্ড করা আছে

  ওয়েল ডান! এটা একটা কাজের মতো কাজ করেছ নিরু তো পুলিশ কী বলল? ওরা হোমে যাবে?

  বলল, এখন বড়বাবু নেই এলে সব জানানো হবে সময় মতো পুলিশ যাবে

  উঁ হু, যাবে বলে তো মনে হয় না দেখা যাক এখন তাহলে মহিলা কমিশনের অফিসে যাচ্ছি তো?

  হ্যাঁ, আমি ওদের দপ্তরে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি চেয়ার-পার্সন কথা বলবেন বলেছেন দেখা যাক কী হয়

  তুমি আজ স্কুলে যাবে না?

  যাওয়ার তো কথা, ছুটি দেওয়া নেই হেড-মিস্ট্রেসকে ফোন করে বলেছি, যেতে একটু দেরি হবে ভাবছি, এখন ফোন করে লে দিই, ‘আজ আমার শরীরটা ভালো নেই, যেতে পারছি না

  হ্যাঁ, সেটাই করো কখন ঠিক হবে, ঠিক নেই আমার অফিসেও কোনও ফোন করা হয়নি নিউজ এডিটরকে একটা ফোন করে নিই

  অফিস টাইম শুরু হয়ে গেছে রাস্তায় প্রচুর ট্র্যাফিক তার মধ্যে দিয়ে থেমে থেমে ট্যাক্সি এগোচ্ছে অরুময় মোবাইল ফোনে নিউজ এডিটরকে ধরে ওপাশ থেকে ভেসে আসে গুরুগম্ভীর গলাকতদূরে? তোমার জন্য চীফ এডিটর ওয়েট করছেন

  অরুময়ের বুক দুরুদুরু এই চীফ এডিটর মানুষটাকে মোটেও ভালো লাগে না সবসময় চাপের মধ্যে রাখে তবুও টেনশন কন্ট্রোল করে অরুময় বলেস্যার! আমি ওই নিরুপমা-কেসটা নিয়ে আটকে রয়েছি তাই অফিসে পৌঁছতে একটু দেরি হবে

  নিরুপমা-কেস মানে! দেখো বাপু, নারীঘটিত কেস করলেকেস খেয়ে যাবেযা দিনকাল চলছে

  সেসব নয় স্যার ওই যেপ্রতিবন্ধীদের জীবন-যন্ত্রণাক্যাচলাইন দিয়ে যে কলামটা শুরু হয়েছে, ওইকলাম’- আজ যার জীবন-যন্ত্রণা ছাপা হয়েছে, সেই নিরুপমা

  হ্যাঁ-হ্যাঁ, ওটার ব্যাপারেই তো চীফ এডিটর তোমাকে...! লাইনটা ধরে থাকো তো, আমি ট্রান্সফার করছি

  মিনিট খানেকের মধ্যেই লাইনে সি - গলাবলছি

  স্যার, অরুময় বলছি, অরুময় বোস

  বোস-টোস বাদ দাও এখন সংক্ষেপ করো কোথায় তুমি?

  স্যার, আমি ডাইরেক্ট এসেছি সুখতলা রোডে, হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে এখানে একটা...

  গুড গুড! ওয়েল ডান! ওখানে পাঠানোর জন্যই তো তোমার খোঁজ করছিলাম আমার কাছে ফোন এসেছে, ওই সেন্টারে নাকি হ্যাভক ঝামেলা চলছে একটা আননোন নাম্বার থেকে ফোন এসেছিল মহিলা কণ্ঠ সব শুনে আমি একজন ফোটোগ্রাফার পাঠিয়ে দিয়েছি আর এন -কে বলেছি তোমাকে ফোনে ধরতে

  থ্যাংক ইউ স্যার! আমি নিজেই একজন ফোটোগ্রাফার চাইতাম খুব দরকার আপনি স্যার সবসময় অ্যাডভান্সড এই জন্যই স্যার আপনি সি

  থাক, অনেক হয়েছে আমাকে তেল মেরে লাভ নেই কাজের কাজটা করো

  স্যার, ফোটোগ্রাফার কাকে পাঠিয়েছেন?

  ইকবালকে

  থ্যাংক ইউ স্যার আমি ওকে কনট্যাক্ট করছি

  হ্যাঁ, ইমিডিয়েট কনট্যাক্ট করে স্পটে যাও আর আমাকে আপডেট দাও

  স্যার! আমি স্পটে গিয়েছিলাম ভেতরে ঢুকতে দেয়নি এই মুহূর্তে নিরুপমা আমার সঙ্গে ট্যাক্সিতে লোকাল পি এস- একটা এফ আই আর করানো হয়েছে তার ব্রিফ স্যার, উইদ ইন টেন মিনিটস আপনাকে পাঠাচ্ছি এখন ওখানে কোনও ঝামেলা নেই আমরা এখন যাচ্ছি মহিলা কমিশনের চেয়ার-পার্সনের সঙ্গে কথা বলতে তার আগে ইকবালকে তুলে নিচ্ছি স্যার

  কে! গুড! আমি সুখতলা পি এস- ফোন লাগাচ্ছি তার আগে তুমি এফ আই আর-এর ব্রিফটা পাঠাও প্রয়োজনে ফোর্সের হেল্প নিয়ে ভেতরে যেতে হতে পারে তুমি মহিলা কমিশন থেকে বেরিয়ে ফিডব্যাক দাও

  কে স্যার!

  আর হ্যাঁ, ব্যাপারটা সিক্রেট রেখো অন্য পেপার যেন ভাগ না বসায় তবে টিভি-মিডিয়া ঠিক গন্ধ পেয়ে যাবে ওরা তো তোমাদের পোঁদে-পোঁদে ঘোরে, তোমরা জানতেও পারো না

  ঠিক আছে স্যার, সাবধানী হব ওভার

  ফোন ছাড়তেই নিরুপমা বলে ওঠেতুমি তো দারুণ ম্যানেজ করলে ! তোমাকে...

  এখন ওসবের সময় নেই নিরু তুমি ঝটপট মোবাইলে ভয়েস-রেকর্ডারটা চালাও ওটা শুনে সি -কে ব্রিফ করতে হবে সম্ভবত তোমাদের হোম থেকে কোনো মেয়ে আমাদের অফিসে ফোন করেছিল সি বললেন, সেন্টারে নাকি হ্যাভক ঝামেলা চলছে

  হ্যাঁ, আমি বেরোনোর সময় তোমার কার্ড-টা মিনতির হাতে দিয়ে বলে এসেছিলাম, কোনো অজুহাতে কয়েক মিনিটের জন্য বাইরে বেরিয়ে, টেলিফোন বুথ থেকে তোমাদের অফিসে ফোনে সব জানাতে

  , এই জন্যই... চালাও, চালাও... শিগগির!

  নিরুপমা মোবাইল ফোনে নিজের ভয়েস রেকর্ডিং চালিয়ে দেয় তা শুনে অরুময় নোটবুকে শর্টহ্যান্ডে লিখে যেতে থাকে সেইসঙ্গে বাঁ-হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে ইকবালকে ধরেইকবাল ভাই, তুমি কোথায়?

  এখন মনিতলা বাজার  

  আমি ট্যাক্সিতে এখন বারিশ পার্ক সাইড করছি লেফট- তুমি যত তাড়াতাড়ি পারো এখানে মিট করো বাই অর্ডার সি ওভার

  ভয়েস রেকর্ডিং শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অরুময়ের লেখা থামে মোবাইল ফোনে নোট প্যাডের ছবি তুলে সি -কে হোয়াটসঅ্যাপ কর দেয়

  নিরুপমা এতক্ষণ নিজের কণ্ঠস্বরের রেকর্ডিং শুনছিল শেষ হতেই বলেজানো অরু, আরও কয়েকটা পয়েন্ট ঢোকাতে হত  

  অরুময় বলেযা বলেছ, তা যদি লেখে ব্যাটারা, তাহলেই রেইড মাস্ট ওদিকে মিডিয়ার প্রেসার তো থাকবেই

  অরু আমি ভাবছি রাবেয়ার কথা সত্যি সত্যিই রাবেয়াকে যদি কোথাও পাঠিয়ে দেয়, তাহলে বেচারী আর বাঁচবে না  

  চিন্তা করো না, ওর কিচ্ছু হবে না এমন অবস্থায় ওরা এত সাহস পাবে না তাছাড়া কোনও মিনিস্টারও এখন রিস্ক নিতে চাইবে না, যতই তার ফূর্তি করার ইচ্ছে হোক সামনে ইলেকশন আমাদেরকলাম’-টার খবর তার কাছে পৌঁছবে না, এমন তো নয়

  কিছু না হলেই ভালো

  নিরু, এর মধ্যে তুমি এক কাজ করো এই নাও কাগজ-পেন মহিলা কমিশনের চেয়ার-পার্সনকে যা যা বলবে, তার একটা সিনপসিস করে নাও যে পয়েন্টগুলো থানায় বলা হয়নি, সেগুলো আগে নোট ডাউন করো এই রোককে রোককে

  ট্যাক্সি ড্রাইভার হকচকিয়ে আচমকা ব্রেক কষে

  বাঁদিক চেপে দাঁড়াও

  ম্যাডাম বোলি থী উড স্ট্রিট যায়েঙ্গে মহিলা কমিশন কা অফিস!

  হাঁ হাঁ বাবা, যায়েঙ্গে ইধার থোড়া ঠহরিয়ে এক কাপ চায় পিজিয়ে তব তক মেরা দোস্ত যায়েগা

  ইহা ঠহরনে নেহি দেগা সাব সার্জেন্ট লোক তাং করেগা

  কুছ নেহি করেগা বাবা ম্যাঁয় হুঁ না! ইয়ে পার্ক কা বাজুবালা গলি মে ঘুঁসাও বাঁয়া রাখো

  এমন সময় অরুময়ের ফোন বেজে ওঠে স্ক্রিন- ইকবাল ফোনের রিসিভ বাটন টিপতেইঅরুদা', তুমি কোথায়  

  আমি বারিশ পার্কের উল্টোদিকের গলির সামনে ট্যাক্সি নাম্বার ১০৮২

  ঠিক আছে আমি কাছেই আছি এক মিনিটেই আসছি

  এসো ভাই ইহাঁ থোড়া রুখিয়ে গলি মে ঘুঁসনা নেহি হোগা দোস্ত আ গয়া

  মিনিট দুয়েকের মধ্যে ইকবাল ট্যাক্সির কাছে পৌঁছয় অরুময় আওয়াজ দেয়ইকবাল ভাই, সামনের সিটে বসে পড়ো চলিয়ে ভাইসাব

 

 সাত

 

বিদিশা গোগ্রাসে পড়ে ফেলেছে খবর-কাগজের ছয়ের পাতাখানা ওর মনে পাক খাচ্ছে হেডলাইনটা

              প্রতিবন্ধীদের জীবন-যন্ত্রণা

               আজ নিরুপমা দাশগুপ্ত

ভাবতে থাকে সত্যিই কি নিরুপমার জীবনে এরকম ঘটেছে? নাকি এসব গল্পকথা? লেখাটা পড়ার পর ওর মনের মধ্যে কেমন এক কষ্ট ঘুরে বেড়াতে থাকে তাহলে এই পাতাটা পড়ে ওই আবেগপ্রবণ মানুষটার মনের যে কী অবস্থা হয়েছিল, তা ভাবতেই ওর মনে অদ্ভুত এক যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে চোখে-মুখেও সে যন্ত্রণার আভাস ফুটে ওঠে  

চম্পা কলঘর থেকে বেড়িয়ে চলে যাওয়ার উদ্যোগ নিতে গিয়ে বিদিশার দিকে তাকায় বিদিশাকে দেখে বলে ওঠেকী গো বউদি, আজ তোমার কী হয়েছে? কোনও খারাপ খবর কিছু?  

 বিদিশা আলতো করে ঘাড় ঘুরিয়ে চম্পার দিকে তাকায় কী বলবে ভেবে পায় না এমন সময় ফোনটা বেজে ওঠে উঠে গিয়ে ফোন ধরে হ্যালো!

হ্যাঁ, আমি দাদা বলছি কোথায় ছিলিস তোরা সব? এত বেলা অবধি ঘুমোস নাকি! তখন ফোন করলাম, বেজেই গেল, কেউ ধরলি না!

  না দাদা, ঘুমোইনি আসলে, তখন এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে মানে .... এদিকে আমি ... মেয়েটা ... মানে, যখন ধরতে গেলাম তখন কেটে গেল

  কী মানে-মানে করছিস! কী হয়েছে বল তো! কিছু যেন লুকোচ্ছিস!

  না না তেমন কিছু নয়, মানে ...!

  বুঝেছি, আবার তোদের মন কষাকষি শুরু হয়েছে

  না দাদা, সেসব কিছু নয়, অন্য ব্যাপার আমিই তোমাকে ফোন করতাম বলছি যে, আজ ওবেলায় একটু আসতে পারবে? তোমার সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে

  আজ বিকেলে! কিন্তু আমার যে বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটিতে একটা সেমিনারে অ্যাটেন্ড করার কথা   খুবই জরুরি বিষয় কি? কাল সকাল অবধি ওয়েট করা যাবে না?

  হ্যাঁ, তা যাবে তাহলে এক কাজ করো; আজ না আসতে পারলে কাল সকালেই এসো সম্ভব হলে বউদিকেও নিয়ে এসো এলে সব বলব খুব সমস্যায় পড়েছি গো দাদা

  ঠিক আছে, কাল সকালে দুজনেই যাব তুই বেশি চিন্তা করিস না

   ঠিক আছে, চিন্তা করব না এখন তুমি বল দাদা, কেন ফোন করছিলে, কী বলতে চাইছিলে?

  থাক, এখন আর বলব না কাল সকালে তো যাচ্ছি, তখন বলব  

  বিদিশা ফোনে কথা বলে চলেছে, আর চম্পা এদিকে বিরক্ত হচ্ছে ফোন নামাতে না নামাতে চম্পা বলে ওঠে বউদি! আমি আর বসব না ছেলেমেয়েকে একা রেখে এসেছি ওরা আবার ভাইবুনে মারপিট করে খুব!

   বিদিশা বলে, দাঁড়া, টিফিনটা খেয়ে যা সকাল থেকে তো কিছু খাসনি বোধহয়! পিত্তি পড়বে

  চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বিদিশা রান্নাঘরে ঢোকে ভেবেছিল দাদার ফোনটা ছেড়ে অনির মোবাইলে একটা ফোন করে খোঁজ নেবে তা আর হল না থাক, ওকে খাবারটা দিয়েই না হয় ধীরে সুস্থে ফোন করবে

  মিনিট পাঁচেকের মধ্যে চা-পাউরুটি এনে চম্পাকে দেয় বিদিশা সেঁকা পাউরুটি আর চায়ের গন্ধটা বেশ ভাল লাগছে বিদিশার অথচ পাউরুটি তেমন পছন্দ করে না অনুভব করে, ওরও খুব খিদে পেয়েছে অন্যান্য দিন এতক্ষণে টিফিন করা হয়ে যায় আজ খাওয়া হয়নি

  সকালের চা-টাও ঠিকঠাক খাওয়া হল না চম্পার আর দোষ কী! ওকে টিফিন দিতেও বেশ দেরি হল আজ! সেই সকাল থেকে বেচারি খেটে মরে এই চা-পাউরুটিই যা পেটে পড়ে এতক্ষণ অবধি না খেয়ে এত কাজ করে কী করে কে জানে! অন্য কোনও বাড়িতে তো টিফিন দেয় না এই দুপিস রুটি আর চায়ের পর নাকি সেই দুপুরে ভাত খায়!

  চম্পার প্রতি বিদিশার মন নরম হয় হ্যাঁ রে! আর দুপিস রুটি দেব তোকে?

  না বউদি একদিন বেশি খেলে অব্যেস খারাপ হয়ে যাবে রোজ তো আর চার পিস দেবে না

  কথাটা জ্বালা ধরায় বিদিশার মনে এক ভেবে বলল, আর ...! এত ধারালো ওর জিভটা কিছু বলতে গেলে হয় তো আরও পাঁচকথা শুনিয়ে দেবে তাই চুপ করে যায়

  বিদিশার চোখমুখ দেখে চম্পা বুঝতে পারে, দুম করে তার কথাটা বলা উচিত হয়নি এমনিতেই বউদিমনির আজ মন ভাল নেই তার ওপর সকাল থেকে খায়নি - তো মানুষ! এসব ভেবেচিন্তে পরিস্থিতি হালকা করার জন্য চম্পা বলে ওঠে বউদি! সকাল থেকে তুমিও তো কিছু খাওনি টিফিন করে নাও

  বিদিশা চুপ থাকে চম্পার খারাপ লাগে সমবেদনা জানানোর জন্য এবার বলে ওঠে কাল সারারাত ঘুমোওনি নাকি বউদি? চোখদুটো বসা বসা লাগছে!

  বিদিশার মনে পড়ে যায়, অনি কাল সারারাত ঘুমোয়নি সকালে ঘুম ভাঙলে দেখে, অনি টেবিলে কনুই রেখে মাথা গুঁজে দিয়েছে দুহাতের মধ্যে সামনে বই খোলা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে ওরও কি চোখ বসা বসা ছিল! খেয়াল করা হয়নি বলে ওঠে হ্যাঁরে চম্পা! সারারাত না ঘুমোলে শরীরের কি তেমন কিছু অসুবিধা হয়?

  চম্পা ঈষৎ উচ্ছল হ্যাঁ, হয় তো! চোখ বসে যায়, চোখের নিচে কালি পড়ে বসলেই ঘুম পায়

  আরে না! তা বলিনি বলছি, অন্য কোনও অসুবিধা মানে হঠাৎ রেগে ওঠা বা সেরকম কিছু?

  হ্যাঁ বউদি, তা হতেই পারে রাতে ঘুম না হলে পেটগরম হয় পেটগরম হলে মাথায় গ্যাস উঠে যায় মেজাজ খিটখিটে হয়

  সে হয়, কিন্তু ভুলভাল বকতে পারে? মানে এমন কথা, যার কোনও মাথামুণ্ডু নেই!

  নাঃ, ভুলভাল তো বকবে না! মাথার গন্ডগোল কিংবা মাতাল হয়ে গেলে ভুল বকে মানুষ যেমন আমার মানুষটা যেদিন বাংলা খেয়ে বাড়ি ঢোকে সেদিন তো ....

  এখন তোর মানুষটার কথা ছাড় বলছি, তোর দাদাবাবু

তো আর মদ খায় না!

  তুমি দাদাবাবুর কথা বলছ! আমি ভাবলাম বুঝি ...!

  শুনলি না, সকালে কেমন আবোল তাবোল ...! তখনও তুই আসিসনি শুনবি কী করে! জানিস! সকালে মাথা নেই মুণ্ডু নেই, এমন কী সব বলল, তারপর খুব রেগে উঠল

  আমার কী মনে হয় জান বউদি! দাদার বোধায় মন্দ বাতাস-টাতাস লেগেছে নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ায় এই তো দিন আগে জঙ্গলমহল না কোথায় যেন গেল! ওখানে তো শুনছি মারামারি কাটাকাটি চলছে, কত অপমিত্যু হচ্ছে তাছাড়া দাদা রাত দুকুর অবধি ব্যালকনিতে পায়চারি করে, বল তুমি এই ফেলাট বাড়ির ওপাশেই তো কবরস্থান তুমি এক কাজ কর; আমাদের পাড়ায় মা-মনসার থান আছে ওখানে শনি-মঙ্গলবারে ভর হয় ওই দিন জলপড়া আর মাদুলি দেয় ওতেই মন্দ বাতাস লাগা সেরে যায়

  সত্যি সারে? নাকি সব বুজরুকি?

  না গো বউদি, ওখানকার মা-মনসা খুবই জাগরোতো

আমার ভাসুরপোর শালারই তো ওইরকম ...!

  সেসব কথা থাক; কিন্তু তোর দাদাবাবু যে ওসব বিশ্বাস করে না মাদুলি-ফাদুলি পরবেই না!

  বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পরাতে হবে মন্দবাতাস লাগলে মানুষ একটু মাথাঠারো হয় তাই বলে বোয়ের কতা শুনবে না, তা হয় নাকি!

  তা হ্যাঁরে চম্পা! ওই মনসাতলাটলা তো আমি চিনি না তাছাড়া আমি গেছি শুনলে তোর দাদাবাবু খুব রাগ করবে বলছিলাম, তুই ওই জলপড়া আর মাদুলি...?

  হ্যাঁ হ্যাঁ, আমিই এনে দোব কালই তো শনিবার, সন্ধেবেলায় ভর হবে তোমাদের নামগোত্তরটা একটা কাগজে লিখে দিও আর একটু দুদ-কলা, আর পাঁচ ষোলআনা দক্ষিণা ব্যস!

  বিদিশা একটু ভেবে নিয়ে বলে কলা তো রয়েছে, কাল অবধি থেকে যাবে কিন্তু দুধ বলতে তো ওই প্যাকেট-দুধ, মাদার ডেয়ারি!

  ওই দুদেই হবে গরুর দুদ এখন পাওয়া যায় নাকি! মা মনসা এখন মাদার ডেয়ারি-মেয়ারি সব খায়

  আর ওই পাঁচ ষোল আনা না কী বলছিস; ওটা কোথায় পাওয়া যাবে?

  চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিচ্ছিল চম্পা হঠাৎ হাসতে গিয়ে বিষম খায় কোনক্রমে সামলে নিয়ে বলে পাঁচ ষোল আনা মানে পাঁচটাকা গো! ষোলআনায় একটাকা হয়, তাও জান না! কেমনবিদ্বেনতুমি!

  বিদিশা একটু অপ্রস্তুত হলেও সামলে নেয় আমাদের লোরেটোতে ওসব আনা-ফানা শেখায়নি পাঁচটাকা বললেই তো হয়, ওইসব সেকেলে মার্কা ...!

  চম্পা দুকানে আঙুল ঠেকিয়ে জিভ কাটে না গো বউদি! ঠাকুর দেবতার দক্ষিণার ব্যাপারে টাকা-ফাকা চলে না, সব আনার কারবার অনেক পুরনো ঠাকুর কিনা! টাকার হিসেব বোঝে না। শোন! কাল সকালে এক প্যাকেট দুদ বেশি নেবে আর কলা তো আছে বললে আমি কাল কাজ সেরে যাওয়ার সময় নিয়ে যাব সন্ধেবেলায় জলপড়া আর মাদুলি নিয়ে, দিয়ে যাব এট্টু  লাল কার আনিয়ে রেখো

  আমি আর কোথায় আনতে যাব তুই- বরং পয়সা নিয়ে যাস! কিনে আনবি

  ঠিক আছে, সে যা হয় হবে তুমি কিছু চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে আমি এখন চললাম বউদি আর বসব না, ছেলেমেয়েটা এতক্ষণে কী করছে কে জানে! তুমি একটু টিফিন করে নাও! না খেয়ে থাকলে পিত্তি পড়বে, শরীল খারাপ হবে

  চম্পা বেরিয়ে যেতেই দরজা বন্ধ করে বিদিশা চলে আসে সোজা টেলিফোনের কাছে অনিকেতের মোবাইল নম্বর ডায়াল করতে থাকে মানুষটা ঠিকঠাক পৌঁছল কিনা!

  খুব জরুরি প্রয়োজন না হলে, ওর মোবাইলে কেউ ফোন করুক, এটা অনিকেতের পছন্দ নয় ক্লাসে থাকলে তো সুইচ অফ থাকে অন্য সময় খোলা থাকলেও, অচেনা অর্থাৎ নিউ নাম্বার রিসিভ করেন না বিদিশা ফোন করলে প্রথমবার ধরেন না, লাইন কেটে দেন দ্বিতীয়বার করলে বোঝেন, নিশ্চয় কোনও জরুরী দরকার; তখন রিসিভ করেন

  বিদিশা অনেকক্ষণের চেষ্টায় লাইন পেয়েছে প্রায় আধঘন্টা ধরে সুইচড অফ বলে যাচ্ছিল যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর তারপর যদিও বা রিং হল, দুবার বেজেই ডিসকানেক্ট হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে আবার রি-ডায়াল করতে অনিকেতের গলা শুনতে পেল বল, কী ব্যাপার?

  বলছি, তোমার শরীরটা এখন ঠিক আছে তো?

  আমার শরীর ...এখন ... আমার শরীর খারাপ কখন ছিল?

  না মানে সকালে ...!

  লিসন দিশা, য়্যাম কোয়ায়েট ওকে কেন কাজের সময় ফোন করে ডিসটার্ব করছ ফরনাথিং! এখন আমি ছেলেদের সঙ্গে ইমপর্ট্যান্ট ডিসকাশন- ব্যস্ত তোমার ফোনে খুব কথা বলার ইচ্ছা হলে অন্য কাউকে ফোন কর

  বিদিশা ভয়েময়ে লাইন ডিসকানেক্ট করে দেয় রিসিভার হাতে নিয়ে ভাবে এখন তো কথাবার্তায় কোনও অস্বাভাবিকতা নেই! অথচ সকালে ...! ব্যাপারটাকে ইগনোর করাও যাচ্ছে না এর আগে কখনও এমনটা করেনি বাইরের যে কেউ শুনলে বা দেখলে ভাবত নির্ঘাত মাথার গন্ডগোল আচ্ছা! দিনরাত এত পড়াশুনা করে বলেই এমন হচ্ছে না তো! ছোটমামা বলে, ‘খুব বেশি পড়াশুনা-করা মানুষেরা অল্পবিস্তর পাগল হয়

এসব ভাবতে ভাবতে বিদিশার মনে পড়ে গোবুদা কথা ওদের বাড়ির পাশের বাড়িতে থাকত গোবুদা যখন ক্লাস সেভেনে পড়ে, তখন গোবুদাকে প্রথম দেখেছিল ছাদ থেকে তার দুপায়ে দুটো মোটা লোহার বালা পরানো সেদুটো আর একটা বালা দিয়ে জোড়া বেশি লম্বা পা ফেলতে পারছিল না গোবুদা সদর দরজা খোলা পেয়ে সবার অলক্ষ্যে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসেছিল ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলেই দৌড়বার চেষ্টা করছিল আর চিৎকার করছিল, ‘ইউরেকা ইউরেকা .... ভিনি ভিডি ভিসি .... আই গো আই সি আই কংকার য়্যাম আর্কিমিদিস ... নো নো আয়্যাম আলেকজান্দার ... 

  গোবুদাসেদিন চিৎকার করে আরও কতকিছু বলছিল ইংরাজিতে পায়ে বেড়ি পরানো থাকায় বেশি দূর যেতে পারেনি ওর দাদা ছবু আর ভাই সাবু দুজনে মিলে ধরে, পাঁজাকোলা করে বাড়িতে নিয়ে এসে আটকে দিয়েছিল ওর ঘরে  

  অনেকদিন আগে মা-দাদার মুখে শুনেছিল গোবুদা কথা; সেদিনই প্রথম দেখল মা বলত, গোবুদা' নাকি ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল একসঙ্গে জয়েন্ট এন্ট্রান্স আই আই টি তে চান্স পেয়েছিল খড়গপুর এঞ্জিনীয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিল কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বদ্ধ উন্মাদ হয়ে বাড়ি ফিরেছিল ওদের বাড়ির লোক বলেছিল, র‍্যাগিং-য়ে নাকি এমন হয়েছে তারপর কত চিকিৎসা করানো হয়েছিল পাগলা গারদেও ছিল বহুদিন সুস্থ হয়ে ফিরে এসে কিছুদিন পরেই আবার আগের মতোই দাদা বলত, ‘প্রচুর পড়েই মাথাটা গ্যাছে গোবুরওই গোবুদা মতো ওর মাথাটাও ....

  ধক করে ওঠে বিদিশার বুক এসব কী ভাবছে আবোল তাবোল সামান্য কয়েকটা দুর্বোধ্য কথা বলেছে আর বাথরুমে বেশিক্ষণ ধরে স্নান করেছে লে এমন ভাবার কোনও কারণ নেই হয়তো ঘুমের ঘোর ছিল তখনও কিংবা ...! চম্পার কথাটাও ফেলে দেওয়ার নয় সত্যিই তো এই ফ্ল্যাটগুলোর ওপাশে কবরস্থান ওসব যদি কিছু না- থাকবে, তাহলে এত মানুষ বিশ্বাস করে কেন? তারা কি সবাই বোকা, অশিক্ষিত! চোখে দেখা যায় না বলেই অবিশ্বাস করতে হবে! হাওয়া তো চোখে দেখা যায় না, তা কি নেই? হাওয়া-বাতাস যেমন আছে; মন্দ বাতাসও আছে

   চম্পা উপায়টা মন্দ বলেনি কাল শনিবার, ওদের পাড়ার মনসার থান থেকে জলপড়া আর মাদুলিটা আনাতেই হবে এমন কিছু খরচও নেই, দশ-কুড়ি টাকার ব্যাপার অনি হয় তো মাদুলি বাঁধতে রাজি হবে না; কিন্তু যে ভাবেই হোক রাজি করাতে হবে হাতে না বাঁধে, কোমরে বাঁধবে আর জলপড়াটা নিজে হাতেই ওর গায়ে মাথায় ছিঁটিয়ে দেবে না হয়! আজ প্রায় সকাল থেকেই আজেবাজে ভাবনায় ছেয়ে রয়েছে বিদিশার মন সমস্ত ব্যাপারটা কাউকে খুলে বলতে পারলে মন একটু হালকা হতো কাকেই বা বলবে! বাড়িতে মানুষ বলতে তো আড়াইজন কাজের মেয়ের সঙ্গে আর কী কথা বলা যায়! তবুও চম্পাকে বলতেই হল ওর বুদ্ধিমতো পরামর্শও দিল

  দাদা-বউদি যদি আজ আসত, ভাল হত খুব স্কুলে যাওয়ার সময় মেয়েটারও মুখভার হয়েছিল ওকে যতই বলা হোক না কেন, কিছু হয়নি; ওরও তো একটা বোধবুদ্ধি আছে বেরোনোর আগে অনি রোজ আদর করে মেয়েকে আজ করেনি এই অস্বাভাবিকতা যে মেয়ে ধরতে পেরেছে, তা ওর মুখ চোখ দেখে বোঝা গেছে তা না হলে, বাপি কলেজে ঠিকঠাক পৌঁছল কিনা, তার খোঁজ নিতে বলল কেন মেয়েটা!

  মেয়েটার কথা মনে পড়তেই মনে চলে আসে কাগজে পড়া নিরুপমার কিশোরীবেলার কথা তার মায়ের অবহেলার কথা ভাবে, মা কখনও এমন হতে পারে! কি কখনও পারবে অজির সঙ্গে এমন ব্যবহার করতে! অজিরও তো মেয়েবেলা আসার সময় হয়ে এল খুব শিগগির হয়তো ঋতুমতী হবে তখন কি পারবে চম্পাকে দিয়ে ওকে ওইসব শেখাতে! নিজেই কত আদরে কত যত্নে মেয়েকে শেখাবে নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করার মূলমন্ত্র আচ্ছা! ওর মেয়েও তো একসময় যৌবনবতী হবে তখন ওকেও তো অতন্দ্র পাহারায় রাখতে হবে সমাজটা বড় বেশি পশুসঙ্কুল হয়তো ভুল ভাবা হল সমাজ পশুসঙ্কুল নয়, মানুষের মনের মধ্যেই অমানবিক অপগুণগুলো মানুষকে মনুষ্যেতর করে তোলে মানুষের মধ্যে এত বেশি লোভ-লালসা, যৌনতাড়না যে কেন হয়! পশুদের তো হয় না! তবুও তো পশুরা শিক্ষা-দীক্ষা পায় না মানুষ শিক্ষিত হয়েও...! তবে কি শিক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এমন অমানবিক আচরণ করার বীজ! তা কেন হবে? সমস্ত মানুষ তো এমন হয় না শিক্ষা তো মানুষকে জ্ঞানী করে, চেতনা-সমৃদ্ধ করে, উন্নত করে অথচ মানুষ ক্রমশ নৈতিকভাবে অবনত হচ্ছে তবে কি শিক্ষার মধ্যেই গলদ? যে শিক্ষা মানুষের মানবিক গুণগুলোকে বিকশিত করতে পারে, সে শিক্ষা কি মানুষ পাচ্ছে না! অনি ঠিকই বলে, সবকিছু ঢেলে সাজাতে হবে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে মানুষের সমাজ সমাজ পচে গেছে, নষ্ট হয়ে গেছে ওর কথাগুলো পাগল-পাগল লাগে ঠিকই, কিন্তু ঠিক কথাই বলে ওর গবেষণার বিষয়টাই তো ‌‘মানবিক মূল্যবোধের অবনমন তার উৎস সন্ধানঅনি নিশ্চয় লেখাটা পড়ে দারুণভাবেই মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে তাই সকালবেলায় এমন করছিল বিষয়টা ওর মাথায় তোলপাড় করবে নিশ্চয়! ওর আবার ফিল্ড-ওয়ার্ক করার বাতিক আছে হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার- সেই নিরুপমা দাশগুপ্তর সঙ্গে দেখা করতে না চলে যায়! আবেগপ্রবণ মানুষ, কী বলতে কী বলে ফেলে তার ঠিক নেই তখন হবে আর এক সমস্যা আর পারা যায় না কী ভাবে যে সামাল দেবে মানুষটাকে! এসব কথা ভাবতে ভাবতে বিদিশার মন খুব ভারী হয়ে ওঠে

 

আট

 

নাহ! চা খাওয়া আর হল না ইকবাল গাড়িতে বসতেই বারিশ পার্কের সামনে থেকে ট্যাক্সিটা আবার চলতে শুরু করেছে গন্তব্য উড স্ট্রিট, মহিলা কমিশনের অফিস ওখানে এগারোটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে কমিশনের চেয়ার-পার্সন মিসেস বাগচী বলেছেন, কথা বলবেন নিরুপমা মনে মনে সাজিয়ে নেয় আলোচনা বা অভিযোগের বিষয়গুলো পরে অরুময়ের দেওয়া নোটপ্যাডে পয়েন্টগুলো লিখে নেয় অরুময় অবাক হয়ে দেখতে থাকে, একজন অন্ধ মানুষ অবলীলায় কাগজের উপর কলম দিয়ে লিখে যাচ্ছে কীভাবে!    

  এর মধ্যে অরুময়ের মোবাইলে ফোন আসে অপালার ফোন মামুলি কথাঅফিসে পৌঁছেছ কি না, আজ কী অ্যাসাইনমেন্ট, যাওয়ায় সময়হ্যান্ডিক্যাপড সেন্টারহয়ে গেছ কি না, ইত্যাদির সংক্ষেপে উত্তর দেন অরুময়

  ফোন ডিসকানেক্ট করতেই নিরুপমা বলে! অরু, তুমি সেদিন বলেছিলে, তোমার স্ত্রী নাকি গাছেদের সঙ্গে প্রেম করে! ব্যাপারটা বেশ মজার মনে হয়েছে যদি অসুবিধা না থাকে, আমাকে একটু বলবে ব্যাপারটা কী!

  অরুময় চাপা গলায় বলেনিরু, আস্তে! সামনে ইকবাল রয়েছে সব শুনছে

  নিরু হেসে বলেশুনলেই বা! আমরা তো প্রেমালাপ করছি না, আলোচনা করছি বলো, অবশ্য যদি তোমার অসুবিধা হয়, তাহলে থাক

  নাহ! অসুবিধা আর কী! বলাই যায়, তাছাড়া হাতে যখন একটু সময়ও আছে আমরা বোধহয় চৌরঙ্গী মোড় ক্রস করলাম  

  ট্যাক্সি ড্রাইভার বলে ওঠে হি তো গিরান্ড হোটেল   

  নিরুপমা বলেহ্যাঁ, এখনও পৌঁছতে কিছুটা সময় লাগবে তুমি বলো

  আমার স্ত্রী অপালা, অপালা বসু রায় একটা কলেজে পড়ায় ওর সাবজেক্ট হলো ফিলোজফি তার সঙ্গে সাইকোলজিতেও এম. করেছে

  বাহ! উচ্চশিক্ষিতা বউ পেয়েছ বলো!

  হ্যাঁ, তা যা বলেছ উচ্চশিক্ষিতা হওয়ার ফলে ওর ভাবনা-চিন্তা এত উঁচু দিয়ে বেরিয়ে যায় যে, আমার সাধারণ মাথা তার নাগাল পায় না ফলে দ্বন্দ্ব, দ্বন্দ্ব থেকে কথা বন্ধ, তা থেকে ...

  আরে বাহ! তবে যে বলেছিলে, তোমার সঙ্গে বউয়ের প্রেম হয়নি! এটাই তো প্রেমের লক্ষণ

  বাইরে থেকে ওরম মনে হয় কাছে থাকলে বুঝতে

  নিরুপমা নীচের ঠোঁটে কামড় দিয়ে বলেহয় তো অন্যরকম বুঝতাম অরু, ব্যাপারটা আবার এমন নয় তোগড়পরতা পুরুষেরা অন্য নারীর কাছে নিজের বউয়ের নিন্দে করে সেই নারীর মন পাওয়ার জন্য

  অরুময় কথা থামিয়ে পূর্ণ দৃষ্টিতে নিরুপমার দিকে তাকায় ওর মনের ভাব বোঝার চেষ্টা করে

  নিরুপমা অন্ধ হলেও কীভাবে যেন তা বুঝতে পারে বলেআমাকে ওভাবে দেখার কিছু নেই আমি একজন অন্ধ নারী লোকে মন রাখার জন্য বলে সুন্দরী আর এটা বলতে পারি, তুমি আমার মন পেয়েই গেছো, আর কষ্ট করে পাওয়ার দরকার নেই

  অরুময় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়েকোথায় আর পেলাম! এখনও এত অবিশ্বাস!

  নিরুপমা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠেএই তো তুমি বুঝিয়ে দিলে যে, এই অন্ধ মেয়েটারও মন পেতে কিংবা প্রেম পেতে তুমি আগ্রহী তবে আমি আগ্রহী কি না সে কথা জানতে চেও না সেটা গোপনই থাক

  কেন গোপন থাকবে?

  অরু, এমন অনেক বিষয় আছে, যা প্রকাশ্যে এলে তার মাধুর্য্য নষ্ট হয়ে যায় তাই গোপন থাকাই ভালো কই! তুমি বললে না তো তোমার উচ্চশিক্ষিতা বউ গাছের সঙ্গে কেমন প্রেম করে!

  সে আর এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা নয় ফুলগাছ লাগাতে ভালোবাসে, তাই ব্যালকনিতে যেটুকু জায়গা পেয়েছে, সেখানে টবে ফুলের বাগান করেছে গোলাপ-জুঁই, বেল-রজনী-টগর, অ্যালোভেরা-তুলসী

  তাই ওদের সঙ্গেই তোমার অপালার বেশি সময় কাটে তাই তো?

  হ্যাঁ, ওদের সঙ্গে সময় কাটায় সেটা ব্যাপার নয়, ব্যাপারটা হল, ওদের সঙ্গে বকবক করে ওদের দুঃখের কথা শোনে, নিদান দেয় ওদের প্রেমের কথা শুনে মজা পায়

  ওদের প্রেমের কথা?  

  হ্যাঁ, যেমন ধরো, দেখতে পায় গোলাপগাছটা অ্যালোভেরাকে টীজ করছে অ্যালোভেরার রসালো ঠোঁটে দুষ্টু গোলাপ দাঁত বসিয়ে দিচ্ছে কিংবা বেলফুলের লতানে ডাল চাইনিজ গন্ধরাজের গায়ে পড়েছে দেখে বলে, ‘বেলির নেকুপনা দেখে বাঁচি না! কী এতো দরকার ওই চাইনিজটার সঙ্গে ঢলাঢলি করার!’

  বাহ! দারুণ ব্যাপার তো! তোমার বউ তোমার সঙ্গে প্রেম করুক না করুক, সে যথেষ্ট রোমান্টিক! গাছেদের প্রেম সে বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে বলো জানো, আমি যে কলেজে পড়তাম, সেই কলেজের একজন অধ্যাপক ছিলেন তাঁর নামটাও অদ্ভুত, তাই এখনও মনে আছে নাম ঋক্ষ বাগল আমরা আড়ালে বলতাম, বৃক্ষপাগল

  কেন?

  তাঁরও ওইরকম গাছেদের প্রেম দেখার বাতিক ছিল অন্যান্য স্যারদেরকে ডেকে ডেকে গাছেদের প্রেম করা দেখাতেন দেখতাম, তাঁরাও ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করতেন

  হ্যাঁ, আমিও অপালার এই ব্যাপারটা উপভোগ করি তাছাড়া এসব পাগলপনা অ্যালাও করি কেন জানো?

  কেন?

  ওর তো কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি গাছগুলো নিয়ে ওর একটু সময় কাটে

  শুধু সময় কাটে এমনটা নয়, গাছগুলো নিয়ে ভুলেও থাকতে চায় তা ওকে একটা সন্তান দিলেই তো পারো অসুবিধা কী!

  অরুময় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েএসব কথা থাক নিরু, অন্য কথা বলো তুমি তোমার ওই বৃক্ষপাগল স্যারের কথা বলো, শুনি তিনি কি আমার বউয়ের মতো এরকম ...

  হ্যাঁ, অনেকটা এরকম তবে উনি বড় বড় গাছের প্রেমের কথা বলতেন যেমন ধরো, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া এইসব একবার তো আমার হিস্ট্রির স্যার বাড়ি ফেরার পথে ওঁর খপ্পরে পড়েছিলেন পরের দিন ক্লাসে এসে সে গল্প বেশ মজা করে বলেছিলেন, আমার এখনও মনে আছে

  সে গল্পটা বলোনা, শুনি

  একদিন স্যার কলেজ শেষে বাড়ি ফিরছেন কলেজের গেট পেরিয়ে নন্দনকুঞ্জের বুকচেরা লাল মোরাম রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন হঠাৎ দেখেন, সামনেই অধ্যাপক ঋক্ষ বাগল, গাছের মগডালের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে স্যারের একটু তাড়া ছিল তখন ওই বাগল-স্যারের খপ্পরে পড়লে দেরি হয়ে যাবে তাই পা টিপেটিপে পাশ কাটানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু কাছাকাছি হতেই বাগল-স্যার চোখ নামিয়ে ঘাড় ঘোরান স্যারের সঙ্গে চোখাচোখি পথ আগলে অনাবিল হেসে বলেন, ‘আজ ওদের বিয়েটা দিয়েই ফেললাম

  স্যারের জানার ইচ্ছা না থাকলেও মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে, ‘কাদের বিয়ে?’

  ওই যে পলাশ আর সোনাঝুরির বেশ কিছুদিন ধরে ওরা প্রেম করছিল ওই দেখুন না, বিয়েটা সারা হতে না হতেই দুজনে কেমন নির্লজ্জ হয়ে উঠেছে

  স্যার হেসে বলেছিলেনভালো করেছেন এখন ওদেরকে একা থাকতে দিন ওরা চুমু খাচ্ছে খাক না, চুমু খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো তাছাড়া এখন তো আর ওরা অবৈধ চুমু খাচ্ছে না! আপনি তো আজ ওদের বিয়েটা দিয়েই ফেলেছেন

  তা শুনে বাগল স্যার হো-হো করে হেসে ওঠেন হিস্ট্রি-স্যারের কাঁধ খামচে বলেন, ‘বুঝলেন, রোজই এই নন্দনকুঞ্জ দিয়ে যাওয়া আসার পথে শুনি ওরা ফিসফিসিয়ে প্রেমালাপ করছে ওই সোনাঝুরিটা তো সদ্যযৌবনা, কী চোখটানা রূপ ওর! আর এই পলাশটা ওর চেয়ে বয়সে বড় হলেও, এমন কিছু ডেঁপো হয়ে ওঠেনি গত ফাগুনেই একটু রং ছড়িয়ে কেতা দেখিয়েছে তবে সুগন্ধ নেই বলে ওর সঙ্গে কেউ প্রেম করতে এগিয়ে আসেনি থাকার মধ্যে তো একটু দূরে ওই মহুয়া আর পুবদিকে ওই স্বর্ণচাঁপাটা মন মাতাল করা মহুয়া তো পলাশের দিকে ফিরেও তাকায় না ওর মন পড়ে রয়েছে ওপাশের অর্জুনটার পানে কিন্তু অর্জুনের আবার খুব অহংকার! ওর ছাল দিয়ে মানুষের হৃদয়ের রোগ সারে কি না! আর অহংকারী পুরুষকে পদানত করেই যেন সুন্দরীর গর্ব তাই মহুয়া গাবদা-গোবদা ছাতিমের ঘরনি হওয়া সত্ত্বেও অর্জুনে মজেছে নেহাতই পরকীয়া কী আর বলবো!

  হিস্ট্রি স্যার বলেছিলেন, ‘কেন, আপনি পরকীয়া প্রেম পছন্দ করেন না বুঝি?’

  না, ব্যাপারটা তা নয় তবে উল্টোপাল্টা পরাগ-মিলন ভালো নয় এতে বৃক্ষসমাজের ক্ষতি হয় বুঝতে হয় কার সঙ্গে কার বন্ধুত্ব হবে, কার সঙ্গে কার ঝগড়াঝাঁটির আশঙ্কা আছে, ইত্যাদি

  তখন হিস্ট্রি-স্যার সুযোগ বুঝে বলেছিলেন, ‘বাড়ি ফিরতে আর দেরি করলে স্ত্রীর সঙ্গে আমার ঝগড়াঝাঁটির আশঙ্কা আছে সুতরাং আমি এখন যাই কথা বলেই হিস্ট্রি-স্যার আর না দাঁড়িয়ে চম্পট দিয়েছিলেন কিন্তু দূর থেকে দেখেছিলেন, বাগল-স্যার আবার গাছের মগডালের দিকে তাকিয়ে হাততালি দিচ্ছেন

  অরুময় হালকা হেসে বলেবেশ ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার তো তোমার কী মনে হয়েছিল, তোমাদের ওই বাগল-স্যার কিছুটা পাগল ছিলেন?

  না, পাগল ঠিক বলা যায় না তবে কিছুটা একসেন্ট্রিক তো মনেই হতো

  ঠিক, অপালাকে দেখে আমারও তাই মনে হয় এটা ঠিক মেন্টাল ডিপ্রেশন নয় এটা হলো একটা সাবকনশাস মাইন্ডে ঘুরে বেড়ানো ভাবনার বাহ্যিক প্রকাশ যেটা ঠিক পাগলামি নয়, আবার স্বাভাবিকও নয় আমি তাই ওকে একটা সাইকায়াট্রিস্টের কাছে দেখাবো বলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি শনিবারে নিয়ে যাবো

  তো নিজেকে সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে! কি যেতে রাজি হয়েছে?

  কোনোভাবে রাজি করানো গেছে সে সাইকায়াট্রিস্ট হলো আমার বন্ধু তার ফ্ল্যাটে ইনভাইট আছে লে রাজি করিয়েছি যাক গে, এসব ছাড়ো আমি তোমাকে দেখে অবাক হচ্ছি! তোমার এখনশিরে সংক্রান্তিঅবস্থা, সেসব থেকে বেরিয়ে এসে স্বছন্দে আমার সঙ্গে গল্প করছ  

  হ্যাঁ, ‘শিরে সংক্রান্তিঅবস্থা বলেই তো এসব গল্প করে মনটাকে রিফ্রেস করতে চাইছি মাথা ক্লিয়ার না থাকলে পরবর্তী পর্যায়ে লড়াইটা চালাবো কীভাবে! প্র্যাকটিক্যালি মহিলা কমিশনের চেয়ার পার্সনের সঙ্গে কথা বলার আগে ব্যাপারে তো আমাদের কিছু করার নেই স্বপ্না, রাবেয়া, ওদের কাছে মোবাইলফোনও নেই যে, সেন্টারের লেটেস্ট খবর নিতে পারবো তাই বিন্দাস... এই জানো, এইবিন্দাসশব্দটা তোমার কাছে শিখেছি প্রথম আলাপের দিন তুমি বলেছিলে, ‘জীবনে প্রেম তো হয়নি! আমি বিন্দাস ...আমি ভেবেছিলাম, যাদের জীবনে প্রেম আসে না, তাদেরবিন্দাসবলা হয় সেই হিসাবে ভেবেছিলাম আমিও বিন্দাস পরে স্কুলে কলিগদের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝলাম, বিন্দাস মানে তা নয় এটার মানে সম্ভবত টেনশন-ফ্রি 

  এমন সময় সামনের সিট থেকে ইকবাল বলে ওঠেঅরুদা’, আমরা উড স্ট্রিটে ঢুকছি

  ট্যাক্সিওলা বলেউও পিলাবালা বিল্ডিং ম্যাহিলা কামিশন হ্যায় গেট কা সামনে খাড়া করতা হুঁ

  মেন গেটে ঢোকার পরেই সিকিউরিটি অফিস সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের উত্তর দিয়ে, খাতায় নাম-ধাম, মোবাইলফোন নম্বর লিখে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেল নিরুপমার হাতে ব্লাইন্ড-স্টিক অরুময়ের সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র দেখানোয় কাজটা একটু তাড়াতাড়ি হল তা না হলে ফোন-পর্ব চলত, ভেরিফিকেশন চলত সেসবের হ্যাপা পোহাতে হল না তবুও ওয়েটিং রুমে প্রায় আধঘন্টা অপেক্ষা করার পর মিসেস বাগচীর ঘরে ঢোকার অনুমতি পাওয়া গেল নিরুপমা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার সময় দুজনের যাওয়ার কথা বলেছিলেন তাই দুজন যাওয়ার অনুমতি পাওয়া গেল ফোটোগ্রাফার ইকবালকে ওয়েটিং রুমে বসেই থাকতে হল

  নিরুপমা যে অন্ধ, সেটা মিসেস বাগচীকে আগে জানানো হয়নি তাই ওকে দেখে মিসেস বাগচী কিছুটা হতচকিত হয়ে যান এমনকি নিরুপমা নিজেও ওই হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে থাকে, সেটাও মিসেস বাগচীকে বলেনি তখন বলার প্রয়োজন হয়নি তাই মিসেস বাগচী ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়ার সময় ভেবেছিলেন, নিরুপমা দাশগুপ্ত কোনও সোশ্যাল ওয়ার্কার কিংবা কোনও এন-জি-ওর মহিলা কর্মী  

  তাই নমস্কার বিনিময়ের পর নিরুপমা অরুময় চেয়ারে বসার পরেই মিসেস বাগচীর প্রথম প্রশ্নআপনাদের সংস্থার নাম বলুন মানে, যে এন-জি- থেকে এসেছেন

  নিরুপমা বলেআমি তো কোনও এন-জি- থেকে আসিনি!

  তাহলে?  

  এবার অরুময় বলেম্যাডাম! যদি অনুমতি দেন তো খুব সংক্ষেপে আমি ব্যাপারটা আপনাকে বুঝিয়ে বলি আমি বড় কাগজের একজন সাংবাদিক নাম অরুময় বসু দিস ইজ মাই আই-কার্ড

  ঠিক আছে, বলুন তবে বেশি সময় নেবেন না

  হ্যাঁ ম্যাডামবলেই অরুময় সরাসরি হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের ঘটনায় চলে যায় তারপর নিরুপমার লড়াই নির্ভীক মানসিকতার কথা বলে তারপর বলেম্যাডাম, আপনি নিশ্চয় দেখে থাকবেন,  আজকে আমাদের কাগজেপ্রতিবন্ধীদের জীবনযন্ত্রণা, আজ নিরুপমা দাশগুপ্তএই হেডলাইন দিয়ে একটাকলামলেখা হয়েছে সেটা আমরই লেখা আর ইনি হলেন সেই নিরুপমা দাশগুপ্ত এখন আপনার কাছে কারণেই আসা, ওই লেখাটা প্রকাশিত হওয়ায় যেন মৌচাকে ঢিল পড়েছে ওই হোমের হাঁড়ির খবর আমজনতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এটা ওই হোমের কর্তৃপক্ষের মোটেও পছন্দের নয় কারণ আমি নিজে সেন্টারে গিয়ে দেখে এসেছি, ওখানে মেয়েরা কীভাবে শোষিতা, লাঞ্ছিতা হয় এমনকি ওদের উপর বিভিন্নভাবে, বিভিন্নজনকে দিয়ে যৌন নিগ্রহ করা হয়

 ইটস স্ট্রেঞ্জ! এর কোনও প্রমাণ কি আপনাদের কাছে আছে?

 নিরুপমা মাথার চুলে আঙুল ডোবায়যারা ইউজড হচ্ছে, তাদের জবানবন্দীই তো প্রমাণ কোনও ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং রাখা তো সম্ভব নয় সেন্টারের সবাইকে মোবাইলফোনও ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না নেহাত আমি একটা স্কুলে শিক্ষকতা করি, তাই মোবাইলফোন ইউজ করার সুযোগ পাই তার জন্য স্পেশাল অর্ডার বের করতে হয়েছে

  ! আপনি টিচার! মে বী আমি আপনার কথা কাগজে পড়েছি আপনি কি সেই মহিলা, যিনি হিউম্যান রাইটস-এর সহযোগিতা নিয়ে, টোটাল হিস্টেরেকটমি না করে, রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে থাকছেন যিনি স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় পাশ করেও চাকরি পাচ্ছিলেন না কেস করে চাকরি আদায় করেছেন!

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন  

তাহলে আপনি তো সেল্ফ-সাফিসিয়েন্ট, তবে ওই রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে থাকেন কেন? আপনি তো...!

 হ্যাঁ, আমি ইচ্ছা করলে ভালো ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েও থাকতে পারি কিন্তু আমার মতো একজন অন্ধ মহিলা, ফ্ল্যাটে একা থাকলে নিরাপত্তার অভাব ঘটবে একসঙ্গে অনেকজন প্রতিবন্ধী থাকার কিছু সুবিধাও তো আছে ম্যাডাম তাছাড়া আমি চলে গেলে ওখানকার মেয়েগুলো আরও অসহায় হয়ে পড়বে ওদেরকে দেখার কিংবা  ওদের কথা ভাবার কেউ থাকবে না ওখানে তো আমি দীর্ঘ চৌদ্দ বছর রয়েছি, সেই স্কুল জীবন থেকে আমি দেখেছি, ওরা কীভাবে ওই পঙ্গু অসহায় মেয়েগুলোকে ব্যবহার করে ওই প্রতিবন্ধী হোমের বাইরে সমাজসেবার মুখোশ কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয়ঙ্কর বিশাল ব্যবসা চলে আমি এতগুলো বছর ওদের সঙ্গে লড়াই করেই নিজের মান-সম্ভ্রম বজায় রেখেছি কিন্তু ওদের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার সাহস পাইনি এখন অন্য মেয়েদের সম্ভ্রম আর আমি একা রক্ষা করতে পারছি না তাই এবার আমি ওদের মুখোশ খুলে দিতে চাই অবশ্য যদি আপনার সাহায্য সহযোগিতা পাই দিদি, অনেক আশা নিয়ে আমি আপনার কাছে এসেছি

মিসেস বাগচী সামনের নোটপ্যাডে কলমের আঁকিবুকি কাটতে কাটতে বলেনএতদিন আপনি পুলিশ-প্রশাসন কিংবা আমাদেরকে জানাননি কেন?

দিদি, তার কারণ হলো, এগুলো প্রমাণ করার মতো কোনও তথ্য বা ক্লিপিংস আমার কাছে নেই তাছাড়া ওদের পিছনে পড়লে ওখানকার মেয়েগুলো দুর্দশা বাড়বে বই কমবে না কেন না, ওদের হাত মন্ত্রী-আমলা অবধি প্রসারিত হয় তো মেয়েগুলোকে ওই হোম থেকে তাড়িয়েই দেওয়া হবে তাতে ফুটপাত ছাড়া ওদের আর কোনও জায়গা থাকবে না

 মিসেস বাগচী কলমের পিছন দিয়ে কান চুলকোনসে অবস্থা তো এখনও হবে তাহলে...!

 না দিদি, তখন আমাকে কিংবা আমার সঙ্গের কয়েকটা মাত্র মেয়েকে নিয়ে ওদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে হতো কিন্তু এখন গণমাধ্যমে খবরটা প্রকাশ হওয়ার জন্য আমরা কিছুটা হলেও জনসমর্থন পাবো সেইসঙ্গে আপনাকে পাবো তাছাড়া বুদ্ধিজীবী মহলেও একটা যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছি এই সাংবাদিক বন্ধুর কল্যাণে তাদেরকে পাশে পেলে এইঘোঘের বাসা ভেঙে দেওয়াহয় তো সম্ভব হবে আমরা কয়েকটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পেরেছি তারাও পথে নামতে, আন্দোলন করতে রাজি হয়েছে সেইসঙ্গে মহিলা কমিশন যদি আমাদের সহযোগিতা করে, তাহলে ওই মেয়েগুলোর ওপর যৌননিগ্রহ বন্ধ করতে ওরা বাধ্য হবে তখন সমাজকল্যাণ দপ্তর এবং বড় বড় ব্যবসায়ীরা হয়তো ওদেরকে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার হাত গুটিয়ে নেবে

 মিসেস বাগচী কানের পাশের চুল ঠিক করতে করতে বলেনঠিক আছে বুঝলাম কিন্তু সবকিছুরই তো একটা প্রসিডিওর আছে প্রথমেই তো আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি না পুলিশ-প্রশাসনকে আপনারা আগে জানান ওরা যদি ইন্যাকটিভ থাকে, তখন আমরা ওদেরকে ব্যবস্থা নিতে চাপ দেবো

 আমরা লোকাল থানায় আজই এফ-আই-আর করেছি এই হলো এফ-আই-আর নম্বর

 নিরুপমা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে এফ-আই-আর-এর জেরক্স কপিটা বের করতে উদ্যত হয় মিসেস বাগচী বলেনথাক থাক, দেখাতে হবে না আপনারা এক কাজ করুন আপনারা কি আপনাদের পিটিশন লিখে এনেছেন?

 নিরুপমা অরুময় মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিরুপমা বলেম্যাডাম, লিখে জমা দিতে হবে জানতাম না

অরুময় জামার হাতা ঠিক করতে করতে বলেযদি একটা কাগজ দিয়ে সহযোগিতা করেন, তাহলে এখুনি পিটিশনটা লিখে দিচ্ছি

 ঠিক আছে, এই নিন কাগজ লিখে তার একটা জেরক্স করে নিয়ে আসুন পিটিশনে এফ-আই-আর বা জি-ডি নম্বর উল্লেখ করবেন আর পিটিশনে যিনি সাইন করবেন, তাঁর একটা আই-ডি প্রুফ অ্যাটাচ করে দেবেন দেখছি কী করা যায়

 অরুময় হাত বাড়িয়ে মিসেস বাগচীর হাত থেকে দুটো -ফোর সীট কাগজ নেয়  

 মিসেস বাগচী উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানিয়ে বলেনআপনারা ওয়েটিং রুমে গিয়ে লিখে ফেলুন তারপর করসপন্ডেন্স- জমা দেবেন

 অরুময় নিরুপমা উঠে দাঁড়ায় অরুময় বলেম্যাডাম একটা রিকোয়েস্ট করবো?

বলুন

বলছি যে, আমি তো সাংবাদিক নিরুপমা যে ব্যাপারটা নিয়ে মহিলা কমিশনে এসেছেন এবং আপনার সঙ্গে দেখা করে পিটিশন জমা দিয়েছেন, এটা একটা নিউজ করতে চাই তাতে ব্যাপারটা একটু জোরদার হবে বলে মনে হয় তাছাড়া আপনারা পিছনে রয়েছেন দেখে প্রশাসনও তখন ব্যাপারটাতে গুরত্ব দেবে না হলে জানেন তো আমাদের প্রশাসন ব্যবস্থার কী গতিপ্রকৃতি

 ঠিক আছে, আমার আপত্তি নেই নিউজ করে দেবেন

 থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম আমি জানি, আপনার মতো একজন সংবেদনশীল মানুষ অনুমতি অবশ্যই দেবেন তাই আমি একজন ফোটোগ্রাফার সঙ্গে নিয়েই এসেছি যদি একটা ছবি তোলার... বাইরে ওয়েট করছে

 হালকা হেসে মিসেস বাগচী বলেনঠিক আছে, ঝটপট ডেকে নিন আমার আবার সময় কম বাইরে আরও কেউ অপেক্ষা করছেন  

পিটিশন জমা দিয়ে, মহিলা কমিশন অফিস থেকে যখন তিনজনে বেরিয়ে আসে, তখন সূর্য মাথার উপর আগুন ঢালছে তবুও নিরুপমার চোখেমুখে একটা খুশির আভাস কিছুটা কাজ তো এগোনো গেছে ইকবালকে একটা ট্যাক্সি ধরতে ব'লে অরুময় মোবাইলফোনেডু নট ডিসটার্বএবংভয়েস রেকর্ডারবাটন অফ করে অভ্যাসবসত ম্যাডামের ঘরে ঢোকার আগেই দুটো অন করে দিয়েছিল এখন কল লিস্ট খুলে দেখে চীফ এডিটরের তিনটে মিসড কল সঙ্গে সঙ্গে কল ব্যাক করে    

ওপাশে ভারী গলাতোমাকে অনেকক্ষণ থেকে ট্রাই করছি  

স্যার! নিরুপমা দাশগুপ্তকে নিয়ে মহিলা কমিশনের চেয়ার পার্সন মিসেস বাগচীর ঘরে ছিলাম ইকবাল ছবি নিয়েছে ভালো নিউজ হবে স্যার

ঠিক আছে ওদিকে আরো ভালো নিউজ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে আমি সুখতলা রোড থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এফ-আই-আর-এর উল্লেখ করে যা বলার বলেছি খবর পেলাম, ওরা কাল সকালের দিকে ওই হোমে রেইড করবে তোমরা আগে থেকেই স্পটে হাজির থাকবেপুলিশ-অ্যাকটিভিটি নাটক’-এর ডিটেলস রিপোর্ট আমার চাই কেস-টা আর একটাশান্তিচরের কুমার ব্রহ্মচারী কেসকরেই ছাড়ব প্রতিবন্ধী মেয়েদেরকে নিয়ে এই ব্যবসা বন্ধ করতেই হবে সংবাদপত্রের তো একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকেই তাই পুলিশ বেরিয়ে গেলে আমাদের অ্যাকশন স্কোয়াড ওই হোমে ঢুকবে আমি টিম রেডি করে ফেলেছি   

কে স্যার! তাহলে আমি ... মানে...!  

তোমার চিন্তার কিচ্ছু নেই ব্রাদার তুমিই থাকবে টিম-লিডার যেহেতু প্রথম নিউজটা তুমিই করেছ তোমার টিমে কে কে থাকছে, তা তোমাকে হোয়াটস অ্যাপ করে দিচ্ছি তুমি ওদিকের কাজ সেরে আমার সঙ্গে দেখা করো কালকের ব্যাপারটা একটু চক-আউট করে দেবো আজকের নিউজটা রেডি করে দিয়ে যাও আর ওই কলামের পরশুদিনের লেখাটা ওটা এখন চলতে থাকুক

ইয়েস স্যার, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার আর একটা রিকোয়েস্ট, ইকবালকে দিনকয়েক আমার সঙ্গে দিন

ঠিক আছে, দুজনকেই এক সপ্তাহের জন্য অ্যাসাইনমেন্ট দিলামহ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার

থ্যাঙ্ক ইউ স্যার!

মোবাইল ফোন ডিসকানেক্ট করার সঙ্গে সঙ্গেই অরুময়ের মুখে একটা হাসির ঝিলিক সে হাসির আওয়াজ শুনে নিরুপমাও খুশি হয় ইতিমধ্যে ইকবাল ভাই একটা ট্যাক্সি ধরে ফেলেছে কিন্তু সঠিক গন্তব্য বলতে পারেনি আন্দাজে বলেছে, সুখতলা রোড

নিরুপমা ট্যাক্সিতে ওঠার পর অরুময় উঠে মোবাইলফোনে টাইম দেখে নেয় তারপর বলেচলিয়ে ভাইসাব, আমিনিয়া রেস্টুরেন্ট

নিরুপমা ইকবাল প্রশ্ন মাখানো চোখে অরুময়ের দিকে তাকাতে বলেচলো, ইঞ্জিনে আগে ভালো করে ফুয়েল নেওয়া দরকার কতক্ষণ লড়তে হবে, ঠিক নেই! নিরু, তুমি চিকেন-টিকেন খাও তো?

নিরুপমার ঠোঁটে কষ্টের হাসিদুবেলা যার ভাত জোটে না, তার আবারতপ্ত না পান্তা!’

তোমার মুখে একথা শোভা পায় না নিরু! একজন স্কুল-টীচারের স্যালারি এখন কম নয়!

শুধু টাকা থাকলেই কি সবকিছু জোটে? ভাগ্যে যদি না থাকে! হোমে যা খাবার দেওয়া হয়, মুখে দেওয়া যায় না

তুমি তো বাইরে খেয়ে নিতে পারো!

সে হয়তো পারি কিন্তু খেতে বসে রাবেয়া, মিনতি, স্বপ্নাদের মুখগুলো মনে ভেসে ওঠে, তখন ভালো খাবার আর গলা দিয়ে নামতে চায় না

অরুময় কেমন চুপ হয়ে যায় তারপর বলেঠিক আছে, তাহলে আজআমিনিয়া’-তে খাওয়ার পরে ওদের জন্যও কিছু খাবার নিয়ে নেবো

নিরুপমা কিছু না বলে অরুময়ের দিকে গভীর ভাবে তাকায়

ইকবাল বলেতাহলে অরুদা’, আজ কী খাওয়াচ্ছ? মুর্গ মসল্লম না চিকেন দোপিঁয়াজি?

চিকেন বিরিয়ানি আর মাটন রেজালা

নিরুপমা ফোড়ন কাটেআমার তো অভ্যেস নেই, ‘কুকুরের পেটে ঘি সহ্য হবে তো?’

অরুময় কটমট  করে তাকায় নিরুপমার দিকে

 নিরুপমা খিকখিক করে হেসে ওঠে

 নয়

 

আজ এমনিতেই দেরীতে চলছে সবকিছু কোনও কাজেই মন লাগছে না বিদিশার অন্যান্য দিন এতক্ষণে দুপুরের খাওয়া সেরে কোনও ম্যাগাজিন টেনে নিয়ে বিছানায় চলে যায় আজ এখনও খাওয়াই হয়নি কিন্তু পেট তো কারুর কথা শোনে না! খেতে দেরি হওয়ায় হাঁকডাক শুরু করেছে সে

  বিদিশা অন্যদিনের চেয়ে কম পরিমাণে খাবার নিয়ে বসেছে এমন সময় মোবাইলফোন বেজে ওঠে — ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে ...!’ খাবার ছেড়ে তড়িঘড়ি উঠে গিয়ে ফোন ধরে হ্যালো

  হ্যাঁ, হ্যালো, অদ্রিজার মা বলছ?

  হ্যাঁ বলছি  

  আমি সংযুক্তার মা বলছি চিনতে পারছ? সংযুক্তা তোমার মেয়ের সঙ্গে পড়ে

  হ্যাঁ, বীথিদিআপনি!

  মা! আমার নামটাও মনে আছে তোমার! আমি না তোমার নাম ভুলে গেছি; কিছু মনে রো না

  না না, এতে মনে করার কী আছে আমি বিদিশা বলুন কী বলবেন!

  হ্যাঁ হ্যাঁ, বিদিশা এবার মনে পড়েছে বলছিলাম কি তোমার হাজব্যান্ড কেমন আছে এখন?

  তো ভাল আছে হঠাৎ ওর খবর!

  না, মানে স্কুলে ঢোকার সময় তোমার মেয়ের সঙ্গে দেখা হল স্কুলবাস থেকে নামছিল তখন তোমরা কেমন আছ জিজ্ঞেস করলাম বলল, ‘বাপি ভাল নেইতাই খোঁজ নিচ্ছি একটু

  হ্যাঁ, মানে তেমন কিছু নয়; সারাদিনে প্রচুর ব্রেন ওয়ার্ক করতে হয় তো! তাই একটু মাথা গরম আর কি! ফরনাথিং রেগে যাচ্ছে, বকাবকি করছে

  না না, ওসব ব্রেন ওয়ার্কের জন্য নয় ব্রেন ওয়ার্ক তো সারাদিন আমার হাজব্যান্ডও করে এত বড় কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাথা কি কম ঘামাতে হয়! আমার কী মনে হয় জান! হল তোমাদের বাস্তুতন্ত্রের গন্ডগোল  তোমার কিচেনটা কি টয়লেটের সোজাসুজি?

  না তো! পাশাপাশি

  ওই পাশাপাশি আর সোজাসুজি একই হল আচ্ছা! তোমার ফ্ল্যাটের দক্ষিণের জানলার সামনে কি কোনও গাছ আছে?

  গাছ! হ্যাঁ, আছে তো!

  ঠিক ধরেছি আর ওই গাছে নিশ্চয় শকুনের বাসা আছে!

  না, ওগাছে শকুনের বাসা কী করে হবে! ওগুলো তো ক্যাকটাস বন্ধ জানলার গ্রিল ঘেরা খোপে দুটো ক্যাকটাসের টব আছে

  ! ক্যাকটাস আচ্ছা ক্যাকটাসগুলোতে কাঁটা আছে কি?

  হ্যাঁ, ক্যাকটাসে কাঁটা তো থাকবেই!

  এবার বুঝতে পেরেছি বিদিশা, তুমি আজই ওই ক্যাকটাস সরাও ওগুলোই যত নষ্টের গোড়া ঘরের দক্ষিণের জানলায় কি কোনও কাঁটাগাছ রাখতে আছে! ওই কাঁটাগাছের হাওয়া বাড়ির পুরুষমানুষকে পাগল করে ছাড়ে ওগুলো তুমি রাখ উত্তরের জানলায় আর এক কাজ কর একটা ইঞ্চি হাইটের সাদালাফিং বুদ্ধএনে ঘরের নৈর্ঋত কোণে বসিয়ে রাখ ব্যস! দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে আমারও তো প্রবলেম ছিল সে অনেক কথা বিদিশা, তুমি ফোন কর তো; আমি লাইন কেটে দিচ্ছি ফোনের একগাদা বিল এলে আমার কর্তা খুব রাগারাগি করে 

  ঠিক আছে বীথিদি’, আপনি রাখুন, আমি করছি আমি খাচ্ছিলাম তো! হাতমুখ ধুয়ে মিনিট দুয়েক পর করছি

  বিদিশার খেতে ইচ্ছে করে না আর আধখাওয়া ভাতের থালা সরিয়ে রেখে মুখ-হাত ধুয়ে নেয় টেলিফোনের কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ডায়াল করে বীথিদিকে

  ফোন ধরেই বীথিদিবলেন তোমাকে যা বলছিলাম, আমার কর্তার যা হয়েছিল, সে আর বলার কথা নয় সংসারটা ছন্নছাড়া হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল ঘরের কথা পরকে বলা উচিত নয়; তবু তোমাকে বলেই বলছি

  বিদিশার মনে কৌতূহলের বেলুনটা ক্রমশ ফুলতে থাকে সেটা ফাটার আগেই বীথিদিচাপা গলায় বলেন ওকে প্রায় কব্জা করে ফেলেছিল আর কি!  

  গুলতির ছিটেগুলির মতো বিদিশার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে কে কব্জা করে ফেলেছিল? 

  আবার কে! ওর পি.. শয়তানিটা রোজ ওকে গাড়িতে চড়িয়ে হোটেল, সে হোটেল, মাল্টিপ্লেক্স’, রায়চকের রিসর্ট নিয়ে যাওয়া শুরু করেছিল আমার মানুষটা ওর পিওন ডাকুয়া ফোনে আমাকে সব না জানালে এতদিন হয়তো আমাকে ডির্ভোস দিয়ে ওই শয়তানিটাকে বিয়ে করে ফেলত কিন্তু আমার মানুষটাকে তো আমি জানি; কোনওদিনই ওর এমন ছুকছুকে বাই ছিল না বিয়ে তো কম দিন হল না! এই নতুন ফ্ল্যাটে ওঠার পর থেকেই ওর মতিগতি পাল্টে গেল আমার সঙ্গে অশান্তি শুরু হল শেষে ধরা পড়ল ফ্ল্যাটের দোষ আছে শোওয়ার খাট ঘোরানো হল, জানলার পর্দার কালার চেঞ্জ করা হল আর ওই 'লাফিং বুদ্ধ' ফেং শুই করে সব ঠিক হয়ে গেল মেয়েটার ট্রান্সফার হল অন্য ডিপার্টমেন্ট- এখন তো ওর নাম শুনলেই রেগে যায় আমার কর্তা

  এখন আপনার সঙ্গে আর অশান্তি, ঝগড়াঝাঁটি করে না তো?

  না, না, এখন সব ঠিক হয়ে গেছে তোমাকে যা বললাম,  কর দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে

  বিদিশা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলে হ্যাঁ, দেখি কিছু একটা করতেই হবে ধন্যবাদ আপনাকে এখন রাখি!

  ফোনের লাইন কেটে দেওয়ার পরেও বেশ কিছুক্ষণ রিসিভার হাতে মুহ্যমান হয়ে বসে থাকে বিদিশা ওর মনের মধ্যে বয়ে চলে এলোপাতাড়ি ভাবনা চম্পা বলল, মন্দ বাতাস লেগেছে; মা মনসার মাদুলি আর জলপড়া দিলে ঠিক হয়ে যাবে বীথিদিবলল, বাস্তুতন্ত্রের গন্ডগোল,  ফেং শুই করাতে হবে ওদিকে দাদা ভেবে বসল, দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য চলছে দাদার এমন ভাবাটা অবশ্য অমূলক নয় এর আগে বেশ কয়েকবার ঝামেলা হয়েছে ওর সঙ্গে

  একবার তো অজিকে নিয়ে সোজা চলে গিয়েছিল দাদার ফ্ল্যাটে অনি একা ছিল ফ্ল্যাটে একদিন ওখানে থাকার পর দাদা বউদি দুজনে সঙ্গে এসে মীমাংসা করে দিয়েছিল যদিও মনোমালিন্য হওয়ার তেমন কোনও জোরালো কারণ ছিল না মেয়েকে বাটার খেতে দেওয়া হবে কি হবে না, এই নিয়ে মতান্তর অনির ইচ্ছা মেয়েকে রোজ ভাতের সঙ্গে বাটার দিতে হবে, এতে ব্রেন শার্প হয় ওর ইচ্ছা, রোজ বাটার খাওয়া ঠিক নয়, এতে মেয়ে মুটিয়ে যাবে ছিপছিপে না হলে সৌন্দর্য খোলতাই হয় না অবশেষে দাদার মধ্যস্থতায় একদিন অন্তর মেয়ের জন্য বাটার বরাদ্দ হয়েছে ইদানীং দুদিন ছাড়া বাটার দেয় মেয়েকে অনি মাথা ঘামায় না আর এসব নিয়ে এখন যেন মানুষটা মেয়ে, বউ, এমন কী সংসার সম্পর্কেই পুরোপুরি উদাসীন হয়ে গেছে দিনরাত শুধু বই আর কাগজ-কলম! যেন সংসারে আর কোনও মানুষ নেই! ভাল না লাগলেও অশান্তির ভয়ে মুখ বুজে মেনে নিচ্ছিল এসব কিন্তু আজ যা হল, তাতে তো দুশ্চিন্তা হচ্ছে খুব যদি মেন্টাল ডিসব্যালান্স হয় তা হলে তো ...!

  এমন ভাবতেই বিদিশার চোখ ছলছল করে ওঠে নাকে জল এসে যায় ওর খুব ইচ্ছে করে একটু কেঁদে নিতে ওর মন খারাপ হলে আজকাল দরজা জানলা বন্ধ করে প্রাণ ভরে কেঁদে নেয় কিছুটা সময় তারপর বেশ হালকা লাগে মনটা কাঁদবে বলে শোবার ঘরে ঢোকে

  বিদিশা কতক্ষণ কেঁদেছিল কে জানে! একসময় আচমকা ফোনটা ঝনঝনিয়ে ওঠে বিদিশা চোখ মুছতে মুছতে গিয়ে ফোন ধরে হ্যালো বলতেই ওর কানে আসে নমস্কার!

  যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে বলছি ...

  কথাটা শোনামাত্র বিদিশার মনে যেনইলেকট্রিক শকখাওয়ার ঝাঁকুনি  

  'ম্যাডাম, ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রদের সঙ্গে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা করতে করতে হঠাৎ প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েন অধ্যাপক অনিকেত নাথ ব্যাপক চিৎকার শুরু করেন পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যত শীঘ্র সম্ভব হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আপনাকে অনুরোধ করছেন ...

  কথোপকথন শেষ হতেই বিদিশা দিশেহারা হয়ে যায় এই মুহূর্তে কী করবে ঠিক করতে পারে না মেয়েটা রয়েছে স্কুলে ঘন্টা দুয়েক পর স্কুলবাস ওকে ছেড়ে দেবে কমপ্লেক্সের গেটে দুঘন্টার মধ্যে হাসপাতাল থেকে ফিরতে পারবে কি না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই পাশাপাশি ফ্ল্যাটের কাকেই বা বলবে মেয়েকে এনে তার ফ্ল্যাটে কিছুক্ষণ রাখার জন্য প্রায় সবাই চাকরি কিংবা অন্য কাজে বাইরে রয়েছে এই ব্লকটাতে একাই হাউস-ওয়াইফ, অন্যান্য বউগুলো চাকরি করে কাজের মেয়ে চম্পাকে যে বলবে; তার বাড়ি চেনে না চম্পার একটা মোবাইলফোন আছে একদিন দেখেছিল লম্বা ফিতে দিয়ে গলায় একটা মোবাইলফোন ঝুলিয়ে ঘর মোছা-বাসন ধোয়ার কাজ করতে এসেছে চম্পা বিদিশা ওকে দেখে অলক্ষ্যে হেসেছিলবাব্বা! কালে কালে কত কিছু দেখবএমন ভেবেছিল চম্পা আদুরে গলায় বলেছিল, ‘সরকার বউদি এটাগিফকরল আমাকে বউদি একটা নতুন সেট কিনেছে, ক্যামেরাওলা, এফ.এম. লাগানো তাই পুরনোটা দিয়ে দিল নম্বরটা নিয়ে রাখ বউদি, কোনওদিন কাজে না এলে ধাতানি দিতে পারবেকথাটা বলে খিকখিক করে হেসেছিল চম্পা

  ইস! সেদিন ওর নাম্বারটা নিয়ে রাখলে আজ খুব কাজে লাগত! মুখরা হলেও চম্পা বিশ্বস্ত, ওকে মেয়ে আর ফ্ল্যাটের দায়িত্ব দিয়ে হাসপাতালে দৌড়নো যেত এখন দাদা-বউদির শরণ নেওয়া ছাড়া উপায় নেই

  দাদার ফ্ল্যাটে ফোন করে বিদিশা বউদি ধরেছে দাদার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বউদি বলে এই তো তোমার দাদা কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেল বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটি থেকে গাড়ি পাঠিয়েছিল ওখানে একটা সেমিনারে তোমার দাদারস্পিচআছে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে কী ব্যাপার, আমাকেই বল না!

  দাদা নেই শুনে আরও ঘাবড়ে যায় বিদিশা অনি হাসপাতালে কী অবস্থায় কে জানে! যদি তেমন কিছু হয়!   

  বউদি বলে কী হল? চুপ করে রইলে কেন? কী হয়েছে আমাকে বলা যাবে না!

  বিদিশা যতটা সম্ভব সংক্ষেপে বউদিকে বলে সকাল থেকে এখন অবধি ঘটনা পরম্পরা বউদি বলে আমি ট্যাক্সি ধরে এক্ষুনি তোমার কাছে পৌঁছে যাচ্ছি মেয়েকে স্কুলবাস থেকে নিয়ে তোমার ফ্ল্যাটে থাকব তুমি রেডি হয়েই থাক আমি পৌঁছলেই হসপিটালে রওনা দেবে আর শোন! বেশি চিন্তা করো না অত্যধিক গরমে আর টেনশনে এমন হয়েছে হয় তো! সব ঠিক হয়ে যাবে এখন তোমার দাদাকে জানানোর কোনও দরকার নেই শুনে ওর আবার টেনশন হবে আমি বেরোচ্ছি এক্ষুনি!

  বউদি লাইনটা কেটে দেওয়ার পরেও বিদিশা আনমনে রিসিভারটা ধরে থাকে কিছুক্ষণ এই মুহূর্তে ওর আর কী করা উচিত ভেবে উঠতে পারে না বউদি এক্ষুনি বেরোলেও আধঘন্টার আগে পৌঁছতে পারবে না আচ্ছা! অনির মোবাইলফোনে একবার ফোন করে কি খবর নেবে এখন কেমন আছে ! নাহ! সেটা বোধহয় ঠিক হবে না এখন অসুস্থ, ফোন ধরবে কী করে! হয়তো ফোনটা ওর কাছেই নেই! ইউনিভার্সিটিতে ফোন করে কি কোনও লাভ হবে! তো হাসপাতালে

কী এমন হল যে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল! সকালে একটু ভুলভাল বকছিল আর রেগে উঠছিল এর জন্যে তো হাসপাতাল পাঠানোর কথা নয় তবে কি বাড়াবাড়ি হল যিনি ফোন করেছিলেন, তিনি বললেন, ‘সেন্সলেস হয়ে গেছে বিভিন্ন কারণেই তো সেন্সলেস হয় মানুষ হঠাৎ কি ওর ব্লাড প্রেসার বেড়ে গেল! নাকি কোনও কারণে ঝট করে প্রেসার নেমে গেল! সকালে ওরকম হল, বেরোতে না দিলেই ভাল হত

  এসব ভাবতে ভাবতে বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে গেছে হঠাৎ পাশের ফ্ল্যাটে কলিংবেল বেজে ওঠার শব্দে সম্বিত ফেরে বিদিশার রিসিভার নামিয়ে রাখে ক্রেডল-য়ে রাখতে না রাখতেই আবার বেজে ওঠে ফোন রিসিভার কানে দিতেই প্রান্তে মহিলা-কণ্ঠ আপনাকে অনেকক্ষণ থেকে চেষ্টা করছি ফোনটা এনগেজড ছিল

  হ্যাঁ, বলুন, আমি মিসেস নাথ

  হ্যাঁ, আমি যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে বলছি এইমাত্র খবর পেলাম প্রফেসর নাথের জ্ঞান ফিরেছে সুস্থ আছেন উনি বেশি চিন্তার কিছু নেই কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেবে তো বলছিলাম, আপনি কি আসতে পারছেন? নাকি আমরা ট্যাক্সি করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব?  

  না না, আমি এখখুনি রওনা হচ্ছি ট্যাক্সি ধরেই যাব হাসপাতাল পৌঁছতে আমার বেশিক্ষণ লাগবে না

  ঠিক আছে, আপনি সাবধানে আসুন আমাদের অনেকেই হাসপাতালে রয়েছে, চিন্তা করবেন না ম্যাডাম এমার্জেন্সিতে চলে আসুন

  ঝটপট শাড়ি পাল্টে তৈরি হয়ে নেয় বিদিশা সঙ্গে বেশ কিছু টাকা নিয়ে নেয় বলা যায় না, হঠাৎ দরকার লাগে যদি ওষুধপত্তরও নিশ্চয় কিছু লিখেছেন ডাক্তার; সেগুলো কিনতে হবে মেয়ে ফিরে আসার আগে ফিরে যেতে পারলে খুব ভাল হয় তা না হলে মেয়েটার আবার টেনশন হবে

  কিছুক্ষণের মধ্যেই মেন গেটের ভেতরে প্রশস্ত লন- বউদিকে দ্রুতপায়ে হেঁটে আসতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে ফ্ল্যাটে তালা লাগিয়ে তরতর করে নীচে নেমে আসে

  সিঁড়ির সামনেই দেখা হয়ে যায় বউদির সঙ্গে চাবিটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে খবর পেলাম, সেন্স এসেছে এখন ভাল আছে, ছেড়ে দেবে, নিয়ে আসি অজির স্কুলবাস আসবে চারটে চল্লিশ নাগাদ ঘন্টাখানেক দেরি আছে এখনও আসছি আমি সাড়ে চারটে নাগাদ নীচে নেমে আসবে তাহলেই হবে

  ঠিক আছে সাবধানে যেও লে বউদি এগোয় লিফট-এর দিকে

  বিদিশা যখন হাসপাতালে পৌঁছল তখন চারটে দশ

  এমার্জেন্সির উল্টোদিকের গেটের সামনে ব্যাপক ভিড় ভিড় দেখে প্রথমে ঘাবড়ে যায় বিদিশা কাছাকাছি গিয়ে দেখে এমার্জেন্সির গেট ফাঁকাই আছে উল্টোদিকের গেটে ভিজিটরদের লাইন বেড- থাকা রোগীদের দেখতে এসেছে আত্মীয়-প্রিয়জন ইচ্ছেমতন ঢুকতে পারছে না  ওরা বড় কোলাপসিবল গেটের কিছুটা অংশ ফাঁকা রাখা  হয়েছে সেখানে 'ভিজিটর কার্ড' দেখিয়ে একজন একজন করে ঢোকানো হচ্ছে ভেতরে, তাই হই-হট্টগোলও খুব ভাবে, এমার্জেন্সিতে ঢুকতে গিয়ে ওকেও আবার কোনও কার্ড দেখাতে হবে নাকি! হাসপাতালে তেমন একটা আসতে হয়নি, সেই শাশুড়ি মারা যেতে একবার যা .... তাই হাসপাতালের নিয়মকানুনও জানা নেই

  এমার্জেন্সি বিল্ডিংয়ের বিশাল কোলাপসিবল গেটখানা বড় করে খোলা রয়েছে কোনও গেটকীপার নেই একটু দূরে ছোট্ট একটা ঘরের দরজার মাথায় লেখাপুলিশ আউটপোস্ট

  ঘরের সামনে দুজন পুলিশ বসে গল্পে মত্ত গেট-য়ের দিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই ডাইনে বাঁয়ে তাকিয়ে বিশাল লম্বা সিঁড়ি দুটো টপকে ভেতরে ঢোকে বিদিশা এমার্জেন্সির টিকিট কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভদ্রলোক এগিয়ে আসেন ওঁর দিকে এক্সকিউজ মী! আপনি কি মিসেস নাথ?

  ঘাড় হেলিয়েহ্যাঁবলতেই ভদ্রলোক বলেন আমি অধ্যাপক মাইতি অনিকেতবাবুর কলিগ আসুন আমার সঙ্গে ডানদিকে মোড় নিয়ে বারান্দা দিয়ে কয়েক পা এগোতেই ফার্স্ট এইড রুম অধ্যাপক মাইতির সঙ্গে ফার্স্ট এইড রুমে ঢুকতেই চোখে পড়ে অনিকেতকে লম্বা কাঠের বেঞ্চে বসে রয়েছেন পাশে দুতিনজন বেশ খোসমেজাজে গল্প করছেন তাদের সঙ্গে দেখে মনেই হচ্ছে না যে, উনি অসুস্থ

  বিদিশা কাছে যেতেই ওর দিকে তাকিয়ে হাসেন অনি  আমার তেমন কিছু হয়নি শুধুমুদু এরা কষ্ট দিল তোমাকে

  পাশ থেকে একজন বলে ওঠেন হ্যাঁ, তেমন কিছুই হয়নি ব্লাডপ্রেসারটাই যা হু হু করে বাড়ছিল আর সেন্স না থাকলেও জ্ঞান ছিল টনটনে

  ভদ্রলোকের কথায় হেসে ওঠেন সকলে বিদিশাও ম্লান হাসে এতক্ষণ ওর মনে জমে থাকা ভাবনার ধুলোবালিগুলো যেন উড়ে যায় হাসির দমকা হাওয়ায়

  অন্য একজন বলে ওঠেন বউদিকে তো আমরা আগে দেখিনি এই সুযোগে দেখা হয়ে গেল

  অধ্যাপক মাইতি বলেন এখানে বসুন মিসেস নাথ আমি ডক্টরকে ডেকে আনি আর একবার প্রেসারটা চেক করবেন উনি তারপর ডিসচার্জ করে দেবেন

  বিদিশা অভিযোগের সুরে অনিকেতকে বলে আজ সকাল থেকেই তোমার শরীরটা খারাপ ছিল আজ না বেরোলেই পারতে নিজের ভালমন্দ পাগলেও বোঝে, বোঝে না, জানেন তো দাদা

  বিদিশার শেষ কথাটা অধ্যাপক মাইতির উদ্দেশে মাইতি হালকা হেসে কথাটার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তারপর এগিয়ে যান ডাক্তারকে ডাকার জন্য অনিকেতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোক হেসে বলেন অনিকেতদাএখনও পাগল হননি তো, তাই নিজের ভালোটা বুঝতে পারছেন না তবে, দেশ, সমাজ, সন্ত্রাস, নারীদের ওপর অত্যাচার, ধর্ষণ, গণহত্যা এসব বিষয়ে যা ভাবতে শুরু করেছেন, তাতে নিজের ভালো বুঝতে বেশি সময় লাগবে না

  মজা করে কথাটা বললেও বিদিশার মনে ধক করে লাগে সত্যিই কি তাহলে অনি পাগল হয়ে যাবে! ওর মুখেও ফুটে ওঠে মনের দুশ্চিন্তা অন্যান্যরা বিদিশার মুখ দেখে বোঝেন মানসিক কষ্ট পেয়েছেন মিসেস নাথ তাই একজন বলেন ওর কথায় কিছু মনে করবেন না মিসেস নাথ! ওইরকমই মজা করে কথা বলতে ভালবাসে

  বিদিশা আসার পর থেকে অনিকেত শুধু একটা কথাই বলেছেন তারপর কেমন গুম মেরে বসে রয়েছেন হঠাৎ বেশ জোরালো গলায় বলে ওঠেন মজা নয়, ঠিকই বলেছে অরুণ শুধু আমি একা নয়, পুরো পৃথিবীটাই পাগল হয়ে যাবে কিছুদিনের মধ্যে তখনই নিজের ভালো বুঝতে শিখবে পৃথিবীর মানুষ তখনই হবে বিপ্লব আর বিপ্লবের মধ্যে দিয়েই মানুষের মানবিক মূল্যবোধের উন্নতি ঘটবে তখন সামাজিক শোষণ, অত্যাচারগুলো থাকবে না তাই মানবিক মূল্যবোধের অবনমনের উৎসটা ..!

  বিদিশা এগিয়ে আসে অনিকেতের কাছে তুমি আবার চেঁচামেচি শুরু করলে কেন? একটু চুপ কর না শরীর ভাল নেই তোমার!

  অনিকেতের গলা আর এক প্রস্ত চড়ে পৃথিবীর কোন মানুষটার শরীর ভাল আছে বলতে পার! শরীরের সঙ্গে মনের নিবিড় সম্পর্ক মন যদি ভাল না থাকে, শরীর ভাল থাকতে পারে না আর সর্বদা মৃত্যুভয় থাকলে কারুর মন ভাল থাকে না মনের ভালমন্দ শরীরের ভালমন্দ হল সমানুপাতিক

  অধ্যাপক মাইতি ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন উনি ছদ্ম শাসন করার ভঙ্গিতে বলে ওঠেন অনিকেতবাবু,  আবার আপনি কথা বলা শুরু করলেন! ডাক্তারবাবু বলেছেন চুপচাপ শুয়ে থাকতে

  অনিকেত আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন অধ্যাপক মাইতির পেছনে ডাক্তারকে দেখতে পেয়ে থেমে যান ডাক্তার ব্লাড প্রেসার মাপার যন্ত্র দিয়ে অভ্যস্ত হাতে অনিকেতের রক্তচাপ মাপা শুরু করেন ওঁর মুখের দিকে ব্যগ্র দৃষ্টিতে সকলে তাকিয়ে ডাক্তারের চোখ মুখের অভিব্যক্তিই জানিয়ে দেয় রক্তচাপ স্বাভাবিক যন্ত্র গোছগাছ করতে করতে ডাক্তার বিদিশার দিকে তাকিয়ে বলেন আপনি নিশ্চয় মিসেস নাথ! আমার সঙ্গে আসুন কয়েকটা মেডিসিন লিখে দেব, একটু বুঝে নেবেন, কখন কীভাবে খাওয়াবেন এখন সব নরম্যাল আছে

  বিদিশা ডক্টরস রুমে গিয়ে সকালের ঘটনা সব বলে ডাক্তারকে সব শুনে ডাক্তার হাসপাতালের এমার্জেন্সি টিকিটাতে খসখস করে ওষুধের নাম লিখতে লিখতে বলেন চিন্তার কিছু নেই মারাত্মক কিছু নয়  ওষুধগুলো খাওয়ান, কমে যাবে তবে, একটু লক্ষ্য রাখবেন যদি কথাবার্তার মধ্যে কোনও অসংলগ্নতা কিংবা বাড়াবাড়ি দেখেন, তাহলে নিউরোলজি . পি. ডি-তে একবার দেখিয়ে নেবেন কিংবা কোনও রেপুটেড নিউরো-সাইকায়াট্রিস্টকে মনে হচ্ছে এক্ষেত্রে হাইপারটেনশন থেকেই ডিলিরিয়াম হয়েছে রাত জাগতে দেবেন না মোটেও নরম্যাল ডায়েট লিকার কনজিউম চলবে না স্মোকিংও বন্ধ করলে ভাল হয়

  বিদিশা কোনও রকমে বলতে পারে ড্রিংক করে না, স্মোকও করে না দিনরাত শুধু পড়ে, নয়তো লেখে!

  দ্যাটস গুডবলে কাগজটা বিদিশার হাতে ধরিয়ে দেন ডাক্তার

  পাশেই ছিলেন অধ্যাপক মাইতি বিদিশার হাত থেকে কাগজটা টেনে নিয়ে বলেন দিন, আমরা ওষুধটা কিনে আনছি

  বিদিশাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে এগিয়ে যান অধ্যাপক মাইতি বিদিশা পায়ে পায়ে পৌঁছয় অনিকেতের কাছে অনির কাঁধে হাত রেখে বলে চল, বাইরে বের হই

  চলুন সবাই

  অনিকেত কোনও কথা বলেন না মুখে যেন লিউকোপ্লাস্ট লাগানো! হিপনোটাইজড মানুষের মতো উঠে দাঁড়িয়ে গুটিগুটি পায়ে এগোন বিদিশার পাশে পাশে

  ট্যাক্সিতে বসে একটা কথাও বলেন না বিদিশার সঙ্গে যেন পাশে বসে রয়েছে অচেনা কেউ বিদিশা ওঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে মেয়ের প্রসঙ্গ তোলে বউদিকে ফ্ল্যাটে রেখে আসার কথা জানায় অনিকেত নির্বাক শ্রোতা হয়ে শুনে যান শুধু আদৌ শুনেছেন কি না, সেটাও বোঝা যায় না কেমন এক বোবা দৃষ্টি ওঁর চোখে

  বিদিশা একসময় কথা থামিয়ে দেয় বাড়ির দিকে ট্যাক্সি এগোতে থাকে রাস্তার দুপাশের অজস্র গাড়ির ভিড় ঠেলে বিদিশার মনেও অজস্র ভাবনার ভিড় কিন্তু ভাবনাটা তেমন এগোয় না একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকে

 পি.এন.বি মোড় সামনে ম্যাডাম এবার কোন দিকে যাব বলুন ড্রাইভারের প্রশ্নে সম্বিত ফেরে বিদিশার বুঝতেই পারেনি ওর চোখ থেকে গাল গড়িয়ে জল নেমেছে কখন ও কিছু বলার আগেই খুবই স্বাভাবিক গলায় অনিকেত বলেন সামনের মোড় থেকে বাঁদিকে টার্ন নিয়ে সুখতলা রোডে ঢুকুন ভাই! ৬৭/১ সুখতলা রোড। বাড়িটার কপালে লেখা রয়েছে 'হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার', ওই বাড়িটার সামনে গাড়ি থামাবেন।     

  চমকে ওঠে বিদিশা হাসপাতাল থেকে অবধি যে একটা কথাও বলেনি, সে কি না ...! চোখের জল মুছতেও ভুলে যায় বিদিশা

  বিদিশাকে আরও অবাক করে অনিকেত বলে ওঠেন  আজকাল ঘরবাড়িগুলোও খুব একটু সুখে নেই ওদের বড় দুঃসময় ওরাও তো পৃথিবীর মধ্যেই ওই বাড়িটা ঠিকঠাক আছে তো!

  বিদিশার হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফেরে চিৎকার করে ওঠেএই ভাই রোকো!

  জোর ব্রেক কষে ট্যাক্সি থেমে যায় বিদিশা বলেসামনের মোড় থেকে ট্যাক্সি ঘুরিয়ে নাও সুখতলা রোড নয়, সোজা সিটি সেন্টার চলো  

  অনিকেত বিদিশার এমন রূপ দেখে হতভম্ব হয়ে যান উনি আর কোনও কথা বলেন না চুপচাপ বসে নিজের নখ খুঁটতে থাকেন

  বিদিশা সিদ্ধান্ত নেয়, মোটেও দেরি নয়, কলকাতার সেরা নিউরো-সাইকায়াট্রিস্ট নির্বেদ দাশগুপ্তর কাছে একবার দেখিয়ে নেবে আজই ফোন করবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার জন্য

 

দশ

 

আমিনিয়া রেস্টুরেন্ট থেকে যখন অরুময়, নিরুপমা ইকবাল বেরোল, তখন আকাশে হালকা মেঘ জমেছে কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই তবে রোদের তেজটা আটকে পড়ায় আবহাওয়াটা বেশ ভালো লাগছে অরুময় ঘড়ি দেখে, দুটো কুড়ি হাতে অনেকটা সময় আছে নিরুপমাকে হ্যান্ডিক্যাপড সেন্টারে নামিয়ে দিয়ে কাগজের অফিসে যাওয়া যাবে ইকবালকে একটা ট্যাক্সি ধরতে বলে তারপর ভাবে, এই ফাঁকে অপালাকে একটা ফোন করে নেওয়া যাকহ্যালো অপু, বলছি এখন কলেজে রিসেস টাইম তো! টিফিন করেছ?

  বাব্বা! আজ তোমার হলো কী! ঘটা করে আমার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে! অন্যান্য দিন তো আমার কথা মনেই থাকে না

  না, মানে রোজ তো এসময় ব্যস্ত থাকি আজ একটু ফ্রি  আছি তাই...

  অ্যাই, তুমি কিছু খেয়েছ? তখন তো তাড়াহুড়োয় ভালো করে খাওয়া হলো না

  হ্যাঁ, খেলাম একটু আগে মহিলা কমিশন থেকে বেরোলাম আজ একটা ভালো নিউজ হবে এখন যাবো আমাদের হাউসে তার আগে হ্যান্ডিক্যাপড সেন্টার ঘুরে যাবো যেহেতু আমাকেই ওই অ্যাসাইনমেন্টটা দেওয়া হয়েছে

  ভালো, যাও ওখানে যেতে তোমার ভালোই লাগবে সেই সুন্দর মুখের দেখা পাবে পথের ধারের হাসনুহানা..!

  কথার মধ্যে একটু খোঁচা না দিলেই নয়?

  অরু! গোলাপে কাঁটা থাকে বলেই তার মাধুর্য্য বেশি, তেমনি... কিছুই বোঝো না তুমি কেমন যেন দিনদিন নন-রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছো অথচ...!

  অথচ কী?

  কিছু না

  আরে বলই না

  শুনলে কষ্ট পাবে

  না, পাবো না, বলো

  অথচ আমার রোমান্টিকতা দিনদিন বাড়ছে কৃষ্ণচূড়া-পলাশ, বসন্তবৌরী-পাপিয়া, ঠুংরি-গজল খুব মন টানছে

  ঠিক আছে, তুমি কৃষ্ণচূড়া, পাপিয়া দেখ, গজল শোনো, আমি এখন রাখছি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে

  অ্যাই! শোনো না, আজ ফেরার সময় পারলে কিছু ফুল এনো তো! 

  ঠিক আছে আর কিছু লাগলে হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট করো ছাড়লাম

  নিরুপমা ঠোঁট টিপে হাসেকী অরু, বউ না গার্লফ্রেন্ড?

  অরুময় নিরুপমার কাঁধে হাত রাখেগার্লেফ্রেন্ড তো পাশেই দাঁড়িয়ে ফোনটা ছিল অপালার

  নিরুপমা লজ্জা পেয়ে যায়তোমার গার্লফ্রেন্ড হওয়ার যোগ্যতা আমার নেই

  , তাই বুঝি! তো তুমি অযোগ্যা, তা কী করে বুঝতে পারলে?

  জানি না যাও মনে হল তাই বললাম

  ইতিমধ্যে ইকবাল ট্যাক্সি জোগাড় করতে না পেরে মোবাইল ফোন থেকে একটাওলা’ ‘বুককরেছে সেটা বোধহয় কাছাকাছিই ছিল সামনে হাজির ইকবাল হাঁক পাড়েদাদা, এটা আমাদের, উঠে পড়ুন, উঠে পড়ুন

  অরুময় মৌরি চিবোতে চিবোতে বলেআমাদের সঙ্গে উঠে পড় তোমাকে হোমের সামনে ছেড়ে দিয়ে আমরা কাগজের অফিসে যাবো

  গাড়িতে উঠে অরুময় হোয়াটসঅ্যাপ খোলে নাহ! অপালা হোয়াটসঅ্যাপে কোনো টেকস্ট করেনি তবে ডাক্তার-বন্ধু নির্বেদ দাশগুপ্ত টেক্সট করেছে, লিখেছেতুই তোর বউকে নিয়ে কাল আসছিস তো?

  অরুময় টেক্সট করেহ্যাঁ, অবশ্যই আসছি, সন্ধে সাতটায় আর একটা কথা, পারলে আমাদের আজকের কাগজের ছয়ের পাতাটা পড়িস!  

  নিরুপমা চোখের কালো চশমা খুলে সেটার কাচ মুছতে মুছতে বলেকী অরু, গাড়িতে উঠে একদম চুপচাপ হয়ে গেলে যে! কী এতো ভাবছ?

  নাহ, কিচ্ছু ভাবিনি হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ দেখছিলাম সকাল থেকে দেখার সময় হয়নি

  হুঁ, আজকাল এই এক হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ট্যুইটার অনেকেই বলে শুনি আমার সঙ্গে প্রথম দিনে যে মেয়েটাকে দেখেছিলে, সে তো দিনরাত ফেসবুকে লেপ্টে থাকে তার তিন-চার হাজার ফ্রেন্ড আচ্ছা, তুমি আমাকে আবার ওইরকম ফ্রেন্ডের দলে ফেলছ না তো!

  তোমার কি মনে হয় যে, তুমি আমার ওইরকম বন্ধু! তাহলে তোমার জন্য, মানে শুধু তোমার জন্য নয়, তোমার কথায় সেন্টারের হতভাগী মেয়েগুলোর জন্য এত দৌড়চ্ছি কেন!

  সেটা অন্য বিষয় অরু সেখানে তোমার অফিসের দায়িত্বপালন, মানবিক বোধ ইত্যাদি জড়িয়ে আছে কিন্তু শুধুমাত্র আমাকে, অন্ধ যুবতী নিরুপমা দাশগুপ্তকে তুমি করুণা করো না ভালোবাসো? সত্যি করে বল তো!

  অরুময় চুপ থাকে নিরুপমা বলেজানি, তুমি কিছু বলতে পারবে না তোমরা পুরুষেরা উপরে উপরে অনেক আবেগ-ভালোবাসা দেখাও কিন্তু বাস্তবের সম্মুখীন হলেই পিছু হটো

  তুমি ভুল করছো, এটা পিছু হটার ব্যাপার নয় আমি তো তোমার সঙ্গেই আছি সহযোগিতা করছি এবং লড়াইটা শেষ অবধি চালিয়ে যাবো

  বুঝেছি, ওসব এড়িয়ে যেতে চাইছ ছাড়, অন্য কথা বলো

  অরুময়ের চাপা গলানা, এড়িয়ে যেতে চাইছি না পরে এসব আলোচনা হবে এখন ইকবাল সামনের সীটে বসে রয়েছে

ঘুমিয়ে গেছে

ইকবাল সামনের সীটে বসে সত্যি সত্যিই ভাতঘুম দিচ্ছে রীতিমতো নাক ডাকছে গাড়ির ঝাঁকুনিতে মাঝে মাঝে নাক ডাকায় ব্যাঘাত ঘটছে, এটুকুই যা অরুময় নিরুপমার অনুভূতি শক্তির প্রশংসা করে মনে মনে  

নিরুপমা কালো চশমাটা চোখে পরতে পরতে বলেবলছিলাম, তুমি বলেছিলে, আমাদের হোমের এই ব্যাপারটা বুদ্ধিজীবী মহলে চাউড় করে দেবে এবং তাদেরকে পাশে পাবার চেষ্টা করবে

হ্যাঁ, সবে তো আজকের কাগজে একটা পর্ব বেরিয়েছে কয়েকটা বেরোক বুদ্ধিজীবীদের টনক নড়ুক তারপর... তবে ব্যাপারটা বেশি সময় নেবে না কেন না, আজকে এইমহিলা কমিশনে লড়াকু প্রতিবন্ধী নিরুপমা দাশগুপ্তনিউজটা ফাটাফাটি হবে মনে হয় এই নিউজটা করার সময় বুদ্ধিজীবী মহলকে একটু খুঁচিয়ে দিতে হবে দেখা যাক, তারপর কী হয় এমনিতে বেশ কিছু ডাক্তার, লেখক-কবির সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আলাপ বন্ধুত্ব আছে তাদেরকে কোনো একটা রবিবার দেখে প্রতিবাদে শামিল হওয়ার জন্য মোটিভেট করবো তাহলেই তো কেল্লা ফতে

আচ্ছা, বলছিলাম, কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ইনভলভ করা যায় না?

এক্ষেত্রে সেটা অসুবিধা হবে কেন না, ব্যাপারটাতে একটু অন্যরকম গন্ধ তো! তাছাড়া প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য ওদের আবেগ তেমন কাজ করবে বলে মনে হয় না   

কিন্তু যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা তো সব ব্যাপারেই...

হ্যাঁ, সেটা যখন ওদের স্বার্থহানি ঘটার আশঙ্কা থাকে, তখনই ওরাহোক কলরবকরে এসব ব্যাপারে...! জানি না, ওদের উদ্বুদ্ধ করা যাবে কি না

গাড়ি বারিশ পার্ক পেরোলো সামনেই সুখতলা রোড অরুময় বলে ভাইয়া, আগে মোড় সে দাহিনা লিজিয়েগা  

ড্রাইভার পরিষ্কার বাংলায় বলেজি.পি.এস- লোকেশন পুট করা আছে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবো চিন্তা করবেন না

নিরুপমা হালকা হেসে বলেড্রাইভার মানেই অবাঙালি, এমন ধারণা মাথা থেকে বাদ দাও এখন অনেক বাঙালি ছেলে চাকরি-বাকরি না পেয়ে গাড়ি চালাচ্ছে

ড্রাইভার ঘাড় না ঘুরিয়ে বলেম্যাডাম, আপনি ঠিকই বলেছেন তবে আমি আর্মির চাকরি ছেড়ে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি

গাড়িটা যখন হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের দিকে বাঁক নেবে, তার আগে নিরুপমা বলে ওঠেআমাকে এখানে নামিয়ে দাও এখান থেকে আমি হেঁটে চলে যাবো

অরুময় বলেকেন, হোমের সামনেই নামিয়ে দিয়ে আসি খাবারের প্যাকেটগুলো তো নিতে হবে

না অরু, তুমি বুঝবে না, অসুবিধা আছে আমাকে এখানেই নামাও আমি ঠিক নিয়ে যেতে পারব

অরুময়ের কথায় ড্রাইভার গাড়ি সাইড করে থামিয়ে দেয় নিরুপমা নেমে হোমের দিকে হাঁটতে থাকে গাড়ি এগোয় বড় পত্রিকার অফিসের দিকে

সারাটা দিন অরুময়ের খুব ধকল গেল প্রতিবন্ধী-হোমের সামনে নিরুপমাকে নামিয়ে দিয়ে, জ্যামজট কাটিয়ে যখন অফিসে পৌঁছল, তখন বিকেল চারটে ইকবালকে সঙ্গে নিয়ে ওখান থেকে সোজা কাগজের অফিস সেখানে নিউজ-ডেস্কে বসে ঘন্টা দেড়েক ধরে নিউজ রেডি করল তারপর ইকবালের এডিট করা ফোটোগুলো নিয়ে চীফ এডিটরের ঘরে সমস্ত ঘটনার বর্ণনা দেওয়া, রিপোর্ট ফোটো পেশ করা, এসবে আধঘন্টা চলে গেল

সবকিছু শুনে, দেখে-বুঝে সি. বললেনকালকের দিনটা খুব ভাইটাল কাল ভোর সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ওই প্রতিবন্ধী হোমের সামনে পৌঁছে যাবে ইকবালকে সেরকম বলে দেবে টিমে আর যারা থাকবে, তাদের নাম ফোন-নাম্বার তোমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করেছি নিশ্চয় দেখেছ

হ্যাঁ স্যার!

ওদেরকে যা ইনস্ট্রাকশন দেওয়ার রাতে দিয়ে দেবে পারলে পুলিশ ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তুমি ইকবাল ভেতরে ঢুকে যাবে পুলিশ বেরিয়ে এলে অন্যরা একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ক্যামোফ্লেজিং- ভেতরে যাবে ওখানকার আবাসিকদের কিছু খাবার-পানীয় ইত্যাদি দেবে এবং মেয়েগুলোর সঙ্গে কথা লে রাঘব-বোয়ালের নামধাম জানার চেষ্টা করবে যদ্দুর খবর পেয়েছি, রুলিং-পার্টির কয়েজন মন্ত্রী বিধায়ক ফূর্ত্তি করার জন্য ওই হোম থেকে মেয়ে নিত তার বিনিময়ে বড় বড় কোম্পানির ডোনেশন বা গ্র্যান্ট-এর ব্যবস্থা করে দিত আমরা চাই, তাদের মুখোশ খুলে দিতে

স্যার! অবশ্যই চেষ্টা করব আশা করি, সফলও হব কিন্তু স্যার ওখানকার মহিলাদের কী হবে?

আরে! মহিলারা যাক ভাঁড় মে! ওদের নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই ওপরে ওপরে একটু সিমপ্যাথি দেখালেই হবে ওদের ব্যবস্থা করার জন্য সরকার আছে, অনেক এন জি ও আছে, মহিলা কমিশন আছে আমাদের ফুটেজ খাওয়া নিয়ে কথা ঠিকঠাক কব্জা করে রাঘব-বোয়ালকে গেঁথে ফেলতে পারলেই আমাদের বোথ সাইড প্রফিট তাকে খেলিয়ে খেলিয়ে মুখোশ খুলে দেওয়ার হুলো দেখিয়ে ফায়দা আবার বিরোধী দলের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ফায়দা বুঝলে কিছু? যে যখন তেল জোগাবে, তখন তার দিকের আলো জ্বলবে এতে কাগজের পক্ষপাতিত্ব করার বদনামও হবে না  

স্যার! সবই তো বুঝলাম, কিন্তু সেদিনই তো বললেন, সংবাদপত্রের একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে সে ব্যাপারে...

ওসব তোমাদের পিন খাওয়ানোর জন্য বলতে হয় তুমি একটি গড্ডল!

মানে?

মানে, গোদা বাংলায় গাড়ল আমরা সমাজসেবা করতে আসিনি, কাগজের ব্যাবসা করতে এসেছি আমাদের নিউজে বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়, মহিলা কমিশন এদেরকে তাতিয়ে দিতে পারলেই ডিউটি শেষ বাকি কাজটা ওরাই করে দেবে এখন কম্পিটিশনের যুগ ব্রাদার মুম্বাইয়েরসময় গ্রুপকলকাতায় এসে ঘাঁটি গেড়ে, ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে অ্যাড-এর ফরটি পার্সেন্ট কাটল হয়ে ওদের ঝুলিতে চলে যাচ্ছে সেটা আটকাতে না পারলে মালিক তোমাকেও রাখবে না, আমাকেও রাখবে না যদি পাছায় লাথি না খেতে চাও, এসব ভাবনা মাথা থেকে হাটাও তুমি এফিসিয়েন্ট রিপোর্টার, তোমার ভালোর জন্যই বলছি  

অরুময়ের গলা শুকিয়ে গেছে ডেস্ক থেকে জলের বোতল নিয়ে পুরোটা গলায় ঢালে তারপর বলেস্যার, যেমন বললেন, তেমনই হবে আজ তাহলে উঠি!

আরে বসো বসো! এক কাপ কফি খেয়ে যাও আর হ্যাঁ, পরশুদিনেরপ্রতিবন্ধীদের জীবন-যন্ত্রণারেডি হয়েছে?

না স্যার, আজ তো সারাদিন...

ঠিক আছে, রাতে রেডি করে কাল সকালে মেল করে দিও নাও দুটো বিস্কুট খাও খালি পেটে চা-কফি ক্ষতি করে

কফি খাওয়া শেষ হলে অরুময় মনে মনে দু-অক্ষর, চার-অক্ষরের গালাগাল দিতে দিতে সি-- ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তারপর বহু কষ্টে একটা ট্যাক্সি পায় ট্যাক্সিতে উঠেই শরীর এলিয়ে দেয় এর মধ্যে নিরুপমার ফোন দু'বার, অপালার তিনবার অপালার শেষ ফোনটাতে তো মেজাজ হারিয়ে বলে ফেলেএখনও মরিনি, বেঁচে আছি ঠিক ফিরবো

রাত আটটা নাগাদ ফ্ল্যাটে পৌঁছয় তখন অপালা ফুলদানির ধুলো মুছতে ব্যস্ত কলিংবেলের শব্দে উঠে দরজা খুলে দিয়ে আবার ফুলদানি মোছায় মন দেয় অরুময় বুঝতে পারে, ম্যাডামের মুড বিগড়েছে ফোনে ওভাবে কথাটা বলা উচিত হয়নি ফ্রেস-ট্রেস হয়ে ম্যাডামের মান ভাঙাতে হবে, ভাবতে গিয়েই মনে পড়ে যায়মাই গড! একদম মাথা থেকে আউট! মুখ থেকে বেরিয়েও যায় কথাগুলো

অপালা ঘাড় ঘুরিয়ে বলেজানতাম, তুমি আনবে না

অরুময় সোফায় বসে মোজা খুলতে থাকেঅপু, বিশ্বাস করো, যা ঝামেলা গেল, সত্যিই আমি ভুলে গেছি কাল অবশ্যই নিয়ে আসবো

হুঁ! আজ আমাদের ম্যারেজ অ্যানিভারসারি, আর উনি কাল ফুল আনবেন!

মাই গড! আগে বলনি কেন! ম্যারেজ অ্যানিভারসারির কথাটাই তো মনে নেই!

তোমার আর মনে থেকে কাজ নেই আমি কলেজ থেকে ফেরার সময় তিনরকম গোলাপ, ছয় পিস করে নিয়েছি

থ্যাঙ্ক ইউ! এই জন্যই তোমাকে আদর করতে ইচ্ছে করে তো ছয় পিস মানে তো ছয় বছরে পড়ল বুঝলাম কিন্তু তিনরকম কেন?

তোমার আমার মধ্যে প্রেম কমে গেছে তাই ... রেড রোজেস আর স্ট্যান্ড ফর প্যাশন, ট্রু লাভ, রোমান্স অ্যান্ড ডিজায়ার আজকাল তোমার আমার মধ্যে বন্ধুত্বও বোধহয় কমে গেছে তাই তোমার অন্য বন্ধু লাগছে সো হলুদ গোলাপ ইয়েলো রোজ রিপ্রেজেন্টস ফ্রেন্ডশিপ অ্যান্ড হোয়াইট রোজেস অফন রিপ্রেজেন্টস পিউরিটি, ইনোসেন্স অ্যান্ড ইয়ুথফুলনেস আমাদের সম্পর্কের মধ্যে কোনও গলদ নেই, লুকোচুরি নেই এবং আমাদের রিলেশন এখনও তারুণ্যে পরিপূর্ণ তাই তিনরকম গোলাপ হাঃ হাঃ হাঃ! যাও স্নান করে নাও, তারপর আমরা প্রেম করবো কার সঙ্গে বলো তো?

কার সঙ্গে?

গোলাপফুলের সঙ্গে

অরুময় অবাক হয়ে তাকায় অপালার দিকে অপালা বলে বুঝলে না তো?

অরুময়ের এখন এসব শোনার মতো ধৈর্য মানসিকতা নেই স্নান করে, ডিনার সেরে বসতে হবে পরশুদিনেরকলামলিখতে অপালার ওপর ভেতরে ভেতরে খুব রাগ হয় ভাবে, এই পাগলি নিয়ে ঘর-সংসার, কবে যে মুক্তি পাবে! কিন্তু রাগলে সব চটকে যাবেকলামলেখার গুষ্টির ষষ্টিপুজো হয়ে যাবে তাই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রে বলেহ্যাঁ, বুঝলাম তো! তুমি হলে লাল গোলাপ, আমি সাদা গোলাপ আর...!

আর... আর! বলো বলো, ঠিক দিকেই এগোচ্ছ, বলো!

আর জানি না, তুমি বলো!

 আমাদের যে আসছে, সে হলুদ গোলাপ, হি-হি-হি

যে আসছে মানে!

মানে মাসে আমার পিরিয়ড হয়নি কুড়ি দিন পেরিয়ে গেল তার মানে বুঝে নাও

সত্যি?

সত্যি, দেখো, এবার আমাদের হলুদ গোলাপ আসবেই

অরুময়ের মনের সমস্ত কষ্ট, সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষে উবে যায় ওর খুব ইচ্ছে করে, অপালাকে ধরে একটু চুমু খায় অপালার দিকে দুপা এগিয়েও যায় অপালা দুপা পিছিয়ে গিয়ে বলেউঁ-হুঁ-হুঁ, এখন চুমু খাবার সময় নয় এখন ধ্যান করার সময় পঞ্চ ইন্দ্রিয় কর্মক্লান্ত হয়ে আছে ওদেরকে এখন নিয়ন্ত্রণে আনার সময় শরীর একটা মন্দির, প্রেম সেখানে দেবতা, ভালোবাসা হলো পুজো সেই পুজো করতে গেলে আগে দরকার শরীরশুদ্ধি, আত্মাশুদ্ধি এবং চিত্তশুদ্ধি যাও আগে স্নান করো, কিছু খাও, প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নাও তারপর গোলাপ আর আমরা সারারাত...

অরুময় পোশাক বদলিয়ে স্নানে যায় স্নান করার সঙ্গে সঙ্গে ওর ক্লান্তি দূর হয়ে যায়, নাকি অপালার কথায় মনের ঘরে আলো জ্বলে ওঠায় ক্লান্তি পালায়, তা অরুময়ই জানে

কিছুক্ষণ পরে অরুময় রাতের খাবার খেতে খেতে টিভি চালায় চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খবর দেখে মোবাইলফোনে অপালাকে মহিলা কমিশনের চেয়ার পার্সনের সঙ্গে ওর নিরুপমার ছবি দেখায় বলে কাল কাগজে আমার দুটো লেখা বেরোবে একটামহিলা কমিশনের দ্বারস্থ প্রতিবন্ধী মহিলা’, এই নিউজটা, আর একটা হল ওইকলামপ্রতিবন্ধীদের জীবন-যন্ত্রণা  

অপালা খোলাচুলে ক্যাচার লাগাতে লাগাতে বলেঅরু, আমি জানি, উকিলদের মধ্যে দুটো ভাগ আছেসিভিল -ইয়ার এবং ক্রিমিনাল -ইয়ার তোমাদের সাংবাদিকদের মধ্যেও কি তাই?

হঠাৎ এমন প্রশ্ন!

মানে বলতে চাইছি, তুমি কি ক্রাইম-রিপোর্টার? কখনও তো কোনও ভালো ঘটনার কভার করতে দেখি না তোমাকে! সবসময় এই ধরনের নিউজ!

আরে বাবা! এধরনের নিউজ করতে বুকের পাটা লাগে নিউজ কালেক্ট করতে রিস্ক থাকে, এফিসিয়েন্সি লাগে সবার দ্বারা সব কিছু হয় না ওইসব ফ্লাওয়ার শো, ডগ শো কিংবা বিউটি কনটেস্ট কভার করার জন্য অনেক রিপোর্টার পাওয়া যায় এই ধরনের রিপোর্ট করতে হলে আমার মতো মাত্র কয়েক জনেরই ডাক পড়ে, বুঝলে!

হুঁ, বুঝলাম প্রকারান্তরে তুমি স্বীকার করলে যে, তুমি ক্রাইম-রিপোর্টার এটাতেই তোমার স্পেশালিটি আচ্ছা অরু, যারা এরকম ক্রাইমের পরিমণ্ডলে বেশি ঘোরাফেরা করে, তাদের ভেতরে কি ক্রিমিন্যালিটি থাকে?

হঠাৎ এমন প্রশ্ন! আমার মধ্যে ক্রিমিন্যালিটির কী দেখলে তুমি?

না, তোমার মধ্যে আছে, বলছি না থাকে কি না জানতে চাইছি

দেখো অপু, মানুষের পেশাগত কাজ সবসময় তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে প্রভাব ফেলে না হিন্দী সিনেমায় কেষ্ট মুখার্জী মাতালের অভিনয়ে সেরা কিন্তু জীবনে মদ খাননি ভিলেন প্রাণ বাস্তব জীবনে অসাধারণ ভালো মানুষ ছিলেন এরকম অনেক উদাহরণ দেওয়া যায় কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন জাগছে, তোমার এমন মনে হলো কেন? আমি না হয় ফুল আনতেই ভুলে গেছি, ওটা কি ক্রিমিন্যাল অফেন্স?

না, ওটা ক্রিমিন্যাল অফেন্স কেন হবে তবে ফুল ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করাটা ক্রিমিন্যাল অফেন্স

আমি কোথায় ফুল ছিঁড়লাম!

ছিঁড়েছ, তুমি বুঝবে না

হ্যাঁ, আমি তো তোমার অনেক কিছুই বুঝি না আমি তো আর তোমার মতো ফিলজফিতে এম. নই, আর সাইকোলজি নিয়ে থিসিসও লিখছি না

অরু, তুমি অকারণ রাগ করছো বোঝার চেষ্টা করো, আমি কী বলতে চাইছি আজ আমাদের ফিফথ ম্যারেজ অ্যানিভারসারি আজ তোমাকে একটা ভালো খবর দিলাম আজ ফুল নিয়ে এসেছি আজ আমার মনে একটা কামনার ফুল ফুটে রয়েছে তার মধ্যে তুমি এইসব নারী-নির্যাতন, কিশোরীর ধর্ষণ, চাষীর আত্মহননের খবর দেখার জন্য আমাকে ডেকে এনে আমার মনের ফুলটাকে ছিঁড়ে কুটিপাটি করে দিলে প্রেম-ভালোবাসা, মিলন এসব খুব সংবেদনশীল জিনিস গো! খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হয় তা না হলেই ভেঙে ছত্রখান হয়ে যায়

স্যরি অপালা, আসলে আমি খুব চাপে আছি অফিসে আজ সি- শুনিয়ে দিল, ‘পাছায় লাথি না খেতে চাইলে আরও সিরিয়াসলি কাজ করো তো তোমাদের মতো সরকারি কলেজের অধ্যাপনা করা নয়! প্রতিদিন লড়াই করে টিঁকে থাকতে হয় নাহলে দরজা খোলা, বাংলা বাজারে ইয়ে মারাও

অপালা সোফা ছেড়ে উঠে শোবার ঘরে চলে যায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায় কপাল থেকে লাল ভেলভেট টিপ খুলে আয়নার কাচে চিপকে দেয় এই লাল ভেলভেট টিপ অরুর খুব পছন্দ বিশেষ বিশেষ দিনে অপালা এই টিপ পরে ওর পছন্দের টকটকে লাল নাইট-গাউনটা পালটিয়ে একটা নাইটি পরে শুয়ে পড়ে

অরুময় সোফায় কিছুক্ষণ ভ্যাবলা হয়ে বসে থাকে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, উঠে গিয়ে অপালার মান ভাঙাবে, না কি রিডিং-রুমে গিয়ে পরশুদিনেরকলামরেডি করবে!

টিভিটা তখনও চলছে টিভিতেক্যামেরা চলছেঅনুষ্ঠান হচ্ছে সেখানে দেখানো হচ্ছে, সীমা আর্ট গ্যালারিতে আয়োজিত বিশেষ ছবির একজিবিশন যে ছবিগুলোতে ধরা হয়েছে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ভাঙন ব্যাভিচার অরুময় উঠে গিয়ে টিভির সুইচ অফ করে দেয়, তারপর পায়ে পায়ে রিডিং রুমে ঢুকে যায়

 

 

 

এগারো

 

বিদিশা অনিকেতকে নিয়ে যখন ফ্ল্যাটে পৌঁছল, তখন সন্ধে ছ'টা বাজতে আর মাত্র পাঁচমিনিট বাকি এর মধ্যে বউদি বার বার ফোন করেছে তাকে বাড়ি ফিরতেই হবে বেরোনোর সময় তাড়াতাড়িতে চাবি নিয়ে চলে এসেছে বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটি থেকে দাদা ফিরে গেলে ওঁকে বাইরে বসে থাকতে হবে তাই বউদি ছটফট করছে দাদা  ফ্ল্যাটে ঢুকতে না ঢুকতেই বউদি বেরিয়ে পড়েছে

দাদাকে তো এখনও কিছু জানানো হয়নি বিদিশা ভেবেছে, বউদি বাড়ি গিয়ে দাদাকে সব বললেও রাতে দাদাকে ফোন করে সব জানাবে ডাক্তার যতই বলুক চিন্তার কোনও কারণ নেই; ওর খুবই চিন্তা হচ্ছেবাপির কিছু হয়নিবলে অদ্রিজাকে আর বোঝানো সম্ভব হয়নি স্কুলবাস থেকে নেমে মায়ের পরিবর্তে মামীমাকে দেখেই বুঝেছে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে বাপির শরীর খারাপ শুনে মেয়েটা একদম মুষড়ে পড়েছে অনিকে নিয়ে ফেরার পর বিদিশা মেয়েকে খাওয়াতে সচেষ্ট হয়েছে ওর তখন খেয়াল হয়েছে, ওরও আজ ভালমতো খাওয়া হয়নি দুপুরে খেতে বসার সময় বীথিদির ফোন এল তারপরেই তো...!  

অনিকেতকে এখন দেখে মনেই হচ্ছে না যে, ইউনিভারসিটিতে উনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মেয়ের টিফিন করা হতেই কফির কাপ হাতে নিয়ে মেয়ের সঙ্গে গল্পে মেতেছেন অনিকেত স্কুলে আজ কী পড়ানো হল, কোনও ম্যামের কাছে বকুনি খেতে হয়েছে কি না, বেশি হোমটাস্ক আছে, না কম! এসব প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে বিদিশা টুকিটাকি কাজের মধ্যেও কান রেখেছে বাপ-মেয়ের কথাবার্তায়     

বেশ স্বাভাবিক এখনও কথার ফাঁকে ফাঁকে অনি কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন ওর সেই চোখ বন্ধ করা বিশেষ ভঙ্গিমায় বিদিশার এখন নিজেকে কিছুটা নির্ভার নিশ্চিন্ত লাগছে নিজেও এক কাপ কফি নিয়ে বসেছে অনির সামনের সোফায় অনির সঙ্গে দুচারটে কথা বলার জন্য ছুতো খুঁজছে হঠাৎ অনি চাপাগলায় বলে ওঠেন হ্যাঁ রে অজি মা! তুই ফ্ল্যাটে ঢুকলি কী করে! পুরো বাড়িটার তো দখল নিয়েছিল মাওবাদীরা ওরা কিছু বলেনি তোকে? তোকে যদি কিছু করত!

অদ্রিজা বাপির কথার ধরতাই পায় না বোকা বোকা চোখে বাপির দিকে তাকিয়ে থাকে বিদিশা প্রায় ধমকের সুরেই বলে ওঠে অনি! মেয়েকে কী সব বলছ তুমি! তুমি কি পাগল হয়ে গেলে! নাকি ইচ্ছা করেই আমাদেরকে কষ্ট দিতে চাইছ! 

অনি হিসহিসে গলায় বলেন কষ্ট! কষ্ট কাকে বলে আপনি জানেন ম্যাডাম! হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে কিছুদিন কাটিয়ে আসুন, বুঝবেন হোয়াট ইজ হার্ডশিপ হোয়াট ইজ ট্রাবল! কিংবা জঙ্গলমহলের মানুষগুলোর সঙ্গে দিন দশেক কাটিয়ে আসুন; কিংবা মার্কিন সেনা অধিকৃত ইরাকিদের সঙ্গে কাটান নয়তো আফগানিস্তানে তালিবানিদের সঙ্গে ...

বিদিশা কোনও কথা খুঁজে পায় না কাছে গিয়ে কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলে ওঠে গো তুমি এমন করছ কেন? তোমার কী হয়েছে?

অনিকেত গুরুগম্ভীর গলায় বলেন সব লিখে যাব থিসিস-

বিদিশা এবার অনিকেতের বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে ওঠে

অদ্রিজাও বাপির পিঠের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে এমন সময় কলিংবেল বেজে ওঠে  

উঠে গিয়ে দরজা খোলার শক্তিটুকুও যেন নেই বিদিশার নিশ্চল হয়ে বসে থাকে অদ্রিজার দরজা খোলা মানা কখনও দরজা খোলে না অনিকেত ওঠেন এগিয়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনি খোলেন সামনে চম্পাকে দেখে বলেন এস, আজ যেন একটু দেরি হল তোমার

চম্পা তড়বড় করে কথা বলা শুরু করে হ্যাঁ দাদাবাবু, আজ একটু দেরি হয়েছে আসলে সরকার-বউদিদের ঘরে একপাল লোক এসেছে বউদির বুনকে দেখতে পাত্তর নিজেও এসেছেকম্পি-উটের ইঞ্জিনার'  না কী যেন বলল! ওদের খিদমদগারি করতে করতে ... বউদির কী হয়েছে! মাতার যন্তনা নাকি!

বিদিশা ততক্ষণে চোখের জল মুছে সামলে নিয়েছে নিজেকে বলে চম্পা! তুই যদি কফি খেতে চাস তো কাপে ঢেলে নে আছে কিছুটা

অনিকেত মেয়ের কাছে ফিরে বলেন অজি মা! কী রে! কী হোমটাস্ক দিয়েছে বল! টাস্ক ঠিকঠাক না করলে ম্যামের বকুনি খেতে হবে যে!

বিদিশা অনিকেতের মুখের দিকে তাকিয়ে তন্ন তন্ন খুঁজতে থাকে কোথাও কোনও বদমাইশির রেখা আঁকা আছে কি না

না, সহজ-সরল নিষ্পাপ একখানা মুখ, এইমাত্র যেন ঘুম থেকে উঠল তবুও একটু পরখ করে নেওয়ার জন্য বলে ওঠে দরজা খুলে দেখ, দত্তদের ফ্ল্যাটটা নেই

অনিকেত আশ্চর্য হয়ে বলেন ফ্ল্যাট নেই, সে আবার হয় নাকি! ফ্ল্যাটে ওরা কেউ নেই, অথবা ফ্ল্যাটটা আর ওদের নেই রাতারাতি কাউকে বিক্রি করে দিয়েছে এটা হতে পারে

বিদিশা বোঝে, অনি খুব স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছে এখন অথচ একটু আগে - ... বলে ধ্যাত! তোমার সঙ্গে ইয়ারকি করছিলাম কফি খাওয়া হয়েছে তোমার? কাপটা দাও বেসিনে দিয়ে আসি তা না হলে চম্পা না ধুয়েই চলে যাবে

অনিকেত কাপ এগিয়ে দিয়ে বলেন চল অজি-মা, আজ তোমার স্টাডি ফলো আপ করার দিন দেখি কেমন পড়াশুনা চলছে

অনিকেত মেয়েকে নিয়ে রিডিংরুমে চলে যান রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর গুনগুন করে অনির গলায় বিদিশার গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে মানুষটার যে কী হল! এই ভাল তো এই পাগল-পাগল কথা!

চম্পা বাসন ধোয়া মোছার ফাঁকে চাপাগলায় বলে এখন দাদাবাবুকে দেখে ভালই তো লাগল গো বউদি

প্রায় কান্নাভেজা গলায় বিদিশা বলে কোথায় আর ভাল আজ ওর কাজের জায়গায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল

হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল একটু আগে ফিরলাম তখন সুস্থ মনে হয়েছিল বাড়ি ফিরেই আবার ভুলভাল বকা শুরু করেছে এই, তুই আসার আগেই তো ....

! বুঝিছি তাহলে বউদি তোমার ফেলাটের দোষ হয়েছে অবিশ্যি দোষ কাটানো যায় গুমো-হাবড়ায় একটা ভালরোঝাআছে শুনিছি ওকে খপর দিয়ে আনাতে পারলে ....! জান তো! বি ব্লকের সরখেলবাবুর ফেলাটের দোষ হয়েছিল সে একটু আধটু নাকি! তিন পা না চার পা দোষ! ওই রোঝাকে এনে তবেই না ...

রোঝাটা কী জিনিস সেটাই তো বুঝতে পারছি না!

তুমি কোন দেশের মেয়ে গো! রোঝা জান না! ওই যে যারা মন্তরটন্তর পড়ে ঝাড়ফুক করে ....

! তুই ওঝা-গুনিনের কথা বলছিস!

হ্যাঁ, ওরা অনেক কিছুই পারে সে ঘরবাড়ির দোষ বল, বাতাস লাগা বল, জিনে-ভূতে ধরা বল....

চুপ কর তো চম্পা ওইসব অলক্ষুণে কথাগুলো বলিস না

চম্পা মুখ বেঁকায় আমার আর বলাবলি কী! দাদাবাবু অমন করছে বললে বলেই না...

কথা শেষ না করে চম্পা বেশি শব্দ করে থালা-বাসন ধুতে থাকে বেসিনে বিদিশা ওকে আর ঘাঁটায় না পায়ে পায়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় নীচে রাস্তার আলোগুলো জ্বলে উঠেছে ব্যালকনি থেকে মুখ বাড়িয়ে ডানদিকে তাকালে কবরস্থানটা দেখা যায় তার পাশেই একটা মসজিদ এখান থেকে শুধু তার একটা গম্বুজ দেখা যায় চম্পা সকালে বলছিল ওই কবরস্থানটা নাকি ভাল নয়, জিন-কবন্ধর আড্ডা ওটা দূরে থাকলেও ওর বাতাস এদিকে আসতেই পারে আর বাতাসে ভর করেই নাকি জিন-জিব্রাইলের যাওয়া আসা

কবরস্থানটাকে ওখানে আর রাখার কী যে দরকার! আগে না হয় জায়গাটাতে মুসলিমদের বস্তি ছিল, তখন ওটা কাজে লাগত বস্তি উঠিয়ে গড়ে ওঠা এই ফ্ল্যাটবাড়ি গুলোর কোনওটাতে মুসলিম আছে বলে তো জানা নেই তবুও ওই মসজিদটাতে সকাল-দুপুর-সন্ধেয় আজান দেওয়া হয় নমাজও পড়া হয় নাকি! ওই মসজিদ নিয়ে   তো কত জল ঘোলা হল এই কমপ্লেক্স তৈরির সময় কমপ্লেক্সের মালিক গোষ্ঠী নাকি বস্তি, মসজিদ, কবরস্থান সব মিলিয়ে এগার একর জায়গা কিনেছে কিন্তু মসজিদ ধর্মস্থান হওয়ায় ভাঙা গেল না কবরস্থানটাও রয়ে গেল ওদের চাপে খেসারত দিতে হল ফ্ল্যাট বুকিং করে রাখা মানুষগুলোকেই ফ্ল্যাটের দাম চড়ে গেল

কমপ্লেক্স-য়ের মালিক তো আর লোকসান করার জন্য ব্যবসাতে নামেনি!

হঠাৎ বিদিশার মাথায় আসে চম্পার কথা মতো যদি জিন-ভূত বা মন্দবাতাস লাগাই হয়; তবে তা অনিরই শুধু লাগবে কেন! এই ফ্ল্যাটে অনি ছাড়া সে নিজে আছে, মেয়ে আছে কই! কিছু তো হয়নি আশপাশের ফ্ল্যাটের কারুর এমন হয়েছে বলে শোনেনি! ডাক্তার বলল, বাড়াবাড়ি হলে নিউরো-সাইকায়াট্রিস্টের কাছে দেখাতে তবে কি নার্ভের কোনও রোগ ডাক্তার তো বলল, হাইপারটেনশন থেকে এমনটা হতে পারে নার্ভের রোগ হলে তো হাত-পা কাঁপে খিচুঁনি হয় সেসব কিছু তো হচ্ছে না অর্থহীন কথা বলছে মাঝেসাঝে তাহলে মানসিক রোগ নয় তো! তবে তো সাইকায়াট্রিস্ট দেখানো দরকার কী যে করবে ঠিক করতে পারছে না রাতে দাদাকে ফোন করে ডিটেলস জানানো হোক দাদা কী বলে দেখা যাক

বিকেলে চম্পার কাজ কমই থাকে দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার বাসনগুলোই যা ধুতে হয় কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর কাজ সারা হয়ে যায় যাওয়ার আগে বলে বউদি শোন!

বিদিশা চিন্তার ভেতর থেকে যেন ভুস করে ভেসে ওঠে

চম্পার কাছে গিয়ে বলে বল কী বলছিস!

বি ব্লকের সরখেল-গিন্নীর কাছ থেকে কি জানব সেই রোঝার ঠিকানাটা?

বিদিশা কয়েক লহমা ভেবে বলে না থাক, এখন জানতে হবে না কার কী হয়েছে জানতে চাইবে ওরা কাউকে কিছু বলিস না যেন! আর হ্যাঁ, কাল সকালে কাজ সারার পর মনে করে দুধ কলা আর টাকা নিয়ে যাস মা-মনসার থান থেকে মাদুলিটা এনে দিস সঙ্গে লাল কারও আনবি

চম্পা বড় করে ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানায় এমন সময় ওর মোবাইলে বেজে ওঠে উফ! তেরি য়াদ আয়ে...!  

মোবাইল না ধরেই চম্পা বলে বোধহয় সরখেল-গিন্নি একটু দেরি হলেই হয়েছে মিসকল দেবে ওই সরকার বউদির বাড়িতেই দেরি হল আজ বাড়ি ফিরতেও দেরি হয়ে যাবে আজ অন্ধকারে ছেলেমেয়েদুটো কী করবে কে জানে!

অন্ধকার কেন? আলো নেই তোর ঘরে?

না গো বউদি, তোমাদের মতন বিজলিবাতি তো আর নেই লম্ফ নয়তো হ্যারিকেনের আলো সে আমি যাব, তবে তো জ্বালব ওরা ছেলেমানুষ; জ্বালতে গে যদি বিপদ ঘটায়!

চম্পার মোবাইলফোন আবার গান শোনায় চম্পা এবার ঝট করে ফোন রিসিভ করে বলে যাচ্ছি গো যাচ্ছি

হাত ঝাঁকিয়ে লাল বোতাম টিপে লাইন কেটে দিয়ে চম্পা বলে মোবাইলে যেমন সুবিধা আছে, তেমনি জ্বালাও অনেক শান্তিতে দুটো সুখ-দুঃখের কথাও বলতে দেয় না চলি গো!

অ্যাই চম্পা! তোর মোবাইল নাম্বারটা দে তো! সেদিন নেওয়া হয়নি

চম্পা কপট রাগ করে বলে জ্বালানোর লোক আরও একজন বাড়ল লেখো, বিরানব্বই তিনশো ষোল ...

তড়বড় করছিস কেন? দাঁড়া না, আমি মোবাইলটা নিয়ে আসি আগে

চম্পা চলে যাওয়ার পর বিদিশা দরজা বন্ধ করে আনমনে এগিয়ে যায় এই মুহূর্তে কী করবে তা ভাবতে সময় লাগে অন্যান্য দিন অনি এসময় ফেরে না এসময় নিজে মেয়েকে পড়াতে বসায় আজ অনি মেয়ের হোমটাস্ক করানোর উদ্যোগ নিয়েছে অনি অন্যান্য দিন সাড়ে সাতটায় ফেরে স্নান করে, তারপর টিফিন চা খায় আজ স্নান করেনি

অনিকে স্নান করতে বলবে কিনা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না

সকালে বাথরুমে ঢুকে তো এক কান্ড ঘটিয়েছিল এখন যদি আবার...! না থাক, স্নান করতে বলার দরকার নেই একটু পরে বরং টিফিন দেবে কী ব্যাপার! বাবা-মেয়ের কোনও সাড়াশব্দও পাওয়া যাচ্ছে না অংক কষাচ্ছে নাকি!

বিদিশা রিডিংরুমে ঢোকে দেখে, মেয়ে কিছু একটা লিখছে হোমওয়ার্কের খাতায় আর অনিকেত মেয়ের একখানা বই নিয়ে মনোযোগ সহকারে পড়ছে কোনও কথা না বলে অনিকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে, যদি বিসদৃশ কিছু চোখে পড়ে

বিদিশা ভেবেছিল, ওকে অনি লক্ষ্য করেনি কয়েক মুহূর্ত পরেই সে ভুল ভাঙে অনি হঠাৎ বলে ওঠেন ওভাবে মনোযোগ দিয়ে কাকে দেখছ? মেয়েকে, না আমাকে?

বিদিশা চমকে উঠেও সামলে নেয় তোমাকে

কেন! আমার মাথায় কি দুটো শিং গজিয়েছে নাকি, যে অমন ভাবে দেখতে হবে

অনির কথার মধ্যে রসিকতার ছোঁয়া পায় বিদিশা তাই মিষ্টি হেসে বলে না গো! চুলে অল্প অল্প পাক ধরায় তোমাকে আরও ব্যক্তিত্বপূর্ণ সুন্দর লাগছে, তাই দেখছি মুগ্ধ হয়ে

অনিকেত হেসে ওঠেন হো হো করে হাসতে হাসতে বলেন তাহলে সেদিন কাগজের আর্টিকেলটাতে ভুল কিছু লেখেনি

কোন আর্টিকেলটাতে, কী লিখেছিল?

ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে কাগজে একটা আর্টিকেল পড়লাম তাতে লিখেছিল এখন ইয়াং মেয়েরা তাদের তিনগুন বয়সী পুরুষের প্রেমে পড়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে

তার সাথে এর সম্পর্ক কী! আমি ইয়াং মেয়েও নই, আর তুমি আমার তিনগুণ বয়সীও নও

তা নই ঠিকই; কিন্তু আধবুড়ো তো হয়েছি চুল পেকেছে, গোঁফ-দাড়ি পেকেছে ইয়াং মেয়ে জুটতেও পারে! 

বিদিশার হঠাৎ খেয়াল হয়, মেয়ে লেখা থামিয়ে কান খাড়া করে ওদের কথাবার্তা শুনছে ঈষৎ লজ্জা পায় যদিও সবকিছু বোঝার বয়স এখনও হয়নি মেয়ের তবুওপ্রেমশব্দটা ওর সামনে না বলাই ভাল তাই চোখের ইশারায় মেয়ের দিকে অনিকেতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে

অনিকেত মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন কী হল অজি-মা! আনসার পারছ না?

অদ্রিজা জিজ্ঞেস করে বাপী! ড্যাজলিং মানে কী?

ড্যাজলিং মানে হল খুব উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বা জ্বলজ্বল করছে এমন পুরো সেনটেন্সটা বল

কোয়েশ্চনটা হল, হোয়াট ইজ ড্যাজলিং ইন দ্য সান?

ওহ! এর মানে হল, রৌদ্রে কী ঝলমল করছে?

অদ্রিজার চোখে মুখে খুশি পারব পারব; সফটি উইংস অব বিউটিফুল বাটারফ্লাই

অনিকেতের চোখে মুখেও খুশির আভাস রাইট! ঠিক বলেছ! লিখে ফেল এবার

বিদিশার মুখচোখ এবার সত্যিই ঝলমল করে ওঠে অনিকে এখন খুবই স্বাভাবিক লাগছে মনেই হচ্ছে না যে কিছুক্ষণ আগেই আবোল তাবোল কথা বলছিল বলে তুমি মেয়েকে পড়াও আমি টিফিনের জন্য একটা স্পেশ্যাল আইটেম বানাই হ্যাঁ গো! তুমি স্নান করবে তো? আজ ফিরে স্নান করনি

অনিকেত হালকা উদ্বেগ মেশানো গলায় বলেন হ্যাঁ,  স্নান তো করতেই হবে তা না হলে শরীর আনচান করবে যে!

এই বলে উঠে গিয়ে স্নান সেরেছেন অনিকেত! না, এবেলায় আর সকালের মতো দেরি হয়নি বাথরুমে স্নানশেষে টিফিন করেছেন, চা খেয়েছেন বিদিশা কিন্তু অনির অলক্ষ্যে ওকে আড়চোখে দেখছে মাঝে মাঝে অনিকে বুঝতে দিচ্ছে না যে, তার হাবভাবে, আচার আচরণের ওপর ওর তীক্ষ্ণ নজর

রাত দশটার টিভি সংবাদটা অনিকেত নিয়মিত দেখেন আজও যথারীতি টিভি খুলে বসেছেন মেয়েটা এখন পড়ার ঘরে এক মনে অংক কষছে বিদিশা এখন কিচেনে রাতে রান্না করে না সবদিন ফ্রিজ থেকে বের করে রাতের খাবার গরম করছে এখন ওর কান টিভির খবরে কানে আসে, সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার পরমাণু বিস্ফোরণ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রসংঘের সচিব উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি বলেছেন, পরমাণু বিস্ফোরণ সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বিশ্বের সমস্ত দেশেরই সংযত হওয়া উচিত সব দেশ মিলিয়ে পৃথিবীতে এখন যে পরিমাণ পরমাণু বোমা মজুদ করে রাখা হয়েছে; তাতে পৃথিবীকে একুশবার নিষ্প্রাণ করে দেওয়া যায় সুতরাং রাষ্ট্রনায়কদের ভাবা উচিত ...

খবরের কথাগুলো শুনতে শুনতে বিদিশার হঠাৎ মনে  পড়ে সকালে অনি এই ধরনের একটা কথা বলছিল যেন! পৃথিবীকে একুশবার নিঃক্ষত্রিয় করার কুড়ুল সারেন্ডার, আরও কী কী সব যেন! কিচেন থেকে ঝট করে বেরিয়ে আসে খবরটা ভালো করে শোনার জন্য সোফায় এসে বসে অনিকেতও বসে রয়েছে সোফায় ওর দিকে বিদিশা আড়চোখে তাকিয়ে চমকে ওঠে টিভির দিকে তো চোখ নেই অনির! প্রচণ্ড রাগী দৃষ্টি ওর চোখে দরজার বাইরে ব্যালকনির দিকে ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করছে সকালবেলার মতো ভাল করে কান পাততেই কথাগুলো স্পষ্ট হয় বিদিশার কানে সমস্ত ধ্বংস করে দেওয়া হবে পৃথিবীটাতে বেশিরভাগ অমেরুদণ্ডী অঙ্গুরীমাল প্রাণী গিজগিজ করছে কী বিভৎস গা-ঘিন ঘিন করা কীট! সারা পৃথিবীটাকেই কুরে কুরে খাচ্ছে পৃথিবীকে এক নিমেষে ধ্বংস করে দেওয়া হবে শুধু বোতাম টেপার অপেক্ষা

দেখেশুনে বিদিশা ভয় পেয়ে যায় এই মুহূর্তে অনিকে দেখে হিংস্র নেকড়ের মতো লাগছে পাশে বসে থাকতে ভয় লাগছে তবুও মরিয়া হয়ে অনিকে আলতো ঠেলা দেয় কী হল তোমার! কী সব বলছ?

অনিকেত ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে বিদিশার চোখে চোখ রাখে সেই ভয়ংকর চোখের দিকে তাকাতে পারে না বিদিশা অনিকেত এবার স্পষ্ট উচ্চারণে বলে ওঠেন  সমস্ত সাফ করে, আবার নতুন মানুষ দিয়ে পৃথিবী ভর্তি করতে হবে আরও বোধ বিবেক সম্পন্ন সৎ মানুষ চাই শুধু মেধা-সর্বস্ব মানুষে কাজ হবে না অত্যধিক মেধা- মানুষ প্রজাতিটাকে ধ্বংস করেছে এরিক ফন দানিকেনের সঙ্গে কথা বললাম ব্যাটা মিথ্যেবাদী বলেছিল, অন্যগ্রহে উন্নততর মানুষ আছে কিন্তু এখনও অবধি সন্ধান দিতে পারল না ডাজন্ট ম্যাটার! ক্লোনিং তো রয়েছে সেই সঙ্গে সেকেলে প্রজনন ব্যবস্থাও রয়েছে এই পৃথিবী থেকেই বাছাই করে বের করতে হবে কিছু সুবুদ্ধি সম্পন্ন নারী পুরুষ, সুন্দরী, স্বাস্থ্যবতী উর্বরা কিছু নারী আর সক্ষম পুরুষদের প্রিজার্ভ করতে হবে কোথায় প্রিজার্ভ করা হবে? মহীরাবণের পাতালপুরীতে! নো নো দ্যাট ইজ আনহাইজেনিক অ্যান্ড রিস্কি ভাবছি বিশ্বকর্মাকে অর্ডার দেব আন্ডার দ্য সী একটা রেডিয়েশন রেজিস্ট্যান্ট এসেমব্লেজ বানানোর জন্য নো, বিশ্বকর্মা অলসো ব্যাকডেটেড ময়দানব ... নো নো নেভার; দানবই ধ্বংস করবে মানবকে তার চেয়ে একটা ইন্টারন্যাশনাল কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে বরাত দেব তারাই গড়ে তুলবে নতুন পৃথিবীর আঁতুরঘর সেখানেই হবে লক্ষ লক্ষ ক্লোনিং আর ব্যাপক প্রজনন সুন্দর পুরুষ আর সুন্দরী নারীর মিলনে .... তার আগে এই পৃথিবীটাকে সাফ করে ফেলতে হবে

বিদিশা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে অনির কথাগুলোই শুধু কানে যাচ্ছে, কিন্তু কিছু ভাবতে পারছে না অনি কথা বলতে বলতে হঠাৎ খপ করে বিদিশার হাতের কব্জি চেপে ধরেন অ্যাই! তুমি সুন্দরী? উর্বরাশক্তি আছে তোমার? তুমি অনেস্ট তো?

আঁতকে ওঠে বিদিশা ভয়ার্ত শব্দ বেরিয়ে আসে ওর গলা থেকে সে শব্দে পড়ার ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে অদ্রিজা মা! কী হয়েছে?

বিদিশার বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে চেষ্টা করেও কোনও কথা বলতে পারছে না কয়েক মুহূর্ত পর কোনওক্রমে বলতে পারে দ্যাখ না তোর বাপি ....

অদ্রিজা বলে ওঠে হ্যাঁ, বাপির কী হয়েছে? বাপি, কী হয়েছে তোমার?

কথাটা বলেই অদ্রিজা কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দেয় বাবাকে অনিকেত আস্তে আস্তে বিদিশার কব্জিখানা ছেড়ে দেয় ওর চোখমুখ ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে কিন্তু কোনও কথা বলে না

টিভি-পর্দায় সংবাদ পাঠিকা তখন বলে চলেছেন  কলকাতা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে চব্বিশ ঘন্টার আবহাওয়ার খবর...

অদ্রিজা প্রায় কেঁদে ফেলে বাপির কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বল না বাপি, মা এমন চিৎকার করে উঠল কেন? তুমি কি মা-কে মেরেছ?

অনিকেত মেয়ের চুলে আঙুল ডোবান কী রে মা! কী বলছিস তুই! তোর মা-কে ফরনাথিং আমি মারতে যাব কেন! দিশা! তুমি কি এখন চিৎকার করেছ? মাম্মাম বলছে!

বিদিশা কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে মেয়ের সঙ্গে তো অনি স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছে! সেই রাগ, সেই ক্রুর দৃষ্টি নিমেষে উধাও! কী বলবে, তা ভাবতেই বিদিশার সময় যায় কয়েক লহমা তারপর কাঁপা গলায় বলে হ্যাঁ, সামান্য চিৎকার করেছি তবে, তেমন কিছু নয়, বুকে সেফটিপিন ফুটে গেল তাই ...! অজি-মা! যা, তুই পড়ার ঘরে যা আমার কিছু হয়নি

মেয়েটা বাবা আর মায়ের মুখের দিকে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে থাকে দুএক পলক তারপর গুটিগুটি পায়ে পড়ার ঘরে ঢুকে যায়

অনিকেতের গলায় ভৎর্সনার সুর তোমাকে কতদিন বলেছি, ব্লাউজে সেফটিপিন আঁটবে না হয় বাতিল কর ওই ব্লাউজ, নয় তো হুঁক বসিয়ে নাও

বিদিশা এক অদ্ভুত গলায় বলে হ্যাঁ, হুঁক বসাতেই হবে এবার বেশ কয়েকটা হুঁকের দরকার তা না হলে  আমার বুক যে উদলা হয়ে যাবে, ফাঁকা হয়ে যাবে

অনিকেত গলায় জোর এনে বলেন নিজে না পার চম্পাকে বলবে, হুঁক এনে দেওয়ার জন্য

বিদিশার আনমনা গলা হ্যাঁ, ওকে বলতেই হবে কালই ওকে পাঁচটাকা না না, পাঁচ ষোলআনা দেব

অনিকেত উঠে রোজকার মতো টিভি অফ করে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসেন বিদিশা আরও কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকে অফ করা টিভির দিকে তাকিয়ে তারপর মোবাইলফোনটা হাতে নিয়ে সন্তর্পণে এগিয়ে যায় ব্যালকনির দিকে ব্যালকনির দোলনাটাতে ধপ করে বসে ক্লান্ত আঙুলে মোবাইলের বোতাম টিপে কানে চেপে ধরে

এমন সময় অদ্রিজা পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে মা! দেখ না, এই অংকটা কিছুতেই মিলছে না

হঠাৎ মেয়ের গলা শুনে চমকে ওঠে বিদিশা কখন যে মেয়েটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, টের পায়নি মোবাইলের মৃদু কথা ওর কানে আসে দাদা বলছি, বল বিদু!

 

বারো

 

অপালার ভোরবেলায় বিছানা ছাড়া অভ্যেস আজ ভোর পাঁচটায় অরুময়ও উঠে পড়েছে অপালাকে কাল রাতে জানানো হয়নি আজ সকাল-সকাল বেরোবার কথা তাই অরুকে এত তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠতে দেখে অপালা বিস্মিত সকালে জানাতে ওর মুখভার কিন্তু কিছু করার নেই চাকরি লে কথা তাতে আবার বেসরকারি, যখন তখন ছাঁটাই হয়ে যাবার সম্ভাবনা অরুময় প্রাতঃকৃত্য সেরে, হালকা ব্রেকফাস্ট চা খেয়ে টার মধ্যে বেরোনোর জন্য প্রস্তুত

  এর মধ্যে ইকবালকে এবং আরও কয়েকজনকে ফোন করে দিয়েছে কথামতো ইকবাল টা দশ নাগাদ অরুময়ের ফ্ল্যাটের সামনে মোটরবাইক নিয়ে এসে হর্ন বাজায় অপালার বিষণ্ন মনে হালকা খুশির পোঁচ দিতে অরুময় বেরোনোর আগে ওকে হালকা আদর করে অপালা তাতে খুশি না হয়ে বিরক্তই হয় অরুময় বেরিয়ে পড়ে বাইকের রিয়ার গ্রিপে ঝোলানো হেলমেটটা খুলে নিয়ে অরুময় মাথায় পরে নেয় মোটরবাইকে ইকবালের পেছনে সে বলেসোজাহ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারচলো

  ওরা প্রায় হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের কাছাকাছি দূর থেকে দেখা যায় সেন্টারের সামনে ব্যাপক ভিড় জমেছে অরুময় ভাবে, বোধহয় পুলিশ অলরেডি এসে গেছে, হোমে রেইড শুরু হয়ে গেছে তাই এত ভিড় পথচলতি লোককে জিজ্ঞেস রে ইকবাল জানতে পারে, একজন নাকি ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে ফুটপাতে পড়ে মারা গেছে সে জন্য ভিড় জমে গেছে কথাটা শুনে অরুময়ের মনটা ধক করে ওঠেহোমের কেউ ঝাঁপ মারেনি তো! ইকবালকে বলে, ‘চেষ্টা করে দেখো, মেন গেট অবধি পৌঁছতে পারি কিনা

  রাস্তার ধার থেকে একজন বলে ওঠেএই যে দাদা, বাইক ঘুরিয়ে নিন, ওদিকে যেতে পারবেন না হোমের ছাদ থেকে একজন মহিলা ঝাঁপ দিয়েছে

  অরুময় জিজ্ঞেস করেভাই, পুলিশ এসেছে?

  না দাদা, পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে, এখনও আসেনি ফুটপাতে বডি পড়ে আছে

  বাইক নিয়ে ওরা মেন গেটের সামনে পৌঁছতে পারে না অগত্যা কিছুটা দূরে একটা বড় বাড়ির ফাঁকা গাড়ি-বারান্দায় বাইক রেখে হোমের মেন গেটের দিকে হাঁটতে থাকে জোরে পা চালায় ছেলেটার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে ভেসে ওঠে রাবেয়ার মুখ সে কোনো হঠকারিতা করে বসল না তো! নিরুপমা বলছিল, কাল থেকেই ঝিমিয়ে ছিল বেচারী

  গেটে পৌঁছনোর ঠিক আগে বাঁদিকে খুব কোলাহল আর ভিড় ভিড় ঠেলে ঢুকে দেখে, ফুটপাতে রক্তাক্ত এক যুবতীর অসাড় দেহ পড়ে রয়েছে নিরুপমা সেই দেহটা জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে অরুময়কে দেখতে পেয়ে নিরুপমা রাবেয়া... লে দেহটার উপর কান্নায় ভেঙে পড়ে বুকে জড়িয়ে ধরতে চেষ্টা করে রক্তভেজা দেহটাকে অরুময় নিরুপমার পাশে বসে ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে

  ইকবাল প্রফেশনাল ফোটোগ্রাফার এর মধ্যেই পটাপট ছবি তুলতে শুরু করেছে অরুময় চারপাশে চোখ চাড়িয়ে দেখে, বেশ কয়েকটা কাগজের সাংবাদিক স্পটে পৌঁছে গেছে এতো সকালে কোত্থেকে এসে জুটল, কে জানে! হয়তো ব্যাটারা আশেপাশেই ছিল

  এমন সময় সাইরেন বাজিয়ে দুখানা পুলিশের গাড়ি হাজির হয় একটা জিপ, পেছনে একটা পুলিশ-ভ্যান ভ্যান থেকে লাঠি হাতে দুদ্দাড়িয়ে পুলিশ নামতেই ভিড় কিছুটা পাতলা হয় সঙ্গে সঙ্গে চারজন পুলিশ, ভ্যান থেকে একটা স্ট্রেচার নিয়ে আসে এর মধ্যে জিপ থেকে সাব-ইনসপেক্টর সরকারবাবু নেমে আসেন তিনি ভিকটিমের কাছে পৌঁছে মোবাইলফোনে গোটা কতক ছবি তুলে নেন পুলিশ যখন দেহটার পাশে স্ট্রেচার নামিয়েছে, তখনও নিরুপমা রাবেয়ার দেহ আঁকড়ে ধরে কেঁদে যাচ্ছে পুলিশ তাকে প্রায় টেনে সরিয়ে দিয়ে দেহটা স্ট্রেচারে তোলে চারজনে মিলে স্ট্রেচারটা পুলিশ-ভ্যানে তুলে সঙ্গে সঙ্গে রওনা দেয় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দিকে

  ভিড় ফাঁকা হয়ে যেতে সাব-ইনসপেক্টর সরকারবাবু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন যুবককে বলেনঅ্যাই ভাই, এখানে দুবালতি জল ঢালার ব্যবস্থা করো তো! রক্তটা ধুয়ে যাক

 যুবকদুটো তৎক্ষণাৎ সটকান দেয় সরকারবাবু মুচকি হাসেন একটু পরেই সামনের চা-দোকানদার এক বালতি জল দিয়ে বয়টাকে পাঠায় নিজেও এক বালতি জল নিয়ে এসে চাপ চাপ রক্তের উপরে ঢেলে দেয়

সরকারবাবু এবার হোমের উপরের দিকে চোখ ছোঁড়েন কী বোঝার চেষ্টা করেন তিনিই জানেন তারপর গোটাকতক কনস্টেবল নিয়ে মেন গেটের ভেতরে ঢুকে যান অন্যসময় গেটে এজেন্সির সিকিউরিটি স্টাফকে ডিউটি করতে দেখা যায়, এখন কেউ নেই সরকারবাবুর পেছন পেছন সাংবাদিকরাও হুড়মুড়িয়ে ঢোকে উনি ওদেরকে হালকা ধমক দেনএতজন নয়, এতজন নয়, দুএকজন আসুন  

নিরুপমাকে ধরে ধরে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে অরুময় তার পেছনেই ইকবাল ওর গলায় ঝোলানো সাংবাদিক-ফোটোগ্রাফারের পরিচয়পত্র পুলিশ সেটা দেখে বলেন! আপনাদের চীফ এডিটরই তো... আসুন ভেতরে আসুন এই যে! বেশিজন ঢুকবেন না আমাদের কাজ করতে দিন

একটু এগিয়ে ডানদিকেঅফিসলেখা বোর্ড ঝোলানো ঘর সেখানে একজন মহিলা চেয়ারে বসে রয়েছে ভেতরে আর কেউ নেই এতক্ষণ বোধহয় কাঁদছিল পুলিশ দেখে চোখ মোছে তারপর কিছু বলতে গিয়ে আবার কেঁদে ফেলে সরকারবাবু ধমক দেনকাঁদবেন পরে, এখন আপনার নাম বলুন কী পদে আছেন? অন্যরা কোথায়?  

নিরুপমা এগিয়ে যায়স্যার! সরলা একজন প্রতিবন্ধী এই হোমেরই আবাসিক লেখাপড়া জানা মেয়ে লে ওকে রিসেপশনে বসানো হয়েছে

আপনি ! আপনি কে?

আমি নিরুপমা দাশগুপ্ত, এখানকার আবাসিক

! আই সি আপনিই নিরুপমা দাশগুপ্ত মানে আপনিই কাল থানায় এফ আই আর করেছেন?

হ্যাঁ, অফিস ঘরের ভেতরে চলুন আপনাকে সব বলছি সরলা, তুমি ভয় পেয় না বলো কী বলতে চাও

সরলা কান্না জড়ানো গলায় শুধু বলতে পারেসবাই পালিয়েছে

এর মধ্যে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে স্বপ্না, মিনতি, জবা ওরা নিরুপমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে সরকারবাবু ওদের আবেগকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য একটু সময় দেন তারপর বলেননিরুপমা, আপনি বলুন স্বপ্না, মিনতি জবাকে পাশে নিয়ে নিরুপমা বলতে শুরু করে হোমের অতীত বর্তমান কার্যকলাপ একটু শোনার পরেই সরকারবাবু বলেনএতো কাহিনী শোনার সময় নেই যে ঝাঁপ দিয়েছে তার নাম বলুন

 ওর নাম রাবেয়া, রাবেয়া খাতুন বাবার নাম ইদ্রিশ আলি ঠিকানা এখানকারই লিখুন ৬৭/ বি সুখতলা রোড... বোবা ছিল ওকে রিপিটেডলি রেপ করা হয়েছিল প্রভাবশালী মানুষদের দিয়ে

তারা কারা? নাম বলুন!

নিরুপমা একটু হোঁচট খায় তারপর বলেতাঁদের নাম জানা আমার পক্ষে সম্ভব নয় তবে এখানে যারা ওকে যৌননিগ্রহ করেছে, তাদের নাম বলতে পারি

সেটা কি আজকালের মধ্যেই?

না, কিছুদিন আগে

তখন জানাননি কেন? আজকের এই ঘটনার সঙ্গে কি তার কোনও যোগ আছে?

জবা বলে ওঠেঅবশ্যই আছে দিদি সকালে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই হোমের কেয়ারটেকার মাঝে মাঝে আমাদের ঘরে এসে বলেছে, ‘রাবেয়াকে সন্ধেবেলায় এক মন্ত্রীর বাড়িতে কাজে পাঠানো হবে 

সরকারবাবু ধমকানএসব ফালতু কথা শোনার সময় নেই আমার আপনাদের মধ্যে কেউ ওকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দেয়নি তো? আপনার নাম বলুন এই মণ্ডল! এদের নাম-ঠিকানা লিখে নাও তো!   

এ এস আই মণ্ডল একটা নোটবুক বের করে একে একে সকলের নাম, বাবার নাম বয়স লিখে নিতে থাকেন সরকারবাবু দুজন কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে যান এর মধ্যে টিভি মিডিয়ার সাংবাদিকরা নিরুপমা-জবা-স্বপ্নাদের ঘিরে ধরেছে মুখের কাছে বুম নিয়ে এসে নানারকম প্রশ্ন করে যাচ্ছে বেশিরভাগ উত্তরই দিচ্ছে নিরুপমা অরুময় অফিস ঘরে ঢুকে গিয়ে সরলার পাশে বসে নিচু গলায় ওকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে আর নোটবুকে শর্টহ্যান্ডে লিখে যাচ্ছে এর মধ্যে অরুময় সরকারি টিভি-চ্যানেলের সাংবাদিক অরূপদাকে ফোন করে বলেছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ৬৭/১বি সুখতলা রোড, প্রতিবন্ধী হোমে আসার জন্য এই এলাকাতেই কাছাকাছি কোথাও থাকে

কিছুক্ষণের মধ্যেই সরকারবাবু ছাদ থেকে নেমে আসেন মণ্ডলকে এত্তেলা দেনহয়েছে তোমার? চলো, রাবেয়ার ঘরের ভেতরটা একবার দেখব

মণ্ডল বলেনহয়েছে, চলুন স্যার অ্যাই! তোমরা এখন কেউ হোম থেকে অন্য কোথাও যাবে না যখন তখন থানায় হাজির হওয়ার সমন আসতে পারে

 নিরুপমা বলেআমি অন্ধ হলেও একটা স্কুলে  শিক্ষকতা করি আমাকে বেরোতেই হবে

ঠিক আছে, আপনার মোবাইল নম্বর লিখে নিলাম আপনাকে আগাম খবর দেওয়া হবে চলুন স্যার, রাবেয়ার ঘরটা একটু ছানবিন করে নিই

সরকারবাবু জবা-স্বপ্নার সাহায্যে দলবল নিয়ে রাবেয়ার ঘরে ঢোকেন কিছুক্ষণ পরেই ওঁরা বেরিয়ে আসেন দুজন কনস্টেবলকে মেন গেটে পোস্টিং রে অন্যদের ডেকে জিপ নিয়ে বেরিয়ে যান

কিছুক্ষণের মধ্যেই হোম সংলগ্ন ফুটপাত ফাঁকা হয়ে যায় এর মধ্যে দুএকটা বেসরকারী টিভি চ্যানেলের সাংবাদিককেও মুভি ক্যামেরা ঘাড়ে, বুম হাত দেখা যায় পাতি কাগজের রিপোর্টারেরা টিভি মিডিয়ার সাংবাদিকরাও তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে রওনা দেয় অরুময় দেখে, টিভি চ্যানেলের অরূপদা এসে গেছে ওকে ডেকে নিয়ে বলেঅরূপদাথেকে যাও সিন এখনও বাকি নিরুপমা দাশগুপ্তর এক্সক্লুসিভ বাইটের ব্যবস্থা করছি পরে আমাকে খাইয়ে দিও তার আগে চলো, সামনের দোকান থেকে একটু চা পেঁদিয়ে আসি ততক্ষণে ওরা একটু স্বাভাবিক হোক

চলো ভাই, তুমি হলে বিগ হাউসের বিগ রিপোর্টার তোমার অফার কি আর নেগলেক্ট করা যায়!

 হাতি বলে জিরাফকে তুই কত বড়!’ তুমি হলে ভারত সরকারের টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক, আর আমি কোথায় বেসরকারি এক কাগজের অফিসের খবর সংগ্রাহক, যার এবেলা চাকরি থাকে তো ওবেলা চলে যায় ম্যানেজমেন্ট পাছায় লাথি মারার জন্য পা উঁচিয়েই রেখেছে দাও, যতদিন পারো খোঁচা দাও বড়দের হাতে চাঁটি খেতেও ভালো লাগে

নাহ! চাঁটি খাবে কেন ভাই, তার চেয়ে বরং বিস্কুট খাও এই! বিস্কুট দাও তো গোটা চারেক    

খাওয়াবে যখন বিস্কুট কেন, ওমলেট-টোমলেট বল ঘুম থেকে উঠেই দৌড় দিয়েছি, পেটে কিছু পড়েনি।

বলবে তো! এই ভাই, দুটো ডবল-ডিমের ওমলেট আর দুটো স্পেশ্যাল চা

আরে দাদা, আমার সঙ্গে আমার ফোটোগ্রাফার ইকবাল ভাইও আছে

ও! বলবে তো! তাহলে তিনটে-তিনটে ঠিক আছে!

 

তেরো

শনিবার সকাল বিদিশার সকালের ব্যস্ততা কেটেছে চম্পা সময়মতো এসেছিল আজ চম্পা অদ্রিজাকে স্কুলবাসে তুলে দিয়ে এসেছে যাওয়ার সময়, ওকে কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে আর নাম-গোত্র একটা টুকরো কাগজে লিখে দেওয়া হয়েছে বলেছে, সন্ধেবেলায় আসতে একটু দেরি হবে মনসা-বাড়ি হয়ে, মাদুলি নিয়ে আসবে চম্পা বেরোতে না বেরোতেই দাদা-বউদি চলে এসেছে কাল রাতে বিদিশার ফোন পেয়ে তখুনি ওরা আসতে চাইছিল বিদিশাই রাতে আসতে নিষেধ করেছিল  

অনিকেত সকালে একদম স্বাভাবিক আচরণ করেছেন যথারীতি সকালে চা খেয়েছেন সম্বন্ধি বউদিকে হাসিমুখে সুস্বাগতম জানিয়েছেন 'অনেক দিন পরে আমাদের কথা মনে পড়ল,' বলে অভিযোগ জানিয়েছেন একসাথে কফি খেয়েছেন বলেছেন, 'আজ কিন্তু থেকে যাবেন দাদা ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে আপনাদের সঙ্গে অনেক গল্প করব' তারপর নিজের ঘরে গিয়ে লেখার টেবিলে বসেছেন খবর-কাগজ পড়ছেন

কিছুক্ষণ পরে বিদিশা হাতের কাজ সেরে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসে দাদা-বউদির সঙ্গে তারপর অনিকেতের কান বাঁচিয়ে কালকের সকাল থেকে রাত অবধি ঘটনা ওদের কাছে পুঙ্খানুপুঙ্খ বলে যায়  

 সব শোনার পর দাদা বলেন সবই তো শুনলাম রে বিদু! আমার মনে হচ্ছে ইটস সাইকায়াট্রিক প্রবলেম কোনও ভাল সাইকায়াট্রিস্টের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা দরকার

বিদিশার গলায় উৎকণ্ঠা দাদা! তোমার চেনা জানা কোনও ভালো সাইকায়াট্র্রিস্ট আছে?

হ্যাঁ, আছে ডক্টর নির্বেদ দাশগুপ্ত, নামকরা নিউরো-সাইক্রিয়াটিস্ট

ঠিক বলেছ দাদা, আমি রবিবারে ওঁর একটা অ্যাপয়ন্টমেন্ট করিয়ে রেখেছি

তাহলে তো কাজ এগিয়েই রেখেছিস

 বিদিশার বউদি বলে বুঝলে বিদিশা, আমার মনে হচ্ছে এটা তেমন কোনও সিরিয়াস ব্যাপার নয় এত চিন্তা করার কিছু নেই রাতটাত জাগার ফলে ব্লাডপ্রেসার বেড়ে গিয়েছিল বলেই .... ডাক্তার তো বলেছে বললে, যে হাইপারটেনশন হলে অমন ভুলভাল বকে মানুষ তা ছাড়া অনেক সময় মনের ভাবনা মুখে চলে আসে নিজের অজান্তেই ...

হ্যাঁ, একদম সর্বজ্ঞ খনা এলেন! বলে দিলেন, ‘এটা কোনও সিরিয়াস ব্যাপার নয়!’ শুনলে তো বাথরুমে ঢুকে কী কাণ্ডটা করেছে শোন! তোর বউদির কথায় কান দিস না ওর বুদ্ধির দৌড় আমার জানা আছে

আঃ দাদা! তুমি অমন করে বলছ কেন? বউদির যা মনে হচ্ছে সেটা বলতে দাও না!

তোমার দাদাটা ওইরকমই আমি কিছু বলতে গেলেই... বলছি যে, আমরা আসার পর থেকে তো তেমন কোনও গন্ডগোল দেখলাম না বেশ তো আমাদের সঙ্গে বসে চা খেল, আড্ডা মারল ওর গবেষণার বিষয় নিয়ে কত কথা বলল এখন তো দেখছি লেখালেখির জন্য কাগজ-কলম নিয়ে বসেছে

তাতে কী হয়েছে! এতে কি প্রমাণ হয় যে সম্পূর্ণ সুস্থ? তো ফুল ম্যাড হয়ে যায়নি যে সবসময় পাগলামি করবে! কখন সখনো ওর মাথাটা বিগড়োচ্ছে, ভুলভাল বলছে পরক্ষণেই আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছে

ভুলভাল বকছে, এটা তুমি ভাবছ কেন? এমনও হতে পারে যে ওর গবেষণার বিষয়ে কোনও ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, যা হয়তো বিদিশা ঠিক ধরতে পারছে না বা বুঝতে পারছে না!

ওহ! দাদা! বউদি! তোমরা অকারণ তর্কাতর্কি করছ

অনির কী হয়েছে না হয়েছে তা তো ডাক্তার বলবে আমার না ভীষণ ভয় করছে যদি মাথার গন্ডগোল হয়ে যায় তো...!

না রে বিদু, তোর এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই এখন একদম প্রাইমারি স্টেজ, কিছুদিন কাউন্সেলিং করালেই ঠিক হয়ে যাবে মেন্টাল ডিপ্রেশন থেকে হয়েছে হয়তো! রিসার্চ ওয়ার্কটা নিয়ে অনেকদিন লড়ে যাচ্ছে তো! এখনও অবধি কমপ্লিট করতে পারল না

কী করে করবে বল দাদা! বিষয়টাই তো বিদঘুটে! ‘সারা বিশ্বে মানবিক মূল্যবোধের অবনমন তার উৎস-সন্ধান তাও আবার নির্দিষ্ট কোনও দেশের নয়, সারা বিশ্বে মানবিক মূল্যবোধের অবনমনের উৎস খুঁজে পাওয়া কি চারটিখানি ব্যাপার! সারা পৃথিবীর বাঘা বাঘা সমাজ- বিজ্ঞানীকে নিয়োগ করলেও ...! 

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছিস! এসবের অন্তর্নিহিত কারণটা সমাজ-বিজ্ঞানীদেরকেই বের করতে হয় সামান্য ব্যাপার নয় এর পেছনে সমাজ ব্যবস্থা, আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামো, রাজনৈতিক ধর্মীয় মতাদর্শের মতভেদ, রাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্র এরকম বহুকিছু কারণ থাকে মানবিক মূল্যবোধের অবনমন তো শুধু আজকালকার ঘটনা নয় দুহাজার বছর আগে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইশকেলন শহরে রোমানদের দ্বারা যৌনদাসীর সদ্যোজাত শিশুদের গণহত্যা থেকে শুরু করে বর্তমানে নন্দীগ্রামের গণহত্যা পর্যন্ত কম গণহত্যা তো ঘটেনি পৃথিবীতে! সেসবের পেছনে একটা কমন ফ্যাকটর ওই মানবিক মূল্যবোধের অবনমন সেটাকে খুঁজে বের করাটাই হল ...

বউদি বিরক্ত আচ্ছা! তুমি হঠাৎ গণহত্যা নিয়ে পড়লে কেন বল তো! কথা হচ্ছিল অনির অসুস্থতা নিয়ে তার কোনও সুরাহা না করে ওর গবেষণার বিষয় নিয়ে ভাষণ দেওয়া শুরু করলে!

হ্যাঁ দাদা! বউদি ঠিকই বলছে ওসব কথা ছাড় এখন তুমি ভেবেচিন্তে দেখ, ওকে কী ভাবে সাইকায়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া যায় শুনেছি, মনোরোগীরা সবসময় নিজেকে সুস্থ ভাবে ওরা কিছুতেই ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না

সে তোকে চিন্তা করতে হবে না একটা ফন্দিফিকির খুঁজে বের করলেই হবে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলাই হবে না ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হয়েছে! কোনও গপ্প ফাঁদলেই হবে আচ্ছা বিদু! বলছি যে, ওর এই অ্যাবনরম্যালিটিজ কবে থেকে নোটিস করছিস তুই?

কালই প্রথম দেখলাম গো দাদা! তার আগে যে দুমদাম কথা বলত না তা নয়; তবে তা প্রলাপ মনে হত না ওর কথার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন করলে যুক্তি দিয়ে নিজের কথাটাকে এশটাবলিশড করার চেষ্টা করত যেমন ধর; একদিন বলল, ‘জান দিশা! মানুষ পশুর থেকেও নিকৃষ্ট জীবআমি বললাম, ‘তোমার যেমন পাগল-পাগল কথা বলল, ‘কথাটা আমার নয়; দার্শনিক ডেসমন্ড মরিসের উনি নিশ্চয় পাগল নন!’ বললাম, ‘কেন উনি এমন কথা বলেছেন, বোঝাও তখন আমাকে বলল, ‘দেখ দিশা, পশুরা শুধুমাত্র খাদ্যের জন্য প্রাণীহত্যা করে, মানুষ বিনা কারণেও প্রাণীহত্যা করে তারপর ধর, পশুরা তাদের প্রজাতি সংরক্ষণ বা বংশরক্ষার তাগিদে নির্দিষ্ট সময়ে মিলিত হয় কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে দিন নেই, রাত নেই, সময় নেই, অসময় নেই ...

বউদি এবার আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলে ওঠে কাল হয়তো ওই ধরনের কোনও কথা বলেছে, তুমি বুঝতে পারনি

না বউদি! পরে ওকে আমি জিজ্ঞেস করেছি; মনেই করতে পারল না কী বলেছে এই ভুলে যাওয়াটা কিন্তু একটা ফ্যাক্টর!

আমার মনে হচ্ছে কী জানিস! ওর ব্রেনে বেশি লোড নেওয়ার জন্য এমন হচ্ছে এদিকে ইউনিভার্সিটির রীডারসিপ, সেইসঙ্গে রিসার্চওয়ার্ক বিষয়টাও খুব ইমপ্রেসিভ তা ছাড়া অনিকেত এমনিতে খুবই ইমপ্যাশনেট সেন্সিটিভ বর্তমানে সারা পৃথিবীর যা রক্তাক্ত চেহারা, এতে সাধারণ মানুষেরই মেন্টাল প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে! তো গভীরভাবে ভাবছে এটা নিয়ে তবে তুই ওর শরীর খারাপ নিয়ে বেশি ভাবিস না আমি দেখছি কী করা যায়

শোন বিদিশা! তোমার দাদা এদিকে যা ব্যবস্থা করার করুক তবুও আমি একটা কাজ করতে বলব তোমাকে

কী কাজ বউদি?

তেমন কঠিন কাজ কিছু নয় বলছি, পুজো-আচ্চার পাট তো নেই তোমার বাড়িতে অনির নাকি ওসব ঠাকুর-দেবতায় বিশ্বাস নেই কিন্তু ঈশ্বর বলে তো কিছু আছে আমি বলি কী, ভালো পুরোহিত আনিয়ে তোমার ফ্ল্যাটে একটা যজ্ঞ করাও দেখবে, সব ঠিক হয়ে যাবে

ব্যস ব্যস! খনা এবার নিদান দিচ্ছেন বুঝেছিস! ওর হয়েছে মাথার রোগ! আর উনি যজ্ঞ করে ভূত ভাগাবেন! যত সব কুসংস্কার!

তোমার কাছে তো সবই কুসংস্কার! তিথি, গ্রহ, নক্ষত্র বলে কি কিছু নেই? গ্রহের ফেরে কতকিছু হয় মানুষের ওই গ্রহের ফের কাটানোর জন্যেই তো যজ্ঞ করে নবগ্রহের মধ্যে কখন যে কার কুদৃষ্টি পড়ে ...  

তোমাদের ওই জ্যোতিষশাস্ত্রের নবগ্রহের কথা আর বোলো না! বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি না হয় গ্রহ, মেনে নিলাম কিন্তু তোমাদের কাছে রবি, অর্থাৎ সূর্যও গ্রহ, চন্দ্রও গ্রহ, রাহু, কেতু, এগুলো নাকি সব গ্রহ! যত্তসব অবৈজ্ঞানিক ব্যাপার-স্যাপার!

বেশ হোক অবৈজ্ঞানিক ব্যাপার শুধুমাত্র বিজ্ঞানে ভর করেই এই বিশ্ব-সংসার চলছে না বিজ্ঞানের বাইরেও অনেক কিছু আছে এই যে ঝড় হচ্ছে, ভূমিকম্প হচ্ছে এত মানুষ মারা যাচ্ছে তোমাদের বিজ্ঞানের কেরামতিতে থামাও দেখি!

তোমাদের ওই যাগযজ্ঞ এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে থামাতে পারে?

থামাতে না পারলেও কিছুটা অন্তত প্রতিহত করতে পারে

ঘোড়ার ডিম পারে! যত্তসব বুজরুকি তোমার মতো দুর্বল মনের মানুষদেরকে বোকা বানায় ওই যজ্ঞ করনেওয়ালারা

এর মধ্যে অনিকেত কখন লেখার টেবিল থেকে উঠে এসেছে কেউ খেয়াল করেনি যে, কাছে এসে দাঁড়িয়েছে হঠাৎ ওর গলা শুনে চমকে ওঠে সকলে বলছে একদম ঠিক! এই দুনিয়ায় সবাই সবাইকে বোকা বানাতে চায় রাষ্ট্রপুঞ্জ বোকা বানাতে চায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দেশের শাসক বোকা বানাতে চায় জনগণকে জনগণ বোকা বানায় নিজের পরিবারকে রাজনীতিক বোকা বানায় ভোটদাতাকে ভোটদাতা বোকা বনতে বনতে একসময় চালাক হওয়ার চেষ্টা করে তখন প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আন্দোলন, আক্রমণ, সন্ত্রাস, গণহত্যা কিন্তু বিপ্লব আসে না আসবে কী করে! চেতনা না থাকলে বিপ্লব আসে না শিক্ষা না থাকলে চেতনা আসে না প্রকৃত শিক্ষক না থাকলে শিক্ষা হয় না মেরুদণ্ড না থাকলে প্রকৃত শিক্ষক হওয়া যায় না কোথায় মেরুদণ্ডী মানুষ! সব ইনভার্টিব্রেট! অল আর অ্যানিলিডা ইভন মী অলসো!

অনিকেত এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে যান, আর ওঁরা  হতবাক হয়ে শোনেন এর পরেই উনি বলেনদিশা, আমাকে এখুনি একটু বেরোতে হবে খুব জরুরি কাজ আছে সেটা সেরেই ফিরে আসব ভাবছি, আজ আর ইউনিভার্সিটি যাবো না তুমি দাদা-বউদির জন্য জমিয়ে রান্নাবান্না করো এসে একসাথে খাওয়া-দাওয়া করব

বিদিশা চমকে ওঠেএইমাত্র যা সব কথা বলল, তা ভালো লক্ষণ নয় এই অবস্থায় ওকে একা বাইরে ছাড়া ঠিক নয় এমন ভেবে বলেঠিক আছে, খুব যদি জরুরী হয়, যেতে হবে আমি বলছি কি, আমি আর বউদি দু'জনে গল্প করতে করতে রান্নাটা করে ফেলি তুমি আর দাদা দু'জনে দাদার গাড়িটাতেই যাও তাহলে আর ট্যাক্সি-ম্যাক্সি ধরার ঝামেলা রইল না  

অনিকেত বলেননা না, কতদিন পরে দাদা এলেন তোমরা দু'ভাইবোনে একটু মনের কথা বলবে, তা নয় আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছ 

দাদা বলে ওঠেননা না, ওর সঙ্গে কী আর এতো গল্প করব! ওরা রান্নাবান্না করুক, আমি তোমার সঙ্গেই যাই চলো রিটায়ার্ড মানুষ, কাজ ছাড়া তো বাইরে বেরোনোই হয় না তোমার সঙ্গে না হয় একটু অকাজেই ঘুরে আসি ঘরে বসে থাকতে আমার ভালো লাগে না

 অনিকেত বলেনঠিক আছে, যাবেন বলছেন যখন চলুন  

অরুময়, ইকবাল অরূপদা' 'হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার'-এর সামনের চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে এমন সময় একটা গাড়ি এসে চা দোকানের সামনে থামে গাড়ি থেকে নামেন প্রফেসর অনিকেত নাথ তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ওঁর সম্বন্ধি . অশেষ সেনগুপ্ত অনিকেত চা-দোকানিকে জিজ্ঞেস করেনভাই, ওই হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারটা খোলা আছে তো? মেন গেটটা বন্ধ দেখছি!

চা-দোকানদার বলেএইমাত্র পুলিশেরা চলে গেল আপনি কি মেয়েটার কেউ হন?

কোন মেয়েটার?

ওই যে, যে ছাদ থেকে ঝাঁপ মেরেছে

অনিকেত কথার ধরতাই পান না বলেনকে মেয়েটা! কোন ছাদ! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না আমি অনিকেত নাথ, যাদবপুর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর আর ইনি হলেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন রীডার . অশেষ সেনগুপ্ত আমি কালকের খবর-কাগজে একটা লেখা পড়ে এই প্রতিবন্ধী হোম সম্পর্কে, সঠিকভাবে বললে, এই হোমের আবাসিক নিরুপমা দাশগুপ্ত সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিতে এসেছি আজও 'মহিলা কমিশনে নিরুপমা' শিরোনামে কাগজে একটা লেখা বেরিয়েছে, তাই ...

 অরুময় চায়ের কাপ রেখে তড়াক করে উঠে পড়ে নমস্কার স্যার! আপনি কি কালকের 'প্রতিবন্ধীদের জীবন-যন্ত্রণা, আজ নিরুপমা দাশুগুপ্ত' এই লেখাটার কথা বলছেন?

হ্যাঁ ভাই, ঠিক ধরেছেন আমি একটা বিষয় নিয়ে রিসার্চ করছি জটিল বিষয়, তাই ব্যাপারে ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে  

অশেষবাবু বাস্তবিকই বিব্রত ওঁর এসব মোটেও ভালো লাগে না নেহাত ভগ্নিপতির একটু মেন্টাল ডিপ্রেসন চলছে, তাই বোনের কথায় সঙ্গে এসেছেন তারপর আবার এইসব পাগলামি! উনি বলে ওঠেনছাদ থেকে কার ঝাঁপ দেওয়ার কথা বলছিলেন ভাই? সে- নিরুপমা দাশগুপ্ত নয় তো?

অরুময় বলেনা স্যার, তিনি নন, তবে ওই হোমেরই একজন, নাম রাবেয়া সে নিরুপমা দাশগুপ্তের রুমমেট ছিল আপনারা আমার সঙ্গে ওই হোমে চলুন, নিরুপমার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিচ্ছি

অশেষবাবু একটু ইতস্তত করেন তা দেখে অরুময় নিজের আইডেন্টিটি-কার্ড বের করে বলেস্যার, আমি একজন সাংবাদিক ওই স্যার যে লেখাটার কথা বলছেন, ওটা আমারই লেখা আপনাদের কোনও চিন্তা নেই আমি সমস্ত ব্যবস্থা করে দিচ্ছি

রাবেয়া নামের মেয়েটার ছাদ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার কথা শুনে অশেষবাবুর আর মোটেও ওখানে যেতে ইচ্ছে করছে না অনিকেতকেও যেতে দিতে রাজি নন তাই উনি ওঁর হাত ধরে রেখেছেন কিন্তু অনিকেত নাছোড়বান্দা উনি হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলেনচলুন ভাই, ওই মেয়েটির সঙ্গে আমার খুব দরকার দাদা, আপনার যদি যেতে ইচ্ছে না করে, তাহলে এই চা-দোকানে অপেক্ষা করুন আমি কিছুক্ষণ পরেই আসছি  

অরুময়, অনিকেতবাবুকে সঙ্গে নিয়ে, রাস্তা পার হয়ে হোমের দিকে এগোয় অশেষবাবু নিরুপায় হয়ে পেছনে হাঁটতে থাকেন অরুময় চোখের ইশারায় ইকবাল অরূপদা'কে বলে অনুসরণ করার জন্য 

 নিরুপমার ঘরে ওঁদের দু'জনকে নিয়ে গিয়ে অরুময় বলেম্যাডাম, এঁরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রীডার, গবেষণা করছেন এরা আপনার জীবনযন্ত্রণা শুনতে আগ্রহী আপনি নির্দ্বিধায় সবকিছু বলুন সঙ্গে টিভি সাংবাদিকও রয়েছেন এঁদের মাধ্যমে আপনাদের উপর অত্যাচারের কথা, আপনার লড়াইয়ের কথা শুভবুদ্ধি-সম্পন্ন মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে আশা করি, আপনি এবং আপনারা সুবিচার পাবেন এবং দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি হবে

 কথা বলতে বলতে অরুময় নিজের দুটো ভিজিটিং কার্ড বের করে দু'জনের হাতে ধরিয়ে দেয়প্রয়োজন হলে ফোন করবেন রাখুন স্যার! 

 নিরুপমা চোখের জল মুছে দু'জন বিশিষ্ট মানুষকে ডিভানের উপর বসায় প্রথমে রাবেয়ার উপর যৌন নির্যাতনের কথা, ওকে মন্ত্রীর বাড়িতে কাজে পাঠানোর হুমকির কথা এবং ওর সুইসাইড করার কথা বলে অরুময় সাংবাদিক হওয়ার সুবাদে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করেআপনাদের এমন লাঞ্ছনা শোষণের পিছনে কাদের হাত রয়েছে বলে আপনার মনে হয়? ম্যাডাম, আপনি নির্ভয়ে বলুন আপনার সামনে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে দু'জন বিশিষ্ট মানুষ রয়েছেন প্রয়োজনে ওঁরা গণ-আন্দোলনে নামার কথা এই মিডিয়ার সামনে বলবেন আপনি স্বচ্ছন্দে বলুন  

এর মধ্যে অরুময় বাইরে অপেক্ষা করতে থাকা ওর টিমের লোকজনকে ভিতরে আসতে বলে দিয়েছে এবং আবাসিকদের মধ্যে খাবার জল বিলি করতে বলেছে এক ফাঁকে টিভি সাংবাদিক অরূপদা'কে ডেকে নিয়ে গিয়ে এই বিলি-বন্টনের ছবি ক্যামেরায় ধরতে বলেছে ভাষণ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলেছেআমরা আমাদের কাগজের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছি যে, সংবাদপত্র মানুষের কাছে শুধু সংবাদ পৌঁছে দেয় না, বিপদের সময় খাদ্য-পানীয়েরও ব্যবস্থা করে এই গণমাধ্যমের দ্বারা আমি সমস্ত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এন.জিও- কাছে অনুরোধ করব, আপনারা এদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলুন দোষীদের শাস্তি পাওয়ার জন্য সোচ্চার হয়ে উঠুন বেশি দেরি করলে দোষীরা নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করা সুযোগ পেয়ে যাবে তাই আগামীকালই আন্দোলনে নামা দরকার এই আন্দোলনে সুশীল সমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ছাত্র যুবসমাজ দলমত নির্বিশেষে শামিল হোক তবেই সমাজের এমন কলুষতা দূর হবে

নিরুপমার ঘর থেকে প্রফেসর অনিকেত নাথ ওঁর সম্বন্ধি . অশেষ সেনগুপ্ত যখন বেরোলেন, তখন প্রায় দুপুর বারোটা অফিস-টাইমের ভিড়ভাট্টা কিছুটা কমেছে তবে রাস্তায় গাড়ি-টাড়ি কম নেই প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম এর মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আসতে ড্রাইভারের কালঘাম ছুটে গেল রেগুলারের মাইনে-করা ড্রাইভার নয়, এজেন্সি থেকে ঘন্টা হিসেবে নেওয়া সে বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে যাচ্ছে

 অশেষবাবু অনেকক্ষণ থেকেই ফ্ল্যাটে ফেরার জন্য ছটফট করছিলেন কিন্তু অনিকেতের প্রশ্ন যেন আর শেষ হতেই চায় না মেয়েটার কথা শুনে অশেষবাবুর মনে কষ্ট হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু নিজের মেয়েটার কথা মনে হচ্ছিল খুব সে রয়েছে আমেরিকায় কতদিন দেখেননি তাকে এই মেয়েটা ওর মেয়ের বয়সীই হবে বেচারির কী কষ্ট! কিন্তু খুব লড়াকু এর জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগতো কিন্তু দিনকাল ভালো নয় এখন নিজে থেকে মানুষের উপকার করতে গেলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়

অনিকেত ভাবতে থাকেন, আজই কলেজে গিয়ে সমস্ত অধ্যাপককে জানাবেন ব্যাপারটা নিশ্চয় এধরনের কাজ-কারবারের সম্মিলিত প্রতিবাদ করা দরকার স্টুডেন্টদেরকেও বলবেন, তারা যদি প্রতিবাদে শামিল হয়, তাহলে ব্যাপারটা জোরদার হবে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ যে এখন একদম তলানিতে ঠেকেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না এই অবনমনের যে কতরকম কারণ থাকতে পারে, তা জানাই হতো না -বিষয়ে গবেষণা না করলে প্রায় তিনবছর নিরন্তর লেগে রয়েছেন এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য এবার থিসিসটা সাবমিট করার মতো অবস্থায় পৌঁছবে আশা করা যায় তার আগে অবশ্য দরকার ওই প্রতিবন্ধী হোমের মালিক ওদের সাঙ্গপাঙ্গদের পানিশমেন্ট কী ভেবেছে কী ওরা! সমাজের নিচুতলার মানুষগুলোকে নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করবে! সমাজের একজন দায়িত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে নিশ্চয়ই একটা সংঘবদ্ধ আন্দোলন করা দরকার

 

 

চৌদ্দ

 

সন্ধেবেলা। অরুময় নির্বেদ দাশগুপ্তর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছিয়ে মোবাইলফোনে নির্বেদকে ধরে। নির্বেদ ফোন রিসিভ করতেই অরুময় বলে আমরা এসে গেছি তাহলে তোর চেম্বার-লাগোয়া ওয়েটিংরুমে ওয়েট করি?

  -প্রান্তে নির্বেদের আপত্তিসূচক গলা, ওফ! তুই না...! তোর সঙ্গে আমার পেসেন্টের সম্পর্ক যে, পেসেন্টদের ওয়েটিংরুমে ওয়েট করবি? তুই বাঁদিকের সিঁড়ি দিয়ে সোজা দোতলায় উঠে যা, শিঞ্জিনিকে সব বলা আছে গিয়ে আড্ডা মার, কফি-টফি খা গোটা পাঁচেক পেসেন্টের অ্যাপো আছে দেখেই আমি আসছি

  অরুময় সিঁড়িতে উঠতে গেলে অপালা বাধা দেয়, তোমার বন্ধুর চেম্বার তো একতলায় বলেছিলে ওপরে উঠছ কেন?

  আরে বাবা! আমরা কি পেসেন্ট নাকি? বন্ধুর বাড়িতে কফির আড্ডায় নেমন্তন্ন...

  অপালা ডানদিকে কাচের দরজার সামনে দাঁড়ায়কেন মিথ্যা বলছ? আমাকে তো পেসেন্ট ভেবেই তোমার বন্ধু-ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছ তাই আমি পেসেন্টদের সঙ্গেই ওয়েট করব তুমি ইচ্ছে করলে উপরে কফির আড্ডায় যেতে পার তবে, তারে আগে আমার নামটা লিখিয়ে দিয়ে যাও

  কথা বলতে বলতে অপালা কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে অরুময় বাধ্য হয়ে ওকে অনুসরণ করে অপালা ঢুকে একটা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অরুময় ওর পাশে গিয়ে সে ঘরটাতে চোখ চারায় তিনজন পুরুষ একজন মহিলা অপেক্ষমান মহিলাটি একজন পুরুষের গা ঘেষে বসে রয়েছে তার মানে, ওরা কাপল হতে পারে ওদের একজন হয়তো পেসেন্ট অর্থাৎ পেসেন্ট তিনজন হতে পারে

  অনেকদিন পর অরুময় নির্বেদের বাড়িতে, অথবা বলা যায়, বাড়ির লাগোয়া চেম্বারে এল ঘরটাতে আধুনিকতার সম্ভার এখন পরতে পরতে মেঝেতে ম্যাট-ফিনিশড টাইলস দামী সোফা, সেন্টার টেবিল এয়ার-কন্ডিশনার চালু থাকায় হালকা ঠান্ডা দেওয়ালে কয়েকটা পেন্টিং ঝোলানো গোটা চারেক বাঁধানো ছবিও রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাকি তিনটে অচেনা কৌতূহলী হয়ে ছবির কাছাকাছি যায় দেখে একটার নীচে লেখা ফ্রয়েড, একটার নীচে লেখা কান্ট, অন্যটা হল হেগেল

  অরুময় ভাবে, যদ্দুর মনে পড়ছে, এঁরা হলেন দার্শনিক রবিঠাকুর কবি হলেও দার্শনিকের পর্যায়ে কিন্তু ডাক্তারের চেম্বারে এঁরা কেন! হোমিওপ্যাথির চেম্বারে গিয়ে দেখেছে, হানিম্যান কেন্ট-এর ছবি ঝোলানো থাকে আর অ্যালোপ্যাথিক চেম্বারে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু ডা. বিধানচন্দ্র রায় কম্পালসারি কিন্তু এখানে...

  কিছুক্ষণের মধ্যেই অরুময়ের মোবাইলফোন বেজে ওঠে প্রান্তে নির্বেদকী রে! তোরা কোথায়? শিঞ্জিনিকে ফোন করলাম, বলল, তোরা এখনও আসিসনি!

  আমরা তোর চেম্বারে-লাগোয়া ওয়েটিংরুমে ওয়েট করছি

  সত্যি! তুই না গবেটই রয়ে গেলি! বস, আমি রতনকে পাঠাচ্ছি

  লাইন কেটে যায় অপালা বলে ওঠেকী বলল, তোমার বন্ধু?

  অরুময় গজগজ করেকী আর বলবে, এখানে ওয়েট করছি বলে ক্ষেপে গেছে তোমাকে বললাম, ওপরে শিঞ্জিনির কাছে চল, আর তুমি...?

  স্যার! আপনি নিশ্চয় অরুময়বাবু আমার স্যার, মানে ডাক্তারবাবু আপনাকে ভেতরে যেতে বললেন আর ম্যাডামকে দোতলায় নিয়ে যেতে বললেন ম্যাডাম, প্লিজ আমার সঙ্গে আসুন

  অপালা ফিক করে হেসে ওঠে দেখেছ, তোমার ডাক্তার-বন্ধু ঠিক বুঝতে পেরেছে যে, তোমার চিকিৎসাটা আগে দরকার, তাই তোমাকে ডাকল যাও যাও! আমি ওয়েট করছি ডাক এলে যাবো

  অরুময় চোখ পাকিয়ে অপালার দিকে তাকিয়ে হিসহিসে গলায় বলেসিন ক্রিয়েট রো না এই রতনের সঙ্গে দোতলায় যাও নির্বেদ যখন ডাক পাঠাবে, তখন নেমে আসবে

  অপালা আর কথা বাড়ায় না রতনকে অনুসরণ করে অরুময় দরজা ঠেলে নির্বেদের চেম্বারে ঢোকে নির্বেদের সামনের চেয়ারে মুখোমুখি বসে নির্বেদ হেসে বলেতুই একটা ইডিয়ট নিজেই বললি যে, অপালা যেন বুঝতে না পারে ওকে মনোরোগী ভাবা হচ্ছে অথচ তুই ওকে নিয়ে রোগীদের ওয়েটিংরুমে ঢুকে বসলি! আমার ড্রয়িংরুমে কফি খেতে খেতে ওকে কাউন্সেলিং করা যাবে, এমনই কথা ছিল

  আরে বাবা! আমাকে কিছু বলতে দিবি তো! নাকি তুই একাই বলে যাবি! আমি কি ওকে বলেছি যে, ওর চিকিৎসা হবে, নাকি আমি ওকে ওয়েটিং রুমে নিয়ে গেছি নিজেই ভেবে বসে আছে, ওকে সাইকায়াট্রিস্ট দেখানো হবে তাই কিছুতেই দোতলায় উঠল না জোর করে এখানে ঢুকল

  মাই গড! দিস ইজ কেস অব রেট্রোসাইকোসিস

  সে আবার কী!

  ওই তুই বুঝবি না ডাক্তারি পরিভাষা যাক গে, শোন তোকে একা ডাকলাম, তোর স্ত্রীর সমস্যাটা ভালো করে শোনার জন্য ওর প্রেজেন্সে ঠিকঠাক বলতে পারবি না হয় তো! বল তো কেসটা কী!

  অরুময় সংক্ষেপে বলে অপালার রোজনামচা ওর সঙ্গে আজকের কথোপকথনের কিছু কিছু অংশ বিশেষ করে জোর দেয় এই কথাটাতে, 'অপু আমাকে কী বলে জানিস! বলে, আমি যখন জন্মেছি, বার্ধক্যের আবিলতা নিয়ে জন্মেছি, এখন ক্রমশ ছেলেমানুষ হচ্ছি জড়বুদ্ধি-সম্পন্ন থেকে চেতনার উন্মেষ ঘটছে শুধু আমি নয়, সমস্ত মানুষই নাকি তাই!' বল তো এগুলো পাগলামি নয়!  

  আচ্ছা! এবার তুই বল তো পড়াশুনো কী করেছে বা কী করে? আগে শুনলেও ভুলে গেছি

  ফিলজফি সাইকোলজিতে মাস্টার্স করেছে এখন একটা কলেজে পড়ায়

  হুম, বুঝলাম কিছু লেখালেখিও কি করে?

  হ্যাঁ, মাঝেসাঝে রাত জেগেও লেখে কিন্তু সেসব লেখা আমাকে কখনও পড়ায় না বা শোনায় না

  ঠিক আছে, বোঝা গেছে তুই কিচ্ছু চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে কি এখনও বাইরে বসে আছে, নাকি আমার ফ্ল্যাটে গেছে?

  গেছে ধমকে পাঠিয়েছি

  ধমকানোর দরকার ছিল না ঠিক আছে তুইও ওপরে যা আমি আর তিনজন পেসেন্ট দেখেই যাচ্ছি কফি খেতে খেতে কথা হবে

  কে বস! যো হুকুম! আমার বউটাকে ঠিক করে দে প্লিজ!

  কিছুক্ষণ পর চেম্বারের রুগী দেখা শেষ রে ডা. নির্বেদ দাশগুপ্ত দোতলায় নিজের ফ্ল্যাটে আসে ড্রয়িং কাম ডাইনিংয়ে বসে রয়েছে অরুময় অপালা নির্বেদের স্ত্রী কিচেনে কিছু একটা করতে ব্যস্ত নির্বেদ অপালার মুখোমুখি বসে বলেবলুন ম্যাডাম, কেমন আছেন?

  অপালা নির্বেদের হাসিভরা মুখের দিকে একঝলক  তাকিয়ে থেকে বলেনমস্কার ডাক্তারবাবু আমি অপালা বসু রায় আমি কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ম্যাডাম, আপনার  নয় আরআপনিনয়, ‘অপালাবলে ডাকলেই হবে বন্ধুকেতুইআর তার স্ত্রীকেআপনিবললে আপনার বন্ধুর ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স গ্রো করতে পারে

  নির্বেদ হো হো করে হেসে ওঠে হাসি থামিয়ে বলে ঠিক আছেতুমিবলতে পারি শর্ত একটাই, আমাকেওতুমিবলে অ্যাড্রেস করতে হবে

  অপালা মৃদু হাসে দেখুন, আপনি-তুমি দিয়ে কোনও ঘনিষ্ঠতা বা দূরত্ব প্রমাণিত হয় না মানসিক দূরত্ব কমলে স্বতস্ফূর্ত্তভাবেই কখন তুমি-তে চলে আসে বিশেষত আপনার যখন মানব-মন নিয়েই কারবার, তখন মনের অন্দরমহলে ঢুকে পড়তে বেশি সময় লাগবে না

  বাঃ! অপালা, তুমি তো খুব সুন্দর করে কথা বল কী রে অরুময়! পাঁচবছর হল বিয়ে করেছিস, এতদিন ওর সঙ্গে আলাপ করাসনি কেন?

  অরুময় হাত কচলায়তোকে কয়েকবারই ইনভাইট করেছি, তুই যাসনি আমি কী করতে পারি বল

  ঠিক আছে, ওর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল এবার ইনভাইট করলে যাবোই, কথা দিচ্ছি

  এর মধ্যে শিঞ্জিনি কিচেন থেকে ট্রে-তে সাজানো কফিপট, কাপ কিছু স্ন্যাকস নিয়ে টি-টেবিলে রেখে অপালার পাশে বসেছে অপালা শিঞ্জিনির দিকে চোখ ঠেরে বলে ওঠেব্যাপারটা ঠিক ভালো ঠেকছে না, তাই না? আমার সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর একদম কথা দিয়ে ফেলা...! কথা শেষ না করেই অপালা খুক খুক করে হেসে ওঠে তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলে ওঠে ডাক্তারবাবু! গৌরচন্দ্রিকা তো হল, এবার পালা শুরু করুন!

  মানে?

  মানে, আপনার বন্ধু তো আমার মাথার গন্ডগোলের চিকিৎসার জন্য আপনার কাছে আমাকে দেখাতে নিয়ে এসেছে এবার ডায়াগনসিস শুরু করুন, তার পর তো রেমিডির ব্যবস্থা

  নির্বেদ স্থির চোখে অপালার দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে তারপর বলে ওঠেছাড় তো ওসব কথা বল অরু, তোর সাংবাদিকতা কেমন চলছে?

  আর বলিস না! খুব টাফ সিচ্যুয়েশন এখন আবার একটা ডেঞ্জারাস অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছে আজ সারাদিন যা গেল!

  কিসের অ্যাসাইনমেন্ট?

  প্রতিবন্ধীদের জীবন-যন্ত্রণানিয়ে একটা ধারাবাহিক আর্টিকেল শুরু হয়েছে আমাদের কাগজে ওটার জন্য প্রতিবন্ধীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া, লেখাটা তৈরি করার দায়িত্ব আমার ওপর তাছাড়া কাগজে হয়তো পড়েছিস, প্রতিবন্ধীদের একটা হোমের কেচ্ছার অনুসন্ধান নিয়ে আমাদের কাগজ উঠেপড়ে লেগেছে ইটস ভেরি ডেঞ্জারাস!

  ভালো তো! ডেঞ্জারাস কেন হবে!

 ডেঞ্জারাস একারণেই যেকেঁচো খুঁড়তে সাপবেরিয়ে পড়ার চান্স আছে গতকাল, শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে লেখাটা আজ সকালে তো কেলেংকারিয়াস কান্ড! একজন মহিলা ছাদ থেকে ঝাঁপ মেরে সুইসাইড আগামীকালের কাগজে পাবি রাতে টিভিতে দশটার খবরটা দেখিস!

  হ্যাঁ, গতকালকের কাগজে জীবন-যন্ত্রণা টাইপের কিছু একটা কিছু দেখলাম যেন, তবে...

  কাগজটা পড়িসনি, এই তো?

  না, পড়ার সময় পাইনি তবে তোর লেখা যখন, ঠিক পড়ে নেব এমনিতেই আমি পড়তাম কেন না, কাল একজন পেসেন্টের ওয়াইফ ফোন করেছিলেন পেসেন্ট পেশায় অধ্যাপক কি সাম... নাথ কিসব মানবিক মূল্যবোধ-টোধের অধঃপতন নিয়ে রিসার্চ-টিসার্চ করেন ওঁর স্ত্রী ফোনে বললেন, ভদ্রলোক কালকের, মানে শুক্রবারের কাগজে ওইজীবন-যন্ত্রণাবিষয়ক লেখা পড়ে নাকি ভয়ংকর ফিউরিয়াস হয়ে গিয়েছিলেন উল্টোপাল্টা বকছিলেন এমনকি ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে অসুস্থও হয়ে পড়েছিলেন আগামীকাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছি

  বাঃ! এটাই তো অ্যাচিভমেন্ট! লেখাটা অন্তত একজনকে খ্যাপাতে পেরেছে এরকম আরও কিছু মানুষ যদি... তুই ইমিডিয়েট আর্টিকেলটা পরে জানাস তো!

  হ্যাঁ, নিশ্চয় জানাবো

  লেখাটার জন্য ব্যাপক খাটতে হয়েছে, বুঝলি তবে এক্সপিরিয়েন্সও হচ্ছে তুই ভাবতে পারবি না, কী ক্রিটিক্যাল সিচ্যুয়েশনে রয়েছেহোম'-এর মেয়েগুলো কীভাবে যে ওরা ইউজড হচ্ছে! সেই মধ্যযুগের নারীদের মতো...! ভালো কথা, তোকে একটা ব্যাপারে রিকোয়েস্ট করবো, রাখবি?

  ব্যাপারটা কী, না জানলে বলি কী করে!

  কাল বিকেলে তোর চেম্বার আছে?

  এমনিতে সানডে ক্লোজড কিন্তু ওই অধ্যাপক ভদ্রলোকের স্ত্রী- রবিবার ছাড়া সময় হচ্ছে না বলে কাল সন্ধেয় আসতে বলেছি ব্যাপারটা কী বল তো আগে

  বলছি যে, তুই তো ডাক্তার, মানে বুদ্ধিজীবী ওই প্রতিবন্ধী হোমের কেচ্ছার প্রতিবাদে একটা বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন দানা বাঁধছে ওটাকে একটু সাপোর্ট করিস

  আমি বাবা আন্দোলন-টান্দোলনে নেই আমার কোথাও যাওয়ার সময়ও নেই

  তোকে কোথাও যেতে হবে না তেমন প্রয়োজন হলে আমি কাল বিকেলে তোর কাছে একবার আসবো সঙ্গে টিভি মিডিয়াও আসতে পারে একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে তোর একটা বাইট নেবে টিভি মিডিয়া

  ঠিক আছে, এখুনি কথা দিচ্ছি না আমার কী সিডিউল আছে দেখে তোকে জানাবো ফোন করিস

  শিঞ্জিনি কফির কাপ বাড়ায় অরুময়ের দিকেনিন,  কফি খান আর ওসব বাইট-ফাইটের কথা ছাড়ুন তো! কোথায় সবাই মিলে জমিয়ে আড্ডা মারব, তা নয়! ওরা পড়লেন আন্দোলন নিয়ে!

  অপালা বলে ওঠেঠিকই বলেছেন আপনি আমরা ফরনাথিং বোরড হচ্ছি

  অরুময় কফির কাপে চুমুক দেয়ঠিক আছে শিঞ্জিনি, আমরা অন্য কথায় যাচ্ছি আমি শুধু একটা অনুরোধ করব, তুমি ওই লেখাটা পড়ে মতামত জানিও মহিলা-প্রতিবন্ধীদের নিয়েই বেশিরভাগ পর্ব বেরোবে একজন শিক্ষিতা মহিলা-পাঠক হিসাবে তোমার কমেন্টসটা আমাকে হেল্প করবে

  আপনার ঘরেই তো উচ্চ শিক্ষিতা, সমাজ-সচেতন একজন মহিলা রয়েছেন তাঁর মতামতটাকে গুরুত্ব দেবেন তো!

  অপালা শ্লেষের সঙ্গে বলে ওঠেআমার কথার আবার গুরুত্ব! আমি হলাম একজন মানসিক রোগী অন্তত তাই ভাবে সেজন্যই আমাকে আপনার হাজব্যান্ডের কাছে নিয়ে এসেছে এখন আগডুম-বাগডুম গপ্প ফেঁদে কিছুটা আড্ডার মেজাজ এনে আসল জায়গায় ঢুকে পড়বে

 কথাটা বলে অপালা আড়চোখে নির্বেদের দিকে তাকায় নির্বেদ সোজাসুজি অপালার চোখে চোখ রাখেআপনি... মানে তুমি একদম ঠিক বলেছ ইউ আর টু মাচ ক্লেভার তাই তোমার সঙ্গেই কিছু কথা বলতে চাই

স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন

বলছিলাম, প্রথমে কেস হিস্ট্রি, যা অরুময়ের কাছে শুনে নিয়েছি পরে অবজার্ভেশন, সেটা চলছে এর পর ক্রশ কোয়েশ্চেন, তারপর কনক্লুশন এসব মিলিয়ে ডায়াগনোসিস তারপর তো প্রেসক্রিপশন বা রিহ্যাবিলিটেশন বাট ফর ইওর কাইন্ড ইনফর্মেশন, আমি আজ এসবের মধ্যে যাচ্ছিই না এখন আমি ডাক্তার নই, তোমার হাজব্যান্ডের বন্ধু আজ তোমার সঙ্গে স্রেফ গল্প করব

অপালা একটা পটাটো-চিপস মুখে পোরে ঠিক আছে, আমার সঙ্গে যখন গল্প করতে চান, তখন অন্য একটা ঘরে আপনি আর আমি যাই সেখানে অন্য কেউ থাকবে না আমরা দুজনে মন খুলে গল্প করব আপনার আপত্তি নেই তো?

নির্বেদ ঘাড় ঘুরিয়ে অরুময় শিঞ্জিনির দিকে তাকায়

   অপালা বলে কী হল? ওদের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন কেন? আপনি আর আমি গল্প করব, সেখানে ওদের তো প্রয়োজন নেই। আমাদের গল্পটা ওদের শোনাতে চাইছি না, তাই...

  নির্বেদ ইতস্তত রে বলেহ্যাঁ, তা ঠিক, কিন্তু...

  ট্রে-তে রাখা কফির কাপ টেনে নেয় অপালা, অর্থাৎ এটা ধরে নিতে পারি যে, আমার মতো একজন সুন্দরী বন্ধু-পত্নীর সঙ্গে গল্প করার ইচ্ছা আপনার আছে, যা একটু আগে প্রকাশ করেছেন অথচ আপনি তা করার সাহস পাচ্ছেন না সেটা আপনার স্ত্রীর ভয়েই হোক, কিংবা আমার স্বামীর ভয়েই হোক, তাই তো?

  শিঞ্জিনি মুচকি হেসে ড্রয়িংরুম লাগোয়া কিচেনে যায় নির্বেদ কফির কাপে চুমুক দেয়না, ঠিক ভয়ে নয়, তবে সোশ্যাল এটিকেসি মেইনটেন করা উচিত, তাই...

  অপালা কফিতে চিনি মেশায়কেন? একজন নারীর সঙ্গে একজন পুরুষের একান্তে গল্প করাটা কি এটিকেসির বাইরে লে আপনার মনে হয়?  

  নির্বেদ হাতে একটা বিস্কুট তুলে নেয়না, সেটা হয় তো নয় কিন্তু অন্যরা ইল-সেন্স- নিতে পারে

  অপালা চামচে কফি তুলে চুমুক দিয়ে মিষ্টতার পরিমান বোঝার চেষ্টা করেঅন্যরা যে সেন্স- নিক না কেন, আপনার আমার কোনও ইল-বিহেভ না থাকলেই তো হল অন্যের ভাবনাকে এত গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি? তাহলে ধরে নিতে হয়, আপনি এখনও ঠিক স্বাধীন হননি

  শিঞ্জিনি কিচেনে চিংড়ির বড়া ভাজতে ভাজতে খুক খুক করে ইচ্ছাকৃত কাশি দেয় অরুময় বিরক্তির সঙ্গে বলে ওঠেনির্বেদ, আমি বুঝতে পারছি না তুই ডাক্তার, না ! ক্রশ কোয়েশ্চেন তো তোর করার কথা, অথচ তোকে...!

  নির্বেদ হাতের ইশারায় অরুময়কে থামতে বলে মুখের বিস্কুট পেটে চালান করে বলেদেখ অপালা, এখানে স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হল সামাজিকতার সমাজ আমাকে কতখানি পারমিট করবে তার ওপরেই নির্ভর করে

  অপালা শব্দ করে ট্রে-তে চামচ রাখেআর এখানেই আমার আপত্তি সমাজ তো মানুষকে তৈরি করেনি, মানুষই সমাজ তৈরি করেছে তাহলে আমরা কেন সমাজের দাস হয়ে যাবো? আমার যদি আপনার সঙ্গে একান্তে কথা বলতে ভালো লাগে, আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারব না? তাতে সমাজের কী ক্ষতি হবে?

  নির্বেদের আস্বস্তসূচক গলাতাতে সমাজের ক্ষতি হয়তো হবে না, কিন্তু তোমার বা আমার পরিবারের ক্ষতি হতে পারে শিঞ্জিনি বা অরুময় আমাদেরকে ভুল বুঝতে পারে

  তাই যদি বোঝে, তাহলে ধরে নেওয়া যায় যে আমাদের প্রতি ওদের বিশ্বাসের অভাব আর বিশ্বাস যদি না থাকে, প্রেম ব্যাপারটাও থাকে না বিশ্বাসের ভিত্তির উপরেই তো প্রেমের সৌধ গড়ে ওঠে, এটা তো মানেন!

  নির্বেদ কোনও কথা বলে না, স্থির চোখে অপালার অভিব্যক্তি দেখতে থাকে অপালা বলে চলে, তাহলে, কোনও দুটো নর-নারীর মধ্যে যদি প্রেম না থাকে, তবুও দুজনকে বিবাহ-বন্ধনের দোহাই দিয়ে একসঙ্গে, এক ছাদের তলায়, এক বিছানায় কাটাতে হবে সারা জীবন? ইটস হরিবল!

  নির্বেদ ধীরে সুস্থে কফির কাপে চুমুক দেয় তারপর গাঢ় গলায় বলেঅপালা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি, তোমাদের দুজনের মধ্যে কি কোনও ইগো প্রবলেম আছে বা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে? মানে, এনি মিস-আন্ডাস্ট্যান্ডিং? যাতে একে অপরকে...?

  অপালা ফিক করে হেসে ওঠে সাংবাদিক, প্রায় রোজই কাগজে নাম বেরোয় ওর থাকলে থাকতে পারে আমার কোনও ইগো নেই আর নো মিস-আন্ডাস্ট্যান্ডিং তবে, কোনও কোনও ব্যাপারে মতের অমিল তো হতেই পারে যেমন আমার সন্তান না থাকায় কখনো-সখনো ওকে সন্তানের মতো আদর করতে চাই, এটা ওর পছন্দ নয় তার জন্য প্রেমের ঘাটতি হওয়া কিংবা সেপারেশন-ডিভোর্সের কোনও ব্যাপারই নেই তাছাড়া আমি আমাদের কথা বলছি না, ইন জেনারেল কোনও কাপলের কথা বলছি আসলে, সমস্যাটা কি জানেন, আপনি আপনার বন্ধুর কথায় প্রথম থেকেই আমাকে একজন মানসিক রোগী হিসেবে ট্রিট করছেন তাই আপনার ভাবনা-চিন্তার ব্যাপ্তি নেই কেমন সীমাবদ্ধ জায়গায় ভাবনাটা ঘোরা ফেরা করছে আপনি আমাদের দুজনের মধ্যে কোনও ফাটল কিংবা আমার মেন্টাল ডিস-অর্ডার খোঁজার চেষ্টা করছেন অর্থাৎ আপনিও এখনো মানসিকভাবে বার্ধক্য থেকে কৈশোরে পৌঁছতে পারেননি

  অরুময় বলে ওঠেওই শুরু হল

  অপালা বলেপাগলামি, তাই তো! ডাক্তারবাবু, আপনি তো পাগলের ডাক্তার, বলুন তো এর মধ্যে পাগলামির কী দেখলেন?

  নির্বেদ হাত থেকে কফির কাপ নামায়আসলে, আমি তোমার কথাটাই ঠিক বুঝতে পারিনি

  আপনার বন্ধুকে বলুন, বুঝিয়ে দেবে তো বুঝেসুঝে আমাকে পাগল ঠাউরেছে, তাই আপনার কাছে চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছে

  অরুময় বিরক্ত হয়ে কিছু বলতে গেলে নির্বেদ ইশারায় ওকে থামিয়ে বলেঅপালা, তুমিই একটু বুঝিয়ে বল না আমরা তো জানি, মানুষ, শুধু মানুষ কেন, সমস্ত প্রাণীকুল কৈশোর থেকে যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যের দিকে এগোয় কিন্তু তুমি বলছ বার্ধক্য থেকে কৈশোর...!

  অপালা এক চুমুকে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফি শেষ করে কাপ নামিয়ে রাখেআমি ভেবেছিলাম, আপনি হয় তো বুঝতে পারবেন আপনার চেম্বারে দেখলাম, ফ্রয়েড, কান্ট, হেগেলের ছবি ঝোলানো আছে অথচ ওদের লেখাগুলো পড়নেনি! এনিওয়ে, আমি আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি আপনি কলমের চারাগাছ দেখেছেন?

  হ্যাঁ, কলম-করা আমের চারা, লিচুর চারা পাওয়া যায় শুনেছি আমাদের ছাদের টবে একটা কলমের লেবুর চারাগাছ আছে শিঞ্জু কিনেছে ওটাতে ফুলও এসেছে, এবার লেবু ধরবে

  অপালা বলে ওঠে খুব ভালো তাহলে ওই লেবুগাছটাকে এখন কিশোরী বলা যায় আর কিছুদিন পরেই যুবতী হবে এবং মা হয়ে যাবে

  নির্বেদ মজা পায়হ্যাঁ, লেবুকে সন্তান ভাবলে গাছটা মা

  -রাইট আপনি কি জানেন কলম-চারা কীভাবে করা হয়?

  হ্যাঁ, শুনেছি ভালো জাতের বড় গাছের ডালের কিছুটা অংশের ছাল চেঁছে তুলে দিয়ে কীসব দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয় পরে ওই ডালটা কেটে নিলেই চারা

  কাছাকাছি গেছেন ওই ডালের কিছুটা অংশের ছাল চেঁছে ওখানে গোবর-মাটি ইত্যাদির প্রলেপ দিয়ে ন্যাকড়া বা চট জড়িয়ে ভিজিয়ে রাখতে হয় কিছুদিন পর সে জায়গাতে শিকড় গজায় শিকড় বড় হলে শিকড়সহ ডালটা বড় গাছ থেকে কেটে নেওয়া হয় সেটাই কলম চারা

  নির্বেদের বিস্ময়সূচক গলাসে না হয় বুঝলাম কিন্তু এর সঙ্গে প্রাণীকূলেরবার্ধক্য থেকে শৈশব-কৈশোরে পৌঁছনোকথাটার কী সম্পর্ক?

  অপালা মিটিমিটি হাসেসেটাই তো বলব এবার ওই কলমের চারাগাছটা যেমন এক বৃদ্ধ বৃক্ষের খন্ডিত অংশ, সেরকম প্রতিটি প্রাণীর আত্মাই পরমাত্মার খন্ডিত অংশ ভিজে চটের মধ্যে শিকড় গজানো আর জরায়ুর জলের মধ্যে ভ্রুণের বৃদ্ধি একই ব্যাপার পরমাত্মা আদি অকৃত্রিম তাই প্রতিটি প্রাণের আত্মা বা প্রাণশক্তি আদি অর্থাৎ বৃদ্ধ জানেন তো, শক্তি অবিনশ্বর, শুধু রূপান্তরিত হয় জন্মলগ্নে প্রাণশক্তি বৃদ্ধের মতোই জড়বুদ্ধি সম্পন্ন  থাকে তারপর শৈশব-কৈশোর-যৌবন পেরিয়ে বৃদ্ধ হয়ে, অবশেষে নশ্বর দেহ ত্যাগ করে পরমাত্মায় মিশে যায় যেমন নদী সাগরে গিয়ে মেশে, তেমনি দেহ-নির্গত প্রাণশক্তি আবার মহাপ্রাণশক্তি-প্রবাহে গেয়ে মেশে আমি এই প্রাণশক্তির কথা বলছি নশ্বর দেহর কথা বলছি না

  নির্বেদ সোল্লাসে বলে ওঠেবাঃ! অপালা বাঃ! অসাধারণ দর্শন! খুব সুন্দরভাবে দর্শনটাকে বুঝিয়েও দিলে তুমি ব্রিলিয়ান্ট অরুময়টা একটা গাধা, কিস্যু বোঝে না, তাই তোমাকে পাগল ভাবে তখন বলছিলাম না, আজ এক দম্পতি কালকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলেন ফোনে কথা বলে বুঝলাম, ভদ্রমহিলা তাঁর অধ্যাপক স্বামীকে মানসিক রোগী ভাবেন এমনও হতে পারে, হয়তো ভদ্রলোক সম্পূর্ণ সুস্থ শুধু চেতনার স্তরটা ভদ্রমহিলার চেয়ে অনেক ওপরে তাই ভদ্রলোককে উনি পাগল ভাবেন

  অপালা আড়চোখে অরুময়ের দিকে তাকিয়ে বলেউঁহু উঁহু, আমার হাজব্যান্ডকে 'গাধা' বলবেন না। তাতে আমারও প্রেস্টিজ হ্যাম্পারড হবে। আয়্যাম নট গাধার বউ!  

  একথায় সকলে হেসে ওঠে। অপালা বলে এনিওয়ে, যে কথা বলছিলাম, তাহলে আপনি বলছেন যে, আমি পাগল নই!

  নির্বেদ অপালার চোখের আড়ালে অরুময়কে চোখের ভাষায় আস্বস্ত করে অপালাকে বলেমোটেও না আসলে তুমি দর্শনের অধ্যাপিকা তোমার চিন্তা-ভাবনাগুলো অনেকের থেকে আলাদা যারা সেটা বুঝবে না, তারা তোমাকে মনোরোগী ভাববে তবে, তোমাকে একটা কথা বলব অপালা, তুমি যদি জার্নালিজম-এর ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের দর্শন বোঝাতে যাও, তারা তো বুঝবে না তোমার দর্শনের কথা তাদেরকে বলাও উচিত হবে না তেমনি যারা ভাবনায় ভাবিত হতে পারবে না, তাদের কাছে কথা না বলাই ভাল তাই নয় কি?

  অপালা বলেহ্যাঁ, তা ঠিক, কিন্তু আমি তো আমার বাড়ির কাজের লোকের কাছে বলছি না আমি বলছি একজন বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন শিক্ষিত মানুষের কাছে, যিনি একজন জার্নালিস্ট  

  বুঝলাম, যে অরুময় বোধ-বুদ্ধিসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না, জার্নালিজম- একশো পেলেও দর্শনে বা বিজ্ঞানে গোল্লা পাবে তোমার এটা তো দর্শনের তত্ত্ব ওর মাথায় দর্শন ঢুকবে না, বিজ্ঞানও ঢুকবে না বিজ্ঞানের কাজ হল, পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দর্শনের তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করা যেমন টলেমীর যুগে মানুষ জানত পৃথিবী স্থির, সূর্য তাকে প্রদক্ষিণ করে পরে কোপারনিকাস বললেন, না, সূর্য স্থির, পৃথিবী তাকে প্রদক্ষিণ করে এটা তত্ত্ব সে তত্ত্বকে পরে প্রমাণ করেন গ্যালিলিও তাই বলছি অপালা, তোমার ভাবনাটা এখন তো তত্ত্বের পর্যায়ে ওটা ভবিষ্যতে প্রমাণিত হবে উল্টো কথা বলায় কোপারনিকাসের উপর তখনকার মানুষ খেপে উঠেছিল কেউ কেউ ওকে পাগল বলেছিল তেমনি তোমাকেও ... তা নিয়ে বিচলিত হলে কি হয়! বরং তোমার তত্ত্বগুলোকে তুমি সুন্দর ভাবে থিসিসের আকারে লিখি ফেলো এমনকি তোমার অন্যান্য যে ভাবনা, যেমন গাছেদের মহানতা, তাদের সুখ-দুঃখ-অভিমান-প্রেম-ভালোবাসা, যা তুমি অনুভব কর, সেসব তুমি লিখে ফেলো এবং তা গোপন রাখ থিসিস কখনও আগে থেকে অন্য কারও কাছে ডিসক্লোজ করতে নেই

  অপালা আবেগে নির্বেদের হাত চেপে ধরে থ্যাংক ইউ ডক্টর থ্যাংক ইউ এরজন্য আমি অবশ্য অরুময়কেও ধন্যবাদ দেবো কেন না, আমাকে তোমার কাছে, স্যরি আপনার কাছে...!

  না না, ‘তোমার কাছেশুনতেই ভালো লাগছে

  ইটস কে তোমার কাছে নিয়ে আসার জন্য

  এমন সময় শিঞ্জিনি প্লেটে গরম গরম চিংড়ির বড়া নিয়ে এসে টেবিলে নামায় তারপর হেসে বলেভালো লাগবে খাও পরে আর এক-রাউন্ড কফি দেবো তার আগে একটা কথা, অপালা আগে আসায় ওর সঙ্গে গল্প করেছি কিন্তু অরুময়বাবু, আপনার সঙ্গে গল্পই করা হল না ওদের গুরুগম্ভীর আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে লাভ নেই আপনি বরং আমার সঙ্গে পাশের ঘরে চলুন আপনার সঙ্গে মন খুলে গল্প করতে ইচ্ছে করছে অপালা, তোমার নিশ্চয় এতে কোনও আপত্তি নেই?

  অপালা ভ্রু উচিঁয়ে শিঞ্জিনির দিকে তাকায় নির্বেদ চোখের ইশারায় অরুময়কে শিঞ্জিনির সঙ্গে যেতে বলে অরুময় চেয়ার ছেড়ে ওঠে শিঞ্জিনি স্বগতোক্তি করার ঢঙে বলতে থাকে, ছেলেটা মিশন থেকে ছাড়া পায়নি সপ্তাহে বাড়ি এল না আমার মাতৃভাবটা হঠাৎ প্রকট হয়েছে নির্বেদকে ছেলের মতো আদর করতে গেলে রাগ করে তাই ... অরুময়, চলুন আমরা পাশের ঘরে যাই

  অপালা খেপে ওঠেশিঞ্জিনি আপনি আমাকে পাগল ভাবেন, না বোকা ভাবেন? ওকে আপনি ছেলের মতো আদর করবেন?

  হ্যাঁ, তুমিও তো কর বললে!

  অপালা খেপে ওঠেআমি করি, আমার সন্তান নেই বলে কিন্তু আপনার তো সন্তান আছে ওই আধবুড়োটার মধ্যে সন্তানকে খুঁজে পাবেন কী করে?

 যে ভাবে তুমি পাও তবে তোমার যদি আপত্তি থাকে তবে থাক, বসুন অরুময়বাবু

নির্বেদ গাঢ় গলায় বলেশান্ত হও অপালা, আসলে কি জান! সমাজকে মানুষ তৈরি করেছে ঠিকই কিন্তু সেটা মানুষের হিত উপকারের কথা চিন্তা করেই তাই সমাজের পরিপন্থী কিছু করতে গেলে হয়তো প্রগতিশীল হওয়া যায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সমাজের ক্ষতি অপকার করা হয় কেন না, মন-মর্জির কথা তো কেউ বলতে পারে না কখন যে মনে কোন ভাবের উদয় হবে কে জানে! তাই সাবধানতা, তাই সমাজ, তাই নিয়ম-নিগড়ের ঘেরাটোপ এসব সমাজ সংসারকে সুস্থ রাখার  জন্যই

অপালা কিছু বলতে যায় তার আগে শিঞ্জিনি বলে ওঠেঅপালার কোনও দোষ নেই কিন্তু অরুময়বাবু, আপনার বিরুদ্ধে আমার ঘোরতর অভিযোগ আছে আছে পাঁচবছর বিয়ে হয়েছে, এখনও অবধি অপালাকে একটা সন্তান উপহার দিতে পারলেন না? তাহলে আর আপনাকে...

অরুময় থতমত খেয়ে বলেকী করব! ওর স্কুল, আমার খবর-কাগজের অফিস, তার ফাঁকে সংসার এসব সামলিয়ে বাচ্চার ধকল নেওয়া অসুবিধা লে...

এবার শিঞ্জিনি নির্বেদকে বলেআসলে, আমার কী মনে হয় জান, অপালা খুবই সংবেদনশীল খুব ভালো মেয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ বরং অরুময়েরই চিকিৎসার দরকার দর্শন যেমন তোমার বিজ্ঞানের ওপরে, আর বিজ্ঞান জার্নালিজম-এরও ওপরে তেমনি অপালার দর্শন অরুময়ের জার্নালিজমকে ডমিনেট করছে তুমি বরং বিজ্ঞানসম্মত কাউন্সেলিং করে জার্নালিস্টের পোটেনসিয়ালিটি বাড়িয়ে দাও

শিঞ্জিনির কথা শুনে নির্বেদ হো হো করে হেসে ওঠে অরুময় মাথা নিচু করে বসে থাকে অপালা মৃদু গলায় বলেআমিও তো সেটা চাই আমাদের ফিলজফির স্যার বলতেন, প্রকৃতি পুরুষ দ্বারা শাসিত হয়, সেটাই স্বাভাবিক আকাশ তো পুরুষই, বসুন্ধরা তো নারী

শিঞ্জিনি সংযোজন করেআর তাদের সন্তান হল চাঁদ অরুময়বাবু, খুব শিগগির আপনি অপালাকে একটা চাঁদ উপহার দিন তবে এইমুহূর্তে চেষ্টা নয়, পরে

সকলে হেসে ওঠে শিঞ্জিনি প্লেট বাড়িয়ে বলেএখন চিংড়ির বড়া খান ঠান্ডা হয়ে গেলে চিংড়ির বড়া বলুন আর জীবনীশক্তি বলুন, কোনোকিছুই ভালো লাগে না

 হঠাৎ অপালা একটা বড়া তুলে নিয়ে অরুময়ের মুখের সামনে ধরে বলেখেয়ে নাও সোনা, দুষ্টুমি করে না

শিঞ্জিনি মিটিমিটি হাসে আদরটা সন্তানকে না স্বামীকে?

অপালা হেসে বলে, আদরটা বন্ধুকে, কারণ আরও দুজন বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল

নির্বেদ বলে ওঠেআমার ফিজ কিন্তু পাঁচশো টাকা, সেটা চাইছি না তার বিনিময়ে সামনের রবিবার তোমার বাড়িতে আমার আর শিঞ্জিনির নেমন্তন্ন আর তোমরাকলমটা করে ফেল তাড়াতাড়ি শক্তির অপচয় না করে তার রূপান্তর প্রবাহ দরকার

অরুময় হঠাৎ কেমন চুপচাপ হয়ে যায় তারপর আচমকা একটা প্রশ্ন করে বসেআচ্ছা নির্বেদ, মেন্টালি হ্যান্ডিক্যাপড কি তথাকথিত প্রতিবন্ধী তালিকায় পড়ে?

হঠাৎ এমন প্রশ্ন?

না, মানে আমার পরের লেখাটায় কাজে লাগবে তাই... বল না পরে কি না!

অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কখনো-সখনো ধরে নিতে হয় আজ নয়, একদিন আইডল-টাইম দেখে আমার বাড়িতে আয় সেদিন বিষয়ে আলোচনা হবে

আমি খুব শিগগির আসব, সম্ভবত কালই এর আগে কিন্তু তুই আমার কালকের, আজকের আর আগামীকাল যে লেখাটা বেরোবে, তিনটেই পড়ে নিস আর বিকেলটা আমার জন্য রাখ না! আমি টিভি রিপোর্টার নিয়ে আসব শিঞ্জিনি, আমার রিকোয়েস্ট তুমিও কাগজে আমারকলামপড়বে তোমার মতামত এবং প্র্যাকটিক্যালি তোমাদেরকে আমার ভীষণ দরকার

 নির্বেদ শিঞ্জিনির প্রশ্নভরা চোখ অরুময়ের দিকে

 

 

পনেরো

 

ডা. নির্বেদ দাশগুপ্তর ফ্ল্যাট থেকে ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে টা বেজে গেল পুরো সন্ধেটাই নষ্ট হল নির্বেদ কোনো প্রেসক্রিপশন করল না, কাউন্সেলিং-য়ের কথাও বলল না বরং ওকেই খানিক জ্ঞান দিয়ে দিল অপুই যেন আপারহ্যান্ড পেয়ে গেল ফেরার সময় অপু কেমন গুম মেরে ছিল একটা কথাও বলল না নিজে ভাবছিল, কাজের কথা, প্রতিবন্ধী-হোমের কথা বাড়ি ফিরে ফ্রেস হয়ে ডিনারে বসতেই দশটা বেজে গেল  

  খেতে খেতে টিভি অন করে অরুময় রাত দশটার সংবাদ প্রবাহ দেখতে শুরু করে খবর দেখতে দেখতে ওর মন চঞ্চল হয়ে ওঠে অরূপদাকে বলা সত্ত্বেও নিউজ-ক্লিপিংস- ওর অংশগুলো বাদ দেয়নি মেয়েগুলোকে সত্যি কথা বলার সাহস জোগানোর জন্য তখন ক্যামেরার সামনে একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল প্রথমত চীফ এডিটর তাতিয়েছিল ফুটেজ খাওয়া সত্যি খবর বের করে আনার জন্য দ্বিতীয়ত নিরুপমার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা বা সহমর্মিতা ভেতরে ভেতরে কাজ করছিল তাই তখন...

  পরক্ষণেই ওর মনে হয়েছে সত্যিটা বের করার জন্য একজন সাংবাদিক ভোকাল টনিক দিতেই পারে সঠিক তথ্য প্রকাশ করানোর জন্য প্ররোচিত করতেই পারে এটাই তো সাংবাদিকতা এরকম একটা দোলাচলের মধ্যে থাকার সময় অপালা আরও একটু বেশি করে দুলিয়ে দিল সংবাদ প্রবাহ দেখতে দেখতে বলে উঠলসাংবাদিক না হয়ে, রাজনৈতিক নেতা হলেও তুমি নাম করতে

  অরুময় জিজ্ঞাসা ভরা চোখে ওর দিকে তাকাতে বলেপ্রতিবন্ধী হোমে ক্যামেরার সামনে যা ভাষণ দিচ্ছিলে!

  অরুময় অপালাকে কাউন্টার করার জন্য বলেতুমিও লেকচারার না হয়ে -ইয়ার হলে নাম করতে সন্ধেবেলায় ডা. নির্বেদ দাশগুপ্তকে যা ঘোল খাইয়ে ছাড়লে!

  অপালা মাছের কাঁটা চিবোয়না, আমি মোটেও ওঁকে অ্যাটাক করিনি তবে ইচ্ছে করলে করতে পারতাম তোমার বন্ধু তো তাই...!

  অরুময় রুটিতে চাটনি মাখায়কেন? তুমিও তো বললে, তুমি একজন ভালো বন্ধু পেলে!

  হ্যাঁ, সে তো পরে এমনিতে লোকটা খারাপ নয় তবে জানো, ওই ডাক্তারের বউ শিঞ্জিনি না কী যেন নাম, ওকে আমার মোটেও ভালো লাগেনি

  কেন? তোমাকে কাউন্টার করেছে বলে?

  না, সেটা কারণ নয় ডাক্তারও তো প্রশ্ন করেছে কিন্তু শিঞ্জিনিকে মনে হল একটু ওপর-চালাক গোছের ডেপথ কম, কিন্তু ওভারস্মার্ট হতে চায় শেষে আবার কায়দা করে বলছিল, ‘তোমরাকলমটা করে ফেলো তাড়াতাড়িনেকী! সব জেনেশুনে ন্যাকামি!

  অপালা, ওভাবে বলো না তো আর আমাদের সমস্যার কথা জানে না

  না জানার কী আছে! তোমার বন্ধু কি ওকে আগে কিছু বলেনি ভাবছ! তবে এটা ঠিক যে, আমাদের সমস্যা ছিল, এখন আর নেই জানো, আজ সকালে আমি প্রেগ-টেস্ট পেপার দিয়ে টেস্ট করেছি প্রেগ-কালার পজিটিভ

  এটা একটা আনন্দের খবর অপু

  আমার কাছে আনন্দের, কিন্তু তোমার কাছে দুঃখের

  কেন?

  কারণ, এখন আমি মোটেও তোমাকে আমার কাছে ঘেঁষতে দেব না

  সে আবার কী! সে তো শেষ আশিদিন মনে নেই, আগে যখন ডাক্তারকে দেখানো হয়েছিল, তখন ডাক্তার বলেছিল দুশো দিন অবধি...  

  না অরু! কোনো রিস্ক নেব না পাঁচটা বছর আমরা মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছি এবার যদি সে যন্ত্রণা দূর হয় একটু কষ্টই না হয় করলে আমাদের ভবিষ্যতের আনন্দের কথা ভেবে

  অরু কিছু বলতে যাচ্ছিল আবার ফোন আসেআমি কি সাংবাদিক অরুময় বসুর সঙ্গে কথা বলছি?

  হ্যাঁ বলছি

  আমি প্রফেসর অনিকেত নাথ সকালের দিকে আপনি আপনার কার্ডটা ...

  হ্যাঁ হ্যাঁ, গুড ইভনিং স্যার বলুন!

  বলছি যে, এই মাত্র খবরে দেখলাম, প্রতিবন্ধী হোমের ব্যাপারটা ভালোই কভার করেছে আমার পরিচিতজনের কাছ থেকে আমার কাছে কয়েকটা ফোনও এল বেশিরভাগই উৎসাহব্যাঞ্জক আন্দোলনের পক্ষে তারা আন্দোলনে শামিল হতে চায় কিন্তু এই মিনিট দুয়েক আগে একটা ফোন এল যেটাতে আমাকে রীতিমতো হুমকি দেওয়া হল, ‘মিস্টার অনিকেত নাথ! গবেষণা করছেন করুন, এসব সমাজসেবা-টেবা করতে যাবেন না কাজ প্রশাসনের, আপনার নয় বেশি এগোলে এর ফল ভালো হবে না’... সে কারণেই আপনাকে ফোন করলাম

  তাই নাকি! তাহলে তো স্যার, সত্যিই চিন্তার বিষয় আসলে এর পেছনে অনেক ক্ষমতাসীন লোকের হাত আছে তারা ইচ্ছা করলে আপনার ক্ষতি করতে পারে সেটা ভয়ের ব্যাপার আপনি শান্তিপ্রিয় অধ্যাপক... হুমকিটাকে অবজ্ঞা না করাই ভালো  

  হ্যাঁ, সে কথা বলার জন্যই আপনাকে ফোন করলাম আমি হুমকিটাকে অবজ্ঞা না রে গুরুত্ব দিচ্ছি বলেই কাল থেকে আন্দোলনে নামব ভয় দেখাতে চাইছে বলেই আমি আরও বেশি নির্ভীক হবো কাল-পরশুর মধ্যে ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে আমাদের ফোরাম ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলব দু-তিনদিনের মধ্যেই আমরা অরাজনৈতিকভাবে প্রতিবাদ মিছিল করবো এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানাবো তাই আপনাকে জানালাম যে, আমাকে হুমকি দেওয়ার কথাটা আপনি কাগজে লিখতে পারেন তাতে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে একত্রিত করতে সুবিধা হবে দেখুন কী করা যায় ছাড়লাম

  অরুময় আশঙ্কিত হয় এই আন্দোলন করতে গিয়ে যদি মানুষটার কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে খুবই খারাপ লাগবে - মানুষটাকে এই কাণ্ডের মধ্যে জড়িয়ে ফেলল

 পরক্ষণেই ভাবে, ওর আর দোষ কী! কাগজে ওই বিশেষকলামপড়ে উনি তো নিজেই স্পটে গিয়েছিলেন অবশ্য এটাই উদ্দেশ্য ছিল গণমাধ্যমের মধ্যে দিয়ে জনগণের দৃষ্টি আর্কষণ করাটাই তো পরিকল্পনা ছিল সেটা সাকসেসফুল এখন কেউ আন্দোলন করতে চাইলে নিজের দায়িত্বে করবে তার কী বলার আছে

অরুময় ভাবতে থাকেউনি বললেন, ওকে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়ছে তার তো কোনো প্রমাণ হাতে নেই ওটা খবর করা উচিত হবে কি না, সি.- সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া দরকার রিপোর্ট যা লেখার তা লিখে বিকেলেই মেল করে দেওয়া হয়েছে এটা অ্যাড করতে চাইলে সি.- পারমিশন নিতে হবে এমন সময় নিরুপমার ফোন আসে একটু যেন বিরক্তই হয় অরুময় তবুও ফোন রিসিভ করে

ওপাশে নিরুপমার ক্লান্ত গলাবলছি যে, ডক্টরের কাছ থেকে বাড়ি ফিরেছ?

হ্যাঁ

ডক্টর কী বলল?

অরুময় অপালার দিকে তাকায়তেমন কিছু নয়, পরে বলব তোমার ওদিকে সব ঠিক আছে তো?

ঠিক আছে কী করে বলি! রাঁধুনি বা কাজের লোকজন যারা ছিল, তারা সবাই পুলিশের ভয়ে পালিয়ে গেছে আমরা সত্তর জন্য আবাসিক বাইশ জন পালিয়ে গেছে বাকি আটচল্লিশ জনের ডাল-ভাত রান্না করতে হিমশিম খেয়ে গেল মেয়েরা জানি না, কাল থেকে কী হবে আমরা বিকেলে কয়েকজন মিলে থানায় গিয়েছিলাম থানা থেকে জানালোজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এখন কিছু করা সম্ভব নয় শুনলাম, এই লোকসভার সাংসদও নাকি থানায় এসেছিলেন থানা থেকেই খোঁজখবর নিয়ে গেছেন, হোমে আসেননি

দেখো, জেলা প্রশাসক কী করেন প্রয়োজনে কাল আবার একবার থানায় যাবে

না, পুলিশ বিকেলে আমাদের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে বলেছে, এরপর থানায় এলে লক-আপ করে দেওয়া হবে দু-চারটে কেস দিয়ে কোর্টে চালান করা হবে

কথাগুলো কি মোবাইলে রেকর্ড করেছ?

আমার এতো সব মাথায় থাকে নাকি! তুমি সাংবাদিক, সবসমসয় রেকর্ড করতে থাকো এতগুলো মানুষের খাওয়া-দাওয়ার চিন্তায় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি, আর...!  

ঠিক আছে, একটা ব্যবস্থা ঠিক হবে শুনলাম, বুদ্ধিজীবী-মহল এবং কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা নড়েচড়ে বসেছে কাল থেকেই হয়তো ওরা আন্দোলনে নামবে হোমেও যেতে পারে তখন তোমাদের সমস্যার কথা বলবে

তুমি কী করে বুঝলে, যে আন্দোলন করবে?

তোমার ফোনের আগেই সেই প্রফেসর অনিকেত নাথ ফোন করেছিলেন উনি বললেন, খবরের পর অনেকে ওঁকে ফোন করেছেন তাছাড়া কাল সকালে তো আমাদের কাগজে ফলাও করে রিপোর্টটা বেরোচ্ছে তার রিপারকেশন কিছু একটা নিশ্চয় হবে তুমি খেয়েছ?

না, অন্যান্য মেয়েরা খেতে বসেছে ওদের হলে...

দুপুরে কিছু পেটে পড়েছিল?

ওই আর কি! বিস্কুট আর জল

ঠিক আছে, এখন খেয়ে নাও ছাড়লাম

ফোন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপালা বলে ওঠেআমি দুপুরে খেয়েছি কি না, কখনও তো জিজ্ঞেস কর না!

ওহ! তুমি না...! ওদের এখন অ্যাবনর্মাল সিচুয়েশন তাই...

শুধুই কি তাইবলে অপালা বাঁকা চোখে তাকায়

অরুময়ের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেতবে তুমি যা ভাবছ তাই তোমার কিছু বলার আছে?

না, বলার নেই, কিন্তু করার আছে

যা করার আছে করো বেশি ভ্যাজর-ভ্যাজর করো না এমনিতে অফিসের চাপে মাথা ঘেঁটেহয়ে আছে তার মধ্যে উনি আবার...

কথা বলতে বলতে অরুময়ের হঠাৎ মনে পড়ে, সি.-কে ফোনটা করা হয়নি হুমকির ব্যাপারটা নিউজে যাবে কি না জানা দরকার পেজ ছাড়তে আর মাত্র এক ঘন্টা বাকি এখুনি ফোন করা দরকার

সি.-কে ফোন করতে গিয়ে হঠাৎ ওর মনে হয়, আগে প্রফেসরকে একবার ফোন করা যাক যদি হুমকি-ফোনের নাম্বারটা পাওয়া যায়, তাহলে নিউজটা জোরদার হবে অরুময় প্রফেসরের নম্বরে ফোন করে

ওপাশে এক মহিলা ধরেছেননমস্কার!  

আমি সাংবাদিক অরুময় বসু বলছি স্যারের সঙ্গে একটু...

আধঘন্টা পরে ফোন করুন উনি এই মুহূর্তে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন

অরুময় কথা থামিয়ে দেয় কিন্তু ফোনটা কান থেকে নামায় না ওপাশে ফোনটা কাটে না অরুময় ফোনে শুনতে পায় একটা পুরুষ কন্ঠের চিৎকারকিছুটা দূর থেকে বলছেইয়েস -এ্যাম সিসিফাস আই ডোন্ট বদার অ্যাবাউট পানিশমেন্ট বাট -এ্যাম অ্যামেনেবল টু ডু রবারি হোয়াট অডাসিটি অফ জুপিটার! এই! তুমি এজিনা? তুমি এসোপাসের কন্যা তো? তোমাকেই তো জুপিটার কিডন্যাপ করেছিল!

অরুময় শুনতে পায় একটা বাচ্চা মেয়ের কান্নাভেজা কথাবাপি, তুমি কি পাগল হয়ে গেলে! আমি অদ্রিজা আমি তোমার অজি-মা

অরুময় ফোনে মেয়েটার কান্না শুনতে পায় এর মাঝে অন্য একজন মহিলার কান্নাভেজা কথাঅনি, তুমি এমন করছ কেন? শান্ত হও প্লিজ! তুমি দেখো, আমাদের অজি-মা কেমন ভয় পেয়ে গেছে! কাঁদছে তুমি দেখো, তুমি দেখো না

কথা বলতে বলতে ভদ্রমহিলা কেঁদে ফেলেন অরুময় ফোনটা ডিসকানেক্ট করে দেয় ওর হঠাৎ মনে পড়ে, নির্বেদ বলছিল, একজন অধ্যাপকের স্ত্রী অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছেন অধ্যাপককে দেখানোর জন্য বলল, কী সাম... নাথ ইনি সেই অধ্যাপক নন তো?

কথাবার্তা শুনে মনে হল, ভদ্রলোক কিছুটা একসেন্ট্রিক

 অরুময় সিদ্ধান্ত নেয়, অধ্যাপককে আর ফোন করবে না হুমকির ব্যাপারে সি.-কে কিছু বলার দরকার নেই ওর সম্বিত ফিরতে দেখে, অপালা কখন উঠে চলে গেছে ওকে কিচেনে-বাথরুমে শোবার ঘরে দেখতে না পেয়ে ব্যালকনিতে যায় দেখে, সেখানে ম্যান্ডেভিলা ফুলের টবটা আঁকড়ে ধরে অপালা অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে  

অরুময় অপালার হাত ধরে আদর করে উঠিয়ে নিয়ে এসে বিছানায় শুইয়ে দেয় অপালা ওকে জড়িয়ে ধরে বলেআমাকে কাল একটা আলমান্ডা ফুলের চারা এনে দেবে! বলো না, দেবে তো!

অরুময়ের চোখদুটো জ্বালা জ্বালা করতে থাকে অপালার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলেহ্যাঁ, এনে দেবো সোনা

ষোল

 

কাগজের প্রথম পাতায়এক নজরেকলামে খবরটা সংক্ষিপ্ত আকারে রেখেছে দেখে অরুময় খুশি হয় ভেতরে তিনের পাতায় বিস্তারিত খবরে চলে যায় নিজের লেখা খবর হলেও একবার চোখ বুলিয়ে নেয় কেন না, অনেক সময় চীফ রিপোর্টার কাঁচি চালায়

 নাঃ! কোথাও কোনো শব্দ বাদ দেওয়া হয়নি বেশ আত্মতৃপ্তি অনুভব করে খবরের একদম শেষের দিকে গিয়ে চমকে ওঠেপ্রতিবন্ধী হোমের মালিক সুপারকে শেষ রাতে তাদের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে

খবরটা ওর কাছে ছিল না থানা থেকে কাগজের অফিসে জানানো হয়েছে নিশ্চয়! খুশি হয় যাক, এবার ব্যাটারা কিছুদিন পুলিশের রুলের গুঁতো, নয় তো জেলের লপসি-ঘাঁটা খাক

পরক্ষণেই ভাবে, কী যে আবোল-তাবোল ভাবছে সাধারণ মানুষের মতো! ওদের মাথায় মন্ত্রী, এম.এল., এম.পি-দের হাত রয়েছে ওদের কিছুই হবে না এটা আই-ওয়াশ ছাড়া আর কিছুই নয় যখন দেখেছে, বুদ্ধিজীবী কিংবা সাধারণ মানুষ ক্ষেপে উঠছে, তখন ওদেরকে বাঁচাতেই হবে জনগণের কোপে পড়লে মুশকিল তাই ওদেরকে সেফ-গার্ড দেওয়ার জন্য অ্যারেস্ট করেছে  

তবুও জানে, সুশীল সমাজ বা বুদ্ধিজীবী যাদেরকে বলা হয়, তারা প্রতিবাদ বা আন্দোলন করবেই! যদিও তা নিষ্ফল আন্দোলনে পরিণত হবে এইসব বুদ্ধিজীবীকে তো কমদিন দেখছে না! একদিন-দুদিন আস্ফালন হবে তারপর খবর কাগজে ওদের নাম আর ছবি ছাপা হয়ে গেলেই আন্দোলন শেষ পরে আর খোঁজও রাখবে না দোষীদের শাস্তি হল, না বহাল তবিয়তে তাদের কাজ-কারবার চালিয়ে যেতে দেওয়া হল!

অরুময় ভাবে, হোমের আবাসিকদের কথা ওদের কী ব্যবস্থা হবে? সরকার কি সহজে ওদের দায়িত্ব নেবে? বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনের দাবি-সনদে এই ব্যাপারটা ঢুকিয়ে দেওয়া দরকার যে, এই প্রতিবন্ধী হোম চালানোর দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে তাতে যদি কিছুটা সুরাহা হয় এমন ভেবে অধ্যাপক অনিকেত নাথকে ফোনে ধরতে চেষ্টা করে কাল রাতে তো কথা হল না ভদ্রলোকের মাথাটা গন্ডগোল করছে মনে হল হেব্বি পড়াশোনা করা লোকেরা কি এরকম আধপাগলা গোছের হয়! অপালাও তো...! ভদ্রলোক এখন কেমন আছেন কে জানে! কাল বোধহয় ওঁর স্ত্রী ধরেছিলেন ফোনটা সে বেচারীর কী জ্বালা! হয়তো রাতে ঘুমোতেই পারেননি!  

 সত্যিই রাতে বিদিশার মোটেও ঘুম আসেনি মেয়েটাকে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে শুয়েছিল অদ্রিজা ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছিল অনিকেত পাশের ডিভানে মরার মতো শুয়ে দাদার পরামর্শ মতো বিদিশা ওঁকে প্রায় জোর করেই একটা ট্র্যাঙ্কুলাইজার খাইয়েছে দাদা বলেছে, কাল বিকেলে আসবে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে ডা. নির্বেদ দাশগুপ্তর চেম্বারে

 সন্ধেবেলায় চম্পা জলপড়া আর মাদুলি নিয়ে এসেছিল সন্ধেবাতি দেওয়ার আগে ঘরে-দুয়োরে গঙ্গাজল ছিঁটোনো হয় রোজ সেই অছিলায় বিদিশা অনিকেতের গায়ে-মাথায় জলপড়া ছিঁটিয়ে দিয়েছিল অনিকেত হালকা প্রতিবাদ করেছিলেনদুয়োর-ঘরে জল দিচ্ছ দাও, আমার গায়ে কেন! দিনে দিনে কি বাতিকগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছ?

 বিদিশা বোঝাতে চেষ্টা করেছিল কবরস্থানের পাশেই তো আমাদের ফ্ল্যাট, কী থেকে কী হয়! তাই একটু... অনিকেত কিছু একটা লিখছিলেন, তাই তেমন উচ্চবাচ্য করেননি আবার লেখার মধ্যে ডুবে গিয়েছিলেন কিন্তু বিপত্তিটা বাধলো হাতে মাদুলি বাঁধার কথা বলতে কথাটা শোনার পর মেজাজ একদম সপ্তমে শুরুই  করলেন এমন অশিক্ষিতা, আনকালচারড, সুপারস্টিসিয়াস মহিলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ইমপসিবল আগে জানলে...!

বিদিশা শেষ চেষ্টা করেছিলঠিক আছে, আমি তো তোমার স্ত্রী, আমার মন রাখার জন্য এটা হাতে না বাঁধো, কোমরে বেঁধে রাখো ক্ষতি তো কিছু করবে না  

অনিকেত ওটা বিদিশার হাত থেকে খপ করে ছিনিয়ে নিয়ে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন এই তোমার মাদুলি দিলাম ফেলে দেখি, তোমার ওই কবরস্থানের জিন-মামদোরা আমার কী করে! যত্তসব কুসংস্কারের ডিপো ওই কাজের মেয়েটা, কী যেন নাম, - তোমার মাথায় এসব ঢুকিয়েছে কালই ওকে টাকা-পয়সা মিটিয়ে বিদেয় করবো  

মাদুলিটা ফেলে দেওয়ায় অদৃশ্য অমঙ্গলের কথা ভেবে বিদিশার চোখে জল এসে গিয়েছিল তবুও অবধি সহ্য করে নিয়েছিল কিন্তু তারপরেই মানুষটা কেমন যেন পাগল-পাগল হয়ে গেল! চিৎকার শুরু করল মেয়েটা তো ভয়ে কেঁদেকেটে একসা ওর কচি মনে এসব যে কতখানি ক্ষত সৃষ্টি করবে কে জানে! মেয়েকে তো বলছিল, ‘তুমি এজিনা! এসোপাসের কন্যা? তোমাকে জুপিটার কিডন্যাপ করেছিল?’ এসব শুনে মেয়ে তো ভয়ে কাঠ কী যে সব আবোল তাবোল বলে! আরও কতকিছু বলেছিল

এসব ভাবতে ভাবতে বিদিশা ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল ঘুম ভাঙলো বেশ বেলায় বুকের কাছে মেয়েটা গুটিসুটি মেরে শুয়ে ওকে দেখে খুব মায়া হয় ওর গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তারপর ওর গায়ে একটা চাদর ঢাকা দিয়ে বিদিশা উঠে আসে

ডাইনিং- পা বাড়াতেই দেখে, কয়েকটা কাঁচের টুকরো ডাইনিং টেবিলের পায়ার কাছে পড়ে রয়েছে কাল রাতে অনির হাতের ধাক্কায় পড়ে ভেঙে যাওয়া কাঁচের জাগের টুকরো কাল এগুলো চোখে পড়েনি সাবধানে সেগুলো তুলে ডাস্টবিনে ফেলে মন খারাপ দিয়েই বিদিশার দিন শুরু হয় প্রাত্যহিক কাজ শেষ হতে হতে প্রায় টা এর মধ্যে মেয়েকে ওঠায়, ব্রেকফাস্ট দেয়

সাড়ে টা নাগাদ বিছানা ছাড়নে অনিকেত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেনইস! অনেক বেলা হয়ে গেছে আমাকে ডাকোনি কেন দিশা?  

বিদিশা অনিকেতকে ভালো করে দেখে ওর চোখেমুখে কালকের কোনো রুক্ষতা বা ক্রুরতার ছাপ নেই কে বলবে, এই মানুষটা কাল রাতে খুবই হিংস্র জটিল হয়ে উঠেছিল বিদিশা ওঁকে মনে করাতেও চায় না সেসব কথা তাই বলেআজ রবিবার, তোমার তো ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া নেই এমনিতেই তুমি কম ঘুমাও ভাবলাম, আজকে ঘুমাচ্ছো যখন ...

আরে না না, আজ রবিবার হলেও আমার অনেক কাজ আছে অনেকের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে ওরা ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে আসবে মিটিং আছে তারপর ওখান থেকে যাদবপুর কফিহাউসে যেতে হবে

কথা শুনে বিদিশা চিন্তায় পড়ে আজ তো দাদাও এখানে নেই ওকে একা ছাড়া কি ঠিক হবে? কিন্তু নিষেধ করলেও শোনার লোক নয় যাবে বলেছে যখন, যাবেই দাদা বলেছে বিকেলে আসবে এখন কী যে করা যায় !

অনিকেত বাথরুমে ঢুকেছে এমন সময় অনিকেতের মোবাইলফোনে ফোন আসে অন্যসময় হলে বিদিশা অনির ফোন ধরে না কিন্তু এখন আননোন নাম্বার দেখে ফোনটা রিসিভ করে প্রান্তের গলাগুড মর্নিং স্যার আমি সাংবাদিক অরুময় বসু বলছি বিদিশা বলেহ্যাঁ, গুড মর্নিং স্যার বাথরুমে

! তাহলে পরে করবো?

পরে করবেন, তার আগে শুনুন না! আমার একটু কথা আছে

হ্যাঁ, বলুন ম্যাডাম

 বলছি যে, কাল রাতে আপনিই ফোন করেছিলেন তো?

হ্যাঁ, কিন্তু স্যারের সঙ্গে কথা হলো না

হ্যাঁ হলো না, তার কারণ, স্যারের কাল অসুবিধা ছিল অসুবিধাটা আপনাকে একটু খুলেই বলি প্লিজ ওঁকে বলবেন না

বলুন, আমি বলবো না

স্যারের একটু সাইকো-প্রবলেম দেখা দিচ্ছে মাঝে মাঝে খুব রেগে যাচ্ছেন আর অবান্তর কথা বলছেন কিন্তু ঘরেও থাকতে চাইছেন না কাল রাতে উনি খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন এখন মোটামুটি ঠিক আছেন আজ আবার একটু পরেই উনি যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে যাবেন ওখানে নাকি মিটিং আছে ওখান থেকে দুপুরে যাদবপুর কফিহাউস কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি যদি আবার মাথা বিগড়োয় গত পরশুদিন ইউনিভার্সিটিতে সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলেন এখন সঙ্গে যাওয়ার মতো আমার বাড়িতে কেউ নেই আপনি কি ওখানে যাচ্ছেন?

না, মানে আমার তো যাওয়ার কথা নয়

শুনুন না ভাই, আমি দিদি হিসাবে আপনাকে রিকোয়েস্ট করছি, আপনি তো সাংবাদিক, অবারিত দ্বার আপনিও ওখানে যদি যেতেন মানে ওর যদি কোনো অসুবিধা হয়, আমাকে ফোন করতেন আমি আমার মোবাইল নম্বর দিচ্ছি দেখুন না যদি যাওয়া যায় কাল তো আপনিই ওঁকে প্রতিবন্ধী হোমে নিয়ে গিয়েছিলেন

ঠিক আছে, দিদি, বলছেন যখন যাবো আপনি নাম্বার বলুন, আমি লিখে নিচ্ছি

বিদিশা ফোন ছাড়ার একটু পরেই অনিকেত বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসেন বিদিশা বলে তোমার ফোন এসেছিল বারবার রিং হচ্ছে শুনে ধরেছিলাম বললো, সাংবাদিক অরুময় বসু পরে করতে বলেছি

ঠিক আছে, আমি কথা বলে নেব  

একটু পরেই অরুময়ের মোবাইলফোনে ফোন আসে

হ্যাঁ, গুড মর্নিং স্যার! আমি সাংবাদিক অরুময় বসু বলছি, বলুন

আপনি ফোন করেছিলেন

হ্যাঁ স্যার, বলছি স্যার, নিশ্চয় কাগজে দেখেছেনওই হোমের মালিক সুপারকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে

হ্যাঁ, দেখেছি তাতে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই ওরা শিগগির জামিন পেয়ে যাবে তারপর পুলিশ ওদেরকে সেফ-গার্ড দিয়ে রাজার হালে রাখবে

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন স্যার আমিও এমনটাই ভাবছিলাম তাই বলছি স্যার, মূল সমস্যা তো এই প্রতিবন্ধী মহিলাগুলোর সরকারকে ওদের দায়িত্ব নেওয়ার দাবি জানানোর কথা দাবি-সনদে রাখা দরকার তাই না!

হ্যাঁ, দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবির পাশাপাশি ওদের জীবনধারণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিরাপত্তার দাবি তো করতেই হবে প্রয়োজনে ওই হোম সরকার চালাবে আমি আজ ইউনিভার্সিটিতে, তারপরে যাদবপুর কফি হাউসে যাচ্ছি দেখি, সকলের সঙ্গে আলোচনা করি কয়েকজন লেখক-কবিও আমাকে ফোন করেছিলেন তাঁদেরকেও কফি হাউসে আসতে বলা হয়েছে

ঠিক আছে, আপনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমিও ওখানে যাই আপনাদের আলোচনায় কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, মানে কবে কোথায় আন্দোলন শুরু হবে, জানলে নিউজটা ঠিকঠাক করতে পারবো

হ্যাঁ, অবশ্যই আসবেন অসুবিধা কী!

তাহলে স্যার, যাওয়ার পথে আপনাকে বাড়ি থেকে তুলে নেবো অ্যাড্রেসটা হোয়াটঅ্যাপে টেক্সট করে দেবেন আর একটা কথা স্যার! আপনার সঙ্গে এসেছিলেন কলকাতা ইউনিভার্সিটির রীডার . অশেষ সেনগুপ্ত তাঁর কোনো কনট্যাক্ট নাম্বার আমার কাছে নেই

থাকার দরকারও নেই আমি ওঁকে ফোন করেছিলাম উনি এসব ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করলেন না উপরন্তু আমাকে উপদেশ দিলেন, এসব নিয়ে মাথা না ঘামানোর জন্য যাই হোক, আমি আপনাকে বলে ফেললাম এসব কথা আবার কাগজে লিখবেন না তাহলে গৃহবিবাদ লেগে যাবে

না স্যার, চিন্তা করবেন না আমরা পজিটিভ খবরটা ছাপি, নেগেটিভ খবর চেপে যাই সমাজের কল্যাণে

ঠিক আছে, ছাড়লাম ভাই

অরুময় ফোন ডিসকানেক্ট করে দিয়ে ভাবে, একবার নির্বেদকে ফোন করলে হয় যদি ব্যাপারে কিছুটা ইন্টারেস্টেড হয়, ওকে দিয়ে মিডিয়ার সামনে যদি তেমন কিছু বলানো যায়, যাতে ডাক্তারদের ফোরামকেও তাতানো যাবে, তাহলে ভালো হয় বিশেষত জুনিয়র ডাক্তারদের গায়ে স্টুডেন্ট-ইউনিয়নের গন্ধটা রয়ে যায় ওদেরকে আন্দোলনে নামাতে পারলে... কিন্তু ওরা টু মাচ সেলফিস নিজেদের স্বার্থ কিছু নেই বুঝলে, মোটেও এগোবে না তবু দেখা যাক চেষ্টা করে

এমন সময় অপালা ব্যালকনিতে আসে বলেতোমার চা যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল

হ্যাঁ খাচ্ছি, তুমি খেয়েছো?

হুঁম, কতক্ষণ আর তোমার জন্য অপেক্ষা করব!

না না, ঠিক আছে বলছি যে, আজ তো তোমার ছুটি, কিন্তু আমাকে একটু বেরোতে হবে

কোনদিন তোমাকে বেরোতে না হয়!

 না, আসলে ওই প্রতিবন্ধী হোমের ব্যাপারটা আমিই কভার করছি তো! ওহ! আর একটা কাজের জন্যও তো বেরোতে হবে

অপালা ঝারিতে করে ফুলের টবে জল দেয়কী কাজ?

তোমার ফুলের চারা আনতে হবে

 কী ফুলের চারা?

ওই যে কাল রাতে বললে না, আলমান্ডা ফুলের চারা একবারনেচার নার্সারি’-তে যাবো আলমান্ডা ছাড়াও আরও ভালো কিছু পেলে নিয়ে আসবো   

বসানোর টব কোথায় পাবে? তাছাড়া টব রাখার আর জায়গা নেই ব্যালকনিতে কাপড়-চোপড় রোদে দেওয়ার জন্যও তো স্পেস দরকার

তাহলে কি আনবো না?

একটা এনো, আলমান্ডা মনে আছে, আমি খুব ছোটোবেলায় মায়ের সঙ্গে একবার ফ্লাওয়ার-শোতে গিয়েছিলাম সেখানে আলমান্ডা ফুল-ভর্তি টবের পাশে দাঁড়িয়ে আমার একটা ছবি আছে আমি ফুল ছুঁয়ে হাসছি

! বুঝেছি, নস্টালজিয়া ঠিক আছে, নিয়ে আসবো

অপালা অরুময়ের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে তারপর আদুরে গলায় বলেতুমি না খুব ভালো আজ তোমাকে...

কী, আজ আমাকে ... থেমে গেলে কেন?

বলবো না

বলো না!

আজ তোমাকে আমি সাবান মাখিয়ে স্নান করিয়ে দেবো, মাথায় শ্যাম্পু দিয়ে দেবো

অরুময় কী বলবে ভেবে পায় না অবাক চোখে অপালাকে দেখতে থাকে দেখে, অপালা হলুদ গোলাপটার ওপর জমে থাকা জলবিন্দুগুলোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আর মিটিমিটি হাসছে

ওকে দেখে অরুময়ের কেমন যেন মায়া হয় বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আসে বলেঅপু, ভাবছি কয়েকদিনের জন্য আমরা কোথাও বেড়াতে যাবো তোমার কলেজে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে রেখে তো!

অপালার কানে হয় তো অরুময়ের কথা পৌঁছয় না আপন মনে গোলাপটার গায়ে হাত বুলোতে থাকে এমন সময় অরুময়ের মোবাইলফোন বেজে ওঠে স্ক্রিনে নির্বেদের ছবি অরুময় ফোন রিসিভ করেহ্যাঁ, বলো বন্ধু

গুড মর্নিং

হ্যাঁ মর্নিং

তিনি কেমন আছেন?

অরুময় অপালার দিকে তাকিয়ে ব্যালকনি থেকে ঘরের ভেতরে চলে আসেভালো

আবোল-তাবোল বকছে না তো?

না, তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয় তবে পজেসিভনেস আউটবার্স্ট হচ্ছে  

তাই নাকি! হা হা হা! তুই কি ডাইনে-বাঁয়ে করছিস নাকি?

না সেরকম কিছু নয় আমার জবটাই তো মানুষের সঙ্গে রিলেটেড সে পুরুষ হোক বা নারী

হুঁম, বুঝলাম আমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলবো নাকি?

হ্যাঁ বলতে পারিস ফ্রি আছে, ফুলগাছে জল দিচ্ছে

দে একবার

অরুময় ব্যালকনিতে ফিরে যায়অ্যাই! নির্বেদ ফোন করেছে, ধরো  

তুমি কথা বলো

অরুময় ফোনের মাইক্রোফোনে হাত চাপা দেয়তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে

অপালা শাড়ির আঁচলে হাত মোছেআচ্ছা, দাও হ্যালো!

শুভ সকাল বন্ধু কেমন আছো?

ভালো, আপনি?

আমি ফার্স্ট ক্লাস কিন্তুআপনিকেন? ‘তুমিবলার কথা তো! কাল যে বললে, আমি তোমার বন্ধু!

অপালা বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলে গোলাপ-কাঁটার আঁচড়ের দাগ দেখে! ‘তুমিবললে খুশি হবেন! ঠিক আছে বলছি যে, ক্রিসেন্থিমাম ফুল কোন সময় ফোটে তুমি জানো?

ক্রিসেন্থিমাম! সম্ভবত স্প্রিং- তো হিল-এরিয়ার ফুল

অপালা জলের ঝারিটা ব্যালকনির কোণে রাখেহ্যাঁ তা হোক, এখানে বসালেও গাছ বাঁচবে যত্ন করলে ফুলও ফুটবে

তুমি বসিয়েছ বুঝি!

নাহ, ভাবছি ওকে দিয়ে চারা আনাবো

এখানে -গাছের চারা পাওয়া যায়?

অর্ডার দিলে এনে দেবে অনলাইনেও অর্ডার দেওয়া যায়

হ্যাঁ, সেটা ভালো বলছি যে, তোমার থিসিস কদ্দুর এগোলো?

অপালা রিনরিনিয়ে হাসেআমি থিসিস লিখছি কে বলল!

না, মানে তোমার নিজস্ব লেখালিখি

, তেমন কিছু নয় ভাবছি চাইল্ড-সাইকোলজি নিয়ে একটা বই লিখবো

বাহ! দারুণ ব্যাপার হবে বইটা বেরোলে আমাকে এক কপি দিও

ভাবছি, বইটা তোমাকেই উৎসর্গ করবো

আমাকে?

হ্যাঁ, আপত্তি আছে?

না না, আপত্তি থাকবে কেন? তো আনন্দের কথা নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবো লিখে ফেলো ঝটপট!

হ্যাঁ চেষ্টা করছি এই নিন, আপনার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলুন

আবারআপনি’!

মনের কাছাকাছি এলে শুধরে যাবে

অরুময় অপালার হাত থেকে ফোন নেয়বল, বিশেষ কিছু বলার আছে?

না, তেমন কিছু নয়

যা বুঝলাম, সব ঠিক আছে, ওরিড হোস না একটু তাল মিলিয়ে চল

দেখা যাক! আর শোন! বলছি যে, টিভির সাংবাদিককে নিয়ে তোর কাছে কখন যাবো?

আমার কাছে আসবি বলছিস!

অরুময় চেয়ারে বসেহ্যাঁ, তুই যদি কনসেন্ট দিস দ্যাখ, এতে তোর লাভ ছাড়া ক্ষতি হবে না পলিটিক্যাল স্পিচ তো আর দিচ্ছিস না! তুই ডাক্তার, সমাজের বন্ধু সমাজের এক শ্রেণির মানুষের ফেভারে দুটো কথা বলবি, এতে তোর আলাদা একটা আইডেন্টিটি তৈরি হবে প্রচারও হবে

নির্বেদ হাসেআমার বেশি প্রচারের দরকার নেই এমনিতেই মানুষের মধ্যে ডিপ্রেশন এতো বেড়েছে যে, আমি রোগী দেখে শেষ করতে পারছি না তবুও বলছিস যখন, আয় বিকেলের দিকে তবে সন্ধের আগে শেষ করতে হবে সন্ধেয় কয়েকটা পেসেন্ট আছে

ঠিক আছে শোন না, বলছি নিশ্চয় কাগজে দেখেছিস, প্রতিবন্ধী হোমের মালিক সুপার অ্যারেস্ট হয়েছে

না দেখিনি তবে গত কাল-পরশুর কাগজে তোর লেখাটা পড়েছি ওরা অ্যারেস্ট হয়েছে, তো ভালো খবর

ভালো না কাঁচকলা ওরা সেফ জোনে ঢুকে গেল পাবলিকের আর কিছু করার থাকলো না এখন পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর খেলা শুরু হবে বিরোধীরা একরকম বলবে, পাওয়ারে থাকারা আর এক রকম তবে শুনছি, অরাজনৈতিকভাবে অধ্যাপক, কবি-সাহিত্যিকদের একটা গ্রুপ প্রতিবাদ-মিছিল বের করবে আজ নয়, হয়তো কাল কিংবা পরশু ওখানেডক্টরস ফোরামপার্টিসিপেট করলে ব্যাপারটা জোরদার হয়

আরে! আমি তো আর ফোরামের প্রেসিডেন্ট বা সেক্রেটারি নই

না, তা নয় ঠিকই কিন্তু মিডিয়াতে বলার সময় তোর এরকম একটা আবেদন থাকতেই পারে

ঠিক আছে, আয় তো, ভেবে দেখছি

ওকে বস! টা-টা

অরুময় ফোন ছেড়ে দেয় অপালা বলেব্রেকফাস্ট দিয়েছি, এসো

সতের

 

রবিবার সকালে পোস্টমর্টেমের পর নিরুপমা অন্যান্যরা হাসপাতাল থেকে রাবেয়ার মরদেহ নিয়ে এল। ওকে যে ডাক্তারবাবু এই হোমে বছর দেড়কে আগে রেখে গিয়েছিলেন, তাঁর মোবাইলফোন নম্বর ছিল। যোগাযোগ করে জানা গেল, তিনি এখন আমেরিকায় ওখান থেকেই তিনি এই রিহ্যাব সেন্টারে রাবেয়ার জন্য সারাবছরের টাকা পাঠিয়ে দেন রাবেয়ার মৃত্যুর খবর তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হল কিন্তু মুর্শিদাবাদে ওর বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা গেল না হোম-এর মালিক সুপার অ্যারেস্ট হওয়ায়, অন্যরাও পালিয়ে গেছে তাই রাবেয়ার দেহ সৎকারের দায়িত্ব নিরুপমা মিনতি-জবাদেরই নিতে হল  

  মরদেহ পাওয়ার পর নিরুপমা অরুময়কে ফোনে ধরার চেষ্টা করেছিল কিন্তু না পেয়ে নিজেরাই ব্যবস্থা করেছে মুসলিমদের দেহ কীভাবে কবর দেওয়া হয়, তা ওদের কারও জানা ছিল না তাই প্রথমদিকে ওরা একটু সমস্যায় পড়েছিল কিন্তুমুশকিল-আসানহল সামনের চা দোকানদার ওর জানাশোনা একটা মুসলিম ছেলেকে জোগাড় করে দিল সে মৃত রাবেয়াকে তার ফুফাতো বোন বলে পরিচয় দিয়ে, সঙ্গে গিয়ে যা ব্যবস্থা করার করে দিল   

  কবরস্থান থেকে ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল আজ নিরুপমা অন্যান্য মেয়েরা কাজে ব্যস্ত ছিল, তাই সারাদিন খাওয়ার কথাও মনে হয়নি তাছাড়া রাবেয়ার জন্য কারও মন ভাল নেই কিন্তু উপোস দিয়ে তো আর বাঁচা যায় না, তাই কবরস্থান থেকে ফেরার পর নিরুপমা উদ্যোগ নিয়ে সবাইকে ডেকেডুকে খিচুড়ি রান্না করালো

  আজ একবার থানায় যাওয়ার দরকার ছিল কিন্তু সময় হল না কাল সকালে যেতেই হবে হোমের ভাঁড়ারে চাল-ডাল আর নেই বললেই চলে এরপর তো এতগুলো মানুষ না খেতে পেয়ে মরবে যদিও বেশ কয়েকজনের বাড়ির লোক খবর পেয়ে তাদের ক্যান্ডিডেটকে নিয়ে গিয়েছে অন্য হোমে, না বাড়িতে, সে খবর জানা নেই তবুও এখনও চৌত্রিশ জন রয়েছে, যাদের যাওয়ার জায়গা নেই এদের তো বাঁচাতে হবে!

  কাল থানার অফিসার বলেছিল, জেলা প্রশাসনকে জানাবে কিন্তু ডি.এম কিংবা অন্য কোনো পদাধিকারীর পাত্তা নেই এমন কি লোকাল কাউন্সিলারও এখনও অবধি কোনো ব্যবস্থা করেননি এসে বলে গেছেন, ‘দেখছি কী করা যায়

  এসব ভাবতে ভাবতে নিরুপমা অরুময়কে ফোন করার কথা ভাবে পরক্ষণেই সে ইচ্ছা ত্যাগ করে ওর মনে অভিমান জমা হয়ে আছে কাল সেই যে টিভি মিডিয়ার লোকজন আর দুজন স্যারকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, তারপর আর পাত্তা নেই বরং নিজেই অপালার খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য কাল রাতে ফোন করেছিল তাও একটুখানি কথা বলেই ছেড়ে দিয়েছিল না কোনও খোঁজখবর, না কোনও ফোন সত্যিই মানুষ চেনা দায় সাংবাদিক হলেও তো আগে মানুষ, পরে সাংবাদিক খবর সংগ্রহ করা আর কাগজে ছাপানো ছাড়া আর কোনও দায়িত্ব কি থাকতে নেই! এসব ভাবতে ভাবতে নিরুপমা দিশেহারা হয়ে পড়ে

  এমন সময় নিরুপমার মোবাইলফোন বেজে ওঠে অরুময়ের ফোন নিরুপমার গলার স্বরে অভিমান ঝরে পড়ে সেসব সামাল দিয়ে অরুময় আসল কথায় আসেজানো নিরু! আগামীকাল সকাল দশটা নাগাদ তোমাদের হোমের সামনে পথ অবরোধ হবে ওখানে বুদ্ধিজীবী লেখক-কবিরা প্রতিবাদ জানাবে তুমি অবশ্যই যেন থেকো!

 নিরুপমা ভেতরে ভেতরে কিছুটা উৎফুল্লযাক, তাহলে একটা কাজ তুমি করেছ   

তুমি আমাকে কী ভাবো বলো তো নিরু! আমার কি কোনও দায়-দায়িত্ব নেই! হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, সকাল থেকে তোমার সঙ্গে কথা বলা হয়নি তবে আমি ইকবালের কাছে সব খবর পেয়েছি তোমরা রাবেয়ার মরদেহ নিয়ে এসেছ এক মুসলিম ছেলের সাহায্যে তার কবর দিয়েছ কাল ওটা খবর হিসাবে ছবিসহ ছাপা হবে আসলে আমি সকাল থেকে সারাদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম সেই প্রফেসরকে সঙ্গে নিয়ে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিলাম আজ তো রবিবার, সব বন্ধ তবুও ওই স্যার চেষ্টা-চরিত্তির করে, বেশ কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে ডাকলেন তাঁদেরকে নিয়ে ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে বসা হল সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, আগামীকাল থেকে ওঁরা আন্দোলনে নামবেন মোমবাতি মিছিল-টিছিল নয়, পথ অবরোধ করে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবী করবেন তারপর যাদবপুর কফিহাউসে লেখক-কবিদের সঙ্গেও একটা মিটিং হল ওখানেলেখক-শিল্পী সংঘ’-এর প্রধান সম্পাদক, ‘ছোটো পত্রিকা সম্পাদক সমিতি সম্পাদক এঁদেরকে পেয়েছিলাম ওঁরাও পথে নামবেন বলেছেন বিকেলে গিয়েছিলাম, ডাক্তার নির্বেদ দাশগুপ্তর কাছে সঙ্গে ছিল টিভি মিডিয়া ওর মুখ দিয়ে কায়দা করে বলিয়ে নিলাম, ‘ডাক্তারদের সংগঠনও এই আন্দোলনে পাশে আছে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে ওরা ...’ ইত্যাদি ইত্যাদি ওরা যদি আসে, ব্যাপারটা আরও জবরদস্ত হয় শুনলাম, আজই বুদ্ধিজীবী সংগঠন কালকের ওই অ্যাজিটেশনের জন্য পুলিশ পারমিশন করিয়ে নিয়েছে এখন দেখা যাক কী হয় নিশ্চয় একটা ব্যবস্থা হবে বেশি চিন্তা করো না

অরুময় কথাগুলো একটানা বলে যায় নিরুপমা মাঝপথে বাধা না দিয়ে চুপচাপ শুনে যায় ওর মনে আশার আলো জাগে বলেতোমাকে ধন্যবাদ  

অরুময় বলেধন্যবাদ-টাদ বাদ দাও নিশ্চয় আজ সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি?  

সে খোঁজ নিয়ে তোমার কী দরকার? এটা তো খবর হবে না

! বুঝলাম

কী বুঝলে?

বুঝলাম যে, তুমি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো তাই আমার ওপর অভিমান করেছ

এটা বুঝেছ! আমি ভাবলাম, আমাকে ভালোবাসো কি না, আমার কথা ভাবো কি না, এটা বুঝতে পেরেছ কেন না, অন্ধমহিলাকে তো কেউ ভালোবাসতে পারে না বড়জোর করুণা করতে পারে, দয়া দেখাতে পারে

 তুমি কি জানো হেলেন কেলারেরও প্রেমিক ছিল তুমি কি জানো, স্টিফেন হকিংয়েরও একশোর বেশি গার্লেফ্রন্ড বা প্রেমিকা ছিল

 হুঁ, কোথায় ওঁরা, আর কোথায় আমি

 নিজেকে এত ছোটো ভেবো না, বুঝলে! তুমি অতি সাধারণ হলে তোমাকে নিয়ে খবর-কাগজ-ওয়ালারা মাতামাতি করতো না! তোমার সাক্ষাৎকার নিতে আমাকে পাঠাতে না! সুতরাং ওসব মন থেকে বাদ দাও কাজের কাজটা আমাদের করতে হবে মান-অভিমানের কথা পরে ভাবা যাবে এখন দ্যাখো, খিচুড়ি রান্না বোধহয় হয়ে গেছে গিয়ে খেয়ে নাও

খিচুড়ি হচ্ছে, তুমি কী করে জানলে!

সাংবাদিকদের অনেক কিছুই জানতে হয় যেমন আরও একটা খবর দিই তোমাকে, তুমি খুশি হবে

বলো বলো!

 রাবেয়াকে যে গাড়িতে চড়িয়ে মন্ত্রীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে গাড়ির ড্রাইভারকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে এবার কান টানলেই মাথা আসবে তাকে থার্ড ডিগ্রি দিলে ঠিক মন্ত্রীর নাম বেরোবে

হয় তো বেরোবে, সেটা পুলিশের কাছে আটকে থাকবে জনসমক্ষে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই কেন না, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল সংবিধান নিয়ে -বি-সি-ডি প্র্যাকটিস করে, আর আইন নিয়েকুমির ডাঙাখেলে

হ্যাঁ নিরু, এটা তুমি ঠিকই বলেছ তবুও দেখা যাক, কী হয় তথাকথিত সুশীল সমাজ বুদ্ধিজীবীদের চাপে পড়ে যদি কিছুটা সুরাহা হয় সবচেয়ে আগে দরকার তোমাদের হোমের একটা সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা সরকার কিংবা কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যদি ওটা চালানোর দায়িত্ব নেয়, তাহলে ভালো হয়

দ্যাখো, কী-কদ্দুর করতে পারো বন্ধু হিসেবে তোমাকে পেয়েছি, এটা আমার ভাগ্য আর বেশি কিছু চাই না

তুমি না চাইলেও যদি ঈশ্বর চান ... যাক গে! এসব কথা থাক এখন গিয়ে খেয়ে নাও

হ্যাঁ, ভালো থেকো বন্ধু ছাড়লাম

নিরুপমার সঙ্গে ফোনে যখন অরুময় কথা বলছিল, তখন অপালা যে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, তা অরুময় খেয়াল করেনি অরুময়ের কথা শেষ হতেই অপালা বলে ওঠেযাক, আমার দায়িত্ব কিছুটা কমল

কীসের গো অপু?

ওই তোমাকে ভালোবাসার কেন না, এখন তোমাকে ভালোবাসার লোকের তো অভাব নেই তারা সত্যিই ভালোবাসে, অভিমানও করে

অরুময় কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না ব্যাপারটা তেমন কিছুই নয়, অথচ কথাটা তো ফোনে নিরুপমাকে বলেছে অপালার কানেও গেছে রি-অ্যাক্ট তো করবেই একটু ভেবে নিয়ে বলেতুমি বুঝছ না অপু! ওরা এখন খুবই অসহায়! ওদের পাশে কেউ নেই মানবিক কর্তব্যবোধ থেকে ওদেরকে বোঝাতে চাই যে, আমি ওদের পাশে আছি

এটা কি গৌরবে বহুবচন?

মানে!

মানে, কথা বললে তো একজনের সঙ্গে এখনওদেরশব্দটা ব্যবহার করছ তাই ভাবলাম, স্ত্রী ছাড়া অন্যের ভালোবাসা পাওয়াটা বোধহয় গৌরবের!

অপু, আজকাল দেখছি, তুমি খুবই সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়ছ নির্বেদ অবশ্য কাল বলল, সন্তান না হলে মেয়েরা একটু সন্দেহপ্রবণ হয় দেখা যাক, যা খবর দিয়েছ, সেটা সঠিক হলে, আর কিছুদিন পর এটা কেটে যাবে

আমি সন্দেহপ্রবণ কেন হতে যাবো! তুমি নিজেই তো সন্দেহের সৃষ্টি করছ ওই কথাগুলো কি না বললেই নয়? তুমি একজন দুঁদে সাংবাদিক, তোমার একটা ব্যক্তিত্ব আছে সামান্য একজন অন্ধ মহিলার কাছে নিজেকে এত ল্যুজ কর কেন গো! তারই বা তোমাকে প্রেম নিবেদন করার সাহস কী করে হয়! নিশ্চয় তোমার প্রশ্রয় আছে  

অরুময় আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেআমি তো ওকে প্রেম নিবেদন করতে যাইনি তাই যদি যেতাম, তাহলে তো তোমাকে লুকিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলতাম তোমার সামনে বলতাম না তাছাড়া ওর আছেটা কী, যে ওকে প্রেম নিবেদন করতে ইচ্ছা হবে অহেতুক তুমি আমাকে ভুল বুঝছ তুমি শুধু আমাকে নয়, ওই ব্যালকনির গোলাপ গাছটাকেও সন্দেহ কর ঝাউ গাছটাকেও সন্দেহ কর

ঝাউগাছকে সন্দেহ! মাথা কাটা যাবে আমার তুমি জানো, ঝাউগাছ হলেন আমার ব্যালকনি-সাম্রাজ্যের রাজাধিরাজ তার সাত রানি হল টগর, চামেলি, বেলি, জুঁই, ডালিয়া, জিনিয়া আর অলিভিয়া সেনাপতি হল গোলাপ সিং আর মন্ত্রী কে জানো!

অরুময় প্রমাদ গোনে, শুরু হলো পাগলামি রাত্তিরে কী করবে কে জানে! হয় তো বাথরুমে ঢোকাবে সাবান মাখিয়ে স্নান করাতে নয় তো বলবে, ‘আমার বুকে কান পেতে শোনো তো, হৃৎপিন্ডটা কী বলতে চাইছে!

কী হল! বলতে পারলে না তো! জানি, পারবে না মন্ত্রী হলো, ওই ঝাউ-মহারাজের ডানদিকে বসে থাকা সাইকাস ওর কী প্রখর বুদ্ধিমত্তা!

অরুময় ভেতরে ভেতরে কিছুটা খুশি হয় যাক, অপ্রীতিকর কথাবার্তা থেকে সরে এসে গাছপালায় ঢুকে গেছে যখন, তখন নিশ্চিন্ত এবার একটু সুরে সুর মিলিয়ে ধুনটা ধরে রাখলেই হবে তাই বলে ওঠে তোমার ব্যালকনি-মহারাজের সাত-সাতটা রানি আছে, কোনো রাজপুত্র নেই? 

রাজপুত্র তো জন্মাবে আর মাত্র আটমাস পরে যাই, নিরালায় বসে একটু তার কথা ভাবি তুমি জানো, ষষ্ঠ সপ্তাহে ভ্রূণের ব্রেন হার্ট তৈরি শুরু হয় এখন তার হৃদয়টাকে ভালো করে গড়ে তুলতে হবে তোমার মতো পাষাণ-হৃদয় যেন না হয়!

আরও কীসব বলতে বলতে অপালা শোবার ঘরে চলে যায় অরুময় ভাবতে থাকে, সে ভাগ্যবান না কি হতভাগ্য! ভেবে কোনো কূলকিনারা পায় না

এমন সময় মোবাইলফোন বেজে ওঠে ইকবাল ফোন করেছেদাদা, কাল তো তুলকালাম কাণ্ড হবে শুনলাম, রুলিং পার্টির কাউন্সিলার সুখতলা রোডের গণ-অবস্থান বানচাল করতে চাইছে পুলিশও নাকি তাতে মদত দেবে!

হ্যাঁ, ভাই ইকবাল, এটা হওয়াই তো স্বাভাবিক যেখানেকেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোনো সম্ভাবনা আছে, সেখানে খুঁড়তে দেবে ভেবেছ! খেলা ভালোই জমবে আমি খবর পেলাম, তলায় তলায় বিরোধী দল এই বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে ভিড়তে চাইছে যদিও তারা সরাসরি নয়, এন.জি.- ছদ্মবেশে যাবে তুমি একটু সাবধানে থেকো ছবি তোলার জন্য তোমাকে তো ফোরফ্রন্টে আসতে হয়

আমার জন্য চিন্তা রো না দাদা আমি ভাবছি, ওই বুদ্ধিজীবী নামধারী মানুষগুলোর কথা ওরা তো সক্রিয় রাজনীতি করার লোক নয় মিটিং-মিছিলে, পথ-অবরোধে ওদের তেমন অব্যেস নেই ওদের দৌড় তো মোমবাতি নিয়ে রবীন্দ্রসদন থেকে বড়জোর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল অবধি তার মধ্যে যা শুনলাম, বেশিরভাগই বুড়োধুরো অধ্যাপক, কবি-সাহিত্যিক কোনো ছাত্র ইউনিয়ন নাকি এই নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নয়

আরে না ব্রাদার! ওরা সব পোড়-খাওয়া মাল তোমার ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়ে ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে পরের দিনের কাগজে ছবি ছাপাতে হবে তো! আমি ভাবছি সেই মানুষগুলোর কথা, বেশকিছু প্রতিবন্ধী সংগঠন এই অবরোধে যোগ দেবে বাইচান্স পুলিশ হুটারিং করলে সেই প্রতিবন্ধী মানুষগুলোর কী দশা হবে! শুনছি নাকি এরা সি.এম-এর হস্তক্ষেপ চাইবে এইসব ছোটোখাটো ব্যাপারে এমন কিছু রাজনৈতিক ফায়দা তোলা যাবে না যে, সি.এম আসবে

দেখা যাক দাদা, কাল কী হয় কাল দেখা হচ্ছে রাখলাম, গুডনাইট

হ্যাঁ ভাই, গুডনাইট

অরুময় ফোন রেখে গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের দিকে তাকায় রাত দশটা বাজতে আর তিন মিনিট বাকি সাধারণত সংবাদ প্রবাহদেখতে দেখতে, দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে নেয় তাই টিভি অন রে উঁকি মারে শোবার ঘরে দেখে, অপালা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে বই পড়ছে দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে বলেকী ম্যাডাম! রাজপুত্রের ভালো হৃদয় গড়ে তোলার ফরমুলা বইয়ে খুঁজে পেলে? 

অপালা যেন অন্য এক জগতে বিচরণ করছে বলে ডেল কার্নেগী বলেছেন, ‘অল্প স্বার্থপরতায় দোষ নেই

তুমি এখন ডেল কার্নেগী পড়ছ নাকি? রাজপুত্রের কোমল হৃদয় গড়তে ওই ভদ্রলোক কীভাবে সাহায্য করবেন বুঝতে পারছি না

আমি পড়ছি কার্নেগীর লেখাস্ত্রী যখন বান্ধবীবইটা

তো উনি স্ত্রীকে স্বার্থপর হতে বলেছেন, না বান্ধবী হতে বলেছেন? স্বার্থপর হলে তো মুশকিল তোমার পাষাণ-হৃদয় স্বামীর এখন খিদে পেয়েছে

এই হল তোমার দোষ পুরো কথাটা শোনো না, শুনলেও মনে রাখো না উনি বলেছেন, ‘অল্প স্বার্থপরতায় দোষ নেই’ ‘অল্পশব্দটা বাদ দিলে হবে! যদিও উনি টু সাম এক্সটেনড অ্যারিস্টটলকে অনুকরণ করেছেন

তাই নাকি!

হ্যাঁ, আলেকজান্ডারের শিক্ষাগুরু অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ‘দোষমুক্ত স্বার্থপরতা কল্যাণকর যারা জীবনে উন্নতি করতে চায়, তাদের অল্প স্বল্প দোষমুক্ত স্বার্থপরতা দরকার মহান মানুষেরা নিজের স্বার্থকে বির্সজন দেন অপরের স্বার্থ লক্ষ্য রেখে কাজ করে আনন্দ পান কিন্তু সাধারণ মানুষ তো তা করে না বেশিরভাগই ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত থাকেডেল কার্নেগী বলছেন, ‘স্ত্রীরা সামান্য স্বার্থপরতা বজায় রেখে চললে স্বামীকে উৎসাহিত করতে পারে বা উদ্দীপিত করতে পারে

তাহলে তুমি এখন আমাকে উৎসাহিত উদ্দীপিত করার চেষ্টা করো অন্তত এখন ডিনার করাতে উদ্দীপিত করতে পারলে...

আবার অরুময়ের ফোন বেজে ওঠে ধ্যাত্তেরিকা! — বলে অরুময় ড্রয়িং- গিয়ে ফোন রিসিভ করেনমস্কার!  

ভাই, আমি মিসেস নাথ, মানে বিদিশা বলছি

হ্যাঁ, বলুন দিদি!

প্রথমেই আপনাকে আবারও একবার ধন্যবাদ জানাবো দিদির কথা রাখার জন্য আপনি ওবেলায় ওঁকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ায় আমি সত্যিই নিশ্চিন্ত ছিলাম

আর এমন কি! ওসব ঠিক আছে আপনি যে বলেছিলেন, আজ সন্ধেবেলায় স্যারকে ডা. নির্বেদ দাশগুপ্তর কাছে নিয়ে যাবেন গিয়েছিলেন?

হ্যাঁ সে অনেক বুদ্ধি বের করে, প্ল্যান-পরিকল্পনা করে আমার দাদাই বুদ্ধিটা বের করল বিকেলে আমাদের বাড়ি এসে কথায় কথায় ওঁকে বলল, ‘‘ডা. নির্বেদ দাশগুপ্তডক্টরস ফোরাম’-এর একটা পদে আছেন ওর কাছে গিয়ে যদি কালকের প্রতিবাদ আন্দোলনের কথা বলতে পারো, তো ওদের ফোরামকে পাশে পেয়ে যাবে তুমি চাইলে আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি আমার সঙ্গে আলাপ আছে’’

ওঁর মাথায় তো ঘুরছে কালকের প্রতিবাদ, আন্দোলন এইসব উনি রাজি হয়ে গেলেন

ওঃ! স্যার দারুণ প্ল্যানটা বের করেছেন তো!  

হ্যাঁ, এদিকে ওরা বেরোতেই আমি ডা. নির্বেদ দাশগুপ্তকে ফোন করে বললাম আমাদের পরিকল্পনার কথা উনি বললেন, ‘গুড আইডিয়াআচ্ছা! উনি আরও বললেন, বিকেলে আপনি নাকি কোন এক টিভি চ্যানেলের সাংবাদিককে নিয়ে গিয়ে ওই প্রতিবন্ধী হোমের ব্যাপারে স্পিচ নিয়েছেন!

হ্যাঁ, উনি তো প্রতিবাদ আন্দোলনের পক্ষেই বলেছেন এখনসংবাদ প্রবাহশুরু হয়েছে টিভি চালান, শেষের দিকে এক ঝলক দেখাবে

হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখবো তো!

দিদি, বলছি যে এসব কথা থাক, ডাক্তার স্যারকে দেখে কী বললেন?

কী আর বলবেন! চিকিৎসা করার মতো করে তো দেখেননি ওইসব কথা বলতে বলতে অবজার্ভ করেছেন তারপর আড়ালে গিয়ে একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দাদার হাতে দিয়ে বলেছেন, ‘এই ওষুধগুলো খাওয়ান ঠিক হয়ে যাবে এক সপ্তাহ পরে কেমন থাকে জানাবেন কথাটা জানানোর জন্যই আপনাকে ফোন করলাম

যাক, ঠিক হয়ে গেলেই ভালো দিদি, বলছি যে, কাল সুখতলা রোডের পথ-অবরোধ প্রতিবাদ মিছিলে তো স্যার থাকবেন একটু সাবধানে থাকতে বলবেন ঝামেলা হতে পারে

ওরে ভাই! আমার কথা শুনলে তো! ভাবছি, আমিও সঙ্গে যাবো দাদাকেও আসতে বলেছি কী থেকে কী হয়, কিছু তো বলা যায় না

হ্যাঁ দিদি, এটা ভালো ভেবেছেন আমিও কাছেপিঠেই থাকবো চিন্তা করবেন না

হ্যাঁ ভাই, ভরসা পেলাম রাখি!

হ্যাঁ রাখুন

ফোন রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ডাইনিং- ডিনার রেডি করেছে অপালা

 

আঠারো

 

প্রায় সকাল থেকেই রাজা শুভবোধ স্কোয়ারে সাজোসাজো রব। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন পত্রিকা গোষ্ঠী তাদের রং  বেরঙের ব্যানার নিয়ে হাজির।লেখক-শিল্পী সংঘ’- বেশ কিছু সদস্য তাদের আঞ্চলিক কমিটির ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে পৌঁছে গেছে। কয়েকটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কালো পতাকা নিয়ে হাজির। একটু দেরিতে পৌঁছলেনপ্রফেসরস ফোরামএর কয়েকজন প্রফেসর। নটা নাগাদ শুভবোধ স্কোয়ার থেকে মিছিল বেরোনোর কথা। মিছিল শেষ হবে সুখতলা রোডেহ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার’-এর সামনে।

  পৌঁনে টা নাগাদ একটা সাদা গাড়িতে চড়ে পৌঁছলেন প্রফেসর অনিকেত নাথ, ওঁর স্ত্রী বিদিশা এবং বিদিশার দাদা . অশেষ সেনগুপ্ত প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করার জন্য যতজন মানুষ এসেছেন, প্রায় তার অর্ধেক সংখ্যক পুলিশকর্মীও হাজির রয়েছেন বেতের ঢাল, লাঠি ইত্যাদি নিয়ে তাছাড়া ছোটো বড়ো সমস্ত কাগজের সাংবাদিক-ফোটোগ্রাফার সরকারি-বেসরকারি টিভি চ্যানেলের রিপোর্টাররা মুভি-ক্যামেরা নিয়ে উপস্থিত  

  অধ্যাপক অনিকেত নাথ গাড়ি থেকে নামামাত্র কয়েকজন ফোটোগ্রাফার খচাখচ ফোটো তোলা শুরু করল দু-একজন টিভি মিডিয়ার সাংবাদিক প্রথমেই অনিকেত নাথের বাইট নেওয়ার জন্য ওঁর মুখের সামনেবুমবাড়িয়ে দিল বলল, ‘স্যার! এই প্রতিবাদ মিছিল গণ-অবস্থান কেন করতে চলেছেন, যদি একটু বলেন!’ কেউ বলল, ‘সরকারের বিরুদ্ধেই কি আপনাদের প্রতিবাদ?’ অন্যজন বলল, ‘প্রতিবন্ধী হোমে আপনার কি কোনও আত্মীয়া লাঞ্ছিতা বা নিগৃহিতা হয়েছে?’

  অনিকেত নাথ কার কথার উত্তর দেবেন, আর কার কথার দেবেন না বুঝে উঠতে পারেন না একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কথা ভাবতেই অন্য প্রশ্ন ছুটে আসে তার মধ্যেই উনি বলেনসরকারের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ নয় আমরা অরাজনৈতিক ভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, প্রতিবন্ধী নারীদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি তার জন্য আমরা মিছিল করে যাবো সুখতলা রোডেরপ্রতিবন্ধী হোমঅবধি আমাদের দাবি হল, যারা প্রতিবন্ধী মহিলাদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে, তাদের ওপর নির্যাতন করেছে, যৌননিগ্রহ করেছে, তাদের আইনানুগ শাস্তি দিতে হবে ব্যাপারে আমরা মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করছি

  যখন মিডিয়ারবুমঅনিকেত নাথের মুখের সামনে ধরা হচ্ছিল, তখনলেখক-শিল্পী সংঘ’-এর এবংছোটো পত্রিকা সম্পাদক সমিতি কয়েকজন সদস্য অনিকেত নাথের পাশে দাঁড়নোর জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে এতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় প্রফেসর নাথকে একটু ঠেলাঠেলিও সহ্য করতে হয় তা দেখে বিদিশা চিন্তায় পড়ে যায় মানুষটা অসুস্থ, তার মধ্যে মিডিয়া অনুচরেরা যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ওর মাথাটা আবার না বিগড়োয়! তাই বিদিশা ভিড় ঠেলে বেরিয়ে পুলিশকর্মীর কাছে যায় ওদেরকে বলেআমি প্রফেসর নাথের ওয়াইফ উনি কাল রাত থেকে বেশ অসুস্থ এখন মিডিয়ার লোকজন ওঁকে যেভাবে ঘিরে ধরেছেন, তাতে আবার উনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন প্লিজ! আপনারা একটু যান, ওঁর চারপাশটা একটু ফাঁকা করে দিন   

  কয়েকজন পুলিশকর্মী লাঠি হাতে ভিড়ের দিকে এগোয় ওরা ভিড়ের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে বোধহয় মজা দেখতে থাকে এমন সময় নিরুপমাকে নিয়ে অরুময় সেখানে পৌঁছয় সাংবাদিকদের ভিড় ঢেলে সোজা প্রফেসর নাথের কাছে অনিকেত নাথের বিব্রত অবস্থা দেখে অরুময় গলা চড়িয়ে নেতার ঢঙে বলতে থাকেবন্ধুগণ! আমরা প্রফেসর নাথ অন্যান্যদের কথা পরে শোনার সময় পাবো উনি কথা দিয়েছেন, স্পটে পৌঁছনোর পর পথ অবরোধ করার সময় একটা প্রেস কনফারেন্স করবেন তাই এখন আপনারা সরে দাঁড়ান প্রসেশনটা বের করতে সহযোগিতা করুন

  এরই মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিক নিরুপমাকে ঘিরে ধরেছে বাইট নেওয়ার জন্য সেখানেও হুড়োহুড়ি প্রায় সমস্ত সাংবাদিক অরুময় বসুকে চেনে কেন না, দু-বছর প্রেস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিল তাছাড়া বিগ হাউসের দুঁদে সাংবাদিক হিসাবে ওকে সবাই মানে তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই সাংবাদিকরা সরে দাঁড়ায় পুলিশকর্মী জন ভিড়ের পিছন থেকে এগিয়ে বিদিশার কাছে যায় বলেম্যাডাম, ভিড় হালকা করে দিয়েছি   

  নানারকম মত, অভিমত, প্রতিমতের পর সাড়ে টা নাগাদ আঁকাবাঁকা দুটি লাইনে মিছিল শুরু হয় মিছিলের সামনে এক দঙ্গল পুলিশ, তারও আগে একটা পুলিশের জিপ মিছিলের সামনের সারিতে প্রফেসর অনিকেত নাথ, ‘লেখক-শিল্পী সংঘ’- প্রধান সম্পাদক, ‘ছোটো পত্রিকা সম্পাদক সমিতি’- সম্পাদক, ড. অশেষ সেনগুপ্ত এবং নিরুপমা বিদিশা অনিকেতকে কাছ ছাড়া করতে রাজি নয়, তাই ঠিক অনিকেতের পিছনে কিন্তু সামনের সারিতে দু-একজন সুন্দরী মহিলা না থাকলে ফোটোগ্রাফাররা বোধহয় ছবি তুলে মজা পান না তাই বিদিশাকে ডেকে নেন নিরুপমার পাশে

  ট্র্যাফিক কন্ট্রোল থেকে আগেভাগেই ওই পথে যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তবুও গলি থেকে বেরিয়ে বেশ কয়েকটা গাড়ি আটকা পড়েছে সেগুলোর পিছনে সারি সারি মোটরবাইক পথচারীরা মিছিলের জন্য রাস্তা পার হতে পারছে না সব মিলিয়ে বেশ জ্যামজট হয়েছে

  মিছিল চলা শুরু হতেই পার্টির মিছিলের ঢঙে শ্লোগান শুরু করেছিল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে আসা কিছু লোকজন কিন্তু লেখক-শিল্পী সংঘের সদস্যরা এসে ওদের থামিয়ে দিয়ে বলে, — এমন শ্লোগান দেবেন না শুধু বলুন, ‘প্রতিবন্ধী হোম কেলেঙ্কারিতে দোষীদের শাস্তি চাই’, ‘নিগৃহিতা নারীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে’, ইত্যাদি   

  প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ মিছিলের মাথা সুখতলা রোডে পৌঁছয় তখন মিছিলের লেজ কলেজ রোডের কাছে অরাজনৈতিক প্রতিবাদ মিছিল হলেও লোকজন কিন্তু কম হয়নি! প্রফেসর নাথ ভাবতেও পারেননি যে মিছিলে এত মানুষ আসবে

  প্রতিবন্ধী হোমের সামনে আগে থেকেই পুলিশ মোতায়েন রয়েছে হোমের মহিলারা গেটের ভেতরে দাঁড়িয়ে তারা বেরিয়ে এসে পথ অবরোধ বা গণঅবস্থানে শামিল হতে চায় কিন্তু গেটের সামনে পুলিশ পাহারায় তারা কিছুতেই এই মহিলাদেরকে বেরোতে দিতে রাজি নয় মিছিলের আগে আগে আসা পুলিশের দল গিয়ে যুক্ত হয় এই পুলিশগুলোর সঙ্গে দেখে মনে হয়, হয় তো পুলিশদেরই মিছিল এখানে শেষ হল কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ফুটপাতে আশেপাশে পুলিশেরা পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় মিছিলের প্রথম সারি মেন গেটের সামনে পৌঁছতেই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কিছু সদস্য পিছন থেকে বেরিয়ে গিয়ে পাকা রাস্তার উপর বসে পড়ে কেউ বা আবার খবরের কাগজ পেতে শুয়ে পড়ে

  মিছিল শুরুর সময় শ্লোগানের আওয়াজ জোরে থাকলেও মাঝপথে তা মিইয়ে গিয়েছিল এখন আবার তা জোরদার হয়

  এখন রাস্তার মাঝখানটা যেন সেমিনার হলের মঞ্চ সেই মঞ্চে রয়েছেন প্রফেসর অনিকেত নাথ, নিরুপমা দাশগুপ্ত আরও কয়েকজন অধ্যাপক রয়েছেনলেখক-শিল্পী সংঘ’-এর প্রধান সম্পাদক ছোটো পত্রিকা সম্পাদক সমিতি সম্পাদক প্রফেসর নাথ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে আস্তে আস্তে এই গণঅবস্থানের কারণ ব্যাখ্যা করতে থাকেন রাস্তা বন্ধ করে জনগণের অসুবিধা সৃষ্টি করার জন্য কয়েকবার ক্ষমাও চেয়ে নেন

  ওঁর বক্তৃতা শেষ হতেই নিরুপমা বক্তৃতার ঢঙে চড়া  সুরে বলতে শুরু করে নিরুপমা দাশগুপ্ত ইতিমধ্যে গণমাধ্যমগুলিতে পরিচিত মুখ সপ্তাহ দুই ধরে তাকে নিয়ে কাগজে-টিভিতে হুল্লোড় চলছে তাই বক্তৃতার ভিডিয়ো করার জন্য টিভি মিডিয়াগুলোর সাংবাদিকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় বক্তৃতায় নিরুপমা বলতে থাকে প্রতিবন্ধী মহিলাদের জ্বালা-যন্ত্রণার কথা, এইহ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার’-এর দুর্নীতি অমানবিক কাজকর্মের কথা, এখানকার মহিলাদেরকে এম পি, এম এল এ কিংবা মন্ত্রীর বাড়িতে কাজে পাঠানোর ছুতোয় তাদের ওপর যৌন নির্যাতনের কথা, রাবেয়াকে মন্ত্রীর বাড়ি পাঠানো এবং তার আত্মহত্যার কথা, কিছুই বলতে বাদ রাখে না  

  অন্য একজন অধ্যাপক এবার বলতে ওঠেন তিনি দাবি জানানহোমের মালিক সুপারকে অ্যারেস্ট করেই যে প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ হয় না, এর পিছনে যে চক্র রয়েছে তা ভেঙে দেওয়া হোক এবংরাঘববোয়ালদের গ্রেফতার করা হোক

  অবশেষে বলতে ওঠেন একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্পাদক তিনি বলেনআমাদের কাছে খবর আছে, পুলিশ একজন ড্রাইভারকে অ্যারেস্ট করেছে যে ড্রাইভার রাবেয়াকে মন্ত্রীর বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল, সেই ড্রাইভারের জবানবন্দী সর্বসমক্ষে পেশ করতে হবে যে মন্ত্রীর বাড়িতে রাবেয়াকে পাঠানো হয়েছিল, সেই মন্ত্রীকে ইমিডিয়েট অ্যারেস্ট করতে হবে তাছাড়া এই হোমের অসহায় মহিলাদের থাকা খাওয়া, রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা কিংবা সরকারের এই হোম চালানোর দায়িত্ব নেওয়া উচিত সরকারেরজরুরী ভিত্তিতে এক সপ্তাহের জন্য এই হোম চালানোর দায়িত্ব নেবে আমাদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন’ — কথা বলতেই তুমুল হাততালি শুরু হয় হাততালি থামলে তিনি বলেনতারপর এই হোম চালানোর দায়িত্ব সরকার নিক ব্যাপারে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করেন সঙ্গে সঙ্গে শ্লোগান শুরু হয়ে যায়এখানে মুখ্যমন্ত্রীর আসা চাই ...

  আসা চাই আসা চাই ...

  এর মধ্যে স্থানীয় থানার .সি এসেছেন তিনি বক্তৃতা শুরুর আগেই প্রফেসর নাথকে বলেছেনস্যার! আপনাদের চল্লিশ মিনিট সময় দিলাম এর মধ্যে যা বলার বলে নিয়ে দয়া করে অবরোধ তুলে নিন

  এখন চল্লিশ মিনিট অতিক্রান্ত তাই ও সি এগিয়ে এসে প্রফেসর নাথকে বললেনস্যার, এবার ওদের থামতে বলুন অবরোধ তুলে নিন সমস্ত গাড়িঘোড়া আটকে রয়েছে এখন অফিস টাইম

  প্রফেসর নাথ বলেনহ্যাঁ, কথামতো এবার অবরোধ তুলে নেওয়া হবে

  তিনি বক্তৃতা থামানোর জন্য এগিয়ে যান কিন্তু অবরোধের লাগাম এখন আর ওঁর হাতে নেই তার দখল নিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ছদ্মবেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলের কিছু সদস্য তারা এখন রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারস্বরে সরকারের অযোগ্যতার কথা, প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা এবং মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে প্রফেসর নাথ এসব মোটেও চাননি তিনি এসব দেখেশুনে অত্যন্ত বিরক্ত ক্ষিপ্ত তাই চিৎকার করে বলতে থাকেন অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য কিন্তু এখন ওঁকে আর কেউ পাত্তা দিচ্ছে না বিদিশা অনিকেতকে থামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু উনি থামলে তো...!

  প্রায় এক ঘন্টা ধরে পথ অবরোধ চলছে অবরোধকারীরা ওদের অনুরোধ রাখেনি তাই বাধ্য হয়ে নীলবাজার থেকে নির্দেশ এসেছে ওদেরকে হুট আউট করার জন্য পুলিশ তবুও আর একবার অনুরোধ করে তাতে কাজ না হওয়ায়, জল কামান থেকে জল ছোঁড়া শুরু করে তাতে বেশিরভাগ মানুষই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় কিন্তু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কয়েকজন পুলিশকে লক্ষ্য রে ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে নিমেষে জায়গাটা রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় এবার পুলিশ নিরুপায় হয়ে টীয়ার গ্যাসের শেল ফাটানো শুরু করে

  প্রফেসর নাথ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা বুঝতে পারেননি তাই তিনি প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েন বিদিশা ওকে থামানোর চেষ্টা করে

  প্রফেসর নাথ হঠাৎ বিদিশার সামনে হাঁটুগেড়ে বসে হাতজোড় করে বলতে থাকেনম্যাডাম! ইউ আর দ্য সি.এম অফ দ্য স্টেট ইউ মাস্ট হ্যাভ টু ডু সামথিং দিজ হ্যান্ডিক্যাপড লেডিজ আর হেল্পলেস আপনিও একজন নারী, নারী হয়ে নারীর কষ্ট বুঝবেন না! ওরা প্রতিনিয়ত ধর্ষিতা হচ্ছে কোথায় গেছে আমাদের সমাজ! মানবিক মূল্যবোধের কিছু আর অবশিষ্ট নেই আপনি কিছু একটা করুন ম্যাডাম!  

  এমনিতেই টীয়ার গ্যাসে বিদিশার চোখ জ্বালা করছিল এখন অনিকেতের অবস্থা দেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে মানুষটা আবার পাগল-পাগল হয়ে গেছে এই আশঙ্কাই করছিল এখন কী যে করবে ভেবে পায় না দাদাকে ডেকে নিয়ে আসে দাদা অশেষ সেনগুপ্ত ওঁর ড্রাইভারকে ফোনে ধরার চেষ্টা করেন কয়েকবার রিং হওয়ার পর পেয়েও যান বলেন, গাড়িটা নিয়ে হোমের উল্টোদিকে চা-দোকানের কাছে আসার জন্য

  ড্রাইভার বলেগাড়ি অনেকটা দূরে পার্কিং আছে সামনে যা চলছে, মোটেও গাড়ি নিয়ে ওখানে যাওয়া সম্ভব নয় পারলে স্যারকে নিয়ে আস্তে আস্তে কলেজ রোডের দিকে এগিয়ে আসুন  

  নিরুপমা প্রফেসর নাথের কথাগুলো শুনে ভাবে, স্যারের নিশ্চয় মাথা গরম হয়ে গেছে তাই জলের বোতল খুলে বিদিশার হাতে দিয়ে বলেওঁর মাথায় জল ঢালুন ম্যাডাম এই রোদ-গরমে আর এইসব ঝামেলায় স্যারের বোধহয় প্রেসার বেড়ে গেছে

  বিদিশা মন্ত্রচালিতের মতো জলের বোতল খুলে অনিকেতের মাথায় জল ঢালতে থাকে অনিকেত কেমন স্তব্ধ হয়ে যান তারপর মাথায় হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলতে থাকেনএত রক্ত! এত রক্ত কোথায় থেকে এল! আমার শরীরে তো এত রক্ত থাকার কথা নয় তবুও রক্ত দিতে হবে সমাজের অধঃপতন রুখতে রক্ত দিতেই হবে আমার থিসিসটা কি রক্ত দিয়ে লিখতে হবে! হয়তো তাই... হয়তো তাই...!

  ইতিমধ্যে নিরুপমা চেষ্টা করতে করতে ফোনে অরুময়কে পেয়ে যায় প্রফেসর নাথের এই অবস্থার কথা জানায় অরুময় বলেআমি অনেক দূরে আছি সামনে টীয়ার গ্যাসের শেল ফাটছে তাড়াতাড়ি যাওয়া মুশকিল তুমি শিগগির পুলিশকে বলো, ওরা জিপে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাবে আমি পৌঁছনোর চেষ্টা করছি কোন জায়গায় আছো, বলো

  আমরা আমাদের হোমের উল্টোদিকের চায়ের দোকানের পেছনে আছি শিগগির এসো

  ফোন কেটে দিয়ে নিরুপমা বিদিশাকে বলেদাদাকে বলুন না পুলিশকে জানাতে! পুলিশ নিশ্চয় একটা ব্যবস্থা করবে  

  অশেষবাবু এগিয়ে গিয়ে একজন পুলিশকে অনিকেতের অসুস্থতার কথা বলেন সেই পুলিশ ও.সি-কে ফোনে জানায় মিনিট দশেকের মধ্যে একটা পুলিশ-ভ্যান চা দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় প্রফেসর নাথকে কোলপাঁজা করে ধরে ভ্যানে তোলা হয় সেইসঙ্গে . অশেষ সেনগুপ্ত বিদিশাও সঙ্গে যাওয়ার জন্য ভ্যানে উঠে পড়ে এদিকে প্রফেসর অনিকেত নাথকে জোর করে পুলিশ ভ্যানে তুলতে দেখে, মিডিয়ার সাংবাদিকরা পটাপট ছবি তোলা শুরু করে মুভি ক্যামেরায় ধরে মুহূর্তে খবর পৌঁছে যায় আন্দোলনকারী কয়েকজনের কাছে বিশেষত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার লোকজনের কাছে ওরা টীয়ার গ্যাসের ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে চোখেমুখে ভেজা রুমাল চাপা দিয়ে শ্লোগান দেওয়া শুরু করেঅন্যায়ভাবে প্রফেসর নাথকে অ্যারেস্ট করা যায় না যাবে না ...

  যায় না যাবে না ...

  সরকারের দালাল পুলিশ তুমি দূর হটো ...

  দূর হটো দূর হটো ...

  বিধায়ক এম.পি ছিঃ ছিঃ ...

  ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ ...

  অন্যায়ের বিচার চাই ...

  বিচার চাই বিচার চাই ...

  এবার পুলিশ তেড়ে এসে লাঠিচার্জ শুরু করে শ্লোগানকারীরা রণে ভঙ্গ দেয়

  অরুময় চায়ের দোকানের কাছে পৌঁছে দেখে, ওখানে প্রফেসর নাথ নেই এদিক ওদিক চোখে বুলোতে নিরুপমাকে দেখতে পেয়ে যায় ওর কাছে জানতে পারে প্রফেসর নাথ, তাঁর স্ত্রী স্ত্রীর দাদাকে পুলিশ ভ্যান তুলে হাসপাতাল নিয়ে গেছে

  অরুময় নিশ্চিন্ত হয় নিরুপমাকে বলেপরিস্থিতি খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে পুলিশ লাঠিচার্জ করছে এবার পুলিশ সামনে যাকে পাবে তাকে অ্যারেস্ট করবে তুমি আর মোটেও বাইরে থেকো না হোমের ভেতরে ঢুকে পড়ো চলো, তোমাকে রাস্তার ওপাশে পৌঁছে দিয়ে আসি

  অন্যসময় হলে নিরুপমা স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় বলত, ‘আমি নিজেই রাস্তা পার হতে পারবো, তোমার সাহায্য লাগবে নাকিন্তু এখন কেন যে অরুময়ের হাতটা ওর খুব ধরতে ইচ্ছে করে হাত বাড়িয়ে দেয় অরুময় নিরুপমার হাত ধরে রাস্তাটা পার হয় মেন গেটের সামনে গিয়ে বলেএখন আমি ইকবালকে সঙ্গে নিয়ে সোজা কাগজের অফিসে যাবো নিউজ রেডি করতে হবে তুমি ভিতরে গিয়ে কিছু খাবারের আয়োজন করো এতগুলো মহিলা তো রয়েছে

  অরুময় চলে যায় নিরুপমা বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত অরুময়ের গন্ধটা থাকে

উনিশ

 

পুলিশ-ভ্যানে প্রফেসর অনিকেত নাথকে তোলার পর উনি আরও উত্তেজিত হয়ে পড়েন কিছুতেই হাসপাতালে যেতে রাজি হন না অভিযোগ করেন, তাঁকে ইউনিভার্সিটির ভি. সি- পদ না দেওয়ার জন্য কায়দা করে পুলিশ-ভ্যানে তোলা হল এসবই পুলিশের কারসাজি সংবাদ মাধ্যমকে তিনি সব বলবেন এইসব নানা কথা বলতে থাকেন বিদিশা ওঁকে থামানোর চেষ্টা করতে থাকে বিদিশার দাদা গাড়িতে থাকা দু'জন পুলিশকে ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করেন, ওর মাথাটা গেছে, ওঁরা যেন কিছু মনে না করেন

  একসময় খুব অবসন্ন হয়ে অনিকেত কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যান তখন বিদিশার আরও ভয় করে, মানুষটার কিছু হয়ে যাবে না তো! কেমন নিস্তেজ হয়ে গেল! যেন খুব ঘুম পেয়ে গেছে এর চেয়ে বকবক করাটাই ভালো ছিল

  কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ-ভ্যান হাসপাতালে পৌঁছে যায় অনিকেতকে এমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হয় স্ট্রেচারে নয়, হেঁটে হেঁটেই যান উনি বিদিশা দাদা দুপাশে বগলদাবা করে হাতদুটো ধরে নিয়ে যায় প্রাথমিক পরীক্ষার পর ডাক্তার বলেনমারাত্মক কিছু নয়, বি.পি-টা একটু বেশি একটা ইঞ্জেকশন লিখে দিচ্ছি, কিনে এনে পুশ করিয়ে নিন আর অন্যান্য সিম্পটম যা দেখলাম, এবং আপনারা যা কেস-হিস্ট্রি বললেন, তাতে ওঁকে কাল নিউরো-সাইকায়াট্রিক .পি.ডি-তে দেখিয়ে নেবেন এখন ঘন্টাদুয়েক এখানে থাকুন পরে আর একবার বি.পি-টা চেক করব

  ইঞ্জেকশন দেওয়ার ঘন্টাখানেক পরে ডাক্তার এসে আর একবার ব্লাড প্রেসার মাপেন স্বাভাবিক দেখে বলেনবাড়ি নিয়ে যান উনি যে মেডিসিন খাচ্ছেন, তা চলবে কাল অবশ্যই নিউরো-সাইকায়াট্রিক .পি.ডি অথবা যে ডাক্তারের আন্ডারে ট্রিটমেন্ট চলছে, তাঁর কাছে নিয়ে যাবেন

  সেদিন রাতেই ডা. নির্বেদ দাশগুপ্তকে ফোনে সব জানানো হয় উনি পরের দিন সন্ধেবেলায় চেম্বারে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন পরের দিন ওঁর চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয় উনি সব কিছু শোনার পর কিছু ওষুধ বদলে দেন আর ইউনিভারসিটি থেকে কিছুদিনের জন্য ছুটি নিতে বলেছেন।    

  এখন অনিকেত সবসময় বাড়িতে ডাক্তারের নির্দেশকিছুদিন লেখা পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হবে সম্ভব হলে খবরের কাগজটা না পড়লেই ভালো হয় তবে মেয়েকে পড়াশোনা করানোতে বাধা নেই বই না পড়ে থাকা না গেলে, কবিতার বই পড়া যেতে পারে ডাক্তার বলেছেন, রোগটা হল টিপিক্যাল সিজোফ্রেনিয়া ইটস রেয়ার কেস সাবধানে নিয়ম মেনে চলতে হবে   

  তাই অনিকেত এখন বেশিরভাগ সময় ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার চেষ্টা করেন বিদিশা ওকে বাইরে খুব একটা বেরোতে দেয় না ওই স্কুল-বাসে দিয়ে আসা নিয়ে আসাতে যেটুকু বেরোনো হয় মেয়ের হোমটা করানো পড়ানোর দায়িত্ব বিদিশা একরকম জোর করেই ওর ওপর চাপিয়েছে যাতে কোনোকিছুতে এনগেজড থাকতে পারে

  অনিকেত প্রথম প্রথম বেশ কয়েকদিন খুব উৎসাহ নিয়ে  মেয়েকে পড়াচ্ছিলেন কিছুদিন পেরোতে উৎসাহে ভাটা পড়েছে মেয়েকে পড়াতে গিয়ে বড্ড বেশি বকতে হয় এর চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নাকি পড়ানো সহজ মেয়ের স্কুলের বই ছাড়া যখন অন্য বই পড়ার জন্য অনিকেতের মন ছটপট করে, তখন বিদিশা ঠিক বুঝতে পারে সঙ্গে সঙ্গেসঞ্চয়িতা’-খানা বুকসেল্ফ থেকে বের করে অনির হাতে ধরিয়ে দেয় অনিকেত অবশ্য কবিতাগুলো বেশিক্ষণ পড়তে পারেন না কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে রেখে দেন একসময় তিনি ধীর পায়ে ব্যালকনিতে চলে যান আকাশ দেখার চেষ্টার করেন

  ব্যালকনি থেকে আকাশ যে ভাল দেখা যায়, এমন নয় দুটো ফ্ল্যাটবাড়ির মাঝে এক চিলতে চারকোনা আকাশ ঘাড়, মাথা নিচু করতে করতে একদম মেঝেতে কান ঠেকালে সামনের বাড়ির ছাদের উপর দিয়ে অনেকখানি আকাশ দেখা যায় ওই বিশাল আকাশখানা দেখতে পাওয়াতেই যেন অনিকেতের বেশি আগ্রহ তাই ঘাড়-মাথা নিচু করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে যান তখন ঘুমিয়ে পড়েন

  ডাক্তার কিছু ওষুধ-পত্তর দিয়েছেন সবই ট্যাবলেট ওগুলো খেলে একটু ঘুমঘুম ভাব আসে বিদিশাও চায়, অনি একটু বেশি সময় ঘুমোক ওর মগজের বিশ্রাম দরকার তাই বিদিশা তখন অনির পাশে গিয়ে, ওর মাথাটা কোলের মধ্যে টেনে নিয়ে চুলে বিলি কেটে দেয় অনির চোখ বুজে আসে সে সময় অনির গোঁফদাড়িহীন মুখখানা বাচ্চার মুখের মতো মনে হয় বিদিশা সে মুখের দিকে আনমনে কতক্ষণ যে তাকিয়ে থাকে, কে জানে! ওদিকে হয়তো ডাল চড়িয়ে এসেছিল গ্যাস স্টোভে তা পুড়ে-ধরে একশা তখন হয়তো ভেবে চলেছে, মানুষটা ঠিকঠাক সুস্থ হয়ে উঠবে তো! সুস্থ হয়ে উঠলে আবার তো সেই গবেষণার কাজ! বিশ্বজুড়ে সমস্ত সন্ত্রাস, গণহত্যা, জিহাদ, ফিঁয়াদ, মুক্তিযুদ্ধ এসবের খুঁটিনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পড়বে, নোট নেবে এত যে মারদাঙ্গা, খুনোখুনি, সন্ত্রাস, লুণ্ঠন, মানবিক মূল্যবোধের অবনমন চলছে সারা বিশ্বজুড়ে, তা নিয়ে অন্য কারুর মাথাব্যথা নেই যত মাথাব্যথা যেন ওই মানুষটার! এসমস্ত বন্ধ করতে বলার দায়িত্ব যেন ওর একার ওপর বর্তেছে!

  ডাক্তার তো বললেন, কোনও জটিল বিষয়ে অতিমাত্রায় ভাবনা চিন্তা করতে থাকলে এরকম ইমোশনাল আউটবার্স্ট হয় আরও বললেন, ‘নট ওনলি সিজোফ্রেনিয়া, ইটস কেস অব আর্লি ডিমেনসিয়া অলসো সেইসঙ্গে রয়েছে এক্সিস্ট্যান্স ফোবিয়া আরও কী সব খটমট কথা বললেন সব শুনে বিদিশার মনে হয়েছে, অনির এতকিছু হয়নি ডাক্তার যেন একটু বাড়িয়েই বলছেন পেশেন্ট-পার্টিকে একটু চাপে রাখতে চাইছেন হয়তো! ট্যাবলেটও লিখে দিয়েছেন গাদাগুচ্ছের!

  চিকিৎসা ওষুধপত্তর, বিশ্রামের সাথে সাথে বিদিশা অন্যান্য টোটকাগুলোও চালিয়ে যেতে আগ্রহী কী থেকে কী হয়ে যায়, কে বলতে পারে! আসল কথা তো হল, অনিকে সুস্থ করে তোলা  

  বিদিশা আজ আর মেয়েকে স্কুলবাসে দেওয়ার জন্য অনিকে পাঠায়নি নিজেই গেছে ওকে স্কুলবাসে চড়িয়ে দিয়ে বাস ধরে নিউমার্কেট গেছে অনিকে বারম্বার সাবধান করেছে নীচে না নামার জন্য, বই না পড়ার জন্য খুব তাড়াতাড়ি ওর ফিরে আসার কথা ছিল কিন্তু ইঞ্চি হাইটের সাদালাফিং বুদ্ধাখুঁজে পেতে অনেক সময় গেল ইঞ্চি হাইটের হচ্ছে না, চার ইঞ্চি আর ইঞ্চিরবুদ্ধা’- বেশি একটা দোকানে ইঞ্চি পাওয়া গেল, কিন্তু ধবধবে সাদা রং নয় রংটা বাদশাহি মুক্তোর মতো ক্রিম রংয়ের অনেক খুঁজে একটা কিওরিও সপ-য়ে পাওয়া গেল আকাঙিক্ষত বস্তু পাক্কা ইঞ্চি হাইট, দুধ সাদা রং তবে দাম একটু বেশি পড়ল

  বিদিশা যখন ফিরল, তখন দুপুর প্রায় শেষ অনিকেত খাবার না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন শুধু ট্যাবলেট খেয়ে ওঁর ঘুম ভাঙিয়ে দরজা খোলাতে অনেকখানি সময় গেছে বিদিশার কলিংবেল-য়ের শব্দে ঘুম ভাঙেনি তাই দরজায় ধাক্কা

  তাতেও ফল হয়নি অবশেষে দরজার ফাঁকে মুখ লাগিয়ে রীতিমত চিৎকার করতে হয়েছে আশপাশের ফ্ল্যাটের দুএকটা জানলাও খুলেছে সে চিৎকারে কী লজ্জাকর পরিস্থিতি! ভেবেছে, ওকে ভেতর থেকে বন্ধ না করতে বলে, ইয়েল-লকের ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে গেলেই ভাল করত

  ওর ফিরতে দেরি হওয়াতে অনিকেত একটুও রাগ দেখাননি দরজা খুলে দিয়ে সোজা ঘরে ঢুকে গেছেন অথচ অসুখ হওয়ার আগেকার দিন হলে এতক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেচি করে সিলিং ফাটিয়ে ফেলতেন

  অবেলায় খাওয়া দাওয়ার পর বুদ্ধমূর্তিটা যথাস্থানে বসানোর জন্য অনেক সময় গেছে প্রথম অসুবিধা হল  নৈর্ঋত  কোণ খুঁজে না পাওয়া অনিকে জিজ্ঞেস করেছিল, কোনটা নৈর্ঋত কোণ! অনি বলেছে, ‘সাউথ-ওয়েষ্ট কর্ণার

  কোণ নির্ধারণ করার পর সমস্যা হল মূর্তি বসানোর পাটাতন লাগানো নিয়ে মেঝেতে তো আর মূর্তিটা নামিয়ে রাখা যায় না! এদিকে দেওয়ালে পাটাতন লাগাতে গেলে পেরেক বসানো দরকার পেরেক ঢোকেই না শক্ত দেওয়ালে অবশেষে শো-কেসটাকে সরিয়ে দেওয়া হল নৈর্ঋত কোণের দিকে সেই শো-কেসের মাথায় কোণ ঘেষে স্থান হল লাফিং বুদ্ধার! 

অনিকেতের প্রবল অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিদিশার মন রাখতে হাত লাগাতে হয়েছিলবুদ্ধ-প্রতিষ্ঠারকাজে কাজের শেষে ঘেমে নেয়ে যখন মূর্তিটার দিকে তাকিয়েছে দুজনে, দেখছে সাদা ধবধবে বুড়োটার কী হাসি! ওই হাসি দেখে দুজনের মনে দুরকম ভাবনার উদয় হয়েছে  

বিদিশা ভেবেছেমূর্তিটা সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত হতে পারায় খুশিতে হাসছে খিলখিলিয়ে যেন বার এসংসারের সমস্ত মুশকিল আসান করে দেবে হাসিমুখে

আর অনিকেত ভেবেছেন, মূর্তিটা ওদের বোকামি আর অন্ধবিশ্বাস দেখে হাসছে সেই মধ্যযুগে বুদ্ধদেব জন্মগ্রহণ করে ভারতবর্ষে ধর্মের সংকট মোচন করার জন্য শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন এখন যদি এরকম কোনও মানুষের সন্ধান পাওয়া যেত, যিনি এই বিশ্ব-সংসারকে হানাহানি, মারামারি, সন্ত্রাস, হত্যা এসব থেকে মুক্ত করে সমগ্র মানবজাতিকে এক সূত্রে গাঁথতে পারতেন! তাহলে ভাল হত তাহলে হয়তো প্রতিটি মানুষের ঘরের কোণে নয়, হৃদয়ের কোণে তিনি বাস করতেন

সদ্য প্রতিষ্ঠিত মূর্তির দিকে তাকিয়ে, শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বিদিশা ভেবেছে, লাফিং বুদ্ধা যখন বসানোই হল, তখন ক্যাকটাসগুলো দক্ষিণের জানলা থেকে সরানোই বা বাকি থাকে কেন! কিন্তু সমস্যা হল, উত্তরদিকে দরজা আর পুব-পশ্চিমে নিরেট দেওয়াল; ক্যাকটাসের টব সরিয়ে রাখবে কোথায়! অবশেষে ছোট্ট ব্যালকনিতে একপাশে ঠাঁই হল কাঁটাগাছগুলোর দোলনা দোলার জায়গা গেল কমে তা যাক, কোনও প্রকারে অনির সুস্থ হয়ে ওঠাটা এখন ভীষণ দরকার বাস্তুতন্ত্রের  গন্ডগোল এবার কেটে যাবে নিশ্চয়!

অনিকেতের এবং বিদিশার দাদার ঘোরতর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও, সামনের মঙ্গলবার এই ফ্ল্যাটে যজ্ঞ করার আয়োজন চলছে বউদির প্রচেষ্টায় একজন ভাল তান্ত্রিকের সন্ধান পেয়েছে বউদি তিনি গণনা করে বলেছেন, চার পোয়া দোষ আছে ফ্ল্যাটের দোষ কাটাতেঅলখ নিরঞ্জন তিল কাঞ্চন যজ্ঞকরতে হবে

সে যজ্ঞের জিনিসপত্রের বিশাল ফর্দ দেখে তো অনিকেতের মাথায় হাত! কিন্তু সংসারের হাইকম্যান্ড হল ঘরের বউ তার কথামতো না চললে শান্তি থাকে না তাই ব্যয়ভার বহন করতেই হবে সন্ধেবেলায় দাদা আর বউদি এসেছে খোঁজ খবর নিতে তারপর বউদি আর বিদিশা যজ্ঞের কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে গেছে চম্পাকেও সঙ্গে নিয়েছে মালপত্র বয়ে আনার জন্য কিছু উপরি উপার্জনের লোভে এবং যজ্ঞর মতো বিশাল কাজে সহযোগিতা করার লোভে সন্ধেবেলায় দুটো ফ্ল্যাটের কাজে ডুব মেরেছে

অসহায় সরকার বউদি আর মুখরা সরখেল গিন্নি দুজনেই ফোন করেছিল চম্পার মোবাইলেভীষণ শরীর খারাপবলেছে দুজনকেই তারপর মোবাইল ফোনের সুইচ অফ করে দিয়েছে

রাতে দাদা-বউদি নিজেদের ফ্ল্যাটে ফিরে যাওয়ার আগে বউদি হঠাৎ কী মনে করে বিদিশাকে ইশারায় একপাশে ডেকে নিয়ে চাপাগলায় বলেছে শোন বিদিশা! যজ্ঞ-টজ্ঞ যেমন হচ্ছে হোক তোমাকে একটা কথা বলি তুমি যেন মেয়েকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত দেখি রাতে বোধহয় অনির কাছে শোও না! ওকে একটু বেশি বেশি সান্নিধ্য দেওয়ার চেষ্টা কর, বুঝলে! সেক্সুয়ালি ডিস্যাটিসফায়েড হলেও পুরুষ মানুষের অনেক সময় এমন হয় ওকে ভাল রাখতে পারলে তবেই তো তোমার ভাল ব্যাপারটা মাথায় রেখ

বউদির কথাটা বিদিশার মনে ধরেছে সত্যিই তো অনেকদিন হল ওসব হয়নি আসলে অনিও কোনও তাগিদ দেখায়নি ওর পড়া আর লেখা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে তারপর অসুস্থ হয়ে পড়তে, দুশ্চিন্তায় ওসব ভাবনা মাথায় জায়গা পায়নি বউদি আজ ওই প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দিতে কেমন আনচান করে ওঠে মনটা তাই দাদা-বউদি রওনা দিতেই বিদিশা সাত-তাড়াতাড়ি মেয়েকে খাইয়ে দিয়েছে ওকে বিছানায় দিয়ে আসার পর, হালকা প্রসাধন সেরেছে গতবছর পুরী বেড়াতে যাওয়ার আগে অনির কিনে দেওয়া নাইট গাউনটা পরেছে তারপর মৃদুপায়ে অনির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে অনি ব্যালকনির দোলনায় বসে রয়েছে ওর হাতে আজকের খবরের কাগজ কখন যে কাগজটা বের করে এনেছে অনি,  দেখেনি বিদিশা কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় অনির চোখ আটকে রয়েছে বড় হরফের হেডলাইনে মুম্বাইয়ে তাজ হোটেলে জঙ্গি হামলা, মৃত চল্লিশ অনিকেত বুঝতেই পারেননি বিদিশা ওঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তাই বিদিশা ওঁর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য, আলতো করে কাঁধে হাত রাখে চমকে ওঠেন অনিকেত কে?

আমি

অনিকেত বিদিশার দিকে না তাকিয়ে বলেন ইয়েস!

এইআমিশব্দটাই যত অনিষ্টের মূলেআমিত্ব’- মানুষকে পশুতে পরিণত করছে মানুষ চায় একাধিপত্য যেখানেআমি’, আমার শৌর্য-বীর্য ক্ষমতা, যশ-খ্যাতি-প্রতিপত্তিটাই মুখ্য, বাকি সব গৌণ সেইআমিত্ববজায় রাখতেই কেউ ইরাকে সৈন্য পাঠায়, কেউ আফগানিস্তানে যুদ্ধবিমান পাঠায়, কেউ জঙ্গলমহলে মাইন পাতে, কেউ নন্দীগ্রামে গুলি চালায় কেউ জঙ্গি পাঠায় সাধারণ মানুষকে মারতে আবার কেউ হোম থেকে মহিলা নিয়ে গিয়ে তাকে ধর্ষণ করে এইআমি’ ...!

বিদিশা এবার ওর কাঁধ ধরে ঝাঁকায় আরে! আমি, মানে আমি বিদিশা, তোমার বউ!  

তুমি বউ হও আর মা হও, তুমি তো নারী নারী বহুক্ষেত্রেই গণহত্যার কারণ হয়ে ওঠে ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়েছিল এক নারীর জন্য তার নাম হেলেন ওর জন্য অসংখ্য মানুষ মারা গিয়েছিল

অনির গলার স্বর উত্তরোত্তর বাড়ছে বিদিশা তা শুনে ভেতরে ভেতরে ভাঙছে তবুও আপ্রাণ চেষ্টায় স্বাভাবিক কথা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তুমি ঠিকই বলেছ কিন্তু আমি তো হেলেন নই আমি তোমার দিশা

কথা বলতে বলতে বিদিশা প্রবল চেষ্টায় অনির মুখের কাছে মুখ নিয়ে যায় অনির দুগালে দুহাতের তালু রেখে বলে দেখ, আমাকে, আমি দিশা!

অনিকেত এক ঝটকায় বিদিশার হাত সরিয়ে দেন নো, ইউ আর নট দিশা! ইউ আর দেশ, মাদার ইন্ডিয়া ভারতমাতা তুমি সেই প্রাচীনযুগ থেকে তুমি ধর্ষিতা হচ্ছ শুধু কখনও হুনদের দ্বারা, কখনও মুঘলদের দ্বারা পর্তুগিজ, ইংরেজ, ফরাসী সব্বাই তোমাকে রেপ করেছে! ইয়েস! তুমি হ্যান্ডিক্যাপড হয়ে গিয়েছ, টিল ইউ আর গোয়িং টু বী রেপড! ধর্মগুরু, রাজনৈতিক নেতা, সন্ত্রাসবাদী, ভণ্ড বিপ্লবী সব্বাই তোমাকে ধর্ষণ করার ফন্দি আঁটছে আমি কিছুতেই আর তা হতে দেব না

কথা শেষ হতে না হতে দোলনা থেকে উঠে দাঁড়ান অনিকেত বিদিশার বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে যে কী করবে, কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না কয়েকদিন বেশ সুস্থ ছিল, আজ আবার হঠাৎ ....! অনিকেত উঠে বিদিশার দুকাঁধ চেপে ধরতেই বিদিশা হু হু করে কেঁদে ভেঙে পড়ে অনিকেতের বুকে

পাশের ঘরে অদ্রিজা তখনও ঘুমোয়নি বাবার চিৎকার শুনে বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছে বাবার কাছে যেতে সাহস হচ্ছে না মা কান্নায় ভেঙে পড়তে মেয়ে এবার ছুটে যায় বাবার কাছে বাবার হাত ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে কান্নাভেজা গলায় বলে বাপি! তুমি অমন করছ কেন? তুমি কি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেলে!

অনিকেত হঠাৎ কেমন বদলে যান মেয়ের হাতদুটো ধরে ক্লান্ত গলায় বলেন অজি-মা! তোর কী হয়েছে? তোর মায়ের কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন তোরা!

ঠিক তখনই বিদিশার মোবাইলফোনে বেজে ওঠে  যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে ...!’

বিদিশা উঠে গিয়ে ফোন ধরে দাদা ফোন করেছে

অনেকক্ষণ কথার মধ্যে একটা কথাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে লুনাটিক অ্যাসাইলাম  

কুড়ি

 

খবরের কাগজের প্রথম পাতায় একই বিষয়ের খবর কিন্তু এক-এক কাগজে এক-এক রকম ক্যাপশন কোনও  পত্রিকা হেডলাইন দিয়েছেবুদ্ধিজীবীদের শান্তিপূর্ণ গণ-অবস্থানে পুলিশের লাঠিচার্জ কোনো পত্রিকাতে হেডলাইনবুদ্ধিজীবীর ছোঁড়া ইটে পুলিশকর্মী আহত কেউ লিখেছেপ্রতিবন্ধী হোম বন্ধের পথে : মেয়েরা বিপাকে আবার কেউ লিখেছেসরকারকে প্রতিবন্ধী হোমের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা  

  বিভিন্ন পত্রিকা বিভিন্ন হেডলাইন দিয়ে কালকের খবরটা প্রকাশ করেছে কিন্তু একটা ব্যাপারে সব কাগজের অদ্ভুত মিল সেটা হল, হোমের মহিলাদের যৌন-নির্যাতনে মন্ত্রীর যোগ, ইঙ্গিত কোনও পত্রিকাতেই লেখেনি শুধুমাত্র অরুময়দের কাগজের খবরে ব্যাপারে একটা বাক্য খরচ করা হয়েছেপ্রতিবন্ধী হোমের আবাসিক, শিক্ষিকা নিরুপমা দাশগুপ্ত তাঁর বক্তৃতায় প্রতিবন্ধীদের ধর্ষণকান্ডে যুক্ত মন্ত্রীর গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন

  গতকাল রাত্রিবেলায় টিভির খবরেও কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! কোনও চ্যানেল দেখাচ্ছে পুলিশের জলকামান, টীয়ার গ্যাসের শেল ফাটানো লাঠিচার্জ কোনও চ্যানেল দেখাচ্ছে পুলিশকে লক্ষ্য করে পথ অবরোধকারীদের ইট ছোড়ার দৃশ্য কোনও চ্যানেল দেখাচ্ছে, বুদ্ধিজীবীদের মিছিলকে পুলিশ এসকর্ট করে নিয়ে যাচ্ছে, তার ক্লিপিংস আবার কেউ দেখাচ্ছে প্রফেসর অনিকেত নাথকে পাঁজাকোলা করে পুলিশ ভ্যানে তোলার দৃশ্য

  এসব দেখেশুনে, সকালবেলার চা খেতে খেতে অপালা ভাবতে থাকেমানুষ যেমন বিভিন্ন চরিত্রের হয়, তেমনি বিভিন্ন টিভি চ্যানেল খবরের কাগজের চরিত্রও বিভিন্ন সেগুলোর দর্শক এবং পাঠক-শ্রেণিও ভিন্ন তাহলে এক-এক শ্রেণির মনে এক-এক রকম ধারণা জন্মাবে এতে কি সত্যি সত্যিই কোনো সাধারণ জনমত তৈরি হবে? মানুষ কি একত্রিত হয়ে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে সরকারকে বাধ্য করবে? তা কখনও সম্ভব নয় গণ-মাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনই জনগণের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে দিচ্ছে তাদের মনে পারস্পরিক বিপরীত চিন্তাভাবনার বীজ বপন করছে তাহলে সমাজে বা মানুষের কল্যাণে গণ-মাধ্যমের  ভূমিকা কী! এরা কি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়? এরা কি নির্দিষ্ট কারও অঙ্গুলি হেলনে চলে? এদের কি নিজস্ব চরিত্র বা সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকতে নেই? কোনো না কোনো দলের মুখপত্র হতেই হয় একজন সাধারণ দেশবাসী হিসাবে -প্রশ্ন তোলার অধিকার তার আছে কিন্তু প্রশ্ন সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কোনও পত্রিকাই নেবে না এমন কি ওর স্বামী যে পত্রিকার সাংবাদিক, সে পত্রিকা এমন মনোভাবাপন্ন কোনও আর্টিকেল লিখে দিলে প্রকাশ করবে না

  অপালা পরক্ষণেই ভাবেতাহলে কি এই মিছিল, এই পথ-অবরোধ, এসবের কোনও গুরুত্বই নেই! দিয়ে কি অমানবিক কাজকর্মের জগদ্দল পাথরটাকে একচুলও নড়ানো যাবে না?

  -ব্যাপারে অরুময়ের সঙ্গে একটু আলোচনা করতে অপালার খুব ইচ্ছা করছে কিন্তু চা খাওয়ার পর অরু সকালের কাগজ পড়ছিল, তখন বলা যায়নি তারপর সেই যে ভয়েস-রেকর্ডার চালিয়ে আর বন্ধ করে লেখা শুরু করেছে তা আর শেষই হচ্ছে না! অপালা একসময় বিরক্ত হয়ে রান্নাঘরে ঢুকে যায় আজ রাধুঁনি মালতীদিছুটি নিয়েছে তাই নিজে হাতেই অপালাকে সবকিছু করতে হবে তারপর অরুময়ের বেরোনো, নিজের কলেজ

একসময় অরুময় ড্রয়িংরুম থেকে হাঁক পাড়েমালতীদি’, একটু চা হবে?

অপালা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসেআজ মালতীদিছুটি নিয়েছে

তাহলে তো আর ...!

কেন! আমার তৈরি চা কি মুখে রুচবে না?

না, সেটা নয় আসেনি, মানে তোমার খুব চাপ, তার ওপর চা করতে বললে ...!

খাবে যদি তাহলে বলো, হাতে বেশি সময় নেই

তাহলে বানাও দু-কাপ তোমার আর আমার

অপালা চা বানাতে রান্নাঘরে ঢোকে এই ফাঁকে অরুময় নিরুপমাকে ফোনে ধরেগুড মর্নিং!

গুড নয়, ভেরি ভেরি ব্যাড মর্নিং!

কেন কী হল?

কাল সন্ধেবেলা কাউন্সিলার দলবল নিয়ে আমাদের হোমে এসেছিল

তারপর?

সে একরকম প্রায় হুমকি দিয়ে গেল বলল যে, আমাদের জন্য যা হোক একটা ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছিল, এম.পি-কে বলেছিলএম.পি-কোটা কিছু টাকা স্যাংশন করিয়ে একটা ব্যবস্থা করে দিত কিন্তু যা ঘটনা কাল ঘটল, তাতে আর সহযোগিতার কোনও প্রশ্নই ওঠে না দেখা যাক, স্বেচ্ছাসেবীর ছদ্মবেশে বিরোধীদল কতদিন হোম চালায় এতদিন এখানকার মহিলাদের যথেষ্ট সম্মান দেওয়া হয়েছে কিন্তু দলের বদনাম যখন হয়েছে, তখন কী করে সম্মানহানি করতে হয়, তার কায়দা ভালোই জানা আছে

এসব কথা তুমি কাল রাতে জানালে না?

 নাঃ, এমনিতেই মন-মেজাজ ভালো নেই ভাবলাম, তুমিও ব্যস্ত থাকবে তাছাড়া কাউন্সিলার চলে যাওয়ার পর থেকে হোমে কারেন্ট নেই মোবাইলে চার্জ না থাকায় সু্ইচ অফ হয়ে গিয়েছিল সকালে গদাদা চায়ের দোকানে গিয়ে একটু চার্জ নিয়ে গেলাম তাই এখন কথা বলতে পারছি

রাতে কারেন্ট আসেনি?

নাহ!

ওহ! তাহলে অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে

হ্যাঁ, তাই মনে হচ্ছে দেখা যাক, আজ একবার থানায় যাবো , একটা কথা শুনে খুশি হবে, কাল কাউন্সিলার দলবল নিয়ে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে ভয়েস-রেকর্ডার অন করে দিয়েছিলাম রেকর্ড হয়েছে বলেই মনে হয় চালিয়ে দেখতে গেলাম, তো ব্যাটারি ডাউন লে বন্ধ হয়ে গেল তারপর তো...!

বাহ! এটা একটা দারুণ কাজ করেছো এখন চালিয়ে দেখো, ‘রেকর্ডিংঠিকঠাক হয়েছে কি না

হ্যাঁ, দেখতেই যাচ্ছিলাম তো তোমার ফোন ঢুকল

 ঠিক আছে, আমি রাখছি তুমি প্লে করে জানাও রেকর্ড ঠিকঠাক হয়েছে কি না

ঠিক আছে

অপালা দু-কাপ চা নিয়ে ডাইনিং- আসে এসময় চা খায় না কিন্তু অরুময়কে সঙ্গ দেওয়ার জন্যই হোক কিংবা ওর মনে বয়ে চলা ভাবনা অরুময়ের সঙ্গে শেয়ার করার জন্যই হোক, নিজের জন্যও চা নিয়ে আসে অরুময় চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে নিরুপমার ফোনের অপেক্ষা করতে থাকেরেকর্ডিং’-টা হয়েছে কিনা এটা জানা জরুরী ওটা হাতে পেলেই অনেকখানি কাজ হবে হুমকির একটা এভিডেন্স পাওয়া যাবে ওটা নিয়ে সোজা সি.-এর কাছে খবরটাও রেডি করে নিয়ে যাবে তারপর ওই কাউন্সিলারের মুখোশ খুলতে বেশিক্ষণ লাগবে না

অপালা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলেআজ তো পাঁচখানা পেপার নিয়েছো দেখলাম সব পেপারে কালকের খবরটা পড়লাম কোনটাকে বিশ্বাস করে নিজের মতামত গড়ে তুলবো বলো তো?

কেন এমন কথা?

আরে বাবা! এক এক কাগজ এক একরকম লিখেছে কোনটা ঠিক?

সবটাই ঠিক

তা আবার হয় নাকি!

হয় হয়, বনধ ডাকলে ফাঁকা রাস্তাও হয়, লোকভর্তি রাস্তাও হয় দোকানপাট বন্ধ থাকে, আবার খোলাও থাকে কী বলছো, কিছুই বুঝতে পারছি না

কাগজগুলোতে যা যা লিখেছে, সবই ঘটেছে কিন্তু যে কাগজ যা বোঝাতে চায়, সেই অংশটুকু ধরেছে, বাকিটা বাদ দিয়েছে যেমন যারা বনধ সফল দেখাতে চায়, তারা ফাঁকা রাস্তা ফাঁকা দোকানপাটের ছবি তোলে

আর যারা বনধ ব্যর্থ দেখাতে চায়, তারা লোক গিজগিজ করা রাস্তা খোলা দোকানের ছবি তোলে

, বুঝলাম তাহলে কোনও কাগজই নিরপেক্ষ নয়

পলিটিক্যালি নিরপেক্ষ বলে কিছু হয় না একটা না একটা পক্ষ নিতেই হয়

কেন! কোনও দলের হয়ে কিছু না লিখে যা ঘটনা তা লিখলেই হয়  

হয় না তোমাকে বোঝাচ্ছি ধর, তুমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছো দেখলে, একটা লোককে একদল লোক পকেটমার লে ধরেছে তাকে সবাই মিলে খুব পেটাচ্ছে তোমার দেখে মায়া লাগছে ভাবলে, লোকগুলোকে বলবে, ওকে আর না মারতে পরক্ষণেই ভাবলে, কী দরকার ঝুট-ঝামেলায় যাওয়ার! ওরা কি কথা শুনবে! থাক, কারও পক্ষ নেওয়ার কোনও দরকার নেই এমন ভেবে তুমি পাশ কাটিয়ে চলে গেলে তুমি কি নিরপেক্ষ থাকলে?

হ্যাঁ, আমি তো কিছু বললাম না

না, তুমি নিরপেক্ষ থাকলে না বাধা না দিয়ে, যারা পেটাচ্ছে তাদেরকে সাপোর্ট করলে যদি বাধা দিতে, তাহলে মার খাওয়া লোকটার পক্ষ নিতে

এভাবে তো ভেবে দেখিনি!

অনেকেইও ভাবে না, কিন্তু এটাই সত্যি এটা তোমারই সাবজেক্ট, বলা উচিত ছিল কিন্তু আমাদের জার্নালিজম- এটা পড়ানো হয় সংবাদ পরিবেশন মানে হলঅন্ধের হস্তিদর্শনবুঝলে! যে অন্ধটা হাতির কান ছোঁয়, সে বলে হাতি কুলোর মতো যে অন্ধ হাতির পা ছোঁয়, সে বলে হাতি থামের মতো

সে যাই হোক, আংশিক খবর ছাপলে তো পাঠকের কাছে ভুল বার্তা যাবে?

ভুল কেন হবে! সব খবরই ঠিক যে কোনও কাগজ কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্ট দলের পক্ষে যাবে, এমন খবর ওই কাগজ ছাপলেই সে ঠিক আর উল্টো খবর ছাপলেই সে বেঠিক

অপালা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় অরুময়ের মোবাইলফোন বেজে ওঠে তা দেখে অপালা খালি কাপদুটো নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে যায়

অরুময় ফোন রিসিভ করেই বলেঠিকঠাক আছে?

ফোনের প্রান্তে নিরুপমাহ্যাঁ, বেশ ভালোই রেকর্ড হয়েছে

ঠিক আছে তুমি কি আজ স্কুলে বেরোবে?

না, একবার থানায় যাবো আর একবার বিধায়কের অফিসে

ঠিক আছে, দশটা অবধি থেকো আমি তার মধ্যে আসছি

অরুময় দশটার একটু আগেই পৌঁছে যায়হ্যান্ডিক্যাপড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার’-এর সামনে মেন গেটে পুলিশ প্রহরা ইচ্ছে হলে আই-কার্ড দেখিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারতো কিন্তু ঢোকে না গদাদা চায়ের দোকানে সে নিরুপমাকে ফোন করে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিরুপমা আসে বলেমিনিট দশেক আগে কারেন্ট এলো ইলেক্ট্রিক সাপ্লাইয়ের লোকজন বাড়ির ভেতরে মেরামত করতে এসেছিল বলল, ‘কোনভাবে শর্ট-সার্কিট হয়েছে বাড়িতে আগুনও লেগে যেতে পারতো আপনাদের ভাগ্য ভালো যে, তেমন বিপদ হয়নিবলছি, আগুন লেগে গেলে ভালোই হতো, নাকি বলো! সমস্ত ল্যাঠা চুকে যেত

নিরু, তোমার মুখে এমন কথা শোভা পায় না একজন লড়াকু মহিলা বলেই, আজ তুমি মিডিয়াতে চেনামুখ এমন নেগেটিভ ভাবনা মাথায় আসে কী করে!

অনেক দুঃখে-কষ্টে এমন ভাবছি, জানো তো! আমাদের হোম একমাস চালানোর জন্য যে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অর্থ সাহায্য করবে বলেছিল, তারা শর্ত আরোপ করতে চাইছে

কী রকম?

ওদের চারজন প্রতিনিধি কিছুক্ষণ আগে হোমে এসেছিল মেন গেটে পাহারাদার কনস্টেবলের সঙ্গে অনেক ঝগড়া-ঝামেলা করে আমার ঘরে পৌঁছেছে যাই হোক, মাথা ঠান্ডা হওয়ার পর আলোচনা করতে করতে ওরা বলল, ‘আমাদের সংস্থায় আপনাদের কয়েকজনকে কাজে পাঠাতে হবে এখানেও তো ওরা কাজ করত এটা সহযোগিতা ছাড়া অন্য কিছু ভাববেন না সংস্থা চালাতে তো খরচ হয় আমরা সরকার থেকে তো কোনও অনুদান পাই না! কিছু ভালো মানুষ ব্যবসায়ীর সাহায্যে সংস্থা চলে

তুমি কী বললে?

আমি কথা দিইনি বললাম, ভেবে দেখি, সকলের সঙ্গে আলোচনা করি

ঠিকই বলেছ

আমার কী মনে হয় জানো অরু, এতদিন কুমিরের খপ্পরে ছিলাম, এবার হাঙরের খপ্পরে গিয়ে পড়বো ওরা মন্ত্রীর বাড়িতে দিনসাতেক রেখে ছিবড়ে করে ফেরত পাঠাতো এরা হয়তো নিয়ে গিয়ে মেয়েগুলোকে পাচার করেই দেবে একদম ভরসা পাচ্ছি না আর ভাবতেও পারছি না কী করবো তাই...!

শোনো! এত চিন্তা করো না কাল আমি আমাদের সি. - সঙ্গে দেখা করলাম ব্যাপারে আলোচনা হলো সি. বলল, তোমাদের এই হোম নিয়ে এমন প্রপাগান্ডা শুরু করবে যে, কয়েকদিনের মধ্যে সরকার হোমের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হবে নিজেদের মান বাঁচাতেই এটা করবে

এতে ওদের মান কীভাবে বাঁচবে বুঝলাম না

সব বুঝিয়ে বলবো এখন এখান থেকে চলো বাতাসেরও কান আছে একটা ট্যাক্সি ডাকি!

তারপর?

আমি আমাদের হাউসে যাবো ট্যাক্সিতে উঠে সবার আগে তোমার মোবাইলফোন থেকে ওইরেকর্ডিং’-টা আমার মোবাইলে নিয়ে নেবো পথে তোমাকে থানার সামনে নামিয়ে দেবো আর থানায় ঢোকার আগে মোবাইলে ভয়েস রেকর্ডার অন করার কথা তোমাকে মনে করিয়ে দেবো

নিরুপমা হেসে ওঠেএখন এটা আমি রপ্ত করে ফেলেছি এই যে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধিরা এলো, ওদের সঙ্গে কথোপকথনও রেকর্ড করে নিয়েছি

বাঃ! ট্যাক্সিতে উঠে দুটোই ট্রান্সফার করে দেবে বাট একটা কথা বলে রাখি, ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশনওই লোকগুলো কেউই কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নয় ওরা হলো সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোকজন ওরা যা কিছু করছে দলের স্বার্থে করছে এই ট্যাক্সি...!

নেহি যায়েগা সাব!

নেহি যায়েগা তো, গাড়ি কিঁউ নিকালা?

গারিজ যা রাহা হুঁ মিটার খারাব হ্যায়

ট্যাক্সিবালাদের মিটার জীবনে ঠিক হবে না কিছুদিনের মধ্যে সব ট্যাক্সিবালা মায়ের ভোগ মে যায়েগা ওলা-উবার জাঁকিয়ে বসছে যাও, হামেশা কে লিয়ে গারিজ কর দো বুরবাক কাঁহিকা!

ট্যাক্সিবালা কিছু বলতে বলতে ট্যাক্সি নিয়ে চলে যায় অরুময় মোবাইলফোন বের করেউবারবুক করে সাত মিনিট পরউবার’-এর গাড়ি চা দোকানের সামনে দুজনে উঠে বসে নিরুপমা হাতের স্টিক ফোল্ড করতে করতে বলেসরকার কেন হোমের দায়িত্ব নেবে বলো!

বলছি, তার আগে তুমি মোবাইলটা দাও, ‘শেয়ার ইটদিয়েরেকর্ডিং’-দুটো নিয়ে নিই

নিরুপমা অরুময়কে মোবাইলফোন দেয় অভ্যস্ত হাতে অরুময় রেকর্ডিং শেয়ার করে নেয় তারপর বলেযে ড্রাইভারটাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে, তাকে একটু কড়কানি দিতেই গলগল করে সব বলে দিয়েছে

কী বলে দিয়েছে?

এম.এল.-এম.পি-দের নাম সেগুলো রেকর্ডও করা হয়েছে এখন পুলিশের সঙ্গে সরকারের, মানে পার্টির দর-কষাকষি চলছে রেকর্ড গায়েব, তো পুলিশের প্রমোশন রেকর্ড ফাঁস, তো পুলিশের পানিশমেন্ট-ট্রান্সফার সুন্দরবন

তাতে হোমের কী লাভ হবে?

বলছি বলছি, এতো উতলা হয়ো না আমাদের স্পাই জানিয়েছে, ব্যাপারটা অলরেডি পাঁচকান হয়ে গেছে সি.এম-এর কান অবধি পৌঁছেছে সি.এম দোষী এম.এল. এম.পি-কে ডেকে আজ রুদ্ধদ্বার বৈঠক করবে আশা করা যায়, দলের মান বাঁচাতে এবং ইমেজ বাড়াতে কালকেই ঘোষণা করবে — ‘মানবিকতার কথা মাথায় রেখে আপাতত হোমের দায়িত্বগরমেন্টনেবেএছাড়া কয়েকজন পুলিশকে প্রমোশনও দিয়ে দেবে

এসব খবর তুমি পেলে কোথায়? ফোনে বলোনি তো!

সাক্ষাতে ছাড়া এসব বলা যায় না আমাদের চীফ এডিটর তো আদা-জল খেয়ে কেসটা নিয়ে পরে রয়েছে থানায়, পার্টি অফিসে আমাদের স্পাই আছেআসলি খবর’-এর জন্য তাদেরকে পে করতে হয় যাক গে, এসব কথা ছাড়ো আবেগে তোমাকে বলে ফেললাম এসব ট্রেড সিক্রেট, কাউকে বলতে নেই

ঠিক আছে, এসব শুনেও আমার কাজ নেই শুধু একটা কথা আমার জানার খুব ইচ্ছা বলবে?

বলো কী কথা!

বলছি যে, তোমাদের কাগজ, মানে চীফ এডিটর আমাদের হয়ে, কিংবা বলা যায়, এই হোমের হয়ে এতো ভাবছে কেন? কোনও স্বার্থ ছাড়া শুধুমাত্র সামজিক দায়বদ্ধতার কথা মাথায় রেখে এসব করছে, এটা বিশ্বাস হয় না

ঠিকই বলছ তুমি, দায়বদ্ধতা-মদ্ধতা ওসব গুলি মারো! সরকারি বিজ্ঞাপনের প্রায় হাফ টেনে নিচ্ছে মুম্বাইয়েরসময় গ্রুপ সরকারকে একটু প্যাঁচে ফেলে, সেটাকে নিজেদের ঝুলিতে না ভরতে পারলে কাগজের ব্যবসা লাটে উঠবে কাগজ বিক্রি করে নিউজ প্রিন্টেরও দামও ওঠে না বিজ্ঞাপন না পেলে ... এই যে তোমার থানা এসে গেছে এই নাও তোমার মোবাইলফোন আর ঢোকার আগে মনে করে ভয়েস রেকর্ডার অন করবে ভাই, একটু সাইড করবেন ম্যাডাম নেমে যাবে 

একুশ

 

এসময় বৃষ্টি হওয়ার কথা নয় তবুও আকাশ জুড়ে মেঘ বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ মেঘ-বৃষ্টি অপালার খুব পছন্দের আকাশে মেঘ জমলেই ওর মনে পুলক জাগে মেঘভরা আকাশের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকতে মন চায় তখন ঘরের কাজ করতে করতে কেমন আনমনা হয়ে যায় মাঝেমাঝে ব্যালকনিতে যায় গাছগুলোর ছটফটানি দেখে ওদের উল্লাসের শব্দ শুনতে পায় আগে অরুময়কে ডেকে শোনাতে চাইত গাছেদের হর্ষধ্বনি কিন্তু অরুময় শুনতেই পায় না বরং ওকেই পাগল ঠাওরায় তাই এখন আর ওকে ডাকে না তবে অরু ঘরে থাকলে এবং তখন বৃষ্টি নামলে ওকে না ডেকে পারে না বলেএকটুখানি ব্যালকনিতে এসো না! দুজনে গায়ে-মাথায় বৃষ্টি মাখি

বিয়ের পর প্রথম প্রথম দু-একবার বৃষ্টির সময় অরুময়কে টেনে নিয়ে ছাদেও গেছে প্রাণভরে বৃষ্টি মেখেছে গান গেয়েছে, ময়ূরের মতো নেচেছে এখন আর অরুময় যেতে চায় না

পরশু রাতের খবরে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলেছিল এই নিম্নচাপের কথা তাই অপালা গতকাল কলেজে গিয়ে, আজ আগামীকালের ছুটি জমা দিয়ে এসেছিল আবহাওয়ার পূর্বাভাস ভুল হলে ওর ছুটি দুটো অকাজে নষ্ট হতো কিন্তু আকাশে মন আকুল-করা মেঘ জমায়, অপালার মনের আকাশে অসাধারণ এক আলো ফুটে উঠেছে ব্যালকনিতে বসে আকাশে মেঘেদের যাওয়া আসা দেখছে পাহাড়-প্রমাণ মেঘগুলো অনায়াসে উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে একদিক থেকে অন্যদিকে তাদের নানারকম রূপ! কেউ জিরাফের মতো লম্বা গলা, কেউ বা সিংহের মতো কেশর ফোলানো, আবার কেউ যেন বিশাল  এক খরগোশ হয়ে দুটো কান খাড়া করে ছুটে চলেছে আকাশটা এখন যেন ধমক খাওয়া বাচ্চার জল-টলটলে চোখ! টসটস করছে জলে, এই বুঝি ভ্যাঁ করবে!  

অরুময় ড্রয়িংরুমে বসে কাগজ পড়ছে আলো কমে যাওয়ায় লাইট জ্বেলে দিয়েছে আকাশের মেঘটা যেন ওর দুই ভ্রুর মাঝখানে চেপে বসেছে আজ আগে থেকেই ওর অ্যাসাইনমেন্ট নেওয়া আছেনবকরণযেতে হবে   কাঁপদানিতে স্কুল-ছাত্রীকে ধর্ষণ তার মৃত্যুর প্রতিবাদে বিরোধী দল সি.এম-এর কাছে ডেপুটেশন দিতে যাবে তাই নবকরণের হাফ কিলোমিটার দূর অবধি ১৪৪ ধারা জারি থাকবে তবুও তা ভেঙে বিরোধীরা এগোতে চাইলে জলকামান, কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং গ্রেফতার কোনোটাই বাকি থাকবে না একটা জম্পেশ খবর হবে কিন্তু বৃষ্টি নামলে সব কেমন মিইয়ে যাবে প্রতিবাদটাও যেন নেতিয়ে পড়বে তাছাড়া বৃষ্টির মধ্যে ফিল্ড কভার করা খুবই অসুবিধা কিন্তু কিছু করার নেই এমন একটা কাজ, মেঘ-বৃষ্টি-রোদ্দুর সবেতেই যেতে হবে

অরুময় ভাবে, আজ একবার নিরুপমার সঙ্গে দেখা করতে পারলে ভালো হতো সে বেচারী খুবই আপসেট হয়ে পড়েছে রাবেয়া-টা সুইসাইড করল অনেকে হোম ছেড়ে চলে গেল যে জন আছে, তাদের খাওয়া-দাওয়ারও ব্যবস্থা নেই এখন অবধি সরকারের কোনও উচ্চ-বাচ্য নেই প্রশাসনও গায়ে হিমজল ঢেলে বসে আছে লম্পট মন্ত্রীটা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ছদ্মবেশে বিরোধী রাজনৈতিক দল সাময়িক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল তাদের শর্ত শুনে ভয় পেয়ে নিরুপমা তাদেরকেও বাতিল করে দিয়েছে খুব লড়াকু মেয়ে বলে নিজের বেতনের টাকায় হোমের মেয়েগুলোর অন্ন জুগিয়ে যাচ্ছে লড়াইটাকে জারি রেখেছে কিন্তু তা আর দিন সম্ভব হবে! হয়তো নিজে বাঁচার জন্য লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে চলে যেতে হবে একসময় বেচারী আশায় আছে, যদি সরকার কিংবা অন্য কোনও সংস্থা হোম চালানোর দায়িত্ব নেয় এখনও শেষ চেষ্টা হিসাবে আর একবার মহিলা কমিশনে যাওয়ার কথা ভাবছে কমিশনের চেয়ার পার্সন মিসেস বাগচীর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে আজ বিকেলে কিংবা কাল সকালে যাবে হয়তো

অরুময়ের মনে কষ্টের মেঘসামাজিক পরিবর্তন চেয়েছিল নিরু চেয়েছিল, প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়ের অভিভাবকদের মানসিক পরিবর্তন, সমাজের পরিবর্তন তাই ওকে কাগজে ডেইলিকলামলিখে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল এখনো প্রতিবন্ধীদের জীবন-যন্ত্রণাকলাম-টা চালিয়ে যাচ্ছে হয়তো বা প্রেমও চেয়েছিল মেয়েটা কখনও সখনও ওর কথায় ফুটে উঠেছিল প্রেম-প্রস্তাব সত্যিই প্রেমের কাঙাল কিন্তু কী ভেবে নিজেকে আবার গুটিয়ে নিয়েছে হয়তো বা পরিস্থিতি ওকে তা করতে বাধ্য করেছে

কাগজ পড়তে পড়তে কখন অরুময় এসব ভাবনায় তলিয়ে গিয়েছিল হঠাৎ ওর সম্বিত ফেরে গুরু গুরু মেঘের ডাকে বৃষ্টি নামল বোধহয়, এমন ভাবতে না ভাবতেই দমকা হাওয়ার মতো অপালা ব্যালকনিতে ছুটে আসে এসেই হাত ধরে টানতে থাকেএকবার এসো না! এসো না একবার! কাগজ পরে পড়বে দেখো, কী দারুণ মেঘ জমেছে! ওই যে শুরু হয়েছে বৃষ্টি চলো না গো আমার সঙ্গে ব্যালকনিতে! একটু বৃষ্টি যদি আমাদের গায়ে-মাথায় এসে পড়ে! হাওয়াটা বোধহয় এদিকেই

অপালার এই পাগলপনাকে অরুময় গুরুত্ব দেয় মা না-হতে পারা অপু এভাবে যদি একটু সুখী হয় তো হোক অপুর আকুল আহ্বান যেন দমকা বাতাস হয়ে অরুময়ের মনে জমে থাকা নিরুর মেঘটাকে উড়িয়ে দেয় বলেঅপু, তোমার ছেলেমানুষী এখনও গেলো না! দক্ষিণের ব্যালকনিতে বৃষ্টির ফোঁটা আসবে কী করে! হাওয়া তো পূর্ব থেকে পশ্চিমে তার চেয়ে বরং চলো, ছাদে যাই

 অপালা বিশ্বাস করতে পারে না অরুময়ের কথাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে অরুময়ের মুখের দিকে অরুময় বলে ওঠেকী হল! রাধিকা-সখীর মতো দাঁড়িয়ে রইলে কেন! বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা গায়ে না পড়লে মজাই পাবে না

অপালা মুগ্ধতা ভেঙে অরুময়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর বুকে মুখ গুঁজে হু-হু করে কেঁদে বলেতুমি আমাকে এখনও এতো ভালোবাসো!

অরুময় কোনও কথা না লে ওকে জড়িয়ে ধরে পায়ে পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে যায় আশপাশের ফ্ল্যাটগুলোর দরজা-জানলা বন্ধ কোত্থাও কোনও সন্দেহের চোখ ওদের দিকে তাকিয়ে নেই শুধু চিলেকোঠার ঘুলঘুলিতে দুটো পায়রা গায়ে গা লাগিয়ে জড়সড় হয়ে বসে রয়েছে তাদের চোখে লজ্জা, ভয়, নাকি কৌতূহল জমে রয়েছে, ওরাই জানে! হঠাৎ তুমুল বৃষ্টি নামে অপালা গান ধরে

  বক বক বক বক বকম বকম পায়রা তোদের

 রকম সকম দেখে

 মুখ টিপে যে হাসছে ভোরের আকাশটা

 দূরে থেকে ...দূরে থেকে ...

শাড়িটা একটু উঁচু করে কোমরে গুঁজে নিয়ে নাচতে শুরু করে অরুময় ছুটে গিয়ে অপালাকে জাপটে ধরে নাচ থামিয়ে দেয় অপালার চোখেমুখে রাগ প্রশ্ন মাখামাখি অরুময় বলেএসময় নাচতে নেই আমাদের হলুদ গোলাপ এখন কুঁড়ি হয়ে তোমার ভেতরে রয়েছে যে! তার কষ্ট হবে

অপালা লজ্জা পেয়ে অরুময়ের বুকে মুখ লুকোয় ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে ছাদের ঠিক মাঝখানে একে অপরকে জাপটে ধরে দাঁড়িয়ে দুজন নরনারী কোনও কথা না বলেও ওরা অজস্র কথা বলতে থাকে আচমকা তীব্র আলোর ঝলকানি আকাশের বুক চিরে দেয় ওদের চোখে ধাঁধা লাগে গুরু গুরু মেঘের ডাক তীব্র হয়ে বুকে বাজে অপালা বলে, চলো এবার নিচে যাই আমার ভারী ভয় করছে

নিচে নেমে এসে দুজনে ভিজে পোশাক খুলে ফেলেছে অরুময় অপালাকে শুকনো পোশাক পরার সময় দেয়নি ওকে টেনে নিয়ে গেছে শোবার ঘরে অপালা বলতে চেষ্টা করছে, ‘এখন নো দুষ্টুমি, আমার রান্না করা বাকিঅরুময় অপালার কথা বন্ধ করে দিয়েছে নিজের ঠোঁটদুটো ওর ঠোঁটের উপর চেপে এমন সময় টি-টেবিলে রাখা বে-আক্কেলে ফোনটা বেজে ওঠে বাজতেই থাকে, অরুময় ধরার ফুরসত পায় না

কিছুক্ষণ হল বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু আকাশে তালশাঁস রঙের মেঘ আয়নার মতো আলো ঠিকরোচ্ছে চরাচর জুড়ে এক অদ্ভুত মায়াময় আলো অপালার মনে, চোখেমুখে এক অনির্বচনীয় আলোর উদ্ভাস অরুময়ের মন থেকে মুছে গেছে তার কাজের ঝামেলার মেঘ, নিরুপমার বজ্রের ঝলকানি ওর মনে এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি মিসড-কল দেখেনির্বেদের ফোন হয়তো তার পেসেন্টের খবর নেবে অরুময় মুচকি হাসে, ব্যাটা নির্বেদ আবার তার পেসেন্টের প্রেমে পড়ল না তো! কল-ব্যাক করে নির্বেদের গলায় অভিযোগের সুরকোথায় যে যাস! নাকি সাতসকালে মিষ্টি বউটাকে আদর করছিলিস!

অরুময়ের কপট রাগএই! আমার বউ মিষ্টি না তেতো তুই কী করে জানলি! ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিস না তো!

নির্বেদ হালকা হাসেইচ্ছে তো করে, সাহস পাই না এখন কেমন আছে সে

ভালো, খুব ভালো তোকে একটা খবর জানানো দরকার অপু বোধহয় কনসিভ করেছে প্রেগ-টেস্ট পজিটিভ তবে এখনো ইউ.এস.জি করাইনি

গুড নিউজ! এবার তোর বউ একদম সুস্থ হয়ে যাবে আসলে ওর একটা স্ট্রেস রি-অ্যাকশন হয়েছে আস্তে আস্তে কেটে যাবে সবসময় খবরের পেছনে না দৌড়ে ওকে একটু সময় দিস!

হ্যাঁ, বুঝি একটু সময় দেওয়া দরকার দেখি, কী করা যায় বাথরুমে পরে তোকে ফোন করতে বলব

ঠিক আছে, ছাড়লাম রে!

সকালের দিকে বৃষ্টি হলেও দুপুরে বৃষ্টি থেমে গেছে শুধু মেঘের ছাতাটা সূর্যর সঙ্গে দুষ্টুমি করছে বিরোধীদলের নবকরণ অভিযান স্মারকলিপি পেশ করতে বেশি সময় লাগেনি পুলিশ যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে বলা ভালো, ওদেরকে শান্তির প্রস্তাব দিয়ে একটা প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছে নবকরণ অবধি বাকিরা ১৪৪ ধারা এলাকার বাইরে অরুময় ইকবালকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিনিধি দলের পিছন পিছন নবকরণের কনফারেন্স রুমে মুখ্যসচিবের কাছে স্মারকলিপি পেশ, পাঁচ মিনিটেই শেষ হঠাৎ একটা ফোন রিসিভ করার পর মুখ্যসচিব জানান, সি.এম এখুনি প্রেস কনফারেন্স করবেন সাংবাদিকরা প্রেস কর্নারে অপেক্ষা করুন

এটা পূর্বনির্ধারিত নয়, আচমকাই মুখ্যমন্ত্রীর স্বভাবই এমন চমক দিতে তিনি ওস্তাদ এমন ভেবে অরুময় ইকবাল অন্যান্য সাংবাদিকদের সঙ্গে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় মুখ্যমন্ত্রী প্রায় দৌড়িয়ে প্রেস কর্নারে আসেন স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ইংরিজি হিন্দী বাংলা মিশিয়ে অনেক কথা বলেন তার মধ্যেই ঘোষণা করেনকাঁপদানিতে ধর্ষিতা মেয়েটির দাদাকে চাকরি দেওয়া হবে আর সুখতলা রোডে যে প্রতিবন্ধীদের হোম রয়েছে, সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভবগরমেন্টদায়িত্ব নেবে পরে একটা ট্রাস্টি বোর্ড করে দেওয়া হবে আপাতত ওখানকার মহিলাদের দায়ভারগরমেন্ট’-এর

ঘোষণা শোনার পর আনন্দের আতিশয্যে অরুময় এটার শর্টহ্যান্ড করতেও ভুলে যায়  

 প্রেস কনফারেন্স শেষ হতেই অরুময় সোজা কাগজের অফিসে নিজের ডেস্কে বসে রিপোর্টটা তৈরি করতে বেশি সময় নেয় না তারপর চীফ রিপোর্টারের কাছে নিউজ জমা দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে আসে বাড়ি ফেরার জন্য ট্যাক্সির খোঁজ করতে গিয়ে, হঠাৎ তা না করে দুরপাল্লার বাসের টিকিট কাউন্টারে যায় আগামীকাল সকালে বকখালি যাওয়ার দুটো টিকিট কেটে নেয় তারপর বাইরে এসে চীফ রিপোর্টারকে ফোন করে বলেস্যার! খবর পেলাম, ওয়াইফ খুব অসুস্থ কাল-পরশু দুদিন আমার কোনও অ্যাসাইনমেন্ট রাখবেন না ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে মাথাটা একদমই গেছে বোধহয়

এরপর একটা ট্যাক্সিতে উঠে বলেসেন্ট্রাল পার্ক

ট্যাক্সিতে যেতে যেতে গুনগুন করে গানের কলি ভাঁজে নিরুপমাকে ফোনে ধরতে চেষ্টা করে কিন্তু কিছুতেই লাইন পায় না কল ড্রপ হয়ে যায় যখন প্রায় বাড়ির কাছাকাছি, তখন নিরুপমার ফোনফোন করেছিলে?

হ্যাঁ, ফোন ঢোকেনি

ঢুকবে কী করে! এয়ারপ্লেন মোডে ছিল যে! আমি ছিলাম মহিলা কমিশনের চেয়ার পার্সনের ঘরে জানো, উনি আশ্বাস দিলেনসরকার প্রশাসন এক সপ্তাহের মধ্যে কোনও ব্যবস্থা না নিলে, ওরা সরকারপক্ষকে অ্যার্টনির চিঠি পাঠাবে আর যা ব্যবস্থা নেওয়ার নেবে এবার একটা হিল্লে হবে বোধহয়!

নিরুপমার গলায় বেশ উচ্ছ্বাস সে উচ্ছ্বাসকে ছাপিয়ে অরুময় বলে ওঠেগুলি মারো তোমার মহিলা কমিশন কাল সকালে কাগজ খুলে দেখে নিও

কী দেখব?

এখন বলবো না

আরে বাবা, বলো না!

 উঁ-হু, আমার বলার সময় নেই, এখন ট্যাক্সি-ভাড়া মেটাচ্ছি

তুমি না ভীষণ বাজে লোক!

হ্যাঁ আমি জানি তো! কালকের কাগজে দেখবে...

কী দেখবো বলো!

দেখবে, অরুময় বসু নামের একজন বাজে লোক কিডন্যাপড ফ্ল্যাটে ঢুকছি রাখলাম এখন, পরে কথা হবে

অরুময় আজ একটু তাড়াতাড়ি ফ্ল্যাটে ফিরে গেছে এখনও সন্ধে নামেনি কলিংবেলের শব্দে অপালা দরজা খুলেছে অরুকে দেখে ওর চোখেমুখে বিস্ময় তা দেখে অরুময় বলে ওঠেকী হলো! ম্যাডামের মুখ কেনডাব্লিউহয়ে আছে? আমার তাড়াতাড়ি ফেরাটা বুঝি পছন্দ হলো না?

না, তা নয় বৃষ্টি এলো না, তুমি এলে তাই!

আমি বৃষ্টিকে ছুটি দিয়ে দিয়েছি নিজেও ছুটি নিয়েছি দুদিনের

কেন?

বৃষ্টির সঙ্গে হারিয়ে যাবো বলে ...আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো, হারিয়ে যাবো আমি তোমার কাছে ...

আরে বাবা ভেতরে এসো, লোকে দেখবে খালি ফাজলামি

না না ফাজলামি নয়, সত্যিই আমি তোমাকে নিয়ে দুদিনের জন্য হারিয়ে যাবো

কোথায় যাবো?

হেরন অনলি

সে আবার কী?

হেরন অনলিমানে বকখালি খুশি তো! বলেছিলাম না দুদিনের জন্য কাছেপিঠে কোথাও বেড়াতে যাবো

কীসে যাবো? গাড়ি করেছো?

বাসে যাবো

বাসে...! এখন আমার অবস্থায় বাসের ঝাঁকুনিতে... উঁ হুঁ হুঁ, আমি যাবো না

আরে সেই লঝঝরে বাস নয় হলো .সি ভলভো নো ঝাঁকুনি, কমফোর্টেবল জার্নি মি অ্যান্ড মাই সুইট হানি.... পুচু পুচু পুচু পুচু উমমমা! এই অপু, ‘অপালামানে কী যেন একটা বলেছিলে!

জানি না যাও বুদ্ধু ভুতুম একটা

অরুময়ের মনে খুশির আবেশ চা নিয়ে সোফাতে বসে টিভি অন করেছে এমন সময় নিরুপমার ফোন

হ্যাঁ, বলো

বলছি যে, এখন তুমি এতো ব্যস্ত থাকছ যে আমার সঙ্গে দু-মিনিট কথা বলারও সময় পাচ্ছ না!

আরে বাবা, সেসব কিছু নয় তোমাকে একটু সাসপেন্স- রাখার জন্য তখন কিছু বললাম না তাছাড়া আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে তো জানো, না আঁচানো অবধি বিশ্বাস নেই ভোজ খেলাম কিনা যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তাহলে কাল সকালে কাগজে একটা ভালো খবর পাবে সেটা তোমার লড়াইয়ের স্বীকৃতি তবে এখানে থেমে থাকলে চলবে না আরও কঠিন পথে তোমাকে পা বাড়াতে হবে নিরু আমি জানি, সে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো হিম্মৎ মনের জোর তোমার আছে সেইসঙ্গে বন্ধু হিসেবে আমি তো তোমার পাশে আছিই যখন ডাকবে, আমাকে পাবে প্রথম পর্যায়ে আমাদের জিৎ নিশ্চিত প্রায় এখন দ্বিতীয় পর্যায়ে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থার জন্য আমাদের লড়তে হবে

তুমি আশীর্বাদ করো, যেন সে লড়াইয়ে জয়ী হতে পারি আর ... আর ...

বলো, থামলে কেন!

না, কিছু না

বলো বলো!

না থাক, সব কথা বলা যায় না ভালো থেকো তোমার পাগলি বউটাকে ভালো রাখার চেষ্টা করো ছাড়লাম

শেয়ার করুন: