Cover

GYANACHARITMANAS

সম্মুখে বিস্তৃত জলরাশি। মধ্যাহ্নের সূর্যচ্ছটায় ঝিকমিক করছে তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গ। সেই উজ্জ্বল তরঙ্গরাশি দ্বারা কুলুকুলু শব্দে হাসি প্রক্ষেপ করে বয়ে চলেছে সর্বংসহা পুণ্যতোয়া। অনেক দূরে একটা পালতোলা মহাজনী নৌকা যেন চিত্র হয়ে ফুটে রয়েছে নীল আকাশের পটে। উত্তুঙ্গ পাল দেখে অনুমান করা যায় নৌকাটি ক্রমশ এগিয়ে আসছে।

শেয়ার করুন:

সম্মুখে বিস্তৃত জলরাশি মধ্যাহ্নের সূর্যচ্ছটায় ঝিকমিক করছে তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গ সেই উজ্জ্বল তরঙ্গরাশি দ্বারা কুলুকুলু শব্দে হাসি প্রক্ষেপ করে বয়ে চলেছে সর্বংসহা পুণ্যতোয়া অনেক দূরে একটা পালতোলা মহাজনী নৌকা যেন চিত্র হয়ে ফুটে রয়েছে নীল আকাশের পটে উত্তুঙ্গ পাল দেখে অনুমান করা যায় নৌকাটি ক্রমশ এগিয়ে আসছে  

  দূর থেকে দৃষ্টি সংবরণ করে ঘাটের সম্মুখের জলে নিক্ষেপ করতেই চোখে পড়ে একটি মানুষকে বস্ত্রখণ্ড দিয়ে গাত্র মার্জিত করার পর তিনটি ডুব দিয়ে উঠে আসছেন মানুষটি তাঁর কণ্ঠ থেকে কৃষ্ণনাম উচ্চারিত হচ্ছে ঘাটের মাথায় দাঁড়িয়ে গৌরকান্তি এক বালক কতই বা বয়স হবে তার! একাদশ উত্তীর্ণ সবে দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত ও ঘর্মাক্ত তাই গাত্রের উত্তরীয় খুলে ফেলেছে বালকটির স্কন্ধ থেকে আজানুলম্বিত দুগ্ধধবল উপবীত মুণ্ডিত মস্তক অঙ্গে আটহাতি ধুতি নগ্ন পদযুগল ধূলায় মলিন সে নির্নিমেষ চেয়ে রয়েছে কৃষ্ণনাম জপকারী মানুষটির দিকে সিক্ত বসন, শ্মশ্রুগুম্ফহীন মুখে স্মিতহাসি, কণ্ঠে তুলসীমালা পিতৃতুল্য বয়স তাঁর স্নিগ্ধ কণ্ঠে কৃষ্ণনাম কী মধুর লাগছে! জল থেকে উঠে ঘাটের সম্মুখে এসে মানুষটির মুখ উন্নীত হয় ছেলেটির সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় নিষ্পলক হয় মানুষটির মুগ্ধতা মাখানো চোখদুটি হাসি বিস্তীর্ণ হয় সন্নিকটে আসেন ছেলেটির সম্মুখে দাঁড়ান অকস্মাৎ মানুষটি ওই বালকের পদযুগল স্পর্শ করে জিহ্বাগ্রে ও মস্তকে অঙ্গুলি ছোঁয়ান বালক বিহ্বল ও আশ্চর্যান্বিত এ কেমনতর ব্যাপার! পিতৃতুল্য মানুষটি তার পদধূলি গ্রহণ করছেন! তার মনের কথা মুখে প্রকাশ পায় ঘটনা দেখে ঘাটের পাশে বটের ছায়ায় বিশ্রামরত অন্য দুটি বালক এবং তাদের অভিভাবক-সরূপ বর্ষীয়ান একজন মানুষও এগিয়ে আসেন

  ততক্ষণে কণ্ঠীধারী মানুষটি বালকের কৌতূহল নিরসনে বলতে শুরু করেছেন আমি বৈষ্ণব পদপিষ্ট হওয়া তৃণ থেকেও দীন হতে হয় প্রকৃত বৈষ্ণবকে আপনি ব্রাহ্মণ বংশজাত সদ্য দ্বিজ হয়েছেন আপনাকে প্রণাম না করে কি থাকতে পারি!

  সন্নিকটে তখন অন্য বালকদুটিও তাদের একজন বলে ওঠে জ্ঞানদাস আপনার চেয়ে বয়সে ছোট, ওকে প্রণাম করলেন যে ভারি!

  মানুষটি বিনয়ে বিগলিত তাতে কি! উনি যে ব্রাহ্মণ সদ্য ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেছেন বয়স দিয়ে কি সব কিছুর বিচার হয় বাছা!

  চটুল বালকটি মুখর আমিও ব্রাহ্মণ, আমার নাম বংশীবদন ঠাকুর, প্রণম্য মঙ্গল ঠাকুরের নাতি তাহলে আমাকেও প্রণাম করুন

  বৈষ্ণব বংশীবদনকেও প্রণাম করেন তৃতীয় বালকটিকে প্রণাম করতে উদ্যত হলে, সে সরে যায় না না, আমি ব্রাহ্মণ নই, আমি শূদ্র মনোহর দাস আমার নাম বৈষ্ণব তাকে প্রণাম না করে বক্ষে জড়িয়ে ধরেন তোমার স্থান তো বুকে জগাই-মাধাইও শূদ্র ছিল মহাপ্রভু কি তাদের বুকে জড়িয়ে ধরেননি!

  আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে বালক মনোহর, বৈষ্ণবকে প্রণাম করে বৈষ্ণব তার আরাধ্য কেশবকে সে প্রণাম উৎসর্গ করে মুক্তকণ্ঠে নাম জপ করতে করতে প্রস্থান করেন

  ওদের অভিভাবকসরূপ নৃসিংহবল্লভ মিত্র এগিয়ে আসেন এমন ঘটনা তাঁর পরিচিত তাই তিনি স্বাভাবিক তিনি হাসিমুখে প্রশ্ন করেন ওই বৈষ্ণব যাওয়ার সময় কোন্ রাগ আশ্রয় করে নামকীর্তন করছিলেন, কে বলতে পার?

  চটুল বংশীবদন কলকলিয়ে ওঠেমাশায়! আমি তো খোল বাজাই আমি রাগ-রাগিনীর কী জানি? তবে ওই গানে খোল বাজাতে বললে একতালা বাজাতাম আপনার প্রশ্নের উত্তর একমাত্র আপনার প্রিয় ছাত্র জ্ঞানদাসই দিতে পারবে

  জ্ঞানদাসের কর্ণে সে কথা হয়তো প্রবেশ করে না ও ঘাটের পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরের নৌকা দেখে, নদীর জল দেখে জলের দিকে এগিয়ে যাওয়া বটের ডাল থেকে খসে পড়া পাতার ভেসে যাওয়া দেখে মহাজনী নৌকাটি ক্রমশ ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে এ ঘাট থেকেও হয়তো অমূল্য সম্পদ আহরণ করবে ওই নৌকা, এমন ভাবে জ্ঞানদাস

এক সময় নৃসিংহবল্লভের তাড়নায় উথাল-পাথাল স্নান সেরে অনিচ্ছায় উঠে আসে বংশীবদন আর মনোহর ঘাটের জল তখন কর্দমবর্ণ ধারণ করেছে জ্ঞানদাস অনেক আগেই স্নান সেরে ঘাটের পাড়ে বটের ছায়ায় কেমন অন্যমনস্ক, চুপচাপ, শান্ত কিংবা সমাহিত

  ওকে দেখে নৃসিংহবল্লভ ভাবতে থাকেননিশ্চয় ও গভীর কিছু ভাবনায় নিমজ্জমান এরপরেই হয়তো এমন কিছু করবে, যা অভূতপূর্ব সঙ্গীতগুরু হলেও তিনি জানেন, তাঁর এই প্রিয় ছাত্রটির আচার আচরণ কান্দরার পূর্বপাড়া আর তাঁর বাসস্থান রাজুরগ্রাম এমন কিছু দূরবর্তী নয় মনে পড়ে যায় ওর শিক্ষাগুরু, বন্ধুবর জয়গোপাল দাসঠাকুরের কাছে শোনা বছর সাতেক আগের সেই ঘটনাসেদিন কান্দরা গ্রামের পূর্বপাড়া তোলপাড় কল্পনাথ  দেবশর্মণের বাড়ির মানুষজন শশব্যস্ত হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন কল্পনাথের নয়নের মনি, আদরের ধন পাঁচ বছরের গেনুকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না গেনুর মা উর্জস্বীদেবী মুহুর্মুহু মূর্চ্ছা যাচ্ছেন আত্মীয়-পরিজন গেনুর অমঙ্গল আশঙ্কায় রোদন করতেও পারছেন না কেউ ভাবছেন, ‌‘পূর্ব পুকুরের বাঁশতলা ঘাটের মাথায় ধুলোবালি নিয়ে খেলছিল ছেলেটা জলে পড়ে গেল না তো!’

  পূর্বপুকুর তোলপাড় পাওয়া গেল না তবে কি সোনার বরণ ছেলেটাকে কেউ চুরি করে নিয়ে পালালো!

  ইত্যাবসরে মাঝের পাড়া থেকে ক্রিয়াকর্ম সেরে গৃহে প্রত্যাবর্তন করছিল পূর্বপাড়ার পরানের মা হৈ-হট্টগোল কর্ণে প্রবেশ করতেই দন্ডায়মান হলো সবকিছু শ্রবণ করে বললঅ মা গো! এ জানলে আমি কোলে করে লিয়ে আসতাম ছেলেটাকে আমি মনে করিচি দাসঠাকুরের টোলে নেকাপড়া করতে এয়েচে বুজি! দেকো গা, ওখানে পাবা তোমাদের ছেলেটাকে  

  সকলে তড়িৎ গতিতে ধাবিত হলো মাঝের পাড়ার জয়গোপাল দাসঠাকুরের চতুষ্পাঠীতে পশ্চাতে উৎকন্ঠিত কল্পনাথ পৌঁছে গিয়ে দেখেন অন্যান্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে অম্লান বদনে বসে রয়েছে গেনু, আদরের জ্ঞানদাস

  জিজ্ঞাসাবাদ করতেই জয়গোপাল বললেন! আপনার পুত্র এটি! ওইটুকু দুধের শিশুকে প্রথমদিনে সঙ্গে না এনে একা পাঠালেন কেন ঠাকুরমশাই!

  কল্পনাথ বিব্রতনা না, আমি পাঠাইনি ও নিজেই কীভাবে চলে এসেছে! ওকে তো তোমার চতুষ্পাঠীতে পড়ানোর কথা ভাবিইনি আমি

  জয়গোপাল দাসঠাকুর কিছুটা ম্রিয়মান সত্যিই তো তাঁর চতুষ্পাঠীতে কোনও ব্রাহ্মণ সন্তান শিক্ষালাভ করতে আসে না তিনি একে কায়স্থ, তাই চতুষ্পাঠী চালানোয় ব্রাহ্মণদের চক্ষুশূল ওঁদের সন্তানেরা বিদ্যার্জন করে বামুনপাড়ার রামরাম পন্ডিতমশাইয়ের টোলে তাহলে এ শিশুটি কীভাবে ...!

  কল্পনাথ বলেনগেনু, উঠে এসো, বাড়ি চলো বাবা!

  গেনুর অর্ধোচ্চারিত আবদারআমি যাবো না, গুলুমছাইয়ের কাছে পলবো

  পুত্রের বাক্য শুনে বিমোহিত কল্পনাথ অবোধ শিশু সেই পূর্বপাড়া থেকে এতটা পথ একা একা চলে এসেছে! অন্য কোথাও নয়, চতুষ্পাঠীতে তারপর ওই কায়েতের পো জয়গোপালকে সে নিজেই গুরু বলে স্বীকার করে নিচ্ছে তবে কি এটা শ্রীরাধাগোবিন্দর ইচ্ছা!

  কল্পনাথ কিংকর্তব্যবিমূঢ় জয়গোপাল বলে ওঠেনঅবোধ শিশু চলে এসেছে এখানে আপনি বরং ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যান ঠাকুরমশাই

  কল্পনাথ ছেলের গাত্রোত্থানের প্রচেষ্টায় রত জ্ঞানদাস নাছোড়বান্দানা, আমি পলবো গুলুমছাইয়ের কাছে

  সেই মুহূর্তে কল্পনাথ ঠাকুরের মনে পড়ে যায় বংশীধর আচার্যের ভবিষ্যৎবাণী, ‌‘কল্পনাথ! তুমি মহা ভাগ্যবান! তোমার পুত্রের ধনুরাশি, চন্দ্রলগ্ন, দেবগণ, বিপ্রবর্ণ গুরুস্থানে বিরাজ করছেন দেবগুরু বৃহস্পতি ওর বিদ্যাস্থানে বুধ মহাজ্ঞানী হবে তোমার পুত্র ওকে স্বাধীনভাবে শিক্ষালাভ করতে দিও

  কল্পনাথ কয়েক পল বাক্যহারা থাকেন তারপর বলে ওঠেননা গো দাসঠাকুর! ও যখন নিজে এসে তোমাকে গুরু সম্বোধন করেছে, তুমিই ওর বিদ্যাশিক্ষার দায়ভার নাও আজ বৃহস্পতিবার, শুক্লা পঞ্চমী তিথি এমন শুভ লগ্ন তো ও নিজেই বেছে নিয়েছে

  নৃসিংহবল্লভ ভাবেন, এই সেই পাঁচবছরের গেনু জয়গোপাল দাসঠাকুরের কাছে বিদ্যার্জন করে আজ বেদজ্ঞ পন্ডিত হয়ে উঠেছে ওর চিন্তাভাবনায় গভীরতা তো থাকবেই! পরক্ষণেই আকাশের পানে তাকিয়ে চিন্তিত হন তিনি বেলা বয়ে যায়

  তাই উনি বলে ওঠেনএস, ফলাহার সেরে নিই আবার যে এতটা পথ হেঁটে সূর্যাস্তের আগে গ্রামে পৌঁছতে হবে

  জ্ঞানদাস ফলাহারেও মনঃসংযোগহীন তা দেখে ওর বন্ধু বংশীবদন বলে ওঠেসেই বৈষ্ণবের প্রণাম পেয়েই জ্ঞানের পেট ভরে গেছে মাশায় ফল খেতে পারছে না

  জ্ঞানদাস অস্ফূটকণ্ঠে বলেতুইও তো লোভে পড়ে প্রণাম চেয়ে নিলি ব্রাহ্মণের অধিকার বজায় রাখতে তোর পেট ভরল না কেন?

  তুই তো কালকের বামনা! মঙ্গল ঠাকুরের নাতির পেট কি এত সহজে ভরলে চলে রে! তুই না খেলে তোর ভাগের ওই দুগণ্ডা মর্তমান কলাও আমি খেয়ে নিই, দে!

  জ্ঞানদাস অবহেলায় কলার ছড়া দিয়ে দেয় পেটুক বংশীবদনকে কলাপাতায় অবশিষ্ট ভিজে আতপচালটুকু মুখে পুরে চর্বন করতে থাকে তার স্বাদে কিংবা তৃপ্তিতে ওর মুখে এক অনির্বচনীয় হাসি ফুটে ওঠে ঠিক যেন সেই বৈষ্ণবের হাসির ছটা ওর মুখে!

  বংশীবদনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাটা নিঃশব্দে অনুরণিত হতে থাকে নৃসিংহবল্লভের কানে ও মনে, ‌‘মঙ্গল ঠাকুরের নাতির পেট কি এত সহজে ভরলে চলে রে!‌'

  সত্যিই কান্দরা গ্রামে মঙ্গলঠাকুর এখন একটি উজ্জ্বল নাম কান্দরা ও আশপাশের গ্রাম জুড়ে এখন তাঁর প্রতিপত্তি তিনি যা বিধান দেন, সেটাই সকলে মেনে নেয় অথচ এই মঙ্গলঠাকুর কান্দরার ভূমিপুত্র নন মুখসুদাবাদের কিরীটকোণা গ্রামে তাঁর জন্ম পিতৃদেব ছিলেন কিরীটেশ্বরী দেবীর সেবাইত রামনৃসিংহ চট্টোপাধ্যায় মঙ্গলঠাকুর প্রায় বারো বছর বয়সে গৃহদেবতা নৃসিংহদেবের শালগ্রাম শিলা মাথায় নিয়ে এক মধ্যরাতে বেরিয়ে পড়েন ভরতপুর হয়ে কান্দরা গ্রামে পৌঁছন সেই থেকে কান্দরাতেই তাঁর অবস্থান, খ্যাতি ও প্রতিপত্তি সে এক ইতিহাস শুনেছেন রাজুর গ্রামের সর্বাপেক্ষা বর্ষীয়ান মানুষ বংশীধর আচার্য মহাশয় ও স্বয়ং মঙ্গলঠাকুরের মুখ থেকে ভাবেন, আজ গ্রামে ফেরার পথে জ্ঞানদাসকে শোনাবেন সে কাহিনী এতে ওদের পথশ্রমও লাঘব হবে আর ও জানবে ওর বন্ধু ও গুরুভাই বংশীবদনের ঠাকুরদাদার কীর্তিকাহিনী

  এসব ভাবতে ভাবতে নৃসিংহবল্লভ স্নেহভরা দৃষ্টিপাত করেন বালক তিনটির দিকে ইতিমধ্যে তারা ফলাহার সেরে জলপান করার জন্য নদীতে নেমেছে তিনি নিজেও সামান্য ফলাহার সেরে নেন

  একসময় চলমান সূর্যটা যেন ক্লান্ত হয়ে পাটে বসে কিন্তু চারজন মানুষের কোনও ক্লান্তি নেই বর্ষীয়ান মানুষটি পথ চলতে চলতে বলে চলেছেন প্রাচীন ঘটনা তিনটি বালক সাগ্রহে শুনতে শুনতে পথ চলার ক্লান্তিকে উপেক্ষা করছে তার মধ্যে একটি বালকের বুক গর্বে স্ফীত হয়ে উঠছে কেন না, তারই ঠাকুরদার কীর্তি-কাহিনীই বলে চলেছেন সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভ পথশ্রমে পরিশ্রান্ত তিনি পথ-পার্শ্ববর্তী পুষ্করিণী থেকে দুই গন্ডুষ জলপান করে নিয়ে পূর্ণ উদ্যমে আবার শুরু করেন — ‌“সদ্য দ্বিজ হওয়া একাদশোত্তীর্ণ বালক মঙ্গল চট্টোপাধ্যায়ের কোমল মন কিছুতেই মেনে নিতে পারে না ওই নৃশংসতা কিরীটেশ্বরীদেবীর মন্দিরের পাষাণচত্বরে অজস্র ছাগ-শিশুর বলিদান ও রক্তস্রোত তার মনে কষ্ট, ঘৃণা ও তিতিক্ষার জন্ম দেয় মায়ের কাছে সে কথা ব্যক্তও করে বালক মঙ্গল পিতৃদেব রামনৃসিংহের কর্ণে সে কথা প্রবেশ করতেই তিনি ক্রুদ্ধ হন পুত্রকে বলপূর্বক সম্মুখে এনে তাঁর দাম্ভিক উক্তি, 'বহুজন্মের পুণ্যফলে তুমি কিরীটেশ্বরী দেবীর সেবাইত কাশ্যপ গোত্রীয় চট্টোপাধ্যায় বংশে জন্মগ্রহণ করেছ সেটাকে অবজ্ঞা করে নিজের জীবনের অমঙ্গল ডেকে এনো না মঙ্গল বংশমর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করো

  পিতৃদেবের একথা শুনে বালক মঙ্গল স্থির করে এই নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা সে কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না, গৃহত্যাগ করবে যেমন ভাবনা তেমন কাজ পরের রাত্রিতেই বালক মঙ্গল গৃহত্যাগ করে একা নয়, সঙ্গে নেয় গৃহদেবতাকে তার মনে হয়, রক্তখাকী দেবী কিরীটেশ্বরীর সেবকের ঘরে ক্ষমার অবতার নৃসিংহদেব খুবই বেমানান তাই রজত সিংহাসনে রাখা মখমলে ঢাকা নৃসিংহদেবের শালগ্রাম শিলা মস্তকে নিয়ে নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করে

  রাত্রিশেষে প্রত্যুষে পৌঁছয় ভরতপুর গ্রামে সেখানে হৈমন্তিক অমানিশা শেষে গোঁসাইবেশে, খঞ্জনি বাজিয়ে, ভৈরবী রাগ কন্ঠে নিয়ে টহল দিচ্ছেন গদাধর গোস্বামী

জাগত পুরবাসি নিদ নিছন

    দিননাথ উদিত করমে মগন ...”

পথিমধ্যে কুয়াশা ভেদ করে হঠাৎ তাঁর চোখে ধরা পড়ে দেবদূতের মতো দিব্যকান্তি এক বালক, মাথায় দেবসিংহাসন গদাধর গোস্বামী ভাবেন, তিনি যেন এই বালকের জন্যই অপেক্ষমান ছিলেন, এমনভাবে তাকে সমাদরে নিয়ে যান আশ্রমে বালক মঙ্গলও অনুভব করে, এই গোঁসাইজির সান্নিধ্যে তার স্বজন হারানোর ব্যথা লাঘব হচ্ছে মনে হয়, গোঁসাই যেন তার জন্ম-জন্মান্তরের আপনজন সে নিজের অজ্ঞাতেই তাঁকে ‌‘গুরুদেববলে সম্বোধন করে

গদাধর গোঁসাইয়ের মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত হয় ‌‘গুরুদেবডাক শুনে তিনি বলেন, ‌‘ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করলেও তুমি যে পরম বৈষ্ণব তোমার আচার-আচরণে সেটাই প্রকাশ পায় তুমি আমাকে ‌‘গুরুদেবডেকেছ তাই তোমাকে আমি দীক্ষা দেব এই আশ্রমের গৌরগোপাল বিগ্রহের সেবার দায়িত্ব তুমি নাও, সেটাই গোপালের ইচ্ছা আমি যাব নবদ্বীপে সেখানে যুগাবতার জন্ম নিয়েছেন তাঁকে দর্শন করে ধন্য হব

  বালক মঙ্গল গদাধর গোঁসাইয়ের সঙ্গী হতে চাইলে তিনি বলেন, ‌‘আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি, তোমার এখনও তাঁকে দর্শনের সময় হয়নি বাবা সময় হলে তিনি নিজে এসে তোমাকে দর্শন দেবেন তুমি তখন থাকবে কান্দরা গ্রামে

  গুরুদেব গদাধর গোঁসাই, তাঁর গুরুদেব নয়নানন্দ গোস্বামী প্রতিষ্ঠিত বৈষ্ণব আশ্রমের দায়ভার, নতুন শিষ্য মঙ্গলের উপর অর্পণ করে নবদ্বীপের পথে পাড়ি দেন নব-বৈষ্ণব মঙ্গল পূর্ণোদ্যমে গৌরগোপাল ও নৃসিংহদেবের সেবা করতে থাকে কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই গুরুদেবহীন আশ্রম তার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে আবার পথে পা বাড়ানোর জন্য মনপ্রাণ ব্যাকুল হয়ে ওঠে

  কিছুদিন পর রজতসিংহাসনে নৃসিংহদেবের শালগ্রাম শিলা ও গুরু-প্রদত্ত গৌরগোপাল বিগ্রহ নিয়ে আবার পথে নামে মঙ্গল নবদ্বীপের পথে যাওয়ার ইচ্ছে হলেও তা সংবরণ করে গুরুদেব বলেছেন, কান্দরা গ্রামে যুগাবতার তাকে দর্শন দেবেন তাই কান্দরা গ্রামের উদ্দেশে মঙ্গল পা বাড়ায়...’’

  সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভ দম নেওয়ার জন্য একটু থামেন সেই কাটোয়ার গঙ্গার ঘাট থেকে কান্দরা গ্রামের দিকে চলতে শুরু করেছেন তিনটি বালককে সঙ্গে নিয়ে গুরুদেবের কাহিনীকথা একটু থামতেই বালক বংশীবদন বলে ওঠে, ‌‘মাশায়! তারপরেই কি আমার ঠাকুরদাকান্দরায় চলে এলেন?’

  জ্ঞানদাসের অনুরোধসূচক গলাতুমি থামো না ভাই বংশীবদন! মাশায়কে সবিস্তারে বলতে দাও

  গুরুদেব মৃদু হেসে আবার বলতে শুরু করেন — “ভরতপুর থেকে র্নৈঋত কোণ বরাবর গেলেই পাওয়া যাবে কান্দরা গ্রাম, এমন জেনে নিয়ে মঙ্গল আবার পথ চলতে থাকে গোধূলিবেলায় মঙ্গল পৌঁছয় একটি গ্রামে কিন্তু ও স্থির নিশ্চিত নয় যে, এটিই কান্দরা গ্রামের প্রান্তে দাঁড়িয়ে ও লক্ষ্য করে, অনতি দূরে দুই বৃদ্ধ আলাপরত মনস্থ করে, ওঁদেরকেই জিজ্ঞাসা করবে কাছে গিয়ে দেখে, একটা মাটির তৈরি ভাঙা পাঁচিলের ওপরে বসে রয়েছেন একজন ফকির তার দুগ্ধ-ধবল শ্মশ্রুগুম্ফ ভরা মুখমণ্ডলে চোখদুটি খুব উজ্জ্বল তার পাশে হেলে পড়া একটা  গাছের গুঁড়িতে বসে এক বৈষ্ণব বাবাজি তারও শ্বেতশুভ্র শ্মশ্রুগুম্ফ, আর মাথায় সাদা চুল চুড়ো করে বাঁধা ওঁদেরকে মঙ্গল জিজ্ঞাসা করে কান্দরা গ্রামের কথা ওঁরা দুজনে প্রবল হাসির বন্যা রোধ করে বলেন, ‌‘এসেই তো পড়েছিস খ্যাপা র্নৈঋত কোণ বরাবর এগিয়ে যা দেখবি ঈশানি নদী তার ধারেই দেখবি একটা ডাঙা, নাম রাঢ়ীর ডাঙা সেখানেই কুঞ্জবন ওই কুঞ্জবনে গিয়ে বিশ্রাম নে

  মঙ্গল ইতস্তত করতে একজন বৃদ্ধ বলে ওঠেন, ‌‘ওরে! আমি হলাম নয়ন শা ফকির, আর ও হল দধিয়ার আখড়ার গোপালদাস বাবাজি তোকে পথ দেখানোর জন্যই আমরা আছি সবই তাঁর ইচ্ছা যা, ওই পথেই যা!’

  মঙ্গল এগোয় র্নৈঋতে পেয়ে যায় ঈশানী নদী, তার ধারে কুঞ্জবন ঈশানীর স্নিগ্ধ জলে স্নান সেরে বনের ফলমূল আহরণ করে মঙ্গল সেই ফলমূল আর ঈশানীর জল দিয়ে দুই দেবতার সেবা দেয় তারপর বেরিয়ে পড়ে মাধুকরীতে নিজের উদরও তো পূরণের প্রয়োজন

  সেই রাঢ়ীর ডাঙার কুঞ্জবনে আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে এক পর্ণকুটির সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় শালগ্রাম শিলারূপী গৃহদেবতা নৃসিংহদেব ও গুরুপ্রদত্ত গৌরগোপাল বিগ্রহ

  বংশীবদন কথার মাঝে বলে ওঠেকিন্তু মাশায়, রাঢ়ীর ডাঙাতে তো ঠাকুরদাথাকেন না! কান্দরা গ্রামের ভিতরে তো আমাদের শ্রীপাট!

  নৃসিংহবল্লভ বলেন, ‌‘হ্যাঁ বংশীবদন, তুমি ঠিকই বলেছ ওই রাঢ়ীর ডাঙার কুঞ্জবন থেকে গ্রামের মাঝে শ্রীপাট স্থাপন, এর মধ্যে অনেক কাহিনী আছে তা অন্যদিন শোনাবো ওই দেখো, আমরা গ্রামে পৌঁছে গেছি ওই যে দূরে রাঢ়ীর ডাঙা দেখা যাচ্ছে'  

  জ্ঞানদাসের খুব ইচ্ছা করে পরবর্তী কাহিনী এখুনি শোনার কিন্তু পথ যে শেষ হয়ে গেল বংশীবদন বেশ অহঙ্কারের সঙ্গে জ্ঞানদাস ও মনোহরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মনোহর এতক্ষণ কোনও কথা বলেনি ও নিবিষ্টমনে শুনে যাচ্ছিল বন্ধুবর বংশীবদনের ঠাকুরদাদার কীর্তিকাহিনী

  নৃসিংহবল্লভ মৌনাবলম্বন করলেও তাঁর মনের মাঝে প্রবাহিত হয় কত কথামঙ্গল চট্টোপাধ্যায় এখন মঙ্গলঠাকুর স্বয়ং শ্রীচৈতন্য তাঁকে ‌‘ঠাকুরউপাধি প্রদান করেছেন একজন গৃহত্যাগী বালক এখন শাহ্-এন-শাহ্ বাদশাহ আলাউদ্দিন হুসেন শাহর অনুদানে একশো আট বিঘা নিষ্কর জমির মালিক যদিও সে জমি তিনি প্রাপ্ত হয়েছেন রাধাবল্লভজীর সেবার জন্য

  একেই বলে ভাগ্য! উড়িষ্যা ভ্রমণকালে পুরীর এক সন্ন্যাসী গণৎকারের সঙ্গে বাদশাহর সাক্ষাৎ হয়েছিল সেই সন্ন্যাসী তাঁকে বলেছিলেন, ‌‘রাজধানীতে ফিরে গেলেই তোর এন্তেকাল হবে পথের মাঝেই কাল কাটিয়ে যা, কীর্তি রেখে যা বেটা

  বাদশাহের মনে কথাটা গেঁথে গিয়েছিল তাই তিনি গৌড়ে ফেরার পথ ও সময়কে দীর্ঘতর করলেন উড়িষ্যা থেকে গৌড় পর্যন্ত তিনি চওড়া সড়ক নির্মাণের আদেশ দিলেন সেই সড়কের প্রতি একক্রোশ অন্তর খনন করা হতে থাকল একটি করে দীঘি ডাক-অন্তর একটি করে মসজিদ অর্থাৎ একটি মসজিদের আজান ধ্বনি অপর মসজিদ থেকে শোনা যাবে, এমন দূরত্বে অন্য মসজিদ একক্রোশ অন্তর বাদশাহের শিবির পড়ছে সড়ক, দীঘি ও মসজিদ নির্মাণের তদারকি করছেন বাদশাহ স্বয়ং

  একসময় কান্দরা গ্রামের র্নৈঋত কোণে বাদশাহের শিবির পড়ল চলতে থাকল দীঘি খননের কাজ দীঘি খনন করতে করতে পাওয়া গেল এক অপরূপ প্রস্তর নির্মিত দেবমূর্তি ধর্মপ্রাণা বাদশাহ সে মূর্তি ফেলে দিতে চান না চান, কেউ তার প্রতিষ্ঠা করে সেবার দায়িত্ব নিক তাঁর দরবারের দুই মুসলিম নামধারী হিন্দু কর্মচারী সাকর--মল্লিক ওরফে অমর ও দবির--খাস ওরফে সন্তোষ মূর্তিটি দেখে নাম রাখল রাধাবল্লভ তারা ওই মূর্তি প্রতিষ্ঠা ও সেবার দায়িত্ব নিতে চাইল কিন্তু বাদশাহ তাদেরকে ছাড়তে চাইলেন না দায়িত্ববান দুই ভাই দরবার ত্যাগ করলে রাজকার্যে বিঘ্ন ঘটবে তখন নয়নশাহ্ দরবেশজীর পরামর্শে বাদশাহ, মঙ্গল চট্টোপাধ্যায়কে ওই মূর্তি প্রতিষ্ঠা ও নিত্য সেবার দায়িত্ব দিলেন সেবা চালানোর জন্য বাদশাহ তাঁকে বার্ষিক একটাকা খাজনায় একশো আট বিঘা জমিও দান করলেন পরে ওই একটাকা খাজনাও মকুব করে তিনি ওই জমি নিষ্কর করে দেন তখন রাঢ়ীর ডাঙার পর্ণকুটির ছেড়ে মঙ্গল চট্টেপাধ্যায় কান্দরা গ্রামের ভিতরে মন্দির নির্মাণ করালেন স্থাপন করলেন তিন দেবতাকে কুলদেবতা নৃসিংহদেব, গুরুপ্রদত্ত গৌরগোপাল আর বাদশাহ প্রদত্ত রাধাবল্লভ জিউ তিনি গদাধর গোঁসাইয়ের কাছে দীক্ষা নিয়ে বৈষ্ণব হলেও বর্তমানে সামান্য মানুষ নন গ্রামের গন্যমান্য ও প্রভাবশালী একজন মানুষ ধর্মে বৈষ্ণব হলেও তাঁর রক্তে প্রবাহিত ব্রাহ্মণের গুণাবলী তাই অহংবোধ ওঁর স্বভাবজাত সেই অহংকার পৌত্র বংশীবদনের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়  

  এসব কথা ভাবতে ভাবতে বংশীবদনের দিকে তিনি দৃষ্টিপাত করেন দেখেন, বংশীবদন ধূলার পথ থেকে একখানি কঞ্চি কুড়িয়ে নিয়ে পথিপার্শ্বের ঝোপঝাড়কে শাসন করতে করতে এগিয়ে চলেছে গ্রামের পথে

 

দুই  

 

কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে ঈশানী নদী আসলে সেটি নদী নয়, কান্দর এই কান্দর থেকেই গ্রামের নাম কান্দরা ঈশানীর উত্তরপাড়ের মাঠ পেরিয়ে কান্দরা গ্রাম, আর দক্ষিণপাড়ের মাঠ পেরিয়ে রাজুর গ্রাম, যেন দু'টি যমজ ভাই দু'টি গ্রামেই শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারা ঈশানী নদীর মতোই প্রবাহিত দু'টি গ্রামে দু'টি শিক্ষাকেন্দ্র কান্দরা গ্রাম যখন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মুখরিত হয় মধুর স্তোত্রপাঠে, ঠিক তখনই রাজুর গ্রামে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে  মৃদঙ্গ, তানপুরা, মন্দিরার সুমধুর শব্দ সহযোগে আলাপ, বিস্তারের মধুর তানে শিক্ষার্থীদের সকালবেলা কাটে কান্দরায় বেদ-বেদান্ত পাঠে বিকালবেলা যায় রাজুর গ্রামে ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের মহড়ায়    

  দুপারের এই মহাকোলাহলের সঙ্গে নিজের কুলকুল ধ্বনি মিশ্রিত করে বয়ে চলে ঈশানী তার বুকের উপর বাঁশের একটি সাঁকো দু'টি গ্রামকে সংযুক্ত করেছে যেন দু'টি গ্রাম হস্ত প্রসারিত করে করমর্দন করছে সেই সাঁকোর ওপর দিয়ে যেমন যাতায়াত দূরগামী পথিকের, হাটুরের, প্রেমাকাঙ্ক্ষী দয়িতের, তেমনই যাতায়াত  শিক্ষাভিলাষী পড়ুয়াদের পাপহীন কচি কচি মুখ, সর্বগ্রাসী ডাগর চোখ দুপাশের প্রকৃতিকে যেন গলাধঃকরণ করতে করতে একসময় হয়ে ওঠে দুরন্ত কিশোর তখন তারা পথের ধূলা ওড়ায় চঞ্চল দু'পায় সুউচ্চ গাছে চড়ে, ডাল ভাঙে, ফল পাড়ে নদীজলে নেমে পড়ে, ধুতি দিয়ে জল ছেঁকে ছোটমাছ ধরে ধানক্ষেতে শীষ ছেঁড়ে, আখক্ষেতে আখ ভাঙে এমনি করেই শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে এগিয়ে চলে দুই গ্রামের বালকেরা এগিয়ে চলে কল্পনাথের পুত্র জ্ঞানদাস, মঙ্গলঠাকুরের নাতি বংশীবদন শূদ্রপুত্র মনোহর দাস আর সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভের কন্যা মানসী  

  জয়গোপাল দাস ঠাকুরের গৃহ ঈশানীর দক্ষিণপাড়ে রাজুর গ্রামের বেলেপাড়ায়  মাটকোঠা বাড়ি খড়ের চাল দেওয়ালগুলি গিরিমাটি দিয়ে রাঙানো তার মাঝে শতদল আঁকা মাটির বাড়ি হলেও বড় সুন্দর আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘরগুলি দেখলে দুদণ্ড বসতে ইচ্ছা জাগে দক্ষিণ দিকের ঘরটা তো সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর দেওয়ালে বিভিন্ন রং ব্যবহার করে দেবী সরস্বতীর চিত্র অঙ্কিত তার দুপাশে দেওয়াল কেটে কাঠের তক্তা বসিয়ে নির্মিত হয়েছে পূঁথিপত্রের তাক থরে থরে পূঁথি সজ্জিত সেই তাকে বাড়ির মালিক জয়গোপাল দাসঠাকুরের বেশির ভাগ সময়টা অতিবাহিত হয় এই ঘরটিতে প্রায় সারাদিনই কাটে পুঁথিপত্র ঘেঁটে এ ঘরেই তাঁর চতুষ্পাঠী শিক্ষার্থী বেশী নেই তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানদাস, মনোহর দাস এবং বংশীবদন ঠাকুর তালপাতার চাটাই পেতে বসে রয়েছে জয়গোপাল ঠাকুর একটি তাকিয়াতে ঠেস দিয়ে বসে রয়েছেন তাঁর হাতে তালপাতার পুঁথি সেটা দেখে তিনি বলে চলেছেন

জয় জয় ভগবতি ভীমা ভবানী

চারি বেদে অবতরু ব্রহ্মবাদিনী

হরি হর ব্রহ্মা পুছইত ভরমে

একও ন জানি তুঅ আদি মরমে

ভনই বিদ্যাপতি রায় মুকুটমনি

জিবও রূপনারায়ণ নৃপতি ধরনি

  তিন শিক্ষার্থী মনপ্রাণ দিয়ে শ্রবণ করছে গুরুর পাঠ আর তার অন্বয় জয়গোপাল ঠাকুরভগবতি ভীমা ভবানীর ব্যাখ্যা শেষ ক'রে হরি, হর এবং ব্রহ্মার স্বরূপ ও কার্য ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত জ্ঞানদাস হঠাৎ প্রশ্ন করেমাশায়! হরি, হর ও ব্রহ্মার মধ্যে কে বড়?

  এ বড় কঠিন প্রশ্ন বৎস! এঁদের মধ্যে বড় ছোট নিরূপণ করা যায় না, সৃষ্টি স্থিতি ও লয়ের কার্যে ব্যাপৃত এঁরা একে অপরের পরিপূরক ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন, হরি অর্থাৎ বিষ্ণু পালন করেন এবং জীবের কার্য সম্পন্ন হয়ে গেলে লয় অবশ্যম্ভাবী তা না হলে পুনরায় সৃষ্টি হবে না এ কার্য করেন হর অর্থাৎ মহাদেব এর মধ্যে জীবকুল বিষ্ণুর অধীনেই বেশি সময় থাকে সৃষ্টি এবং লয় তো ক্ষণিকের ব্যাপার

  মাশায়! তাহলে তো বিষ্ণুকেই আমাদের বেশি করে ভজনা করা উচিত তবে, আমরা ব্রহ্মভজনা করি কেন?

  দেখ বৎস, ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করা আর ব্রহ্মভজনা করা এক জিনিস নয় ব্রহ্মজ্ঞানীকেই ব্রাহ্মণ বলা হয় কিন্তু বিষ্ণুর উপাসকদের বৈষ্ণব বলা হয় মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য নববৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তন ও বিস্তার ঘটান

  বংশীবদন উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠেমাশায়, শ্রীচৈতন্য আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন একরাত্রি ছিলেনও আমার ঠাকুরদার মুখে শুনেছি

  হ্যাঁ, তুমি ঠিকই শুনেছ বৎস! মহাপ্রভু কাটোয়ায় সন্ন্যাস গ্রহণ করার পর রাঢ়দেশ ভ্রমণকালে সন্ন্যাস গ্রহণের তৃতীয় দিনে আমাদের গ্রাম এই কান্দরাতে পৌঁছন তখন তোমার ঠাকুরদা' বয়সে নবীন রাধাবল্লভের সেবাইত এবং সেইসঙ্গে কুলদেবতা নৃসিংহদেবেরও পূজারী গ্রামের লোকেরা মান্যগন্য করে তাছাড়া মঙ্গল ঠাকুরও ভরতপুরে গদাধর দাসের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন মহাপ্রভু সে কথা শুনেছেন আগেই তাই তিনি তোমার ঠাকুরদার আতিথ্য গ্রহণ করেন কথাগুলো বলতে বলতে জয়গোপাল দাসঠাকুর কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন তাঁর মনে পড়ে যায় স্বয়ং মঙ্গলঠাকুরের মুখ থেকে শোনা সেই কাহিনী দিনটা ছিল তেসরা ফাল্গুন, ১৪৩১ শকাব্দ কান্দরা গ্রামে সহস্র মানুষের ঢল আর জনকোলাহল কান্দরা সেদিন মহাতীর্থক্ষেত্র দলে দলে মানুষ আসছে পশ্চিমের কুর্মডাঙ্গা, খঞ্জননগর, পলসা থেকে পূর্বের কোমরপুর, বেণীনগর থেকে উত্তরের শ্রীপুর, গোপালপুর, আমগড়িয়া থেকে দক্ষিণের রাজুর মাসুন্দি, দধিয়া থেকে মহাজঙ্গলে দাবানলের মতো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে এই সন্দেশনিমাই সন্ন্যাসী আসছেন কান্দরায় মঙ্গল চট্টোপাধ্যায়কে দর্শন দিতে  

  নবদ্বীপের জগন্নাথ মিশ্রের পুত্র নিমাই মিশ্রের পান্ডিত্যের খ্যাতি সুদূর বৃন্দাবন পর্যন্ত প্রসারিত তিনি এখন নিমাই পন্ডিত নামে খ্যাত সেই নিমাই পন্ডিত এক গভীর রাত্রিতে গৃহত্যাগ করে গত ২৯ মাঘ সংক্রান্তির দিন সন্ন্যাস নিয়েছেন কাটোয়ার গঙ্গাতীরে তাঁর মস্তকমুন্ডন করিয়ে দীক্ষা দিয়েছেন মাধবেন্দ্র পুরীর যোগ্য শিষ্য কেশবভারতী পূর্বাশ্রমে যিনি ছিলেন কুলিয়া গ্রামের অধিবাসী কালীনাথ আচার্য আর দীক্ষাশেষে নিমাই হয়েছেন ‌‘শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য

  সেই স্বয়ং চৈতন্যদেব সন্ন্যাস নেওয়ার পরেই রাঢ় ভ্রমণে বেরিয়েছেন প্রথমেই তিনি গিয়েছিলেন সাধক নয়নানন্দ গোস্বামী প্রতিষ্ঠিত, গদাধর গোস্বামীর স্মৃতি বিজড়িত মুখসুদাবাদের ভরতপুরের গোপীবল্লভ আশ্রমে পরবর্তীদিনে তিনি এসেছেন মনোহরশাহী পরগণার কেতুগ্রামে অভয়পদ চট্টোপাধ্যায়ের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন তিনি সেখানে আমানি-জল খেয়ে তিনি পথের ক্লান্তি দূর করেছেন অভয়পদর বাড়ির বাইরে বর্ষাপুকুরে পাড়ে বেলতলায় রাত্রি যাপন করেছেন তৃতীয়দিনে তিনি আসছেন কান্দরায় ভরতপুরে গদাধর গোস্বামীর কাছেই তিনি শুনেছেন মনেপ্রাণে পরম বৈষ্ণব মঙ্গল চট্টোপাধ্যায়ের কথা তাই তিনি মঙ্গল চট্টোপাধ্যায়ের আতিথ্য গ্রহণ করতে চান

  কান্দরার জনপথ জনাকীর্ণ মৃদঙ্গ আর করতালের মধুর শব্দে আকাশ বাতাস মুখরিত সেই সঙ্গে সুললিত কণ্ঠে  হরিনাম সংকীর্তন ওই তো তিনি আসছেন আহা কী অপরূপ রূপ! দীর্ঘকায় সোনার বরণ তনু আজানুলম্বিত বাহুদুটি উর্ধ্বে তুলে নৃত্য করতে করতে আসছেন তিনি তাঁর দুচোখে বয়ে চলেছে প্রেমের অশ্রুধারা সহস্র মানুষ হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে ওই দিব্যোন্মাদের সঙ্গী হয়েছেন পথপার্শ্বে গ্রাম্য নারীরা হুলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনি ও পুষ্পবৃষ্টি করছে কান্দরা গ্রাম যেন আজ মথুরাপুরী! কিংবা কান্দরা যেন এখন শ্রীবৃন্দাবন! নাকি কান্দরা এখন দ্বারকাপুরী! স্বয়ং দ্বারকার রাজা আজ নিমাই বেশে কান্দরায়  

  ওই দীঘলতনু দিব্যকান্তি মহাপুরুষ হরিনাম বিলিয়ে নেচে চলেছেন কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর করে তুলছেন আপামর জনগণকে সে প্রেমে পাগল হয়ে শত সহস্র মানুষ তার সঙ্গী হয়েছেন তার আলতারাঙা দু'টি চরণ পথের ধূলিতে ধুসরিত সে ধূলি যেন পবিত্র ব্রজরেণু হয়ে কান্দরাকে পূণ্যভূমি করে তুলেছে মানুষ কান্দরার পথের ধূলি নিয়ে সারা অঙ্গে মাখছে কেউ বা পথের ধূলায় গড়াগড়ি দিচ্ছে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের কোনওদিকে হুঁশ নেই তিনি দুহাত বাড়িয়ে নামগান করছেন আর বলছেনকই মঙ্গল, কোথায় মঙ্গল, তোমার হাতের বনফুলমালা আমার কন্ঠে পরাবে না! নাকি দুর্বাদল শ্যামের তনুলাবণ্য আমার নেই, তাই আমাকে তোমার পছন্দ হয়নি! কোথায় হে পরম বৈষ্ণব আমার প্রাণের সখা!

  একথা শ্রবণ করে মঙ্গল চট্টোপাধ্যায় বাকরুদ্ধ কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে পান বিমোহিত মঙ্গলএ কী বলছ প্রভু, না না তুমি প্রভু নয়, মহাপ্রভু তোমাকে আমার শতকোটি প্রণাম আমার সর্বস্ব তোমার পায়ে নিবেদন করলাম হে মহাপ্রভু উদ্ধার করো আমায়

চৈতন্যদেব বুকে জড়িয়ে ধরেন মঙ্গলকেতুমি আমায় মহাপ্রভু বললে সখা! তবে তো তুমি বৈষ্ণবঠাকুর আজ থেকে তুমি মঙ্গল ঠাকুর এসো চরণে নয়, বুকে এসো সখা

  মঙ্গলের স্ত্রী মহাপ্রভুকে পাদ্যঅর্ঘ্য দিয়ে সেবায় নিযুক্ত হন যুগাবতারের রাঙাচরণ দু'টি মুছিয়ে দেন মাথার বেণী খুলে মৃদঙ্গ কাঁসর ঘন্টা করতালের মধুর শব্দে মঙ্গলের শ্রীপাট মুখরিত হয়ে ওঠে যেন শ্রীপাট আজ বৃন্দাবনের রাসমঞ্চ  

  মঙ্গল বলেনএসে মহাপ্রভু, তোমার পদধূলিতে আমার গৃহ আজ ধন্য হোক

  চৈতন্যের ওষ্ঠে ফুটে ওঠে মৃদু হাসি, ‌‘আমি সন্ন্যাসী, গৃহ, বিষয়-আশয় আমার কাছে বিষবৎ, তাই গৃহে নয়, আমি রাত্রিযাপন করব তোমার গৃহের সামনে এই ডাঙাতেই

  এ কাহিনী বহুবার শুনেছেন জয়গোপাল দাসঠাকুর সেই থেকে মঙ্গল ঠাকুরের গৃহের সম্মুখের সেই ডাঙার নাম হল গৌরাঙ্গডাঙা আজ আবার তাঁর স্মৃতিচারণ হল মঙ্গলঠাকুরের নাতি বংশীবদনের কথায় এদিকে বংশীবদন নিচু গলায় তার নিজের মতো করে সহপাঠী দু'জনকে বলতে থাকে তাঁর ঠাকুরদার কীর্তিকাহিনী কথা শেষে বংশীবদন বেশ গর্বভরে জ্ঞানদাস আর মনোহর দাসের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জ্ঞানদাস সে দৃষ্টিকে গুরুত্ব না দিয়ে গুরুকে প্রশ্ন করে মাশায়! চৈতন্যদেব তো বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন!

  হ্যাঁ, ঠিক বলেছ

  আচ্ছা মাশায়! বৈষ্ণবকে কি তৃণ থেকেও দীনতর হতে হয়?

  হঠাৎ এ প্রশ্ন? এ কথা তুমি কোথায় শ্রবণ করলে?

  জ্ঞানদাস তখন কাটোয়ার গঙ্গার ঘাটের ঘটনা সবিস্তারে গুরুসকাশে জ্ঞাপন করে

  গুরু বলে ওঠেনহ্যাঁ, সেই বৈষ্ণব ঠিক বলেছেন

‌‘তৃণাদপি সুনীচেন তরোরপি সহিষ্ণুনা

অমানীনা মান দেন কীর্ত্তনীয়ঃ সদা হরিঃ।।'  

তবে এ দীনতা ধনসম্পত্তির বিচারে নয়, অহং বোধের বিচারে বাহ্যিক দীনতা নয়, অন্তরের দীনতা, বুঝলে জ্ঞানদাস! প্রকৃত বৈষ্ণব ব্রাহ্মণেরও অনেক উর্ধ্বে

  জ্ঞানদাস এ কথা শুনে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে চোখের দৃষ্টি জানলার বাইরে দূর আকাশে পালতোলা নৌকার মতো কোন ভাবনা যেন বয়ে চলেছে মনের নদীতে হঠাৎ ভাবনা-নৌকা কূল পায় মাশায় ব্রাহ্মণ হলে কি বৈষ্ণব হওয়া যায় না?

  এ প্রশ্ন কেন বৎস? তুমি এখন সদ্য দ্বিজ হয়েছ মাত্র এগারো বৎসর বয়সোত্তীর্ণ তুমি এখনও বুদ্ধি পরিপক্ক হয়নি শুধু আবেগের বশীভূত হয়ে কখনও কোন কিছু করবে না আবেগ এবং বিচারবুদ্ধির সমন্বয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়

  বংশীবদন বলে ওঠে মাশায়! আপনি ভুল বললেন জ্ঞানদাস তো বারো বছরের ওর জন্ম তো ৯৩৮ সনে ভাদ্র মাসে এখন তো ৯৫০ সন চলছে ও আমার চেয়ে বড়

  তুমি ঠিক বলেছ বংশী ও তোমার চেয়ে বড়ই বয়সে, বুদ্ধিতে, নম্রতায় গুরুজনদের কথার মাঝে কথা বলা অনুচিত, এ শিক্ষাটা আমি তোমায় দিতে পারিনি বলে লজ্জিত

  বংশীবদন নতমস্তকে বসে থাকে

  মনোহর বলে ওঠে মাশায়, জয় জয় ভগবতি ভীমা ভবানী....পদটির অন্বয় করছিলেন আপনি পদটি আর একবার শ্রবণ করার ইচ্ছা জেগেছে মনে

  জয়গোপাল দাস ঠাকুর হৃষ্টমনে মনোহরের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করেন বাৎসল্য রসে সিক্ত সে দৃষ্টি তারপর তিনি আর্দ্রকণ্ঠে বলেনবাছা! তোমাদের অন্য একটি পদ শোনাই আমার রচিত ‌‘জ্ঞানপ্রদীপনামক গ্রন্থের পদ এটি

হরিস্মরণে সরসং মনো

প্রিয়ভাষণেন জনরঞ্জন

প্রমুদিতহৃদয়ং হরিমতিসদয়ং

জ্ঞানময়বদয়ং জিনি জনমনঃ।।

  মানুষের মন জয় করতে হলে হরির স্মরণে মন সর্বদা সরস রাখতে হয় প্রত্যেকের পছন্দমতো প্রিয়ভাষী হতে হয় জ্ঞানগর্ভ কথা বলতে হয়, সর্বোপরি উদার হৃদয় ও ভক্তিমান হতে হয়

  গুরুদেবের শ্লোক ও অন্বয় সমাপ্ত হলে জ্ঞানদাস ধীরকণ্ঠে বলে মাশায়! আপনার ‌‘জ্ঞানপ্রদীপগ্রন্থটির পান্ডুলিপিটি পাঠ করার ইচ্ছা আমার সেদিন বংশীর ঠাকুরদাবলছিলেন আপনি নাকি ‌‘শ্রীকৃষ্ণবিলাস‌‘মনোবুদ্ধিসংবাদনামে আরও দু'টি গ্রন্থ রচনা করেছেন 

  গুরুদেব অন্যমনস্ক হয়ে মস্তক আন্দোলিত করেন ওঁর মনে পড়ে যায় মঙ্গল ঠাকুরের কথা — ‌‘শোনো হে জয়গোপাল! তোমার ‌‘জ্ঞানপ্রদীপগ্রন্থটির পর ‌‘অথ ধর্মসন্দর্ভনামের সংস্কৃত গ্রন্থটি পাঠ করার সৌভাগ্য হল অপূর্ব লিখেছ ভায়া শ্লোকগুলি বৈষ্ণব সমাজে খুবই সমাদৃত হবে, এ বিষয়ে কোনও দ্বিমতের অবকাশ নাই শুনলাম ‌‘শ্রীকৃষ্ণবিলাস ‌‘মনোবুদ্ধিসংবাদনামে আরও দু'খানি গ্রন্থ রচনা করেছ সময়সুযোগ মতো সে দুটি শ্রবণ করিও বা পাঠ করতে দিও  

  সত্যিই সেদিন মঙ্গল ঠাকুর খুবই আন্তরিকভাবে বলেছিলেন কথাগুলো বন্ধুবর নৃসিংহবল্লভের কাছে রয়েছে ওই গ্রন্থ দু'খানির প্রতিলিপি বন্ধুবরের পাঠ শেষ হলে ও দু'টি নিয়ে মঙ্গল ঠাকুরকে দিতে হবে যে কোনও গ্রন্থ রচনা সমাপন হলেই সর্বপ্রথম পাঠ করতে নেয় বন্ধুবর নৃসিংহবল্লভ ও সঙ্গীতের গুরু হলে কী হবে, শাস্ত্রপাঠেও যথেষ্ট আগ্রহী এবং শাস্ত্রজ্ঞানীও বটে সেদিন তো সদ্য রচিত ‌‘জ্ঞানপ্রদীপগ্রন্থখানি পাঠ করে উচ্ছ্বসিত বলল, ‌‘এ গ্রন্থটির প্রতিলিপি করিয়ে নবদ্বীপ এবং বৃন্দাবনের পন্ডিতমহলে পাঠিয়ে দাও বৈষ্ণব সমাজে অনুমোদনের জন্য প্রভূত সারা পাবে অসাধারণ লিখেছ তুমি! সত্যিই তোমার মতো পন্ডিতের মিত্র হতে পেরে আমি ধন্য

  গুরুদেবকে অন্যমনস্ক দেখে জ্ঞানদাস ভাবে, অর্বাচীন ছাত্র হয়ে গুরুদেবের গ্রন্থপাঠ করতে চাওয়ায় উনি কি ক্ষুব্ধ হলেন! তাই জ্ঞানদাস বলে ওঠে, ‌‘মাশায়, থাক, গ্রন্থ নেব না আপনি তো ওই গ্রন্থের পদগুলি অন্বয় করে বুঝিয়েই দিচ্ছেন'

  গুরুদেবের সম্বিত ফেরে উনি বলে ওঠেন না না ঠিক আছে তবে প্রথমে তোমাকে অন্য একটি গ্রন্থ দেব এখন ‌‘অথ ধর্মসন্দর্ভনাম্নী গ্রন্থটির সংস্কার করছি সংস্কার শেষ হলে এইটি তোমাকে পাঠ করতে দেবো এটি পাঠ করলে বৈষ্ণব ধর্ম সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে পারবে

  গুরুদেবের কথা শুনে জ্ঞানদাস খুবই প্রীত হয় ওর চোখেমুখে খুশির আভাস ফুটে ওঠে ওর মুখমন্ডলে দৃষ্টিপাত করে জয়গোপাল ভাবেন, এ ছাত্রটির প্রভূত শাস্ত্রপিপাসা নিশ্চয় ও একদিন মহাপন্ডিত হয়ে উঠবে এবং জগৎ-বিখ্যাত হবে ওর চোখেমুখে তার আভাস ফুটে উঠেছে  

  এ কথা মনে হতেই জয়গোপালের মনে পড়ে যায় নিজের বাল্যকালের একটি ঘটনা   শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দক্ষিণ ভারত ভ্রমণে রওনা হয়েছেন তার প্রিয় শিষ্য শ্রীনিত্যানন্দকে দিয়েছেন বঙ্গদেশে নামগান প্রচারের দায়িত্ব বীরপুরুষ নিত্যানন্দ ক্রোশের পর ক্রোশ পদব্রজে গমন করে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বৈষ্ণবীয় প্রেমের স্রোতধারা প্রবাহিত করছেন সন বোধহয় ১৪৩৩ শকাব্দ জৈষ্ঠ্য মাস, বেলা দ্বিপ্রহর প্রায় শ্রীনিত্যানন্দ ও তাঁর প্রিয় শিষ্য সুন্দরানন্দ দাঁইহাট গ্রামের এক বটবৃক্ষতলায় বিশ্রাম নিতে বসেছেন তখন পাঠশালার বিদ্যাভ্যাস শেষে সতীর্থদের সঙ্গে কোলাহল করতে করতে গৃহে ফিরছেন তিনি নিজে, বালক জয়গোপাল দিব্যকান্তি তেজস্বী পুরুষ নিত্যানন্দকে দেখে সকলে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন ওঁর দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই নিত্যানন্দ প্রশ্ন করেছিলেন, ‌‘তোরা কোথায় বিদ্যাভ্যাস করতে গিয়েছিলি?’

  বালক জয়গোপাল নিজে উত্তর দিয়েছিলেন, ‌'দাঁইহাটের চতুষ্পাঠীতে'

  আজ কী পড়ালেন গুরুমশাই?

  ভাগবত পড়ালেন

  ভাগবতের শ্লোক তোরা বুঝতে পারিস?

  হ্যাঁ পারি আজ গুরুদেব পড়ালেন

গচ্ছোদ্ধব ব্রজং সৌম পিত্রোর্ণঃ প্রীতমা বহ

গোপীনাং মদ্বিয়োগাধিং মৎসন্দেশৈবিমোচয় ।।

অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ...

  নিত্যানন্দ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, থাক আর বলতে হবে না তোমার নাম কি বাবাজীবন?

  আমার নাম শ্রী জয়গোপাল দাস, নিবাস বিকিহাট, জাতিতে কায়স্থ

  তখন নিত্যানন্দ তাঁর শিষ্য সুন্দরানন্দকে বলেছিলেন, এ বালক শ্রুতিধর অদ্ভুত প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের অধিকারী এর শিক্ষার ভার তুমি নাও একসময় এ মহাপন্ডিত হয়ে উঠবে এর মুখাবয়বে তার ছাপ সুস্পষ্ট

  তারপর তো ইতিহাস! সুন্দরানন্দ ঠাকুরের সুযোগ্য শিষ্য হয়ে তিনি কাটোয়ার বিকিহাট থেকে উঠে এসে বসতি স্থাপন করলেন এই কান্দরায় মাঝের পাড়ায় গ্রামদেবী দূর্গা চন্ডীমন্ডপের বিপরীতে উত্তরমুখী একটি মন্দির নির্মাণ করে সেখানে স্থাপন করলেন শ্রী নিত্যানন্দ প্রভু প্রদত্ত শ্রীধর শালগ্রাম শিলা ও শিক্ষাগুরু সুন্দরানন্দ ঠাকুর প্রদত্ত গোবিন্দ জিউ রাধারানি বিগ্রহ সিংহাসনের নীচে স্থাপন করলেন সুন্দরানন্দজীর পাদুকা যুগল ও শিঙা সেখানে চতুষ্পাঠীও খুলে ফেলা হল এখন সেই চতুষ্পাঠীতে তৈরি হচ্ছে জ্ঞানদাস, ভাবী পন্ডিত তাকে পাঠ করতে দিতেই হবে বিভিন্ন গ্রন্থ

  অনেকখানি বেলা হয়েছে এবার বিশ্রাম প্রয়োজন ওদেরও নিশ্চয় ক্ষুধার উদ্রেক হয়েছে এমন ভেবে জয়গোপাল সেদিনের মতো পাঠদান থেকে নিস্কৃতি দেন ওরা হৃষ্টমনে প্রস্থান করে কিন্তু উনি তাকিয়াতে ঠেস দিয়ে বসেই রয়েছেন ওঁর মনে প্রবাহিত হচ্ছে কত ভাবনামহাকালকে সাক্ষী রেখে মাঝেমাঝেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে ইতিহাসও মাঝেমাঝে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে মহামানবের আবির্ভাবের জন্য সেই মহামানব শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের আবির্ভাব ঘটেছে তাঁর নেতৃত্বে কৃষ্ণপ্রেমের জোয়ারে ভাসছে আসমুদ্র হিমাচল প্রেমের বাণী বিতরণ করে তিনি যবন, অন্ত্যজ, পাপীতাপী, পতিতদের উদ্ধার করে চলেছেন সকলে প্রেমের তরঙ্গে ভেসে যাচ্ছে সে জোয়ারে যেমন ভাসছে পাপীতাপী অন্ধ-আতুর, তেমনই ভাসছে সঙ্গীতজ্ঞ ও কবিগণ বৈষ্ণব ধর্মকে অবলম্বন করে সঙ্গীতজ্ঞ বাঁধছেন অজস্র পদ কবিগণ রচনা করে চলেছেন নানা কাব্য সেই পদকীর্তন ও কাব্যচ্ছটায় সমৃদ্ধ হচ্ছে, বঙ্গসাহিত্য ও বঙ্গসংস্কৃতি  

  শ্রীক্ষেত্র জগন্নাথধামে বিরাজ করছেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য তাঁর যোগ্য শিষ্য শ্রী নিত্যানন্দ সদলবলে সারা বঙ্গভূমি পরিব্রাজন করছেন তাঁর প্রচারে কালনা, শান্তিপুর, নবদ্বীপ, নদীয়া তো উত্তাল প্রেমের বাণী বিতরণ করে তিনি উচ্চ-নীচ জাতি-ধর্মকে জলতলের মতো সমান করে দিয়ে বীরবিক্রমে এগোচ্ছেন উত্তরে

  আলাউদ্দিন হুসেন শাহের রাজদরবারেও সেই তরঙ্গ বিপুল বিক্রমে আছড়ে পড়েছে তাঁর দরবারের দুই মুসলমান নামধারী হিন্দু কর্মচারী বৈষ্ণবীয় নামগানের তরঙ্গে ভেসে গিয়েছেন তাঁরা দুজন আর সাকর--মল্লিক ও দবির--খাস নন, তাঁরা হয়েছেন রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামী  

  পূর্ববঙ্গের গোপালপুরও গড়ানহাটি পরগণার দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদার কৃষ্ণানন্দ দত্ত তাঁর রাজধানী খেতুরি কৃষ্ণনামের বন্যায় ভাসমান ভেসে গিয়েছেন জমিদারে জ্যেষ্ঠ পুত্র নরোত্তম দত্ত তিনি নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর নিকট দীক্ষাগ্রহণ করে, নরোত্তম দাস ঠাকুর নাম ধারণ করে রওনা দিয়েছেন শ্রীবৃন্দাবনের পথে

  ওদিকে কাটোয়ার গদাধর দাসের নেতৃত্বে সে অঞ্চলে কৃষ্ণপ্রেমের জোয়ার কান্দরায় বীরচন্দ্র-শিষ্য পন্ডিত জয়গোপাল দাসঠাকুর চন্ডাল, মুচি, মেথর, অন্ত্যজ সম্প্রদায়কে নামগানে উদ্ধার করে কৃষ্ণ প্রেমে ভাসাচ্ছেন

  এদিকে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতিভূ মঙ্গল ঠাকুরও কৃষ্ণ প্রেমে মাতোয়ারা স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁকে ঠাকুর উপাধি দিয়ে গিয়েছেন তার আগে ভরতপুরে গদাধর দাসের নিকট তিনি বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষাও নিয়েছেন তিনি ওঁকে যথেষ্ট স্নেহ করেন

  জয়গোপালের মনে পড়ে যায় সেদিনের ঘটনাপ্রাতঃকালে পূজাপাঠ ও নামগানের পর প্রসন্নমনে মঙ্গল ঠাকুর একাকী নাট-মন্দিরে বসে তাম্রকূট সেবন করছেন এমন সময় চতুষ্পাঠীতে পাঠদান শেষে উনি মঙ্গল ঠাকুরের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন ‌‘গুরুদেবের জয় হোক’ — ধ্বনি শুনে মঙ্গল ঠাকুর বললেন, ‌‘এসো পন্ডিতপ্রবর! বসো বলো কী খবর!’

  উনি আসন গ্রহণ করলেন কুশল বিনিময়ের পর বললেনপ্রভু! আমার একটা উপকার আপনার দ্বারা করা সম্ভব ভেবেই আপনার শরণাপন্ন হলাম

  মঙ্গল ঠাকুর স্মিত হেসে বলেনবৎস! উপকার বলছ কেন! কী করতে হবে তাই বল! তুমি মহাপন্ডিত তোমার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি

  উনি বললেনগুরুদেব, আপনার এবং বন্ধু নৃসিংহের পরামর্শ মতো আমি ‌‘জ্ঞানপ্রদীপগ্রন্থটির প্রতিলিপি খুব ভালো করে করিয়েছি শুনলাম, আপনি শ্রীধামে রওনা হচ্ছেন, মহাপ্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ তো অবধারিত ভাবেই হবে আপনি যদি অনুগ্রহ করে এই গ্রন্থটির প্রতিলিপি নিজ হাতে মহাপ্রভুর নিকট সমর্পণ করেন, তাহলে আমি কৃতার্থ হবো

মঙ্গল ঠাকুর ধুম্র পরিত্যাগ করতে করতে বলেনঠিক আছে, এত ইতস্তত করছ কেন! এ তো মহৎ কাজ এত সুন্দর একটি গ্রন্থ মহাপ্রভুর হাতে তুলে দিয়ে আমি ধন্য হব তুমি প্রতিলিপিখানা দিয়ে যেও

  অহো! আমি অতীব মানসিক শান্তি পেলাম প্রভু আমি কল্যই গ্রন্থখানি আপনার নিকট পৌঁছে দেব প্রণাম প্রভু আপনি নিশ্চয় এখন স্নানে গমন করবেন, তারপর পূজাপাঠ আপনাকে আজ্ঞা করুন প্রভু, আমি যাই

  হ্যাঁ, তুমি এসো জয়গোপাল, সাবধানে যাও

  মঙ্গল ঠাকুর সযত্নে নিয়ে গিয়ে সেই ‌‘জ্ঞানপ্রদীপগ্রন্থটির প্রতিলিপি মহাপ্রভুর হস্তে অর্পণ করেছেন তারপর তো ইতিহাস শ্রীবৃন্দাবনের পণ্ডিতসমাজ গ্রন্থটির ভূয়সি প্রশংসা করেছেন এবং বৈষ্ণবসমাজের পণ্ডিতমহল ওঁকে‌‘মহাপণ্ডিতআখ্যায় ভূষিত করেছেন

  এসব কথা মনে প্রবাহিত হওয়ায় জয়গোপাল হয়তো কিছুটা আত্মশ্লাঘা অনুভব করছিলেন অকস্মাৎ তাঁর মনে উদয় হয়, ছি-ছিঃ! তিনি না বৈষ্ণব, তাঁর এমন আত্মপ্রসাদ উপলব্ধি পাপ কিছুই করতে পারেননি তিনি যা করার শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছেন তিনি তো তাঁর দাসানুদাস মাত্র

 

তিন

 

জয়গোপাল দাস ঠাকুরের চতুষ্পাঠী গুরুমশাইয়ের পাঠদানের অবসরে জ্ঞানদাস বিনয়ের সঙ্গে বলেমাশায়! আপনি আমাকে গ্রন্থখানি পাঠ করতে দিয়েছিলেন গৃহে অবসর সময়ে আমি গ্রন্থখানি পাঠ করছি, আর মুগ্ধ হচ্ছি আমার শিক্ষা এখনো অসম্পূর্ণ, অথচ গ্রন্থটি এত সহজ ভাষায় রচিত যে, আমি অনুধাবন করতে পারছি

  জয়গোপাল সানন্দে বলে ওঠেনআমি জানি, তুমি ওই গ্রন্থটি আমার ব্যাখ্যা ব্যতীত নিজেই বুঝতে পারবে সেজন্যই তো তোমাকে ওইটি পাঠ করতে দিয়েছি

  হঠাৎ বংশীবদন ঠাকুর বলে ওঠে মাশায়, আমাকেও একটা গ্রন্থ পাঠ করতে দিতে হবে ওই ‌‘শ্রীকৃষ্ণবিলাসগ্রন্থটি আমাকে দিতে আজ্ঞা হোক জয়গোপাল ঠাকুর উচ্চকণ্ঠে হেসে ওঠেনওই গ্রন্থটিই তোমার পাঠ করতে ইচ্ছা হল! এখনও ওই গ্রন্থ পাঠ করার মতো বয়ঃপ্রাপ্ত হওনি তুমি রাধিকা কে জান? বংশীবদন আহতকণ্ঠে বলে ওঠেরাধিকা শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী হতে পারে আমরা তো সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভ মিত্র মহাশয়ের কন্যা মানসীকে রাগানোর জন্য ‌‘রাধিকাবলি আর জ্ঞানদাসকে কৃষ্ণ ওদের দুজনের যা ভাব! একে অন্যকে ছাড়া সঙ্গীত পরিবেশন করে না

  জ্ঞানদাস লজ্জায় যেন মাটিতে মিশে যেতে থাকে ওর মনে পড়ে যায় সেদিনটার কথাউপনয়ন হয়ে যাওয়ার দিন সাতেক পরে প্রথমদিন সঙ্গীতগুরুর বাড়িতে পৌঁছেছে দরজা উন্মুক্ত করল মানসী ওর দিকে দৃষ্টিপাত করেই সে মুখ নামিয়ে দরজা থেকে সরে গিয়ে ঘরের কোণে লুকোল ও বুঝে উঠতে পারে না মানসী কেন এমন করল! লজ্জায়, নাকি অন্যকিছু মানসী তো ওকে দেখে লজ্জা পায় না ওর সম্মুখে সে তো যথেষ্ট প্রগলভ কদাচিৎ খুনসুটিও করে তবে আজ কেন ...!

  গুরুমশাই তানপুরা নিয়ে বসেছিলেন তিনি ব্যাপারটা লক্ষ্য করে বলেনকী হল রে মা! যা, ওকে ডেকে নিয়ে আয়! ঘরে এসে বসতে বল  

  মানসীর অভিমানী কন্ঠস্বরনা বাবা, আমি ওর সঙ্গে কথা বলব না

  নৃসিংহবল্লভ তানপুরার কর্ণ ঘুরিয়ে তারে টান দিতে দিতে বলেনকেন রে! ঝগড়া হয়েছে বুঝি!

  না বাবা, ঝগড়া নয়, দুঃখ হয়েছে ওর উপনয়নের দিন আমাদের নিমন্ত্রণ করেছিল আমরা গিয়েছিলাম কিন্তু আমাদেরকে থাকতেও দিল না, পৈতে নেওয়া দেখতেও দিল না তাড়িয়ে দিল কেন?

  নৃসিংহবল্লভ তানপুরার তারে আঙুলের টঙ্কার দিয়ে সুর পরখ করতে করতে বলেন ! এই ব্যাপার! তা ওকে এতো দেখার কী ছিল! রোজই তো দেখিস আমাদের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেল, তাই চলে এলাম

  না বাবা, ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল বংশীবদন বলছিল, জ্ঞানদাদা কেমন মাথা ন্যাড়া করে গেরুয়া বস্ত্র পরেছিল হাতে একখানা বেলকাঠের লাঠি নিয়েছিল কী সুন্দর লাগছিল ওকে! আমি ওকে দেখতে পেলাম না!

  নৃসিংহবল্লভ মেয়েকে প্রবোধ দেনবোকা মেয়ে! ওই সময় অব্রাহ্মণদের থাকতে নেই যে! দেখলি না, তোদের গুরুমশাইও অব্রাহ্মণ বলে চলে এলেন

  এটা ওরা ঠিক করেননি বাবা! গুরুমশাইয়ের মতো জ্ঞানীগুণী মানুষ এ গাঁয়ে আর কেউ আছেন! অথচ ওঁকেও অসম্মান করলেন!

  ওরে পাগল মেয়ে, জয়গোপাল যে কায়স্থ এ অসম্মান নয়, সামাজিক নিয়ম কী করবে তোর এই জ্ঞানদাদা বা ওর বাবা-মা মানতে তো হবেই অভিমান করিস না যা, ছেলেটা বোধহয় দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তোর কথা শুনে লজ্জায় আসতে পারছে না ডেকে নিয়ে আয়

  পিতার আদেশ অমান্য করার মেয়ে নয় মানসী তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে দরজার দিকে এগোয় জ্ঞানদাস ওর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে চোখে চোখ পড়তেই মানসী চোখ সরিয়ে নেয় মুখ নিচু করে তখন মানসীকে দেখে সত্যিই যেন অভিমানী রাধিকা মনে হয়েছিল গুরুমশাইয়ের টোলে ‌‘শ্রীকৃষ্ণবিলাসগ্রন্থের প্রতিলিপির শুকোতে দেওয়া ভূর্জপত্রতে ও দুএকটা পদ পড়েছে সেখানে শ্রীরাধিকার মুখমন্ডলের এমনই বর্ণনা ছিল

  মানসী সরে যেতে ও গিয়ে গুরুদেবের পাশে বসে মানসী আড়চোখে মাথায় টিকিওয়ালা ন্যাড়া ওকে দেখে ফিক করে হেসে ফেলে তারপরেই গম্ভীর হয়ে যায় মানসী যেন পণ করেছে ওর সঙ্গে কথা বলবে না কিন্তু ও মানসীর কাছে সহজ হওয়ার চেষ্টা করে ও বলেআমার পৈতের জন্য আমি তো বেশ কিছুদিন আসতে পারিনি,  সেসময় তোমরা গুরুজীর কাছে নতুন কী শিখলে?

  ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জানলার বাইরে ছাতিমগাছের দিকে তাকিয়ে থাকে মানসী চোখেমুখে ফুটে ওঠে অভিমান ও বিচলিতবল মানসী, গুরুজী নতুন কী তালিম দিলেন?

  অভিমানী দৃষ্টিতে মানসী ওর টিকিওয়ালা মাথাটা আর একবার দেখে নেয়, তারপর একটু দূরে সরে যায় মহা বিড়ম্বনায় পড়ে ও নিজের অপরাধটা সে বুঝতে পারে না তাই জিজ্ঞাসা করেকী হল মানসী, কথা বলছো না যে!

  মানসী নখ খুঁটতে খুঁটতে বলে  ব্রহ্মচারীর সাথে অব্রাহ্মণের কথা বলতে নেই আমাদের সেদিন তোমাদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করলে কিন্তু অনুষ্ঠান দেখতে না দিয়ে চলে যেতে বললে কেন?

  মানসীর অভিযোগে ও হতভম্ব হয়ে যায় আমতা আমতা করে বলেআমি কী করব! ও তো শাস্ত্রের নিদান শাস্ত্র তো আর আমি লিখিনি

  মানসী আড়চোখে ওকে দেখে ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি ফুটিয়ে বলে ইস্! উনি আবার শাস্ত্র লিখবেন! ভারী তো পন্ডিত ঠোঁট উল্টে ভেংচি কাটে মানসী

  ও কপট রাগ দেখিয়ে বলেআমি কি বলেছি যে আমি পন্ডিত, আমি কি বলেছি যে শাস্ত্র লিখতে পারি! তবে একটা নতুন পদ লিখেছি, শুনবে তুমি?

  মানসী চোখ তোলে ওর মুখের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকায় জ্ঞানদাদা নাকি পদ লিখেছে! ও হঠাৎ খুব উৎফুল্ল হয়ে ওঠে অভিমান ভুলে বলে ওঠে, জানো বাবা, ‌‘জ্ঞানদাদা নাকি নিজে পদ লিখেছে!’

  নৃসিংহবল্লভ অমায়িক হেসে বলেনহ্যাঁ, ও তো পদ লিখবেই তার জন্যই তো ও জন্মেছে পদটা শোনাও তো জ্ঞানদাস!

জ্ঞানদাস একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে সুর করে গায়

মধুবনে মাধব দোলত রঙ্গে

ব্রজবনিতা ফাগু দেই শ্যাম অঙ্গে।।

  জ্ঞানদাসের গলায় নতুন পদ ও তার সুর শুনে মুগ্ধ হয়ে যান সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভ তিনি বলেন, ‌‘এর জন্য তোমার তো একটা নিমন্ত্রণ পাওনা হল গো জ্ঞানদাস, তাছাড়া নতুন ব্রহ্মচারী হয়েছ তোমাকে তো একদিন নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানোও দরকারপিতার এ-কথা শুনে মানসীর অন্তরটা গর্বে ভরে উঠেছিল অচিরেই নিমন্ত্রণ প্রাপ্ত হয়েছিল জ্ঞানদাস    

  আজ সেই নিমন্ত্রণের দিনের কথাটাও মনে পড়ে যায় জ্ঞানদাসের সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভ মিত্রমশাইয়ের বাড়িটা তো বাড়ি নয় যেন একটা আশ্রম অসংখ্য গাছ-গাছালি ঘেরা, পাখ-পাখালিতে ভর্তি যেন একটা তপোবন সেই তপোবনেই ছোটোখাটো একটা ভোজের আয়োজন করা হয়েছে উপলক্ষ্য ব্রহ্মচারী ভোজন রাজুর ও কান্দরা গ্রামের বেশ কিছু গণ্যমান্য মানুষজন নিমন্ত্রিত রান্না-বান্নার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন পাড়ার চাট্টুজ্জে মশাই ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা ব্রাহ্মণ ভোজনের পংক্তিতে তাঁরাই পরিবেশন করছেন আর নতুন ব্রহ্মচারী জ্ঞানদাসকে পরিবেশন করার দায়িত্ব নিয়েছেন চাট্টুজ্জেগিন্নী ব্রহ্মচারীকে আহারের সময় মৌন থাকতে হয় মৌনী ব্রহ্মচারীকে বুঝেশুনে খাদ্য পরিবেশন করতে হয় দীর্ঘ উপবীতধারী কিশোর জ্ঞানদাস একটি কম্বলের আসনে বসে নিবিষ্ট মনে আহার গ্রহণ করছে হঠাৎ পরমান্নের কালো পাথরবাটিটা নিয়ে মানসী এগিয়ে আসে নামিয়ে দেয় জ্ঞানদাসের সামনে ও জানে পরমান্ন জ্ঞানদাসের খুব প্রিয় তা দেখে ওর জননী হাঁ-হাঁ করে ছুটে আসেএ কী করলি, এ কী করলি! জানিস না, ব্রহ্মচারীর খাবার অব্রাহ্মণদের ছুঁতে নেই!

  মেয়েকে একটু তিরস্কারই করেন গুরুমাতা চাট্টুজ্জেগিন্নী জিভ কেটে সরে দাঁড়ান উপস্থিত সকলে বিব্রত বোধ করেন চাট্টুজ্জে গিন্নী বলে ওঠেনওটা তুমি খেয়ো না বাবা, আমি বাটি পাল্টে দিচ্ছি

  এদিকে মায়ের তিরস্কারে মানসী ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে জ্ঞানদাস কোনো কিছু ভ্রূক্ষেপ না করে মানসীর দেওয়া বাটি থেকে পায়েস খেতে শুরু করেছে তা দেখে উপস্থিত ব্রাহ্মণমণ্ডলী রে রে করে ওঠেনএ কী অনাসৃষ্টি! কায়স্থ কন্যার হাতে নব ব্রহ্মচারীর অন্নগ্রহণ! বোষ্টমের হাওয়া লেগে সমাজটা উচ্ছন্নে যাচ্ছে নাকি! বামুন-কায়েতের আর ভেদাভেদ রাখবে না এরা

  জ্ঞানদাসের কাণ্ডকারখানা দেখে মানসীর কান্না থেমে গেছে ওর মনের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, জ্ঞানদাদা ব্রহ্মচারী হয়েও তার দেওয়া পায়েস ভক্ষণ করেছে তখন ওর চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল যেন শ্রীরাধিকার লজ্জাসম্ভ্রম

  তাই এখন গুরুমশাইয়ের সম্মুখে বংশীবদনের মুখে মানসী ও রাধিকার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হতে এবং সেসব কথা মনে পড়তে ও বাস্তবিকই লজ্জা বোধ করে

  মনোহর দাস সহপাঠী জ্ঞানদাসের এমন অবস্থা দেখে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেনা মশায়! মানসী তো আমাদের সঙ্গেই গান শেখে আমাদের সকলেরই প্রিয় ও সকলের সঙ্গেই গান গায়

  মনোহরের কথা শুনে গুরুদেবের মুখে স্মিত হাসি ফুটে ওঠে জ্ঞানদাস মস্তক অবনত করে বসে থাকে বংশীবদন কেমন অন্যমনস্ক হয়ে হাতের নখ খুঁটতে থাকে

  জ্ঞানদাস ভাবেসেদিন মানসীর অভিমানী কথাগুলো শুনে সেভাবে বোঝার অবস্থা জ্ঞানদাসের ছিল না আজ গুরুমশাইয়ের কাছে বিভিন্ন শ্লোক ও তার ব্যাখ্যা শুনে ও ভাবে, সনাতন ধর্মের নিয়মকানুনগুলো মোটেও ভালো নয় গুরুদেব ঠিকই বললেন, প্রকৃত বৈষ্ণব ব্রাহ্মণদের অনেক উর্দ্ধে সনাতন ধর্মের এই উচ্চনীচ ভেদাভেদগুলিকে সংস্কার করা দরকার সে জন্যই বোধহয় যুগাবতার শ্রীচৈতন্যদেব আর্বিভূত হয়েছেন এবং সাম্যের বাণী বিতরণ করছেন

 

চার

 

শ্রীবৃন্দাবনে সঙ্গীতগুরু হরিদাস স্বামীর আশ্রমে আজ যেন নক্ষত্র সমাবেশ তা দেখে বর্ষীয়ান হরিদাস স্বামী অভিভূত ও তৃপ্ত তাঁর আশ্রমে এমন গুণীজন সমাবেশ এর আগে বোধহয় ঘটেনি তাঁর দক্ষিণপার্শ্বে বসে আছেন গড়ানহাটার জমিদার পুত্র নরোত্তম দাস ঠাকুর, সর্বত্যাগী বৈষ্ণব বর্তমানে ইনি তাঁর প্রিয়তম শিষ্য মার্গ সঙ্গীত শিক্ষালাভের জন্য সুদূর পূর্ববঙ্গ থেকে তিনি এসে নাড়া বেঁধেছেন এই বর্ষীয়ান সঙ্গীত সাধকটির কাছে তাঁর রচিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দুটি গ্রন্থ ‌‘সাধারণ সিদ্ধান্ত ‌‘রস কে পদ’-এর শ্রুতিলিপিকারও এই নরোত্তম

  আর একপার্শ্বে রয়েছেন আর একজন প্রিয় শিষ্য শ্রীনিবাস আচার্য ওঁর হাতে তানপুরা সম্মুখে বসে রয়েছেন বঙ্গের কান্দরা থেকে আগত মঙ্গল ঠাকুর, শ্রীচৈতন্যর দুই প্রিয় শিষ্য রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামী অদূরে রয়েছেন গুরুজীর প্রাক্তন শিষ্য মিঞা তানসেন যিনি মুঘল বাদশাহ্ আকবরের সভাগায়ক তাঁর পার্শ্বেই রয়েছেন এক সওদাগর কিন্তু সওদাগরের বসার ভঙ্গিমাই জানান দিচ্ছে যে, তিনি ছদ্মবেশী কোনো অসাধারণ মানুষ আসলে উনি হলেন সঙ্গীতপিপাসু সম্রাট আকবার বাদশাহ্ তানসেনের অনুরোধে ছদ্মবেশে এসেছেন তানসেনের গুরুজীর সঙ্গীত শ্রবণ করতে গুরুজী হরিদাস স্বামী ভজন পরিবেশন করছেন

চলত নাগরী ভরনে গাগরি পায়েল ঝনকে

ঝনক ঝনক কাঁকন কনক গাগরি ছলকে।। ...

  তানপুরায় সঙ্গত দিচ্ছেন হরিদাস স্বামীর আর এক শিষ্য শ্রীনিবাস আচার্য তানসেনও গুনগুন করে গাইছেন গুরুদেবের সঙ্গে পার্শ্বে ছদ্মবেশী উপবিষ্ট বাদশাহ আকবর আর আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না তানসেন তাঁকে ইঙ্গিতে সংযত হতে বলছেন তিনি যে বাদশাহ্ তা প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে এই আশঙ্কা বাদশাহকে ছদ্মবেশে আসতে বলেছেন তানসেন নিজেই কারণ বাদশাহ্ ,তানসেনের গুরুজীর গান শ্রবণ করতে চেয়েছিলেন লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দিলেও গুরুজী বাদশাহের সভায় সঙ্গীত পরিবেশন করতে যাবেন না, তা তানসেনের জানা গুরুজী সুরের সাধক তিনি অর্থ, মুদ্রা, রত্ন, এসবের মোহে আবদ্ধ নন তার প্রমাণ তানসেন পূর্বেই পেয়েছেন ওঁর মনে পড়ে যায় একটি ঘটনাএকবার দিল্লীর সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠী দয়ালদাস ক্ষেত্রী, গুরুজীর আশ্রমে সঙ্গীতসুধা পান করতে এসেছিলেন গুরুজীর সঙ্গীত শ্রবণ করে তিনি খুশি হয়ে নিজের পাগড়ি থেকে সাতটি মহামূল্যবান রত্ন খুলে নিয়ে গুরুজীকে নজরানা দিয়েছিলেন গুরুজী মুষ্ঠির মধ্যে সেগুলি নিয়ে শ্রেষ্ঠীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‌‘আপনি যে সঙ্গীতপিপাসু, আপনি সপ্তসুর চেনেন? শুনে বলতে পারবেন কোনটি কোন সুর?’

  শ্রেষ্ঠী মস্তক আন্দোলন করে বলেছিলেন তিনি চেনেন না তখন গুরুজি তাঁকে বলেছিলেন, ‌‘আসুন আমার সঙ্গে যমুনা তীরে আমি আপনাকে সপ্তসুরের সঙ্গে পরিচয় করাবো 

  শ্রেষ্ঠী খুশি হয়ে গুরুজীর সঙ্গে যমুনাপুলিনে তানসেনও পশ্চাদগমন করেছিলেন তিনি দেখেছিলেন, মুষ্ঠীতে রাখা সাতটি রত্ন, একটি একটি করে গুরুজী যমুনার জলে ছুঁড়ে দিচ্ছেন বিশেষ মুদ্রায় জলে বেজে উঠছে ভিন্ন ভিন্ন সুরের জলতরঙ্গ গুরুজী একে একে সাতটি মুদ্রা ছুঁড়লেন, আর বলতে থাকলেনএইটি হল ষড়জ, এইটি ঋষভ, এইটি গান্ধার, এইটি মধ্যম, এইটি পঞ্চম, এইটি ধৈবত, আর এইটি হল নিষাদ

  শ্রেষ্ঠী তখন বুঝতে পেরেছিলেন গুরুজীর কাছে রত্নের কী মূল্য তিনি লজ্জিত হয়েছিলেন তাই তানসেন বাদশাহকে বলেছিলেন, ‌‘সাধারণ বণিকের বেশেই চলুন, তাহলে আপনার দ্বারা সঙ্গীতসুধা পান করা সহজ হবে  

  গুরুদেবের ভজন শেষ হতেই তাঁর শিষ্য শ্রীনিবাস আচার্য স্বরচিত পদ পরিবেশন করলেন

প্রেমক পুঞ্জরি শুনো গুনমঞ্জরি তুঁহু সে সকল শুভ দাই

 তোহরি গুনগণ চিন্তয়ে অনুখন মঝু মন রহল বিকায়।। ...

  অসাধারণ কণ্ঠ এবং অনবদ্য সুর-ঝঙ্কার সকল শ্রোতা যেন মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছেন তারপরেই মিঞা তানসেন শুরু করেছেন তাঁর সঙ্গীত তিনি একের পর এক গেয়ে চলেছেন খাম্বাজ, কাফি, দরবারি কানাড়া সকলেই রাগ-সমুদ্রে নিমজ্জমান, ভাবে বিভোর সবশেষে গুরুজির প্রিয় শিষ্য নরোত্তম দাস ঠাকুর পরিবেশন করলেন পদাবলী কীর্তন তা শুনে সকলে যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রয়েছেন

  যখন সুরের ঝঙ্কার স্তব্ধ হল, তখন পূর্ব আকাশে শুকতারা জ্ঝলজ্ঝল করছে আর কিছুক্ষণ পরেই উষার আলো প্রস্ফুটিত হবে নরোত্তম দাসের পদাবলী কীর্তন শুনে মঙ্গল ঠাকুর বিমোহিত হয়ে গিয়েছেন তিনি নরোত্তমকে বক্ষে আলিঙ্গন করে বলেন, ‌‘এ এক নতুন ধারার কীর্তন সারাদেশ তোমাকে এই নতুন ধারা প্রর্বতনের জন্য মনে রাখবে

  নরোত্তম মঙ্গল ঠাকুরের চরণধূলি নিয়ে মস্তকে ও জিহ্বাগ্রে স্পর্শ করলেন এমন সময় দূরে উপবিষ্ট এক যুবক উঠে এসে বলেনআপনি তো জমিদার কৃষ্ণানন্দ দত্তর জ্যেষ্ঠ পুত্র?

  নরোত্তম বলেনহ্যাঁ, অধমের নাম নরোত্তম

  আমি সেই খেতুরি থেকে আসছি আপনাকে ধরার জন্য

  তাই নাকি! তা আমার অপরাধ?

  যুবকটি জিভ কাটেনা, অপরাধ কেন হবে! বলতে চাইছি যে, আপনার সন্ধান করছি এখানে এসে আপনাকে পেলাম আপনার জন্য একটি দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছি আমি

নরোত্তম বলে ওঠেনসংবাদ এনেছো বলতে পারো আমার কাছে সেটি দুঃসংবাদ হতে পারে, আবার সুসংবাদও হতে পারে

  না প্রভু, এটি দুঃসংবাদই আপনার পিতৃদেব কৃষ্ণানন্দ দত্ত গত হয়েছেন আপনার ভ্রাতা পুরুষোত্তম রাজ্যপাট চালাচ্ছেন উনি আমাকে প্রেরণ করেছেন আপনাকে সংবাদটি জ্ঞাপন করার জন্য

  নরোত্তম এ কথা শ্রবণ করে শোকে মুহ্যমান হয়ে যান মৃদু গলায় বলতে থাকেনসত্যিই তুমি দুঃসংবাদই বহন করে এনেছো

  কিছুক্ষণ পর নরোত্তম শোক সংবরণ করেন গুরুজীর সন্নিকটে গিয়ে দুঃসংবাদ ব্যক্ত করেন গুরুজি ওকে আলিঙ্গন করে বলেনতোমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে বৎস এবার তোমার গৃহে ফেরার পালা জন্মভূমিতে ফিরে যাও যাওয়ার আগে শ্রীবৃন্দাবন থেকে তুমি নিয়ে যাও ষড়বিগ্রহ শ্রীগৌরাঙ্গ, বল্লভীকান্ত, শ্রীকৃষ্ণ, ব্রজমোহন, রাধামোহন ও রাধাকান্ত এঁদেরকে প্রতিষ্ঠা করো তোমার জন্মভূমিতে এঁরাই তোমাকে পথ প্রদর্শন করবেন

  গুরুজির আদেশ মতো নরোত্তম ষড়বিগ্রহ সংগ্রহ করে জন্মভূমি খেতুরিতে প্রত্যাবর্তন করছেন ওঁর পৌঁছনোর পূর্বেই সংবাদ প্রেরক সেই যুবক খেতুরিতে পৌঁছে নব্য জমিদার পুরুষোত্তমকে নরোত্তমের আগমন সংবাদ দিয়েছেন পুরুষোত্তম, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে আবাহন ও বরণ করে নেওয়ার জন্য যথাযোগ্য আয়োজন সম্পূর্ণ করে অপেক্ষা করছেন

  পিতৃবিয়োগের সংবাদ প্রাপ্তির একপক্ষকালের মধ্যেই নরোত্তম দাস পৌঁছলেন গড়ানহাটি পরগণার রাজধানী খেতুরিতে এসেই ঘোষণা করলেনপিতৃধন, রত্নসম্ভার, রাজ্যপাট এসবে তাঁর কোনও প্রয়োজন নাই, তার শুধু একটাই ইচ্ছা, খেতুরিতে তিনি বৈষ্ণব মহাসম্মেলনের আয়োজন করবেন ভ্রাতা পুরুষোত্তমকে তার ব্যবস্থা করে দিতে হবে আর বৃন্দাবন থেকে আনা ষড়বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করার জন্য একটা মন্দির তৈরি করে দিতে হবে

  শুরু হল মহাসম্মেলনের আয়োজন আমন্ত্রণ জানানো হল দেশ-দেশান্তরের বৈষ্ণবগণকে আমন্ত্রণ পেয়েছেন কান্দরার জয়গোপাল দাসঠাকুর, জ্ঞানদাস, মনোহর দাস, মঙ্গল ঠাকুরের নাতি বংশীবদন, রাজুর গ্রামের কীর্তনীয়া তথা সঙ্গীতাচার্য নৃসিংহবল্লভ মিত্রঠাকুর শ্রীখন্ড থেকে নরহরি সরকার ঠাকুরের ভ্রাতা রঘুনন্দন, যাজিগ্রাম শ্রীপাট থেকে শ্রীনিবাস আচার্য, বীরভূমের একচক্রা গ্রাম থেকে আসছেন বীরচন্দ্র ও তাঁর মাতা জাহ্ণবা দেবী এছাড়া অগণিত বৈষ্ণব উপস্থিত হচ্ছেন এই মহা সম্মেলনে

 

 

পাঁচ

কার্ত্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথি বেলা দ্বিপ্রহর তবুও রৌদ্রের তেজ খুব একটা পীড়াদায়ক নয় বরং স্বস্তিদায়কই বলা যায় ছাতিমগাছে তখনও কিছু ফুল অবশিষ্ট রয়েছে এবং সেগুলি জয়গোপাল দাসঠাকুরের দেবালয়ের চতুষ্পার্শ্বকে আমোদিত করছে দেবালয়ে আজ ঘটা করে শ্রীধর জিউ, গোবিন্দ জিউ ও শ্রীকৃষ্ণ-রাধারানি জিউয়ের পূজাপাঠ সমাপ্ত হয়েছে গ্রামবাসীগণ প্রসাদ পেয়ে যে যার গৃহে প্রত্যাগমন করেছে স্বয়ং জয়গোপাল দাসঠাকুর নিজের সেবা গ্রহণের পর নাট-মন্দিরে কম্বল বিছিয়ে বেশ আয়েশ করে বসে ‌‘মনোবুদ্ধিসংবাদগ্রন্থটি সংস্কার করছেন এমন সময় দুলকি চালে একটি ঘোড়া দন্ডায়মান হয় নাটমন্দিরের পার্শ্বে ঘোড়া থেকে অবতরণ করেন সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভ  

  জয়গোপাল তাঁকে দেখে উদ্বেগের সঙ্গে দন্ডায়মান হনকী বন্ধু! এমন অসময়ে! সার্বিক কুশল তো?

  নৃসিংহবল্লভ সহাস্যে বলেনহ্যাঁ বন্ধু, উদ্বেগের কোনও কারণ নাই তুমি উতলা হয়ো না বেশ কয়েকদিন তোমার দর্শন লাভ করিনি, তাই ... তাছাড়া তোমার ‌‘শ্রীকৃষ্ণবিলাসগ্রন্থটি সদ্য পাঠ সমাপ্ত করেছি ওটির ব্যাপারে তোমার সঙ্গে আলাপ না করে থাকতে পারছি না তাই আমার আগমন

  জয়গোপাল হৃষ্টমনে বন্ধুবরকে আহ্বান ও আপ্যায়ন করেন এতক্ষণ যে কম্বলটিতে বসেছিলেন, সেটি প্রশস্ত করে বন্ধুকে উপবেশন করতে বলেন তারপর উচ্চকন্ঠে বলেনকই রে! কে আছিস! এদিকে আয়! নিত্য সেবার পুষ্প-আহরণকারী বালকটি গুরুদেবের উচ্চকন্ঠ শুনে সন্নিকটে আসে তাকে শীতল জল ও কিছু মিষ্টান্ন আনয়নের আদেশ দিয়ে বলেনতারপর, বল মিত্র, তোমার সঙ্গীতচর্চা কেমন চলছে?

  নৃসিংহবল্লভ কম্বলে উপবেশন করতে করতে বলেনআমার কথা বাদ দাও আমি নগন্য মানুষ তোমার মতো একজন প্রকৃত পন্ডিতকে বন্ধুরূপে পেয়ে আমি ধন্য আমাকে যদি কেউ স্মরণে রাখে তো তোমার মিত্র রূপেই রাখবে

  জয়গোপাল খুবই সংকুচিত হয়ে বলেনকী যে বল বন্ধু! আমার আর পান্ডিত্য কোথায়! তোমার মতো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এমন সুপন্ডিত বন্ধু পেয়ে আমিই নিজেকে ধন্য মনে করি

  নৃসিংহবল্লভ ঈষৎ উত্তেজিতদেখ জয়, তোমার এই এক দোষ! বিনয় ভালো, অতি বিনয় ভালো নয় তোমার রচিত ‌‘জ্ঞানপ্রদীপগ্রন্থখানি নবদ্বীপ ও শ্রীবৃন্দাবনের পণ্ডিত সমাজ মান্যতা দিয়েছে তোমাকে ‌‘সুপণ্ডিতআখ্যা দিয়েছে তবুও তুমি ...!

  জয়গোপাল লজ্জিত হননা না, অতি বিনয় নয় ভাই! শাস্ত্রে লিখিত আছে

তৃণাদপি সুনীচেন তরোরপি সহিষ্ণুনা

অমানিনা মান দেন কীর্তনীয়ঃ সদাহরিঃ ।।

আমি যে বৈষ্ণব এই দীনতাই তো বৈষ্ণবের আসল বৈশিষ্ট্য ভাই

  নৃসিংহবল্লভ এবার বেশ রুষ্ট যেনদেখ ভাই, তোমার একথা আমি মানতে পারলাম না তুমি আমি হলাম কুলীন কায়স্থ ব্রাহ্মণদের পরেই সমাজে আমাদের স্থান তাহলে এত দীনতা কেন? তোমার ওই দীক্ষা নিয়ে নব্য বৈষ্ণব ভেক আমার ভালো লাগে না ভাই

  জয়গোপাল দুই কর্ণে অঙ্গুলি স্পর্শ করে হরি স্মরণ করেনএমন কথা বলা উচিত নয় ভাই নৃসিংহ সনাতন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মালিন্য ও এইসব জাতিভেদ প্রথা দূর করার জন্যই তো স্বয়ং বিষ্ণু মহাপ্রভু রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন সনাতন ধর্মকে সংস্কার করে বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তন করেছেন গীতার শ্লোক তো তোমার অজানা নয়

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত

অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।

পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতম।।

ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।

  এমন সময় পুষ্প-আহরক বালকটি একটি রৌপ্য-রেকাবিতে কিছু মিষ্টান্ন ও পিতল ঘটিতে শীতল জল নিয়ে উপস্থিত হয় জয়গোপাল বলেননাও বন্ধু, এই দ্বিপ্রহরে সূর্যদেবের তপ্ত কিরণ মস্তকে ধারণ করে এতখানি পথ পাড়ি দিয়ে এসেছ শীতল জল পান করে একটু শীতল হও

  নৃসিংহদেব বালকটির হাত থেকে জলপূর্ণ পিতল ঘটি নিয়ে হাত-মুখ প্রক্ষালন করেন তারপর মিষ্টান্ন আহারে মনোনিবেশ করেন

  জয়গোপালের মনে প্রবাহিত হয় বন্ধুবর নৃসিংহের কথা, ‌‘তোমার এই নব্য বৈষ্ণব ভেক আমার ভালো লাগে না...’ তিনি মনে মনে গুরু স্মরণ করেন এবং বন্ধুর হয়ে শ্রীকৃষ্ণের কাছে মার্জনা ভিক্ষা করেন এটা যে ভেক নয়, তা তিনি বন্ধুকে কী করে বোঝাবেন! শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায় বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন ওঁর স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে দীক্ষা নেওয়ার দিনটির কথা বর্ধমানের কান্দরা গ্রাম থেকে বীরভূমের একচক্রা গ্রামে তিনি পৌঁছেছেন পদব্রজে এখানেই শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর জন্মভূমি ও নিবাস তাঁর ইচ্ছাতেই তিনি কিশোরবেলায় সুন্দরানন্দজিকে গুরুরূপে পেয়েছেন যে সুন্দরানন্দজি হলেন, দ্বাদশ বৈষ্ণবগোপালের অন্যতম সেই গুরুর গুরু স্বয়ং নিত্যানন্দ প্রভুর কাছে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নেওয়ার জন্যই তাঁর আগমন কিন্তু দুর্ভাগ্য! নিত্যানন্দজি বঙ্গদেশকে কৃষ্ণ প্রেমে ভাসিয়ে দিতে নিজের তালুক ছেড়ে কোন মুলুকে পাড়ি দিয়েছেন তার ঠিকানা নেই কিন্তু তাঁর কাছেই যে দীক্ষা নেওয়ার অভিপ্সা নিত্যানন্দ-পত্নী মাতা জাহ্ণবা দেবীকে সে কথা জ্ঞাপন করতেই তিনি বলেনদীক্ষা নিতে এসে তো ফিরে যেতে নেই বাবা তুমি আমার পুত্র বীরচন্দ্রের কাছেই দীক্ষা নাও

  মাতৃ আদেশ শিরোধার্য করে সমবয়সী বীরচন্দ্রের কাছেই তিনি দীক্ষা নিয়েছিলেন বীরচন্দ্র জয়গোপালের মতো একজন পন্ডিতকে দীক্ষাদান করে অতীব আনন্দিত হয়েছিলেন কারণ বর্ধমানের কান্দরায় বসে ‌‘অথ ধর্মসন্দর্ভরচনা করলেও তার সুবাস ও সুভাষ ছড়িয়ে পড়েছিল এই বীরভূমের বৈষ্ণব সমাজেও এমন একজন পন্ডিতপ্রবর শিষ্যের সশ্রদ্ধ প্রণাম পাচ্ছেন তিনি, এ তো প্রভূত সম্মান প্রাপ্তি সেটি গুরুদেবের আনন্দিত মুখমণ্ডল দেখেই তিনি অনুধাবন করেছিলেন

  কিন্তু মনেপ্রাণে তিনি নিত্যানন্দ প্রভুকেই গুরুপদে বরণ করেছিলেন আসলে সেই কিশোরবেলায় দাঁইহাটের বটবৃক্ষতলে তাঁকে প্রথম দর্শনেই গুরু বলে মেনে নিয়েছিলেন এখন সেই গুরু স্মরণ করে বন্ধু নৃসিংহর জন্য মার্জনা ভিক্ষা করেন শ্রীকৃষ্ণের কাছে

  এদিকে বন্ধুবর নৃসিংহবল্লভ মিষ্টান্ন ও শীতল পানীয় গ্রহণ করে কিছুটা তৃপ্ত ও প্রশমিত যেনহ্যাঁ, বলছিলাম, ধর্ম সংস্কার করার জন্য যুগাবতার চৈতন্য আর্বিভূত হয়েছেন ঠিক আছে কিন্তু গুণীজন, পন্ডিতজনের গুণপনাকে মান্যতা না দিলে অপমানই করা হয় তুমি জান না, কত বড় কাজ তুমি করেছ তোমার এই ‌‘মনোবুদ্ধিসংবাদগ্রন্থটি প্রত্যেক ব্রাহ্মণের পাঠ করা উচিত আর এই ‌‘শ্রীকৃষ্ণবিলাসগ্রন্থটি প্রত্যেক মানুষের পাঠ করা উচিত তাতে রিপুমুক্ত হওয়া যাবে কান্দরার সমাজ-শ্রেষ্ঠ আমার দীক্ষাগুরু মঙ্গল ঠাকুরও তো বৈষ্ণব কই! তিনি তো তোমার মতো এতো বিনয়ের অবতার নন তিনি সর্বত্র নিজের প্রাধান্য বজায় রাখেন

  বন্ধু, ছাড় ওসব কথা গুরুর সমালোচনা করা পাপ এই দেখ, ‌‘মনোবুদ্ধিসংবাদগ্রন্থখানি তোমার দীক্ষাগুরুকে পাঠ করতে দিয়েছিলাম উনি বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন এখন ওই গ্রন্থটি সংস্কার করছি

  নৃসিংহবল্লভ আহ্লাদিত হয়ে ওঠেন ওঁর মুখমণ্ডলে ফুটে ওঠে অনির্বচনীয় আনন্দের হিল্লোলঅহো! অহো! কী লিখেছ বন্ধু! আমি যা বলছি শোনো! ওই গ্রন্থখানি কোনও ভালো লিপিকারকে দিয়ে প্রতিলিপি করাও তারপর ওইটি পন্ডিত সমাজের অনুমোদন করাও দেখবে, ব্রাহ্মণরা তোমাকে সম্মান দিতে বাধ্য হবেন এখন ওঁরা তো তোমাকে অবজ্ঞা করেন কান্দরা বা রাজুরের ব্রাহ্মণ সমাজ তোমার এই চতুষ্পাঠী আর এই মন্দিরের দেবসেবাকে ভালো চোখে দেখেন না তোমার চতুষ্পাঠীতে ওই মঙ্গল ঠাকুরের নাতি আর কল্পনাথের পুত্র জ্ঞানদাস ছাড়া আর কোনও ব্রাহ্মণ সন্তান আজ অবধি শিক্ষালাভ করতে এসেছে? তুমি নিশ্চয় জানো, কান্দরার ব্রাহ্মণ সমাজ মঙ্গল ঠাকুরের কাছে দরবার করতে গিয়েছিল তোমার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উদগার করতে গিয়েছিল

  জয়গোপাল স্মিত হেসে বলেনহ্যাঁ জানি বন্ধু! স্বয়ং মঙ্গল ঠাকুরই আমাকে সে কথা বলেছেন সেদিন মঙ্গল ঠাকুরের শ্রীপাটের নাট্যমন্দিরে সান্ধ্য অধিবেশনে তিনি আলবোলায় ধুম্রপান করতে করতে আলাপচারিতায় মগ্ন এমন সময় কেনারাম বাঁড়ুজ্জে, হৃষিকেশ মুখুজ্জেরা দল বেঁধে সেখানে উপস্থিত যতরকম ভাবে সম্ভব তাঁরা মঙ্গল ঠাকুরের কাছে আমার বিরুদ্ধে বলে তাঁর মন বিষাক্ত করার চেষ্টা করলেন কিন্তু মঙ্গল ঠাকুর গুণীজনের সম্মান করেন এর মধ্যে তিনি তাঁর এই অধম শিষ্য রচিত ‌‘অথ ধর্মসন্দর্ভপাঠ করে ফেলেছেন এবং মুগ্ধ হয়েছেন তাই বলেছেনও পন্ডিত মানুষ, শ্রীবৃন্দাবনে বৈষ্ণব সমাজে ওর রচিত ‌‘জ্ঞানপ্রদীপগ্রন্থটি সমাদৃত মহাপ্রভুর মহাপ্রয়াণ হলেও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‌‘বৈষ্ণব পণ্ডিত সমাজওকে যথেষ্ট মান্যতা দেয় পণ্ডিত মানুষ চতুষ্পাঠী খুলে ভালো করেছে ওর চতুষ্পাঠীতে আমাদের সন্তানেরা শিক্ষাগ্রহণ করলে উপযুক্ত শিক্ষালাভ করবে সেজন্যই আমার পৌত্র বংশীবদনকে ওর চতুষ্পাঠীতে শিক্ষালাভ করতে পাঠিয়েছি আমার তিন পুত্র রাধিকা, গোপী আর শ্যামকে যে শিক্ষা দিতে পারি নাই, বংশীবদনকে দিয়ে সে ইচ্ছা পূর্ণ করব

  এতে নাকি ওই বাঁড়ুজ্জেরা, মুখুজ্জেরা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে স্থান ত্যাগ করেছে

  নৃসিংহবল্লভ বলেনহ্যাঁ তুমি ঠিকই শুনেছ এছাড়া ওরা তোমার এই ঠাকুর সেবা নিয়েও ক্ষুব্ধ বলেছে, ‌‘কায়েতের পো মন্দিরে ঠাকুর সেবা করে কোন অধিকারে! এ তো ব্রাহ্মণের কাজ

  জয়গোপাল স্মিত হাসেনসেটাও জানি এ কথা শুনে মঙ্গল ঠাকুর নাকি বলেছেন, ‌‘ও তো তোমাদের যজমানি কিংবা মন্ত্র প্রদানে বাধা দিচ্ছে না ঠাকুরকে ফুল-জল দেওয়ার অধিকার সকলের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন,‌‘ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈশ্য শূদ্রে কোনও ভেদাভেদ নাই সকলেই অমৃতের পুত্র সকলেই পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণের প্রেম পাওয়ার যোগ্যএ কথা শুনে তো ব্রাহ্মণ সমাজ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে  

  নৃসিংহবল্লভ রৌদ্রতাপ এড়ানোর জন্য কম্বলের উপর স্থান বদল করে বলেনএতে তোমার কোনও ক্ষতি নাই বন্ধু তুমি নিজের কর্মটি করে যাও যে কথা বলার জন্য এই দ্বিপ্রহরে রৌদ্র মাথায় করে তোমার কাছে ছুটে আসা, সেটি শোনো খবর পেলাম, আগামী রথযাত্রার পূর্বেই শ্রীখন্ডের নরহরি সরকার ঠাকুর তাঁর নামসংকীর্তনের দল নিয়ে নীলাচলে রওনা দেবেন ওই নরহরি ঠাকুরের হাত দিয়ে তোমার ওই ‌‘মনোবুদ্ধিসংবাদগ্রন্থের প্রতিলিপি পাঠিয়ে দাও ওখানকার পণ্ডিতমহলে

  জয়গোপাল ঈষৎ উৎফুল্লহ্যাঁ, সেকারণেই তো বসে বসে ওই গ্রন্থটি পরিমার্জনা করছিলাম

  নৃসিংহবল্লভ উল্লসিতখুব ভালো করছ বন্ধু আর একটা কথা তোমাকে বলার জন্য এসেছি

  বল বন্ধু!

  বলছি আমার কন্যার কথা

  জয়গোপাল ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেনহ্যাঁ হ্যাঁ, আমি তো বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলাম তোমার কন্যার জন্মকুণ্ডলী বিচার করতে দিয়েছিলে তো রাজুরের বংশীধর আচার্য মশাইয়ের কাছে কী বললেন উনি?

  উনি ভালোই বললেন কন্যা সুলক্ষণা, বুদ্ধিমতী, সুপন্ডিত হবে সঙ্গীতে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি অর্জন করবে শুধু একটাই সমস্যা, ওর বিবাহকালে বিশেষ গন্ডগোলের আশঙ্কা আমি অবশ্য তা নিয়ে ভাবছি না সমূহকালে সমুৎপন্ন বুদ্ধি প্রয়োগ করা যাবে আমি ভাবিত হচ্ছি ওর বিদ্যাশিক্ষা নিয়ে এব্যাপারে আমার একটি অনুরোধ তোমাকে রাখতেই হবে ভায়া আমার কন্যা মানসীকে তোমার চতুষ্পাঠীতে গ্রহণ করতে হবে ও যথেষ্ট মেধাবিনী তোমার কাছে শিক্ষালাভ করলে ও বিদুষী হবেই, এতে কোনও সন্দেহ নাই

  জয়গোপাল এক মুহূর্ত নির্বাক থাকেন তারপর বলেনবলছো কী হে! কন্যা পড়বে চতুষ্পাঠীতে! এমনিতেই ব্রাহ্মণ সমাজ আমার উপর খড়গহস্ত হয়ে রয়েছে তার উপর এই অনাচার ওরা সহ্য করবে ভাবছো! ওরা আমার চতুষ্পাঠী উঠিয়ে দেবে আমার এই গ্রামের বাসও উঠিয়ে দেবে

  নৃসিংহবল্লভ মস্তক আন্দোলিত করেন তারপর বন্ধুর দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করেনদেখ ভাই, আমি হলাম রাজার দেওয়ান কালীচরণ মিত্রর পুত্র জাতিতে কুলীন কায়স্থ ওসব ভিক্ষাজীবী ব্রাহ্মণদের রক্তচক্ষুকে আমি ভয় পাই না আমি থাকতে তোমারও কোনও ভয় নাই তাছাড়া গুরুদেব মঙ্গল ঠাকুর তো আমাদের সহায় ওঁর নাতি বংশীবদন আমার কাছেই সঙ্গীতে সঙ্গত করতে যায় তোমার কাছেই শিক্ষালাভ করতে আসে

  জয়গোপাল এবার উচ্চস্বরে হেসে বলে ওঠেনতার মানে, বাহ্যিকভাবে তুমি বৈষ্ণববিরোধী কথা বললেও অন্তরে তুমি বৈষ্ণব ধারাকে সর্মথন কর তাই একটা সমাজ বদল আনতে চাইছ নারীশিক্ষার পুনঃপ্রবর্তন করতে চাইছ সেটা পরিষ্কার করে বল! তাহলে আমিই বা কেন পশ্চাদ্গামী হব! তোমার কন্যা মানসী তো আমারও কন্যাসমা ওকে আমার চতুষ্পাঠীতেই পাঠাবে আমার কাছেই ও শিক্ষালাভ করবে নারীশিক্ষার পুনঃপ্রবর্তনটা তোমার-আমার মাধ্যমেই শুরু হোক যদি আর একটা গার্গী, মৈত্রেয়ী কিংবা খনা তৈরি হয়

  জয়গোপালের এ কথা শেষে দুই বন্ধুই একযোগে হেসে ওঠে

 

ছয়

 

মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে সেই বাতাসে ঝুরুঝুরু কাঁপছে ছাতিমগাছের পাতাগুলি সাতসকালের ঝিকিমিকি রৌদ্রে সুবিশাল গাছটির ছায়া অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত সেই ছায়ায় খেজুর পাতার তালাই পেতে বসে রয়েছেন নৃসিংহবল্লভ মিত্র ঠাকুর তাঁর হাতে ধরা এস্রাজ গলায় গুনগুন করছে ভৈরবী রাগ অর্ধনিমিলিত নয়নে নিমগ্ন হয়ে আছেন সুরের সাগরে এমন সময় মৃদু পদচারণায় সন্নিকটে আসে মানসী, তার হাতে একটি বীণা পরনে মোটা কাপড়, মাথায় কবরী সদ্য ঝরে পড়া শিউলির মতো নিষ্পাপ মুখ, কালো ভ্রমরের মতো চোখ, ঠোঁটের কোণে মহামায়ার মতো ভুবন ভোলানো হাসি লেগে রয়েছে ওর বয়ঃক্রম মাত্র এগারো বৎসর পিতার কাছটিতে এসে বসে মানসী পিতার কণ্ঠের সঙ্গীত আর এক পর্দা চড়ে যায় মানসী বিভোর হয়ে শোনে ওই অপূর্ব রাগ শুনতে শুনতে সেও কণ্ঠে কণ্ঠ দান করে একসময় নৃসিংহবল্লভ নিজের কন্ঠদানে বিরত হন কন্যাকে ইশারায় বলেন গান গেয়ে যেতে মানসী অসাধারণ মুন্সীয়ানায় গেয়ে চলে ভৈরবী রাগ

  নৃসিংহবল্লভ মনে মনে আনন্দিত হন কন্যা বুঝি পিতাকেও অতিক্রম করে যাবে স্বয়ং মা সরস্বতী ওর ঘরে এসেছেন যেন! উনি ভাবতে থাকেন, সেটা হওয়ারই তো কথা ওর ধমনিতে প্রবাহিত হচ্ছে এই সঙ্গীত-সাধক পিতার রক্ত পিতার গুণ পুত্রী পেতেই পারে পরক্ষণেই ভাবেন, উনি নিজে অবশ্য পিতার গুণ প্রাপ্ত হননি পিতা সঙ্গীত-সাধক ছিলেন না এমনকি ছেলের সঙ্গীত-সাধনাও পছন্দ করতেন না উনি ছিলেন মুখসুদাবাদের রাজবাড়ির দেওয়ান পিতা কালীচরণ মিত্রের কাছেই শুনেছেন, উনি নাকি তাঁর ষষ্ঠ সন্তান ওর আগে পাঁচটি মৃত সন্তান প্রসব করেছিলেন জননী শঙ্করীদেবী তখন এই গ্রামের বর্ষীয়ান গণৎকার বংশীধর আচার্য নাকি ভবিষ্যৎ-বাণী করেছিলেনকাটোয়ার গঙ্গার ঘাটে ঘটা করে গৃহদেবতার পুজো দাও, ষষ্ঠ সন্তান জীবিত থাকবে সেই পূজার পুরোহিত ছিলেন কান্দরার মঙ্গল চট্টোপাধ্যায় তিনিও পূজা সমাপন হলে বলেছিলেন এবারেও পুত্র সন্তান হবে এবং জীবিত থাকবে সন্তান অভূতপূর্ব নাম-যশের অধিকারী হবে

  নৃসিংহবল্লভ ভাবেন, নাম-যশের অধিকারী তিনি হয়েছেন কিনা জানেন না কিন্তু মঙ্গল ঠাকুরের কূলদেবতা নৃসিংহদেবের আশীর্বাদে তিনি সঙ্গীতের সাধক হয়ে উঠেছেন কিন্তু আশ্চর্য! পিতার মুখে শুনেছিলেন, একাদশ বৎসর বয়ক্রম অবধি ওর নাকি জিভের আড়ষ্টতা কাটেনি সঠিকভাবে বাক্য উচ্চারণ করতে পারতেন না ওই মঙ্গল ঠাকুরের কাছে দীক্ষা নেওয়ার পর একবছরের মধ্যে ওঁর জিভের আড়ষ্টতা কেটে যায় এবং অপূর্ব সুকণ্ঠের অধিকারী হন তাঁর নির্দেশেই তিনি সঙ্গীত-সাধনা শুরু করেন সেকারণে তাঁকে যথেষ্ট মান্যতা দেন তাঁর মন্দিরে নাম-সংকীর্ত্তন করতেও ওঁর ডাক পড়ে ব্রাহ্মণ হলেও তিনি এই কায়স্থ সন্তানটিকে যথেষ্ট স্নেহ করেন তাঁর বাড়িতে ওঁর অবারিত দ্বার ভাবেন, কন্যাটিকেও একদিন গুরুদেব মঙ্গল ঠাকুরের মন্দিরে নাম-সংকীর্ত্তন করতে নিয়ে যাবেন এত অপূর্ব কন্ঠস্বর ও গায়কিতে মঙ্গল ঠাকুর মুগ্ধ হবেন নিশ্চয়!

  সঙ্গীত-শেষে মানসী থামতেই নৃসিংহবল্লভ বলে ওঠে কই রে মা! জ্ঞান, মনোহর ওরা তো এল না এখনও! বংশীবদনেরও দর্শন মিলল না প্রভাতি সুরে ওর খোল না বাজলে যেন সঙ্গীতটা অসম্পূর্ণই রয়ে যায়! ছেলেটি একটু দাম্ভিক ও চটুল ঠিক; কিন্তু হাতটি চমৎকার ওর হাতে খোল যেন কথা বলে!

  তুমি শুধু ওর কথাই বল বাবা! অন্য ছাত্রদের কথা তো তেমন বল না! ও বড় বেশি চঞ্চল আর কটুভাষী!

  তোকে বুঝি খুব জ্বালাতন করে!

  হ্যাঁ, কী সব বলে রাগায় আমাকে!

  তুই রাগিস কেন মা!

  বাঃ! রাগের কথা বললে রাগবো না! জান, আমাকে 'রাধিকা', 'রাইকিশোরী' এসব বলে তুমি একটু বকে দিও তো ওকে

  ঠিক আছে কোনওদিন অপরাহ্নে এলে বকব প্রত্যুষে কাউকে বকতে নেই যে!

  তোমার শুধু ছল! আসলে তুমি ওকে ভয় পাও

  ওকে ভয় পাই না রে, ওর ঠাকুরদা' মঙ্গল ঠাকুরকে অবিশ্যি একটু ভয় পেতেই হয় গ্রামে ওঁরই তো প্রভাব প্রতিপত্তি

  তাতে কী! কেউ দোষ করলে কি বকবে না! অন্যদেরকে তো একটুতেই তিরস্কার কর

  অন্যদের বলতে কি তুই জ্ঞানের কথা বলছিস! জ্ঞান যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র রে! ওকে যে আমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসি

  ভালবাসলে তিরস্কার কর কেন?

  যাকে আদর করা যায় তাকেই যে শাসন করতে হয় রে পাগল মেয়ে! ওকে তিরস্কার করলে তোর বুঝি রাগ হয়!

  মুখ নিচু করে মানসী, কিছুই বলে না

  একটু পরে নৃসিংহবল্লভের কণ্ঠে গুনগুনিয়ে ওঠে পিলু খাম্বাজ এমন সময় দুজন যুবক এসে দাঁড়ায় সম্মুখে একজন গৌরকান্তি, অন্যজন শ্যামবর্ণ ওদের মুখমণ্ডলে সদ্য যৌবনের চিহ্ন অঙ্কিত বছর পাঁচেক আগে কাটোয়ার ঘাটে স্নান করতে যাওয়া সেই কিশোর দুটিকে যেন চেনাই যায় না ওরা এসে প্রণাম জানায় গুরুদেবকে নৃসিংহবল্লভ ওদের মস্তক স্পর্শ করে আশীর্বাদ করেনসঙ্গীতময় হোক জীবন

  তারপর ওরা গুরুদেবের দক্ষিণে বসে গুরুদেব তাঁর হাতের এস্রাজটি তুলে দেন জ্ঞানদাসের হাতেবল বৎস! আজ কোন সঙ্গীত শোনাবে ওই আকাশ, বাতাস আর এই ছাতিমগাছকে জ্ঞানদাস অনুমতি চাওয়ার ভঙ্গিতে বলে ওঠেআজ একটা বিদ্যাপতির পদ কীর্তন করার বাসনা গুরুদেব

  বিদ্যাপতির পদ! তাই হোক তুমি তো বিদ্যাপতির ভক্ত! বংশীটা এখনও এল না খোল ছাড়া কি কীর্তন জমে!

মনোহর সম্মুখে অঙ্গুলি নির্দেশ করেওই তো গুরুদেব, বংশী আসছে

  শ্রীখোল কাঁধে নিয়ে বংশীবদন এসে দণ্ডায়মান হয় গুরুদেবকে প্রণতি জানিয়ে বসে

  জ্ঞানদাস গুনগুণ করতে করতে পঞ্চম স্বরে গেয়ে ওঠে

অরুণ কিরণ কিছু অম্বর দেল

দীপক শিখা মলিন ভএ গেল

হঠ তজ মাধব জএবা দেহ

রাখএ চাহিঅ গুপুত সনেহ...

  সুরের মূর্চ্ছনা আর শ্রীখোলের নিনাদে সত্যিই যেন আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে নিমিলিত আঁখি জ্ঞানদাসের গলায় অনায়াসে খেলে যায় পঞ্চম থেকে সপ্তম সুর মীড়, গমক, আর তেহাইয়ের তালে তালে স্থায়ী-অন্তরার জমক মানসী নতমস্তকে সেই যে বসেছে, আর মুখ তোলেনি মনপ্রাণ সারা শরীর দিয়ে সে জ্ঞানদাসের গান শুনছে

দুরজন জাএত পরিজন কান

সগর চতুরপণ হোএত মলান

ভমর কুসুম রমি ন রহ অগোরি

কেও নহি বেকত করএ নিঅ চোরি...

  মানসীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটিও যেন চুরি করে নিয়েছে ওই বিদ্যাপতির পদ আর জ্ঞানদাসের সুর জ্ঞানদাস একসময় সঙ্গীত শেষ করে

 

ফাব চোরি জৌঁ চেতন চোর

জাগি জাএ পুর পরিজন মোর

ভনই বিদ্যাপতি সখি কহ সার

সে জীবন জে পর উপকার

  জ্ঞানদাসের সঙ্গীত শেষ হয় মানসী তীর্যক নয়নে দেখে জ্ঞানদাসকে জ্ঞানদাসের চোখ খুঁজতে থাকে ছাতিমগাছের পাতার ফাঁক থেকে একনাগাড়ে ডাকতে থাকা বেহায়া পাপিয়াটাকে

  জ্ঞানদাসের সঙ্গীত শেষ হলেও সহসা চক্ষু উন্মিলিত হয় না গুরুদেবের তিনি ভাবে বিভোর হয়ে আছেন যেন! তিনি ভেবে চলেছেন, সদ্য সমাপ্ত হওয়া কান্দরায় মঙ্গল ঠাকুরের দেবালয়ে সাতদিন ব্যাপি সাঁজি উৎসবের কথা ওখানে জ্ঞানদাস যথেষ্ট ভালো সঙ্গীত পরিবেশন করেছে প্রশংসাও পেয়েছে বহু গুণী মানুষের আগমন হয়েছিল এই উৎসবে এর জন্য মঙ্গল ঠাকুরকে সাধুবাদ দিতেই হয় তাঁর দীক্ষাগুরু পরম বৈষ্ণব গদাধর গোস্বামীর আগমন উপলক্ষ্যে তিনি এই উৎসবের সূচনা করেছিলেন ঠিক সেসময় বন্ধুবর সুপন্ডিত জয়গোপাল দাসঠাকুরের গৃহে আগমন ঘটেছে ওঁর শিক্ষাগুরু সুন্দরানন্দজির এঁদের উপস্থিতিতে মঙ্গল ঠাকুরের এই সাতদিন ব্যাপী  অনুষ্ঠানটি আশপাশের অঞ্চলে যথেষ্ট সাড়া ফেলে দিয়েছে মঙ্গল ঠাকুর নাট-মন্দিরকে সুসজ্জিত করেছেন মন্দিরের তিন বিগ্রহ নৃসিংহদেব, গৌরগোপাল ও রাধাবল্লভ জিউকে গর্ভগৃহ থেকে বাইরে এনে রাজবেশ পরিহিত করিয়ে নাট-মন্দিরে রেখেছেন আশপাশের গ্রাম থেকে প্রতিদিন শত-শত মানুষ আসছেন দেবদর্শনে তাঁরা অনুষ্ঠানে প্রসাদ পাচ্ছেন, জয়গোপাল দাসঠাকুরের ভাগবৎ পাঠ শুনছেন আর শুনছেন সঙ্গীত, নাম-সংকীর্ত্তন তিনি নিজেও যে ওখানে যথেষ্ট ভালো সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন তা সকলে এক বাক্যে স্বীকার করেছে গুরুদেবের গুরুদেব গদাধর গোস্বামী তো গান শুনে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে কিন্তু তিনি সর্বাপেক্ষা তৃপ্ত হয়েছেন মানসীর প্রশংসা পাওয়াতে এই প্রথম মানসী মঙ্গল ঠাকুরের নাটমন্দিরের সাঁজি উৎসবে সঙ্গীত পরিবেশন করল গুণীজন প্রত্যেকেই মানসীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বলেছেন, পিতাকে অতিক্রম করে যাবে এ কন্যা এ বয়সে সঙ্গীতের উপর এত দক্ষতা যার থাকে, পরিণত বয়সে সে দেশ জয় করবে

  মঙ্গল ঠাকুর মানসীর সঙ্গীত শ্রবণ করে মুগ্ধ হয়ে ওকে পুরস্কৃত করার কথা ঘোষণা করেছেন এবং নিজকণ্ঠের  হার খুলে নিয়ে কিশোরী মানসীর কন্ঠে পরিয়ে দিয়েছেন সেই সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, শ্রীপাটে তিন দেবতার পূজার পুষ্পচয়ণ করার অধিকার দেওয়া হল মানসীকে ও যখন প্রত্যুষে জয়গোপালের চতুষ্পাঠীতে বিদ্যাভাসে আসবে, তখন মন্দিরে পূজার ফুল ও-ই দিয়ে যাবে নৃসিংহবল্লভ ভাবেন, সত্যিই তখন ওর মন আনন্দে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়েছিল দেবসেবার পুষ্পচয়ণের অধিকার সত্যিই পুণ্যের কাজ

  ওখানে জ্ঞানদাসও তার নতুন পদ বেঁধে, সুর দিয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করে সকলকে অভিভূত করে দিয়েছে ওর এখন আরও গুণীজন সান্নিধ্য প্রয়োজন এমন ভেবে উনি বলে ওঠেনশোন জ্ঞানদাস! সকলেই শোন! আগামী মার্গশীর্ষ মাসের শুক্লাচতুর্দ্দশীতে আমাদের সকলকে খেতুরি যেতে হবে ওখানে এক মহোৎসবের আয়োজন করেছে গড়ানহাটি পরগণার জমিদার কৃষ্ণানন্দ দত্তের পুত্র নরোত্তম দত্ত সে আবার যে সে লোক নয়, সঙ্গীতসাধক তানসেনের গুরুভাই গুরুদেব হরিদাস গোস্বামীর নিকট তানসেন আর নরোত্তম দত্ত মার্গসঙ্গীত শিক্ষালাভ করেছে শুনছি ওই মহাসম্মেলনে সমস্ত  বৈষ্ণব ও কীর্তনীয়াদের আহ্বান করা হয়েছে অনেকেই যাবে শ্রীখন্ডের মুকুন্দ সরকার ঠাকুরের নাতি রঘুনন্দনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে ও যাবে আমাদের সঙ্গে কী এক নতুন ধারার কীর্তন পরিবেশন করবে ওই নরোত্তম দত্ত আমাদের শোনা দরকার; যেহেতু আমরা সঙ্গীত সাধক

  সকলে সানন্দে সম্মতি দেয়হ্যাঁ, যেতেই হবে গুরুদেব

  জ্ঞানদাস ভেতরে ভেতরে সর্বাপেক্ষা বেশি পুলকিত বৈষ্ণবদের সম্পর্কে ওর প্রবল আগ্রহ ওখানে বহু বৈষ্ণবের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে এতে ওর মন ময়ূরের মতো নেচে ওঠে

 

সাত

 

জয়গোপাল দাসঠাকুর আজ নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই চতুষ্পাঠীর ছাত্রদের ছুটি দিয়ে দিলেন তিনি রওনা হবেন শ্রীখন্ডের পথে দেখা করবেন নরহরি সরকার ঠাকুরের সঙ্গে ‌‘মনোবুদ্ধিসংবাদগ্রন্থটির সংস্কার ও প্রতিলিপি সম্পূর্ণ হয়েছে সেটি নরহরি সরকার ঠাকুরের নিকট পৌঁছে দেবেন তাঁকে অনুরোধ করবেন, সেটি নীলাচলে গিয়ে মহাপ্রভু প্রতিষ্ঠিত ‌‘বৈষ্ণব সমাজ পণ্ডিতমণ্ডলীতে সর্মপণ করার জন্য বন্ধু নৃসিংহবল্লভ তাকে এ ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে বলে রেখেছেন শ্রীখন্ড অনেকটা পথ সময় থাকতে রওনা দেওয়াই ভালো আবার তো প্রত্যাগমন করতে হবে

  এদিকে চতুষ্পাঠীর ছাত্রগণ অদ্য আগেভাগে ছুটি পেয়ে যার পর নাই খুশি ও উৎফুল্ল চতুষ্পাঠী থেকে নিস্ক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বংশীবদন প্রস্তাব দেয়চল, সকলে আজ নয়ন শাহর মাজারে যাই ওখানে ‌‘ঝোল-ঝাপ্টিখেলব দারুণ মজা হবে  

সকলে সমস্বরে বলে ওঠেহ্যাঁ হ্যাঁ, চল চল!

  নয়ন শাহ্ দরবেশের মাজারটি কান্দরা গ্রামের উত্তর-পূর্ব কোণের একপ্রান্তে মাজারের পার্শ্বে একটি পুকুর তার চতুষ্পার্শ্বে নানান বৃক্ষরাজি আম, জাম, নোনা আতা, ঘোড়ানিম, সবেদা, ফলসা, বকুল আরও কত রকমের গাছে ভরা, অথচ নির্জন পাখির কুজন ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই এ জায়গাটি বালকগুলির খুবই প্রিয় ছোটো-ছোটো গাছে সহজেই চড়া যায় গাছ থেকে লম্ফঝম্প করা যায় অথচ তিরস্কার করার কেউ নাই তাই বালকেরা একটু অবসর পেলেই এখানে ছুটে আসে গাছে চড়ে, গাছ থেকে ঝুলে মাটিতে লম্ফ দেয় দোল খায়, পুকুরে সাঁতার কাটে আবার কখনও বা গাছের ছায়ায় চুপচাপ বসে গল্প করে কিংবা তর্কে মেতে ওঠে

  জ্ঞানদাস একটু শান্ত প্রকৃতির ও বন্ধুদের সঙ্গে মাজারে এসেছে ঠিকই, কিন্তু লম্ফঝম্পে ওর মন নেই তাই পুকুরের বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িতে চুপচাপ বসে রয়েছে টলটলে জলের দিকে ওর দৃষ্টি ও অবলোকন করতে থাকে, জলে পড়ে থাকা একটা গাছের ডালে একটা লাল ফড়িং বসছে উড়ে যাচ্ছে, আবার বসছে

  হঠাৎ খেলা ছেড়ে মনোহর ওর পাশে এসে বসে জ্ঞানদাস বলেকী রে! খেললি না! চলে এলি যে!

  মনোহর বলেখেলতে ভালো লাগছে না তুইও তো না খেলে এখানে বসে আছিস!

  জ্ঞানদাস হেসে বলেনা রে, আমি খেলছি ওই লাল ফড়িংটার সঙ্গে দ্যাখ, ওকে উড়িয়ে দিচ্ছি, ও এক চক্কর মেরে আবার এসে ওখানেই বসছে আমাকে যেন অবজ্ঞা করতে চাইছে, আর আমি ওকে জ্ঝালাতন করছি বেশ ভালো খেলা নয়, বল

  হ্যাঁ, ফড়িংটাও তোর সঙ্গে খেলে মজা পাচ্ছে

  তাহলে তুইও খেল ওই ফড়িংটার সঙ্গে

  না রে, আমি ওই ফড়িংয়ের ভাষা বুঝতে পারি না, তুই পারিস তুই তো আকাশ-বাতাস-নদী-গাছ-ফুল-পাখি সকলের সঙ্গে কথা বলিস মানুষের সঙ্গেই কম কথা বলিস

  কেন রে! তোর সঙ্গে কথা বলি না! এই তো বলছি

  মনোহরের অভিমানী কন্ঠস্বরজানিস জ্ঞান! তোদের বাড়িতে কিংবা বংশীদের বাড়িতে আমি গেলে কোনো কিছুতে আমাকে হাত দিতে দেয় না, ছুঁতে দেয় না জল খেলে গেলাসটাও ধুয়ে উপুড় করে রাখতে হয় তুই আমাকে ছুঁলে তোকেও গঙ্গাজলের ছিঁটে নিয়ে শুদ্ধ হতে হয় কিন্তু গুরুমশাইয়ের বাড়িতে এসব নাই আমাকে গুরুমশাই ছুঁলেও গঙ্গাজল নেন না তোদেরকেও নিতে বলেন না এমন কেন হয় রে?

  গুরুমশাই যে বৈষ্ণব আমরা তো ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণদের অনেক নিয়ম, জাতপাত ভেদাভেদ বৈষ্ণবদের ভেদাভেদ নেই সবাই সমান আমিও ওসব মানি না তুই তো শুনেছিস, উপনয়নের পর গুরুমশাইয়ের বাড়ির নিমন্ত্রণে আমি মানসীর দেওয়া পায়েস খেয়েছি তাতে ব্রাহ্মণরা খুব ক্রোধান্বিত হয়েছিল আমি মিটিমিটি হেসেছিলাম আর বাড়ি ফেরার পথে পদ বেঁধেছিলাম

নিতি নিতি আসি যাই,

এমন কভু দেখি নাই,

 কী খ্যানে পা বাড়াইনু জলে

গুরুয়া গরব কূল নাশয়িতে তার কূল

কূলবতী আগে আগে চলে

এ পদ শুনে পিতৃদেবের কাছে বকুনি খেয়েছিলাম আর গুরুমশাই প্রশংসা করেছিলেন  

  মনোহর আনমনা হয়ে বলেতাহলে বৈষ্ণব ধর্মটাই তো ভালো, তাই না রে!

  জ্ঞানদাস পুকুরের জলের দিকে ওপারের শিরীষ গাছের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে বলেআমি বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা নেবো

  তাহলে আমিও নেবোমনোহর বলে ওঠে

  জ্ঞানদাস মনোহরের দিকে স্থির চোখে তাকায় তারপর গাঢ় গলায় বলেতুই কেন বৈষ্ণব হবি?

  তুই হবি যে! তুই হলে আমিও হবো আমি যে তোকে খুব ভালোবাসি রে জ্ঞান!

  জ্ঞানদাস মনোহরকে আলিঙ্গন করে ওর চক্ষুদুটি বাষ্পাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে মনোহর বলেতোর মনে আছে জ্ঞান, পাঁচ-ছয় বছর আগে কাটোয়ার ঘাটে গঙ্গাস্নান করতে গিয়েছিলাম সেখানে গঙ্গাস্নান করে উঠে এসে একজন বৈষ্ণব তোর পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিল আর আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল

  হ্যাঁ, মনে আছে তিনি পরম বৈষ্ণব

  হ্যাঁ, সেদিন উনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে আমার কেমন আনন্দে মন ভরে গিয়েছিল আজও তুই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে সেরকম হল জানিস! কিন্তু তুই তো ব্রাহ্মণ

  না রে, আমি ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব কোনোটাই নই আমি তোর বন্ধু, তাই তোর এমন হল এরপর জ্ঞানদাস গুনগুন করে গান ধরে

তুঁহু মোর মনোহরও বঁধু

না দ্বিজ না শূদ্র তুঁহু মনুষ্য শুধু

দুর্বাদল শ্যাম সাথে যেমন গুহক

গলে গলে লাগল হিয়ে হিয়ে এক

  মনোহর মুগ্ধ হয়ে জ্ঞানদাসের গান শোনে গান থামতেই বলে ওঠেঅসাধারণ! এখুনি পদটা বাঁধলি বুঝি!    

  জ্ঞানদাস বিড়বিড় করেআমি আর বাঁধলাম কোথায়! তুই তো আমাকে দিয়ে বাঁধিয়ে নিলি তুই তো আমার কৃষ্ণ গোঁসাই

  এবার মনোহর জ্ঞানদাসকে বুকে টেনে নেয়, আলিঙ্গন করে আলিঙ্গনশেষে মনোহর বলেজ্ঞান, তুই শুধু পদ লিখে যা মুখে মুখে এমন পদ লিখে সুর দিতে পারিস অনেক বড়ো হবি রে তুই! দূরে ওই তালগাছটার চেয়েও বড়ো, আকাশে রামধনুর মতো বড়ো

  জ্ঞানদাস কোনও কথা বলে না জলের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বসে থাকে মনোহর ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে বলেতোর খেলার সাথী সেই লাল ফড়িংটা আর নাই

  জ্ঞানদাস মিটিমিটি হেসে বলেআছে, আছে, সে আমার মনের কোণে বাসা বেঁধে আছে এখুনি একটা পাক মেরে দিল শুনলি না ‌‘তুঁহু মোর মনোহর ...

  এমন সময় বংশীবদন ও আরও কয়েকজন হই-হই করে ওদের সন্নিকটে আসে ওদের দুজনের হাত ধরে হিড় হিড় করে জলের দিকে টেনে নিয়ে যায় জ্ঞানদাস বাধা দেয় না মনোহরও জ্ঞানকে অনুসরণ করে

  জল কর্দমবর্ণ আর ওদের চক্ষু রক্তবর্ণ হওয়ার পর ওরা পুকুর থেকে উঠে আসে ধুতি খুলে মস্তকগাত্র মুছে নিয়ে আবার ধুতি পরিধান করে এরপর ফলাহারের পালা নোনা আতা, সবেদা, বৈঁচি ফল যা হাতের নাগালে পাওয়া গিয়েছে, তা আহরণ করে দুদণ্ডে সাবাড় করে ফেলে সকলে মিলে

  বালকগুলিকে আজ যেন খেলায় পেয়েছে কারও গৃহে প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা নাই না ফিরলে সমস্যাও নাই ওদের বাড়িতে মাতা-পিতারা জানেন, মাঝেসাঝেই ছাত্রগুলির মধ্যাহ্ণ ভোজনের ব্যবস্থা হয় গুরুগৃহে তাই ওরা চিন্তিত নয় সেখানেই রয়েছে বাছারা

  সেকারণে মহানন্দে বালকগুলি আবার খেলায় মনোনিবেশ করে এবার জ্ঞানদাসও খেলায় মেতে ওঠে তবে ওই গাছে চড়া, লম্ফঝম্প করা ওর মোটেও পছন্দ নয় তাই ও এক অভিনব খেলা আবিষ্কার করে বিদ্যাপতি বা চন্ডীদাসের কোনো একটি পদ গেয়ে ওঠে তারপর বলে, ‌‘বল তো বংশী, এটাতে কোন তাল বাজবে?’ কিংবা মনোহরকে বলে, ‌‘এ পদটা আর কীভাবে গাইতে পারবি মনো?’

  মনোহর চেষ্টা করে পদটাকে নতুন সুরে বাঁধতে অন্যরা মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে এই তিনজন সঙ্গীতপাগল বন্ধুর পাগলামি

এভাবেই কখন বিকেল পেরিয়ে গোধূলি আসে ডুবন্ত সূর্যের আভায় পথের ধূলি গেরুয়াবর্ণ ধারণ করে সেই ধূলি উড়িয়ে মাঠ থেকে গোরুগুলি ঘরে ফেরে তাদের অনুসরণ করতে করতে রাখাল-বালক উদাত্ত কন্ঠে গান গাইতে থাকে রাখাল জানে না, যে গান সে গাইছে, সে গান এ জ্ঞানদাস নামক ছেলেটির রচনা করা পদ, নৃসিংহবল্লভ মিত্রর সুরে বাঁধা দূর থেকে জ্ঞানদাস সে গান শুনে চমকিত হয় মনোহর বলে, জ্ঞান, এ যে তোরই পদ গাইছে! মঙ্গল ঠাকুরের নাটমন্দিরে সাঁজি উৎসবে গেয়েছিলিস

  জ্ঞানদাস বলেএখন আর ও পদ আমার নয় আমি বেঁধেছিলাম ঠিকই তারপর আকাশ-বাতাস-গাছপালা, খাল-বিল-নদী-নালা, রাখাল-বাগাল-নাইয়া, এদেরকে দিয়ে দিয়েছি এখন ওই পদ, ওই গান ওদের ওদের মতো আমি কী আর দরদ দিয়ে গাইতে পারি?

বংশীবদন টিপ্পনি কাটেঠিকই বলেছে জ্ঞান, একমাত্র মানসী যখন ওর গান শোনে, তখনই ও দরদ দিয়ে গান গায় মানসী যে জ্ঞানের 'রাইকিশোরী'  

  জ্ঞানদাস লজ্জা পায় ওর মুখমণ্ডলের গোলাপী ছোপ ও গোধূলির রং মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় লজ্জা লুকোতে ও মুখ ঘুরিয়ে দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হঠাৎ দেখে, দূরের পথ ধরে শিক্ষাগুরু জয়গোপাল দাসঠাকুর গুটিগুটি পায়ে গ্রামের দিকে আসছেন ওরা দৌড়ে তাঁর কাছে পৌঁছয় দেখে, গুরুদেবের পরিশ্রান্ত চোখেমুখে কষ্টের ছাপ জ্ঞানদাস জিজ্ঞাসা করেমাশায়, আপনার শরীর ঠিক আছে তো?

  গুরুদেব কষ্টের সঙ্গে বলেনহ্যাঁ বাবা, শরীর ঠিক আছে এতখানি পথ অতিক্রম করে যাতায়াত করলাম, সে কারণে খুবই ক্লান্ত বোধ করছি তোমরা এবার গৃহে ফিরে যাও, সন্ধ্যা নামবে এখুনি

  কথাগুলি শেষ হওয়ার পর গুরুদেব ধীর গতিতে এগিয়ে যান গ্রামের দিকে তখন গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যা নামছে পাখিরা বাসায় ফিরে তুমুল চিৎকার শুরু করেছে মনোহর বলেসূর্য পাটে বসেছে চল এবার ঘরে ফিরি এখুনি আঁধার নামবে

জ্ঞানদাস অন্যমনস্ক হয়ে বলে ওঠেসূর্য তো সময় হলেই পাটে বসবে, তাতে কী! একটু পরেই চাঁদ উঠবে আঁধার কি সহজে নামে রে!

 

আট

 

পৌষের সকাল পূর্ব আকাশে সূর্যদেব উদিত হচ্ছেন তাঁর ঝলমলে রশ্মিচ্ছটায় চতুষ্পার্শ্ব উজ্জ্বল হয়ে উঠছে শিশিরভেজা ঘাসে সূর্যরশ্মি পতিত হয়ে অসংখ্য মুক্তোদানা সৃষ্টি করছে অলক্তরাঙা পায়ে সেই মুক্তোদানা পদদলিত করে আলপথ ধরে রাজুর থেকে কান্দরার পথে মানসী জয়গোপাল দাসঠাকুরের চতুষ্পাঠীতে শিক্ষালাভের জন্য যাচ্ছে সে মাঠে সাদা, সবুজ আর হলুদের সমারোহ কোথাও হলুদ ফুলে ভরা সর্ষেক্ষেত, কোথাও ঘন সবুজ পাতায় ভরা ইক্ষুক্ষেত তার মাঝে কোথাও সাদা ফুলে ভরা মুলোক্ষেত যেন এক রঙবেরঙের গালিচার উপর দিয়ে দ্রুতপায়ে হেঁটে চলেছে মানসী ঠিক যেন যমুনাপুলিনগামী রাইকিশোরী গাগরির মতো তার হাতে ধরা একটি ফুলের সাজি গুরুমশাইয়ের মন্দিরে আর মঙ্গলদাদুর শ্রীপাটে পুজো দেওয়ার জন্য সে প্রতিদিনই ফুল তুলে নিয়ে যায় দুই গ্রামের মাঝে বাঁশের সাঁকোটি পার হওয়ার পর কান্দরা গ্রামের ঢোকার মুখেই ঘণ্টেশ্বরী পুকুরপাড়ের  ফুলগাছগুলি থেকে সে প্রতিদিন ফুল তোলে অসংখ্য ফুলগাছে ভরা এই পুকুরপাড় খুবই মনোরম ও নির্জন

  মানসী গুনগুন করে রামকেলী রাগ গাইতে গাইতে বাগানে পুষ্পচয়ণ করছে তার সাজি ভরে উঠছে নানান ফুলে লাল জবা, সাদা টগর, হলুদ গাঁদা, আরও কত ফুল

  হঠাৎ গাছের আড়াল থেকে কে যেন বেরিয়ে এসে তার চোখদুটি আলতো হাতে চেপে ধরে মানসী প্রথমে চমকিত হলেও পরক্ষণেই বুঝে যায় কার হাতে তার চোখ ঢেকেছে আগন্তুক একহাতে চোখ ঢেকে রেখে অন্যহাত দিয়ে উঁচু ডাল থেকে ফুল তুলে নিয়ে পরিয়ে দেয় মানসীর কবরীতে কিশোরী কন্ঠ রিনরিনিয়ে ওঠেএ মা! জ্ঞানদাদা, ছাড় ছাড়, কেউ দেখে ফেলবে যে!

  কেউ দেখবে না, এদিকে কেউ আসে নাবলেই মানসীর চোখ থেকে হাত সরিয়ে নেয় জ্ঞানদাস

মানসীর কন্ঠে প্রশ্রয়ের সুরকেউ আসে না তো, আপনি কেন এসেছেন মশাই! আপনার মতলব তো ভালো নয়

  আমি ... আমিও এসেছি ফুল তুলতে

  ও তাই বুঝি, তো কোথায় আপনার ফুলের সাজি?

  আমার সাজি লাগে না, এমনিই ফুল তুলি

  তো কোথায় সে ফুল?

  এই যে আমার সামনে দাঁড়িয়েবলেই মানসীকে জড়িয়ে ধরে জ্ঞানদাস

  এমন সময় কোথায় থেকে হো হো হাসির শব্দ কানে আসে ওরা দুজনেই তড়িৎ গতিতে বিচ্ছিন্ন হয় চতুষ্পার্শ্বে দৃষ্টি ছোঁড়ে কাউকে নজরে পড়ে না নাঃ, কেউ কোত্থাও নেই! তবে কি ...!

এমন সময় ওরা কথা শুনতে পায়তোমরা যাকে খুঁজছো, সে এখানে এই যে উপরে তাকাও

ওরা দেখে, লম্বা খেজুরগাছটার মাথা থেকে মনোহর হাঁক পাড়ছে জ্ঞানদাস কপট ক্রোধ প্রদর্শন করে খেজুর গাছের দিকে এগোয় মনোহর বলেরসিক নাগর, অ্যাতো রাগলে চলে! রস খেতে পেলে না, তাই রাগ হল বুঝি! এই যে আমিও রসের ভাণ্ড নামাচ্ছি তবে তোমাদের ওই রস নয়, খেজুরের রস এটা খেতে পারো

  মানসী লজ্জায় অধোবদন হয় এক মুহূর্ত তারপর এক ছুটে সেখান থেকে পৌঁছয় রাস্তায় দ্রুত পায়ে এগোতে থাকে কান্দরা গ্রামের ভেতরে জ্ঞানদাস তা দেখে গেয়ে ওঠে

শুনো শুনো গুণবতী রাই

তোমা বিনে আকুল কাহ্ণাই।।

  মানসীর কানে সে গানের সুর পৌঁছলেও সে পশ্চাতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে না বরং গতি আরও বাড়িয়ে দেয় ইতিমধ্যে মনোহরও গাছ থেকে নেমে সে গানে দোহারকি দেয় — ‌‘শুনো শুনো গুণবতী রাই’ ...

তারপর গান থামিয়ে মনোহর বলেনাও বন্ধু, খেজুরের রস খাও ওই রস তো পেলে না জ্ঞানদাস সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে গান ধরে

বন্ধু, রসের কথা কী কহব তোয়

মনের উল্লাস যত কহিল না হোয়।।

কড় গুনি গণনায় অন্ত না পাই

রূপে গুণে রসে প্রেমে ভজনা বাঢ়াই।।

 

  একসময় গান থামিয়ে জ্ঞানদাস অগ্রসর হয় জয়গোপাল দাসঠাকুরের চতুষ্পাঠীর দিকে আর মনোহর তার খেজুর রসের ভাণ্ড নিয়ে রওনা দেয় বায়েন পাড়ার দিকে

  জ্ঞানদাস চতুষ্পাঠীতে পৌঁছে দেখে, গুরুমশাইয়ের সম্মুখে বংশীবদন আর দক্ষিণে মানসী মুখ নীচু করে উপবিষ্ট ওর খোপায় ফুলটা আর নাই এরই মধ্যে ও দুটি মন্দিরেই ফুল দিয়ে চতুষ্পাঠীতে পৌঁছে গেল কীভাবে, সেটাই ভাবতে থাকে জ্ঞানদাস গুরুমশাই বলেনবসো জ্ঞানদাস, গতকাল মহাপদকর্তা জয়দেবের ‌‘শ্রীশ্রীগীতগোবিন্দমপাঠদান শুরু করেছিলাম আজ তার দ্বিতীয় সর্গের পাঠ শুরু করব

  ও গুরুমশাইয়ের সম্মুখে, বংশীবদনের পার্শ্বে উপবেশন করে গুরুমশাই দুই চক্ষু বন্ধ করে দুই পল স্থির থাকার পর চক্ষু উন্মোচন করেন তারপর বলতে শুরু করেন

বিহরতি বনে রাধা সাধারণপ্রণয়ে হরৌ বিগলিত নিজোৎকর্ষাদীষ্যবিশেন গতান্যতঃ

ক্কচিদপি লতাকুঞ্জে গুঞ্জন্মধুব্রতমণ্ডলী মুখরশিখরে লীনা দীনাপু্যবাচ রহঃ সখীম্।।

  সুললিত কন্ঠে সুন্দরভাবে পদগুলির ব্যাখ্যা করে যাচ্ছেন গুরুমশাই — ‌‘কৃষ্ণকে গোপবধূগণের সঙ্গে সমভাবে কেলি করতে দেখে শ্রীমতী রাধার অন্তরে অভিমানের উদয় হল স্বীয় প্রাধান্য বিলুপ্ত হল, মনে করে তিনি যার শিখরপ্রদেশকে ভ্রমরকূল গুঞ্জনরবে মুখরিত করছিল, সেই লতাকুঞ্জমধ্যে প্রবিষ্ট হলেন এবং সেখানে উপবেশন করে দীনভাবে প্রিয় সহচরীকে নিজের ইচ্ছার কথা বলতে শুরু করলেন

  তিনজনে মুগ্ধ হয়ে পদগুলির ব্যাখ্যা শ্রবণ করছে জ্ঞানদাস লক্ষ্য করে, কোনও কোনও পদ গুরুমশাই শুধু পাঠ করে পরবর্তী পদে পৌঁছে যাচ্ছেন কিন্তু আগের পদের ব্যাখ্যা করছেন না যেমন -

জলদপটলদিন্দুবিনিন্দকচন্দনতিলকললাটম

পীনপয়োধরপরিসরমর্দননির্দয়হৃদয়কবাটম।।

  পদটির ব্যাখ্যা গুরুমশাই করলেন না কিন্তু অতীব মেধাবী ও পাঠপিপাসু জ্ঞানদাস পদগুলি গৃহে বসেই একান্তে পাঠ করেছে এবং তার অর্থ অনুধাবন করতে পেরেছে তাই সে বুঝতে পারছে, কেন গুরুমশাই কিছু পদের ব্যাখ্যা এড়িয়ে যাচ্ছেন ও অপাঙ্গে মানসীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখে, মানসীর চক্ষুদুটি ভূমির দিকে নিবদ্ধ মুখমন্ডল আরক্ত নাসিকা ও কর্ণলতিকা প্রায় গোলাপি বর্ণ ধারণ করেছে সর্বাঙ্গে যেন লজ্জা ও ব্রীড়া আচ্ছাদন করেছে জ্ঞানদাস ভাবে, মানসীও কি তাহলে এই ব্যাখ্যা না করা পদের অর্থ বুঝতে পারছে! তাই এমন লজ্জাবতী হয়ে উঠছে! নাকি সেই ঘন্টেশ্বরী পুকুরপাড়রে লজ্জা এখনও ওর সর্বাঙ্গে! ওর পার্শ্বে বসে থাকা বংশীবদন মিটিমিটি হাসছে আর উভয়ের দিকে যুগপৎ দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে

  গুরুমশাই নির্বিকার চিত্তে বলে চলেছেন

রতিসুখসময়রসালসয়া দরমুকুলিতনয়নসরোজম

নিঃসহনিপতিততনুলতয়া মধুসূদনমুদিতমনোজম।।

  জ্ঞানদাস এখনও বোঝে না এবং জানে না রতিসুখ কী! ও ভাবে, সেসময় শ্রীরাধিকা প্রেমরসে অবশ হয়েই বা পড়বে কেন! আর সেসময় সখার পদ্যচক্ষু ঈষৎ মুকুলিতই বা হবে কেন! এসবের ব্যাখ্যা গুরুমশাই দিলেন না কিন্তু সত্যি সত্যিই ওর চোখ এখন যেন ঈষৎ মুকলিত হচ্ছে ও মানসীর দিকে সোজাসুজি দৃষ্টিপাত করতে পারছে না আর মানসীও তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে না তবে কি ওরা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে উঠেছে! গুরুমশাই শ্লোকের ব্যাখ্যা না করলেও ওরা হৃদয় ও মনন দিয়ে অর্ন্তনিহিত অর্থ অনুধাবন করতে পারছে! তাই যদি পারছে, তবে গুরুমশাই কি তা বুঝতে পারছেন না! বুঝতেই যদি পারছেন, তাহলে ব্যাখ্যা এড়িয়ে যাচ্ছেন কেন? তিনি নিশ্চয় চানক্যের সেই শ্লোক পাঠ করেছেন

লালয়েত পঞ্চবর্ষাণি দশবর্ষাণি তাড়য়েৎ

প্রাপ্তে তু ষোড়শবর্ষে পুত্রং মিত্রবদাচরেৎ।।

  বেলা একপ্রহর অতিক্রান্ত গুরুমশাই সেদিনের মতো পাঠদান সমাপ্ত করেন বলেনতোমরা গৃহে গমন করো জ্ঞানদাস, তুমি মানসীকে গ্রামের প্রান্তের সাঁকো অবধি পৌঁছে দিয়ে এসো

বংশীবদন বলে ওঠেআমি যাবো মাশায়?

  গুরুমশাই বলেননা, জ্ঞান যাক, তুমি শীঘ্র গৃহে গমন কর বিলম্ব হলে তোমার ঠাকুরদাচিন্তিত হবেন

  মানসীও মনে মনে সেটাই আকাঙ্ক্ষা করছিল, যে জ্ঞানদাদা যদি কিছুটা পথ সঙ্গদান করে জ্ঞানদাস হৃষ্টমনে এগোয় দরজার দিকে বলেএসো মানসী, তোমাকে গৃহে পৌঁছে দিই

  দুজনে যতক্ষণ না চোখের অন্তরালে যায়, ততক্ষণ বংশীবদন ওদের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁড়িয়ে থাকে

  জ্ঞানদাস পথ চলতে চলতে অন্যমনস্কতায় পথিপার্শ্বের লতাপাতা ছিন্ন করে হাতে দলিতমথিত করতে করতে বলেআচ্ছা মানসী, গুরুমশাই কিছু কিছু পদের ব্যাখ্যা করলেন না তুমি কি ওই পদগুলির অর্থ বুঝতে পেরেছো?

  মানসী লম্বা করে ঘাড় হেলায় মুখে কিছু বলে না

  জ্ঞানদাস আবার বলে ওঠেগুরুমশাই ওগুলির ব্যাখ্যা কেন করলেন না বল তো?

  মানসী মুখ না তুলেই বলেআমি তার কী জানি! তুমি কি বোঝোনি?

  জ্ঞানদাস বলেআমি বুঝেছি বলেই তো তোমাকে বোঝাতে চাইছি

  লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে মানসীর গৌড়বর্ণ মুখখানি ও বলেআমার আর বুঝে কাজ নেই এখন শীঘ্র চল, আমার খুব খিদে পেয়েছে

  জ্ঞানদাস বলেআমার বুঝি খিদে পায়নি! তবুও তোমাকে পৌঁছে দিচ্ছি আচ্ছা বল তো মানসী, এই পদটার অর্থ কী

কোকিলকলরবকূজিতয়া জিতমনসিজতন্ত্রবিচারম

শ্লথকুসুমাকূলকুন্তলয়া নখলিখিতঘনস্তনভারম।।

  হঠাৎ ওদের পশ্চাতে কোকিলের ন্যায় কুহু-কুহু রব ধ্বনিত হয় ওরা পশ্চাতে দৃষ্টিক্ষেপ করে দেখে বংশীবদন ওদের পশ্চাতে এমন রব তুলছে ওরা চলা থামাতেই বংশীবদন উচ্চকিত স্বরে বলেআমি জানি ওই পদটির অর্থ, বলব কি?

  জ্ঞানদাস কপট ক্রোধ প্রকাশ করে, আর মানসী লজ্জিত হয়ে বলেতোমাদেরকে আমার সঙ্গে যেতে হবে না আমি একাই যেতে পারব

  কথা শেষ হতে না হতেই মানসী দ্রুত পদে অগ্রসর হতে থাকে বাঁশের সেতুটার দিকে জ্ঞানদাস শশব্যস্ত হয়ে ওঠেসাবধানে মানসী সাবধানে সেতুটা ভগ্নপ্রায় পড়ে যাবে যে!

  বংশীবদন বলেযাও কেষ্টঠাকুর, রাই বুঝি ঈশানীর জলে পড়ে যাবে, শিগগির গিয়ে ওর হাতটা ধরো

  জ্ঞানদাস আর অগ্রসর হয় না বলেতোর ইচ্ছে হচ্ছে তো খুব, তুই গিয়ে ধর আমি বাড়ি চললাম

  মানসী ততক্ষণে বাঁশের সেতু অতিক্রম করে ওপারে পৌঁছেছে

  যতক্ষণ মানসীকে দেখা যায়, ততক্ষণ দুজনে সেতুর উপরে দাঁড়িয়ে থাকে একসময় সে মাঠ পেরিয়ে বৃক্ষরাজির অন্তরালে চলে যায় তখন দুই বন্ধু হাত ধরাধরি করে বাড়ির পথে পা বাড়ায় আকাশে তখন সূর্য যথেষ্ট তাপ বিকিরণ শুরু করেছে মাঠে চড়তে থাকা গরুর পাল ঈশানী কান্দরের দিকে এগোচ্ছে জলপানের জন্য

 

 

নয়

জয়গোপাল দাসঠাকুর এসেছিলেন মঙ্গল ঠাকুরের সন্নিকটে ওঁর সদ্য রচিত গ্রন্থটির কিয়দংশ মঙ্গল ঠাকুরকে শ্রবণ করিয়ে তাঁর ত্রুটি-বিচ্যুতি ও পরামর্শ নেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য বেলা দ্বিপ্রহর হয়ে যাওয়ায় তিনি গাত্রোত্থান করলেন জয়গোপালের প্রস্থানের অপেক্ষাতেই বোধহয় অন্তরালে লুক্কায়িত ছিলেন কেনারাম বাঁড়ুজ্জে, হৃষিকেশ মুখুজ্জেরা জয়গোপাল পথের বাঁকে অন্তর্হিত হতেই ওঁরা মঙ্গল ঠাকুরের সম্মুখে এসে প্রণাম জানান মঙ্গল ঠাকুর প্রণাম বিনিময় করে বলেনবলো বাঁড়ুজ্জে, বলো মুখুজ্জে, এমন অসময়ে তোমাদের আগমনের হেতু?

  এখন আর সময়-অসময় জ্ঞান নাই গো মঙ্গল ঠাকুর! দেশটা রসাতলে যেতে বসেছে

  তা যাক না, তোমরা ভেসে থাকো, তাহলেই তো হল

  হৃষিকেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠেনএই জন্য, এই জন্যই তোমার কাছে আসতে চাই না কোনো কিছুকেই গভীরভাবে অনুধাবন কর না শুধু ...

  মঙ্গল ঠাকুর গম্ভীর হনআসতে আমি তো বলিনি মুখুজ্জে তোমরাই তো স্বেচ্ছায় এসেছ!

  না এসে কী আর উপায় আছে! গাঁয়ের মাথা, হর্তা-কর্তা-বিধাতা তুমি তোমার কাছে না এসে কার কাছে যাবো বলো

  ঠিক আছে, বলো কী ব্যাপার?

  সারা গাঁয়ে ঢি-ঢি পড়ে গিয়েছে পথে বেরুলে আর কান পাতা যাচ্ছে না তুমিও শুনেছো নিশ্চয়! ওই রাজুরের কায়েতদের ধিঙ্গি মেয়েটা এবার আমাদের মাথায় চড়ে নেত্য করবে

  সে কী! কে সে?

  ওই যে তোমার শিষ্য নৃসিংহর মেয়ে মানসী সাঁজি উৎসবে নিজের গলার হার খুলে যাকে দিলে! কল্পনাথের ব্যাটার সঙ্গে ওর লটঘটের কথা নিশ্চয় শুনেছো!

  ! রোজ সকালে আমার মন্দিরে পুজোর ফুল দিয়ে জয়গোপালের টোলে পড়তে যায়, ওই মেয়েটার কথা বলছো নাকি!

  তবে আর কার কথা বলছি! কালে কালে কী হল! কুলীন বামুনের ছেলে জ্ঞানদাস পিরীত করছে কায়েতের মেয়ের সঙ্গে ছোঁড়াটার বাবা কল্পনাথ বেঁচে থাকলে নির্ঘাত আত্মহত্যা করত লোকে তো বলছে, তোমার আস্কারাতেই ও মাথায় উঠেছে তুমি তো ওর গানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ আর ওই কায়েত জয়গোপাল এখন জাত হারিয়ে বোষ্টম হয়েছে ওর উসকানিতেই আরও বাড় বেড়েছে

  হৃষিকেশ ওষ্ঠ কুঞ্চিত করে বলেনআরে বাবা, তুই মেয়ে মানুষ, তোর লেখাপড়া শেখার কী দরকার! ও কি না যাজ্ঞবল্ক্য হবে! বাপ গানের পন্ডিত গানটা শেখ ভালো করে! তা নয়, ছেলেদের সঙ্গে চতুষ্পাঠীতে পড়তে এলি! আর ওই বোষ্টম পন্ডিত, ধিঙ্গি মেয়েটাকে পড়াতেও লাগলো কারও কথা কি কানে নেয়! সবই তোমার প্রশ্রয়ে

  কেনারাম বাঁড়ুজ্জে খেপে ওঠেনওই বৈরিগী ব্যাটাই তো যত নষ্টের গোঁড়া এক তো গুরুগিরি করে বামুনের ভাত মারছে তার ওপর অসৈরণ কাজে উসকানি রোজ টোলের ছুটির পরে ওই ব্যাটাচ্ছেলে জ্ঞানকে বলে, ‌‘ওকে একটু এগিয়ে দিয়ে এসো তো বাবা!’ ব্যাস! ওকে আর পায় কে! যাওয়ার পথে ঘন্টেশ্বরীর পাড়ে, ঈশানীর সাঁকোর ধারে কেষ্টলীলে করে বেড়াচ্ছে আর ওর বাপের কাছে গান শেখার ছল করে গিয়ে ফষ্টিনষ্টি করছে

  মঙ্গল ঠাকুর এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলেন আর আলবোলায় টান দিচ্ছিলেন এবার ইশারায় কেনারামকে থামতে বলেনবুঝেছি, কী অভিযোগ নিয়ে তোমরা এসেছো তা ওই নৃসিংহর বিটিটা তো তোমাদের ছেলেকে নিয়ে টানাটানি করেনি জ্ঞানটা ভালো গান গায় পদও লেখে শুনেছি আর ওই মেয়েটারও গানের গলা ভালো ওদের যদি একে অন্যকে ভালো লাগে তো ...

  সকলে একসঙ্গে রে রে করে ওঠেনা না, এ অনাচার আমরা হতে দেব না বামুনের ছেলে করবে কায়েতের মেয়েকে বিয়ে! জাতধর্ম কিছু আর থাকবে না আমাদের

  মঙ্গল ঠাকুর কিছুক্ষণ ভ্রূ কুঞ্চিত করে ওদের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করেন তারপর বলেনঠিক আছে, তোমরা এখন যাও আর ওই কল্পনাথের ব্যাটাটাকে খবর দাও, ও যেন সন্ধেবেলায় এই নাটমন্দিরে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে আর নৃসিংহবল্লভকেও খবর দাও তারও আসা দরকার 

  তখনকার মতো বাঁড়ুজ্জে-মুখুজ্জেরা উত্তপ্ত স্বগতোক্তি করতে করতে প্রস্থান করেন সন্ধেবেলায় জ্ঞানদাস মঙ্গল ঠাকুরের নাটমন্দিরে উপস্থিত হয় এসে দেখে, মঙ্গল ঠাকুর এবং তাঁর সঙ্গে কান্দরা গ্রামের সমাজপতি ব্রাহ্মণরা উগ্রচন্ডা মূর্তিতে বসে রয়েছেন সেই সঙ্গে উপস্থিত আছেন সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভও জ্ঞানদাস সকলকে প্রণাম জানিয়ে কুন্ঠিত কন্ঠে বলেআমাকে ডেকেছেন ঠাকুরদা’?

  হ্যাঁ, তোমাকে কিছু কথা বলার আছে

  বলুন ঠাকুরদা’!

এঁরা বলছেন, তুমি নাকি ওই নৃসিংহবল্লভের কন্যার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছ?

বৈধ-অবৈধ জানি না ঠাকুরদা মানসীর সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক হয়েছে, এটা ঠিক এবং আমি মানসীকে বিয়ে করতে চাই

  স্তম্ভিত হয়ে যান সকলে ক্রোধে যেন মূক হয়ে যান বাঁড়ুজ্জে-মুখুজ্জেরা এমনকি মঙ্গল ঠাকুরের মুখেও তৎক্ষণাৎ কোনও কথা ফোটে না কিছুক্ষণ পরে মঙ্গল ঠাকুর বলেনলজ্জা করল না তোমার, সকলের সামনে এ কথা উচ্চারণ করতে! ব্রাহ্মণ হয়ে তুমি কায়েতের মেয়েকে বিয়ে করতে চাও! তাছাড়া দেওয়ান কালীচরণ মিত্রের ছেলে নৃসিংহ তোমার মতো ভিখিরি বামুনের ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দেবে, এটা ভাবলে কী করে?

  জ্ঞানদাস বলে ওঠেতা তো ভাবিনি তিনিও এখানে উপস্থিত আছেন তাই ইচ্ছাটা প্রকাশ করলাম

  কেনারাম বাঁড়ুজ্জে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠেনপতিত করে দেব তোমাকে একঘরে করে দেব তোমাকে তোমার ধোপা-নাপিত বন্ধ করে দেব

  হৃষিকেশ মুখুজ্জে বলে ওঠেকায়েতের মেয়ের সাথে বামুনের বিয়ে! আমরা গাঁয়ে থাকতে কখনই এটা হতে দেবো না

  মঙ্গল ঠাকুর হাত তুলে সকলকে আশ্বস্ত করেনতোমরা থামো, আমি দেখছি বল জ্ঞানদাস, সমস্ত ব্রাহ্মণ সমাজ তোমার বিপক্ষে তুমি কী বলতে চাও

  জ্ঞানদাস কয়েক মুহূর্ত ভূমির দিকে চেয়ে থাকে তারপর চোখ তুলে মঙ্গল ঠাকুরের চক্ষুতে চক্ষু স্থাপন করে ধীর কন্ঠে বলেঠাকুরদা’, আমি বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করবো তাহলে তো আর ব্রাহ্মণ সমাজের কোনও আপত্তি থাকতে পারে না

  সকলে কিছুক্ষণের জন্য বাকরহিত হয়ে যায় মঙ্গল ঠাকুরও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না কী করবেন এমতাবস্থায় পিছন দিক থেকে হরভৈরব চাটুজ্জে বলে ওঠেনএসবের জন্য ওই কায়েতের পো জয়গোপালই দায়ী তা না হলে এত সাহস ও পায় কী করে! লেখাপড়া শেখানোর নামে গাঁয়ের ছেলেপিলেকে কুশিক্ষা দিচ্ছে আর ব্রাহ্মণ্যধর্মের মাথায় লাথি মেরে বৈষ্ণবধর্মের বাড়বাড়ন্ত করার চেষ্টা করছে তাকে ডাক করানো হোক শুনলাম, আপনার যজমান শ্রীপুরের অবিনাশ চাটুজ্জের ছেলেকে সামনের পূর্ণিমাতে বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা দেবে ওই উড়ে এসে জুড়ে বসা কায়েতের ব্যাটা

  কেনারাম বাঁড়ুজ্জে যেন হাতে মোক্ষম অস্ত্র পেয়েছেন, এমনভাবে বলে ওঠেনকী দুঃসাহস! এক্ষুনি এর একটা বিহিত কর মঙ্গল তা না করলে আমরা গাঁয়ের সমস্ত ব্রাহ্মণেরা মিলে ওই জয়গোপালের ঘরে আগুন লাগাবো এ গাঁয়ে ওর বাস ঘোচাবো

  মঙ্গল ঠাকুর বিড়ম্বনায় পড়নে কিন্তু উনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বলেনআপনার একটা দিন সময় দিন আমাকে আমি জয়গোপালের দীক্ষাগুরু বীরচন্দ্র প্রভুকে আগামীকালই খবর পাঠাবো বৈষ্ণব হলেও তিনি তো আমার মতোই ব্রাহ্মণ-সন্তান তিনি উপস্থিত হলে, তাঁর সম্মুখেই বিচার হবে যা শাস্তি দেওয়া হবে, জয়গোপাল তখন তা মেনে নিতে বাধ্য থাকবে এখন আপনারা শান্ত হোন

  মঙ্গল ঠাকুর করজোড়ে মিনতি জানান সমবেত ব্রাহ্মণমণ্ডলীকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, ব্রাহ্মণ সমাজের অন্ন সংস্থানে অন্তরায় হচ্ছে ওই পন্ডিত, তাই ওরা এত ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেছে ওরা যদি জয়গোপালকে কোনক্রমে গ্রাম থেকে বিতারণ করতে পারে তাহলে, তাকেও বিতারণ করতে বেশি সময় নেবে না জয়গোপালের মতো উনি নিজেও তো অন্য গ্রাম থেকে এসে এই গ্রামে বসবাস করছেন শুধু তাই নয়, উনিও ব্রাহ্মণ হয়ে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন তাছাড়া উনি বাদশাহ্ হুসেন শাহর অনুগ্রহে গণ্যমান্য এবং সমাজের শিরোমণি হয়ে উঠেছেন  এটা অনেকেই মেনে নিতে পারেনি তাই খুবই বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি উত্তপ্ত ব্রাহ্মণমণ্ডলীকে শান্ত করেন পরিশেষে বলেনজ্ঞানদাস, তুমি ব্রাহ্মণ হয়ে কায়স্থ কন্যাকে বিবাহ করতে পারো না ওই কন্যাটির সংস্রবে তোমার যেন আর না দেখি ব্রাহ্মণ কন্যার তো অভাব নাই তুমি দেখেশুনে কোনো ব্রাহ্মণ কন্যাকে বিবাহ করো আর নৃসিংহবল্লভ, তুমিও তোমার কন্যাকে সংযত হতে বলো সে বয়ঃপ্রাপ্তা এতদিন তার বিবাহ দিয়ে দেওয়া উচিত ছিলো তুমি একটা কায়স্থ সুপাত্রের সন্ধান করে কন্যার বিবাহের ব্যবস্থা করো যাও, তোমরা দূর হয়ে যাও আমার সম্মুখ থেকে

  মঙ্গল ঠাকুরের এই নিদানে ব্রাহ্মণগণ আপাতত শান্ত হন আগামীকালই বীরচন্দ্রপ্রভুকে সংবাদ প্রেরণের আবেদন রেখে তাঁরাও গৃহাভিমুখে রওনা হন শুধু মঙ্গল ঠাকুর নাট-মন্দিরে বসে উত্তর আকাশের শুকতারাটিকে কেন যে তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন কে জানে!

  নৃসিংহবল্লভ নাটমন্দির থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ রাজুরের দিকে রওনা হন না তিনি দ্রুতগতিতে জয়গোপালের বাসগৃহের দিকে রওনা হন ব্রাহ্মণ সমাজ ও মঙ্গল ঠাকুরের আচার-আচরণে তিনি যথেষ্ট ক্ষুব্ধ এবং ক্রোধান্বিতও কিন্তু প্রিয় বন্ধুর সমূহ বিপদে উনি আশঙ্কিত তাই বন্ধুকে সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য অনুরোধ করবেন এবং পরমার্শ দেবেন, এই অভিপ্রায়

  জয়গোপাল পূর্বেই সংবাদ পেয়েছেন, তাঁকে ঘিরে ব্রাহ্মণ সমাজে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে মঙ্গল ঠাকুরের কাছে তার বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে ও বিহিত করার আবেদন জানাতে গিয়েছেন তাঁরা তাই তিনি কিছুটা উদ্বেল খবর পেয়েছেন বন্ধুবর নৃসিংহকেও উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে বন্ধু নিশ্চিতভাবেই সভা শেষে তাঁর সঙ্গে দেখা করবে, এমন ভাবনায় ভাবিত হতে না হতেই দরজায় করাঘাত দরজা খুলেই সম্মুখে বন্ধুবর নৃসিংহবল্লভ পূর্বাপর সমস্ত   ঘটনা বন্ধুর মুখ থেকে শোনার পর নৃসিংহবল্লভ বলে ওঠেনবল বন্ধু, এখন আমার কী করা উচিত!

  দেখো ভাই জয়গোপাল, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে অবিনাশ চাট্টুজ্জের পুত্রকে দীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা তোমার ঠিক হয়নি আমার গুরুদেব মঙ্গল ঠাকুরও তোমার ওপর রুষ্ট হয়েছেন কিন্তু ‌‘গতস্য শোচনা নাস্তি আমি দেওয়ান কালীচরণ মিত্রের পুত্র, আমি থাকতে তোমার কোনো ক্ষতি কেউ করতে পারবে না

  জয়গোপাল বলেনদেখো বন্ধু, আমি তো কোনো অন্যায় করিনি কেউ তো দীক্ষা নিতে চাইলে আমি কী করতে পারি এখন বৈষ্ণব ধর্মের জোয়ার ওই ব্রাহ্মণদের বালির বাঁধ কি এই জোয়ারকে ঠেকাতে পারবে?

  নৃসিংহবল্লভ মস্তক আন্দোলন করেনতুমি বুঝতে পারছো না ভায়া, ওদের অন্ন সংস্থান হাত পড়েছে তাই ওরা ছেড়ে কথা বলবে না তাই এটা নিয়ে তোমার একটু ভাবনা-চিন্তা করার দরকার

  জয়গোপাল বলেনঠিক আছে, ভেবে দেখবো আর একটা কথা তোমায় জিজ্ঞাসা করি বন্ধু, তোমাকে ওখানে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল কেন? নিশ্চয় জ্ঞানদাস ও তোমার কন্যার অন্তরঙ্গতার প্রশ্ন উঠেছিল?

  হ্যাঁ, জ্ঞানদাসও উপস্থিত ছিল সে ওদের মুখের ওপর বলে দিল যে, আমার কন্যাকে বিবাহ করবে

  এতে তোমার কী অভিমত?

নৃসিংহবল্লভ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলেনসত্যি কথা বলতে কি, আমি দ্বিধায় পড়েছি জ্ঞানদাস ব্রাহ্মণ সন্তান কিন্তু আমরা তো কায়স্থ! আবার জ্ঞানদাস ও মানসীর সম্পর্কটাকেও মর্যাদা দেওয়া উচিত কী করব বুঝে উঠতে পারছি না যদিও জ্ঞানদাস বলেছে, সে বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করবে

জয়গোপাল উচ্ছসিত হনতাহলে তো সমস্যার সমাধান হয়েই গেল তুমি উদারপন্থী মানুষ, জ্ঞানদাস বৈষ্ণব হলে তো আর তোমার কন্যাকে বিবাহ দেওয়ার কোনো অসুবিধা নাই দরিদ্র হলেও জ্ঞানদাস শিক্ষায়-দীক্ষায় সুপাত্র এবং উদারচেতা তাছাড়া মানসী-মাকে সত্যিই সে খুব ভালোবাসে নৃসিংহবল্লভ বন্ধুর দিকে গভীর দৃষ্টিপাত করে বলেনআমারও তাই মনে হয়

দশ

এদিকে জ্ঞানদাস মঙ্গল ঠাকুরের আদেশ শুনে নাটমন্দির প্রাঙ্গন থেকে ধীর পায়ে প্রস্থান করে গৃহাভিমুখে অগ্রসর হতে ওর মন সরে না ও ঈশানী নদীর দিকে রওনা হয় ওর মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে মঙ্গল ঠাকুরের আদেশ, ‘ওই কন্যাটির সংস্রবে তোমাকে যেন না দেখি ...’

  জ্ঞানদাসের মনে প্রবাহিত হয় এই ভাবনাএটা কী করে সম্ভব! ওর অদর্শনেই যে মনপ্রাণ আনচান করে সকালে চতুষ্পাঠীতে শিক্ষালাভ করতে গেলে মানসী যতক্ষণ না আসে, ততক্ষণ পাঠে মন বসে না সঙ্গীতগুরুর নিকটে উপস্থিত হয়ে ভিতর ঘরের দিকে চেয়ে থাকা, কতক্ষণে মানসী এসে পাশে বসবে ও না এলে গলায় সুর খেলে না ওর সান্নিধ্য পেলে তবেই নতুন নতুন পদ মাথায় আসে ও যেন ভাবনার উৎস! এই তো সেদিন যে নতুন পদটির প্রশংসা করলেন গুরুমশায়, সে তো ওর ছোঁয়াতেই বেরিয়ে এল

  মনে পড়ে যায় সেদিনের কথাদিনটি ছিল বসন্তপূর্ণিমা কান্দরার শ্রীপাটে দোল উৎসব সে উপলক্ষে গর্ভগৃহ থেকে বিগ্রহগুলি বাইরে এনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও সুসজ্জিত করা হয়েছিল তাদের পরিধানে রাজবেশ শ্রীচরণ রাঙানো হয়েছিল রাঙা আবিরে মৃদঙ্গ করতাল সহযোগে প্রভাতফেরি হয়েছিল তারপর সকলে আবির ও ফাগে রাঙা হয়ে নগরসংকীর্তন দুই গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা সেই আনন্দ উৎসবে অংশগ্রহণ করেছিল ও এবং মানসীও এই আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছিল ছিল বংশীবদন, মনোহর দাসও আর ছিলেন গুরুমশাই জয়গোপাল দাসঠাকুর

  সারাদিন ধরে আনন্দে মেতে গ্রাম পরিভ্রমণ করতে করতে সকলেই ক্ষুধার্ত ফিরে এসে মন্দিরের প্রসাদ গ্রহণ করা হয়েছিল সকলে মিলে এসবেই বেলা বয়ে অপরাহ্ণ হয়ে গিয়েছিল সন্ধ্যা সমাগত প্রায় মানসী গৃহ থেকে নিস্ক্রান্ত হয়েছিল সেই প্রাতঃকালে ও গৃহে ফেরার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল গুরুমশাই বলেছিলেন, ‌‘মানসী, তুমি আর বিলম্ব করো না গৃহে ফিরে যাও তোমার পিতা চিন্তান্বিত হবেন জ্ঞানদাস, তুমি ওকে কিছুটা পথ পার করে দিয়ে এসো

  তা শুনে বংশীবদন চাপা গলায় টিপ্পনি কেটেছিল, ‌‘হ্যাঁ জ্ঞান, ওকে ঈশানীর ভগ্নপ্রায় সেতুটা হাত ধরে পার করে দিয়ে আয়

  ওরা দুজনেই লজ্জিত হয়েছিল এবং তৎক্ষণাৎ অগ্রসর হয়েছিল রাজুরের পথে যেতে যেতে ওরা গুরুদেবের পড়ানো শাস্ত্র আলোচনায় মেতে উঠেছিল সেদিনের সেই আনন্দ উৎসব, সারাদিন ধরে মানসীর সান্নিধ্য, গুরুমশাইয়ের পড়ানো ‌‘শ্রীশ্রীগীতগোবিন্দমকিংবা ‌‘কুমারসম্ভব’-এর শ্লোক ওর মনে প্রেমের জোয়ার এনেছিল ও তখন মানসীর মনের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য প্রশ্ন করেছিলআচ্ছা মানসী, তোমার মনে আছে, সেদিন চতুষ্পাঠীতে গুরুমশাই ‌‘কুমারসম্ভব’-এর চারটি সর্গ পাঠ করালেন, কিন্তু পঞ্চম সর্গটি পাঠ না করিয়ে বললেন,‌‘বাড়িতে পড়ে নিওতুমি পড়েছিলে?

  মানসী হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নেড়েছিল

  ও তখন বলেছিল, ‌‘আচ্ছা বলো তো গুরুমশাই ওটা কেন পড়ালেন না?’

  মানসী লাজবতী হয়ে বলে উঠেছিল, ‌‘আমি তার কী জানি!’

  ! তুমি জানো নাবলে জ্ঞানদাস সুর করে উচ্চারণ করেছিল

ক্লীষ্টকেশমবলুপ্ত চন্দনং উৎপথার্পিতনখং সমৎসরম

তস্য তচ্ছিদূরমেখলাগুণং পার্বতীরতমভুন্ন তৃপ্তয়ে।।

এই শ্লোকটার অর্থ বলো তো মানসী!

  মানসী ওর বুকে আলতো ঠেলা দিয়ে বলেছিল, ‌‘যাও, তুমি ভারী অসভ্য!’

  ও খিলখিল করে হেসে বলেছিল, ‌‘আমি অসভ্য কেন হতে যাবো! অসভ্য তো মহাকবি কালিদাস

  মানসী তখন দুকানে হাত দিয়ে জিভ কেটে বলেছিল, ‌‘এ মা! মহাজনদের সম্পর্কে এমন কথা বলতে নেই, পাপ হয়

  ও তখন ‌‘কালিদাস যা বলেছিলেন, তাই করি’ — বলেই মানসীর আরক্তিম গাল দুখানি দুহাতে ধরেছিল মানসী তখন গুম করে ওর পিঠে একটা কিল মেরেছিল তারপর কপট রাগ দেখিয়ে দূরবর্তিনী হয়েছিল ঠিক তখনই ওর মনের মধ্যে পদ তৈরি হয়েছিল

ও চাঁদমুখের মধুর হাসনি সদাই মরমে জাগে

মুখ তুলি যদি ফিরিয়া না চাহ আমার শরম লাগে।।

  মানসী সে পদ শুনে অপূর্ব এক দৃষ্টিতে ওকে নিরীক্ষণ করছিল সে দৃষ্টিতে ছিল মুগ্ধতা, প্রেম, আবেগ, নির্ভরতা ও আরও অনেক কিছু সেসময় আকাশে রজতশুভ্র পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল জ্যোৎস্নালোকে দিক দিগন্ত উদ্ভাসিত আদিগন্ত বিস্তৃত শস্যক্ষেতের মাঝে আলপথে ওরা দুজন একসময় ওরা ঈশানী নদীর তীরে চন্দ্রালোকে ঝিকিমিকি করছে নদীজল ওদের মনের মধ্যেও প্রেমের ঝিকিমিকি পূর্ণিমার চাঁদ যেন দ্রবীভূত হচ্ছে ঈশানীর জলে! ওরও খুব ইচ্ছা করছিল, মানসীর নদীতে অবগাহন করে, দ্রবীভূত হয়ে যায় মানসীও হয়তো বুঝতে পেরেছিল ওর মনের কথা তাই সে তার আয়ত নয়ন দুটি পূর্ণ দৃষ্টিতে ওর চক্ষুতে স্থির করে বিম্বফল সদৃশ ওষ্ঠদুটি ঈষৎ প্রস্ফুটিত করেছিল ঘনিষ্ট হয়েছিল ওরা তারপর বাঁশের সাঁকোটি পার হচ্ছিল দুজনে মানসী বলেছিল, ‌‘সাঁকোটি বড় দোলে, আমার ভয় করে, আমার হাত ধরে পার করে দাও না গো!’

  মানসী নবনী-নিন্দিত কোমল হস্ত প্রসারিত করেছিল ও মানসীর চম্পাকলির মতো করপল্লব নিজের মুষ্ঠিতে নিয়ে বলেছিল, ‌‘সারাজীবন এভাবেই তোমাকে পার করে দেবো গো রাইকিশোরী! আমি যে তোমার নওলকিশোর

  সেই মানসীর সংস্রব ত্যাগ করার আদেশ দিলেন মঙ্গল ঠাকুরদাদা, যা কোনো মতেই সম্ভব নয় প্রয়োজনে ও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম পরিত্যাগ করবে, দীক্ষিত হবে বৈষ্ণব ধর্মে তবুও ... হঠাৎ ওর মনে উদয় হয় পরম প্রেমময় এক বৃদ্ধের মুখমণ্ডল কাটোয়ার গঙ্গাতীরে বৃদ্ধটি তাকে প্রণাম করেছিলেন বলেছিলেন, তিনি বৈষ্ণব বৈষ্ণবের কাছে ছোটবড়, উচ্চনীচ, ধনীদরিদ্র সবই সমান বৈষ্ণবই হবে ও এমন ভাবামাত্র ওর মনে একটা পদ উদ্ভাসিত হয় সেটি সুর হয়ে নিঃসৃত হয় ওর সুললিত কন্ঠে

গৌরাঙ্গ আমার ধরম করম গৌরাঙ্গ আমার জাতি

গৌরাঙ্গ আমার কুলশীলমান তিনি অগতির গতি।।

  জ্ঞানদাস নিজগৃহে না ফিরে গতিমুখ পরিবর্তন করে বংশীবদনের গৃহের অভিমুখে ওর কন্ঠ থেকে নিঃসৃত হয় একের পর এক পদ

দুহুঁ কূলগরিমা অসীম দুখ অন্তরে বাহিরে পরিজন গঞ্জে

ও নব নেহ দেহ অবলম্বন সোঙরি সঘন মন রঞ্জে।।

সজনী বুঝয়ে না পারয়ে এ চিত ... ।।

কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর জ্ঞানদাসের মনে হয়, না এখন বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ঠিক হবে না সে তো মঙ্গল ঠাকুরের পৌত্র সে তাকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু এমন কিছু পরামর্শ দেবে না, যা তার ঠাকুরদার বিরুদ্ধে যায় তাই সে অভিমুখ পাল্টিয়ে গভীর নিশিথে বাড়ি ফেরে ওর কণ্ঠে তখনো খেলে বেড়াচ্ছে অজস্র নতুন পদ বেশির ভাগই পদকর্তা বিদ্যাপতির

আজু রজনী হম ভাগে গমাওলুঁ পেখলুঁ পিয়ামুখচন্দা

জীবন জৌবন সফল করি মানলুঁ দসদিস ভেল নিরদন্দা।।

... ... ... ... ... ...

... ... ... ... ... ...

অব মঝু যব পিয়া সঙ্গ হোঅত তবহি মানব নিজ দেহা

বিদ্যাপতি কহ অলপ ভাগি নহ ধনি ধনি তুঅ নব নেহা।।

  ওর মনের মাঝে রাধিকা কখন মানসীর অবয়বে ধরা পড়েছে নিজেকে কৃষ্ণের স্থানে বসিয়ে স্বপ্নের মায়াজাল বুনে চলেছে তাছাড়া অনেক বৈষ্ণবের সঙ্গে ওর সাক্ষাৎ ও ঘনিষ্ঠতা হয়েছে সেইসব কথা ওর মনে এক আবর্ত রচনা করেছে সেই আবর্তের মধ্যে ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে ব্রাহ্মণ্যধর্মের একের পর এক বন্ধনরজ্জুগুলো একসময় নিজেকে মুক্তপুরুষ মনে হচ্ছে জ্ঞানদাসের সেই আবর্তের মধ্যে ভাস্বর হয়ে উঠছে একটা মুখ সে মুখ কৃষ্ণের নাকি মহাপ্রভুর, তা অনুধাবন করতে পারছে না জ্ঞানদাস কিন্তু সে মুখ প্রবল ভাবে আকর্ষণ করছে ওকে মনপ্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠছে তাঁকে পাওয়ার জন্য ও সিদ্ধান্ত নেয়, অবশ্যই ও বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করবে কিন্তু কার কাছে?

  এমন ভাবনায় ভাবিত হতেই মনে সঞ্চারিত হয় শিক্ষাগুরু জয়গোপাল দাসঠাকুরের কথা তিনি শ্রীনিত্যানন্দের পুত্র বীরচন্দ্রের কাছে দীক্ষা নিয়েছেন তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে দীক্ষা গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তিনি নিশ্চয় প্রত্যাখ্যান করবেন না  যেমন ভাবা তেমন কাজ করা জ্ঞানদাসের স্বভাব তাই পরের দিন প্রত্যুষে জ্ঞানদাস রওনা হল বীরভূম জেলার একচক্রা গ্রামের উদ্দেশে

  জ্ঞানদাস যখন একচক্রা গ্রামে পৌঁছল তখন দ্বিপ্রহর পথশ্রমে নিদারুণ ক্লান্ত ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কিছুটা কাতর হলেও খাদ্যগ্রহণের তেমন ইচ্ছা নেই তবে, একটু জলপান করতে পারলে ভাল হয় জলের সন্ধানে ইতস্তত দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই অদূরে চোখে পড়ে একটি ইঁদারা দুএকজন রমণী ইঁদারা থেকে জল তুলছে জ্ঞানদাস ইঁদারা সন্নিকটে গিয়ে জলপানের ইচ্ছা প্রকাশ করে মহিলাদের অবগুণ্ঠন আরও দীর্ঘ হয় অবগুণ্ঠনবতী একজন বলে ওঠে পথিক! আপনি ব্রাহ্মণ তো?

  কেন বলুন তো?

  ব্রাহ্মণ হলে জল পাওয়া আপনার অধিকার আমরাও ব্রাহ্মণকে জলদান করে পূণ্য অর্জন করব আপনি শূদ্র হলে আমরা জল আপনার হাতে ঢেলে দিতে পারব না জলের ছোঁয়ায় অশুচি হয়ে যাব

  আর বৈষ্ণব হলে?

  আপনি তো বৈষ্ণব নন, আপনার মুখে কৃষ্ণনাম কই?

  বৈষ্ণব হলেই বুঝি সর্বদা কৃষ্ণনাম জপ করতে হয়?

  না, তা নয়; বৈষ্ণব হলে কৃষ্ণনাম শুনিয়ে জলভিক্ষা করতেন বৈষ্ণবরা যা কিছু করে, তা শ্রীকৃষ্ণের নিমিত্ত

  অবশেষে উপবীত দেখিয়ে নিজেকে ব্রাহ্মণ প্রতিপন্ন করে জলপান করতে হয় জ্ঞানদাসকে জলপান শেষ হলে  পথপার্শ্বে এক বটবৃক্ষতলে উপবেশন করে জ্ঞানদাস মনের মধ্যে ভাবনা প্রবাহিত হয় বৈষ্ণব যা কিছু করে শ্রীকৃষ্ণের জন্য! ব্রাহ্মণরা শুধু কি করে নিজের জন্য? সেটাই ঠিক বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ নানা বিধান আরোপ করে কুক্ষীগত করে সমাজের সমস্ত অধিকার প্রাধান্য পেতেই অভ্যস্ত এরা সবচেয়ে স্বার্থপর বর্ণ এই ব্রাহ্মণ না ব্রাহ্মণ আর থাকতে রাজি নয় সে পরক্ষণেই মনে ভাবনা আসেআদৌ কি সে ব্রাহ্মণ, ব্রহ্মজ্ঞান কি আছে তার? নাকি ব্রাহ্মণের গুণাবলী তার মধ্যে বর্তমান?

ব্রাহ্মণের স্বভাবগত ধর্ম সম্পর্কে গীতায় আছে

শমোদমস্তস্পঃ শৌচং ক্ষান্তিরাজমেবচ

জ্ঞানাং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম সভাজনম্ 

  মনসংযম, ইন্দ্রিয়সংযম, তপস্যা, শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, সত্যবাদিতা, শাস্ত্রজ্ঞান, অনুভূতিলব্ধ জ্ঞান ও ঈশ্বরে বিশ্বাস এই দশটি স্বভাবজ গুণ ব্রাহ্মণের থাকা উচিত এর মধ্যে কটিই বা মেনে চলতে পারে ব্রাহ্মণ! সে নিজেও তো এর অর্ধেক পালন করতে পারে না সুতরাং সে ব্রাহ্মণ নয় ব্রাহ্মণ বলতে একমাত্র উপবীতখানা ধারণ করে আছে এটি ত্যাগ করলেই তাকে আর ব্রাহ্মণ বলে কেউ মানবে না ভাবামাত্র উপবীত পরিত্যাগ করে বটবৃক্ষে ঝুলিয়ে দেয় জ্ঞানদাস নিজেকে এখন মুক্তপুরুষ মনে হয় তার একটা পাষাণভার যেন নেমে যায় বুক থেকে

এবার সে গাত্রোত্থান করে পায়ে পায়ে হাজির হয় নিত্যানন্দের আলয়ে নিত্যানন্দ তখন রাধাগোবিন্দের সেবা সেরে, নিজে প্রসাদ পেয়ে বিশ্রামে রত

  জ্ঞানদাস নিত্যানন্দের সকাশে নিবেদন করে তাঁর বাসনার কথা নিত্যানন্দ সমস্ত কিছু শ্রবণ করেন তারপর বলেন শোন জ্ঞানদাস! তুমি যখন নিজেকে কৃষ্ণের চরণে নিবেদন করতে চাও, অবশ্যই তা করতে পার আমরা সকলেই তো তাঁর দাসানুদাস তুমি আমার পুত্র বীরচন্দ্রের কাছে দীক্ষাগ্রহণ কর -ই হবে তোমার দীক্ষাগুরু; গোবিন্দের এমনই ইচ্ছা

  জ্ঞানদাস পূর্বেই বীরচন্দ্রকে মনেমনে গুরুপদে বরণ করেছিল সে ইচ্ছাপূরণ হল নিত্যানন্দের দ্বিতীয়া স্ত্রী জাহ্নবার পুত্র বীরচন্দ্রের নিকট দীক্ষা নিয়ে নামগানে মাতোয়ারা হয়ে জ্ঞানদাস ফিরে এল তার গ্রামে

  ক্রমে ক্রমে জ্ঞানদাসের ধর্মান্তরের কথা সারাগ্রামে ছড়িয়ে পড়ল গ্রামের অন্যান্য বৈষ্ণবরা সাদরে গ্রহণ করল নব্য বৈষ্ণব জ্ঞানদাসকে গৃহী ব্রাহ্মণরা বৈষ্ণবদের একটু নিচু নজরে দেখে তাই বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণদের সঙ্গে আবহমান কালধরে বৈষ্ণবদের বৈরিতা বৈষ্ণবরা সে বৈরীতায় জয়ী হয়েছে, ব্রাহ্মণ জ্ঞানদাস বৈষ্ণব হয়ে তাদের দলভুক্ত হওয়ায় তাই তারা নতুন উদ্যমে নামগানে মেতে উঠল জ্ঞানদাসকে সামনে রেখে জ্ঞানদাস নতুন ধর্মে দীক্ষিত হয়ে আবেগের জোয়ারে ভাসল চন্দ্রশেখর এবং বন্ধু মনোহর দাসের উদ্যোগে রাধাগোবিন্দের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করল জ্ঞানদাস বৈষ্ণবরা ব্রাহ্মণপুত্রকে নিজেদের দলভুক্ত করে যারপরনাই আহ্লাদিত যেন শ্রীগোবিন্দ প্রাপ্তি হয়েছে তাদের, একজন ব্রাহ্মণ কন্যাকে রাধারূপে পেলেই ষোলকলা পূর্ণ হয়! তারা মনোহর দাসের কাছে জানতে পারল নৃসিংহবল্লভ মিত্র ঠাকুরের কন্যা মানসীর কথা সঙ্গীতসঙ্গিনী মানসীকে জ্ঞানদাসের সাধনসঙ্গিনী করার জন্য তারা ইন্ধন জোগাতে থাকল জ্ঞানদাসকে পূর্বেই জ্ঞানদাসের মনের মাঝে মানসীরর প্রতি প্রেমের বীজ উপ্তই ছিল এখন সে বৈষ্ণব, তাই সে বীজে যেন জলসিঞ্চন করল অন্যরা সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভের গৃহে জ্ঞানদাসের যাতায়াত বৃদ্ধি পেল নৃসিংহবল্লভ সঙ্গীতপাগল মানুষ, সঙ্গীতই তাঁর ধ্যানজ্ঞান তাঁর প্রিয় ছাত্র জ্ঞানদাসকে তিনি প্রশয়ই দিলেন তার ধর্মান্তর নিয়ে কোনও বৈকল্য দেখা গেল না তাঁর মনে বরং জ্ঞানদাসকে উৎসাহ দিতে থাকলেন নতুন নতুন পদ রচনা করতে বললেন তিনি জ্ঞানদাস গুরুকন্যা মানসীকে দয়িতা ভেবে পদ বাঁধল

রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর

প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।।

হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে

পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বান্ধে।।

  এ পদ শুনে নৃসিংহবল্লভ ভাবলেন, শ্রীরাধিকার মনোবেদনা বুঝি ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছে জ্ঞানদাস তাঁর নেতৃত্বে জ্ঞানদাস, মনোহর দাস, বংশীবদন ঠাকুর, বৈষ্ণব গোকুলানন্দ, শশিশেখর, চন্দ্রশেখর এদের নিয়ে রীতিমতো কীর্তনের দল তৈরী হয়ে গেল কান্দরা ও রাজুর গ্রাম সেই নতুন ধারার কীর্তনে আন্দোলিত হল বৈষ্ণবধর্মের নামগান প্রচারিত হতে থাকল বৈষ্ণব সম্প্রদায় আহ্লাদিত হলেও ব্রাহ্মণদের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠল তাঁরা ভাবতে শুরু করলেন কী ভাবে জ্ঞানদাসের বিজয়রথের গতিরোধ করা যায়

  জ্ঞানদাসের বৈষ্ণব ধর্মগ্রহণে মাতোয়ারা কান্দরা আর রাজুর গ্রামের বৈষ্ণবকুল ব্রাহ্মণগণ বৈষ্ণবদের নিচু নজরে দেখে সবসময় জ্ঞানদাস যেন এই ব্রাহ্মণদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছে তাই ব্রাহ্মণকুল প্রতিশোধ-স্পৃহায় পাগল হয়ে উঠেছে কয়েকজন ব্রাহ্মণশিরোমণি একত্রিত হয়ে নীচুস্বরে শলাপরামর্শে রত

  ওঁরা একে একে সকলের বক্তব্য পেশ করার পর সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেন, আগামীকল্যই সকলে মঙ্গল ঠাকুরের সন্নিকটে উপস্থিত হয়ে নিজেদের বক্তব্য জানাবেন এবং এই অনাচারের একটা বিহিত চাইবেন যেনতেন প্রকারেন জ্ঞানদাস ছোঁড়াটাকে গ্রাম থেকে না তাড়াতে পারলে সারা গ্রাম উচ্ছন্নে যাবে সেইসঙ্গে ওর ওই গুরুদেব কায়স্থর পো জয়গোপালটাকেও গ্রামছাড়া করতে হবে একমাত্র মঙ্গল ঠাকুরের সাহায্য পেলেই সেটা সম্ভব

 

এগার

 

মঙ্গল ঠাকুরের পত্রপ্রাপ্ত হয়ে শ্রীনিত্যানন্দের পুত্র বীরচন্দ্র কান্দরায় উপস্থিত হয়েছেন মাতা জাহ্ণবা দেবীকেও সঙ্গে এনেছেন ওঁরা আতিথ্য গ্রহণ করেছেন নতুন শিষ্য জ্ঞানদাসের গৃহেই মঙ্গল ঠাকুরের নিকট সে সংবাদ পৌঁছেছে বীরচন্দ্র জানিয়েছেন, মধ্যাহ্ণ ভোজনের পর একটু বিশ্রাম নিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এতে মঙ্গল ঠাকুর কিঞ্চিৎ ক্ষুব্ধ হয়েছেন তঁর পাঠানো পত্র পেয়ে ওঁরা কান্দরায় উপস্থিত হলেন, কিন্তু আতিথ্য গ্রহণ করলেন ওই অভিযুক্ত জ্ঞানদাসের গৃহে! কিন্তু কিছু করণীয় নাই

  যাই হোক, তিনি গ্রামের ব্রাহ্মণমণ্ডলীকে সংবাদ পাঠালেন অপরাহ্ণে নাটমন্দিরে উপস্থিত থাকার জন্য জয়গোপাল দাসঠাকুর এবং জ্ঞানদাসকেও উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ পাঠালেন ওদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ ইচ্ছা থাকলেও নৃসিংহবল্লভ মিত্রর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সাহস পাননি প্রথমত তিনি অন্য গ্রামের মানুষ দ্বিতীয়ত তিনি দেওয়ান-পুত্র, অর্থবান ও প্রভাবশালী তৃতীয়ত সঙ্গীতগুরু রূপে তিনি যথেষ্ট প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন যদিও তাঁরই কন্যা মানসীর সঙ্গে জ্ঞানদাসের অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে জ্ঞানদাসকে অভিযুক্ত করা হয়েছে আর জয়গোপাল দাসঠাকুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি জন্মসূত্রে কায়স্থ হয়েও ব্রাহ্মণকে দীক্ষা দিচ্ছেন এবং ব্রাহ্মণ না হয়েও চতুষ্পাঠী খুলে বসেছেন

  বিচারকরূপে উপস্থিত থাকছেন শ্রীবীরচন্দ্র মহাপ্রভু এবং তিনি নিজে রয়েছেন বিচারকে মান্যতা দেওয়ার জন্য সর্বজনশ্রদ্ধেয় অশীতিপর বৃদ্ধ রাজুরের বংশীধর আচার্য মশাইকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন

  অপরাহ্ণবেলায় মঙ্গল ঠাকুরের নাটমন্দিরের উপস্থিত হয়েছেন বিচারক-মণ্ডলী, ব্রাহ্মণ-মণ্ডলী ছাড়াও দুই গ্রামের অসংখ্য সাধারণ মানুষ তাদের বক্তব্য হল, বর্তমানে গ্রামে যে উদরাময় রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে, এটা নাকি ওই জয়গোপাল দাসঠাকুর ও জ্ঞানদাসের পাপের ফলেই ওদেরকে শাস্তির বিধান দিলে মহামারী উদরাময় এমনিতেই গ্রাম থেকে দূর হবে কিছু মানুষ এসেছেন নিতান্তই কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে কেউ এসেছেন জ্ঞানদাসকে ভালোবেসে আবার কেউ বা এসেছেন রসের সন্ধানে

  প্রথমেই জ্ঞানদাসের প্রসঙ্গ তোলেন কেনারাম বাঁড়ুজ্জে পাশের গ্রামের এক কিশোরী কন্যার সঙ্গে জ্ঞানদাসের মেলামেশা ও অন্তরঙ্গতা সমাজের পরিপন্থী এটাকে বরদাস্ত করা যায় না এর একটা প্রতিকার দরকার, এই প্রস্তাব উত্থাপিত হতেই প্রধান বিচারক বীরচন্দ্রের নির্দেশে জ্ঞানদাস দণ্ডায়মান হয় সে সকলকে করজোড়ে প্রণাম করে অতঃপর বলে, ‌‘আমি সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভ মিত্র মহাশয়ের কন্যা মানসীকে ভালোবাসি এবং মানসীও আমাকে ভালোবাসে প্রয়োজনে দূতী পাঠিয়ে মানসীর মনের কথা জেনে নিতে পারেন ওকে আমি বিবাহ করতে চাই আমি ব্রাহ্মণ-সন্তান হওয়ায় কায়স্থ কন্যাকে বিবাহে প্রতিবন্ধকতা ছিল সেকারণে আমি উপবীত পরিত্যাগ করে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছি সম্মুখেই আমার দীক্ষাগুরু উপবিষ্ট রয়েছেন

  একথা শুনে উপস্থিত ব্রাহ্মণ সমাজ একযোগে আস্ফালন করতে থাকেন বর্ষীয়ান বংশীধর আচার্য মশাই হাতের লাঠি ঠুকে সকলকে শান্ত হতে বলেন বীরচন্দ্র প্রভু দণ্ডায়মান হন তিনি বলেন, ‌‘হ্যাঁ একথা সত্য যে কিছুদিন পূর্বেই জ্ঞানদাস আমার নিকট দীক্ষা নিয়ে স্বেচ্ছায় বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছে এ ধর্মে কোনো জাতিভেদ নাই বিবাহের ব্যাপার পাত্র ও কন্যার অভিভাবকের মতামতের ওপর নির্ভর করে তাঁদের মত থাকলে বিচারক হিসাবে এ বিবাহে আমার বাধাদান করার অধিকার নাই আপনারা কী বলেন? — এমন জিজ্ঞাসা অন্য দুই বিচারকের দিকে নিক্ষেপ করে বীরচন্দ্র উপবেশন করেন

  মঙ্গল ঠাকুর কোনও মত প্রকাশ করেন না কেন না, এর পূর্বে একদিন তিনি এই নাটমন্দিরেই তাঁর মত প্রকাশ করেছিলেন এতে তিনি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ব্রাহ্মণ সমাজ এ ব্যাপারে তার উপরে প্রসন্ন নন তাছাড়া বিভিন্ন কারণে তার উপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আছে তাই তার বিরুদ্ধে জনরোষ উত্থাপিত হতে পারে

  বর্ষীয়ান বংশীধর আচার্য রায় দেনপ্রতিলোম বিবাহ অশাস্ত্রীয় ঠিকই কিন্তু অনুলোম বিবাহ শাস্ত্রসম্মত তার অনেক উদাহরণ আছে এক্ষেত্রে জ্ঞানদাস বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করায় এবং পাত্র-কন্যা উভয়ের সম্মতি থাকায় এটা অনুলোম বিবাহ সুতরাং এ বিবাহে বাধা না দেওয়াই সমীচীন

  উপস্থিত ব্রাহ্মণকূল এই বিচারে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন অশীতিপর বৃদ্ধ কোনক্রমে তাঁদেরকে নিরস্ত করেন তিনি বর্ষীয়ান ও অভ্রান্ত গণৎকার তাঁকে সকলে শ্রদ্ধা করে তাই একসময় সকলে শান্ত হয় মঙ্গল ঠাকুর কোনো বিধান না দিলেও মনে মনে একটি পরিকল্পনা করতে থাকেন

  এরপর জয়গোপাল দাসঠাকুরের বিচারপর্ব তাঁকে আত্মপক্ষ সর্মথনের সুযোগ দেওয়া হলে তিনি বলেনস্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জাতিভেদ প্রথার বিলোপ ঘটিয়েছেন অব্রাহ্মণ হয়েও ব্রাহ্মণকে দীক্ষা দেওয়ার অজস্র উদাহরণ আছে শ্রীখন্ডের নরহরি সরকার এবং মুকুন্দ সরকার জাতিতে বৈদ্য ওঁরা সচ্ছন্দে ব্রাহ্মণদের দীক্ষা দিয়ে চলেছেন খেতুরির নরোত্তম দাসঠাকুরও জন্মসূত্রে কায়স্থ তিনি বহু ব্রাহ্মণকে দীক্ষা দিয়েছেন আমি দীক্ষা দিলে অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে কেন? তাছাড়া স্বেচ্ছায় কোনো ব্রাহ্মণ সন্তান আমার নিকট দীক্ষা নিতে চাইলে আমি প্রত্যাখ্যান করি কী করে!

  বীরচন্দ্র শিষ্য জয়গোপাল দাস ঠাকুরকে খুব একটা পছন্দ করেন না কারণ, সমবয়সী বীরচন্দ্রকে জয়গোপাল সেভাবে গুরুর মান্যতা দেন না তিনি অন্তরালে শ্রীনিত্যানন্দকেই তাঁর গুরু বলেন এ খবর বীরচন্দ্রের জানা আছে তাই তিনি জয়গোপালের বিরুদ্ধে রায় দেন বলেনওর চতুষ্পাঠী আছে, ও সেখানে শিক্ষাদান করে অর্থাৎ একাধারে ও শিক্ষাগুরু এবং অন্যথায় ও দীক্ষাগুরু এতে অন্য সম্প্রদায় বঞ্চিত হচ্ছে এবং জয়গোপালের স্বার্থপরতা ও লোভ রিপুর প্রকটতা দেখা যাচ্ছে, যা বৈষ্ণব হিসাবে বাঞ্ছনীয় নয় তাই আজ এই সভায় ওকে আমি ত্যাজ্য-শিষ্য করলাম ওর আর দীক্ষা দেওয়ার অধিকারই রইল না

  এই রায় শুনে ব্রাহ্মণ সমাজ উল্লসিত হয়ে উঠলেন তাঁরা ঈর্ষাজনিত কারণে আর একধাপ অতিক্রম করে বলেনওকে পতিত করে দেওয়া হোক, গ্রামছাড়া করা হোক, মস্তক মুন্ডিত করে ঘোল ঢেলে দেওয়া হোক

  বৃদ্ধ বংশীধর আচার্য সকলকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বললেনজয়গোপাল শিক্ষিত মানুষ, ওর রচিত ‌‘জ্ঞানপ্রদীপ ‌‘শ্রীকৃষ্ণবিলাসগ্রন্থদুটি আমি নিজে পাঠ করেছি এমন গ্রন্থ যে রচনা করতে পারে সে অবশ্যই সুপণ্ডিত একজন পণ্ডিত মানুষ গ্রামে বসবাস করলে, সেটা গ্রামের গর্ব সুতরাং তাকে গ্রামান্তরে পাঠানোটা আমি সর্মথন করি না দীক্ষাদানের ব্যাপারটা তো সমাধান হয়েই গেল লঘুপাপে গুরুদন্ড দেওয়া মোটেও কাম্য নয়

  মঙ্গল ঠাকুরও বংশীধর আচার্য মশাইকে সর্মথন করেন এতে যেন অগ্নিকে ঘৃত নিক্ষিপ্ত হয় সমস্ত ব্রাহ্মণ সমাজ মঙ্গল ঠাকুরের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মঙ্গল ঠাকুরের বিরুদ্ধে জমে থাকা সকলের মনের বাষ্প যেন একযোগে বেরিয়ে আসতে থাকে গ্রামের সাধারণ মানুষের কয়েকজন এবার মঙ্গল ঠাকুরের বিরুদ্ধে মুখ খোলে তারা বলেওই মঙ্গল ঠাকুরের পাপাচারের ফলে গ্রামে মহামারী দেখা দিয়েছে ওকেও গ্রাম থেকে বিতারণ করা দরকার

  কিন্তু মঙ্গল ঠাকুর অর্থশালী ও প্রভাবশালী হওয়ায় কয়েকজন মানুষের এই আবেদন সর্বজনগ্রাহ্যতা পায় না গ্রামের ব্রাহ্মণকূলও এই মুহূর্তে মঙ্গল ঠাকুরের বিরুদ্ধাচরণ করতে ইচ্ছুক নন তাঁরা জয়গোপালের বিচারে কিছুটা খুশি হলেও জ্ঞানদাসের শাস্তি না হওয়ায় নতুন কৌশল প্রকরণ করতে থাকেন

  মঙ্গল ঠাকুর সভা শেষে কেনারাম বাঁড়ুজ্জে, হৃষিকেশ মুখুজ্জে ও হরভৈরব চাট্টুজ্জের সঙ্গে একান্তে মিলিত হয়ে বলেনআমি কিছুদিনের জন্য নবদ্বীপ রওনা হচ্ছি এক পক্ষকালের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করব এই সময়টুকু তোমরা জ্ঞানদাস-মানসীর বিবাহ স্থগিত রাখার চেষ্টা কর আমি প্রত্যাবর্তন করার পর উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করব

প্রৌঢ় মঙ্গল ঠাকুরের এই পরামর্শ ব্রাহ্মণকূলকে কিছুটা নিরস্ত করে তাঁরা নতুন কোনও কৌশলের আশায় বুক বাঁধেন এবং মঙ্গল ঠাকুরের প্রতি বিরূপতা দূরে ঠেলে পুনরায় তাঁর বশংবদ হয়ে যান কয়েকদিন পরেই মঙ্গল ঠাকুর রওনা দেন নবদ্বীপের উদ্দেশে

  এদিকে গড়ানহাটি পরগণার রাজধানী খেতুরিতে বৈষ্ণবদের মহাসম্মেলন আসন্ন সর্বত্যাগী নরোত্তম দাস ঠাকুরের শ্রীবৃন্দাবন থেকে প্রত্যাবর্তনের পর, তাঁর ইচ্ছাক্রমে মন্দির নির্মাণ করিয়ে বৃন্দাবন থেকে আনা ষড়বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং বৈষ্ণবদের মহাসম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে দেশ-দেশান্তরের বৈষ্ণবগণকে আমন্ত্রণ জানানোর কাজ শেষ হয়েছে আমন্ত্রণ পেয়েছেন কান্দরার জয়গোপাল দাসঠাকুর, জ্ঞানদাস, মনোহর দাস, মঙ্গল ঠাকুরের নাতি বংশীবদন, রাজুর গ্রামের কীর্তনীয়া তথা সঙ্গীতাচার্য নৃসিংহবল্লভ মিত্রঠাকুর শ্রীখন্ড থেকে নরহরি সরকার ঠাকুরের ভ্রাতা রঘুনন্দন, যাজিগ্রাম শ্রীপাট থেকে শ্রীনিবাস আচার্য, বীরভূমের একচক্রা গ্রাম থেকে আসছেন বীরচন্দ্র ও তাঁর মাতা জাহ্ণবা দেবী এছাড়া অগণিত বৈষ্ণব উপস্থিত হচ্ছেন এই মহা সম্মেলনে

  শুরু হল মহাসম্মেলন সাতদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করলেন জমিদার পুরুষোত্তমের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সর্বত্যাগী নরোত্তম দাস ঠাকুর স্বরচিত পদকীর্তন করলেন তিনি

গৌরাঙ্গের দুটি পদ যার ধনসম্পদ

সে জানে ভক্তিরস সার

গৌরাঙ্গ মধুর লীলা যার কর্ণে প্রবেশিলা

হৃদয় নির্মল ভেল তার।।

  অগণিত বৈষ্ণব সমাজ ধন্য ধন্য করে ওঠেন এই অভিনব শ্রীগৌরাঙ্গ বন্দনা শ্রবণ করে এরপর সঙ্গীত পরিবেশন করতে আসেন আর এক দিকপাল শ্রীনিবাস আচার্য ইনিও পদকর্তা তাঁর রচিত পদ

প্রেমক পুঞ্জরি শুনো গুনমঞ্জরি তুঁহু সে সকল শুভ দাই

তোহরি গুনগণ চিন্তয়ে অনুখন মঝু মন রহল বিকায়।। ...

সভাস্থলে আলোড়ন তুললো এই অসাধারণ পদ এরপরেই মঞ্চে আহুত হলেন আর দিকপাল গায়ক নৃসিংহবল্লভ মিত্র উনি পরিবেশন করলেন শিষ্য জ্ঞানদাসের রচনা করা, নিজের সুরারোপিত পদ

শচীগর্ভসিন্ধুমাঝে গৌরাঙ্গ রতন রাজে

প্রকট হইলা অবনীতে

হেরি সে রতন আভা জগৎ হইলা মনোলোভা

পাপ তম লুকালো তুরিতে

এ চাঁদবদনের আগে গগনের চাঁদ কি লাগে

চাঁদ হেরি চাঁদ লাজে কাঁদে।।

  এ পদ শ্রবণ করে উপস্থিত বৈষ্ণবগণ ধন্য ধন্য করে উঠলেন বাংলায় এত মধুর পদ এর আগে তাঁরা শোনেননি এই পদ কার রচনা, গুঞ্জন উঠল বৈষ্ণব সমাজে গুরুজীর কৃপায় জ্ঞানদাসের নাম সকলের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকল

  উৎসবের দ্বিতীয় দিনে বহিরাগত বৈষ্ণবগণ তাঁদের নিজ নিজ ধারার কীর্তন পরিবেশন করলেন তৃতীয় দিনে গুরুগম্ভীর শাস্ত্র আলোচনা ও তর্ক বিতর্কে মুখর হয়ে রইল সভাস্থল চতুর্থ দিনে জ্ঞানদাস তার পদ স্বকন্ঠে পরিবেশন করার সুযোগ পেল ইতিমধ্যে গুরুজি নৃসিংহবল্লভ মিত্রের কন্ঠে ওর পদ পরিবেশিত হওয়ায় জ্ঞানদাস নামটি শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে এবার শ্রোতা-দর্শক তার কন্ঠে ও সুরে তাঁর বাঁধা পদ শ্রবণ করলেন এবং খুবই প্রশংসা করলেন

  পঞ্চম ও ষষ্ঠ দিনে শ্রীখন্ডের রঘুনন্দন সরকার ঠাকুর, বল্লভ ঠাকুর প্রমুখ অনেক কীর্তনীয়া নিজস্ব ভাবধারায় ও শৈলীতে কীর্তন পরিবেশন করলেন শেষদিনে নরোত্তম দাসঠাকুর শুরু করলেন তাঁর সঙ্গীত প্রথমে শ্রীগৌরাঙ্গকে বন্দনা করে কিছু পদ পরিবেশন করলেন যেটাকে তিনি গৌরচন্দ্রিকা নামে অভিহিত করলেন তারপর রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমকাহিনী সম্বলিত স্বরচিত পালা পরিবেশন করলেন এর পূর্বে বৈষ্ণবকূল যা কখনও শ্রবণ করেননি এই কাহিনীধর্মী কীর্তনকে নরোত্তম পালাকীর্তন বা লীলাকীর্তন নামে অভিহিত করলেন, যে ধারার প্রবর্তন হল এই খেতুরি মহোৎসবে এই নতুন শৈলীর কীর্তন শ্রবণ করে অগণিত বৈষ্ণব মুগ্ধ হলেন এবং নতুন ধারাকে মান্যতা দিলেন

  খেতুরি গড়ানহাটি পরগণার অন্তর্গত, তাই এই শৈলী ‌‘গড়ানহাটি শৈলীনামে পরিচিত হলো সাতদিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানের শেষে উপস্থিত সকলের মুখে উচ্চারিত হতে থাকল পালাকীর্তনের কথা

  প্রত্যেকে নিজ নিজ নিকেতনে ফেরার পথে পা বাড়ালেন পদব্রজে সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভ, তাঁর সুযোগ্য ছাত্র জ্ঞানদাস, মৃদঙ্গবাদক বংশীবদন এবং সুগায়ক মনোহর দাস নৃসিংহবল্লভের মুখমণ্ডলে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিজের জন্য তিনি ততখানি আনন্দিত নন, যতখানি আনন্দিত তাঁর শিষ্য জ্ঞানদাসের জন্য জ্ঞানদাসও এক অনাস্বাদিত আনন্দের স্বাদ পেয়ে মুগ্ধ ও অভিভূত

  নৃসিংহবল্লভ চলতে চলতে আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলে ওঠেনঅহো অহো! কী শুনলাম, কী দেখলাম! হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে গেল! সত্যিই বিশিষ্টতা আছে ওই নরোত্তম ছেলেটির! এই না হলে হরিদাস গোস্বামীর যোগ্যশিষ্য

  গুরুদেবের তৃপ্তিবাক্যকে মাথা আন্দোলিত করে সমর্থন জানায় জ্ঞানদাস, মনোহর, বংশীবদন পাশে উপবিষ্ট   রঘুনন্দন বলে ওঠে নামটিও বেশ, লীলাকীর্তন মনোহর বলে কীর্তন শুরুর আগে যেটি গাইল, কী যেন বলল সেটিকে? 

  গৌরচন্দ্রিকা বংশীবদন বলে ওঠে

  হ্যাঁ, গৌরচন্দ্রিকা ও লীলাকীর্তন পালাকীর্তনও বলছিল কখনও সখনও কৃষ্ণ ও রাধা এবং তার সখীদের কথোপকথনও ছিল পালাগানের মতো

  গুরুদেব নৃসিংহবল্লভ বলে ওঠেন এ এক নতুন ধারা বটে কী বল হে জ্ঞানদাস

জ্ঞানদাস বলে হ্যাঁ গুরুদেব

কথাটি বলেই সে নিশ্চুপ হয় আসলে ওর মনের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে পালাকীর্তনের কলিগুলো

শুন শুন ওগো রাইকিশোরী

কাঁখে লয়ে যাও কণকগাগরি

পিছল কর পথ ঢালি যমুনা বারি

কালা হেথা যাবে পড়ি...

 

রাধিকা তখন বলছে

সখি হে!...

পিছল কাটি যদি শ্যাম পড়ি যায়

ব্যথা পাবে এই অধমিনী রাই

শ্যামের অঙ্গ, আমার সঙ্গ

সদা মিলিমিশি রাজে

সখি! ওই যে মোহন-মুরলী বাজে...

রাধা এবং কৃষ্ণের লীলা এবং ভাব-ব্যাকুলতায় আচ্ছন্ন এখন জ্ঞানদাস বেশি কথা বলার মতো অবস্থা এখন তার নেই তাই ও মৌনাবলম্বন করে আপন মনে পথ চলতে থাকে ওর মনে প্রবাহিত হতে থাকে খেতুরির মহোৎসবে শোনা নতুন ধরনের পদগুলি সেইসঙ্গে নতুন নতুন পদ ওর মনে সৃষ্টি হতে থাকে সেগুলি যতক্ষণ না ও লিপিবদ্ধ করে ফেলতে পারছে ততক্ষণ মানসিক শান্তি পাচ্ছে না

 

বারো

 

খেতুরি মহোৎসব শুধু কান্দরা বা শ্রীখন্ড নয়, সারা বঙ্গদেশে তুলেছে এক নতুন উদ্দীপনা নরোত্তম দাস উদ্ভাবিত অভিনব পালাকীর্তন বৈষ্ণব সমাজে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছে বিভিন্ন গ্রামে পালাকীর্তন বা লীলাকীর্তনের দল গঠন করা হচ্ছে শ্রীখন্ডের রঘুনন্দন সরকার কান্দরায় উপস্থিত হয়েছেন দল গঠনের জন্য তাঁর নেতৃত্বে কান্দরার বল্লভ ঠাকুর, জ্ঞানদাস, রঘুনন্দন, বংশীবদন, শশীশেখর, চন্দ্রশেখর এবং সঙ্গীতগুরু নৃসিংহবল্লভের অনুমত্যনুসারে তাঁর কন্যা মানসীকে নিয়ে গঠিত হল পালাকীর্তনের এক নতুন ধারা যারা নাম দেওয়া হল মনোহরশাহী কীর্তন এই নতুন ধারার আন্দোলনে কান্দরা, রাজুর সহ সমগ্র মনোহরশাহী পরগণা ভেসে যাচ্ছে দধিয়ার বৈরাগ্যতলা, কেন্দুবিল্বর আশ্রম, শ্রীখন্ড শ্রীপাট, এরকম নানা স্থানে পরিবেশিত হচ্ছে নতুন ধারার মনোহরশাহী পালাকীর্তন তা সত্যিই শ্রোতৃমন্ডলীর মনকে হরণ করতে সম্ভব হচ্ছে জ্ঞানদাসের কন্ঠে স্বরচিত পদ, বংশীবদনের মৃদঙ্গের বোল, মনোহর দাস, রঘুনন্দন, বল্লভ ঠাকুরের দোহারকি, সর্বোপরি রঘুনন্দনের বাঁধা পালা, সেইসঙ্গে রাধিকারূপে মানসী ও শ্রীকৃষ্ণরূপে জ্ঞানদাসের পালাগান সারা বঙ্গদেশ মাতিয়ে তুলেছে

  এদিকে মঙ্গল ঠাকুর এক পক্ষকাল পর নবদ্বীপ থেকে গ্রামে প্রত্যাবর্তন করেছেন গ্রামের ব্রাহ্মণ সমাজের প্ররোচনায় এবং নিজের প্রাধান্য খর্ব হওয়ায় জ্ঞানদাসের উপর ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়েছেন বাঁড়ুজ্জে-চাটুজ্জেদের অভিযোগ শুনে যার পর নাই বিরক্ত হয়ে পরের দিন ওদেরকে আসতে বলেছেন তিনি জ্ঞানদাসের সঙ্গী-সাথী শশীশেখর, চন্দ্রশেখরদের আহ্বান জানালেন তাঁর গৃহে একটা কিছু করতেই হবে তা না হলে সম্মান ধুলায় লুটোবে

  শশীশেখর ও চন্দ্রশেখর ভূমিতে বসে রয়েছে মঙ্গল ঠাকুর এদের সম্মুখে দৃঢ় পদচারণা করছেন আর উত্তপ্ত কণ্ঠে বলছেন স্বয়ং চৈতন্যদেব আমার গৃহে রাত্রি যাপন করে গেছেন আতিথেয়তায় তৃপ্ত হয়ে আমাকে তিনিঠাকুর' উপাধি দিয়েছেন আমাকে তিনি বৈষ্ণব-শ্রেষ্ঠ বলেছেন আর ওই অর্বাচীন জ্ঞানদাস কিনা জাত খুইয়ে বোষ্টম হয়ে বৈষ্ণবদের শিরোমণি হযে উঠল! তাকে নিয়ে তোমরা নৃত্য করছ শশীশেখর! ছিঃ ছিঃ ছিঃ!

  বৃথায় আপনি রুষ্ট হচ্ছেন দা'ঠাকুর আপনিই গ্রামের শিরোমণি কোথায় আপনি, আর কোথায় আপনার নাতির বয়সী জ্ঞানদাস! আপনি হলেন বাদশাহ হুসেন শাহের কৃপাধন্য স্বয়ং বাদশাহ আপনাকে রাধাবল্লভ জিউয়ের সেবাইত করেছে

  তবে, তোমরা ওই ডেঁপো ছোঁড়াটাকে নিয়ে এত মাতামাতি করছ কেন?

  আসলে কি জানেন দা'ঠাকুর! জ্ঞানদাসের গানের গলাটা খুব ভাল পদগুলিও বাঁধে চমৎকার গুরু নৃসিংহবল্লভ তো ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ

  ওই নৃসিংহই তো যত নষ্টের গোঁড়া কীর্তনগানে নাকি নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে! আহা! কী গাল ভরা নামমনোহরশাহী ধারা ব্যাটা শুদ্দুর মনোহর দাস; তার নামে কীর্তনের ধারা!

  হো-হো করে হেসে ওঠে শশীশেখর আপনি ভুল করছেন দা'ঠাকুর! আমাদের এই কান্দরা আর রাজুর গ্রাম মনোহরশাহী পরগণার অন্তর্গত, তাই মনোহরশাহী

  তা কি আর আমি জানি না! তোমার কাছে শুনে শিখতে হবে! আরে বাবা কীর্তন হল গান; তার আবার ধারা-ফারা কী! গান গাইছিস গা সেখানে আবার যাত্রাপালা করার কী আছে নৃসিংহর মেয়েটিকেও দলভুক্ত করেছে ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা! নৃসিংহকেও বলিহারি যাই, বয়ঃপ্রাপ্তা কন্যার বিবাহ দেবার আয়োজন নাই, পালাগানের রাধিকা সাজিয়েছে! আর তোদের ওই জ্ঞানদাসের আস্পর্ধা কম নয়! সে ব্যাটা কিছুদিন আগে জাত খুইয়ে বোষ্টম হয়েছে তখনই ওকে ভিটেছাড়া করার কথা নাতির বয়সি, নাতির বন্ধুও বটে তাই বিচারে বলা হল, ভালোই যখন বেসেছিস, বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হল বিয়ে কর, ঘর-সংসার কর! তা নয়, আইবুড়ো ধিঙ্গি মেয়েটাকে নিয়ে যাত্রাপালা! গাঁয়ে সমাজ বলে কিছু আছে নাকি!

  নিশ্চয় আছে আপনিই তো হলেন সে সমাজের মাথা আপনাকে অমান্য করার সাধ্য কার!

  ঠিক আছে যদি মান্যই কর, তাহলে আমার নির্দেশ মতোই তোমাদের চলতে হবে এখন তোমরা যাও

  বাঁড়ুজ্জে-চাটুজ্জেদেরও আগামীকাল আসতে বলা হয়েছে দেখা যাক কী ব্যবস্থা করা যায়

  পরের দিনের প্রাতঃকাল সূর্যদেব তখনও সম্পূর্ণভাবে চক্ষু উন্মোচন করেননি মঙ্গল ঠাকুর শয্যায় উঠে বসেছেন তাঁর চক্ষু রক্তবর্ণ শয্যায় উপবিষ্ট থেকেই তিনি হাঁক দিলেনকে আছিস, এদিকে আয়!

পুত্র রাধিকানাথ তৎক্ষণাৎ সন্নিকটে হাজির মঙ্গল ঠাকুর বলেনভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখেছি শীঘ্র কেনারাম বাঁড়ুজ্জে, হরভৈরব চাটুজ্জেদের নাটমন্দিরে আসতে বল আর রাজুরের নৃসিংহবল্লভকেও আমার সঙ্গে এখুনি দেখা করার জন্য সংবাদ পাঠিয়ে দে

  কিছুক্ষণের মধ্যেই কান্দরা গ্রামের ব্রাহ্মণকূল মঙ্গল ঠাকুরের নাটমন্দিরে উপস্থিত তাঁরা আসার জন্য উদগ্রীব হয়েই ছিলেন, রাধিকানাথের মুখে আহ্বানবাণী শুনে আরও তৎপর হয়ে রয়েছেন মঙ্গল ঠাকুর শয্যা থেকে সরাসরি উপস্থিত হলেন নাটমন্দিরে তাঁর বিস্রস্ত বেশবাস, চক্ষু রক্তবর্ণ, ললাট কুঞ্চিত তিনি গুরুগম্ভীর গলায় বলতে শুরু করলেনদুঃসময়, খুবই দুঃসময়! কান্দরার আকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা গতকাল রাত্রিতে আমি এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখেছি স্বপ্নে দেখলাম, আমার গৃহে অগ্নি সংযোগ হয়েছে দাউ-দাউ করে জ্বলছে গৃহ, দেব-দেউল, নাটমন্দির সে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের গৃহে আমার পুত্রগণ অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুমুখে আমি করজোড়ে গৃহদেবতা নৃসিংহদেবকে আকুল প্রার্থনা জানাচ্ছি, ‌‘রক্ষা করো ঠাকুর, রক্ষা করো!’  

  হঠাৎ এক অলৌকিক কাণ্ড দর্শন করলাম অগ্নির লেলিহান শিখা থেকে আর্বিভূত হলেন স্বয়ং নৃসিংহদেব আমি আকুল প্রার্থনা জানালাম তাঁর কাছে, ‌‘করুণা করো, হে প্রভু করুণা করো

  কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি শুনতে পেলাম নৃসিংহদেবের মেঘমন্দ্রিত কন্ঠস্বর, ‌‘ওরে পামর! গ্রামে যথেচ্ছ অনাচার হচ্ছে, তাই গ্রামে আজ মহামারী দেখা দিয়েছে সে মহামারী থেকে রক্ষা পেতে নৃসিংহবল্লভের কন্যা মানসীর সঙ্গে কণ্ঠীবদল কর তাকে সাধনসঙ্গিনী করে তোর ঘরে নিয়ে এলে, নিত্য তার সুকণ্ঠের গান শুনতে পাবো’— এ আদেশ প্রদানের পর অগ্নিশিখার মধ্যে বিলীন হলেন নৃসিংহদেব তোমরা বল, এখন আমি কী করব

  ব্রাহ্মণকূল যেন ব্রহ্মাস্ত্র হাতে পেলেন তারা সমস্বরে বলে উঠলেনকূলদেবতার আদেশ অমোঘ ও অলঙ্ঘনীয় সে আদেশ পালন না করলে সত্যিই তুমি নির্বংশ হয়ে যাবে মঙ্গল তাই আমাদের পরামর্শ, তুমি যত শীঘ্র সম্ভব, মানসীর সঙ্গে তোমার বিবাহের আয়োজন করো

  ইতিমধ্যে নৃসিংহবল্লভও উপস্থিত হয়েছেন সমস্ত শ্রবণ করে তিনি কাতর প্রার্থনা জানালেনএ কী করে সম্ভব গুরুদেব! মানসী আপনার পৌত্রীসমা মাত্র ত্রয়োদশ বৎসর বয়স তার আপনি সম্পর্কে তার পিতামহ এ কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না

  মঙ্গল ঠাকুর বলেনএ তোমার গুরুর আদেশ

  নৃসিংহবল্লভ মস্তক আন্দোলন করে বলেনআপনার কোনো আদেশ আমি কখনও অমান্য করিনি কিন্তু এ আদেশ আমি কোনোমতেই মানতে পারবো না এ আদেশ অসঙ্গত

  এ আমার কূলদেবতা নৃসিংহদেবের আদেশ, মানতে তুমি বাধ্য

  না গুরুদেব, সম্ভব নয়

  দেখো নৃসিংহ, আমার কূলদেবতা নৃসিংহদেবের আশীর্বাদেই তোমার জন্ম একথা তুমি বিস্মৃত হয়েছ তাঁর আদেশ অমান্য করলে এ মহামারী থামবে না চতুর্দিকে সর্বনাশ হবে তুমিও নির্বংশ হবে

  নৃসিংহবল্লভ তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন অবশেষে বললেনআমি গৃহে ফিরে যাই কন্যাকে জানাই সে বয়ঃপ্রাপ্তা তারও একটা অভিমত দরকারএ কথা বলে উনি আর এক মুহূর্ত ওখানে অবস্থান করলেন না তৎক্ষণাৎ উনি বন্ধুবর জয়গোপাল দাসঠাকুরের গৃহাভিমুখে রওনা হলেন

  পাগলের প্রায় হয়ে নৃসিংহবল্লভ পৌঁছলেন বন্ধুবর জয়গোপালের গৃহে বন্ধুকে এমন হন্তদন্ত হয়ে উপস্থিত হতে দেখে জয়গোপাল অনুমান করলেন, নিশ্চয় কোনো অঘটন ঘটেছে বন্ধু নৃসিংহবল্লভকে এমন বিভ্রান্ত হতে কখনো দেখেননি তিনি তাই তৎপরতার সঙ্গে বসার আসন ও হাতমুখ প্রক্ষালনের জল দিয়ে বললেনবল, তোমাকে এমন বিচলিত দেখাচ্ছে কেন? সব কুশল তো?

  নৃসিংহবল্লভ সমস্ত বৃত্তান্ত বন্ধুসকাশে জ্ঞাপন করলেন অতঃপর বললেন, এখন আমার কী করণীয় বল বন্ধু! গুরদেবের এমন প্রস্তাব আমি কোনো মতেই গ্রহণ করতে পারব না

  জয়গোপাল ক্ষণিক চিন্তা করে বললেনওই বৃদ্ধ মঙ্গল ঠাকুরের মতিভ্রম হয়েছে ওঁর কথায় গুরুত্ব দিও না তবে, যত শীঘ্র সম্ভব তোমার কন্যার বিবাহের আয়োজন করো জ্ঞানদাসের সঙ্গে তোমার কন্যার বিবাহ দাও ওরা উভয়ে উভয়ের প্রতি অনুরক্ত ওদের বিবাহ সংঘটিত না হলে উভয়েই কষ্ট পাবে আসলে জ্ঞানদাসকে মোটেও পছন্দ করেন না গ্রামের ব্রাহ্মণকূল তাই ওকে আঘাত করার জন্য এটা ওদের চক্রান্ত তুমি বরং এখুনি বংশীধর আচার্য মশাইয়ের কাছে যাও বিবাহের দিন স্থির করে এসো

  নৃসিংহবল্লভ বন্ধুর কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হলেন অন্তত একটা পথ দেখালো বন্ধু জয়গোপাল তাই তিনি তৎক্ষণাৎ ঘোড়া ছোটালেন বংশীধর আচার্য মশাইয়ের গৃহাভিমুখে

  আচার্য মশাই সবকিছু শুনে বললেনআমার যতদূর মনে পড়ছে, তোমার কন্যার কোষ্ঠী বিচারের সময় আমি বলেছিলাম, কন্যার বিবাহকালে ঘোরতর গোলোযোগের সম্ভাবনা আছে এখন বিবাহের দিনক্ষণ সঠিকভাবে স্থির করতে হলে জাতকের কোষ্ঠীপত্রের বিশেষ প্রয়োজন

  নৃসিংহবল্লভ বললেনযত শীঘ্র সম্ভব তিনি কন্যার কোষ্ঠীপত্র ও জন্মপত্রিকাটি নিয়ে আসছেন

  তৎক্ষণাৎ নৃসিংহবল্লভ তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন গৃহে প্রবেশ করার পূর্বেই তাঁর কর্ণে প্রবেশ করে কন্যা মানসীর সুললিত কন্ঠস্বর

আজি কালি করি কত গোঙাইব কাল

কহিও বন্ধুরে মোর এত পরিহার।।

একতিল যাহা বিনু যুগশত মানি

তাহে কী এতহুঁ দিন সহয়ে পরাণি।। ...

  উনি ভাবেন, এ পদ নিশ্চয় জ্ঞানদাসের রচনা জ্ঞানদাস বলেছিল, ও কিছু বিরহ পর্বের পদ রচনা করেছে সে পদ মানসীর কন্ঠে! কন্যা কি তবে সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে তার মনের কথা প্রকাশ করছে! তাহলে আর কন্যাকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন নাই এমন ভেবে তিনি কন্যার জন্মপত্রিকা ও আচার্য মশাইয়ের গণনা করা কোষ্ঠীপত্র সঙ্গে নিয়ে পুনরায় রওনা হলেন আচার্য মশাইয়ের গৃহে

  আচার্য মশাই সবকিছু বিচার বিবেচনা করে জানালেন, আগামী ১০ই আষাঢ়, মঙ্গলবার, কৃষ্ণাষ্টমী তিথিতে রাত্রি একপ্রহর একদন্ড দশপল পাঁচ বিপল পনেরো অনুপল গতে, তিন দণ্ড চল্লিশ পল কুড়ি বিপলের মধ্যে একটিই মাত্র লগ্ন রয়েছে এই লগ্নে বিবাহকার্য সম্পন্ন করা দরকার

  নৃসিংহবল্লভ আচার্য-আদেশ শিরোধার্য করে প্রস্থান করলেন সারাদিন ধরে অভুক্ত এবং ক্লান্ত নৃসিংহবল্লভ যখন তাঁর ক্লান্ত ঘোড়ার পৃষ্ঠে চড়ে ঈশানী নদীর উপরে বংশনির্মিত ভগ্নপ্রায় সেতুটি অতিক্রম করছেন, তখন সূর্যদেবও সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে পশ্চিম আকাশে রক্তিম রশ্মিচ্ছটা বিকিরণ করে তাঁর বিদায়ক্ষণ জ্ঞাপন করছেন দিকদিগন্ত বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরে তার রক্তিম আভা যেন স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে

 

তেরো

 

রাজুর গ্রামে উৎসবের আমেজ গ্রামের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বিত্তবান ও প্রভাবশালী মানুষ নৃসিংহবল্লভ মিত্র মহাশয়ের একমাত্র কন্যার বিবাহকাল আসন্ন গ্রামের সকলের হাঁড়িবাড়ন্ত নিমন্ত্রণ সারা গ্রাম সজ্জিত হয়েছে পত্র-পুষ্প-লতিকা-বিতানে কয়েকটি স্থানে অস্থায়ী জলসত্র খোলা হয়েছে কান্দরা থেকে রাজুর অবধি পথের খানা-খন্দ ভরাট করা হয়েছে দুই গ্রামের সংযোগস্থল ঈশানী নদীর উপর যে বংশ-নির্মিত সেতুটি রয়েছে, সেটিকে যতটা সম্ভব মেরামত করা হয়েছে

  বিবাহে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কান্দরা গ্রামের বহু মানুষকে তার মধ্যে ব্রাহ্মণকূল নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি বলেছেন, ‌‘জাতকূল হারানো বোষ্টমের সঙ্গে তোমার কন্যার বিবাহের নিমন্ত্রণ আমরা গ্রহণ করতে রাজি নই

  দুতীর মাধ্যমে নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছেন মঙ্গল ঠাকুরকেও মঙ্গল ঠাকুর অবশ্য নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন কিন্তু পত্র মারফত জানিয়েছেন, কূলদেবতা নৃসিংহদেবের ইচ্ছা নয় এ বিবাহ হোক এতে গ্রামদুটি শ্মশানে পরিণত হবে তাঁর সঙ্গেই মানসীর বিবাহ হবে, এটা তিনি স্থির নিশ্চিত তাই তিনি দেবতার আদেশে নিজেও প্রস্তুত থাকছেন

  এদিকে কান্দরা গ্রামেও সাজ-সাজ রব জ্ঞানদাসের পিতা কল্পনাথ প্রয়াত হলেও জ্ঞানদাসের বিবাহ-অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নেওয়ার মানুষের অভাব নেই গ্রামের বৈষ্ণবকূল মেতে উঠেছে এই আনন্দযজ্ঞে তাদের শিরোমণি ও পরামর্শদাতা হয়ে বিরাজ করছেন পন্ডিত জয়গোপাল দাসঠাকুর, যাঁর ‌‘মনোবুদ্ধি সংবাদগ্রন্থটিকে সম্প্রতি নবদ্বীপ ও বৃন্দাবনের পন্ডিতকূল মান্যতা দিয়েছে এবং শ্রীবৃন্দাবনে আমন্ত্রণ জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেছে ওখানকার পন্ডিতসমাজ

  গ্রামের ব্রাহ্মণকূল কোনো পক্ষেরই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি উপরন্তু তাঁরা নিদান দিয়েছেন, এমন অসবর্ণ বিবাহের জন্য গ্রামের অমঙ্গল হবে যে উদরাময় রোগের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে, এই পাপাচারের জন্য তা মহামারী আকার ধারণ করবে

  মঙ্গল ঠাকুরের, মানসীকে বিবাহ করার প্রস্তাবটিকে তাঁর পুত্রগণও সমর্থন করেননি বরং ক্ষুব্ধ হয়েছেন বৃদ্ধ বয়সে পিতার এমন ভীমরতিতে তাঁরা বিরক্তি প্রকাশই করেছেন জ্ঞানদাসের সহপাঠী ও বন্ধু, মঙ্গল ঠাকুরের পৌত্র বংশীবদন তো পিতামহের এই অভিপ্রায়ে তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে সে পণ করেছে, যেভাবেই হোক বন্ধু জ্ঞানদাসের বিবাহ মানসীর সঙ্গে দিতেই হবে তাই সে মনোহর, বল্লভ ঠাকুর, শশীশেখর, চন্দ্রশেখরদের নিয়ে একটি দল গঠন করেছে জ্ঞানদাসের বিবাহের আয়োজনে তারা দিনান্ত পরিশ্রম করছে বংশীবদন পিতামহকে যোগ্য জবাব দেওয়ার অভিপ্রায়ে, জ্ঞানদাসের বিবাহের আগের দিন ওকে অব্যূঢ়ান্ন ভোজনের নিমন্ত্রণ জানিয়েছে নিজ গৃহে ওর পিতা ও পিতৃদেবের সম্মতি থাকায় কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি বন্ধুর প্রবল অনুরোধে ও আন্তরিকতায় জ্ঞানদাস এ নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছে বংশীবদনের মা-জ্যাঠাইমারা ছত্রিশ ব্যাঞ্জন রন্ধন করে জ্ঞানদাসকে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে ভোজন করিয়েছেন বংশীবদনের কাছে এটা যেন ঠাকুরদার অন্যায় প্রস্তাবের বিরুদ্ধে একটা সমুচিত জবাব রূপে প্রতিভাত হয়েছে  

  পরের দিন সকাল থেকেই জ্ঞানদাসের গাত্রহরিদ্রা পর্বে মেতে উঠেছে গৃহের রমণীকূল কিন্তু রাত্রি থেকেই জ্ঞানদাসের কিঞ্চিত অসুস্থতা অনুভূত হচ্ছিল অল্প অল্প উদরপীড়া হচ্ছিল সম্ভবত অতি ভোজনের জন্য হতে পারে ভেবে, পাচক-বটিকাও খাওয়ানো হয়েছিল গাত্রহরিদ্রা পর্ব সমাধা হওয়ার পরে পরেই জ্ঞানদাসের তীব্র উদরপীড়া দেখা দিল এবং প্রবল জলপিপাসা শুরু হল কিন্তু বিবাহের দিনে, বিবাহের পূর্বাবধি জলপান করা নিষেধ, এই বিধি মানতে গিয়ে তাকে জলপান করতে দেওয়া হলো না কিছুক্ষণের মধ্যে শারীরিক অসুস্থতা ভয়ানক আকার ধারণ করল পুনঃপুনঃ বাহ্য ত্যাগ করে দ্বিপ্রহরে জ্ঞানদাস অবসন্ন ও কাতর হয়ে পড়ল বিবাহের লগ্ন যত নিকটস্থ হতে থাকল, জ্ঞানদাস ততই ম্রিয়মান হতে থাকল সন্ধ্যা নাগাদ সে চেতনারহিত হয়ে পড়ল বংশীবদন ও বল্লভঠাকুরের বাহিনী উপস্থিত হয়ে জ্ঞানদাসের অপরিমেয় সেবা-যত্ন করতে থাকল যেভাবেই হোক ওকে বিবাহ লগ্নের আগে সুস্থ করে তোলা দরকার

  জ্ঞানদাসের অসুস্থতার সংবাদে গ্রামবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিল কেউ বলতে থাকল, ‌‘ব্রাহ্মণদের অভিসম্পাতের ফলেই এই অসুস্থতাকেউ বলল, ‌‘স্বয়ং নৃসিংহদেবের আদেশ অমান্য করার ফল তো এমন হবেই!’ কেউ বা বলল, ‌‘মঙ্গল ঠাকুরের কুবুদ্ধি প্রয়োগের জন্য জ্ঞানদাসের এই অবস্থা গৃহে নিমন্ত্রণ করে ওকে কুপথ্য ভোজন করানো হয়েছে, যাতে ওর উদরাময় হয়, ও অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে বুড়োটা ওই কিশোরী মানসীকে বিবাহ করে ফেলতে পারবে

  জ্ঞানদাসের এবম্বিধ শারীরিক অসুস্থতা দেখে জয়গোপাল দাসঠাকুরের শিরঃপীড়া দেখা দিল তিনি পাগলের মতো ছুটলেন বৈদ্য ও কবিরাজ ডাকতে যেভাবেই হোক, জ্ঞানদাসকে বিবাহের লগ্ন অবধি সুস্থ করে তুলতে হবে নতুবা কন্যা লগ্নভ্রষ্টা হবে

  এ সংবাদ রাজুর গ্রামে পৌঁছতেও খুব একটা সময় নিল না সংবাদ পাওয়া মাত্র গ্রামের আনন্দ কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেল নৃসিংহবল্লভ পাগলের প্রায় হয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে কান্দরা গ্রামে পৌঁছলেন সেখানে জ্ঞানদাসের অচৈতন্য অবস্থা দেখে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন তবে কী মারক রোগ উদরাময়ে আক্রান্ত হল জ্ঞানদাস! ওর কি মৃত্যু আসন্ন! তাহলে মানসীর কী হবে! তৎক্ষণাৎ উনি বিকল্প বিধানের জন্য ঘোড়া ছোটালেন বংশীধর আচার্যর গৃহাভিমুখে

  সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে বংশীধর বললেনআমি পূর্বেই গণনা করে বলেছিলাম, ওর বিবাহকালে বিশেষ গোলযোগ দেখা দেবে তবে কন্যা লগ্নভ্রষ্টা হবে না জ্ঞানদাস ছাড়া অন্য কোনো পাত্রের সন্ধান করো

  নৃসিংহবল্লভ যেন অথৈ সাগরে নিক্ষিপ্ত হলেন এই মুহূর্তে কোথায় পাবেন মানসীর উপযুক্ত পাত্র মনে উদয় হলো জ্ঞানদাসের বন্ধু বংশীবদনের কথা মঙ্গল ঠাকুরের নাতি ব্রাহ্মণ বংশজাত হলেও বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত পরিবারের সন্তান ওকে যদি রাজি করানো যায় তাহলে এ যাত্রা রক্ষা পায় উনি ছুটলেন জ্ঞানদাসের বাড়িতে, যেখানে অচৈতন্য জ্ঞানদাসের সুস্থতার জন্য প্রাণপণ সেবা করে যাচ্ছে বংশীবদন

  শত চেষ্টা করেও তিনি বংশীবদনকে কোনোক্রমেই রাজি করাতে পারলেন না বংশীবদন বললজ্ঞানদাসের বাগদত্তাকে ও কিছুতেই বিবাহ করবে না ওরা একে অপরকে ভালোবাসে মানসীর ভালোবাসার জোরে জ্ঞানদাস ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে প্রয়োজনে বিবাহের দিন পিছিয়ে দেওয়া হোক

 একথা শুনে সুযোগসন্ধানী ব্রাহ্মণসমাজ রে-রে করে উঠলএ হতে দেওয়া যায় না লগ্নভ্রষ্টা কন্যা অপয়া, তাকে গ্রামে রাখা যাবে না লগ্নভ্রষ্টা হলে, সে কন্যার বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়

  একথা শুনে নৃসিংহবল্লভ শিহরিত হলেন তাঁর আদরের ধন, স্বয়ং সরস্বতী অকালে মৃত্যু বরণ করবে অসম্ভব! ব্যবস্থা কিছু একটা করতেই হবেএমন ভেবে পাগলের মতো কেশ উৎপাটন করতে করতে তিনি জ্ঞানদাসের গৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন

  পথিমধ্যে কেনারাম বাঁড়ুজ্জে, হরভৈরব চাট্টুজ্জেরা অপেক্ষমান ছিলেন ওঁরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও কন্যা-মৃত্যু ভয়ে ভীত নৃসিংহবল্লভকে পথিমধ্যে ঘিরে ধরলেন বলতে লাগলেনএসবই হচ্ছে নৃসিংহদেবের কোপের ফলে দেবতার আদেশ অনুযায়ী মঙ্গল ঠাকুরের সঙ্গেই কন্যার বিবাহ দিয়ে তাকে বাঁচাও এতে নৃসিংহদেবও তুষ্ট হবেন, এতে তোমার প্রিয় ছাত্র জ্ঞানদাসও হয় তো মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে আসতে পারে মঙ্গল ঠাকুর বৃদ্ধ হলেও ক্ষতি কী! কুলীন ব্রাহ্মণ অশীতিপর হলেও সুপাত্র তাঁর সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিsয়ে কন্যাকে ও বংশকে রক্ষা করো যাও, লগ্ন বয়ে যায় পিতা হয়ে কন্যাকে লগ্নভ্রষ্টা হতে দিও না

  নৃসিংহবল্লভ হতবুদ্ধি হয়ে দণ্ডায়মান হৃষিকেশ মুখুজ্জে বলে ওঠেনদেওয়ান-পুত্রের আর মাথার ঠিক নাই আমিই যাই, মঙ্গল ঠাকুরকে সংবাদ দিই পাত্রসাজে সজ্জিত হয়ে রাজুর গ্রামে যাত্রা করতে

  হরভৈরব বললেনওরে কে আছিস! নৃসিংহবল্লভ আমাদের ছেলেপিলের সঙ্গীতগুরু, সম্মাননীয় মানুষ তো বটে! যা, ওকে সঙ্গে করে বাড়িতে পৌঁছে দে

  ওদিকে জ্ঞানদাসের অসুস্থতার খবর পেয়ে মানসী মুহুর্মুহু সংজ্ঞা হারাচ্ছে ওর আত্মীয় পরিজনরা শুশ্রুষায় ব্যস্ত কোনোক্রমে ওর সংজ্ঞা ফেরানো হয়েছে লগ্ন শেষ হয়ে যাওয়ার কয়েক পল আগে অর্ধচেতন মানসীর সঙ্গে অহংকারী ব্রাহ্মণ মঙ্গল ঠাকুরের বৈষ্ণবমতে কণ্ঠীবদল সম্পন্ন হয়ে গেল চূড়ান্তভাবে পরাজিত হল বৈষ্ণব সমাজ এবং নব্য সংস্কারের প্রতিভূ জয়গোপাল দাসঠাকুর কান্দরার ব্রাহ্মণসমাজ বিজয়োল্লাসে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুললো এদিকে বংশীবদন ও মনোহরের সেবাশুশ্রুষায় এবং কবিরাজের হাতযশে জ্ঞানদাস চোখ মেলে চাইল ততক্ষণে রাত্রি শেষ হয়ে ভোরের শুকতারা পূর্বাচলে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে

 

 

 

চৌদ্দ

বৃদ্ধ মঙ্গল ঠাকুরের কিশোরী ভার্যা মানসীর মানস ঘরের বিচলন ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যের পক্ষে অনুধাবন করা অসম্ভব সে জীবিত না মৃত নিজেই অজ্ঞাত জীবনের যা কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা, কামনা-বাসনা সকলই পরিত্যাগ করেছে মানসী শশ্রুগৃহের অন্য রমণীদের প্রবল অনুরোধে ও প্রচেষ্টায় অন্নগ্রহণ করতে হচ্ছে প্রাণটুকু ধারণ করে রাখার জন্য সকলের সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ, সঙ্গীত বন্ধ আর সুর আসে না কন্ঠে তানপুরা গৃহকোণে ধূলিধুসরিত তার চম্পাকলিকা অঙ্গুলিকা আর তোলে না ঝঙ্কার সে গৃহের বাহিরে নিষ্ক্রান্ত হয় না পরপুরুষের মুখ দর্শন করে না এমনকি জ্ঞানদাসের প্রাণদাতা বংশীবদনেরও সম্মুখীন হয় না স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী মানসী এখন পতিব্রতা নারীর মূর্ত প্রতীক বৃদ্ধ ঠাকুরদাদা, নাকি অসুস্থ স্বামীর সেবায় দিবারাত্র নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে সে বয়সভারে ন্যুব্জ ও বার্ধক্যজনিত কিছু রোগে আক্রান্ত মঙ্গল ঠাকুর কিশোরী-স্ত্রীর সেবাযত্নে যেন আরও আরামপ্র্রিয় ও অলস হয়ে যাচ্ছেন তিনিও প্রায় গৃহবন্দী মানসীর অতিরিক্ত সেবাযত্ন পেতেই হয়তো তিনি নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন

  ওদিকে জ্ঞানদাস প্রিয় বন্ধুর সেবা-শুশ্রুষায় শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও মানসিক অসুস্থতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি দিবারাত্র কী এক ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে আছে সে কখনও মানসী... লে হাহাকার করে উঠছে তারপর আবার শান্ত, সৌম্য, নির্বাক তাপস যেন! ওর কন্ঠে আর সুর খেলে না, চোখে ভাষা ফোটে না শুধু সময়ান্তরে দীর্ঘশ্বাস নিঃসৃত হয় শরীরে বোধহয় শক্তিও হ্র্রাস পেয়েছে প্রায় চলচ্ছক্তিরহিত হয়ে রাধাগোবিন্দজির মন্দিরের বারান্দায় বসে থাকে সে আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে দেবতার মূর্তি দেখে, আকাশ দেখে, ভূমি দেখে আর দেখে নিজের বর্ধিত-নখ দক্ষিণ হস্তটিকে

একসময় সে হস্তে তুলে নেয় খাগের কলম আর ভূর্জপত্র পরিপার্শ্ব বিস্মৃত হয়ে লিখে চলে পংক্তির পর পংক্তি  

পহিলহি প্রেমলুঁ সায়রে ডুবলুঁ

অব বুঝলুঁ পরিণামে

মানিক জানি পরশে চিত পরশল

অব বিঘটন কোন ঠামে।।

... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...

সজনি তুঁহুজনি বিছুরসি মোয়।।

কান্দরা গ্রামে পূর্বপাড়ার মঙ্গল ঠাকুরের গৃহ এবং মাঝেরপাড়ার রাধাগোবিন্দ মন্দিরের বারান্দার দূরত্ব সামান্যই কিন্তু স্বেচ্ছা গৃহবন্দি মানসী ও বাহ্যজ্ঞানহীন পদ-রচয়িতা জ্ঞানদাসের মধ্যে দূরত্ব যেন লক্ষ যোজন এভাবেই বয়ে যায় কয়েকটি ঋতুচক্র কত জল প্রবাহিত হয়ে যায় দুই গ্রামের মধ্যবর্তিনী ঈশানী নদী দিয়ে সে নদী গ্রীষ্মে পিপাসার্ত হয়, বর্ষায় উৎফুল্ল হয়, কুমুদ ফুটে ওঠে বুকের মাঝে শরৎ-এ হাস্যমুখর হয়ে ওঠে তার দুই পার্শ্বে ফুটে ওঠে অজস্র কাশফুল মানসী-নদীতেও জোয়ার-ভাটা খেলে ও পিপাসার্ত হয়, বর্ষায় উৎফুল্ল হয়, কিন্তু কুমুদ ফুটে ওঠে না ওর বুকের মাঝে ও আর পথে নামে না ওর অলক্তরঞ্জিত চরণ আর ঈশানীর জলকে স্পর্শ করে না ওর নুপুরের শিঞ্জন আর নদীকূলের ভেকদলকে জলে লম্ফ দিতে তাড়িত করে না ডাহুক-ডাহুকি দৌড়ে পলায়ন করে না

কিন্তু এসবকিছু ফুটে ওঠে জ্ঞানদাসের খাগের কলমে

গগনে ভরল নব বারিদ হে

বরখা নব নব ভেল

ঝর ঝর বাদর ডাকে ডাহুকী সব

শবদে পরাণ হরি নেল ।।...

মানসীর পিতা নৃসিংহবল্লভ কন্যার বিবাহের কিছুদিন পরেই গ্রাম পরিত্যাগ করেছেন তাঁর কন্যা লগ্নভ্রষ্টা হয়নি, মৃত্যুবরণ করেনি এটাই তাঁর সান্ত্বনা তবুও তিনি ধরে নিয়েছেন এক অর্থে কন্যার মৃত্যুই হয়েছে আর কোনোদিনও সে প্রভাত-সূর্যের আলোয় আস্তরিত হয়ে বারান্দায় বসে কামোদ, তিলক কিংবা ভৈরবী রাগ গাইবে না আর কোনোদিনও সে উত্তরীয় নিয়ে এসে পিতার ঘর্মাক্ত শরীর মার্জনা করে দেবে না আর কোনোদিনও সে বলবে না, ‌‘বাবা, তুমি আমার চেয়ে জ্ঞানদাদাকে বেশি ভালোবাসো

  অথচ সে রয়েছে অনতিদূরে পার্শ্ববর্তী গ্রামেই এ অসহনীয় ব্যথা বুকে নিয়ে জন্মভূমিতে বসবাসের আর প্রয়োজন কী! এমন ভাবনায় ভাবিত হয়ে নৃসিংহবল্লভ কোনও এক দূর আত্মীয়ের আহ্বানে বীরভূমের পথে পা বাড়িয়েছেন নাকি সেখান থেকে আরও দূরে কোনো গ্রামে কিংবা শ্রীবৃন্দাবনের পথে কেউ তাঁর সংবাদ রাখে না

  জয়গোপাল দাসঠাকুর ব্রাহ্মণ সমাজের চাপে পড়ে চতুষ্পাঠী বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি গ্রামের পথে আর সচরাচর পদার্পণ করেন না অধিক সময় গৃহেই বন্দী থাকেন নতুন কোনও গ্রন্থ রচনায় নাকি জীবনের অবশিষ্টটুকুর হিসাবনিকাশে তিনি ব্যস্ত, কে জানে!

  কয়েকটি বছর অতিক্রান্ত কান্দরা গ্রামে কোনও এক প্রত্যুষে আকাশে বাতাসে বিষাদের বাণী ছড়ায়মঙ্গল ঠাকুরের জীবনাবসান হয়েছে প্রভাত হতে না হতেই তাঁর নাটমন্দিরের চত্বর জনারণ্যে পরিণত হয়েছে শান্ত এক শোকের আবহাওয়া চতুষ্পার্শ্বকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে তার মধ্যে অকস্মাৎ এক চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায় শান্ত জনারণ্য মুখর হয়ে ওঠে মঙ্গল ঠাকুরের তরুণী ভার্যা মানসী ঘোষণা করেছে, স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যাবে

  নিমেষের মধ্যেই এই বার্তা দুটি গ্রামের মধ্যে বিস্তারিত হয় যেন মানসী বলে গৃহনারীদেরকে, গৃহনারী সংবাদ দেয় বৃক্ষরাজিকে, বৃক্ষরাজি সঞ্চারিত করে বাতাসের কানে বাতাস বার্তা পাঠায় ঈশানী নদীতে ঈশানী জানায় পার্শ্ববর্তী ধানক্ষেতকে ধানক্ষেত হিন্দোলিত হয়ে ছড়িয়ে দেয় রাজুর গ্রামের প্রতিটি মানুষের কানে

  কিছুক্ষণের মধ্যেই দুটি গ্রামের সমস্ত মানুষ একত্রিত হয় মঙ্গল ঠাকুরের মন্দির প্রাঙ্গণে তাদের কারও হাতে সিঁদুর, কারো হাতে পুষ্পমাল্য সতী মানসীর পায়ে তারা অর্পণ করতে চায় সিঁদুর তার কন্ঠে প্রদান করতে চায় শ্রদ্ধার পুষ্পমাল্য সে যে এখন মানবী মানসী নয়, সে এখন দেবী, সতীলক্ষ্মী নারী তার কল্যাণে ধন্য হয়ে যাবে মঙ্গল ঠাকুরের বংশ ধন্য হবে কান্দরা গ্রাম তাই সকলে সতীনারীর দর্শন চায় এক পলকের জন্য হলেও মানসী মৃত স্বামীর পদস্পর্শ করে নিষ্কম্প, নিষ্পলক, স্থির, সংযত এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞ

ওদিকে জ্ঞানদাস ভূর্জপত্রে লিখে চলে

বিফলে সাজায়লুঁ কুঞ্জ

কী ফল উপচার পুঞ্জ।।

কী ফল অন্ধ সমীপ

উজোরলুঁ রতন-প্রদীপ।।

  মানসী নির্বাক হয়ে উপবিষ্ট থাকলেও তার মানসপটে বয়ে চলে অজস্র কথা সেগুলি চিৎকারধ্বনি হয়ে বেরিয়ে আসতে চায়তোমরা আমাকে দেবী সাজালেও আমি দেবী নই আমি রক্তমাংসের নারী এ আমার স্বামীর প্রতি ভক্তির পরাকাষ্ঠা নয়, এ নারীত্বের প্রতি পুরুষের চরম অবমাননার প্রতিবাদ এ হলো প্রকৃত প্রেমের হত্যার প্রতিবাদ সমাজে নিষ্ঠুর বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে এই আত্মহনন কিন্তু কোনো স্বর ফুটে ওঠে না ওর কন্ঠে কোনো ভাষা ফুটে ওঠে না ওর শরীরে শুধু অশ্রুশূন্য চোখদুটি ধকধক জ্ঝলতে থাকে

  তবুও ওর মনের ভাষা একজন উপলব্ধি করতে পারে, সে বংশীবদন, সম্পর্কে তার নাতি এই জনারণ্যে সে উপস্থিত নেই সে ছুটেছে মাঝের পাড়ায় জ্ঞানদাসের নিকটে জ্ঞানদাসের সমীপে সে আকুল মিনতি জানায়ভাই জ্ঞানদাস, ঠাকুরমাকে বাঁচাও তুমিই পারো ওই অভিমানিনীকে মৃত্যুর কোল থেকে ফিরিয়ে আনতে তোমার উপর অভিমান করেই যে সে ঠাকুরদার চিতায় পুড়ে মরতে চাইছে তুমি তোমার মানসীকে বাঁচাবে না!

  জ্ঞানদাসের সাধনায় ব্যাঘাত ঘটে তার যেন তপস্যাভঙ্গ হয় বন্ধুর অনুরোধে সে বহুদিন পর স্খলিত পায়ে হাঁটতে থাকে পূর্বপাড়ার দিকে

  হঠাৎ ব্রাহ্মণসমাজ হতচকিত হয়ে ওঠেআরে! ও যে দেখি জ্ঞানদাস! এদিকেই আসছে ওকে আটকাও, আটকাও ও পৌঁছলে এ মাগী আর সতী হতে চাইবে না তখন আর এক বিড়ম্বনা কাঁচা বয়সের বিধবা ওই বংশী-বল্লভ-শশী-চন্দ্রদের মাথা চিবিয়ে খাবে যেনতেন প্রকারেণ ওর গতি রোধ করো নয় তো এ মাগীকে আফিম গিলিয়ে সংজ্ঞাহীন করে দাও

  জ্ঞানদাসের আগমনবার্তা পৌঁছে যায় মঙ্গল ঠাকুরের অন্দরমহলে তবুও মানসী নির্বিকার, সংকল্পে অবিচল ও সংবাদ পেয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে কম্বুকন্ঠে বলে ওঠেওকে আসতে নিষেধ করো আমি স্বেচ্ছা বন্দীত্ব থেকে মুক্তি চাই এই পুরুষশাসিত সমাজের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি চাই আমি স্বামীর সহমরণে যাবোই আমাকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না

  ততক্ষণে জ্ঞানদাসের শিক্ষাগুরু জয়গোপাল দাসঠাকুরের নিকট পৌঁছে গিয়েছে জ্ঞানদাসের আগমন বার্তা তিনি বিচলিত, শেষে তার প্রিয় ছাত্রটিরও যেন প্রাণনাশ না হয়ে যায়! দীর্ঘদিন পর তিনিও পথে নামেন তড়িৎ পায়ে অগ্রসর হন পূর্বপাড়ার দিকে

  জ্ঞানদাসের কাছে এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, মানসী তার সংকল্পে অবিচল কারও কথায় সে তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করবে না জ্ঞানদাস ফিরে যাক নিজের জগতে যে কাজের জন্য এই পৃথিবীতে সে এসেছে, সেই কাজ করুক নিবিষ্ট মনে

  বক্ষভর্তি বেদনা, চক্ষুভর্তি অশ্রু আর একসমুদ্র অভিমান নিয়ে ফিরে যায় জ্ঞানদাস পথিমধ্যে সাক্ষাৎ গুরুদেব জয়গোপালের সঙ্গে জয়গোপাল দাসঠাকুর তাঁর প্রিয় ছাত্রকে বক্ষে আর্কষণ করেন, আলিঙ্গন করেন মস্তকে চিবুক রেখে বলেনঅনেক কাজ বাকি বৎস! সৃষ্টিকাজে ছেদ টানতে নাই আমার সঙ্গে চলো

  জ্ঞানদাস বাধ্য সন্তানের মতো গুরুপদ অনুসরণ করে, গুরুগৃহে পৌঁছে যায়

  সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে তার তীব্র দাহনশক্তি খর্বিত ক্লান্ত অবসন্ন সে এমন সময় দেখা যায় কাঁচা মাটির পথ ধরে গুরু ও শিষ্য মৃদুমন্দ গতিতে এগিয়ে চলেছেন দুজনের হস্তে ধরা দুটি পেটিকা ক্রমে তারা রাঢ়ীর ডাঙা অতিক্রম করেন পার্শ্বেই প্রবহমানা ঈশানী নদী তার তীরে ঢাকঢোল, কাঁসর-ঘন্টা ধ্বনিত হচ্ছে শঙ্খধ্বনি ও হুলুধ্বনি চলছে ক্রমাগত সতীমায়ের জয়ধ্বনিতে চতুষ্পার্শ্বের শস্যশ্যামলা প্রান্তরের নৈঃশব্দকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে নদীতীরের চিতায় লেলিহান অগ্নিশিখা দাউ-দাউ জ্ঝলছে তার মধ্যে সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় প্রবেশ করছে এক প্রতিবাদী নারী

বিপুল জয়ধ্বনিতে ছাত্র পশ্চাতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই গুরুদেব বলে ওঠেনসর্বত্যাগীদের পিছনে তাকাতে নেই চরৈবেতি ... চরৈবেতি

জ্ঞানদাস সম্মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গেয়ে ওঠে

 

সুখেরও লাগিয়া যে ঘরও বাঁধিলুঁ

অনলে পুড়িয়ে গেল

অমিয়া সাগরে সিনান করিতে

সকলি গরল ভেল।।

(শব্দসংখ্যা : ২১০৯০)

 

 

তথ্যসুত্রঃ

বিদ্যাপতি চন্ডীদাস ও অন্যান্য বৈষ্ণব মহাজন গীতিকা -- সম্পা. চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

বৈষ্ণব পদাবলী -- সম্পাদকঃ হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

বৈষ্ণব মহাজন পদাবলী -- সম্পা. সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

দীপ্রকলম পত্রিকা, জ্ঞানদাস সংখ্যা -- সম্পা. প্রবীর আচার্য

অদ্যাপি কান্দরা গ্রামে জ্ঞানদাস কবি নামে -- ড. কালীচরণ দাস ও প্রবীর আচার্য

জ্ঞানদাসের পদাবলী

শেয়ার করুন: