Cover

KARKATKRANTI

একটু সময় থাকতেই বাড়ি থেকে বেরোলাম। আমার দেখা করার কথা বিকেল পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে। সাড়ে চারটে বাজতে না বাজতেই বেরিয়ে পড়লাম। ভাবলাম একটু আগে পৌঁছনোই ভালো, দেরি হলে যদি অন্য কোনও কাজে বেরিয়ে পড়ে রুমির হাজব্যান্ড। কী যেন নাম ওর! কেমন একটা হেলাফেলা মার্কা নাম, সহজে মনে থাকে না। ও! মনে পড়েছে, খেলারাম সরখেল। ছোটবেলায় দিনরাত খেলায় মত্ত থাকত বোধহয়! নামেও খেলা, পদবিতেও খেলা। খুব খেলোয়াড় ছেলে হবে হয়তো!

শেয়ার করুন:

একটু সময় থাকতেই বাড়ি থেকে বেরোলাম। আমার দেখা করার কথা বিকেল পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে। সাড়ে চারটে বাজতে না বাজতেই বেরিয়ে পড়লাম। ভাবলাম একটু আগে পৌঁছনোই ভালো, দেরি হলে যদি অন্য কোনও কাজে বেরিয়ে পড়ে রুমির হাজব্যান্ড। কী যেন নাম ওর! কেমন একটা হেলাফেলা মার্কা নাম, সহজে মনে থাকে না। ও! মনে পড়েছে, খেলারাম সরখেল। ছোটবেলায় দিনরাত খেলায় মত্ত থাকত বোধহয়! নামেও খেলা, পদবিতেও খেলা। খুব খেলোয়াড় ছেলে হবে হয়তো!

ধুর, ওসব ভেবে আমার লাভ কী! খেলোয়াড় ভাল কি মন্দ তা রুমি বুঝবে; আমার কী! আমার একটা কাজ পাওয়া নিয়ে কথা। রুমি বলেছে, ওর হাজব্যান্ডের সেন্টারে একটা ব্যবস্থা করে দেবে।

রুমির মুখে ‘সেন্টার’ কথাটা শনে ঝট করে আমার মনে এসেছিল ‘যোগা অ্যান্ড মেডিটেশন সেন্টার’-এর কথা। আমাদের পাড়াতে এটা। আমাদের বাড়ি থেকে তিনখানা বাড়ি পরেই। সেখান থেকে মাঝেসাঝে বিকট অট্টহাসির শব্দ শোনা যায়। বাড়ির পাশে মডার্ন সেলুনের হিপিদাকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম, যোগা সেন্টারে বয়স্ক মানুষগুলো ইচ্ছা করেই একসঙ্গে হা-হা করে হাসে। ওতে নাকি শরীরের রোগব্যাধি চলে যায়।

হাসি না পেলেও, ইচ্ছা করে কীভাবে হাসা যায় জানি না বাবা! হা-হা শব্দ করলেই কি তাকে হাসি বলা যায়! বাইরে পাঁচজনের সামনে হলে হয়তো ওরা ওভাবে হা-হা করতে লজ্জা পেত। যোগা সেন্টার বলেই...। আর ক’দিন পর হয়তো হাও-হাও করে কান্নাও শুরু করবে মনের ব্যাধি তাড়ানোর জন্য। এখন প্রায় সব মানুষেরই তো মনের ব্যাধি!

রুমি অবিশ্যি বলেছিল, ‘সেন্টার’ মানে মাসাজ সেন্টার। ওর হাজব্যান্ডের নিজের বিজনেস। ইউনিটটা হল ফুলবাগানে। নাম ‘র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টার’। জেন্টস ও লেডিসের জন্য দুটো আলাদা ডিভিশন আছে একই বাড়িতে। ওর হাজব্যান্ডকে বলে কয়ে ওখানেই একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেবে। ওই সেন্টারটার খুব নামডাক। হেব্বি চলে। সল্টলেক, নিউ-টাউনের বাবু-বিবিরা এই ‘র‍্যামস্পোর্ট’ বলতে অজ্ঞান।  

‘র‍্যামস্পোর্ট’ কথাটা এমনভাবে বলেছিল রুমি, আমি শুনেছি ‘ট্রান্সপোর্ট’। আমার বাবা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে কাজ করে তো; তাই ট্রান্সপোর্ট শব্দটা সড়গড় হয়ে আছে কানে। রুমি বলেছিল— ট্রান্সপোর্ট নয় রে, র‍্যামস্পোর্ট। ‘স্পোর্ট’ মানে  খেলাধুলো। ছোটবেলায় ইস্কুলে স্পোর্টস-য়ে নাম দিতিস না; সেই স্পোর্ট। বুঝলি না, খেলারাম নামটা কেমন গেঁইয়ামার্কা; ওটাই একটু কায়দা করে র‍্যামস্পোর্ট  করেছে। ইংরেজি নামের একটা গ্ল্যামার আছে। পয়সাওলা মানুষগুলো ইংরেজি নাম দেখে হেদিয়ে মরে। তাই...। 

‘বাব্বা! তোর বরের তো দারুণ ব্রেন!' বলতেই রুমি বলেছিল, ‘‘অ্যাই! ‘বর’ বলিস না, হাজব্যান্ড। ‘বর’ কথাটা কেমন সেকেলে। ও খুব মডার্ন জানিস! সব সময় জিন্স, টি-শার্ট, দামি সিগারেট। একটু আধটু ইংরেজিও বলতে পারে।’’

আমি থামিয়ে দিয়ে বলেছিলাম— থাক তোর বরের...স্যরি, তোর হাজব্যান্ডের গুণকীর্তন শুনে কাজ নেই। আমার কাজের ব্যবস্থাটা যদি করে দিতে পারিস তো দেখ। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই তোর একটা হিল্লে হয়ে গেল। কাজরিও বাস-কন্ডাকটর মন্টুদাকে বিয়ে করেছে। সুলেখা আর রত্না...।

হবে, হবে, তোরও ঠিক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তুই চিন্তা করিস না। এক কাজ কর। পরশু দিন তো শনিবার। ওইদিন বিকেল পাঁচটা সাড়ে-পাচঁটার মধ্যে চলে আয়। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্রাঙ্গুলার পার্কে দাঁড়িয়ে থাকব তোর জন্যে। ওইদিন রাম একটু ফ্রি থাকে।

ট্রাঙ্গুলার পার্ক তো গড়িয়াহাটের দিকে— সবিস্ময়ে বলেছিলাম আমি।

আরে ধেৎ, ওটা নয়। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি বেলেঘাটা সি.আই.টি. রোডেও একটা ট্রাঙ্গুলার পার্ক আছে। বেলেঘাটা মেন পোস্টাপিস ছাড়িয়ে ফুলবাগানের দিকে এগোবি। দেখবি ডানদিকে পড়বে একটা তিনকোনা পার্ক। বাচ্চাদের দোলনা, স্লিপার এসব আছে। ওই পার্কের গেট-য়ের সামনেই দাঁড়াবো আমি। এই নে, আমার মোবাইল নম্বরটাও রাখ। তেমন হলে ফোন করে নিস।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হল, ফোন-নম্বর লিখে রাখা বাসের পুরনো টিকিটটা নিয়েছি তো আবার! খুচরো পয়সা রাখার ছোট্ট ব্যাগটার চেন টেনে উঁকি মারলাম। এক কোণে ভাঁজ হয়ে লেপটে থাকা টিকিটটা বের করে দেখলাম। যাক, রয়েছে। না থাকলে খালপুল থেকে বাড়ি অবধি এতখানি পথ আবার হাঁটতে হত। 

আসলে হয়েছে কী, দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বাল্ব কারখানার কাজটা চলে যাওয়ার পর এই এক বদভ্যাস হয়েছে। দুপুরে তো কোনও কাজ থাকে না। খেলেই চোখ এঁটে আসে। হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই দেখি চারটে কুড়ি। তাড়াতাড়ি উঠে রেডি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছি। ফোন-নম্বর লেখা কাগজটার কথা তখন মাথায় আসেনি।

সত্যিই কাজটা আমার খুব দরকার। তিনমাস হল বাড়িতে বসা। ওদিকে সুলেখা আর রত্না ক্রিস্টোফার রোডে একটা ফ্যান কারখানায় কাজ জুটিয়ে নিয়েছে। আমিই শুধু...। কারখানাটা বন্ধ করে বক্সিবাবু জমিটা প্রোমোটারকে দিয়ে দিল। ব্যাটা বুড়ো লাখ-লাখ টাকা কামালো। আর আমরা শালা...। প্রমোটারটাও মালদার আছে। তিনমাস যেতে না যেতেই তিনতলা কমপ্লিট। শুনছি নাকি দশতলার ফ্ল্যাটবাড়ি হবে। কী যেন নাম দিয়েছে! ও হ্যাঁ, 'ডিউভিউ কমপ্লেক্স'।

ওই যে খালপুলের ওপর থেকে ডিউভিউ কমপ্লেক্সের মাথা দেখা যাচ্ছে। ছাতিমগাছটা না থাকলে ‘ডিউভিউ আন্ডার কন্ট্রাকশন’ লেখা বোর্ডটাও দেখা যেত। এদিকে এলেই ওটার দিকে চোখ যায়। ওখানে আগে লাগানো ছিল ‘বক্সি বাল্ব  কোম্পানি’র সাইনবোর্ড। তার জায়গায় এখন...। নয় নয় করে বছর খানেক কাজ করেছি ওই বাল্ব কারখানায়। একটু টান তো থাকবেই জায়গাটার ওপর। 

‘ডিউভিউ’ নাম শুনে ভেবেছিলাম কী নাম রে বাবা! জীবনে প্রথম শুনলাম। সি ভিউ, লেক ভিউ এসব শুনেছি। ময়লা খালের ধারে তো কমপ্লেক্সটা। ‘খাল ভিউ’ বা ‘ক্যানেল ভিউ’ নাম হতে পারত। তার জায়গায় কিনা ‘ডিউভিউ’।

ছোটকাকাকে নামটার মানে জিজ্ঞেস করতে, ছোটকাকা বলেছিল — ‘ডিউ ভিউ’ মানে শিশির দর্শন।

ওই ফ্ল্যাটে বসে নিশ্চয় শিশির দেখা যাবে। বুঝলি না সেই যে একটি ভাব সম্প্রসারণ আছে — দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা “দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু...। ওটার শেষ লাইনটা মনে আছে। ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শীষের উপর একটু শিশির বিন্দু’। ওই কনসেপ্টটা খাওয়ানোর জন্যই এমন নামরকণ।

আমি অবাক হয়েছিলাম। লোকে ফ্ল্যাটে বসে সমুদ্র দেখতে চায়, নিদেন পক্ষে লেক হলেও চলে। তাই বলে শিশির দেখার জন্যে...! পরে ভেবেছিলাম, পয়সাওলা লোকেরা সমুদ্র, লেক হামেশাই দেখে। শিশির দেখারই ফুরসত পায় না ওরা। ফ্ল্যাটে বসে যদি তা দেখে নিতে পারে! পরক্ষণেই মনে হয়েছিল, শিশির তো ভোরবেলায় দেখা যায় ঘাসে-পাতায়। বাবুদের খোয়ারি কাটিয়ে ঘুমই তো ভাঙে ন’টায়। তখন শিশিুর ফুরুৎ। তাছাড়া শিশির তো আর সারাবছর পড়ে না। ওই শরৎকালেই যা...!

ক্লাস থ্রি-তে পড়া কবিতাটা এখনও মনে আছে— ‘এসেছে শরৎ হিমের পরশ লেগেছে হাওয়ার ’পরে, সকালবেলায় ঘাসের আগায় শিশিরের রেখা ধরে...’। সারাবছর তো আর শিশির দেখা যাবে না! তাছাড়া ওখানে ঘাসই বা কোথায়! খালের জলে তো কচুরিপানা আর দু’ধারে কচুবন; কচুপাতায় কি শিশির জমে! তবুও নাম ‘ডিউভিউ’! পারেও বটে প্রমোটাররা!

রাসমনি বাজারের রাস্তাটা ধরেই আমি সি.আই.টি. রোডের দিকে এগোতে পারতাম। কিন্তু কারখানার জায়গাটা সত্যিই টানে। তাই চাউলপট্টি রোড ধরে ওদিকেই এগোলাম। একটু ঘুরপথ ঠিকই। কিন্তু হাতে তো সময় আছে। সবে চারটে পঞ্চাশ এখন। যদি ওখানে আর কেউ এসে থাকে। জায়গাটা শুধু আমাকে নয়, যে ক’জন ওখানে কাজ করতাম, সবাইকেই টানে। তাই তো আমরা প্রায়ই বিকেলে ওই ছাতিমগাছটার তলায় সিমেন্ট বাঁধানো চাতালটাতে আসি। নিজেদের সুখ-দুঃখ, ভালোমন্দর গল্প করি। গত বেস্পতিবার ওখানেই তো হঠাৎ দেখা হয়েছিল রুমির সঙ্গে। রিক্সায় চড়ে কোথায় যেন যাচ্ছিল। ওখানে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম, আমি, সুলেখা আর রত্না। সুলেখাই প্রথম দেখেছিল ওকে। 'অ্যাই রুমি...' বলে হাঁক পাড়তেই ও রিক্সা থামিয়ে নেমে এসেছিল। তারপর তো এটা-সেটা বলতে বলতে ওই কাজের কথা। 

রুমি যেভাবে বলল, মনে হয় কাজটা হয়ে যেতে পারে! ও চলে যাওয়ার পর রত্না বলল, 'গিয়েই দেখ না! হলেও হতে পারে কাজটা। আমাদের পাড়ার একটা মেয়েও কাজ করে ওখানে। শুনেছি ‘র‍্যামস্পোট’ দারুণ মাসাজ পার্লার।'

আমিও খোঁজ নিইনি তা নয়, কাল রাত্রিবেলা খাবার সময় ছোটকাকাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টারের কথা। ছোটকাকা কাঁচা পেঁয়াজে কামড় বসিয়ে বলেছিল— আমি তো কখনও যাইনি ওখানে। তবে, শুনেছি ওটা বেশ গর্জিয়াস। ফুল এ সি, মালদার পার্টিরা শরীরের ব্যথা মারতে যায়। আমার এক ছাত্রের বাবা যায় মাঝে সাঝে। ওর কাছে একদিন গল্প শুনেছি। তবে হেভি কস্টলি। আমার একদিন যাওয়ার ইচ্ছে আছে। যাক সে কথা। ওটার খোঁজে তোর কী দরকার? ওসব জায়গায় তোর না যাওয়াই ভালো।

ওখানে একটা কাজ পাওয়ার চান্স আছে। তাই মালিকের সঙ্গে দেখা করতে যাব কাল।

মালিক বাঙালি? চিনিস তাকে?

হ্যাঁ, বাঙালি। আমার এক বান্ধবীর হাজব্যান্ড।

কাজের ব্যাপার যখন, তখন যা। তবে সাবধান। পয়সাওলা লোকগুলো বেশির ভাগই পাজি হয়।

কাল রাতে ছোটকাকার বলা সাবধান-বাণীটা হঠাৎ মনে পড়ল। রুমির বর খুব বড়লোক বলে তো মনে হয় না। তাহলে কি আর রুমিকে বিয়ে করত! রুমি এমন কিছু ডানাকাটা পরি নয় যে, বড়লোক ওকে খাঁচায় পুরতে চাইবে। আমাদের সঙ্গেই তো বাল্ব কারখানায় কাজ করত। কারখানায় কাজে আসার পথেই লাইন হয়েছিল ওই খেলারামের সঙ্গে।

রুমি সেদিন কথায় কথায় বলল, আগে নাকি একটা সেলুন ছিল ওই মাসাজ সেন্টারটা। দু’জন ‘উড়ে’ নাপিত আর একটা চিনা মেয়ে চুল-দাড়ি ছাঁটত। চিনা মেয়েটা মেয়েদের চুল ছাঁটার সাথে সাথে চুল বাঁধারও কাজ করত। তারপর ওরই পরামর্শে সেলুন তুলে দিয়ে হল বিউটি পার্লার।

রুমি মাঝে মাঝে ওই বিউটি পার্লার থেকে মুফৎ-এ ভ্রূ-প্লাক, ফেসিয়াল করে আসত খেলারামের সঙ্গে ‘হাম-তুম’ খেলার সময়।

বিউটি পার্লার বেশ চলছিল। কিন্তু তার পাশে মিষ্টির দোকানটা চলছিল না। কায়দা করে টাকার টোপ দিয়ে ওই মিষ্টির দোকানটাও কিনে নিল রাম। দুটো দোকান মিলিয়ে, ভেঙেচুরে হল মাসাজ সেন্টার। ওটা করার পরেই কপাল খুলে গেল। রুমি ভ্রূ উঁচিয়ে, ঘাড় বেঁকিয়ে বলে, ওর পয়েই নাকি রামের এত বাড়বাড়ন্ত। ওর সঙ্গে প্রেম করার পর থেকেই কপাল খুলেছে। সে জন্যেই তো রাম প্রেম পাকতে না পাকতে ওকে বিয়ে করে ফেলল। যখন সেলুন ছিল, তখন নাকি হেভেন নার্সিংহোমের এক আয়ার সঙ্গে প্রেম করত রাম। সেলুন উঠে যেতে ওই আয়ার মায়া কাটিয়ে তার ছায়ায় জুড়োতে এল। তারপর তো...!

এখন বেশ সুখেই আছে রুমি। ওকে আর কোথাও কাজ করতে হয় না। মাঝে সাঝে মাসাজ সেন্টারের কাউন্টারে সেজেগুজে বসে। চেহারাটা আরও চেকনাই হয়েছে। তবে, ওর মনটা ভাল। কোনও অহঙ্কার-টহঙ্কার নেই। রাস্তায় দেখা হলেই কথা বলে। পরশু তো রিক্সা চড়ে যাচ্ছিল। সুলেখার ডাকে নেমে পড়ল। রিক্সা ছেড়ে দিয়ে ওদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। তাই তো কাজের খোঁজটা পাওয়া গেল। দেখা যাক আজ কী হয়!

পচাখালের ওপর কংক্রিট ব্রিজ থেকে পায়ে পায়ে কখন যে তৈরি হতে থাকা ‘ডিউ ভিউ’য়ের সামনে পৌঁছে গেছি। দেখি ছাতিমতলায় সুলেখা দাঁড়িয়ে। আমাকে আগেই দেখতে পেয়েছে ও। কাছে যেতেই বলে ওঠে— কী রে সীমা, কোথায় চললি হন হন করে? 

দাঁড়িয়ে পড়েছি আমি— তোর মনে নেই! আজ বিকেলে রুমির বরের সঙ্গে দেখা করার কথা। সেই কাজটার জন্য।

হ্যাঁ, সে তো সাড়ে পাঁচটায়। এখনও পাঁচটা বাজেনি। এত ব্যস্ত হওয়ার কী আছে! দু’দণ্ড দাঁড়া একটু আড্ডা মারি। তারপর যাস।

তুই এ সময় এখানে! আজ কাজে যাসনি?

হ্যাঁ, গিয়েছিলাম তো। আজ শনিবার না, চারটেই ছুটি। বাজার মন্দা, সামনে শীত আসছে তো! তাই আজ আর ওভারটাইম করালো না। ভাবলাম, তাড়াতাড়ি যখন ছুটিই হয়ে গেল, একবার আমাদের ঠেক ঘুরে যাই। তোদেরকেও খবরটা দিয়ে আসি।

কিসের খবর রে! তোর বিয়ের ঠিক হল নাকি?

ধুস! তোর শুধু বিয়ের ভাবনা। এই নে, এটা দেখ!

একটা ভাঁজ করা খবরের কাগজ আমার হাতে দিল সুলেখা। কাগজটা উল্টে পাল্টে বলি— কী দেখব এতে?

আরে! এই ছবিটা দেখ! চিনতে পারছিস?

আমি বোকার মতো তাকিয়ে আছি ছবিটার দিকে। সুলেখা বলে ওঠে— চিনতে পারছিস না! ওটা ঝুমুর।

আমার চোখে অবিশ্বাস— ঝুমুরের ছবি কাগজে ছাপতে যাবে কেন?

ভাল করে দেখ ওটা ঝুমুরই। আর ওর পাশে মুখে রুমালচাপা দেওয়া লোকটা ফোর্ট উইলিয়ামের এক মিলিটারি। নিচের খবরটা পড়, তাহলেই বুঝবি।

ছবিতে মেয়েটাকে খুঁটিয়ে দেখি আমি। শাড়ি-ব্লাউজ-পরা। কপালে একটা বড়-সড় টিপ। হাতে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ রয়েছে মনে হচ্ছে। হ্যাঁ, আমাদের ঝুমুরই।

ওর পেছনে আবছা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরি। পাশের ছবিটা মুখ ঢাকা এক পুরুষের। আমি ঝুমুরকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখিনি কখনও, তাই প্রথম দেখায় চিনতে পারিনি। বাল্ব কারখানায় ও কাজে আসত সালোয়ার কামিজ পরে। খবরের কাগজের ছবিটাতে শাড়ি-ব্লাউজ পরা ঝুমুরকে বেশ লাগছে। খবর পড়া বাদ দিয়ে ওকেই দেখতে থাকি আমি।

আমি এখনও শাড়ি পরা শুরু করিনি। মা বলে, আমাকে শাড়ি পরলে ভাল লাগে। একবার শাড়ি পরে একখানা ছবি তুলেছিলাম। আমার মামাতো দাদার ক্যামেরা আছে। ও একবার ক্যামেরা নিয়ে আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসেছিল।

মা বলেছিল, ‘যতু! সীমার একটা ছবি তুলে দিস তো ভালো করে। ও বড় হয়েছে এখন। বিয়ের যোগাযোগ করতে গেলে তো ছবি চাই।'

মা শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিল। মায়ের যা দু’একখানা গয়না আছে, তাই দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিল আমাকে। আমার চুল তো বেশ লম্বা! যতুদা বলেছিল শ্যাম্পু করা চুল খোলা রাখতে। ছবি তোলার সময় এলোচুল কাঁধের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে সামনে বুকের কাছে ঠিকঠাক রাখার অজুহাতে, যতুদা' দু’একবার হাত ঠেকিয়েছিল আমার বুকে। বুঝতে পেরেছিলাম, ইচ্ছে করেই যতুদা'...। লজ্জায় কিছু বলিনি।     

সেই প্রথম কোনও পুরুষ মানুষ আমার বুকে হাত দিল। শরীরে একটা শিহরণ খেলে গিয়েছিল। সেই মুহূর্তে কিছু না বললেও পরে মনে হয়েছিল যতুদা' ভীষণ অসভ্য। আর কোনও দিন ওর কাছাকাছি যাব না। ওর সামনে দাঁড়াব না। তবু কেন যে মাঝে সাঝে যতুদা'র তোলা ছবিটা লুকিয়ে বের করে দেখি। আর সে দিনটার কথা মনে পড়ে। মনে হয়, যতুদা'  আবার আমাদের বাড়ি বেড়াতে এলে বেশ হয়। হলেই বা মামাতো দাদা! সেবার বলেছিল আমাকে ভিক্টোরিয়া বেড়াতে নিয়ে যাবে। কী কারণে যেন যাওয়া হয়নি।

আচ্ছা! কাগজের ছবিতে ওই মুখঢাকা লোকটা ঝুমুরের মামাতো দাদা নয় তো! হয়তো ওকে ভিক্টোরিয়া বেড়াতে নিয়ে গেছে!

সুলেখা আমার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে ওঠে— কী রে, পড়লি খবরটা?

আমি তড়িঘড়ি খবরটা পড়ার চেষ্টা করি। খবরের হেডলাইন— ‘রক্ষকই ভক্ষক’।

এ কী খবর রে বাবা! ঝুমুরের ছবি কাগজে ছাপাটাই এক আশ্চর্য ব্যাপার! রাজনৈতিক নেতা, আর নয় তো সন্ত্রাসবাদীদের ছবিই কাগজে ছাপে বেশি। ঝুমুর তো ও দুটোর কোনওটাই নয়। তবে কি ও নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে! সাধারণ মানুষের ছবি টাকা নিয়ে কাগজওলারা ছাপে, সে নিরুদ্দেশ হলে বা জ্যোতিষী হলে। খবরের খুদে খুদে লেখাগুলো আমি পড়া শুরু করি— ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল সংলগ্ন ময়দান এখন ক্রমশঃ দেহপসারিনীদের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। দুপুর পেরোতে না পেরোতেই কপোত-কপোতিরা জোড়ায় জোড়ায় গাছের তলা কিংবা বেঞ্চিগুলো দখল করে...।

খবরটা পড়া শেষ হয় না। তার আগেই সুলেখা চিৎকার করে ওঠে— আরে, ওই তো ঝুমুর আসছে।

চোখ তুলে দেখি সত্যিই ঝুমুর আসছে। ও একা নয়, ওর সঙ্গে রত্নাও রয়েছে। রোজ যে চুড়িদার-সেট পরে বাল্ব  কারখানায় কাজে আসত; সেই বেগুনি রংয়ের সেট-টাই ঝুমুর পরেছে আজ। কপালে বড়সড় একখানা টিপ।

ওই খবরের কাগজে ছাপানো টিপটাই বোধহয়! ওর চোখে মুখে কোনও মালিন্যের ছাপ নেই। হাসি হাসি মুখে এগিয়ে আসছে আমদের দিকে। মাজা মাজা গায়ের রঙ হলেও, ওই চুড়িদার, ওই টিপ, হাসি হাসি মুখ আর পড়ন্ত রোদ্দুরে ওকে বেশ ভাল লাগছে। আসলে, ওর মুখের গড়নটাই এমন, সব সময় ওকে হাসিখুশি দেখায়। কোনও দুঃখ-কষ্ট ওর মুখে তেমন ছাপ ফেলে না।

আজ খবরের কাগজে ওর ছবি বেরোনোতে খুশি খুশি ভাবটা যেন বেশি করে মুখে ফুটে উঠেছে। রত্না ওর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে কী বলতে বলতে আসছে, এখান থেকে শোনা যাচ্ছে না। বক বক করেই চলেছে।

আসলে রত্না একটু বকে বেশি। কোনও ধুয়ো পেলে তো আর কথাই নেই, অনর্গল বকে যাবে। ঝুমুরের ছবি বেরোনোর খবরটা জেনেছে বোধহয়, তাই ঝুমুরের বাড়ি ছুটেছে। ওর আবেগ অন্যের চেয়ে বেশি। কোনও আনন্দের খবরে যেমন হই হই করে ওঠে, তেমনি অল্প দুঃখতেই চোখদুটো জল থইথই হয়ে ওঠে। এর জন্যে বাল্ব কারখানার মালিক বক্সিবাবুর কাছে কত যে বকুনি খেতে হয়েছে ওকে!

আমি সুলেখাকে জিজ্ঞেস করি— হ্যাঁ রে, রত্না আজ কাজে যায়নি?

না রে! ও মাঝে মাঝেই কামাই করে। আজ শনিবার, হাফ-ডে ফুল মজুরি, তবুও যায়নি। 

জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘রোজ রোজ ওই তামার তার জড়াতে ভাল লাগে না।’ তুই বল সীমা, এটা কোনও কথার কথা! ওটাই তো তোর কাজ, রোজই তো তা করতে হবে! অফিস-কাছারিতে কলম পেশার কাজ তো তুই পাসনি! কে বোঝাবে ওকে সে কথা। কাজে না গেলে যে ‘রোজ’ কাটা যায়, ‘হপ্তা’ শেষে কম টাকা আসে হাতে; সে হুঁশ নেই। এদিকে কাঁদুনি গাইবে, ছোটবোনটার একটা ফ্রক কেনা খুব দরকার, ফাটাফুটো দিয়ে শরীর বেরিয়ে পড়ছে। এ হপ্তায় বাবার ওষুধ কেনা হয়নি। যত্তসব...!

আমি বলি, ওর আর দোষ কী! বাবার তো ওই অবস্থা! কোনও আয় করে না, তার পেছনেই গুচ্ছের টাকা খরচ হচ্ছে। বোন আর ভাইটা ইস্কুলে যায়। তার একটা খরচ আছে। ওর মা পরের বাড়ি রান্নার কাজ করে আর ক’টাকা পায় বল!

সুলেখা তেতে ওঠে, আমিও তো সে কথাই বলছি। যার ঘরে এত অভাব, যার মাথায় এত দায়িত্ব, সে কিনা কাজ কামাই করে ঘরে বসে থাকবে! ঘরে বসে থাকলে টাকা আসবে! এই যে ড্যাং-ড্যাং করে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, খবরের কাগজে ঝুমুরের ছবি দেখে ওর বাড়ি দৌড়চ্ছিস, তাতে সময় যাচ্ছে না! এই সময়টুকু কারখানায় কাটালে তো কটা টাকা আসত! আদিখ্যেতা দেখে বাঁচি না। তাও যদি কোনও ভাল কাজ করে ছবি ছাপা হত ঝুমুরের!

কেন রে! ঝুমুর খারাপ কাজ কী করেছে?

কাগজটা দিলাম, খবরটা তো পড়লি না ভাল করে! পড়লেই বুঝতিস। আমাদের সবারই মুখ পুড়িয়েছে ও। অথচ দেখ মুখে কেমন খুশি খুশি ভাব!

সে কী! কী করেছে ও?

এসেই তো পড়েছে। ওর মুখ থেকেই শোন, ও কী করেছে।

ঝুমুরের ব্যাপারটা জানার খুবই আগ্রহ আমার। কিন্তু ওদিকে সিআইটি রোডে ট্র্যাঙ্গুলার পার্কের গেটের সামনে রুমি দাঁড়িয়ে থাকবে। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে পৌঁছতেই হবে। তা না হলে ও আবার রেগে যাবে, কাজটা হয়তো পাওয়া যাবে না। আমি বলি, আমার আর দাঁড়ালে চলবে না বুঝলি সুলেখা। পাঁচটা বেজে গেছে।

ঘটনাটা শুনে গেলে পারতিস। কাগজে তো সব ঠিকঠাক লেখে না। তাছাড়া...।

ঝুমুর আর রত্না ইতিমধ্যে আমাদের কাছে চলে এসেছে। আমরা কিছু বলার আগেই ঝুমুর হেসে বলে— কী রে, কী খবর তোদের?

সুলেখা বলে ওঠে— আমাদের আর কী খবর হবে! খবর তো তোর। এই যে!  

আমার হাত থেকে কাগজটা ফস করে টেনে নিয়ে ঝুমুরের সামনে মেলে ধরে সুলেখা।

ঝুমুর মিটিমিটি হেসে কাগজটা টেনে নেয় সুলেখার হাত থেকে। ছবিতে আলগা চোখ বুলিয়ে বলে— তোদেরও চোখে পড়েছে ছবিটা?  

রত্না তড়বড় করে বলে ওঠে— আমি তো টিভির ‘জবর খরব’-এ দেখলাম। আজ কাজে যাইনি। বাবাকে নিয়ে ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতালে গিয়েছিলাম। ওখানে ওয়েটিং রুমে বসে রয়েছি। চলতে থাকা টিভিটাতে হঠাৎ দেখি ঝুমুরকে। ওর পাশে একটা ইয়াং ছেলে। ঝুমুরকে টাকা না কী যেন দিল মানিব্যাগ খুলে। তারপরেই তো ওদের মুখে আলোর ঝিলিক পড়ল, ছবি তোলার ফ্ল্যাশের আলোর মতো। সঙ্গে সঙ্গে ইয়াং ছেলেটা মুখে রুমাল চাপা দিয়ে ফেলল। টিভির সাউন্ড খুব কমানো ছিল বলে খবরটা শুনতে পেলাম না।

পর্দায় এক ঝলক দেখলেও আমি ঠিক চিনেছি ওটা ঝুমুর। বাড়িতে বাবাকে পৌঁছে দিয়েই ছুটেছি ঝুমুরের বাড়ি। ওর কাছে সব শুনেটুনে ওকে ধরে আনলাম তোদের কাছে।

আমার মন ছটফট করছে চলে যাওয়ার জন্যে। পাঁচটা পেরিয়ে গেছে। আমি যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই রত্না বলে ওঠে—  কী রে, তোর আবার কী হল! চলে যাচ্ছিস যে!

তুই তো জানিস রত্না, রুমি আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে ট্র্যাঙ্গুলার পার্কে। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে পৌঁছতেই হবে রে! কাজটা আমার না পেলেই নয়!

তা বলে ঝুমুরের কেসটা ওর মুখ থেকে না শুনেই চলে যাবি! রুমিকে একটা ফোন মেরে দে না। সেদিন তো মোবাইল নম্বর দিল তোকে। বল, যেতে আধঘন্টা দেরি হবে, জরুরি কাজে ফেঁসে গেছিস।

আমি আমতা আমতা করি— মানে ফোন, আমার কাছে তো...!  

রত্না বলে ওঠে— আরে, এই তো ঝুমুরের মোবাইল আছে। এটা থেকে একটা ফোন মেরে দে। নম্বরটা আছে না হারিয়েছিস! তুই চিরদিনের কেবলিই রয়ে গেলি!

কলোনির মেয়ে আমি। পড়াশুনাও করেছি কর্পোরেশনের ইস্কুলে। তবুও আমি যেন অন্যান্য মেয়েদের থেকে একটু আলাদা। ম্যাদামারা গোছের। কলোনির অন্যান্য মেয়েরা বেশ ডাকাবুকো, ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ টাইপের। কেউ কোন বেফাঁস কথা বললেই হয়েছে, হাতে না মারলেও কথার তোড়ে আধমড়া করে দেয় তাকে। সে তুলনায় বরাবর আমি কম কথা বলি। একটু আধটু অন্যায়ও সহ্য করে নিই। 

স্কুলেও আমায় সবাই ছিঁচকাদুনে বলে রাগাত। অল্প কিছুতেই কেঁদে ফেলতাম যে! লেখাপড়ায় তেমন ভাল ছিলাম না। তবুও মাস্টারমশাইরা আমাকে খুব ভালবাসতেন আমার শান্ত স্বভাবের জন্য। কোনও কোনও বিষয়ে দু’একবার ফেল করলেও একক্লাসে কখনও দু’বছর থাকিনি। গড়িয়ে গড়িয়ে ক্লাস টেন অবধি উঠে গেলাম। টেস্টেও এলাও হয়ে গেলাম। কিন্তু মাধ্যমিকের সিঁড়িটা আর টপকাতে পারলাম না। ইংলিশে ব্যাক পেলাম। মা বলল, ‘আর পড়তে হবে না, অনেক হয়েছে। যতই পাশ দাও, বিয়ের পর সেই খুন্তি নাড়া আর কচি ছেলের কাঁথা-কানি কাচা, এসবই করতে হবে। আমাদের মতোন ঘরে তো আর মাস্টার-ডাক্তার, উকিল-মোক্তার জুটবে না! সেই খেটে খাওয়া মজুর-মিস্ত্রি ধরেই দিতে হবে।’

অনেক ছোট থেকেই মায়ের মুখে শুনে আসছি আমার বিয়ের কথা। শুনে বেশ রাগ হত আমার। মা হয়তো আমাকে থালা বাসন ধুতে পাঠিয়েছে কর্পোরেশনের কলে। পেছনে অনেক লাইন থাকায় তাড়াহুড়োতে ভালোমতো ধোয়া হয়নি। ব্যস! মায়ের চিৎকার শুরু, ‘কাজের কী ছিরি! শ্বশুরবাড়ি গিয়ে এমন কাজ করলে কপালে মুড়ো ঝাঁটা জুটবে।’ 

তখন আমার কতই বা বয়স! ক্লাস সিক্সে পড়ি। মেয়েলি ব্যাপার স্যাপারগুলোও শরীরে প্রকট হয়নি। মায়ের কথাবার্তা শুনে তখন ভাবতাম, মেয়েদের জন্ম বোধহয় শ্বশুরঘর করার জন্যেই। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বাসন মাজা, রান্না করাটাই মেয়েদের কাজ। সে জন্যেই ছেলেরা মেয়েদেরকে বিয়ে করে। তখন এর বেশি ভাবার মতো জ্ঞান আমার হয়নি।

ক্লাস সেভেনের হাফ-ইয়ারলি দেওয়ার কয়েক দিন আগে প্রথম ঋতুমতি হয়েছিলাম আমি। ব্যাপারটা সম্পর্কে ঠিকঠাক ধারণাও ছিল না। আসলে আমি কম কথা বলার জন্য পাড়ায় বা ইস্কুলে আমার বন্ধু কম ছিল।  

ক্লাসে অনেক বড় বড় মেয়ে থাকলেও আমার সঙ্গে ওসব বিষয়ে আলোচনা করত না। ওদের কাছে আমি যেন অনেক ছোট, তাই পাত্তা পেতাম না। ফলে কারুর কাছে ও ব্যাপারে জানাও সম্ভব হয়নি। সে কারণে বিচ্ছিরি ঘটনায় পড়তে হয়েছিল আমাকে।

তখন সেভেনের হাফ-ইয়ারলি আর মাত্র পাঁচদিন দেরি। ভালো করে পড়তে হবে। বিশেষত ইতিহাসটা। ওই বিষয়টা যতই পড়ি, কিছুই মনে থাকে না। বাবা বলে, ভোরবেলায় উঠে পড়া করলে মনে থাকে ভালো। সে চেষ্টাই করছি ক’দিন ধরে। কিন্তু বিধি বাম। ভোরবেলা ওঠার জন্যেই হোক, আর যে কারণেই হোক, ঠিক ওই সময়েই আমার শরীর খারাপ হল। হালকা জ্বর, তলপেটে, কোমরে আর পায়ের গুলিগুলোয় বেশ যন্ত্রণা। কিন্তু পড়তে না বসেও উপায় নেই। সামনে পরীক্ষা। সন্ধেবেলা ছোটকাকার কাছে অংক কষছি। প্রায় সব অংকই ভুল হচ্ছে।

ছোটকাকা রেগেমেগে দু’একটা চড়-থাপ্পড়ও দিচ্ছে। হঠাৎ আমার তলপেট কনকনিয়ে উঠল। ‘ছোট বাইরে’ পেয়েছে মনে হল। উঠে বাথরুমে বসতে গিয়ে দেখি, আমার ইজের রক্তে ভেসে গেছে। প্রচণ্ড ভয়ে আমি তো ‘মা’ বলে চিৎকার করে উঠি। তারপর শুরু করি কান্না।

মা অবশ্য ততক্ষণে ছোটকাকার কাছে খবরটা জেনে ফেলেছে। কারণ আমি যেখানে বসে অংক কষছিলাম সে জায়গাটাতে রক্তের ছোপ পড়েছে। মা বাথরুমে গিয়ে আমাকে সব বুঝিয়ে শুনিয়ে দিল। সবশেষে বলল, 'কেবলি মেয়ে কোথাকার! কিচ্ছু বোঝে না! তুমি এখন বড় হয়েছ!'   

মায়ের মুখে ওই ‘কেবলি’ সম্বোধনটা আমার খুব ভালো লেগেছিল সেদিন। মনে হয়েছিল, দুম করে আমি হঠাৎ বড় হয়ে গেলাম। সেই থেকে কেউ আমাকে 'কেবলি' বললে মোটেও রাগ হয় না। যদিও সে ঘটনার পর অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। আমার জ্ঞান-বুদ্ধিও বেড়েছে। 'কেবলি' বলতে যা বোঝায়, তা আমি নই। তবুও ‘কেবলি’ সম্বোধনটা আমার কেন যে এত ভালো লাগে! যে বলে, তাকে তখন খুব কাছের বলে মনে হয়। তার কোনও কথার অবাধ্য হতে ইচ্ছে করে না।

তাই রত্না আমাকে ‘কেবলি’ বলতেও আমার রাগ হল না। আমি ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে রুমির মোবাইল নম্বর লেখা কাগজটা বের করছি। তার আগেই ঝুমুর বলল— আমার ফোনটাতে শুধু ফোন আসে। এটা থেকে ফোন করা যায় না। ‘টাকা ভরা' নেই। 

আমি বেশ বিপাকে পড়লাম। সাড়ে পাঁচটা প্রায় বাজতে চলল। এখন জোরে পা চালিয়ে গেলেও হয়তো সাড়ে পাঁচটার মধ্যে পৌঁছতে পারব না ট্র্যাঙ্গুলার পার্ক।

আমি কী করব ভাবছি। রত্না বলে উঠল— এত চিন্তায় পড়ার কী আছে, আজ না হয় কাল যাবি। ঝুমুরের কেসটা শুনে যা। নাকি বল ঝুমুর। আজ খবর তো তোরই। এই যে...!

ঝুমুর মুখ খোলে— হ্যাঁ, হারামি পুলিশ দুটো ‘প্লেন ডেসে’ ছিল বুঝতে পারিনি। রিপোটার মালটাকে আমি চিনি। কোন এক বিদেশিনী ময়দানে রেপ হওয়ার পর থেকে, পকেটে ক্যামেরা ঢুকিয়ে মালটা ওই অঞ্চলেই ঘোরাফেরা করে। আমার দিকে আড়চোখে তাকায় মাঝে মাঝে। ও যে দুম করে আমার ফটো খিঁচবে জানব কী করে! তবে পরে বুঝলাম, টার্গেট আমি ছিলাম না। পুলিশ দুটোর টার্গেট ওই ফৌজি মাকড়াটা। আর রিপোটারের টার্গেট ছিল পুলিশদুটো। জানিস তো, ফৌজিগুলোর ওপর পুলিশের খুব রাগ। একবার এক ফৌজির বেলেল্লাপনার জন্যে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ফৌজিরা থানায় ভাঙচুর চালিয়ে ছিল মনে আছে? সেই থেকে পুলিশ ফৌজিদের ওপর খচে আছে। আর রিপোটার-পুলিশ তো চিরদিনই সাপে-নেউলে। পুলিশের ঘুষ খাওয়ার ছবি ছাপে যে শালারা!

রত্না চোখ গোল গোল করে বলে— আর ওই টিভি রিপোটারটার কথা বল।   

ঝুমুর বলে— ওটা হারামির হাড়। ওই সি.আই.টি. বিল্ডিং-এ থাকে। আমার সঙ্গে লাইন মারার চেষ্টা করেছে কিছুদিন। আমি পাত্তা দিইনি। সেই থেকে আমার ওপর রাগ। তোরাই বল, পাড়ার পয়সাওলা বাড়ির ছেলে। ‘জবর খবর’ টিভিতে কাজ করে। ও কি আমাকে কোনওদিন বিয়ে করবে! ক’দিন লাইন মারবে। চা খাবে তারপর ভাঁড় পেলে দেবে। ওর মতলব কি আমি বুঝি না! ওসব ‘মুরগী পোষা ভালোবাসায়’ আমি নেই। অতই যদি শরীরের খিদে তো 'পয়সা ফেকো, তামাশা দেখো’। বদের ধাড়ি ওটা। যেখানে যত রগরগে খবর, সেখানেই ওর তোলা ছবি। মহা ঢ্যামনা শালা!

সুলেখা অধৈর্য্য হয়, তো, কী করল তোকে ওই ছেলেটা?

আরে, ও কিছু করেনি। ফৌজিটার সঙ্গে আমার কনট্যাক হয়েছিল দুশো টাকার।

মাত্তর দশ মিনিট, যা হবে ওপরে ওপরে। কাজের সময় কেউ ডিসটাব করেনি। কাজ হয়ে গেলে আমার পাওনাগণ্ডা মেটানোর সময় প্লেন ডেসের খোচর দুটো হাজির।

আমি অস্ফুটে বলে উঠি— ‘কাজ হয়ে গেলে’ মানে! কী কাজ?  

রত্না থামিয়ে দেয় আমাকে— নেকু, কী কাজ বোঝ না! কেবলি কোথাকার! পরে বুঝিস, এখন শোন। তারপর কী হল ঝুমুর?

তারপর আর কী! আমার সঙ্গে লেনাদেনা দেখে গন্ধ পেয়েছে পুলিশ! ওই রিপোর্টার ছোঁড়াটাই বোধ হয় ডেকে এনেছে ও দুটোকে। সে দেখি ক্যামেরা বাগিয়ে পুলিশের পাশেই দাঁড়িয়ে।

এই মওকায় ফৌজি মাকড়াটাকে গেলে মাল কামানোর ধান্ধা পুলিশ দুটোর। ফৌজিটাও সেয়ানা। মানিব্যাগে বেশি টাকা রাখেনি।

কিন্তু খোচর দুটো দশ-বিশে কিছুতেই পটলো না। শেষে কেস খাওয়ার ভয়ে মোজার ভেতর থেকে পাঁচশো টাকার নোট বের করে দিল। এই ঘুষ খাওয়ার সিনটাই ক্যামেরাতে ফাস্টে তুলেছিল ওই রিপোর্টার। সেটা যে কেন ছাপল না কাগজে! বোধহয় ঘুষখোর পুলিশ খবরটা না ছাপানোর জন্য ঘুষ দিয়েছে রিপোর্টারকে। ওদিকে ক্যামেরার আলো মুখে পড়তেই সেয়ানাটা মুখে রুমাল চাপা দিয়েছে।

সুলেখা তড়িঘড়ি বলে ওঠে— হ্যাঁ রে, তুই তো সেই সুযোগে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটা ঢেকে ফেলতে পারতিস!

ঢেকে কী হত! তোরা ছাড়া আমাকে আর ক’জন চেনে! তাছাড়া আমাকে মুখ দেখিয়েই টাকা কামাতে হয়। মুখ ঢেকে লাভ কী! বরং কাগজে ছবি ছাপানোয় ফোকটে অ্যাড হয়ে গেল আমার। রসের নাগরগুলো সন্ধেবেলায় ভিক্টোরিয়ার মাঠে এখন এই মুখখানা খুঁজবে।  

ঝুমুরের কথাগুলো শুনে ওর কাজ-কারবারটা আঁচ করেছি আমি। ভেবে পাচ্ছি না কী বলব ওকে। ওর ওপর কেমন একটা ঘেন্না ও রাগ হচ্ছে। কিন্তু আমার মুখে কোনও কথা জোগাচ্ছে না। আমি ঝুমুরের মুখের দিকে বোবা দৃষ্টিতে তাকাই। ওর মাথার ঠিক পেছনে ডুবন্ত সূর্যটা। তাই ওর মুখখানাতে আবছায়া। মুখখানা কিছুটা অস্পষ্ট হলেও ওর মনটা আমার কাছে বাল্বের কাচের মতোন স্পষ্ট। ভেতরের ফিলামেন্ট দেখতে পাওয়ার মতো ওর মনটাও আমি দেখতে পাই। আমি জানি, ও এ-রকমই। কোনও ঢাকঢাক গুড়গুড় নেই, যা বলে সোজাসাপটা। এ জন্যে ওকে আমার ভালো লাগে। ওর ওপর তেমন রাগতে পারি না।   

বক্সিবাবুর বাল্ব কারখানায় আমরা যে কটা মেয়ে কাজ করতাম, তার মধ্যে ঝুমুরই আমার সবচেয়ে প্রিয়। কারখানায় প্রথমদিন কাজে গিয়ে ওর সঙ্গেই প্রথম আলাপ হয়েছিল। ও-ই যেচে আলাপ করেছিল আমার সঙ্গে। লাল, হলুদ, নীল, সবুজ কাচের বলগুলোর মধ্যে কীভাবে ফিলামেন্টটা সেট করতে হয়, দেখিয়ে দিয়েছিল হাতে ধরে। কাজের সুবিধা-অসুবিধা বুঝিয়ে দিয়েছিল। সবশেষে আশ্বাস দিয়েছিল, 'এমন কিছু আহা মরি কাজ নয়, দু’দিনেই শিখে যাবি তুই!'      

তুমি-টুমি নয়, প্রথমদিনেই ‘তুই’। ওকে আমি প্রথমদিন ‘তুই’ বলতে পারিনি, কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। আমার চেয়ে বড়ই হবে। শুনলাম বছর দুয়েক আগে থেকে ও ওখানে কাজ করে। ও নাকি বক্সিবাবুর খুব প্রিয়! কাজের শেষে দু’জনে একসঙ্গে  কারখানা থেকে বেরিয়েছিলাম। ও ফুচকা খাইয়েছিল। শালপাতার ঠোঙায় ফাউ নেওয়া তেঁতুলজলে সুরুৎ করে টান দিয়ে ঝুমুর বলেছিল, "সীমা, তুই দেখতে শুনতে মন্দ নোস। রঙখানা কটা। গায়ে-গতরেও দেখছি ভরভরন্ত। একটু সাবধানে থাকিস। বক্সিবাবুটা একটু ছুকছুকে আছে। মালের ফিনিশিং দেখার নাম করে কখন গালের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে তার ঠিক নেই। একবার তো ‘কেলো’ করেছিল। জলি নামের একটা মেয়ে কাজ করত এখানে, তুই দেখিসনি। হেব্বি ডেস দিয়ে আসত। জিনসের প্যান্ট, টাইট গেঞ্জি। বুক দুটোও খুব বড়বড় ছিল। পুরুষ মানুষ কোন ছাড়, আমরাও ওর বুকের দিকে না তাকিয়ে পারতাম না। আর বক্সিবাবু তো ঘুরত ফিরত আর ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াত। মালের ফিনিশিং দেখার নাম করে ওর বুকের খাঁজ দেখত। তো একদিন হয়েছে কী, ছুটির সময় পেরিয়ে গেছে। আমরা মাল ‘বুঝ’ দিয়ে হাত-ফাত ধুয়ে বেরিয়ে এসেছি। জলির তখনও হয়নি। স্টোরে মাল বুঝ দিতে গেছে। ব্যস, ঢ্যামনাটা ওকে জাপটে ধরে বুকে খাবল মেরেছে। ভেবেছিল, ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে দেখলে কিছু বলে না যখন...। কিন্তু জলি মেয়েটা আমাদের মতো হেলে সাপ নয়। জাত কেউটে। হাতে কামড় মেরে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে। ছাতিমতলায় ছিল পাড়ার মস্তান বোম-রতন আর ওর সাঙ্গপাঙ্গরা। ওরা অবিশ্যি জলির ‘সাইজ’ দেখার জন্যই আমাদের ছুটির সময় ওখানে আড্ডা মারত। ওদেরকে গিয়ে জলি বক্সিবাবুর ঢ্যামনামির কথা বলতেই, ওরা তো হাতে পেয়ে গেছে ‘সোনে কা আন্ডাবালি বত্তক’। মোটা মাল খিঁচেছিল বক্সিবাবুর কাছ থেকে। সে জন্যে মালিক মালটাকে একটু এড়িয়ে চলি, দেখিস না।"

তাহলে যে তখন বললে, বক্সিবাবুর খুব কাছের লোক তুমি!

এই মেয়ে! তুমি-টুমি ছাড়, ‘তুই’ বল তুই! আমরা বন্ধু।

ঠিক আছে আজকের দিনটা ‘তুমি’ বলি; কাল থেকে ‘তুই’ বলব। যা বলছিলে বল!

কী আর বলব, আজ প্রথমদিন তোর, মালিকের প্রতি তোর মনটা বিষিয়ে দিতে চাই না। আমাকে ও এমনি এমনি কাছের লোক বলে না, অনেক ব্যাপার আছে। সেসব তোকে পরে বলব একদিন।

প্রথমদিনের আলাপে যে ঝুমুর বলেছিল বক্সিবাবুর বাজে স্বভাবের জন্য ওকে এড়িয়ে চলে; সে কিনা এধরনের কাজে নামতে পারে! আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তাই আমি কেমন চুপচাপ হয়ে যাই। ঝুমুরের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতে থাকি শুধু।

ঝুমুরের ছবি-কাহিনি শুনে আমি কোনও মন্তব্য করছি না দেখে রত্না বলে ওঠে— কী রে, তুই এখনও বুঝতে পারিসনি ঝুমুর কী করে!

আমি কিছু বলার আগেই সুলেখা তেতে ওঠে— না বোঝার কী আছে! আমরা কি কচি খুকি নাকি! শেষে তুই লাইনে নামলি ঝুমুর! আর কোনও কাজ পেলি না!

আমিও বেশ ক্ষোভের সঙ্গে বলি— সত্যি ঝুমুর, তোর কি লাজ-লজ্জা, মান-ইজ্জত...!  

আমার কথা থামিয়ে ঝুমুর ম্নান হাসে— ওসব তোদের জন্য রে! মা বক্সিবাবুর সঙ্গে ধরা পড়ার পর ওসব ধুয়ে মুছে গেছে। তাছাড়া ওসবে কি পেট ভরবে! মায়ের এখন আর গ্ল্যামার নেই। বক্সিবাবু ফক্সিবাবু কেউ আসে না। সংসারটা তো চালাতে হবে।

ঝুমুরের কথার মাথামুণ্ডু ঢোকে না আমার মাথায়। ‘মা বক্সিবাবুর সঙ্গে ধরা পড়া-টড়া’ কীসব বলে যাচ্ছে অনায়াসে। মায়ের সম্পর্কে কোনও মেয়ে এমন কথা বলতে পারে, আমি ভাবতেও পারছি না। তাছাড়া ওর মা... বক্সিবাবু... আমার কেমন সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। তবে কি ঝুমুরের মা কোনও বাজারে মেয়েছেলে! নাঃ! তাহলে তো ‘ধরা পড়া’ শব্দটা বলত না ঝুমুর। তবে হওয়াটাও আশ্চর্যের নয়। তা না হলে মেয়ে কি আর বুক ফুলিয়ে বলে, ‘আমাকে মুখ দেখিয়েই টাকা কামাতে হয়। রসের নাগরগুলো সন্ধেবেলায় ভিক্টোরিয়ার মাঠে এ মুখখানা খুঁজবে।’ ভেতরে ভেতরে ঝুমুরের ওপর আমার কেমন রাগ হয়।

কড়া কথা শোনাতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে লাগাম টেনে বলি— তুই তো সুলেখা, রত্নার মতো ফ্যান কারখানায় কাজ নিতে পারতিস। তা না নিয়ে এই সব নোংরা কাজ...!

ঝুমুর একটু বিরক্ত যেন— তুইও তো কাজ পাসনি সীমা! তুই নিয়ে নে না ওই ফ্যান কারখানার কাজটা! তুই তো আমার মতো এসব কাজ পারবি না। তোদের ওইসব লাজ-লজ্জা, মান-ইজ্জত, আরও অনেক কিছু আছে। আমি যা করছি ঠিক করছি। ফুটপাতের মেয়েছেলের আবার লাজ-লজ্জা কী রে!

ঝুমুরের কথায় আমি একদম চুপ হয়ে যাই। জানি, ঝুমুরের বুকের ভেতর অনেক আগুন জমে আছে। হয়তো আমি সেই আগুনে অজান্তেই খোঁচা দিয়ে ফেলেছি। কিছুটা তাপ তো ছড়াবেই। ঝুমুর যতই নিজেকে হীন ভাবুক, ও যে ফুটপাতের মেয়ে নয়, তা আর কেউ না জানুক আমি জানি। প্রথম দিন মালিকের প্রতি মন বিষিয়ে দিতে না চাইলেও পরে একদিন আমাকে বলেছে ওই বক্সিবাবুর কীর্তি-কাহিনি।

ওই বাল্ব তৈরির কারখানাটা প্রথমে শুরু করেছিল ঝুমুরের বাবা আর ওই বক্সিবাবু মিলে। দু’জনে ব্যবসার পার্টনার। ঝুমুরের বাবা কারখানা সামলাতো আর বক্সিবাবু দেখত বাইরের কারবার। মালের অর্ডার নেওয়া, সাপ্লাই দেওয়া, পেমেন্ট আনা এইসব। নিজেদের কোনও ‘ব্র্যান্ড’ নেই। অন্য নামী কোম্পানিকে ফিনিশ করা মাল সাপ্লাই দিত। বেশির ভাগই নাইট ল্যাম্প। তারা নিজেদের স্ট্যাম্প লাগিয়ে মার্কেটে পাঠাত। বেশ চলছিল কারবার।

একদিন হয়েছে কী, চাউলপট্টি রোড এলাকায় কেবল ফল্ট হয়েছে। কখন কারেন্ট আসবে ঠিক নেই। কারখানার কাজ বন্ধ। লেবারদের সবাইকে ছুটি দিয়ে ঝুমুরের বাবা বাড়ির পথে রওনা হয়েছে। ঝুমুর তখন বেশ ছোট। ইস্কুলে পড়ে। সে-দিন তখনও স্কুল থেকে ফেরেনি।

ওর বাবা বাড়ি পৌঁছে দেখে, ঘরের দরজা-জানালা ভেতর থেকে বন্ধ। ওর মায়ের নাম ধরে ডাকে দু’একবার। সাড়া পায় না। হয়তো অঘোরে ঘুমুচ্ছে, এমন ভেবে জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে দৃষ্টি গলিয়ে দেখে, ওর মা আর বক্সিবাবু...। 

আর দরজা ধাক্কায়নি ওর বাবা। পায়ে পায়ে ফিরে গেছে উলটো পথে। পাড়ার ছেলেদের মুখোমুখি হতে, ওরা বলেছে, ‘কী হল, চলে যাচ্ছেন যে! চিড়িয়া অনেকক্ষণ ঢুকেছে, এখুনি হয়ে যাবে। বউকে ভাড়া খাটাচ্ছেন, ভাড়ার টাকাটা নিয়ে যান।’

কোনও কথা বলেনি ওর বাবা। চুপচাপ চলে গেছে মাথা নিচু করে। পরের দিন ভোরবেলায় গোবরা রেলগেটের কাছে ওর বাবার ছ্যাকরা-ব্যাকরা লাস পাওয়া গেছে।

তারপর ওদের পাড়ার ক্লাবঘরটা রাতারাতি পাকা হয়েছে। কোনও আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের ছোঁয়ায় ক্লাবে কালার টিভি হয়েছে। দেনার দায়ে ঝুমুরদের বাড়িটা গেছে। ঝুমুর ইস্কুল ছেড়েছে। অবশেষে বক্সিবাবুর হাতে-পায়ে ধরে ঝুমুরের মা ঝুমুরকে বাল্ব কারখানায় কাজে লাগিয়েছে। ঝুমুর আর ওর মা এখন খালের ধারে মুলিবাঁশের বেড়ার ঘর তৈরি করে থাকে।

আমাকে ঝুমুর একটু ঝাঁঝের সঙ্গে কথা বলায়, সুলেখা আর রত্না একটু দমে যায়। কী বলবে ভেবে পায় না। আমি একটু চুপ থেকে বলি— তুই নিজেকে ফুটপাতের মেয়ে বলিস কেন রে! তুই কি ফুটপাতের মেয়ে?

তখনও ঝুমুরের ঝাঁঝ মরেনি। ও বলে— ঝুপড়িতে যারা বাস করে তারা ফুটপাতের মেয়ে নয়তো কি তোদের মতো ভদ্দরলোকের মেয়ে!

আমি আর কথা বাড়াই না। ঝুমুরের মায়ের কেচ্ছাকাহিনীকে বিচার্য বিষয় ধরলে আমি ভদ্রলোকের মেয়েই বটে! আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না এমন কাজের কথা। ঝুমুরের মায়ের সঙ্গে আমার মাকে মোটেও মেলাতে পারি না। আমি কলোনির মেয়ে ঠিকই। তবু নিজেদের একটা বাড়ি আছে। চারখানা ঘর, পাকা দেওয়াল, অ্যাসবেসটসের চাল, পায়খানা-বাথরুম-রান্নাঘর। বাবা একটা ট্র্যান্সপোর্ট কোম্পানিতে খাতা লেখার কাজ করে। ছোটকাকা বি.এ., বি.এড. করেও মাস্টারি পায়নি। একটা কোচিং সেন্টারে পড়ায় আর অবসর সময়ে ‘পার্টি’ করে চাকরি পাওয়ার আশায়। চাকরি পায়নি বলে এখনও বিয়ে করেনি। কোচিং-য়ের একটা মেয়ের সঙ্গে ‘ইন্টুমিন্টু’ হয়েছিল। সে অপেক্ষা করে করে একজন প্রমোটারকে বিয়ে করেছে। এখন রাজপ্রাসাদের মতো ফ্ল্যাটে থাকে। ছোটকাকারও ইচ্ছা, ওইরকম একটা ফ্ল্যাট কিনে তার চেয়েও একটা সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করবে। তাই কাকা শুধু টাকা জমায়। সংসারে টাকা-পয়সা তেমন দেয় না। ওই কখনো সখনো কুমড়ো, পুঁইডাঁটা, কুচো চিংড়ি কিনে আনে।

এদিকে অল্প মাইনে চাকরির টাকায় বাবা সংসার চালাতে হিমসিম খায়। তাই কিছুটা সুরাহা হওয়ার জন্য একখানা ঘর ভাড়া দিয়েছে ওই ট্র্যান্সপোর্ট কোম্পানির ক্যাশিয়ারবাবুকে। প্রায় চার বছর হল ভাড়া আছে ও। আমি তাকে ক্যাশকাকু বলি। ক্যাশকাকু রান্নাবান্না করে না। টাকা দিয়ে আমাদের কাছে খায়। মা বলে, তাতেও কিছুটা সুরাহা হয়। ক্যাশকাকুকে মা খুব যত্ন করে খাওয়ায়। মায়ের সঙ্গে ক্যাশকাকুর খুব ভাব। ডাকতে হাঁকতে একপায়ে খাড়া।

অনেক আগে দেখতাম, সংসারে কোনও সমস্যা দেখা দিলে মা ক্যাশকাকুর সঙ্গে পরামর্শ করছে দরজা বন্ধ করে। তখন বাবা কিংবা ছোটকাকা বাড়িতে নেই। আমি হয়তো স্কুল থেকে ফিরছি সেসময়। যদিও এসব কথা অন্য কেউ জানে না। বলা যায় না। কেন না আমরা ভদ্রলোক। অন্তত ঝুমুর জানে আমি ভদ্রলোকের মেয়ে। ও খুব একটা মন্দ বলেনি। 

ঝুমুর হয়তো ঝাঁঝের মাথায় আরও কিছু বলত। কিন্তু হঠাৎ ওর মোবাইল বেজে ওঠে — ম্যাঁয় হুঁ পায়রা পায়রা ম্যাঁয় তো পায়রা বিবি হুঁ....।

ঝুমুর পায়রার গলা টিপে কানে ধরে— হ্যাঁ রুমি বল!...হ্যাঁ আছে। ...হ্যাঁ দিচ্ছি। এই সীমা তোর ফোন। নে ধর! 

আমি ঝুমুরের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে কানে ঠেকাই দুরুদুরু বুকে। ওপাশে রুমি ঝনঝনিয়ে ওঠে— কী রে, আমি সেই পাঁচটা থেকে এখানে দাঁড়িয়ে, আর তুই ওখানে ওদের সঙ্গে স্রেফ আড্ডা দিচ্ছিস! ওখানে থাকতে পারিস আন্দাজ করে ঝুমুরের মোবাইলে ফোন করলাম। যা ভেবেছি তাই!

না রে আড্ডা দিইনি। আমি ঠিক টাইমেই বেরিয়েছি তোর সঙ্গে দেখা করার জন্য। রাস্তায়...মানে...এখানে সুলেখা....খবরের কাগজ মানে...তুই আজকের কাগজে দেখেছিস ঝুমুরের একটা খবর ছাপা হয়েছে ছবিসহ।...

দেখিসনি! আরে ওটা নিয়েই তো...। তারপর তো ঝুমুর এসে গেল। তুই আজকের আনন্দবাজারটা একটু চোখ বুলিয়ে নিস। ঝুমুরের ছবিসহ খবরটা পড়লেই বুঝতে পারবি। ঘটনাটা ঝুমুরের মুখে শুনতে শুনতেই তো দেরি হয়ে গেল। তাই আর গেলাম না।

... ...

শোন না! রাগ করিস না! আমি কালকে ঠিক যাব। তুই একটু তোর হাজব্যান্ডকে বলে রাখিসনা। প্লিজ! কাজটা আমাকে পেতেই হবে বুঝলি!

... ...

ঠিক আছে বাবা ঠিক আছে। বন্ধুর জন্যে না হয় একটু করলি।

.... ....

ঠিক আছে, একেবারে সেন্টারেই পৌঁছে যাব। ছাড়ছি।

ঝুমুর ফোনটা আমার হাত থেকে ফেরত নিতে নিতে বলে— রুমি খুব বমকে গেছে বুঝি! 

হ্যাঁ, সেই পাঁচটা থেকে আমার জন্যে ওয়েট করছে বেচারি! ওর কর্তার কোম্পানি র‍্যামস্পোর্ট সেন্টারে কাজের ব্যবস্থা করে দেবে।

পাঁচটা থেকে না হাতি! ওসব ঢপ। এখন এসে দেখেছে তুই পৌঁছসনি; তাই ফোন মেরেছে। ছাড় তো! ওসব বড়লোকদের রকমসকম আমার সব জানা আছে!

রত্না বলে ওঠে— রুমি আবার বড়লোক কবে হল! আমাদের সঙ্গেই তো বাল্ব কারখানায় কাজ করত!  

ঝুমুর কথার সুর বদলায় না— করত যখন করত। এখন সে বড়লোকের বউ। পার ডে ওই র‍্যামস্পোর্ট সেন্টারের আমদানি কত জানিস! কয়েক হাজার টাকা।

সেদিন আমার এক কাস্টমার কথায় কথায় র‍্যামস্পোর্টের কথা তুলল। আধঘন্টা দলাই-মলাই করে দেওয়ার রেট কত জানিস! আড়াইশো টাকা। অবিশ্যি চিনা আর নেপালি মেয়েদের নরম নরম হাতের সেবা যত্ন। দাম তো বেশি হবেই।

সুলেখা অনেকক্ষণ কথা বলেনি। ও বলে ওঠে— এখন অনেক বাঙালি মেয়েও কাজ করে ওখানে। পরশুদিন রুমি বলছিল। সে জন্যেই তো সীমাকে কাজের কথা বলল।

ঝুমুরের গলায় জেরা করার সুর— কী কাজ করতে হবে তোকে বলেছে কিছু?

না, গেলাম আর কোথায়! ওর বরের সঙ্গে দেখা হলে তবে তো কাজের কথা!

ওখানে কী কাজ আর থাকবে! শোন! ওই দলাই-মলাই করার কাজ করতে বললে মোটেও রাজি হবি না। খুপরি মতো ঘরে একটা আধ-ন্যাংটো মদ্দর শরীরে তেল বুলিয়ে দিতে গিয়ে আরও কত কিছু করতে হবে তার ঠিক নেই। তুই ভদ্দরলোকের মেয়ে, ওসব পারবি না। আমার মনে হয় তোর না যাওয়াই ভালো।

রত্না ফোড়ন কাটে— ঝুমুর! তুই এ কাজ ভালোই পারবি, নাকি বল! 

ঝুমুর একপলক চেয়ে থাকে রত্নার দিকে। তারপর গম্ভীর গলায় বলে— তেমন অবস্থায় পড়লে তুইও পারবি রে! আসলে সব মেয়েমানুষের মধ্যেই একটা ছেনাল মেয়েছেলে বাস করে।

কথাটা বলেই ঝুমুরের খেয়াল হয়, রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে ওরা। লোকজন চলাফেরা করছে অনবরত। কেউ শুনল কিনা তা দেখার জন্য চোখ ফেরাতেই দেখে, ময়দানে ঘুরে বেড়ানো কালকের সেই খেঁচামার্কা রিপোর্টারটা। আমাদের দিকে ক্যামেরা তাক করে দাঁড়িয়ে রাস্তার ওপারে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হয়তো ছবি তুলে নিয়েছে! ঝুমুর ভাবে, আশ্চর্য, মালটা এখান অবধি ধাওয়া করেছে! মতলবটা কী ওর! ও তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠে— অ্যাই হারামির বাচ্চা!

 

দুই

‘মাইনেটা একটু বাড়লেও শালা ভাড়াটে-মারাটে উঠিয়ে দেব’। মাঝে মাঝেই বেশ রাগের সঙ্গে বাবা কথাটা বলে। কথাটা নতুন নয়। বছর চারেক ধরে শুনে আসছি। চারবছরে বাবার মাইনে বেড়েছে কিনা জানি না। কিন্তু ভাড়াটে উঠিয়ে দেওয়া হয়নি। দক্ষিণ দিকের ঘরখানা দখল করে ক্যাশকাকু বহাল তবিয়তেই আছে। ওর কোনও কাজকর্মে বাবা অসন্তুষ্ট হলেই মাকে শুনিয়ে রেগেমেগে ওই ডায়ালগ ছাড়ে। অবশ্য এটা খেয়াল রাখে, ক্যাশকাকুর কানে কথাটা যেন না যায়। শুনলে যে অসুবিধা আছে! মাসের শেষে টাকা ফুরোলে ওর কাছেই হাত পাততে হয়। কাছে না থাকলেও ক্যাশকাকু ক্যাশ থেকে দু’একশো টাকা ঠিক ম্যানেজ করে দেয়। বাবাকে মাইনে দেওয়ার সময় সে টাকা কেটে নিয়ে ভুক্তান করে ক্যাশকাকু। ও চটলে এ সুবিধাটা আর পাওয়া যাবে না।

মা কথাটা শুনেই অবশ্য চটে যায়। বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে— হ্যাঁ, ভাড়াটে তো তোমার বাড়া ভাতে ছাই দিচ্ছে, তাকে না ওঠালে কি চলে! ডাকতে হাঁকতে, অভাব অভিযোগে ভাই লক্ষ্মণ, আর কাজ মিটে গেলেই তখন বিভীষণ! এমন নেমকহারাম লোক দেখিনি বাবা!

বাবা চুপচাপ কথা হজম করে না। কিন্তু গলাও চড়ায় না। মিনমিন করে বলে— হ্যাঁ, স্বামীকে তো নেমকহারাম বলবেই, চৌদ্দপাকের দেওর পেয়েছে তো! তোমার কীর্তিকলাপ জানতে আমার বাকি আছে ভেবেছ।

শেষমেশ যতক্ষণ না মা কেঁদে কেটে বিছানায় উপুড় হয়, অথবা বাবা না খেয়ে দুমদাম পা ফেলে কাজে বেরিয়ে যায়, ততক্ষণ ঝগড়াটা চলে। ক্যাশকাকু বাড়িতে না থাকলেও কী করে যে খবর পেয়ে যায়, আমার বাবার সঙ্গে মায়ের ঝগড়া হয়েছে!

সেদিন ক্যাশকাকু এককিলো খাসির মাংস কিংবা বড়সড় একখানা ইলিশ নিয়ে বাড়ি ফেরে। বাবার সামনেই মায়ের হাতে মাছ কিংবা মাংসর ক্যারিব্যাগখানা ধরিয়ে দিয়ে বলে— বেশ জমিয়ে রাঁধুন তো বউদি। আজ কিন্তু আগে-পরে নয়, সবাই একসাথে খেতে বসব।

মা মুখ ফিরিয়ে চাপা-হাসি হেসে, ক্যারিব্যাগটা রান্নাঘরে রাখতে রাখতে বলে— আবার এসব আনা কেন? তোমার দাদাকে বললেই পারতে। কাল কিনে আনতো। 

ক্যাশকাকু সে কথা শুনতেই পায়নি যেন, এমন ভান করে বলে— দেশের বাড়িতে দাদা থেকেও নেই। একনম্বরের স্বার্থপর, একই বাড়িতে ‘আলাদা-হাঁড়ি’ হয়েছে বউকে নিয়ে। এখানে একটা দাদার মতো দাদা পেয়েছি। আপনার সঙ্গে সে শয়তানটার তুলনাই চলে না। কবে থেকে ভাবছি, আপনাদের দু’জনকে একবার আমার দেশের বাড়ি কাঁথি নিয়ে যাব। ওদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেব, সত্যিকারের দাদা বউদি কাকে বলে। তো আপনাদের আর সময়ই হচ্ছে না। এবার পুজোর ছুটিতে চলুননা দাদা! দেখবেন ভাল লাগবে।  

বাবা দেওয়ালের ঠেসে ছেড়ে, একটু নড়েচড়ে বলে— যাব ভাই যাব। এত করে যখন বলছ, ঠিক যাব একদিন। নাকি বল গিন্নি! 

মা নকল মুখঝামটা দেয়— তুমি আর ব’লো না। তোমার ওই কথাই সার। যাব-যাব বলেই তো চার বছর কাটিয়ে দিলে।

এই চারবছরে ক্যাশকাকুকে নিয়ে কম ঘটনা ঘটেনি। মনে পড়ে, তখন আমার ক্লাস সেভেনের অ্যানুয়াল পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে। দিন-দুয়েকের জন্য আমি সন্তোষপুরে মাসির বাড়ি বেড়াতে যাব। ছোটকাকু ট্যুইশানি থেকে ফিরে আমাকে দিয়ে আসবে। আমার মোটামুটি ব্যাগ-গোছানো হয়ে গেছে। হঠাৎ মা বলল— আজ কত তারিখ রে?  

আমি তারিখ বলতেই, মা বলে— যা ভেবেছি তাই! একটা জিনিস নেওয়া হয়নি। তোর নিজেরও হুঁশ নেই। সাধে আর কি আর ‘কেবলি’ বলি তোকে! বড়ই হয়েছ, বোধবুদ্ধি হল না।

মায়ের ভাষায় আমি এখন ‘বড়’ হয়েছি। তবুও বুঝে উঠতে পারি না মা কী বলতে চাইছে। তাই মায়ের মুখের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকি।

মা লাজুক হেসে বলে— আজকালের মধ্যেই তোর ‘শরীর-খারাপ’ হবে। এটা দ্বিতীয়বার। প্রথমবারে তো ভালো করে জানলি না বুঝলি না। মাসির বাড়ি গিয়ে অসুবিধায় পড়বি। যা, নেপালের দোকান থেকে এক প্যাকেট ন্যাপকিন কিনে নিয়ে আয়। ন্যাকড়া-টেকড়া দিয়ে সামাল দিতে পারবি না। 

তখন আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি। কিন্তু নেপালদা'র দোকান থেকে ওইসব জিনিস কিনে আনা! সে ভারী লজ্জার ব্যাপার! এমনিতেই নেপালদা'র দোকানে কোনও জিনিস কিনতে গেলে, ও আমার বুকের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকায়। তার ওপর ও-সব চাইলে তো...! আমি বলি— আমি ওসব কিনতে পারব না। তুমি এনে দাও।

মা ঝাঁঝিয়ে ওঠে— হ্যাঁ, আমি কিনতে যাই! এমনিতে আমি দোকানে কিছু কিনতে যাই না। যা লাগে তোর বাবা এনে দেয়। তাছাড়া আমি কোনওদিন ওসব ব্যবহার করি না। এখন নেপালের কাছে ওইসব কিনতে গেলে...। দাঁড়া, এক কাজ করি। তোর ক্যাশকাকু ঘরে আছে কিনা দেখে আয় তো! ওকেই আনতে দিই। তোর বাবা বেরিয়েছে, কখন ফিরবে ঠিক নেই।

ক্যাশকাকু নেপালদার দোকান থেকে ন্যাপকিন কিনে এনে মায়ের হাতে দিচ্ছে, এমন সময় বাবা বাড়িতে ঢোকে। ব্যাপার দেখে শুনে বাবার তো মাথা গরম! ক্যাশকাকু বেরিয়ে যাওয়ার পর মায়ের সঙ্গে বাবার তুমুল ঝগড়া! মা কিছুতেই বাবাকে বিশ্বাস করাতে পারছে না যে, ওটা আমার জন্যে কিনতে পাঠিয়েছিল। তখন আমার ছোট মাথায় ঢোকেনি, ক্যাশকাকু ন্যাপকিন কিনে এনে দেওয়ায় বাবারই বা এত রাগ কেন!  

মা অবশেষে রেগেমেগে বলেছিল, 'তুমি যদি তা-ই ভাবো, তাহলে তাই! তুমি তো কোনওদিন এসব দাওনি। ছেঁড়া কাপড় দিয়েই কাজ চালিয়েছি। ও আমার শখ-আহ্লাদ মেটাচ্ছে। বেশ করেছে দিয়েছে। ওর কাছে হাত পাততে তোমার লজ্জা লাগে না। শুধু শুধু মানুষটার বদনাম দিচ্ছ!'

সেদিন আর আমার মাসির বাড়ি যাওয়া হয়নি। দিন পাঁচেক পরে মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম।

আর একবার তো আরও বিচ্ছিরি ব্যাপার! মা বাথরুমে চান করছিল। ক্যাশকাকু নাকি বুঝতে না পেরে বাথরুমের দরজা খুলে ফেলেছিল। আমাদের বাথরুমের দরজার ভেতরের ছিটকিনিটা অনেক দিন থেকেই ভাঙা। সারানোর কথা ভেবেও কেন যে সারানো হয়নি!

একটা দড়ির ফাঁস দেওয়ালের পেরেকে লাগিয়ে কাজ চলে। ক্যাশকাকু দরজা ঠেলতেই পুরোনো দড়ি ছিঁড়ে দরজা হাট হয়ে খুলে যায়। আচমকা দরজা খুলে যাওয়ায় মা-ও চিৎকার করে ওঠে। বাবা বারান্দায় বসে গ্যাস-ওভেনের বার্নার পরিষ্কার করছিল। আচমকা মায়ের চিৎকারে উঠে গিয়ে দেখে ওই কাণ্ড। তারপর তো ক্যাশকাকুকে চূড়ান্ত অপমান। আর মা-কেও অশ্রাব্য গালিগালাজ।

ক্যাশকাকু কোনও কথা বলেনি। সন্ধেবেলায় অফিস থেকে ফেরার সময় এক কিলো রেওয়াজি খাসির মাংস কিনে এনেছিল ক্যাশকাকু। রাতে এক সঙ্গে খেতে বসে বাবা বলেছিল, ‘ওবেলায় রাগের মাথায় অনেক কিছু বলে ফেলেছি। কিছু মনে ক’রো না অমিয়।’ তা শুনে ক্যাশকাকুর দিকে অপাঙ্গে দৃষ্টি ছুঁড়ে মা ফিক করে হেসেছিল।

বছর চারেক ধরে এমন ঘটনা দেখতে দেখতে আমিও বড়ো হয়ে গেলাম। মাধ্যমিকে ইংলিশে ব্যাক পাওয়ার পর লেখাপড়া ছেড়ে দিলাম। তারপর থেকে মায়ের কাছে চলল আমার ট্রেনিং পিরিয়ড। শ্বশুরবাড়িতে কীভাবে ভালো বউ হিসেবে নাম কেনা যায়, তার শিক্ষা নিতে থাকলাম মায়ের কাছে। ভালো বউ হতে গেলে ভালো রাঁধুনি হতে হয়, ভালো ধোপানি হতে হয়, ভালো ঘরসাজুন্তি হতে হয়। এমনকি ভালো নার্স না হলেও অন্তত ভালো আয়া হতে হয়। মায়ের কাছে ট্রেনিং নেওয়ার কোর্স দেখে শুনে আমার এমনই মনে হয়েছে। আমি তো একদিন মা-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'আচ্ছা মা, শ্বশুরবাড়িতে বউ হয়ে যাওয়া মানেই কি ‘কাজের লোক’ হয়ে যাওয়া? এ-সব না করলে তাড়িয়ে দেবে?'    

মা বলেছিল, "তুই এভাবে নিচ্ছিস কেন? সংসারটা তো তোরই। তোর সংসার তোকেই বুঝে শুনে গোছগাছ করে চলতে হবে। সংসার করতে গেলে তো কাজকর্ম করতেই হয়। আমি করি না! তবে তোর কপাল যদি ভালো হয়, ভালো ঘর-বর পাস, পয়সাওলা লোকের বউ হোস তখন আর এসব করতে হবে না। বাড়িতে ঠাকুর-চাকর, কাজের ঝি সবই থাকবে। তবুও কি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারবি? নিজেই অনেক কিছু করতে চাইবি। মহাপুরুষরা বলে গেছেন, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’, কথাটা তো ফ্যালনা নয়!"

মা মাঝেসাঝেই এমন কিছু জ্ঞান দেওয়ার কথা ছড়া কেটে কেটে বলে। আর সেসবই নাকি মহাপুরুষরা বলে গেছেন। একদিন হাসতে হাসতে বলেছিলাম, 'মহাপুরুষ বলেই ওরা মেয়েদেরকে নাকানিচোবানি খাওয়ানোর জন্য এসব বলেছেন, মহানারী হলে বলতেন না।'  

মা ভ্রূ কুঁচকে কয়েক পলক তাকিয়েছিল আমার দিকে। তারপর বলেছিল, 'আজকাল তুই কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছিস বল তো! ওই সব কী যেন নারীবাদী না প্রগতিশীল মহিলা সমিতি-টমিতি হয়েছে, ওদের দলের নাম লিখিয়েছিস নাকি? শোন, একটা কথা বলি। উইপোকা চিনিস তো! যতদিন ওরা উইঢিপির ভেতর থাকে, ততদিন ওদের বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ঘর-সংসার করে। বর্ষার জল পেয়ে যখন ওদের পাখনা গজায়, তখন ওদের বলে বাদলাপোকা। ওরা তখন আলোর সন্ধানে উড়ে যায় আর আগুনে পুড়ে মরে। বাদলাপোকা হতে চাস না বুঝলি! পূর্ব্বপুরুষ ঠাকুমা-দিদিমার যেমনভাবে চলেছেন, তেমনি চলাই ভালো।'

তখন মাকে রাগানোর জন্য বলেছিলাম, 'ঠাকুমা-দিদিমারা পূর্বপুরুষ কী করে হল? পূর্বনারী বা পূর্বমহিলা বলতে পার।' 

মা খুন্তি নিয়ে তেড়ে এলে আর দাঁড়াইনি। যদিও মা-কে এমন মুডে পাওয়া যায় খুব কম। বেশিরভাগ সময়ই মায়ের মেজাজ সপ্তমে চড়ে থাকে। ওই ক্যাশকাকুর সঙ্গে কথা বলার সময়ে যা মায়ের মোলায়েম গলা শোনা যায়। বাবার সঙ্গে তো মা-কে নরম সুরে কথা বলতেই শুনি না। আচমকা কোনওদিন ফুরফুরে মনে মা আর বাবা একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেই অনিবার্যভাবে ওঠে আমার বিয়ের কথা। বাবা বলে, 'ভাবছি আর একখানা ঘর ভাড়া দিয়ে দেব। দু’খানা ঘরে যেমন-তেমন করে চলে যাবে আমাদের। মেয়েটার বিয়ের জন্যে তো অনেক টাকার দরকার।' 

জানি না, ঘরভাড়ার টাকা জমিয়ে কতদিনে আমার বিয়ের টাকা জোগাড় করতে পারবে বাবা।

মা বলে, 'সীমুটা দিনরাত বাড়িতে বসে থেকে কেমন ঘরকুনো হয়ে যাচ্ছে। ওকে বলে দেখ না, দু’একটা টিউশনি পড়ালেও তো ক’টা টাকা আসে।'  

মায়ের কথা শুনে নিজের মনেই হাসি। আমি মাধ্যমিক ফেল, আমি করব টিউশনি! যা শিখেছিলাম, সবই তো ভুলে মেরে দিয়েছি, কী শেখাব ছাত্তরদের! ক'টা টাকাই বা পাওয়া যাবে ছেলেমেয়েদের অ-আ-ক-খ আর নামতা শিখিয়ে! আমি বুঝতে পারি, যে-ভাবেই হোক আমাকে কিছু সময়ের জন্য বাড়ির বাইরে রাখাটাই মায়ের উদ্দেশ্য। তাই আমি নিজেই বাবাকে বলি, 'আমি তো বাড়িতে বসেই রয়েছি। খুঁজে পেতে কোনও কাজ করি না বাবা! একঘেয়েমিটা কাটবে।' বাবা হাই তুলে বলে, 'আজকালকার বাজারে কাজ পাওয়া কি আর এত সহজ রে মা! দ্যাখ, কাছে পিঠে যদি কোথাও ভদ্রস্থ কাজ পাস। আমার আপত্তি নেই তাতে।'    

কিছুদিনের মধ্যে বাড়ির পাশে মডার্ন সেলুনের হিপিদার যোগাযোগে কাজও পেয়ে যাই ওই বাল্ব কারখানায়। হিপিদার কাছে কত রকমের লোক আসে চুল-দাড়ি কাটাতে। আমিও মাঝেসাঝে চুলের ডগা ছাঁটতে কিংবা লকস ঠিক করতে যাই ওর কাছে।

আমার কাছে ও পয়সা নেয় না, পাড়ার মেয়ে তো! শুধু সামনের দিকে লকসটা কেটে ছেঁটে ঠিক করার সময় ওর কনুইটা আমার বুকে ঠেকায়। ওতেই ওর পয়সা উসুল হয়ে যায়। আমার গা রি-রি করে ওঠে। কিন্তু কিছু বলি না। চুল ছাঁটার সময় হিপিদা বয়স্ক মানুষগুলোর কানও তো ধরে, ওরাও তো কিছু বলে না।

একদিন আমি চুলের ডগা ছাঁটতে গিয়ে হিপিদাকে কাজের কথা বলি। তখন চুল কাটাচ্ছিল একটা ইয়াং ছেলে। আমার কথাটা শুনে সে বলে, 'হিপিদা! আমার বোন একটা বাল্ব কারখানায় কাজ করে। ওকে বলে দেখব, যদি ওখানে মেয়ে-টেয়ে লাগে।'  

আমি আয়নার দিকে তাকাতেই ছেলেটার চোখে চোখ পড়ে। মাঝে মাঝে দেখেছি, তবে আলাপ নেই। সাইকেল চড়ে চুল-দাড়ি কাটাতে আসে হিপিদার সেলুনে। একটু ঢ্যাঙা, ফর্সা, কোঁকড়া চুল, ভ্রূ দুটো জোড়া। মাঝে মাঝেই বাঁ-হাতের তালু দিয়ে চুল ঠিক করার মুদ্রাদোষ আছে। এলাকারই ছেলে। সেকেন্ড লেন না পঞ্চাননতলা কোথায় যেন থাকে। চোখে-মুখে একটু বেপরোয়া ভাব। আমি তেমন গুরুত্ব দিই না ছেলেটার কথায়। ইয়াং ছেলেরা, ইয়াং মেয়ে দেখলে এমন যেচে উপকার চায়! কাজ তো লবডঙ্কা! আসলে আলাপ করার ফন্দি-ফিকির। তারপর ক’দিন যেতে না যেতেই সেন্ট্রাল পার্ক কিংবা সুভাষ সরোবরের ‘বনবিতান’-এ ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব। দিনকতক নেকু নেকু প্রেমের অভিনয় করে শরীরে খাবল মারার ধান্দা। এসব জানা আছে আমার! তাই কিছু না বলে চুপ থাকি আমি। ভেবেছিলাম এখন চলে যাই। একটু পরে আসব।

কিন্তু ছেলেটার দাড়িকাটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল, তাই চলে না গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আবার কেউ বসে গেলে আজ আর চুলের ডগা ছাঁটা হবে না।  

চেয়ার থেকে নেমে ছেলেটা সোজাসুজি চোখে চোখ রেখে বলে— আমার বোন চাউলপট্টি রোডে ‘বক্সি বাল্ব’ কারখানায় কাজ করে। ওর কাছে জেনে বলব, ওখানে কোনও ‘লেবার’ লাগবে কি না! শুক্কুরবার এরকম সময়ে হিপিদার সেলুনে এসো। জানিয়ে দেবো। দরকার হলে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বোনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবো।

তারপর হঠাৎ সেলুন থেকে বেরিয়ে সাইকেলে চড়ে জোরসে প্যাডেল করে চলে গেল। আমি অবাক! এ কীরকম ছেলে রে বাবা! অন্য কেউ হলে, এই সুযোগে খানিক ভ্যাজরং-ভ্যাজরং করত। নিজের হিরোগিরির জাহির করত। কথা বলতে বলতে দু’চারবার আমার বুকের দিকে চোখ বুলিয়ে নিত।

সে-সব কিচ্ছু নয়, আচমকা সাইকেল চড়ে হাওয়া! পরক্ষণেই ভাবলাম, মেয়েদের পটাবার এটাও এক ধরনের স্টাইল। দেখানো যে, আমি কতটা ভদ্র ছেলে। ও-সব আদেখলামি আমার নেই। মেয়েটা পটে গেলে তখন আর সন্নিসি থাকে না। লালঝোল মাখা জিভ আর লদলদে শুঁড় বেরিয়ে পড়ে।

যাবো না যাবো না করেও শুক্কুরবার হিপিদার সেলুনে গেলাম। দেখি ছেলেটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। কাছে যেতেই বলে ওঠে—  তোমার জন্যেই দাঁড়িয়ে আছি। আমি বোনের সঙ্গে কথা বলেছি, বক্সিবাবুর কারখানায় লেবার লাগবে। ইচ্ছে হলে তুমি এখন আমার সঙ্গে যেতে পারো। কারখানার সামনে নামিয়ে দেবো। তা না হলে সময়-সুযোগ মতো গিয়ে আমার বোনের সঙ্গে দেখা করে নিও! সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা অবধি কারখানায় থাকে। ওর নাম সুলেখা।

আমার উত্তরের অপেক্ষায় আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ছেলেটা। ওর নামধাম জানি না। শুধু মুখ চেনা। ওর সঙ্গে যাওয়া হয়তো ঠিক হবে না। তাছাড়া বাড়িতে কিছু না বলে দুম করে যাওয়া যায় নাকি! তাই বলে উঠি, না, এখুনি মানে... বাড়িতে তো বলা হয়নি। আমি বিকেলবেলা গিয়ে দেখা করে নেবো। কারখানার ঠিকানাটা বলুন।

চাউলপট্টি রোড। খালের ওপর নতুন ঢালাই ব্রিজ হচ্ছে। ওর পাশে কাঠের ব্রিজটা পেরিয়ে ডান দিকে কিছুটা গেলেই বাঁ-দিকে কারখানা।

কথাটা শেষ হতে না হতেই সাইকেলে চড়ে বসেছে ছেলেটা। ওর নামটা জিজ্ঞেস করার কথা মনে হতেই দেখি, বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে।

হিপিদার কাছে জানতে পারি ওর নাম সুভাষ। সেদিনই বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে চলেও যাই বক্সিবাবুর বাল্ব কারখানায়। সুলেখা নামের মেয়েটার সঙ্গে দেখা করি। তারপর তো বাল্ব কারখানায় কাজ জুটে গেল সুলেখার চেষ্টায়। আমাকে ধরে ছ’জন মেয়ে। ঝুমুর, সুলেখা, রত্না, রুমি, কাজরি আর আমি।   

কাজে বেশ মন বসে গেল আমার। মাও খুশি! আগে মা-বাবা প্রায় সময় আমার বিয়ে দেওয়ার কথা তুলত। এখন তোলে না। মা-বাবার মুখে আমার বিয়ের কথা শুনে প্রথম প্রথম আমি লজ্জা পেতাম। এখন আর লজ্জা পাই না। বরং এখন আমার বিয়ে করার খুব ইচ্ছা। প্রথমত আমাদের এই বাড়িটা আমার আর মোটেও ভালো লাগে না। শ্বশুরবাড়িটা যদি ভালো লেগে যায়! পাশের বাড়ির টুসি আমারই সমবয়সী। শ্বশুরবাড়ি ওর খুব পছন্দ হয়েছে। 

ও যখন এখানে আসে, তখন আমার সঙ্গে শুধুই ওর শ্বশুরবাড়ির গল্প করে। ওর বরটাও খুব ভালো। দু’জনকে একসঙ্গে দেখে কী ভালো যে লাগে! এখন তো একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। সেদিন এসেছিল। কচিটাকে কোলে নিয়ে কত আদর করলাম!

সত্যি কথা বলতে কী, আমার মনে মনে হচ্ছিল, আমারও যদি বর থাকত, অমন একটা ছেলে হত! পরক্ষণেই মনে হয়েছে, ধুস, কী সব আবোল তাবোল ভাবনা। বিয়ের বয়স পালিয়ে যাচ্ছে নাকি! টুসির অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেছে তাই...! তবুও মনের কোণে বিয়ের বাসনাটা আমার রয়েছেই। তাই বাল্ব কারখানায় কাজ পাওয়ার পর নিজের নামে ব্যাঙ্কে বই করলাম। যা মাইনে পেতাম, জমাতাম। বাবা কতদিনে বিয়ের টাকা জমাবে তার ঠিক নেই।

কারখানা উঠে যেতে টাকা জমানোও বন্ধ হয়ে গেল। চারজন ছেলে আর দু’জন মেয়ের কাজ গেল। ছেলে চারটে নিশ্চয় কোথাও কাজ পেয়েছে। ওদের মধ্যে চন্দনদা' বেশ শিক্ষিত। কী মজার মজার কথা বলত। চন্দনদা' নিশ্চয় ভালো চাকরি পেয়ে গেছে এতদিনে। আমাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয় না।      

ওখানে শুধু আমাদের কারখানাটাই উঠল তা নয়, আমাদের কারখানার লাগোয়া প্লাইউডের কারখানাটাও উঠে গেল। ওই দুটো জমি মিলিয়েই তো ওই ‘ডিউভিউ কমপ্লেক্স' হচ্ছে। প্লাইউডের কারখানাটার জায়গা ছিল বিশাল। অ্যাসবেসটসের শেডের ভেতরে ছিল করাত-কল, পেস্টিং মেশিন, আরও নানান যন্ত্রপাতি। একপাশে ডাম্পিং রুম। আর সামনে ছিল বিশাল ফাঁকা জায়গা। ওই ফাঁকা জায়গাটার একপাশে পড়ে থাকত মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি। সেগুলোকে ‘লগ’ বলত ওখানকার লেবারগুলো। একপাশে শুকনো হত পাতলা প্লাইবোর্ড। ওগুলো শুকিয়ে গেলে ডাম্পিং রুমে গাদা করে রাখা হত।

একবার হল কী, রাত্রিবেলায় ডাম্পিং রুমে কীভাবে যেন আগুন লেগে গেল। দমকলের গাড়ি আসতে আসতে প্লাইউড কারখানা পুড়ে ছাই। ওরা এসে আমাদের কারখানাটাকে কোনক্রমে আগুনের হাত থেকে বাঁচাল।

ওই প্লাইউড কারখানায় আগুন লাগার পরের দিন সকালে ডিউটি গিয়ে দেখি লোকে লোকারণ্য। তখনও অ্যাসবেসটসের চাল থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া বেরোচ্ছে। তখন ভিড়ের মাঝে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারের মধ্যে ওই ছেলেটাকেও দেখেছিলাম, যে এখন রাস্তার ওপার থেকে আমাদের ছবি তুলছিল।

সেদিন আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে ও কথাও বলেছিল — আপনারা কি ওই কারখানায় কাজ করেন? কারখানা মালিকের নামটা বলতে পারেন? এ ধরনের কয়েকটা মামুলি প্রশ্ন করে উত্তরটা পটাপট লিখে নিচ্ছিল একটা নোটবুকে।

আমাদের মধ্যে ঝুমুর একটু বলিয়ে-কইয়ে। ও-ই সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। হঠাৎ ওকে ছেলেটা প্রশ্ন করেছিল, 'আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় যে, কারখানাটাতে ইচ্ছে করে কেউ আগুন লাগিয়েছে?'

ঝুমুর উত্তর দিয়েছিল, 'তা মনে হতে যাবে কেন? কতভাবেই তো আগুন লেগে যেতে পারে।' 

পরের প্রশ্ন করেছিল ছেলেটা, 'আচ্ছা, কিছু দিন পরে যদি আপনাদের কারখানাটাতেও কোনওভাবে আগুন লেগে যায়, আর কারখানা বন্ধ হয়ে যায়; তখনও আপনারা কি একই কথা বলবেন?'

ঝুমুর রেগে উঠেছিল তখন, 'যান তো দাদা! বেশিক্ষণ ভ্যাজর-ভ্যাজর ভাল্লাগে না। কী বলব না বলব, তখন দেখা যাবে।'

তিন

 

রাস্তার ওপাশে ময়দানে ঘুরে বেড়ানো কালকের সেই খেঁচামার্কা রিপোর্টারটাকে দেখে ঝুমুর ভাবে, আশ্চর্য, মালটা এখান অবধি ধাওয়া করেছে! মতলবটা কী ওর! ও তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠে— অ্যাই হারামির বাচ্চা!

ঝুমুরের গালাগালি শুনে রিপোর্টারটা এক পা-ও নড়ল না। ঝুমুর এবার তেড়েমেড়ে রাস্তার ওপারে যায়। ও এখন রিপোর্টার ছেলেটার মুখোমুখি। বেশ তেজি গলায় বলে ওঠে— কী পেয়েছেনটা কী! আমার পেছনে পড়ে রয়েছেন কেন?

খুব ঠাণ্ডা গলায় ছেলেটা বলে— ছবিটা দেখেছেন কাগজে? কেমন হয়েছে?

আপনাকে আমি পুলিশে দেব, লুকিয়ে ইয়াং মেয়েদের ছবি তুলছেন!

এত উত্তেজিত হবেন না ম্যাডাম! কুল! কুল! আমরা সাংবাদিক, পুলিশ আমাদের কিছুই করবে না। কাগজে ছবি বের করে দিলাম, কোথায় ধন্যবাদ দেবেন! না, তার জায়গায় গালাগালি দিচ্ছেন! পুলিশের ভয় দেখাচ্ছেন!

ঝুমুরের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হচ্ছে দেখে আমরাও রাস্তা পেরিয়ে ঝুমুরের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। ঝুমুর এখন কিছুটা নরম, আমার ছবি ছাপতে কে বলেছে আপনাকে?

তাতে তো আপনার ভালোই হয়েছে। একটু আগে বলছিলেন না, ফোকটে ‘অ্যাড’ হয়ে গেল আপনার! অ্যাড করে দেওয়ার মজুরিটা দিন।

রত্না মুখ খোলে এবার, আপনি তো ভীষণ বাজে লোক। লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের কথা শুনছিলেন নাকি!

যা জোরে জোরে কথা বলছিলেন আপনারা, না শুনে আর উপায় কী বলুন!

ঝুমুর আবার স্বমহিমায়, আপনি কী চান বলুন তো?

তেমন কিছু না, আপনাদের একটা ইন্টারভিউ!

সুলেখা বলে ওঠে— ইন্টারভিউ! আমাদের? আমরা কী এখন নামীদামি, যে আমাদের ইন্টারভিউ নেবেন?

আপনারাই তো এখন দামি! দেশের রাষ্ট্রপতি মহিলা, পার্লামেন্টের স্পিকার মহিলা, প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রী মহিলা, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও মহিলা। অথচ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মহিলাদের মান-সম্মান, জীবন-যাপন সবই বিপন্ন। এটা কেন হবে! এ ব্যাপারে মতামত চাইব আপনাদের।

সাংবাদিকটার কথাগুলো শুনে আমরা কেমন চুপ মেরে যাই। এ কথাগুলো তেমন সাদামাটা মনে হচ্ছে না। কেমন রাজনীতির গন্ধ। আমি রাজনীতি খুব একটা বুঝি না। ছোটকাকা পার্টি করে। মাঝে মাঝে বাবার সামনে বুলি কপচায়। সেগুলোই শুনেছি তাই...! 

ছোটকাকা বলে, ‘রাজনীতি ছাড়া মানুষ হয় না। বউদি তো বাড়িতেই থাকে, রাঁধে বাড়ে, খেতে দেয়। ঘরের কাজকর্ম করে; তার মধ্যেও নাকি রাজনীতি করে বউদি! রাজনীতি করার জন্য ঝাণ্ডা নিয়ে মিটিং-মিছিলে যেতে হবে, তার কোনও মানে নেই।’ কী অদ্ভুত কথাবার্তা! সাংবাদিকটার এই কথাগুলোও কেমন কেমন যেন! 

ঝুমুর বলে— বেশ তো ছিলেন ময়দান চত্বরের কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি নিয়ে, এসবের মধ্যে ঢুকতে চাইছেন কেন? 

সাংবাদিক বাঁকা হাসি হেসে বলে— ওই কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির সঙ্গে এগুলোরও সংযোগ আছে যে! যেমন ধরুন, আপনি বাল্ব কারখানায় কাজ করতেন। তখন তো আর ময়দান চত্বরে যেতেন না! কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। আপনি নিরুপায় হয়ে  টাকা রোজগারের জন্য ওখানে যেতে বাধ্য হলেন। পুলিশের খপ্পরে পড়লেন। সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের খপ্পরেও পড়লেন। কাগজে ছবি ছাপায় সবাই জেনে গেল আপনি কী কাজ করেন। এতে আপনার তো বদনাম হল। ঠিক কিনা বলুন!

তার জন্য তো আপনিই দায়ী। আমার আর ওই ফৌজি মাকড়াটার ছবি তুলে কাগজে দিয়ে ক’টাকা পেয়েছেন?

ওটাই যে আমার কাজ ম্যাডাম। আপনি যেমন পেটের দায়ে কাজ করেন, আমাকেও করতে হয়।

ঝুমুর হঠাৎ বলে ওঠে— ও! একটা কথা মনে পড়ে গেছে। কাল যে পুলিশের ঘুষ খাওয়ার ছবিটা তুললেন, সেটা না ছেপে এটা ছাপলেন কেন? পুলিশের কাছে ঘুষ খেয়েছেন নাকি!

দেখুন, ওটা কাগজের সম্পাদকের ব্যাপার! আমরা ছবি তুলে দিয়ে খালাস। কোন ছবি যাবে না যাবে সম্পাদক বুঝবে।

রত্না ঝুমুরের হাত ধরে টান মারে— চল তো ও-দিকে। ওর একটা কথারও উত্তর দিবি না। ফোকটে ইন্টারভিউ নিয়ে টাকা কামাবে।

এর মধ্যে কয়েকজন কৌতূহলী লোক দাঁড়িয়ে গেছে আমাদের চারপাশে। তার মধ্যে চাউলপট্টি রোডের রতনও আছে। বোম-রতন বলেই ওকে জানে সবাই। এ এলাকায় বোম বাঁধতে ওস্তাদ ওর মতো নাকি কেউ নেই। এলাকার সবাই ওকে একটু সমঝে চলে। এলাকার দাদা হিসেব কানু সাহার পরেই ওর নাম। আমার এসব জানার কথা নয়। গত বছর লোকসভা ইলেকশনের আগে ও দলবল নিয়ে বক্সিবাবুর কাছে পার্টির চাঁদা নিতে এসেছিল। তখন আমরা মাল ‘সিল’ করছি।

বক্সিবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল নির্লজ্জের মতো। চোখ সরাবার নাম নেই। যেন চোখ দিয়েই চেঁটে নিচ্ছে আমাদের শরীরটাকে। ওরা চলে যেতে ঝুমুরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'কে রে ওই হোঁৎকাটা?'

ঝুমুর চোখ পাকিয়ে বলেছিল, 'সে কী রে, ওকে চিনিস না..!'

তারপর সাতকাহন করে শুনিয়েছিল রতনের কাহিনী। ওই রতন ক’জনকে খুন করেছে, ভোটের সময় কত বোম বাঁধে, কোন কোন এলাকায় ও তোলা তোলে, তার ভাগ কোন কোন নেতারা নেয়, সব শুনিয়েছিল ঝুমুর। সে-সব শুনে আমি বলেছিলাম, তুই এত কী করে জানলি রে?

আমি বক্সিবাবুর কাছে শুনেছি। জানিস, রতন আমার সঙ্গেই শান্তি সংঘ ইস্কুলে পড়ত। পড়াশুনায় আমার চেয়ে ও খুব ভালো ছিল। কিন্তু ওর কপালটা খারাপ।

আমি বলেছিলাম, 'কেন? কী হয়েছিল?'    

ঝুমুর করুণ করুণ গলায় বলেছিল, 'ওরা ছিল খুবই গরিব। ওর মা রান্না করত একটা বড়লোকের বাড়িতে। একবার ওর মায়ের খুব অসুখ করল। হাসপাতালে ভর্তি করতে হল। ডাক্তার বলল, অপারেশন করতে হবে, অনেক টাকা লাগবে। ওর বাবা কী আর করে! ওর মা যে বাড়িতে কাজ করে, তাদের কাছে গিয়ে টাকা ধার চাইল। তারা টাকা কিছুতেই দিল না। ওর বাবা তখন সেই বাড়ির বুড়িটাকে একা পেয়ে খুন করে টাকা নিয়ে হাসপাতালে এল। কিন্তু এমনই কপাল খারাপ; ওর মা-টাও মরে গেল, আর বাবা খুনের দায়ে জেলে গেল। তারপর রতন তো একা হয়ে গেল। চেয়ে চিন্তে খেয়ে পেট ভরাতো কোনও রকমে। সেই রতন আস্তে আস্তে হয়ে গেল ‘তোলাবাজ রতন’।

আমি বলেছিলাম, ‘তুই তো হিন্দি সিনেমার গল্প বললি রে ঝুমুর’।

ঝুমুর করুণ গলায় বলেছিল, 'না রে, সিনেমার গল্প নয়, সবটাই সত্যি। ছোটবেলায় ও কত ভালো ছিল। আমার সঙ্গে কত ভাব ছিল! কিন্তু এখন রতনটা একদম পাল্টে গেছে। টাকা ছাড়া আর কিচ্ছু চেনে না। টাকার জন্য ও যখন তখন মানুষ খুন করতে পারে। আগে ও আমার বন্ধু ছিল, এখন ও আমার দারুণ শত্রু হয়ে গেছে জানিস!'

কেন রে, তুই কী করেছিস ওর?

ঝুমুর হঠাৎ আবেগ সামলে বলেছিল, 'সে অনেক কথা, পরে বলব।' 

সেই রতন ভিড়ের ভেতর থেকে এগিয়ে আসে এবার। হেঁড়ে গলায় বলে— কী কেস? কী হয়েছে এখানে?

ওর প্রশ্নটা ঝুমুরকে লক্ষ করেই। ঝুমুর কিছু বলার আগেই আমার পাশ থেকে রত্না বলে ওঠে— তেমন কিছু হয়নি। ওই রিপোর্টারটা...। 

রত্নার পুরো কথাটা না শুনেই রতন বলে— রিপোর্টার! কোন কাগজের? এই এই। কোন কাগজের তুমি?

রিপোর্টার ছেলেটা কয়েক পলক তাকায় বোম-রতনের দিকে।

রতন বলে ওঠে— কী হল? কথাটা মগজে হিট করেনি বুঝি! বলছি কোন কাগজের সাংবাদিক তুমি?

ছেলেটা বলে— আমি নির্দিষ্ট কোনও কাগজের নই। ফ্রিল্যান্সার। ফটোগ্রাফার আমি। ভালো ছবি পেলে ক্যামেরায় ধরি। যে কাগজে পয়সা বেশি দেয় তাকে বেচি। 

তা এখানে কী মতলবে, এইসব মেয়েদের ছবি তুলছ নাকি?

না, মেয়েদের নয়, উন্নয়নের। সামনে মিউনিসিপ্যাল ইলেকশন আছে তো! এলাকায় কেমন কাজকর্ম হচ্ছে সেসবের ছবি...!

লোকাল পার্টি-অফিসের পারমিশন নিয়ে এসেছ?

পারমিশন! কেন?

লোকাল কমিটির পারমিশন ছাড়া এখানে ছবিটবি তুলতে দেওয়া হয় না। চল, পাতলা হও। তা না হলে ক্যামেরাটা যাবে।

বোম-রতনের প্রশ্নের তোড়ে ঝুমুর কথা বলার সুযোগই পায়নি এতক্ষণ। এর মধ্যে ওর মাথায় কী খেলে যায় কেন জানে! রতনের ফরমান জারি হতেই দু’পক্ষ কয়েক মুহূর্ত চুপ।

সেই ফাঁকে ঝুমুর মিহি গলায় বলে— রতন, ও আমার চেনা। এখানে খালের ওপর ভাঙা কাঠের ব্রিজের পাশে ওই ঢালাই ব্রিজ, তারপর ওই যে বস্তি হঠিয়ে ভালো ভালো কমপ্লেকস হচ্ছে, ও-সবেরই ছবি তুলতে এসেছে। বলছিল ‘জনবাংলা’ কাগজের জন্য নাকি।   

আমি অবাক হই। ওকে ছবি তুলতে দেখে ঝুমুর গালাগালি দিয়ে তেড়ে এল ওর দিকে! অথচ ও-ই এখন রতনদার হাত থেকে ওকে বাঁচানোর জন্য ওর হয়ে সাফাই গাইছে! রতন কিছুটা শান্ত— ও, আমাদের কাগজের জন্য। ঠিক আছে ঝটপট তুলে নিয়ে চটপট কাট তো বাবা। এই যে আপনারা ভিড় জমিয়েছেন কেন? জ্যান্ত দুগ্গি দেখছেন নাকি! কাটুন সব!

রিপোর্টার ছেলেটার চোখে মুখে বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতা মেশানো। ঝুমুর বলে— আপনার ছবি তোলা তো হয়ে গেছে। চলুন এখন ওই ডাকুয়ার দোকানে চা খাই।

রত্না ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে চোখ ঠারে। ওদের দু’জনের চোখে চোখে কী কথা হয় কে জানে। রত্না বলে— ধুস, চা কী খাব! তার চেয়ে চল ফুচকা খাই। অনেকদিন ওই টেরুদার ফুচকা খাওয়া হয়নি।

এর মধ্যে রতন, পঙ্কার গুমটি থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ল্যাম্পপোস্টে ঝোলানো জ্বলন্ত নারকেল-দড়িতে সিগারেট ধরিয়েছে। সিগারেটে কষে একটা টান দিয়ে, নাক-মুখ দিয়ে ফুরফুর করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সরু চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

ঝুমুর আর রত্না একরকম প্রায় হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে থেকে টেনে নিয়ে আসে রিপোর্টারকে। হতবাক রিপোর্টারের মুখে কথা ফোটে এতক্ষণে— আচ্ছা, আপনি ওই মিথ্যা কথাগুলো বললেন কেন?

আপনাকে বাঁচানোর জন্য। জানেন ও কে? এলাকার টপ-মস্তান। লুকিয়ে আমাদের ছবি তুলছেন জানতে পারলে এতক্ষণে কিমা বানিয়ে দিত।

আপনি তো সেটাই চাইছিলেন। বিশ্রী গালাগাল দিয়ে যেভাবে আমার দিকে তেড়ে এলেন!

আজ আপনার ওই ক্যামেরা তাক করা, আর কালকের ঘটনা মনে পড়ায় আমার খুব রাগ হয়ে গিয়েছিল।

তা এখন হঠাৎ আবার সদয় হওয়ার কারণ?

সেটা ঠিক আপনাকে বোঝানো যাবে না।

আমি গবেট ঠিকই, তবে বোঝালে নিশ্চয় বুঝব!

পুরুষ মানুষ তো আপনি! মেয়েদের জ্বালাটা ঠিকঠাক বুঝতে পারবেন না। তবুও শুনতে চাইছেন যখন বলি, তবে, এগুলো যেন কাগজে লিখবেন না। তাহলে আমাদের বিপদ হবে।

কথা দিচ্ছি লিখব না।

আপনি আমাদের ছবি তুলছেন, আমরা প্রতিবাদ করছি, এটা ওই রতন-মস্তান জানলে আপনাকে কয়েকটা চড় থাপ্পড় দিয়ে ক্যামেরাটা কেড়ে নিত। সেটা করে ও আমাদের কাছে হিরো সাজত। তার প্রতিদানে ও আমাদের কাছে অন্যায় সুযোগ নিত কিংবা জুলুম করত। এমনিতেই অনেক দিন থেকে বাল্ব কারখানার মেয়েগুলোর ওপর ওর নজর। আমার সঙ্গে এখন ওর দুষমনি চলছে। 

তাহলে তো এমনিতেই জুলুম করতে পারে! বলছেন তো ও এলাকার টপ মস্তান।

সেটাতে একটু অসুবিধা আছে। ও পার্টির ছাতার নিচে আছে। নেতাদের ভয়ে সেটা পারবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ হওয়ার একটা অজুহাত পেয়ে যেত। তার ওপর আজকের কাগজে ছাপা ছবিটা নজরে পড়লে তো আর কথাই নেই। আমার ওপর ওর ন্যায়সঙ্গত অধিকার জন্মে যেত। সেটা থেকে রেহাই পেতেই...।

আমার ঝুমুরের কথাগুলো হা হয়ে শুনতে থাকি। ঝুমুরকে কেমন যেন অচেনা লাগে। এমনভাবে ঝুমুরকে কথা বলতে শুনিনি কখনও। ওর কথায় মধ্যে সব সময় খিস্তি মেশানো থাকে। কেমন একটা বস্তির ‘টোন’ থাকে। কিন্তু এখন...! তবে কি ও ইচ্ছে করেই আমাদের সঙ্গে ওইভাবে কথা বলে। এটাই হয়তো ঠিক, ও তো বস্তির মেয়ে নয়, ভদ্রঘরের মেয়ে। এখন কপালদোষে খালপাড়ের ঝুপড়িতে থাকতে হচ্ছে। ঝুপড়ির অন্যান্যদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিংবা ওদের মধ্যে টিকে থাকার জন্যই, হয়তো ইচ্ছে করে ও কথার ধরন পাল্টে ফেলেছে! সত্যিই ঝুমুরকে আমি যত দেখছি, তত অবাক হচ্ছি। ও এখন এমনভাবে রিপোর্টারকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে, যেন ও কতদিনের চেনা!

আমরা গুটি গুটি পায়ে এগোই ছাতিমতলার দিকে। ওখানে ফুচকাওলা ওর ডালা পেতেছে। অনেকদিন ধরে ও এই একই জায়গায় ডালা লাগায়। আমি তো বছরখানেক ধরে দেখছি। প্লাইউড কারখানা আর আমাদের বালব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে ওর বিক্রি কমেছে বোধহয়! এখন তেমন ভিড় নেই। শুধু একটা লাফাঙ্গা গোছের ছেলে, তিনটে মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে হ্যা-হ্যা করছে আর ফুচকা খাচ্ছে। তার মধ্যে একজনের সিঁথিতে সিঁদুর আছে। দেখে মনে হল, সে ওর বউ আর দু’জন শালি হতে পারে। আবার তা না-ও হতে পারে।

আগে তো এসময়ে ফুচকাওলার চারপাশে ভিড় লেগে যেত। আমরা প্রায় প্রতিদিনই ওর কাছে ফুচকা খেতাম। ওর যে আসল নাম কী, আমরা কেউ জানি না। ওর চোখ ঈষৎ ট্যারা বলে আমরা ওকে ‘টেরুদা’ বলি। ও কিছু মনে করে না। আস্তে আস্তে ওটাই ওর নাম হয়ে গেল। আমাদেরকে ও খুব ভালোবাসে। হিসেব মতো ফুচকা দেওয়া হয়ে গেলেও সবশেষে একটা করে আলুভরা শুকনো ফুচকা ফাউ দেয়। ফুচকাওলা একসঙ্গে এতগুলো খরিদ্দার পেয়েছে। তাই ব্যস্ত হাতে আলুর খোসা ছাড়িয়ে, তেঁতুলজল আর মশলা দিয়ে আলু চটকাচ্ছে। ও জানে, আমরা ঝাল বেশি খাই।

আমাদের বাল্ব কারখানায় একঘন্টা টিফিন টাইম ছিল। দুপুর দুটো থেকে তিনটে। আসলে ওটা লাঞ্চ-টাইম। কাছে পিঠে যারা থাকে, তারা বাড়িতে খেতে যেত। কেউ টিফিন-ক্যারি থেকে ভাত-তরকারি বের করে খেতে বসত। আমরা জনাচারেক মেয়ে ভাত খেতে যেতাম না। ঝালমুড়ি কিংবা ফুচকা খেতাম। কোনওদিন হয়তো আর একটু হেঁটে রাসমনি বাজারের মোড়ে আসতাম। 

ওখানে সাউথ-ইন্ডিয়ান ছেলেটার কাছে ইডলি খেতাম। টিফিন খাওয়ার পরেও আমাদের হাতে সময় থাকত বেশ কিছুটা। আমরা সেসময়টুকু লুডো খেলতাম কাজের একঘেয়েমি কাটাতে। জোড়ায় জোড়ায় ঘর খেলতাম। আমার জুটি হত ঝুমুর। আর রত্নার জুটি সুলেখা। কখনও সাপলুডো খেলতাম। বেশ মজা হত এই সময়টুকু। বেশিরভাগ দিনই আমরা বাজি ধরে লুডো খেলতাম। ফুচকা বাজি। যারা হারত তারা ফুচকার দাম দিত। আজ ফুচকার দাম কে দেবে জানি না। রত্না ফুচকাওলার ডালা থেকে শালপাতার ঠোঙা নিয়ে সকলের হাতে হাতে ধরিয়ে দিল।

রিপোর্টার ছেলেটা বোম-রতনের হাত থেকে বাঁচার জন্যেই হোক, ঝুমুরের এমন কথাবার্তার জন্যই হোক, কিংবা নিজের প্রয়োজনের তাগিদেই হোক, আমাদের সঙ্গে ফুচকাওলার কাছে এসেছে। হঠাৎ ওর হাতে শালপাতার ঠোঙা গুঁজে দিতে ওর যেন বোধবুদ্ধি হল। বলল— আরে! আমি ফুচকা খাই না। আপনারা খান। তা না হলে চলুন চা খাওয়া যাক।

রত্না বলে ওঠে— সে কী, ফুচকা খান না! ফুচকা হল জাতীয় খাবার। দেশের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সব অঞ্চলের খাবার মিলিয়ে মিশিয়ে এ খাবার তৈরি; আর আপনি তা খান না?

ছেলেটা কৌতূহলী, সেটা কী করে হয়? 

রত্না এবার বালব কারখানার চন্দনদার কাছে বহুবার শোনা সেই কথাগুলো বেশ রসিয়ে নিজের মতো করে ঝাড়ে— দেখুন, ফুচকার খোলটা হল আটা, সুজি আর ডাল বাঁটা দিয়ে তৈরি পুরী বা কচুরির মতো। লুচি-পুরী হল উত্তর ভারতের একচেটিয়া। সেই খোলের ভেতর ফুটো করে আলু ঢোকায়। আলু পূর্ব ভারতের। আমরা আলু খাই খুব। বিহারেও তো একটা কথা চালু আছে, ‘সমোসা মে আলু, বিহার মে লালু’। তারপর ধরুন মশলাটার কথা। ভাজা ধনে, ভাজা জিরে শুকনো লঙ্কা গুঁড়ো করা যে মশলাটা আলুতে মেশায় সেটা তো মাড়োয়াড়ি, গুজরাটিদের। তার মানে কিনা পশ্চিম ভারতীয়দের। আর সবশেষে তেঁতুলগোলা জলে চুপুস। তেঁতুল তো জানেনই দক্ষিণীদের স্পেশাল আইটেম। তাহলে...!

রিপোর্টার ছেলেটা রত্নার কথা শুনে হো-হো হেসে ওঠে— বাঃ, দারুণ বলেছেন তো! ফুচকা নিয়ে আপনি এতকিছু ভাবেন?

সুলেখা বলে ওঠে— ও ভেবেছে নাকি! চন্দনদার কথা ঝেড়ে বলল। 

রত্না বলে— ঝেড়েই বলি আর নিজেই বলি, বললাম তো! ফুচকা নিয়ে দারুণ কথা শুনলেন যখন, আজকের ফুচকার দাম আপনি দেবেন কিন্তু!

রত্নার কথায় আমার খারাপ লাগে। পারেও বটে মেয়েটা। চেনা নেই জানা নেই। ওকে টেনে নিয়ে এল ফুচকা খাওয়ার জন্যে। ওর সঙ্গে ভাব জমানোর কী দরকার ভেবে পাই না। আমার তো মোটেও ভালো লাগছে না ছেলেটাকে। কী ধান্দা আছে কে জানে! বলে কিনা ইন্টারভিউ নেবে। যতসব ঢপবাজি কেস! ঝুমুরকেও বলিহারি যাই! যে খবরের কাগজে তোর ছবিসহ নোংরা খবর ছেপেছে, তার সঙ্গে কিসের এত মাখামাখি!

সত্যিই লাজ-লজ্জার মাথা খেয়েছে ও। আমার তো বেশ ভয় লাগছে, আমাদের অজান্তে তখন ছবি তুলে নিয়েছে কিনা কে জানে! ঝুমুর আবার আমার পাশেই ছিল। কালকের কাগজে যদি ঝুমুরের সঙ্গে আমারও ছবি ছেপে দেয়, আর খবরে আজেবাজে কথা লিখে দেয়; তাহলেই তো হয়েছে। পাড়ায় ঢি-ঢি পড়ে যাবে। কারুর কাছে আর মুখ দেখানো যাবে না। বাবা হয়তো আঁশবটি দিয়ে কেটেই ফেলবে!  ইস! কী কুক্ষণে যে দেখা হয়ে গেল সুলেখার সঙ্গে। ওদিকে রুমির সঙ্গে দেখাও করা হল না। কাজের ব্যাপারটা আবার কেঁচিয়ে না যায়! সুলেখার কোনও হ্যাঁৎ-ক্যাঁৎ আছে! চিরকেলে হাবা ওটা! কিসে ভালো, কিসে মন্দ, তা ভাবেই না কখনও। পেছনে পেছনে থাকতে জানে শুধু!

রিপোর্টার ছেলেটা বলে— আপনাদের ওপর যে অন্যায় অত্যাচার চলছে, কারখানা তুলে দিয়ে, সেখানে কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে, জমির মালিক ও প্রমোটার লাখ-লাখ টাকা কামাচ্ছে; অথচ আপনাদের বিকল্প কাজের কোনও ব্যবস্থা হচ্ছে না। এগুলোই আমরা আমাদের কাগজের মাধ্যমে তুলে ধরতে চাই। এতে আপনাদের কোনও ক্ষতি হবে না। বরং ভালোই হবে। কিছু মানুষের অন্তত টনক নড়বে, সরকার বা প্রশাসনের টনক না নড়ুক। সে কারণেই আপনাদেরকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করব।

আমরা সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করি। কী বলব ভেবে পাই না। রত্না বলে ওঠে— আমরা কিছু বলব না। আমাদের ওপর যখন ওরা খেপে উঠবে, তখন কি আপনি আমাদের বাঁচাতে আসবেন? 

সুলেখা বলে— আমিও কিছু বলব না। 

আমিও তালে তাল মিলিয়ে বলি— না বাবা! আমিও মুখ খুলব না। কী হতে কী হয়! শেষে...! 

ছেলেটা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। এমন সময় ওর হাতে ধরা শালপাতার ঠোঙায় পড়ে তেঁতুলজল ভর্তি একখানা ফুচকা। ঝুমুর বলে— নিন, ফুচকা খান। এ ব্যাপারে আজ কোনও কথা হবে না। আমি ময়দান এলাকায় দেখা হলে সব বলব একদিন। আর একটা কথা, আপনি যদি আজ আমাদের ছবি তুলে থাকেন, তা যেন মোটেও ছাপবেন না। এরা আমার মতো খারাপ নয়, খুবই ভালো মেয়ে। ওদের মান-সম্মান আছে। ওরা ভদ্রঘরের মেয়ে। আপনি যদি চান, আমি হটকেক-মার্কা ছবি তোলার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। কাল ময়দানে আসুন।   

ছেলেটা কিছু না বলে ফুচকা মুখে পোরে। আমাদেরকে একসঙ্গে ফুচকা খেতে দেখে পথচলতি কেউ এক জন আওয়াজ দেয়— ওয়ান টু কা ফোর, ফোর টু কা ওয়ান...। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখতে গিয়ে দেখি, ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট ধরিয়ে বোম-রতন গটগটিয়ে আসছে আমাদের দিকে। তা দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। ইশারায় ঝুমুরকে দেখাই।

এমন সময় ঝুমুরের মোবাইল বেজে ওঠে। ঝুমুর মুখের মধ্যে ভরা ফুচকাটা কোনক্রমে গলার ওপারে চালান করে, মোবাইলের বোতাম টিপে বলে— হ্যাঁ বল।

কার ফোন, কী বলে, বোঝা যায় না। তার উত্তরে ঝুমুর বলে— কালকে? কটার সময়?

যে ফোন করছে সে হয়তো সময়টা বলে দেয়।

ঝুমর বলে— ঠিক আছে, যাব। তবে আমার কালকের আমদানিটা ঝাড় হবে, এই আর কী! 

প্রত্যুত্তরে বোধহয় ও প্রান্ত থেকে আশ্বাসদায়ক উত্তর পায় ঝুমুর। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। 'ঠিক আছে, ঠিক আছে' বলে ও ফোনের লাইন কেটে দেয়।

এর মধ্যে রতন আমাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি ভয় পাচ্ছি, এই বুঝি ফটোগ্রাফার ছেলেটার ওপর চড়াও হয়। হয়তো মিথ্যাটা ধরে ফেলেছে। কিন্তু না, রতন তেমন কিছু করে না। ও ঝুমুরের ফোনে কথা শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করে। তারপর বলে— অ্যাই, তোর কাছে একটা ফোন-নম্বর হবে? 

কার ফোন নম্বর?

ওই যে তোর সঙ্গে কাজ করত, রুমি না কী যেন নাম; এখন খেলারামের বউ হয়েছে। ওর নম্বরটা একটু চাই আমার। খেলার মোবাইলটা সুইচড অফ বলছে।  

ঝুমুর ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে ওঠে— ও সেই স্বার্থপর রুমিটার কথা বলছিস তুই! ওর নম্বর তো নেই আমার কাছে! ও এখন বড়লোকের বউ হয়েছে, আমাদের সঙ্গে কি যোগাযোগ রাখবে!

নেই, না? ঠিক আছে। অন্য কোথাও থেকে জোগাড় করে নেব। আর বলছিলাম, এই যে রিপোর্টার! তোমার মোবাইল নম্বরটা একটু দাও তো! তেমন কোনও খবর থাকলে জানাবো তোমাকে ‘জনবাংলা’ কাগজের জন্যে। 

রিপোর্টার ছেলেটা লাজুক হেসে বলে— এখনও ও জিনিসটা কেনার পয়সা জোটাতে পারিনি দাদা। ফ্রিল্যান্সিং করে আর ক’টাকা পাই! পেপারে দেখছি এখন দাম কমেছে। সামনের মাসে একটা কিনব ভাবছি।

বোম-রতন ঝুমুরকে বলে— শোন, রিপোর্টারদের সঙ্গে মাখামাখি না করাই ভালো, বুঝেছিস! তাতে লাভ হবে না।

তারপর নিজের মনেই একটা খিস্তি দিয়ে হন হন করে চলে যায় ডিউভিউ কমপ্লেক্সের ভেতরে। যেখানে এখনও সিমেন্ট-বালি-পাথর মেশানোর যন্ত্রটা থেকে ঘটাং-ঘট শব্দ বেরোচ্ছে।

রতন চলে যাওয়ার পরেই রিপোর্টার ছেলেটার জিন্সের পকেটে রাখা মোবাইল বেজে ওঠে টি-টি শব্দ করে। আমি ভাবি, ভাগ্যিস রতন থাকতে ফোন আসেনি।

ছেলেটা পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করে— হ্যাঁ, আধঘন্টার মধ্যেই পৌঁছব। ছাড়ছি।  

তড়িঘড়ি মানিব্যাগ বের করে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট নিয়ে ঝুমুরের হাতে গুঁজে দেয়, ফুচকার দামটা দিয়ে দেবেন ম্যাডাম। চলি। আমার একটু তাড়া আছে। কাল দেখা হচ্ছে।

ঝুমুর বলে— হ্যাঁ, কাল সন্ধে ছ’টায়। শালা রতনটা শাসিয়ে গেল আমাকে। আমিও দেখে নেব।

ঝুমুরের চোখে যেন আগুন জ্বলছে। আমি, রত্না আর সুলেখা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। বোম-রতনের সঙ্গে ওর কেন ঝগড়া, কিসের ঝগড়া তা আমরা জানি না। কিন্তু ঝগড়া যে একটা আছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।

রতন-মস্তান একদিন দলবল নিয়ে আমাদের কারখানায় পার্টির চাঁদার নামে তোলা তুলতে এলে, ঝুমুর বলেছিল, রতন এখন ওর দারুণ শত্রু। কেন শত্রুতা তা আর শোনা হয়নি। ও বলেছিল পরে বলবে। একদিন শুনতে হবে ঘটনাটা। আসলে ওকে একা পাওয়াই মুশকিল। সকলের সামনে হয়তো বলতে চাইবে না। আর আজ এখন? ওর চোখে যা রাগ ফুটে উঠেছে দেখছি, এখন ওকে ঘাঁটানো ঠিক হবে না।

 

চার

কাল বিকেলে ঝুমুরের মোবাইলে ফোন করে আমাকে বেশ দু’কথা শুনিয়ে দিয়েছিল রুমি। ওকে অবশ্য দোষ দেওয়া যায় না। কাজটা আমার দরকার; আমারই ঠিক সময়ে পৌঁছনো উচিত ছিল। আজ আর গড়িমসি করিনি। ঠিক চারটেই যেতে বলেছে সোজা র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টারে। আমি তিনটেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। আমার তো মোবাইলফোন নেই। তাই বেরিয়েই সেলুনের হিপিদা'র মোবাইলফোন থেকে একটা ফোন করে দিয়েছি রুমির মোবাইলে— আমি বেরিয়ে পড়েছি। তুই যেন সেন্টারে থাকিস প্লিজ! 

ফোন করে নিশ্চিত হয়ে আমি সোজা হাঁটা দিয়েছি রাসমনি বাজার বাসস্টপের দিকে। ফুলবাগান দূর কম নয়, বাস ধরে যাওয়াই ভালো। রাসমনি রোড ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় দেখি, একটা মনোহারি দোকানের সামনে কাজরি দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর হাতে একটা বিগসপার ব্যাগ। দোকানের ছেলেটার সঙ্গে কথা বলছে। তাই আমাকে লক্ষ্য করেনি। ইচ্ছে হলেও আমি ওর সঙ্গে দেখা করাটা এড়িয়ে গেলাম। কালকের মতো যদি ফেঁসে যাই আবার। 

কাজরি আমাদের সঙ্গে বাল্ব কারখানায় কাজ করত। বিয়ের পর কাজ ছেড়ে দিয়েছে। ও বারোয়ারিতলা রোডে শান্তি সংঘের কাছাকাছি কোথাও থাকে। ওর বিয়েতে আমরা এসেছিলাম ঠিকই। ‘আলোছায়া’ হলের পাশে বিয়ে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বিয়ে হয়েছিল। সেখানেই গিয়েছিলাম আমি, ঝুমুর, সুলেখা আর রত্না। তখন কাজরির বাড়িটা আর দেখা হয়নি। কলিমুদ্দিন লেনে ওর শ্বশুরবাড়ি। ওর বাড়ি থেকে বেশি দূর নয়, যেন এপাড়া-ওপাড়া। 

চাউলপট্টি রোডে বাল্ব কারখানা থেকেও ওর শ্বশুরবাড়ি বেশি দূর নয়। কিন্তু ওর বর, মন্টুর ইচ্ছে নয়, বউ এসব কাজ করে। মন্টু ফরটি ফাইভ রুটের বাসের কন্ডাক্টর। ও বলে, 'আমি যা রোজগার করি, বউকে খাওয়াতে পরাতে পারব। ওকে খেটে খেতে হবে না।'

মন্টুর সঙ্গে কাজরির প্রেম করে বিয়ে। ‘আলোছায়া’ সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে গিয়ে ওদের আলাপ হয়। ঝগড়ার মধ্যে দিয়ে ওদের নাকি প্রথম আলাপ। সে এক মজার ঘটনা। শুনে তো আমরা হেসে গড়াগড়ি। কাজরি ঘটনাটা বলেও বেশ রসিয়ে। ‘আলোছায়া’তে ইভনিং শো-য়ে ‘দেবদাস’ দেখতে গেছে। দেবদাস-শাহরুখের সঙ্গে ঐশ্বরিয়া-পারুর প্রেমপর্ব চলছে। তখন কাজরি নাকি আবেগে সামনের চেয়ারে ওর পা তুলে দিয়েছে। 

সামনের সিটে বসেছিল মন্টু। ওর পাছায় কাজরির পা লেগেছে।

এই যে পা-টা নামান।

ও! স্যরি স্যরি।

এই ছিল দু’জনের প্রথম কথা বিনিময়। কিছুক্ষণ পরে ভুলে আবার পাছায় লাথি। এবার আর ভদ্র ভাষায় নয়, বাস-কন্ডাক্টরি ভাষাতেই ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল মন্টু। কাজরিও কম যায় না। আশেপাশের লোক ওদেরকে না থামাতে পেরে হলের বাইরে গিয়ে ঝগড়া মিটিয়ে আসতে বলেছিল। হাফ টাইমে বাইরে বেরিয়ে এমন ঝগড়া মিটল যে, একে অপরের দিওয়ানা হয়ে গেল। বছর দুয়েক পার্ক, সিনেমা হল, রেস্টুরেন্ট, সুভাষ সরোবর করার পর কালিঘাটে সিঁদুর দান।

বাসস্টপে পৌঁছে দেখি একটা ফরটি ফাইভ আসছে। ঝট করে মনে আসে, মন্টুদা'র সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে না তো! এ বাসটাতেই যদি মন্টুদা' থাকে।

বাসটা এসে সামনে দাঁড়াতেই উঠে পড়লাম। না, এ বাসের কন্ডাক্টর মন্টুদা নয়। যাক, বাঁচা গেছে। দেখা হলে আবার হাজারো প্রশ্ন! আসার সঙ্গে সঙ্গে বাস পেয়ে গেলাম। সাড়ে তিনটের মধ্যেই ফুলবাগান পৌঁছে যাব মনে হচ্ছে। ভালোই হয়েছে। একটু সময় পেলে রুমির সঙ্গে গল্পগুজবও করা যাবে। ওর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তো তেমন দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। সেদিন ভাগ্যিস দেখা হয়ে গেল তাই...!

আচ্ছা, ঝুমুর কাল বলছিল, মাসাজ করার কাজ হলে না করার জন্য। ওর কী করে ধারণা হল যে, মাসাজ করার কাজটা খারাপ! ও কি তবে করেছে কখনও? নাকি আমার দ্বারা মাসাজ হবে না, তাই ভেবে বলেছে! আমি তো মোটামুটি মাসাজ করতে পারি। আগে মায়ের মাজায়, ছোটকাকার হাতে-পায়ে-পিঠে কত মাসাজ করে দিয়েছি। ছোটকাকা বলত, আমি নাকি এত সুন্দর গা-হাত-পা টিপে দিই, ঘুম এসে যায়। এখন অবশ্য ছোটকাকা গা-হাত-পা টিপতে বললেও আমি টিপি না।

সত্যি কথা বলতে কি ছোটকাকার ঘরে ঢুকতেই আমার কেমন এক অস্বস্তি হয়। তা না হলে রোজ সকালে ছোটকাকার বিছানা ঝেড়েঝুড়ে পেতে দেওয়া, ঘরখানা একটু সাফসুতরো করে দেওয়াটা আমারই কাজ। একদিন হয়েছে কী, সাতসকালেই আমি বেরিয়েছিলাম। আগের দিন রত্না বলে রেখেছিল, ওর বাবার ‘কেমো’ করানো হবে। ওর একার পক্ষে অসুবিধা। সঙ্গে একটু গেলে খুব উপকার হয়। তাই সেদিন সকালে আর ছোটকাকার ঘর পরিষ্কার করা হয়নি। যখন বেরোই, তখনও তো ছোটকাকা ঘুমোচ্ছিল। দুপুরে ফিরে স্নান করতে যাওয়ার আগে মনে পড়ল, ছোটকাকার ঘরটা আজ মোছা হয়নি। আমি বালতিতে জল আর ন্যাতা নিয়ে ঘরে ঢুকলাম।

দেখি, ছোটকাকা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে মনোযোগ দিয়ে একটা চটি বই পড়ছে। আমি উবু হয়ে বসে ন্যাতা দিয়ে ঘর মুছছি নিজের খেয়ালে। হঠাৎ দেখি কাকা আমার বুকের দিকে কেমন চোখে তাকিয়ে আছে। আমি ম্যাক্সি পরে ছিলাম, গায়ে গামছা জড়ানোও ছিল না। হয়তো অসাবধান হয়ে পড়েছিলাম তাড়াহুড়োতে। কাকার চোখে চোখ পড়তেই চোখ সরিয়ে নিয়েছে কাকা। আমার খুব লজ্জা লেগে গেছে। সে লজ্জা ঢাকতেই আমি তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম— ছোটকাকা কী বই পড়ছ গো এত মন দিয়ে?

আমার কথাটা শোনা মাত্রই কাকা ঝট করে বইটা বালিশের তলায় ঢুকিয়ে দিয়ে বলল— এমনি একটা বই, কিছু না, ম্যাগাজিন...ম্যাগাজিন। তোর ঘর মোছা হয়েছে? যা তুই!

কাকার দিকে তাকিয়ে দেখি, চোখে মুখে কেমন একটা চোর-চোর ভাব। কথাগুলোও কেমন তোতলানো। আমি তখন চলে এলাম ঠিকই, কিন্তু মনে একটা সন্দেহ ঢুকে গেল। কৌতূহলও হল কিছুটা। ছোটকাকা বইটা ঝট করে লুকিয়ে ফেলল কেন?

পরের দিন সকালে বিছানা ঝাড়তে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেল বইটার কথা। দেখি তো কী বই পড়ছিল কাকা! বালিশের তলায় খুঁজলাম। নেই। ঘরের মধ্যে অন্যান্য বইপত্তরের মধ্যে খুঁজলাম, পেলাম না। বইটা খুঁজে পাওয়ার নেশা যেন আমায় পেয়ে বসল। খুঁজতে খুঁজতে বিছানার তোশকের তলা থেকে পেয়ে গেলাম বইটা। ওপরে একটা ন্যাংটো মেয়ের ছবি। তার মাথার কাছে লেখা DIBONARE। পাতা উলটিয়ে দেখি ইংরিজি পত্রিকা। ভেতরে অনেক ছবি। ছেলেদের, মেয়েদের। সবই ন্যাংটো ছবি। আর কী বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি! এমন ছবি কখনও দেখিনি আমি। আজ প্রথম দেখলাম। ছবিগুলো দেখে খুব লজ্জা লাগছিল আমার। কিন্তু দেখে অদ্ভুত একরকম অনুভূতি হচ্ছিল। ঠিক বলে বোঝানো যাবে না সে অনুভূতি।

দেখতে দেখতে কখন ছবিগুলোর মধ্যে ডুবে গেছি। আমি যে ছোটকাকার ঘরে, সে হুঁশই নেই। হঠাৎ বইয়ে ছায়া পড়তে দেখি দরজায় চৌকাঠ ধরে ছোটকাকা দাঁড়িয়ে। সকালের টিউশনি সেরে কখন যে ফিরে গেছে! সেই মুহূর্তে আমি কী করব বুঝে উঠতে পারি না! ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি কাকার দিকে। কাকার চোখে-মুখে রাগ, নাকি আনন্দ, লোভ নাকি ঘৃণা, নাকি সবকিছু মিলেমিশে অচেনা কেমন এক ভাব। কয়েক মুহূর্ত পরে সম্বিত ফিরতেই, বইটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে আমি চলে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কাকা যে দরজা আটকে দাঁড়িয়ে! যাব কী করে! 

কিছুই যেন হয়নি, এমন ভান করে সহজ গলায় ছোটকাকা বলে— ‘সীমু! বিছানার চাদরটা কেচে দিস তো! খুব নোংরা হয়েছে।

আমি বিশ্রী দাগ ধরা চাদরটা তুলে নিয়ে, ছোটকাকার পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। তারপর থেকে ছোটকাকার চোখে চোখ রাখিনি বেশ কয়েকদিন। সেই থেকে ছোটকাকার গা-হাত-টিপে দেওয়া দূরের কথা; কাকা ঘরে থাকলে, ঘরেই ঢুকি না। ওই বইটার ছবিগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। কাকা যদি ওই ছবির ন্যাংটো পুরুষ হয়ে যায়! নিজেকে কেমন ওই ছবির মেয়েটা মনে হয়। কোনও পুরুষ মানুষের শরীর দলাই-মলাই করতে গিয়ে যদি...! না না, ছিঃ!

 রুমির ওখানে কাজটা এমন হলে কিছুতেই রাজি হব না। তবে আমার মনে হয়, এমন কাজের কথা আমাকে বলবে না রুমির হাজব্যান্ড। রুমি তো জানে, আমি কেমন মেয়ে! ও নিশ্চয় আমার ব্যাপারে বলেছে ওর বরকে। কত রকমের তো কাজ থাকে যে কোনও কোম্পানিতে বা দোকানে। আমাকে ক্যাশ কালেকশনেও দিতে পারে। রুমি তো জানে, আমি কতখানি বিশ্বস্ত। সে না হোক, আজকাল পার্লার, হোটেল, রেস্টুরেন্ট এমন কি বড় বড় কাপড়ের দোকানেও রিসেপশনিস্ট দেখা যায়! এ কাজটাও মন্দ নয়। তবে, একটু চটপটে ও স্মার্ট হতে হয়। রিসেপশনিস্টের কাজ হলেও পারব ঠিক। প্রথমে দু’ একদিন একটু অসুবিধা হবে। সেটা যে কোনও কাজেই হয়। তবে, এই কাজটাতে বাংলা, হিন্দি, ছাড়াও ইংরিজি ভাষা জানতে হয়। হিন্দিটা ভালোই বলতে পারি। কিন্তু ইংরিজিটা...। এখানে অবশ্য ইংরাজির তেমন দরকার হবে না মনে হয়। খদ্দের তো আসে সল্টলেক, নিউটাউন, উল্টোডাঙা, লেকটাউন এ-সব জায়গা থেকে। ওরা বাংলা আর হিন্দি বলে বেশির ভাগ।  

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ফুলবাগানে পৌঁছে গেছি! কন্ডাক্টর ‘ফুলবাগান ফুলবাগান, এগিয়ে আসুন’ বলে হাঁক পাড়তেই হুড়মুড় করে গেটে চলে আসি।

এ চত্বরটায় আসিনি কখনও। বেশ জমজমাট এদিকটা। আমাদের রাসমনি বাগানের কথা না হয় বাদই দিলাম; রাসমনি  বাজার, দেশবন্ধু, আলোছায়া এসব এলাকা থেকে আরও বেশি ঝিকঝাক। ঝলমলে দোকানপাট, ব্যাংক, নার্সিংহোম, রেস্টুরেন্ট, ওষুধের দোকান সবকিছু মিলিয়ে ঝাক্কাস ব্যাপার-স্যাপার। রুমি ঠিকই বলেছে, এমন জায়গায় পার্লার কিংবা মাসাজ সেন্টার তো রমরমিয়ে চলবেই। এখন মানুষের হাতে প্রচুর পয়সা। খরচ করার জায়গা তো চাই নাকি? পরক্ষণেই মাথায় আসে, সব মানুষের হাতে প্রচুর পয়সা নেই। কিছু মানুষের কাছে...আচ্ছা! আমার বাবা, কাকা, কিংবা ওই ঝুমুর, রত্না, সুলেখাদের প্রচুর পয়সা নেই কেন? ওরাও তো কাজ করে! বাবা তো সেই সকাল ন’টায় বেরোয়, রাতে ফেরে ক্লান্ত হয়ে। ছোটকাকা ভোরবেলা থেকে টিউশনি শুরু করে রাত অবধি পড়ায়। তবুও এই র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টারে একবার আসার শখ মেটানোর টাকা জোটে না ছোটকাকার। 

এসব ভাবতে ভাবতে বেশ কিছুটা হেঁটেছি বাস থেকে নেমে। হঠাৎ মনে হল, যাঃ বাবা! এতখানি পথ তো হাঁটলাম! মাসাজ সেন্টারটা চোখে পড়ে কই! রুমির বুঝিয়ে বলে দেওয়া পথ ধরে তো এগোচ্ছি। ওই যে বড় নার্সিংহোমটার কথা বলেছিল। ওর পাশেই নাকি! চোখে তো পড়ছে না সাইন-বোর্ডখানা! এদিক ওদিক তাকাতে হঠাৎ চোখে পড়ে নার্সিংহোমের পাশের গলিটার মুখে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে রুমি— অ্যাই সীমা! এই যে এদিকে...!

গলিটার মুখে অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে। এগোনো মুশকিল। গাড়িগুলোর ফাঁক গলে রুমির কাছে পৌঁছে বলি— এত গাড়ি কীসের জন্যে রে?

রুমি হেসে বলে— আমাদের কাস্টমারদের, তারপর ওই নার্সিংহোমের পেসেন্ট-পার্টির। চল এই গলির ভেতর আমাদের সেন্টার।

আমি রুমির সঙ্গে এগোই। আমার বেশ ভালো লাগে— আমার জন্যে ও গলির মুখে এগিয়ে এসেছে। ও বেশ আন্তরিক। কারখানায় কাজ করার সময় খুব যে মিশত আমাদের সঙ্গে, এমনটা নয়। ওই টুকটাক কথা, ওর প্রেমের হালচাল কেমন, এ ব্যাপারে দু’একটা হাসি-ঠাট্টা। বিয়েতে নেমন্তন্ন করার পর যা একটু মাখামাখি বেশি হয়েছিল। তারপর তো কাজ ছেড়েই দিল।

ওর সঙ্গে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করি— হ্যাঁ রে, এ-রকম সব দামি দামি গাড়ি চড়ে আসে তোদের কাস্টমার?

হ্যাঁ, সব পয়সাওলা। এখানে এসে মজা পায় বলেই তো আসে।

মজা মানে! এটা কি মজার জায়গা নাকি?

না, মজা মানে আরাম আরাম। এন্টারটেইনমেন্ট।

বাব্বা! তুই কি ভারি ভারি কথা শিখেছিস!

‘এন্টারটেইনমেন্ট’ আবার ভারী কথা কি! থাকতে থাকতে তুইও শিখে যাবি। এর মানে হল বিনোদন।

ও! বিনোদনের জন্য এত মানুষও এখানে! আমি ভেবেছিলাম শরীরের ব্যথা কমানোর জন্য শরীর দলাই-মলাই করতে আসে মানুষ।

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে একবার বাবুঘাটে গিয়েছিলাম গঙ্গাস্নান করতে। ওখানে দেখেছিলাম, ইয়া চেহারার একজন লোক পাকা চাতালে খালি গায়ে উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে। আর একজন কাঠখোট্টা মার্কা লোক তার গায়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছে। ফট ফট করে আওয়াজ বেরোচ্ছে যখন মাথা দলাই-মলাই করছে।

আচ্ছা, তুই এত বোকা কেন রে সীমা! এই যে গাড়ি চড়ে লোকগুলো আসে, এরা কি কোনও শারীরিক পরিশ্রম করে, যে শরীর ব্যথা হবে! এদের তো সব মগজের কাজ-কারবার। বড় বড় বিজনেসম্যান, পুলিশ অফিসার, আমলা, রাজনৈতিক নেতা এরা আসে। শরীরের ব্যথা কমাতে নয়, শরীরের আগুন কমাতে। তুই আমাদের সেন্টারে চল আগে। দেখলেই বুঝবি।

আমি বলি, আমাদের পাড়ায় হিপিদার ভাই গুপি আছে না, ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাসাজ করে দেয়। ওর খদ্দেররা হল সব রোগি। কেউ স্পন্ডিলাইটিসের ব্যথায় ভুগছে। কারও প্যারালিসিস হয়ে একটা সাইড অবশ হয়ে গেছে। কারও আবার আর্থ্রাইটিস। আমি ভেবেছিলাম এখানে ওই সব রোগিরা আসে হয়তো গাড়ি চড়ে।   

এখানেও ওইরকম রোগি আসে। তবে সংখ্যায় কম। স্পন্ডিলাইসিসের ব্যথায় কষ্ট পাওয়া রোগির চেয়ে মনের ব্যথায় কষ্ট পাওয়া রোগিই বেশি। এক অঙ্গ অবশ হয়ে যাওয়া রোগিরা বাড়িতে শুয়েই মাসাজ করায় ওইরকম হিপি-গুপিদের দিয়ে। কিন্তু বিশেষ অঙ্গ অবশ হয়ে যাওয়া রুগীরা এখানে আসে অবশ অঙ্গকে বশে আনতে।

কথাটা শেষ করেই রুমি ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হাসে। আমি ব্যাপারটা আন্দাজ করলেও নিশ্চিত হতে পারি না। এমনটা হয় নাকি। কথা বলতে বলতে আমরা একটা হলুদ রংয়ের পুরোনো বাড়ির কাচের দরজার সামনে এসে গেছি। কাচের মধ্যে দিয়ে ভেতরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। রুমি বলে— আয়, এই আমাদের সেন্টার।

রুমি দরজা ঠেলে ধরে। ভেতরে ঢুকি। সুন্দর করে সাজানো অফিস রুম এটা। রুমি বলে— বস, আমার হাজব্যান্ড এখনও আসেনি। চারটেয় এসে যাবে। 

আমি রুমির সামনাসামনি চেয়ার বসি। ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। এ.সি. আছে নিশ্চয়। আমি বলি— তাহলে এখন সেন্টার চালাচ্ছে কে?

সে তো লোকজন আছে। পার্মানেন্টলি আটটা মেয়ে আর দু’জন ছেলে কাজ করে। তার মধ্যে তিন জন চিনা মেয়ে, দু’জন নেপালি। আর বাঙালি মেয়ে আছে তিনজন। ছেলে দুটো বাঙালি। ওরাই সেন্টার চালায়। আর রিসেপশনিস্ট কাম ক্যাশিয়ার কাম ম্যানেজার হিসেবে আমি তো রয়েছি। কাস্টমার এলে আমিই অ্যাটেন্ড করি। ক্যাটালগ দেখাই। পেমেন্ট নিই। তারপর রিটায়ারিং রুমে পাঠিয়ে দিই।

রিটায়ারিং রুম মানে?

মানে রিজার্ভড রুম আর কি! অর্থাৎ কেউ ডিসটার্ব করবে না। মানে যে ঘরে পার্টিকে মাসাজ দেওয়া হয়। পার্টির প্রাইভেসি ও গোপনীয়তার কথাও তো আমাদের ভাবতে হয়।

মাসাজ নিতে আসবে, তাতে আবার গোপনীয়তা কী দরকার!

বা রে! দরকার নেই! এখানে কি হেজিপেজি লোক আসে ভাবিস নাকি! বড় বড় কোম্পানির ম্যানেজার, ডিরেক্টর, এম.এল.এ, এম.পি, এমনকি মন্ত্রীও আসে।

উরিব্বাস! মন্ত্রীও এখানে মাসাজ করাতে আসে? সে তো বাড়িতে মাসাজের লোক রেখে দিলেই পারে!

আরে বাবা! সব জায়গায় সব কিছু হয় না। বাড়িতে কি আর এখানকার মতো মাসাজ করানো যায়! তুই না চিরদিনের কেবলিই রয়ে গেলি! রত্না ঠিক কথাই বলে।

আমি কাচের দরজার ভেতর দিয়ে বাইরে তাকাই। বাইরের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অথচ বাইরে থেকে ভেতরের কিছু দেখা যাচ্ছিল না। দেখি, একটা মোটরবাইক এসে থামল দরজার সামনে। দরজা থেকে কিছুটা দূরে মোটরবাইকটা স্ট্যান্ড করে ভেতরে ঢোকেন এক জন মাঝবয়সি পুরুষ। পরনে নীল রংয়ের জিনস আর আকাশি রঙের টি-শার্ট।

ওকে দেখে রুমি হেসে বলে— আরে! আসুন স্যার আসুন! অনেকদিন পর এলেন দেখছি। বাইরে গিয়েছিলেন নাকি? বসুন।  

গদিমোড়া সোফায় বসে রুমাল বের করে ঘাম মোছেন ভদ্রলোক— হ্যাঁ, সিঙ্গাপুরে যেতে হয়েছিল ব্যবসার কাজে। আজ হঠাৎ মনটা আনচান করে উঠল। চলে এলাম।

কথাটা বলার পর ভ্রূর ইশারায় আমাকে দেখিয়ে রুমির দিকে তাকান উনি।

রুমি হেসে বলে— ডোন্ট ওরি! ও আমার বান্ধবী। তাছাড়া ও এখানে জয়েন করছে। আর সীমা! উনি হলেন মি. চৌধুরী, আমাদের একজন দামি কাস্টমার।

ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে হাসেন। তারপর রুমিকে বলেন— ও এখানে জয়েন করেছে বললে। আজ কি বুকড? যদি ফ্রি থাকে, তাহলে...!  

রুমি হেসে বলে— না না, সীমা এখনও আমাদের স্টাফ হয়নি। ওর ট্রেনিংও হয়নি এখনও। আপনি ক্যাটালগ দেখুন না! পুজো তো এসে গেল প্রায়। কিছু পুজো-স্পেশাল মাসাজ-আইটেম ক্যাটালগে ঢুকেছে। দেখুন ভালো লাগবে। এ সপ্তাহেই ওকে পেয়ে যাবেন।

রুমি সুদৃশ্য ক্যাটালগ-বুক ড্রয়ার থেকে বের করে দেয় মি. চৌধুরীর হাতে। চৌধুরী সেটা উলটে-পালটে দেখতে থাকেন। রুমি প্রত্যাশা মাখানো চোখে তাকিয়ে থাকে চৌধুরীর দিকে।

আমি ভাবি, রুমি কত বদলে গেছে। সেই বাল্ব কারখানায় কাজ করা রুমি মনেও হয় না। আগের চেয়ে অনেক স্মার্ট হয়েছে। কথাবার্তাও বদলে গেছে। কত ইংরিজি শব্দ ব্যবহার করছে কথার মধ্যে। সে তুলনায় আমি তো কেবলি। তবে, কেবলি হলেও এটা ঠিক যে, এখানকার কাজ-কারবার সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছি। সেটা কিন্তু রুমিকে বুঝতে দিইনি। ওর কাছে কেবলির-ই ভান করছি আমি। ওর হাজব্যান্ডের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাক— কী কাজের কথা বলে। মনে হচ্ছে না এখানে সুবিধা হবে। তবুও...।

মিঃ চৌধুরী বলে ওঠেন— বাঃ, এই স্যান্ডউইচটা নতুন আইটেম দেখছি।

আমি ভাবি, স্যান্ডউইচ তো একটা খাবারের নাম শুনেছি। খাইনি কখনও। এখানে কি শরীর দলাই-মলাইয়ের সঙ্গে খাবারেরও ব্যবস্থা থাকে? 

রুমি বলে— হ্যাঁ, ওটা হিট করে গেছে। টু ইন ওয়ান, খুবই এনজয়েবল! ওটাই ‘বুক’ করে দিচ্ছি তাহলে!

চৌধুরি হেসে বলেন— তুমি যখন বলছ!

রুমি ততক্ষণে ওর ডানদিকে রাখা কম্পিউটারের মনিটারে কিছু ছবি নিয়ে এসেছে মাউস টিপে। বেশির ভাগই মেয়ের ছবি। গোটাচারেক ছেলের ছবিও আছে। রুমি বলে— নিন স্যার, এবার মাসাজ এক্সপার্ট চুজ করুন।

মিঃ চৌধুরী স্ক্রিনে একটু নজর বুলিয়ে দুটো নম্বর বলে দেন। রুমি মাউস আর কী-বোর্ডের বোতাম টেপাটেপি করতে করতে জিজ্ঞেস করে— ক’টার স্লট দেব স্যার?

ফাইভ টু সিক্স দিয়ে দাও। হাতে বেশি সময় নেই আজ। 

ও কে স্যার।

আরও কিছুক্ষণ কী-বোর্ডের বোতাম টিপে মনিটরের পাশের মেশিন থেকে একটা মেমো বের করে রুমি। একঝলক চোখ ছুঁড়ে দেখি, মেমোতে দুটো মেয়ের মুখের ছবি এবং কিছু সংখ্যা। 

সেটা রুমি এগিয়ে দেয় ভদ্রলোকের দিকে। উনি পকেট থেকে ছ'খানা পাঁচশো টাকার নোট বের করে দিয়ে বলেন— আমার পছন্দসই স্যুইটটা খালি আছে দেখছি।

হ্যাঁ স্যার! আমার মন বলছিল, আপনি আজ আসবেন, তাই...!

একটা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে ভদ্রলোক কাচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এগোন মোটরবাইকের দিকে। আমি ভাবি, রুমি কী সুন্দর কম্পিউটার চালানো শিখে গেছে। আমি স্কুলের কম্পিউটার ক্লাসে দু’বছর শিখেছিলাম। যন্ত্রপাতিগুলোর নাম ছাড়া সব ভুলে গেছি। মোটরবাইক স্টার্ট করে ভদ্রলোক চলে যেতে রুমি বলে— জানিস উনি কে?

আমি বোকা বোকা মুখ করে ঘাড় নাড়ি।  

উল্টোডাঙা স্টেশনের কাছে ‘প্রিন্সিপ্যাল ইলেকট্রনিক্স’ নামে টিভির দোকানের নাম শুনেছিস! উনি হলেন ওই ‘প্রিন্সিপ্যাল’-এর মালিক। বিশাল পয়সা। সেইরকম হোল্ড! মিনিস্টার-ফিনিস্টার সব হাতের মুঠোয়। বুঝতে পারছিস! এমন মানুষ আমাদের কাস্টমার। এখানে কাজে জয়েন করলে চাই কি তোর কপাল খুলে যেতেও পারে! কোনও মিনিস্টারের নজরে পড়লে...!

আমি দুম করে বলি, আমাকে কাজটা কী করতে হবে? 

তেমন কিছুই না, সিম্পল কাজ! আরে বাবা! মাসাজ করা আবার আহা মরি কিছু কাজ নাকি! নরম নরম হাতে সুড়সুড়ি দিয়েই কামিয়ে নাও যত পার। তুই দেখলি তো পার্টির কাছে তিনহাজার নিলাম। ওর ফিফটি পারসেন্ট মাসাজ-এক্সপার্টের, ফিফটি আমার। টাইম একঘন্টা। তাহলে দেখ, আট-দশ ঘন্টা কাজ করলে কত ইনকাম হবে। আরে বাবা! ওদের আছে, আমাদের নেই। যত পার গেলে নাও।

তুই আর কাঁদুনি গাস না তো! তুই কি আগের মতো আছিস? এখন তো তুই...!

আরে বাবা! আমার কথা বলছি না। তোর, ঝুমুরের, সুলেখার কথা বলছি। আমাদের এখানে কাজ করা মেয়েগুলোর কথা বলছি, ভিক্ষে তো করছে না ওরা। আর ইজ্জতও বিক্রি করছে না। খেটে পয়সা কামাচ্ছে। এতে লজ্জা কী! অপমানই বা কী! এখন ইজ্জতের মানেটাই আলাদা, বুঝলি। যার টাকা নেই তার ইজ্জত নেই। যার প্রচুর টাকা, তার খুব মান-ইজ্জত।

তাই বলে একটা অজানা-অচেনা পুরুষ মানুষের শরীরে টেপাটেপি করে...!

উফস! তোকে নিয়ে আর পারা গেল না! এই যে আমাদের পাশেই নার্সিংহোম আর প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি। যারা ওই ল্যাবে পেচ্ছাব, পায়খানা, থুতু-কফ পরীক্ষা করে, ওদের হাতে কি ওগুলো লেগে থাকে। ধুলেই সব সাফ। ওরা করছে না! টাকা কামাচ্ছে না! যারা আয়ার কাজ করে তারা কামাচ্ছে না!

তা কামাচ্ছে ঠিকই! তাই বলে...!

তুই একটু ভাব সীমা। তোর ভালোর জন্যই তোকে আসতে বলছি। এদিকে আমার হাজব্যান্ডের আসার সময় হল। আমি ভেতর থেকে একবার আসছি। তুই মাথা ঠান্ডা করে দু’মিনিট ভাব।

গোল করে ঘেরা টেবিলটার ওপাশ থেকে বেরিয়ে রুমি একটা পর্দা ঠেলে ভেতরে যায়। আমি কী করব ভেবে না পেয়ে আনমনে হাতে তুলে নিই রঙিন ক্যাটালগখানা।

ক্যাটালগবুক-টার ওপরে সুন্দর ডিজাইনে লেখা— র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টার। পাতা ওলটাতেই চোখে পড়ে বেশ কিছু মেয়ের মুখের ছবি। তাদের নিচে একটা করে নম্বর বসানো। কোনও নাম লেখা নেই। পরের পাতায় লেখা, আইটেম অ্যান্ড চার্জ।

ড্রাই মাসাজ উইথ পাউডারঃ রুপিজ ওয়ান থাউজেন্ড ফর ওয়ান আওয়ার     

জেনারেল মাসাজ প্যাসিভঃ রুপিজ ওয়ান থাউজেন্ড অ্যান্ড ফাইভ হানড্রেড ফর ওয়ান আওয়ার

জেনারেল মাসাজ অ্যাকটিভঃ রুপিজ টু থাউজেন্ড ফর ওয়ান আওয়ার  

হট মাসাজ ফরম্যালঃ রুপিজ টু থাউজেন্ড অ্যান্ড ফাইভ হানড্রেড ফর ওয়ান আওয়ার   

হট মাসাজ স্যান্ডউইচঃ রুপিজ থ্রি থাউজেন্ড ফর ওয়ান আওয়ার

স্পেশাল একসাইটিং মাসাজ উইথ জাপানি অয়েল রুপিজ ফোর থাউজেন্ড ফর ওয়ান আওয়ার

মাসাজ যে এত ধরনের হয় তা আমার জানা ছিল না। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন রসুন-তেল গরম করে সারা শরীরে মাসাজ করে দিত মা। একটু বড় হয়ে জানলাম, গা হাত পা জোরে জোরে টিপে দেওয়ার নামও মাসাজ। এখন দেখছি...। রুমি ফিরে আসে— কী রে! কী ঠিক করলি?

কিছুই ঠিক করিনি এখনও।

চল পাশের ঘরে, তোকে কাজের ধরনটা দেখাই, তাহলে বুঝবি।

সে কী! কোনও মদ্দ আধন্যাংটো হয়ে গা টেপাচ্ছে, তাই পাশে দাঁড়িয়ে দেখব নাকি। 

আরে বাবা! পাশে দাঁড়িয়ে দেখবি কেন? টিভির পর্দায় দেখবি। প্রত্যেকটা রুমেই লুকোনো মুভি ক্যামেরা আছে। ক্লোজ সার্কিট টিভিতে ডাইরেক্ট চলে আসে ওই ক্যামেরায় তোলা ছবি। মেয়েগুলোর সেফটির জন্যই এই ব্যবস্থা। পুরুষদের তো বিশ্বাস নেই। কাস্টমাররা অবশ্য এটা জানে না। তোকেই বললাম। তুই যেন কাউকে বলে ফেলিস না আবার। তাছাড়া শুধু পুরুষ নয়, আমাদের মেয়েগুলোকেও বা কতখানি বিশ্বাস করা যায়! ওদের ওপর নজরদারি রাখার জন্যই বিশেষ করে ওই ‘স্পাই-ক্যাম’।

আমি ধরতে পারি না রুমির কথা। তাই জিজ্ঞেস করি— ওরা আবার কী বিশ্বাসঘাতকতা করবে?

ওরে বাব্বা! ওরাই তো বেশি পাজি! মানে, সবাই নয়, কেউ কেউ। আসলে টাকার লোভ! একটা ঘটনার কথা বলি তোকে শোন!  

জেনি নামে একটা মেয়ে কিছুদিন এখানে কাজ করেছিল। আমার হাজব্যান্ডের কালেকশন। হেলাবটতলা না কেষ্টপুর কোথায় যেন থাকে। হেবি স্মার্ট মেয়েটা। হাই-ফাই স্ট্যাটিস্টিকস! থার্টি সিক্স-টোয়েন্টি এইট-থার্টি সেভেন। টাইট জিন্স আর মিনি স্কার্ট পরে আসত। সে করত কি— হট ম্যাসাজ ফরম্যাল-এর কাস্টমার নিত। কখনো স্যান্ডউইচ-এ রাজি হত না। 

একদিন স্পাই-ক্যাম-এ দেখা গেল, হট মাসাজ নিতে নিতে পার্টি এক্সাইটেড হয়ে গেছে। ও তখন আরও বেশি বেশি শরীর এক্সপোজ করছে পার্টিকে প্রলুব্ধ করার জন্য। পার্টি তখন ওকে বেডে যাওয়ার প্রস্তাব দিতেই হেভি অ্যামাউন্ট খিঁচে নিয়ে ‘দশ মিনিট কা খেল’। আমাদের পার্লার, আমাদের স্যুইট, আমাদের বেড অথচ আমরা পাচ্ছি মাসাজ চার্টের ফিফটি পারসেন্ট অর্থাৎ একহাজার দু'শো পঞ্চাশ টাকা। আর ও এক্সট্রা এক পাঞ্জা করে কামিয়ে নিচ্ছে প্রায় প্রত্যেক স্লটে। বোঝ ব্যাপারটা। এতে আমাদের সেন্টারের রেপুটেশন নষ্ট প্লাস মানি লস। ওই স্পাই-ক্যামের জন্য ধরা পড়ে গেল। হি-হি-হি!

ভেতরে ভেতরে রুমির ওপর আমার খুব রাগ হচ্ছে। এমন একটা কাজের জন্য রুমি আমাকে আসতে বলল! আমার খুব কৌতূহলও হচ্ছে টিভিতে ওই মাসাজিং দেখার। এ-দিকে সংকোচও হচ্ছে। একটু ভেবে বললাম— আগে ঠিক করি কাজটা করব কিনা। যদি করি, তাহলে তো দেখতেই হবে। আজ থাক।

ঠিক আছে দেখতে যখন চাইছিস না, তাহলে আজ থাক। তবে, তোকে একটা কথা বলি, তুই আমার খুব ভালো বন্ধু, তোরও কাজের দরকার। তাই তোকে বলেছি। রত্নাকে বললে এ কাজ লুফে নেবে। আর ঝুমুর তো...।

এমন সময় বাইরে একটা মোটরবাইক এসে থামে। লাল রংয়ের গেঞ্জি আর জিনস পরে, বাইকটা থেকে নামে খেলারাম সরখেল। রুমি বলে— ওই যে রাম এসে গেছে। আজ রবিবার তো, কাস্টমারের খুব চাপ থাকে। তোর সঙ্গে হয়তো ও বেশিক্ষণ কথা বলতে পারবে না। ফোনে প্রচুর স্লট বুকিং হয়। তুই চটপট কাজের কথাটা সেরে নিস।

খেলারাম ঢুকেই আমাকে দেখে বিনয়ী হাসি হাসে। আমি বলি— চিনতে পারছেন?

বাব্বা! তোমাকে চিনতে পারব না! ফুলশয্যার রাতে বিয়ে বাড়ির লজে যা জ্বালিয়েছিলে!

আপনার এখনও মনে আছে সেসব!

খাটের তলায় টেপরেকর্ডার রাখাটা যে তোমারই বুদ্ধি, তা শুনিনি ভাবছ!

আমি, রুমি দুজনেই হেসে উঠি। রুমি বলে— ওর একটা কাজের জন্যে তোমাকে বলে রেখেছিলাম।

খেলারাম গোলাকার টেবিলের ভেতর দিকে যেতে যেতে বলে— তোমার বান্ধবী যখন, তখন কাজ তো দিতেই হবে। কী! রুমির কাছে সব শুনে নিয়েছ তো! কাল-পরশু থেকেই জয়েন কর। আর কী! 

আমি হ্যাঁ-না কিছু বলি না। খেলারাম ভেতরে বসার পর বলে— বুঝলে, কাজ করে মজা পাবে। মাইনের ব্যাপারে নিশ্চয় রুমি কিছু বলেনি। ওটা আমি বলে নিই।

কাজ থাক না থাক পাবে পাঁচহাজার টাকা। যাতায়াত খরচটা ওতে হয়ে যাবে। কাজ পেলে কাস্টমারের যা বিল হবে তার অর্ধেক তোমার আর অর্ধেক রুমির। ঠিক মতো কাজ করলে মাসে হাজার ত্রিশেক কোনও ব্যাপার নয়। কী খুশি তো!

আমি কী বলব ভেবে পাই না। খেলারাম আবার বলতে শুরু করে— মাস তিনেক দেখব, যদি পারফরমেন্স ভালো থাকে, তখন পারমানেন্ট করার কথা ভাবা যাবে। তখন মাসে পনের হাজার প্লাস কাস্টমারের কমিশন। প্রভিডেন্ট ফান্ড, ইন্স্যুওরেন্স, ছুটি সব ফেসিলিটি পাবে। এটা স্পেশালি তোমার জন্যে। 

আমি বসে বসে টেবিলের কাচের ওপর লেগে থাকা কালির দাগ মোছার চেষ্টা করি আঙুল ঘষে ঘষে। মুখে কোনও কথা জোগায় না। যা বলার বলা হয়ে গেছে, এমন ভাব করে খেলারাম মোবাইল নিয়ে বোতাম টিপতে থাকে।

রুমি বলে— কী রে, কী এত ভাবছিস! বাল্ব কোম্পানির চেয়ে অনেক ভালো। কাল থেকে চলে আয়। শিখিয়ে-পড়িয়ে তৈরি করে দেব।   

আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াই। রুমিকে বলি— আজকের দিনটা আমাকে ভাবতে দে। কাল তোকে ফোনে জানাব।

কাচের দরজা ঠেলে বেরোব বলে এগোতে গিয়ে দেখি, দরজা ঠেলে ঢুকছে বোম-রতন। আমি কী করব ভেবে পাই না। হাত থেকে হ্যান্ডব্যাগটা পড়ে যায়, নাকি ফেলে দিই জানি না। সেটা কুড়োবার জন্য নিচু হই। রতন ভেতরে ঢুকতেই অটোম্যাটিক ক্লোজার লাগানো দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই সুড়ুৎ করে বাইরে বেরিয়ে পড়ি। দ্রুত পায়ে এগোই মেন রোডের দিকে। যেতে যেতে ভাবি, রতন কি মাসাজ নিতে এল! নাকি অন্য কোনও কারণ! তোলা তুলতেও আসতে পারে। ওর তো ওটাই কাজ। সেজন্যেই হয়তো কাল খেলারামকে ফোনে না পেয়ে, ঝুমুরের কাছে রুমির ফোন নম্বর চাইছিল।

আচ্ছা! আমাকে কি রতন দেখতে পেয়েছে! নিশ্চয় দেখেছে ও। ওর চোখে যেন বাজপাখির দৃষ্টি! কী ভাবল কে জানে! খারাপ কিছু ভাবল না তো! ভাবল তো বয়েই গেল। ও আমাদের পাড়ারও নয়। ওর ধার ধারার কী দরকার! আমাকে ওখান থেকে শুধু বেরোতে দেখেছে, আর তো কিছু নয়। ওতে খারাপ ভাবার কী আছে! রুমি আর আমি যে একসঙ্গে কাজ করতাম তা তো জানে ও। ওর সঙ্গে দেখা করতে আমি আসতেই পারি! এসব ভাবতে ভাবতে গলি পেরিয়ে আমি মেন রোডে চলে এসেছি। রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি রাস্তার ওপারে ঝুমুর। এপারে আসবে বলে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে ও দেখতে পায়নি।

আমার মনে পড়ে যায়, কাল বিকেলে ফুচকা খাওয়ার সময় ঝুমুরের একটা ফোন এসেছিল। তাহলে রুমিই করেছিল ফোনটা। ওকেও কি তবে ওই মাসাজ করার কাজের জন্যে...! নাকি আগে থেকেই ও একাজ করে! কে জানে! হয়তো করে, আমাদের বলেনি। তা না হলে এখানে কাজের জন্য আসব শুনে আমাকে কাল বলল কেন, ‘শোন! ওই দলাই-মলাইয়ের কাজ করতে বললে মোটেও রাজি হবি না। ...আধ ন্যাংটো মদ্দর শরীরে তেল বুলিয়ে দিতে গিয়ে আরও কত কিছু করতে হবে তার ঠিক নেই।...তুই ভদ্দরলোকের মেয়ে, ওসব পারবি না।’ ও নিশ্চয় এখানে কাজ করে, তা না হলে এত সব জানল কী করে!

সিগন্যাল অফ হতে গাড়িগুলো থেমেছে। জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছে ঝুমুর। ঝাক্কাস ড্রেস পরেছে আজ। জুতো জোড়াও নতুন। ওর পায়ের দিকে তাকিয়ে আছি আমি। কখনও সাদা দাগে আবার কখনও কালো পিচরাস্তার ওপর ওর পা পড়ছে। রাস্তার এপারে আসতেই আমার সঙ্গে মুখোমুখি। আমি বলি— রুমির ওখানে চললি।

ও ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে আমাকে দেখে। তারপর খুবই স্বাভাবিক গলায় বলে— হ্যাঁ, তোর কাজের কোনও ব্যবস্থা হল?

আমি ওর চোখে চোখ রেখে বলি— তুই-ই তো নিষেধ করলি ওই কাজ করতে।

হ্যাঁ, ঠিকই করেছি। এসব কাজ তোর জন্যে নয়। যা, বাড়ি চলে যা। আর এখানে কখনও আসিস না।

আমি ওর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিই— ঠিক আছে আসব না। তুই গেলে ওখানে বোম-রতনের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। এখুনি ঢুকল ও। তুই সেদিন ওকে বললি রুমির সঙ্গে তোর পটে না। আজ আবার...।

কথাটা শুনেই ঝুমুরের চোখ মুখ বদলে যায়। ও বলে— বোম-রতন এখানে! চল, আমিও যাব না।

রাস্তার ধার ধরে আমরা দু’জনে হাঁটতে থাকি। ঝুমুর ওর মোবাইল বের করে কাকে যেন ফোনে ধরার চেষ্টা করতে থাকে। একসময় লাইন পেয়ে বলে ওঠে— রিপোর্টারদা! আমি ঝুমুর বলছি।

ঝুমুর চাপা স্বরে মোবাইলে কথা বলতে থাকে। আমি ভাবি, রুমি তাহলে আমাকে আর ঝুমুরকে, দু’জনকেই ডেকেছিল আজ। তাহলে, আমার কাজ পাওয়ার চেয়ে ওদের কাজ করার মতো মেয়ে পাওয়াটা বেশি দরকার। সে জন্যেই ও গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। পাছে খুঁজে না পেয়ে ফিরে যাই। আমি ভেবেছিলাম, ও বুঝি খুবই আন্তরিক আমার ব্যাপারে। আসলে, ও ওদের ওই নোংরা কাজে আমাদেরকে লাগাতে চাইছে। সেদিন কি তবে ইচ্ছে করেই রিক্সা চড়ে ওদিকে যাচ্ছিল! আমাদের সঙ্গে দেখা করাটাই ওর উদ্দেশ্য ছিল! তাই সুলেখা ওকে ডাকতেই রিক্সা ছেড়ে দিয়ে আমাদের কাছে চলে এসেছিল! খেলারাম সরখেলের র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টারের জন্যে নতুন নতুন মেয়ে জোগাড় করাটাই তাহলে ওর কাজ এখন! বিভিন্ন কারখানায় কাজ করার সুবাদে অনেক ইয়াং মেয়ের সঙ্গে ওর জানাচেনা আছে। সেটাকে কাজে লাগানোর জন্যেই তাহলে খেলারাম ওকে বিয়ে করেছে! হঠাৎ আমার মনে হয়, আমি শুধু খারাপটাই ভাবছি কেন? আমাদের অভাব আছে, কষ্ট আছে; ও তা জানে। তাই আমাদের উপার্জনের কথা ভেবেই হয়তো...! কোনটা যে ঠিক!

 

পাঁচ

বাসে উঠিনি। ফুলবাগান থেকে হাঁটতে হাঁটতে আমি আর ঝুমুর চাউলপট্টি রোড চলে এসেছি। আমাদের গন্তব্যস্থল এখন ‘ডিউভিউ’-এর সামনে ছাতিম গাছতলা। অন্যান্য দিন সময় না হলেও, রবিবারের বিকেলে আমরা সবাই ওখানে আসি।

ঝুমুর সবদিন আসে না। ওর নাকি রবিবারেও কাজ থাকে। কাজটা যে কী, তা তো কাল খবরের কাগজ দেখে জেনে গেছি। আজও আসত না। র‍্যামস্পোর্ট-য়ে কাজ ছিল হয়তো! আমার মুখে বোম-রতনের আসার কথা শুনে আর গেল না। বোম-রতনকে ওর ভয় পাওয়া বা এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। তাই ওকে জিজ্ঞেস করি— হ্যাঁ রে ঝুমুর, বোম-রতনের কথা শুনে তুই পালিয়ে এলি কেন? ওকে কি তুই খুব ভয় পাস?

ঝুমুর বলে— ওকে কে না ভয় পায়! তবে সবাই যে কারণে ভয় পায়, আমি সে কারণে ভয় পাই না। আমার ভয় পাওয়ার কারণটা অন্য।

তুই কেন ভয় পাস?

এখন তোকে সেটা ঠিক বুঝিয়ে বলা যাবে না। আমি বলতেও চাই না। আর দিন কয়েকের মধ্যেই বুঝে যাবি।

আমি ঝুমুরকে আর কিছু জিজ্ঞেস করি না। চুপচাপ ওর পাশে পাশে হাঁটতে থাকি।

ও হঠাৎ আমার হাতটা চেপে ধরে— সীমা, তুই আমার খুব ভালো বন্ধু! তোকে আমার খুব ভালো লাগে। তবুও সব কথা তোকে বলছি না বলে রাগ করিস না। তুই হয়তো ভাবছিস আমিও রুমির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম ওখানে কাজ করার জন্য। আদৌ তা নয় রে! তোকে বলি, রুমির কথায় ওখানে আমি মাত্র একদিন কাজ করেছি। তারই মাশুল গুনছি। এখন আমার খুব বিপদ। তোকে শুধু একটা কথাই বলব, তুই ভুলেও আর ওখানে যাস না। রুমির সঙ্গে যোগাযোগও রাখিস না।

আমি ঝুমুরের চোখের দিকে গাঢ় দৃষ্টিতে তাকাই। দেখি, ওর চোখদুটো ছলছল করছে। আমিও ওর হাতখানা চেপে ধরি—  তুই যখন বলছিস, আর যাব না। আর একটা কথা, তোর বিপদে কোনও দরকার হলে বলিস আমাকে।

ঝুমুর আর কোনও কথা বলে না। আমরা চুপচাপ হাঁটতে থাকি ছাতিমতলার দিকে। আমাদের ডান দিকে সুন্দর সুন্দর বাড়ি আর বাঁ-দিকে পচা খাল। খালটা সংস্কার হয়নি। তাই মজে রয়েছে। নোংরা-আবর্জনা জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, তাই পচাখাল বলে সবাই। কোথাও বা শুধু পাঁক। কোথাও জল রয়েছে। জলের ওপর ঘন সবুজ কচুরিপানা। হালকা বেগুনি রঙের ফুল ধরেছে কচুরিপানায়। নোংরা পচা জলের ওপর থাকলেও ফুলটাকে ভালো লাগছে। হালকা হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে ফুলের পাপড়ি। পুকুরে দেখেছি কচুরিপানাগুলো হাওয়ায় একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যায় ভেসে ভেসে। খালে ভেসে যাওয়ার জায়গা নেই। তাই এক জায়গায় দাঁড়িয়েই রয়েছে পানাগুলো। প্রায় রোজই এই খালধারের রাস্তা দিয়ে হাঁটি। কোনওদিন এভাবে রাস্তার দু'ধারে তাকাই না। আজ কেন যে চোখ চলে যাচ্ছে কে জানে! আসলে মনটাও আজ কেমন হালকা হয়ে আছে। কিন্তু হালকা হাওয়ার কথা নয়। এখনও অবধি কাজের কোনও ব্যবস্থা হল না। রুমির দেওয়া সুযোগটাও বাতিল হল। মনে পাথর চেপে থাকারই কথা। তবুও...! কিছুক্ষণ আগেও মনটা ভার ভার ছিল। ঝুমুর ওই কথাগুলো বলার পরেই...! আসলে, আমাকে কেউ ভালোবাসে জানলে আমরা মনটা কেমন যেন হয়ে যায়। বাবা মাঝে মাঝে আদর করে ডাকে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। দু’একটা মন কেমন করা কথা বলে। তখন কী ভালো যে লাগে! মনে হয় এমন বাবা বুঝি কারও হয় না। খুব বেশি ভালো লাগলে আমার আবার কান্না পেয়ে যায়। তখন বাবার সামনে থেকে ছুট্টে চলে আসি পাশের ঘরে। বাবা অস্ফুটে বলে, 'পাগলি মেয়ে কোথাকার!'

মা আমার সঙ্গে খুব একটা ভালোভাবে কথা বলে না কোনওদিন। আমাকে তেমন ভালোবাসে কিনা বুঝতেই পারি না। কখনও সখনও মা বলে, 'এই যে নবাবনন্দিনী! মাথাটা তো বাবুইপাখির বাসা হয়েছে। চিরুনিটা নিয়ে আমার কাছে এস দয়া করে।'

মা আমাকে কাছে বসিয়ে, চুলের ফাঁস ছাড়িয়ে দেয়। বিনুনি করে চুল বেঁধে দেয়। ভিজে গামছা দিয়ে ঘাড় আর কানের পাশের ময়লা তুলে দিতে দিতে বলে, 'তুমি বড় হয়েছ এখন! শরীরের যত্ন করতে শেখ।'

আমি বড় হয়েছি— মা বললেও আমার তখন মনে হয়, আমি বুঝি হঠাৎ ছোট হয়ে গেছি। মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিতে ইচ্ছে করে খুব। মনে হয় মা-কে জড়িয়ে ধরি একবার। কিন্তু সাহস পাই না। মনে পড়ে যায় ক্লাস সেভেনের হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার আগে সেদিনটার কথা। বাথরুমে গিয়ে মা আমাকে বলেছিল, ‘এমন সব মেয়েদের হয়। কান্নার কী হল! প্রত্যেক মাসেই এমন অস্বস্তিকর কয়েকটা দিন আসবে। কেবলি মেয়ে কোথাকার! কিচ্ছু বোঝে না! তুমি এখন বড় হয়েছ’!  তখন ভেবেছি, সেই বড় হওয়া আর এই চুল বেঁধে দিতে দিতে বলা ‘বড় হওয়া’র মধ্যে বিস্তর ফারাক। একদম ছোটবেলায় মায়ের ভালোবাসা আর এখন মায়ের ভালোবাসার প্রকাশভঙ্গির মধ্যেও কত তফাৎ!

তেমনি ঝুমুরের অন্য সময় বলা, ‘সীমা আমার বন্ধু’ আর এখন হাত চেপে ধরে বলা, ‘তুই আমার খুব ভালো বন্ধু’; এদুটোর মধ্যেও পার্থক্য আছে। এখনকার কথাটা যেন ঝুমুর মুখে বলেনি, ওর ভেতর থেকে অন্য কেউ বলে উঠল। তাই তো মনটা এমন উদাস হয়ে গেল।

খালের জল, কচুরিপানার ফুল, দু’একটা বক, এসব দেখতে দেখতে কখন আমরা ছাতিমগাছের তলায় পৌঁছে গেছি। তখনও আমাদের কেউ আসেনি ওখানে। ঝুমুর জিজ্ঞেস করে— তুই এখন বাড়ি চলে যাবি, নাকি সুলেখা-রত্নার জন্য দাঁড়াবি?

আমি বলি, কেন তুই চলে যাবি নাকি?

আমার একটা জরুরি কাজ আছে রে! আজ এখানে তোদের সঙ্গে আড্ডা মারা যাবে না।

আমি তাহলে একা দাঁড়িয়ে থাকব নাকি বোকার মতো!

না না, একা থাকবি কেন! আমি কিছুক্ষণ আছি। সুলেখা, রত্নাদের মধ্যে কেউ আসছে দেখলেই আমি চলে যাব। চল ওই সিমেন্টের বেঞ্চিতে একটু বসি।

ঝুমুরকে ওখানে কখনও বসতে দেখিনি। বরং আমরা বসতে চাইলে ও বাধা দিত, ‘বুড়ি হয়ে গেছিস নাকি! যাদের হাঁটুতে বাত তারাই বসে আড্ডা মারে’। সেই ঝুমুর আজ নিজেই বসতে চাইছে! দু’জনে গিয়ে সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসি। ঝুমুর খুবই মনমরা হয়ে আছে আজ।

আমি বলি— ঝুমুর! তুই যে বললি তোর খুব বিপদ, কিসের বিপদ রে! আমাকে তো তুই বন্ধু ভাবিস। বল না কী হয়েছে! যদি আমার দ্বারা কোনও কিছু করা সম্ভব হয়!

ঝুমুর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে— মৌমাছির চাকে ঢিল মেরেছি রে আমি। এখন মৌমাছি হুল ফোটানোর জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে।

আমি ধরতে পারি না ঝুমুরের কথা। কেবলির মতো তাকিয়ে থাকি ওর মুখের দিকে।

ঝুমুর একটু থেমে বলে— শুধু এটুকু বলতে পারি তোকে, ওই রুমিদের মাসাজ পার্লার হল মধুর ভাণ্ডার। অনেক রথী-মহারথী প্রজাপতি সেজে মধু খেতে যায় ওখানে। খবরদার রুমির চক্করে পড়িস না। কাল যে বোম-রতন আমার কাছে রুমির ফোন নম্বর চাইতে এসেছিল, ওটা ওর ছল। ও আমাকে বোঝাতে চাইল খেলারাম ওর বন্ধু। রুমির ফোননম্বর ওর কাছেই আছে। ও তো প্রায়ই যায় ওখানে। ওখান থেকেও রতন মাল কামায়। তোলা নেয়।

সে নেয় নিক, তাতে তোর বিপদের কী হল?

আরে বাবা! কিছু নিতে গেলে তো কিছু দিতে হয়। এটাই নিয়ম। রতনকে যে হপ্তায় হপ্তায় গাদাখানেক টাকা দেয়, তার জন্য ওদের ভালোমন্দটাও তো দেখতে হবে রতনকে। ওদের পোষা গুণ্ডা ধরে নিতে পারিস ওকে।

তুই কি ভাবছিস রতন তোকে কিছু করবে?

কিছু করবে না, এমন ভেবে নেওয়া ঠিক হবে না। ওরা সব পারে। টাকা পেলে ওরা নিজের বোনেরও ইজ্জত নিতে পারে!

তুই কি সেই ভয় পাচ্ছিস?

না, ওর চেয়ে বড় কিছুর ভয় পাচ্ছি আমি। যাকগে, তোর মাথায় এসব ঢুকিয়ে, তোর চিন্তা বাড়িয়ে লাভ নেই। একটা কথা শুধু জেনে রাখ, ওই প্লাইউড কারখানায় আগুন লাগা, ওই কারখানা আর আমাদের বাল্ব কারখানা প্রমোটারের হাতে চলে যাওয়া, এসব কিছুর পেছনে ওই বোম-রতনের হাত আছে।

তুই এতসব কী করে জানলি?

যে-ভাবেই হোক জেনে ফেলেছি বলেই তো আমার বিপদ! যাকগে শোন, রত্না, সুলেখাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করিস না। ওই যে ওরা আসছে, আমি উঠি।

কংক্রিট ব্রিজের দিকে তাকিয়ে দেখি রত্না ও সুলেখা আসছে। ঝুমুর উলটো দিকের গলির দিকে এগোতে এগোতে বলে—  আমি এসেছিলাম ওদেরকে বলার দরকার নেই।

কথা শেষ হতে না হতেই ঝুমুর গলির বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যায়। রত্না আমার কাছাকাছি পৌঁছনোর আগেই বলে ওঠে— কী রে, তুই রুমির ওখানে দেখা করতে যাসনি?

ওরা দু’জন কাছে এলে আমি বলি— হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।

কী হল? কাজ পাক্কা?

না, আমার পোষাবে না ওখানে।

কেন? 

মাসে পাঁচহাজার টাকা দেবে। এখান থেকে ফুলবাগান তো কম দূর নয়! বাস ভাড়াতেই বেরিয়ে যাবে ছ'শো টাকা। টিফিন করতে ছ'শো টাকা, থাকবে কী! 

সুলেখা মুখ খোলে— ছাড় তো! রুমির দৌড় আমার জানা আছে। ওর মুখেই যত বারফট্টাই! ওর বরের মতো বর আর কারও নেই। ওর বরের ব্যবসার মতো ব্যবসা আর কারও নেই! দেখিস না, দেখা হলেই কেমন লম্বা চওড়া ডায়লগ ঝাড়ে! তুই বরং এক কাজ কর। আমাদের সঙ্গে গিয়ে, আমাদের মালিকের সঙ্গে একবার দেখা কর। দেবুদা' খুব ভালো লোক। নিয়ে নিতে পারে তোকে। 

রত্না মুখ ঝামটা দেয় সুলেখাকে— তোর মতো বলদা দেখিনি। সামনে শীত আসছে, বাজার ডাউন। আমাদেরই কাজ থাকে কিনা তার ঠিক নেই! আর তুই বলছিস ও গেলেই নিয়ে নেবে ওকে! বুদ্ধি বটে!

আর তুই খুব বুদ্ধিমতী! ওই জন্য সপ্তাহে দু’তিনদিন কাজে যাস না!

আমার ভালো লাগে না ওদের বাকবিতণ্ডা। একটু ঝেঁঝে উঠি আমি— ছাড় না এসব কথা! আমার কাজ নিয়ে ভাবতে হবে না তোদেরকে। আমাকে তো সংসার চালাতে হয় না। কাজ না পেলেও চলবে।

রত্না ঠেস দিয়ে বলে— তাহলে ঢং করে রুমির ওখানে কাজ পাওয়ার জন্য গেলি কেন?

আমি গেলাম তাতে তোর কী অসুবিধা হল? তোর ওইরকম কাজের দরকার হলে তুইও যা!

সুলেখা জিজ্ঞেস করে— ওইরকম কাজে মানে? কী কাজের কথা বলেছিল তোকে?

তা আর না-ই বা শুনলি!

বল না! জেনে রাখা ভালো। যদি দরকার লাগে।

ব্যাটাছেলের গায়ে, তারপর ইয়েতে তেল মালিশ করার কাজ। করবি তো চলে যাস রুমিদের মাসাজ সেন্টারে। পেয়ে যাবি।

ছিঃ! রুমি তোকে এই কাজের কথা বলল!

আমি বেশ যুতসই উত্তর দিতে যাচ্ছি একটা। কিন্তু দেওয়া হল না। ছাতিমগাছের ডালে বসে থাকা একটা কাক ঠিক ওই সময়েই আমার কাঁধের ওপর পায়খানা করল। গা ঘিনঘিন করে উঠল। কাকের পায়খানা দেখলে বমি চলে আসে আমার। কাক এত নোংরা-আবর্জনা খায়, তা আর বলার কথা নয়। একটু দূরে রাস্তার ধারে ট্যাপকলের জলে কাঁধটা ধুতে গিয়ে দেখি জল চলে গেছে। মেজাজটা আরও খিঁচড়ে যায়।

আমি আবার রত্না-সুলেখার কাছে বিরক্ত হয়ে ফিরে আসি। এর মধ্যে রত্না আর সুলেখা হাতে তালি দিয়ে, হুশ-হাশ শব্দ করে কাকটাকে তাড়িয়েছে। আমি আক্ষেপের সঙ্গে বলে উঠি— আজ আমার দিনটাই খুব খারাপ যাচ্ছে।

রত্না খুঁজে পেতে একটা সিগারেটের খালি প্যাকেট কুড়িয়ে আনে। সুলেখা তার ভেতরের রাংতা দিয়ে আমার কাঁধের কাছে ঘষে ঘষে সাদা ছোপটা তোলার চেষ্টা করে।

শুধু তোর নয় রে সীমা, আজ আমাদের তিনজনেরই দিনটা খুব খারাপ গেল।

কেন? তোদের আবার কী হল?

রত্নার বাবার আজ খুবই বাড়াবাড়ি।

কী রে রত্না, কালকেই তো তোর বাবাকে ঠাকুরপুকুরের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলিস!

রত্না ওর হাতে ধরা সিগারেট-প্যাকেটটা টুকরো টুকরো করতে থাকে — বাবার তো আবার ‘কেমো’ দেওয়ার সময় হল। কাল দেখিয়ে আসার পর সারারাত ছটফট করেছে। কী ওষুধ দিল কে জানে! যন্ত্রণা কমছে না। কতক্ষণ আর ওই কষ্ট দেখা যায় বল! তাই বেড়িয়ে সুলেখার কাছে গেলাম।

কথা বলতে বলতে দেখি রত্নার চোখ দুটো ছল ছল করছে। আমি রত্নাকে কী বলে সান্ত্বনা দেব খুঁজে পাই না। তাই চুপ থাকি। রত্না যে ওর বাবাকে কতখানি ভালবাসে, তা তো আমি জানি! ওকে যদি কেউ বলে যে, তোমার হাত কেটে মাংস দিলে তোমার বাবার গলার ক্যান্সার সেরে যাবে, ও তাতে রাজি হয়ে যেতে পারে! বাবার ওপর ওর এত টান।

রত্নাকে আনমনা করার জন্য বলি— সুলেখা, তোর আবার কী অসুবিধা হল?

আর বলিস না, মা-কে নিয়ে চিন্তা। হঠাৎ পেট ছেড়েছে। সকাল থেকে পাঁচ-ছ’বার পায়খানা গেছে। ভাগ্যিস আজ রবিবার! রান্নাবান্না আমিই করলাম। সারাদিন ধরে সংসারের নানা কাজ করতে হয়েছে। আসলে সব করি না তো, তাই বিরক্ত ধরে গেছে। দাদা ডালুদা’র ফার্মেসি থেকে বলেকয়ে ট্যাবলেট নিয়ে এল, খাওয়াল। এখন সেরে গেলে বাঁচি। রত্না না গেলে হয়তো আজ বেরোতাম না!     

আমি বলি— ডাক্তারের কাছে দেখিয়ে আনলে ভালো করতিস! এখন এত আন্ত্রিক-মান্ত্রিক হচ্ছে না!

সুলেখা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলে— না না, সে-সব কিছু নয়, বদহজম। মায়ের খুব দোষ আছে জানিস তো! কাল রাতের তরকারি বেঁচে ছিল। সেগুলো ফেলতে মায়া লেগেছে। মুড়ি দিয়ে খেয়েছে সকালে। ব্যস, তারপর থেকেই...!

তিনজনেই যেন কথা হারিয়ে ফেলেছি। কী বলব ভেবে পাচ্ছি না। সুলেখা ওপরে তাকিয়ে দেখছে, কাকটা আবার এসে বসেছে কিনা। রত্না সিগারেট প্যাকেট ছেঁড়া টুকরোগুলো এহাত-ওহাত করছে। হয়তো ওর মনের কষ্টটাকে এভাবেই কমাতে চাইছে। আমি খালের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। খালের ধার ঘেঁষে একটা ঝুপড়ি রয়েছে। ঝুপড়ির মালিক কোত্থেকে বিজ্ঞাপন ছাপানে হোর্ডিঙের ফ্লেক্স জোগাড় করে ঝুপড়ির চাল বানিয়েছে। চালের এপাশে দেখা যাচ্ছে সাদা দাড়িওয়ালা অমিতাভ বচ্চনের মুখ। পাশে হিন্দিতে লেখা — কৌন বনেগা..। বাকি অংশটা চালের ও-পাশে। অনুমান করলাম ও-পাশে রয়েছে ‘করোড়পতি’। অনুষ্ঠানটা টিভিতে হয় না আর। আগে হত। দেখতাম। অন্যজনে লাখ-লাখ টাকা পেত। তবুও দেখতে খুব ভালো লাগত অনুষ্ঠানটা।

হঠাৎ পরিচিত গলা শুনে চোখ ফেরাই। দেখি পাশেই কাজরি দাঁড়িয়ে। ওর হাতে চটের তৈরি একটা বিগ সপার ব্যাগ।

ও বলে— কী রে, তোরা চুপচাপ কেন? তিনজনে ঝগড়া করলি নাকি! 

আমরা তিনজনেই ম্লান হাসি। রত্না বলে— ঝগড়া করতে যাব কেন রে! আমরা আমাদের দুঃখের কথা বলাবলি করে একটু মন হালকা করছি। তোর খবর কী বল! অনেকদিন দেখা হয়নি তোর সঙ্গে।

সুলেখা বলে, মার্কেটিং করতে গিয়েছিলিস নাকি! এত বড় ব্যাগ!

একটু ইতস্তত করে কাজরি বলে— তা বলতে পারিস! মাল তুলতে গেছিলাম।

মাসকাবারি মুদি-স্টেশনারি?— জিজ্ঞেস করি।

না না, কোম্পানির মাল। আমি তো এখন...!

হঠাৎ সুলেখা চমকে ওঠা গলায় বলে— হ্যাঁ রে কাজরি, তোর সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে শাঁখা নেই কেন রে! কী ব্যাপার?

কাজরি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে— ডিভোর্স হয়ে গেছে। মন্টুটা মাতাল লম্পট, বদের ধাড়ি।

সে কী রে! তোদের তো প্রেম করে বিয়ে! আগে বুঝিসনি?

বুঝলে কী আর করতাম! ছাড় তো ওর কথা। 'ভাত দেবার ভাতার নয়, ইয়ে মারবার গোঁসাই!' সেটাও যদি পারত ভালো করে! দিয়েছি কাঁচকলা দেখিয়ে।

কাজরির রকম-সকম দেখে অবাক হই আমি। ও এমন ভাবে কথাগুলো বলছে, যেন মনে হচ্ছে গালে একটা মশা বসেছিল, দিয়েছে চটাস করে মেরে।

আমি বলি— তাহলে তুই এখন...? 

কথা শেষ করার আগেই কাজরি বলে— আমি এখন একটা কসমেটিক কোম্পানিতে কাজ করি। বিভিন্ন মনোহারী দোকানে, ফ্ল্যাটবাড়িতে ডোর টু ডোর বিক্রি করি নেলপালিশ, রুজ-লিপস্টিক, আইলাইনার এইসব! 

আমার মনে পড়ে যায়, ফুলবাগান যাওয়ার সময় দেখেছিলাম রাসমনি বাজারে। এই জন্যই মনোহারি দোকানের ছেলেটার সঙ্গে অত কথা বলছিল। এই ব্যাগটাই ছিল ওর হাতে।

রত্না বলে— তোদের ব্যাপার-স্যাপার বুঝি না বাবা! এই প্রেম করলি। কিছুদিন যেতে না যেতেই বিয়ে করলি। এখন শুনছি ছেড়েও দিয়েছিস। ছেলেখেলা যেন! তুই কি ভাবছিস ওই কসমেটিক বিক্রি করেই তোর জীবনটা চলে যাবে?

চলে তো যাচ্ছে! এণ্ডিগেণ্ডি তো হয়নি। একটা পেটের জন্য এই যথেষ্ট! 

রাস্তার ওপাশে তৈরি হতে থাকা ডিউভিউ কমপ্লেক্স দেখিয়ে কাজরি বলে— এই ফ্ল্যাটগুলোতে ফ্যামিলি এসে গেলে এখানেও আসব মাল বিক্রি করতে। তোরাও নিস দু’এক পিস।

কাজরির কথা শুনে আমার মনে হয়, এই যে ওর বিয়ে হওয়া, স্বামীর সঙ্গে আবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া, এগুলো যেন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার! অথচ মা বলে...! আমি মায়ের কথাগুলোর সঙ্গে মেলাতে পারি না। মায়ের কথাগুলো শোনা, কিন্তু কাজরিরটা সামনে দেখছি। আমার চুল বেঁধে দিতে দিতে মা কখনো সখনো বলে, 'মেয়েদের বিয়ের আগে দেবতা হল বাবা মা, আর বিয়ের পর স্বামী। স্বামী হল জন্ম-জন্মান্তরের। মারুক, ধরুক, অপমান করুক স্বামীকে ছাড়তে নেই। রাগ কমলে ওই স্বামীই আবার কাছে টেনে নেবে, আদর করবে। এ হল বিধির বিধান।' 

কাজরিকে দেখে শুনে, মায়ের কথাগুলো ঠিক নয়, মনে হয়। আবার অবিশ্বাস করতেও মন চায় না। রুমিকে একদিন মায়ের কথাগুলো শুনিয়েছিলাম। ও লাল-নীল বাল্ব-এর মধ্যে সাবধানে সূক্ষ্ম তারের ফিলামেন্ট ঢোকাত ঢোকাতে বলেছিল, ‘ওসব কথা এখন আর চলে না। ওসব পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষদের বানানো কথা, মেয়েদেরকে বশে রাখার জন্য। এখন সে দিন গেছে।’ তখন রুমির দিকে সবিস্ময়ে তাকিয়েছিলাম আমি। ভেবেছিলাম, রুমি কত কিছু জানে! পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কথাটা আগে শুনেছি ঠিকই, কিন্তু ওর মানেটা ঠিকঠাক জানি না। অথচ রুমি...! কিন্তু ও তো আমার মতোই মাধ্যমিক ফেল। আজকেও তো রুমি রিসেপশনিস্টের চেয়ারে বসে, পেপার ওয়েট ঘোরাতে ঘোরাতে বলছিল, ‘পুরুষদের তো বিশ্বাস নেই...’! আমি বুঝে উঠতে পারি না, যে রুমি পুরুষতান্ত্রিকতা বোঝে, মেয়েদের অসহায়তা বোঝে, সেই রুমি আবার আমাদের মতো  মেয়েদেরকে কায়দা করে পুরুষদের খপ্পরে ফেলে!

এখন কাজরির কথা শুনে ভাবছি, সত্যিই পুরুষদের বিশ্বাস নেই। হঠাৎ মনে পড়ে যায় রুমির কথা, ঝুমুরের মায়ের কথা, আমার মায়ের কথা। মেয়েদেরই বা বিশ্বাস কী! ঝুমুরের মা তো বক্সিবাবুর সঙ্গে...! আমার মা-ও যে কতখানি বিশ্বাসী, সে ব্যাপারে সন্দেহ হয় আমার। ক্যাশকাকুর ব্যাপারে কোনও কথাই সইতে পারে না।

কাজরির কসমেটিকস কেনার প্রস্তাবে রত্না বলে— আমাদের পেটে ভাত জোটে না ঠিক ঠিক। আমরা কিনব কসমেটিক। ওষুধ কিনতেই সব শেষ! তুই বরং রুমির কাছে গিয়ে দেখতে পারিস। পয়সাওলা ঘরের বউ হয়েছে। বরের ব্যবসা আছে, ঠাটবাটও আছে। ফাঁট করে ও বরের ব্যবসার দেখাশোনা করতে যায়। ও কিনতে পারে তোর স্নো-পাউডার লিপস্টিক।

কাজরি বলে— হ্যাঁ, ওর সঙ্গে অনেক দিন দেখা হয়নি। একদিন গেলে হয়। এদিকে আসেটাসে?

সুলেখা বলে— খুবই কম। দিন তিনেক আগে একবার দেখা হল। রিক্সায় চড়ে কোথায় যাচ্ছিল এদিক দিয়ে।

কাজরি বিগ-সপারটা অন্য হাতে নেয়, তাহলে নিশ্চয় পিসির বাড়ি। চাউলপট্টি রোডে গেঞ্জি কারখানার পাশেই ওর পিসির বাড়ি। একদিন ঝুমুর আর আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।

রত্না বলে— ব্যাগটা ওই সিমেন্টের বেঞ্চিতে রাখ না! হাত ধরে যাচ্ছে তো তোর!

কাজরি ব্যাগটা সিমেন্টের বেঞ্চে নামাতে গিয়ে দেখে বেঞ্চখানা কাকের পায়খানায় ভর্তি। ‘ম্যা গো’! বলে ফিরে আসে ও। ভাবি একটু আগেই পরিষ্কার ছিল বেঞ্চিটা। আমি আর ঝুমুর বসেছিলাম। এর মধ্যেই ওটা...! ও কাছে এসে মাটিতে ব্যাগ নামিয়ে বলে— হ্যাঁ রে রত্না, ঝুমুরের কী খবর? ও আসে না এখানে?

হ্যাঁ, কম আসে। কাল এসেছিল।

আজও যে এসেছিল ঝুমুর, সেটা আমি আর বলি না। কাজরি জিজ্ঞেস করে— কারখানা উঠে যাওয়ার পর ঝুমুর কী করছে এখন? 

আমরা তিনজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করি। কিছু বলি না। কাজরি বলে ওঠে— আমি জানি, ও কী করে। বলতে লজ্জার কী আছে! ওটা তো একটা কাজ।

কাজরির কথায় রত্না কৌতূহলী— তুই কী করে জানলি?    

কাজরি আমাদের মুখের দিকে একবার হালকা চোখ বুলিয়ে নেয়। হয়তো বুঝতে চায় গোপন কথাটা আমাদেরকে বলা ঠিক হবে কিনা। আমরা কতখানি বিশ্বাসযোগ্য। তারপর চোখের ওপর এসে পড়া উমনো-ঝুমনো চুল দু’আঙুল দিয়ে সরিয়ে কানের পাশে গুঁজতে গুঁজতে বলে— দিন কয়েক আগে আমি ফুলবাগানের দিকে স্টেশনারি দোকানগুলোতে মাল পুশ করতে গেছি। হঠাৎ দেখি, কিওর নার্সিংহোমের গলি থেকে ঝুমুর বেরোচ্ছে। আমি ওকে দেখে ভাবি, ওর মা বা অন্য কোনও আত্মীয়কে নার্সিংহোমে এনেছে নাকি! ওর মুখখানাও কেমন শুকনো লাগছে! ওর মুখোমুখি হই। আমাকে দেখে ও ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘কী রে! কার কী হল? নার্সিংহোমে ভর্তি করেছিস নাকি?' ও আমতা-আমতা করে বলে, ‘না, আমি এসেছিলাম র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টারে।’ আমি বলি, ‘তুই ওখানে? ওখানে তো পুরুষেরা আসে মাসাজ করাতে। মেয়েরা তো...’! এই অবধি বলে থেমে যেতে ঝুমুর বলেছিল, 'থামলি কেন? বল না! মেয়েরা তো আসে মাসাজ করে দিতে। ধরে নে, আমি ওখানে পুরুষদের মাসাজ করে দেওয়ার জন্য এসেছিলাম। টাকার দরকার। বাঁচতে তো হবে!' কথা শেষ হতে না হতে ঝুমুর হাঁটা লাগিয়েছিল বাসস্টপের দিকে। যেতে যেতে বলেছিল, ‘পরে কথা বলব, আমি এই মুহূর্তে দারুণ সমস্যায় আছি। গেলাম।’ সেদিনই বুঝেছিলাম, বালব কারখানায় কাজ চলে যাওয়ার পর ও অন্য লাইনে নেমেছে।

রত্না বলার মতো কথা খুঁজে পায় যেন— ‘অন্য লাইনে’ নয় বল লাইনে নেমেছে। লাইনের মেয়েরাও এখন শ্রমিক। ওদের ইউনিয়ন আছে, কীসব সমিতি-টমিতি আছে। ভাবছি আমিও লাইনে নামব ঝুমুরের মতো। খেটে খেতে লজ্জা কী!

চমকে উঠি রত্নার কথা শুনে। রত্না নির্বিকারে বলে চলে— দেহ-ব্যবসাতে এখন অনেক টাকা। আমি তো ঝুমুরের মতো ছুটকো-ছাটকা কাজ করব না। কার্জন পার্ক, ভিক্টোরিয়া পোষাবে না আমার। আমি খেপ খাটব বকখালি, দিঘা। তেমন পার্টি পেলে পুরী, গ্যাংটক। মুম্বাইও চলে যেতে পারি। বছর পাঁচেক কাজ করব। লাখ দশেক কামাব। তারপর ফিরে এসে বিয়ে-থা, ঘর-সংসার করব।

রত্নার কথা বলার ধরনে হেসে উঠি আমি আর সুলেখা। কাজরি হাসে না। ও গম্ভীর হয়ে বলে— ঘর-সংসার করব বলা সোজা, করাটা সোজা নয় রে! কর! তখন টের পাবি কোন লিপস্টিকের কী রকম গন্ধ!

সুলেখা ফোড়ন কাটে— লিপস্টিকের তো রং হয়, গন্ধ আবার কী? 

কাজরি বলে— হয় হয়! রঙটা দেখা যায়, গন্ধটা দেখা যায় না। ঠোঁটে লাগালে তখন পাওয়া যায়। ওই ঘর-সংসার করার মতো। কর তখন বুঝবি।

কথাটা শেষ হতেই হাতে ব্যাগ তুলে নিয়ে কাজরি বলে— আমি যাই রে! আরও কয়েকটা ফ্ল্যাটে যেতে হবে।

আমরা কিছু বলার আগেই ও পা বাড়ায়। রাস্তার ওপারে গিয়ে ‘ডিউভিউ’য়ের কঙ্কালের দিকে তাকায় একবার। সামনেই সিমেন্ট-বালি-পাথরকুচি মেশানোর যন্ত্রটা দাঁড়িয়ে। কাজরি ওটার দিকে একবার চোখ ছুঁড়ে হন হন করে হাঁটা দেয়। আমরা তিনজনে ওর চলে যাওয়া দেখি। রত্না বলে— ভুল করল কাজরিটা। পরে বুঝবে। 

আমি নিজের মনেই বিড়বিড় করি— কে যে ঠিক করছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। ঝুমুর ভুল পথে, কাজরি ভুল পথে। রত্না আর সুলেখার ভবিষ্যৎ কী জানি না। আর আমি...!

রত্না বলে— সীমা, আমি এবার যাব রে। বাবার কষ্টটা সহ্য না করতে পেরে বেরিয়ে পড়েছিলাম। এখন বাবার জন্য মনটা খারাপ লাগছে। বাড়ি যাই বুঝলি!

আর একটু দাঁড়া না বাবা! দুজনে একসাথেই যাব। কিছুটা তো যাওয়া যাবে তোর সঙ্গে।— আমি বলে উঠি।

এমন সময় একটা ট্যাক্সি এসে একদম আমাদের গা ঘেঁষে ব্রেক কষে। আমরা ঘাবড়ে যাই। দেখি ট্যাক্সির পেছনের জানলা থেকে একটা ইয়াং ছেলে মুখ বাড়িয়ে বলছে, সুলি, শিগগির গাড়িতে আয়। মা-কে আই-ডি-তে নিয়ে যাচ্ছি।

ছেলেটাকে চিনতে আমার দু-তিন সেকেন্ড সময় লাগে। সুলেখার দাদা সুভাষ। সুলেখা ততক্ষণে হুমড়ি খেয়ে ট্যাক্সির দরজায়।

সুভাষদা আমাদেরকে কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে— মায়ের ডাইরিয়া মতো হয়েছে। আই-ডি হাসপাতালে অ্যাডমিশন করাতে নিয়ে যাচ্ছি। সুলি, গাড়িতে ওঠ শিগগির! হাসপাতালে একা অসুবিধা হবে। 

আমি কিছু বলার আগেই রত্না বলে ওঠে— আমাদের যেতে হলে বলুন। 

সুলেখা ততক্ষণে, মা — বলে গাড়িতে ঢুকে জড়িয়ে ধরেছে মাকে। আমি কোনও কথা বলার আগেই ট্যাক্সিটা গড়াতে থাকে। একরাশ কালো ধোঁয়া ছেড়ে ট্যাক্সিটা চলে যায়। রত্না আর আমি হতভম্ব হয়ে সে-দিকে তাকিয়ে থাকি।

রত্না বলে ওঠে— ভালোয় ভালোয় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরলে হয়। আই.ডি. টা তো হাসপাতাল নয়, নরক। আমার মা-ও তো ওই হাসপাতালেই...!

আমার মনে পড়ে যায় — কথায় কথায় রত্না একদিন বলেছিল, ওর মা আন্ত্রিকে মারা গেছে। তারপর থেকে সংসারে হাঁড়ি ঠেলায় দায়িত্ব ওর ওপর পড়েছে। আমি মনে মনে ঠাকুরকে ডাকি, 'ঠাকুর! সুলেখার মা যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসে। তা না হলে সুলেখাটাও...।' ওর অবিশ্যি দাদা আছে। রত্নার তো দাদা নেই। সুলেখার দাদা বিয়ে করে বউ ঘরে আনলে, তখন সুলেখা...!

সুলেখার দাদার বিয়ের কথা মনে হতেই আমার মনের মধ্যে কেমন যেন একরাশ লজ্জা এসে হাজির হয়। তেমন কোনও কারণ নেই। আসলে, একটা স্বপ্নের কথা মনে পড়ে যায় আমার। সুলেখার দাদা, সুভাষদাকে নিয়ে স্বপ্ন। বিশ্রী, এলেবেলে। স্বপ্নে দেখছিলাম, আমি সুভাষদার বউ হয়েছি। দু’জনে দিঘায় হানিমুনে গেছি। এমন স্বপ্ন দেখার কোনও কারণ নেই। সুভাষদার সঙ্গে আমার তেমন কোনও ঘনিষ্ঠতাও হয়নি।

বাল্ব কারখানায় কাজ পাওয়ার পর দু’একবার দেখা হয়েছিল হিপিদার সেলুনে। প্রথমদিন আমি কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম। ও হেসে বলেছিল, ‘শুকনো ধন্যবাদ দিলে হবে? মিষ্টি খাওয়াতে হবে।’

আমি রসগোল্লা খাওয়ানোর কথা বলতে ও বলেছিল, 'রসগোল্লা-সন্দেশে হবে না। ওগুলোর চেয়েও বেশি মিষ্টি জিনিস খাওয়াতে হবে।' 

ওর ইঙ্গিত বুঝতে পেরেও আমি না বোঝার ভান করে বলেছিলাম, ‘ওগুলোর চেয়ে মিষ্টি তো স্যাকারিন। সেটা মুখে দিলে প্রথমে তেতো লাগে।' কথাটা বলেই ফিক করে হেসে সেলুন থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। তারপর একদিন দেখা হতে শুধু হেসেছিলাম কোনও কথা হয়নি। তবুও সেদিন রাতে ওই স্বপ্নটা...! এখন স্বপ্নটার কথা মনে পড়তে হাসি নয়, কেমন যেন লজ্জা লাগে। রত্না আচমকা বলে ওঠে— কী রে, এমন চুপচাপ হয়ে গেলি কেন? সুলেখার মায়ের শরীর খারাপের জন্যে? নাকি সুলেখার দাদার কষ্ট-মাখানো মুখখানা দেখে!

আমি বলি, ধ্যাৎ, তুই না...!

ছয়

হঠাৎ সাতসকালে যতুদা' হাজির আমাদের বাড়িতে। অনেকদিন পর আমার এই মামাতো দাদাটা আমাদের বাড়ি এল। ওকে দেখে আমার বেশ ভালো লাগল। অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম, যতুদা' এলে বেশ হয়। সেবার ভিক্টোরিয়া ঘুরতে যাওয়া হয়নি। ও এলে যাওয়া যায়। পরশুদিন সুলেখা খবরের কাগজে ঝুমুরের ছবি দেখাতেই এই যতুদা'র কথা মনে আমার পড়েছিল। এবারে ও ক্যামেরা এনেছে কি না কে জানে!   

সেবার ছবি তোলার সময় ও দুষ্টুমি করেছিল। বরং এখন মনে হচ্ছে, যতুদা' ওই ধরনের দুষ্টুমি করলে বেশ হয়! ওর আর সে ঘটনা মনে আছে কি না জানি না। অনেকদিন তো হয়ে গেল! ব্যাপারটা ওকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ওর তোলা সেই ছবিটা খুঁজেপেতে বের করি। একটা পুরোনো পঞ্জিকার মধ্যে ঢোকানো ছিল।

একটু নিরিবিলি পেয়ে ছবিটা দেখাই ওকে— যতুদা', এটা তুমি তুলে দিয়েছিলে মনে আছে?    

যতুদা' আমার হাত থেকে ছবিটা নেয়। বলে— আগের চেয়ে তুই আরও সুন্দর হয়েছিস। আগে রোগা ছিলিস!

কথা বলতে বলতে যতুদা' আমাকে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে, যেন ছবির সঙ্গে এখনকার সীমার তফাৎ খুঁজে বের করছে; ভাবখানা এমন! আমার চোখ মুখ বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর, ওর চোখ আমার বুকে নামে। স্থির হয়। কেউ আমার বুকের দিকে তাকালেই আমার কেমন একটা অস্বস্তি হয়। দোপাট্টাখানা ভালো করে ঢাকা দিয়ে নিই বুকে। কিন্তু এখন আমার বুকের ওপর দোপাট্টা নেই। বাড়িতে পরার প্লেন সালোয়ার কামিজ পরে রয়েছি। দোপাট্টা ছাড়া বুকে যতুদা'র চোখের খোঁচায় মনে একটা অস্বস্তি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেটা প্রকাশ করি না।

যতুদা বুকের দিকে তাকিয়ে বলে— বাঃ, আগের চেয়ে তুই মোটা হয়েছিস।   

আমার মনের মধ্যে অদ্ভুত এক শিরশিরানি! সেটা যেন ভালো লাগছে আমার। কোনও পুরুষকে আমি এতক্ষণ শরীর দেখতে দিইনি। আজ কেন যে যতুদা'কে দেখতে দিলাম, জানি না। আমি কি যাচাই করে নিতে চাইলাম, যতুদা' আগের মতোই আছে কি না! নাকি নিজেকে যাচাই করে নিলাম পুরুষের চোখ দিয়ে। ও আমার মামাতো দাদা হলেও, ও তো পুরুষ।  শুধু পুরুষ নয়, সক্ষম সুন্দর পুরুষ। দারুণ স্বাস্থ্য, লম্বা, ফর্সা। এইরকম পুরুষ আমার খুব পছন্দ। ও ইছাপুরে ‘গান অ্যান্ড শেল ফ্যাকটরি’তে চাকরি করে। এখনও বিয়ে করেনি।

আমাকে মন ভরে দেখা শেষ হলে ও ছবিটা আমাকে ফেরত দেয়। আমি বলি— যতুদা, এবারে ক্যামেরা আননি?

না রে! সে ক্যামেরাটা খারাপ হয়ে গেছে। আর সারাইনি।

আমি ঠোঁট টিপে দুষ্টু হাসি হেসে বলি— তাহলে আমার ছবি তুলবে কী করে?

ও হাসে। হয়তো সেবারের ব্যাপারটা ওর মনে পড়ে গেছে। বলে— আর ছবি তুলি না। দেখি শুধু।

আচ্ছা যতুদা'! সেবারে ভিক্টোরিয়া বেড়াতে নিয়ে যাবে বলেছিলে। যাওয়া হয়নি। এবারে নিয়ে যাবে তো?  

যতুদা' ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’-য়ের মাঝামাঝি ঘাড় নাড়ে। আমি বুঝতে পারি না, ভিক্টোরিয়া যাওয়ার কথায় যতুদা' উৎসাহ দেখাল না কেন! সেবারে তো যাওয়ার জন্যে ঝুনোঝুটি! আমার রাগ হয়েছিল বলে এড়িয়ে গেছিলাম। এবার আমিই...! বিকেলে আই-ডি হাসপাতালে সুলেখার মা-কে দেখতে যাওয়ার কথা ভেবে রেখেছি। সেটা বাতিল করে যতুদার সঙ্গে ভিক্টোরিয়া যেতে চাইছি তবুও...!    

আজ সকালের দিকটা আমার বেশ ভালোই কাটল। যতুদা'র সঙ্গে গল্পে হাসি-ঠাট্টায় কেটে গেল অনেকখানি সময়। আমার প্রশ্রয় পেয়ে যতুদা' আমাকে ছুঁল কয়েকবার। আমার মনে এক অদ্ভুত ভালোলাগা। পুরুষমানুষ শরীর ছুঁলে এত ভালো লাগে জানতাম না। এ তো শুধু ওপর ওপর ছোঁয়া! ছোটকাকার ঘরে বিছানার তলায় পাওয়া সেই ম্যাগাজিনটার কথা ঝট করে মনে পড়ে গেল। ম্যাগাজিনের ছবিগুলোর মতো যদি কেউ ছোঁয় তাহলে...! 

পরশুদিন ছাতিমতলায় গল্প করতে করতে ঝুমুর রেগেমেগে একটা কথা বলেছিল, ‘সব মেয়েমানুষের মধ্যেই একটা ছেনাল মেয়েছেলে বাস করে।’ তবে কি এখন আমার ভেতরের ছেনাল মেয়েছেলেটা মাথাচাড়া দিচ্ছে। তা না হলে সেই ম্যাগাজিনের ছবির মেয়েমানুষটা হতে ইচ্ছে করছে কেন?

মায়ের রান্নাবান্না হয়ে গেছে। যতুদা' স্নান করতে ঢুকেছে বাথরুমে। আমি ভাবছি, বিকেলে কোন সালোয়ার-কামিজটা পরে ভিক্টোরিয়া ঘুরতে যাওয়া যায়। একবার ভেবেছি, মায়ের একখানা শাড়ি পরে যাব। তখন ঝট করে মনে পড়ে গেছে কাগজে ঝুমুরের ছবিটার কথা। শাড়ি পরা ছিল ঝুমুর। পেছনে ভিক্টোরিয়ার ছবি। না বাবা! শাড়ি পরে যাব না।

এ-সব ভাবতে ভাবতেই যতুদা বেরিয়ে এসেছে বাথরুম থেকে। ভেজা ভেজা খালি গা, উঁচু উঁচু মাংসপেশি, কোঁকড়ানো চুল। বেশ লাগছে ওকে। আমি সোজাসুজি তাকাতে পারি না। আড়চোখে দেখি যতুদা'কে। পিঠের খাঁজ, বুকের রোম, চওড়া কাঁধ। লুঙ্গি, পাজামা এ-সব কিছু আনেনি যতুদা'। তাই স্নান করার পর বাবার একখানা ধুতি, লুঙ্গির মতো করে পরেছে। তার ওপর সাদা ধবধবে স্যান্ডো গেঞ্জি। বেশ লাগছে ওকে। জামাই-জামাই। বড়মাসির জামাই অষ্টমঙ্গলায় মাকে প্রণাম করতে এসেছিল। এ-রকম ভাবে ধুতি গেঞ্জি পরেছিল সেই জামাইবাবু। মনে পড়ে যায় তার কথা। 

রান্নাঘর থেকে এ ঘরে এসে মা জিজ্ঞেস করে, এখন ভাত বাড়বে কিনা। যতুদা' বলে— দাঁড়াও পিসিমা। একটা জিনিস দেখাই তোমাকে।

চুল আঁচড়ানো হয়ে গেলে ব্যাগ থেকে ও একটা খাম বের করে। খাম থেকে বের করে একখানা ছবি। উঁকি মেরে দেখি, কোনও মেয়ের ফটো। ওটা ও মায়ের দিকে বাড়িয়ে দেয়— দেখো পিসিমা, কেমন লাগছে?

মা বলে— কার ছবি রে?

তোমার হবু বউমার। কেমন, পছন্দ তো?

আমি সেকেলে মানুষ, আমার আর পছন্দ-অপছন্দ! ভালোই তো লাগছে! ছিরি আছে চোখমুখের। সীমাকে দে। দ্যাখ ও কী  বলে! ও আজকালকার মেয়ে।

আমি ছবিখানা হাত বাড়িয়ে নিই। তেমন ভাবে না দেখেই বলি— ভালোই তো, বেশ ভালো। মা, তাড়াতাড়ি খেতে দাও খুব খিদে পেয়েছে আমার! 

ছবিটা যতুদা'র হাতে ফিরিয়ে দিই। যতুদা' নিজে এক পলক দেখে ছবিটাকে। তারপর বলে— নাকটা একটু বসা, বল পিসিমা! সীমার মতন খাড়া নাক আর ওর মতো গায়ের রং হলে, আরও ভালো লাগত।

মা ছড়া কাটে— ‘শ্যামলা বরণ নাক বসা, সেই হল মেয়ে খাসা’। বেশি সুন্দরী নিয়ে কি সাজিয়ে রাখবি শো-কেসে? মত দিয়ে দে গে। অনেক মেয়ে দেখেছিস।

যতুদা' মিটিমিটি হেসে ফটোটা খামে ভরে ব্যাগে ঢোকায়। আমি ভাবি, এই জন্যই তখন যতুদা বলেছিল— এখন আর ছবি তুলি না। দেখি শুধু।  

যতুদা' ব্যাগ থেকে এবার একটা বড়সড় খাম বের করে। খামের কোণে হলুদ লাগানো, প্রজাপতি আঁকা, সেটা মায়ের হাতে দিয়ে বলে— মত আমি দিয়েই দিয়েছি। অঘ্রানের দু’তারিখে বিয়ে। মাঝে তো একটা মাস। একা হাতে সব করতে হবে। তখন আসতে সময় পাব না পাব; তাই সময় থাকতে নেমন্তন্নটা সেরে রাখছি।

মা বলে— ভালোই করেছিস! দাদা নেই, বউদিরও বয়স হয়েছে; তার দ্বারা আর কতটা করা সম্ভব! তোকেই তো সব করতে হবে। নে, খেতে বোস। সীমা, দাদার জন্যে জল-আসনটা করে দে তো!

মামাতো দাদার বিয়ে ঠিক হয়েছে। এতে আমার আনন্দিত হওয়ারই কথা। অথচ আমার মনে ধক করে লাগল কথাটা! খুশি তো হতেই পারলাম না, বরং একটা চাপা কষ্ট মনের মধ্যে। কিন্তু আমার কষ্ট পাওয়ার কথা নয়। মামাতো দাদার সঙ্গে আমার বিয়ে হওয়া কখনও সম্ভব নয়। সে-রকম ভাবিনিও কখনো। তবু কেন যে মনের মধ্যে একটা খচখচানি ভেবে পাই না। মেয়েদের মন কি এমনই হয়!

আসন পেতে, গ্লাসে জল দিয়ে যতুদা'র খাবার জায়গা করে দিয়েছি। ভেবেছিলাম, আমি আর ও একসঙ্গে খেতে বসব। মা ভাতও বেড়ে দিয়েছে। আমি বললাম— একটু পরে খাচ্ছি। যতুদা'র খাওয়া হোক।

কেন যে হঠাৎ মত বদলালাম জানি না। আমি কি ওকে বোঝাতে চাইছি যে, তোমার বিয়ে ঠিক হওয়ার খবরে আমি মোটেও খুশি হইনি! হয় তো সেটাই। ওর ওপর আমার একটু রাগ যে হয়েছে, তা বেশ বুঝতে পারছি। ওর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, ও বেশ গম্ভীর। হয়তো আমার রেগে যাওয়াটা ধরতে পেরেছে।

ও এক মনে ভাত খেয়ে যাচ্ছে। চিবানোর ভঙ্গিটা কী বিচ্ছিরি! গালের ওপর হাড়দুটো উঁচু হচ্ছে দাঁতে চাপ দেওয়ার সাথে সাথে। গালের মাঝখানটা টোল খেয়ে যাচ্ছে। থুতনিতে গুঁড়িগুঁড়ি দাড়ি। তার মধ্যে দু’একটা সাদা রঙ চিক চিক করছে। যতুদা'র বয়সটা কম হয়নি! চাকরিই তো হয়ে গেল আট বছর। আগে বিয়ে করলে এতদিনে...! মুখখানা বুড়িয়ে গেছে। দেখতে ভাল্লাগছে না।   

একটু দূরে মোড়ার ওপর বসে যতুদা'কে যত দেখি, ততই আমার রাগ বাড়ে। তোর তো বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে। নাকবসা ছবিখানা বের করে চৌদ্দবার ধরিস চোখের সামনে। স্বপ্ন দেখিস। তাহলে এত হ্যাংলামি কেন? আর ক’দিন পরেই তো পাবি। তবুও...! লজ্জা করে না! আমি তোর বোন হই সম্পর্কে! তবুও গায়ে হাত দিস!

মনটা একটু শান্ত হলে ভাবি, পুরুষমানুষ মানেই কি এ-রকম! বক্সিবাবু, ক্যাশকাকু, কাজরির বর মন্টু, যতুদা' সবাই কি এক! শুধুমাত্র পুরুষ! মেয়েমানুষ দেখলেই ছোঁকছোঁকানি! পরক্ষণেই ভাবি, না না, তা কী করে হয়! আমার বাবাও তো পুরুষ! তার তো কখনও বেচাল দেখিনি! আজ না হয় বয়স হয়েছে বাবার! কিন্তু দশবছর আগে তো কম ছিল। তখনও দেখেছি কোনও অপরিচিত মেয়েমানুষের দিকে তাকাতো না। ‘মা’ ডাক ছাড়া কথা বলে না কমবয়সী মেয়েদের সাথে। বাবাকে আমি ছুঁয়েছি কবে, মনে পড়ে না। শীতকালে বাবার গায়ে-পিঠে তেল মালিশ করে দিতে গেলে বলে, ‘তোকে দিতে হবে না রে মা! তোর মা সময় পেলে দিয়ে দেবে। জানিস তো মেয়েরা বড় হলে দেবী হয়ে যায়। দেবীকে সবসময় ছুঁতে নেই।’

মা জিজ্ঞেস করে— হ্যাঁ রে যতু, আজ রাতখানা থাকবি তো এখানে?  

যতুদা' উঁচু করে ঘটি ধরে জল খাচ্ছিল। ঘটি নামিয়ে বলে— হ্যাঁ, পিসিমা। আজ রাতটা এখানে থেকে কাল সকালের ট্রেন ধরে যাব বনগাঁ। ছোটমামা তো এখন বনগাঁতে থাকে।

আমি ভাবি, যতুদা' তাহলে সারা দুপুর এমন কি বিকেলটাও জ্বালাবে আমাকে। এক কাজ করব! মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে বলে মায়ের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ব। চারটে বাজলেই উঠে চলে যাব সুলেখার বাড়ি। ও নিশ্চয় কাজে যাবে না আজ। ওর মা হাসপাতালে। বাড়িতেই পেয়ে যাব ওকে। যদি ওর মা হাসপাতাল থেকে ছাড়া না পায়, তাহলে ওর সঙ্গে ওর মাকে দেখতে যাব ঠিক করেছি।

খাওয়া-দাওয়ার পর মায়ের ঘরে গিয়ে শুয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু ঘুম এল না মোটেও। মেঝেতে বসে মা আর যতুদা'  সারাক্ষণ বক বক করে গেল।

আর আমি মটকা মেরে শুয়ে ওদের বকবকানি শুনলাম। বিয়েতে কী দেনাপাওনার কথা হয়েছে, নগদ দেবে কি না, ক’জন বরযাত্রী যাওয়ার কথা, নমস্কারি ও ননদপ্যাটারি কতগুলো দেবে; এসব প্রশ্নের উত্তরপর্ব চলল আধঘন্টা ধরে। তারপর এল বিয়ের কেনাকাটার কথা। কী শাড়ি কেনা হবে, বেনারসি না সাউথ ইন্ডিয়ান, ভোজে মাছ, মাংস দুই-ই হবে, নাকি শুধু মাংস, দই হবে না আইসক্রিম!

এসবের আলোচনা শেষ করে এল আমার বিয়ে দেওয়ার পর্ব। মায়ের আক্ষেপ, আমি নাকি বয়সের তুলনায় ফনফনিয়ে বেশি বেড়ে উঠেছি। আমার দিকে নাকি তাকানো যাচ্ছে না! বিয়ের যোগাযোগ না করলেই নয়। তার মাঝে ইশারা-ইঙ্গিতে যতুদা'র প্রশ্ন, আমি কারও সঙ্গে প্রেম করছি কি না। তার উত্তরে মায়ের জোরালো গলা, 'ডাইনে-বাঁয়ে করলে কেটে কুচি-কুচি করে ফেলব না! আমার মেয়ে বলে কথা! আমার মতোই হয়েছে।' আমি শুয়ে হাসব না কাঁদব ভেবে পাই না। মায়ের মতো হতে হলে তো ক্যাশকাকুর মতো কাউকে জোটাতে হয়। আমি তো তা পারি না। ইচ্ছে করলে তো সুভাষদার সঙ্গে...।

সবশেষে যতুদা'র কাছে মা আর্জি পেশ করে, ওদের অফিসে কোনও ভালো ছেলে থাকলে একটু যোগাযোগ করে দিতে। তবে, দিতে থুতে, বেশি পারবে না। আমার বাবাটা নাকি ঢ্যাঁড়স, ঠিকমতো সংসারই চালাতে পারে না। মেয়ের বিয়ের টাকা জমাবে কোত্থেকে। 

একথা শুনে রাগ হয় আমার। বাবার নিন্দা আমি একদম সহ্য করতে পারি না। তবুও চুপ করে থাকি। এসব আলোচনা শুনতে শুনতে আমার বিরক্ত ধরে যায় একসময়। আমি নড়াচড়া করি। তারপর উঠে বসি। ওদের আলোচনা থেমে যায়। আমি হাই তুলি। তখখুনি যেন ঘুম ভাঙল, এমনভাবে আড়মোড়া ভাঙি।

যতুদা' বলে— কী রে! পড়ে পড়ে ঘুম দিলি! ভিক্টোরিয়া কখন যাবি? 

আমি বলি— শরীর ভালো নেই, ভিক্টোরিয়া যাব না।

আমার কথা শুনে ও খুশি হল, না দুঃখ পেল বুঝতে পারি না। আমার মনে হয় খুশিই হল। আমাকে বেড়াতে নিয়ে গেলে তো অনেকগুলো টাকা খসত। অথচ তেমন কোনও সুবিধা হত না। আমার হাবভাব দেখে বুঝেই গেছে যে, আমি ওকে আর আমার শরীর ছোঁয়ার সুযোগ দেব না।  

আমি ম্যাক্সি পরে শুয়েছিলাম। হাঁটু অবধি ম্যাক্সি উঠে গিয়েছিল ব'লে মা একখানা চাদর চাপিয়ে দিয়েছে। আমি চাদরটা আর সরাইনি। তাই খুব ঘেমে গেছি। তা দেখে যতুদা' বলে ওঠে— বাব্বা! ঘেমে গেছিস যে! গলায় ঘাম জ্যাব জ্যাব করছে।

আমি বুঝতে পারি, গলায় ঘাম দেখার অজুহাতে ও আর একবার আমার বুক দেখল। পুরুষের চোখ শুধু দেখে না, ছোঁয়ও যেন! তাই ওদের চোখ শরীরে পড়লেই বোঝা যায়।

এতক্ষণ শুয়ে থাকার পরেও দেখি চারটে বাজেনি। উঠে বাথরুমে যাই। হাতে মুখে জল নিই। হঠাৎ মনে হয়— মা বলছিল, আমি নাকি বয়সের তুলনায় বড় হয়ে গেছি। আমার দিকে তাকানো যাচ্ছে না! কী নোংরা কথাবার্তা সব! তাকানো যাচ্ছে না মানে, আমার পুরুষ্টু বুকের কথাই বোঝাতে চাইছে। নিজের মেয়ে সম্পর্কে ভাইপোর সঙ্গে কেউ এমন আলোচনা করে। আমি যেন এর জন্যে দায়ী! তাছাড়া কী-ই বা এমন বড় সাইজ আমার। চৌত্রিশ সাইজ ব্লাউজ লাগে। ঝুমুরের লাগে তো ছত্রিশ। তবুও আমার খুব ইচ্ছে জাগে নিজেকে একটু দেখার। ঘরে তো দেখার উপায় নেই। ছোটকাকা, নয় তো ক্যাশকাকু কেউ না-কেউ ঘুর ঘুর করবেই। তাই বাথরুমে একটা চিড় ধরা বাতিল আয়না দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছি। ওটাতেই মুখখানা দেখি মাঝে মাঝে। আজ বুক দেখার সাধ হল খুব। মাথা গলিয়ে খুলে ফেললাম ম্যাক্সিখানা। চিড় ধরা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম ব্রেসিয়ার পড়া বুকে। একসময় ব্রেসিয়ারটাও খুলে ফেললাম। কিছুটা নত হয়ে থাকা দু’খানা বড় ফজলি আম বসানো রয়েছে যেন! আমের রঙ হলুদ, বোঁটা দুটো কেমন লালচে। ঝুমুর একদিন বলেছিল, ‘মা হওয়ার পর বোঁটা কালো হয়ে যায়।’ এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কখনও দেখিনি নিজেকে। এটাই আমি! এই আমার শরীর! কেমন যেন অচেনা লাগছে। ছোটকাকার ঘরে বিছানার তলায় পাওয়া ম্যাগাজিনের ছবির মতো বুক আমার! না না তার চেয়েও সুন্দর!  

আচ্ছা! মা তো কখনও উদলা দেখেনি আমাকে! তবুও মা কী করে বুঝল! আসলে, মা-রা সবই বুঝতে পারে। বাবা বলে, ‘মা-বাবার কাছে ছেলেমেয়েরা কিছু লুকোতে পারে না।’ এই যে এখন আমি বাথরুমে কী করছি, মা এটাও হয়তো বুঝে ফেলেছে। এ ভাবনাটা মাথায় আসতেই তাড়াতাড়ি ম্যাক্সিটা গলিয়ে বেরিয়ে আসি বাথরুম থেকে।

মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে যায়। এমন খুশি যে, যতুদাকেও ক্ষমা করে দিতে ইচ্ছে করে। ওর ওপর রাগটা বেমালুম উধাও হয়ে যায়। ওরই বা দোষ কী! ও পুরুষ! পুরুষরা সুযোগ পেলেই নারীদের ভোগ করতে চাইবেই। বিশেষত আমার মতোন ‘না তাকাতে পারা’ শরীর যদি থাকে! আমি সুযোগ দিয়েছি বলেই না ও...! আচ্ছা! আমি তো এমন নই। তবুও কেন আমি এমনটা করলাম! ভাবি, কিন্তু কারণ খুঁজে পাই না। মা মাঝে মাঝে বলে, 'বড় হয়েছিস, নিজের শরীরে যত্ন নিতে  শেখ।’ 

নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া মানেই কি পুরুষের চোখে নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা! তাতে তো বিপদ আরও বাড়ে। তবুও মেয়েরা কেন যে...! এর উত্তরও খুঁজে পাই না। আসলে, আমি একটা কেবলি, অনেক কিছুই আমার বোধবুদ্ধি দিয়ে বুঝে উঠতে পারি না। 

মনে মনে যতুদা'কে মাফ করে দিতেই মনে দুষ্টু-বুদ্ধি জাগে। দাঁড়াও, নিজেকে আরও লোভনীয় করে তুলব। কিন্তু এবার আর ধরা দেব না। ধরতে গেলেই প্রজাপতির মতো ফুরুৎ করে উড়ে যাব।

হাতে সময় থাকায় অনেকক্ষণ ধরে সাজি আজ। যে চুড়িদারটা পরলে আমাকে সবচেয়ে বেশি মানায়, সেটা বের করে পরি। মনে মনে বলি, ‘দেখ যতুদা! তোমার ব্যাগের মধ্যে খামে ঢোকানো নাকবসা সুন্দরীর চেয়ে আমি ঢেরগুণে বেশি সুন্দরী। এবার আমাকে আর ছুঁতে এসো না হাত পুড়ে যাবে।’

আমাকে অনেকক্ষণ দেখতে না পেয়ে যতুদা' পাশের ঘরে এসেছে আমার খোঁজে। আমাকে দেখেই বলে ওঠে— বাব্বা, এত সেজেছিস! কোথায় যাবি রে?

আমার মুখ দিয়ে কেন যে বেরিয়ে যায়— ভিক্টোরিয়া!

সে কী! একটু আগেই বললি শরীর ভালো নেই, যাবি না! আমি তে রেডি হইনি! দেরি হয়ে যাবে তো!

তুমি ভাবলে কী করে যে, তোমার সঙ্গে যাব!

তবে? কার সঙ্গে যাবি?

তুমি ছাড়া আমার কি আর কেউ নেই! ভেবেছিলাম তোমাকেও আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাব। পরে ভাবলাম, হবু-বউদির পারমিশন নেওয়া নেই তো! পরে জানলে যদি রাগ করে! 

কথাটা শেষ করেই আমি গট গট করে বেরিয়ে পড়ি যতুদা'র পরের কথার তোয়াক্কা না করে। জুতোর শব্দ পেয়ে মা বলে ওঠে— কোথায় চললি সীমা?

আমি এগোতে এগোতে বলি— সুলেখাদের বাড়ি!

সুলেখাদের বাড়িতে আমি যাইনি কোনওদিন। তবে বাড়িটা চিনি। রত্না একদিন দেখিয়েছিল। রত্নার বাড়ি ছাড়িয়ে সেকেন্ড লেন ধরে আর কিছুটা এগোলেই ওর বাড়ি।

আমার ভাগ্য ভালো, সুলেখার বাড়ি অবধি হাঁটতে হল না। ফিনাইল কোম্পানির কাছাকাছি যেতেই দেখি সুলেখা আসছে। আমাকে দেখে বলে— কী রে, কোথায় যাচ্ছিস? এত সেজেগুজে!

আমি তো তোর কাছেই যাচ্ছিলাম! তোর মা কেমন আছে? ছাড়া পেয়েছে আই.ডি. থেকে?

মা মোটামুটি ভালোই আছে। তবে ছাড়েনি এখনও। কাল ছাড়তে পারে। আমি তো আই.ডি-তে যাচ্ছি মাকে দেখতে।

চল, আমিও দেখে আসি মাসিমাকে। কাল তো যেভাবে ট্যাক্সিতে উঠে চলে গেলি, কথাই বলা গেল না।

কাল কথা বলার অবস্থায় ছিলই না মা! একদম নেতিয়ে পড়েছিল। ভাগ্যিস রবিবার! দাদা বাড়িতে ছিল! তাই...! সাত বোতল স্যালাইন টেনেছে জানিস! শরীরে সমস্ত জল নাকি বেরিয়ে গিয়েছিল!

যাক এখন অনেকটা ভালো আছে বলছিস! কথাটথা বলছে তো?

হ্যাঁ, সকালে গিয়েছিলাম। উঠে বসেছিল, কথাও বলেছে। তবে খুব কাহিল হয়ে গেছে রে! সীমা! একটু পা চালিয়ে চল। ভিজিটিং আওয়ার ছ’টা অবধি। দেরি হলে বেশিক্ষণ কথা বলা যাবে না মায়ের সঙ্গে।

হ্যাঁ, চল।

আই.ডি. হাসপাতালে ফিমেল ওয়ার্ডের সামনে পৌঁছে দেখি বেশ ভিড়। কোলাপসিবল গেটটা একটু ফাঁক করা। তার সামনে বেশ বড় লাইন। যণ্ডামার্কা একজন লোক গেট আগলে দাঁড়িয়ে হম্বিতম্বি করছে। কার্ড দেখিয়ে তবে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি। যত না লোকজন ঢুকছে ভেতরে, তার চেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি বেশি হচ্ছে।

সুলেখা বলে, তুই দাঁড়া এখানে। এক সাথে দু’জন ঢোকা যাবে না। আমার কাছে একখানা কার্ড আছে। অন্যটা দাদার কাছে। দাদা বোধহয় ঢুকে গেছে আগেই। চারটেয় দাদার চলে আসার কথা। আমি ঢুকে দাদার কাছ থেকে কার্ডটা নিয়ে আসছি।

তোর দাদা যদি এখনও না এসে থাকে?

তুই দাঁড়া তো! দাদা না এলেও অন্য কারুর থেকে ম্যানেজ করে নিয়ে আসছি।

সুলেখা কিছুক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ধাক্কাধাক্কি সামলে ভেতরে ঢুকে যায়। গেটের সামনে এত জটলার কারণ বুঝে উঠতে পারি না। কার্ড দেখাবে, ঢুকে যাবে। গেটের মুখটা ফাঁকা থাকারই কথা।

গেটের কাছাকাছি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বুঝে যাই জটলার কারণ। আসলে, যাদের কার্ড নেই, তারাও ঢুকতে চায়। ষণ্ডামার্কা লোকটা তাদের বাধা দিতে চায়। তাই যত গণ্ডগোল।

ভাবি, সর্বত্রই একই দৃশ্য। নিয়মভাঙার চেষ্টা। তা সে ঝুমুরের সঙ্গে ফৌজির মেলামেশাই হোক, খেলারাম সরখেলের মাসাজ সেন্টারে মাসাজ করানোই হোক কিংবা আমাকে নিরিবিলিতে পেয়ে যতুদা'র আদর করাই হোক। নিয়ম ভেঙেই যেন বেশি আনন্দ পায় মানুষ! যারা কোনওরকমে কার্ড ছাড়াই গেট পেরিয়ে ঢুকে যাচ্ছে, তাদের মুখের হাসিতে যেন বিশ্বজয়ের আনন্দ। প্রিয়জনকে দেখতে যাওয়ার চেয়েও এই ঢুকতে পারাটা বেশি সুখের যেন!

বেরোনোর গেটটা ফাঁকা। দু’একজন বেরোচ্ছে। আমি তাকিয়ে রয়েছি বেরোনোর গেটের দিকে। সুলেখা বেরোবে। তারপর আবার ঢুকব দু’জনে!

আমি ভাবি, আমি কি সত্যিই মাসিমার টানে, মানে সুলেখার মায়ের টানেই এসেছি! মাসিমার সঙ্গে আমার তো আলাপ হয়নি এখনও। সুলেখার মুখে শুনেছি তার কথা। মাসিমাও হয় তো আমার কথা শুনেছে। এই পর্যন্ত। তবে কি কর্তব্য পালনের জন্যই এসেছি!

কাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো যেতাম না! এটাকে ভদ্রতা রক্ষাও বলা চলে। পরক্ষণেই মনে হয়, তাই যদি হয়, তাহলে রত্না তো এল না ভদ্রতা রক্ষা করতে! সুলেখা তো ওরও বন্ধু! আমিই কেন বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছি! তাহলে কি কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে! 

সুলেখার দাদা বাল্ব কারখানায় কাজটার যোগাযোগ করে দিয়েছিল বলেই কি! সে তো কবেকার কথা। সব চুকেবুকে গেছে। কারখানাই নেই আর। কাল গাড়ি থেকে সুভাষদা' হাত না নাড়লে হয়তো আসার ইচ্ছাটাই জাগত না!

তবে কি সুভাষদা'র টানেই! নাহ! সেরকম টান থাকার কথা নয়। ওর সঙ্গে আমার দেখা সাক্ষাৎ হয় না। আজকাল আর হিপিদা'র সেলুনে চুল কাটাতে যায় না বোধহয়। তাহলে বোধহয় যতুদা'কে এড়িয়ে চলার জন্যেই বেরিয়ে পড়েছি। কোথায় যাব ঠিক করতে না পেরে সুলেখার বাড়ি যাচ্ছিলাম ওর সঙ্গে...!   

এ-সব ভাবতে ভাবতে দেখি সুলেখার দাদা বেরোচ্ছে ভেতর থেকে। আমাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য সুলেখা ওর দাদাকে পাঠিয়েছে!   

এদিক ওদিক তাকিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে যায় সুভাষদা'। কাছে আসে। বলে— চল, কার্ড এনেছি।

এমন ভাবে বলল, যেন ওর জন্যই দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। এখন ঢোকার লাইনটা আর নেই। একজন করে আসছে, ঢুকে যাচ্ছে। দুটো কার্ড দেখিয়ে আমরাও ঢুকে গেলাম। পাশাপাশি যেতে যেতে সুভাষদা' বলে— তুমি মাকে দেখতে আসবে ভাবিনি।

আমি কী বলব ভেবে না পেয়ে চুপ করে থাকি। ও আবার বলে— হাসপাতালে রোগি দেখতে এসেছ, এত সেজেগুজে কেন? 

ওর কথায় ভীষণ লজ্জা পেয়ে যাই আমি। তা ঢাকতেই বলি— তা নয়, আসলে আমার মামাতো দাদা এসেছে। ওর সঙ্গে একটু বেরিয়েছিলাম। দেরি হয়ে যাবে বলে আর পোশাক বদলাইনি।

ও, দাদা! মামাতো দাদা!

হ্যাঁ, অঘ্রাণে ওর বিয়ে। নেমন্তন্ন করতে এসেছে আমাদের বাড়ি। মাসিমা কেমন আছে?

আপাতত ভালো। সেজেগুজে তোমাকে বেশ লাগছে!

মাসিমা উঠে বসছে তো এখন?

হ্যাঁ, বিপদ কেটে গেছে। মামাতো দাদার সঙ্গে কোথায় গিয়েছিলে?

কিছু কেনাকাটা করার ছিল। কত নম্বর বেড মাসিমার?

ওই তো সামনেই ছ’নম্বর। সুলি দাঁড়িয়ে আছে।

সুলেখা হাত নাড়ে— এই যে এদিকে! মা, দেখো কে এসেছে তোমাকে দেখতে! সীমা। 

আমি সুলেখার মাকে প্রণাম করার জন্য হাত বাড়াই। অবসন্ন গলায় মাসিমা বলেন— থাক মা! অসুস্থ মানুষকে প্রণাম করতে নেই। তোমার কথা সুলির কাছে অনেক শুনেছি।

এখন ভালো আছেন তো?

হ্যাঁ, কাল যা অবস্থা হয়েছিল, আর দেখতে পেতে না হয়তো!

ছি! অলুক্ষুণে কথা বলবেন না তো! ওইসব বাসি খাবার-দাবার খাবেন না আর কখনও।

তোমাকে কে বলল, বাসি খাবার খেয়েছি!

আমি শুনেছি। শুয়ে পড়ুন আপনি। বসে থেকে কষ্ট হচ্ছে আপনার।

শুয়ে থেকেই বেশি কষ্ট হচ্ছে। আজ ছেড়ে দিলে ভালো হত।

কাল ছেড়ে দেবে। আজকের রাতটুকু কষ্টমষ্ট করে থাকতেই হবে। কী খেতে দিচ্ছে আপনাকে?

কিছু না, লেবু-চিনি-গোলা জল। রাতে ভাত দেবে শুনছি। ভাত না খেয়ে কি থাকা যায় বল তো! সুবো আবার হরলিক্স কিনে নিয়ে এসেছে। গরম জলে গুলে খেতে হবে। ওসব ঝকমারি। কী দরকার ছিল এতগুলো টাকা খরচ করার!

ছেলে রোজগার করছে, মায়ের জন্য খরচ করছে। ভালোই তো! কথাটা বলে আমি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুভাষদা'র দিকে তাকাই।

সুভাষদা' আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে।

সুলেখা বলে— গ্লাসটা দাও তো মা! আমি বাইরের চায়ের দোকান থেকে গরমজল এনে দিচ্ছি।

সুভাষদা হাত বাড়ায়— দে, আমি আনছি। 

তুই গেলে বেশি পয়সা নেবে! মেয়েদের কাছেই ওরা জব্দ। মায়ের সাথে কথা বল তুই! আমি আনছি।

কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমার দিকে চোখ ঠারে সুলেখা। সুভাষ ওর মায়ের অলক্ষ্যে বোনকে ঘুষি দেখায়।

সুলেখা গ্লাস নিয়ে চলে যায়। আমি সুভাষদার দিকে তাকিয়ে বলি— পাশের টুলটা খালি আছে তো!

মাসিমা বলেন— সুবোটার খুব কষ্ট গো! ওর বাবা তো বাতের ব্যথায় পঙ্গু। যত দৌড়ঝাঁপ ওকেই করতে হচ্ছে। কাজেও যেতে হয়েছিল। পুজোর আগে তো! ওদের এখন ‘সিজিন’। ছুটি দেয়নি।

ওর কাজের জায়গা কোথায় মাসিমা?

ওকেই জিজ্ঞেস কর না! এত লজ্জা কী! শুনেছি ও-ই তোমার কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।

হ্যাঁ, সুলেখা একবার বলেছিল সুভাষদা' কাপড়ের দোকানে কাজ করে।

হ্যাঁ, ক্যাশিয়ার। অনেক বড় দোকান, বড়বাজারে। কী যেন নাম রে সুবো তোদের দোকানটার?

সুভাষদা' বলে— নিউ নাড়ুগোপাল বিষয়ী।   

হ্যাঁ, 'নাড়ুগোপাল', মনে থাকে না ছাই! ও তো কাজের জায়গা থেকে সোজা এখানে চলে এসেছে। হ্যাঁ রে সুবো, দুপুরে খেয়েছিস তো!

সুভাষদা বলে— তুমি খাওনি বলে আমিও না খেয়ে থাকব নাকি!

শুনছ ছেলের কথাবার্তা! আমি কি তোকে না খেয়ে থাকতে বলেছি! খুব পাজি ওটা!

সুভাষদা হাসে। আমি বলি— শাসন করতে পারেন না?

ছেলে বড় হয়েছে, আর কি মায়ের শাসন মানে রে মা! এখন ওকে শাসন করার জন্যে বউমা আনতে হবে।

তোমার খালি ওই কথা মা! জান তো ছেলের বউ আনলে মা পর হয়ে যায়!

ভালো ঘরের মেয়ে আনলে পর কেন হবে! বল তো মা!

হ্যাঁ মাসিমা, সে তো ঠিকই। খুঁজে-পেতে একটা ভালো ঘরের মেয়ে নিয়ে আসুন, দেখবেন তখন শাসন কাকে বলে।

আমার কথা শুনে মাসিমা আর সুভাষদা' দু’জনেই হেসে ওঠে।

হাসি থামিয়ে মাসিমা বলে— তুমি তো বেশ মজা করে কথা বলতে পার। সুলেখার সঙ্গে আসতে পার তো আমাদের বাড়িতে। আসবে! বুঝেছ! 

আমি সম্মতি জানাতে ঘাড় নাড়ি। সুভাষদা হঠাৎ বলে ওঠে— মেয়েদের ‘চোখে-মুখে কথা’ ভালো নয় শুনেছি, ‘ঘাড়ে কথা’ কি ভালো মা!

সে আবার কী রে! ‘ঘাড়ে কথা’ মানে?

আমিও সুভাষদার কথাটা ধরতে পারিনি। তাই প্রশ্ন আঁকা চোখে তাকাই ওর দিকে। ও বলে— দেখলে না, ঘাড় হেলিয়ে বলল, যাব। এটাকে কি ‘ঘাড়ে কথা’ বলা যায় না!

এবার আমিও হেসে উঠি। হঠাৎ হাসি থামিয়ে দিই আমি। খেয়াল হয়, এটা হাসপাতাল, আশেপাশে কত রোগি! যন্ত্রণা, ব্যথা, বেদনা, কষ্ট! এখানে সবসময় গম্ভীর থাকা উচিত। তাই আমি গম্ভীর হয়ে যাই!

সুভাষদা' ওর মায়ের সঙ্গে সাংসারিক কথা বলতে থাকে নিচু গলায়। আমি আশেপাশে চোখ ছুঁড়ি। বাব্বা! কত রোগি এদের সকলেরই কি ডায়েরিয়া কিংবা কলেরা হয়েছে! হাসপাতালে এলে বোঝা যায়, কত লোক অসুস্থ! এরাই যখন ট্রেনে-বাসে ভিড় করে, তখন মনেই হয় না, শহরে এত অসুস্থ মানুষ আছে!

কিছুক্ষণ পরেই সুলেখা গ্লাসে গরমজল নিয়ে আসে। হরলিক্সের প্যাকেট খুলে গ্লাসে হরলিক্স বানায়। আমি একটু-আধটু হাত লাগাই। মাসিমার মুখে গ্লাস ধরি। 

সুভাষদা বলে— আমি এবার যাব মা! আমাকে আবার দোকানে যেতে হবে। ঘন্টা দুয়েকের ছুটি পেয়ে এসেছি।

সুলেখা খালি গ্লাসটা বেসিনে ধোয়ার জন্য এগোতে এগোতে বলে— দাঁড়া না বাবা! আমরাও তো যাব। তুই একটু দেরিতে পৌঁছলে খদ্দেররা টাকা না দিয়ে চলে যাবে ভাবছিস নাকি!

মাসিমাকে আর একবার শরীরের যত্ন নেওয়ার ও সাবধানে থাকার কথা বলে বেরিয়ে আসি তিনজনে একসঙ্গে। বেরোনোর আগে মাসিমা বলেন— তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে, বাড়িতে আসবে, আমি মিটিমিটি হেসে ঘাড় হেলাই। বাইরে বেরিয়ে সুভাষদা হঠাৎ বলে— রাগ করেছ নাকি?  

আমি অবাক হই— ওমা, রাগ করব কেন?

ওই যে ‘ঘাড়ে কথা’ বলতেই গম্ভীর হয়ে গেলে ভারি!  

আমি এবার খিল খিল করে হেসে উঠি— আপনি না খুব বোকা! হাসপাতালে গম্ভীর থাকতে হয়, এত হাসতে নেই।

সুভাষদা সুলেখাকে উপলক্ষ্য করে বলে— হাসপাতালে সিম্পল ড্রেস পরে আসতে হয়, এত সাজতে নেই।

সুলেখা বলে— সীমাকে সাজলে বেশ ভালো লাগে! ফর্সা তো, স্বাস্থ্যটাও ভালো।

আমি সুলেখার পিঠে আলতো চাপড় মারি— যাঃ! ফাজিল কোথাকার!

সুভাষদা বাসস্টপের দিকে এগোতে এগোতে বলে— চলি, পরে দেখা হবে।  

আমি তড়িঘড়ি বলে উঠি— আর হিপিদা'র সেলুনে যান না দাড়ি কাটতে? অনেকদিন দেখা হয়নি।

ও বলে, যাই তো! আবার সামনের রোববার যাব।

সুলেখা ঠোঁট টিপে হেসে বলে, রবিবার, মনে রাখিস কিন্তু!

আমি সুলেখার পিঠে আলতো করে একটা কিল মারি, যাঃ! তুই না ভীষণ ফাজিল!

তোর দাদার সঙ্গে দেখা করতে আমার বয়েই গেছে! বড়বাজারের মতো জায়গায় কাজ করে। কত সুন্দরী মেয়ে আসে ওখানে। এতদিন কি কারও সঙ্গে প্রেম করেনি তোর দাদা? 

সুলেখ হেসে ওঠে— ও প্রেম করবে! বলেছিস ভালো। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই দাদা তোতলায়।

বাজে বকিস না! হিপিদার সেলুনে তোর দাদা-ই তো যেচে কথা বলেছিল আমার সঙ্গে।

সে তো তোর উপকার করার জন্যে। তুই কাজের খোঁজ করছিলিস; তাই কাজের সন্ধান দেওয়ার জন্যে। আমার দাদার মনটা খুব নরম জানিস! ভিখিরিরা ভিক্ষা চাইলে কাউকেও ফেরায় না।

তাহলে তোর দাদার অনেক পয়সা আছে বল!

অনেক পয়সা থাকলে তো আমাকে কাজ করতে হত না। জানিস তো বাবা থেকেও না থাকা। সংসারটা দাদাকেই সামলাতে হয়। আমি আর ক’টাকা দিতে পারি বল। দাদার চাকরিটা যদি আর একটু ভালো হত।

সবই কপাল বুঝলি সীমা, সবই কপাল। দাদা বি কম পাশ জানিস! অ্যাকাউন্টেন্সি নিয়ে পড়েছে। কিন্তু কোনও চাকরি পেল না।

একবার তো সেল ট্যাক্সে চাকরি পেয়ে যাবার কথা প্রায় পাকা। শেষ মেশ কেঁচিয়ে গেল দুলাখ টাকা ঘুষ দিতে পারল না বলে। এতগুলো টাকা কোথায় পাবে বল।

তখন মা বলেছিল, বাড়িটা বিক্রি করে ঘুষের টাকা জোগাড় করার কথা। বাবা কিছুতেই রাজি হয়নি। বাবার ভয়, টাকা দিয়েও যদি চাকরিটা না হয়! তখন পথে বসতে হবে। মা-মেয়ে নিয়ে কি ফুটপাতে থাকবে! বস্তি হোক, টালির চাল হোক, তবু তো মাথার ওপর রয়েছে একটা কিছু!

আমি কী বলব ভেবে পাই না। কিছুক্ষণ আগে মনের মধ্যে একটা ফুরফুরে বাতাস বইছিল। এখন গুমোট। সে গুমোট কাটাতে জানলা-দরজা খুলে দেওয়ার মতো করে আমি বলি— সুভাষদাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে বল। এখনও এজ পেরোয়নি। নিশ্চয় একটা সরকারি চাকরি পেয়ে যাবে। আমার এক মামাতো দাদা আছে, যতুদা', ও চেষ্টা করতে করতে ছ’বারের বার চাকরি পেয়েছে। আর একমাস পর সে দাদার বিয়ে।  

সুলেখা কেমন আনমনা হয়ে গেছে যেন! ও রাস্তায় চলতে থাকা গাড়িগুলোর দিকে চোখ রেখে অদ্ভুত গলায় বলে— হ্যাঁ, ছেলেরা চাকরি পেলেই বিয়ে করে। তারপর বউ নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। তখন মা-বাবা-বোন কেউই আপন নয়। তখন...।

আমি সুলেখাকে ধমক দিয়ে বলে উঠি— যাঃ! তোর দাদা এমন নয়। খুবই ভালো ছেলে। তাছাড়া তোর বউদি যে হবে সে যদি...। 

সুলেখা হঠাৎ আমার গালে চিমটি কেটে বলে— যে যদি আমার বন্ধু হয় তাহলে ভালো হয়। আমার গালটা আমি দেখতে না পেলেও বুঝি, গাল রাঙা হয়ে গেছে। তা সুলেখার চিমটি কাটায় নাকি অন্য কারণে কে জানে!

 

সাত

দিন দুয়েক হল ঝুমুরের দেখা নেই। সেই যে রবিবার ফুলবাগান থেকে আসার পর, রত্না-সুলেখাকে আসতে দেখেই চলে গেল; আর আসেনি দু’দিন। কোথায় গেল কে জানে! ওর জন্য মনটা কেমন করছে। হতচ্ছাড়ি লাইনের মেয়ে হয়ে গেছে, ওর সঙ্গে মিশলে এখন আমদেরও বদনাম হতে পারে! কিন্তু না মিশেও পারব না। কেন যে ওকে এত ভালোবাসি! সেদিন ফুলবাগান থেকে হেঁটে হেঁটে ফেরার সময় কাকে যেন ফোন করছিল! ‘রিপোর্টারদা’ বলে কাকে সম্বোধন করল! এই রিপোর্টারদা মানে কি সেই ওর ছবি ছাপানো ছেলেটা; নাকি অন্য কেউ কে জানে! এ ছেলেটার ওপর তো বেশ চটেছিল দেখলাম সেদিন। আবার এত ভাব হল কী করে জানি না! সেদিন তো আমার কাছ থেকে তড়িঘড়ি চলে গেল জরুরি কাজ আছে বলে। আমার মনে হয় ওই রিপোর্টার-ছোঁড়াটার সঙ্গেই দেখা করতে গেল! আমার মনে আছে, রবিবারে ফুচকা খাওয়ার সময় ছেলেটাকে বলেছিল, ‘কাল সন্ধে ছ’টায় ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’।’

‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ মানে তো ময়দানেই কোনও এক জায়গা। ভিক্টোরিয়ার কাছাকাছি হবে। ছোটকাকার কাছে শুনেছি ওখানে নাকি মিউজিকের তালে তালে জলের ফোয়ারা নাচানাচি করে, আর লাল-নীল আলো ফেলা হয় সেখানে। অনেক লোক বসে বসে দেখে ওই জল আর আলোর নাচন। ওখানে ওর কী কাজ বুঝি না বাবা! ওর সঙ্গে এত মাখামাখিই বা কেন! এর মধ্যে কোনও বিপদ-টিপদ হল না তো! সেদিন তো বলছিল ওর খুব বিপদ! কী বিপদ, কিসের বিপদ খুলেও বলল না। বোম-রতন নাকি ওর পেছনে পড়েছে! রুমিদের মাসাজ সেন্টারটা নাকি মধুর ভাণ্ডার! প্লাইউড কারখানায় আগুন লাগায় নাকি বোম-রতনের হাত আছে! আরে বাবা, তুই মেয়েছেলে! তোর এত ঝামেলায় জড়ানোর কী দরকার? কী যে মাথায় আছে ওর বুঝি না। দেখে শুনে কোনও কারখানায় কাজ জুটিয়ে নে! তা নয়...! ঝুপড়িতে থেকে থেকে স্বভাবটাও ওই ঝুপড়ির মেয়েগুলোর মতো হয়ে গেছে। চুলোয় যাক, আমার আর খোঁজখবর নিয়ে দরকার নেই। ‘যেমন কাঠ খাবে তেমন কাঠকয়লা হাগবে’।

ওই রত্না যা বলছিল সেটাই ঠিক! কাউকে জুটিয়ে নিয়ে বকখালি কিংবা দিঘায় খেপ খাটতে গেছে বোধহয়। একটু যে ফোন করে খবর নেব, তা নম্বরটাও খুঁজে পাচ্ছি না ছাই! বাসের টিকিটের পেছনে লিখে দিয়েছিল। সে কি থাকে, ওইটুকুনি একটা কাগজ! ওর ঝুপড়িতে যেতেও গা ঘিন ঘিন করে। একে তো পচাখালের দুর্গন্ধ! সে যা হোক না হোক সহ্য করা গেল। কিন্তু ওখানকার ওই লাফাঙ্গা মার্কা ছেলেগুলোর চাহনি সহ্য করা যায় না মোটেও! এমনভাবে তাকায় যেন চোখ দিয়েই খুবলে খাবে! মেয়েছেলে যেন দেখেনি বাবার কালে! টোন-টিটকিরিও করে। কাঁহাতক সহ্য করা যায় সেসব! তবুও আমার হয়েছে দায়! কেন যে ভালোবেসে ফেলেছি ঝুমুরকে! দেখি, আজ ঠেকে রত্না, সুলেখা এলে বলব ওদের ঝুপড়িতে একসঙ্গে যাওয়ার জন্য। একটু খোঁজ নিয়ে আসব। ওর মা-টার শুনেছি শরীর ভালো নেই। কীসব রোগ বাধিয়ে বসে আছে! বেঁচে আছে না টেঁসে গেল কে জানে! একদম সহ্য করতে পারি না ওই মেয়েছেলেটাকে! ওর জন্যেই আজ ঝুমুরের এই হাল! ভদ্রঘরের বউ, স্বামী-মেয়ে নিয়ে ভরভরন্ত সংসার। স্বামীর ব্যবসা আছে। সুখে ঘর-সংসার কর! তা নয়, ওই বক্সিবাবুর সঙ্গে ফস্টিনস্টি করতে গেলি! এত কুটকুটুনি কীসের বুঝি না! নিজের স্বামী তো ছিল! তোর কুকম্মর জন্যে স্বামীটা লজ্জায়-ঘেন্নায় মরল। ব্যবসাটাও গেঁড়িয়ে নিল বক্সিবাবু। তোকেও ছিবড়ে করে ছেড়ে দিল। দেনার দায়ে বাড়িটাও গেল। শেষে ওই খালপাড়। তাও শুনেছি নাকি খালপাড়ে সব বস্তি উচ্ছেদ হবে। খালের সংস্কার হবে। ওই খাল দিয়ে নাকি লঞ্চ চলবে! তখন কোথায় যাবি! তুই অবিশ্যি তার আগেই মরে যাবি। ওই মেয়েটারই নাকাল হবে।

ওই যে, সুলেখা আর রত্না আসছে দেখছি। আজ তাহলে রত্নাটা ফ্যান কারখানায় কাজে গিয়েছিল। কেন যে ওর কাজটা ভালো লাগে না, বুঝি না! মাইনে তো খারাপ দেয় না শুনেছি। ইচ্ছা করলে আমি কাজটা করতে পারতাম। তোর অভাব বেশি, টাকার দরকার বেশি, তাই সুলেখা বলা সত্ত্বেও আমি যাইনি। তুই অন্তত মন দিয়ে কর কাজটা!

না ভাবতে চাইলেও কেন যে মনের মধ্যে এসব কথা বয়ে যেতে থাকে কে জানে! সত্যি মনটা অদ্ভুত এক জিনিস। কোন সময়ই দেখলাম না ভাবনা ছাড়া থাকে। ওই ঘুমোলেই যা...! তা-ও বা কেন, স্বপ্ন দেখে তো মানুষ।

রত্নার কথাবার্তায় কখনও কোনও ভূমিকা থাকে না। দুম করে মাঝখান থেকে কথা বলা শুরু করা ওর অভ্যেস! আজও অন্যরকম কিছু হল না। কাছে এসেই বলল— কী রে সীমা, ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিস! ভাবছিস শিবের বাবাও টের পাবে না!

আমি ধরতেই পারি না ও কী বলতে চাইছে! সুলেখার দিকে প্রশ্ন-মাখানো দৃষ্টি ছুঁড়ি। সুলেখা মিটিমিটি হাসে, কিছু বলে না। আমি কিছু বুঝতে না পেরে বলি, শিবের বাবা টের না পাক, তুই তো টের পেয়েছিস। বল না কী ব্যাপার!

পরশুদিন খুব সাজুগুজু করে হাসপাতালে গিয়েছিলিস শুনলাম।

হ্যাঁ, সুলেখার মা-কে দেখতে! তাতে কী হয়েছে!

রত্না ভ্রূ নাচায়, ওর মাকে দেখতে, না অন্য কাউকে দেখতে?

অন্য কে আর আছে হাসপাতালে?

অনেক হয়েছে, আর এত নাটক করতে হবে না। সুলেখার কাছে সব শুনেছি।

কী শুনেছিস?

আরে বাবা, ও-ই তো চান্স করে দিল। নিচে আনতে পাঠাল, নিজে গরমজল আনতে গিয়ে দু’জনে কথা বলার সুযোগ করে দিল।

ও! এবারে বুঝেছি। সুভাষদা'র কথা বলছিস!

বাব্বা, আগে যেন বুঝিসনি! কেন নকশা করছিস! আমি কি ভাগিয়ে নেব! ওর চোখ টানার জন্যেই তো ঝাক্কাস ড্রেস দিয়ে...!

তুই বিশ্বাস কর রত্না, আমি জানতামই না ওখানে সুভাষদা' আসবে। তাছাড়া ড্রেস করার সময় আমি ভাবিওনি যে হাসপাতালে মাসিমাকে দেখতে যাব। আমি মামাতো দাদার সঙ্গে ভিক্টোরিয়া বেড়াতে যাব বলে সেজেছিলাম।

ভিক্টোরিয়া! শেষে ঝুমুরের মতো কাগজে ছবি ছেপে বদনাম কুড়োতে চাস নাকি।

আরে বাবা! মামাতো দাদার সঙ্গে ঘুরতে যাব, তাতে বদনামের কী আছে?

লোকে তো আর জানবে না যে, ছেলেটা তোর মামাতো দাদা! তারা তো ভাববে...!

সুলেখা এবার বাধা দেয়— ছাড় তো ওসব কথা! তার চেয়ে সীমা তুই বল, আমার দাদাকে কেমন লাগল?

কেমন আবার লাগবে! ভালোই! একজন মানুষকে যেমন লাগে!

রত্না কথার জোগান দেয়, এক জন বিশেষ মানুষ বল!

এবার আমি রেগে উঠি, বেশ! বিশেষ মানুষ তো বিশেষ মানুষ যা! তোর কি হিংসে হচ্ছে?

তা একটু-আধটু হচ্ছে বৈকি! তোর মতো কেবলি-মার্কা মেয়ে, ওর দাদাকে লটকে নিল, আর আমরা...!

‘আমরা’ বলিস না। ‘আমি’ বল ‘আমি’। সুলেখা তো আর নিজের দাদার সঙ্গে প্রেম করতে যাবে না! আর ঝুমুর ওসব প্রেম-ট্রেমের ধার ধারে না।

সুলেখা বলে ওঠে— হ্যাঁ ঝুমুরের কথা হল, ‘পয়সা ফেকো, তামাশা দেখো’! 

রত্না বলে— ঠিক হল না কথাটা। কথাটা হওয়া উচিত, মাল্লু দাও, চটকাও, মজা নাও।

এমন ভাবে সুর করে কথাটা বলে রত্না, আমি আর সুলেখা দু’জনেই হেসে উঠি।

হাসি থামিয়ে বলি— হ্যাঁ রে, দু’দিন ধরে ঝুমুরের পাত্তা নেই! কী ব্যাপার বল তো!

চল, ওদের ঝুপড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসি। সেদিন বলছিল ওর মা অসুস্থ।

ব্যাপার আর কী হবে...এই অবধি বলেই রত্না আচমকা থেমে যায়।

আমি আর সুলেখা একসঙ্গে বলে উঠি, কী হল রে?

রত্না চাপা গলায় বলে— সামনে তাকিয়ে দেখ। ডিউভিউয়ের ভেতরে মোটরবাইকে বসে বোম-রতন আমাদের দিকে কেমন সরু চোখে দেখছে। ওর চাহনিটা ভালো লাগছে না।

সুলেখা আর আমি দু’জনেই তাকাই ওদিকে। দেখি, সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে ঠোঁট সরু করে।

সুলেখা পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে— ও ওখানে বসে রয়েছে তো আমাদের কী! আমাদের সঙ্গে তো ওর কোনও লেনাদেনা নেই!

রত্না বলে— নেই, হতে কতক্ষণ! জানিস তো ও একটা গুণ্ডা। ওখান থেকে এসে যদি তোকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে ওর মোটরবাইকে তোলে, কেউ বাধা দিতে আসবে ভেবেছিস!

দেশে আইন বলে কি কিছু নেই! যা খুশি করলেই হল? 

তা থাকবে না কেন! আইনের দরজা অবধি তুই পৌঁছতে পারলে তবে তো! তার আগেই তো...!

আমি বলি— এক কাজ করি চল। আমরা এখান থেকে কেটে পড়ি। রাসমণি বাজারের দিকে যাই।

সুলেখা বলে ওঠে— কেন যাব, ওর ভয়ে নাকি? রোজই তো আমরা এখানে আড্ডা দিই! তাহলে এবার থেকে এখানে আসা বন্ধ করতে হবে বল! আজ নতুন তো আড্ডা দিচ্ছি না এখানে! ও তো এর আগেও কতবার গেছে এদিক দিয়ে। আমাদের কি কিছু করেছে?

আমরা কথা বলছি রতনের ব্যাপারেই। এমন সময় ও মোটরবাইক স্টার্ট করে। আমাদের কথা থেমে যায়। পুরোনো দিনের বুলেট গাড়ি। কী বিকট আওয়াজ! দুম দুম শব্দটা যেন আমাদের বুকের ভেতরে হচ্ছে। আমরা তিনজনে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। গাড়িটা আমাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় সি.আই.টি. রোডের দিকে। গাড়ির ধোঁয়া বেরনো পাইপটা থেকে জোরালো হাওয়ার ধাক্কা এসে লাগে আমাদের গায়ে।

আমাদের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। গাড়িটা চলে যাওয়ার পর সুলেখা বলে— কিছুই করতো না আমাদের। মিছি মিছি ভয় পাচ্ছিলিস তোরা।

রত্না বলে— যদি কিছু করত?

কিছু করতে এলে মজা দেখিয়ে দিতাম না!

রত্না টিপ্পনী কাটে— কী মজা দেখাতিস সে তো বুঝতেই পারছি। গাড়ি স্টার্ট করতেই কথা বন্ধ। আমাদের দিকে এগোতেই কাঠের পুতুল। হাত বাড়ালেই হয়তো প্যান্টি ভিজে যেত। সেটা তো মজার ব্যাপারই! নাকি বল সীমা!

রত্নার কথায় আমি হেসে উঠি। হাসিটা একটু জোরেই হয়ে গেছে। মনের মধ্যে চাপা ভয়টা কেটে যেতেই হয় তো। তাতে সুলেখা খুব রেগে ওঠে— সীমা, তুইও রত্নার কথায় সায় দিচ্ছিস। এমন করছিস যেন তুই দারুণ সাহসী!

এর মাঝে হঠাৎ ঝুমুরের গলা— তোরা কেউ সাহসী নোস! সবচেয়ে সাহসী হলাম আমি।

তিনজনে কথায় এত মশগুল ছিলাম যে, ঝুমুর এসেছে দেখতেই পাইনি। ঝুমুরকে দেখে আমরা খুশি হই। দু’দিন পর দেখা হল। আমরা তিনজনেই মনে মনে চাইছিলাম ঝুমুর আসুক।

ঝুমুর মিটিমিটি হেসে বলে— আমি কিছুক্ষণ আগেই এসেছি এখানে। দূর থেকে রতনের মোটর সাইকেলটা দেখতে পেয়েছি। তাই তোদের কাছে না এসে, ওই পঙ্কার গুমটির আড়ালে অপেক্ষা করছিলাম, কখন রতনটা যায়! তাহলে আমি সবচেয়ে সাহসী নই! বল!

আমি আর সুলেখা হাসলেও রত্না হাসে না— কেন রে, তোর সঙ্গে ওর কিছু হয়েছে নাকি! সামনে আসতে ভয় পাচ্ছিস?

না, হয়নি কিছুই! আমাকে দেখলে সে-দিনের ধুয়ো তুলে হয়তো হ্যাজাতে আসবে আমাদের সঙ্গে তাই...! তাছাড়া বলা তো যায় না, সেদিনের ছবিটা কাগজে যদি দেখে থাকে, তাহলে আবার...।

আমি বলি— ছাড় ও-সব পুরোনো কথা। এ দু’দিন তুই কোথায় ছিলিস বল তো!

আর বলিস না, মা-কে নিয়ে খুব ভুগছি। কাউন্সিলার ইলাদি’র চিঠি নিয়ে কাল চিত্তরঞ্জনে ভর্তি করে দিয়ে এসেছি। এখন চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল থেকেই আসছি মা-কে দেখে।

কী হয়েছে তোর মায়ের?

আর বলিস না। ওখান থেকে ব্লিডিং হচ্ছে কদিন ধরে। বন্ধই হচ্ছে না। অনিয়ম তো আর কম করেনি! দেহের রক্ত একদম শেষ বলতে গেলে। বাঁচবে কিনা কে জানে!

তবে তো তোর মন ভালো নেই! 

ছাড় তো! আমার মনই নেই, তার আবার ভালো-মন্দ! এক কাজ করি চল তো! সেদিন দেখলাম আমাদের সঙ্গে কথা বলার পর বোম-রতন ওই ‘ডিউভিউ’-তে ঢুকল। আজ দেখছি, মোটর সাইকেল ঢুকিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে সিগারেট ফুকছে ওখানে। কেসটা কী, একটু পাতা লাগাই চল তো! 

সুলেখা বাধা দেয়— কেন খুঁচিয়ে ঘা করতে যাচ্ছিস বল তো! ও কেন যাচ্ছে তা জেনে আমাদের কী লাভ!

জানতে পারলে কোনও ক্ষতিও তো নেই! তাছাড়া আমাদের কারখানা উঠে যাওয়ার পর এই তিনমাসের মধ্যে আমরা ওখানে যাইনি কোনও দিন। চল না একবার ঘুরে আসি। ভেতরটা কেমন হচ্ছে না হচ্ছে দেখাও যাবে।

আমি বলি— চল যাই, একঘেয়েমিটা কাটবে।

ঝুমুর কেন ওই কমপ্লেক্সের ভেতর যেতে চাইছে জানি না। নিশ্চয় কোনও কারণ আছে। সেটা রত্না-সুলেখা না বুঝলেও আমি অনুমান করছি। সেদিন ঝুমুর আবছা-আবছা বলেছিল আমাকে। সবটা বলেনি অবশ্য। 

সামনেই একটা রোগা-প্যাঁটকা বুড়োটে লোক ঢোলা-মার্কা সিকিউরিটি ড্রেস পরে নীল রংয়ের চেয়ারে বসে আছে। আমরা এগোতেই কাঠ-বাঙাল ভাষায় বলে ওঠে— কই যান? কী কাম?

ঝুমুর বলে— এখানে রতন এসেছে গো! একটু দেখা করতাম। আমি ওর বন্ধু। 

রতন কেডা?

আরে! রতনকে চেন না? ওই যে ভটভটি নিয়ে আসে। মোটাসোটা, গালে দাড়ি, নীল-সাদা জামা!

ও! বোম-বাবুরে খুঁজতাছেন! হেইডা কন! একটু আগেই তো ছিলেন। ওভারসিয়ারের লগে কথা কইতাছিলেন। বারায় গ্যালেন অহনে।

ইস, বেরিয়ে গেছে! আমাদের আসতে বলেছিল, দেরি হয়ে গেল। তাহলে ওভারসিয়ারের সঙ্গে একটু দেখা করে নিই।

ওভারসিয়ারের লগে? কথাটা বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবে লোকটা। তারপর বলে— যান, বেশিক্ষণ থাকবেন না। কামের কথা সারা অইলেই বারায় পড়বেন। যান, যান।

ঝুমুরের পিছু পিছু আমরা এগোই। ঠিক কোন জায়গাটাতে আমাদের কারখানাটা ছিল, ঠিকঠাক বুঝতে পারি না কিছুতেই।

ওভারসিয়ার একটা ইয়াং ছেলে। বেশ লম্বা কিন্তু রোগা। মাথায় একখানা সাহেবি টুপি। তাতে বোধহয় ওদের কোম্পানির নাম লেখা। আমাদেরকে দেখে ওর চোখেমুখে জিজ্ঞাসা। ঝুমুর আমাদের দলনেত্রী যেন! সবার সামনে ও। ও ছেলেটার কাছাকাছি গিয়ে বলে— নমস্কার ওভারসিয়ারবাবু! 

ওভারসিয়ার হাতদুটো জোড়া করে, মুখে কিছু বলে না। একসঙ্গে চারজন ইয়াং মেয়েকে দেখে ভড়কে গেছে বোধহয়। ঝুমুর বলে— আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এলাম। এ জায়গায় আগে আমরা কাজ করতাম, এখন আপনি করছেন। আমরা তো একই দলের নাকি বলুন!

ওভারসিয়ার কিছু বুঝল কিনা জানি না। ও বলল— হ্যাঁ, ঠিকই তো!

এর মধ্যে আরও দু’একজন আমাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মিস্ত্রি কিংবা কন্ট্রাকটরও হতে পারে। তবে লেবার নয়। একসঙ্গে চারজন মেয়েকে ভেতরে ঢুকে কথা বলতে দেখলে কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। 

ঝুমুর আর রত্নার বাচালতায় একসময় ওরা জেনে যায়, এখানে বাল্ব-কারখানা ছিল। আমরা সেখানে কাজ করতাম। এখনও জায়গাটার মায়া কাটাতে পারিনি, তাই রোজ ওই ছাতিমতলায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিই কিছুক্ষণ। আমরাও জেনে যাই, বোম-রতন এখানে ইট-বালির সাপ্লায়ার, সেই সঙ্গে তোলাবাজও বটে। মালিক তোডরমল ঢনঢনিয়ার কাছে কয়েক লাখ টাকা নিয়েছে। আরও কিছু মাল কামাতে চায় বলে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। আমাদের কাজ চলে গেছে বলে ওভারসিয়ার কিংবা অন্যান্যরা সহানুভূতি দেখাল না। যেন কাজ যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে, খারাপ ব্যবহারও করল না। বেশ ভাব হয়ে গেল ওদের সঙ্গে। আমি বললাম— এত বিশাল বাড়ি কীভাবে তৈরি হয়, খুব দেখতে ইচ্ছে করে! কতসব যন্ত্রপাতি আপনাদের! আপনারাও সব বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার! 

ওভারসিয়ার হেসে বলে— চলে আসবেন। যখন দেখার ইচ্ছা হবে চলে আসবেন। তবে, যেখানে কাজ চলছে, সেখানে যাবেন না। এই সামনের বাড়িটার দোতলায়-তিনতলায় উঠে দেখতে পারেন। এটাতে এখন কাজ বন্ধ। বসতেও পারেন ওখানে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দেওয়ার চেয়ে বেটার হবে।

কথা বলতে বলতেই হঠাৎই ঝুমুর বলে ওঠে— আরে! ক’টা বাজল রে! 

রত্না টাইমটা বলতেই ঝুমুর বলে— শিগগির চল। বাইরে সাড়ে পাঁচটায় একজনের আসার কথা। হয়তো অপেক্ষা করছে। চলি দাদা! আবার দেখা হবে।

কথা শেষ করেই ঝুমুর হন হন করে গেটের দিকে পা বাড়ায়। অগত্যা আমরাও ওর সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসি। দেখি, ছাতিমতলায় সত্যিই একজন অপেক্ষা করছে।

ঝুমুর এগিয়ে গিয়ে বলে— কতক্ষণ এসেছ তুমি?

মিনিট পাঁচেক হল। খুঁজে না পেয়ে চলে যাব ভেবেছিলাম।

আমরা একটু ডিউভিউ-য়ের ভেতরে গিয়েছিলাম। আজ ক্যামেরা আনোনি?

এনেছি ব্যাগে আছে। তবে ‘জবর খবর’-য়ের লোগো লাগানো ‘বুম’ নেই সঙ্গে। কোনও অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে, তবে অফিস থেকে অ্যাংকারার ও ‘বুম’ দেয়।

ঝুমুর শুধোয়— ষষ্ঠীদা তোমাকে সব বলেছে তো?

হ্যাঁ, মোটামুটি, তবে কাজটা কী সে ব্যাপারে খুব একটা কিছু বলেনি। বলল, তুমিই নাকি সব বুঝিয়ে দেবে।

এর মধ্যে আমরা অনুমান করেছি ছেলেটা কে! তবুও ঝুমুর আলাপ করিয়ে দেয়— এ শ্যামলদা'। জবর খবর টিভির রিপোর্টার। সিআইটি বিল্ডিঙে থাকে। আর শ্যামলদা'! এরা আমার বন্ধু, রত্না, সুলেখা আর সীমা। খুব ভালো মেয়ে এরা।  

রত্না বলে ওঠে— তাহলে ভিক্টোরিয়ায় সেই ফৌজির সঙ্গে ঝুমুরের ফুটেজ আপনিই তুলেছিলেন, তাই না! আমি টিভিতে দেখেছি।

দেখ, ওটা আমাদের কাজ। ইচ্ছা না থাকলেও করতে হয়। ঝুমুর কিন্তু রাগ করেনি। আমি ওকে ‘স্যরি’ বলেছি।

ঝুমুর বলে ওঠে— শ্যামলদা', এই কাজটা তুমি যে ভাবেই হোক করে দাও। তাহলে রাগ তো দূরের কথা, তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করব।  

ঝুমুরের কথা বলার ঢঙে হেসে উঠি আমরা। শ্যামলদা' লজ্জা পেয়ে যায়। সে লজ্জা কাটাতেই যেন বলে— কাজটা কী বলবে তো আগে! 

বলব, বলব, ধীরে সুস্থে বুঝিয়ে বলতে হবে। চল শ্যামলদা, আমরা সুভাষ সরোবরের দিকে যাই।

কথা শেষ হতে না হতেই ঝুমুর মোবাইলের বোতাম টিপতে টিপতে পা বাড়ায়। পেছনে শ্যামলদা'। আমরা বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকি।

ঝুমুর হঠাৎ ফিরে এসে বলে— শোন, তোরা তো আছিস কিছুক্ষণ। যদি ষষ্টীদা আসে, বলবি আমরা সুভাষ সরোবরে বোটিং ক্লাবের পাশে আছি। ওকে মোবাইলে পাচ্ছি না কিছুতেই। শুধু সুইচড অফ আর সুইচড অফ! 

ষষ্টীদা কে? চিনি না তো আমরা!

আরে বাবা। সেই রিপোর্টারটা। যার পয়সায় সেদিন ফুচকা খেলি। গেলাম আমি। ও আসা অবধি থাকিস তোরা।

রত্না ঠোঁট উলটিয়ে বলে— কী ব্যাপার রে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না! যে রিপোর্টার ওর ছবি ছাপিয়ে বদনাম রটাল, সে হয়ে গেল ষষ্টীদা'। যে ছেলেটা ওর সঙ্গে লাইন মারার চেষ্টা করেছিল, পাত্তা দেয়নি ঝুমুর। তাকে নিয়েই এখন যাচ্ছে সুভাষ সরোবর। কেসটা কী রে সীমা?

আমি তার কী জানি! আমার সঙ্গেও তো ওর দেখা হল দু’দিন পর।

রত্না বলে— লাগতা হ্যায়, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়!

সুলেখা বলে— 'কালা-সাদা’ যা-ই হোক, তা জেনে তোর কী! ফালতু ফালতু বাজে ঝামেলায় জড়াস না তো! ও আজকাল একদম বাজে মেয়ে হয়ে গেছে। ওর মতলবটা যে কী ধরা যাচ্ছে না!

রত্না ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে— মতলব আর কী! কাউকে ফাঁসিয়ে বড় দাঁও মারার ধান্দা! 

সুলেখা কথার বিষয় পালটানোর জন্যই যেন বলে ওঠে— হ্যাঁ রে সীমা, তোর সেই মামাতো দাদা আছে না চলে গেছে?

সে তো পরের দিনই চলে গেছে। ওর বিয়ের নেমন্তন্ন করতে এসেছিল তো! ও ভালো কথা, মাসিমা কেমন আছে? হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে তো?

হ্যাঁ, পরের দিনই। এখন ভালো আছে। শোন, মা তোকে একদিন যেতে বলেছে এই সপ্তাহের মধ্যেই। তোর সঙ্গে নাকি ভীষণ দরকার আছে!

এই সপ্তাহের মধ্যেই? কী দরকার রে?

তার আমি কী জানি! যেতে বলেছে যাবি। গেলেই জানতে পারবি।

ঠিক আছে, তাহলে সামনের শনিবার যাব। শনিবারে তো তোদের তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যায়। তোর সঙ্গেই যাব।

রত্না টিপ্পনী কাটে— শনিবার তো এখনো দেরি আছে। কালই চলে যা। নিশ্চয় ভালো কিছুর জন্যেই দরকার। উফস! মাসিমাকে হাসপাতালে হরলিক্স বানিয়ে খাইয়ে একেবারে মন জয় করে ফেলেছিস!

ধুর, আমি হরলিক্স বানিয়েছি নাকি! সুলেখাই তো...! 

সুলেখা বলে— ওই দেখ, সেই রিপোর্টারটা আসছে।

রত্না বলে— হ্যাঁ, ঝুমুরের ষষ্টীদা'! এখন বোধহয় ওর সঙ্গেই ফস্টিনষ্টি করছে। 

আমি বলি— রত্না, তুই না সবসময়...! অন্য কিছুও তো হতে পারে!

ষষ্টী ততক্ষণে ওদের কাছে চলে এসেছে। হালকা হেসে বলে— কী! ভালো আছেন তো আপনারা?

রত্না কথা বলার জন্য আগে থেকেই তৈরি— হ্যাঁ, ফাসক্লাস। আপনি?

রিপোর্টার কখনও ভালো থাকে না, বুঝলেন না। আর যদি ভালো থাকে, তাহলে জানবেন সে ভালো রিপোর্টার নয়। কোথায় আপনাদের লিডার?

ঝুমুরের কথা বলছেন তো?

হ্যাঁ।

ও লিডার হতে যাবে কেন? আমাদের বন্ধু। আমরা সবাই সমান।

ছিঃ, এমন কথা বলবেন না! ও কাগজের খবর হয়েছে, আপনারা হননি!

সুলেখা বলে— আমাদের হওয়ারও দরকার নেই অমন খবর হওয়ার। ওকেই খবর করুন বেশি করে।

হ্যাঁ, করব বলেই তো খুঁজছি ওকে। কোথায় সে?

রত্না বলে ওঠে— মোবাইলে ফোন করে জেনে নিন!

মোবাইল থাকলে তো এতক্ষণ জেনেই যেতাম। আর বলবেন না, সেদিন মিথ্যা করে আপনাদের সেই বোম-রতনকে বললাম এখখানা মোবাইল কিনতে হবে। এখন সত্যি-সত্যিই কিনতে হবে।

কেন?

আজ মেট্রো ধরে আসছিলাম। কে যে পকেট থেকে তুলে নিল! বারো হাজার ঝাড় হয়ে গেল! 

ওই জন্যই ঝুমুর আপনাকে ফোন করে পাচ্ছে না। ও সুভাষ সরোবরে বোটিং ক্লাবের পাশে থাকবে বলেছে।

ওর সঙ্গে কেউ আছে নাকি?

হ্যাঁ, সেই 'জবর খবর'-এর রিপোর্টার। শ্যামল না কী নাম বলল যেন!

ঠিক আছে, আমি তাহলে যাই বুঝলেন। ওর সঙ্গে জরুরি দরকার আছে। পরে দেখা হবে, চলি!

ঝুমুরের ষষ্টীদা লম্বা লম্বা পা ফেলে সুভাষ সরোবরের দিকে এগোল। রত্না কয়েক পলক সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলে—  ঝুমুরটার ক্যালি আছে মাইরি। একসঙ্গে দুটো খদ্দের লটকেছে। শেষে ও-দুটোর মধ্যে আবার কিচাইন না হয়!

সুলেখার গলায় ঝাঁঝ—  তুই না সবসময় বাজে বাজে কথা বলিস। ওই সব ছাড়া কি আর কোনও দরকার থাকতে পারে না মানুষের! 

আমি বলি— এদের তুই খদ্দের ভাবছিস কেন রত্না? খদ্দেরই যদি হবে, তাহলে ঝুমুর দু’জনকে একসঙ্গে ডাকবে কেন? আমি যদ্দুর জানি, ঝুমুর কোনও একটা সমস্যায় পড়েছে। তার সমাধানের জন্য এদেরকে দরকার।

রত্না ঠোঁট বেঁকায়— ওর সমস্যা তো অসুস্থ মাকে নিয়ে। সেখানে এরা কী সাহায্য করবে?

আমি বলি— না রে, ওর মায়ের ব্যাপার নয়। বোম-রতনের সঙ্গে কিছু একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছে ঝুমুর। সে ব্যাপারেই কোনও পরামর্শ বা অন্যকিছু। আমি তোদেরকে বললাম, ওকে বলিস না যেন!

সুলেখা ও রত্না দু’জনেই আঁতকে ওঠে— বোম-রতন! ওই মস্তানটা!

হ্যাঁ, ওর সঙ্গে কোনও কারণে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে বোধহয়।

রত্না বলে ওঠে— ঠিক বলেছিস সীমা! সে-জন্যই বোম-রতনকে ডিউ ভিউয়ের ভেতরে মোটর-সাইকেলের ওপর বসে থাকতে দেখে ভয়ে পঙ্কার গুমটির আড়ালে লুকিয়েছিল।

সুলেখা বলে— কিন্তু ঝুমুর তো ভয় পাওয়ার মেয়ে নয়! ও যা ডাকাবুকো!

আমি বলি— যাকগে! এখন এ-সব আলোচনা বাদ দে! কাছে পিঠে বোম-রতনের চ্যালাচামুণ্ডা থাকলে শুনে ফেলবে। তার চেয়ে চল, আমরা টেরুদার ফুচকা খাবো আজ। আমি খাওয়াবো। ঝুমুরটা থাকলে ভালো হত।

 

আট

সকালবেলা রাস্তার ট্যাপকল থেকে জল আনতে গিয়ে দেখি টুসি এসেছে। কোলে ছেলে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কলতলার হুটোপাটি আর ঝগড়াঝাঁটি দেখছে। আমি জল নেওয়ার জারিকেনটা লাইনে পেতে দিয়ে টুসির কাছে যাই— কী রে, কখন এলি?

আমি কাল বিকালে এসেছি।

তোর বর আসেনি?

হ্যাঁ, এসেছে। আমাকে একা ছাড়ে না তো! এখন তো আবার ছেলেকে ছেড়ে থাকতেই চায় না।

কী মিষ্টি দেখতে হয়েছে তোর ছেলেটা। নাম কী রেখেছিস?

ওর ঠাকুমা নাম রেখেছে অভিজিত। সুরজিতের ছেলে অভিজিত। ওর বাবা ডাকে সাহেব বলে। আমার যখন না মনে আসে তাই বলে ডাকি। বাবু, বাবাই, সোনাই...। না রে বাবাই! আমার সোনাটা! আমার বাবুটা...!

শেষের কথাগুলো বলতে বলতে ছেলেকে আদর করে আর চুমু খায় টুসি। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে বাচ্চাটা। এত ভালো লাগে বাচ্চার ওই হাসি। কোলে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে আমার। টুসিকে বলি— দে, তোর ছেলেকে আমার কোলে দে একটু।

বাচ্চাটা আমার কোলে এসে প্যাট প্যাট করে তাকায় আমার মুখের দিকে। একটু পরেই ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ওঠে। অচেনা মুখ দেখেছে তো! আমি বুকে চেপে ধরে, দোলা দিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করি। কান্না থেমেও যায়। পেটের মধ্যে নাক গুঁজে নাড়া দিতেই খিলখিল করে হেসে ওঠে। অবাক হয়ে যাই আমি। এক্ষুনি কাঁদছিল আবার এক্ষুনি হাসি। এত তাড়াতাড়ি কী করে যে কান্না থেকে হাসিতে বদলে ফেলতে পারে! বাচ্চা বলেই পারে হয়তো! আমার খুব ভালো লাগে বাচ্চাটাকে ওইভাবে হাসাতে।

টুসি বলে— অ্যাই, এক্ষুনি দুধ খাইয়েছি। তুলে দেবে ওরকম করলে।

ওর কথায় আমার যেন সম্বিত ফেরে। জল নিতে এসেছি আমি। ভুলেই গেছিলাম। বাচ্চাকে টুসির কোলে ফিরিয়ে দিই। টুসি ছেলের মাথায় চুলগুলো আঙুল দিয়ে ঠিক করতে করতে বলে— তোর কিছু ঠিকঠাক হল?

বুঝতে পেরেছি, টুসি আমার বিয়ের কথা জানতে চাইছে। তবুও আমি ইচ্ছে করেই বলি— না রে, বাল্ব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর কোথাও কাজের ঠিক হল না। 

তোর কাজের কথা বলিনি। বিয়ের ঠিক হল?

ও! বিয়ের কথা বলছিস। ও-সব ভাবিইনি এখনও।

আর কবে ভাববি! মেঘে মেঘে বেলা তো হল! পরেরটাকে আদর করলে হবে, নিজের তো এমন একটা বানাতে হবে।

তুই যখন আদর করতে দিচ্ছিস, তখন আর দরকার কী! বলেই হেসে উঠি আমি।

টুসি বলে— সে না হয় আদর করতে দিলাম, কিন্তু কারও আদর খেতে ইচ্ছে করে না?

করে তো! সেটারও না হয় ভাগ দিবি। এসেছে বললি তো! তুই আমার বন্ধু যখন! বিকেলে যাব?

টুসি কিল দেখায়— হ্যাঁ, দিচ্ছি আয়! তোর মুখে দেখছি কিচ্ছু আটকায় না। কেউ শুনলে কী বলবে!

ওরে বাবা! তোর বরের ভাগ আমি নেব না, হয়েছে। আমি এখন জল নিই গে, আমার লাইন এসে গেছে। দেখ দেখ, বাবু আমার দিকে তাকিয়ে কেমন হাসছে! এবার চিনে ফেলেছে আমাকে।

টুসি ওর ছেলের কাণ্ড-কারখানা দেখে ওর মুখে মুখ দিয়ে চুমু খায়। আমি পলিথিনের জারিকেনের জল ভরতে ভরতে ভাবি, টুসিটার এতদিন বিয়ে হলে কী হবে, সেই ছেলেমানুষই রয়ে গেছে যেন! আসলে খুবই সরল ও। দু’জনে হামজুটি আমরা। একসঙ্গে স্কুলে যেতাম, একসঙ্গে খেলতাম। কতবার ঝগড়াও হয়েছে ওর সঙ্গে, আবার ভাব হয়েছে। সেই টুসি আজ ঘোরতর সংসারী। ওর স্বামী নাকি ওকে আর ছেলেকে ছাড়া থাকতেই পারে না! ভাবি, বিয়ে না হলে কি এমন ভালোবাসা পাওয়া যায় না! কারও বউ হলেই কি ‘আমাকে ছেড়ে থাকতে না পারার’ মতো ভালোবাসা পাওয়া যাবে!

আমার মা, বাবা, ছোটকাকা এরা কি আমাকে তেমন ভালোবাসে না! আমাকে ছেড়ে ওরা কি থাকতে পারবে? আমি যদি ওদেরকে না জানিয়ে কোথাও চলে যাই, তাহলে ওরা কি চিন্তা করবে না, ব্যতিব্যস্ত হবে না!

কী রে! ও সীমা! জল যে ভর্তি হয়ে পড়ে যাচ্ছে, এত কার কথা ভাবছিস আনমনে? সরা জারিকেনটা!

সাতাশ নম্বরের নমিদি’র খরখরে গলা শুনে চমকে উঠি আমি। একটু লজ্জাও পাই।

নমিদির পাশের জন ফোড়ন কাটে— এই বয়সে আর কার কথা ভাববে বল! তখন রাই যমুনায় জল আনতে গিয়ে যার কথা ভাবত, এখন সীমা জল নিতে এসে তেমন কোনও নিঠুর কালার কথাই ভাবছে।

আমি তড়িঘড়ি জলের জার সরিয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াই। শুনতে পাই, কলতলায় একটা হাসির রোল উঠল নিঠুর কালার কথা শুনে!

সকাল থেকেই আজ আমার মনটা কেমন চঞ্চল হয়ে আছে। একটু উড়ূ উড়ূ ভাব। কোনও কাজেই তেমন মন বসছে না। ছোট কাকার বিছানা আর ঘর পরিষ্কার-ঝরিষ্কার করা, বাথরুমের চৌবাচ্চায় জল ভরা, এসব আমার প্রতিদিনের কাজ। কিন্তু মন লাগছে না কাজে।

কল থেকে জল নিয়ে ফেরার সময় ‘নিঠুরকালা’র খোঁচাটা শুনে আমার ঝট করে মনে পড়ল সুভাষদার কথা। মনে পড়ে গেল আজ রবিবার, সুভাষদা হিপিদা'র সেলুনে দাড়ি কাটাতে আসবে।

আজ সুভাষদার সঙ্গে দেখা করলে কেমন হয়! ওই সময়ে চুলের ডগ ছেঁটে নেওয়ার নাম করে সেলুনে গেলেই তো হয়! পরক্ষণেই ভাবি, ওর সঙ্গে দেখা করেই বা কী হবে। ও তো আমার 'নিঠুরকালা' নয়, তেমন প্রেম-ট্রেমও হয়নি ওর সঙ্গে! তবুও ওর কথা মনে এল কেন! ওর সেদিনকার কথাগুলোর মধ্যে কেমন একটা ভালোলাগা ছিল বলেই কি...!

ইচ্ছা আর অনিচ্ছার দোলাচলে থাকলেও একটা সময় আন্দাজ করে হিপিদা'র সেলুনে চলে এলাম। এসে দেখি, সুভাষদা'  এসেছে। ওর দাড়ি কাটা প্রায় শেষের দিকে। ওকে দেখেই আমার বুকের ধুকপুকুনিটা একটু বেড়ে যায়। হিপিদা' বলে ওঠে—  কী রে, অনেক দিন পর এলি যে!     

হ্যাঁ, হিপিদা'! আর আসা হয় না। আসলে কারখানার কাজটা চলে যাওয়ার পর আর কিছু ভালো লাগে না।

হিপিদা', সুভাষদা'কে দেখিয়ে বলে— একে চিনতে পারছিস? তোর কাজের ঠিক করে দিয়েছিল।

আমি বলি— হ্যাঁ, চিনব না কেন? উপকারী মানুষকে কি ভোলা যায়!  

ওকেই বল। অন্য কোথাও কাজের ব্যবস্থা করে দেবে। ওর অনেক জানা-চেনা আছে। কী গো সুভাষদা'! ঠিক বলছি তো!

সুভাষদা'র গলায় তখন ফটকিরি ঘষছে হিপিদা'। তাই ওর গলা থেকে শুধু ঘোঁৎ করে একটা শব্দ বের হয়। আমি পাশের চেয়ারটাতে বসে বসে হিপিদা'র হাতের কায়দা কানুন দেখতে থাকি। 

বড়ো সাইজের ফটকিরিটা রেখে এবার হিপিদা' হাতের তেলোয় হালকা সবুজ রংয়ের তরল ঢালে। মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছে সেটা। দু’হাতে সেটা মেখে নিয়ে সুভাষদা'র গালে ঘষতে থাকে অদ্ভুত কায়দায়। 

সুভাষদা চোখ বন্ধ করে রয়েছে। আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। তাই আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। সদ্য দাড়িকাটা মুখখানা বেশ ভালো লাগছে। হঠাৎ আমার মনে পড়ে যায় মামাতো দাদা যতুদা'র মুখখানা। যতুদা'র মুখের চেয়ে সুভাষদা'কে দেখে বেশি ভালো লাগছে। কেমন বাচ্চা বাচ্চা, হাসি-হাসি মুখ।  

হিপিদা' বলে চলেছে— জানিস, সুভাষদা বড়বাজারে বড়ো শাড়ির দোকানে কাজ করে। সেখানে কত বড়ো বড়ো কল-কারখানার মালিকরা কেনাকাটা করতে আসে। ওদের সঙ্গে সুভাষদা'র খুব জানাশোনা আছে। ইচ্ছা করলে তোর একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারে। তবে, তোকেও একটু— হেঁ — হেঁ...নাকি বল সুভাষদা'!   

‘তোকেও একটু...’ বলে হেঁ হেঁ করে থেমে গেল হিপিদা'। ওটাতে ও কী বোঝাতে চাইল, তা আমি বুঝেছি। ‘কিছু নিতে গেলে কিছু দিতে হয়’ — এটা চিরন্তন কথা। তাহলে, সুভাষদা'র কাজ দেখে দেওয়ার বিনিময়ে দস্তুরি কিছু দিতেই হবে, এটাই হিপিদা' বোঝাতে চাইল। কিন্তু আমাকে কী দিতে হবে! সুভাষদা' কি আমার ব্যাপারে হিপিদা'কে কিছু বলেছে! তাই হিপিদা' এত কথা বলছে! ঠিক বুঝতে পারছি না। সুভাষদা কি আমার সঙ্গে প্রেম করতে চায়! নাকি ওই যতুদা'র মতো নিরিবিলিতে একলা পেলে একটু-আধটু আদর করতে চায়।         

আমি হিপিদা'র কথার খেই ধরে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে বলি— হ্যাঁ, আমাকেও একটু ‘রিকুয়েস্ট’ করতে হবে এই তো! সুভাষদা’! আমাকে একটা কাজ দেখে দেবেন তো! খুব দরকার কাজের।

হাতজোড় করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলি কথাটা। তা শুনে হিপিদা' আর সুভাষদা দু’জনেই হেসে ওঠে। 

হাসি থামিয়ে হিপিদা' বলে— তোর যেমন কাজের খুব দরকার, সুভাষদা’রও তেমনি একজন কাজের লোকের খুব দরকার। সুতরাং...! সুভাষদা' ভুল বলছি!  

হিপিদা' কথা শেষ করে চোখ-মুখ বেঁকিয়ে এমন একটা ভঙ্গি করে, যার ইঙ্গিতটা আমি বুঝতে পারি। তবুও আমি না বোঝার ভান করে বলি— এখান থেকে বড়বাজারে কাজ করতে আমি যেতে পারব না বাবা! তাছাড়া কাপড়ের দোকানে অত বড় বড় মানুষ আসে বলছ! তাদের সঙ্গে আমি কথা বলতে পারব নাকি!

হিপিদা' বিরক্তি প্রকাশ করে— ধুর ব্যাঙ! কিচ্ছু বোঝে না মেয়েটা! 

সুভাষদা' মানিব্যাগ খুলে একগোছা টাকা বের করে। পাঁচশো টাকা আর একশো টাকার নোট নাড়াচাড়া করে একটা কুড়ি  টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলে— হিপিদা'! তুমি এত বকবক কর কেন বল তো! নাও পয়সা নাও।

হিপিদা' খ্যা খ্যা করে হাসে। সুভাষদা' চিরুনি নিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে আয়নায় ফুটে ওঠা আমার প্রতিবিম্বর দিকে তাকিয়ে বলে— তুমি এখন আর ডিউভিউয়ের সামনে যাও না? 

আমিও সুভাষদা'র প্রতিবিম্বর দিকে তাকিয়ে বলি— হ্যাঁ, যাই তো! তবে রোজ যাওয়া হয় না। কাল গিয়েছিলাম।

পারলে আজ যেও। আমি কংক্রিট ব্রিজের ওপরে থাকব। বিকেল চারটে।

আজ কাজে যাবেন না?

আজ রবিবার, আমার ছুটি।

কথা শেষ করেই সেলুন থেকে বেরিয়ে সামনে ‘স্ট্যান্ড’ করে রাখা সাইকেল চড়ে প্যাডেলে চাপ দেয়।

আমি নিজের অজান্তেই হয়তো ওর চলে যাওয়া দেখি। হিপিদা' হেসে বলে— এখন আর এত দেখতে হবে না। বিকেলে ভালো করে দেখিস। আয়, চুলের ডগ ছেঁটে দিই। 

হিপিদা'র কথায় লজ্জা পেয়ে যাই আমি। লজ্জা চাপা দিতেই যেন বলি— হিপিদা, তুমি না খুব ইয়ে!

বেশ ইয়ে তো ইয়ে, নে বোস দেখি। 

হিপিদা' লম্বা চুলের ডগ ছেঁটে দেওয়ার পর সামনের চুলের লকস ঠিক করতে থাকে বেশি সময় নিয়ে। আজ যেন বেশি বেশি করে আমার বুকে কনুই ঠেকাতে চায় হিপিদা'।

আমিও আজ মনে মনে জিদ করেছি ওকে কনুই ঠেকাতে দেব না। তাই বুকের ওপর আড়াআড়ি হাত দিয়ে রাখি বিবেকানন্দর স্টাইলে।

লকস কাটা-ছাঁটা হয়ে গেলে হিপিদা' বলে— হয়ে গেছে। নে, নাম এবার।  

আমি উঁচু চেয়ার থেকে নেমে যাই। ও বলে— রোজ-রোজ বিনা পয়সায় হবে না। দশটাকা দিবি।  

আমি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলি— ভারি তো কাজ করলে, তার আবার দশটাকা! লিখে রাখ, কাজ পাই, তারপর সুদে-আসলে মিটিয়ে দেব।

ও চেয়ারের হাতলে পড়ে থাকা কুচো চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বলে— তুই না দিস, সুভাষদা'র কাছে থেকে নিয়ে নেব যা!  

আমি মুখ ভেঙিয়ে বলি— হুঁ, 'সুভাষদার কাছ থেকে নিয়ে নেব'! ‘তাই নিও’ বলে ফিক করে হেসে সটকান দিই আমি।

আজ রবিবার। ছোটকাকা বাড়িতে। ছোটকাকা সচরাচর দুপুরবেলা বাড়িতে থাকে না। সকাল-বিকাল টিউশানি করে।  দুপুরে ছাত্র পড়ায় না, অথচ বাড়িতেও থাকে না। কোথায় যায় জিজ্ঞেস করতে একদিন বলেছিল, ‘লাইব্রেরিতে পড়াশুনা করতে যাই। একটা চাকরি এবার জোটাতেই হবে। ভাবছি এবার এসএসসিতে বসব। পরীক্ষাটা জম্পেশ করে দিতে হবে। তাছাড়া একটা চ্যানেলও পেয়েছি এক ছাত্রের বাবার মারফত। রিটনটা পাশ করতে হবে কোনও রকমে। তারপর লাখপাঁচেক  দিলেই...’! 

আমি বলেছিলাম, পাঁ-চ লা-খ টাকা! এত টাকা তুমি কোথায় পাবে কাকু? জমিয়েছ? 

কাকু আক্ষেপের সুরে বলেছিল, 'না রে, এত টাকা আর জমাতে পারলাম কই! তবে, কিছু তো জমিয়েছি। দরকার হলে বাকিটা ধার করব বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে। চাকরি পাওয়ার কথা শুনলে ধার দেবে না! কী বলিস সীমু!'

আমি বোকা-বোকা মুখ করে কাকুর দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। কাকু নিজের মনেই বলে যাচ্ছিল, ‘শালা! আরও দু’এক বছর আগে থেকে পার্টির কাজ করলে এদ্দিনে একটা ব্যবস্থা হয়ে যেত। এখন শালা সবেতেই ওই পার্টি। স্কুলে ভর্তি করানো, চাকরি পাওয়া, বাড়ির মিউটেশান, বাড়ি তৈরি; এমনকি মরলে পরে ডেডবডি বয়ে নিয়ে যাওয়ার গাড়িটাও পার্টির ক্যাডার মারফত নিতে হবে। শুধু পরীক্ষা আর টাকা দিলেই চাকরি হবে না। তার সঙ্গে পার্টির নেতার সুপারিশও চাই।’ কাকু বিড়বিড় করা থামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিল। তারপর পায়ে পায়ে এগিয়েছিল রাস্তার দিকে।

ছোটকাকুর জন্যে আমার খুব খারাপ লাগে। কাকুর বয়স কম হল না। দু’এক দিন দাড়ি না কামানো কাকুর থুতনিতে তাকালে চোখে পড়ে চিক চিক করতে থাকা সাদা বিন্দু বিন্দু দাড়ি। কাকু বি.এ. পাস করেছে, তা বোধহয় বছর দশেক হয়ে গেল। আগে বাবার মুখে শোনা যেত, বিলুটা চাকরি পেয়ে গেলে আমাদের আর চিন্তা করতে হবে না। বাড়িঘরটা মেরামত করা যাবে। সংসারেও আয়-উন্নতি হবে। এখন আর বাবা এসব কথা বলে না। মা বলত, ঠাকুরপো চাকরি পেলে আমার ভালো হয়। ওর বিয়ে দিয়ে একটা বউ আনা যায় বাড়িতে। ব্যস! আমার তখন অনেক কাজ কমে যাবে। দু’জনে মিলেমিশে সংসারের সমস্ত কাজকর্ম করা হবে। সবিতা মেয়েটা খুব ভালো। আমার সঙ্গে ঝগড়ঝাঁটি করবে না।

সবিতা হল কাকুর এক ছাত্রী। সবাই বলে, কাকুর সঙ্গে নাকি ভালোবাসাবাসি হয়েছিল। কাকুর সঙ্গে আমাদের বাড়িতেও এসেছে অনেকবার। মায়ের সঙ্গে গল্প করেছে। মা রান্নায় ব্যস্ত যখন, তখন হঠাৎ রসুনের খোসা ছাড়ানোর দরকার পড়লে, ছাড়িয়ে দিয়েছে। কাকু একদিন সবিতার সামনে কথায় কথায় বলেছিল, মাস্টারির চাকরিটা পেয়ে গেলেই সবিতাকে বিয়ে করবে। সবিতা মুচকি হেসেছিল শুধু।

কাকুর চাকরি হয়নি। সবিতার সঙ্গে বিয়েও হয়নি। সবিতা এখন এক প্রোমোটারের ঘরনী। সে থাকে ক্রিস্টোফার রোডের ওদিকে কোথায়! ক্যাশকাকু একদিন মাকে বলছিল, বিলুদা'কে ক্রিস্টোফার রোড ধরে উদাস হয়ে হাঁটতে দেখেছে। তার দৃষ্টি ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দাগুলোর দিকে।

ক্যাশকাকুর কথা সত্যি কি মিথ্যা জানি না। কিন্তু কাকু যে সবিতাকে খুব ভালোবাসত, সেটা আমি জানি। একদিন কাকুর ঘরে নিরিবিলিতে কাকু সবিতাকে চুমু খাচ্ছিল। দরজার ফাঁক দিয়ে হঠাৎ আমার চোখে পড়েছিল ব্যাপারটা।

ছোটকাকুও হয়তো আমাকে দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু কিছু বলেনি। আমিও কিছু বলিনি। তবে, সবিতার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যাওয়ার খবরটা ছোটকাকার মুখে শুনে রাগে বলে ফেলেছিলাম, 'কী বজ্জাত মেয়েরে বাব্বা! একজনের কাছে এত ভালোবাসা পেয়ে তারপর অন্যজনকে ভালোবাসা যায়! মেয়েরা সত্যিই খুব স্বার্থপর হয়!'       

তারপর থেকে ছোটকাকা কিছুদিন খুব ভেঙে পড়েছিল। কোচিং-এ পড়াতে যাওয়া বন্ধ করেছিল কিছুদিন। সবসময় বিছানায় শুয়ে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকত। বাইরে বেরোত না। অনেক দিন পর বাবার বকুনিতে আর মায়ের মিষ্টি কথায় চাঙ্গা হয়েছিল ছোটাকাকা। আমি তখন ভাবতাম, কাকু যদি চাকরিটা পেয়ে যেত, তাহলে হয়তো সবিতাটা...?

আগে প্রত্যেক রবিবার ছোটকাকা সাড়ে এগারোটা-বারোটার মধ্যেই স্নান খাওয়া সেরে, হেবি মাঞ্জা দিয়ে বেরোত। কোথায় যেত কে জানে! হয়তো সবিতাকে নিয়ে সিনেমায় বা অন্য কোথাও। এখন রবিবারে বাড়িতেই থাকে!

ছোটকাকা বাড়িতে থাকায় সকাল সকাল খাওয়া হয়ে গেল। দুপুরে পেটে ভাত পড়লেই চোখ এঁটে আসে আমার। তাই আমার ঘরে গিয়ে শুয়েছি। তখনও সূর্য তেমন পশ্চিমে ঢলেনি। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। কখন যে আমি কংক্রিট ব্রিজের ওপর পৌঁছেছি। তখন রোদ্দুর বেশ কমে গেছে।

কংক্রিট ব্রিজ জুড়ে পাশের বাড়িগুলোর ছায়া। বাঁদিকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমার পরনে সবচেয়ে সুন্দর সালোয়ার কামিজ। পড়ন্ত রোদে ঝিকমিক করছে। আমার চোখ খালের জলে কচুরিপানার দিকে থাকলেও মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছি সুভাষদা' আসছে কি না। বেশি সময় দাঁড়াতে হয় না। দেখি একখানা ঝকঝকে নতুন সাইকেল চড়ে সুভাষদা'  আসছে। আমি ভাবি, সুভাষদা' আমার সঙ্গে দেখা করবে বলেই নতুন সাইকেলখানা কিনেছে। ওর পরনে সাদা প্যান্ট আর  নীল টি-শার্ট। দারুণ হ্যানসাম লাগছে ওকে। ওকে দেখেই আমার বুকের মধ্যে ধুকপুকুনি বেড়ে যায়। ও কংক্রিট ব্রিজের দিকে এগিয়ে আসছে। আমি ঈষৎ লজ্জায় মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। জানি, ও ঠিক আমার পাশে এসে দাঁড়াবে।

কয়েক মুহূর্ত পরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সুভাষদা' সাইকেল চালিয়ে সোজা বেরিয়ে যাচ্ছে। আমাকে তাহলে দেখতে পায়নি বোধহয়। আমি স্থান-কাল ভুলে হাঁক পাড়ি-সুভাষদা'! আমি এখানে...!   

কিন্তু এ কী! আমার গলা থেকে কোনও শব্দ বেরোচ্ছে না কেন! কত জোরে চিৎকারের চেষ্টা করলাম আমি। কিন্তু একটুও আওয়াজ বেরোল না। সুভাষদা' শুনতেও পেল না। ও এগিয়ে যাচ্ছে। আমি দৌড়ে ওকে ধরার চেষ্টা করব কি না ভাবছি। এমন সময় দেখি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে হিপিদা'। ও এসময় এখানে কেন কে জানে! ওর হাতে আবার একখানা কাঁচি। কাঁচি নিয়ে ও এখানে কী করছে জানি না বাবা! আমাকে দেখে ও মিটিমিটি হাসে। বলে, 'সুভাষদা তো সাইকেল চালিয়ে চলে গেল!  আমি দৌড়ে গিয়ে বলব তুই এখানে? সেই সুযোগে তোর চুলের ডগ ছাঁটার দশটাকাও চেয়ে নেব।' আমি কিছু বলার আগেই দেখি হিপিদা' দৌড় মেরেছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে থাকি। একটু পরেই দেখি, সুভাষদা' আসছে একটা মোটরসাইকেল চড়ে। আশ্চর্য, সুভাষদা' তো সাইকেল চড়ে গেল! এর মধ্যে মোটর সাইকেল কোথায় পেল! কাছে আসতেই দেখি পুরোনো দিনের বুলেট গাড়ি। ভালো করে দেখি। আরে! এটা তো বোম-রতনের মোটরবাইকটা। আমার সব কেমন গুলিয়ে যায়। সুভাষদা' আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। তারপর বলে, 'চল, ওই সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসি।' আমি ঘাড় ঘোরাতেই দেখি ছাতিমতলায় কখন এলাম। হয়তো সাইকেলের পেছনে দৌড়ে বেখেয়ালে চলে এসেছি। যাক গে! এখন ওসব ভাবার সময় নেই। সুভাষদা বলে, 'এত সেজেগুজে এসেছ কেন?' আমি কিছু বলি না। মিটিমিটি হাসি শুধু। হঠাৎ দেখি সুলেখা আর রত্না আসছে। আমি বলি, 'সুভাষদা, তোমার বোন আর রত্না আসছে। দু’জনকে একসঙ্গে দেখে কী ভাববে বল তো!'

সুভাষদা বলে, 'সুলি কিছু ভাববে না, ও জানে। তবে, ওই রত্না...। এক কাজ করা যাক, ওই যে ঝুপড়িটা দেখছ, ওটা আমার এক বন্ধুর। ওখানে চল, কেউ নেই ওখানে এখন।' ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি একটু দূরে সাদা দাড়ির অমিতাভের ছবির চালওয়ালা সেই ঝুপড়িটা। আমি বলি, 'ঝুপড়িতে যাব না। কিছুতেই না। আমার শরীর খারাপ। ওখানে গেলে তুমি...!'

সুভাষদা' ঝুপড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমার হাত ধরে টানতে থাকে। আমি বাধা দিতে চেষ্টা করি। হঠাৎ দেখি আমার হাত ধরে টানছে রোমশ একটা হাত। সে হাতের মালিক খালি গা, ধুতি ভাঁজ করে লুঙ্গির মতো পরা। এ কী! এ তো সুভাষদা' নয়, যতুদা'। যতুদা' আমাকে এখন জাপটে ধরেছে। আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে ওই ঝুপড়িটার মধ্যে। আমি প্রাণপণ চেষ্টায় ওর কবল থেকে মুক্তি পেতে চাইছি। আমি প্রবল শক্তিতে একটা ঝটকা দিই। ছিটকে পড়ে যায় যতুদা'। আমিও পড়ে গিয়ে প্রবল যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠি। আমার কনুইটা প্রচণ্ড জোরে ঠোক্কর খেয়েছে। সিমেন্টের বেঞ্চিতে, নাকি ছাতিমগাছে! 

এমন সময় শুনতে পাই মায়ের গলা— রাতে না খেলে বলে যেও। তাহলে তোমার জন্যে রান্না করবো না।

আমি ধড়মড়িয়ে উঠে বসি। দেখি, ছোটকাকা সেজেগুজে কোথাও বেরোচ্ছে। সঙ্গে কাকার এক বন্ধু। জানলা দিয়ে ওদের দেখতে গিয়ে দেখি, জানলার পাশে একটা মোটরবাইক। ছোটকাকার বন্ধুর ওটা। একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে, ভুট ভুট শব্দ তুলে বেরিয়ে যায় দু’জনে। ওরা চলে যেতে আমার কনুইয়ের যন্ত্রণাটা ফিরে এসেছে আবার। কনুইয়ে হাত বুলোতে বুলোতে দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকাই। দেখি চারটে বাজতে তেরো মিনিট বাকি। 

আমি তড়িঘড়ি উঠে বেরোনোর জন্য রেডি হই। কংক্রিট ব্রিজে সুভাষদা' এসে দাঁড়িয়ে থাকবে চারটে থেকে। আমার দেরি হয়ে যাবে পৌঁছতে।

বেশ তাড়াহুড়ো করা সত্ত্বেও আমি চারটের মধ্যে কংক্রিট ব্রিজে পৌঁছতে পারলাম না। যখন পৌঁছলাম, তখন চারটে আটাশ। একে রবিবার, তাছাড়া রোদ্দুরও আছে বেশ। তাই খাঁ-খাঁ করছে কংক্রিট ব্রিজ। সুভাষদা' নেই। এমন কি ব্রিজের মুখে জুতো মেরামত করার মুচিটাকে কিংবা ব্রিজের ফুটপাতে দিনরাত শুয়ে থাকা পাগলাটাকেও আর দেখা যাচ্ছে না। 

ব্রিজে ওঠার আগে বড়ো হোর্ডিংটার ছায়ায় আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু সুভাষদা'র পাত্তা নেই। একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। পথচলতি দু’একজন পিটপিট করে সন্দেহের চোখে দেখছে আমাকে। আমি একবার পায়ে পায়ে ব্রিজের ওপারে গেলাম। আবার ফিরে এলাম। সাড়ে-চারটে বাজে।

তাহলে কি সুভাষদা' চারটের সময় এসে আমাকে না দেখতে পেয়ে চলে গেছে। সেটাই হবে হয় তো! আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। এই প্রথম কোনও পুরুষ আমার জন্য অপেক্ষা করল! অথচ আমি সময়মতো পৌঁছতে পারলাম না। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমি এগোই ‘ডিউভিউ’-য়ের দিকে। যেতে যেতে ভাবি, সুভাষদা' আমাকে এখানে দেখা করার কথা বলল কেন? আমার কোনও কাজের ব্যাপারে কথা বলতে? নাকি অন্য ব্যাপারে! কাজের ব্যাপার হলে তো দুপুরে হিপিদা'র সেলুনেই বলতে পারত। তবে কি...? হ্যাঁ, সেটাই হবে হয়তো! সেদিন আই.ডি. হাসপাতালে ওর চাহনি, ওর কথাবার্তা কেমন কেমন লাগছিল! ইস, আজ দেখাটা করতে পারলে ভালো হত। বোঝা যেত ও কী চায়। এমনই লাক খারাপ কোত্থেকে আজগুবি স্বপ্নটা সব গণ্ডগোল করে দিল। 

আচ্ছা! পায়ে পায়ে সুলেখাদের বাড়ির দিকে গেলে কেমন হয়। যদি রাস্তায় কোথাও দেখা হয়ে যায়! নাহ! যাওয়াটা ঠিক হবে না। যদি দেখা হয়ে যায়, তখন কী বলব! এটা বলা খারাপ শোনায় যে ওর দেখা পাওয়ার আশাতেই ওদিকে যাচ্ছি।

অবশেষে আমি ‘ডিউভিউ’-য়ের দিকে যাওয়া মনস্থ করেছি। ঠিক তখুনি দেখি, সুলেখা আর রত্না আসছে। আজ ওদের তো ছুটি। তবুও দু’জনে একসঙ্গে! তাহলে সুলেখা নিশ্চয় রত্নার বাড়ি হয়ে আসছে। সুভাষদা'র সঙ্গে দেখা না হওয়ায় আমার মনটা বেশ খারাপ, ওদেরকে দেখে একটু ভালো লাগে। রত্না বলে— তুই যে আজ আগে আগেই চলে এসেছিস! বাড়িতে মন টিকছে না নাকি রে! 

কোনও উত্তর দিই না আমি। ওদের পায়ে পা মিলিয়ে ‘ডিউভিউ’-য়ের গেটের সামনে যাই। বুড়ো সিকিউরিটি কর্মীটা রোজকার মতো বলে ওঠে— দিদিমনিরা আইলা!

আমরা ঘাড় নেড়ে ভেতরে এগোই। দু’একদিন হল, আমরা আর ছাতিমতলায় আড্ডা মারি না। সেদিনের ওভারসিয়ারের সঙ্গে ভাব জমানোর পর আমাদের ঠেক এখন এই ‘ডিউভিউ’-এর সামনের বিল্ডিংটার দোতলায়। চারদিক খোলা ছাদ, এখনও দেওয়াল তোলা শুরু হয়নি। বেশ লাগে ওখানে বসে আড্ডা মারতে। ওখানকার লেবার-মিস্ত্রিরাও কিছু বলে না। বরং আমাদের দেখে ওরা যেন কাজে এনার্জি পায়। আজ ওরা কেউ নেই। রবিবার ওদের কাজ বন্ধ থাকে।

সেদিন ওভারসিয়ারের সঙ্গে আলাপ করার পর ঝুমুর একদিন মাত্র এসেছিল। ইদানিং ঝুমুর দু’চারদিন করে ডুব মারে। আজ আসবে কিনা কে জানে! দোতলায় উঠতে উঠতে রত্না বলে— জানিস! ঝুমুরের প্রমোশন হয়েছে। এখন ও ময়দান ছেড়ে  বকখালি-দিঘা করে বেড়াচ্ছে। রত্নার কথার মধ্যে কেমন ঈর্ষার গন্ধ পাওয়া যায়। যেন বকখালি-দিঘা যাওয়ার কাজটা ওরই পাওয়া উচিত ছিল।   

এই দোতলায় প্রথম যেদিন আমরা বসলাম, সেদিন ঝুমুর ছিল। ও না থাকলে হয়তো সাহস করে সেদিন আমরা আসতাম না। সেদিন এখানে অনেকক্ষণ আড্ডা মেরেছিলাম। সেদিন কথায় কথায় রত্না ঝুমুরকে বলেছিল, ‘ঝুমুর! আমাকেও দু’একটা ভালো ‘পাটি’ ধরে দে না! প্রথম প্রথম আমি কম টাকায় কাজ করব। তেমন হলে তোকেও কিছু কমিশন দেব না হয়।’

প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, রত্না হয়তো ঝুমুরকে রাগাচ্ছে। কিন্তু না, পরক্ষণেই ও বলেছিল, ‘আমার আর উপায় নেই রে! বাবার দ্বিতীয়বার ‘কেমো’-টা না করালেই নয়। হাতে একদম টাকা নেই। লোকের কাছে কত আর ধার চাইব বল।’

ঝুমুর বেশ খেপে উঠেছিল রত্নার কথায়। দু’একটা কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছিল ওকে। একটু পরে মাথা ঠান্ডা হলে বলেছিল, ‘তোরা বুঝবি না রে আমার কষ্টটা! ওইসব বুড়ো ভাম আর খেঁকশিয়ালগুলো আমার শরীরটাকে কাঁচা মাংস ভাবে, তখন কী কষ্ট যে হয় আমার! বুকের ভেতরটা হু-হু করে জ্বলতে থাকে। কিন্তু নিরূপায় আমি, এছাড়া আমার আর রাস্তা নেই। নষ্ট মেয়েছেলের মেয়েকে নষ্টই হতে হয় রে! ইচ্ছে থাকলেও ভালো হয়ে বাঁচা যায় না। এটাই আমাদের সমাজের নিয়ম। আমি এ থেকে মুক্তি পাবো না। কিন্তু তোরা ভদ্দরলোকের মেয়ে; খারাপ কাজে কেন নামবি!' 

আমি দেখেছিলাম, ঝুমুরের চোখদুটো ছলছল করছে। রত্না ওসবের তোয়াক্কা না করে বলেছিল, ‘আমি তোর চেয়ে দেখতে ভালো। আমি লাইনে নামলে তোর বাজার নষ্ট হবে, এটা বললেই পারতিস’!

কথাটা শুনে ঝুমুর অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে রত্নার দিকে তাকিয়েছিল। সে-দৃষ্টিতে রাগ, নাকি দুঃখ-কষ্ট, নাকি করুণা — কী যে ছিল আমি বুঝতে পারিনি।

সুলেখা বকে উঠেছিল, ‘কী রে রত্না! ঝুমুর তোকে ভালো কথাই তো বলছে। তুই এভাবে বলছিস ওকে।’

আমারও রাগ হয়েছিল ওর ওপর। কিন্তু কিছু বলিনি। ভেবেছি, সত্যিই রত্নার খুব টাকার দরকার, তাই মরিয়া হয়ে গেছে ও। পরক্ষণেই মনে হয়েছে, অভাব যতই থাক, তাই বলে খারাপ কাজে নামতে হবে! আরও তো কত কাজ আছে!  

আমার মনের কথাটা সুলেখার মুখে ফুটেছিল, 'রত্না, তোর যদি ফ্যান কারখানার কাজে না পোষায়; তো অন্য কাজ দেখ।  তাই বলে...!' রত্না খেকিয়ে উঠেছিল, 'ওঃ কত কাজের ছড়াছড়ি! দিনে বারোঘন্টা খাটিয়ে নিয়ে মাইনের বেলায় দশহাজার! ওই গেটে সিকিউরিটি কাকা কত মাইনে পায় জানিস। সারাদিন পাহারা দিয়ে দুশো পঞ্চাশ টাকা। একটা চামড়ার ব্যাগ-কারখানায় সারাদিন ধরে সেলাই কিংবা চামড়ার ব্যাগ রং করবি, পাবি কত; না তিনশো টাকা। এদিকে ঝুমুরকে জিজ্ঞেস করে দ্যাখ। ও নিজে মুখে বলেছে দু’দিনের ‘কনট্যাকে’ বকখালি গেলে, দুই-দুই চারবেলা সমুদ্রে চান, হেব্বি খাওয়া দাওয়া। ইচ্ছে হলে ব্যান্ডি, জিন এসবও খেতে পারে। এ-সি ঘর, নরম বিছানা। ফেরার দিনে কড়কড়ে দু’হাজার। ওই ফ্যান কারখানায় কাজ করে সারাজীবনেও তুই সমুদ্র দেখতে পাবি না। বুঝেছিস!    

সেদিন রত্নাকে অনেক কথা বলেছিল ঝুমুর। তবুও রত্না বুঝতে চায়নি। ও বলেছিল, ‘প্রয়োজনে মানুষ অনেক কিছুই করতে পারে। যেমন তুই করছিস। থাক, তোকে আমার জন্য ‘পাটি’ ধরতে হবে না। আমি নিজেই দেখে নিতে পারব। আর সেটা ছুটকো-ছাটকা নয়, দিঘা-বকখালির পার্টি ধরব।' সেদিন কথাটা বলেই গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গিয়েছিল রত্না।

আজ রত্না সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ঝুমুরের দিঘা-বকখালি যাওয়ার কথা বলছে। আমি আর সুলেখা ওর কথা শুনে কোনও সাড়াশব্দ দিই না। ও ব্যাপারটাই পছন্দ নয় আমার। যত্তসব নোংরা আলোচনা! দোতলার ছাদের মাঝখানটাতে বসে রত্না আবার বলে ওঠে— খবর পেলাম, ঝুমুর দিঘা গেছে এক মালদার পার্টির সঙ্গে। আর সেখানে হোটেল ‘রেড’ করার সময় ও পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। এখন ও দিঘার লক-আপে। 

আমরা দুজনেই এক সঙ্গে বলে উঠি— সে কী রে, তুই এসব খবর পেলি কোথা থেকে!

‘জবর খবর’ টিভির সেই শ্যামলদা'র সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ওর মুখেই শুনলাম।

শ্যামলদার সঙ্গে তোর কোথায় দেখা হল?

রত্না একটু ইতস্তত করে। তারপর বলে— মেট্রো সিনেমার সামনে। 

সুলেখা বলে— মেট্রো সিনেমা! তুই আবার এর মধ্যে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলিস নাকি?

রত্না কেমন গম্ভীর হয়ে যায়। একটু থেমে থেকে বলে ওঠে— কেন? সিনেমা দেখা ছাড়া কি ওখানে আর কোনও কাজ থাকতে পারে না?

তা আবার থাকবে না কেন? তুই তো সে ব্যাপারে কিছু বলিসনি তাই...!

সবই তোদের বলতে হবে, তার কী মানে আছে!

আমি এবার একটু জোর গলায় রত্না আর সুলেখাকে থামাই— থাম না তোরা! দু’জনে ঝগড়া শুরু করলি! প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত ব্যাপার থাকতেই পারে। তা নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো। এখানে তো আমরা আসি একটু আড্ডা মারতে, একটু আনন্দ পেতে। সেটাই কর না! ওসব আলোচনা ছেড়ে আয় আমরা সেদিনকার মতো গানের ‘অন্ত্যাক্সারি’ খেলি।

 

নয়

সত্যিই মনটা আমার মোটেও ভালো নেই। রত্নার কথাটা যদি সত্যি হয়; তাহলে তো ঝুমুর এখন থানার লক-আপে। ওর জন্য কষ্ট হচ্ছে আমার। মেয়েটা সত্যিই কপালপুড়ি। কী হালে থাকার কথা; আর কী হাল হচ্ছে ওর! কবে লক-আপ থেকে ছাড়া পাবে কে জানে! জেল-হাজত না হয় আবার! মনে মনে খুব রাগও হয় ওর ওপর। একে তো নোংরা কাজে নামলি। সেও না হয় ক্ষেমা-ঘেন্না করে নিলাম। পেটের দায়ে করছিস। এখনকার বাজারে কাজ কর্ম্মের যা হাল! কিন্তু এত লোভ করার কী আছে যে, দিঘা-বকখালি ছুটতে হবে! এদিকে বললি তোর খুব বিপদ! রুমি, বোম-রতনদের সঙ্গে কীসব গণ্ডগোল পাকিয়ে বসে আছিস। ওদিকে আর এক কাণ্ড ঘটিয়ে বসলি। মা-টা হাসপাতালে পড়ে। কে দেখভাল করবে এখন!

দিঘা যাওয়ার কথা শুনেই নেচে উঠেছে হয়তো! সমুদ্র দেখা হবে, টাকা রোজগারও হবে। সেদিনই তো বলছিল, দু’বেলা সমুদ্রে স্নান, ভালো খাওয়া-দাওয়া আরও কতকিছু। সমুদ্র যেন আর জীবনে দেখা হবে না! আমাদের এ ক’জনের মধ্যে কে আর সত্যিকারের সমুদ্র দেখেছি। ওই সিনেমাতেই যা...! বাড়ির সাদা-কালো টিভিতে বিশাল বিশাল ঢেউ আর শোঁ-শোঁ শব্দ! রত্নাটাও বোধহয় ওইদিকেই ঝুঁকছে। মেট্রো সিনেমার সামনে কেন গিয়েছিল জিজ্ঞেস করতে যা রেগে উঠল!

সন্ধে নামার আগেই ঝুমুরের কথা, রত্নার কথা, সমুদ্রের কথা ভাবতে ভাবতে ডিউভিউয়ের দোতলার ছাদের আড্ডা থেকে বাড়ি ফিরছি। একফালি উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় উঠতেই শুনি সমুদ্রের কথা। ঘরের ভেতর দরজার কাছে একটা মোড়াতে বসে ক্যাশকাকু বলছে— বুঝলে, সমুদ্রের মজাই আলাদা। বিশাল বিশাল ঢেউ, জড়িয়ে ধরে স্নান। বালিয়াড়িতে শঙ্খ আর রঙ-বেরঙের ঝিনুক কুড়োনো। আরও কত কিছু। দাদা তো যাবে না। সীমুকেও নেব না। শুধু তুমি আর আমি।

বাড়িতে অন্য কেউ না থাকলে ক্যাশকাকু মাকে ‘আপনি’ বলে না; ‘তুমি’ বলে। আমি অনেক দিন শুনেছি। ক্যাশকাকু বারান্দার দিকে পিছন ফিরে বসে চা খাচ্ছে, তাই আমাকে দেখতে পায়নি। আর আমিও পাজি কম নই! আজ একটু আগেভাগে চলে এসেছি, বুঝতে পারছি বাবা এখনও ফেরেনি। তাই বারান্দায় উঠেছি পা টিপে টিপে। মা খাটে বসে রয়েছে দরজার দিকে মুখ করে। তাই আমাকে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে উঠেছে— সীমু, তোর ক্যাশকাকু বলছে, এবার পুজোর ছুটিতে আমাদেরকে দিঘা বেড়াতে নিয়ে যাবে। ওর দেশের বাড়ি থেকে তো দিঘা বেশি দূর নয়। যাওয়া যাবে, নাকি বল!

দেখি, ক্যাশকাকু কেমন থতমত খেয়ে যায়। মায়ের কথায় আমি হ্যাঁ, না কিছুই বলি না। চুপচাপ পাশের ঘরে চলে যাই। আসলে, আমি বুঝিয়ে দিতে চাইলাম যে, তোমাদের ওইসব আলোচনা, কথাবার্তা আমার কানে গেছে। ক্যাশকাকু তো বলছিল, ‘সীমুকেও নেবো না।’ ক্যাশকাকুর সঙ্গে যাওয়া হোক আর না হোক, সমুদ্র দেখার ইচ্ছা আমার অনেকদিনের। সিনেমাতে দেখি হিরো-হিরোইন সমুদ্রে জড়াজড়ি ধরাধরি করছে, বালিয়াড়িতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। দেখে গা শিরশির করে ওঠে। কখনও আবার সানরাইজ কিংবা সূর্য ডোবা দেখায়। কী ভালো যে লাগে! মনটা উদাস হয়ে যায়। টুসি বিয়ের পরে-পরে এসে গল্প করেছিল, ওর নাকি ‘হানিমুন’ করতে গিয়েছিল দিঘায়। সে কী রসিয়ে যে বলছিল, শুনে মনে মনে লোভ হচ্ছিল। ও বলেছিল, শাড়ি কিংবা ম্যাক্সি পরে নাকি সমুদ্রে নামা যায় না। ঢেউ এসে সব উল্টে দেয়। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার! চুড়িদার কিংবা সালোয়ার পরে সমুদ্রে নামতে হয়।

হঠাৎ আমার মনে আসে, আচ্ছা, মা-ও কি চুড়িদার পরবে? কোনওদিন চুড়িদার পরেনি মা। ওই ঢিপসিমার্কা শরীরে চুড়িদার পরে জলে ভিজলে মাকে কেমন লাগবে, ভাবতেই আমার গা রি-রি করে ওঠে। জানি, মায়ের সম্পর্কে এমন ভাবা ঠিক নয়। মা, মা-ই! বাবা বলে, ‘সন্তানদের কখনও উচিত নয় মা-বাবার দোষগুণ বিচার করা। মা-বাবা যেমনই হোক, তারা দেবতুল্য।’ তবু না ভেবে পারি না। আসলে, ক্যাশকাকুর সঙ্গে মায়ের মাখামাখিটা আমার মোটেও পছন্দ হয় না। ওর সঙ্গে মা সমুদ্রে নামতে চাইছে। ওই ক্যাশকাকুর হাত ধরে কি ঢেউ সামাল দিতে পারবে মা! তলিয়ে যাবে না তো!

আচ্ছা! আমাকে যদি সঙ্গে নিয়ে যায়। মা যদি আমাকে ক্যাশকাকুর সঙ্গে সমুদ্রে নামতে বলে! না, আমি নামব না। কিছুতেই না। ওই লোকটার সঙ্গে আমি যাবই না দিঘায়। মাকেও যেতে দেব না। যা ইচ্ছা তাই করবে নাকি মা! শেষকালে ঝুমুরের মায়ের মতো যদি...! তখন বাবা যদি...!

উফস, কী যে সব আবোল তাবোল ভাবনা মাথায় আসে না! না, আমার বাবা কখনও খারাপ কিছু করবে না। আমার বাবার অসীম ধৈর্য! আর মা! না না, মা-ও ভালো। হয় তো আমার বোঝার ভুল হতে পারে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তো সংসারের কাজ নিয়ে বাড়িতেই কাটায় বেচারি। না কোনও বন্ধু-বান্ধব, না কোথাও বেড়াতে যাওয়া। একদম মুখ বুজে, বন্ধু-বান্ধবহীন হয়ে কোনও মানুষ কি থাকতে পারে! হয় তো ক্যাশকাকুর কাছে মা একটু ফ্রি হয়। একঘেয়েমি কাটায়। বাবার সঙ্গে তো খাওয়ার সময় ছাড়া আর কোনও কথা হয় না।

এমন ভাবনা মাথায় আসতেই মনটা হালকা হয়ে যায়। আমি আমার ঘরে ঢুকে এতক্ষণ আলো জ্বালিনি। পাছে মা, দিঘা নিয়ে আর কোনও কথা বলে। বাইরে তেমন অন্ধকার না হলেও ঘরের ভেতর সব অস্পষ্ট হয়ে গেছে। এবার আমি আলোর সুইচ টিপে দিই। কয়েক মিনিট পরেই মা ঘরে ঢোকে— কী রে, এসে শুয়ে পড়েছিলিস নাকি? মাথা-যন্ত্রণা হচ্ছে? চা খাবি?

আমি বলি— না, মাথা যন্ত্রণা হয়নি। তবে, চা খাব।

মা বেরিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে। আমি ঘর থেকে বের হই, দেখি, ক্যাশকাকু ওর ঘরে চলে গেছে। আমি কুয়োতলায় যাই। বাইরে থেকে এসে হাত-পা ধোয়া হয়নি এখনও। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে আমি ধূপ জ্বালি। সকাল-সন্ধ্যায় ধূপ-ধুনো দেওয়াটা আমার কাজের মধ্যে পড়ে। অনেক আগে দেখতাম, সন্ধেবেলায় প্রদীপ জ্বালতো মা। মাথায় ঘোমটা দিয়ে, শাড়ির আঁচলটা গলায় জড়িয়ে, দু’হাতের তালুতে প্রদীপ নিয়ে, মা তুলসীতলায় যেত। জ্বলন্ত প্রদীপ নামিয়ে গড় হয়ে প্রণাম করত মা। তখন মা-কে দেখে কী ভালো যে লাগত! ঠিক যেন কোনও এক গাঁয়ের বধূ! এখন আর প্রদীপ জ্বালানো হয় না। কী কারণে যে বন্ধ হয়ে গেল, কে জানে! এখন শুধু ঘর-দোরে একটু জলের ছিঁটে আর দুটো কমদামি ধূপকাঠি ধরানো হয়।

আমার জন্যে চা নিয়ে আসে মা। সঙ্গে বাটিতে কিছুটা তেলমাখা মুড়ি। বলে— মুড়িটুকু খেয়ে নে। কখন ভাত খেয়েছিস!  বাইরেও তো কিছু খাসনি বোধহয়!  

মায়ের গলায় স্নেহের ছোঁয়া। সবসময় এটা পাওয়া যায় না। কিন্তু যখন মা আমাকে স্নেহ করে, ভালোবাসতে চায়, আমি ঠিক বুঝতে পারি। আমি ভাবি, ক্যাশকাকুর কথাগুলো আমি শুনে ফেলেছি বলেই কি মা আমাকে তোয়াজ করছে! কিন্তু মা-তো জানে, আমি শুনলেও এসব কথা কাউকে বলব না। কোনও অশান্তি, চিৎকার-চেঁচামেচি আমার পছন্দ নয়।

নিজের জন্য হাফ-কাপ চা নিয়ে এসে মা আমার পাশে বসে। আমি চুপচাপ চা-মুড়ি খাচ্ছি। মা কাপে চুমুক দিয়ে বলে—সীমু, তুই আমার ওপর রাগ করেছিস?

এমন প্রশ্ন আশা করিনি আমি। তাই চমকে উঠি। তবুও সামলে নিয়ে হাসিহাসি মুখ করে বলি— শুধু শুধু তোমার ওপর রাগ করতে যাব কেন?

আমি জানি, তোর ক্যাশকাকুর কথাগুলো তুই শুনেছিস।

আমার এবার সত্যি সত্যি একটু রাগ হয়— তাতে কী? এমন কথা তো আর নতুন শুনছি না। তুমি আবার তা নিয়ে নিজের মেয়ের সঙ্গে আলোচনা করছ! তোমার লজ্জা পাওয়া উচিত মা।

না-রে! তুই যা ভাবছিস তা নয়; লজ্জা পাওয়ার মতো কোনও কাজ আমি করিনি। ও শুধু বলেই যায়, আমি শুনি। তার বেশি কিছু নয়। হয়তো বলবি, ওর এ ধরনের কথায় আমি আপত্তি করি না কেন, বাধা দিই না কেন! তারও কারণ আছে, সেটা ঠিক তোকে বোঝাতে পারব না।

আমাকে বোঝানোর আর কী আছে। তুমি যা খুশি তাই কর, তোমাকে বাধা দেবে কে!

আমাকে বাধা দেওয়ার জন্য অন্য কাউকে লাগবে না, আমি নিজেই নিজেকে বাধা দিই। তা না হলে এই চারবছরে ঘর-সংসার ভেসে যেত।

আমি কী বলব ভেবে পাই না। তাই চুপ থাকি। এসব নিয়ে কথা বলতে ভালোও লাগছে না আমার। একটুখানি চুপ করে থেকে মা আবার মুখ খোলে— ভুল আমি একটাই করেছি, প্রথম দিনে বাধা দিতে পারিনি।  

তোর বাবার কথায়, ‘প্রথম রাতে বেড়াল মারতে পারিনি আমি।’ আসলে তারও কারণ ছিল। চারবছর আগে ওই তোর ক্যাশকাকু যখন ভাড়া এল, তখন সংসারে খুবই টানাটানি। তা না হলে ঘর ভাড়া দেওয়ারই কথা নয়। তুই তো তখন যথেষ্ট বড়, এইটে পড়িস! নিশ্চয় জানিস! তোর বাবার মাইনে তখন এতই কম যে, সংসার চালাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে মানুষটা। মাগ্যিগণ্ডার বাজার, তোর লেখাপড়ার খরচ। তোর ছোটকাকাও তখন সেভাবে টিউশানি শুরু করেনি। তখন এতই অভাব যে, তোর বাবার মুখে হাসি চলে গেছে। সবসময় কেমন গুমরে থাকে। না কোনও মিষ্টি কথা, না কোনও হাসি-ঠাট্টা মজা করা। আমার খুবই খারাপ লাগত, অমন হাসিখুশি থাকা লোকটা টাকা-টাকা করে যেন শুকনো, রসকষহীন হয়ে পড়েছে। তখন তোর ওই ক্যাশকাকু ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, এ সুযোগটা কাজে লাগাল। আমাদের সঙ্গে এক হেঁসেলে খাওয়া শুরু করল। প্রায় রোজই সবজিটা, মাছটা কিনে নিয়ে আসত। মাসের শেষে টাকাটাও ঠিকমতো দিত। বেশ কিছু সাশ্রয় হত। এতে তোর বাবার ওপর চাপ কিছুটা কমে গেল। শুধু তাই নয়, খেতে বসে ওই মানুষটা বেশ মজার মজার কথা বলে আমাদের অভাব-কষ্টে জারিয়ে যাওয়া মনগুলোতে একটু ফুরফুরে বাতাস বইয়ে দিত। ভালো লাগত আমাদের। বেশ রসিক মনে হত ওকে। আস্তে আস্তে ওর ওই রসিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে, নিছক রসিকতা থাকল না। বাড়িতে আর কেউ না থাকলে এমন এমন কথাও বলে ফেলত, যা মেয়ের কাছে বলার মতো নয়। কিন্তু বাধা দিতে পারিনি রে! বলতে পারিস এটাই আমার একমাত্র ভুল!

আমার চা খাওয়া হয়ে গেছে। বাটিতে কয়েকটা মুড়ি রয়ে গেছে, সেগুলো আনমনে নাড়াচাড়া করছি মাথা নিচু করে। মায়ের কাপে চা রয়ে গেছে এখনও। তবে জুড়িয়ে জল। মা একাই কথা বলে যাচ্ছে। আমারও কিছু বলা দরকার। তাই বলি, চা যে ঠান্ডা হয়ে গেল!  

একচুমুকে ঠান্ডা চা-টুকু পেটে চালান করে মা আবার কথা বলা শুরু করে— সত্যি কথা বলতে দোষ নেই, তখন ওই মানুষটার কথাগুলো আমার শুনতেও বেশ ভালো লাগত। বেশ মজা পেতাম। আসলে, মেয়েদের, বিশেষত আমার তো একদম ঘরবন্দি জীবন! না আছে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, না অন্য কিছু। আনন্দ পাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। তখন টিভিও আসেনি বাড়িতে। ওটা তো তোর ক্যাশকাকুই কিনে দিয়েছে। তোর বাবাও দিনকে দিন নীরস, কাঠখোট্টা হয়ে যাচ্ছে। সে সময় তোর ক্যাশকাকুর কথাগুলো আপত্তিকর হলেও, একটু যেন রসিয়ে তুলত মনটাকে। একঘেয়েমিটা কাটত। তুই বড় হয়েছিস, বুঝতে পারছিস খাওয়া ঘুমোনো ছাড়াও, বেঁচে থাকতে গেলে মানুষের আরও কিছু প্রয়োজন হয়। আমাকে সেটা জোগাতো ওই মানুষটা। আমি লোভে পড়ে গেলাম। তবে বিশ্বাস কর...! 

আমি মায়ের কথা থামানোর জন্য কথার মাঝেই বলে উঠি— বাবা এল বোধহয়!

মা এক লহমা কান খাড়া করে বলে— না, তোর বাবার পায়ের শব্দ আমি চিনি।

তোর ক্যাশকাকু বাথরুমে গেল। আসলে, এ মানুষটাকেও খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। প্রত্যেক মানুষেরই পেটের খিদের মতো মনেরও একটা খিদে থাকে! টাকা রোজগারের জন্যে ও গ্রামের বাড়িতে বউ-বাচ্চা, আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে, কলকাতায় এসে পড়ে আছে। সারাদিনের কাজের শেষে ওরও ইচ্ছে করে একটু রঙ্গ-রসিকতা করতে, এটু মজা করতে। সবাই তো আর তোর বাবার মতো এমন নির্বিকার-নির্লিপ্ত পুরুষ মানুষ নয়। আমাদের মতো গরীব মানুষদের মনের খোরাক বলতে তো ছেলে-মেয়েদের ভালোবাসা দেওয়া, আর স্বামীর ভালোবাসা নেওয়া। এর বাইরে টাকা খরচ করে ‘ফুত্তিফাত্তা’ করার মতো টাকাও নেই, আর সে বয়সও নেই। তোর ক্যাশকাকুরও তাই। ওরও তো ঘর-সংসার অছে, বউ-বাচ্চা আর বুড়োবুড়ি বাবা-মা আছে। এমনিতে মানুষটা খারাপ নয় রে! ওই মুখে বলেই যা একটু আনন্দ পায়। ওর বাড়িতেও অনেক অশান্তি জানিস তো! ওর বউ ওকে তেমন পছন্দ করে না। বাড়ি গেলে যত্ন-আত্তি করে না। তাই সব সপ্তাহে বাড়িও যায় না ও। ওরও তো একটু মন হালকা করার ব্যাপার থাকে।

আমার আর শুনতে ভালো লাগে না মায়ের এই কথার কচকচানি। আমি শুনতেও চাইনি। মা নিজে থেকেই বলতে শুরু করল। আমার মনে হয়, মা নিজেই অপরাধবোধে ভুগছিল। এখন আমাকে কথাগুলো বলে একটু হালকা করল নিজেকে। হয়তো বা নিজেকে কিছুটা পরিশুদ্ধও করতে চাইল। কিংবা এমনও হতে পারে, মেয়ে যাতে মায়ের দেখে পাঁকে পা না ফেলে, সেই সাবধানতার জন্যেই নিজের অসহায়তার কথাটা বোঝাতে চাইল। আমি কদ্দুর কী বুঝলাম সেটা পরের কথা।

মায়ের এই চালচলনে একটু লাগাম দেওয়ার জন্য বললাম— তুমি যাই-ই বল না মা, ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে না। তুমি ভাব, বাবা কিছু বোঝে না! বাবা খুব ভালো আর নরম মানুষ তাই তোমাকে কিছু বলে না। তোমারও তো বয়স হয়েছে, আমি বড়ো হয়েছি। এবার তুমি একটু চেক কর না নিজেকে! দরকার হলে ক্যাশকাকুকে উঠিয়ে দিয়ে অন্য ভাড়াটে বসাও।

আমার কথা শুনে মা একটু থমকে রইল। তারপর মিন মিন করে বলল— অন্য ভাড়াটে এলে, সে কেমন হবে না হবে তার ঠিক নেই। তুই বড়ো হয়েছিস তো! আর কিছুদিন পর তোর ছোটকাকার বিয়ে হলে এমনিতেই ভাড়াটে উঠিয়ে দিতে হবে। যে কটা দিন আছে ও-ই থাক। 

আমি কিছু বলতে যাব, এমন সময় বারান্দায় পায়ের শব্দ শোনা যায়। মা বলে ওঠে— তোর বাবা আসছে।

আমি উঠে পড়ি। বাবার জন্য লুঙ্গি আর গামছখানা টেনে নিয়ে বহুদিনের পুরোনো চেয়ারখানার ভাঙা হাতলে রাখি। ও জিনিসদুটো ওখানে না থাকলে বাবা বিরক্ত হয়। বলে, হাতের কাছে লুঙ্গি-গামছা থাকে না কেন?

মুড়ির বাটি আর এঁটো কাপ দুটো নিয়ে মা উঠে পড়ে।

রোজ রাতে ছোটকাকা সকলের শেষে বাড়ি ফেরে। কিন্তু সকলের আগে খেয়ে নেয় রাতের খাবার। খাওয়া শেষ হলেই ছোটকাকা তার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। তার আগে কাকার বিছানা ঝেড়েঝুড়ে মশারি টাঙিয়ে রেখে আসাটা আমার কাজ। এর জন্য কখনও সখনও দু’দশ টাকা চাইলে ছোটকাকার কাছে পাওয়া যায়। তাছাড়া পুজোর সময় বাড়ির চারজনের জন্যে নতুন পোশাক ছোটকাকা কেনে। ফ্যামিলিতে এটাই হল ছোট কাকার বড় খরচ।   

ছোটকাকা ঘরে ঢুকে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়ে; নাকি সেইসব নোংরা ছবিওয়ালা বইগুলো পড়ে, জানি না। কিন্তু ঘরে আলো জ্বলে অনেকক্ষণ ধরে। কাকু অবিশ্যি তাড়াতাড়ি খেয়ে নেওয়ার কৈফিয়ত হিসেবে বলে, ‘ভোরবেলায় উঠে কোচিং সেন্টারে পড়াতে যেতে হয় তো, তাই...।' 

ছোটকাকা ঘরে ঢুকে যাওয়ার পর বাবা আর ক্যাশকাকু রোজ খেতে বসে। সবশেষে আমি আর মা খাই। আজও যথারীতি ক্যাশকাকু আর বাবার জন্য খাবার বাড়ছে মা। আমি হঠাৎ মেঝেতে বাবার পাশে বসে পড়ি। বলি— আমাকেও দিয়ে দাও, খিদে পেয়েছে।

মা অবাক হয়। তারপর একটু যেন মনক্ষুণ্ন হয়েই ভাতের থালা বাড়িয়ে দেয় আমার দিকে। আমি খেতে খেতে বাবার দিকে তাকাচ্ছি। মুখ নিচু করে একমনে খেয়ে যাচ্ছে বাবা। কেমন গোবেচারা লাগছে বাবাকে। যেন বোকাহাবা লোক একটা। কিন্তু বাবার সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়, বাবা কত জ্ঞানী! কত সুন্দর সুন্দর কথা বলে। বাবা মাঝে মাঝে একটা কথা বলে, ‘যে সয় সে মহাশয়, যে না সয়, সে নাশ হয়।’ সেই হিসেবে বাবা মহাশয়। বাবা বহু কিছু সহ্য করে। যেমন, একসঙ্গে খেতে বসলেও মা ক্যাশকাকুকে বেশি যত্ন করে। আমারই দৃষ্টিকটু লাগে। বাবা বলে, ‘ও তো আমাদের পেয়িং গেস্ট। ওর ত্রুটি যাতে না হয়, সে চেষ্টাই করে তোর মা।’

বাবা মুখ নিচু করে খেতে থাকলেও কীভাবে বুঝে ফেলে, আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। বলে— কী রে সীমু! কিছু বলবি মা?

কী বলব, কিছুই ঠিক করিনি আমি। আসলে কিছু বলতেও চাইনি। এমনিই বাবার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাই বাবার প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে হঠাৎ-ই বলে ফেলি— ‘তুমি বল তোমার মাইনে বাড়লেই...!' তোমার মাইনে কবে বাড়বে বাবা? 

বাবা একবার চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। আমি দেখতে পাই সে দৃষ্টিতে রাগ আর কষ্ট মাখানো। বাবা নিচু গলায় বলে— হয়তো সামনের মাসেই...।

কথাটা শেষ করে আধ-খাওয়া ভাতের থালা ঈষৎ ঠেলে সরিয়ে দিয়ে জল খায় বাবা। ঘটি তুলে আলগোছে জল খেতে গিয়ে মেঝেয় জল ফেলে। বাবা উঠে পড়ে। মেঝেয় পড়া জলের ধারা কেমন সাপের মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে যায় মায়ের দিকে।

মায়ের পায়ের কাছে গিয়ে জলধারা থেমে যায়। এখন ওটাকে ঠিক সাপলুডোর সাপের মতো লাগছে। সাপের মুখটা যেন মায়ের পায়ের কাছে আর লেজটা বাবার বসে থাকা আসনের কাছে।

মা বলে, কী হল! আর খেলে না?

বাবা কিছু না বলে কুয়োতলায় হাত ধুতে চলে যায়। মা আমার দিকে রাগ-রাগ চোখে তাকায়। আমি মাথা নিচু করে বাঁ হাতের নখ দিয়ে মেঝের অদৃশ্য ময়লা খুঁটতে থাকি। আমারও আর খেতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু মা রেগে উঠবে ভেবে, কোনওক্রমে ভাতগুলো গিলে নিয়ে উঠে পড়ি।

বাবা সাধারণত খাওয়ার পর বড় ঘরের খাটে গিয়ে বসে। আমি আর মা খেতে খেতে টুকটাক কথা বলি বাবার সঙ্গে। আজ বাবা মুখ-হাত ধুয়ে পাশের ঘরে গিয়ে বসেছে। ওই ঘরটাতে আমি একা শুই। কোনও কোনওদিন মা-ও শোয় আমার সঙ্গে। সচরাচর বাবা আমার শোবার ঘরে ডোকে না। বলে, ‘মেয়েদের ঘর হল ভগবতীর ভদ্রাসন! যখন তখন কি সেখানে প্রবেশ করতে আছে রে মা’!

আজ বাবা আমার ঘরে গিয়ে বসেছে। আমার ভালো লাগে, আবার ভয়ও লাগে। বাবা কি আমাকে কিছু বলতে চায়? আমি হাত ধুয়ে গুটিগুটি আমার ঘরে ঢুকি। বাবা বলে— আয়, বোস এখানে।

আমি সেলফ-এ রাখা কৌটো এনে আমলকির শুকনো টুকরো বের করে বাবার হাতে দিই, নিজেও এক টুকরো মুখে ফেলি। বাবা আমলকির টুকরো হাতে রেখেই প্রশ্ন করে, তোর কাজের কিছু ব্যবস্থা হল?

আমি কৌটোর ঢাকনি আঁটতে আঁটতে বলি— না বাবা, হয়নি। তুমি ভাত না খেয়ে উঠে পড়লে কেন?

বাবা আমলকির টুকরোটা মুখের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়ে বলে, রোজই তো বেশি বেশি খাই, আজ না হয় কম খেলাম।

জানো! মা রাগ করেছে।

তাই নাকি! এটা তো ভালো লক্ষণ নয়। রেগেমেগে আবার ভাত বেশি না খেয়ে ফেলে। চালের যা দাম এখন!

আমি কপট বিরক্তি প্রকাশ করি— তুমি ইয়ারকি কোরো না বাবা! তোমার ওভাবে ভাত ফেলে উঠে পড়াটা উচিত হয়নি।

তোরও কি উচিত হয়েছে ক্যাশকাকুর সামনে ওই কথাটা বলা। ও তো কখন না কখনও শুনেছে আমার মুখে ওই কথাটা। ও কী ভাবল বল তো! 

ভাবল তো কী হয়েছে! যা সত্যি তাই বলেছি। ওর তো এগ্রিমেন্ট শেষ হয়ে গেছে একবছর আগেই। ওকে এবার ঘর ছেড়ে দিতে বল। অন্য ভাড়াটে বসাও তুমি!

ওকে তোর মায়ের খুব পছন্দ যে!

মায়ের পছন্দ বলেই তুমি ওকে রাখবে?

দেখ, তোর মায়ের পছন্দ মতো তো কিছুই দিতে পারি না। না বাড়ি, না গাড়ি, না সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। একটা কালার টিভির কথা বলছে কবে থেকে; সেটাই কিনে দিতে পারছি না। একটা পছন্দের মানুষ যদি বাড়িতে থাকে থাক না!

বাবা, তুমি না..! একটা পর-মানুষ বছরের পর বছর বাড়িতে মৌরসীপাট্টা গেড়ে থাকবে আর...! জান মা তোমাকে...!

ওরে পাগলি মেয়ে। পর কখনও আপন হয় না, আর আপন কখনও পর হয় না। তোর মায়ের কাছে আমি আপনই আছি। তুই অত ভাবিস না। একটু ধৈর্য ধর। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।

তুমি খাওয়ার পর খাটে গিয়ে বসলে না কেন?

তোর সঙ্গে দুটো কথা বলব বলেই তো এ ঘরে এলাম।

তুমি ও ঘরে গেলে না, এর জন্যেও মা তোমাকে দুটো কথা শোনাবে।

কথা শোনালে শুনব। বাড়ির লোক ছাড়া সে আর কাকে কথা শোনাবে বল! বাইরের লোক তো আর...!

বাবা তুমি কী বল তো! তোমার মধ্যে কি রাগ-দুঃখ বলে কিছু নেই?

আছে তো? যখন রাগ করার মতো পরিস্থিতি হয়, তখন রাগি। যখন দুঃখ পেতে হয়, দুঃখ পাই। সবসময় কি রাগ দেখালে সংসার চলে রে মা!

তবে যে তুমি রাগ করে ভাতের থালা সরিয়ে উঠে এলে!

ওটা রাগ করে নয়। আসলে ওই সময় উঠে আসার প্রয়োজন ছিল। তা না হলে কথাটা অন্য দিকে মোড় নিত। তোর মা এখন যা রেগেছে, তার চেয়ে বেশি রেগে যেত। সে এক বিশ্রী ব্যাপার হত।

আমরা কথা বলছি; শুনতে পাই মা দুম দুম করে পা ফেলে কুয়োতলায় গেল। এঁটো বাসনগুলো ঝড়াম করে নামাল। এ সময় বাসন ধোয়ার কাজে রোজ আমিও হাত লাগাই। তাই বাবাকে বললাম— আমি যাই, মা বাসন নামিয়েছে।

কুয়োতলায় গিয়ে বাসনের কাছে বসতেই মা খনখনিয়ে ওঠে— থাক, আমিই ধুয়ে নিতে পারব। 

আমি বাসন নিয়ে ছাই মাখানো নারকোল ছোবড়া ঘষতে ঘষতে বলি— তুমি পারবে আমি জানি, তবুও রোজ হাত লাগাই তো, তাই এলাম।

মা আর কিছু বলে না। দড়িবাঁধা বালতি করে কুয়ো থেকে জল তুলতে থাকে। কুয়োতলা থেকে শুনতে পাচ্ছি ক্যাশকাকুর ঘরে টিভি চলার শব্দ। বিজ্ঞাপনের কথাগুলো শোনা যাচ্ছে — জিন্দগী কা সং হরকদম হরপল...!

ক্যাশকাকুর ঘরে কালার টিভি। কেবল কানেকশন আছের কাকুর। তবুও আমি কিংবা মা ওর ঘরে টিভি দেখতে যাই না। আমাদের সাদা-কালো টিভি। কেবল কানেকশন নেই। তাই অনেক চ্যানেল আসে না। ‘জবর খবর’ চ্যানেলও আসে না। সেদিন রত্নার মুখে ঝুমুরের ব্যাপারটা ‘জবর-খবর’-এ দেখিয়েছে শুনে, মনে হয়েছিল ক্যাশকাকুর ঘরে গিয়ে রাতের ‘জবর খবর’টা একবার দেখব।

পরে আবার মত বদলেছি — দরকার নেই, যদি দেখায়, তাহলে ক্যাশকাকুও জেনে যাবে ব্যাপারটা। যদি প্রশ্ন করে বসে ঝুমুরকে চিনি কিনা, তখন মিথ্যা কথা বলতে হবে। আমি আবার মিথ্যা কথা বলতে পারি না ঠিকমতো, ধরা পড়ে যাই। তাছাড়া বাবা বলে, ‘কখনও মিথ্যা বলতে নেই। একটা মিথ্যা ঢাকতে গিয়ে হাজার মিথ্যা বলতে হয় এবং অবশেষে ধরা পড়ে যেতে হয়।’

ঝুমুরের কথা মনে পড়তে হঠাৎ খারাপ লাগে। বেচারি লক-আপ থেকে ছাড়া পেল কিনা কে জানে! হয়তো খেতেও দেয়নি। হয়তো মারধোর করেছে, কিংবা অন্য কিছু! ইস! পেটের দায়ে মেয়েটা...! কাল একবার ওদের ঝুপড়িতে যেতে হবে খবর নিতে। মা-টাও তো নেই। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল কিনা জানি না। যাওয়ার পথে সুলেখাকে সঙ্গে নেব। খালধারের ঝুপড়িতে একা যেতে ভয় লাগে।

সুলেখার কথা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যায় ওর দাদার কথা। কী আশ্চর্য, সন্ধে থেকে একবারও মনে পড়েনি! বিকেলে দেখা হল না। দেখা হলে হয়তো বলত, ‘আই লাভ ইউ।’ আজ না হোক সামনের রবিবার তো আবার দেখা হবে হিপিদা'র সেলুনে। কাল একবার হিপিদা'র কাছেও যাব ওর ফাঁকা টাইমে। যদি কোনও কথা বের করা যায়। 

মা হঠাৎ বলে ওঠে— কী এতক্ষণ ধরে একটা থালা মেজে যাচ্ছিস। হাত চালা। ওদিকে উনি আবার নোংরা বিছানাতেই শুয়ে পড়বেন মশারি-ফশারি না টাঙিয়ে। বুকে একটু তেলমালিশ করে দিতে হত। রোজ রাতে ফিরে চান করে বুকে কফ জমেছে, কাশছে। মুখে তো বলবে না কিছু, এমন মানুষ!

আমি অবাক হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকাই। আশ্চর্য, কিছুক্ষণ আগেই বাবার ওপর দারুণ রেগে উঠেছিল মা! অথচ এখন বাবার কফ-বসা বুকে তেল মালিশ করে দেওয়ার কথা ভাবছে। মা যে কী; আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। সন্ধেবেলায় মায়ের ওপর সত্যিই আমার রাগ হয়েছিল। খেতে বসার সময়ও রাগটা ছিল, তাই বাবাকে ওই কথাটা বলে ফেলেছিলাম। এখন মায়ের ওপর সমস্ত রাগ চলে গিয়ে কেমন যেন আনচান করে ওঠে মনটা। মাকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করে। নিজের ওপর ধিক্কার জন্মায়— ছিঃ! কেন যে খেতে বসে ওই কথাটা বলতে গেলাম! আসলে, মায়ের কথাটাই ঠিক, বেঁচে থাকতে গেলে খাওয়া ঘুমনো ছাড়া আরও কিছু প্রয়োজন হয়। সেটা হল ভালোবাসা। মা আসলে, বাবা, ছোটকাকু, ক্যাশকাকু, আমি, আমাদের সক্কলকে ভালোবাসে। ভালোবাসাটাই হল সংসারকে শক্তপোক্ত রাখা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল মন্ত্র। মা-কে সত্যিই অসাধারণ মহিলা বলে মনে হয় আমার। প্রণাম করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এমনি এমনি তো আর প্রণাম করা যায় না। তাই হাত ধুয়ে উঠতে গিয়ে ইচ্ছে করে মায়ের পায়ে পা ঠেকিয়ে দিয়ে জিভ কেটে প্রণাম করে নিই।

মা ভিজে হাতেই আমার থুতনিতে পাঁচ আঙুল ঠেকিয়ে, নিজের আঙুলে চুমু খেয়ে বলে— বাব্বা, মেয়ে আবার এত ভক্তিমতী হয়ে উঠল কবে থেকে!

 

দশ

অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ রাতে বিছানায় যেতে একটু দেরি হল। তবুও অন্যদিনের মতো শোওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম এল না আজ। মনে এলোমেলো ভাবনা। মায়ের কথা, ক্যাশকাকুর কথা, আবার কখনও বা ঝুমুরের কথা মনের মাঝে ঘুরছে। ভাবতে ভাবতে কখন চোখের পাতা এঁটে এসেছে জানি না। ভোরের দিকে হঠাৎ শুনি বেশ কয়েকজনের গলার আওয়াজ। কান পাতি আমি। শুনি ক্যাশকাকু বলছে— বউদি, তোমার জন্যেই দাদা জানতে পেরে গেল। আমি তো কখন থেকে ব্যাগপত্তর গুছিয়ে রেডি হয়ে আছি। তোমার আর সাজগোজ হয়-ই না।

মা চাপাগলায় বলছে— সাজগোজ আর কোথায় করলাম! ম্যাক্সি পরে তো আর বেরোনো যায় না। শাড়ি-ব্লাউজটা তো পরতে হবে নাকি! এর মধ্যে ও জেগে যাবে জানব কী করে!

বাবার গলা শুনতে পাই— তোমরা দু’জনে দিঘা যাচ্ছ, তা বললেই তো পারতে, এমন লুকিয়ে-চুরিয়ে যাওয়ার কী দরকার!

অবাক হই আমি। এই ভোরবেলায় ক্যাশকাকুর সঙ্গে লুকিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মা! ছি ছি ছি! এই বয়সে...! মা বলতে ঘেন্না লাগছে আমার। আর বাবাটাও সেরকম! পুরুষত্ব বলে কিছু আছে! শুধু মুখে রামকৃষ্ণের মতো বাণী — অমুক করতে নেই, তমুক করতে নেই। আরে বাবা! নিজের বউকে ঘরে ঠিকমতো রাখতে পারো না, পরপুরুষের সঙ্গে ভোরবেলায়...। ছিঃ!

মায়ের গলা শুনতে পাই— আমি যাব বলেছি, যাবই। কেউ আমাকে ঠেকাতে পারবে না।

আমার মাথায় রাগ উঠে যায়— কেউ ঠেকাতে পারবে না! দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা! ভেবেছ মেয়ে বলে তোমাকে কিছু বলব না!

এমন ভেবে আমি তেড়েমেড়ে উঠতে যাই। কিন্তু আশ্চর্য, আমি বিছানা থেকে উঠতে পারছি না কেন! মনে হচ্ছে বিছানার সঙ্গে কেউ বেঁধে রেখেছে আমাকে। তবে কি আমি ঘুমনোর পর মা আমাকে...! না না, তা কী করে হয়! আমি তো রাতে উঠে একবার বাথরুমে গিয়েছিলাম! আশ্চর্য, ছোটকাকাই বা কী করছে! এত চেঁচামেচিতেও ওর ঘুম ভাঙছে না! ও উঠে এসে ওই খচ্চর ক্যাশকাকুটাকে লাথি মেরে বের করে দিতে পারে তো! সব হয়েছে সেইরকম। আমি ওঠার চেষ্টা করি আবার। এবার সফল হই ওঠার পর ভাবি, ওরা দুজনে একজোট হয়েছে। মা-কে কব্জা করতে পারলেও ওই খচ্চরটাকে পারব না, যা গামা চেহারা ওর! তার চেয়ে ছোটকাকাকে ডেকে আনি। এমন ভেবে পা টিপে টিপে ছোটকাকার ঘরের সামনে যাই। দরজা বন্ধ। চিৎকার করে ডাকলে তো মুশকিল। তখন যদি আমার ওপর চড়াও হয়। এখন ওরা মরিয়া দু’জনে।

বাবা ল্যাদারুস মার্কা। বাধা দিতে পারবে না। জানলাটা খোলা আছে দেখছি। জানলা দিয়ে কোনওভাবে জাগানো যায় কিনা দেখি। জানলার সামনে গিয়ে তো আমি লজ্জায় মরে যাই। ছি ছি ছি! ছোটকাকু একটা উলঙ্গ মেয়ের সঙ্গে...! সেই ‘প্লে বয়’ ম্যাগাজিনটার ছবিগুলোর মতো... ছিঃ! কী অসভ্য ওরা। ঘরের আলোটাও নেবায়নি। মেয়েটাকে যেন চেনাচেনা লাগল। ও মনে পড়েছে। যতুদা'র দেখানো সেই ছবির মেয়েটাই তো! নাকবসা, থ্যাবড়া মতো মুখখানা! ওর সঙ্গে তো যতুদা'র বিয়ের ঠিক হয়েছিল! ও এখানে ছোটকাকার ঘরে কী করে এল! আমি কী করব ভেবে পাই না। ওদিকে বাবার গলায় শোনা যাচ্ছে গান নাকি স্তোত্র। রোজ সকালবেলায় এই স্তোত্রটা আওড়ায় বাবা। বলে, ‘এটা জপ করলে দিন ভালো যায়।’

অদ্ভূত মানুষ! এমন একটা বিচ্ছিরি অবস্থায় গান গাইতেও ইচ্ছে করে মানুষের! বাবাটা যেন কী! আমার রাগে-দুঃখে-হতাশায় কান্না পেয়ে যায়। কী করব বুঝে উঠতে পারি না। তাই আবার আমি বিছানায় ফিরে আসি। বালিশে মুখ গুঁজে কান্না আটকানোর চেষ্টা করি।

বাবা গান থামিয়ে বলে—যাচ্ছ যাও, আর এ বাড়িতে ঢুকবে না।

মা বলে— ঠিক আছে ঢুকবো না।

আমার মনটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মা বরাবরের জন্যে চলে যাচ্ছে। আমার কথা একবারও ভাবল না! যেমন হোক মেয়ে তো! মায়ের মন একবার কাঁদল না আমার জন্যে! এমন ভাবতে ভাবতেই মা বলে ওঠে— যাওয়ার আগে মেয়েটাকে শেষ দেখা দেখে যাই।

মা আমার ঘরের দরজার সামনে এসে ডাকে— সীমু, ও সীমু, ওঠ সীমু রে...!

আমি শুনতে পেলেও কিছুতেই উঠি না। বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকি। এমন মায়ের মুখ দেখতে চাই না আমি।

মা বক বক করে— কী ঘুম রে বাবা! এত ডাকছি, কানে ঢুকছে না।

কথা বলতে বলতে মা আমার বিছানার কাছে আসে। আমার গায়ে ধাক্কা দেয় এবার— এই সীমু! ওঠ শিগগির! এত বেলা অবধি ঘুম কিসের রে! চা ঠান্ডা হয়ে গেল!

ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসি আমি। দেখি, বাবা বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে। তার মানে এর আগে ছোটকাকা চা-বিস্কুট খেয়ে টিউশনিতে বেরিয়ে গেছে। আমি মায়ের দিকে ভালো করে তাকাই। রাতে শোওয়ার সময় যে কালো হলুদ ম্যাক্সিখানা পরে মা, সেটাই পরে রয়েছে। আমি উঠে বাথরুমে যাই। মা হেঁকে বলে— তোর ক্যাশকাকুকে ডেকে দিস তো সীমু! চা বার বার গরম করলে টেস্ট থাকে না। 

কিছুক্ষণ পর আমি, মা আর ক্যাশকাকু চা আর টোস্ট খাচ্ছি। আমি ক্যাশকাকুকে হঠাৎ প্রশ্ন করি— আচ্ছা, দিঘাতে প্রচুর নামী-দামি হোটেল আছে, না কাকু!

ক্যাশকাকু উৎসাহের সঙ্গে বলে— হ্যাঁ, নামী-দামিও আছে, কমদামিও আছে। তবে তোমাদের তো হোটেলে থাকতে হবে না; আমার বাড়িতেই থাকা যাবে। দিঘার কাছাকাছিই বাড়ি আমার।

আমি সে কথায় কান না দিয়ে পরের প্রশ্ন করি— ওই হোটেলগুলোতে মাঝে মাঝে ‘রেড’ হয় কেন?

কাকু এ প্রশ্ন শুনে থমকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারে না। আমি উত্তর শোনার জন্য চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া থামিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছি।

তাই ইতস্তত করে বলে ওঠে— সব হোটেলে হয় না। তবে কিছু হোটেল আছে যেগুলোতে ‘রেইড’ হয়। নানা রকম বাজে লোকজন আসে তো! তাদের ধরপাকড় করার জন্য...!

শুনেছি মেয়েদেরও ধরে নিয়ে যায়, লক-আপে পুরে দেয়।

তুমি কোথায় শুনলে এসব?

কাগজে লেখে, তারপর টিভিতে দেখায় তো!

সে সব অনেক ব্যাপার। ওরা সব খারাপ মেয়ে!

কী করে ওদেরকে ধরে? জেলে পুরে দেয়?

না না, ওই ভয় দেখানো আর কি! কিছু টাকা-পয়সা নিয়ে ছেড়ে দেয়। এসব খোঁজে তোমার কী দরকার সীমা?

না, দরকার কিছু নেই। এমনি জিজ্ঞেস করছি। কালকের কাগজে এরকম একটা খবর দেখেছিলাম, তাই...!

মা এতক্ষণ চুপচাপ আমাদের কথা শুনছিল। এবার বলে ওঠে— কাগজে ওইসব খবর পড়ার কী দরকার! তার চেয়ে ‘পাত্র-পাত্রী’র পাতাটা একটু চোখ বুলোতো পারিস। যদি তেমন কোনও ভালো ছেলের খোঁজ পাওয়া যায়।

এত তাড়াতাড়ি সীমার বিয়ে দিয়ে দেবেন ভাবছেন নাকি বউদি?

তাড়াতাড়ি আর কোথায়! ষোল বছরে আমার বিয়ে হয়েছিল। ওর মতো যখন আমার বয়স, তখন ও হয়ে গেছে ছ’মাসের মেয়ে।

আপনাদের সময় অন্যরকম ছিল। এখন দিন পালটেছে। মেয়েরা আর ঘরে বসে থাকে না। এত কম বয়সে বিয়েও করে না।

সে না হয় বুঝলাম। কাজই-বা পাচ্ছে কোথায়! খবর কাগজে নিদেন পক্ষে ‘কর্মখালি’র জায়গাটাও তো একটু ভালো করে পড়লে পারিস। তিন মাস হল, বাড়িতে বসে আছিস। খাচ্ছিস-দাচ্ছিস আর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছিস। আজকাল কতরকম কাজের জন্য মেয়ে লাগে। বিউটি পার্লার, সেলস-এর মেয়ে, তারপর কীসব ‘লাইপেনসিওর’ করার এজেন্ট।

আমি একটু বিরক্তির সঙ্গেই বলে উঠি, কাজ কি আর আমি খুঁজছি না! এই তো গত রোববার রুমির ওখানে গিয়েছিলাম। কাজটা পোষাবে না। মানে, বাজে কাজ তাই...! আজ সুলেখা বলেছে একটা কাজের সন্ধান দেবে।

সন্ধানই করছিস তুই তিনমাস ধরে! জোগাড় আর হচ্ছে না কোনও কাজ! এত মেয়ে কাজ পাচ্ছে!

হ্যাঁ, আমি তো ইচ্ছে করেই কাজ করছি না! এবার যা কাজ পাবো করব। তাতে লক-আপে যেতে হয়, আর হাজতে যেতে হয়!

কথাটা বলে আমি আর ওখানে থাকি না। এঁটো কাপ তিনটে তুলে নিয়ে কুয়োতলায় চলে যাই। কুয়োতলা থেকে শুনতে পাই, মা আর ক্যাশকাকু নিচু গলায় কথা বলছে।

এমন সময় পাশের বাড়ির বুচকি এসে বলে— সীমাদি', বাইরে একটা মেয়েমানুষ রিক্সায় বসে আছে। তোমাকে খুঁজছে। তোমাদের বাড়ি কোনটা জিজ্ঞেস করছিল। 

আমি হাতের জল মুছতে মুছতে বাইরে যাই। দেখি, রিক্সাতে রুমি। আমি অবাক হই, কী ব্যাপার! সাতসকালে রুমি!

ও আমাকে দেখে বলে ওঠে— বাবা, তোদের বাড়িটা এমন গুলিঘুঁজির মধ্যে; খুঁজে পেতে দম বেরিয়ে গেল।

আমি বলি— কার? তোর না রিক্সাওলার?

সেকথার উত্তর না দিয়ে ও বলে— একটা দরকারে এসেছি তোর কাছে।

আয়, ভেতরে আয়। রিক্সাওলাকে ছেড়ে দে না।

না রে, ওর রিক্সাতেই ফিরব। তাড়া আছে আমার।

রিক্সাওলা দাঁড়িয়ে থাকে। রুমিকে বাড়িতে ভেতরে নিয়ে যাই। আমার ঘরে বসাই। তখনও বিছানাপত্র গোছগাছ করা হয়নি। খাটের একপাশে বসে ও বলে— তুই ঝুমুরের খোঁজ জানিস?

ধক করে ওঠে আমার মনটা। কাল রত্নার মুখে শুনেছি ও দিঘার লক-আপে। খারাপ কিছু হল না তো? কিচ্ছু জানি না, বোঝাতে ঘাড় নাড়ি আমি।

রুমি বলে— ওকে আমার ভীষণ দরকার। গত রবিবারে যাওয়ার কথা ছিল, গেল না। তারপর থেকে ওর দেখাই পাচ্ছি না।

রত্নার মুখে শোনা কথাটা চেপে যাই আমি। ঠোঁট উলটিয়ে বলি— আমাদের সঙ্গেও দেখা হয়নি। তবে, শুনেছি ওর মা খুব অসুস্থ, চিত্তরঞ্জনে ভর্তি আছে।

কী হয়েছে ওর মায়ের?

তা জানি না। আমাদের সঙ্গে তো দেখাই হয়নি। ওর সঙ্গে তোর কিসের এত দরকার? তোদের ওখানে কাজ করবে নাকি?

না রে! কাজ নয়, অন্য দরকার। খুবই দরকার। একজন রিপোর্টার না ফটোগ্রাফার ওর জানাশোনা আছে। তার নাম-ঠিকানাটা দরকার। তুই চিনিস তাকে?

আমি চিনব কী করে?

বোম-রতন বলল, এক দিন ঝুমুর, ওই রিপোর্টার আর তোরা ডিউভিউয়ের সামনে একসঙ্গে ফুচকা খাচ্ছিলিস!

বোম-রতনের কথা উঠতে সাবধান হয়ে যাই আমি। ঝুমুর বলেছিল ওর খুব বিপদ।

তাই হঠাৎ মনে পড়ল এমন ভাবে বলি— হ্যাঁ, দিন দশেক আগে ওখানে আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম। ঝুমুরও ছিল। সেদিন একটা ছেলেকে দেখেছিলাম। ঝুমুর বলল ওর চেনা রিপোর্টার। ওই-ই ফুচকা খাওয়াল আমাদের। তারপর তো দেখা হয়নি। নামও জানি না।

যদিও জানি, রিপোর্টারের নাম ষষ্টীদা, তবুও বললাম না। মনে হল না বলাই ভালো। কী থেকে কী হয়! এমন সময় মা ঘরে আসে। ম্যাক্সি পাল্টে শাড়ি পরেছে মা। চুল আঁচড়িয়ে সিঁদুর পরেছে। হয়তো রুমির সামনে নিজেকে একটু অন্যরকম দেখাতে চায়।

আমি আলাপ করিয়ে দিই— মা, এ রুমি। আমরা একসঙ্গে বাল্ব কারখানায় কাজ করতাম। আর রুমি! আমার মা, তা তো বুঝতেই পারছিস!   

মা নকল হাসি হেসে বলে— হ্যাঁ, তোমার কথা অনেক শুনেছি সীমুর মুখে। বস, তোমার জন্যে চা করে আনি।

রুমি বাধা দেয়— না মাসিমা, চা খাব না এখন। আমার তাড়া আছে খুব।

এদিকে কোনও দরকারে এসেছিলে বুঝি!

হ্যাঁ, মানে সীমার সঙ্গেই দরকার ছিল।

কোনও কাজের খবর বোধহয়! সীমা বলছিল, তুমি নাকি ওকে একটা কাজের সন্ধান দিয়েছ।

হ্যাঁ মাসিমা, আমাদের সেন্টারেই, মানে আমার হাজব্যান্ডের মাসাজ সেন্টারে! ও তো প্রথমদিন কথা বলে আসার পর আর কোনও খবরই দিল না, করবে কি করবে না। আমিও এ ক’দিন একটা ব্যাপারে ব্যস্ত ছিলাম বলে খোঁজ নিতে পারিনি।

মা বিছানার চাদর টানটান করার চেষ্টা করে, সীমু বলছিল, ওই কাজটা নাকি ওর পছন্দ নয়। দেখ না, অন্য কোনও কাজের ব্যবস্থা করতে পার কি না। বোঝ তো, আমাদের মতো ঘরে ছেলে বল, মেয়ে বল, ঘরে বসে থাকলে চলে না। ওর বাবার রোজগারপাতিও কম। কোথাও যদি ব্যবস্থা করতে পার।

রুমি উঠে পড়ে— হ্যাঁ মাসিমা, আপনি বলছেন যখন নিশ্চয় চেষ্টা করব। আজ উঠি রে সীমা! তাড়া আছে আমার। আর শোন না! তুই তো বিকেলে ওখানে যাবি; রত্না, সুলেখার সঙ্গে দেখা হবে। ওদের কাছে যদি ঝুমুরের খবর পাস, তাহলে আমাকে ফোনে একটু জানাস না রে! আমার ফোননম্বর আছে তো তোর কাছে?

আমি ঘাড় হেলিয়ে জানাই, আছে। ও আর দাঁড়ায় না। বেশ জোরেই পা চালিয়ে গলির দিকে এগোয়।

ও চলে গেলে আমি ভাবি, রিপোর্টারটার খোঁজ করছে কেন রুমি! ওকে দিয়ে কি কোনও কাজ করাতে চায়! নাকি অন্য কিছু। রিপোর্টারটাকে তো আর দেখতেও পাই না। শেষ দেখেছিলাম দিন পাঁচেক আগে। সম্ভবতঃ বুধবারে। সেদিন ঝুমুরও ছিল।

‘জবর খবর’ টিভির রিপোর্টার শ্যামল নামের ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে সুভাষ সরোবরের দিকে চলে গেল ঝুমুর। তার একটু পরেই এসেছিল ওই কাগজের রিপোর্টার। ঝুমুরের খোঁজ করল, তারপর আমাদের কথা মতো সুভাষ সরোবরের দিকে চলে গেল। একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, ঝুমুরের সঙ্গে ওই রিপোর্টার দুটোর দহরম-মহরম কেন?

ঝুমুর খদ্দের ধরার কাজে কি ওদের কোনও হেল্প পায়! শ্যামল নামের ছেলেটাকে পাত্তা দিত না ঝুমুর। সেদিন দেখলাম শ্যামলদা-শ্যামলদা করে হেদিয়ে মরছে। ওর মতলবটা কী বোঝা যাচ্ছে না। তারপর তো কয়েকদিন পাত্তা নেই। রত্নার কথাটা সত্যি না মিথ্যা কে জানে! ‘জবর খবর’ টিভিতে দেখিয়েছে বোধহয়! ওই এক চ্যানেল হয়েছে। যেখানে যত কেলেংকারি, রসালো ব্যাপার-স্যাপার তার খবরটা ওরা ঠিক পায়। ওগুলোই ওদের মেন খবর হয়।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ বেরোবার জন্য রেডি হচ্ছি আমি। যাওয়ার জায়গা বলতে তো ‘ডিউভিউ’য়ের ঠেক। আগে আগে গিয়ে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে না। সুলেখা আর রত্নার ফ্যান কারখানা থেকে ছাড়া পেতে পাঁচটা। সেই ক্রিস্টোফার রোড থেকে হেঁটে হেঁটে চায়না টাউনের ভেতর দিয়ে আসে ওরা। রাসমনি বাগান, মানে আমাদের পাড়ার পাশ দিয়েই যায়। কিন্তু রাস্তার ধারে হা-পিত্যেশ করে বসে থাকতে ভাল্লাগে না। তার চেয়ে একদম ঠেকে পৌঁছিয়ে অপেক্ষা করাই ভালো। ঝুমুরটা যদি আগে আগে আসে, না দেখতে পেয়ে চলে যেতে পারে। অবশ্য যদি দিঘার লক-আপ থেকে ছাড়া পেয়ে থাকে।

বেরোতে যাব, এমন সময় দেখি সুলেখা আমাদের গলিটার মুখে। আমাদের বাড়ির দিকেই আসছে। আমি থমকে যাই। ও কাছে আসতে জিজ্ঞেস করি— কী রে কী ব্যাপার? হঠাৎ!

আজ তাড়াতাড়ি ছাড়া পেয়ে গেলাম কারখানা থেকে। ভাবলাম তোর বাড়ি হয়ে যাই। তোর সঙ্গে দরকারও আছে।

ভালো করেছিস। চল বাড়ির ভেতর। রত্না কই?

আর বলিস না। আজও কাজে যায়নি। বোধহয় ও কাজ ছেড়ে দেবে। শোন না! বলছি আজ আর ভেতরে যাব না। অন্যদিন আসব। তুই তো বেরোবি বলে রেডি হয়েছিস। চল যেতে যেতে বলব।

আমাদের বাড়িতে ঢুকবি না যখন...চল।

ঢুকব রে বাবা, ঢুকব। তবে আজ নয়। সময় হলে ঠিক ঢুকব দেখিস।

পায়ে পায়ে গলি থেকে বেরিয়ে চওড়া রাস্তায় আসি আমরা। আমি বলি, বল কী দরকারের কথা বলছিলিস?

হ্যাঁ বলছিলাম, কাল সকালে তুই একবার আমাদের বাড়ি যেতে পারবি?

সকালেই যেতে হবে?

সকালের দিকে, মানে ন’টা দশটায় গেলেও হবে।

হ্যাঁ ন’টার পর হলে হতে পারে। কিন্তু কী ব্যাপার? তুই কাজে যাবি না কাল?

না কাল কাজে যাব না। ব্যাপারটা হল কাল আমাকে দেখতে আসবে।

দেখতে আসবে? কে রে? কেন আসবে?

আরে বাবা! পাত্রপক্ষ। আমার বিয়ের যোগাযোগ করছে দাদা।

বাঃ! তাহলে তোর বিয়ের ফুল ফুটল বল!

আজকাল আর ফুল ফোটে না, হুল ফোটে। বিয়ে মানেই নানান জ্বালা। বেশ স্বাধীন আছি। রোজগার করছি। ঘুরছি-ফিরছি। আড্ডা মারছি। কাজরির তো বিয়ে হল। তারপর কী অবস্থা তো জানিস।

তবে বিয়েতে রাজি হচ্ছিস কেন?

রাজি না হয়ে উপায় কী বল। আমার বিয়ে না হলে দাদা লাইন ক্লিয়ার পাচ্ছে না। এদিকে মা একা আর সংসারের জোয়াল টানতে পারছে না, দাদার বিয়ে দিতে চাইছে।

তা আমাকে কী করতে হবে?

কী আবার করবি! আমাকে একটু সাজিয়ে গুছিয়ে দিবি। আর আড়াল থেকে পাত্রকে দেখবি। আমি তো আর ভালো করে তাকাতে পারব না। লজ্জা পাওয়ার ভান করতে হবে। শুনেছি ওরা নাকি একটু সেকেলে ধরনের।

আড়াল থেকে দেখতে বলছিস কেন?

তা বলব না? তোকে দেখলে আর আমাকে পছন্দ করবে নাকি?

হেসে উঠি আমি, সে ভালোই তো, দু’জনের একজনকে তো পছন্দ হবে।

তোকে একজন পছন্দ করেই রেখেছে, আর কারুর পছন্দ হওয়া লাগবে না।

তাই নাকি! সে আবার কোন বে-আক্কেলে লোক?

সে সময় হলেই জানতে পারবি। এখন বল, তুই কাল ঠিক যাচ্ছিস তো?

হ্যাঁ যাব, তবে বাড়িতে মিথ্যা কথা বলতে হবে?

কেন? আমাদের বাড়ি যাওয়া নিষেধ নাকি?

না তা নয়, সকালের দিকে ঘর-সংসারের কাজে মা-কে হেল্প করতে হয়। সেটা করা যাবে না। মায়ের রাগ হবে। তাই কাজের সন্ধানে যাচ্ছি বলতে হবে।

সে যা ইচ্ছা বলিস, তোর কিন্তু যাওয়া চাই। সকাল ন’টায়।

ঠিক আছে যাব। সেদিন হাসপাতালে তোর মা-ও তো বলল তোদের বাড়ি যাওয়ার জন্যে। এই সুযোগে যাওয়া হয়ে যাবে।

আরও একজন চায় যে তুই আমাদের বাড়ি আয়।

আমি বুঝতে পারি সুলেখা কার কথা বলতে চাইছে। তবুও না বোঝার ভান করে বলি— কে? রত্না?

উুঁ নেকু! কিছুই বোঝ না যেন! রত্না নয় রতন!

আমি কথা ঘোরাবার জন্যে বলি, এই শোন না। বলছি যে রত্নার বাড়ি হয়ে চল। ও কেন কাজে গেল না, খোঁজ নিয়ে আসা যাক।

আমিও তাই ভেবেছিলাম রে! কথায় কথায় ভুলে গেছি। চল যাই।

রত্নার বাড়ি অবধি যেতে হয় না আমাদের। রাস্তায় দেখা হয়ে যায় ওর সাথে। অন্যদিনের চেয়ে আজ একটু অন্য রকম লাগছে ওকে।

সুলেখা বলে— কী রে কাজে গেলি না?

নাঃ! ভাবছি আর যাব না।

এখন এত সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছিস?

এই বেরোচ্ছিলাম একটু। তোরা যখন এসে গেছিস, চল তোদের সঙ্গেই যাই।

আমরা তিনজনে এবার ‘ডিউভিউ’-এর দিকে এগোতে থাকি।

রত্না আমাকে শুধোয়— কী রে ঝুমুরের কোনও খবর পেলি?

আমি আর খবর কী করে পাব! সকাল থেকে বাড়ির বাইরেই বেরোইনি। না পড়েছি কাগজ, না দেখেছি টিভি। তুই যে কাল বললি, ও দিঘা থানার লক-আপে। ‘জবর খবর’-য়ে দেখেছিস। তো আজকে ‘জবর খবর’-এ কিছু দেখায়নি ওর ব্যাপারে?

‘জবর খবর’-য়ে দেখিছি বলিনি তো! ‘জবর খবর’-এর শ্যামলদার মুখে শুনেছি, বলেছি। তবে, বোধহয় ছাড়া পেয়ে গেছে। আমি যদ্দুর জানি, পুলিশ এসব কেস কোর্টে তোলে না। কিছু মাল কামিয়ে ছেড়ে দেয়।

সুলেখা বলে ওঠে— আচ্ছা রত্না, তুই এসব ব্যাপারগুলো জানিস কোত্থেকে বল তো! যেভাবে বলিস, তোর যেন এসব ব্যাপারে অভিজ্ঞতা আছে।

রত্না বলে ওঠে— বিয়ে না করলেও জানা যায়, বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী বিছানায় কী করে। তেমনি...!

সুলেখা থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠে— বুঝেছি বুঝেছি। উদাহরণ তোর একদম জিভের ডগায়। আজকাল দেখছি তোর মুখে বিছানার কারবারই বেশি আসছে। কেসটা কী! ঝুমুরের ছোঁয়া লাগল নাকি! 

রত্না কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে ওঠে— লাগতেই পারে। ওটা দোষের নাকি! ঠেলায় পড়লে শুধু বেড়াল কেন, বাঘও গাছে ওঠে। শুধু শুধু বেড়ালের দোষ দিয়ে লাভ কী?

কথা বলতে বলতে আমরা এক সময় ‘ডিউভিউ’য়ের সামনে পৌঁছে গেছি। আমি বলি— এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি, নাকি ওই দোতলার ঠেকে যাবি!

সুলেখা হেসে বলে— চল, দোতলাতেই যাই। ওখানে আমাদের দেখতে না পেলে ওভারসিয়ার বাবুরও মন খারাপ হয়।

আমরা ডিউভিউয়ের দোতলায় উঠতে থাকি। উঠতে উঠতে বলি— ও, একটা কথা তোদের বলা হয়নি। আজ সক্কালবেলাতেই রুমি আমার বাড়িতে হাজির।

দু’জনে একসঙ্গে বলে ওঠে— সে কী রে!

হ্যাঁ, ঝুমুরের খোঁজ করতে এসেছিল। ওকে নাকি ভীষণ দরকার।

ঝুমুরকে ওর আবার কী দরকার পড়ল?

তা জানি না। সেই সঙ্গে ওই কাগজের রিপোর্টারটাও নাম ঠিকানা জানতে চাইছিল। তাকেও নাকি খুব দরকার। আমি বলেছি, জানি না।

সেই ফুচকা-ষষ্টীর কথা বলছিস?

সুলেখা হেসে ওঠে রত্নার কথায়— বাঃ, নামখানা বেশ দিয়েছিস, ফু-চ-কা-ষো-শটি। আর সেই জবর-খবর-এর ছেলেটার নাম কী যেন বলল ঝুমুর? 

আমি বলি— তার নাম শ্যামল। মানে হল গিয়ে সবুজ।

রত্না বলে ওঠে— সবুজ তো নয়, অবুঝ! ঝুমুর যে কী চীজ বুঝল না। ওর পেছনে হেদিয়ে মরল। বুঝবে পরে।

আধা-খেঁচরা ডিউভিউয়ের সামনের বাড়িটার দোতলায় আমরা। চারদিক খোলা, তাই আমরা প্রায় ছাদের মাঝখানে বসেছি। তবুও দেখতে পাচ্ছি, দূরে মেন গেটের পাশে লাল রংয়ের চেয়ারে বসে সিকিউরিটি কাকা ঢুলতে ঢুলতে পাহারা দিচ্ছে সবকিছু।

এতক্ষণ বেশ রোদ্দুর ছিল। হঠাৎ ছায়া পড়ল চারপাশটাতে। আকাশে একটা চালি মেঘ। ফিন ফিন করে হাওয়া বইছে। বেশ ভালো লাগছে হাওয়াটা। কোথাও বৃষ্টি হয়েছে বোধহয়। রত্নাকে আজ দেখতে বেশ ভালো লাগছে। সিঁদুররঙা সিন্থেটিক শাড়ি, ম্যাচিং করা লো-কাট ব্লাউজ। ঠোঁটে চড়া রঙের লিপস্টিক, কপালে ঝিকমিক টিপ। ওকে বললাম— কী রে রত্না, কোথায় বেরোচ্ছিলিস বললি না তো!

ও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল— কোথায় যাচ্ছিলাম শুনতে তোদের ভালো লাগবে না।

ভালো লাগুন না লাগুক তোর বলতে আপত্তি কেন?

ও কিছুটা মরিয়া হয়েই যেন বলে ওঠে— ধর্মতলায়। মেট্রো সিনেমার সামনে দাঁড়াতে। সামনের সপ্তাহে বাবার গলায় কেমো না করালেই নয়। অনেকগুলো টাকার দরকার।

তুই ওখানে গেলেই তোকে দাঁড়াতে দেবে ভেবেছিস! অন্য মেয়েরা মেরে তাড়াবে।

সুলেখা বলে— তোর টাকার দরকার তো কারখানায় মালিকের কাছে অ্যাডভান্স নে না। মাসে মাসে মাইনে থেকে কেটে শোধ দিবি!

আমি আর ওই ফ্যান কারখানায় কাজ করব না। সারাদিন ধরে শুধু তামার তার জড়িয়ে যাওয়া। উঠতে, বসতে, খেতে, শুতে সবসময় যেন তারের প্যাঁচের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছি। হাত-পা আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঘুমোলে মাথার মধ্যেও তারের পাক শুধু।

তুই আর একটু ভাব রত্না। যে রাস্তায় যেতে চাইছিস, ওটা খারাপ রাস্তা। রোজগার হবে কি না তার ঠিক নেই। তাছাড়া অনেক বিপদ আপদ...!

কমপ্লেক্সের সামনের রাস্তাটার অবস্থা খুব খারাপ। তার ওপর দিয়েই বিপদের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি, মোটরবাইক ছুটছে। তার মাঝেই হেঁটে চলা লোকজন। কেউ কেউ ঘাড় উঁচিয়ে আমাদেরকে দেখছে। ওরা কেউ জানতে পারছে না, আমরা দু’জন মেয়ে আর একটা মেয়েকে খারাপ রাস্তায় নামা থেকে আটকাতে চাইছি। ওকে যাতে ঝুমুরের মতো পুলিশের হাতে না পড়তে হয় সে চেষ্টা করছি। ওকে বলি— ঝুমুরের অবস্থাটা দেখ। তুই-তো তো বললি, ও লক-আপে। ছাড়া পেল কিনা জানি না। চল বরং আমরা ঝুমুরের বাড়ি যাই। খোঁজ নিয়ে আসি।  

আকাশের চালি মেঘটা সরে গেছে। তবে সূর্যটার আর তেমন তেজ নেই। আর একটু পরেই আড়ালে চলে যাবে। আমরা দোতলা থেকে নেমে আসি। হঠাৎ দেখি ছাতিমতলায় ঝুমুর। আমরা চনমনিয়ে উঠি। ওর দিকে এগোই। ও আমাদের দেখতে পেয়ে জোরকদমে এগিয়ে আসছে।

আজ ঝুমুর সুন্দর একটা চুড়িদার সেট পরেছে। চাঁপাফুলের মতো রং। সাদা ওড়না গলায় জড়ানো। বিকেলের রোদ্দুরে ঝলমল করছে ওর বুক অবধি ঝোলানো ঝুটো পাথরের মালা। ওর ঝকঝকে চোখ, হাসিহাসি মুখ। ওকে দেখে আমাদের মনের মাঝের দুর্ভাবনাটা উড়ে যায়।

ও কাছে এসে বলে— কী রে! কেমন আছিস তোরা?

আমরা ভালো আছি। তুই?

আমি বিন্দাস! চল ফুচকা খাই। কয়েকদিন হল, ওই টেরুদা'র ফুচকা খাওয়া হয়নি। 

রত্না বলে ওঠে— হঠাৎ এত খুশি কিসের রে! দিঘার লক-আপ থেকে ছাড়া পাওয়ার আনন্দে নাকি!

রত্না দুম করে এ-ভাবে কথাটা বলবে বুঝতে পারিনি। আমি আর সুলেখা চুপসে যাই।

এই বুঝি ঝুমুর...! কিন্তু না, ঝুমুর রাগে না, দুঃখও পায় না। ও খিলখিলিয়ে হেসে বলে— তাহলে তোরাও জানিস খবরটা! ভেবে নে ওই আনন্দেই। চল চল, ফুচকা খেয়ে দোতলার ঠেকে যাব।

এতগুলো ফুচকা প্রথম খেলাম। ঝুমুর বলেছে, ‘যত খাবি খা, খরচা আমার।’

ফুচকা খাওয়া হলে, ঝালে হুশহাশ করতে করতে আমরা আবার দোতলায়। মনের মাঝে হাজারো প্রশ্ন গিজ গিজ করছে। ঝুমুর কবে ছাড়া পেল, কীভাবে ছাড়া পেল? ওর এত খুশিই বা কেন? রত্নার কৌতূহল যেন বেশি।

ও বলে— হ্যাঁ রে ঝুমুর, কেস না দিয়েই ছেড়ে দিল পুলিশ! টাকা নিয়েছে নিশ্চয়!

হ্যাঁ, ওরা তো টাকা নেওয়ার জন্যই হোটেল ‘রেড’ করে। আমার কাস্টমারের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। মান-সম্মান আর চাকরি বাঁচানোর জন্যে টাকা দিয়ে নিজে ছাড়া পেয়ে সটকান দিয়েছে দত্ত সাহেব। আমার জন্য টাকা দেয়নি।

তাহলে? তোর কাছে টাকা ছিল?

আরে বাবা, ইয়াং মেয়েদের শরীরটাই তো টাকার খনি। খুঁড়লেই টাকা। থানার বড়বাবু আর ছোটবাবু দু’জনে আমার শরীরটাকে খুঁড়ল। টাকা উসুল, ছেড়ে দিল।

কত সহজেই কথাগুলো বলে যাচ্ছে ঝুমুর। যেন এগুলো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। আমাদেরকে হজম করারও সময় দিচ্ছে না। ও এ-রকমই। এই সব কথা বলতে বলতে ঝুমুর হঠাৎ বলে ওঠে— অ্যাই! চল লুডো খেলি। অনেক দিন খেলিনি। সেই বাল্ব কারখানা বন্ধ হওয়ার পর আর...! 

ফোট! লুডোর বোর্ড, গুটি এ-সব কোথায় যে খেলব?

আরে, বোর্ড না থাক, চারজন তো আছি। মাঝখানে বোর্ড, গুটি রয়েছে ভাবলেই তো হল। নে দান চাল। আমি কিন্তু লালগুটি নেব।

ঝুমুরের খুশির তোড়ে আমরা ভেসে যাচ্ছি। কেন যে আজ এত খুশি ওর! বেশ ভালো লাগছে ওই খুশিটুকু। তাই আজগুবি হলেও ওর প্রস্তাব মেনে নিই আমরা। ও বলে— বোস, সাপসুডো খেলি।

আমরা চারজনে গোল হয়ে বসি। মাঝখানে অদৃশ্য লুডো। হাত মুঠো করে ঝাঁকিয়ে নিয়ে মুঠো খুলছি। মুখে বলছি পুট, ছক্কা, দুই...। অদৃশ্য গুটি দিচ্ছি ঘর গুণে গুণে। কখনও মই বেয়ে ওপরে উঠছি। কখনও বা সাপের মুখে পড়ে একদম ল্যাজে নেমে যাচ্ছি। 

ছেলেমানুষি খেলার নেশা ধরে গেছে আমাদের। বাল্ব কারখানার এক ঘন্টা টিফিন টাইমে লুডো খেলতাম আমরা। জোড়ায় জোড়ায় খেলতাম ফুচকা বাজি রেখে। হেরো দল খাওয়াতো। আজ হারজিতের আগেই ফুচকা খেয়েছি। ঝুমুর খাইয়েছে।

তাহলে, ঝুমুরই কি হারবে আজ! না, ও কোনওদিন হারে না, পাকা খেলুড়ে। আজও তো মই বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে চড়চড় করে। হয়তো ও-ই ফার্স্ট হবে।

কতক্ষণ আমরা খেলছি হুঁশ নেই। এর মধ্যে সূর্য উধাও। তবে মরা আলোটুকু আছে। কেমন লালচে আলো। খেলার মাঝে কথাও চলছে। ঝুমুর বলছে— জানিস, দিঘায় গিয়ে আমার বিশাল লাভ হয়েছে।  

আমরা নড়েচড়ে বসি। এবার ঝুমুরের খুশির আসল কারণটা জানা যাবে, রত্নার তর সয় না— কী লাভ রে!

লাইসেন্স পেয়ে গেছি। কলগার্লের লাইসেন্স। আর পুলিশে ধরবে না।

কোথায় পেলি?

দিঘার হোটেলে। ম্যানেজার দিল। কোন এক দীপালি দাসের। লাইসেন্স বিছানায় ফেলে বেপাত্তা। দু'দিন পরে নিউ দিঘার বালিয়াড়িতে পচাগলা লাশ। আর চাইতে আসতে পারবে না।

ওটা তো দীপালি দাসের। তুই নিয়ে কী করবি?

তাতে কী হয়েছে! ছবি তো সাঁটানো নেই। পুরুষের বিছানায় দীপালি, আমি, তুই সব সমান। তেমনি কার্ডে ছবি না থাকলে দীপালি, ঝুমুর, রত্না সব সমান। এই দেখ সেই কার্ড।

ঝুমুর তার লাল টকটকে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে কার্ডখানা বের করে রত্নার হাতে দেয়। রত্না কার্ডটা খুঁটিয়ে দেখতে থাকে।

সুলেখা বলে— কী রে, খেলা যে শেষ হল না। ‘দান’ চাল। 

আমি বলি— খেলে আর কী হবে ঝুমুর তো ফার্স্ট হয়েই গেছে। একবারও সাপের মুখে পড়েনি।

ঝুমুর ছলছল চোখে বলে ওঠে— দেখেছিস, হোম-এ ওঠার আগের ঘরে বিশাল বড় একটা সাপের মুখ। ওটা এখনও টপকাতে পারিনি। মই বেয়ে বেয়ে তো অনেক উঁচুতে উঠে গেছি। হোমের কাছাকাছি। ‘দান’ চালতে ভয় লাগছে, যদি ‘দুই’ পড়ে। এক কাজ করি চল। এই বাড়িটা কতটা উঁচু হয়েছে একটু দেখে আসি। ভয় কেটে যাবে। এসে আবার খেলব।

আমি হৈ-হৈ করে উঠি— চল চল। অনেক উঁচুতে উঠলে নীচের সবকিছু দেখতে বেশ ভালো লাগে। আর মানুষগুলোও সব একরকম লাগে।

আমরা খেলতে খেলতে উঠে দাঁড়াতেই চোখে পড়ে, ছাতিমগাছ তলায় দাঁড়িয়ে আছে রিপোর্টার ষষ্টীদা। ঝুমুর ওকে দেখতে পেয়ে পড়ি কি মরি করে দৌড়য়। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলে— তোরা আয়, আমি নিচে যাচ্ছি। ষষ্টীদার সঙ্গে আমার ভীষণ দরকার। ও আমার খোঁজেই এসেছে। এখন ওকে দিয়েই দান চালতে হবে।

আমরা নিচে গিয়ে দেখি, শুধু ষষ্টীদা নয়, ‘জবর খবর’-এর সেই শ্যামল নামের ছেলেটাও রয়েছে। ঝুমুর ওদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে চাপাগলায় কথা বলে যাচ্ছে।

আমার হঠাৎ মনে পড়ে যায় সকালে রুমির আসার কথা। ঝুমুরকে কথাটা বলা দরকার মনে হয় আমার। ওর কাছে এগোই।

সব শুনে ঝুমুর আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে— তুই যে আমার কী উপকার করেছিস, নিজেই জানিস না। তুই আমার খুব ভালো বন্ধু রে! ষষ্টীদা', শ্যামলদা'ও খুব ভালো। জানিস। ওরা আমার কত উপকার করেছে! 

আমি কিছু জানি না। তাই শোনার অপেক্ষায় ঝুমুরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। হঠাৎ দেখি, ঝুমুরের চোখের কোণে জল। ঝুমুরকে কখনও কাঁদতে দেখিনি। আমি অবাক হই।   

ঝুমুর ধরা গলায় বলে— আমি দিঘা যেতে রাজি হয়েছিলাম কেন জানিস। মায়ের চিকিৎসার জন্য রক্ত কেনার টাকা জোগাড় করতে। হাসপাতাল থেকে বলেছিল, দু’তিন বোতল রক্ত কিনতে হবে। তাই দত্ত সাহেবের সঙ্গে একরাতের জন্য দিঘা যেতে রাজি হলাম দু’হাজার টাকা পাব বলে। পরের দিন দুপুরের মধ্যে একবারে রক্ত কিনে নিয়ে ফিরব। কিন্তু সে রাতেই হোটেলে ‘রেড’ হল। আমি নিরুপায় হয়ে শ্যামলদা'কে ফোন করে মায়ের অসুস্থতার কথা জানিয়েছিলাম দিঘা থেকে। ষষ্টীদা' আর শ্যামলদা' দু’জনে মিলে রক্ত জোগাড় করে হাসপাতালে দিয়ে এসেছে। ওদেরকে ফোন না করলে তোরা জানতেই পারতিস না আমি দিঘা থানার লক-আপে।  

রত্না বলে— হ্যাঁ, শ্যামলদার সঙ্গে ধর্মতলায় দেখা হয়েছিল আমার। শ্যামলদাই আমাকে বলল তোর কথা।

সুলেখা বলে— রত্নার মুখ থেকেই আমরা শুনেছি। 

ঝুমুরের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে ওর উচ্ছ্বাস আর খুশির তোড়ে এমন ভেসে গিয়েছিলাম যে ওকে ওর মায়ের কথা জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি আমরা। অপরাধ ও লজ্জা মেশানো স্বরে বলি— তোর মা এখন কেমন আছে?

ঝুমুর খুব স্বাভাবিক গলায় বলে— মা বোধহয় বাঁচবে না আর! কর্মফল তো ভোগ করতেই হবে, নাকি বল!

আমরা কী বলব ভেবে পাই না। ঝুমুর কেমন আনমনা হয়ে খালে ফুটে থাকা কচুরিপানা-ফুলের দিকে তাকিয়ে বলে—  আমি কিন্তু মরব না এত সহজে। আমাকে বাঁচতেই হবে রে! আর যদি মরতেই হয়, মেরে মরব। জলে যখন নেমেছি, শেষ দেখে ছাড়ব।

ঝুমুরের শেষের দিকের কথাগুলো কিছুই বুঝতে পারি না। তাই ওর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি আমি, রত্না আর সুলেখা।

 

এগারো

সকাল থেকেই মনের মধ্যে কেমন একটা ভালোলাগা ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু ভালোলাগাই নয়; কোনও অজানা বিষয় জানতে পারব, এমন এক কৌতূহলও রয়েছে মনের মধ্যে। কোনও উপহার-পাওয়া বাক্সের মোড়ক খোলার আগে মনে যেমন আগ্রহ ও কৌতূহল থাকে, অনেকটা সেরকম। 

কাল সুলেখা কথায় কথায় বলেছিল, আমাকে নাকি একজন পছন্দ করেই রেখেছে। সেই ‘একজন’ বলতে ও কার কথা বোঝাতে চেয়েছে। সুভাষদা', নাকি ওর মায়ের কথা! ওর মা তো সেদিন হাসপাতালের বেডে বসেই বলেছিল, 'তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে, বাড়িতে আসবে।' অবশ্য এ ‘পছন্দ’ আর সুলেখাকে পাত্র পক্ষের ‘পছন্দ করা’, এ দুটোর মধ্যে বিস্তর তফাৎ।

আমার কথাবার্তা, চালচলন সুলেখার মায়ের বেশ ভালো লেগেছে, তাই পছন্দ বলেছে হয়তো। এটা তো একটা সাধারণ কথা! মানুষকে মানুষের ভালো লাগতেই পারে। তবে, সুভাষদা' যদি বলত, ‘তোমাকে আমার খুব পছন্দ’ তার মানেটা কিন্তু অন্যরকম দাঁড়াত। 

সুভাষদা' কথাটা বলবেই বা কখন! ওর সঙ্গে একা দেখা সাক্ষাৎ হল আর কোথায়! সেদিন হাসপাতালে ফেরার সময় তো সুলেখা ছিল সঙ্গে।

গত রবিবার মডার্ন সেলুনে দেখা হয়েছিল। সেখানে তো হিপিদা' কান খাড়া করে রয়েছে। বিকেলে কংক্রিট ব্রিজে দেখা করবে বলল, সেটাও শুনে ফেলেছে। তাছাড়া ওরকমভাবে লোকজনের মাঝে একটা ইয়াং ছেলে অল্প চেনা একটা ইয়াং মেয়েকে দুম করে বলতে পারে, ‘তোমাকে আমার পছন্দ’, কিংবা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। যদি সেদিন ঠিক সময়ে কংক্রিট ব্রিজে পৌঁছতে পারতাম, তাহলে হয় তো...!

নিশ্চয় কোথাও কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলার জন্যে বিকেল চারটের সময় ওখানে থাকতে বলেনি। তেমন হলে তো তখন সেলুনেই বলতে পারত। আমিও এমন কেবলি, সময় মতো পৌঁছতেই পারলাম না।

ওই দুপুরবেলা ঘুমনোটাই কাল হল। ঘুমোলাম ঘুমোলাম, স্বপ্নটা না দেখতে পারতাম! কী যে মনটা না ছাই, খালি স্বপ্ন দেখি। তুবও যদি ভালো কিছু দেখতাম স্বপ্নে! কী বিচ্ছিরি একটা স্বপ্ন!

খালপাড়ের বস্তির মধ্যে হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চাইছিল সুভাষদা' না যতুদা' কে যেন! আমার হাত ধরে কখনও কেউ ও-ভাবে টানেনি, তবুও কেন যে স্বপ্নের মধ্যে এসব...! 

সুভাষদা'দের বাড়ি তো খালপাড়ের বস্তি নয়। আমাদের মতো ওদেরও নিজের বাড়ি। পাকা দেওয়াল, মেঝে।  অ্যাসবেসটাসের চাল। যদিও আমি ওদের বাড়িতে যাইনি কোনওদিন। রত্না একদিন দূর থেকে দেখিয়েছিল সুলেখাদের বাড়িটা।

আমাদের চেয়ে ওদের অবস্থা একটু ভালো। শুনেছি সুলেখার বাবা ন্যাশনাল রাবার ফ্যাক্টরিতে চাকরি করত। ওটা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে সমস্যায় পড়েছিল। অনেকদিন অবস্থান, গেটমিটিং, হেড অফিসে দৌড় ঝাঁপ করার পর এককালীন টাকা পেয়েছে বেশ কিছু। সেটা দিয়েই হয়তো সুলেখার বিয়ে দেবে।   

সুভাষদা' চারজনের সংসারটা কোনও রকমে চালিয়ে নেয়। সুলেখা ফ্যান-কারখানায় কাজ করে খারাপ রোজগার করে না। শুনেছি, ওর মা-ও ঘরে বসে থাকে না। অবসর সময়ে স্টিকার কাটা-র কাজ করে। একশোখানা স্টিকারের পাতা কাটলে ত্রিশটাকা। ওই স্টিকারগুলো নাকি রেডিমেড পোশাকে সাইজ আর দাম লেখার জন্য সাঁটানো হয়।

সুলেখা এক দিন কথায় কথায় বলেছিল, ওদের বাড়িতে কালার টিভি আছে, কেবল কানেকশনও আছে। একবার পুজোর বোনাস পেয়ে একটা ডি.ভি.ডি. প্লেয়ার কিনেছে ওর দাদা। মাঝে মাঝে সিডি ভাড়া নিয়ে এসে সিনেমা দেখে ডিভিডি লাগিয়ে। ভালোই হবে, রোজ অনেক সিনেমা দেখা যাবে। কাজরির বর মন্টুদা’র মতো সুভাষদা'ও বোধহয় বউকে কাজ করতে দেবে না। সারাদিন বাড়িতে...!

ধুস, কী যে সব ছাতার মাথা ভাবনা আসে না মাথায়! কোথায় কী তার ঠিক নেই। মেয়েরা দেখতে শুনতে একটু ভালো হলেই ছেলেরা একটু হেসে কথা বলতে চায়। ঘনিষ্ঠ হতে চায়। এতে ভেবে নেওয়ার কোনও মানেই হয় না যে, সুভাষদা'  আমার সঙ্গে প্রেম করতে চায়। বড়বাজারের মতো জায়গায় ও কাজ করে। কতজনের সঙ্গে ওর চেনাজানা। অন্য কারুর সঙ্গে ও প্রেম করতেই পারে। তেমন হলে তো রবিবারে কংক্রিট ব্রিজের ওপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারত! তা তো করেনি!

দেখা যাক, আজ তো যাচ্ছি ওদের বাড়ি। থাকবও অনেকক্ষণ। শুনেছি পাত্রপক্ষর সঙ্গে কথা বলার জন্য সুভাষদা'ও একবেলা ছুটি নেবে আজ। কিছু বলুক না আর না বলুক হাবেভাবে তো বোঝা যাবে কিছুটা। 

সকালে মাকে সত্যি কথা-ই বললাম, সুলেখাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে আজ। সুলেখা আর ওর মা যেতে বলেছে একটু করে-কম্মে দেওয়ার জন্যে। দুপুরে ওখানেই খাওয়া-দাওয়া হবে। বিকেলে ফিরব। 

দেখলাম, মা আপত্তি করল না। বরং বলল— ঝোড়ো কাকের মতোন যেও না। লোকের বাড়ি যাচ্ছ, একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে, ভালো পোশাক পরে যেও।

সকালের দিকের কাজকর্ম্মগুলো জলদি-জলদি সেরে ফেললাম। তারপর চুলে শ্যাম্পু দিলাম। পাশের বাড়ির তপিদি কিছুদিন বিউটি পার্লারে কাজ করেছে। ওর কাছে গিয়ে, কুড়ি টাকা দিয়ে ভ্রূ প্লাক করে এলাম। 

অনেকদিন আগে বাল্ব কারখানায় চন্দনদা বলেছিল, প্লাক করা দুই ভ্রূর মাঝখানে মেরুন রংয়ের টিপ পরলে আমাকে খুব ভালো দেখায়। আমার এখনও মনে আছে কথাটা। তাই মেরুন টিপও কিনে আনলাম একপাতা। কোন সালোয়ার কামিজটা পরব ঠিক করতে পারছিলাম না। মাকে জিজ্ঞেস করতে, মা বাক্স থেকে একটা শাড়ি বের করে দিয়ে বলল— এই শাড়িখানা পরে যা। শাড়ি পরলে তোকে ভালো লাগে। 

মেরুন রংয়ের সিল্ক শাড়ি। হয়তো মায়ের বিয়ের সময়ের। তবু এখনও বেশ ঝকঝকে। দেখে পছন্দ হয়ে গেল শাড়িটা। কিন্তু সমস্যা হল, শাড়ি আমি ভালো পরতে পারি না। আমার আনাড়িপনা দেখে মা শাড়িখানা পরিয়ে দিল সুন্দর করে।

মায়ের এ হেন ব্যবহারে অবাক হচ্ছি। সকালের দিকেই বেরিয়ে যাচ্ছি আমি। রান্নার সময় কুটে-বেঁটে দিতে পারব না আজ। একাই সবকিছু করতে হবে মা-কে। তবুও মায়ের মুখ গোমড়া হয়নি।

মায়ের সিল্ক শাড়ি, ম্যাচিং ব্লাউজ, মেরুন টিপ আর কিছু ইমিটেশন গয়নার সাজগোজ সেরে যখন মায়ের সামনে দাঁড়ালাম, মায়ের চোখেমুখে খুশি উপচে পড়ছে। নিজেকে বড় আয়নায় খুব দেখার সাধ হচ্ছিল। 

কিন্তু আমাদের বাড়িতে তো ড্রেসিং টেবিল নেই, বড় আয়নাও নেই। তবুও যা দেখার তা যেন আমি মায়ের চোখের আয়নাতেই দেখে নিলাম। বেরোনোর আগে মা আমার বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলটা দাঁতে কেটে আমার কপালে ঠেকিয়ে দিয়ে বলল— যা, খুব চটর পটর করে কথা বলিস না যেন। সন্ধে লাগার আগে ফিরে যাবি।

মায়ের কাণ্ডকারখানা দেখে হাসি পেয়ে যায় আমার। মায়ের এমন ভাবখানা, যেন আমাকেই দেখতে আসছে পাত্রপক্ষ। ন’টায় বেরোব ভেবেছিলাম। কিন্তু রেডি হয়ে বেরোতে বেরোতে সাড়ে ন’টা বেজে গেল। যেতে যেতে সেই কোন ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল আমার। তখন সবে ইস্কুলে ভর্তি হয়েছি। মা রোজ এমনটা করত, যাতে কারুর নজর না লাগে। আমি ভাবি আজও তো মা আঙুল কামড়ে তুক করে দিল যাতে কারুর নজর না লাগে। কিন্তু আমি তো মনে মনে চাইছি নজর লাগুক, অন্তত একজনের, সুভাষদা’র।   

পরক্ষণেই মনে হয়, আমি কি টুসিকে দেখে কিংবা সুলেখার কথা ভেবে বিয়ের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছি! নাকি খুব প্রেম করার ইচ্ছা হয়েছে আমার! আমি তো এমন ছিলাম না! সেই যতুদা' আসার পরদিন থেকেই দেখছি আমার মনটা কেমন পালটে যাচ্ছে। যতুদা' আমাকে ছুঁয়ে অদ্ভুত একটা শিহরণ জাগিয়ে দিয়েছিল বলেই কি! এবারে যতুদা' এসে আমাকে যেন কিশোরী থেকে যুবতীতে বদলে দিয়ে গেছে। নাকি ছোট কাকার ঘরে বিছানার তলায় পাওয়া ম্যাগাজিনটার ছবিগুলোই এর জন্য দায়ী! যাকগে, মরুক গে। এত ভাবতে পারি না। আমি তো আর ‘প্রেম করব প্রেম করব’ বলে নেচে বেড়াচ্ছি না। কারও ভালো লাগলে, কেউ হাবেভাবে প্রেম করতে চাইছে বুঝলে তখন দেখা যাবে। ভালো লাগলে কথা বলব, না লাগলে পাত্তা দেব না। মিটে গেল। আচ্ছা, যদি সুভাষদা' হাবেভাবে বোঝায় যে আমাকে ওর ভালো লেগেছে, তখন কী করব আমি! আমিও কি বোঝাবো যে, তোমাকেও আমার ভালো লেগেছে।  

আদৌ সুভাষদা'কে আমার ভালো লাগে কি না, সেটাই তো বুঝতে পারি না ছাই। ও নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে কথা ব’লে, বাল্ব কারখানায় আমার কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। এর জন্য আমি ওর কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু কৃতজ্ঞতা আর প্রেম তো এক জিনিস নয়। ও এমন কিছু আহামরি সুপুরুষও নয়। হাইফাই চাকরিও করে না। করে তো কাপড়ের দোকানে কাজ। তাতেই কী অহঙ্কার! সেদিন আমার যেতে একটু দেরি হয়েছে; অমনি চলে গেছে।

ধুস! কী যে সব উৎপটাং ভাবনা আসে না মাথায়। এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে কখন সুলেখার বাড়ির কাছে চলে এসেছি। বাড়ির ভেতর ঢুকতে একটু ইতস্তত করছি। এমন সময় পেছনে গম্ভীর গলা শুনতে পাই— দেবীজির ভেতরে যেতে আজ্ঞা হোক! 

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সাইকেল চড়ে সুভাষদা'। বাজার-টাজার গিয়েছিল বোধহয়। সাইকেলের হ্যান্ডেলে দু’পাশে দুটো ব্যাগ ঝোলানো দেখছি। ও আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।

আমি বলি উঠি— দেখুন, আমি দেবী নই, মানবী। আর এটা দেবীর মন্দির নয়, মানুষের বাড়ি।

আমার কথায় হো হো করে হেসে ওঠে সুভাষদা— বেশ বলেছ! চল চল ভেতরে চল। তোমার বন্ধু অধীর আগ্রহে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।

আমি বলি— আমার জন্যে না ছাই! ও অপেক্ষা করছে সেই তাদের জন্যে। আপনি আগে চলুন, আমি পেছনে যাচ্ছি।

ও ভালো কথা! এ বাড়িতে ঢুকতে গেলে একটা শর্ত আছে। আমাকে আপনি-আপনি বলা চলবে না, তুমি বলতে হবে।

তাই নাকি! বেশ! তুমি চল, পেছনে আমি যাচ্ছি।

সাইকেলের পেছন পেছন যেতে যেতে ভাবি, সত্যিই কি আমার ওপর কোনও দেবী-টেবি ভর করেছে নাকি! এত চটপটে কথা তো আমি বলতে পারি না। মাথাতে সঙ্গে সঙ্গে আসেও না। পরে মাথায় আসে। তখন ভাবি, ইস, তখন বললাম না। আজ যেন অন্যরকম! ঠোঁটের ডগায় কথা রেডি হয়ে আছে। শাড়ি পরলে বুদ্ধি বেড়ে যায় বোধহয়!

আমার গলা শুনে সুলেখা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমাকে দেখে ও কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে। তারপর হেসে বলে— ওরা আসছে দেখলেই তোকে একটা ঘরে পুরে শেকল তুলে দেব। ওরা চলে গেলে খুলব।

আমি কপট ভয় পেয়ে বলি— কেন রে, আমাকে বন্দি করবি কেন?

করব না! তোকে দেখতে এত সুন্দর লাগছে, ওদের চোখে পড়লে আমাকে আর দেখতেই চাইবে না!

যা ভাগ! ফাজিল কোথাকার!

বারান্দায় সুলেখার মা বসে চা তৈরি করছিলেন। আমাকে দেখে বলে ওঠেন— ও মা, আমি প্রথমে চিনতেই পারিনি। একবারই দেখেছি তো! সেদিন চুড়িদার পরেছিলে। আজ শাড়ি পরেছ! বেশ মিষ্টি লাগছে তোমাকে। এসো মা এসো!

আমি সুলেখার সঙ্গে ঘরে ঢুকি। ওটা সুলেখার মায়ের ঘর। সুলেখা বলে— এ-ঘরে আমি আর মা শুই। মাঝের ঘরটাতে বাবা। আর ওই দক্ষিণ দিকের ঘরটাতে দাদা থাকে।

আমি হ্যাঁ-হুঁ, তাই বুঝি, এসব বলে সুলেখার সঙ্গে কথা চালিয়ে যেতে থাকি। কিন্তু আমার মাথায় ঘোরে, যার প্রশংসা শোনবার জন্য এত ভালো করে সাজলাম, সে তো এ ব্যাপারে একটা কথাও বলল না। অথচ সেদিন হাসপাতালে...!

সুলেখা এবার বকবকানি থামিয়ে বলে— সীমা, এবার আমাকে তোর চেয়েও সুন্দর লাগে এমনভাবে সাজিয়ে দে তো! যেন এক দেখাতেই...!

হঠাৎ ও কথা থামিয়ে দেয়। যেন লজ্জা পেয়েছে, ভাবখানা এমন। আমি বলি— দাঁড়া, পাত্তরটা আসুক, আগে দেখি। ওকে আগে আমাদের পছন্দ হলে, সেই বুঝে সাজাব। 

ও দেখতে খারাপ হলে কি খারাপ করে সাজাবি?

হ্যাঁ, ওকে তোর পছন্দ হল না, অথচ ওর পছন্দ হয়ে গেলে তো মুশকিল। যদি বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। তখন...!

দাঁড়া, অত সহজ ভাবিস না বিয়ের ফাইনাল হওয়া। শুধু দেখনদারি নয় রে! পরে গুণবিচারি, তারপরে পয়সাকড়ি, সোনাদানা, খাটবিছানা, দানসামগ্রী, বরযাত্রী, দেনা-পাওনা সবকিছু মনমতো হলে তবেই না!

আমিও একমত হই সুলেখার সঙ্গে— তা যা বলেছিস! খালি হাতে কনে নিতে কেউ চায় না, তা সে যতই সুন্দরী হোক না!

কথাটা বলেই আমি নিজের মনে পস্তাই, ইস, কেন বলতে গেলাম কথাটা। আমাকে দেখে যদি সুভাষদা' কিংবা ওদের বাড়ির সকলের পছন্দ হয়, তবুও টাকা-পয়সা দিতে রাজি, এটাই তো মানে দাঁড়ায়।

সুলেখার বাবার মতো আমার বাবার তো জমানো টাকা নেই! তাই আবার আমি বলে উঠি— প্রেম করে বিয়ে করলে আলাদা ব্যাপার! তখন দেওয়া-থোওয়ার ব্যাপার থাকে না। ‘রেজিস্ট্রি’ কিংবা কালিঘাট তো আছেই।

সুলেখা বলে, ঠিক বলেছিস। তখন হল গিয়ে ‘মিঁয়া-বিবি রাজি তো কেয়া করেগা কাজি।’ দে, আমার চুলটা একটু ফাঁস ছাড়িয়ে দে তো!

আমার পক্ষে যতটা সম্ভব ততটা সুন্দর করে তোলার চেষ্টা করি সুলেখাকে। আমি মনে প্রাণে চাই সুলেখাকে দেখে পছন্দ হয়ে যাক পাত্রপক্ষের। ওর বিয়ের ঠিক হলে আমি সত্যিই খুশি হব। সত্যি-মিথ্যা জানি না, আমার মনে হয় মেয়েরা যতই চাকরি করুক না কেন, নিজের পায়ে দাঁড়াক না কেন; তার বিয়ে যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ যেন তার বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা যায় না। মেয়েদের জীবনটা যেন বিয়েতেই সম্পূর্ণতা লাভ করে। অথচ ছেলেদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো। ওরা বিয়ে করুক না করুক, চাকরি কিংবা ব্যবসা অথবা ডাক্তারি, ওকালতি এসব করে টাকা উপার্জন করতেই হবে। নিজের পায়ে দাঁড়ানো অর্থাৎ রোজগেরে হতেই হবে। 

রুমি কী যেন একটা কথা বলে! ছেলেতান্ত্রিক... না না, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ! কী গালভরা নাম! পুরুষরাই নাকি সমাজকে শাসন-টাসন করে এসব বলে ওই রুমি। কেন জানি না, আমর মনে হয় উলটোটাই ঠিক। পুরুষগুলোকে গাধার মতো খেটেখুটে টাকা রোজগার করে আনতে হয়। আর মেয়েরা ঘরের বউ হয়ে গ্যাঁটসে বসে খাবে। মেয়েরা খাটে না তা নয়, সংসার থাকতে গেলে সংসারের কাজকর্ম তো করতেই হবে। ওটা সাধারণ। কিন্তু টাকা কোত্থেকে আসবে তার চিন্তা নেই, মেয়েরা হুকুম করেই খালাস, শাড়ি আনো, গয়না আনো, চাল আনো, ডাল আনো, মাছ আনো, মাংস আনো। পুরুষগুলো যেভাবেই পারুক তা জোগাড় করে আনে। মেয়েরা যেন মহারানি, পুরুষ তার গোলাম! শুধু তাতেও শান্তি নেই, সারাদিন খাটা-খাটনির পর শরীরি সুখ দাও মহারানীকে।  

ঝুমুর একদিন কথায় কথায় বলছিল, ‘কাজরি ওর বর মন্টুকে ছেড়ে দিয়েছে কেন জানিস! ওকে শরীরি সুখ দিতে পারে না বলে। 'আমি ব্যাপারটা ভাসাভাসা বুঝেছিলাম। ও ব্যাপারে আমার জ্ঞানগম্যি ওই যতুদা'র খচরামি পর্যন্ত। ঝুমুর খোলসা করেছিল। ‘মন্টু তো সেই ভোর পাঁচটা থেকে রাত দশটা অবধি বাসে কন্ডাক্টারি করে। সারাদিন দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে, ভিড় ঠেলে, চিৎকার করে ক্লান্ত হয়ে যায় বেচারা। রাতে ভাতটা পেটে পড়লেই চোখ জড়িয়ে আসে ঘুমে। আবার ভোর হতে না হতেই ফাস্ট বাস বের করার জন্যে উঠে পড়তে হয়। করবে কখন। ওই সপ্তায় এক-আধদিন। এতে কাজরির শরীরের আগুন নেভে না বলেই....’! 

শরীরের আগুনের জ্বালাটা কেমন তা আমি এখনও ঠিকঠাক জানি না। ওই ঝুমুর, রত্না ওদের মুখে শুনে যেটুকু বুঝেছি। তবে, সিনেমায়, সিরিয়ালে যখন একটা ছেলে একটা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদর-টাদর করে, চুমু খায়; তখন মনে হয় আমাকেও যদি কেউ অমন আদর করত, বেশ হত। মনটা একটু উসখুস করে এই অবধি। অন্য ‘সিন’ দেখতেই আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যায়। এটাকে 'আগুন' বলে কিনা আমি জানি না। তবে আমার মনে হয়, জ্বালা না বলে এটাকে সুড়সুড়ি বলাই ভালো। তো মেয়েদের এই সুড়সুড়ুনিও মেরে দেয় পুরুষেরা। তবুও রুমি বলে নাকি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। আরে বাবা! মেয়েরা যদি পেটে বাচ্চা না ধরে, মানুষ যদি না বাড়ে, তাহলে সমাজটা থাকবে কোথায়! সমাজটা তো তৈরি করে মেয়েরাই। হ্যাঁ, তাতে ছেলেদেরও গা-ঘামানো ব্যাপারটা থাকে। বলা ভালো, পুরুষ-মহিলা মিলেমিশে মানুষ তৈরি করে। তাদেরকে বাবা-মা, মাস্টারমশাইরা শিখিয়ে পড়িয়ে বড় করে, সমাজ হয়। মাস্টার তো আর শুধু ছেলেরা হয় না। মেয়েরাও হয়। এখন দিদিমনি তো দলে দলে যায় দেখি। তারাও ছাত্তরদেরকে শাসন করে, ভালোবেসে, শিখিয়ে পড়িয়ে সমাজে চলার মতন তৈরি করে দেয়। শুনি মেয়েরা নাকি এখন প্লেনও চালাচ্ছে।

বরং আমার মনে হয়, পুরুষরাও সমাজকে শাসন করে না, মেয়েরাও শাসন করে না। এখন সমাজকে শাসন করে পার্টির লোকেরা, আর ওদের চ্যালাচামুণ্ডারা। সে পুরুষই হোক আর মহিলাই হোক। যতরকম হুমকি-ধমকি ওরাই তো দেয়। পার্টির নেতা বা তাদের চামচা ছাড়া কোন মানুষটা আর স্বাধীনভাবে কিছু করতে পারে! ওই যে বোম-রতন, ঝুমুরের সঙ্গে পড়ত এক ক্লাসে! ও এখন পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে মস্তানি করছে, আর ছোটবেলাকার ‘ক্লাস ফ্রেন্ড’ ঝুমুরকেই শাসাচ্ছে। পার্টি-ফার্টি খুব খারাপ জিনিস বলেই মনে হয় আমার। এতে ভাইয়ে-ভাইয়ে মারামারি, বন্ধুতে বন্ধুতে লাঠালাঠি, পাড়া-প্রতিবেশিতে খুনোখুনি অবধি হয়ে যাচ্ছে।

ছোটকাকা অবিশ্যি বলে, 'প্রত্যেক মানুষেরই রাজনীতি করা উচিত। তাতে দেশ উন্নত হয়।’ আমি এক দিন বলেছিলাম, 'উন্নত হয় না ব্যাঙের মাথা হয়। রাজনীতি করতে গিয়ে কারও বউ বিধবা হচ্ছে, কারুর ছেলেমেয়ে বাপ-হারা মা-হারা হচ্ছে। ও করে কী উন্নতি হবে’! 

ছোটকাকা বলেছিল, 'সে তো রাজনীতির নোংরামির জন্যে। তার জন্যে আমরাই দায়ী। বড়লোক হওয়ার লোভ, ক্ষমতার লোভ আর তার অপব্যবহার, এসবের জন্যে ওই খুনোখুনি মারামারি। সত্যিকারের রাজনীতি তো আর ওই সব করতে শেখায় না। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী, দেশবন্ধু ওঁরা কি রাজনীতি করেননি! আমরা ওদের পুজো করি কেন! ওঁরা স্বার্থত্যাগ করেছিল বলেই তো।’

ছোটকাকা হয়তো আরও কিছু বলত। আমি দুম করে বলে ফেলি, 'তুমি তো নিঃস্বার্থ হয়ে পার্টি করছ না। মাস্টারি চাকরি বাগানোর জন্য ওদের সঙ্গে ঝাণ্ডা নিয়ে মিটিং মিছিলে যাচ্ছ! তাহলে...!'  

ছোটকাকা আর কিছু বলেনি। রেগে উঠে গিয়েছিল। যেতে যেতে বলেছিল, ‘এবার নেলপালিশ, চুলের ক্লিপ কেনার জন্য টাকা চাস, দেব ভালো করে!' আমার বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, 'ছোটকাকা, ওই তো তুমি ক্ষমতার অপব্যবহার করছ।' কিন্তু বলিনি। সত্যি সত্যি রেগে গেলে কাকা আর টাকা দেবে না। আমি প্রয়োজন মতো নেলপালিশ, লিপস্টিক কিনতে পারব না।

সুলেখাকে সুন্দর করে সাজানোর পর সবশেষে নেলপালিশ লাগিয়ে দিলাম ওর হাত-পায়ের নখে। বললাম— মিনিট পাঁচেক চুপচাপ বসে থাক। নেলপালিশটা শুকোক।

ড্রেসিং টেবিলের বড় আয়নার সামনে সুলেখা দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। তারপর বলে— সীমা! তুই যে এত সুন্দর সাজাতে পারিস জানতাম না আমি। এবার শাড়িটা পরিয়ে দে তো! ওরা একটু সেকেলে ধরনের। বলেছে, সালোয়ার কামিজ, চুড়িদার ওসব চলবে না। শাড়ি পরিয়ে মেয়ে দেখবে।

এবার আমার ফেল করার পালা। শাড়ি পরানো দূরের কথা, নিজেই পরতে পারি না ঠিক করে। সুলেখাকে বলি, সত্যিই ওরা সেকেলে রে! এখনকার দিনে কেউ ঘটের মতো শাড়ি পরানো অবস্থায় মেয়ে দেখে! আমার পাশের বাড়ির বন্ধু টুসিকে যখন দেখতে এসেছিল, আমিই সাজিয়ে দিয়েছিলাম। ও তো পাত্রপক্ষের সামনে হাজির গাউন-ফ্রক পরে চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে। যেন আত্মীয়-স্বজনদের চা দিচ্ছে। চা দেওয়ার পাট চুকলে ওদের সামনে একটা চেয়ারে বসে গল্প জুড়ে দিল ওদের সঙ্গে।

সুলেখা বলে— ওটা তো হিন্দি সিনেমার স্টাইল। এরা হিন্দি সিনেমা দেখে কিনা সন্দেহ আছে।

সে কী রে! ছেলেটাও ওইরকম নাকি?

তা জানি না।

কী করে ও?

অ্যাকাডেমি হল আছে না, রবীন্দ্রসদন আর তারামণ্ডলের মাঝখানে; ওই হলের লাইটম্যান ও।

তাহলে ও-রকম রদ্দিমার্কা হবে না, ভালোই হবে। ওই হলে শুনেছি আজকালকার থিয়েটার-ফিয়েটার হয়। সে-সব তো দেখে। মডার্ন হওয়া তো উচিত। আর যদি মডার্ন না হয়, তুই মডার্ন করে নিবি।

বেশ ডায়লগ ঝেড়েছিস, এবার শাড়িটা পরা। ওদের আসার সময় হয়ে গেল।

অনেক কসরত করে অবশেষে মাসিমার সাহায্য নিয়ে শাড়ি পরাই সুলেখাকে। একসময় পাত্রপক্ষ আসে। ওদের আদর-আপ্যায়ন শুরু হয়। আমি আর সুলেখা পাশের ঘরে! ওদের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সুলেখা বলে— সীমা, আমার বুক ঢিপ ঢিপ করছে রে! যদি উল্টো-পাল্টা প্রশ্ন করতে থাকে!  

এ কী তুই চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছিস নাকি! যে উল্টো-পাল্টা প্রশ্ন ধরবে! সংসারের কাজে যে সমস্ত দরকার লাগে, সেসব শুধোবে। আজকাল আর আগেকার দিনের মতন কূটকচালি করে না।

হ্যাঁ রে সীমা, তুই ওকে দেখলি? কেমন দেখতে রে?

খুব ভাল করে দেখতে পাইনি। ঢোকার সময়ই যা একঝলক দেখলাম। মন্দ নয়। লম্বা, ফর্সা, তবে একটু রোগা। যদি বলিস তো পাশের ঘরে গিয়ে একবার ভালো করে দেখেশুনে আলাপ করে আসি!

সুলেখা আমার হাত চেপে ধরে— না না, তুই আমাকে ছেড়ে যাস না। আগে দেখাশোনা হয়ে যাক, তারপর গিয়ে আলাপ করিস!

একসময় সুলেখা পাশের ঘরে গিয়ে ওদের সামনে বসে। এ ঘর থেকে আমি শুনতে পাই ওদের কথাবার্তা। কত রকমের কথা হতে থাকে। শুনতে শুনতে আমি কেমন আনমনা হয়ে যাই। ভাবি, আমাকেও কোনও দিন ওই রকম জবুথবু হয়ে সেজেগুজে কারুর সামনে বসতে হবে তাদের পছন্দ হওয়ার জন্যে! নাকি সুলেখার কথাটাই সত্যি হবে! যদি সুলেখার কথা সত্যি হয়, তাহলে মন্দ হয় না। সুভাষদা'কে আমার বেশ লাগে। মাসিমাও খুব ভালো। বাড়িঘর খুব ভালো না হলেও আমাদের চেয়ে ভালো। গোটাচারেক ঘর আছে। দু’খানা বাথরুম। একটাতে আবার কমোড বসানো। ওর বাবার জন্যে! বাবার নাকি হাঁটুতে বাত। ভালো করে চলাফেরা করতে পারে না। টয়লেটে বসতেও কষ্ট হয়, তাই ওই ব্যবস্থা।

এসে থেকে সুলেখার বাবার সঙ্গে আলাপ হল না। আসলে, সুলেখা নিয়েও যায়নি বাবার সঙ্গে আলাপ করাতে। যাওয়ার আগে আলাপ করে যেতে হবে। যদিও জানি, আমার বাবার মতো কিছুতেই হবে না। আমার বাবা সত্যিকারের একজন ভালোমানুষ। তবে, মাসিমাকে আমার ভালো লেগেছে। বেশ আপন-আপন। কথা বলতে ইচ্ছে করে ওর সঙ্গে। সুভাষদা'র সঙ্গেও দু’একটা কথা ছাড়া তেমন কোনও কথা হয়নি। ওর সঙ্গে একদিন সুভাষ সরোবর যেতে হবে। জমিয়ে গল্প করতে হবে। তাহলেই বোঝা যাবে ও কেমন!

এ-সব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি, সুভাষদা' এ ঘরে ঢুকেছে। ভাবলাম হয়তো কোনও জিনিস নিতে। কিন্তু না, ও খাটে বসে বলে— রবিবারে কংক্রিট ব্রিজে আসার কথা ছিল, এলে না কেন? 

এলে কী হত?

এলেই বুঝতে পারতে কী হত?

অমি এসেছিলাম তো! আপনিই ছিলেন না।

আবার আপনি!

ও! তুমি ছিলে না।

সোয়া চারটে অবধি ছিলাম, তারপর চলে গেছি। ওদিক দিয়েই সুলিটা তোমাদের ছাতিমতলার ঠেকে যায় তো! ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে কী ভাবত!

ও জানে তো!

কী জানে?

তুমি যে আমাকে...জানি না যাও।  

সুভাষদা' আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে। আমি মাথা নিচু করে রয়েছি। কেন যে এত লজ্জা লাগছে! ওকে হিপিদা'র সেলুনে দেখলে তো লজ্জা লাগে না। হয় তো একা বলেই। এটা লজ্জা নাকি ভয়, সেটাও ঠিক বুঝতে পারছি না।

ও বলে— কী হল, চুপ করে আছ যে? 

কী বলব! আমি ঘরে একা, তুমি এলে। কেউ কিছু মনে করবে না?

কেন মনে করবে কেন? আমরা খারাপ কিছু করছি নাকি!

তা করছি না, তবুও যদি লোকে ভাবে!

লোক বলতে তো মা আর সুলি। ওরা কিছু মনে করবে না। আর বাবা এসবে চোখ কান দেয় না। দিনরাত শুধু গান শোনে। রাগপ্রধান গান।

জান, সেদিন আমি দুপুরে শুয়ে একটা স্বপ্ন দেখেছি। ওই স্বপ্ন দেখতে দেখতেই ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে গেল। তাই দেখা হল না।

কী স্বপ্ন?

এখন বলা যাবে না, পরে বলব।

পরে কবে?

যেদিন বলবে।

সামনের রবিবার। ওখানেই, কংক্রিট ব্রিজে। এবার কিন্তু ঘুমিয়ে যেও না।

না, ওখানে নয়, সুভাষ সরোবর।

ঠিক আছে, সুভাষ সরোবরের কোন জায়গায়?

আমি এক-আধবার সুভাষ সরোবর গিয়েছি ঝুমুর, সুলেখার সঙ্গে। ওখানে তেমন কিছু চিনি না। তুমি যেখানে বলবে।

দেখবে ওখানে ‘বনবিতান’ নামে একটা গার্ডেন আছে। গার্ডেনের ভেতরে ঢুকে যাবে। গার্ডেনের মাঝে একটা চাতাল আছে। ওখানে থাকব আমি।

ঠিক আছে, এখন তুমি যাও আমার ভয় করছে। ও-ঘরে সুলেখার দেখাশোনা হয়ে গেছে এতক্ষণে। ও চলে আসবে।

আসুক না! তাতে কী!

তাতে অনেক কিছু। তুমি যাও তো এখন। 

সুভাষদা' ভ্রূ তুলে অদ্ভুত একটা ইঙ্গিত করে হেসে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। যাওয়ার আগে ছোট্ট করে বলে যায়— মেরুন  শাড়িতে তোমাকে দারুণ লাগছে। 

সুভাষদা' ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি কিছুক্ষণ কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকি। আমি যে সুলেখাদের বাড়িতে রয়েছি, পাশের ঘরে সুলেখাকে পাত্রপক্ষ দেখছে, এসব মাথাতেই নেই। মনের মধ্যে শুধু সুভাষদা' আর ওর কথাগুলো। কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হলে ভাবি, এটাকেই কি প্রেম বলে! নাকি অন্য কিছু! আমি ভাবি, সেদিনকার স্বপ্ন আর আজকের বাস্তবের মধ্যে কত তফাৎ। আচ্ছা! আমি সুভাষ সরোবরে গিয়ে ওই স্বপ্নটার কথা ওকে বলতেই পারব না। বানিয়ে-বানিয়ে বলতে হবে কিছু একটা। কিংবা বলবই না। 

এতক্ষণের ভালো লাগাটা এক নিমেষে মন থেকে মুছে গেল। মেজাজটাকে খিঁচড়ে দিল সুলেখাকে দেখতে আসা ওই পাত্রপক্ষ। বিশেষ করে পাত্রের মা-টা। রূপ-চেহারা বেশবাস দেখে বোঝার উপায় নেই কিছু। যখন এল তখন ভিজে বেড়াল যেন! মুখে কোনও কথা নেই। তারপর দেখতে বসে, এটা জান সেটা জান, অমুক করতে পার, তমুক করতে পার? কত প্রশ্ন! যেন কাজের লোক ঠিক করতে এসেছে! উনি যেন সবজান্তা আর সবই পারেন! ছোট্ট কাচের বাল্বের মধ্যে ফিলামেন্ট কীভাবে না কেটে ঢোকানো যায় সুলেখা জানে; তুমি জান? ভার্জিন বাল্বের ভেতর গ্যাস ভরে ‘সিল’ করতে পারে ও। তুমি পার? পার না! আমি হলে ঠিক শুনিয়ে দিতাম। পরে সুলেখার মুখে শুনে যা রাগ হচ্ছিল না! ওটা তো মেনিমুখো!

সুলেখাকে ইন্টারভিউ করার পর্ব চুকলে চর্ব-চুষ্য গিলল, তারপর ‘পরে জানাব’ বলে কেটে পড়ল। সুলেখা দেখতে কি খারাপ! বলা যেত না, মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে। তাহলে আপাতত মনখারাপ তো হত না কারও। সবাই জানে ‘পরে জানাব’ মানেই হল পছন্দ হয়নি। তোমার ছেলে কী একবারে আমির খান, শাহরুখ খান! ওই তো রোগা-প্যাটকা চেহারা!

মাসিমা আবার দুপুরে খেয়ে যেতে বলছিল। শুনে তো আমার গা-পিত্তি জ্বলছিল। ভাগ্যিস দুপুরে ওরা খেয়ে যেতে রাজি হয়নি! থাকলে হয়তো মুখ ফসকে কিছু বলে ফেলতাম। তখন সুলেখা বা ওর মা রাগ করত। একটা ব্যাপারে আমি ভেবে কুল-কিনারা পাই না। রাস্তাঘাটে, হাটে-বাজারে, বাসে ট্রামে মেয়েরা খুব আকর্ষণীয়, আর দামী। কিন্তু বিয়ের যোগাযোগের সময় মেয়েরা যেন গরু-ছাগল। বাসে ট্রামে দেখি, সদ্য গোঁফ গজানো ছোকরা থেকে শুরু করে সব চুল সাদা হয়ে যাওয়া বুড়ো অবধি সবাই মেয়ে দেখে। মুখের দিকে তাকানোর পরেই চোখ নেমে আসে বুকে। বেশ বুঝতে পারি ওদের চোখের ভাষা। কেউ নির্লজ্জের মতো ড্যাবডেবিয়ে তাকায়। কেউ চোরা চোখে দেখে! কেউ বা আবার কাছাকাছি এসে চুলের গন্ধ শোঁকার কিংবা পাঁজরায় কনুই ঠেকানোর চেষ্টা করে। আমাদের সাবধান থাকতে হয়, কখন কোন দিক দিয়ে ওদের ভালোলাগা প্রকাশ পাবে। কিন্তু বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে এলেই ওদের সব ভালো লাগাগুলো চলে গিয়ে খারাপ লাগাটা বেশি করে প্রকাশ পায়। রঙটা একটু দাবা। নাকটা একটু বসা, মাথায় চুল কম, চোখ টানা-টানা নয়, আরও কত যে খুঁত বেরোয়। যেন ওইসব খুঁত থাকলে সংসার করতে, ছেলেমেয়ে মানুষ করতে স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা যত্ন করতে কত অসুবিধা হবে। আবার দেখি, বেশি বেশি সোনাদানা, নগদ টাকা দিলে সব খুঁত ঢাকা পড়ে যায়।

আমার বড় পিসির মেয়ে ঝিমলিদির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ও যেমন মোটা তেমন কালো। গতবছর ওর বিয়ে হয়ে গেছে। একবছর ধরে কত জায়গা থেকে কতজন যে দেখতে এল ওকে। কারুরই পছন্দ হয় না। পিসি-পিসেমশাই তো খুবই সমস্যায় পড়েছে।

হঠাৎ যেন ভগবান মুখ তুলে চাইলেন ওর দিকে! পাড়ায় লটারি টিকিট বিক্রি করতে এসেছিল প্রাইভেট কারের মাথায় সাউন্ডবক্স বেঁধে। ঝিমলিদি' তখন পাঁচফোড়ন কিনতে গেছে রাস্তার ধারে মুদির দোকানে। সাউন্ডবক্সে লাখপতি হওয়ার ঘোষণা শুনে পাঁচটাকা দিয়ে একটা লটারি টিকিট কিনে আনল। লাগবি তো লাগ ফার্স্ট প্রাইজ দশ লাখ। কেটে কুটে হাতে পেল আট লাখেরও বেশি। চারলাখ নিজের নামে রেখে বাকিটা পিসির নামে ফিক্সড ডিপোজিট। তারপর বিয়ের যোগাযোগ হতে, মেয়ের নামে চারলাখ ফিকসড ডিপোজিট আছে জানতেই ঝিমলিদি' কালো থেকে হয়ে গেল শ্যামবর্ণা। আর মোটা শরীর হল দোহারা গড়ন। ড্যাংডেঙিয়ে বিয়ে হয়ে গেল।        

সুলেখাকে পছন্দ-অপছন্দের কথা পরে জানানোর পেছনে রয়েছে, কত টাকা মেয়ের বাবা খরচ করতে পারবে এটা জানা। মধ্যিখানের লোক মারফত সেটা জানতে পারাটাই এখন পাত্রপক্ষের প্রধান কাজ। আমার তো এমনই মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে আসে, সুলেখার বাবা তার মেয়ের বিয়েতে যেমন টাকা খরচ করবে, ঠিক তেমন টাকা পাওয়ার আশা করবে ছেলের বিয়েতে। সুভাষদা'র সঙ্গে যদি আমার বিয়ের ঠিক হয়, বাবা কি পারবে এত টাকা খরচ করতে! 

ধুস! আমার মাথাটা বোধহয় গেছে। চুপচাপ বসে থাকলেই মনের মাঝে এমন সব চিন্তা ঘুরে বেড়ায়। কোনই মানে হয় না এসব ভাবার। এমন সময় সুলেখা বলে— কী রে, কার কথা ভাবছিস। খাবি চল। দাদা তোর জন্য বসে আছে একসঙ্গে খাবে বলে। দাদা তো কাজে বেরোবে চল শিগগির।  

 

বারো

দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সুভাষদা' বড়বাজার চলে গেছে। আমি সুলেখার মায়ের ঘরে বসে টিভি দেখছি। সুলেখা ওর মায়ের সঙ্গে ধোয়া-মোছায় হাত লাগিয়েছে। পাশের ঘর থেকে গানের সুর ভেসে আসছে। সুলেখার বাবা বোধহয় খেয়াল শুনছে।

হঠাৎ আমার মনে আসে ঝুমুরের কথা। সকাল থেকেই এমন এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম যে, ওর বা রত্নার কথা মনে পড়েনি একবারও। কাল ‘ডিউভিউ’য়ের ঠেক থেকে আসার আগে ঝুমুরকে বললাম ওকে রুমির খোঁজ করতে আসার কথা। তা শুনে ও আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল— আমি নাকি ওর খুব উপকার করলাম। 

কী উপকার করলাম, তা আমি জানি না। হয়তো ও রুমির সঙ্গে দেখা করতে চায় না! কিংবা ও কোথায় আছে, কী করছে, তা রুমিকে জানাতে চায় না। নিশ্চয় রুমির সঙ্গে ওর কোনও গণ্ডগোল হয়েছে! যেদিন আমি রুমির সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, সেদিন বোম-রতন ওখানে আছে শুনে, ও রুমির সঙ্গে দেখা করতেও গেল না। অথচ ফিরে আসতে আসতে আমাকে বলল, ওই র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টারে ও এক-আধদিন কাজও করেছে। এমনও হতে পারে ও রুমির কাছ থেকে অ্যাডভান্স টাকা নিয়েছে ওখানে কাজ করার জন্য। ওর মা তো বেশ কিছু দিন ধরেই অসুস্থ। বোধহয় ভীষণ টাকার দরকার হয়েছিল! তারপর কাজ ভালো না লাগায় আর যায়নি। রুমি সেই টাকা উদ্ধার করার জন্যেই হয়তো ঝুমুরের খোঁজ করছে। ঝুমুরটাও হয়েছে সেইরকম! মানুষের অসুবিধা থাকতেই পারে! টাকা এখন না দিতে পারিস, দেখা তো করতে পারিস! রুমির সঙ্গে দেখা করে যদি বলিস, তোর এখনকার অবস্থার কথা; ও কি বুঝবে না! পরে হাতে টাকা এলে মিটিয়ে দিবি!

আজকাল ঝুমুরের মতিগতি ভালো লাগছে না আমার। মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পড়ে, কাল জিজ্ঞেস করতে বলল, ওর মা হয়তো আর বাঁচবে না। কিন্তু কোনও কষ্ট বা দুঃখের লেশমাত্র নেই! এসেই তো হুল্লোড় শুরু করল। ফুচকা খাওয়া, লুডোখেলা। যেন কত আনন্দ মনে! মাথাটা গেছে কিনা কে জানে! কাল বলছিল, ও সহজে মরবে না, বাঁচতেই হবে, মরলে মেরে মরবে। এইসব আংসাং কথা। কে যে ওকে মারতে চায়, ও-ই বা কাকে মেরে মরবে, কিছুই বলল না। খুব জরুরি কাজ আছে বলে ষষ্টীদা' আর শ্যামলদা'র সঙ্গে হাঁটা দিল বেলেঘাটা সি.আই.টি রোডের দিকে। বোম-রতনের সঙ্গে কোনও ঝগড়াঝাঁটি হলে তো বলত। কী যে করছে ঝুমুরটা!  

এ-সব ভাবছি টিভি দেখতে দেখতে। সুলেখা গামছায় হাত মুছতে মুছতে ঘরে আসে, কী রে, কোন সিরিয়ালটা দেখছিস?

কী এক বিদঘুটে নাম দেখাল সিরিয়ালটার। আমি তো এ সিরিয়াল দেখি না। আমাদের টিভিতে এই চ্যানেল আসে না। কেব্ল লাইন নেই তো! সুলেখা আমার পাশে বসে টিভি সিরিয়ালের গল্প শুরু করল। আমি কিছু শুনছি, কিছু শুনছি না। ওদিকে টিভিটাও চলছে। শুধু ছবি দেখছি। কিছু বোঝবার চেষ্টা করছি না। এমন সময় মাসিমা বারান্দা থেকে বলে— সুলি, দেখ কে এসেছে!

আমি আর সুলেখা একসঙ্গেই বের হই ঘর থেকে। দেখি বাইরের দরজায় ঝুমুর। কেমন ঝোড়ো কাকের মতো লাগছে ওকে। ও এসে বারান্দায় একটা টুলের ওপর বসে। ইশারায় বোঝায় জল খাবে।

সুলেখা জল এনে দেয় তাড়াতাড়ি। এক নিঃশ্বাসে জলটুকু শেষ করে ঝুমুর। আমি আর সুলেখা অনুমান করি, নিশ্চয় খারাপ কিছু হয়েছে। কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করতে সাহস পাই না।

সুলেখা বলে— হ্যাঁ রে, সারা দিন কিছু খেয়েছিস? 

ঝুমুর তার উত্তরে ধরা গলায় বলে— আজ মা মারা গেছে।

ঝুমুরের চোখ মুখ দেখে এমন একটা দুঃসংবাদই অনুমান করছিলাম আমরা। সুলেখা সান্ত্বনা দেয়, কী আর করা যাবে বল! যা অসুখ হয়েছিল! একপক্ষে ভালো হয়েছে। খুব কষ্ট পাচ্ছিল! বেশি কষ্ট পেতে হল না। রত্নার বাবাটা কী কষ্ট পাচ্ছে তুই তো জানিস।

ঝুমুর ছল ছল চোখে বলে— হ্যাঁ, ভালোই হল। একেবারে স্বাধীন হয়ে গেলাম রে! আর কোনও পিছুটান রইল না।

আমি জিজ্ঞেস করি, কখন খবর পেলি?

কাল দুপুরে দারোয়ানকে বলে কয়ে একবার ঢুকেছিলাম। তখন ভালো ছিল। বিকেলে ভিজিটিং আওয়ার্সে তো যাওয়া হয়নি। আজ এগারোটার সময় গিয়ে শুনি সকালেই মারা গেছে। কাল বিকেলে যদি যেতাম...। বলেই ঝুমুর ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। সুলেখা ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কান্না থামাতে সচেষ্ট হয়। আমি সুলেখাকে ইশারায় বলি— ওকে একটু কাঁদতে দে, মনটা হালকা হবে।

এর মধ্যে সুলেখার মা আমাদের কাছে একবার এসে ঘুরে গেছেন। শুনেছেন ঝুমুরের মায়ের মৃত্যুর খবর। কিছুক্ষণ পর ঝুমুরের কান্না থামাতেই মাসিমা আসেন ঝুমুরের কাছে। হাতে একটা প্লেটে দুটো সন্দেশ আর এক গ্লাস জল।

সন্দেশের প্লেট আর গ্লাসটা জানলার গোবরাটের ওপর নামিয়ে ঝুমুরের গা ঘেঁষে দাঁড়ান মাসিমা।

ঝুমুরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন— মা চিরদিন কারও থাকে না রে মা! সময় হলে সবাইকেই চলে যেতে হয়। দুঃখ করো না। আমি তো আছি? যখন মায়ের জন্য মন খারাপ করবে, আমার কাছে চলে আসবে। 

একথা শুনে ঝুমুর হু-হু করে কেঁদে ওঠে মাসিমার বুকে মুখ গুঁজে। মাসিমা ওর পিঠে হাত বুলিয়ে বলেন— ওই হয়েছে, নে। আর কাঁদিস না, শরীর খারাপ করবে। নে, এই মিষ্টিটুকু খেয়ে নে। সারাদিন তো কিছু পেটে পড়েনি। ঘাট-কর্ম সারা না হলে আর খেতেও পাবি না। নিজেকে তো বাঁচতে হবে।

মাসিমা সন্দেশ দুটো ঝুমুরকে খাইয়েই ছাড়েন। পর পর দু’গ্লাস জল খায় ঝুমুর। এবার যেন একটু ধাতস্ত হয় ও। নিজেকে সামলে নেয় অনেকখানি। দোপাট্টা দিয়ে চোখ মোছে। আমি বলি— কখন ডেডবডি দেবে হাসপাতাল থেকে? আত্মীয়-স্বজন কাউকে খবর-টবর দিয়েছিস?  

ঝুমুর মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় বলে— বেলা একটার পর যখন খুশি যেতে বলেছে হাসপাতালে। আত্মীয়দের মধ্যে কাকে আর খবর দেব বল। খালপাড়ে ঝুপড়িতে চলে আসার পর সবাই আত্মীয়তা ছেড়ে দিয়েছে। এখন আমার আত্মীয় বলতে ষষ্টীদা', শ্যামলদা' আর তোরা। মোবাইলে ওদেরকে খবর দিয়েছি। ওরা খুব ভালো রে! আমার দাদা নেই। কিন্তু ওরা আমার দাদার চেয়েও বেশি! কীভাবে যে মায়ের জন্যে রক্ত জোগাড় করে দিয়েছে কল্পনা করতে পারবি না। তবুও বাঁচল না মা-টা!

আবার গলা ধরে আসে ঝুমুরের। চেষ্টা করে ও সামলে নেয় নিজেকে। তারপর বলে— ষষ্টীদা' আর শ্যামলদা' বিকেল চারটের আগে আসতে পারবে না। আজ প্রধানমন্ত্রী এসেছে কলকাতায়। ওরা সেখানে ব্যস্ত রয়েছে। বলল, বিকেল চারটের পর খাট-টাট কিনে ম্যাটাডোর ভাড়া করে নিয়ে আসবে একবারে। আমাকে কিছু চিন্তা করতে হবে না।

আমি আর সুলেখা একসঙ্গে বলে উঠি— সত্যি ওরা খুবই ভালো রে! নিজের লোকেরাও এতটা করে না।

যখন ওদেরকে মোবাইলে জানাই, তখন বাজে সাড়ে বারোটা। চারটে বাজতে অনেক দেরি! এতক্ষণ হাসপাতালে একা একা বসে থাকব! তাই চলে এলাম। তোদেরকে তো ফোনে খবর দেওয়ার উপায় নেই!

আমার দিকে তাকিয়ে ঝুমুর বলে— চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল থেকে আসতে তোদের বাড়িটা তো প্রথমে পড়ে। তাই তোদের বাড়িতেই আগে গিয়েছিলাম। মাসিমা বলল, তুই এখানে। এখানে আসার পথে রত্নার বাড়িতেও ঢুকলাম একবার। রত্নার বোন রয়েছে, আর একটা অচেনা ছেলে। বাবাটা বিছানায় পড়ে। ঘুমোচ্ছে বোধহয়। রত্না নেই। ওর বোন বলল, 'দিদি সেজেগুজে কোথায় বেরিয়েছে। বলে গেছে ফিরতে রাত্তির হবে।' তারপর ওখান থেকে বেরিয়ে এখানে তোদেরকে খবরটা দিতে এলাম।

সুলেখা বলে— তোর কাছে তো রুমির মোবাইল নম্বর আছে। ওকে জানাসনি? ও কিছুটা হেল্প করতে পারত।

রুমির কথা শুনেই ঝুমুরের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। বলে— হ্যাঁ, ও আমাকে অনেক হেল্প-ই করেছে। ও হেল্প না করলে আজ আমি কলগার্ল হতাম না। ও-ই রাস্তা দেখিয়েছে আমাকে।  

আমি আর সুলেখা অবাক হই ওর কথা শুনে। ঝুমুরকে যেন কথায় পেয়েছে এখন। ও বলে চলে— জানিস, বাল্ব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, একদিন ওর সঙ্গে দেখা বেলেঘাটা মেন পোস্টাপিসে। আমার পাসবই থেকে শেষ দু’শো টাকা তুলেছি। আর মাত্র উনিশ টাকা থাকল। রুমি গেছে টাকা জমা দিতে। আমাকে দেখে হেসে কাছে এল। সব শুনল। তারপর আমার হাতে জোর করে একখানা পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বলল, 'রাখ এটা। আর শোন! কাল দুপুরবেলা ফুলবাগানে আমাদের র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টারে চলে আসিস। তোর একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেব।' 

ঝুমুর একটু থামে। জলের জাগ থেকে দু’ঢোক জল খায়। তারপর আবার বলতে থাকে— আমার খুবই কাজের দরকার। পরদিন গেলাম। তোদেরকে ইচ্ছে করেই বলিনি। আমাকে রুমি মাসাজ করার কাজের অফার দিল। আমার করার ইচ্ছে ছিল না মোটেও। কিন্তু ওর কাছ থেকে পাঁচশো টাকা নিয়ে ফেলেছি। ঘরে চাল-ডাল-তেল-নুন কিচ্ছু ছিল না। খরচও করে ফেলেছি। টাকাটা শোধ দেব কীভাবে! তাই ভাবলাম, দু’দিন কাজ করে ওর টাকাটা শোধ করে দিয়ে কাজ ছেড়ে দেব।

রাজি হয়ে গেলাম কাজ করতে। তখন রুমি আমাকে পাশের ঘর নিয়ে গিয়ে কাজের ব্যাপারটা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে দিল। ক্লোজ-সার্কিট টিভিতে মাসাজ করার কায়দা-কানুন দেখাল। বলল, ‘মুভি ক্যামেরাতে প্রত্যেকটা রুমের ছবি তোলা হচ্ছে। ভয়ের কিচ্ছু নেই। কাস্টমাররা খুবই ভালো। মাসাজের আরাম নিতে নিতে ঘুমিয়ে পড়ে ওরা।’

আমার মনে পড়ে যায়, রুমি আমাকে সেদিন ক্লোজ সার্কিট টিভির ছবি দেখতে বলেছিল, দেখিনি। বোধহয় কোথাও সিডি লাগানো আছে সেটাই চালিয়ে দেখায় নতুন মেয়েদেরকে। ঝুমুর বলে চলে— টিভিতে দেখে ভাবলাম, এ আর আহা মরি কী কাজ! আমি পারব। পরের দিন গেলাম। আমার প্রথম কাস্টমার উল্টোডাঙার ‘প্রিন্সিপ্যাল ইলেকট্রনিক্স'-এর মালিক মি.  চৌধুরি। বিশাল পয়লাওলা লোক।

নাম শুনেই চমকে উঠি আমি। সেই লোকটা। মোটরবাইক নিয়ে রুমির ওখানে এসেছিল। নীল জিন্স আর আকাশি রংয়ের টি-শার্ট পরেছিল। তাহলে, সেদিন আমি রাজি হয়ে গেলে আমারও প্রথম কাস্টমার ও-ই হত!

ঝুমুর বলে চলেছে— লোকটার কথাবার্তা খুব ভালো। মিষ্টি ব্যবহার। ভদ্রও মনে হল। তাই ছোট্ট খুপরি ঘরে ঢুকে গেলাম ওকে নিয়ে। পোশাক খুলে তোয়ালে পরে নিল লোকটা। ঘরের ভেতরে জোরালো আলো কমে গেল। মিষ্টি বাজনা শুরু হল। টেবিলের ওপর পাতা কুশনে উপুড় হয়ে ও শুয়ে পড়ল। আমি হাতে গ্লাভস পরে নিয়ে, পাউডার লাগিয়ে ভয়ে ভয়ে ওর পিঠে হাত রাখলাম। আঙুল চলতে থাকল পিঠ থেকে ঘাড় হয়ে মাথা অবধি। তারপর ওর নির্দেশে হাত গেল কাঁধে, হাতের মাসল-এ। মোটামুটি যখন ভয়টা কাটিয়ে উঠেছি আমি; তখন ও চিৎ হল। ওর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। ওর পরনের তোয়ালেটা ঠিক যেন সার্কাসের তাঁবু হয়ে গেছে। আমার চোখে চোখ রেখে ও বলল, কোনও ভয় নেই। এমন হয়। পায়ের মাসলগুলোতে দাও।

এমন সময় রুমি দরজার বাইরে থেকে একবার আওয়াজ দিল, ঝুমুর, কোনও অসুবিধা নেই তো? আমি বাইরে আছি। দরকারে কলিংবেলের সুইচটা টিপিস!

আমি সাহস পেয়ে ওর পা টিপতে থাকলাম। পরে হুকুম হল, ব্যাস, এবার থাই দুটো একটি দিয়ে দাও তাহলেই তোমার ছুটি।

লজ্জায় জড়সড় হয়ে ওর থাই টিপছি আমি। ও হঠাৎ আমার হাতটা খপ করে ধরে বসিয়ে দিল তাঁবুর খুঁটিতে। আমি ঝটকা মেরে পিছিয়ে এলাম। ও বলল, ভয় কী! ওটাও শরীরের অংশ। লজ্জা পেও না।

আমি কলিংবেলের সুইচের দিকে হাত বাড়াতে যাচ্ছি। হঠাৎ ও ঝট করে উঠে কুশনের তলা থেকে একখানা হাজার টাকার নোট বের করে আমার সামনে ধরে বলল, 'জাস্ট মাসাজ করে দাও, আপ অ্যান্ড ডাউন। তোমার কোনও ক্ষতি হবে না।'  

আমারও তখন ভেতরটা কেমন যেন হল! অদ্ভুত এক শিরশিরানি। প্রথম কোনও পুরুষের উদোম শরীর দেখছি, স্পর্শ করছি। আমি টাকাটা নিলাম হাত বাড়িয়ে। হয়তো লোভে পড়ে! কিংবা অজানা এক আকর্ষণে! জানিস! সেদিন শয়তানটা আমার বুক দুটো ছিঁড়ে খেয়েছিল বলতে গেলে। শুধু শেষ কাজটা করতে দিইনি কিছুতেই।

আমি আর সুলেখা মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে ঝুমুরের পাশে। ঝুমুরের দিকে তাকিয়ে দেখি ওর চোখে জল।

ও কিছুক্ষণ থেমে থেকে বলে— তারপর আর কী! আমি তো এঁটো হয়েই গেলাম। সংসারের বিশাল খিদে আর ওই হায়নাগুলোর বিশাল খিদে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। তবে রুমিদের ওই মাসাজ সেন্টারে পরদিন থেকে আর যাইনি। পরে রুমি মোবাইলে শাসিয়েছিল, বাইরে কাজ করছি, অথচ ওর কাছে কাজ করছি না বলে।

আমিও বলেছিলাম, ওদের ওই মৌচাকে ঢিল আমি ছুঁড়বই, এভাবে মেয়েগুলোর সর্বনাশ হতে আমি দেব না।

একটা লম্বা নিশ্বাস ছাড়ে ঝুমুর। ঘড়ি দেখে একবার। আবার বলতে শুরু করে— তারপর কত কিছু হল। আমাকে টাকার অফার দিল। কব্জা করতে না পেরে মেরে ফেলার হুমকি দিল। বোম-রতনকে লাগাল আমার পেছনে। ওই বোম-রতন বক্সিবাবুর পেছনে লেগে বাল্ব কারখানা বিক্রি করে দিতে বাধ্য করেছিল। রুমি বলেছে আমাকে।

আমার মনে হয় দিঘায় যাওয়ার জন্যে দত্ত সাহেবের অফারটাতে রুমিরই হাত ছিল। দত্ত সাহেব দিঘায় হোটেলে নেশার ঘোরে বলেছিল, ও র‍্যামস্পোর্ট-য়ের কাস্টমার। দিঘার একরাতের জন্যে এত টাকার অফার দেয় না কেউ। ওই রুমি কিংবা ওর বর দিঘা থানায় ফোন করে আমাদের ধরিয়ে দিয়েছিল। আমিও মরণ-কামড় দিয়ে দিয়েছি।

দু’জনে এক সঙ্গেই বলে উঠি— তুই আবার কী করলি?  

ঝুমুর হঠাৎ চোখ বড়বড় করে বলে ওঠে— আচ্ছা সুলেখা, তুই একদিন বলেছিলিস না; তোদের কেব্ল কানেকশান আছে!

হ্যাঁ, আছে তো।

জবর খবর চ্যানেল আসে?

হ্যাঁ, আসে।

চল, টিভিটা খোল তো একবার। তখন শ্যামলদা'কে ফোন করতে, শ্যামলদা জানাল মিশন সাকসেসফুল। তিনটের খবর থেকে দেখানো শুরু হবে। তিনটে বাজতে আর মাত্র দু’মিনিট বাকি। শিগগির খোল।

আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই ঝুমুরের হাবভাব দেখে। মাথাটা গেল নাকি! ওর মায়ের ডেডবডি হাসপাতালের বেডে, আর ও এখন টিভি দেখতে চাইছে! তবুও আমরা তিনজনে ঘরে ঢুকি।

‘জবর খবর’ চ্যানেল ধরাতেই শুরু হয় — ‘জবর ঝলক’। কলকাতায় প্রধানমন্ত্রীর কনভয়-এ বাধা। কনভয় ঘুরপথে। পুলিশ কমিশনারকে মুখ্যমন্ত্রীর তিরস্কার। ফুলবাগানে বিশাল মধুচক্রে পুলিশি হামলা, ধরপাকড়, জালে রাঘব-বোয়াল মন্ত্রী।

এরপর ‘জব্বর বিস্তার’। ডিটেলস-এ দেখানো হচ্ছে ‘জবর ঝলক’ এর খবরগুলো।

আমরা নিষ্পলক তাকিয়ে থাকি টিভির দিকে। ‘মধুচক্রের বিস্তার’ পর্দায় ভেসে উঠতেই নড়েচড়ে বসি আমরা। পর্দায় ভেসে ওঠে রাতের কলকাতা। ফুলবাগান মোড়। র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টারের সাইনবোর্ড। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির নম্বর প্লেট। মন্ত্রীর গাড়ি থেকে নামা। রুমির রিসেপশন ডেস্ক-এর সামনে মন্ত্রী। ক্যাটালগ-এর রেট চার্ট। ক্লোজ-সার্কিট টিভি।

ঝুমুর বিড়বিড় করে— ধন্য সাহস শ্যামলদার! কী নিখুঁত কাজ করেছে। শ্যামলদা' বলেছিল ওর কাছে একটা বিদেশি ‘স্পাই-ক্যাম’ আছে। বাইরে থেকে দেখলে সানগ্লাস, চোখে লাগালেই মুভিক্যামেরা। 

পর্দায় ফুটে উঠেছে মাসাজ করার একটা দৃশ্য। তারপরেই এক ঝলকের জন্য একটা নোংরা ছবি। তারপর একে একে পুলিশের মুখ, রুমির মুখ, ওর হাজব্যান্ড খেলারাম সরখেলের হ্যান্ডকাপ পরা হাতজোড়া। দু’একটা প্যান্টি-ব্রা পরা মেয়ের ছবি। মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তার ছবি। সেই সঙ্গে ধারা বিবরণী দেওয়ার মতো সংবাদ পাঠিকা একের পর এক ছবির সঙ্গে কথাও বলে যাচ্ছেন! সবশেষে বলেন, র‍্যামস্পোর্ট মাসাজ সেন্টারের মালিক খেলারাম সরখেল ও তাঁর স্ত্রী রুমি সরখেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সেন্টারটি আপাতত সিল করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ মনে করছে এই মধুচক্রের সঙ্গে অনেক উপরমহলের কর্তাব্যক্তি জড়িত। এই চক্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে। এলাকার কুখ্যাত গুণ্ডা রতন দাস ওরফে বোম-রতন এই মধুচক্রের ভাড়াটে গুণ্ডা হিসাবে কাজ করে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। পুলিশি ‘রেড’ করার সময় বোম-রতন মাসাজ সেন্টারের মধ্যেই ছিল। পুলিশ তাকে ধরতে পারেনি। পেছন দরজা দিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পালিয়ে যায়। তার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

ঝুমুর আবেগের সঙ্গে বলে— কালকের কাগজে ভালো করে সব জানা যাবে। ষষ্টীদা সমস্ত তথ্য জোগাড় করেছে অনেক খেটেখুটে। শুধু ওদেরকে হাতে নাতে ধরিয়ে দেওয়ার অপেক্ষায় ছিল।

বোম-রতনের পালিয়ে যাওয়ার খবর শুনে আমার মনে ভয় ঢুকে যায়। ও নিশ্চয় বুঝে ফেলবে এর পেছনে ঝুমুরের হাত আছে কিনা, ওই রিপোর্টারদের সঙ্গে ঝুমুরের মাখামাখি ওর চোখ এড়ায়নি। ঝুমুরও দেখি একটু উসখুস করছে। শুনি ও বিড়বিড় করছে, শয়তানটা পালিয়েছে। ও ধরা পড়লে ভালো হত। খুব বাড় বেড়েছে ওর। 

সুলেখা বলে— রতন পালিয়ে যাবে কোথায়! আজ হোক, কাল হোক পুলিশের হাতে ধরা ওকে পড়তেই হবে।

খবর শেষ হতে ঝুমুর বলে— দেখলি তো কেমন মরণ কামড় দিয়েছি। ও ব্যাপারে ওই ষষ্টীদা' আর শ্যামলদা' খুব হেল্প  করেছে রে! ওদের সঙ্গে মেলামেশা করি বলে তোরা রাগ করতিস, বুঝতে পারতাম। কিন্তু ওরাই তো ব্যাপারটা ফাঁস করল। উচিত শিক্ষা হল রুমির। 

সুলেখা বলে ওঠে— তুই এসব করতে গেলি কেন? শুধু শুধু নিজের বিপদ ডেকে আনলি। ওরা তোকে ছেড়ে দেবে ভেবেছিস! তোর ভালো লাগল না, তুই যাবি না। যে যাচ্ছে যাক, তোর কী!

ঝুমুর ম্লান হেসে বলে— তুই তোর উপযুক্ত কথাই বলেছিস। অন্যরা বিপদে পড়লে তোর কী! অন্য মেয়েকে ফুসলে নিয়ে গিয়ে ইজ্জত নিলে, নোংরা পথে নামালে তোর কী! কিন্তু যদি আমার পর তোকেও রুমি এভাবে পটিয়ে-পাটিয়ে নিয়ে গিয়ে আমার মতন অবস্থা করত; তখন কী করতিস!

সুলেখা মাথা নিচু করে থাকে।

ঝুমুর বলে, ‘যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর’। আজ আমাকে ফুসলে নিয়ে গেছে। কাল সীমাকে, পরশু তোকে যাতে এভাবে নষ্ট করতে না পারে, তার জন্যেই আমার এই লড়াই। যাক গে! ছাড়! তোরা গা বাঁচিয়ে তোদের মতো থাক। ভালো ছেলে দেখে বিয়ে কর, ঘর-সংসার কর। ভদ্রঘরের মেয়ে তোরা। আমার মতো তো আর ‘বস্তির মেয়ে’ নয়!

ঝুমুরের কথাগুলো আমার বুকে তিরের মতো বেঁধে। লজ্জাও লাগে। সত্যিই আমরা কত স্বার্থপর! ঝুমুর অল্প লেখাপড়া জানা, ভুল পথে পা-বাড়ানো একটা মেয়ে হয়েও...। ওকে শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। অন্তত একটু বুকেও যদি জড়িয়ে ধরা যায়! কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও আমি তা করি না। এসময় এমন নাটুকেপনা মানায় না। আমি ওর কথায় মোড় ঘোরাতেই যেন বলি— ঝুমুর, সাড়ে-তিনটে বাজল। চল, হাসপাতালে যেতে হবে তো! ষষ্টীদা-রা এসে বসে থাকবে। 

ঝুমুর যেন এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। বোধহয় ভুলেই গিয়েছিল যে, হাসপাতালে ওর মায়ের মরা দেহটা পড়ে রয়েছে।

হ্যাঁ চল যাই। যে মুখে ওষুধ-পথ্যি ঠিকমতো দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারলাম না, সে মুখে আগুনটা অন্তত দিয়ে আসি। সুলেখা তুই যাবি তো?

সুলেখা বলে— তোর মা গত হয়েছে, আর আমি যাব না! তুই ভাবলি কী করে! দু’মিনিট দাঁড়া, আমি মাকে বলে আসি। মা বোধহয় বাবার ঘরে রয়েছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে আমি, সুলেখা আর ঝুমুর বেরিয়ে পড়ি সুলেখাদের বাড়ি থেকে। সুলেখার মা বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলেন— সাবধানে যাস তোরা। পারলে সন্ধে নামার আগে ফিরিস সুলি! দেরি হলে আমার আবার চিন্তা হয় খুব।

আমরা পায়ে পায়ে এগোই। মাসিমা বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে। বেশ কিছুটা দূর অবধি কানে আসে একটা রাগপ্রধান গানের সুর। সুলেখার বাবার ঘর থেকে আওয়াজটা আমাদের পেছন পেছন আসছে হয়তো!

রত্নাদের বাড়ির কাছে এসে আমি আর সুলেখা থেমে যাই।

ঝুমুর বলে— ঢুকে কোনও লাভ নেই। ওকে পাবি না। ও কোথায় যেতে পারে আমি জানি। তোরা হয় তো জানিস না, কাল ডিউভিউ কমপ্লেক্সের দোতলায় দীপালি দাসের নাম লেখা যে কার্ডখানা তোদের দেখিয়েছিলাম; সেটা রত্না দেখতে নিয়ে আমাকে আর ফেরত দেয়নি। ও এখন দীপালি দাস হয়ে গেছে। তবুও মেয়েটা ওর বাবাকে বাঁচাতে পারবে না রে! ক্যানসার যে সারে না! ক্রমশ ছড়াতে থাকে।

ফিনাইল কোম্পানিকে বাঁদিকে রেখে খালপাড়ের রাস্তা ধরে নতুন কংক্রিট ব্রিজের কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা। দূরে দেখা যাচ্ছে ডিউভিউ কমপ্লেক্সের অসম্পূর্ণ বাড়িগুলো। আমরা এখন ডিউভিউ-য়ের দিকে যাব না। ডাইনে ঘুরে রাসমনি  বাগান হয়ে হাসপাতাল যাব। আমাকে একবার বাড়িতে দেখা করে যেতে হবে। তা না হলে মা চিন্তা করবে। মা জানে না, ঝুমুরের মা মারা যাওয়ার কথা! ঝুমুর তখন আমাদের বাড়ি গেলেও মাকে ওর মায়ের মারা যাওয়ার কথা বলেনি।

কংক্রিট ব্রিজ ছাড়িয়ে আমরা রাসমনি বাগানের দিকে ঘুরছি। হঠাৎ কানে আসে ফট করে পটকা ফাটার মতো একটা শব্দ। শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখি ঝুমুর মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবার তীব্র এক আওয়াজ। নির্ঘাত বোমফাটার শব্দ। ধোঁয়ায় ভরে ওঠে আমাদের চারপাশটা। আমি আর সুলেখা হতভম্ব। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। কাছেই শব্দ শোনা যায় দুম দুম দুম দুম। মোটরবাইক স্টার্ট করার শব্দ। এ শব্দটা আমাদের চেনা। বোম-রতনের পুরোনো বুলেট গাড়ির শব্দ এটা। মুহূর্তে বুঝে যাই কী হয়েছে। সুলেখার কিছু হল কিনা কে জানে! আমার কিছু হয়নি। ধোঁয়া হালকা হতে দেখি, ঝুমুরের পিঠ থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে রাস্তায় গড়িয়ে যাচ্ছে। আশেপাশের দোকানগুলোর সাটার নামানো হচ্ছে হুড়মুড় করে। আমাদের সাহায্যের জন্যে কেউ ছুটে আসে না। ঝুমুর একটু নড়াচড়া করে স্থির হয়ে যায়। ঠিক তখুনি ওর হাতে ধরা ছোট্ট ভ্যানিটিব্যাগের ভেতর মোবাইলটা বেজে ওঠে, ম্যায় হুঁ পায়রা পায়রা ম্যায় তো পায়রা বিবি হুঁ...!

মোবালই ফোনটা বের করে দেখি স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে, ষষ্টীদা'।

সুলেখা আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে সবুজ বোতাম টিপে কানে ঠেকায়। আমি ভেবে পাই না, সেই মুহূর্তে আমার ও সুলেখার ভয় দূর হয়ে এত সাহস এল কী করে।।

শেয়ার করুন: